

‘একটি লোক গোলাপ টবের কান ধরে এমন ভঙ্গিতে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে স্পষ্ট প্রতিভাত হয় সে শুধু বাগান করেছে গাছের জনক হতে পারেনি।’ উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতর উপরোক্ত শব্দসমষ্টি পর্যালোচনা করলেই বাক্যস্রষ্টার শক্তিশালী উপস্থাপন ক্ষমতা উপলব্ধি করা যায়। উপরের বাক্যটি কথাশিল্পী নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু উপন্যাস থেকে গৃহীত হয়েছে। ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করে নাসরীন জাহানের বিশ্লেষণধর্মী জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস উড়ুক্কু। পরবর্তী সময় উপন্যাসটি ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।
নীনা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির চাকরিজীবী একজন বিচ্ছিন্ন নারীচরিত্র। মূলত নীনা নামের এই চরিত্রকে কেন্দ্র করেই সমগ্র কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। তাই দেখা যায় কাহিনির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নীনার উপস্থিতি। আত্মপীড়নে দ্বগ্ধ, আপসহীন, অগ্রবর্তী চিন্তার অধিকারী-মানবতাবাদী, সৃজনশীলতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, রাজনৈতিক সচেতনতা, আন্তর্জাতিকতাবাদ মানবজীবনের প্রভৃতি মৌল উপাদান একই সঙ্গে নীনা নামের মেয়েটির বৈশিষ্ট্যে বিদ্যমান।
পারিবারিক অস্থিরতায় কিশোরগঞ্জ শহরে বাল্যকাল, কিশোর বেলা ও তরুণ বেলা কেটেছে। সংসারের প্রতিনিয়ত আর্থিক টানাপোড়ন বালিকা নীনা, কিশোরী নীনা, তরুণী নীনাকে বারবার দগ্ধ করেছে সত্য, কিন্তু স্তব্ধ করে দেয়নি। পাঠক লক্ষ করে চরম ধর্মীয় আচ্ছাদনের ভেতর বাস করে বাবা যখন কন্যাকে নারী ও পুরুষের বিভেদ বুঝাতে তৎপর হয়, নীনা তখন একের পর এক প্রশ্ন করে বাবাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মূলত এর মাধ্যমেই গতানুগতিক ধারণা ভেঙে দিয়ে সংগ্রামমুখর দুর্গম পথে হেঁটে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত হয়। যেন স্বাভাবিক পারিবারিক পরিমণ্ডলে বাস করেও অন্যলোকের বাসিন্দা। কারণ উপন্যাসের প্রথম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সর্বত্র নীনার বিচরণ সমাজের আর দশটা সাধারণ মানুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, প্রতিবাদী ও বহুমাত্রিক। ছোট বোন রানু যখন একটি চকোলেট অথবা টেকো মজুমদারের উপাদেয় খাবার ফলমূলের লোভে নিজের ব্যক্তিসত্তা সম্পূর্ণ বিলীন করে দেয়, নীনা তখন সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে। শিল্প-সাহিত্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজের ভূমিকাকে একান্ত প্রয়োজনীয় করে তোলে। অর্থাৎ বারবার নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রমাণ করে। লেখক উপন্যাসে এ সকল ঘটনার অবতারণা করে যথেষ্ট ভিন্নতা, বাক্য উপস্থাপনে নিজস্বতা ও মুন্সিয়ানার স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রতিটি চরিত্রকেই বিশ্লেষণ করেছেন সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতা থেকে।
একটি সমাজে স্বাভাবিকভাবেই ভালো-মন্দের কারণে কিছু মৌলিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্রের আগমন ঘটে। একদিকে রয়েছে মজুমদার মহিম, বড় চাচা, ছোট চাচা, ধর্মভীরু বাবা, আত্মসমর্পিত মা, মানসিক বিকারগ্রস্ত ছোট বোন রানু, বখে যাওয়া ছোট ভাই মন্টু, সমকামী ও সংকীর্ণ চিন্তার অধিকারী স্বামী রেজাউল, শানুর স্বামী কামাল, অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উর্বসি মেহজাবিন, কানে দুল পড়া মাস্তান, নির্জন রাস্তার মাস্তান, সমাজের উঁচুতলার বাসিন্দা সিনথির মা-বাবা। অন্যদিকে খুব স্বল্প পরিমাণে হলেও নিজস্ব ভূমিকায় উজ্জ্বল সামাজিক ব্যক্তিত্ব ইরফান চাচা, সহজসরল ওমর, প্রগতির পথিক সালাহউদ্দীন, রঞ্জু, শাহতাব, সত্যজিৎ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছোট ভাই আরেফিন। সবকিছু মেনে নেওয়ার অপূর্ব ক্ষমতার অধিকারিণী শানু। আর ঠিক তার মধ্যবিন্দুতে লেখক উপন্যাসের পরিপূর্ণ কাঠামো সৃষ্টি করতে গিয়ে এমন কিছু স্রোতে ভাসা শ্যাওলার মতো চরিত্র উপস্থাপন করেছেন যারা মূলত সমাজের অর্থ, শিক্ষা, মানসিক পরম্পরা থেকে সৃষ্ট এক একটি পরগাছা। বিষয়টি বিশ্লেষণ করে যদি বলতে হয়, তবে বলতে হয় চরিত্রগুলো পরনির্ভরশীল। অর্থাৎ আমরা যখন লক্ষ করি রোগা, নোংরা, হাড্ডিসার শূন্য ওমরের ছোট বোন ভালোবাসার প্রলোভন ফাঁদ তার অবস্থানকে আরও নড়বড়ে করে তোলে, তখন সেখানে কোনও বাড়াবাড়ি দৃষ্ট হয় না। বরং ফুটে ওঠে সমাজের দৈনন্দিন চালচিত্র। ওমরের মা ভাই এরা প্রত্যেকেই অবস্থার শিকার মাত্র। অথবা অন্যত্র আমরা লক্ষ করি, ‘পরক্ষণেই আমার প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই হুড়মুড় করে আমার কানের ওপর আছড়ে পড়ে, কণ্ঠেই ফিসফিস, সেদিন পার্টিতে ডান্সের সময় একফাঁকে জিন্নাহ চাচা মায়ের ব্লাউজের নিচে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। বাবা তো মিসেস আলীকে নিয়েই বিভোর। মায়ের যা হেভি ব্রেস্ট, বুক দিয়েই জিন্নাহ চাচাকে ধাক্কা দিয়েছিল। টাল সামলাতে গিয়ে চাচার যে কি হাসি। মাও কম পাজি না।’ লেখক সিনথির কণ্ঠ দিয়ে একথা উচ্চারণ করিয়ে উচ্চবিত্ত সমাজের একটি কালো দিকই চিহ্নিত করেছেন মাত্র। “সিনথির মা বাবা ঐশ্বর্যের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে হাই সোসাইটির লাগামহীন প্লাবণে নিজেদের এলিয়ে দেয়। স্বাভাবিক ভাবেই সিনথির উপর এর প্রভাব মারাত্মক। এই সকল বৈষম্য ও সামাজিক দুষ্টক্ষত লেখক উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত শৈল্পিক ভাষায়। সিনথির রুমে একজোড়া উলঙ্গ পুরুষ রমণীর চুম্বন দৃশ্য সম্বলিত বিশাল পোস্টার, টেবিলে নতুন-পুরাতন, উইকলি, মান্থলি ম্যাগাজিন এবং পড়ার প্রতি প্রচণ্ড নিঃস্পৃহতা প্রভৃতি উপস্থাপন করে লেখক সত্যি উপন্যাসের খাঁজে খাঁজে বিষয় বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে তার অনুসন্ধানী দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। উপন্যাসটি পেয়েছে একটি চরম আঙ্গিকগত মাত্রা।
জীবনের ক্ষণিক ঘটনাও যে কত বড় উপলব্ধি, মর্মপীড়া, মর্ম যাতনা, আনন্দানুভূতি ও বেঁচে থাকার নষ্টালজিয়া উপাদান উপহার দিতে পারে। অজয়ের স্পর্শে নীনাই তার বাস্তব উদাহরণ। তখন রানুকে খোঁজা বাদ দিয়ে জীবনের শাশ্বত পথেই হাঁটা মুখ্য হয়ে ওঠে। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলে, অজয়ের অভাববোধই তাকে পরবর্তী সময় মহিমের দিকে ঠেলে দেয়। মহিম নীনাকে ঠকিয়ে হাত বাড়িয়েছে নীনার ছোট বোন রানুর দিকে। এখানে একটি জিনিস লক্ষণীয়, মহিম যদি মনের অবচেতনে এই কাজটি করত তবে হয়তো পাঠক তাকে তার দায় থেকে কিছু অব্যাহতি দেয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু মহিম পরিকল্পনা মাফিক ছক অনুযায়ী নিয়ত নীনার সাথে প্রতারণা করে যেতে থাকে। তার প্রতিটি উচ্চারণে ঝড়ে পড়ত মিথ্যের অপূর্ব শিল্পধ্বনি। কিন্তু মুখোশের আড়ালে মহিমের শিল্পীত কণ্ঠস্বর ‘অদ্ভুত তোমার চরিত্র নিজেকে খুলে দিতে তোমার জুড়ি নেই। কিন্তু অপরপক্ষ খুলতে চাইলেই শামুক হয়ে যাও।… ওই আঙ্গুলের ডগা ভেদ করে চলে গেছে আমার সুঁচের মত চোখ তন্ন তন্ন করে ঘুরে এসেছে তোমার শরীরের তীর্থে। এখন সে আঙ্গুলে ঠুলি পরালেও আমার ভ্রমণ চিহ্ন ঢাকা যাবে না। নীনা আমরা বিয়ে করবো। আকাশ নক্ষত্রের মহা ঘরে সামান্য স্তবক হবে সে বিয়ের মন্ত্র। একদিন আমরা আমাদের চিনতে পারবো। সব ছদ্মবেশ তখন খুলে যাবে। জ্বলতে জ্বলতে বাঁচো নীনা, আর ছড়িয়ে দাও তোমার তেজস্ক্রিয় আভা।’ মহিম এইভাবে প্রতি মুহূর্তে তার জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় নীনাকে প্রতারিত করতে থাকে। মহিমের এই স্বীকারোক্তি মহিমের কণ্ঠে ফুটে ওঠে এভাবে, ‘বাসায় ফেরার পর একদিন একজনকে তীব্রভাবে শরীরে চাইলাম। তাকে উল্টেপাল্টে যখন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলাম তার ভেতরে প্রবেশ করার জন্য সেই মেয়ে ম্লান চোখ মেলে ধরেছিল তুমি আমায় বিয়ে করবে মহিম ? আমি জানতাম স্পষ্ট আমি তা করবো না। কিন্তু সেই আবেগ থেকে আমি তাকে না করিনি।’ মূলত মহিম ছিল প্রতারকদের শিল্পীত সংস্করণ। সেই বৈশিষ্ট্যের ঊর্ধ্বে ওঠে নীনাকে গ্রহণ করতে ব্যর্ধ হয়। বিপন্ন হয় নীনার জীবন-স্বপ্ন। এমনভাবে তরুণী নীনার জীবনে হাজার বৈপরীত্য এসে বাসা বাঁধে।
নীনাদের সংসারের প্রতি বড় চাচার মারাত্মক রকম নিঃস্পৃহতা, ছোট চাচার পলায়নপর মানসিকতা, টেকো মজুমদারের সুদের ব্যবসা, তার এবং ছোট বোন রানুর উপর মজুমদারের শ্যেন দৃষ্টি ইত্যাদি বিরূপ পরিস্থিতিতে সামান্য খড়কুটো হলেও নীনাকে আশ্রয়ের জন্য প্রলুব্ধ করে। সেই ধারাবাহিকতায় আবির্ভাব ঘটে সামান্য চাকুরে রেজাউলের। শুরু হয় জীবনের বৃহৎ আঙ্গিনায় প্রবেশ। সংসারের তীব্র অভাব, পাওয়া না পাওয়ার এক ধরনের টানাপোড়নের ভেতর পারিবারিক মতামতের তোয়াক্কা না করে রেজাউলের সঙ্গে সংসার পাতে। এখানেও আর্থিক দৈন্যদশা তাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করে। নুন আনতে পান্তা ফুড়োয়, ঘিঞ্জি এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, উন্নত জীবনের প্রতি স্বামীর অনাগ্রহ নীনার জীবনকে বিষময় করে তুলতে থাকে। উপরোক্ত পরিস্থিতি বর্ণনায় লেখকের একটি বাক্য যথেষ্ট―‘হলুদ কমোডের মাঝখানে এমন একটি গর্ত ছিল মনে হয় কেউ খাবলা দিয়ে মাংস তুলে নিয়েছে।’ এত কিছুর পরেও জীবনের প্রয়োজনে সংসারকে মানিয়ে নিতে চেয়েছিল নীনা। কিন্তু পরিবেশকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলল রেজাউলের মানসিক বিকারগ্রস্ত অবস্থা। সমকামিতা, বহুগামিতা কীভাবে তার মন ও মানসকে দখল করে রেখেছিল তা নিচের বাক্যে ফুটে ওঠে প্রকটভাবে। নীনার ভাষায়―‘সত্যজিৎ রঁদ্যার জীবনী সম্বলিত একটি বই দিয়েছিল আমাকে যার মধ্যে কিছু ন্যুড স্কাল্পচারের ছবি আছে। বইটি উল্টেপাল্টে আমাকে কন্ঠে রেজাউল বলেছিল, দেখেছো, পুরুষদের ন্যুডগুলো, কি অদ্ভুত এদের কাঠামো না।’ এরকম একের পর এক মানসিক যন্ত্রণাদায়ক ঘটনা প্রতি মুহূর্তে তাকে জর্জরিত করে তুলতে থাকে। কখনও রেজাউলের বন্ধু সত্যজিৎ যদি নীনাকে কোথাও বেরিয়ে আসার প্রস্তাব দেয়, এক ধরনের নির্লিপ্ততার ঘেরাটোপে রেজাউল নিজেকে গুটিয়ে নেয়। মান সন্মান বোধ একেবারে ভোঁতা হয়ে যায়। সংসারের যাবতীয় ছোট-বড় কষ্টের পর তাদের বেঁচে থাকা ছিল রুটিন জীবনযাপন। রেজাউল কখনও স্বামীত্বের সংকীর্তন পেরিয়ে বিশাল হৃদয়ের প্রেমিক হয়ে ধরা দেয়নি। বর্ষার একপশলা বৃষ্টি জীবনের যাবতীয় ক্লেদ মুছে দিয়ে নতুন সূর্যের আলো দিতে পারে এই ক্ষুদ্র অথচ অতুলনীয় অনুুভূতি রেজাউলের মনোজগতে সৃষ্টি হয়নি। নীনা ছিল তার শারীরিক প্রয়োজন পূরণের সস্তা অবলম্বন। কখনও বন্ধু বলে মনে হয়নি। নীনা বারবার রেজাউলের অনুুভূতিতে টোকা দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে। নীনার ভাষায়―‘পুনরায় শুরু হতো জৈবিকতার সাথে প্রতিদিনের যুদ্ধ। প্রতিদিনই মনে হতো এই ঘরটি থেকে বেরিয়ে পড়ি, পালিয়ে যাই কোথাও। সেই মানুষের নাকের সামনে মেলে ধরতাম খোলা চুল… বলতো চুলে কিসের গন্ধ ? সাবান। আর আমার গায়ে ?… বলে ঝুঁকে পড়তাম ওর দিকে বলো তো-ঘাম এবং পাউডারের।’ ঠিক এই ভাষ্যটির মতোই সামগ্রিক জীবনবোধের প্রতি রেজাউলের অনুুভূতি ছিল একেবারে সাধারণ, ভোঁতা, একপাক্ষিক, ভাসা ও ভোগসর্বস্ব। তার বিপরীতে আমরা কী দেখতে পাই ? নীনা একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও জীবন সম্পর্কে তার ধারণা স্বতঃস্ফূর্ত মৌলিক, প্রতিবাদী এককথায় ইতিবাচক। কারণ সে ছিল চিত্রশিল্পী। তার ইজেলের আচড়ে মূর্ত-বিমূর্ত প্রভৃতি ভাষায় কথা বলে উঠত। যেখান থেকে নিষ্কৃতি পায়নি টেকো মজুমদারের কুৎসিত চেহারা।
দীনতা সে মুছে দিতে চাইত তার শৈল্পিক ভাবনা দিয়ে। এভাবে নীনার ইতিবাচক ভাবনা, চাওয়া, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা একজন সমকামী ব্যক্তির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এক একটি স্তর ভাঙতে ভাঙতে চূড়ামণি পরিবর্তনের পথে এগোয়। যার চূড়ান্ত মেরুকরণ দৃষ্ট হয় সন্তানকে বাঁচাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এক ব্যক্তি যখন নিজের চাওয়াটাকে বড় করে দেখে। তখন আর কোনও সংস্করণই ভঙ্গুর কাঠামোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।
উপন্যাসকে সার্থক করতে যতগুলো অনুষঙ্গ প্রয়োজন ঔপন্যাসিক সেই অনুষঙ্গগুলো ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে। ফলে পূর্নাঙ্গ কাঠামোর প্রয়োজনে লঘু, গুরু বিভিন্ন চরিত্র তিনি উপস্থাপন করেছেন। তেমনি একটি শক্তিশালী প্রতিকধর্মী, প্রেরণাদায়ক ও দৃঢ় চরিত্র ইরফান চাচা। নীনা যখন ক্রমাগতভাবে নিজের ভাবনা, প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়ে পরাজয়ের পথে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিল সেই মুহূর্তে ইরফান চাচা অমীমাংসিত ভাবনায় সৃজনশীল গতি সৃষ্টি করেছেন। নীনার জীবনের সকল ভাবনায় একমাত্র ইরফান চাচাই ইতিবাচক সমর্থন যুগিয়ে আসে। নীনা ঠিক নিজেকে ইরফান চাচার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে সমর্থ হয় না।
ফলে নীনা চেতনে হোক বা অবচেতনে হোক নিজের প্রতিচ্ছায়াকে উপস্থাপিত করেছে বহুমাত্রিক ফটোফ্রেমে। কিন্তু ইরফান চাচা তার স্বভাবসুলভ দৃঢ়তা নিয়ে বারবার নীনাকে সাহস যুগিয়েছেন। আমরা দেখতে পাই যখন স্বামীর অনুপস্থিতিতে নীনা কামালের মতো আত্মকেন্দ্রিক চরিত্রহীন ও শানুর মত সহজ সরল বোকা নারীর পাশাপাশি বসবাস করে দিনরাত্রি প্রতি মুহূর্তে অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। বাড়িওয়ালা তার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। সেই মুহূর্তে প্রগতিশীল মুক্তবুদ্ধির অধিকারী ইরফান চাচা তার জীবনে প্রখর রৌদ্রের পর একপশলা বৃষ্টির মতোই কাক্সিক্ষত। তাই সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এ কথা নিদ্বিধায় বলতে পারি নীনার সমান্তরালে একমাত্র ইতিবাচক চরিত্র হলো ইরফান চাচা।
উপন্যাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হলো ওমর। আপাতদৃষ্টিতে তাকে শিকলবিহীন, বিদঘুটে, জঙ্গুলে ছেলে বলে মনে হলেও তার চরিত্রের একটি মারাত্মক ইতিবাচক বিষয় রয়েছে। তা হলো শত প্রতিকূলতার মাঝেও বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা। স্বাভাবিক লোকলজ্জা, আত্মসন্মান বোধ সবকিছুই ভোঁতা। কিন্তু এ কথা সত্যি মানুষের বেঁচে থাকাটাই যখন মুখ্য হয়ে ওঠে তখন পৃথিবীর সকল সৌজন্যবোধ এড়িয়ে সে কেবল টিকে থাকতে চায়। ওমরের এই নিজের মতো করে বেঁচে থাকতে চাওয়া আত্মকেন্দ্রিকতা নয়। নীনা অসতর্ক মুহূর্তের ফসল, স্বামী রেজাউলের অস্তিত্ব নিজের গর্ভে অনুভব করে। যা নীনাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। পরিচয় সংকট নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে। ঠিক সেই মুহূর্তে একমাত্র ওমর নিঃস্বার্থভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে। আমাদের সমাজে যারা সব জেনে বুঝে বোকা হয়, সানন্দে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারে ওমর তাদের যোগ্যতম প্রতিনিধি। ওমর চরিত্রটি উপন্যাসে আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। নিজস্ব সংকীর্ণতা, ক্ষুদ্রতা অতিক্রম করে যাওয়া এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।
নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু উপন্যাসটি সমাজবাস্তবতার নিরিখে এক কালোত্তীর্ণ উপন্যাস। লেখক উপন্যাসটি রচনা করতে গিয়ে সচেতনভাবে স্থান কাল ভেদে পাত্র-পাত্রীদের মহান করতে গিয়ে অতিকথন ও বর্ণনার আশ্রয় নেননি। যৌক্তিক ভাবে উপন্যাসটি পরিপূর্ণ কাঠামো নিয়ে ওঠে দাঁড়াতে সমর্থ হয়। এ কথা সত্য, লেখক নাসরীন জাহান তাঁর উড়ুক্কু উপন্যাসের মাধ্যমে আত্মদ্বন্ধে জর্জরিত ব্যতিক্রমী এক প্রতিবাদী নারী চরিত্রের ভাষাচিত্র অঙ্কন করেছেন। উপন্যাসে সাসপেন্স ও বহুমাত্রিক টার্ন নেওয়ার জন্য মূল কাহিনির ভিতর উপকাহিনি ও অনুষঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। লেখক নিজের সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক মূল্যবোধ, ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব, নিম্নমধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, মধ্যবিত্তসুলভ দ্বিধা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ-কুসংস্কার বাস্তবানুগ ভাবে অঙ্কন করেছেন। সবগুলো ভাবনা-অনুষঙ্গ সমান্তরাল রেল সড়কের মতো তুলে এনে এক নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছেন। সমকালীন উপন্যাসে সচরাচর এমনটি দেখা যায় না। এদিক থেকে নাসরীন জাহান নিঃসন্দেহে সার্থক ও সফল ঔপন্যাসিক।
উড়ুক্কু উপন্যাসের অপূর্ব রচনাশৈলী, বাক্যসুষমা, ভাষার চমৎকারিত্ব, শব্দের নতুনত্ব-ব্যঞ্জনা ও বাক্যের কাব্যময় উপমা পাঠকের মনোজগতে ঘোরলাগা আবহ সৃষ্টি করে। ইচ্ছা করলেও পাঠক এই ঘোর থেকে সহজে মুক্তি পায় না। পাঠক ধরে রাখা নাসরীন জাহানের এই এক নিজস্ব ক্ষমতা। উপন্যাসটি শৈল্পিক বিচারে উত্তীর্ণ হলেও পাঠকপ্রিয়তা বিষয়টি ভিন্ন। কারণ পাঠকদের রুচির ভ্যারিয়েশন আছে। কাজেই সব শ্রেণির পাঠকদের কাছে উপন্যাসটি প্রিয় হয়ে উঠবে এই রকম আশা করাই ভুল।
উপন্যাসের এতগুলো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কিছু নেতিবাচক বিষয়ও রয়ে গেছে। সমগ্র কাহিনি ও উপকাহিনির মধ্যে ধারাবাহিকতার অভাব, অশ্লীলতার ছড়াছড়ি, বিদ্যমান মূল্যবোধের প্রতি আঘাত ইত্যাদি। এসব উপাদানের যে কোনওটি উপন্যাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বস্তুত শিল্প একটি উত্তোলিত বোধ, যা মানুষকে অতিক্রম করতে হয়, আপন বিচারক্ষমতা, রুচি, সৌন্দর্য বোধ, মানবিক অনুুভূতি, সহমর্মিতা, পারিপার্শ্বিক সমাজবাস্তবতা ও জীবনবোধের গভীরতা থেকে। নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু উপন্যাসটি তার সফল বাস্তবায়ন।
লেখক : কবি ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক



