আর্কাইভউপন্যাস

উপন্যাস : ঝিঁঝিঁপোকার জীবন : নলিনী বেরা

আচমকা আমাদের বাবা ধুলো পায়ে কোত্থেকে দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসে মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে সমূহ সর্বনাশের ইঙ্গিত করে বলে বসলেন, ‘এখানে আর এক দণ্ডও থাকাটা নিরাপদ নয়, আঁকাড়া বিপদ চারধার থেকে ধেয়ে আসছে ধাঁই ধাঁই করে। সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে এক্ষুনি পালাতে হবে। কই, ডাক তোর মাকে।’

জানি বাবার মা-অন্ত প্রাণ, তাই বলে আমি ও আমার বোন নাকফুঁড়িও তাঁর কাছে কম নই। কখনও পিঁপড়ের ডিম বা ‘কুরকুট পটম’, ডিমওয়ালা ‘ডিমাল কাঁকড়া’ কী খঙ্গা-বঙ্গা ধরে আনলে ঘরের কাছে এসে প্রায় রাস্তা থেকে বাবা হাঁক পাড়তেন, ‘কই রে নাকফুঁড়ি, কই রে নীলুয়া! ডাক তোর মাকে!’ ডাক শুনে আমরাও ঘর থেকে দৌড়ে বেরুতাম।

কখনও কখনও খলুইভরতি করে নিয়ে আসেন লাল লাল চোখ-না-ফোটা কাঁড়াল কোঁড়ল ‘চুটিয়া’ বা ইঁদুরের বাচ্চা। অবশ্য আমাদের থেকেও চোখ-না-ফোটা কাঁড়াল কোঁড়ল চুটিয়ার বাচ্চা আমাদের মায়ের খুব প্রিয়।

কাঁচা কচমচিয়ে চিবিয়ে খেতে তিনি যে কী ভালোই না বাসেন! খেতে খেতে তাঁর মুখের কষ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে আর আমরা হি হি করে হাসছি, মা-ও হাসছেন, আহা! সে কী তাঁর মা কালীর মতো হাসি!

সেই মাকে এখন খুঁজতে বেরিয়েছি। মা কোথায় আর যাবেন! যা দিনকাল―এই বড়জোর বাঁধগোড়ার জলে গেঁড়ি-গুগলি, শুশনি কি ঘোড়াকানা শাক তুলছেন।

আঁকাড়া বিপদের আঁচ আমরা ছোটরাও একটু একটু করে টের পাচ্ছিলাম। কেননা দিনেদুপুরে অযথা জমির আলে-আবডালে হঠাৎ হঠাৎ ঢিস্ ঢিস্ করে ধুলো উড়ছিল, রাত-বিরেতে জঙ্গলে গাছের ডাল ভেঙে পড়ছিল মট মট করে। অকালে ভুস ভুস করে ‘খতখানা’ থেকে বেরিয়ে আসছিল ফিনফিনে ডানাওয়ালা শালুইপোকা।

বর্ষার শালুইপোকা বালিখোলায় মুচমুচে ভেজে খেতেও ভারি সুস্বাদু। কিন্তু অসময়ের পোকামাকড় খেতে তিতকুটে লাগছে, আমরা মুখে পুরেই  ছিঃ থুঃ করে ফেলে দিচ্ছি।

দূরের পিচ রাস্তায় জঙ্গল ভেদ করে ছোটদের যাওয়াও এখন বারণ, অচেনা কারা যেন সেখানে অষ্টপ্রহর হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে! সন্ধ্যা হতে না হতেই টিপিক টিপিক করে ‘বাঘযুগনি পোকা’-র সঙ্গে জ্বলে উঠছে ঘন ঘন সত্যিকারের টিপালাইটের আলো, দু-ব্যাটারি তিন ব্যাটারি এমনকি পাঁচ ব্যাটারির টর্চ।

বেড়ে গেছে ‘রি-রি-আঁ’ পোকার ডাকও। রাত যত বাড়ে, বাড়তে থাকে একটানা ভয়ংকর রিঁ রিঁ আওয়াজ। থেকে থেকে ভদভদিয়ে গাছ থেকে, টাঁড়-টিকর থেকে উড়ে উঠছে কয়ের-কপতি টিয়া-হরিয়ালের ঝাঁক।

ঘরে দোরে রাস্তায় ঘাটে টাটকাটাটকি মরে পড়ে থাকছে ‘বাগাডুলু’ ‘পতনি’ কেঁচো-কেন্নো-ক্যাঁকলাস’, ‘ঘরঘুন্নি’।

অথচ বেশ তো, ভালোই চলছিল সম্বৎসর!

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের রুখাশুখা দিনগুলোয় ঝাঁটি কুড়োতে পাতা ছিঁড়তে জঙ্গলে যাওয়া, এর তার গায়ে ঢলতে ঢলতে হল্লা করে যাওয়া। একা নয়, দঙ্গলে মিলে যাওয়া।

জষ্টিমাস খরার মাস, জাম-জামরুলের কাল। ঢুঁড়লে আলু-তুঙা, নানাবিধ ফলমূলও পাওয়া যায়। তাছাড়া শিকার, ধামসা-মাদল-চেরপেটি বাজিয়ে―‘টি-লি-ঙ ডু-বু-ল ডু-বু-ল’। কাঁড়াল কোঁড়ল পাখির বাচ্চা, ঝিঁকর-খেড়িয়া-বরহা, ঢ্যামনা-গোই-গোধি শিকার করতে জঙ্গলে যাওয়া।

এ সময় কতই ফলপাকুড়―পিয়াল-ভুড়রু আম-জাম-বেল কচড়া-কুসুম―খাও রে! ছড়াও রে!

আষাঢ়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলেই অজস্র ‘ছাতু’―সরুবালি বড়বালি, কুড়-কুড়িয়া কাড়হান ঝালুয়া হলদে ভণ্ডা সাদা ভণ্ডা, শালপোঙড়া-পোয়াল।

পরাং তমাল কুবাই নদীতে আষাঢ়-শ্রাবণে ‘ঝোপ’ এলে শোল বোয়াল পুঁটি দাঁড়িকিনি চ্যাঙ গোড়ুই খঙ্গা বঙ্গা কাঁকড়ার অভাব হয় না।

ধানপাকা, ধানকাটার মরশুমে খেতভরতি তো ধানের ‘টুঙ’! আর আছে ধানখেতের আলের গাঢ়হায় ইঁদুর, ইঁদুরধান।

আমি আর আমার বোন ‘খুঁজে খুঁজে নারি যে পায় তাহারি’ করে খুঁজতে থাকি ধানের টুঙ আর আমার বাবা-মা খন্তা দিয়ে ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে গর্তের মুখে ধোঁয়া দেন, ধোঁয়ায় থকোবকো হয়ে বেরিয়ে আসে জোড়া-ইঁদুর।

জোড়া ইঁদুর ধরা পড়লে অতঃপর খন্তা দিয়েই খান খান করা হয় জমির আল। উদ্ধার করা হয় ইঁদুরধান আর মায়ের অতি প্রিয় সেই লাল লাল চোখ-না-ফোটা কাঁড়াল কোঁড়ল ‘চুটিয়া’ অর্থাৎ ইঁদুরছানা।

ফাগুন, চোত তো মধুর মাস। মহুল গাছে গাছে মধু, লাটাপার খাঁজে খাঁজে মধুর চাক। মহুল কুড়োনোর ধুম পড়ে যায় তল্লাট-কে-তল্লাট।

পোহাতারা উঠল কি উঠল না―তাই দেখতে ঘর-বাহির করতে করতেই রাত ভোর করে দেন আমাদের মা-কাকি-ঝিউড়ি-বউড়িরা। রাত থাকতে থাকতে আগেভাগে না গেলে যে মহুল কুড়িয়ে সাফা করে দেবে চোর-চুরনীরা!

আখের খেত আর আমাদের কোথায় ? মহুলের রস জ্বাল দিয়েই তো আমাদের গুড় করা, গুড় খাওয়া।

বনকাল্লা-বনকুঁদরী-বনকাঁকড়ো, চেঁকা-ঘলঘসি-নাহাঙা- সরন্তি-শুশনি―জঙ্গলে আনাজপাতি-শাকপাতা তো আছেই আর আছে চোত-বোশেখের ‘কেঁদ্’ পাকা, কেঁদুগাছের ফল।

যতখুশি খাও রে! দাও রে! বাকিটা ঝুড়িতে ভরে খালা খালা করে বেচতে কামহার-কুমহার-হাটুয়া পাড়ায় যাও রে! মা-কাকিমারা পাড়ায় বে-পাড়ায় যান ঝুড়িতে আঁচল চাপা দিয়ে। খদ্দেররা দেখতে চাইলে সামান্য একটু আঁচল সরিয়ে দেখান―শালপাতার খালায় ভরা গণ্ডা গণ্ডা করে সাজানো হলদে রংয়ের গোল গোল পাকা কেঁদফল।

আহা, ফল তো নয়, যেন অমৃত! বিনিময়ে চাল তো নয়, খুদ। নচেৎ দু-চার গণ্ডা পয়সা। ওই-ই ঢের।

তবু তো মন্দের ভালো এসব ছিল। ছিল, ছিল। এখন সব ছেড়ে ছুড়ে কে জানে কোথায় পালাতে হবে!

সত্যি সত্যিই বাঁধগোড়ার জলে ঘোড়াকানা শাক তুলছিলেন মা।

ঘোড়ার কানের মতো লম্বা লম্বা শাক, নীল রংয়ের ফুল। তার উপর হেথা হোথা বক বসে আছে দু-চাট্টা, যেন বা সাদা সাদা ফুল ফুটে আছে, বকফুল।

কাছে গিয়ে মাকে বললাম, ‘মা! মাগো! বাবা বলল আর এক দণ্ডও এখানে থাকাটা আমাদের পক্ষে নিরাপদ নয়, সব ছেড়ে ছুড়ে এক্ষুনি পালাতে হবে।‘

মায়ের যেন সবকিছুই জানা ছিল। একটাও কথা না বলে এতক্ষণের তোলা কোঁচড়ের সব কটা শাকপাতা জলেই ফেলে দিয়ে ঘরের দিকে দৌড়ুলেন।

আর এ সময়ই ঝিটকার জঙ্গলে অজানা অচেনা ভয়ংকর আওয়াজে ডানা ফেটিয়ে একসঙ্গে ভদভদিয়ে উড়ে উঠল অজস্র টিয়া-হরিয়াল চড়ৈ-চটি।

আমরাও দৌড়োনোর গতি বাড়িয়ে দিলাম।

হাতে আর এক মুহূর্তও সময় নেই, বাবা তাড়া দিচ্ছেন, আমরা যা হোক তা হোক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

কী-ই বা ছিল আমাদের! ওই তো একটা পাতার কুঁড়িয়া, মাটির ‘তুঁবাঘর’। মায়ের মাথায় একটা গাঁটরি, হাতে একটা কলসি। কী-ই জানি কী আছে কলসিতে।

শীতের মরশুমে ইঁদুর ধরার প্রাক্কালে দেখেছি ওই কলসিটারই মুখে খড় গুঁজে ভেতরে ঘুঁটের আগুন জ্বেলে ইঁদুরের গর্তের মুখে ধোঁয়া দিতে। খড়ের ডাঁটি বেয়ে গাবানো উসুম উসুম ধোঁয়া দিগ্ভ্রান্ত না হয়ে সোজা চলে যায় গর্ত বরাবর ইঁদুরের বাসায়।

হয়তো ভবিষ্যৎ ইঁদুর-শিকারের লক্ষ্যেই ধোঁয়া দিতে মা ওটা সঙ্গে নিয়ে চলেছেন।

বাবার কাঁধে বস্তা, হাতে খন্তা―চোয়ালের হাড় উঁচিয়ে আগে আগে হেঁটে চলেছেন। তারপরে মা, মায়ের পিছনে বোন, বোনের পিছনে আমি।

বোনের মাথায় ‘রোল’ করে বাঁধা ছেঁড়াফাটা একটা খেজুরপাতার চাটাই। এ যাত্রায় চাটাইটা নিতে বারণ করেছিলাম, বোন কথা শোনেনি। সে নাকি খোলা ‘মেঘপাতাল’-এর নিচে রাতের বেলা ওই চাটাই পেতে শুলেই কত নতুন নতুন তারা দেখতে পায়―‘রাবণ রাজার সিং-দুয়ারের তারা’ ‘সাতভায়া’ ‘দধিভারিয়া’ ‘কালপুরুষা’―

আমার হাতেও ‘টুইলা’ ও ‘সাতনলা’। ‘টুইলা’ হলো বাজাবার আর ‘সাতনলা’ হলো পাখি ধরবার যন্তর। এক এক করে সাত-সাতটা নল, সবার শেষে সরু তীরের ফলা-গোঁজা-নল।

মগডালে বসে থাকে কপতি কী গোবরা চড়ৈ কী ক্যারকেটা, হয়তো বসে বসে ঝিমোয়। তখনই লতাপাতা ডাল-আবডালের ফাঁক-ফোকর দিয়ে সন্তর্পণে চালিয়ে দিতে হয় ‘সাতনলা’।

পাখি টেরও পায় না আচম্বিতে সে কখন সাতনলার ফলায় বেঁধা হয়ে যায়! পাকা ফলের মতো থুপ করে মাটিতে পড়ে যায় নচেৎ ফলায় গাঁথা হয়ে ডানা ঝাপটায়।

এমন এমন যে অস্ত্র তাকেই বা ফেলে যাই কী করে ? হ্যাঁ, প্রিয় ‘টুইলা’-র সঙ্গে ‘সাতনলা’-টাও নিলাম।

ঘর ছাড়ার আগে আগে আমাদের ঘরে ‘কাঁটাদুয়ারি’ করতে এত বিপদের মধ্যেও বাবা কিন্তু ভুললেন না। কোত্থেকে ‘ভাবুর’ গাছের কাঁটাডাল এনে দুয়ারের মুখ কাঁটা দিয়ে আটকে দিলেন।

যাতে করে ‘ঝাঁটিয়া কুঁদরা’  ‘গিয়ান’ ‘গোমুহা’  ‘কালপুরুষা’-র মতো অপদেবতার ছায়া না পড়ে ঘরে।

ঘর ছাড়ার আগে আমার ও বোনের কান কামড়ে কী একটা ছাল কোমরে গুঁজে দিয়ে বাবা বললেন, ‘এবার নির্ভয়ে চল!’

আমরা চলতে শুরু করলাম। শুধু কি আমরা ? আমাদের গ্রামের ঘর-ঘর। ওই তো হাঁসুদের পরিবার, বড়ভদ্র-ছোটভদ্রদের লোকজন, বস্তা কাঁধে কালীপদ-বধিরাম, গাঁটরি মাথায় হারানির মা কালমণি, বেজু-কাঁদরির বাপ শরাবন।

কারুর মুখে কোনও রা নেই, কেউ কাউকে জিজ্ঞাসাও করছে না, ‘কোথায় যাচ্ছ গো ?’ জিজ্ঞাসা করলেও সঠিক উত্তর দিচ্ছে না, যাচ্ছে উত্তরে তো বলছে দক্ষিণে। কে জানে কী আছে কার মনে!

দুপা যাওয়ার পরেই অস্থির হয়ে উঠল বোন নাকফুঁড়ি। উসখুস করছে―সে নাকি তার দামি জিনিস ফেলে এসেছে।

‘কী জিনিস রে ? কী জিনিস ?

‘আরশি-কাঁকই।’

মা জানতে চাইলেন, ‘কোথায় রেখেছিলি ?’

‘ভুগড়াঘরের খাঁজে।‘

বাবা বললেন, ‘আগে নিজে বাঁচ তারপর আরশি-কাঁকই।‘

বাবার কথা শুনে ভারি কষ্ট হলো। বেশ বুঝতে পারছি বোন নাকফুঁড়ি ফনফনিয়ে বাড়ছে, তার এখন আয়নায় মুখ দেখা দরকার।

বাবাকে বললামও, ‘যাই একছুটে নিয়ে আসি ?

বাবা কড়া নিষেধ করলেন, ‘ন্না, ঘরে কাঁটাদুয়ারি হয়ে গেছে, আর এখন যেতে নেই।’

গ্রামের মানুষজন নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেক দূরের নিরাপদ গ্রামের আত্মীয়-কুটুম্বের বাড়ি চলে যাচ্ছে। যাদের আছে তারা তো একটা দিশা নিয়ে আশায় বুক বেঁধেই যাচ্ছে, যাদের কেউ কোথাও নেই, দিশাহারা, তারাও পালাচ্ছে।

যেমন আমরা।

এর-তার মুখে কত গ্রামের নামই তো শুনি―গিধিঘাটা, দলদলি, কেন্দাপাড়া, ভুলাভেদা, চিল্কিগড়, কেঁদুয়াসোল, কাদাসোল, কলাইমুড়ি, কিয়া-বনি, পিংবনি, আরও অমুক-তমুক।

যতদূর জানি এসব গ্রামে আমাদের তিনকুলের কেউ জানাচেনা আত্মীয়-কুটুম্ব একজনাও নেই। আশপাশের গ্রামে মায়ের বাপের বাড়ির, বাপের বাপের বাড়িরও সব মরে হেজে সাফা!

বড় রাস্তার দিকে কিছুদূর এসে বোন নাকফুঁড়ি আচমকা জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবা, আমরা কোথায় যাচ্ছি ?’

বাবা কোনও উত্তর দিলেন না। কিছুক্ষণ চলার পর আমিও জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি বাবা ?’

বাবা এবার বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘যেদিকে দু চোখ যায়।’

ঝাঁটিজঙ্গলের ভেতর দিয়ে সুঁড়িপথ, দু ধারে লহ লহ করছে আঁটারি গাছের ডগ। আমি আর বোন ডগ ছিঁড়ে মুখে পুরছি, চিবোচ্ছি। ঢোঁক গিলছি। কষা কষা অম্লমধুর স্বাদ। মুখের ভেতরটা জলে ভরে যাচ্ছে।

এতক্ষণ পরে মা যেন বুকের ভেতর থেকে কথা বলে উঠলেন, ‘যেখানে মেঘপাতালে দেখবি গোল হয়ে চিল ঘুরছে, ঘুরছে তো ঘুরছে, সেখানে জানবি জলের জন্য চিল কুয়া খুঁড়ছে। আমরা সেই দিশমেই যাচ্ছি রে ধন!’

মায়ের কথামতো তারপর থেকেই আমরা দু ভাইবোন মাঝেমধ্যেই আকাশের দিকে তাকাচ্ছি। আকাশও যেন সুনসান, চিল তো চিল, একটা ঢেপচু পাখিরও দেখা নেই―যে কি না অনবরত ‘ভু-ই-চু-ঙ’  ‘ভু-ই-চু-ঙ’ করে মাকুর ফিতার মতো এ-মাথা সে-মাথা উড়ে ঘুরে বেড়ায়।

বড় রাস্তা এসে গেল। খাকি পোশাকের পুলিশ সব, হাতে বন্দুক নিয়ে টহল দিচ্ছে। দেখামাত্রই আমরা খানিকটা পিছু হটে লাটাপাটার ভেতর লুকিয়ে পড়লাম।

আমাদের মা কিন্তু অকুতোভয়, বাবার হাত টেনে ধরে বললেন, ‘ডরপেল-কার মতন এখন লুকালে চলবে ? মাথা সোজা করেই হাঁটো!’

বাবার ভারি ভয়―যদি আনসাটকা সন্দেহ করে ‘জিহলখানা’-য় পুরে দেয় পুলিশ ? পুলিশ আমাদের সত্যি সত্যিই থামিয়ে দিল।

‘কোথায় যাচ্ছ ?’ জিজ্ঞাসা করল।

উত্তর না দিয়ে খালি চোখ পিট পিট করছেন বাবা, কথা আটকে গেছে তাঁর। মা এগিয়ে এসে বললেন, ‘কোথায় আর যাবেন ? ঘরে যাচ্ছি।’

‘কোথায় গিয়েছিলে ?’

মায়ের চটজলদি উত্তর, ‘কুটুমবাড়ি।‘

‘কী আছে পুটলিতে ? কলসিতে ?’

আর তর সইছিল না পুলিশদের, পোঁটলাপুঁটলি নিজেরাই খুলে ফেলল।

কলসিটা কিছুতেই হাতছাড়া করছেন না মা, ভেতরের জিনিস মুঠোয় এনে দেখাচ্ছেন, আমরাও উঁকি মেরে দেখছি, কী জিনিস দেখি! দেখি!!

শুকনো মহুল আর ছালছাড়ানো ভাজা তেঁতুলবিচি।

এতক্ষণে বুঝলাম কেন যখের ধনের মতো কলসিটা আগলে রেখেছেন মা―ওই তো আমাদের পেটের ভাত! মহুল আর তেঁতুলবিচি সেদ্ধ।

গরম জলে ফুটে ফুলে-ফেঁপে একাকার হয়ে যায় শুকনো মহুল আর ছাল-ছাড়ানো পোড়া তেঁতুলবিচি। তখন কোনটা মহুল কোনটা তেঁতুলবিচি চেনাই দায় হয়ে পড়ে। কিন্তু আমার মা জানেন বেছে বেছে সেদ্ধ তেঁতুলবিচি খেতে আমি কতটা ভালোবাসি।

পুরোটাই ঢালতে হলো। পেটের অন্ন অতটা হেলাফেলার নাকি ? রাস্তার বালি-কাঁকরে মা কিছুতেই ঢালতে রাজি হলেন না। বোনের ছেঁড়া চাটাই পেতে তবে ঢাললেন।

সব দেখেশুনে পুলিশ আমাদের ছেড়ে দিল। আর আমরাও মায়ের কথামতো কুটুমবাড়ি ছেড়ে নিজেদের ঘরের দিকে হেঁটে যেতে লাগলাম। 

বাবার মুখে কোনও কথা নেই, মা-ও চুপ। আমরা অনবরত হেঁটে চলেছি। হেঁটে চলেছি, হেঁটে চলেছি, হেঁটে চলেছি। খালি যা আমি আর নাকফুঁড়ি মাঝে মাঝেই পথের দু ধারের লতাপাতা ছিঁড়ে মুখে পুরছি, কখনও ঢোঁক গিলছি, কখনও ছিঃ থুঃ করে ফেলে দিচ্ছি।

আমরাও চুপচাপ, কথা তেমন বলছি না। আসলে কথা বলার ইচ্ছাটাই যেন মরে আসছে ধীরে ধীরে।

এভাবে আরও কতদূর যেতে হবে―সে হয়তো বাবা জানেন, কিন্তু বাবার ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছিল সেটুকুও বাবার জানা নেই।

এসময়টা ‘কচড়া’ ‘কুসুম’-এর দিন―অথচ ধারেকাছে কোথাও একটা কচড়া কি কুসুমগাছ দেখা যাচ্ছে না, এদিকে কুসুমের নামে জিভে জল এসে যাচ্ছিল।

অগত্যা মাকে বললাম, ‘চাট্টি তেঁতুল ‘মুজি’ দাও না মা, খাই!’

মা দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘চ, কোথাও একটুক বসি।‘

একটা চল্লাগাছের তলায় আমরা বসে পড়লাম, বাবা বিরক্ত হলেন, তবু আমাদের দেখাদেখি বেজার মুখ করে বসেও পড়লেন।

চল্লাগাছ ওই তো আরেকটা―এত যখন চল্লাগাছ, কাছে পিঠে নির্ঘাত গাঁ-গঞ্জ আছে। বেছে বেছে ভাজা ছাল ছাড়ানো তেঁতুলবিচি চিবোতে চিবোতে সে কথা বাবাকে বললামও।

বাবা যেন খুশি হয়ে বললেন, ‘ঠিকই ধরেছিস, ঠিকই ধরেছিস, এদিকটায় কাদাসোল বাঁদরিসোল কলাইমুড়ি আমরা ফের ট-ঙ-স ট-ঙ-স করে হাঁটতে লাগলাম।

গাঁ-গেরাম তো আছে কিন্তু লোকজন কোথায় ? একটা লোকও তো নেই! নেই, নেই। ঘরের দরজা জানলা―সব হাট করে খোলা, চৌকাঠের পাল্লাগুলো যেন এখনও ঠির্ ঠির্ করে নড়ছে, যেন এইমাত্রই ‘গিরিহা’ ঘর ছেড়ে হুট হাট বেরিয়েছে, এক্ষুনি এক্ষুনি ফিরে আসবে।

চোখে পড়ল দু-চাট্টা মুরগি টিঁ টিঁ করে চরে বেড়াচ্ছে, কয়েকটা কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়েছিল। আমাদের দেখে আড়ষ্টভাবে উঠে দাঁড়াল, তবে আমাদের কাছে দৌড়ে এল না, ওখানে দাঁড়িয়ে থেকেই ল্যাজ নাড়ছে।

কোথাও গরু ডাকল―হা-ম্বা! একটা নয়, আরও কয়েকটা। বাবা বললেন, সব ছেড়ে ছুড়ে লোকজন পালিয়েছে। গেরামটা মাহাত মহাজনদের। কতবার এ গেরামে দিতে এসেছি গরুর গাড়ির ‘আরা’ ‘ধুরিকাঠ’ ‘জুয়াল’ লাঙ্গলের ‘ঈশ’―

গ্রামের মাথায় একটা পাতকুয়া, ঘড়রিতে এখনও লাগানো আছে দড়ি-বালতি। বোন নাকফুঁড়ি আর আমি দৌড়ে গেলাম―যদি একটু জল পাওয়া যায়!

বাবা হাঁকড়ে উঠলেন, ‘খ-ব-র-দা-র!’

আমরা হাত গুটিয়ে ফিরে এলাম। বাবা কেন যে নিষেধ করলেন বুঝতে পারছি না। অথচ তেঁতুলের বিচি চিবিয়ে ‘টাকরা’ শুকিয়ে যাচ্ছে আমার।

মা বললেন, ‘হাঁটতে থাক, সামনে কত নদীনালা সায়র বাঁধগোড়া পাবি।’

সত্যি সত্যিই আমরা একটা নদী পেলাম। মরাহাজা হাড় জিরজিরে নদী, এখানে জল তো সেখানে চাপড়া চাপড়া ঘাস-পাথর। আমরা আঁজলা ভরে জল খেলাম।

‘কী নাম, বাবা ?’

বাবা বললেন, ‘জঙ্গলের ভেতর বাস অত নদীনালার নাম কি আর জানি ? শুনেছি ‘টাঙ্গাই’ কি ‘তমাল-টমাল’ হবে।’

বোন আচমকা জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবা, আরও কদ্দুর যেতে হবে ?’

উত্তর দিতে না দিতেই কাছে পিঠে কোথাও ভয়ংকর একটা শব্দ হলো, জঙ্গলের ভেতরে কি ওধারে আগুনের হলকা উঠল।

আমরা দৌড়ুতে থাকলাম―রিটপিটে দৌড়―দৌড়  দৌড়―

দৌড়ুতে দৌড়ুতে মা একজায়গায় থুপ করে আচমকা বসে পড়ে বললেন, ‘কার খাই না ধারি যে অমন পড়ি-কি-মরি দৌড়াব ?’

বোন আর আমি বুঝতে পারলাম―মা আর পারছেন না। বাবাও ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে ফেললেন, ‘আর তো সামান্যই!’

আমরাও জেনে উল্লসিত হলাম, যাক আর ক-পা হাঁটলেই আমরা তাহলে ভয়ের মুল্লুক পেরিয়ে যাব!

ফের ট-ঙ-স ট-ঙ-স হাঁটা। একই তো আবহাওয়া গাছপালা রাস্তাঘাট, বাবুই ঘাসের চাষ। বেলা প্রায় হেলে পড়েছে।

তফাতের মধ্যে এই যা―এখানে ডুবকাডুংরিতে গরু চরছে। গরুর গলায় ঠরকা বাজছে, ঠ-র-ক! ঠ-র-ক!! তবে লোকজনের এখনও দেখা নেই, গরুবাগালরাই বা কোথায় ?

দেখতে দেখতে একটা লোক সাঁক করে সাইকেল চালিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেল, তার সাইকেল ক্যারিয়ারে গাদাগুচ্ছের ডুমুরগাছের পাতা, বোধকরি ছেড়ি-ছাগলের জন্য।

লোকটা সাইকেলের ঘণ্টি বাজাতে বাজাতে গেল কিন্তু একটাও কথা বলল না আমাদের কারওর সঙ্গে। তাহলেও তবু তো অবশেষে একটা গ্রামে আসা গেল, যে গ্রামে অন্তত একটা মানুষ আছে, তার নিজস্ব কতকগুলো ছেড়ি-ছাগল আছে।

একটা নয়, অনেক মানুষেরই দেখা মিলল, আমাদের বাবাও তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয়বাড়ি খুঁজে পেলেন। আমি আর বোন পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বললামও, যাক তাহলে আমাদেরও আত্মীয় কুটুম্ব আছে!

বাবার সম্পর্কে মাসতুতো ভাই মোটামুটিভাবে দু বেলা দু মুঠো খেতে পাওয়া মানুষ। সাইকেলে চেপে ঘুরে ঘুরে কেঁদুপাতা ও বাবুইদড়ির কারবার করেন, সাইকেলের ক্যারিয়ারে এখনও বাঁধা বাবুইদড়ির বান্ডিলই তার প্রমাণ।

গলায় জোর আছে তবু যেন কথা বলছেন বাবার সঙ্গে ফিসফিস করে। মা আর বোন ততক্ষণে ঝিউড়িবউড়িদের সঙ্গে ভেতরঘরে, একলা আমি দুপা এদিক সেদিক হেঁটে বেড়িয়ে গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখছি।

তেঁতুলতলায় এক ন্যাড়ামুণ্ডি আমারই বয়সী ছেলে এসে আচমকা জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার নাম দামু, তোর ?’

আমিও নাম বললাম।

‘আমাদের গেরামের নাম চিচুরগেড়িয়া, তোদের ?’

গ্রামেরও নাম বললাম।

‘তোরা কোন পার্টি ? আমরা’―

দৌড়ে ফিরে এলাম কোনও উত্তর না দিয়ে। বাবাকে বললাম, বাবার মাসতুতো ভাইকেও।

তিনি দ্রুত তেঁতুলতলায় ঘুরে এসে হাসতে হাসতে বললেন, “ও দামু, হাবাগোবা, আধ‐পাগলা কিন্তু ভালো ‘আলি’ খেলে, যা না দু-দান ওর সঙ্গে খেলে আয়!”

‘আলি’ তার মানে কাচের নানা রংয়ের গুলি, গুলিখেলা দিয়ে আঙুলের ‘টিপ’ পরীক্ষা। ক-ত খেলেছি! তা বলে এখানে কাচের গুলি নয়, ভেলা ফলের কালো কালো বিচি।

এখন এই চারধার আঁধার করে আসা ঝুঁজকো বেলায় আর ‘আলি’ খেলতে মন গেল না। এতদিন মাঝে মধ্যে ‘কুরথি-সিজা’ খেয়েছি, কিন্তু কুরথির ডাল ? আজ আমাদের কুটুমবাড়িতে সেই কুরথির ডাল দিয়ে শুকনো ভাত খাচ্ছি।

দু-এক গ্রাস খেয়েছি কি খাইনি, দরজায় দমাদ্দম লাথি পড়ল, কে বা কারা বাবার মাসতুতো ভাইয়ের বাড়িটাই যেন ভেঙে দিচ্ছিল। আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল চালে―দাউ দাউ!

খাওয়া ফেলে কোনও মতে গাঁটরিগুঁটরি নিয়ে আমরা ফের উদ্বাস্তু হলাম, দৌড়ুলাম। শুধু কি আমরা ? বাবার দূর সম্পর্কের মাসতুতো ভাইয়ের বাড়ির লোকজনেরাও।

দৌড়ুতে দৌড়ুতে দলছুট হয়ে গেলাম আমরা। তাঁরা তো যাবেন তাঁদের আত্মীয়ের বাড়ি, দূরদূরান্তের কোনও এক নির্দিষ্ট গ্রামে কিংবা টাউনে। আমাদের আর কোনও আত্মীয়কুটুম্ব নেই, যাওয়ার জায়গাও নেই।

বাবা ফের মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে সমূহ সর্বনাশের ইঙ্গিত করে বলে বসলেন,  ‘অভাগা যেদিকে চায় সাগরের জলও শুকায়। যেদিকে দু চোখ যায় দৌড়া!’

আমরা ঝাঁ ঝাঁ রাতে সাপখোপ পোকামাকড় মাড়িয়ে দৌড়ুতে লাগলাম। আমার পদে পদে আশঙ্কা হচ্ছিল―মা না থুপ করে বসে পড়ে বলে বসেন, ‘কার খাই না ধারি যে অমন পড়ি-কি-মরি দৌড়াব ?’

আসলে আমরা কুরথির ডালভাত যা হোক করে দু-এক গ্রাস মুখে পুরলেও মা যে আমার এক খাবলও মুখে দেননি! পুরুষদের খাওয়া শেষ হলে তবেই না মেয়েদের খাওয়া শুরু হবে!

পিছনে দাউ দাউ আগুন, মাঝে মাঝে গুলির আওয়াজ। আমরা ঠিক করতে পারছি না যে-পথে গিয়েছিলাম সে-পথেই ফিরে আসছি কি ?

আমার কেবলই মনে হচ্ছিল হাবাগোবা আধপাগলা দামু কিী আঙুল উঁচিয়ে সেই তাদেরও জিজ্ঞাসা করছে―‘তোমরা কোন পার্টি ?’

যাওয়ার রাস্তায় ফিরে আসা আর তো নিরাপদ নয়, বাবা বললেন, ‘নাহ, আমরা কাঁটাপাহাড়ি সিজুয়ার দিকেই যাচ্ছি।’

কোথায় সিজুয়া, কোথায় কাঁটাপাহাড়ি আমার জানা নেই। বোন নাকফুঁড়িও অস্থির হয়ে বলে উঠল, ‘আর পারছি না বাবা! কাঁটাপাহাড়ি-ঝাঁটাপাহাড়ি থাক, ওই জঙ্গলেই চল-অ। আমার যে দমে ঘুম পাচ্ছে বাবা।’

অগত্যা আমরা বাকি রাতটুকু কাটাতে জঙ্গলে ঢুকলাম। জঙ্গল, জঙ্গল। গাছপালার আড়ালে একটা টিকরোল ভুঁই দেখে আমরা আস্তানা গাড়লাম।

মাথার উপর গাছপালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে দেখা যাচ্ছে তারাভরা ‘মেঘ-পাতাল’, এক-দু টুকরো ভাসমান ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘ। তার মধ্যেই মাঝেমাঝে একটি-দুটি তারা হারিয়ে যাচ্ছিল।

সেদিকে চোখ পড়ামাত্রই বোন নাকফুঁড়ি সিলোক বলে উঠল―

‘একটি তারা দুটি তারা

কোন তারাটি আরাঝারা।

আন্ দেখি গ’ কাঁড়বাঁশটা

বিঁধে দিব ভুরভুরাটা।’

আমরা কেউই কিছু বললাম না। চারধারে ঝোপেঝাড়ে রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা ডাকছে, ডাকছে মানে ? যেন তাদের বুক-পেট ফাটিয়ে ডাকছে।

কোত্থেকে দু-চাট্টা ধরে এনে মাটিতে গুঁজে দিল নাকফুঁড়ি। অর্ধেক মাটিতে, অর্ধেক উপরে, তার মধ্যেও শুঁড় নেড়ে নেড়ে বিরামহীন ডেকে চলেছে ‘রিঁ-রিঁ-আঁ’ পোকাগুলো রিঁ-ই-ই-ই! রিঁ-ই-ই-ই!

নাকফুঁড়ি ঘোষণা করল, ‘আজ থাক, কাল তোদের বিয়ে দেব।’

তারপর সে তার ছেঁড়া চাটাই পেতে শুয়ে শুয়ে আকাশের নতুন নতুন তারা আবিষ্কারে মেতে উঠল, মুখে তার সেই সিলোক―‘একটি তারা দুটি তারা কোন তারাটি আরাঝারা’―

বাবা খন্তা-হাতে চারপাশটা ঘুরে ভালো করে দেখে এলেন। সরসর করে শুকনো মড়মড়ে পাতার উপর বুকে ভর দিয়ে চলে যাচ্ছে রাতের ‘লতা’, হুপ হুপ করে মাঝেমধ্যেই ডেকে উঠছে বন্য নিশাচরের দল।

বনমোরগ ‘বাঙ’ দিচ্ছে দূরে কোথাও,  ট্র্যাঁ ট্র্যাঁ করে পাখি ভদকালো গাছের মগডালে।

মা কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন! এবার নাকফুঁড়িও ঘুমিয়ে পড়ল। বাবা আর আমি জেগে থেকে থেকে খন্তার খুপ খুপ আওয়াজ পাচ্ছি। একসময় সে আওয়াজও থেমে গেল, বাবা ঘুমিয়ে পড়লেন। আমিও।

ভোরের দিকে মায়ের আর্তচিৎকারে ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে দেখি খন্তা-হাতে বাবা লাটাপাটা ভেঙে দৌড়ুতে দৌড়ুতে গভীর থেকে গভীরতর জঙ্গলে ঢুকে যাচ্ছেন।

আর একমুহূর্তও দেরি না করে আমিও বাবার পিছু পিছু দৌড়ুতে শুরু করলাম।

আমাদের পরিবারের আমরা সাকুল্যে চারজন একসঙ্গে ঘর ছেড়েছিলাম, এখন আমরা তিনজন।

গতকাল রাতে কে বা কারা এসে ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে গেছে বোন নাকফুঁড়িকে। তন্ন তন্ন করে সারা জঙ্গল ঢুঁড়েও আমরা তাকে আর খুঁজে পেলাম না।

তার ফেলে যাওয়া খেজুরপাতার ছেঁড়া চাটাইটা জঙ্গলেই পড়ে থাকল, কেউ আর তার উপর শুয়ে তারাভরা রাতে ‘মেঘপাতাল’-এ ‘কালপুরুষা’ ‘দধিভারিয়া’ ‘সাত-ভায়া’-র মতো নতুন নতুন তারা খুঁজবে না।

‘রিঁ-রিঁ-আঁ’ পোকাগুলো অর্ধেক মাটিতেই পোঁতা থাকল, পোঁতাই থাকল, ঘটা করে তাদের বিয়ে দিতে নাকফুঁড়ি নামের কেউ আর থাকল না।

দুপুর গড়িয়ে আড়বেলা পর্যন্ত আমরা সেখানেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকলাম―যদি সে ফিরে আসে, যদি সে আসে!

বাবার চোখদুটো খোসা ছাড়ানো পাকা কুসুমফলের মতো লাল, একটাও কথা বলছেন না। মা থেকে থেকে কঁকিয়ে কেঁদে উঠছেন। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল বোন যেন এসেই বলবে, ‘আরও কদ্দুর যেতে হবে বাবা ?’

সব মায়া কাটিয়ে আমরা ফের রওনা দিলাম পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে। কোথায় এসেছিলাম, এখন কোনদিকে যেতে হবে―তা জানা নেই, আর তার যেন দরকারও নেই।

বাবা এগিয়ে চলেছেন, মা হাঁটতে পারছেন না, মাকে জড়িয়ে ধরে ধরে হাঁটছি।

হাঁটছি, হাঁটছি। টাঁড়-টিকড় বন-বাদাড় পেরিয়ে। দুয়েকটা গ্রাম যে চোখে পড়ছে না তা নয়, পড়ছে পড়ছে, তবে জনমানুষশূন্য, খাঁ খাঁ।

মাটির ভুগড়া, কোনওটায় বা পলিথিন শিট চাপা দেওয়া। দরজা হাট করে খোলা, নচেৎ ঝিঁজরি দেওয়া। যে কেউ দরজা না ভেঙে ঢুকতে পারে ভেতরে।

ভেতরে ঢুকে চুরিচামারি করার লোকও যেন আর অবশিষ্ট নেই। বাড়ির মাচানে ভুয়াঙ লাউ ফলেছে, কুঁদরি মাচায় কুঁদরি পেকে লাল হয়ে ঝরে পড়ছে মাটিতে, কাঁচা কুঁদরি তুলে ‘ভাতে-সেদ্ধ’ বা তরকারি করে কে আর খাবে ?

পাতকূয়ার ঘড়রিতে লটকানো দড়ি-বালতি পড়ে আছে যেমনকার তেমন। দেখেই আমার মনে পড়ে গেল বোন নাকফুঁড়ির কথা, ছুটে সেই জল খেতে যাওয়া আর বাবার নিষেধের কথা।

সেবার নিষেধ মেনে ফিরে এলেও এবার যেন জেদি মোরগের মতো ঝুঁটি ফুলিয়ে দৌড়ে গেলাম, বোনও যেন সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ুচ্ছে। কূয়ায় বালতি ধাসিয়ে জল তুলে জলও খেলাম।

বাবাও নিষেধ করলেন না, তাঁর যেন আর কিছুতেই কিছু যায় আসে না।

একটা খাল পড়ল। খালপাড়ে ডুবকাডুংরিতে গরুমোষ চরছে। কিন্তু সঙ্গে ভাঙা-ছাতা-লাঠি-ধারী সচরাচর দেখা যায় এমন কোনও গরুবাগাল কাড়াবাগালকে দেখা গেল না।

আমরা খাল পেরিয়ে মোরাম রাস্তায় উঠে এলাম। এখন ডাইনে যাবেন না বাঁয়ে যাবেন ঠিক করতে না পেরে বাবা খানিক থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে ‘আড়বেলা’-র অবস্থান দেখে ডানদিকেই হাঁটতে লাগলেন।

হাঁটছি, হাঁটছি।

কখনও মনে হচ্ছে সামনের দিক থেকে কেউ আসছে, কখনও মনে হচ্ছে কেউ পিছন পিছন আসছে।

দু ধারে জঙ্গল, তবে জঙ্গল খুব গাঢ় নয়, রাস্তার ধারে ধারে দু-দশটা বড় বড় গাছ, তার তলায় তলায় আঁটারি-চুরচু-পড়াশের ঝাঁটিজঙ্গল। কিছুদূর এগিয়ে দেখা গেল―রাস্তা কাটা!

বাবা ফের মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে সমূহ সর্বনাশের ইঙ্গিত করে বলে উঠলেন, ‘এই যা!’

আসলে ধন্দে পড়ে গেছেন তিনি―কোনদিকে কারা ? এগোলে ভালো, না পিছোলে ভালো ? আমাদের জড়িয়ে ধরে বাবা সামনের দিকেই হাঁটতে লাগলেন।

হাঁটছি, হাঁটছি।

রাস্তার উপর একটা আস্ত গাছের গুঁড়ি ফেলা। রাস্তার তেমাথা কি চৌমাথার মোড়ে মাঝেমাঝেই দেখা যায় ধানের তুষসহ হাঁড়ি ভাঙা, ডিমের খোসা, সিঁদুরগুঁড়ো, সিঁদুরটিপ।

তার মানে কেউ ‘তুকগুণ’ ‘ছাড়ান’ ‘নিমছা’ করেছে।

রাস্তা পার হতে গিয়ে আমরা মোড়টা না ডিঙিয়ে খানিকটা ঘুরপথে হেঁটে যাই। বাবাও তাই করলেন। গাছের গুঁড়িটা না ডিঙিয়ে আমরা ঘুরপথে হেঁটে ফের রাস্তায় উঠলাম।

এখন নাক বরাবর হাঁটা। হাঁটছি, হাঁটছি। কখনও মনে হচ্ছে আশপাশে কেউ নেই। সুনসান, সুনসান। পরক্ষণেই মনে হচ্ছিল কে বা কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে, হাঁটছে চলছে, লাটাপাটা তো নড়ছে সড়্ সড়্ করে। কে জানে―‘খেড়িয়া’ না ‘বরহা’!

বাবা এই সময়টায় ফের মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে সমূহ সর্বনাশের ইঙ্গিত করে বললেন, ‘চোখ কান খোলা রেখে হাঁটো!’

আমি চারপাশটা চন মন করে দেখতে দেখতে হাঁটছি, মায়ের অত দেখাদেখি নেই, বললেন, ‘ছাড়্ ত! ধর্মের রাস্তায় হাঁটছি―ডর কী ?

মায়ের ডরভয় নেই, সদ্য সন্তানহারা জননীর কাছে ডর-ভয়ের চেয়ে শোকই তো বড়। মা এখনও মাঝে মাঝেই কঁকিয়ে কেঁদে উঠছেন।

বেলা আড় হয়ে ঢলে পড়লেও হঠাৎ যেন নিভু নিভু চারধারটা জ্বলে উঠল দপ করে। তার মানে জঙ্গল শেষ হলো।

জঙ্গল শেষ হতেই দেখা গেল বেশকিছু লোকজন রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছেন প্রায় এক-দু মাইল তফাতে। হাতে তাঁদের কাঁড়-কাঁড়বাঁশ-টাঙ্গি-বল্লম-তাবলা-বুড়িয়া।

মুখে চিৎকার করে হাত-পা নেড়ে কীসব বলে চলেছেন। বাবা থমকে দাঁড়ালেন, ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘পিছনটা একবার দ্যাক্ রে নীলুয়া!’

দেখলাম বন্দুক-হাতে তাক করে খাকি আর তার উপর ছাপকা ছাপকা রংয়ের পোশাক পরা কাতারে কাতারে পুলিশ! এর মধ্যেই কোথাও একটা ভয়ংকর আওয়াজ হলো, একসঙ্গে কত যে গোলাপায়রা ডানা ফট ফটিয়ে উড়ে উঠল!

একটা, তারপর আরও একটা আওয়াজ! কা-ন-ফা-টা!

আমরা দাঁড়িয়ে পড়েছি থমকে। বাবা বোধহয় তড়পে উঠলেন রাগে, তার চোখদুটো লাল, আরও লাল হয়ে উঠল। তারপর খন্তা-হাতে কেন যে হঠাৎ দৌড়ে গেলেন সামনের দিকে এখনও বুঝতে পারছি না!

এক মুহূর্তও গেল না, মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন বাবা। মা আর আমি দৌড়ে গেলাম বাবার কাছে, বাবাকে জড়িয়ে ধরে আছি, আমাদের উপর দিয়েই ডাইনে-বাঁয়ে গুলি চালাতে চালাতে দৌড়ে গেল খাকি আর ছাপকা ছাপকা পোশাক পরা লোকগুলো।

মাটির কলসি ভেঙেচুরে রাস্তাময় ছড়িয়ে পড়ল শুকনো মহুল আর ছালছাড়ানো তেঁতুলবিচি। তার ওপর ভারী বুটের সরকারি ছাপ্পা লাগল।

এখন ওই, ওই তো বাবার দেহ, একটা ইস্কুলঘরের সামনে একটা বেঞ্চিতে শোয়ানো। তাঁর কাছে যাবার আর এখন আমাদের অধিকার নেই।

মাঝেমধ্যেই মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে সমূহ সর্বনাশের ইঙ্গিত করার জন্য আর আমাদের কেউ থাকল না। বাবা এখন পুরোপুরি ওঁদের সম্পত্তি। ‘ফটো-খিঁচা’ মেসিনে এখন  ঘন ঘন কত ছবি উঠছে বাবার!

আমরা বড় গরিব ছিলাম, গরিব হয়ে গেলাম আরও।

এর মধ্যেই পুলিশ এসে আমার হাফ-পেন্টুলের পকেট হাঁতড়েছে দু-দু বার। তল্লাশি করে দু-দুটো শুঁড় জড়ানো লোহার মতো শক্ত ‘রিঁ-রিঁ-আঁ’ পোকা পেয়েছে। কে জানে কাল রাতের বেলায় কখন পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল নাকফুঁড়ি!

‘টুইলা’ আর ‘সাতনলা’ তো ছুড়ে ফেলে এসেছি সেই ‘বহিন-খাকি’-র জঙ্গলে!

একসঙ্গে ঘর ছেড়েছিলাম আমরা চারজন। বাবাও চলে গেলেন, বোনও। মুখে গাঁজলা তুলে জ্ঞান হারিয়েছেন মা-ও।

এতক্ষণে মরে গেছেন কি বেঁচে আছেন―জানি না।

মা পড়ে আছেন রাস্তায়, ঠিক রাস্তায় নয়, রাস্তার একধারে। আমিই টেনে এনেছি এদিকে, পাছে রাস্তায় হঠাৎ হঠাৎ চলে আসা গাড়িঘোড়া―

কাঠের ধুরিওয়ালা লোহার মুখপাত বসানো দু চাকার গরুর গাড়ি তো নয়, বনের ভেতর পিচরাস্তার উপর দিয়ে গিড়্ গিড়্ করে আসতে আসতে গাড়োয়ান ঘুমিয়ে থাকলেও অবলা জীবদুটি রাস্তায় কাউকে পড়ে থাকতে দেখলে তক্ষুনি থমকে দাঁড়িয়ে যায়!

আর এখন যা অবস্থা এসব অঞ্চলে গরুর গাড়ি আসাটাই ঝকমারি, কখন কোথায় ফেঁসে যাবে কীভাবে। যা আসছে সব বুঝি মিলিটারি গাড়ি বুম বুম করে।

এই তো একটু আগে গেল একটা, এখন আরেকটা। এমনভাবে হুঁকরে আসছিল যেন তালজ্ঞান ভুলে চড়ে বসবে মায়ের উপর। আমি উপুড় হয়ে শুয়ে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলাম মাকে।

এই আমার মা, মুখে এখন বুজকুড়ির মতো গাঁজলা উঠছে ফেনা ফেনা। মায়ের মুখের দিকে চেয়ে বসে আছি আমি, মাঝেমাঝে হাতের আঙুল বুলিয়ে গাঁজলা মুছে দিচ্ছি আর বুকের উপর কান চেপে শুনছি―ধুকপুকানিটা আছে কি না।

আছে, আছে।

কেঁদ কি কুরকুট নিয়ে হাটে গিয়েছেন, জিনিস বেচে কিনে এনেছেন চাল-নুন-ডাল, সেই সঙ্গে মিষ্টি পান একটা।

পান চিবোতে চিবোতে ঠোঁট লাল করে ফেলেছেন, কোত্থেকে দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসে মায়ের দু হাঁটু জড়িয়ে ধরে, আমরা দু ভাইবোন আবদার ধরেছি, ‘দাও না গো মা পান, খেয়ে ঠোঁট লাল করি।’

মা মুখ থেকে চিবোনো পান তার জিভের ডগায় নিয়ে একবার আমার মুখের সামনে, একবার বোনের মুখের সামনে ধরে লোভ দেখাতেন, ধরতে যেই আমরা হাত বাড়াতাম, অমনি মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নিতেন সুড়ুৎ করে।

আসলে প্রথম প্রথম কৌতুক করতেন মা, অবশেষে চর্বিত পান মুখের ভেতর থেকে বের করে ভাগ করে দিতেন আমাদের মধ্যে।

তবে ওই যে, যখন লাল লাল চোখ-না-ফোটা কাঁড়াল কোঁড়ল চুটিয়ার বাচ্চা কচমচিয়ে চিবিয়ে খেতেন, ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ত রক্ত, তখন চর্বিত ভগ্নাংশ চাওয়া তো দূর অস্ত, আমরা দূরে দূরেই থাকতাম আর বলতাম, ‘তুমি কী গো মা!’

তাতেও মায়ের হিন্দোল নেই, ওই শুধু হি-হি করে মা কালীর মতো হাসি।

আমাদের জঙ্গলে একপ্রকার আলু আছে, যার নাম ‘পানআলু’। হয়তো আলুলতার পাতা দেখতে পানের মতোই, তাই পানআলু। সেই পানআলুর পাতা চুন-খয়ের সহকারে আমি আর বোন কতদিন চিবিয়ে দেখেছি―ধুর! কোথায় ছিঃ থুঃ! ঠোঁট লাল তো হলোই না, উলটে গোটামুখ বিস্বাদে ভরে গিয়েছিল। আমাদের কিত্তি দেখে মায়ের সেদিন কী মুচকি মুচকি হাসি আর গান―

‘আলুপতর কি পান হেইব।

পরদেশরে কি মন রহিব।।’

ঠোঁটের কষ বেয়ে চর্বিত পানের রস নয়, লাল লাল চোখ-না-ফোটা কাঁড়াল কোঁড়ল চুটিয়ার রক্তও না, মায়ের মুখ দিয়ে এখন সাদা সাদা বুজকুড়ির মতো গাঁজলা উঠছে।

ঢুঁড়লে এই জঙ্গলেও কি আর পানআলুর দেখা মিলবে না ? মিললেও চুন-খয়ের মিশিয়ে তার পাতা চিবোনোর আর দোসরা পাওয়া যাবে না। একা একা চিবোলেও কে আর তাই দেখে মুচকি হেসে গেয়ে উঠবে―‘আলুপতর কি পান হেইব ?’

না না। আলুর পাতা কখনও পানপাতা হবে না, বিদেশও কখনও স্বদেশ হবে না, মন ‘রহা-রহি’ তো পরের কথা!

রাস্তায় একটা লোক নেই, সুনসান। সুনসান, সুনসান। অথচ একটু আগে―ওই তো ওই, ওই যেখানে শুঁড়ে শুঁড়ে জড়াজড়ি করে আছে আঁটারি লতা, রাস্তার দু ধারে নেমে গিয়েছে মোরাম রাস্তা, হেলা-বটগাছের তলায় একটা জনশূন্য ভাঙা গুমটি―সেখানেই টাঙ্গি-বল্লম কাঁড়-কাঁড়বাঁশ তাবলা-বুড়িয়া নিয়ে কাতারে কাতারে লোক রাস্তা ঘিরে ধরে দাঁড়িয়েছিল!

ফুট ফাট ফুটুস ফাটাস! কীসব শব্দ হলো, জাঁতাকলে পড়ে বেঘোরে একটা লোক মরল, আর মুহূর্তেই সব ভোঁ-ভাঁ, নিমেষে হাওয়া!

লোক অবশ্য আছে অদূরে ইস্কুলঘরের আনাচেকানাচে, ওই যেখানে কাঠের বেঞ্চিতে শোয়ানো রয়েছে বাবার দেহ। তবে ঝলকে ঝলকে ফটো-তোলা-মেসিন তাক করে ফটো-খিঁচা-মানুষগুলো আর নেই, বেলা থাকতে থাকতে যে যারমতো সরে পড়েছে।

বেলাও পড়ে আসছে, বেলা এখন ঝিরিঝিরি। কখন খসে যাবে টুঙ করে! নিঃসাড় হয়ে আসছে বনজঙ্গল, বড় বড় গাছ, গাছতলার ঝোপঝাড়, লাটাপাটা। থেকে থেকে ওই যা দুটো-একটা ‘পাখ’ ডাক দিয়ে যাচ্ছে ঘরে-ফেরানির।

ডাক শুনলেই বোঝা যায়―সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমাদের গ্রামের বাঁধগোড়ার জলে হিলহিলে হাওয়া যখন বিলি কাটে, জলের কিনারে দুয়েকটা কুচো বক কি কাদাখোঁচা জলপিপি কি কয়ের-কপতি যখন একপায়ে দাঁড়িয়ে এক পা তুলে গলা ফুলিয়ে গলার সাদা অংশ কাঁপিয়ে ‘ক-য়ে ক-ক’ ‘ক-য়ে ক-ক’ করে ডাক দেয়, তখন বুঝি বৈকি সন্ধ্যার আর বিশেষ দেরি নেই।

আজ আবার সন্ধ্যা নামবে, রিঁ-রিঁ করে বিরামহীন ‘রিঁ-রিঁ-আঁ’ পোকা ডাকবে, রাত গাঢ় হবে, গেল রাতের মতো বোন নাকফুঁড়ি আজ তো আর ঘুমের জন্য বায়না ধরবে না, রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা ধরে এনে মাটিতে গুঁজে রেখে পরের দিন প্রত্যুষে কেউ আর বিবাহের উদ্যোগ করবে না, বাবা ঘুমন্ত, মা-ও তো ঘুমিয়েই আছেন।

আজ আবার খাবার জুটবে না। এতদিনের সঞ্চয় যা মা আঁকড়ে রেখেছিলেন ওই মাটির কলসিতে, ভাজা ও খোসা ছাড়ানো ‘তেঁতুল মুজি’ আর শুকনো মহুল দানা, তা তো ভেঙে ছত্রখান, এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাস্তায়! তার ওপর কত যে গামবুট, মোটরগাড়ি, মিলিটারি ভ্যান গেল এল! আরও কত আসবে যাবে! কত যে সরকারি শিলমোহরের ছাপ্পা পড়ল, আরও কত পড়বে!

সে যা হয় হোক, এখন কোথাও একটু জল পেলে হয়! মাথায় চোখেমুখে জলের ছিটা দিলে তবে যদি মায়ের জ্ঞান ফেরে!

জলের আশায় এদিক ওদিক তাকাচ্ছি―ধারেকাছে কোথাও কি একটা বাঁধগোড়া নেই ? জল ছিল ছিল পুকুর ? গহম বাঁধ, রিলিফ বাঁধ ? কিংবা, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে, কেঁদ-কুসুমের গাছতলা দিয়ে, জইড়তল-বড়তল পেরিয়ে বহন্তি কোনও খাল ? এমনকি মরাহাজা কোনও নালা ?

জঙ্গলে পাতা ছিঁড়তে ঝাঁটি কুড়োতে গিয়ে ঠা-ঠা খরায় গলা ‘শঁসালে’ জল না পাই, আমরা আঁটারি লতার ডগ, শালের ডগাল চিবোই।

এখন আমি না হয়―কিন্তু মা ? অথচ এই মানুষটাই আমাদের তেষ্টা পেলে অথবা জলের কথা উঠলে একদা বলতেন, ‘যেখানে দেখবি গোল হয়ে চিল ঘুরছে, ঘুরছে তো ঘুরছে, সেখানে জানবি জলের জন্য চিল কুয়া খুঁড়ছে। সেখানে গেলে জল পাবিই পাবি।’

মায়ের কথামতো বড় বড় গাছের মাথার ফাঁকফোকর দিয়ে মেঘপাতালের দিকে চোখ তুলে দেখছি―যদি ঘুরঘুর ঘুরন্তি চিলের ঘুরে ঘুরে কোনও কুয়া খোঁড়ার হাল-হদিস খুঁজে পাই!

  কিন্তু হায়! বেলা আড় হয়ে যে অস্তাচলে ঢলে পড়ছে তার মায়ের কোলে, এখন আর চিল কোথায় ? সব তো কুয়া খুঁড়তে খুঁড়তে ‘থকে’ গিয়ে নেমে পড়েছে খালেবিলে, নদীধারের বট পাকুড়ে!

ইস্কুলবাড়ি যখন, ধারেকাছে কোথাও একটা-দুটো গ্রাম আছেই আছে। গ্রামে মানুষজন না থাকে না-ই থাক, কুয়ো তো আছে, আছে কুয়োয় ধাসাবার দড়ি-বালটিন―

বাবার আর বাধা কোথায় ? ‘আয় নাকফুঁড়ি আয়’! মাকে ফেলে রেখেই যাব ভাবছি জল আনতে, জল আনার পাত্র না পাই গলায় জড়ানো গামছাটাই ভিজিয়ে চবচবে করে আনব।

উঠে দাঁড়ালাম―তাহলে যাই ? যাচ্ছি! পরক্ষণেই মনে হলো, না, ন্না। আমার অনুপস্থিতিতে কেউ বা কারা যদি এসে ফের তুলে নিয়ে যায় মাকে ? তখন ? তারবেলা ?

ছেড়ে যেতেও ভয়, ছেড়ে যেতেও মায়া! অথচ একটু জল না হলে যে―

একটা ‘গ্যাজর’, তারমানে লাল তেলতেলে বুনো বিছা, ওই, ওই তো রাস্তার ওপার থেকে ছুটে আসছে এপারে, ঠিক মায়ের দিকেই! অঙ্গভঙ্গি ঠিক সাপের মতোই, মাঝেমাঝে ফণা তোলার ন্যায় সামনের শুঁড়দুটি উপরে তুলছে।

হাতে অস্ত্রও নেই যে গ্যাজরটাকে মেরে ফেলব, বাপের হাতের ‘খন্তা’-ও তো বাজেয়াপ্ত। অগত্যা গ্যাজরের যাত্রাপথ থেকে মাকে বগলদাবা করে কিছুটা সরিয়ে আনলাম। গ্যাজর স সরসর করে সরে যাচ্ছে তার মতোই।

গ্যাজরের জায়গায় এবার একটা বিষধর সাপও তো আসতে পারে ? হ্যাঁ, আসতে পারে বৈকি। আংকুড়া বাংকুড়া ‘লতা’―সবাই তো জঙ্গলেরই জীব।

যদিও জঙ্গল ছাড়িয়ে আমরা এখন জঙ্গলের শেষ মাথায়, তবু তাদের বিচরণে বাধা কোথায় ? সাপনিধনের লাঠি বানাতে ডকাগাছের একটা আস্ত ডালকে ভেঙে ফেললাম মড় মড় করে। আর এ সময়ই দূরে-অদূরে কতকগুলো কুকুর ডেকে উঠল একসঙ্গে!

ইস্কুলঘরের সামনে টহলদারি মিলিটারি পুলিশ শূন্যে ক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ল। একজন তো দৌড়ে এল আমাদের কাছে! আবার কি হাফ-পেন্টুলের পকেটে, অস্থানে-কুস্থানে তাঁরা হাতড়াতে শুরু করবে ?

তার আগেই আমি আমার হাফ-পেন্টুলের ‘পাকিট’-এ হাত রাখলাম। বোন নাকফুঁড়ির গুঁজে দেওয়া ‘রিঁ-রিঁ-আঁ’ পোকাদুটি আছে তো ঠিক ?

ফেলেই দিয়েছিল পুলিশটা পকেট হাঁতড়ে, আমি আবার কুড়িয়ে জড়ো করে গামছার সুতো দিয়ে বেঁধে রেখেছি। আহা, কী শক্ত পোকাদুটির শিংজোড়া! একদম যেন লোহার তারের পারা!

‘কৌন হো তুম ?’

লম্বা বন্দুক-হাতে পুলিশ লোকটা জিজ্ঞাসা করল। ভাবলাম বলি, “ওই যে ইস্কুলঘরের সামনে বেঞ্চিতে শুয়ে লোকটা, যাঁর এতক্ষণ ছবি তোলা হচ্ছিল ফটাফট, যাঁকে তোমরা হয়তো বুদ্ধি করেই বলে বেড়াচ্ছ বেওয়ারিশ ‘লাশ’―ওই আমার বাবা। আর গুলি খেয়ে লোকটা মারা গেলে তাঁর মৃত্যুতে সেই থেকে অজ্ঞান হয়ে মুখে গাঁজলা তুলে পড়ে আছেন যে―তিনিই আমার মা।”

কিন্তু মুখে কিছু বললাম না। কারণ মায়ের মুখেই শুনেছি―‘সবু পরব ত আসে ভালা ঘুরি-ন-ঘুরি যে বাবু হো, মানুষ মরলে নাহি আওয়ে।’

কিংবা, ‘আঙটি-ভাঙা পিতল-ভাঙা  স-বই জুড়া যায়, মানুষ মরিলে দিদি নাই গ জুড়া যায়।’

তার মানে, এ বছরের পূজা-পরব পরের বছর ঠিকই ঘুরে আসে, কিন্তু মানুষ একবার মরে গেলে সে আর ফিরে আসে না। ভাঙা আংটি ভাঙা পিতলকাঁসা সবই মেরামত করা যায়। তা বলে মরা মানুষকে মেরামতি করে ফের বাঁচিয়ে তোলা যায় না।

ইস্কুলঘরের সামনে বেঞ্চিতে বরাবরের জন্য যে শুয়ে আছে, তাকে তো আর জাগানো যাবে না। সে আর ‘বাবা’ নয়, সে এখন মড়া, মুর্দা। কাঁহাতক তাকে ‘বাবা’ পরিচয় দিয়ে হুট মুট উটকো বিপদে পড়া!

তাই চুপ থাকলাম।

‘হিঁয়া ক্যায়া করতা ?’

দেখতেই তো পাচ্ছ! ফের চুপ।

মিলিটারি লোকটা নিচু হয়ে মাকে ঘাঁটাঘাঁটি করে বলল, ‘বিমারি হ্যায় ক্যায়া ?’

তাও চুপ। তার ভাষা হয়তো বুঝতে পারছি না বলে অন্য কাউকে ডেকে আনতে চলে যাচ্ছিল সে। আর থাকতে না পেরে দৌড়ে গিয়ে তার পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কেঁদে কঁকিয়ে উঠে বললাম, ‘মায়ের জন্য একটুক জল দাও না গো!’

এবারে আমার ভাষা ওই হয়তো বুঝল না, পা ছাড়িয়ে চলে গেল সদম্ভে। একটু বাদেই এল আরেকজন।

একটু বাদেই কী আর, ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গেছে। রিঁ-রিঁ-আঁ পোকাও ডাকতে শুরু করেছে। পাশের জঙ্গলে মাঝে মাঝেই পাখ-পাখালি ভদকাচ্ছে।

তাহলে, গত রাতের মতো আরেকটা রাত আসছে! মায়ের অবস্থা যে-কে-সেই। অদূরে ইস্কুলঘরের সামনে কাঠের বেঞ্চিতে শোয়া বাবার অবস্থাও যেমনকার তেমন।

‘আছা ভালা’ কী করবে ওরা বাবার রোগা-প্যাটকা দেহটা নিয়ে ? পয়সা খরচ করে পোড়াবে ? না, গাড়হা করে পুঁতে দেবে মাটিতে ?

ধুর! অত কী আর করবে! হয়তো রাতের অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দেবে জঙ্গলে, শিয়াল-শকুনে টানাটানি করে খাবে, কে আর দেখছে! কে কার বাবা, কে কার স্বামী―বেওয়ারিশ মড়া ছাড়া বা কী!

একসঙ্গে অনেকগুলো হ্যাজাক ধরানো হলো ইস্কুলঘরে। মিলিটারি পুলিশদের একজন তো এ-লাইট সে-লাইটের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে খালি বাতাস দিচ্ছে। এখান থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

ইস্কুলঘরের ভেতর টেবিলের চারধারে বসে ওরা কীসব খাচ্ছে! দেখাদেখি খিদে পেল আমারও।

সে তো পাবেই, সেই কবে কুরথি ডালের সঙ্গে একমুঠো ভাত খাওয়া। তাও তো আধ-খাওয়া!

মা এখন ক্ষুধা-তেষ্টার বাইরে, আমি তাঁর বুকের উপর ফের কান পেতে শুনছি -ধুকপুকানিটা আছে কি না।

‘ধুক পুক  ধুক পুক’―আছে। ‘ধুক পুক  ধুক পুক’―আছে, আছে!

আমি পরম নিশ্চিন্তে মায়ের পাশটিতে শুয়ে এখন ভাবছি―সেই আমাদের গ্রামের উত্তরে মাঝুডুবকার জঙ্গলের ভেতরে ঝাঁটিবুদা কেটে তৈরি করা ডাহি জমিনে সেবার কুরথির বীজ বুনেছিল যুধিষ্ঠির কুমহার, সবুজ শুঁড় তোলা কুরথি লতিতে ক্ষেত ভরে গিয়েছিল কানায় কানায়, এমনকি ক্ষেতের চারধারে আলের উপর দিয়ে হাঁটতে চলতে কুরথি লতির শুঁড় এসে দু পায়ে জড়িয়ে যায়।

অগত্যা পায়ে মাড়িয়ে দুমড়াতে মুচড়াতেই যেতে হয়। কারণ ওই তো আমাদের গ্রামে যাবার একমাত্র রাস্তা!

ক্ষয়ক্ষতির বহর দেখে আমাকে ডেকে ঝানু চাষি যুধিষ্ঠিরই বলেছিল, ‘বাবু রে, পাহারা দে! তোকে দু-মান কুরথির ডাল খাওয়াব!’

রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে কড়া পাহারাও দিয়েছিলাম আমি, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে দু-মান কুরথির ডাল দিয়েছিল মাকে।

দু-মান অর্থাৎ দু-কুনকে বা দু-টোপা। ক্ষেতের কাঁচা ফলও খেয়েছিলাম খুব-দুধ ভরে আসা কাঁচা কুরথিরও যে কী স্বাদ! ক্ষুধা-তেষ্টা দুই-ই একসঙ্গে মিটে যায়।

কুরথি ডালের দুধ ভরে আসা কাঁচা দানাশস্যে এখন ক্ষুধা ও তেষ্টা মেটানোর স্বপ্ন দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বন্দুকের বাঁটের গুঁতো খেয়ে ঘুমটা ভেঙে গেল চট করে।

মায়ের বুকের কাছে উবু হয়ে বসে দু-হাঁটুতে থুতনি গুঁজে জুলু জুলু চোখে চেয়ে থাকলাম পুলিশটির দিকে। আমার ও মায়ের শরীরে টর্চের আলো ফেলে হিন্দিতে নয়, আমাদের ভাষাতেই বলল, ‘ওঠ!’

বলামাত্রই আমি উঠে দাঁড়ালাম। লোকটাও তৎক্ষণাৎ আমার হাফ-পেন্টুলের পকেট হাঁতড়ে বের করে আনল সেই গামছার সুতোয় বাঁধা রিঁ-রিঁ-আঁ পোকার বান্ডিলটা। জিজ্ঞাসা করল, ‘এসব কী ?’

বলব না বলব না করেও বলে ফেললাম, ‘রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা।‘

পুলিশটা গর্জন করে উঠল, ‘হো-য়া-ট ? রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা―তার মানে ?’

শহরবাজারের মানুষরা হয়তো রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা চেনে না, চেনে না―এখন কী করে তাকে রিঁ-রিঁ-আঁ পোকার মানে বুঝাব ভাবছি।

কোনও কিছু বিষাক্ত পোকা ভেবে তার আগেই জিনিসটা মাটিতে ফেলে দিয়েছিল লোকটা। অবশ্য খুব দূরেও না, আমার পায়ের কাছেই।

জ্বলন্ত টিপা-লাইটের আলোয় চটজলদি কুড়িয়ে এনে ফের পকেটে পুরলাম। আর কী আশ্চর্য! এ সময়ই কি না গাবগুবি গাছের ঝোপেঝাড়ে একসঙ্গে হাজারটা রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা পোঁদ ফেড়ে ডেকে উঠল ‘রিঁ-ই-ই-ই রিঁ-ই-ই-ই’ করে!

উৎফুল্ল হয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, ‘বাবু গ, ঔই ওই ডাকছে পোঁদ ফেড়ে রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা! আনব ধরে ? মিলিয়ে দেখবেন ?’

ফের গর্জন করে উঠল লোকটা, ‘চো-ও-প! ও তো ঝিঁঝিঁ পোকা।’

মাথা নামিয়ে দু হাতের আঙুল মটকাতে মটকাতে বললাম, ‘তাহলে তাই, আমরা তো বলি।’

পুলিশটা বলল, ‘ফের পকেটে পুরলি যে ? এ দিয়ে কী করবি ?’

বললাম, ‘অষুধ।’

‘কার ?’

মাকে দেখিয়ে বললাম, ‘আমার মায়ের।’

মায়ের কথায় একটু যেন নরম হলো লোকটা। জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে তোর মায়ের ? কই, ডাক তোর মাকে!’

‘কই, ডাক তোর মাকে’ ‘কই, ডাক তোর মাকে’―মুহূর্তে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল মাথাটা। ঠিক একদিন আগে এইরকমই একটা কথায় আমরা ঘর ছেড়েছিলাম।

আমাদের বাবা ধুলো পায়ে কোত্থেকে প্রায় দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসে মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে সমূহ সর্বনাশের ইঙ্গিত করে বলে বসেছিলেন, ‘এখানে আর এক দণ্ডও থাকাটা নিরাপদ নয়, আঁকাড়া বিপদ চারধার থেকে ধেয়ে আসছে ধাঁই ধাঁই করে। সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে এক্ষুনি পালাতে হবে। কই, ডাক তোর মাকে!’

বললাম, ‘মায়ের হুঁশ নেই। ডাকলেও আর উঠছে না!’

শশব্যস্ত হয়ে ঝুঁকে পড়ে মায়ের নাড়ি দেখল লোকটা। আঁতকে উঠে বলল, ‘আরে তাই তো!’

ততক্ষণে আরও চার-পাঁচজন মিলিটারি পুলিশ―পূর্ব-পশ্চিম উত্তর-দক্ষিণ―চারদিকেই বন্দুক তাক করে মহড়া দিতে দিতে আমাদের কাছে এসে গেল।

তাদের মধ্যে একজন বলল, ‘মতলব, উঁহাপে যো মুর্দা আদমি, ইহলোগ উসিকা লেড়কা অউর জেনানা আছে ?’

কে জানে কী বলল! আমি তো ফেঁসে যাবার আশঙ্কায় ও মায়ের সেই―‘সবু পরব ভালা ঘুরি ঘুরি আওয়ে মানুষ মরলে নাহি আওয়ে’―গানের ধুয়ো ধরে মাথা নাড়লাম, না না।

 বাঙালি পুলিশটা জিজ্ঞাসা করল, ‘তবে আসছিস কোত্থেকে ? যাচ্ছিসই বা কোথায় ?’

এখানেও সেই মায়ের বুলি, ‘গিয়েছিলাম কুটুমবাড়ি যাচ্ছি নিজেদের বাড়ি।’

 কিন্তু নিজেদের বাড়ি বলে কোন গ্রামের নাম করব ? তেমন নিরাপদ গ্রামনামও তো আমার জানা নেই। চটজলদি মুখে এসে গেল বাবার মাসতুতো ভাইয়ের গ্রামনামটা।

বললাম, ‘যাচ্ছি চিচুরগেড়িয়া।’

সঙ্গে সঙ্গে একাধিক গলায় আওয়াজ উঠল, ‘উরি ব্বাস! খতরনাক জায়গা। উধর আভি আভি মৎ যা না!’

তখনও আমাদের ফেলে রেখেই চলে গেল পুলিশগুলো।

ফের ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মা তো ঘুমোচ্ছেনই। আসলে না ঘুমিয়ে আমাদেরই বা উপায় কি ? অবশেষে, রাত তখন কত হবে কে জানে, বেদম আওয়াজ করে একটা গাড়ি এসে থামল।

 মাকে ওরা ধরাধরি করে গাড়িতে তুললও। মায়ের পিছু পিছু গিয়ে গাড়ির ভেতরে উঁকি মেরে দেখছি―বাবাও সাদা কাপড়ে দড়িতে বাঁধাছাঁদা হয়ে শুয়ে রয়েছেন। মাকেও তাঁর পাশাপাশি রাখা হলো।

বাইরে মাটিতে তখনও আমি দাঁড়িয়ে, গাড়ি ছেড়ে দিল হুট বলতে! চলন্ত গাড়ির পিছনে কাঁদতে কাঁদতে পড়ি-কি-মরি দৌড়ুচ্ছি আর পুলিশ বাবারা হো হো করে হাসছে।

ভুখা পেটে প্রায় আধ ক্রোশটাক দৌড়েছি, গাড়িটা থামল। ডালা খুলে আমাকেও তুলল। ও, তাহলে এতক্ষণ!

গাড়ির ভেতর ধাতস্থ হয়ে দেখলাম―না, সবকটা কাঠ-কাঠ মুখ, কেউ একটা কথাও বলছে না। বাবার ঢাকা  মায়ের আ-ঢাকা মুখ দেখে যাচ্ছি, দেখতে দেখতে ভাবছি―এরা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ?  ‘জিহলখানা’-য় ?

‘জিহলখানা’ বা জেলখানাকে বাবার বড্ড ভয় ছিল, মা কিন্তু অকুতোভয়। একসময় তেড়িয়া হয়ে জিজ্ঞাসা করে বসলাম, ‘আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ? জিহলখানায় ?’

কাঠ-কাঠ গুরুগম্ভীর মুখগুলো হেসে ফেলে উত্তর দিল, ‘না, হাসপাতালখানায়।’

বুঝতে পারছি, রাতের অন্ধকারে মিলিটারি পুলিশের গাড়িটা ঘনজঙ্গল ও ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে। কে জানে কোথাকার জঙ্গল!

মাঝে মাঝে গাড়ির আওয়াজকে ছাপিয়েও জঙ্গলের ভেতর থেকে আচমকা একটা-দুটো অচেনা আওয়াজ উঠে আসছে, অনেকটা হনুমানের ডাকের মতো, ‘হু-উ-প-!’

হনুমানও হতে পারে আর নয়তো জঙ্গলের ভেতরে কেউ কাউকে নাম ধরে ডাকছে। গাড়ির ছুটন্ত গতিতে সে ডাক কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে, ঠিক বুঝে ওঠা কঠিন।

এক ঝটকায় মনে পড়ে গেল বোন নাকফুঁড়ির মুখটা! এতক্ষণে ছাড়া পেয়ে সে-ই হয়তো ঠোঁট বিদুর করে কাঁদছে, আর কখনও ‘মা’ কখনও ‘বাপু’ বলে উচ্চৈঃস্বরে ডাকছে। ‘নী-ই-লু-উ’ ‘নীলুয়া রে-এ-এ-এ’ বলে কি আর ডাকছে না ?

ডাকছে, ডাকছে।

বন্দুকধারী মিলিটারি পুলিশগুলোর নিরেট মুখের উপর চোখ বুলিয়ে হাঁটুতে রাখা আড়াআড়ি হাতের ভাঁজে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চাপা গোঙানির মতো ডুকরে কেঁদে উঠলাম।

চোখের লোর কি আর হাতের ‘আড়’ মানে ? কাঁদছি অঝোরঝর, অঝোরঝর, কিন্তু তারা কেউ ভ্রƒক্ষেপও করছে না।

আমরা একসঙ্গে ঘর ছেড়েছিলাম চারজন। বাবা গেলেন, বোনও। মুখে গাঁজলা তুলে জ্ঞান হারিয়েছেন মা। এখন ওই তো, একজন মরা একজন না-মরা মানুষ পাশাপাশি শুয়ে!

মাঝেমধ্যেই গাড়িটা ঘোঁচ করে আটকে যাচ্ছিল, যতবারই আটকাচ্ছে ততবারই খালি মনে হচ্ছিল―এই বুঝি তারা পিঠে সপাটে বুটের লাথি মেরে আমাকে না ফেলে দেয়!

কিন্তু না, গাড়ি থামছিল অন্য কারণে। কখনও বিষধর ‘লতা’ ব্যাঙ কি পাখির কাঁড়াল কোঁড়ল বাচ্চা খেয়ে নধর গতরে লদোপদো করে রাস্তা পার হচ্ছিল ধীরে-সুস্থে, কখন বা ভুঁড়াশিয়াল অতি দ্রুত গতিতে।

গাড়ির জানলার ফাঁক-ফোকর দিয়ে একটা-দুটো গাছের ডাল হঠাৎ হঠাৎ ঢুকে আসছিল গাড়ির ভেতর। কুড়চি কি আঁটারি, পড়াশ ঝাঁটির ডাল―যেন কতকালের চেনা, চেনা-চেনা মানুষ।

হাত ধরে গালের উপর চেপে রাখছি। চেপে রাখা কি যায় ? সে তো হাত ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে সরসর করে!

শিরশিরানি হাওয়া ঠোঁটে লেগে ঠোঁট কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। বুঝতে পারছি―শীত আসছে! শীত আসছে!

বুঝতে পারছি―আর কিছুদিন বাদেই শীতের ‘জাড়’-এ আমার ঠোঁট ফাটবে, ঠোঁট ফেটে ‘মামড়ি’ উঠবে। মামড়ি-ওঠা ফাটা-ঠোঁটে ঝাল তরকারি কি খাসি মাংসের ‘জ্যুস’ খেতে গেলে―আহা রে কী কষ্ট! কী কষ্ট!

খালে, বুড়বুড়ি ঝরনায়, নদীতে নাইতে গিয়ে বালিতে, আর নয়তো হাঁসা-পাথরে ঘষে ঘষে ফাটা ঠোঁটের মামড়ি ছাড়াব।

মামড়ি ছাড়ানো ফাটা ঠোঁটের ফাটায় ফাটায় রক্ত। রক্ত মুছে তার উপর মা কাঠি দিয়ে বড় আদর করে লাগিয়ে দেবেন কুড়চি গাছের ‘ক্ষীর’, গাঢ় দুধের মতো। ঠোঁট ফাটা কদিনেই ঠোঁট ছেড়ে ‘বাপ’ ‘বাপ’ বলে পালাবে!

আর মা তো বেঁচেই আছেন। এই তো একটু আগে ইস্কুলের জঙ্গলের ধারে রাস্তায় পড়ে থাকা মায়ের বুকে কান চেপে ধরে―তার ধুকপুকানি টের পেয়েছি। এখনও কি উঠে গিয়ে আরেকবার কান চেপে ধরে দেখব ?

না, তার আর দরকার কী ? ওরা তো বলেইছে, নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালখানায়। সেখানে বড় বড় ‘ডাগতর’ আছে, বিনা পৈসার অষুধ আছে, চোখ-না-ফোটা লাল লাল কাঁড়াল কোঁড়ল চুটিয়ার বাচ্চা না থাক, ভাতটা রে দুধটা রে―সব নামিদামি খাবার আছে। মা আমার দুদিনেই ‘টেনকে’ উঠবেন।

মা না হয় বেঁচে আছেন, তাই হাসপাতালখানায় ডাগতরের কাছে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু বাবা ? তবে কি বাবাও বেঁচে আছেন―ধুলো পায়ে কোত্থেকে প্রায় দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসে মাথার উপর হাত ঘুরিয়ে সমূহ সর্বনাশের ইঙ্গিত করা সেই লোকটা ?

ওরা ঘুমোচ্ছে, হাতে ধরা বন্দুকের উপর ঠেস দিয়ে। কেউ কেউ গাড়ির গদিতে ঠেস দিয়ে ঝাঁকুনি খেতে খেতে আরামসে। ঘুম নেই একফোঁটা আমার চোখে। রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা ডাকছে―রিঁ-ই-ই-ই  রিঁ-ই-ই-ই!

যেন ‘নাইকুণ্ডুল’-এর মূলও নাড়িয়ে দিচ্ছে, কী ‘পোঁদ-ফাটা’ ডাক! আমার বিরক্ত লাগছে। একে গাড়ির ডাক, একটা তো নয় সামনে আরও দু-দুটো, তার উপর অতিরিক্ত রিঁ-রিঁ-আঁ পোকার ডাক।

রিঁ-ই-ই-ই-রিঁ!

একটু ফাঁকা, জঙ্গল যেন পাতলা হয়ে আসছে। এইমাত্র চলে গেল একটা ‘বাবোই’ ঘাসের ক্ষেত। বাবোই ঘাসের ক্ষেত যখন গেল, ধারেকাছে তখন নিশ্চয়ই মাহাতোদের গ্রাম আছে, আছেই।

মাহাতোরাই তো বেশি বেশি বাবোই ঘাসের চাষ করে, আর হাত মসকে মসকে রাস্তার ধারে বাবোইয়ের দড়ি পাকায় তাদের ঘরের বুড়োবুড়িরা, তাদের বেটাবেটিরা।

গাড়ি আরেকটু গড়াতেই ঝোপঝাড় লাটাবুদার ভেতর দিয়ে দেখা গেল রাস্তার ধারে ধারে পোঁতা খুঁটির মাথায় বিজলি বাতি জ্বলছে। বিজলির আলোয় এক ঝটকায় একটা গাঁ-গেরস্তি, একটা-দুটো টালির বাড়ি, টিনের বাড়ি, এমনকি পাকা বাড়ি দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে।

কে জানে এখন কত রাত, আজ ক ঘড়ির ‘জন’, এখনও তো বিজলীর আলোটুকু বাদ দিলে জঙ্গলের গায়ে-মাথায় কালো কালো হাঁড়ির পারা অন্ধকার! ‘জন’ না থাকলেও একটা ‘মরা’ আলো থাকে, আজ সেটুকুরও বড় অভাব!

গাঁ যখন, নিশ্চয়ই মানুষজনও আছে, ঘুমোচ্ছে, নাকি আমাদের গ্রামের মতোই ‘গাঁ-উজাড়’ করে সবাই ভাগল-বা ?

আমাদের সঙ্গেই তো ঘর ছেড়েছিলেন হাঁসুরা, বড়ভদ্র ছোটভদ্ররা, হারানির মা কালামণি, কালীপদ-বধিরামরা, কাঁদরুর বাপ শরাবনরা।

কে যে কোথায় ‘কুটুমবাড়ি’ যাবার নাম করে ‘গাপ’ হয়ে গেল রাস্তায়! কী করছে এখন মন্মথর বেটা পাড়রু, গুরভার বেটা চৈতন, আর চিনিবাসের বেটা বিনন্দ ?

পাড়রু, চৈতন, বিনন্দ আর আমি―মাঠেঘাটে ডুবকাডুংরিতে সাপকাটি-চিহড়-বান্দীর জঙ্গলে ‘কাঁড়-কাঁড়বাঁশ’ ‘টুইলা-সাতনলা’ নিয়ে কোথায় কোথায় না ‘ঢুণ্ডে’ বেড়াতাম!

পালাতে গিয়ে তারাও কি আমাদের মতো হাতেনাতে ধরা পড়েছে ? তাদেরও বাপেরা কি আমার বাপের মতোই আনসাটকা গুলি খেয়ে মারা পড়েছে ?

কাঠবেঞ্চিতে শুইয়ে রেখে তাদের বাপেদেরও কি অমনি ধারার ফটাফট ফটো খিঁচা হয়েছে ? তাদের মায়েরাও কি আমার মায়ের মতোই জ্ঞান হারিয়ে মুখ থেকে বুজ বুজ করে গ্যাঁজলা তুলেছে ?

এখনও মরে নাই, যে কোনও সময় টাটকাটাটকি মারা পড়বে ?

সেবার তিন বন্ধুতে ফুটবল খেলতে গিয়েছিলাম এমনি একটা মাহাতোদের গ্রামে, ‘শুগনিবাসা’-য়। আমি ছিলাম ‘গোল-কিপার’।

গোলে ও পক্ষ এত বেশি বেশি করে বল ঠেলছিল যে, বল ধরতে ধরতে আমার দু-হাঁটুর ছাল গেল ‘ছড়ে’! রক্ত বইছিল দর দর করে।

চারধারে রুগড়ি ভরা টাঁড়-টিকর, মাঝের ডুংরিতে বলখেলা, বল খেলার মাঠেও রুগড়ি রগ রগ করছে, তবে মাঝে মাঝে ‘জুরগুঁড়া’―ওই যাকে ‘বাবুঘরের’ ছা-ছানারা বলে ‘চোরকাঁটা’।

কিন্তু ‘পেনাল্টি-এলাকা’-র ভেতর জুরগুঁড়ার একটা ঝাড়ও ছিল না যে, হাঁটু মুড়ে বল ধরতে ‘সুসার’ হবে।

আচমকা আমার রক্ত-ঝরা হাঁটু দেখে দর্শকদের মধ্যে থেকে দু-দুটো ‘উরুমাল’ নিয়ে দৌড়ে এল এক মাহাতো ‘বিটি’―মাহাতোদের এক সুন্দরী তরুণী কন্যা!

আমার দু হাঁটুতে পটাপট দু-দুটো উরুমাল বেঁধে দিয়ে দু-গালে ফটাফট দু-দুটো ‘কিস’ খেয়ে আনন্দে-উত্তেজনায় পাগল হয়ে বলতে বলতে গিয়েছিল―‘হিপ হিপ হুর রে!’

সেবার সাত-সাতটা ‘সিওর’ গোল বাঁচিয়ে আমরাই তিন গোলে জিতেছিলাম কি না! পাঁড়রু হাফ-ব্যাক থেকে দৌড়ে এসে আমার কানে কানে বলে গেল, ‘তোর কী ভাগ্য রে নীলু!’

আজও তুই এসে দেখে যা পাঁড়রু, আমার কী ভাগ্য! আমি গাড়ি চড়েছি। যে সে গাড়ি তো নয়, মিলিটারিদের গাড়ি।

ভোটের সময়ে গাঁয়ে আসা ভোটবাবুদের গাড়ি নয় যে, গাড়ির ধুলাধূসর গায়ে হাত দিলেও ডেরাইভার খেঁকিয়ে বলে উঠবেন, “খোকা, হাত দিসনে, ‘হরেন’ খারাপ হয়ে যাবে।”

 কিংবা, ‘টায়ার পাঙচার হবে।‘

 শুধু মাঝে মাঝে, এঁরা আমাকে গাড়ি থামিয়ে ঠেলে ফেলে দ্যান রাস্তায়, রাস্তায় আমাকে ফেলে তাঁরা তাঁদের গাড়ি অল্পবিস্তর চালিয়ে দ্যান জোরে, জোরে। পড়ি-কি-মরি ছুটতে ছুটতে আমিও গাড়ির পিছন-পিছন ধাওয়া করি, হায়! হায়! আমার মা-বাবা যে রয়ে গেলেন গাড়িতে ?

 রঙ্গ-তামাশাই। রঙ্গ-তামাশা সেরে তাঁরা ফের আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে নেন ডেকে। তবু, তবু আশঙ্কা একটাই, খেলা খেলতে খেলতে, খেলার মহড়া দিতে দিতে, কখন যে মিলিটারি পুলিশের গাড়িটা আমাকে বাড়তি ‘আবর্জনা’ ভেবে খেলাচ্ছলে ফেলে রেখেই ছুট দেবে, আর কখনও থামবে না।

অথবা, দুই গাড়ির মাঝখানে ফেলে লোকগুলো উপর্যুপরি গুলি ছুড়ে আমাকে ঝাঁঝরা করে দেবে, যেমনটা করেছে আমার বাবাকে!

কিছু কিছু কুকুর আছে, ছুটন্ত গাড়ি দেখলেই ‘ভুক্ ভুক্’ করে, শুধু ‘ভুক ভুক’ করা নয়, কোনও কোনও কুকুর ছুটন্ত গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতেও থাকে, শুধু ছোটা তো নয়, কখনও কখনও গাড়িকে ছাপিয়েও তার গতিবেগ বেশি হয়ে যায়।

 সে তখন টাল সামলাতে সামান্য এগিয়ে যায়। পরক্ষণেই পিছিয়ে আসে, এসেই ড্রাইভারের দরজা বরাবর, যাত্রীদের দরজা বরাবর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বিকট চিৎকার করে তাকে, তাদেরকে কামড়াতে চায়, আঁচড়াতে যায়।

 রাস্তার নেড়িকুকুর যেমন তেমন, জঙ্গলের জঙ্গলি ‘আদড়া’ কুকুর হলে তো কথাই নেই, আঁচড়ে কামড়ে একশা করবে, টুঁটি কামড়ে ধরবে।

 হয়তো মাহাতো গ্রামের কোনও একটা কুকুর, আর নয়তো জঙ্গলের জীব―আচমকা দৌড়ে এসে ‘ভুক ভুক ভু-উ-উ-উ’ করে, মনে হলো, গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে লাগল।

 চিৎকার বাড়ল বৈ কমলই। হঠাৎই একটা গুলির আওয়াজ!

 কুকুরটা যেন শূন্যে লাফ দিয়ে ‘ভু-উ-উ-উঙ-ঞ-চ’ চিৎকার করে উঠে আছড়ে পড়ল মাটিতে, আওয়াজটাও একেবারে থেমে গেল।

 আমাদের গাড়ির ঘুমন্ত মিলিটারি লোকগুলো ঘুমে প্রায় এর-তার গায়ে ঢলে পড়ছিল, গুলির আওয়াজে আচমকা জেগে উঠে গুলির কারণ জেনে নিয়ে হাসল, ‘অঃ ইসি লিয়ে ?’

 বলেই ফের চোখ বোজার আগে কটমট করে তাকাল আমার দিকে, যেন এটা আবার কোত্থেকে এল ?

 কেউ কেউ বিড়ি-সিগারেট মুখে দিয়ে দাঁতে চেপে প্যান্টের পকেটে ধুলো ঝাড়ার মতো থাপ্পড় মেরে মাচিস বের করে বিড়ি-সিগারেট ধরাল। তারপর হুস হাস টেনে ধোঁয়ার রিং বানিয়ে আমারই মুখের দিকে পাঠিয়ে মুচকি হাসল।

 তার-মধ্যে আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করল, ‘ক্যায়া ? নিঁদ আতা নেহি ? লেট যাও বস! আভি ভি আসপিটাল করিব দূর বা!’

আমি সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমোবার ভান করে চোখ বুজলাম।

ওরা ঘুমিয়ে পড়ল। আমি ধীরে ধীরে চোখ খুলে পিট পিট করে তাকাচ্ছি―ওই তো মা, ওই তো বাবা!

দুজনেই সাদা থান-কাপড়ে মোড়া, অবশ্য মায়েরটা গলা অবধি। তার মানে মা এখনও বেঁচে আছেন। কিন্তু বাবারটা মুখ-কান ঢাকা, বাঁধাছাঁদা।

এমনটা দেখেছিলাম ওই যখন আমাদের গ্রামের তিলোচাঁদকে সাপকাটির জঙ্গলে বাঘ না বাঘারুলে কামড়ে গলার টুঁটি প্রায় ছিঁড়ে ফেলেছিল!

গ্রামের লোকেরা তাঁকে ধরাধরি করে দড়ির খাটিয়ায় শুইয়ে গলায় তিলো-চাঁদের বউয়ের পুরাতন শাড়ি পেঁচিয়ে কাঁধে তুলে দোলাতে দোলাতে নিয়ে গিয়েছিল সাপ-ধরা ‘হেলথ সেন্টার’-এ।

দু দিন তিন দিন ছিলেন, তাও বাঁচানো গেল না। তাঁকে যখন গ্রামের লোকেরাই ফের খাটিয়া করে নিয়ে এল, তখন তাঁর সারা অঙ্গ, এমনকি কান, মাথা, মাথার চুলও নতুন থান-কাপড়ে মোড়া ছিল, গলার কাছেও কাপড়ের একটা প্যাঁচ ছিল।

বাবার সঙ্গে তাঁর সাদা থানকাপড়ের একটু উনিশ-বিশ আছে। কেননা, বাবার গলায় কাপড়ের কোনও গেরো নেই। এমনি এমনিই কপাল অব্দি বিছানো, এমনকি মাথার চুলগুলো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে!

তবে কি বাবা আমার এখনও বেঁচে আছেন ? ‘হে-ই বড়ামথান! হে-ই বাবা কালুয়াষাঁড়! বাঁচিয়ে দে তুই রোগাভোগা বাসটাকে, মা-টারও হুঁশ ফিরিয়ে দে! দে বাবা, দে!’

ওরা ঘুমোচ্ছে, ঘুমোচ্ছে হ্যাঙলার মতো হাঁ-করে, যেন কতকাল ঘুমোতে পায়নি। বনেবাদাড়ে লাটায়পাটায় কখনও বন্দুক ঘাড়ে, কখনও বন্দুক তাক করে হাঁটা।

হাঁটা, হাঁটা। কখনও পায়ে এসে জড়ায় চিহড় চুরচু ‘হাতিবাঁধি’-র লৎ, কখনও খরিস চন্দ্রবোড়া শিয়রচাঁদা রাতভিতের ‘লতা’।

জড়াতে জড়াতে ছাড়াতে ছাড়াতে হাঁটতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে ঘুম কী আর আসে ? এলেও ঘুমের ‘ডগ’-টা মুচড়ে ভেঙে দিতে হয়।

এখন গাড়িতে চড়ে বেশ দুলতে দুলতে যাওয়া, হাঁটা তো নয়, না-ঘুমের-ক্ষতি ঘুমিয়ে যতটা পারা যায় পূরণ করা।

ওরা ঘুমোচ্ছে, হাতে-ধরা বন্দুকের উপর ঠেস দিয়ে, কেউ কেউ নাক ডাকাচ্ছে ‘ঘ-ড়-র-র-র-ঞশ্চু’ করে।

মাঝে মাঝেই বন্দুকে রাখা হাতের মুঠিটা কারওর কারওর আলগা হয়ে যাচ্ছে, বন্দুকটা পড়ে যাচ্ছে দেখে ঘুমের ঘোরেই ফের যেন আঁকড়ে ধরছে, আরও জোরসে।

কিন্তু সে আর কতক্ষণ! হাতের মুঠো থেকে একটা বন্দুক খসে পড়ল ঠিক আমার নাকের ডগায়, বন্দুকের মাথার ‘ছুরি’-টা ঠক করে লাগল আমার কপালের মাঝখানে!

আমি জাপটে বন্দুকটা হাত-মুঠোয় ধরে অবিকল তাঁদের মতোই বসে থাকলাম। খালি গা, কোমরে বাঁধা গামছা, মরা রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা পকেটে, হাফ-পেন্টুলের বন্দুকধারী ‘পল্টন’।

কিন্তু সে আর কতক্ষণ! যার বন্দুক সে তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে হাত থেকে কেড়ে নিল বন্দুকটা। ‘রীতিমতো পজিশন’ নিয়ে আমার বুকের কাছে যন্তরটা ঠেকিয়ে তার সে কী কায়দা! কী আস্ফালন!

অন্যেরা জেগে উঠে রগড় দেখে বলল, ‘চল রহা ক্যায়া ?’

আস্ফালনকারী বন্দুকবাজ হেসে উত্তর দিল, ‘এ লেড়কা মেরা রাইফেল হাইজ্যাক কিয়া’ কেউ যেন বলল, ‘মাও বা ? কিতনা উমর ?’

তারাই দেখেশুনে সাব্যস্ত করল, ‘করীব আঠার-উনিশ সাল তো হোগাই।’

তাদের কথা বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারছিলাম না, বুঝার কথাও নয় আমার! যদিও আমার ঠিক বয়স এখন ষোল।

অবশেষে তারা গাড়ি থামাল। মিলেজুলে সবাই বলল, ‘উও লেড়কা লোগকো ফিন উতার দেও।’

আবার আমাকে নামিয়ে দিল ওরা। অবশ্য তারাও আমার সঙ্গে সঙ্গে নামল। রাস্তার ধারে একজন বন্দুক উঁচিয়ে তাক করে দাঁড়াল, আরেকজন তার বন্দুকটা কাঁধে ঝুলিয়ে ‘পিসাব’ করল ছর ছর করে।

একজনের পালা শেষ হলে আরেকজন।

আমার ক্ষুধাতেষ্টা নেই, সব মরে গিয়েছে কখন! তবু তো ‘পিসাব’ পায়। রাস্তার এধার-ওধার নয়, মাঝখানে দাঁড়িয়েই আমি হুড়্ হুড়্ করে পিসাব করলাম, করছিও।

আর ওরা হো হো করে হাসতে হাসতে গাড়িতে উঠে গাড়ি ছেড়ে দিল! সেই বলে না―‘কার ঘরে ডিঁগা ডিঁগা, কার ঘরে ডাল মুরগা। কেরকেটা পড়েছে ফাঁদে, মাছ-রাঙা ডাঙায় কাঁদে ?’

আমার মা মর-মর, বাপ মরে গিয়েছে, বোন হারিয়ে গেছে―আমি মরছি শোকে। আর ওরা মজা মারছে। পেচ্ছাপ করতে করতেই গাড়ির পিছন পিছন দৌড়ুচ্ছি।

এতক্ষণে চাঁদ উঠেছে। কে জানে আজ ক ঘড়ির ‘জন্’, ক ঘণ্টা পরে চাঁদ উঠেছে ? বনেজঙ্গলে ‘জন’-এর ওঠাওঠি দেখেই তো রাতের বেলা সময়ের হিসাব হয়। পূর্ণিমার পরের দিন উদয়ের এক ঘণ্টা পরে চাঁদ ওঠে, তাই ‘একঘড়ির জন’।

এই কদিন তো সব হিসাব তালগোল পাকিয়ে গেছে। নচেৎ মা আঙুলের ‘কড়’ গুনে গুনে ‘জন’-এর হিসাব রাখেন। ঘরের দেয়ালে রেখ কেটে কেটে অমাবস্যা-পূর্ণিমা দিন-ক্ষণ মাস-বছরের অঙ্ক কষেন।

আহ মা, মাগো!

জঙ্গল এখানে পাতলা, আঁটারি লতার শুঁড়গুলি, ডগগুলি নড়ছে, চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পেচ্ছাপের জলে রাস্তায় আঁকিবুকি কাটতে কাটতে দৌড়ুচ্ছিলাম, গাড়ির গতিবেগও ততটা প্রবল ছিল না, বরঞ্চ কমে আসছিল ক্রমশ।

আমার ধারণা, আগের বারের মতোই ওরা আমাকে ফের গাড়িতে তুলবে, কিছুতেই ফেলে যাবে না, আমাকে নিয়ে তারা টুকচার রগড় করছে, এই যা।

 জঙ্গলের ওদিকে কোথাও অসময়ে একটা মোরগ ডাকল। তার মানে ধারেকাছে একটা লোকালয় আছে, আবার পরক্ষণেই মনে হলো―‘বন-খুকড়া’-ও হতে পারে।

 আর ঠিক এসময়ই আমার ভয় ধরল―যে কোনও মুহূর্তে ওরা আমাকে গুলি করবে, গুলিতে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে আমার ‘ধুকপুকি’-টা!

একবার আমাদের গ্রামের ধারে ঝিটকার জঙ্গলে বাবার সঙ্গে বন্দোবস্ত করে ‘খেড়িয়া’ শিকারে এসেছিলেন পুলিশে কাজ করা ডাইনটিকরির খাঁদুকর্তা। সঙ্গে একটা দোনলা বন্দুক আর দু দুটো পাঁচ ব্যাটারির ‘টিপালাইট’।

টিপালাইট―সে এক মজার গ্যাঁড়াকল। নাকি আঙুল ছোঁয়ালেই ধোঁয়াধার আলো, আর সে-আলো ‘খেড়িয়া’ বা খরগোশের চোখে পড়লে তারও নড়ন চড়ন ‘নট’।

 একটা টিপালাইট আমার হাতে, আরেকটা বাবার―ডাইনটিকরির জঙ্গলে আমরা ‘ফোকাস’ ফেলছি আড়াআড়ি।

অকস্মাৎ একটা খেড়িয়ার বাঁ চোখে পড়ল আমার হাতের আলো, ডান চোখে বাবার। খরগোশটা সামান্য লাফিয়ে উঠে, ‘চিঁড়রা’ অর্থাৎ কাঠবিড়ালীর মতো সামনের দু পা জড়ো করে বোধহয় প্রাণভিক্ষাই চেয়েছিল।

এমন সময় খাঁদুকর্তার বন্দুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছিল তার ধুকপুকিটা! হৃৎপিণ্ডটা ছিটকে বাইরে এসে মাটিতে পড়ে লাফাচ্ছিল ‘ব্যাঙটুনি’-র মতো।

সেই পাপেই হয়তো আজ গুলিতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল বাবার ধুকপুকিটাও! এখন কি এবার আমার পালা ? অথচ খাঁদুকর্তা তো দিব্যি বেঁচে আছেন বহাল তবিয়তেই!

পালাব কি ? ডাইনে-বাঁয়ে, পিছনে―যে কোনও দিকেই যদি দৌড়ায় লাটাপাটা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে, ভালুকঝোড়-ঝিঁকরঝোড়, বরা বা শিয়ালঝোড়ের ভেতর দিয়ে, মিলিটারি পুলিশগুলোর সাধ্য কি পিছু পিছু দৌড়ে আমাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে ?

তবে ওই একটাই ভয়―পিছন থেকে যে কোনও মুহূর্তে দেখামাত্রই বন্দুকের ঘড়া টিপে ‘ফ্যাৎ’ করে গুলি মেরে দেবে পিঠে! আমাকে আর তাদের দরকার কী ? আমি তো অতিরিক্ত, ফালতু একটা!

কিন্তু আমার বাবা-মা ? তাঁরা যে এখনও পাশাপাশি শুয়ে পড়ে আছেন গাড়িতে ? কথার কথা, একজন না হয় ‘মরা’, আরেকজন তো ‘অ-মরা’। তার বেলা ?

 আর না-দৌড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলাম চুপচাপ, দেখি-ই না ওরা কী করে ? এখন তিন-তিনটে গাড়িই আমার সামনে। আমাদের গাড়িটা মনে হলো গতি কমিয়ে সামনে না গিয়ে ক্রমশ পিছিয়ে আসছে।

ওরা ভেবেছে কী―জঙ্গলের মাঝখানে আমাকে গাড়িতে তুলে ফের গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলে হেনস্থা করবে ? কীরকম হেনস্থা―বনে-বিভুঁইয়ে একলা পড়ে থাকলে আমাকে বাঘে-হুঁড়ারে ভালুকে-ল্যাকড়ায় খেয়ে ফেলবে ?

দিনের পর দিন অনাহারে থেকে খেতে না পেয়ে কাঠ হয়ে শুকিয়ে মরব ? আর তাছাড়া, ‘বনপার্টি’-রা এসে আমাকে কুড়িয়ে পেয়ে তাদের দলে ভিড়িয়ে ‘গাপ’ করে দেবে ?

আহা, ওরা তো আর জানে না, ভাদুতলা-শালবনি-আসনবনি -পিংবনি-কাঁটাবনি-জামবনি, বেলপাহাড়ি-কাঁকরাঝোড়- কাঁটাপাহাড়ি-বাঁশপাহাড়ি, তপোবন-কমলা-সোল- পাঁচকাঁহানিয়ার জঙ্গলে বাঘ তো বাঘ, একটা বাঘারোল-হুঁড়ার-ল্যাকড়াও পাওয়া যাবে না, ওই বড়জোর একটা-দুটো বরহা-ঝিঁকর-খেড়িয়া কি খেঁকশিয়াল।

ভালুকেরও আজকাল আকাল! ভালুকওয়ালা-অবশ্য একটা-দুটো নাকে দড়ি বেঁধে খেলাতে নিয়ে আসে, তাও তো কালেভদ্রে!

তবে―‘হুপ!’ ‘হুপ!’―বিস্তর হনুমান আছে বৈকি এ দিগরে! কখনও বটগাছের ঝুরি ধরে দোল খাচ্ছে, কখনও ডুমুরগাছে―

পাকা ডুমুর যত না পেড়ে খাচ্ছে, তার থেকে ছড়াচ্ছে বেশি গাছতলে। ওই, ওই যেখানে জঙ্গলের মাথায় চাঁদোয়ার মতো চাঁদের আলো ফুটেছে, আলোও মনে হচ্ছে ধোঁয়া, ধোঁয়া, ধোঁয়া-সেখানে ‘হুপ’ করে একটা আওয়াজ উঠল! ওই আরও দুটো―‘হুপ! হুট!’

বাবুরা, জঙ্গলে খাবার-দাবারের অভাবের খোঁটা দিচ্ছ, বলি, তাহলে শোনো―

বৈশাখ-জষ্ঠি-আষাঢ়―ফলপাকুড় কুড়োবার পাতা ছিঁড়বার

মাস। কেঁদ-কুসুম-কচড়া-বেল-কোঁৎবেল-ভেলা-ভুড়রু-জাম-

জামরুল-আম-পঁড়স-খেজুর-বৈঁচি গাছ থেকে পাড়ো আর খাও।

শালপাতা ছিঁড়ে থালা বানাও দোনা বানাও। আর কেঁদপাতা

বিড়িপাতা। তোলো, বান্ডিল কর, শহর-বাজারে চালান দাও।

‘সাতনলা’ ‘লাটাচুলী’ ‘কাঁড়-কাঁড়বাঁশ’ নিয়ে শিকারে যাও,

‘দিশম সেঁদরা’-য় কয়ের-কপতি-গুঁড়ুর-ট্যাঁসা-কেরকেটা- চড়ৈ-চটা―

বনি-গুয়েবনি শিকার কর। খঙ্গা-বঙ্গা-ঢ্যামনা-গোঈ-গোধি―

গেঁড়ি-গুগলি-খেড়িয়া-বরহা―যত পার ধর।

 রিমঝিম করে জঙ্গলে ঝড়িয়া-বরষা হলে জলে ভিজে মাটি ‘বতর’ হয়। বতর মাটিতে পুঙ পুঙ করে ‘ছাতু’ ফোটে।

শালপোঙড়া, সরুবালি, বড়বালি, কুড়কুড়িয়া, কাড়হান, পরব

ছাতু, সাদা ভণ্ডা, লাল ভণ্ডা।

আলু-তুঙা হয়―পানআলু খামআলু চুরচু আলু, আঁউলা―

বাঁউলা। চিরোল চিরোল পাতা গজায়, চ্যাঁকা-শুশনি-সরন্তি―

ঘোড়াকানা-ঘলঘসি শাক লহ লহ করে, লই-লতিতে থোঁকা

থোঁকা ফুল হয়, ফল হয়-বনপুঁই-বনকাল্লা-কুঁদরি-কাঁকড়ো।

 শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিনে ‘জনার’ গাদর হয়, মকাইয়ে পাক ধরে। জঙ্গলের ভেতরে খাল-নদী-ঢড়হা-কংসাবতী- সুবর্ণ

রেখা-ডুলুঙ-কুবাই-তমাল-পারাং-শিলাবতী-সব ভরাজলে টই―

টম্বুর।

খল্ বল্ করে ওঠে শোল-মাগুর-চ্যাঙ-গোড়ুই, অল্প

জলে ছিরছির করে পুঁটি-দাঁড়িকিনি-চাঁদা-ধানাহুলু। বিলে―

বাতানে বাঁধগোড়ায় কাঁদরে জলের ধারে নরম মাটিতে

কাঁকড়া তার অতগুলো দাঁড়ায় আঁকিবুকি কাটে, গর্তে ঢুকে

জলে বুজ বুজি তোলে। বুজ বুজি দেখে গর্তের পাশে ‘গজাল’

গুঁজে দিলেই ডিমাল কাঁকড়া বেরিয়ে আসবে চাপে পড়ে।

তখন মার রে, ধর রে। 

কার্তিক-অঘ্রান-পৌষ―ধানকাটা ধান তোলার কাল।

শুখা মরশুম। ঠোঁট ফাটে, গায়ে খড়ি ফোটে। যার ধান সে

কাটে, সেই তোলে। আমাদের আর কি! ধান-কাটা-ন্যাড়া-মাঠে পড়ে থাকা যা ধানের শিষ। ধানের ‘টুঙ’ কুড়াই আমরা―‘খুঁজে খুঁজে নারি। যে পায় তাহারি।।’

ধানবিলের ‘হিড়’ কেটে ইঁদুরের ‘গাড়হা’ থেকে ‘ইঁদুরধান’

যেটুকু পাই, সে তো পাই, তার সঙ্গে পেয়ে যাই ছোট ছোট লাল লাল চোখ-না-ফোটা কাঁড়াল কোঁড়ল চুটিয়ার বাচ্চা। মা তো

আমার সেসব গোটা গোটা মুখে পুরে কাঁচাই কচমচিয়ে চিবিয়ে খান! তাঁর দু ঠোঁটের কষ বেয়ে তখন কাঁচা লোহু ঝরে।

আর, মাঘ-ফাগুন-চোত তো মধুর মাস। মহুলগাছে মধু, চাক-ভাঙা-মধু খাও রে, বেচো রে, মদ ‘চুয়াও’ রে!

তবে হ্যাঁ, আজকাল জঙ্গলে ‘বনপার্টি’―এক সমস্যা বটে! বহিন নাকফুঁড়িকে কী ‘বনপার্টি’-রাই গাপ করেছে ?

পিছোতে পিছোতে গাড়িটা আমার সামনে এসে ‘ব্রেক’ কষল। হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামল বন্দুকধারী মিলিটারিরা।

আমাকে পাকড়াও করে বলল, ‘ক্যা, ভাগনেকো লিয়ে মতলব কিয়া ?’

আমি ‘হাঁ’ ‘না’―কিছুই বললাম না। তবে হাত চাপাচাপিতে টানা-হ্যাঁচড়ায় বুঝলাম―এ পর্যন্ত তাদের কাছে ‘ফালতু আবর্জনা’ ছিলাম, এতক্ষণে ভারি ‘দরকারি’ হয়ে গেলাম।

তারা টেনে-হিঁচড়ে আমাকে গাড়িতে তুলল, ‘চুপচাপ বৈঠ্ রহো! নেহি ত আঁখি বনধ্ কর লেট যাও!

আমি চোখ বন্ধ করে ভাবতে বসলাম―এখন ভারি তো দরকারি হয়ে পড়লাম! তবে কি এরা বাবা-মাকে হাসপাতালখানায় পৌঁছে দিয়ে আমাকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে ‘বনপার্টি’-র লোক সন্দেহ করে জমা রেখে আসবে ‘জিহলখানা’-য় ?

জিহলখানাকে বাবার বড় ভয় ছিল। আমিও ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলাম। এত জোরে জোরে কাঁপছি যে, দু হাঁটুতে ঠক্কর লেগে খট খট আওয়াজ উঠছিল।

এক বন্দুকধারী তার বন্দুকের বাঁট দিয়ে আমার হাঁটুতে সামান্য আঘাত করে বলল, ‘হিলতি কিঁউ রে ? জাড়া লাগতি হ্যায় ক্যা ?’

তাহলে বনের রাস্তা ‘ফুরাঁইল’, এতক্ষণে শেষ হলো। ওই তো বনধার! ঝোপঝাড় লাটাপাটা আর নেই, ছাড়া ছাড়া একটা-দুটো গাছ।

বড় বড় গাছ, শাল-আসন গাছই হবে। রাস্তার দু পাশে বড় বড় খুঁটির উপরে বিজলি বাতি জ্বলছে। ‘গিড় গিড় দাগিন গেঁদা’―যেন মরা খুঁটির মাথায় আলোর ফুল ফুটেছে!

ফুল, ফুল।

পলাশ, সুরগুঁজা, ধাতকি, কুড়চি, আঁটারির ফুল তো নয়, এ ‘হৈল বিলাইতি ফুল’, আলোফুল। তার কবে যে এ জাতের ফুল আমাদের গাঁ-গেরাম-ঝিটকার জঙ্গলে ফুটবে ? জঙ্গল ধব ধবাবে ?

রাস্তার চলমান-বিজলি-আলো গাড়ির ভেতরে এর-তার মুখে পড়ে চকিতে ঝিলিক দিয়ে চলে যাচ্ছে। মুখগুলো কিন্তু যেমনকার তেমন, নির্বিকার। ঘুমে এখনও ঢুলছে।

এত আলো, এত আলো, বোধকরি কোনও শহর-বাজার এসে গেল! তার মানে তো হাসপাতালখানাও এসে গেল। হাসপাতাল যখন তখন ‘জিহলখানা’-ও আর দূরে নয়।

আমার হাঁটু-ঠকঠকানি কমল তো না, বরঞ্চ বাড়তে লাগল। বাড়তে লাগল, বাড়তে লাগল। কে জানে কোন শহর! রাস্তায়, রাস্তার বিপরীতে ট্যাক্সি গাড়ি মোটরগাড়ি, সাইকেল-রিকশা-ভটভটি, এমনকি বাসগাড়িও যাচ্ছে আসছে।

ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। পাতার ঝুপড়ি, কুঁড়িয়া ঘর, বাঁশ বা শালরলার ভুগড়া ঘর তো নয়, সব বড় বড় পাকাঘর। রং-করা, কোনও-কোনওটা চুনের মতো ধবধবে সাদা। কোথাও বা ঠাকুরথান, মন্দির।

 লোকজনও দেখা যাচ্ছে―ওই, ওই তো একজন। সাইকেলের ‘রড’-এ প্রায় শুয়ে পড়ে পেডেল করছে। ঝাড়গাঁ না মেদিনপুর ? আমাদের কাছেপিঠে ওই দুটো শহর-বাজারের নামডাকই তো আছে।

তা বাদে আছে বটে ‘সাপধরা’ আর ‘চাঁদাবিলা হেলথ সেন্টার’। কিন্তু কোথায় চাঁদে আর মেনি বান্দরের―

কটা ঘণ্টা বাজল। একটা নয়, একসঙ্গে অনেকগুলো। ঢং ঢং ঢং ঢং!

‘হাটুয়া’ ছা-ছানাদের ইস্কুলে এমনিতরো ঘণ্টা বাজে। কিন্তু সে তো রাতের বেলা নয়, দিনমানে। তবে কি এখন এখানে ‘রাত-ইস্কুল’ চলছে ?

আমাদের গ্রামেও একটা রাত-ইস্কুল ছিল। ছিল, ছিল। সেখানে যতসব বুঢ়হা-বুঢ়হিরা পড়ত। হারানি-বেজু-বঢ়কয়- হাসনমণি-কাঁদুরারা। পাঁড়রু চৈতন বিনন্দ আর আমিও ক মাস ঢুকেছিলাম বড়দের সঙ্গে।

আন্দাজে আন্দাজে, কখন বা অন্ধকারে বাইরে বেরিয়ে ‘জন’-এর উদয় দেখে একঘণ্টা অন্তর অন্তর বাজানো হত ঘণ্টা-ঢং ঢং!

পড়াশোনা না হোক, ছাত্রসংখ্যা যত নগণ্যই হোক, ঘণ্টাটা কিন্তু বাজত ‘ঘড়ি’ ধরে ধরে। আসল কথা কি, লেখাপড়া করতে নয়, ঘণ্টা বাজাতেই যেন কেউ কেউ যেত রাত-ইস্কুলে।

ঢং ঢং!

সে ঘণ্টাধ্বনিও আর নেই, সে রাত-ইস্কুলও আর নেই। তবে ঘণ্টাটা এখনও আলবাৎ আছে। গোলাকার পিতলের চাকতি, দড়িবাঁধা। আরেকটা কাঠের মুগুর। ‘ঘড়ি’ ধরে ধরে কাঁদরুর বাপ শরাবন এখনও কি ঝড়িয়া কি বর্ষায় ঘণ্টা বাজান―ঢং ঢং ঢং ঢং!

আর বাজবে না―কেননা তিনিও তো ‘কাঁটাদুয়ারি’ করে বেরিয়ে এসেছেন ঘর ছেড়ে। তাঁর ঝুপড়িতেই তো বসত ‘রাত-ইস্কুল’।

রাত-ইস্কুলে আরেকটা কাণ্ড হতো। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ‘শীতলামঙ্গল’ যাত্রা-পালার মহড়া। সে-যাত্রাপালা গাওনা হতো পৌষসংক্রান্তি অর্থাৎ মকরের দিন রাত্রে।

সকালে মকরস্নান, শীতলাথানে ঘট-আনয়ন, দেহুরির পূজাপাঠ, তারপর তো বলিদান। ‘খুকড়া বলি’ ‘পাঁঠাবলি’। অবশেষে বলির মাংস, পিঠাপুলি আর মদ-হাঁড়িয়া খেয়ে খলা-আঙনায় গড়াগড়ি। রাতে―

‘শীতলামঙ্গল যাত্রা’। সারা বছর ধরে তার মহড়া চলত ওই রাত-ইস্কুলেই। আমি, পাঁড়রু, চৈতন আর বিনন্দ―‘নাচুনী’ সেজে প্রথমে ‘গরাম দ্যাবতা’-র বন্দনা করতাম। সেই বন্দনাগীত এখনও মনে আছে―

‘এহি বাটে আসুছন্তি গাঁয়ের গ্রাম।

উত্তর-দক্ষিণ পূরব-পশ্চিম।।

তার নামে সঞ্জিয়া যোগাই মুই রে।

এহি বাটে আসুছন্তি মা যে শীতলা।।

রুগিনী-যুগিনী-ওলাওঠা বুড়ি।

বসন্তকুমারী-চামডলিয়া বুড়ি।।

তার নামে সঞ্জিয়া যোগাই মুই রে।।’

ঘণ্টাধ্বনি আর শোনা যাচ্ছে না, থেমে গিয়েছে। রাস্তায় লোকজন বাড়ছে, বাড়ছে আলোর ঝলকানি। কথাবার্তাও। মাহাতো-কথা শোনা যাচ্ছে। ওই তো দুজন সাইকেল আরোহী পাশাপাশি যেতে যেতে এ-ওকে বলছে, ‘ধূর্ ব! কালে ল্লে বইল্যে আসছিন ঐ একেই কথা ন, তার কে শুনছে!’

 সাইকেলবালা কাল থেকে কাকে যে কী কথা বলে আসছে, আর যাকে বলা সে যে কেন শুনছে না―জানা গেল না, জানা গেল না।

‘আছা ভালা, ‘হাসপাতালখানা’ আর ‘জিহলখানা’ কি কাছাকাছি এসে গেল ?’ আমার চোখ-কান চারধারটা গোগ্রাসে গিলে চলেছে, শুনে চলেছে। আর, ততই হাঁটুজোড়াটার ঠক ঠকানি বাড়ছে তো বাড়ছেই।

 এর আগে কোনওদিন তো ভুলেও শহর-বাজারে আসিনি! হাত দিয়ে দুহাঁটুর মাঝখানে ‘ইয়ের’ জায়গাটা দেখলাম― কেমন যেন ‘ভিজা’ ‘ভিজা’ লাগছে! তবে কি আমি মুতে ফেলেছি ভয়ে ?

 এতটাই ডরপুক্ ? এতটাই ডরপেলকা ?

 অনর্গল ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে একটা লাল রংয়ের মস্ত গাড়ি আমাদের পাশ দিয়ে হুঁকরে ছুটে গেল। মায়ের কথা বাপের কথা, যাবতীয় ভাবনাচিন্তা এখন মাথা থেকে উধাও।

 উধাও, উধাও।

 ওই তো একটা দোকান, পানবিড়ির দোকান কি ? ওই, ওই তো আরেকটা! সাঁক সাঁক করে পিছন দিকে সরে যাচ্ছে দোকানপাট। সরন্তি রাস্তাঘাটের আলো এসে চোখে মুখে বিঁধছে, ঝলকাচ্ছে।

 জঙ্গলে ঝোপেঝাড়ে লাটায়পাটায় গাঁদারগুঁদুর অন্ধকারে এমনিতেই আমাদের চোখের পাতা পিট পিট করে, আর এ তো আলোরই বানবন্যা!

ভালো করে তাকাতেও পারছি না। সে না হয় চোখ বুজেই থাকলাম। কিন্তু, কিন্তু―এরপরেও ‘কিন্তু’ আছে―চোখ বুজে কান ঝুলিয়ে বালুতে মুখ লুকালেই কি আর ‘খেড়িয়া’-র ধুকপুকিটা রক্ষা পায় ?

ওদিকে খাঁদুকর্তার ছোঁড়া ‘ছড়রা’ যে পিঠে এসে লাগল বলে! ‘রোজ রোজ ঘুঘু তুই খেয়ে যাস ধান। আজ ঘুঘু তোর বধিব পরান।’

অবশেষে গাড়ি এসে থামল। এই তাহলে হাসপাতালখানা ? না, জিহলখানা ? বড় বড় বাড়ি, কত বড় বড় ঘর! কত কত গাড়ি! হেথা হোথা খুঁটিতে ঝুলছে কত বড় বড় আলো। আলোর চারধারে ধোঁয়া ধোঁয়া, তার চারধারে অজস্র ‘নিরঘুইন্না পোকা’!

কী পোকা ? ‘সালোই’ না ‘বাদৈল্যা’ ?―ওই যারা ভড় ভড় করে এক পশলা বৃষ্টি হওয়ার পরে পরেই খতখানা থেকে, নোংরাজবরার গাদা থেকে ভুস ভুস করে বেরিয়ে এসে উড়তে থাকে।

আঙিনাময় ডানা মেলে উড়েঘুরে বেড়ায়। ফিনফিনে ডানা, সামান্য ওড়া-ঘোরা করলেই খসে যায়। তখন থুপ করে মাটিতে পড়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না।

 মাটিতে পড়লেই গিনা-বাটি-তাটিয়ায় কুড়াও রে, বালির খলায় ভাজো রে, কুড় মুড় করে খাও রে! চালভাজার মতো খেতেও তো মন্দ না।

 তা ঝড়িয়া-বরষার দিন তো গত হয়ছে কবেই! এমন অসময়ে ‘বাদৈল্যা’ পোকা বা আসবে কোত্থেকে ? ওসব নিরঘুইন্না ‘পাদুরা’ পোকাটোকা হবে।

আগের গাড়িদুটো একটু আগেই হাসপাতাল না জেলখানা চত্বরে ঢুকে পড়েছিল। তাদের ব্যস্ততা ভারি। গাড়ি থেকে নেমেই ছট ফট করছে। গামবুট পায়ে খট খট আওয়াজ তুলে একবার এদিকে আসছে, একবার সেদিকে যাচ্ছে।

আমাদের গাড়িটা ঢুকে পড়তেই তারা চার ধার থেকে ছেঁকে ধরল! ততক্ষণে আমার বুঝি হয়ে গেছে! ‘ঝরণ’ তো শুরু হয়েছিল একটু আগেই, এবার তবে বাঁধভাঙা অঝোরঝরে নেমে পড়বে ?

আমাকে টানাহিঁচড়ান করে নামিয়ে নিয়ে চালান করে দেবে জিহলখানায় ? কিন্তু না, গাড়ির পিছনের ডালা খুলেই তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল আমার মাকে নামিয়ে নিতে।

 বুঝলাম, তবে জিহলখানা এ নয়, হাসপাতালখানাই হবে নিশ্চয়ই। বাঁধাছাঁদা হয়ে গাড়িতেই পড়ে থাকলেন বাবা, মাকে ওরা সযত্নে নামিয়ে রাখছে।

দুজন মিলিটারি পুলিশ হাসপাতালের অন্দরে ঢুকে পড়ল শশব্যস্ত হয়ে, হয়তো ডাক্তারের খোঁজে। পরক্ষণে বেরিয়েও এল, তাদের পিছন পিছন এল হাসপাতালেরই দুজন লোক, হাতে তাদের খাটিয়ার মতো সাদা কাপড়ের দোলনা। মাকে এবার ধরাধরি করে দোলনাতে তোলা হবে।

গাড়ির ডালা খুলে ওরা যখন ধরাধরি করে মাকে নামাচ্ছে, ধরাধরি নামানামিতে ভারি ব্যস্ত, তখনই, বলতে কি তারও আগে চোখের নিমেষে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছিলাম আমি!

যত আলো তত অন্ধকার। যেখানে যেখানে আলো পড়ছে, সেখানে সেখানে ‘ফিন্-ফোটা-জ্যোৎস্না’-র মতো আলোয় আলোময়। কিন্তু যেখানে একফোঁটাও আলো পৌঁছাতে পারছে না, সেখানে ঘোরঘুট্টি অন্ধকার।

তার উপর ঝাঁকড়া শালগাছের ছায়া পড়েছে, পড়েছে ‘পাকা ঘর’-এর ছায়া। হাসপাতালখানার চৌহদ্দিতে তো অভাব নেই শালগাছের, অভাব নেই পাকা ঘরেরও।

কত কত গাছ! কত কত পাকাঘর! বনজঙ্গলের মতো মাঝে মাঝে রাতের পাখ, রাতচরা পাখি গাছে গাছে ভদকাচ্ছে, ‘কহরাচ্ছে’।

উপরের ঘরের ঝুরকায় ঝুরকায় আলো জ্বলছে, আলো জ্বলছে নিচের ঘরগুলোয়ও। কিন্তু যে ঘরে আলো নেই সে ঘরে এক ঘর কালো হাঁড়ির অন্ধকার।

তার মধ্যে কোথাও একজায়গায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়ে আছি, ধরা পড়লেই দৌড়ুব রিটপিটে দৌড়―দৌড়―দৌড়―

ওদের জনাকতক মায়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালখানার বড়বাড়ির ভেতরে ঢুকল। হুটোপুটি করে ঢুকছে, যেন তাদের হাতে ফালতু ফালতু নষ্ট করার মতো অত সময় নেই।

যে কজন মিলিটারি পুলিশ বাইরে খামোখা দাঁড়িয়েছিল, তিনজন ড্রাইভার বাদে তারাও সব ভেতরে ঢুকে পড়ল।

তিন ড্রাইভার একজোট হয়ে এখন সিগারেট খাচ্ছে, খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে কাশছে গলায় ‘গয়ের’ তুলে। কথা বলছে, কথা বলছে―কত কী কথা!

‘কৈ ? ডেরাইভার বাবুরা ত হামাকে লিয়ে অ্যাকটা কথাও বলছে নাই ?’

বিস্মরণ হয়ে গেছি বাবুদের ? অতিরিক্ত, ফালতু। ফালতু, ফালতু। ফালতু একটা লোককে কারই বা অত মনে রাখার দরকার ? সেই বলে না―‘কোথাকার কে দুটো আমড়া ভাতে দে ?’

হাসপাতালের গেটের ধারে বাজারের রাস্তায় এখনও লোক চলাচলের বিরাম নেই। আর হাসপাতাল যখন―সময় অসময় নেই―রোগী নিয়ে রোগীর লোকজন তো আসবেই, আসছেও।

বোধকরি হাসপাতালে যাঁরা ডিউটি করেন, তাঁদের কেউ কেউ ডিউটি সেরে এখন হাসপাতালখানা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ওই, ওই তো একজন―সাইকেলে চড়ে গেট পার হচ্ছেন। পরনে কুঁচি দেওয়া শাড়ি, ফুলহাতা সাদা সেমিজ, মাথায়ও কী সাদা ফেট্টি বাঁধা ?

দিঙ দিঙ করে আমার মনে পড়ে গেল বহিন নাকফুঁড়িকে। হাত চলে গেল সুড় সুড় করে হাফ-পেন্টুলের পকেটে।

সুতোয় বাঁধা সেই দুটো ‘রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা’! ‘বর-কইন্যা’।

পকেটের বাইরে এনে অন্ধকারেও আঙুলে টিপে টিপে দেখছি, আর অমনি একটা সাদা বিল্লি ঝুপ করে নামল আমার মাথার উপর দিয়ে মাটিতে। আচমকা আমাকে দেখতে পেয়ে মিঞ মিঞে গলায় ডেকে উঠল, ‘মি-ঞা-ওঁ!’

আমিও ফিস ফিস করে উত্তর দিলাম, ‘হঁ হঁ, ডাক! ডাক রে নাকফুঁড়রি! ‘ভাই’ বলে ডাক বহিন! তোর ভাই এখন মস্ত ফাঁদে পড়েছে।’

মিলিটারি পুলিশগুলো বন্দুক-হাতে গট মট করে সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসছে। নেমেই এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। টর্চ লাইট জ্বেলে বোধ করি আমাকেই খুঁজছে!

তাহলে এতক্ষণে মনে পড়েছে তাদের―অতিরিক্ত, ফালতু লোকটাকে ? তাদের ভাষায় কী যেন বলাবলি করছে!

একবার তো বলল―‘ঢেঁডরি, কাঁহা গৈল বা!’

কে ‘ঢেঁডরি’ কী ‘ঢেঁডরি’―কিছুই তো বুঝতে পারছি না!

‘ঢেঁডরি’ বলল, না অন্য কিছু―কে জানে! তারা টর্চের ফোকাস ফেলে ফেলে সামনের সারা মাঠটা ঢুঁড়ছে, শালগাছগুলোর উপরও তল্লাশি চালাচ্ছে।

কিন্তু আমি তো দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়েছি একটা অন্ধকার ঘরে, পেট তাবুড় দিয়ে শুয়ে আছি একটা খোঁদলে।

টিপালাইটের ফোকাস এলেও পিছলে যাবে উপর দিয়ে। জানি জানি, একবার আমার হদিস পেলেই হয়! বুটের লাথিতে পিঠের ছালচামড়া ফাটিয়ে ছাড়বে। তারপর হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে যাবে ‘জিহলখানা’-য়।

আমাদের গাড়িটা বাবাকে নিয়েই বেরিয়ে গেল সাঁৎ করে, দেখলাম। হয়তো তারা যাবে আরও কোনও বড় হাসপাতালখানায়। সঙ্গে গেল কজন বন্দুকধারী মিলিটারি।

বাকি বন্দুকধারীরা আপাতত খোঁজাখুঁজি ছেড়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে বোধকরি যুক্তি করছে, ফন্দি আঁটছে তল্লাশি আরও কী করে জোরদার করা যায়!

নাকি, একটা অতিরিক্ত, ফালতু লোককে খোঁজাখুঁজির আর কি দরকার বলে হাল ছেড়েই দিচ্ছে মিলিটারি লোকগুলো―ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তবু ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছি, কেঁপে যাচ্ছি।

খোঁদলের ভেতর থেকে মুণ্ডুটা সামান্য উঁচু করে দেখছি―জোড়া জোড়া পা, জোড়া জোড়া গামবুট হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে, পায়ের ফাঁকে ফাঁকে এই আলো, এই অন্ধকার।

আমার হাফ-পেন্টুলের তলায় দুপায়ের ফাঁক দিয়ে প্রায় গড়িয়ে পড়া জলের ধারাকে দাঁতে-দাঁত কামড়ে কোনও মতে আটকে রেখেছি, কিন্তু সেই বলে না―‘হাগা না মানে বাঘা ?’

যেই জোড়া জোড়া পায়ের হাঁটাচলা শুরু হলো এধার ওধার, মনে হলো গামবুট পরা লোকগুলো এগিয়ে আসছে এদিকেই, তখন আমার ‘দমে’ হয়ে গেল!

না, মিলিটারি পুলিশগুলো এদিকে এলই না, ওরা ওদিকে প্রায় দৌড়ে গিয়ে ধুপ ধাপ শব্দ করে গাড়িতে উঠল। গাড়ি ছেড়েও দিল।

এখনও উঠে দাঁড়াবার সাহস পাচ্ছি না, কেননা আরেকটা মিলিটারি গাড়ি তো আছে। আছে, আছে। তবে তার লোকগুলো আর মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই, যে যেমন গাড়িতে উঠে আলো না জ্বেলে চুপচাপ বসে আছে গাড়িতেই।

তার কারণ, তাদেরও তো ভয়ডর আছে―অন্ধকারে আড়ালে আবডালে কখন কে কোথায় ঘাপ মেরে, বলা তো যায় না―সুযোগ এলেই ‘ফ্যাৎ’ করে―

খানিকটা মরিয়া হয়েই উঠে দাঁড়িয়েছি, গামছা দিয়ে পা-জাঙ মুছছি, হঠাৎ হেডলাইট জ্বেলে একটা গাড়ি ফিরে এল।

বাবাকে নিয়ে যে-গাড়িটা বেরিয়ে গিয়েছিল, সেইটা ? নাকি একটু আগে যেটা রওনা দিয়েছিল, সেটা ?

ঠিক বুঝতে পারছি না। বিদ্যুদ্বেগে ফের খোঁদলে সটান শুয়ে পড়লাম―‘নিচে হল হল  উপরে তুলসীর জল!’ সেই অবস্থায় কাছিমতুল্য ঘাড়টা ঈষৎ উঁচু করে দেখছি―দুজন মিলিটারি পুলিশ গাড়ি থেকে নেমে এল গট গট করে।

একজনের কাঁধে বন্দুক, হাতে ধরা কি একটা প্যাকেট। আরেকজন বন্দুক তাক করে তার পিছন পিছন। ওই যে ওই―বলা তো যায় না―

সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই হাতে-প্যাকেট-ওয়ালা পুলিশটা কাকে যেন হাঁক দিল! বাপ রে, সে কি বাজখাঁই গলা! তার ওপর সে-ডাক পাকাঘরের ভেতর ঠোক্কর খেতে খেতে আরও যেন বড় হলো, যেমনটা হয় আমাদের ‘তিলকমাটিয়া হুড়ি’-তে।

‘তিলকমাটিয়া হুড়ি’―সেও তো এমন চার-পাঁচটা পাকাঘরেরই সমান উঁচু। সাইকেলে যাও আর হেঁটেই যাও―ধার ঘেঁষে যেতে যেতে যদি কখনও হাঁক দাও―‘স্যা-ঙা-ৎ হে-এ-এ-এ-’, তবে সে-হাঁক তিলকমাটিয়া হুড়ির গায়ে ঠোক্কর খেয়ে খেয়ে তোমার কাছেই ফিরে আসবে―‘স্যা-ঙা-ৎ হে-এ-এ-এ’, আর তুমি ঠিক শুনবে ‘―আ-ছি―হে-এ-এ-এ!’

এ এক মজার গ্যাঁড়াকল!

হুঁকরাতে হুঁকরাতে দুটো গাড়িই চলে গেল, আমারও বুকের উপর থেকে চাপিয়ে-দেওয়া-দেড়মনি পাথরটা কে যেন সরিয়ে নিল!

বা, তাও-ও নয়। এক ‘ঘরোয়ালি’ আজ রাতে ‘ঠেকা-চাপা’ দিয়ে রেখেছিল একটা ‘খুকড়া’-কে কাল সকাল হলেই কেটেকুটে খাবে বলেই! তো, সকালে কি মনে করে ঠেকাটা উলটে দিয়ে ঘরোয়ালি বলল, ‘যা চরেঁ খা!’ অমনি খুকড়া-মোরগ ডানা ফেটিয়ে ‘আড়িশ’ ভেঙে উড়ে উঠেই পগার পার!

আমারও হলো সেই অবস্থা। ধড়ফড়িয়ে উঠে হাত পায়ের ‘আড়’ ভেঙে গলায় গামছা জড়িয়ে রগড়াতে রগড়াতে অন্ধকার থেকে আলোয় এসে দাঁড়ালাম।

হাসপাতালে লোকজন এখনও ঢুকছে বেরুচ্ছে। কেউ সাইকেল টেনে নিয়ে ছুট লাগাচ্ছে, কেউ হয়তো পায়ে হেঁটে ঢুকছে ধীরে ধীরে।

সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সাদা শাড়ি সাদা হাত-জামা, মাথায়ও সাদা রঙের কুঁচি-দে-ও-য়া টুপি। ‘এড়ি’-তে ভর দিয়ে সামান্য উঁচু হয়ে কাকে যেন খুঁজছেন, কাকে যেন! কাকে ? হাতে একটা প্যাকেট ?

যাকেই খুঁজুন, যাই ত, যাই! গলায় গামছা জড়িয়ে রগড়াতে রগড়াতে গেলামও।

দেখতে পেয়ে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই যে, সি.আর.পি.এফ.-এর গাড়িতে কি তুই ছিলি ?’

‘হাঁ’ বললে কী হবে আর ‘না’ বললেই বা কী হবে―টুকচার ভাবলাম। তারপর মাথা নাড়লাম।

ফের জিজ্ঞাসা―‘গাড়িতে যে রোগী ছিল, সে তোর কে হন ?’

স্বীকার করব কি করব না ? সহসা মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘হঁ, আমার মা ছাড়া আবার কে ? মা-ই বঠে ন্ন!’

সুন্দরী মহিলা, মনে ত লয় ‘ডাগতর’, আর নাহলে নার্স। বললেন, ‘কচি রে, তোর মায়ের ‘স্ট্রোক’ হয়েছে। বাহাত্তর ঘণ্টা না কাটলে কিছু বলা যাবে না!’

স্টোক ? কে জানে ওটা কি রোগ ? আর বাহাত্তর ঘণ্টা ? তাই বা কে জানে ক দিনে ?

আমি আর কি বলি ? ঘাড়-মাথা নিচু করেই আছি।

সহসা ‘দিদিমণি’ আমার হাতে একটা প্যাকেট, সেই যে সেই প্যাকেটটাই গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘এই নে, ধর! সি.আর.পি.এফ. খাবার দিয়ে গেছে তোর!’

আমি হামলে পড়ে প্যাকেটটা নিলাম। খাবার ? আহা রে, খাওয়া হয়নি কতকাল! সেই তো কবে, কুরথির ডাল―

হ্যাঙলার মতো প্যাকেট খুলে গবাগব খেয়ে চলেছি―ডিম, পাঁউরুটি। রুটি, তরকারিও আছে। আছে, আছে। ‘দিদিমণি’ তখনও দাঁড়িয়ে।

খাবার মুখে পুরে ‘চাভলাতে চাভলাতে’ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আর আমার বাবা ?’

‘কে তোর বাবা ?’

‘কেন, মায়ের ‘সঙে’ একগাড়িতেই তো ছিলেন ?’

রীতিমতো চিৎকার করে উঠলেন ডাগতর দিদিমণি, ‘তবে যে ওরা বলল―বেওয়ারিশ লাশ ?’

‘বে-ও-য়া-রি-শ লা-শ ? তা-র-মা-নে ?’

কিছুই বুঝলাম না। ফের জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বাবা এখন কোথায় ?’

‘মর্গে।’

‘স্বর্গে ? না, মর্ত্যে ?’―কী বলল ? বলল কী ? ঠিকঠাক বুঝতেও পারলাম না। ‘দিদিমণি’ তো খটাখট আওয়াজ তুলে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলেন উপরে, ‘স্বর্গেই’।

হাসপাতালখানার সিঁড়িতে বসে হা-ঘরের মতো খেয়ে চলেছি, ডিম-পাউরুটি শেষ, এবার রুটি-তরকারি।

আমার আর কোনও দিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই―সেই বলে কতকাল আগে চিচুড়গেড়িয়ায় বাপের আত্মীয়বাড়িতে কুরথির ডাল হাঁপরে দুমুঠো ভাত খেয়েছি!

‘ডাগতর’ না ‘নার্স’ দিদিমণিটা আমার হ্যাঙলার মতো নাকে-মুখে খাওয়া দেখে হয়তো লজ্জায় সরে পড়েছেন!

খাওয়া সেরে সিঁড়ি থেকে উঠে পড়লাম, হাত-মুখটা ধোয়া দরকার, হাসপাতালখানায় তো জলের কোনও অভাব নেই! যেদিকেই শুনছি―কল থেকে জল পড়ার ছিরছির আওয়াজ!

তিলকমাটিয়া টিলার ওধারে তপোবন জঙ্গলমহালে ঝড়িয়া-বরষায় এ-লাটা সে-লাটার ভেতর দিয়ে যখন জলের ‘ঝোপ’ আসে―উঁচু থেকে জল গড়িয়ে পড়ে খাদে, খাদের অতলে―তখনও এইরকমই আওয়াজ হয়―ঝর ঝর অঝোরঝর।

এঁটো হাতেই কিছুক্ষণ সিঁড়িতে বসেছিলাম, তাহলে মিলিটারি লোকগুলো তো খারাপ নয় ? আমাকে মাঝে মাঝেই গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে একলা জঙ্গলে ফেলে রেখে ‘একটুকচার’ রগড় করছিল বটে, তা বলে লোকগুলো মোটেও ঠগবাজ নয়, এই তো কেমন খাবারের ঠোঙাও রেখে গেছে মনে করে!

একটা নেড়ি কুকুর এসে সামনে বসল, বসে সমানে ল্যাজ নাড়ছে! খাবার তো নেই, হাতে-ধরা খালি প্যাকেটটাই তাকে দিলাম। প্যাকেট নিয়ে সে তার সামনের দুটো পা আর দাঁত দিয়ে কিছুক্ষণ লোফালুফি খেলল, খেল না।

আমি হাত-মুখ ধুতে টিপ-কলের দিকে যাচ্ছি, নেড়িটাও পিছন পিছন আসছে মুখে সেই ঠোঙা নিয়ে। 

হঠাৎ কোত্থেকে যে এত রাগ চড়ে গেল মাথায়! “শালা! আমার বাপটা সরগে না মরগে, কে জানে! বহিনটা তো গাপ-ঘরে! মা হাসপাতালে আর তুঁই ‘কালিয়া কুঁদরা’ কি না আমার পিছা ধরলি, ধ্যা―র-বাবা!”

বলেই ক্যাঁৎ করে নেড়িটার ল্যাজের দিকে জোরসে একটা ‘লাথ’ কষালাম, কুকুরটাও এত জোরে ‘কাঁই কাঁই’ শব্দে হুরি করে উঠল যে, কী-ই বলব!

কালো কুকুরটার চিৎকারে আরও অনেকগুলো কুকুর, হাসপাতালের আনাচে-কানাচে যে যেখানে ছিল, জড়ো হয়ে একসঙ্গে চিৎকার করে ডেকে উঠল।

তিলকমাটিয়া টিলার―‘স্যা-ঙা-ৎ হে-এ-এ’-ডাকের মতোই সে-চিৎকার হাসপাতালবাড়ির প্রতিটা ঘরে যেন গমগমিয়ে বাজতে লাগল আর তারপর কুকুরগুলো রিটপিটিয়ে দৌড়ে এসে আমাকে ঘিরে ধরে সমানে ‘ভুঁকতে’ লাগল।

বাপরে বাপ! এতই মিলমিশ! এতটাই একসঙ্গে থাকা! আসলে কুকুরগুলোই ‘চিহ্নৎ’ করে দিল আমাকে।

হাত-মুখ ধুয়ে যখন ভাবছি―গামছাটা পরে ‘অদা’ অর্থাৎ ভিজা পেন্টুলটা জলে ভিজিয়ে কোথাও ঘেঁটে দেব শুকোতে, ভাবছি―আমার তো আরও একটা পেন্টুল ছিল মায়ের গাঁটরিতে, গাঁটরিটা কখন কোথায় হাতছাড়া হয়ে গেল, নাকি তাড়াহুড়োয় মাকে গাড়িতে তোলার সময় মনে করে গাঁটরিটা তুলতেই ভুলে গিয়েছি আমি―

তখনই কি না হাসপাতালখানার রাতের পাহারাদার লোকটা কুকুরের দঙ্গলের মাঝখানে আমাকে আবিষ্কার করে হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠল, ‘কৌন হো তুম ? হিঁয়া ক্যা করতা ?’

আমি তাকে হাসপাতালে মায়ের ভরতির কথা, ‘ডাগর দিদিমণির’-র প্যাকেটে করে খাবার দেওয়ার কথা, খাবার খেয়ে টিপ-কলে হাত মুখ ধোয়ার কথা যতটা সম্ভব গুছিয়েই বললাম।

কিন্তু সব কথা শুনেও ও যেন কোনও কিছুই শোনেনি, সজোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘ভিজিটিং আবার’ খতম হো চুকা বা, কোঈ ফিকির উকির নেহি চলেগা, আভি আভি তুমলোগকো বাহার যানা-ই পড়েগা।

লোকটা সেই সঙ্গে আরও জানালো, ‘গরমেন্ট ডিপটি’-তে সে নাকি বরাবরই খুব কড়া আছে।

‘ভিজিটিং আবার’ ‘গরমেন্ট ডিপটি’―কী জিনিস জানা নেই আমার, জানার কথাও নয়। ঝিটকা, মাঝুডুবকা কি কাদাসোলের জঙ্গলে কখন কোথায়―ছিপছিপে ঝিপির ঝিটা ‘ছাগল-ভিড়কানো’ বৃষ্টি হলে সরুবালি না বড়বালি, হড়বড়িয়ে বড় বড় ফোঁটার ধারা নামলে কাড়হান না কুড়কুড়িয়া ছাতু ফোটে, ‘ঝরন’ ধরলে কোন খালে, কোন কাঁদরে, না বাঁধগোড়ায় ডিমাল কাঁকড়া বুজ বুজ করে ফুট তোলে, লাটাচুলী সাতনলা কাঁধে নিয়ে ঘুর ঘুর করলে কোন লাটায়, কোন গাছের মগডালে কপতি-ক্যারকেটা বসে বসে ঝিমায়, শিস দিলেই খাঁচার কয়ের, খাঁচার গুড়ুর ডাকতে শুরু করলে কোথায় কোন ডুংরিতে, কোন বনধারে গলা কাঁপাতে কাঁপাতে ‘ক-এ ক-ক’ ‘গু-ড়্-ড়্-ড়্-ড়্’ ডাক ছেড়ে দৌড়ে আসবে বনের পাখ্―সেসব মুখস্থ ধর বলে যাব গড় গড় করে―

অথবা

‘টুইলা’-য় ছড় টেনে গাইতে বল গেয়ে যাব উধাস হয়ে―

‘এ হাটর পাঁচ পাইক দেউছি হাঁক-ডাক

হাট সরি গনে ভেট পাউ নাই

কী রে মন জানু নাহি কি―

আ গো মোহে পড়ি ভুলা মন ভুলু কাঁহি কি।

জাগিছি কাল চঞ্চলা―

জানু নাহি কী সোনার পিঞ্জরে শুয়া

দিন কাটে নুয়া নুয়া―

হিয়া উড়ি গনে ভেট পাউ নাহি কি

শূন্যরে ভাসুছি ভেলা―মন শুনু নাহি কি।।’

[ভবের হাটে পাঁচ পাইক ডাক দিয়েছে

হাট শেষে তারা ভেট নেবে

মন তুমি কি জানো না―

ওগো ভোলা মন, তুমি ভুলছ কেন মোহে পড়ে।

জেগে আছে কাল-চঞ্চলা

জানো নাকি সোনার খাঁচায় হিয়া

নব নব দিন গত হলে

হিয়া-পাখি উড়ে গেলে―কে ভেট দেবে―

শূন্যে ভাসছে জীবন―ভোলা মন, শুনতে পাচ্ছ না ॥’]

রাতের পাহারাদার লোকটাকে ‘বাপ’ পর্যন্ত বললাম, ‘বাপ, এখন ত আমার আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। জঙ্গলে আমাদের ঘর―সে ঘরে ‘কাঁটা-দুয়ারী’ করে এসেছি আজ প্রায় তিন দিন হতে চলল! তার পিছুকে বাপটা গেল, মায়ের নাকি ‘স্টোক’ হয়েছে, বাঁচবে কি তার ঠিক নাই। এর’ম অবস্থায় রাতটুকুন যদি থাকতে দিস  বাপ―তবে ভারী ‘উবকার’ হয়!’

 গেটের কাছে টুলে বসে হাতের চেটোয় খৈনি ডলতে ডলতে পাহারাদার লোকটা জানতে চাইল, ‘কান্টাদুয়ারী ? উহ ক্যায়সা চিজ হ্যায় ?’

 বুঝলাম ত্যাঁদোড় লোকটা একটুকু নরম হয়েছে, এদিকে খেয়ে দেয়ে আমার মন-টাও বেশ ভালো ভালো, টুলের কাছে থ্যাবড়ে মাটিতে বসে পড়ে দু হাঁটুতে দুহাত রেখে তার সঙ্গে জুড়ে দিলাম ‘কান্টাদুয়ারী’-র গল্প, সবটা মা-বাবা জানে, তবু আমি যেটুকু জানি।

গ্রামে-ঘরে ভূত-প্রেত ডাইনি-যুগনি ত আছেই, বাটে-ঘাটে টাঁড়ে-টিকরে গাছে-পাতায় বিলে-বাতানে―কোথায় কোথায় না ‘তেনারা’ থাকেন!

‘সবু পরব ভালা ঘুরি ঘুরি আও তো মানুষ ম-র-লে নাহি আসে’―মায়ের সেই কথা! সব পরব, উৎসব-অনুষ্ঠান, ঘুরেফিরে বছরের কোনও না কোনও দিন আসেই, কিন্তু মানুষ একবার মরে গেলে আর ফিরে আসে না।

 আসে না বটে, তবে ঘরে ফেরার, ঘরের লোকেদের কাছে ফিরে আসার আহিঙ্কাটুকু ত থাকেই। তাই তারা ঘরের আশেপাশেই ঘুরঘুর করে, এ গাছ সে গাছে মাঝেমধ্যেই ঝাঁপ দেয় ঝুপ ঝুপ করে, গাছের ডাল ভেঙে দেয় মট মট করে, হঠাৎ হঠাৎ।

 এ সবই ফাঁকতালে ফেলে যাওয়া নিজেদের ঘরে ঢুকবার অছিলা, তার উপর আমাদের গ্রামটা ত বাঁধগোড়ায়, অঝোরঝরর্ জঙ্গলের ভেতরে। কত রকম ঝাঁপুড়ঝুপুড় গাছ―নিম-বাঁশ-চল্লা-তেঁতুল-জইড়-বড়্-মহুল-কুচলা, কেঁদ-কুসুম-শাঁসড়া-পাকৌড়, ভাদু-ভেলা-বাদভেলা গাছপালায় ঢাকা―

 যেমন আমাদের ঘরের ছামুতেই ত আছে―বেল-ডুমৌর, একটা কাঁটাভরতি ‘ভাবুর’ অর্থাৎ বাবলা গাছ আর কুচলাগাছ!―এই সমস্ত গাছে নানা রকমের ভূতপ্রেতের বাস―বরহমভূত, গো-মুহা ভূত, ঝাঁপড়ি, ধনকুঁদরা কাইলা ‘কুঁদরা’, কালমুহী, চিড়িকিনী―

‘চিড়িকিনী’―ওই যারা নদীর বালুচরে, শ্মশানে, খালমোহানায়, ঢড়হাধারে, উদমা-ডাঙায় ভরসন্ধ্যায় রাতের অন্ধকারে কখনও একটা, কখনও দুটো হয়ে চিড়িক চিড়িক করে জ্বলে, জ্বলতে জ্বলতে ক্রমশ এগিয়ে আসে গ্রাম-গঞ্জের দিকে, মকাইবিলের টোঙে লোভে লোভে, বিশেষ করে অবিবাহিত একলা যুবকের কাছে―তারা কেউই রক্তমাংসের মানুষ নয়, তারা সব অশরীরী, ভূতপ্রেত!

 সব মেয়েমানুষ মরলেই ত আর ভূত হয় না, ভূত হয় তারাই যাদের ‘আহিঙ্কা’ থাকে, যারা আত্মহত্যা করে, আর যারা গর্ভবতী অবস্থায় পেটে সন্তান নিয়ে মরে, যাদের পোড়ানো হয় না, মরলে যাদের মাটিতে তুপে দেওয়া হয়!

 গলায় দড়ি দিয়ে মরলে―সে হয় একটা ‘চিড়িকিনী’, তার জন্য দপ্ করে একটা আলোই জ্বলে, গর্ভাবস্থায় সন্তানসহ মরলে দুটো, দপ দপ করে আগে ও পিছে আলো জ্বলে দু-দুটো।

‘বরহম ভূত’ ত মহা ঘোড়েল ভূত! কখন যে চুপিসারে ছল করে ঢুকে আসে একদম মাঝুঘরে। একবার হয়েছিল কী, আমাদের গ্রামের বধিরাম মাঝরাতে টোকামাথায় মাছ ধরার ঘুনি-হাতে বেরিয়ে পড়েছিল বাঁধগোড়ায়, বিলে-বাতানে।

সঞ্ঝা থেকেই দমে ঝড়িয়া হচ্ছিল, হচ্ছে ত হচ্ছেই, মাঝরাতের দিকে টুকচার যা ধরেছিল। বধিরাম জানে, এই সময় আল-কাটানের মুখে বেশ জুত করে ঘুনি পেতে দিলেই চ্যাঙ-গোড়ুই পুঁটি-সরপুটি ছলছলিয়ে ছাঁকা হয়ে উঠে আসবে!

বধিরাম বেরিয়ে গেল আর ঝুপ করে বরহম ভূত বেলগাছ থেকে নেমে সোজা ঘুমে-কাদা বধিরামের বউয়ের পাশটিতে রুম রুম শুয়ে পড়ল!

 মাছটাছ ধরে ঘরে ফিরে গলাখাঁকারি দিয়ে বধিরাম বউকে ডাকছে, ‘এ-এ-এ মুড়ি, খুল! আগুড়টা খুল ন―দ্যাক ন মার্ক- অ-অ-ত মাছ এনেছি!’

 স্বামীর ডাকে ধড়ফড়িয়ে উঠল বধিরামের বউ―অ্যাঁ ? ডাকছে বধিরাম ? বিছানায় পোঁদ উলটে শুয়ে আছে এই বেধুয়ামড়া কে বটে তবে ? কে-এ-এ-এ ?’

 বুদ্ধি করে বধিরামের বউ মাচিস কাঠি জ্বেলে যেই আগুড়টা খুলেছে অমনি বধিরাম ঘরে ঢুকে পড়ল আর সে বেরিয়ে গেল!

জাপটে ধরেছিল বৈকি বধিরাম―কেমন সারা গা রোঁয়া রোঁয়া, ঠান্ডা, হিমঠান্ডা! এতটাই ত্যাঁদোড় বেলগাছের ‘বরহম্ ভূত’!

আর, ‘কালিয়া কুদরা বাড়ির ভূত। খুকড়া দিলেই চাপচুপ’―সে ত যেন ঘরেরই ভূত, নিয়মিত তার উদ্দেশে মুরগা বলি দিলে তবে সে চুপ থাকে, নচেৎ সারারাত ধরে সে যা-তা কাণ্ড করে।

হনুমানের মতো গাছে গাছে লাফায়। ধুপ ধাপ শব্দ করে লাফ দিয়ে গৃহস্থের ঘরের চালে গিয়ে পড়ে। চালের খড়-পাতা সরিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকতে চায়। কালো রংয়ের ছাগল খায়, শুওর খায়।

আমাদের কেউ মারা গেলে তাকে কাপড়ে মুড়ে বাবুই দড়ির খাটিয়ায় শুইয়ে চারজন লোক চার কাঁধে তুলে দাহ করতে শ্মশানে নিয়ে যায়। শ্মশানযাত্রার সময় তার মাথার কাছে অবশ্য অবশ্যই রাখতে হয় লোহার ‘জাল-কাঁঠি’ অথবা লোহাধাতুরই অন্য কোনও দ্রব্যাদি।

অন্যথায় কোনও অনিষ্টকারী প্রেতাত্মা তার শরীরের ভেতর ঢুকে পড়ে। শ্মশান-যাত্রীদেরও ছুঁয়ে থাকতে হয় লোহার দ্রব্যাদি।

দাহটাহ হয়ে গেলে ঘরে ফেরার সময় খাটিয়ার দড়ি দিয়েই মড়ার খাটটাকে কোনও গাছের সঙ্গে বেঁধে সেই ঘাট বা দড়ি ডিঙিয়ে পার হতে হয় শ্মশানযাত্রীদের।

পেরিয়ে এসে যাকে পোড়ানো হলো তাকে উদ্দেশ্য করে জনে জনে বলতে হয়―‘ঘরে আর তুই আসতে পারবি না। তোর আসার পথে এই আমরা কাঁটা বিছিয়ে দিলাম!’

আমরাও যখন ঘর ছেড়ে চারজন―মা, বাবা, নাকফুঁড়ি আর আমি―বেরিয়ে এলাম, তখন আমাদের বাবাই আমাদের ছেড়ে আসা ঘরে ‘বরহম’ ‘কুঁদরা’ বা অপরাপর আর কোনও দুষ্টু প্রেতাত্মাই যাতে না সেঁধোতে পারে, তার জন্য বিড় বিড় করে মন্ত্র পড়ে ঘরের দুয়ারের মুখটায় আচ্ছা করে ‘ভাবুর কাঁটা’ বিছিয়ে রেখে এসেছেন―দারোয়ানবাবা একেই বলে ‘কান্টাদুয়ারি’!

‘হাঁ, হ্যাঁ’―

বলেই হাতের তালুতে ডলতে থাকা খৈনি এতক্ষণে মুখে পুরে ‘গরমেন্টের ডিপটিবালে’ দারোয়ানটি খানিক চোখ বুজে থাকল।

তারপর চোখ খুলে তার বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে পু-চু-র করে একদলা ‘ছেপ’ ফেলে বলল, ‘কান্টাদুয়ারি বারে মেঁ যো কুছ বোলা―মুঝে সমুচা সমঝ লিয়া। কাহে ন সমঝে ? লেও বেটা, পহলে হম ভি তো গাঁওবালে আদমি থে!

 লেকিন আজকা হম দেহাত সে আ কর শহরবালে ‘বাবু’ বনগয়ি’―

হাজারিবাগ জেলার গিরিডির আশপাশ শাল-মহুল-হুর্তুকীর জঙ্গলের নজদিগ তারও নাকি গেরাম ছিল, নিজস্ব খেতিবাড়ি ছিল।

‘গেঁহু-মকাই-অড়হর-মুশুরি-মুঙ―ক্যায়া ক্যায়া চিজে আবাদ হৈ ন!’ চোখ বুজে দারোয়ানজি যেন মনে করে করে একে একে বলতে লাগল―‘গাঁওকে আশপাশ পেড়োকা ডালমেঁ কেতনা ভূত-পিচাস-দৈৎ-দানো, বরহম্ দৈৎ, কারিয়া পিরেত বা―ইধর উধর অগল বগলমেঁ ঠারতা হৈ, ঘুমতা-ফিরতা হৈ। ‘কান্টাদুয়ারি’ আভি হম্ সমঝ্ গয়ে বেটে, লেও!’

 বলেই সে টুল থেকে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। হাসপাতালখানারই স্যুটবুট পরা একজন লোক, হয়তো ‘ডাগতর-টাগতর’-ই হবেন, ‘ভটভটি বাইক’ ঠেলতে ঠেলতে গেটের কাছে এসে গেলেন।

অমনি পাহারাদার লোকটা তাকে লম্বা সেলাম ঠুকে গেট খুলে দিল। বুঝলাম―লোকটা পাহারাদার বাবারও বাবা বটে। একেই ধরতে পারলে রাতটা এখানেই নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেয়া যায়!

যেমনি ভাবা অমনি কাজ―কিন্তু, ওই বলে না, ‘অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায় ?’ গেট খোলামাত্রই ডাগতর ডাগতর লোকটা বাইকে চড়েই কাঁড়বাঁশের ছেড়ে দেওয়া পাটনের মতোই ভুস করে কোনদিকে যে উড়ে গেল―টের পাওয়ার আগেই ততোধিক করিৎকর্মা পাহারাদার লোকটা গেট বন্ধ করে দিল ঘড়াঙ করে!

‘মেঘপাতাল’-এ মেঘের ঝলকানির মতোই চকিতে মনে হয়েছিল বৈকি―আমি কি গেটের বাইরে না ভেতরে ? চোখ সয়ে যেতেই বুঝতে পারলাম-না, যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি।

 রাতের পাহারাদার লোকটাও ফের টুলে বসে নিজের কথাই বলতে শুরু করল―এখন সে আর ‘গাঁওবালে জঙলি আদমি’ নেই, রীতিমতো লিখহাই-পড়হাই’ করা শউরে পণ্ডিত আছে, হাসপাতালখানার কোয়ার্টারেই থাকে।

গুন গুন করে দু হাতে তালি মেরে একটা গীতের দু-চার কলিও শুনিয়ে দিল সে―

‘বুঝ বুঝ পণ্ডিত পদ নিরবাণ।

সাঁজ পর কহবাঁ বসে ভান ।।

উঁচ নীচ পর্বত ঢেলা না ইঁট।

বিনু গায়ন তহবাঁ উঠে গীত।।’

কে জানে কী মানে! কিন্তু গান থামিয়ে সে বলল―‘জঙ্গল কি অন্দরমেঁ যো লোগ রহতি, উহ তো জঙলি আদমি, মতলব জানবরকি মাফিক, উহ লোগোনে তো ‘জোঁদা’ ‘নালসে পিঁপড়া কা আন্ডা’ ‘চুহা-চুটিয়া’ খাতেই, ভূত-পিরেৎ-পিচাস-উচাস বিশওয়াস করতেই, ‘লেকিন―গাঁও ছোড়কর শহরবাজার আনেসে উহি ফিকির-উকির নাহি চলে গা, নাহি চলে গা’―

তখন আমার রাগ চড়ে গেল মাথায়! আরে বানচোৎ! কোথাকার শিয়াল পণ্ডিত রে তুই ? তুই কি ‘বি-ডি-ও’ ‘এস-ডি-ও’ ‘ইস্কুল নিসপেটর’ ? আমাদের নদী-সেপারের ভাঙ্গুসোল বড় ইস্কুলের হেড়মাস্টর দিবাকর বড়পণ্ডার থেকেও বড় ? পঞ্চাৎ পরধান মেনকারানি সিং-ও কি তোর থেকে কম পণ্ডিত ?

 সে তখনও বলে চলেছে―‘শহর-বাজার আনেসে ওহি প্রকার গাঁওকে রহনেবালা ভূত-‘বরহম দৈৎ’ ‘কারিয়া পিরেত বা’-হর ভূত ল্যাজুড় গুটা কর দৌড়তে হৈ, ভাগতে হৈ। আরে বেটে, যাঁহা শহরবাজারমেঁ ক্যাতনা নয়ি নয়ি চিজোঁসে জানপহেচান হোতে রহতেঁ হৈ―কি তুম-লোগ এহি সকল রুণ্ডু উরুণ্ডু ভূতবালে কোই ভুল যাবেই যাবে গা।

মুঝে দেখ-ওহি শালপেড়কে নিচে এহি গেটসে অন্দর হম্ টুলমেঁ বৈঠ কর হররাত ডিপটি করদা। লেকিন―কোঈ ভূত পিরেৎ পিচাস উচাস আভিতক তো নাহি দেখা!’

মাথা তুলে সত্যি সত্যিই গেটের কাছেই অবস্থিত সুবিশাল শালগাছটাকে দেখলাম। শহরবাজারেও এমন অঝোর ঝরশালগাছ আছে তাহলে ? তাও এক-আধটা নয়, একসঙ্গে দু-দশটা ?

বিজলিবাতির আলো পড়ে শালগাছের চকচকে পালহাপতরগুলো আরওই ঝকমকাচ্ছে। বিজলিবাতির আলোয় পষ্টাপষ্টি দেখা যাচ্ছে―শালগাছের ঝোড়ে একটা বিজোড়, দলছুট ‘ক্যারকেটা’ চোখের মামড়ি ঢেকে ঘুমোচ্ছে।

কথায় আছে না―‘ক্যারকেটা পড়েছে ফাঁদে, মাছরাঙা ডাঙায় কাঁদে ?’ ক্যারকেটা আর ফাঁদে পড়ল কই ? ওই তো সে এখন চোখ বুজে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে শালগাছের মগডালে! বরঞ্চ ‘মাছরাঁকা’ (মাছের লোভী) হয়ে ডাঙায় ফাঁদে পড়ে আমিই তো ‘কঁহরাচ্ছি’, তার মানে কাঁদছি!

শুনেছি ‘বরহম্ ভূত’ নানারকম ভেক ধরে―কখনও ‘ছুঁচিয়া’ হয়ে ‘চিক চিক’ করে মানুষের দুপায়ের ফাঁক দিয়ে গলে পড়তে চায়, আর গললেই ত মরণ! তে-রাত্তিরও পোহায় না।

কখনও ভেক ধরে ‘গো-মুহা’ অর্থাৎ গরুর মুখের। জবুথবু হয়ে বসে থাকে রাস্তার ধারে, মচর মচর করে জাবরও কাটে। গায়ে মানুষের ছায়া পড়লেই ধারণ করে স্বমূর্তি!

আচমকা মনে হলো―‘ক্যারকেটা’ কেন হবে, ‘বরহম্ ভূত’-ই ক্যারকেটা সেজে শালগাছের মগডালে মটকা মেরে পড়ে আছে! শুনছে এই ভূতে-অবিশ্বাসী খৈনিখোর ডিপটিবালে লোকটার চ্যাটাং চ্যাটাং কথা।

জানে না ত, রাত নিশুতি হলেই ‘চা রা রা রা রা রা’ করে লাফ দিয়ে পড়বে তার ঘাড়ের উপর―টেনে শাঁকনলা ছিঁড়ে ফেলবে তার ?

সে-ভূত আবার আমার যেন কোনও ক্ষতি না করে বসে! তাই বিড় বিড় করে কড়ে আঙুল দাঁতে কামড়ে বুকে থুথু ফেলে বাপের কাছে শোনা মন্তর আউড়ালাম―

‘চিৎপটাং দিয়ে আছে দাঁত গিজড়ে।

মরেছে না বেঁচেছে দেখ শালা চোখ তেড়ে।।

মার শালাকে ধর শালাকে ফেল শালাকে কুলঝাড়ে।

চিৎপটাং দিয়ে আছে দাঁত গিজড়ে।।’

হ্যান-ত্যান―কত কী ভাবছি, ভাবছি এই জন্য যে কী করে কড়া ‘ডিপটিবালে’ লোকটাকে পটিয়ে-সটিয়ে আজকের রাতটুকু হাসপাতালখানার ভেতরেই কাটিয়ে দেওয়া যায়! এখনও ত গেটের বাইরে বের করে দেয়নি ঘাড় ধরে!

মনে ত হয় ধীরে ধীরে ধাতস্থ হচ্ছে লোকটা। ফের খৈনির গুটুল বের করে দোক্তায় চুন মিশিয়ে ডলতে শুরু করল সে।

ডলতে ডলতে ভূত-পেরেত পিচাস-উচাস ছেড়ে এবার জিজ্ঞাসা করল―‘জঙ্গল কি অন্দরমেঁ আভি আভি যো চল রহা হ্যায়, উস কি বিলকুল গরিব লোগোকো ভালাই কে লিয়ে ? কা ফায়দা ? কুছ বেনিফিট মিলতেই কী ? মালুম হ্যায় ক্যায়া বেটে ?’

মালুম নেই মানে ? হাড়ে হাড়েই ত টের পাচ্ছি! তবু কী বললে লোকটা খুশি হবে ভেবে পাচ্ছি না। তাই চুপ করে আছি।

―‘মালুম নাহি বা ?’

ফের জিজ্ঞাসা করায় জোরে জোরে মাথা নাড়লাম। কথা বলার দরকার কি―‘জ্ঞেয়ান’ দিচ্ছে লোকটা, দিক!

পাহারাদার ‘ডিপটিবালে’ মানুষটা এবার তরিবৎ করে খৈনি ডলতে লাগল চুপচাপ। আয়েস করে থাপ্পড় মেরে ফুঁ দিয়ে খৈনির ধুলো ঝাড়ল, তারপর ডানহাতের দু-আঙুলের চিমটে করে খৈনি তুলে মুখে পুরল।

সবকিছুই লোকটা এত ধীরেসুস্থে ঠান্ডা মাথায় করে যাচ্ছে যে, দেখে শুনে মনে হচ্ছে তার চাইতে সুখী মানুষ এই ভূ-ভারতে আর বুঝি দুটি নেই!

জানি, এবার সে পু-চু-র করে থুথু ফেলবে, ফেললও। থুথু-টুথু ফেলে বলল, ‘লেকিন-মালুম ক্যায়সে হোগা, বেটে! তু তো কালকা-যুগি, না-বালক আছে। সমঝ্ লে, ইয়াদ রাখ―ইসমে আচ্ছি তরোসে ‘পলিটিকস কা খেল, নেতা-নেত্রী লোগোকোঁ নওটংকি ছুপা রহতা হৈ।’

বলেই আমার মুখের উপর ফটক বন্ধ করে দিল দড়াম করে।

কিছুক্ষণ ফটকের বাইরে অভাগার মতো মন খারাপ নিয়ে ঘোরাঘুরি করলাম, এত রাত্তিরে আর যাই কোথায়, অচেনা অজানা জায়গা ? ক্ষুধাতেষ্টাতেও যার পর নেই কাহিল হয়ে পড়েছি, একরকম চলৎশক্তিহীন। ভেতরে থাকলেও না হয় হাসপাতালখানার রোগী মানুষদের এঁটোকাঁটাও যা হোক তা হোক করে জুটে যেত, এখন সে-গুড়েও বালি!

 বন্ধ দরজার দিকে একদৃষ্টিতে হাঁ করে হাবাগোবার মতো তাকিয়ে আছি, খাবারদাবার জোটে জুটুক আর নাই জুটুক, আমার মা-ই তো পড়ে আছে ওধারে, আমার নিজের মা, বিপদের সময় ওর কাছে থাকার, অন্তত আশপাশে থাকার হকও ত আছে আমার!

হঠাৎ ফটকের দু ধারে দু-দুটো ঝাঁকড়া শালগাছের মাথার উপর কোত্থেকে বিজলি বাতির আলো এসে ঝিলিক মারল, ওই যেখানে একটুকচার আগেও একলা একটা  ‘ক্যারকেটা পাখ’ চামড়ায় চোখ ঢেকে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল, ওই ত এখনও সে ঘুমোচ্ছে, কেমন ভাবনাচিন্তাহীন, নিশ্চিন্তে!

 ঘুমোচ্ছে, ঘুমোচ্ছে!

 মনে ত হয় দূরের কোনও চলমান গাড়ির আলো, যেমনটা জঙ্গলের ভেতরে থেকেও খড়গপুরের রাবণপোড়ার আলো কী সার্কাসের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চতুর্দিকে ফোকাস ফেলার আলো উঁচু টিলায় না উঠেও আমরা দেখতে পেতাম।

আলো জ্বলে উঠেছিল, আলো নিভেও গেল। আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আমিও ‘ক্যাঁকলাশ’-এর গতিবেগে চুপিসারে তরতরিয়ে দু-দুটো ঝাঁকড়া শালগাছের একটায়, ওই যেখানে একলা ক্যারকেটাটা, উঠে পড়লাম।

 রাতের পাখটা উড়ে গেল না, যেমন চামড়ায় চোখ ঢেকে ঘুমোচ্ছিল, ঘুমোতে লাগল। আমিও তদ্রƒপ তার অদূরে দু-দুটো ডালের খাঁজে পিঠ ঠেকিয়ে খানিক শুয়ে থাকলাম, মনে মনে ভাবছিলাম, এখানেই এমনিভাবে রাতটা কাটিয়ে দিলেও ত মন্দ হয় না!

আর, বনে জঙ্গলে ভোর ভোর মহুল-কচড়া, এটা ওটা ফুলফল অন্যদের চেয়ে আগেভাগে কুড়োনোর তাগিদে রাতভর গাছের ডালে ঘুমিয়ে রাত কাটানোর অভ্যাস তো আমার কাছে কিছু নতুন নয়।

হঠাৎ ডান-বাম দুদিকেরই আলো চোখে এসে পড়ল, এক চোখে হাসপাতাল-খানার দোতলা তিনতলার ঝুরকার ভেতর দিয়ে ঠিকরে পড়া আলো, আরেক চোখে বড় রাস্তার চলমান গাড়িঘোড়া ও দোকানপাটের আলো।

এখন আমি যে কোনও দিকেই চলে যেতে পারি, গাছ থেকে ঝাঁপ মেরে হাসপাতালখানার ভেতরে, ওই যেখানে কড়া ‘ডিপটিবালে’ লোকটা ফটক বন্ধ করে এখন টুলে বসে ফের খৈনি ডলছে, সেখানেই।

আর নয়তো গাছ থেকে নেমে চলে যাব বড় রাস্তায়, শহরবাজারের দিকে।

দুদিকেই মিললেও মিলতে পারে খাবারদাবার, এঁটোকাঁটা। যেটা এখন খুবই দরকার, পেটটাও মোচড় দিয়ে উঠছে ক্ষণেক ক্ষণ, কিন্তু, হাসপাতালখানার নজদিগ লাফ দিয়ে পড়লে সে বাঘের মুখেই পড়বে, সেই কড়া ‘ডিপটিবালে’ লোকটা তাকে পাকড়াও করে ‘জিহলখানা’-য় ভরে দেবে, নচেৎ ডান্ডা মেরে হাড়গোড় ভেঙে দেবে!

হাঁকোড় পাঁকোড় করে গাছ থেকে নেমে হাঁটতে লাগলাম বড় রাস্তার দিকে, অচেনা অজানা শহরবাজারের দিকে, কে জানে বাজারটার কী নামধাম! পাক্কি সড়ক, সড়কের দুই ধারে থুম্বা থুম্বা জঙলি শালগাছ, তার কানচল ঘেঁষে বিজলিবাতির তার, আলোর ডুম জ্বলছে।

দু ধারে বাবুভায়াদের সাজানো গোছানো ঘর, রং-বেরংয়ের ডুম জ্বলছে, তবে এখন পর্যন্ত একটাও লোক দেখি না, হ্যাল হ্যাল করতে করতে কোত্থেকে একটা কুকুর এসে সামনে সামনে চলতে লাগল, যেন একটা ‘কালিয়া কুঁদরা’ আমাকে ‘নিশান’ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে।

কিন্তু পাড়ার কুকুর ত পাড়া ছেড়ে বে-পাড়ায় যায় না, যেই সীমা-চৌহদ্দি ফুরালো অমনি সে পিছু হটল, কোত্থেকে আরেকটা এসে তার জায়গা নিল, এমনি করে চার-চারটে নিশানদার কুকুরের পালা শেষ হলে আমি বড় রাস্তায় পা রাখলাম।

আমাদের দেশে-ঘরে একটা গান আছে :

‘বারিপাদা শহরে গাড়ি চলে রগড়ে।

দাদা গ দিদি গ, চল যাব টাটানগরে।।’

এই শহরের কালাচ সাপের মতো পিচ রাস্তায়ও গাড়ি রগড়ে চলেছে, হুঁকরে চলেছে। পিচরাস্তার দু ধারে ঈষৎ উঁচু পাক্কি রাস্তায় বহুৎ লোক যাচ্ছে আসছে, আমিও গমনকারী লোকজনের পিছু ধরলাম।

একটা তে-রাস্তা পড়ল, সামনে বড় রাস্তা, ডাইনে-বাঁয়ে ঈষৎ ছোট রাস্তা, বড় রাস্তা আর বাঁদিকের ছোট রাস্তা ঘেঁষে একটা মন্দির, তার চূড়োওয়ালা ধজাধারী গোলাকার ছাদে কয়েকটা বাঁদর শুয়ে বসে এর-ওর গা চুলকোচ্ছে, যেমনটা স্বভাব, আর মাঝেমধ্যেই হু-উ-প হু-উ-প আওয়াজ করছে।

পরের পর তিন-তিনটে কালো ঢাউস মিলিটারি গাড়ি বড় রাস্তা দিয়ে আচমকা হুঁকরে ছুটে গেল, ‘ডরপেলকু’ আমিও দৌড়ে এক ঝটকায় মন্দিরের ভেতরে ঢুকে পড়লাম, মন্দিরের আগুড় ত খোলাই ছিল, লোধাছেলে বলে কেউ নিষেধও করল না।

ঢুকেই দেখি, ‘কালুয়া ষাঁড়’! সাদা পাথরের উপর কুচকুচে কালো পাথরের তৈরি  ষাঁড়, তার মানে ভোলে বাবা শিবের মন্দির। এমনটা আমাদের ওদিকেও আছে।

‘কালুয়া ষাঁড়কে কোলে নিয়ে বেদির চারধারে তিন-তিনবার ঘুরতে হয়, ঘুরলেই নাকি মনষ্কামনা পূরণ হয়। আমি ত কত মন্দিরে তিনের জায়গায় তিন তিন ছয়, ছয় তিন নবারও ঘুরেছি!

এখানেও ‘কালুয়া ষাঁড়’-কে কোলে তুলে ঘুরবার বাসনা হয়েছিল বৈকি, কিন্তু উপস্থিত ‘লায়া’ ‘দেহুরি’-রা মানা করায় সে-ইচ্ছা পূরণ হলো না, নাকি বাবা ‘কালুয়া ষাঁড়’ রাতের খাবার খেয়ে দেয়ে এখন নিদ্রা গেছেন!

‘কে তুমি বাবা ?

‘লায়া’ বা বাভনঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন।

আমি আমার কথা, বোন নাকফুঁড়ির কথা, বাবার কথা, মায়ের কথা, এমনকি হাসপাতালখানায় গরমেন্টের ‘ডিপটিবালে’ দারোয়ানের কথা, মায় জঙ্গলমহলের পরিস্থিতির কথাও তাঁকে জানালাম।

বাভনঠাকুর সদয় হয়ে তাঁর চেলা-চামুণ্ডাদের, ওই যারা বসে বসে কল্কে মুখে দিয়ে কীসব খাচ্ছিল, তাদের আদেশ করলেন, ‘অনাথ বাচ্চাটাকে ভোলেবাবার ভোগ দে, আহা! কতদিন খেতে পায়নি রে!’

সাক্ষাৎ যেন ভগবানই হবেন! তাঁর দেওয়া খিচুড়ি ভোগ খেয়ে যার পর নেই সুখ-শান্তি পেলাম, তার উপর ক্ষীরিভোগ, যেন ‘অম্রুতো’-ই বটে!

খাওয়াদাওয়া চুকেবুকে গেলে ঠাকুরকে ঘুমাবার শয্যা পেতে দিয়ে বাভনঠাকুর চটি জুতা পায়ে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন, কলকেয় কীসব ভরে তখনও খেয়ে যাচ্ছিল বাকি লোকগুলো, কিছুক্ষণ পরে তারাও দুয়ারে কুলুপ মেরে যে যার ঘরমুখো হলো।

যথারীতি আমি মন্দিরের বাইরেই পড়ে থাকলাম, একবার ভাবলাম চাতালেই পড়ে থাকি, বাকি রাতটুকু এখানেই কাটাই। কিন্তু চেলাচামুণ্ডাদের একজন বলল, ‘এখানে না, হাসপাতালে যা, আর নচেৎ―’

বলেই একটা গলির দিকে যেতে ইশারা করল সে, আমি ফের হাসপাতালে না গিয়ে গলিঘুঁজির দিকে যাওয়াই ভালো মনে করলাম।

প্রায় অন্ধকার গলিঘুঁজি, কোথাও কদাচিৎ এক-আধটা বিজলি বাতি, অজস্র গুমটি ঘর, যেমনটা হাটেবাজারে দেখা যায়।

গুমটি ঘরগুলোয় কোথাও কোথাও মাচান বাঁধা, তার মানে দোকানিরা আজকের রাতের জন্য মালপত্র তুলে নিয়ে চলে গিয়েছে, ফের কাল সকালবেলা এসে দোকান সাজিয়ে  বসে যাবে। 

আলো-আঁধারিতেও বুঝা যাচ্ছে একেকটা গুমটিঘরে একাধিক লোক আস্তানা গেড়ে বসে আছে, হয়তো রাতটুকুর জন্যই। আমিও ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছি, একটা খালি গুমটির সন্ধান যদি পেয়ে যাই!

যেখানে আলো নেই, হাঁতড়ে হাঁতড়ে খুঁজে চলেছি, দৈবাৎ কারওর গায়ে হাত পড়ে গেলে সে চিল-চিৎকার করে মারতে আসে, আমি দৌড়ে দৌড়ে পালাই, তবু হাল ছাড়ি না, জায়গা ‘একটুক’ ত আমাকে পেতেই হবে, অন্তত রাতটুকুর জন্য হলেও! 

এর মধ্যেই কোথাও যেন ঝগড়া বেঁধে গেল, ঝগড়া মারামারির পর্যায়ে উঠল, তার পরে পরেই কেউ যেন ইনিয়ে বিনিয়ে সুরুক সুরুক করে কাঁদতে লাগল, কাঁদছে, কেঁদেই চলেছে কেঁদেই চলেছে।

একটুক্ষণ পরে আবার কেউ যেন হেসে উঠল, গিল গিল খিল খিল করে হাসি, হাসতে হাসতে সে যেন পাগল হয়ে গেল, হাসছে তো হাসছেই, হেসেই চলেছে।

তবে কি জায়গাটা পাগলাখানা নাকি ?

সারা দিনমান গুমটিতে গুমটিতে দোকানিদের বেচাকেনা চলেছে, হয়তো সঞ্ঝা পর্যন্ত তারা খরিদ্দার সামলেছে, তারপর যেই বটুয়া খুলে পয়সা গোনাগুনতি শেষ করে বাড়ির পথ ধরেছে, অমনি চা-রা-রা-রা করে কোত্থেকে পাগলের দল এসে গুমটির দখল নিয়েছে ?

নাকি দোকানদারেরাই বেচাকেনার লাভ-লোকসান হিসাব করার পরে পরেই খুশিতে ও দুঃখে হাসাহাসি করছে, কান্নাকাটি করছে, খুনসুটি করছে ?

কেমন যেন ভয়-ভয় ডর-ডর লাগছিল! কোনও প্রকার ভূতপেরেত বোঙাবুঙির ব্যাপার-স্যাপার নয়তো ?

আচমকা কে যেন যাত্রাপালার রাজারাজড়ার ঢঙে ‘পাট’ মুখস্থ বলে উঠল―

‘তোলো মুখ মোছো আঁখি জল

লো মানিনী, হেসে কথা কও!

কোথা তব সুধাকন্ঠী সখীগণ ?

আনত নয়ন কী কারণ ?’

মাথামুণ্ডু কোনও কিছুই বুঝলাম না, তবু মনটা ভালো হয়ে উঠল, যাক, ভালো লোকও আছে তাহলে! কেবল বাট-ভিখারি, পাগলছাগল, কানাখোঁড়া, মোদোমাতাল নয়, ফাঁকা গুমটিঘরগুলো তাহলে দূর দূর জায়গা থেকে শহরে এসে বিপাকে পড়া, আশ্রয়-না-পাওয়া মানুষদেরও আশ্রয়স্থল।

 হাতড়ে হাতড়ে ফাঁকা গুমটি, অন্তত একটা, খুঁজেই চলেছি খুঁজেই চলেছি, অবশেষে আঁধারেরও বেশি আঁধার একটা জায়গায় একটা গুমটি খুঁজে পেলাম, পরখ করে দেখলাম, না, সেখানে আর কোনও দ্বিতীয় জনপ্রাণি নেই।

লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে মাচানে উঠে বসলাম। ভরতি পেট নিয়ে আরামসে ঘুমাতে যাচ্ছি আর দেখি কি একটা কালো তস্য কালো কুকুর এসে মাচানের নিচেয় দুই দুই চার পা ছড়িয়ে লেট হয়ে শুয়ে পড়ল!

এই রে! ‘কালিয়া কুঁদরা’ নয় ত! সেই বলে না, ‘কালিয়া কুঁদরা বাড়ির ভূত, খুকড়া পেলেই চাপচুপ ?’ কালিয়া কুঁদরা রে, আমি ত ল্যাংটা সহায়সম্বলহীন, এই দোকান গুমটিতে তোর সন্তুষ্টির জন্য খুকড়া কোথায় পাব, এই নে লাথ খা!

বলেই মাচান থেকে পা বাড়িয়ে জোরসে এক লাথ্ কষালাম! কুকুরটা কোথাও উঠে গেল না, কাঁই কুঁই একটিবার চিৎকার করে ফের শুয়ে থাকল। মনে হলো, হাসপাতাল-খানার সেই কুকুরটাই হবে।

থাকুক, থাকুক সে রাতের ভরসাদার হয়ে, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম, দু চোখের পাতায় ঘুম ত জড়িয়ে আসছিল! কঘড়ির রাত হবে কে জানে, হঠাৎ কুকুরটা চিৎকার করতে করতে দৌড়ে গেল।

কোথাও চেঁচামেচি চেল্লামেল্লি হচ্ছে, বিকট চিৎকার করে কে যেন ভক করে কেঁদে উঠল, কেঁদে উঠেই থেমে গেল। তার কিছুক্ষণ পরেই আমার গুমটির পাশ দিয়ে দুজন লোক, দু জনই হবে, দৌড়ুতে দৌড়ুতে বলতে বলতে গেল, ‘গঙার ‘গাঁজিয়া’-য় নাকি মেলা টাকাপুইসা ছিল!’

‘গঙা’ ? তার মানে বোবা নাকি ?

হবে হয়তো। আবার নাও হতে পারে, নামও হতে পারে।  লোকে ত ‘গঙা’ ‘গঙা’-ই করছিল! নাকি ভিক্ষা মেঙে মেঙে অনেক টাকাপুইসা গাঁজিয়ায় গুঁজে কোমরে বেঁধে রেখেছিল।

‘উ-হেই’ কী কেঁদে উঠেছিল ? ওকেই কি কেউ বা কারা মারধর করছিল ? একেবারে কি মেরে ফেলল ? ওইজন্যই কি ভক করে কেঁদে উঠে পরক্ষণেই থেমে গেল ?

আবারও গোটাকতক লোক লদোপদো করে দৌড়ে গেল, তাদের পিছু পিছু আরও কতক গুমটিবাসী হা-ঘরে মানুষজন!

কেউ বা কারা কি ওদের পিছু পিছু ধাওয়া করেছিল ? খেদিয়ে নিয়ে আসছিল ? ওরাই কি ‘গঙা’-কে খুন করে তার যথাসর্বস্ব কেড়ে নিয়ে পালাচ্ছিল ? 

কে জানে কী! হঠাৎ রাস্তায় ঘণ্টি বাজিয়ে মিলিটারি গাড়ি হুঁকরে ছুটে এল, গুমটির মাচান থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে গুমটির তলায় সেঁধিয়ে লুকিয়ে গেলাম। 

মুহূর্তেই ঘুমন্ত বাজারের গুমটি ঘরগুলো অগুনতি টিপা-লাইটের আলোয় আলোময় হয়ে উঠল, জায়গাটা জুড়ে ভারী বুটের লাগাতার দৌড়াদৌড়ি, দাপাদাপি শুরু হয়ে গেল।

কেউ কেউ ধরা পড়ল, কেউ কেউ মরি-কি-বাঁচি দৌড়াল। আমি বুঢ়বকের মতন দাঁড়িয়ে থাকলাম এক-দু দণ্ড, কী করব ? আমি ত কোনও দোষত্রুটি করিনি, ‘গঙা’-র পকেটমারি, উঁহু, গাঁজিয়ামারিও করিনি।

তব্বে ? তার বেলা ?

এক্ষেত্রে, আমি আমার সেই মায়ের মতো, ‘কার খাই না ধারি যে অমন পড়ি-কি-মরি দৌড়াব ?’

দৌড়াব না, দৌড়াব না―এখানেই দাঁড়িয়ে থেকে রঙ্গতামাশা দেখব, কথা বলতে হয় টেঁটিয়ার মতো কথা বলব, নচেৎ দাঁড়িয়ে থেকে খালি খালি আঙুল মটকাব!

কিন্তু সে আর কতক্ষণ! এক-দুমিনিটও কাটল না, নিজের অজান্তেই দৌড়াতে শুরু করলাম―দৌড়―দৌড়―

জঙ্গলে দিনে-রাতে আলোয়-আঁধারে লাটায় পাটায় কাঁটায় খোঁচায় এমন দৌড় কত, কত যে দৌড়েছি!

দৌড়ুতে দৌড়ুতে শহরবাজারের সীমাচৌহদ্দিও ছাড়িয়ে এলাম, বিজলিবাতির ঝলকানিও শেষ হলো, এখন শুধুই ভুসো-পড়া কালো হাঁড়ির মতোই অন্ধকার।

অন্ধকার, অন্ধকার।

এদিকটা শহরবাজারের পুব না পশ্চিম, উত্তর না দক্ষিণ কোনও কিছুই আমার মালুম নেই, যাচ্ছি ত যাচ্ছি, দৌড়ুচ্ছি ত দৌড়ুচ্ছি। ‘মেঘপাতাল’-এ গিজ গিজ করছে তারা―‘একটি তারা দুটি তারা, কোন তারাটা আরাঝারা―’

কোনটা সাতভায়া, কোনটা দধিভারিয়া, কোনটা কালপুরুষা, কোনটা রাবণরাজার সিংদরজার তারা―বহিন নাকফুঁড়ি থাকলে এক্ষুনি এক্ষুনি চিনিয়ে দিত।

বোধহয় জঙ্গল পড়ল-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাস্তা, ওই ত দুধারে শাল আসন কেঁদ কইম―অন্ধকারেও ‘ঠিকেই’ চিনতে পারছি, জাত-ভাইয়েদের মতো।

ভারী বুটের দুড়দাড় আওয়াজ থেকে অনেক, ‘আনেক’ দূরে এসে পড়েছি, ধরাছোঁয়ার বাইরে, এই রাতে জঙ্গলের ভেতরে আর যাওয়া ঠিক হবে না, ভেবেচিন্তে একটা ঝাঁকড়া শালগাছে চড়ে বসলাম, রাতটা এখানেই কাটিয়ে দিই!

তিন দিকে তিনটে ফ্যাঁকড়া মেলে ধরা ডালের খাঁজে ফের পিঠ ঠেকিয়ে আধশোওয়া হলাম। এখন আমার চোখের সামনে শালগাছের কতক ডালপালা, তারা ভরা ‘মেঘপাতাল’, আজ চারঘড়ি না পাঁচঘড়ির ‘জন’, তবে তার এখনও দেখা নাই।

অনেক দূরে দূরে শহরবাজারের বিজলিবাতির ঈষৎ ঝলকানি, যেন জ্বলছে নিভছে, জ্বলছে নিভছে। দু-চাট্টা ভুঁড়া শিয়াল গর্ত থেকে বেরিয়ে উলুক ভুলুক করতে করতে গাছের তলা দিয়ে চলে যাচ্ছে, হয়তো কাছেপিঠের কোনও খাল-ধারে, কাঁকড়ার খোঁজে।

পোঁদ ফেড়ে রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা ডাকছে জঙ্গলে, রিঁ-ই রিঁ-ই রিঁ-ই রিঁ-ই! মিলিটারি লোকটা রিঁ-রি-আঁ পোকাকে কী যেন বলেছিল, কী যেন ? হ্যাঁ, ঝিঁঝিঁপোকা।

কোত্থেকে দু-দুটো রিঁ-রিঁ-আঁ পোকা ধরে এনে মাটিতে গুঁজে দিয়ে বোন নাকফুঁড়ি বলেছিল, ‘আজ থাক, কাল তোদের বিয়ে দেব!’ কাল কালই থেকে গেল, বিয়ে দেওয়া আর হলো না, কাল হয়ে গেল বোনটাই!

একসঙ্গে ঘর ছেড়ে ছিলাম আমরা চারজন। বাবা চলে গেল, বোনও। মা এখন হাসপাতালখানায়, কে জানে এতক্ষণে মরে গেছে কি বেঁচে আছে!

ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরের দিন সকালবেলায় রাস্তা খুঁজে খুঁজে ঠিক হাজির হলাম হাসপাতালখানায়।

বাজারের গুমটি ঘরগুলোর ভেতর দিয়েই ত এলাম! দোকানপাট দিব্যি বসেছে, কেনাবেচাও হচ্ছে। গতকাল রাতে যে গুমটিটায় ছিলাম, আন্দাজ করে সেখানেও কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম।

পিতল-কাঁসার থালাবাসনের দোকান। সেই কালিয়া কুঁদরা কুকুরটা গুমটির গা ঘেঁষে এখনও পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে, কাছে গেলাম।

ঘুম ভেঙে জেগে উঠে ল্যাজ নাড়ছিল, চাঁদিতে হাতও রাখলাম। তারপরই ত হাসপাতালখানার দিকে দিশা করে হেঁটে এলাম। কুকুরটাও পিছু পিছু আসছিল, রাস্তার এধার ওধার করতে গিয়ে কোথায় হারিয়ে গেল!

হাসপাতালখানার ‘গরমেন্টের কড়া ডিপটিবালে’ লোকটা আজ আর নেই, তার জায়গায় অন্য লোক গেট খুলে বসে আছে। আমি চোখের আড়াল হতেই সুড়ুৎ করে ভেতরে ঢুকে এলাম, শুধু আমি কেন, কত লোকই ত যাচ্ছে আসছে!

সাদা শাড়ি সাদা হাত-জামা, মাথায়ও সাদা রংয়ের কুঁচি-দেয়া টুপি, পায়ের ‘এড়ি’-তে ভর দিয়ে সামান্য উঁচু হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে সেদিনকার মতো কাকে যেন, বোধহয় আমাকেই, খুঁজছেন।

চোখে চোখ পড়তেই হাত নেড়ে ডাকলেন, যেন আমি আসবই তাঁর জানা ছিল। তাঁর কাছে পৌঁছে কাঁদুলমাদুল হয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমার মা― ?’

‘আয়, আগে ত কিছু খা! কিছু খাসনি তো ?’

মাথা নাড়লাম জোরে জোরেই।

‘তবে, আয়!’ বলেই একতলা না দোতলা, নাকি অন্য কোথাও আমাকে নিয়ে গেলেন, নিয়ে গেলেন একটা খাবার ঘরে।

সেখানে অন্যরা খাচ্ছিল, আমাকেও খেতে বসিয়ে খাবার ‘অড়ার’ দিয়ে, দোকানিকে খাবার দিতে বলে গটমট করে কোথায় যেন চলে যাচ্ছিলেন, আমি দৌড়ে গিয়ে ফের জানতে চাইলাম, ‘আমার মা― ?’

বললেন, ‘যা! আগে তো খা, কতক্ষণ খাসনি রে!’

বলেই চলে গেলেন মেমসাহেব দিদি। আমি যা যা খাবার তা তো গপাগপ খেলামই, অধিকন্তু আরও আরও খাবার খেতে চাইলাম, যেন জন্মের খাওয়া একবারেই খেয়ে নিচ্ছি! তাছাড়া মাগনা ত!

খেয়েদেয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ির মুখটায় ঘোরাঘুরি করছি, মাঝেমধ্যেই থুতনি উঁচু করে একতলা দোতলা তেতালার দিকে তাকাচ্ছি।

তাকাচ্ছি ত তাকাচ্ছি! ভ্যাল ভ্যাল করে।

হঠাৎ মাথায় সাদা রংয়ের ফেট্টি বাঁধা দিদিমণিটা বাইরে বেরিয়ে আমায় দেখতে পেয়ে বলল, ‘কচি রে! কাল রাতেই মা তোর মারা গেছে, বাবু রে! দেখতে চাস যদি তো এদিক দিয়ে উপরে উঠে আয়!’

আমি কোনও কিছুই না বুঝে সিঁড়ি ভেঙে দৌড়ুতে দৌড়ুতে উপরে উঠে গেলাম, দেখলাম ধবধবে সাদা বিছানায় মা আমার শুয়ে আছে।

যাক, তবু ত মা আমার এতদিনে একটা লাউফুলের মতো সাদা ধবধবে বিছানা পেয়েছে, বাবার মতোই গায়ের উপর সাদা কাপড়ে দেহ-মুখ ঢাকা।

মা তো আর নয়, একটা লাশ। এতক্ষণে আবারও আঙুলের কড় গুনে গুনে হিসাব করলাম, আমাদের পরিবারের আমরা চারজন একসঙ্গে ঘর ছেড়েছিলাম, এখন আমরা একজন।

একজন! একজন!!

আমি ফের সিঁড়ি ভেঙে দৌড়ুতে দৌড়ুতে নিচেয় নেমে এসে দৌড়ুচ্ছি ত দৌড়ুচ্ছি, দিগি¦দিকজ্ঞানশূন্য হয়ে, যেদিকে দু চোখ যায়!

পিছনে মাথায় সাদা কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা দিদিমণিটাও যেন দৌড়ুতে দৌড়ুতে পিছনে পিছনে ডাকতে ডাকতে আসছেন, ‘কচি রে! মাকে ছেড়ে একেবারে চলে যাস না রে! যাস না!’

 এ সময়ই কোথাও যেন ‘রিঁ-রিঁ-আঁ’ পোকা ডাকছে, ‘রিঁ-ই-ই-ই! রিঁ-ই-ই-ই!! রিঁ-ই-ই-ই!!!’―

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button