আর্কাইভক্রোড়পত্রপ্রচ্ছদ রচনা

প্রবন্ধ-গদ্য-সাক্ষাৎকারের অপূর্ব সহযোগ : সৈকত হাবিব

ক্রোড়পত্র : শব্দঘর ঈদুল ফিতর ২০২৬ পর্যালোচনা

বাংলাদেশে ঈদসংখ্যা প্রকাশের সংস্কৃতি অর্ধশতাব্দী ছাড়িয়েছে। বিষয়ে বৈচিত্র্যে বিন্যাসে অর্জন করেছে বহুমাত্রিকতা। এমনকি আজ যখন পৃথিবী কাগজবিরোধী হয়ে উঠেছে, চালু হয়েছে ‘পেপারলেস কালচার’, সেখানে কেবল দৈনিক-সাপ্তাহিক-মাসিক নয়, এমনকি অনলাইন পত্রিকাও মুদ্রিত ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে সাড়া ফেলছে। প্রতি বছর ছোট-বড় মিলিয়ে সারা দেশ থেকে অন্তত শখানেক ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে। সেগুলোর পাঠকও সুপ্রচুর।

বাংলাদেশে যেখানে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ের পত্রিকার রীতিমতো ‘দুর্ভিক্ষ’ চলছে, সেখানে শব্দঘর পত্রিকা এক যুগ পেরিয়ে এসেছে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে। কেবল তাই নয়, গত এক দশকজুড়ে সবচে আগে ঈদসংখ্যা প্রকাশের পাশাপাশি সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান ঈদসংখ্যা প্রকাশের কৃতিত্বেরও দাবিদার। বিষয়বৈচিত্র্য ও মুদ্রণসৌকর্যেও এই পত্রিকাটি বিপুল প্রশংসা পাচ্ছে।

২০২৬ সালের ঈদসংখ্যা প্রকাশেও এই গৌরব ধরে রেখেছে শব্দঘর। ৫৬০ পৃষ্ঠায় বৃহদায়তনিক ও সুমুদ্রিত এ সংখ্যাটি নানা কারণেই উল্লেখযোগ্য। এ কেবল গল্প-উপন্যাস-কবিতা- প্রবন্ধ-সাক্ষাৎকারের প্রাবল্যেই নয়, এর মানের দিকটিও আমাদের দৃষ্টি কাড়ে।

বর্তমান রচনার লক্ষ্য এবারের শব্দঘর ঈদসংখ্যার প্রবন্ধ-গদ্য-সাক্ষাৎকারের মূল্যায়ন।

‘দুর্লভ-১’ চিহ্নিত একটি বিশেষ রচনা “মাদারীপুরে নজরুল ইসলাম : প্রসঙ্গ বিপ্লবী ‘শান্তিসেনা’ এবং ‘মৎস্যজীবী সম্মেলন’।” এই লেখাটির গুরুত্ব কী তা টের পাওয়া যায় লেখক প্রথমা রায়মণ্ডলের রচনাংশ থেকে। ‘মাদারীপুরের সঙ্গে নজরুলের হৃদয়ের বন্ধন’ উপশিরোনামে তিনি জানাচ্ছেন :

নজরুল ইসলামের সঙ্গে মাদারীপুরের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তিনটি উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে। বহরমপুর জেলে থাকাকালীন সময়ে, কবি তাঁর সেল-এ মাদারীপুরের বিপ্লবীগোষ্ঠীর বেশ কয়েকজনকে তাঁর জেল-মেট হিসেবে পান। সেই অর্থে ওই পর্যায়ে মাদারীপুরের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ না হলেও মাদারীপুরের বিপ্লবী জেলবন্দিরা তাঁকে মাদারীপুরের সঙ্গে অন্তর আদান-প্রদানের একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল। ১৯২৩ সালে বহরমপুর জেল-এর সেলে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় মাদারীপুরের বিপ্লবী-কৃতীসন্তান―‘শান্তিসেনা’ বাহিনীর অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাসসহ কালীপদ রায়চৌধুরী, অমলেন্দু দাশগুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে। ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীও। ভালোবাসার গভীরতায়, জেলে বসে গোপনে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্ণচন্দ্র দাস হয়ে উঠেছিলেন তাঁর সহযোগী-অগ্রগামী-যোদ্ধা। মাদারীপুরের বিপ্লবী, এই ডাকসাইটে নেতার জনগণের মধ্যে ছিল ব্যাপক প্রভাব। তাঁর জেলমুক্তি উপলক্ষে, কবি নজরুল এই নেতাকে নিয়ে লিখলেন দীর্ঘ ৫৪ পঙ্ক্তির কবিতা বা গান : ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’। গভীর শ্রদ্ধায়, ১৯২৯ সালে কবি এই সেনানায়ককে তথা মাদারীপুরের  ‘মর্দবীর’কে এবং তাঁর গড়ে তোলা বিপ্লবী ‘শান্তিসেনা’-বাহিনীকে উৎসর্গ করলেন তাঁর সন্ধ্যা নামের কাব্যগ্রন্থটি। ১৯২৫ সালে নজরুল ইসলাম প্রথম বারের জন্য ফরিদপুরে আসেন এক রাজনৈতিক সম্মেলনে। সেই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। উপস্থিত ছিলেন গান্ধিজিও। সেই উপলক্ষেত, পূর্ণচন্দ্র দাস নিজে নেতৃত্ব দিয়ে, তাঁর  ‘শান্তিসেনা’ বাহিনীকে মিছিল করে ফরিদপুরে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময় দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে দেখা হয় কবির। এই সম্মেলন-পর্বেই কবির সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে মাদারীপুরের দুই পড়ুয়া বিপ্লব-মনস্ক তরুণের সঙ্গে। ফরিদপুরে নজরুল ইসলাম, নানা উপলক্ষে, এসেছেন মোট ৭ বার। কিন্তু ঐ সময়ের মধ্যে কখনও তিনি একবারও মাদারীপুরে আসেননি। তিনি মাত্র একবারই মাদারীপুরে এসেছেন, ১৯২৬ সালে  ‘নিখিল বঙ্গীয় ও প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলন’-এ যোগ দিতে। এই সম্মেলনে তিনি নিজের লেখা ‘জেলেদের গান’ বা ‘ধীবরদের গান’ গেয়েছিলেন। লিখেছিলেন কুমিল্লার জননেত্রী এবং বিপ্লবী হেমপ্রভা মজুমদারকে নিয়েও গান বা কবিতা : ‘হেমপ্রভা’ নামে। কোনও কোনও সমালোচক প্রামাণ্য তথ্য-প্রমাণ সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত না হয়েই, হয়তো মনগড়া ভাবনা থেকে লিখে দিয়েছেন যে, নজরুল ইসলাম মাদারীপুরে এসেছিলেন দুই বার। কিন্তু এই সব কিংবদন্তিমূলক জনশ্রুতি জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। নজরুল ইসলাম নিজের নির্বাচনী-প্রচারে কিংবা অন্য রাজনৈতিক প্রার্থীদের হয়েও  মাদারীপুরে কোনও জনসভা করতে আসেননি।

পুরো রচনাটি তথ্য ও বিশ্লেষণে ভরপুর। নজরুলচর্চার ক্ষেত্রে এ রচনাটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ২০২৫ সালে নোবেল সাহিত্যজয়ীকে নিয়ে। শিরোনাম ‘লাজলো ক্রাজনাহোরকাই : সৃষ্টিশীল গদ্যের আধুনিক জনক’। লিখেছেন মোহীত উল আলম। তাঁর সম্পর্কে গদ্যকার যথার্থই মূল্যায়ন করেন :

তাঁর গল্প বলার কৌশল এতটাই মৌলিক এবং নতুন যে পাঠক বিস্ময়াভিভূত হয়ে যান। তিনি সহজ আবেদন তুলে পাঠকের দরবারে হাজির হতে চান না, বরঞ্চ জটিলতার দ্বারগুলো একে একে উন্মোচিত করেন পাঠকের কাছে, আর যদি পাঠক ধৈর্যশীল হন তা হলে তিনি তাঁর গদ্যরীতির প্রতি আকৃষ্ট হবেনই। তাই তাঁর নিজস্বতার শক্তির কাছে সংলগ্ন থেকে পাঠক বিভোর হয়ে যান। পাঠক উপলব্ধি করেন যে তিনি হালকা বিষয়ে আমোদিত না হয়ে মনস্তত্ত্বের গভীর কন্দরে সহজে সাঁতার কেটেছেন।

তাঁর শক্তি হলো একটি জটিল কিন্তু ছন্দোময় বর্ণনার সাহায্যে তিনি যে কিছুটা তমসাবৃত কিন্তু কৌতুকজনক পরিস্থিতির মধ্যে পাঠককে নিয়ে আসেন, আর তখন পাঠক বুঝতে পারেন যে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো জটিল থেকে জটিলতর হলেও উপেভোগ্য। এটিই তাঁর লেখার বিশেষ প্রণোদনা। বলা বাহুল্য, ক্রাজনাহোরকাই এটা প্রমাণ করলেন যে একজন লেখক নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যয়ের প্রতি নিবিষ্ট থেকেও আর্ন্তজাতিক খ্যাতি অর্জন করতে পারেন। তাঁর লেখা তাঁদেরকেই আকর্ষণ করে যাঁরা একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে চান। তিনি একটি সম্পূর্ণ জগৎ নির্মাণ করে তাতে পাঠকের আবাসস্থল গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাই তিনি বিশ্বসাহিত্যের দরবারে একজন আদৃত লেখক। তিনি আরও উৎকর্ষ কাজের আভাস রেখে যাচ্ছেন। অনেকের ধারণা এই যে তিনি ভবিষ্যতে আরও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রাখবেন।

রচনাটি সুগভীর ও বিশ্লেষণী, একজন লেখকের সামগ্রিকতা অনুধাবনে ঋদ্ধ।

কবি জসীমউদ্দীনের  সুবিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে। আর কবি মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৬ সালে। সে হিসেবে ২০২৫ সাল ছিল ‘কবর’ কবিতার শতবর্ষ এবং ২০২৬ সাল কবিপ্রয়াণের অর্ধশতাব্দী। এ দুটো উপলক্ষ্যকে একত্র করে মফিজ ইমাম মিলন লিখেছেন ‘কবর কবিতার শতবর্ষ, জসীমউদ্দীনের মৃত্যুর পঞ্চাশ’ রচনাটি। এটি একটি তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণঋদ্ধ সুখপাঠ্য রচনা। সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ যোগ হওয়ায় লেখাটি অন্য মাত্রা পেয়েছে।

বাংলাদেশের সাহিত্যে তুলনামূলকভাবে নতুন বিষয় নিয়ে লিখেছেন মোহিত কামাল। শিরোনাম ‘ফ্ল্যাশফিশন ও মাইক্রোফিকশন : পশ্চিমা বিশ্বের সাহিতচর্চা এবং বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’। এ জাতীয় রচনাকে আমাদের ভাষায় ‘অণুগল্প’ নামে ট্যাগ দেওয়া হলেও বিষয়ের বিস্তার ও বৈচিত্র্যে খুবই আলাদা। এ নিয়ে বিস্তৃত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন লেখক। পাশাপাশি নিজের গল্পের ভিতর দিয়ে উদাহরণও দিয়েছেন। এ রচনার মধ্য দিয়ে একজন কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য বিশ্লেষক মোহিত কামালের চমৎকার  যুগলবন্দি ঘটেছে। কথাসাহিত্যের ফর্ম নিয়ে আগ্রহীদের জন্য এ রচনা অবশ্যপাঠ্য।

‘বাংলাদেশের উপন্যাস: একটি রেখাচিত্র’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছেন স্বপন নাথ। বাংলাদেশের উপন্যাসের সাধারণ প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্যগুলো এ রচনায় গুরুত্বের সঙ্গে অথচ সংক্ষেপে আলোচিত হয়েছে। এটি বিস্তৃত করা হলে একটি ভালো গবেষণা হিসেবে তৈরি হতে পারে।

এ সংখ্যার একটি ছোট  কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রচনা আনজীর লিটনের মুক্তগদ্য ‘ট্রাঙ্কের ভেতর জমে থাকা দিনগুলো’। একটি যুগের আখ্যান ধরা পড়েছে এ রচনায়। লেখক যথার্থই লিখেছেন :

ট্রাঙ্কের ভেতর জমে থাকা দিনগুলো কোনও ক্যালেন্ডারের পাতায় ধরা পড়ে না। দুপুরের নিস্তব্ধতা, সন্ধ্যার আলো কিংবা রাতের গভীরতায় জেগে ওঠা কিছু কিছু মুুহূর্ত রাঙিয়ে দেয় ট্রাঙ্ক। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর স্থির হয়ে বসে থাকা ট্রাঙ্ক আমাদের স্মৃতিতে এমনভাবে মিশে থাকে―ভোলা যায় না। স্পর্শ করলেই বোঝা যায় ট্রাঙ্ক শুধু ঘরের অন্যসব আসবাবের মতো নয়―এটা সময়ের চিহ্ন রেখে দেওয়া টিনের একটা বাক্স।

এ সংখ্যার অন্যতম উজ্জ্বল দিক তিনটি বিস্তৃত সাক্ষৎকার : যথাক্রমে লেখক-অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং নোবেলজয়ী ওলগা তোগারজুক।

বিশাল পরিসরের এ সাক্ষাৎকারত্রয়ী তাঁদের জগৎ-জীবন- দর্শন সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা দেয়।

 সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ওবায়েদ আকাশ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের নিয়েছেন দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং ওলগা তোকারজুকেরটি নিয়েছেন মার্তা ফিগলেরোভিচ (বাংলা অনুবাদ করেছেন এলহাম হোসেন)।

মানসম্পন্ন বিপুল দেশি-বিদেশি রচনার এক বিশেষ ভান্ডার হিসেবে এবারের শব্দঘর-এর ঈদসংখ্যাটি নিশ্চয়ই আমাদের সৃজন-মননের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

 লেখক : কবি প্রাবন্ধিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button