শব্দঘর ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা ও আলোচনা : আমিনুল ইসলাম

ক্রোড়পত্র : শব্দঘর ঈদুল ফিতর ২০২৬ পর্যালোচনা

বিগত বিশ শতকের সত্তর-আশির দশক পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশি লেখক-পাঠকরা পশ্চিমবঙ্গের পূজা সংখ্যাগুলো কিনে পড়তাম। এক সময় বাংলাদেশে দৈনিক সংবাদপত্রের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং সংবাদপত্রগুলো ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঈদসংখ্যা প্রকাশ শুরু করে। এটা ছিল বহুল প্রত্যাশিত ও প্রতীক্ষিত। শব্দঘর আরও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। কিন্তু ঈদ সংখ্যা প্রকাশে আগ্রহী, আন্তরিক ও সফলভাবে সক্রিয়। চলমান ২০২৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে বিশাল আকৃতির শব্দঘর ঈদসংখ্যা। বক্ষ্যমাণ সংখ্যাটি সাহিত্যের একটা ছোটখাটো পৃথিবী হয়ে উঠতে চেয়েছে। কী নেই এখানে ? উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, বড়গল্প, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, সাক্ষাৎকার, বিশ্বসাহিত্য থেকে অনূদিত কবিতা, অনূদিত ছোটগল্প এবং আরও কত কি! ম্যাগাজিন সাইজ ৫৬০ পৃষ্ঠা। এর বিস্তৃত জমিনে আছে ৫টি উপন্যাস, ১টি অনূদিত নভেলা, ১টি সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস, ১৮টি ছোটগল্প, ২টি বড় গল্প, ৫টি প্রবন্ধ, ২টি সাক্ষাৎকার, ২টি দুর্লভ রচনা, ২টি মুক্তগদ্য, ৩টি ভ্রমণ, বিশ্বসাহিত্যের ৯টি ছোটগল্পের অনুবাদ, ৩৮জন কবির কবিতা এবং একগুচ্ছ বিদেশি কবিতা অনুবাদ।
সূচিভুক্ত বাংলাভাষী কবি হচ্ছেন মতিন বৈরাগী, আবিদ আনোয়ার, মাহবুব বারী, শিহাব সরকার, নাসির আহমেদ, মঈনউদ্দিন মুনশী, আবদুর রাজ্জাক, হাসান হাফিজ, জাহিদ হায়দার, মাহমুদ কামাল, দুখু বাঙাল, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, রোকেয়া ইসলাম, কামরুল হাসান, রেজাউদ্দিন স্টালিন, জুয়েল মাজহার, শাহীন রেজা, মারুফ রায়হান, শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক, রওনক আফরোজ, খালেদ হামিদী, বদরুল হায়দার, শিহাব শাহরিয়ার, মুস্তফা হাবীব, সালিম সাবরিন, মতিন রায়হান, শামসুল বারী উৎপল, মাহফুজ আল-হোসেন, ভাগ্যধন বড়ুয়া, শাহেদ কায়েস, টোকন ঠাকুর, সৈকত হাবিব, ওবায়েদ আকাশ, বিনয় কর্মকার, রেবা হাবীব, সাকিরা পারভীন, মুশাররাত, আহমেদ শিপলু, রকিবুল হাসান, সেঁজুতি বড়ুয়া, মুক্তিপিয়াসী, স্নিগ্ধা বাউল, নিলয় রফিক, পিয়াস মজিদ, অলভী সরকার, সনেট মাহমুদ, সৌম্য সালক ও নাদিম মাহমুদ। শশিভূষণ করেছেন বিদেশি কবিতার অনুবাদ।
এটা পুরোনো কথা যে, কবিতা নানা রকমের হয়। পাঠকভেদে রুচি ও পাঠপ্রতিক্রিয়াও নানা রকম হয়। কোনও একজন পাঠকের মূল্যায়ন বা পাঠানুভব অন্য পাঠকের মূল্যায়ন বা পাঠানুভূতির সঙ্গে মিলে যাওয়ার উপায় নেই। তো আমার পাঠোত্তর অভিমতও আপেক্ষিকতায় গ্রহণীয়। আসলে কবিতা হচ্ছে অন্তরঙ্গ অনুভব, নিবিড় কথাকে সুন্দর করে বলা। কী বলা হলো সেটা দ্বিতীয় বিবেচনা হতে পারে, প্রথম ও প্রধান বিবেচনা হচ্ছে কেমন করে বলা হয়েছে সেটা। একই কথা বা অনুভূতির প্রকাশ একজনের হাতে সমৃদ্ধ কবিতা হয়ে ওঠে, অন্যদের হাতে তা সাদামাটা সাধারণ উচ্চারণে সীমায়িত থেকে যায়। বিষয়টি অনেকটা গায়কীর মতো। একই রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে একজন- দুজন দেবব্রত বিশ্বাস-সুচিত্রা মিত্র হন, আর শত শত জন রয়ে যায় যান গড়পড়তা গায়কের অনালোচিত-অনালোকিত তালিকায়। কতজনই তো মীর তকী মীর-মীর্জা গালিব-আহমাদ ফারাজদের লেখা গজল কণ্ঠে ধারণ করেন কিন্তু বেগম আখতার-মেহেদী হাসান হতে পারেন শুধু হাতে গোনা দুয়েকজন। কবিতার ক্ষেত্রে সেই ‘কীভাবে’ নির্ধারিত হয় শব্দ চয়ন, উপমা-চিত্রকল্প-উৎপ্রেক্ষা আর উপস্থাপনার সম্মোহনী জাদুতে। সেখানে যেমন থাকে প্রকাশ তেমনি থাকে উন্মোচনযোগ্য আড়াল বা অপ্রকাশিত দিগন্ত। সম্মোহন সৃষ্টির মধ্যে কবিতার জনপ্রিয়তা নির্ভর করে সবচেয়ে বেশি। মীর্জা গালিব যখন বলেন :
‘বিনি পয়সার কাজল আমি মূল্য এতটুকু
খরিদ্দারের চোখে যেন কৃতজ্ঞতা থাকে।’
[বাঙলায়নে জাভেদ হুসেন]
তখন সেখানে প্রকাশ ও আড়াল, পরিহাস ও রস, উপমা ও চিত্রকল্প এবং সর্বোপরি কথার জাদুতে সৃষ্ট সম্মোহন পাঠককে অনিঃশেষ মুগ্ধতায় আকুল করে দেয়। কবিতায় সামাজিক সত্য কিংবা বিজ্ঞানের সত্য থাকতেই পারে কিন্তু সেটাই ভাবনার কেন্দ্র হলে কবিতা সেভাবে জমে ওঠে না। কারণ কবিতার নিজস্ব সত্য আছে। আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কবিতায় প্রাণ থাকতে হয় যা সৃষ্ট হয় কবির হৃদয়ের দানে। কবিতায় মেধা বা বুদ্ধির প্রয়োগ হবেই কিন্তু তা হৃদয়ের বিনিয়োগকে অধিকতর সাফল্যমণ্ডিত করার জন্যই। প্রখ্যাত গীতিকার সুরকার সিনেমা পরিচালক খান আতাউর রহমান রচিত একটি গানের কথা প্রাসঙ্গিকভাবে এসে যায়।
‘সুরের বাঁধনে তুমি যতই কণ্ঠ সাধ
তাকে আমি বলব না গান
সে তো শুধু নিষ্প্রাণ সানিধাপামাগারেসা
নেই তাতে হৃদয়ের দান॥
মরমের ছোঁয়া যদি শিল্পীর কণ্ঠে না থাকে
গানের কবিতা যদি জীবনের ছবিটি না আঁকে
তাকে আমি বলব না গান
সে তো শুধু নিষ্প্রাণ সানিধাপামাগারেসা
নেই তাতে হৃদয়ের দান॥
গান আহা গান যাকে বলে
লক্ষ মনের মধু স্বপ্ন
লক্ষ হারিয়ে যাওয়া লগ্ন
তার বুকে ধিকিধিকি জ্বলে।
সে জ্বালার অনুভূতি যদি ওই অন্তরে থাকে
হৃদয় উজাড় করে সুরে সুরে ঢেলে দিও তাকে
তাহলেই গান হবে গান
না হলে তা নিষ্প্রাণ সানিধাপামাগারেসা
নেই তাতে হৃদয়ের দান ॥’
আধুনিক বাংলা পঞ্চপাণ্ডব খ্যাত কবিদের মধ্যে সকলেই খ্যাতিমান, সকলেই মেধাবী, সকলেই ইউরোপীয় আধুনিক কবিতার অভিজ্ঞ পাঠক ও অনুসারী কিন্তু পাঠকের হৃদয়ের ভালোবাসায় রাজত্ব একজন জীবনানন্দ দাশের। মূল পার্থক্য রচে দিয়েছে এবং রচে রেখেছে কবিতায় মূলত সেই ‘হৃদয়ের দান’ ফ্যাক্টরটি। কবিতার ব্যাকরণ জানলেই কবি হওয়া যায় না। ব্যাকরণের আগে প্রয়োজন জন্মগত কবিপ্রতিভা ও সংবেদনশীল কবিহৃদয়।
এবার আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করতে পারি। শুরুতেই বলে রাখা ভালো, একটি মাত্র নিবন্ধে আটত্রিশ জন কবির কবিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। তাই কয়েকটি কবিতা নিয়ে আলোচনা করব এবং কয়েকটিকে হালকাভাবে স্পর্শ করে যাব। শব্দঘর ঈদ ম্যাগাজিনের প্রথম কবিতাটি কবি মতিন বৈরাগীর। কবিতার শিরোনাম ‘বিশ্বাসের আলো’। জীবন ও চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে প্রচলিত দর্শন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিজ্ঞান এসবকে একপাত্রে ঢেলে জীবনদর্শনের কাব্যিক সংশ্লেষ সৃষ্টি করা হয়েছে। উপসংহার পরিষ্কার ‘আর কোনও অলৌকিক নেই।’
কবিতাটি শৈল্পিক ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ। জীবন চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শব্দে নৈঃশব্দ্যে, আকাশে পাতালে, উচ্চারিত শব্দে, অশ্রুত ধ্বনিতরঙ্গে, ছায়াপথের আলোকনগরে এবং বিশ্বাসের গহনতলে। জীবনসংশ্লিষ্ট বিপরীতমুখী নানা প্রপঞ্চ ভাবনার বহুমুখী ডাইমেনশন রচনা করেছে। কবিতাটির সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য হচ্ছে সৌন্দর্যমণ্ডিত রহস্যমাখা ভাষা যা বোঝা না-বোঝার মাঝামাঝি ভালো লাগার অনিঃশেষ সম্মোহন সৃষ্টি করে রেখেছে। পাঠক যদি হন পথিক তবে এই কাব্যপথ তাকে টেনে নিয়ে যাবে দূর যাত্রায় আকাশের নক্ষত্রালোকে, ভাবনার প্রত্নরাজপথে আর বিজ্ঞানের অজস্র কক্ষপথে। ধর্মবিশ্বাস ও বিজ্ঞান, জড় ও জীবন, মৃত্তিকা ও আকাশ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রভৃতি বাইনারির ব্যবহার পাঠকের নিজস্ব অভিজ্ঞানভিত্তিক কল্পনার জন্য নানাবিধ শৈল্পিক স্পেস সৃষ্টি করে রেখেছে। যারা কবিতার ভাষাকাঠামো নিয়ে আলোচনা ভালোবাসেন, তাদের জন্য রয়েছে ভাবনা ও ব্যাখ্যার অবারিত ক্ষেত্র। একটি অংশ পাঠ করা যায় :
তখন সেই চোখ থেকে হাজার হাজার কোটি সংখ্যাতীত
বিচ্ছুরিত আলোর ঝলকে
ওলটপালট হয়ে যাওয়া পাহাড়চূড়ায় প্রজাপতি ফেলে গেল
পাখার রেণু
উড়ল মহিমার দ্যুতিমালা, লাল-সবুজে লৌহ-মাহফুজে
আর মরা নদীর ভাটায় ডাকল বান ভবিষ্য-দিকের’
[‘বিশ্বাসের আলো’, মতিন বৈরাগী]
তবে কবিতাটির সমাপ্তিসূচক বাক্যটি সেই রহস্যের অবসান ঘটিয়ে দিয়েছে যা পাঠকের নিরুদ্দেশ যাত্রার অকাল ছেদ নিয়ে আসে। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় এই কবিতার একমাত্র দুর্বল দিক এটি। জীবন হচ্ছে রহস্যময় পুস্তকের উপমা যার শুরু ও শেষের পাতা কয়টি উদ্ধারহীনতায় হারানো। কবিতার চূড়ান্ত অর্থ ‘অমীমাংসিত’ থাকলে পাঠক তার বিশ্বাস, কল্পনা ও মেধার অনুকূলে ভেবে নেওয়ার অবকাশ পান। এখানে জীবন দর্শন সংশ্লিষ্ট দুটি কবিতা নিয়ে কথা বলতে চাই।
ক.
‘… … … … … …
হাজার শাস্ত্রীর কণ্ঠে এই বাণী আবার উত্তাল,
হাজার তূর্যের মুখে পুনরুক্ত এক অভিযান,
হাজার দুর্গের ’পরে প্রোজ্জ্বল মশাল,
বিরাট অরণ্যে লুপ্ত শিকারির উদাত্ত আহ্বান।
আর কী প্রমাণ আছে ? ভগবান এই তো পরম,
এই তো নির্ভুল সাক্ষ্য আমাদের দীপ্ত মহিমার,
এই যে আকুল অশ্রু যুগে যুগে করে পরিশ্রম,
অবশেষে লীন হতে অসীমের সৈকতে তোমার। ’
[‘আলোকস্তম্ভ’, বোদলেয়ার; অনুবাদ: বুদ্ধদেব বসু]
খ.
‘… … … … … …
আমাকে ফিরতে হবে। বাঁধাছাদা হলো না এখনও।
কে তুমি নৌকার মাঝি ধরে আছো মাস্তুলের দড়ি
ঢেউয়ের মাতন দেখে ভুলে গেছি কোন দিকে যাবো
কোন দিকে―কোন দিকে―কোন দিকে বিশ্বাসের চর ?
আমার ফেরার দিন, কথা ছিল বিদ্যুতের লেখা
কেবল তোমার মুখ এঁকে দেবে শূন্য নীলিমায়।
নদী এসে ডাক দেবে। আদিগন্ত বৃষ্টির ধনুক
বহুবর্ণ তীর ছুড়ে গেঁথে ফেলবে আমার নয়ন।
নেমে এসো হে অন্ধতা। ভুলে গেছি নিজের কি নাম;
কী নামে ডাকতো লোকে, কোন গ্রামে ছিলো পিতৃকুল ?
আজ শুধু হাওয়া থাক, আর কালো মেঘের গর্জনে
একটি মাস্তুল শুধু ভেসে ভেসে দূরে চলে যাক।’
[‘বিশ্বাসের চর’, আল মাহমুদ]
উপরে বর্ণিত কবিতাংশ জীবনরহস্য নিয়েই রচিত। কবিতাদুটির কোথাও মৃত্যুর পর কী হবে কি হবে না সে সংক্রান্ত মীমাংসাসূচক ছবি নেই। শুধু এক অথই পারাবার চিত্রিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ কবিতাও শেষ হয়েছে মীমাংসাহীন কৌতূহলভরা প্রশ্ন দিয়েই। পাঠক কবিতার ভুবনে জীবনরহস্যের উত্তর খোঁজে না। তারা শিহরিত হতে চায়, ―আন্দোলিত থাকতে ভালোবাসে।
কবি দুখু বাঙাল লিখেছেন ‘বিরহ আর ভালোবাসা অক্ষত থাক’ নামের একটি সুন্দর কবিতা। তিনি সহজ কথায় কঠিন কথা বলেছেন নান্দনিক সৌকর্য অক্ষুণ্ন রেখে। শব্দই ব্রহ্ম। কুন, বিগ ব্যাং, ওম শান্তি, এসবই শব্দ। কবির একমাত্র অস্ত্র শব্দ। শব্দের বাইরে কোনও অফিস আদালত চলতে অসমর্থ। সঙ্গীত মানেও শব্দ। দুখু বাঙাল এই কবিতায় মানুষের নিষ্ঠুরতা ও আবেগহীন আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রোবোটিক ক্রীতদাস হয়ে ওঠা দেখে বেদনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন : ‘দখলদার’ আর ‘বর্বর’ বলতে ইসরায়েলকে বোঝালেও/এই শব্দদুটিও বিস্তৃত হতে পারত মারণাস্ত্রের শক্তির সমান’। মানুষের এই অধঃপতন প্রচলিত শব্দ প্রকাশ করতে অক্ষম। তিনি প্রেমময় দুটি শব্দ ছাড়া বাকিশব্দগুলো বাতিল করে দিতে চেয়েছেন পরোক্ষ ভাষায়। কবিতাটি অন্যায় যুদ্ধ আগ্রাসন অপ্রেম ইত্যাদির বিপক্ষে অথবা শুধুই প্রেমের পক্ষে। কবিতাটির চারটি লাইন চমৎকার :
‘আমার জন্য তুলে আনো সেই সব শব্দ কিংবা শব্দসংকেত
যার প্রকাশে মুহূর্তেই নির্ণীত হয়ে উঠবে হিমালয়ের ভার
যার ব্যঞ্জনায় সহসাই বোঝা যাবে সমুদ্রের অতল তল
যার আর্তনাদে ধরা দেবে আকাশের হাহাকার কতটা গভীর
কেবল বিরহ আর ভালোবাসা শব্দদ্বয় পৃথিবীতে থাক।’
শব্দকে সৃজনের কেন্দ্রে রেখে রচিত একটি অনিন্দ্যসুন্দর কবিতা মাহফুজ আল-হোসেনের ‘উৎসবের শব্দগুলো’। এই কবিতায় পাঠকের জন্য রয়েছে নতুন স্বাদের সওগাত। বিষয়ভাবনা এবং সৃজনসৌকর্য উভয় ক্ষেত্রের অভিনবত্বের ছাপ দৃশ্যমান। ভাব ও সৌন্দর্য প্রকাশে শব্দের ভূমিকা বিমূর্ত থেকে মূর্ত হয়ে উঠেছে শৈল্পিকতার আঁচড় লেগে। নদী, মৌসুম, ভাষা―এসবই প্রবহমান। মাহফুজ আল-হোসেন সেই পরিবর্তনের সুর ও ছন্দকে ধরেছেন কবিতার শরীরে ও প্রাণে। প্রযুক্তিগত শব্দের নিপুণ প্রয়োগ এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে যে কবিতা কোনও সময়বদ্ধ কিংবা মতবাদের খোঁয়াড়ে আটকে থাকা শিল্প নয়। কয়েকটি পঙ্ক্তি পুনশ্চ পাঠ করা যায়―
‘ইথারে ভেসে থাকা অসবর্ণ শব্দগুলো জোড়া বাঁধলেই অশুচি হয় না
বরং শব্দের মৈথুনে উৎসবের পুনর্জন্ম জয় নতুন অভিধানে;
অপ্রস্তুত প্রকৃতি―নদী―মহাসড়ক―রেইলট্র্যাক
আর রোমিও হাওয়াই চপ্পলের আওয়াজও মিলিয়ে যায় বহুবর্ণিল বিলবোর্ড আর সাউন্ড সিস্টেমে।’
আবার খুব সাদামাটা কয়েকটি শব্দ দিয়েও একটি মনোজ্ঞ ও হৃদয়ছোয়া কবিতা লেখা সম্ভব, যদি কবির সেই সৃষ্টিশীল কারুকার্যের হাত থাকে। টোকন ঠাকুরের ‘থাকা না-থাকা’ তেমনি একটি কবিতা। আয়তনে ক্ষুদ্র। মাত্র কয়েকটি শব্দের কারুকার্য। ‘ছিল’ এবং ‘নেই’ এই দুটি শব্দের বাইনারি দিয়ে ইহলৌকিক অস্তিত্ব বা যাপিত জীবনকে একটা মায়াময় দর্শনের আয়নায় তুলে ধরেছেন। সেই দর্শন হয়ে উঠেছে কবিতার সমাপ্তিতে যুক্ত হওয়া একটি ‘অমীমাংসিত প্রশ্ন’-এর ঐশ্বর্যে। প্রশ্নটি হচ্ছে ‘কিছুই কি থাকে না ? কবিতা ?’
কবিতা যেমন সোজাসাপটা লেখা যায় তেমনি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জটিলতা গ্রন্থি যোগ করে লেখা যায়। গ্রন্থি উপহার দেয় কিংবদন্তি, রূপকথা, লোককাহিনি, অমীমাংসিত ইতিহাস ও কষ্টকল্পনা। জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘কবিতার কথা’ শিরোনামযুক্ত প্রবন্ধে বলেছেন: ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি―কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকীরণ তাদের সাহায্য করছে। সাহায্য করছে; কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।’ কিংবদন্তি ও অমীমাংসিত ইতিহাস, কল্পনা ইত্যাদি ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্ষেত্রজ্ঞান ও মাত্রাবোধ। এসবের পরিমাণমতো ও জুতসই ব্যবহার কবিতায় প্রকাশ ও আড়ালের নান্দনিক ঐশ্বর্য দান করে। তেমন ভাবনা থেকে বিনয় কর্মকার লিখেছেন ‘লিলিথ’ এবং শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক লিখেছেন ‘থিবসের পথে ওডিপাস’ শীর্ষক কবিতা। দুটি কবিতাই সুন্দর ও সমৃদ্ধ। ‘লিলিথ’ কবিতাটিতে ইহুদি ধর্মমতে সৃষ্টির প্রথম নারী তথা আদমের প্রথম জীবনসঙ্গিনী লিলিথকে নিয়ে সেমিটিক ধর্মীয় উপাখ্যান, তার অস্বীকৃত জীবন, পুরুষের বহুগামিতা, নারীর পরাধীনতা, বাইজি জীবন ইত্যাদি একাকার ব্যঞ্জনায় খুব আঁটসাঁট ফ্রেমে উপস্থাপন করা হয়েছে। কবিতাটির ‘বিকল্প দরপত্রে তৈরি হয়েছিল ইভ।’ ‘ঘুঙুরের খসে পড়া ঘণ্টি থেকে খুঁজে নিয়েছি বাইজির ইতিবৃত্ত―’ প্রভৃতি পঙ্ক্তি অনিন্দ্যসুন্দর।
‘থিবসের পথে ওডিপাস’ কবিতাটি প্রাচীন থিবস নগরীর রাজা ওডিপাস কর্তৃক তার পিতাকে হত্যা করে মাতাকে বিয়ে করা, থিবস নগরে মহামারি নেমে আসা, মহামারির সন্ধানে রাজা ওডিপাসের নগর পরিভ্রমণ ইত্যাদিকে আড়ালে রেখে রচিত। মানুষের নিয়তি ও কর্মফল ব্যঞ্জিত কবিতায়। মধ্যপ্রাচ্যের কিংবদন্তি নিয়ে রচিত আল মাহমুদের একটি কবিতায় আছে:
‘যদিও বোঝে না কবি রাজাদের স্বপ্নের কী মানে,
কিন্তু এটা তো জানে, হত্যাই হত্যা ডেকে আনে।’
[‘প্রাচীর থেকে কথা’, আল মাহমুদ]
শাহ মোহাম্মদ সানাউল হকের ‘থিবসের পথে ওডিপাস’ কবিতায় কি বিশেষত রাষ্ট্রীয় হত্যার পেছনে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড অথবা হত্যার পরিণতিতে আরও হত্যাকাণ্ড―এমনতর ভাবনাকে উপস্থাপন করেছেন ? কবিতাটি অনেকখানি দুর্বোধ্যতার পোশাকে আবৃত। ওডিপাসের কিংবদন্তি যাদের পরিষ্কারভাবে জানা শুধু তাদের পক্ষে কিছুটা অনুমান করা সম্ভব। শিহাব সরকারের ‘শ্যুটিং থেকে’, আহমেদ শিপলুর ‘নাটাই। ঘুড়ি। অদৃশ্য সুতোর ভরসা’, শাহেদ কায়েসের ‘কবিতাযুগল’, মতিন রায়হানের ‘হেমন্তের ধূপগন্ধা ভোর থেকে উত্থিত’, জুয়েল মাজহারের ‘অনলুকার’ শীর্ষক কবিতা আঁটসাঁট কাব্যভাষায় রচিত। প্রকৃতির উপকরণ সহযোগে সাম্প্রতিক কাব্যকলায় জীবন চিত্রিত হয়েছে এসব কবিতায়; কোথাও কোথাও রাজনীতির ভাবনা সাংকেতিকতায় প্রকাশ পেতে চেয়েছে। খণ্ড খণ্ড চিত্রকল্পে রচিত হয়েছে অনুভবিত জীবনের কোলাজ। জুয়েল মাজহারের ‘অনলুকার’ কিছুটা পরাবাস্তবভাষী; কবিতায় রূপক-সংকেত ও কাব্যালঙ্কার হয়েছে। এ কবিতার শব্দার্থ খুঁজতে গেলে কূল পাওয়া যায় না। ‘ঘুমের কফিন’, ‘নদীর গেলাসে খসে পড়া নক্ষত্র’, ‘আরেকটি হাটখোলা বিরাট কফিন’, ‘রৌপ্যজয়ী মোহনা বক’―এসব চিত্রকল্প জোড়া দিয়ে একেক পাঠক একেক দৃশ্যপাঠ তৈরি করে নেবেন অথবা এড়িয়ে যাবেন সেই পরিশ্রম। যারা কবিতার খুচরো দৃশ্য নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন তাদের বেশি ভালো লাগবে এই কবিতা।
এই ফাঁকে কবিতায় রহস্যময়তার গুরুত্ব বিষয়ে দু কথা বলে নেওয়া যায়। উৎকৃষ্ট মানের কবিতা জোছনারাতের মতো আলো-আঁধারিময়। দূর থেকে সবকিছু অচেনা কিন্তু যতই কাছে যাওয়া যায় ততই চেনা দৃশ্য মুখোমুখি হয়ে আসে। উৎকৃষ্ট কবিতার খরার দুপুরের মতো সবখানি অনাবৃত নয় আবার কৃষ্ণপক্ষের রাতের মতো অন্ধকারে মোড়ানো নয় শতভাগ। রহস্যময়তা বা অপ্রকাশের আড়াল রচনার সময় কবিদের মনে রাখতে হয়―কবিতায় ছলনা থাকবে কিন্তু তা যেন কবিতাকে ধাঁধায় পর্যবসিত না করে দেয়। কিংবদন্তির ব্যবহার কিংবা কিংবদন্তিকেই কবিতা করে তোলার সময় কাব্যভাষায় সাবলীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আল মাহমুদের ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ কবিতা হচ্ছে কিংবদন্তিকে কবিতা হিসেবে ব্যবহারের সফলতম উদাহরণ। একই প্রসঙ্গে শামসুর রাহমানের ‘ইলেকট্রার গান’ কিংবা ‘চাঁদ সদাগর’ কবিতার নামও উল্লেখযোগ্য। সব কবিতাতেই রহস্যময়তা থাকতে হবে এমন নয়। তবে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কবিতায় রহস্যময়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঐশ্বর্য। কবিতার রহস্যময়তা কিন্তু দুর্বোধ্যতা নয়―অবোধগম্যতা তো নয়ই। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ যথেষ্ট রহস্যময়তার আধার। কিন্তু সেটি তাঁর ‘গোধূলিসন্ধির নৃত্য’ কবিতার মতো দুর্বোধ্যতায় ঢাকা নয়। দুটি কবিতার সাফল্য বা সার্থকতায় পার্থক্য আসমান জমিন। আলোচকরা কবিতাদুটি নিয়ে প্রভূত আলোচনা করেছেন। ‘বনলতা সেন’-এর অতুলনীয় জনপ্রিয়তায় হেরফের ঘটেনি এতটুকু। আর কবিতায় সহজ ভাষাতেই আড়াল বা প্রকাশ-অপ্রকাশের রহস্যময়তা রচনা করা যায়। ‘বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল/গাঙের ঢেউয়ের মতো বল কন্যা কবুল, কবুল।’ অথবা ‘ইতিহাসের সারসংক্ষেপ কিনতে কিনে এনেছি/ গরিলার ছবি ভর্তি জানোয়ারের বিশাল এ্যালবাম।’ এসব পঙ্ক্তি সহজ সাবলীলতা ধারণ করে আছে উন্মোচনযোগ্য রহস্যময়তা―ব্যাখ্যাযোগ্য অপ্রকাশের শিল্প। অনুরূপ আরেকটি পঙ্ক্তি: ‘আকাশের আকাশ ভরা নির্লিপ্ততাকে ছাতায় আড়াল করে / মহাশূন্যের কেন্দ্রে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে আছে চুলপাকা ইতিহাস…’ আসলে প্রসঙ্গ উল্লেখপূর্বক যেটুকুর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হয়, সেটাই সে কবিতার উন্মোচনযোগ্য আড়াল, সেটাই তার আবিষ্কারযোগ্য রহস্য,―সেটাই তার নান্দনিক ঐশ্বর্য।
শব্দঘর ঈদ সংখ্যার কবিতার আলোচনায় আবারও ফিরে আসা যাক। রেজাউদ্দিন স্টালিনের ‘কফি কাপ’ হচ্ছে গল্পের ছলে স্মৃতির কবিতায়ন। সহজবোধ্য তবে উপভোগ্যতায় সুন্দর। সাকিরা পারভীনের ‘বিস্সুদবার’ একটি অনুভব নিবিড় কবিতা। গ্রামীণ প্রকৃতির দৃশ্যপট, নগরের রাজনৈতিক দৃশ্য, আঞ্চলিক ও প্রযুক্তিগত ভাষা, ধর্ম, পরিবারতন্ত্র ইত্যাদি বহু কিছু দিয়ে কবিতার ককটেল রচনা করা হয়েছে। কাব্যভাষায় নিরীক্ষপ্রবণতা প্রাধান্য পেয়েছে। তবে শব্দের ভিড় ও চাপ কিছুটা কম হলে পাঠকের পক্ষে উপভোগ করা সহজ হতো। সনেট মাহমুদের দীর্ঘাকৃতির কবিতা ‘আন্তঃনাক্ষত্রিক ভালোবাসা’ তাঁর কবিত্বশক্তির অনুকূলে কথা বলে। দীর্ঘ কবিতা রচনার জন্য নিবিড় জীবনানুভব ও গভীর কবিত্বশক্তির প্রয়োজন হয়। অল্পতেই যাদের দম ফুরিয়ে যায় তাদের জন্য শুধুই ছোট আকৃতির কবিতা। কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য রয়েছে অনিঃশেষ মহাবিশ্ব পরিভ্রমণের স্মৃতি ও প্ররোচনা। স্থায়ী মিলনে নয়, পারস্পরিক বিচ্ছেদেই প্রেমের অবিনাশী বিস্তার―এই ভাবনা ও ভাব ব্যঞ্জিত হয়েছে কবিতায়। পাঠশেষে রবীন্দ্রনাথের ‘মানসসুন্দরী’ কবিতার কথা মনে আসবে:
‘ … … … মিলনে আছিলে বাঁধা
শুধু এক ঠাঁই, বিরহে টুটিয়া বাঁধা
আজি বিশ্বময় ব্যাপ্ত হয়ে গেছ প্রিয়ে,
তোমারে দেখিতে পাই সর্ব্বত্র চাহিয়ে!
ধূপ দগ্ধ হয়ে গেছে, গন্ধবাষ্প তার
পূর্ণ করি ফেলিয়াছে আজি চারি ধার!’
[‘মানসসুন্দরী’, সোনার তরী]
খালেদ হামিদীর ‘পরিচয়’ কবিতাটি কিছুটা সোজাসাপটা ভাষায় রচিত, তবে গভীর বক্তব্যে সমৃদ্ধ যা আহসান হাবীবের ‘আমি কোনো আগন্তুক নই’ কবিতাটির কথা মনে করিয়ে দেয়। সেঁজুতি বড়ুয়ার ‘নেশাতুর সময়’ অন্তরঙ্গ আবেগে রচিত একটি হৃদয়-সম্মোহিত করা কবিতা। অলভী সরকারের ‘করুণ কাঁঠালিচাঁপা’ কবিতাটি শব্দের ক্যানভাসে আঁকতে চেয়েছে হৃদয়ের সঙ্গোপন অভিজ্ঞানের চিত্র, যেখানে রংতুলি হয়েছে প্রাতিস্বিক আনন্দ-বেদনার অনুভব এবং যে অনুভবের সঙ্গে একাত্ম হতে পাঠক-দর্শকের হৃদয়ের সম্মতি মেলে সহজেই। এ ধরনের কবিতার আবেদন নিঃশেষে ফুরোয় না কোনওদিন। আরও কিছু কবিতা নিয়ে আলোচনা করা যেত কিন্তু তা করতে গেলে গেলে লেখাটি অডিট রিপোর্টের মতো হওয়ার আশঙ্কা ছিল বলে আর অগ্রসর হলাম না।
কবিতা কিন্তু সবসময় তার সমগ্রতার জন্য সুন্দর বা সমৃদ্ধ হবে এমন কথা নেই। রবীন্দ্রনাথ যেমন একটি কালো মেয়ের কালোরং কিংবা শারীরিক সৌষ্ঠবের প্রশংসা না করতে পারলেও তার দুটি কালো হরিণ চোখের প্রশংসা রচনা করেছেন: ‘কালো ? তা সে যতই কালো হোক/দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।’ অসাধারণ বা সাধারণ কবিতার মধ্যেও অনেকসময় খচিত থাকে একটি সুন্দর উপমা, একখানি অভিনব চিত্রকল্প কিংবা একটি মেধাশাণিত উৎপ্রেক্ষা কিংবা অনুভবে চমক সৃষ্টি করার মতো অনন্য ঢংযুক্ত কোনও পঙ্ক্তি। ঈদসংখ্যার বেশ কিছু কবিতার শরীরের ভাঁজে অনুরূপ ঐশ্বর্য-কণা চোখে পড়েছে। যেমন:
ক.
আমাদের চা-বিকেল
উনোনের কেটলিতে ফোটে
ধূসর সিনেমা আর গল্পের
ফাঁদপাতা ঘ্রাণে
[‘নেশাতুর সময়ে’, সেঁজুতি বড়ুয়া]
খ.
হায়! আমাদের হৃদয়! সেও যদি আমার হতো!
সে আমার কথা অন্যকে বলে
আর আমাকে হাস্যকর করে তোলে
এমন মোনাফেক আর কে আছে বন্ধু
যার জন্য সমাজে মুখ দেখানো বন্ধ।
(‘মোনাফেক’, মাহবুব বারী)
গ.
মিছিলের ছায়ারা মিলিয়ে যায় অন্ধকার ঠিকানায়
(‘চিহ্ন’, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক)
ঘ.
মানুষ সময় কেনে। মানুষ সময় বেচে দেয়।
(‘সময় বিক্রির গল্প’, বদরুল হায়দার)
ঙ.
আর কিছুক্ষণ শিকারির মুখোমুখি,
আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাক হে ছেলে;
চোলাইগন্ধী শরীরের কাছে এসে
পাখির মতন ঝাপটানো ডানা মেলে।
(‘করুণ কাঁঠালিচাঁপা’, অলভী সরকার)
চ.
মালিকেরা নাটাই গোটাতে গোটাতে হিসাব করে সুতোর।
এদিকে শহর জুড়ে টুকরো হচ্ছে আকাশ।
(নাটাই। ঘুড়ি। অদৃশ্য সুতোর ভরসা’, আহমেদ শিপলু)
ছ.
তুমি যখন পৌঁছলে গিয়ে চাঁদে
আমি তখন হুমড়ি খাচ্ছি খাদে
গভীর খানাখন্দে তবু জ্যোৎস্না এসে পড়ে।
(‘শিরোনামহীন’, কামরুল হাসান)
জ.
রোজই যে ডায়েট প্রকল্প করো তাতে তো তারই কথা মনে পড়ে
তোমার পৃথুলা ডাক্তার যার চেম্বারে বসেছে বৈশ্বিক সেমিনার
[‘বিসসুদবার’, সাকিরা পারভীন]
ঝ.
ততক্ষণে আরও একটি ছোট তারা খসে
পড়বে নদীর গেলাসে
[‘অনলুকার’, জুয়েল মাজহার]
ঞ.
শব্দ করে না, পাথরের হাসি শীতের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে,
[‘মাঠের দিকে শুধু এক অস্পষ্ট ধু ধু’, আবদুর রাজ্জাক]
ছ.
কানকোর লাল রক্তটা জমাট করতে চায়
বেইলি রোডের মহিলা সমিতি।
[‘কুয়াশার হুইসেল’, স্নিগ্ধা বাউল]
জ.
মানুষ যুগপৎ
তার নিজের
প্রভু ও দাস
[‘একগুচ্ছ কণাকবিতা’, সৈকত হাবিব]
শশিভূষণ অনুবাদ করেছেন অনেক কয়জন বিদেশি কবির ছোট ছোট কবিতাংশ। এসবকে অনুবাদিত কবিতাকণা বলা যেতে পারে। যাদের কবিতা থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে তারা হচ্ছেন উইলিয়াম শেক্সপীয়ার, কাহলিল জিবরান, রবার্ট ব্রাউনিং, বিদ্যাপতি, হাফিজ, কবি বল্লভ, পাবলো নেরুদা, মাহমুদ দারবিশ, জ্বিগনিয়েফ হেরবের্ত, রবার্ট ফ্রস্ট এবং রবার্ট র্যাংক গ্রেভস। কবিতাংশগুলো পড়ে পাঠক বিদেশি কবিদের কিছু ভাবনার অংশীদার হতে পারবেন। এই অংশটি শব্দঘর ঈদসংখ্যার সম্ভারে বৈচিত্র্য আনয়নে সহায়তা করেছে নিঃসন্দেহে।
কবিতা লেখা হচ্ছে প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও অভ্যাসের ব্যাপার। তবে সাড়া জাগানো উৎকৃষ্ট মানের কবিতা রচনার জন্য বিধাতা প্রদত্ত কাব্যশক্তি প্রয়োজন। শুধু চেষ্টা আর বুদ্ধি দ্বারা কারও পক্ষে রুমি-হাফিজ-খৈয়াম-গ্যেটে-বোদলেয়ার-রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ-আল মাহমুদ হওয়া সম্ভব নয়। জন্মগতভাবে অনন্য কবিত্বশক্তির অধিকারী কালজয়ী একজন তকী মীরের কবিতা সম্পর্কে আরেক কালজয়ী কবি মীর্জা গালিব বলতে পারেন:
‘মীরের কবিতার বেদনাগাথা, কী বলব গালিব!
তাঁর কাব্যগ্রন্থের কাছে কাশ্মিরের বাগান হার মানে’
[বাঙলায়ন: জাভেদ হুসেন]
তারপরও যেটা সম্ভব তা হচ্ছে কবিতার রাজ্যে নিজের মতো করে এবং নিজের সমান কিছু একটা হওয়া। সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবী শুধু নীল-আমাজন-দজলা-হোয়াংহো- গঙ্গা-মেঘনা নামক গুটিকয় প্রধান নদীর অবদানে সবখানি সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা নয়; আরও হাজার হাজার মাঝারি-ছোট আকৃতির নদ-নদী-দিঘি-বিল-হাওর পৃথিবীকে উর্বর ও প্রাণবন্ত রাখার কাজে ভূমিকা পালন করে আসছে। সাহিত্যের পৃথিবীর জন্যও এই উপমা প্রযোজ্য। আর অনেক কবির মধ্যে থেকে কখন যে কোন কবি কোনও একটি বড় নদীর উপমা হয়ে ওঠেন, তা জানে কেবল কাল-মহাকাল।
লেখক : প্রাবন্ধিক
সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক



