আসপিক : মূল : তাতিয়ানা তলস্তোয়া

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা অনুবাদ : সর্বজিৎ সরকার
[তাতিয়ানা তলস্তোয়া। এই সময়ের রাশিয়ান লেখকদের মধ্যে অন্যতম। জন্ম ১৯৫১, লেনিনগ্রাদে। তাতিয়ানার কাহিনির বিন্যাসে সমকালের রাশিয়ার সাধারণ মানুষজনের দৈনন্দিন জীবন যতটা উঠে আসে ঠিক ততটাই উঠে আসে রুশ চেতন-অবচেতনের অন্তর্লীন নৃশংসতা ও উত্তরণের ভাষ্য। সমালোচকদের ভাষায় তাতিয়ানার লেখায় আমরা দেখি, ‘গোগোল, চেকভ, বুলগাকভ ও নবোকভের উত্তরাধিকার। তাঁর গল্পে একই সাথে মিশে থাকে গদ্য ও কবিতার মূর্ছনা, মূলধারায় বর্ণনার মাঝেই থাকে দ্রষ্টার জাদুকল্পনা।’ অনিতা দেশাই তাঁকে বলেন, ‘জাদুকরী’।আসপিক প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তাতিয়ানা নিজে বলেন, ‘আপনি জানতে চাইছেন আমার লেখাটা প্রতীকী কিনা, মৃত্যুর এই বর্ণনা আর রন্ধনের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধ হওয়া আমি আসলে পুনর্জন্মের কথা বলছি কিনা ? তাহলে আমি বলব, না, আমি আসলে পুনর্জন্ম নয়, রূপান্তরের কথা বলছি। মেটামরফোসিস-এর কথা। ভাবুন, মাংস জিনিসটা তো আসলে এমন কিছু যা দুটো আলাদা পৃথিবীর মধ্যে আটকে পড়েছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেও তাতে প্রাণ ছিল। হাসছিল, খেলছিল, হয়তো মজাও করছিল। আর তার পরেই একটা কিছু ঘটানো হলো। একটা খুন। একটা কুপিয়ে মারা। অবশ্যই সেখানে যন্ত্রণা, ব্যথা, ভয় সবই থাকবে। আমি বিশ্বাস করি না, মৃত্যুই শেষ কথা। কিন্তু তার ওপারে কী আছে তা আমরা জানি না। সেই ওপার কোথায় আছে তাও আমরা জানি না। আর আপনি রাঁধুনির কথা ভাবুন। যারা এই খুনের সাথে জড়িত থাকছে তাদের মধ্যে রাঁধুনিও পড়ে, তাই না। প্রথমে কেউ খুন করে। তারপর একজন কোপায়। আর তারপর আসে রাঁধুনি। এই হত্যাকাণ্ডে তার পার্ট হলো এই অপরাধের সব চিহ্ন মুছে দেওয়া। কিন্তু তার অন্য আরেকটা কাজ হলো, নবজন্ম দেওয়া। মানুষের পক্ষে তার নিজের ভেতরের এই দ্বিখণ্ডিত সত্তাকে বোঝা সত্যিই খুব কঠিন। আর সেই কারণেই তো মানুষ কাঁদে।’
ইংরেজিতে দুটো বই এখন অবধি অনুবাদ হয়েছে। একটি উপন্যাস, Slynx, অন্যটি গল্পের―White Walls]
সত্যি বলতে কি, ছোটবেলা থেকেই, আমি ওটাকে ভয় পেয়ে এসেছি। হালকাভাবে, কী একটু খেয়াল হলো, অমনি ওটা বানিয়ে ফেললাম, এটা হয় না, বরং সাধারণত ওটা রান্না করে নিউ ইয়ার ইভ-এ, একেবারে ভরা শীতে, ডিসেম্বরের সব থেকে ছোট আর নিষ্ঠুর দিনগুলোতে। অন্ধকার ওই সময়ে তাড়াতাড়ি নামে। সে সময়ে তুষার কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে; আর তুমি রাস্তার বাতিগুলোর চারপাশে দেখবে, কেমন খোঁচা খোঁচা আলোর বৃত্ত তৈরি হয়েছে। তোমার দস্তানাটার ফাঁক দিয়ে তোমাকে শ্বাস নিতে হবে। মাথা ব্যথা করবে ঠান্ডায়, আর গালদুটো দেখো, একদম অসাড় হয়ে গেছে। কিন্তু, তুমি তো জানো, এত কিছু সত্ত্বেও তোমাকে আসপিকটা সেদ্ধও করতে হবে, আবার কনকনে ঠান্ডাও করতে হবে―এই খাবারটার নাম শুনলেই তোমার অন্তরাত্মা ঠান্ডা মেরে যায়, আর তখন, এমন কি একটা মোটা খয়েরি রঙের ছাগলের লোমে তৈরি শালও তোমায় বাঁচাতে পারবে না। এই আসপিক রান্না করা, যেন একটা বিশেষ ধরনের ধর্মপালন। অবশ্যই এটা একটা বাৎসরিক আত্মাহুতি, যদিও আমরা জানি না সেটা কার কাছে বা কিসের জন্যে। আর তুমি যদি এটা না রাঁধো তাহলে যে কী হবে সেটাও একটা প্রশ্ন।
কিন্তু যাই হোক, কোনও একটা কারণে এটা বানাতেই হয়।
এবার ঠান্ডার মধ্যে তোমাকে বাজারেও যেতে হবে―এ জায়গাটা আবার সবসময়েই কেমন টিমটিমে, কখনওই কোনও উত্তাপ নেই। আরকে জারানো সবজিগুলোর পাশ দিয়ে, দুধ দই ছানার সুগন্ধি কিশোরী সরলতার পাশ কাটিয়ে, আলুর অস্ত্রাগার টপকে গিয়ে, মুলো, বাঁধাকপি, ফলের পাহাড়ের পাশ দিয়ে গিয়ে, শেষে কমলালেবুর সিগনাল লাইট পার করে―তুমি এক্কেবারে শেষ কোনাটায় গিয়ে পৌঁছবে। কসাইখানাটা ঠিক ওইখানেই; ওখানেই রক্ত আর চপার আছে। ‘কুঠারের দিব্যি, এটাই রাশিয়া’। এই যে ঠিক এইখানে, যেখানে কাঠের গুঁড়িটার ওপর তার ধারালো ফলাটা আছড়ে পড়ছে। রাশিয়া এইখানে আছে, রাশিয়া এখন একটা মাংসের টুকরো তুলে নিচ্ছে।
‘আইগর, ম্যাডামের জন্যে টেংরিটা কাটো।’ আইগর তার চপারটা তোলে : ঘ্যাঁচাক! পড়ে থাকে সাদা গরুর ঠ্যাং, হাঁটুর নিচের টুকরোটা। কেউ কেউ আবার শুধু মুখের টুকরো কেনে, ঠোঁট আর নাকের পাটা। আর যারা পর্কের ঝোল পছন্দ করে―শুয়োরের পুঁচকে খুরসমেত ঠ্যাং কেনে। ওগুলোর একটাকে হাতে ধরে দেখলে, হলুদ চামড়াটা ছুঁয়ে ফেললে, উফফ, গা শিরশির করে ওঠে―কী হবে যদি ওই ঠ্যাংটা এখন ধন্যবাদ জানাবে বলে হঠাৎ তোমারই হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে দেয় ?
ওগুলোর একটাও আসলে মৃত নয় : সেটাই আসল ধাঁধা। মৃত্যু নেই। ওদেরকে কুপিয়ে কাটা হয়েছে, টুকরো করা হয়েছে; এখন ওরা আর হেঁটে হেঁটে কোথাও চলে যেতে পারবে না, এমনকি হামাগুড়ি দিয়েও পারবে না; ওদের খুন করা হয়েছে কিন্তু ওরা মৃত নয়। ওরা জানে যে তুমি ওদের জন্যেই এসেছো।
এরপরে কিছু শুকনো আর পরিষ্কার জিনিস কেনা দরকার; পেঁয়াজ, রসুন, কিছু বিট গাজর, আর কিছু শাকপাতা। এবারে ঘরে ফেরার পালা বরফের ওপর দিয়ে―খচর মচর খচর মচর। অবশেষে বরফ ঢাকা বিল্ডিংটার দরজায় পৌঁছানো গেল। সামনের বাল্বটা আবার কে ঝেপে দিয়েছে। অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে তুমি লিফটের বাটনটা খুঁজলে; ওর লাল চোখটা এতক্ষণে জ্বলে উঠল। লিফটের রট আয়রনের খাঁচার নাড়িভুঁড়ি দেখা দিল প্রথমে, তারপর পুরো খাঁচাটা। আমাদের প্রাচীন সেন্ট পিটার্সবুর্গের সব লিফটই এমন লজঝড়ে আর ঢিলে; প্রতিটা