অনুবাদ গল্পআর্কাইভবিশ্বসাহিত্য

শিনাগাওয়া বানরের স্বীকারোক্তি : মূল : হারুকি মুরাকামি

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প

ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ : মিলটন রহমান

[জাপানের কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯ সালে। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা সম্ভবত চৌদ্দটি। আর ছোটগল্পগ্রন্থ ছিল মাত্র পাঁচটি। তবে ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল প্রকাশিত হয় তাঁর ষষ্ঠ গল্পগ্রন্থ দি ফার্স্ট পার্সন সিঙ্গুলার (মূল জাপানি ভাষায় গ্রন্থের শিরোনাম―ইছিবানসু তানসু)। এক মলাটে আটটি গল্প। গ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে বিশ্বের তাবৎ পত্রিকা আলোচনায় মেতে ওঠে। মূল জাপানি ভাষা থেকে সব কটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল। বিশ্বসাহিত্যে মুরাকামির গল্পগ্রন্থটি বিস্তর আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে। বিশ্বের প্রথম সারির প্রায় সব সাহিত্য পত্রিকা গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করেছে। দি নিউ ইয়র্কার, গার্ডিয়ান, দি টাইমস থেকে শুরু করে বিভিন্ন পত্রিকায় এ গ্রন্থ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। সঙ্গীত, স্মৃতি এবং স্ফীত জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর মানসিক দর্শন গল্পগুলোর অবকাঠামো তৈরি করেছে। এ গ্রন্থের পঞ্চম গল্প ‘শিনাগাওয়া বানরের স্বীকারোক্তি’ ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছি। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি মূলের ভাব এবং চিন্তার রেখা ঠিক রাখতে।]  

পাঁচ বছর আগে উষ্ণ-ঝরনার গুনমা শহরের ছোট্ট জাপানি ধাঁচের হোটেলে সেই বয়স্ক বানরটিকে দেখছিলাম। হোটেলটি ছিল গ্রাম্য এবং জরাজীর্ণ, সেখানে আমি এক রাত থাকতে পেরেছিলাম।

আমি চারপাশে ঘুরতে থাকলাম, মন যেখানে যেতে চাইল সেখানে গেলাম। ঘুরতে ঘুরতে সন্ধে সাতটা পেরিয়ে গেল। উষ্ণ-ঝরনার শহরে পৌঁছে আমি ট্রেন থেকে নেমে গেলাম। শরৎ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সূর্য অস্ত গেছে অনেক আগে। জায়গাটি আচ্ছাদিত হয়ে গেল হালকা-নীল অন্ধকারে, বিশেষ করে পাহাড়ের অংশটি। চূড়া থেকে কনকনে ঠান্ডা বাতাস ধেয়ে আসছে। গাছ থেকে ফর ফর শব্দে রাস্তায় আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাতা।

আমি শহরের একেবারে কেন্দ্রে হেঁটে হেঁটে থাকার জায়গা সন্ধান করছি, কিন্তু রাতের খাবারের পর অভিজাত কোনও হোটেল অতিথি নিতে চায় না। পাঁচ-ছয়টি হোটেল দেখলাম, কিন্তু তারা আমাকে সরাসরি না করে দিল। শেষে শহরের বাইরে নির্জন একটা এলাকায় গেলাম, সেখানে একটি হোটেল আমাকে থাকতে দিল। জায়গাটি ছিল একেবারে নির্জন এবং হোটেলের বাড়িটি ছিল অনেকটাই বিধ্বস্ত। এ হোটেলটি দেখেছি অনেক বছর আগে, কিন্তু পুরোনো ওই হোটেলে এমন কিছু ছিল যা থাকার কথা নয়। এখানে-সেখানে জোড়া গলিগুলো ছিল কিছুটা চিকন। ফাটলগুলো মেরামত করা হলেও দেয়ালের সঙ্গে সমান্তরালে যায়নি। আমি ভাবছিলাম হয়তো কোনও ভূমিকম্প এলে দেয়ালগুলো সমান হবে। তবে এটুকু আশা করেছিলাম, যাতে আমি থাকতে কোনও ভূমিকম্প না হয়।

হোটেলটি রাতের খাবার দেয় না, তবে সকালের নাস্তা দেয়। এক রাতের জন্য হোটেলটির ভাড়াও ছিল খুব সস্তা। রিসেপশনে ছিল একটি সাদামাটা টেবিল। টেবিলটির পেছনে বসা ছিলেন ভ্রƒহীন ও লোমহীন এক বৃদ্ধ। লোকটি আমার কাছ থেকে এক রাতের ভাড়া অগ্রিম নেন। ভ্রƒ না থাকায় বৃদ্ধর ঢাউস ঢাউস চোখগুলো জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। তার পাশে রাখা কুশনে একটি বুড়ো বিড়াল ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দে ঘুমাচ্ছিল। বিড়ালটির নাকে নিশ্চয় কোনও সমস্যা আছে, কারণ বিড়াল ঘুমানোর সময় এভাবে নাক ডাকতে আমি কখনও শুনিনি। মাঝে মাঝে নাকের শব্দের ছন্দপতন ঘটছে। হোটেলটির সব কিছুই পুরোনো, মনে হয় এখনি ভেঙে পড়বে।

আমাকে যে রুমে নিয়ে যাওয়া হলো সেটি ছিল খুবই ছোট। ঠিক যেন স্টোর রুম―যেখানে মেট্রেস, বালিশ এসব রাখা যায়। ছাদের আলো ছিল ম্লান, মেঝের কার্পেটের ওপর পা ফেলতেই কড়কড় করে ভীতিকর শব্দ করছিল। কী আর করা, তখন খুঁতখুঁতে হওয়ার কোনও সুযোগ ছিল না। নিজেকে প্রবোধ দিয়ে বললাম মাথার ওপর একটি ছাদ আর ঘুমানোর জন্য একটা বিছানা পেলেই হয়ে যায়।

আমি লাগেজ আর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ মেঝেতে রেখে আবার শহরের দিকে রওয়ানা হলাম। (ঘরটি এমন ছিল না যে, সেখানে আরাম করে কিছু সময় কাটানো যায়)। আমি কাছের একটি সোবা নুডলসের দোকানে ঢুকে কোনওমতে রাতের খাবার খেলাম। এছাড়া কোনও উপায় ছিল না। এখানে না খেলে কিছুই খাওয়া হতো না সারা রাত। আশেপাশে আর কোনও রেস্তোরাঁ খোলা ছিল না।

আমি একটি বিয়ার, হালকা নাস্তা আর গরম সোবা নুডলস খেলাম। নুডলসের স্বাদ মোটামুটি।  স্যুপও কুসুম গরমই বলা যায়। এ সম্পর্কে কোনও অভিযোগ করার প্রয়োজন মনে করিনি। খালি পেটে ঘুমাতে যাওয়ার চেয়ে কিছু খেতে পেলাম সেটাই সে মুহূর্তে উত্তম ছিল আমার কাছে। খাবার দোকান থেকে বের হওয়ার পর ভাবছিলাম কিছু নাস্তা আর হুইস্কির একটা ছোট বোতল কিনব, কিন্তু কোনও দোকান খুঁজে পেলাম না। তখন রাত আটটা পার হয়ে গেছে। খোলা আছে কেবল শুটিং গ্যালারি গেম সেন্টার, সাধারণত এমন দেখা যায় উষ্ণ ঝরনার শহরগুলোতে। পায়ে হেঁটে হোটেলে পৌঁছুলাম এবং গায়ে ইউকাতা গাউন চাপিয়ে স্নান সারতে নিচে নেমে গেলাম।

জীর্ণ ভবন আর সীমিত সুবিধার হোটেলের উষ্ণ ঝরনায় প্রবাহিত স্নানাগার অকল্পনীয় রকম ভালো লাগল। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পানি ছিল ঘন সবুজ রঙের, একেবারেই পাতলা নয়; গন্ধক-এর তীব্র গন্ধটা ছিল আমার জীবনে আগে কখনও অনুভব করা কিছুর চেয়েও প্রবল। সেখানে আমি ডুবে রইলাম, হাড়ের ভেতর পর্যন্ত নিজেকে গরম করে নিলাম। সে সময় আর কাউকে স্নান করতে দেখিনি (আমার জানাও ছিল না, হোটেলে আর কোনও অতিথি আছে কি না)। দীর্ঘ সময় নিয়ে আমি আরামে ও আনন্দে স্নান উপভোগ করলাম। কিছুক্ষণ পর আমি কিঞ্চিৎ মাথা ঘোরা অনুভব করলাম। বাইরে এসে কিছুটা স্থির হয়ে আবার স্নানঘরে ঢুকলাম। ভাবলাম জরাজীর্ণ দেখালেও মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত ভালো হোটেলই পেয়েছি। কোনও একটি বড় হোটেলে অনেক স্নানার্থীদের সঙ্গে শোরগোল করে স্নান করার চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক এবং শান্তিপূর্ণ স্নান করতে পেরেছি বলেই মনে হয়েছে।

আমি তৃতীয়বারের মতো যখন স্নান করছি, ঠিক তখন ঝন ঝন করে কাচের দরজা খুলে বানরটি প্রবেশ করে। মৃদু উচ্চারণে বলল, ‘মাফ করবেন’। আমার বুঝতে কিছুটা সময় লাগল যে সে একটি বানর। গরম পানির ভাপে পুরো ঘর উত্তপ্ত হয়ে আছে, তাতে আমি কিছুটা হতবাকও ছিলাম। কারণ কিছুতেই ভাবিনি যে সেখানে কোনও বানরের কথা শুনব। তাই দেখার সঙ্গে সঙ্গে এটি যে আসলেই একটি বানর তা বুঝতে আমার সময় লাগল। বানরটি দরজা বন্ধ করে, এলোমেলো পড়ে থাকা বাক্সগুলোকে গুছিয়ে রেখে, তাপমাত্রা মাপার জন্য একটি থার্মোমিটার পানিতে চালান করে দিল। সে থার্মোমিটারের ডায়ালের দিকে মনযোগসহকারে তাকাল। এমনভাবে তাকাচ্ছে দেখে মনে হলো কোনও জীবাণুবিজ্ঞানী নতুন কোনও জীবাণুর ধরন আলাদা করে দেখছে।

‘স্নান কেমন ছিল’, বানরটি আমাকে জিজ্ঞেস করে।

‘খুবই আনন্দদায়ক, ধন্যবাদ’ আমি বললাম।

ধোঁয়ায় জড়িয়ে আমার কণ্ঠ কিছুটা হালকাভাবে প্রতিধ্বনিত হলো। সে কণ্ঠ অনেকটা পৌরাণিক মনে হলো, আমার নিজের কণ্ঠের মতো মনে হলো না। মনে হলো গভীর বন থেকে ফিরে আসা অতীতের কোনও প্রতিধ্বনি। সেই প্রতিধ্বনি…এক সেকেন্ডের মতো থমকে ছিল। একটা বানর এখানে কী করছে। তাছাড়া সে কেন আমার ভাষাতেই কথা বলছে ?

আমি কি ঘষে তোমার পিঠ পরিষ্কার করে দেব ? মৃদু কণ্ঠে বানরটি জিজ্ঞেস করল। তার কণ্ঠটা ছিল স্পষ্ট ও মোহনীয়, এক ধরনের ডু-ওয়প গ্রুপের ব্যারিটোন গায়কের মতো। বিষয়টি এমন ছিল না, যা তুমি প্রত্যাশা করছিলে। তার কণ্ঠ যে খুব অদ্ভুত ছিল তাও নয়। চোখ বন্ধ করে শুনলে মনে হতো একজন সাধারণ মানুষ কথা বলছে।

‘জি ধন্যবাদ’ আমি বললাম।

বিষয়টি এমন ছিল না যে, আমি সেখানে বসে কারও জন্য অপেক্ষা করছি, যে এসে আমার পিঠ ঘষে দেবে। আমি তাকে না বলতে পারিনি, পাছে সে যদি মনে করে আমি একজন বানরকে দিয়ে পিঠ ঘষাতে চাই না। ভাবলাম তার পক্ষ থেকে এটি একটি সদয় প্রস্তাব। না বলে তার অনুভূতিতে আঘাত করতে চাই না। আমি ধীরে ধীরে টব থেকে উঠে, বানরের দিকে পিঠ ঘুরিয়ে একটি কাঠের পাটাতনে বসলাম।

বানরের কোনও কাপড় ছিল না। বানরের ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক। তাই আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকেনি। তাকে দেখতে বেশ বয়স্ক মনে হচ্ছিল। চুল সাদা হয়ে গেছে। সে ছোট্ট একটি তোয়ালে নিয়ে তাতে সাবান মেখে অভিজ্ঞ হাত দিয়ে আমার পিঠ ঘষে দিল।

‘আজকাল বেশ ঠান্ডা পড়ছে তাই না’ বানরটি বলল।   

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।’

‘শীঘ্রই এ স্থানটি তুষারে ঢেকে যাবে। এরপর ছাদ থেকে বরফ সরাতে হবে, যা সহজ কাজ নয়। বিশ্বাস করো।’

একটু বিরতির পর আমি কথা বললাম। ‘তাহলে তুমি মানুষের মতো কথা বলতে পারো ?’

‘হ্যা আমি পারি’ বানরটি চটপটে উত্তর দিল। এ প্রশ্ন তাকে হয়তো অনেকে করেছে। ‘ছোটবেলা থেকে আমি মানুষের কাছেই বড় হয়েছি। থাকতে থাকতে কখন যে মানুষের ভাষা শিখে ফেলেছি জানি না। আমি অনেকদিন টোকিওর শিনাগাওয়ায় থাকতাম।’

‘সিনাগাওয়ার কোথায় ?’

‘গোটেনিয়ামার আশেপাশে।’

‘ওই এলাকাটি খুব সুন্দর।’

হ্যাঁ, তুমি তো জানো। এ এলাকাটি বসবাসের জন্য খুবই মনোরম স্থান। সেখানে রয়েছে গোটেনিয়ামার গার্ডেন। আমি সেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতাম।’

আমাদের কথাবার্তা এখানে এসে থেমে গেল। বানরটি আলতোভাবে আমার পিঠ ঘষতে থাকল (আমি খুব আরাম অনুভব করছিলাম) আর সে ফাঁকে আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম, একটি বানর বেড়ে উঠেছে শিনাগাওয়াতে ? গোটেনিয়াম গার্ডেন ? কী সাবলীলভাবেই না কথা বলে ? এ কীভাবে সম্ভব ? আরে সে তো একটা বানর―বানরই তো, এর বেশি কিছু তো নয়।

‘আমি মিনাতো কুতে থাকি।’ আমি বললাম। যদিও এ সময়ে এটি বলায় তেমন কোনও অর্থ বহন করে না।

‘তাহলে তো আমরা প্রায় প্রতিবেশীই ছিলাম’। বানরটি আন্তরিকতা মাখা স্বরে বলে।

‘শিনাগাওয়ায় তুমি যার কাছে বড় হয়েছো, তিনি কেমন মানুষ ছিলেন ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমার মনিব ছিলেন একজন কলেজ অধ্যাপক। তিনি ছিলেন পদার্থবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ। তিনি টোকিওর গাকুগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ক বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।’

‘তাহলে তো তিনি বেশ জ্ঞানী মানুষ ছিলেন।’

‘নিশ্চয়ই জ্ঞানী ছিলেন। তিনি মিউজিক খুব বেশি ভালোবাসতেন। বিশেষ করে ব্রুকনার আর রিচার্ড স্ট্রাউসের মিউজিক। তাঁরই কারণে আমি নিজের মধ্যে মিউজিকের প্রতি এক ধরনের অনুরাগ তৈরি করেছিলাম। আমি সব সময় সঙ্গীতে মজে থাকতাম। মনে করতে পারো, আমি অনেক কিছু না জেনেই এ জ্ঞান বা অনুরাগ তৈরি করেছিলাম।’

‘তুমি ব্রুকনারের মিউজিক পছন্দ করো ?’

‘হ্যাঁ। তাঁর সপ্তম সিম্ফনি। আমি সবসময় তৃতীয় মুভমেন্টটাকে বিশেষভাবে উদ্দীপক মনে করি।’  

‘আমি প্রায়ই তাঁর নবম সিম্ফনি শুনি’, আমি বললাম। আরেকটি প্রায় অর্থহীন মন্তব্য করলাম।

‘হ্যাঁ, সত্যি সেটি চমৎকার।’ বানরটি বলল।

‘তাহলে সেই অধ্যাপক তোমাকে ভাষা শিখিয়েছে ?’

‘হ্যাঁ, তিনিই শিখিয়েছেন। তাঁর কোনও সন্তান ছিল না। সম্ভবত সে শূন্যতা পূরণ করার জন্য, তিনি যখন সময় পেতেন তখন বেশ কড়া নিয়মে আমাকে প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি খুব ধৈর্যশীল মানুষ ছিলেন। শৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। তিনি সিরিয়াস স্বভাবের মানুষ ছিলেন, যার প্রিয় উক্তি ছিল―সঠিক তথ্যের পুনরাবৃত্তি হলো জ্ঞানের সত্যিকারের পথ। তাঁর স্ত্রীও ছিলেন শান্ত এবং মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। সব সময় আমার প্রতি সদয় ছিলেন। তাঁদের দুজনের সম্পর্ক খুব মধুর ছিল।’

‘তাই না!’ আমি বললাম।

বানরটি আমার পিঠ ঘষা শেষ করল। ‘আপনার ধৈর্যের জন্য ধন্যবাদ’ বানরটি বলল এবং মাথা নিচু করে সম্মান জানাল।

‘তোমাকে ধন্যবাদ’ আমি বললাম। ‘আমি খুব আরাম পেয়েছি। তুমি কি এ হোটেলে কাজ করো ?’

‘হ্যাঁ, আমি এখানেই কাজ করি। তারা খুবই সজ্জন বলে আমাকে এখানে কাজ করতে দিয়েছে। অভিজাত কোনও হোটেল একটা বানরকে কাজ দিত না। এ হোটেলে সব সময় লোকসংখ্যা কম থাকে। আর আপনি যদি নিজেকে উপকারী হিসেবে তৈরি করতে পারেন, তাহলে আপনি মানুষ না বানর সেটি তারা ধর্তব্যের মধ্যেই রাখে না। বানরের পারিশ্রমিক খুব কম। তারা আমাকে কাজ করতে দেয় এমন স্থানে যা সরাসরি কারও চোখে পড়ে না। যেমন স্নানঘর ঠিক করা, পরিষ্কার করা এসব কাজ। অধিকাংশ অতিথি বানরকে চা পরিবেশন করতে দেখলে চমকে যেত। রান্নাঘরে কাজ করাও সম্ভব নয়। সেখানে স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয় রয়েছে।’

‘তুমি কি এখানে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছো ?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘হ্যাঁ, প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করছি।’

‘তাহলে তো বোঝা যাচ্ছে এখানে এসে থিতু হওয়ার আগে তোমাকে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে।’

বানরটি দ্রুত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, ‘একদম ঠিক।’

আমি সঙ্কোচ বোধ করছি। তারপরও বাইরে এলাম এবং বললাম, ‘যদি কিছু মনে না করো, তুমি কি তোমার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বলতে পারো আমাকে ?’

বানরটি সম্মতি জানাল। বলল, ‘হ্যাঁ, তাই ভালো হবে। তবে আমার গল্প শুনতে আপনার যতটুকু ভালো লাগবে ভাবছেন তত ভালো নাও লাগতে পারে। আমার কাজ শেষ হবে দশটায়। এরপর আমি আপনার রুমে থামতে পারি। আপনার জন্য কোন সময় ভালো ?’

‘নিশ্চয়ই’ আমি বললাম। ‘আমি অত্যন্ত খুশি হব আসার সময় যদি তুমি বিয়ার নিয়ে আসো।’

‘বুঝতে পেরেছি। কিছু ঠাণ্ডা বিয়ার। সাপোরো কি ভালো লাগবে আপনার ?’

‘অবশ্যই ভালো লাগবে। তুমি কি বিয়ার পান করো ?’

‘অল্প পান করি।’

‘তাহলে দুটো বড় বোতল নিয়ে আসবে প্লিজ।’

‘অবশ্যই। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে আপনি দ্বিতীয় তলার আরাইসু স্যুটে উঠেছেন।’

‘হ্যাঁ, ঠিক।’ আমি বললাম।

‘কিছুটা অদ্ভুত, তাই না ?’ বানরটি বলল। পাহাড়ের মধ্যে একটি হোটেল, আর সেখানে একটি কক্ষের নাম আরাইসো ‘রগড শোর’। সে হেসে উঠল। আমি বিস্মিত হয়েছি, কারণ এর আগে কখনও এভাবে বানরের হাসি শুনিনি। কিন্তু মনে হয় বানরেরাও কখনও কখনও হাসে, এমনকি কাঁদেও। সে কথা বলছিল―এ ভেবে আমার অবাক হওয়ার কথা ছিল না।

‘সে যাই হোক, তোমার কি কোনও নাম আছে ?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘না, আসলে আমার কোনও নাম নেই। তবে সবাই আমাকে শিনাগাওয়া বানর বলে ডাকে।’

বানরটি কাচের দরজা আলতো টানে খুলল, ঘুরে দাঁড়িয়ে ভদ্রভাবে মাথা নোয়াল, তারপর ধীরে ধীরে দরজাটি বন্ধ করল।

দশটা বাজার একটু পরে বানরটি আরাইসু স্যুটে এল। সঙ্গে একটি ট্রেতে করে নিয়ে এল বড় দুটি বিয়ারের বোতল। সঙ্গে ছিল বোতলের ছিপি খোলার চাবি, দুটি গ্লাস এবং কিছু স্ন্যাকস, শুকনো, মশলাদার স্কুইড আর কাকিপির একটি প্যাকেট―চিনাবাদাম মেশানো চালের ক্র্যাকার। একেবারে সাধারণ বার-স্ন্যাকস। বানরটি সত্যিই খুব আন্তরিক ছিল।

এবার বানরটি পোশাক পরে এসেছে। ধূসর সুয়েট প্যান্ট আর আই লাভ নিউ ইয়র্ক লেখা লম্বা হাতার একটি শার্ট। মনে হচ্ছে কোনও বাচ্চার পুরোনো জামাকাপড়। 

ঘরে কোনও টেবিল ছিল না, তাই আমরা পাশাপাশি দেয়ালে হেলান দিয়ে কিছু পাতলা মেট্রেস ও কুশনের ওপর বসলাম। বানরটি বোতলের ছিপি খুলে দুটি গ্লাসে ঢাললো। আমরা নিঃশব্দে দুটো গ্লাসে ঠোক্কর দিয়ে পান করতে শুরু করি।

‘পানীয়র জন্য ধন্যবাদ’ বানরটি বলল। বলেই ঠান্ডা বিয়ার পান করতে থাকল। আমিও অল্প পান করলাম। সত্যি বলতে, একটি বানরের পাশে বসে বিয়ার ভাগ করে পান করছি―বেশ অদ্ভুত লাগছিল, কিন্তু বোধহয় মানুষ এক সময় এভাবে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

‘কাজের পর এভাবে বিয়ার পান করার সুযোগ হয় না’― লোমযুক্ত হাতের পিঠ দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বানরটি বলল। ‘এভাবে বিয়ার পান করার সুযোগ একটি বানরের জন্য কমই আসে।’

‘তুমি কি এ হোটেলেই থাকো ?’

‘হ্যাঁ, এখানে একটি চিলেকোঠার মতো ঘর আছে, সেখানে ওরা আমাকে ঘুমাতে দেয়। সেখানে ইঁদুরের চলাচল আছে, তাই আরাম করে ঘুমাতে পারি না। আমি তো একটা বানর, তাই ঘুমানোর জন্য যে একটা জায়গা দেওয়া হয়েছে, তাতেই আমি কৃতজ্ঞ। তাছাড়া তিন বেলা খেতেও তো পারি। এটা যে কোনও স্বর্গ নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’

বানরটি তার প্রথম গ্লাস বিয়ার শেষ করার পর আমি আরও একবার ঢেলে দিই।

‘অনেক ধন্যবাদ’ সে ভদ্রতার সঙ্গে বলল।

‘তুমি কি কেবল মানুষের সঙ্গে না অন্য বানরের সঙ্গেও থেকেছো ?’ এ প্রশ্ন করার পর আমার মনে হতে লাগল তার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু জানা যেতে পারে। 

‘অন্য বানরের সঙ্গে বহুবার থেকেছি’, সে উত্তর করল। এ সময় তার মুখে বিষণ্নতার ছায়া খেলে গেল। তার চোখের পাশের বলিরেখাগুলো গভীর ভাঁজ তৈরি করল।

“বিভিন্ন কারণে আমাকে জোরপূর্বক শিনাগাওয়া থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাকে নিয়ে দক্ষিণের এলাকা তাকাসাকিয়ামায় ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই এলাকাটি বানর পার্কের জন্য বিখ্যাত। প্রথমে ভেবেছিলাম, সেখানে শান্তিতে থাকতে পারব, কিন্তু তা আমার কপালে জুটলো না। অন্য বানরগুলো আমার খুব প্রিয় সাথীই ছিল। কিন্তু অধ্যাপক ও তাঁর স্ত্রীর কাছে, মানে মানুষের ঘরে বেড়ে ওঠায়, আমি তাদের কাছে আমার অনুভূতিগুলো ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারতাম না। আমাদের মধ্যে চিন্তার মিল ছিল খুব কম। একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন ছিল। ওরা আমাকে বলত ‘তুমি হাস্যকর কথা বলছো’। তারা আমাকে ঠাট্টা আর হয়রানি করত। মেয়ে বানরগুলো আমাকে দেখলেই খিলখিল করে হাসতো। বানরেরা সামান্যতম পার্থক্যের বিষয়েও অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমার আচরণ তাদের কাছে হাস্যকর ছিল। তারা বিরক্ত হতো। ফলে কখনও কখনও তারা আমাকে খুব জ্বালাতন করত। সেখানে থাকা আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠল। অবশেষে আমি নিজেই সেখান থেকে চলে আসি। হয়ে যাই অন্য জগতের একাকী বাসিন্দা।’

‘তুমি নিশ্চয়ই খুব একাকী হয়ে পড়েছিলে।’

‘অবশ্যই একাকী হয়ে পড়েছিলাম। কেউ আমাকে সহায়তা বা যত্ন করত না। আমি নিজের খাবারের ব্যবস্থা নিজেই করেছি। যে কোনও ভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতাম। সবেচেয়ে ভয়াবহ হলো―আমার কেউই ছিল না কথা বলার মতো। আমি বানর কিংবা মানুষ কারও সঙ্গেই কথা বলতে পারতাম না। এমন একাকিত্ব বড়ই যন্ত্রণাদায়ক। তাকাসাকিয়ামায় অনেক মানুষের ভিড় হতো, কিন্তু হঠাৎ কারও সঙ্গে দেখা হলে সরাসরি কথা বলা সহজ ছিল না। ওটা যদি করতাম তাহলে ভয়াবহ বিপদে পড়তাম। শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি দাঁড়াল যে, আমি যেন কোনও এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পড়ে রইলাম। না মনুষ্য সমাজের অংশ না বানরজগতের। যা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।’

‘এমনকি তুমি ব্রুকনারের সঙ্গীতও শুনতে পারতে না।’

‘সত্যি বলেছেন, তা এখন আর আমার জীবনের অংশ নয়’ শিনাগাওয়া বানরটি বলল। বলেই আরেকটু বিয়ার পান করল। 

আমি কাছ থেকেই তার মুখ দেখছিলাম। মুখ আগে থেকেই লাল ছিল। তবে তা যে আরও লাল হয়ে উঠেছে, তা আমার নজরে আসেনি। আমি ভেবেছিলাম এই বানরটি মদ্যপান ভালোই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অথবা হয়তো বানরের ক্ষেত্রে মুখ দেখে বোঝা যায় না তারা মদ্যপান করেছে কি না।

‘আরেকটি বিষয় আমাকে খুব কষ্ট দিত, আর তা হলো মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক।’

‘বুঝতে পেরেছি’, আমি বললাম। ‘মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক বলতে তুমি  বোঝাতে চাইছো― ?’

‘সংক্ষেপে বলতে গেলে মেয়ে বানরদের প্রতি আমি কোনও রকম যৌন আকর্ষণ অনুভব করিনি। তাদের সঙ্গে থাকার আমার অনেক সুযোগ ছিল, কিন্তু আমার তেমন কোনও ইচ্ছে হয়নি কখনও।’

‘তাহলে কোনও মেয়ে বানরও কি তোমার প্রতি আকর্ষণ বোধ করেনি, কারণ তুমিও তো একজন বানর।’

‘হ্যাঁ। ঠিক তাই। ব্যাপারটা লজ্জার। সত্যি বলতে কী, আমি কেবল মানুষ্য নারীদের প্রতিই আকর্ষণ বোধ করতাম।’

আমি চুপ করে রইলাম আর গ্লাসের বিয়ার এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম। কুড়মুড়ে স্ন্যাকসের ব্যাগটা খুলে একমুঠো তুলে নিলাম।

‘তাতে তো বেশ বড়সড় ঝামেলা হতে পারে বলে মনে হয়,’ আমি বললাম।

‘হ্যাঁ, সত্যিই বড় ধরনের সমস্যা। শেষ পর্যন্ত আমি তো বানরই। মনুষ্য নারীরা আমার আকাক্সক্ষার জবাব দেবে, এমন আশা করার কোনও উপায় ছিল না। তার ওপর, এটা জিনগত নিয়মেরও সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে।’

আমি তার আরও কথা শোনার অপেক্ষা করলাম। সে কানের পেছনটা চুলকে আবার কথা শুরু করে।

‘তাই আমার অপূর্ণ আকাক্সক্ষাগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অন্য উপায় খুঁজে নিতে হয়েছিল।’

‘অন্য উপায় বলতে তুমি কী বুঝাতে চাচ্ছো ?’

বানরটি গভীরভাবে ভ্রƒ কোঁচকালো। তার মুখ কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

‘আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না।’ বানরটি বলল। ‘সত্যি বলছি আপনার বিশ্বাস হবে না। যেসব নারীর প্রতি আমি আকৃষ্ট ছিলাম, এক সময় তাদের নাম চুরি করতে শুরু করলাম।’

‘তাদের নাম চুরি ?’

‘ঠিক তাই। জানি না কেন, আমার মনে হতো আমি সেই বিশেষ ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। ইচ্ছে হলেই কারও নাম চুরি করে নিজের করে নিতে পারি।’

তার কথা শুনে তরঙ্গের মতো অজস্র বিভ্রান্তি আমাকে আঘাত করল।

‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’ আমি বললাম। ‘তুমি বলছ মানুষের নাম চুরি করো। তার মানে যাদের নাম চুরি করো তারা কি তাদের নাম সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলে ?’

‘না। তারা পুরোপুরি তাদের নাম হারায় না। আমি তাদের নামের একটা অংশ, একটা খণ্ড চুরি করি। সেই অংশটা নিয়ে নিলে নামটা আগের চেয়ে কম দৃঢ় এবং হালকা হয়ে যায়। ঠিক যেমন সূর্য মেঘে ঢেকে গেলে মাটিতে পড়া আপনার ছায়াটা একটু ফিকে হয়ে যায় সেরকম। আর মানুষভেদে কেউ কেউ তাদের সেই ক্ষতির কথা বুঝতেও পারে না। শুধু মনে হয়, কোথাও যেন কিছু একটা ঠিক নেই।’

‘তবে কেউ কেউ হয়তো স্পষ্টতই বুঝতে পারে, তাই না ? যে তাদের নামের একটি অংশ চুরি হয়ে গেছে।’

‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। কখনও কখনও অনেকে নিজেদের নামও মনে করতে পারে না। খুবই অস্বস্তিকর, বিরক্তিকরও বটে, আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন। এমনকি তারা মনেই করতে পারে না তাদের নাম কী ছিল। এভাবে তারা নিজের পরিচয় সংকটে পতিত হয়। এর পুরো দোষই আমার। কারণ আমি তার নাম চুরি করেছি। আমি এর জন্য খুব দুঃখিত। প্রায় আমার নিজেকে অপরাধী মনে হয়। ভাবলে মাথা নিচু হয়ে আসে। আমি জানতাম ভুল করছি, কিন্তু কিছুতেই নিজেকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারিনি। আমি কোনও ধরনের অজুহাত দার করাতে চাইছি না। মস্তিষ্কের ডোপামিন যেন আমাকে বাধ্য করে এ কাজটি করার জন্য। মনে হয় ভেতর থেকে কেউ বলে ওঠে, ‘এই, এগিয়ে যাও, নাম চুরি কর’। তবে এটা এমন নয় যে বেআইনি বা অন্য কিছু।’

আমি হাত গুটিয়ে বানরটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। ‘ডোপামিন ?’ আমি মুখ খুললাম। ‘তুমি যে নামগুলো চুরি কর সেগুলো কি, যেসব নারীকে তুমি পছন্দ কর বা যাদের প্রতি যৌনাকর্ষণ বোধ করো তাদের ? আমি কি ঠিক বুঝেছি ?’

‘ঠিক তাই। আমি গড়পরতা কারও নাম চুরি করি না।’

‘কতগুলি নাম তুমি চুরি করেছো ?’

গম্ভীর মুখে বানরটি আঙুলে হিসাব কষতে থাকল। গুনতে গুনতে কী যেন বিড় বিড় করছিল। ‘মোট সাতজন। আমি সাতজন নারীর নাম চুরি করেছি। এটা কি সংখ্যায় খুব বেশি ছিল না কম ? কেই-বা বলতে পারে ?’

‘তো তুমি কীভাবে নাম চুরির কাজটি করতে ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। ‘যদি কিছু মনে না করো আমাকে বলতে পারো।’

‘এটা মূলত ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। মনোযোগের শক্তি, মানসিক শক্তি। তবে এও যথেষ্ট নয়। আমার এমন কিছু লাগে যাতে ওই নারীর নাম লেখা আছে। পরিচয়পত্র হলে সবচেয়ে ভালো হয়। হতে পারে ড্রাইভিং লাইসেন্স, ছাত্রী পরিচয়পত্র, বিমা কার্ড বা পাসপোর্টও হতে পারে। নাম থাকলেই চলবে। সে যাই হোক বাস্তব কোনও জিনিস আমার হস্তগত করতে হয়। আর তার বস্তু চুরি করা ছাড়া পাওয়ার কোনও উপায় নেই। লোকজন বাইরে থাকলে আমি তাদের ঘরে প্রবেশ করতে বেশ দক্ষ। চারদিকে খুঁজে দেখি যে কোথাও তার নাম লেখা আছে কি না। পেলেই সেটা নিয়ে আসি।’

‘তাহলে নারীর নাম লেখা সেই জিনিস আর তোমার ইচ্ছে শক্তি―এ দুটো মিলে তুমি নাম চুরি করো ?’

‘ঠিক তাই। বস্তুতে লেখা নামটির দিকে আমি একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি। আমার অনুভূতিকে একাগ্র করি। যাকে আমি ভালোবাসি তার নামটা আমি নিজের মধ্যে ধারণ করি। এমনটি করতে অনেক সময় লাগে। এ কাজটি মানসিক এবং শারীরিকভাবে বেশ ক্লান্তিকর। আমি এ প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি ডুবে যাই। আর এক সময় সেই নারীর একটা অংশ আমার অংশ হয়ে যায়। এভাবে আমার প্রেম ও আকাক্সক্ষা যা প্রকাশের উপায় ছিল না, তা পরিপূর্ণ তৃপ্তি লাভ করে।

‘তার মানে, সেখানে কোনও শারীরিক সম্পর্ক নেই ?’

বানরটি মাথা নাড়ল। বলল, ‘জানি আমি কেবল সাধারণ একটা বানর। কিন্তু আমি কখনও অশালীন কাজ করি না। আমি যে নারীর প্রেমে পড়ি, তার নামটি আমার নিজের অংশ করি―এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আমি বুঝতে পারি, কাজটা কিছুটা বিকৃত। তবে কাজটি শুদ্ধ প্লেটোনিক। আমি কেবল গোপনে সেই নামের প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করি। একটি শান্ত ঝোঁপের ওপর নরম হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো।’

আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম, ‘হুম। আমার মনে হয় তুমি এটাকেই রোমান্টিক ভালোবাসার চূড়ান্ত রূপ বলতে পারো।’

‘মানলাম। তবে এটিকে একাকিত্বেরও চরম রূপ বলা যেতে পারে। অনেকটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। এ দুটি চরম অনুভূতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাদের কখনও আলাদা করা যায় না।’

আমাদের কথোপকথন এখানে থেমে যায়। বানর আর আমি চুপি চুপি বিয়ার পান করি। সঙ্গে কাকিপি এবং শুকনো স্কুইড খাচ্ছিলাম।

‘তুমি সম্প্রতি কারও নাম চুরি করেছো ?’ আমি জানতে চাইলাম।

বানরটি মাথা নাড়ল। হাত দিয়ে নিজের শরীরের লোম টেনে ধরে যেন নিজের অস্তিত্ব বোঝার চেষ্টা করছে।

‘না, আমি সম্প্রতি কারও নাম চুরি করিনি। এ শহরে আসার পর ঠিক করি, সব ধরনের অসদাচরণ ত্যাগ করব। এতে করে এই ছোট্ট বানরটির আত্মা শান্তি পেয়েছে। আমি সাতজন নারীর নাম বুকে ধারণ করে, শান্ত এবং নীরবে জীবন যাপন করি।’

‘শুনে খুশি হলাম।’ আমি বললাম।

‘আমি জানি যা বলতে চাইছি তা আপনার কাছে স্বপ্রণোদিত বলে মনে হতে পারে, ভাবছিলাম ভালোবাসা বিষয়ে আমার নিজের মতামত জানানোর যদি সুযোগ দিতেন আমাকে।’

‘অবশ্যই’, আমি বললাম।

বানরটি কয়েকবার চোখ পিট পিট করল। তার পুতুলের মতো ভ্রƒ হাওয়ায় ঢেউ খেলে গেল। সে গভীরভাবে দীর্ঘশ্বাস নিল। অনেকটা হাই জাম্পের আগে খেলোয়াড় যেভাবে দীর্ঘশ্বাস নেয়।

‘আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসা হলো জীবন চালানোর অপরিহার্য জ্বালানি। একদিন সে ভালোবাসা শেষ হয়ে যেতে পারে। অথবা এর সঙ্গে কোনও কিছুর তুলনা নাও হতে পারে। কিন্তু ভালোবাসা ম্লান কিংবা একতরফা হয়ে গেলেও আপনি কিন্তু কারও প্রতি ভালোবাসা অনুভব করার স্মৃতি, কারও প্রেমে পড়ার স্মৃতি নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারেন। আর তা হলো জীবনের অমূল্য উষ্ণতা। সেই উষ্ণতা না থাকলে, মানুষ এবং বানরের হৃদয় মরুভূমিতে পরিণত হতো। সেটি এমন একটি স্থান যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, শান্তির বনফুল আর আশার বৃক্ষরা জন্মানোর সুযোগ পায় না। আমি হৃদয়ে সেই সাতজন নারীর নাম ধরে রাখি, যাদের আমি ভালোবাসি।’ বানরটি তার রোমশ বুকে হাত রাখে। ‘আমি ঠিক করেছি, স্মৃতিগুলোকে আমার জীবনের জ্বালানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করব। ঠান্ডা রাতগুলোকে উষ্ণ করার জন্য। যাতে বাকি জীবন নিজেকে উষ্ণ রাখতে পারি।’

বানরটি আবার হেসে উঠল এবং হালকাভাবে মাথা নাড়ল।

‘এভাবে বলা তো কিছুটা অদ্ভুত তাই না ?’ বানরটি বলল। ব্যক্তিগত জীবন। যেহেতু আমি মানুষ নই, একজন বানর হি হি।

আমরা বড় দুই বোতল বিয়ার পান করা যখন শেষ করি, তখন প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা। ‘আমার এখন যাওয়া উচিত’ বানরটি বলল। ‘আমার এতই ভালো লাগছিল যে অযথাই কতগুলো বাড়তি কথা বলালাম। মাপ করবেন।’  

‘না, আমি একটা আকর্ষণীয় গল্প শোনলাম।’ আমি বললাম। ‘যদিও আকর্ষণীয় শব্দটা বলা ঠিক হলো না। মানে একটা বানরের সঙ্গে গল্প করতে করতে ভাগ করে বিয়ার পান করা, একেবারে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো। এর সঙ্গে সত্যি হলো একটি বানর ব্রুকনারের সঙ্গীত পছন্দ করত। নারীদের নাম চুরি করত। নাম চুরির মধ্য দিয়ে তাকে যৌনাকাক্সক্ষা (হয়তো ভালোবাসা) তাড়িয়ে বেড়াত। এ গল্প শোনা ছিল আমার কাছে অবিশ্বাস্য ঘটনা। আমি কিন্তু বানরের অনুভূতিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে উসকে দিতে চাইনি। তাই এ নিরপেক্ষ ও শান্ত শব্দটি বেছে নিলাম।

বিদায় নেওয়ার সময় আমি বানরটির হাতে এক হাজার ইয়েন গুঁজে দিলাম। ‘এটা কি খুব কম হয়ে গেল ?’ আমি বললাম। ‘দয়া করে খাওয়ার জন্য তুমি ভালো কিছু কিনে নিও।’

বানরটি প্রথমে টাকা নিতে চাইছিল না। আমি জোরাজুরি করাতে নিল। সে নোটটি ভাঁজ করে ধীরে ধীরে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিল।

‘এটা আপনার দয়া’ বানরটি বলল। ‘আপনি আমার অদ্ভুত জীবনকাহিনি শুনলেন, আমাকে বিয়ার পান করালেন। আবার উদার হস্তে অর্থও দিলেন। আমি বলতে পারব না কতটুকু কৃতজ্ঞ হয়েছি।’

বানরটি ট্রেতে খালি বোতল আর গ্লাসগুলো নিয়ে চলে গেল।

পরের দিন সকালে আমি হোটেল ছেড়ে টোকিও শহরের দিকে রওয়ানা করলাম। ফ্রন্ট ডেস্কে সেই ভয়ংকর বুড়ো, যার চুল বা ভ্রƒ নেই, তাকে দেখা গেল না। নাকের সমস্যাযুক্ত সে বিড়ালটিও সেখানে ছিল না। তার পরিবর্তে সেখানে মোটা খিটখিটে মধ্যবয়সী এক মহিলা বসে আছে। গত রাতের বিয়ারের জন্য আমি অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে চাইলে, তিনি অনেকটা জোর দিয়েই বললেন, বিয়ারের জন্য আমার ওপর অতিরিক্ত কোনও বিল ধার্য করা হয়নি। বললেন, ‘আমাদের কাছে শুধুমাত্র ভেন্ডিং মেশিনের ক্যান বিয়ার আছে,’ তিনি জোর দিয়ে বললেন। ‘আমরা কখনও বোতল বিয়ার সরবরাহ করি না।’

আমি অনেকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। মনে হতে লাগল বাস্তবতা আর অবাস্তবতা এলোমেলো ভাবে একে অপরের জায়গা বদলাচ্ছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে, বানরের সঙ্গে দুটো বড় বোতলের সাপোরো বিয়ার ভাগ করে পান করেছি। আমি তার জীবনকাহিনিও শুনেছি।

আমি মধ্যবয়স্ক মহিলাটির কাছে বানরটির কথা বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু শেষে না বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। হয়তো আসলেই বানরটি কখনও ছিল না। সবই ছিল বিভ্রম। যেন গরম পানির ঝরনায় দীর্ঘ দিন ভিজে ভিজে অবশ হয়ে যাওয়া মস্তিষ্কের ফল। হয়তো আমি যা দেখেছি তা অস্বাভাবিক হলেও অনেকটা বাস্তবের মতো স্বপ্ন। আমি যদি ‘আপনাদের এখানে একজন কর্মচারী আছে, বয়স্ক বানর’―হয়তো এভাবেই বলতাম তাই না ? তাহলে পরিস্থিতি অনেকটা ঘোলাটে হয়ে যেত। মহিলাটি আমাকে পাগল ভাবত। হয়তো বানরটি ছিল কর্মচারী তালিকার বাইরে। কর বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগের ঝামেলা এড়াতে হোটেল কর্তৃপক্ষ বানরটিকে জনসমাগমে আসতে দেয় না।

ট্রেনে করে বাড়ি ফেরার পথে বানরটির বলা সব কথা আমার মস্তিষ্কে পুনরায় ধ্বনিত হচ্ছে। যতটা মনে করতে পেরেছিলাম ততটা কাজের নোটবুকে লিখে ফেললাম। টুকে রাখলাম এ জন্য যে, ভাবলাম, টোকিওতে ফিরে গিয়ে পুরো ঘটনাটা লিখে ফেলব।

বানরটি যদি সত্যিই থেকে থাকে, আমি যদি সেভাবে বিশ্বাস করি, তাহলে বানরটি বিয়ার পান করতে করতে আমাকে যা যা বলেছিল তার কতটা বিশ্বাস করা উচিত, তা নিয়ে আমি একেবারেই নিশ্চিত ছিলাম না। নিরপেক্ষভাবে তার গল্পের সত্য মিথ্যা নির্ণয় করাও সহজ ছিল না। সত্যিই কি নারীর নাম চুরি করে নিজের করা যায় ? কেবল শিনাগাওয়া বানরটিই কি এমন অনন্য ক্ষমতা পেয়েছিল ? হয়তো বানরটি ছিল বিকৃত মিথ্যেবাদী। কে জানে ? এর আগে আমি মিথ্যেবাদী বানরের কথা কখনও শুনিনি। কিন্তু বানর যদি দক্ষতার সঙ্গে তার মতো মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে, তাহলে তার অভ্যাসগত মিথ্যে বলার প্রবণতা থাকা অস্বাভাবিক নয়।

আমি কাজের অংশ হিসেবে অনেক সাক্ষাৎকার করেছি। এ বিষয়ে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছি। কে বিশ্বাসযোগ্য আর কে নয় তা বুঝতে পারি। কারও সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে, সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ও সংকেত ধরা যায়। অন্তর্দৃষ্টি ও অনুভূতি দিয়ে বোঝা যায় মানুষটি বিশ্বাসযোগ্য নাকি নয়। আমার এমনও মনে হয়নি যে শিনাগাওয়া বানরটি আমাকে যা বলেছিল তা একটা রচিত গল্প ছিল। তার চোখের ভঙ্গি ও অভিব্যক্তি, মাঝে মাঝে মনে হতো ভাবনায় ডুবে যেত―আবার থেমে থাকা, অঙ্গভঙ্গি, কথা বলতে গিয়ে যে আটকে যেত-সবকিছুই কোনওভাবেই কৃত্রিম বা জোর করে করা বলে মনে হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো তার স্বীকারোক্তি ছিল একেবারে খাঁটি। সেসব স্বীকারোক্তিতে ছিল ব্যথাতুর সততা।

শান্ত একাকী ভ্রমণ শেষ করে, আমি শহুরে ব্যস্ত জীবনে ফিরে এসেছি। কখনও আমার বড় কোনও কাজ না থাকলেও, আমি নিজেকে আগের চেয়ে বেশি ব্যস্ত হিসেবে খুঁজে পাই। আর সময়ের গতি যেন বাড়তেই থাকে। শেষ পর্যন্ত আমি কারও কাছে শিনাগাওয়া বানরের কথা বলিনি, বা তার সম্পর্কে কিছু লিখিনি। চেষ্টাও করিনি, কারণ যদি কেউ আমাকে বিশ্বাস না করে! যদি আমি প্রমাণ দিতে না পারতাম―প্রমাণ, অর্থাৎ বানরটি যে সত্যিই ছিল―তাহলে মানুষ বলত আমি আবার ‘গল্প বানাচ্ছি।’ আর যদি আমি তাকে নিয়ে গল্প লিখতাম কল্পকাহিনির মতো, তবে সেই গল্পে কোনও স্পষ্ট লক্ষ্য বা মূল ভাব থাকত না। আমি ছিলাম কল্পনাপ্রবণ। সহজেই কল্পনা করতে পারতাম। আমার সম্পাদক বিভ্রান্ত মুখভঙ্গি নিয়ে বললেন, ‘আপনি তো লেখক, তাই জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা করছি, কিন্তু এই গল্পের থিম কী হওয়া উচিত ?’

‘থিম ?’ বলতে পারি না, কোনও থিম আছে কি নেই। এটি শুধু একটি বয়স্ক বানরের গল্প।  যে মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে। গুনমা প্রিফেকচারের একটি ছোট শহরের গরম ঝরনায় অতিথিদের পিঠ ধুয়ে দেয়। ঠান্ডা বিয়ার উপভোগ করে। মনুষ্য নারীদের প্রেমে পড়ে এবং তাদের নাম চুরি করে। এর মধ্যে থিম কিংবা নৈতিক শিক্ষা কোথায় ?

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, সেই উষ্ণ ঝরনার শহরের স্মৃতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যেতে লাগল। স্মৃতি যতই স্পষ্ট হোক না কেন, তা সময়কে অতিক্রম করতে পারে না।

কিন্তু এখন, পাঁচ বছর পর সিদ্ধান্ত নিয়েছি সে সম্পর্কে লিখব সে সময় টুকিটাকি যেসব নোট নিয়েছিলাম সেগুলোর ভিত্তিতে। সবই ঘটেছে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কারণে, যা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে। যদি সে ঘটনা না ঘটতো তাহলে আমি এভাবে লিখতে বসতাম না।

আকাশাকা শহরের একটি হোটেলের কফি লাউঞ্জে কাজ সংক্রান্ত আমার একটা বৈঠক ছিল। যার সঙ্গেদেখা করতে যাচ্ছি তিনি ছিলেন ভ্রমণবিষয়ক একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক। খুব রূপবতী মহিলা। বয়স ত্রিশের কোঠায়। দীর্ঘ চুল, মনোহর ত্বক ও বড় মোহনীয় চোখ। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সম্পাদক। মহিলাটি ছিলেন অবিবাহিত। আমরা একাধিকবার একসঙ্গে কাজ করেছি। আমাদের মধ্যে বেশ ভালো বোঝাপড়া আছে।

কাজ শেষ করার পর, আমরা কিছুক্ষণ কফি পান করতে করতে আরাম করে গল্প করলাম। তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল, আর আমার দিকে ইতস্তত ভঙ্গিতে তাকালেন। আমি বললাম ফোন ধরতে। তিনি নম্বরটি দেখে নিয়ে ফোন ধরলেন। মনে হচ্ছিলো কলটি তার করা কোনও বুকিং সম্পর্কিত। সম্ভবত রেস্টুরেন্ট, হোটেল কিংবা ফ্লাইট বুকিংসংক্রান্ত হতে পারে। এমন কিছুই হবে। তিনি কিছুক্ষণ কথা বলে পকেট প্ল্যানার দেখে নিলেন। তারপর আমার দিকে আবার ইতস্তত ভঙ্গিতে তাকালেন।

‘আমি সত্যিই দুঃখিত’, বলেই এক হাতে ফোন ঢেকে, আমার দিকে মৃদু চাহনিতে তাকালেন। ‘এটা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন জানি, কিন্তু আমার নাম কী ?’

আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে আমি তার পুরো নাম বললাম। তিনি মৃদু মাথা নেড়ে ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে তার নাম বললেন। এরপর ফোন লাইন কেটে আমার কাছে আবারও ক্ষমা চাইলেন।

‘আমি সত্যি দুঃখিত, হঠাৎ করে নিজের নাম মনে করতে পারছিলাম না। আমি লজ্জিত।’

‘কোনও কোনও সময় কি এমন হয় ?’ আমি জানতে চাইলাম।

তিনি একটু দ্বিধা বোধ করে, সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। ‘হ্যাঁ আজকাল এমনটা হচ্ছে। আমি নিজের নাম নিজে মনে করতে পারি না।’

‘আপনি কি অন্যান্য জিনিসও ভুলে যান, যেমন―আপনার জন্মদিন, ফোন নাম্বার বা পিন নাম্বার ?’

তিনি দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়লেন। ‘না, একদমই না। আমার স্মৃতিশক্তি সব সময় প্রখর। আমি আমার সব বন্ধুর জন্মদিন মনে গেঁথে রেখেছি। আমি অন্যের নাম কখনও ভুলে যাই না। এমনকি একবারের জন্যও না। কিন্তু এখন, কোনও কোনও সময় আমি নিজের নাম মনে রাখতে পারি না। বুঝতে পারছি না কেন এমন হচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার স্মৃতি ফিরে আসে। কিন্তু ওই কয়েক মিনিট আমার জন্য খুব অস্বস্তিকর, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। মনে হয় আমি আর নিজের মতো নেই। আপনি কি মনে করেন এটি আলঝাইমারের প্রাথমিক লক্ষণ ?’

আমি নিঃশ্বাস নিলাম। ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে কী বলে আমি জানি না। কিন্তু কখন থেকে এই নাম ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় ?’

তিনি চোখ কুঁচকে একটু ভেবে বললেন, ‘মনে হয় প্রায় ছ মাস আগে। আমি চেরি ফুল দেখতে গিয়েছিলাম। তখনই প্রথম এমন মনে হয়েছিল।’

‘আমি এখন যে প্রশ্নটি করব, তা হয়তো আপনার কাছে অদ্ভুত শোনাবে। তখন কি আপনি কিছু হারিয়েছিলেন ? যেমন কোনও পরিচয়পত্র-ড্রাইভিং লাইলেন্স, এনআইডি কিংবা কোনও ইন্সুরেন্স কার্ড ?’

তিনি ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, আপনি ঠিক বলেছেন। আমি সে সময় ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়েছিলাম। তখন দুপুরের খাবার সময় ছিল। বিরতি নিতে আমি পার্কের একটি বেঞ্চিতে বসি। আর বেঞ্চের উপর হাতের কাছেই আমার ব্যাগটি রেখেছিলাম। আমি মেকআপ-বক্স বের করে ঠোঁটে আবার নতুন করে লিপিস্টিক লাগাচ্ছিলাম। একটু পরেই তাকিয়ে দেখি হ্যান্ডব্যাগটি নেই। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মনে হলো মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য আমি অন্যদিকে চোখ ফিরিয়েছিলাম, তার মধ্যেই ব্যাগ হাওয়া! আশেপাশে কেউ ছিল বলে মনেই হয়নি। এমনকি কোনও পায়ের শব্দও শুনিনি। চারপাশে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলাম কেউ আছে কি না। দেখলাম কেউ নেই, আমি একাই বসেছিলাম। পার্কটি ছিল একেবারে নীরব। কেউ যদি আমার ব্যাগ চুরি করতে আসত তাহলে আমি টের পেতাম।’

তার কাছ থেকে আরও শোনার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম।

‘কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা সেখানেই শেষ ছিল না। একদিন বিকেলে পুলিশ স্টেশন থেকে আমার কাছে ফোন এল। জানাল আমার হ্যান্ডব্যাগটি পাওয়া গেছে। পার্কের পাশেই একটি ছোট্ট পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে ব্যাগটি রাখা ছিল। নগদ টাকা যথাস্থানে ছিল। আমার ক্রেডিট কার্ড, এটিএম কার্ড, মোবাইল ফোন সবই একেবারে অক্ষত অবস্থায় ছিল। শুধু আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সটি পাওয়া যায়নি। পুলিশও এতে বিস্মিত হয়ে পড়েছিল। কে এমন চোর যে কোনও টাকা নেয়নি। শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্সটা নিয়ে ব্যাগটি আবার পুলিশ স্টেশনের পাশেই রেখে যায় ?’

আমি নীরবে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, কিছুই বললাম না।

‘এটা ছিল মার্চ মাসের শেষ দিকের ঘটনা। সঙ্গে সঙ্গে আমি সামেজুতে মোটর ভেহিকলস অফিসে গিয়ে নতুন একটি লাইসেন্স করিয়ে নিলাম। পুরো ঘটনা অদ্ভুত ছিল। তবে ভাগ্য ভালো এতে কোনও ধরনের ক্ষতি হয়নি।’

‘শামেজু শিনাগাওয়াতে, তাই না ?’

‘ঠিক তাই। এটি হিগাশিওই-তে। আমার কোম্পানি তাকানাওয়ায়। ট্যাক্সি নিয়ে দ্রুত চলে আসা যায়’, তিনি বললেন।

তিনি আমার দিকে একবার সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। ‘আপনি কি মনে করেন আমার নাম মনে না থাকা আর লাইসেন্স হারানোর মধ্যে কোনও যোগসূত্র আছে ?’

আমি দ্রুত মাথা নাড়ালাম। তবে এও ভাবলাম শিনাগাওয়া বানরের গল্পটা তো আমি এখানে ঠিকমতো বলতে পারব না।

আমি বললাম, ‘না, সেরকম কোনও সম্পর্ক নেই। হঠাৎ কেন জানি এমন একটি প্রশ্ন মনে এল। হয়তো আপনার ঘটনা বলেই আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল।’

তিনি আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়েছেন বলে মনে হলো না। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, বিষয়টি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে তাকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে হবে।

‘সে যাই হোক, আপনি কি পরে সেখানে কোনও বানর দেখতে পেয়েছিলেন ?’

‘বানর ? তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন সেখানে কোনও পশু ছিল কি না ?’

‘হ্যাঁ, সত্যিকারের কোনও বানর সেখানে ছিল কি না ?’

তিনি দ্রুত মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমার মনে পড়ে না কয়েক বছরেও আমি কোনও বানর দেখেছি কি না। এমনকি চিড়িয়াখানা কিংবা অন্য কোথাও।’

সিনাগাওয়া বানর কি তার পুরোনো কৌশল নিয়ে এ ঘটনাটি ঘটিয়েছিল ? নাকি অন্য কোনও বানর একই কৌশল অবলম্বন করে এ অপরাধ করেছে। কিংবা এমনও হতে পারে বানর ছাড়া অন্য কেউ একই কৌশল অবলম্বন করেছে ওই ঘটনা ঘটানোর জন্য।

আমি সত্যিই ভাবতে চাইছিলাম না যে শিনাগাওয়ার বানর আবার নাম চুরিতে ফিরে এসেছে। বানরটি তো আমাকে বলেছিল, যে সাতটি নারীর নাম তার কাছে আছে, তাতেই সে সন্তুষ্ট। সে বাকি জীবন এই উষ্ণ ঝরনার শহরে ওই সাত নারীর নাম নিয়েই কাটিয়ে দিতে পারবে। তার কথায় সিরিয়াসনেস ছিল, সে সত্যিই এমন বুঝাতে চেয়েছিল। এমনও হতে পারে, সেই বানরের কোনও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সমস্যা ছিল। এমন এক সমস্যা যা কেবল যুক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সম্ভবত তার সেই অসুস্থতা বা মানসিক বৈকল্য তাকে এমনটি করতে বাধ্য করেছিল। সম্ভবত এসব কারণেই বানরটি নিজের পুরোনো অভ্যেস নিয়ে শিনাগাওয়াতে ফেরত এসেছিল। কোনও একদিন হয়তো আমিও এমনভাবে চেষ্টা করে দেখব। নির্ঘুম রাতগুলোতে, এমনই এলোমেলো, কল্পনাবিলাসী ভাব মাঝে মাঝে আমার মনে আসে। আমি যাকে ভালোবাসি সে নারীর এনআইডি কিংবা নাম আছে এমন কোনও কিছু চুপিসারে চুরি করব। লেজারের মতো আলো ফেলে সে নাম গভীরভাবে অবলোকন করব। সে নামটি নিজের হৃদয়ে পুরে নেব। আর তার শরীরের একটি অংশকে আমার অংশ করে নেব। এমন করলে কেমন হবে ?

না, এমন কখনই হবে না। আমার হাত এ কাজ করার মতো কখনই চতুর ছিল না। তাছাড়া আমি কখনই অন্যের জিনিস চুরি করব না। এমনকি সে বস্তুর যদি শারীরিক রূপ নাও থাকে এবং সেটি চুরি করা আইনত অপরাধও যদি না হয় তারপরও এমন কাজ আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়।

সেই ঘটনার পর থেকে, যখনই আমি ব্রুকনারের কোনও সিম্ফনি শুনি, তখনই শিনাগাওয়া বানরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভাবি। আমি কল্পনা করি, বৃদ্ধ বানরটি সেই উষ্ণ ঝরনার শহরে একটি ভাঙাচোরা হোটেলের চিলেকোঠায় পাতলা তোশকের ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। আর ভাবি আমরা দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে, বিয়ারের সঙ্গে যে কাকিপি এবং শুকনো স্কুইড খেয়েছিলাম তার কথা।

তারপর থেকে আমি ট্রাভেল ম্যাগাজিনের সেই সুন্দরী সম্পাদককে কখনও দেখিনি। জানি না তার নামের ভাগ্যে পরে কী ঘটেছিল। আশা করি এতে করে তার সত্যিকারের কোনও ক্ষতি হয়নি। কারণ তিনি তো নির্দোষ ছিলেন। তার তো কোনও ভুল ছিল না। আমি এ নিয়ে নিজে নিজে দুঃখ বোধ করি। কিন্তু সাহস করে শিনাগাওয়া বানরের কথা সুন্দরী সম্পাদককে বলতে পারি না।

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button