আর্কাইভক্রোড়পত্রপ্রচ্ছদ রচনা

শব্দঘর ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত অনুবাদের নৈর্ব্যক্তিক পর্যালোচনা : এলহাম হোসেন

ক্রোড়পত্র : শব্দঘর ঈদসংখ্যা ২০২৬ পর্যালোচনা

যে  গ্রন্থ বা বয়ান মানুষের চিন্তার বাঁধাছক ভাঙতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সময়ের অবধারিত খরস্রোত উপেক্ষা করে কালজয়ী হয়ে ওঠে। মননকাঠামো বা ভাবনার বাঁধাছক ভাঙা সহজ বিষয় নয়। কঠিন। কারণ, মানুষ স্বভাবতই কমফোর্ট জোনে থাকতে পছন্দ করে। কমফোর্ট জোনের বাঁধাছকে আটকে থাকা মানুষকে গতানুগতিক চিন্তার আড়মোড়া ভেঙ্গে জাগিয়ে তোলা এবং নতুনের পথে ঠেলেঠুলে চালিত করা সহজসাধ্য কাজ নয়। তবে এ কাজ যে করতে পারে তার কালের ভ্রƒকুটি উপেক্ষা করে বুক চিতিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার যোগ্যতা আছে। এ কথা বিজ্ঞানী, দার্শনিক, শিল্পী, কবি, অনুবাদক―সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যাঁর ভাবনা বহমান চিন্তাস্রোতে আন্দোলন সৃষ্টি করে সময় তাঁকে অতি যত্নে লালন করে। তিনি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরম্পরার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। ঠিক একই ভাবে যে বয়ান বা প্রপঞ্চ মানুষের বাঁধাছকে আটকানো মনোভঙ্গিতে অভিঘাত সৃষ্টি করে, সেটিও কালের প্রবল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়, দাঁড়িয়ে থাকে। আমার মনে হয় শব্দঘর সাহিত্যপত্রিকা বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের মননকাঠামোতে এমন অভিঘাত সৃষ্টি করে করে এগিয়ে চলেছে। কীভাবে এ কাজ করছে, তার দু-একটি দৃষ্টান্ত অবশ্যই হাজির করব। তবে তার আগে আরও কিছু কথা বলে নেওয়া যাক।

এ বছর শব্দঘর তার ত্রয়োদশ জন্মদিন পার করেছে। বাংলাদেশে এ সময়ে যে কটি সাহিত্য-পত্রিকা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে এবং শিল্পমান বিচারে এগিয়ে রয়েছে সেগুলোর অন্যতম এবং অগ্রগণ্য হলো শব্দঘর। এর এই জনপ্রিয়তা ও অগ্রসরতার প্রধানতম কারণ হলো এর বিষয়-বৈচিত্র্য, মানসম্পন্ন লেখা, অসাধারণ সম্পাদনা, সর্বোপরি চিন্তাউদ্দীপক প্রচ্ছদও। এর প্রতিটি সংখ্যা বাংলাদেশের প্রভাবশালী, খ্যাতিমান লেখকদের লেখা ছাপিয়ে থাকে। সেই সঙ্গে তরুণ লেখকদের লেখাও ছাপিয়ে এটি নতুন নতুন লেখক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশের সাহিত্য তো বটেই এটি পাঠে বিশ্বসাহিত্যেরও নাড়ি টিপে দেখা যায়। বর্তমানে সাহিত্য কোথায় অবস্থান করছে; এর প্যারাডাইম শিফট কীভাবে হচ্ছে এবং কী হচ্ছে, তার একটি বিশ্বস্ত ও সম্যক উপস্থাপনা এই শব্দঘরের প্রতিটি সংখ্যা। এটি যে আক্ষরিক অর্থেই ‘শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ’ তা এর নিবিড় পাঠে প্রত্যেক পাঠকই অনুভব করেন বলে আমার মনে হয়।   

বাংলাদেশের প্রথিতযশা ও অত্যন্ত জনপ্রিয় সাহিত্যিক মোহিত কামাল সম্পাদিত শব্দঘরের এবারের ঈদসংখ্যা তার ধারাবাহিক সাফল্যের মুকুটে আরেকটি বর্ণিল পালক যুক্ত করেছে। বরাবরের মতোই এবারের ঈদসংখ্যাও অনেক দিক থেকে পাঠকের বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। প্রবন্ধ, কবিতা, কথোপকথন, ছোটগল্প, ফ্ল্যাশফিকশন, অনুবাদ―সব দিক থেকে। তবে আমার এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধে আমি শুধু এ-সংখ্যায় প্রকাশিত অনুবাদ নিয়ে দু-চারটি কথা বলব। বর্তমান মাল্টিলিংগুয়াল এবং মাল্টিকালচারা- লিজমের যুগে শব্দঘর সত্যিকার অর্থেই অনুবাদের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং চিন্তার বাঁধাছকে প্রবল অভিঘাত তৈরি করার কাজ করে বলে এটি পাঠকের অকুণ্ঠ প্রশংসার দাবিদার। অনুবাদের কথা শুনলে এক সময় কেউ কেউ নাক সিঁটকাতেন। কারণ, তাঁরা মনে করতেন অনুবাদ মৌলিক কোনও রচনা নয়। অথচ মহাভারত, রামায়ণ, ইলিয়াড, ওডিসি, ইডিপাস রেক্স, আগামেমনন আমাদের প্রায় সবাই অনুবাদেই পড়েছি এবং এই মহাগ্রন্থগুলোর রস আস্বাদন করেছি। এগুলো বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে আন্তঃগ্রন্থিকতা ঘটিয়ে একে সমৃদ্ধ করেছে। অনুবাদের কাছে আমাদের অনেক ঋণ রয়েছে। স্বীকার করি বা না করি। অনুবাদের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে আমরা নিজেদের খামতিও দেখি এবং সেটি পূরণে তৎপরও হই। তবে ইংরেজি থেকে যে পরিমাণ অনুবাদ বাংলা ভাষায় করা হয়, বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ সে-পরিমাণ করা হয় না। কারণ, ইউরোপ-আমেরিকার  পাঠক আমাদের ইংরেজিতে লেখা সাহিত্য পড়ার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়। বিষয়টি আমি আমার কতিপয় ইউরোপীয় বন্ধুর মনোভঙ্গির মধ্যে পেয়েছি। তবে বাংলাদেশের কোনও কোনও অনুবাদক খুব ভালো ও বিশ্বমানের ইংরেজিতে অনুবাদ যে করছেন না, তা নয়। তবে এ সংখ্যা বেশ কম। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে প্রচুর বিশ্বমানের সৃষ্টি রয়েছে। সেগুলোকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়া জরুরি। গোটা বিশ্বকে যেমন আমরা আমাদের ঘরে নিয়ে আসছি তেমনি আমাদের ঘরকেও নিয়ে যেতে হবে গোটা বিশ্বের কাছে। এই দুয়ের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটানোর অত্যন্ত প্রভাবশালী অনুষঙ্গ হলো অনুবাদ। অনুবাদ আসলে এদিক থেকে একটি সেতুর মতো। দুটি ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন টেক্সটকে যুক্ত করে। অনুবাদে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, অনুবাদে নতুন টেক্সটের সৃষ্টি হয়। ঠিক জাক দেরিদা যা বলেছেন, তা অনুবাদের ক্ষেত্রে সত্যি অর্থাৎ তাঁর মতে, অনুবাদ অসম্ভব কিন্তু অনুবাদের প্রয়োজন রয়েছে। অনুবাদের সত্যিই প্রয়োজন আছে। কিন্তু অনেক প্রকাশক অনুবাদ সহজে ছাপতে চান না। সেটি অনুবাদকের জন্য নিরুৎসাহেরও কারণ বটে। তবে এদিক থেকে শব্দঘর অনুবাদ প্রকাশে এবং এমনকি ভালো অনুবাদকদের পুরস্কৃত করতে ইতিমধ্যে ঈর্ষণীয় আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছে। এবারের ঈদসংখা তার ব্যতিক্রম নয়।

এবারের ঈদসংখ্যা মার্চ-এপ্রিল ২০২৬-এ যেসব অনুবাদ ছাপা হয়েছে সেগুলো শিল্পগুণ, মৌলিকত্ব ও প্রভাব বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অনুবাদগুলো বাংলাভাষায় অনূদিত বিশ্বসাহিত্যের ভান্ডারে নিঃসন্দেহে কম হোক বেশি হোক কিছু না-কিছু যোগ করেছে। কোন দিক দিয়ে ? এটি একটি অতি সাধারণ প্রশ্ন। এর উত্তরে বলা যায়―অনুবাদের অন্যতম প্রধান কাজ ইন্টারটেক্সুয়ালিটি বা আন্তঃগ্রন্থিকতা তৈরি করা। বর্তমান সময়টাই আন্তঃগ্রন্থিক। প্রতিনিয়ত একের সঙ্গে অন্যের যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে। এটি এই সময়ের বৈশিষ্ট্য। মাল্টিকালচারালিজম এ সময়ের বাস্তবতা। সময়কে যে ধরতে পারবে সে টিকে থাকবে। যে পারবে না সে সমাজের বৃত্ত থেকে ছিটকে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে ‘আত্ম’ বা ‘নিজ’কে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বৈচিত্র্যময় বিশ্বকে ধারণ করে বৈশ্বিক হয়ে ওঠা। এই দুয়ের সমন্বয় যে মানুষ, সমাজ, সাহিত্য, শিল্প ঘটাতে পারবে সে সংকীর্ণতার বৃত্ত ভেঙে সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারবে। নিজেকে জানার জন্য হলেও অন্যকে জানতে হবে। তা না হলে নিজের অতিমূল্যায়ন আমাদের জ্ঞানের লজ্জাজনক সীমাবদ্ধতা জাহির করে দিতে পারে। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্বাভাবিক। আমরা সবাই সব বিষয় জানি না। কিন্তু যেটুকু জানা আবশ্যক, তা না জেনে নিজেকে অতিমূল্যায়ন করা সত্যিই বিব্রতকর। নিজের জন্যই। নিজের মাটিতে পা রেখে বিশ্বকে দেখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো অনুবাদ।

অনুবাদ নিয়ে শব্দঘরের সচরাচরের মতো এবারের আয়োজন নিশ্চয়ই সেই অতি প্রয়োজনীয় আন্তঃগ্রন্থিকতা নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পেরেছে বলেই মনে হয়। বিশ্বসাহিত্যের বেশকিছু অজানা-অচেনা জগতের দ্বারও উন্মোচন করেছে এবং করেছে এই সংখ্যা। ইসফানদিয়র আরিওন অনুবাদ করেছেন আরবি সাহিত্যিক-দার্শনিক ইবনে তোফায়েলের হাই বিন ইয়াকজান। এটি দ্বাদশ শতাব্দীর দুর্লভ একটি গ্রন্থ যাকে উপন্যাসের পথিকৃৎ গ্রন্থ বলে চিহ্নিত করলে অতিকথন বলে বিবেচিত হবে না। আমরা যারা ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে একটু আধটু নাড়াচাড়া করি, তারা মনে করি অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংরেজ সাহিত্যিক স্যামুয়েল রিচার্ডসনের পামেলা থেকে উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়েছে। খুব বেশি হলে ষোড়শ শতাব্দীর টমাস ন্যাশের জ্যাক উইল্টিনের কথা কেউ কেউ বলেন। মাঝখানে বানিয়ানের পিলগ্রিমস প্রগ্রেস, ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুসো এবং জোনাথন সুইফটের গালির্ভাস ট্রাভেল্স পুরোপুরি উপন্যাসের স্ট্যাটাস না পেলেও এগুলো উপন্যাসের অনেক উপকরণে সমৃদ্ধ। আরও পেছনে গেলে কেউ কেউ জেফরি চসারের দীর্ঘ ও একমাত্র সম্পূর্ণ কাব্য ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডি-তে যে বর্ণনা বা গল্পকথন-রীতির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, তাকে উপন্যাসের অন্যতম বীজ বলে আখ্যা দেন। আর বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের আগমন কাব্যের অনেক পরে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে। তার আগের কিছু কাব্যগ্রন্থে উপন্যাসের নানা উপকরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও সেগুলোকে আলাদা করে তেমন কোনও আলোচনা হয় না। যা হোক, ইবনে তোফায়েলের হাই বিন ইয়াকজান নানা বৈশিষ্ট্য বিচারে বিশ্বসাহিত্যে উপন্যাসের পথিকৃৎ গ্রন্থ হবার যথেষ্ট যোগ্যতা রাখে। বয়স বিচারে ইংরেজি বা বাংলা উপন্যাসের চাইতে অনেক অনেক পুরাতন। অথচ পশ্চিমা আধিপত্যবাদী ন্যারেটিভ ও ডিসকোর্সগুলো তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য দুরভিসন্ধি নিয়ে খণ্ডিত ইতিহাস পাঠকের সামনে হাজির করে। তবে পাঠকের পাঠের ব্যাপ্তি যদি বিস্তৃত হয়; পাঠক যদি তাঁর চিন্তার স্টেরিওটাইপ বা বাঁধাছক ভেঙে বেরিয়ে আসেন, তাহলে তাঁর সামনে নতুন তথ্য ও জ্ঞানের অবারিত এবং বিস্তীর্ণ প্রান্তর প্রসারিত হয়। এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরের একটি দ্বার উন্মোচন করেছেন অনুবাদক ইসফানদিয়র আরিওন। তিনি একজন প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো পাঠকের সামনে এই চক্ষুউম্মিলনকারী তথ্য হাজির করেছেন তাঁর অনুবাদের মধ্য দিয়ে।

ফারহানা আজিম শিউলী বাংলাদেশের একজন অগ্রগণ্য অনুবাদক। পূর্বে তাঁর শূন্যবিন্দুতে নারী (মূল: উইমেন এট পয়েন্ট জিরো, রচয়িতা: নাওয়াল আল সাদাবী) অনুবাদগ্রন্থের আমি রিভিউ লিখেছি এবং সেটি শব্দঘরে ছাপাও হয়েছে। শিউলী অনুবাদ করেছেন আমেরিকান সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী শার্লট পারকিন্স গিলম্যানের নভেলা বা ছোটগল্প দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপার (১৮৯১)। এই অনুবাদের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত মচমচে, সাবলীল ভাষার মুগ্ধতায় ভাসতে ভাসতে পাঠক নারীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি তৎকালীন আমেরিকার পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান পান। ভিক্টোরীয় যুগে নারীর মানসিক ও শারীরিক রোগের চিকিৎসায় তাকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিশ্রামের উপদেশ দেওয়া হতো। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে নারীকে হিস্টিরিয়ার দিকে ঠেলে দিত। তখন তার উপর ভূত-প্রেতের আছর হয়েছে বলে প্রচার করে তাকে নির্যাতন করা হতো। নারীর এমন কষ্টের আখ্যানের সঙ্গে পাঠক পরিচিত হন শিউলীর অনুবাদের মধ্য দিয়ে। জন্রা বিবেচনায় এটি ‘হরর ফিকশন’ হিসেবেও পরিচিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোথিক ট্র্যাডিশনের মধ্যে হরর ফিকশনের শিকড় প্রোথিত। সাহিত্য সমালোচকরা মেরি শেলীর ফ্রাংকেনস্টাইন (১৮১৮) ও আইরিশ লেখক আব্রাহাম স্টোকারের ড্রাকুলাকে (১৮৯৭) হরর ফিকশনের পথিকৃৎ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এভাবে পাঠক ফারহানা আজিম শিউলীর অনুবাদের মধ্য দিয়ে অনেক অজানা দিগন্তে দৃষ্টি প্রসারিত করার প্রয়াস পান।

এলহাম হোসেন অনুবাদ করেছেন ২০১৮ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী পোলিশ সাহিত্যিক ওলগা তোকার্জুকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। মার্তা ফিগলেরোভিচের সঙ্গে কথোপকথনে যে অমোঘ কথাটি পরিষ্কার হয়েছে তা হলো উপন্যাস রচনা একটি প্রক্রিয়া এবং এটি ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানের মতো। এর মধ্যে মানববিজ্ঞান, আচরণ বিজ্ঞান, তত্ত্ব, হতাশা ইত্যাদির গভীর অনুসন্ধান-প্রক্রিয়া জড়িয়ে আছে। স্থানীয় লোককাহিনি, মিথ, ইতিহাস, অভিজ্ঞতা এবং এমনকি একজন কৃষকের বাড়ির দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা একটি পুরাতন, কাদামাখা লাঙলও যে একটি উপন্যাসের বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তা ওলগার কথোপকথনে পরিষ্কার হয়।

এছাড়া বিশ্বসাহিত্যের আরও নয়টি ছোটগল্পের অনুবাদ ছাপা হয়েছে এই সংখ্যায়। সুদান, ভারত, জাপান, লিথুয়ানিয়া, কানাডার অত্যন্ত প্রভাবশালী লেখকদের প্রতিনিধিত্বকারী ছোটগল্প বেছে নিয়েছেন অনুবাদকরা। নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর অনুবাদ করেছেন তায়েব সালির ছোটগল্প ‘এক মুঠো খেজুর’। নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর একজন প্রথিতযশা অনুবাদক। তাঁর অনুবাদ পড়লে পাঠক ভাববেন তাঁরা যেন মূল টেক্সটিই পাঠ করছেন। এখানে না আছে জড়তা, না আছে কৃত্রিমতা। তাঁর অনুবাদের ভাষা স্বচ্ছ জলের ফোয়ারার মতো ছলাৎ ছলাৎ ঝংকার তুলে সামনে এগিয়ে যায়।

বানু মুশতাকের গল্প ‘অগ্নিবৃষ্টি’ অনুবাদ করেছেন মোশাররফ হোসেন। ভারতের কর্নাটক প্রদেশের লেখিকা বানু মুশতাক ২০২৫ সালে তাঁর ছোটগল্প সংকলন হার্ট ল্যাম্পের জন্য ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার জিতে নেন। প্রান্তিক মুসলিম, বিশেষ করে নারীদের উপর ধর্মের অপব্যবহার করে মোল্লাতন্ত্রের যে নির্মম ও কপট নিপীড়নের চিত্র বানু মুশতাকের গল্পের আখ্যানে ফুটে উঠেছে, তার সঙ্গে কিছুটা হলেও পাঠককে পরিচিত করে দেবার বিষয়ে এই অনূদিত গল্পটি বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলেই মনে হয়। এছাড়া লিথুয়ানিয়ার লেখক ভালদাস পাপিয়াভিসের গল্প ‘আমি একটি বাল্ব কিনতে বেরোচ্ছি’ অনুবাদ করেছেন বিকাশ গণচৌধুরী। পাপিয়াভিসের ভাষা কাব্যময় এবং এতে ইম্প্রেশনিস্টিক ফ্লেভার রয়েছে। এমন কাব্যময় ভাষায় পাপিয়াভিস মানুষের শরীর ও মন, ভেতর ও বাহিরের মধ্যকার দ্বিরালাপের অনবদ্য উপস্থাপনা করেছেন। বিকাশ গণচৌধুরী রায় তাঁর অনুবাদে পাপিয়াভিসের রচনার এই গুণগুলো বেশ বিশ্বস্ততার সঙ্গে ধরেছেন। কানাডিয়ান লেখক ডেভিড সালয়ের গল্প ‘উতল হাওয়া’ অনুবাদ করেছেন শাহেরিন আরাফাত। বর্তমান যুগটিই হলো পোস্টহিউম্যান যুগ। মানুষ আর যন্ত্রের ঘনিষ্ঠতা এতটাই নিবিড় যে এই দুয়ের মধ্যে ভেদরেখা টেনে দেওয়া এখন দুষ্কর হয়ে উঠেছে। কিন্তু মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা ও অস্তিত্ব সংকট এড়াতে মানুষ তার ভূমিকা পালটাচ্ছে। কিন্তু তাতে কি এর কোনও সমাধান আছে ? এমন প্রশ্নের পীড়ন পাঠক অনুভব করবেন ডেভিড সালয়ের এই গল্পে। শাহেরিন আরাফাতের অনুবাদ গল্পের শিল্পগুণ অক্ষুন্ন রেখেই তাঁর অনবদ্য অনুবাদ পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

এছাড়া রাশিয়ান সাহিত্যিক তাতিয়ানা তলস্তোয়ার গল্প ‘আসপিক’ অনুবাদ করেছেন সর্বজিৎ সরকার। তাতিয়ানা তলস্তোয়া রাশিয়ার এ সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী সাহিত্যিক। সাবলটার্নদের জীবনের যাপনচিহ্নগুলো তাঁর লেখার প্রধান বিষয়। এছাড়া মানুষের অবচেতন মনের নানা টানাপোড়েন তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। সর্বজিৎ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মূল টেক্সটের সুর, স্বর, অর্থদ্যোতকতা, ব্যঞ্জনা তাঁর অনুবাদে ধারণ করেছেন বলেই আমার কাছে প্রতীয়মান হয়। অনিতা দেশাইয়ের ছোটগল্প ‘ফেয়ারওয়েল পার্টি’ অনুবাদ করেছেন নূর কামরুন নাহার। ভারতীয় ডায়াসপোরা লেখিকা আনিতা দেশাই বরাবরই উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজের অন্তঃসারশূন্যতার চিত্র অঙ্কন করেন তাঁর রচনায়। সেই সঙ্গে শহুরে মানুষের বিচ্ছিন্নতার বয়ান থাকে তাঁর আখ্যান জুড়ে। নূর কামরুন নাহারের সাবলীল অনুবাদে আনিতা দেশাইয়ের গল্পের কোনও কিছুই হারিয়ে যায়নি। নোবেলজয়ী চীনা সাহিত্যিক মো ইয়ানের ছোটগল্প ‘বুড়ো বন্দুক’ অনুবাদ করেছেন ছন্দা মাহবুব। মো ইয়ানের ভাষার বিশেষত্ব হলো যে, এতে জাদুবাস্তবতার প্রলেপ রয়েছে। পাঠক পড়তে পড়তে কখন যে বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝখানে এসে দাঁড়ায় সে নিজেই ভুলে যায়। ছন্দা মাহবুবের অনুবাদে মো ইয়ানের ভাষার এই গুণটি অক্ষুণ্ন থাকে অনুবাদক হিসেবে তাঁর মুন্সিয়ানার কারণেই। মিল্টন রহমানের অনুবাদ ‘শিনাগাওয়া বানরের স্বীকারোক্তি’ পাঠককে হারুকি মুরাকামির সাহিত্যের প্রকৃত রস আস্বাদনে শতভাগ সাহায্য করে।

প্রাগুক্ত অনুবাদকদের প্রত্যেকেই অনুবাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং এঁদের গল্পচয়ন থেকে শুরু করে সাবলীল বাংলায় তা বাংলাভাষাভাষী পাঠকের সামনে হাজির করার যে মুন্সিয়ানা অনুবাদ পাঠে অনুভব করা যায়, তা এক কথায় অসাধারণ।

সর্বশেষে একথা জোর দিয়ে বলা যায়, বর্তমান সাইবার প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাহিত্য যে মাল্টিডিসিপ্লিনারি চরিত্র গ্রহণ করেছে, তা শব্দঘর খুব ভালোভাবেই ধারণ করেছে বলে আমার বিশ্বাস। এ কথার প্রমাণ দিতে এর এই ঈদসংখ্যার দৃষ্টান্ত টানলেই যথেষ্ট। শব্দঘর বাংলা ভাষার পাঠকদের বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের অলিগলিতে ঢুঁ মেরে দেখতে প্রণোদিত করে। এর মতিগতি বুঝতে সাহায্য করে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় কাজ। আর এ কাজের পেছনে যিনি নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনিও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সফল লেখক, সবার প্রিয় সাহিত্যিক মোহিত কামাল। তাঁর দক্ষ সম্পাদনায় এবং তাঁর অত্যন্ত আত্মনিয়োজিত টিমের সযত্ন প্রচেষ্টায় পত্রিকাটি আরও অনেক অনেক পথ সফল ভাবে পাড়ি দিক, শতায়ু হোক―এটিই আমার প্রত্যাশা।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button