ফ্লোর পেরোনোর সময় তারা নানারকম ক্যাঁও ম্যাঁও আওয়াজ করে আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। এদিকে বাজারের থলের ভেতর কুপিয়ে-কাটা ঠ্যাংটা এতক্ষণে তোমার হাতটাকে ক্রমশ আরও নিচের দিকে টানছে, আর দেখে মনে হচ্ছে যেন তারা এই শেষ মুহূর্তে লিফটের ভেতর ঢুকতে কিছুতেই রাজি হবে না। তারা মুচড়ে উঠে, খাঁচা ভেঙে, দৌড়ে পালাবে, সেরামিক টাইলের ওপর দিয়ে আওয়াজ করতে করতে, খটাং―খট, খটাং―খট, খটাং―খট। হয়তো সেটা ভালোর জন্যেই হবে। নাঃ! এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বাড়ি এসে ভালো করে ধুয়ে নিয়ে তুমি একটা পাত্রে ওদের ঢেলে দেবে। গ্যাসের উনুনের আগুনটা অনেকটা বাড়িয়ে দাও।
এবারে ওরা সেদ্ধ হচ্ছে, ফুঁসছে। ওপরের চামড়াটা এখন লালচে আর নোংরা হয়ে কুঁকড়ে এসেছে : যা কিছু খারাপ, যা কিছু ভারী, যা কিছু ভয়ংকর, ছিটকে উঠে, শেষ চেষ্টা করেছিল ভেঙে বেরোতে, দাপিয়েছিল আর ডেকে উঠেছিল আর্তস্বরে, বোঝেনি কিছুই, চেয়েছিল যুঝতে, আর হাঁপিয়ে উঠছিল শ্বাস নিতে সব কিছুই এখন কাদা হয়ে গেছে। সব যন্ত্রণা আর সব মৃত্যু সরে গেছে, একটা স্বাদহীন থকথকে চাদরে জমাট বেঁধেছে সবকিছু। সমাপ্ত। শান্ত, সমাহত, করুণাময়।
এবারে সময় হয়েছে এই মরা জলটাকে ফেলে দিয়ে, ঝিমিয়ে থাকা টুকরোগুলোকে কলের নিচে পরিষ্কার জলে ধুয়ে, তারপর একটা পরিষ্কার জলের গামলায় ওদের রেখে দেওয়ার। এটা মাংস এখন, একটা খাদ্য শুধু; যা কিছু ভয় দেখায় সব মুছে গেছে। প্রোপেন গ্যাসের একটা শান্ত নীল ফুল, সামান্য একটু উত্তাপ জ্বলে উঠল এবার। আস্তে আস্তে ফুটুক এখন, কম করে পাঁচ থকে ছ ঘণ্টা লাগবে আরও।
যতক্ষণ রান্না হচ্ছে, তুমি নাহয় ততক্ষণ শাকপাতা আর পেঁয়াজগুলো কাটাকুটি করে ফেল। দু ভাগে ওগুলো পাত্রে ঢালতে হবে। প্রথমে, কাইটা ঘন হবার দু ঘণ্টা আগে, আর তারপর, আবার, এক ঘণ্টা পরে। ঠিকমতো নুন মেশাতে ভুলো না যেন। যাক! এতক্ষণে তোমার খাটুনি সার্থক। যতক্ষণে পুরো রান্না শেষ হবে, ততক্ষণে মাংস সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়ে গেছে : পুরো পাত্রটা তখন এক সোনালি হ্রদ, যেখানে খুশবুদার মাংস ভেসে বেড়াচ্ছে, আর তখন কিছুই, কোনও কিছুই আর আমাদের মনে করিয়ে দেবে না আইগরের কথা।
বাচ্চারাও চলে এসেছে; পাত্রটা দেখছে, একটুও ভয় নেই চোখে। এখন ওদের স্যুপটা দেখাতে কোনও অসুবিধে নেই―কেউ কোনও কঠিন প্রশ্নও করবে না।
ঝোলটা আর একটু কষাও, মাংসটা ছিঁড়ে ফালি করো, একটা ধারালো ছুরি দিয়ে ওটাকে টুকরো কর, ঠিক যেমন করে পুরোনো দিনে করত, সেই জার-এর সময়ে, আর অন্য জার-দেরও, আর তৃতীয় জারের কালেও, মিট গ্রাইন্ডার আসার অনেক আগে, ভাসিলি দ্য ব্লাইন্ড, আর ইভান কালিতা, আর কুমানেরা, আর রুরিক, আর সিনেউস ও ট্রুভর, যাদের কি না, এখন তো এটাও জানা গেছে, কোনওদিন তাদের অস্তিত্বই ছিলই না।
থালা বাটি এসব সাজিয়ে ফেলো এবারে আর কিছুটা করে আদা থেঁতলে দিয়ে দাও প্রত্যেকটাতে। তারপর ফালি করা মাংসগুলো দাও। এবার হাতা দিয়ে কিছুটা ওই ঘন, সোনালি, জেলির মত কাই ঢেলে দাও ওর ওপরে। ব্যস! এবার সব ঠিকঠাক। তোমার কাজ শেষ; বাকি কাজটা বরফের। সাবধানে সব বাটি আর প্লেট বারান্দায় নিয়ে এস, কফিনগুলো ঢাকনা দিয়ে ঢাকো, তারপর প্লাস্টিকের মোড়কে ভাল করে মুড়ে দাও, আর তারপর অপেক্ষা করো।
কিছুটা সময়, গায়ে বেশ একটা গরম শাল জড়িয়ে, বারান্দাতেও দাঁড়াতে পারো। একটা সিগারেট খেতে পারো আর তাকিয়ে থাকতে পারো শীতের তারাদের দিকে, যদিও ওদের একটাকেও তুমি চিনতে পার না। বরং কালকের অতিথিদের কথা ভাবো, মনে রাখার চেষ্টা করো টেবিলক্লথটা ইস্তিরি করতে হবে, সজনেতে একটু কাসুন্দি লাগাতে হবে, ওয়াইনটা কিছুটা উষ্ণ রাখতেও হবে আর ভদকাটা এক্কেবারে কনকনে ঠান্ডা, কিছুটা ঠান্ডা মাখন কুড়তে হবে, বাঁধাকপিতে টক মিশিয়ে ডিশে রাখবে, আর কিছু পাঁউরুটি স্লাইস করতে হবে। তাছাড়া তোমায় চুলে শ্যাম্পু করতে হবে, ভালো ড্রেস পরতে হবে, মেক আপও করতে হবে―ফাউন্ডেশন, মাসকারা, লিপস্টিক।
আর যদি তোমার ইচ্ছে হয় বোকার মতো অঝোরে কাঁদতে তাহলে এখনই কাঁদো, যখন তোমায় কেউই দেখতে পাচ্ছে না। আকুল হয়ে কাঁদো, কোনও কিছুর জন্যে নয়, কোনও কারণে নয়, জামার হাতায় কান্না মুছতে মুছতে ফুঁপিয়ে ওঠো, কাঁদো যখন তুমি বারান্দার রেলিং-এ সিগারেটটা চিপে ধরছো আর রেলিংটা সেখানে খুঁজে না পেয়ে পুড়িয়ে ফেলছো নিজের আঙুলগুলো। কেননা এটাকে সেইখানে কী করে পৌঁছে দিতে হয় আর কোথায় বা সেইখান আছে এ কথা কেউই জানে না।
টীকা
আসপিক―রাশিয়ান খাবার। অনেকটা পুডিং-এর মতো দেখতে। কিন্তু স্বচ্ছ। প্রধানত নিউ ইয়ার ইভ-এ বানানো হয়। বিফ, পর্ক বা অনান্য মাংস দিয়েও করা যায়।
ভাসিলি দ্য ব্লাইন্ড―মস্কোর রাজপুত্র, ১৪২৫ থেকে ১৪৬২ রাজত্ব করেছেন, ইভান কালিতা―১৩২৫-১৩৪১। মস্কোর গ্রান্ড ডিউক। তাঁর শাসনকালে ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে মস্কোর গুরুত্ব ক্রমশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
কুমান―তুর্কি উপজাতি। যাযাবর। মঙ্গল সাম্রাজ্য বিস্তারের পরবর্তী সময়ে হাংগেরি, বুলগেরিয়া ও তুর্কিস্থানে শরণার্থী হয়ে বসবাস শুরু করে।
রুরিক―৮৬২-৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দ। রুরিক বংশের প্রধান পুরুষ। পূর্ব স্লাভিক উপজাতি গোষ্ঠীদের সংঘবদ্ধ করেছিলেন। আজকের বেলারুশ, ইউক্রেন, রাশিয়ার মানুষ এখনও মনে করেন তারা রুরিক বংশেরই উত্তরসূরি।
সিনেউস ও ট্রুভর―রুরিকের দুই ভাই। যদিও আধুনিক ইতিহাস মনে করে তাদের কোনও অস্তিত্বই ছিল না।
সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক



