আর্কাইভউপন্যাস

উপন্যাস : কার্নিসে কালো সাপ : মনি হায়দার

তুমি আমার বন্ধুর সঙ্গে…প্রিয় স্ত্রী জাহানারা লাইজুর দিকে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কনক করিম।

শোয়া থেকে উঠে বসে জাহানারা লাইজু, আরে তুমি চটছো কেন ? আমি তো আধঘণ্টা ধরে তোমাকে বুঝিয়ে বললাম।

কী বুঝিয়ে বললে ? বললে তুমি আমার বন্ধু মহিবুর মুহিবের সঙ্গে শুইতে চাও ? আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি লাইজু, তুমি কেমন করে ভাবতে পারলে… আর সেটা আমার সম্মতিতে ? বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায় কনক করিম। তুমি আমাকে কী মনে করো ? তোমার হাতের আড়াই প্যাঁচের জিলাপি ?

খুলে যাওয়া চুলের বেণী দু হাতে বাঁধতে বাঁধতে গভীর চোখে তাকায় লাইজু, কনক ? তুমি যা বলছো, ভেবেচিন্তে বলছো ? আমি তোমাকে জিলাপির প্যাঁচ দিলাম কেমন করে ? আমার মনে একটা ভাবনা এসেছে, সেই ভাবনা তোমার সঙ্গে একান্তে শেয়ার করলাম মাত্র।

বড় বড় চোখে স্ত্রী জাহানারা লাইজুর দিকে তাকিয়ে থাকে কনক। বিশ্বাসই করতে পারছে না, লাইজু এমন একটা খাপছাড়া বিদঘুটে কুৎসিত প্রস্তাব দিতে পারে ? এই কুৎসিত ভাবনাটা ওর মাথায় কবে প্রবেশ করেছে ? মানে―আমরা যখন শারীরিকভাবে মিলিত হই, তখন লাইজু আমার পরিবর্তে বন্ধু মুহিবকে ভাবে ? দীর্ঘ ষোলো বছরের বিবাহিত জীবনে লাইজু ছাড়া কোনও নারীর প্রতি সামান্যতম আকর্ষণ অনুভব করিনি আমি। অফিসের বর্ণালী দাস তো সব নিয়ে বসে আছে, কিন্তু আমি তো লাইজুর জন্য ফিরেও তাকাই না। কিন্তু লাইজু, আমার বিবাহিত সুন্দরী স্ত্রী আমার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে আমারই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে শয্যায় যেতে চায় ? জগতে এমন ঘটনা কেউ শুনেছে ?

তুমি গরুর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন ? খুব স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করে জাহানারা লাইজু।

স্ত্রী লাইজুর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করে কনক, কবে থেকে তুমি মহিবুরকে নিয়ে ভাবছো ?

কপালে আস্তে করে ডান হাতে আঘাত করে লাইজু, যার জন্য করতে চাইলাম চুরি সেই আমাকে এখন ফাঁদে আটকাতে চায় ? লাইজু বিছানা থেকে নেমে কনকের শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়―তুমি এত ভুল বুঝলে কেন ? আমি কী এমন অপরাধ করেছি যে মাঝরাতে বিছানা থেকে নেমে এলে ?

নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে নেয় কনক করিম, তুমি আমার কাছে এসো না।

মানে কী ? চিৎকার করে লাইজু। তুমি পাগলের মতো আচরণ করছো বুঝতে পারছো ? এই পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে তুমি আমাকে এই চিনলে ? আমি এই পরিকল্পনা করেছি আমার জন্য না তোমার জন্য ?

হতবাক কনক করিম, আমার বন্ধু মহিবুরের সঙ্গে শয্যায় যেতে চাইছো আমার জন্য ?

হ্যাঁ তোমার জন্য, আমার জন্য―আমাদের দুজনার জন্য… সংসারটা টিকিয়ে রাখার জন্য, এই পরিকল্পনায় আমার লজ্জা লাগছে না ? অপমান লাগছে না ? আর তুমি… গলা ভারী হয়ে আসে জাহানারা লাইজুর, এত সুন্দর করে বুঝিয়ে বললাম তোমাকে, তুমি উলটো বুঝলে। আসলে পুরুষ কী বোঝে, বোঝে আমার স্ত্রী। স্ত্রীর শরীর। কিন্তু শরীরের মধ্যে মন মান সম্মান মাতৃত্ব―এসব কিছুই বুঝতে চায় না―চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়লে লাইজু আঁচলে মুছতে মুছতে পাশের বাথরুমে ঢোকে।

কনক করিম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। 

হ্যাঁ মহিবুর মুহিব আমার চেয়ে সুঠাম শরীরের, দীর্ঘদেহী। মাথায় ঘন কালো চুল। পাশে দাঁড়ালে আমাকে ওর কর্মচারী মনে হয়। কিন্তু লাইজু কি কেবল সন্তানের জন্য শয্যায় যেতে চায় ? নাকি প্রেমে পড়েছে ? বিশেষ করে মাস ছয় আগে ইন্ডিয়া থেকে আসার পরই আমি ওর মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখছি―আগের মতো উচ্ছল না। কেমন একটা চিন্তার মধ্যে ডুবে থাকে। সেই চিন্তা কি মহিবুর মুহিবের সঙ্গে বিছানায় যাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা ? আর সেটা আমাকেই আয়োজন করতে হবে ? কীভাবে সম্ভব ? কেন ? ওর মাথা ঠিক নেই―রুমের মধ্যে আপনমনে পায়চারি করতে করতে নিজের মনে সিদ্ধান্ত নেয় কনক, একটা সন্তানের জন্য ওর হাহাকারটা বোঝা দরকার আমার। গতকাল ওর ছোট বোন এলে বাসাটা হেসে উঠেছিল।

লাইজুর ছোট বোন রেহানা পারভিন। দুটো বাচ্চা রেহানা পারভীনের, বড়টা মেয়ে চন্দ্র আর ছোটটা ছেলে রিংকু। সারাক্ষণ ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে হাসি আনন্দে মুখর ছিল লাইজু। বুঝতে পারে, একটা শিশুর জন্য মা হিসেবে ওর ভেতরের হাহাকার। রেহানা আবার মা হবে, তিন মাস চলছে।

টেবিলে খেতে খেতে হাসি-ঠাট্টার ছলে কনক বলেছিল রেহানাকে, রেহানা তোমার তো তিনজন বাবু।

তিনজন কই দুলাভাই, দুজন। রিংকু আর চন্দ্র।

তোমার বোন যে বলল, আর একজন আসছে।

লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে মুখ লুকায় রেহানা, আপনি না…

শোনো―ইলিশ মাছের ঝোলের সঙ্গে ভাত মাখতে মাখতে বলে কনক করিম, একটা বাচ্চা আমাদের দাও না। খুব আদরে মমতায় আগলে রাখবে তোমার আপা। আর আমি তো আছিই…

রেগে যায় জাহানারা লাইজু, তোমাকে এই প্রস্তাব দিতে কে বলছে ? কোনও মা কি সন্তানকে পালক দিতে রাজি হয় ? তোমার আসলে কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই।

মুখে হাসি এনে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করে কনক, আরে আমি সত্যি সত্যি বলছি নাকি। এমনি বললাম। আর রেহানা তো আমাদের পর না, আপন ছোট বোন।

সেটাই যদি বোঝো, তাহলে তোমার বোন বিলকিসের তো পাঁচ ছেলেমেয়ে, একটাকে নিয়ে এসো। দেখি, কেমন ভালোবাসে তোমার বোন তোমাকে! লাইজুর গলায় তীব্র শ্লেষ। রেহানাকে চোখের সামনে পেয়ে একেবারে…

আপা, অনেকটা ধমকের সুর রেহানা পারভীনের চড়া সুর―দুলাভাই তো এমন কথা আমাকে বলতেই পারে। তুমি চুপ থাকো।

ভাতের থালা সামনে ঠেলে ককিয়ে ওঠে লাইজু, আরে তুই জানিস না, লোকটার জন্য আমার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেল। জীবনে না পেলাম সংসারের সুখ না পেলাম সন্তানের সুখ…

সামনে এখনও সময় আছে তোমাদে…

না, তুই জানিস না, মুখের কথা কেড়ে নেয় জাহানারা লাইজু, আমি আর জীবনে মা হতে পারব না। দিল্লির ডাক্তার জানিয়েছে… ভেতরের দুঃখকাতরতায় সব বলে যাচ্ছিল রেহানাকে, কিন্তু কনকের দিকে চোখ প[তে নিজেকে সামলে খাওয়ার টেবিল ছেড়ে দ্রুত চলে যায় লাইজু। খাবার টেবিলে নেমে আসে কবরের নিস্তব্ধতা। রেহানা সুলতানা খুব ভালোবাসে দুলাভাই কনক করিমকে। মানুষটা খুব সহজ-সরল। কিন্তু নিজের বড় বোন সর্ম্পকে কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। বড় আপা যখন ভালো আচরণ করেন, তখন অনেক সময়েই বেশিই করেন। কিন্তু রেগে গেলে অথবা ভুল বুঝলে পরিস্থিতি জটিল করে ফেলেন মুহূর্তে। দুলাভাইয়ের একটা বাক্য থেকে গোটা পরিস্থিতি পালটে দিলেন।

কিন্তু  থাইল্যান্ডের ডাক্তার কী জানিয়েছে ? নিশ্চয়ই দুলাভাই পিতা হওয়ার উপযুক্ত নয়। কমতো হলো না, প্রায় চৌদ্দ বছরের বিবাহিত জীবনে একটা বাচ্চাও এল না, এমন কী ভ্রƒণেরও জন্ম হয়নি।

মা! চার বছরের রিংকুর গলা, আমি ভাত খাব না।

একটা সুযোগ পায় রেহানা নীরবতা ভাঙার, খাবে না ? আর একটু ঝোল দেই মুরগির মাংসের ? তুমি তো পছন্দ করো…

না, ঝাল লাগে।

ঠিক আছে, উঠে যাও। বেসিনে হাত ধুইয়ে দাও চন্দ্র।

চন্দ্র বুঝতে পারে পরিস্থিতি জটিল। বাধ্যগত ছাত্রের মতো উঠে বেসিনের কাছে যায়। নিজের হাত পরিষ্কার করে ছোট ভাই রিংকুর হাত পরিষ্কার করে বারান্দায় চলে যায় দুজনে। হাতের মধ্যে ভাতের দলা নিয়ে চুপচাপ বসেছিল কনক করিম। মনে হচ্ছিল সারা জীবনের সঞ্চিত সম্মান মুহূর্তে মাটিতে পড়ে ছড়িয়ে গেছে ধুলোবালির সঙ্গে। সমাজ সংসারের কত বিচিত্র ধরনের মুখ ও মুখোশ থাকে। একটি মাত্র বাক্যে কনকের মনে হলো, রেহানা আর কোনওদিন আমাকে সম্মান করবে না। ও জেনে গেছে, আমার কারণে ওর বোন মা হতে পারছে না। মা হতে পারছে না, এই একটি কারণে জীবনের সকল সুখ সম্মান বিজর্সন দিতে হলো ?

দুলাভাই ?

রেহানার ডাকে চমকে তাকায় কনক, কী বলো ?

চুপচাপ বসে আছেন কেন ? কাছে এগিয়ে আসে, বসে পাশের চেয়ারে―আপা কখন কী বলে, ঠিক আছে ? আপনি খেয়ে নিন।

খাব ?

হাসে রেহানা, খাবেন না তো কী বসে বসে ভাত গুনবেন ?

আচ্ছা, কনক হাতের ভাত মুখে দেয়। দেশি মুরগির ঝাল  মেশানো ঝোল খুব পছন্দ কনকের। লাইজু সেটাই রান্না করেছিল। খেতেও খুব সুস্বাদু লাগছিল কিন্তু এই মুহূর্তের লোকমা মুখে দিয়ে মনে হলো ভাত ও তরকারির মধ্যে থেকে গন্ধ আসছে। খাবারটাও বিস্বাদ লাগছে।

রেহানা, খেতে ইচ্ছে করছে না, উঠে যায় বেসিনের কাছে হাত ধোয়ার জন্য। রেহানা কী করবে, বুঝে উঠতে পারছে না। টেবিলের থালা বাটি গুছিয়ে রেখে বারান্দায় যায়, বাচ্চাদের কাছে। কনক করিম আগেই খাওয়ার রুম থেকে বের হয়ে গেছে।

দুই

তুমি আমার পিছনে ঘুর ঘুর কর কেন ? রোকেয়া হলের সামনে খালি রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ফুকচাঅলার কাছে ফুচকার অর্ডার দিয়েছে লাইজু।

সামনে এসে দাঁড়ায় কনক করিম, মুখে অবারিত হাসি―তোমাকে দেখতে এলাম।

খিল খিল হাসিতে তরঙ্গ তোলে জাহানারা লাইজু, তুমি আমাকে দেখতে এসেছো ? তোমার সঙ্গে তো আধঘণ্টা আগে ক্লাসে দেখা হলো। হলো না ?

সেটা তো ক্লাসে বদ্ধ জায়গায়, মাথা ঘোরায় কনক কিন্তু এই আকাশের নিচে মহামান্য রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের হলের পাশে তোমাকে দেখার সাধই আলাদা। অন্যরকম…

তাই নাকি ? শরীর দুলিয়ে আবারও হাসিতে ভেঙে পড়ে জাহানারা লাইজু। মাথা নাড়ায় কনক, জি ম্যাম। আপনাকে আমার দৃষ্টিতে এক নজর দেখার জন্য ছুটে এসেছি।

ফুচকাঅলা ফুচকা বানিয়ে বাড়িয়ে ধরে, আপা নেন।

আমাকেও একটা দাও ভাই, অনুরোধ করে কনক করিম। আমার ফুচকায় পিঁয়াজ দেবে বেশি, ঝালও দেবে।

বোম্বাই মরিচ দেব মামা ?

ঘাড় নাড়ে কনক, দাও কিন্তু অল্প করে।

মুখের মধ্যে ফুচকা চালান করে চিবাতে চিবাতে বলে লাইজু , তুমি এত ঝাল কেমনে খাও বুঝতে পারি না।

ঝাল ছাড়া ফুচকা চটপটি খেয়ে মজা পাই না, লাইজুর হাত থেকে একটা ফুচকা তুলে মুখে দেয় কনক, মজা তো!

হ্যাঁ, মামা সব সময়ে মজার ফুচকা বানায়।

ফুচকাঅলা ফুচকা বানিয়ে বাড়িয়ে ধরে কনকের দিকে, মামা আপনার ফুচকা।

ফুচকা হাতে নিয়ে মুখে দেয় কনক। দুজনে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে। ক্লাস শেষ করে অর্থনীতির দ্বিতীয় বর্ষের দীপালি রায় আর শান্তা মরিয়ম হলে ঢোকার মুখে লাইজু আর কনককে দেখে এগিয়ে আসে।

আমাদের হলের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া চলবে না, চলবে না―এক ধরনের স্লোগান তুলে সামনে দাঁড়ায় দীপালি আর মরিয়ম।  

ওই মিয়ারা, ঝালে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে নিতে  জবাব দেয় লাইজু, তোমাদের রোকেয়া হল, আমার কী ? আমি কোথায় থাকি ?

আপা, আপনে চুপ থাকেন। দুপুর বেলা দুলাভাইরে একটু ফুচকা টাইট দিই আর কী, হাসতে থাকে শান্তা।

কী বললে, দুলাভাই ? কে তোমাদের দুলাভাই ?

আপা, আমরা সব জানি…।

কী জানো ? বলো―বললে এক একজনকে দশ প্লেট ফুচকা খাওয়াবো, জবাব দেয় কনক করিম।

সত্যি খাওয়াবেন দশ প্লেট ফুচকা ? লাফিয়ে ওঠে দীপালি।

হাসে কনক, মিথ্যা আমি বলি না। তোমাদের লাইজু আপার বর কে, যদি সত্যি সত্যি বলতে পারো―তোমাদের প্রত্যেককে দশ প্লেট ফুচকা খাওয়াবো।

কথা দিলেন ? আরও পাকা কথায় শান দেয় মরিয়ম।

ফুকচা মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে বলে কনক, তোমরা মেয়েরা, মগজে কোনও সাহসই রাখো না। বলছি তো আকাশ বাতাস সাক্ষী রাইখা―তোমাদের লাইজু আপার বর কে, বলতে পারলে প্রত্যেককে দশ প্লেট ফুচকা খাওয়াবো।

আমাদের লাইজু আপার বরতা আপনি, মরিয়ম তাকায় জাহানারা লাইজুর দিকে, কী আপা সত্যি বলছি ?

লাইজুর  ফুকচা খাওয়া শেষ, তাকায় মরিয়মের দিকে―তুই হলের রুমে যাবি না ? তখন মজা দেখাব। দেখি তোর রাঙা দুলাভাই তোকে কীভাবে রক্ষা করে ?

মনটা খারাপ হয়ে যায় মরিয়মের, আপা রাগ করলেন ? দুলাভাই তো কতবার কইল, আপনি তো তহন কিছু কইলেন না। আমি হাচা কইলাম―হেইডা দোষ অইল ?

 শুনছেন দুলাভাই, আপনার সামনে আপনার বউ আমাদের শাসাচ্ছে, আপনি চুপ কেন ? দীপালি রায় এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় কনকের কাছে।

শোন, তোমাদের কথায় তোমাদের আপা দারুণ আনন্দিত, কারণ তোমরা সত্য প্রকাশ করেছো। আনন্দে ওরকম একটু-আধটু ভয় দেখায় মেয়েরা―নাও, একের পর এক ফুচকা খেতে থাকো―চাচা, তাকায় ফুচকাঅলার দিকে, ওদের ফুচকা দিন, একেক জনকে দশ প্লেট। টাকা অ্যাডভান্স নিন―পকেট থেকে টাকা বের করে দেয়। ফুচকাঅলা টাকা গুনে হাসতে হাসতে পকেটে রাখে।

প্রচণ্ড গম্ভীর হওয়ার ভান করে জাহানারা লাইজু, আমি হলে যাচ্ছি। উঠে দাঁড়ায়।

আমাকে রেখে কোথায় যাচ্ছো লাইজু মিস ? চট করে সামনে এসে পথ জুড়ে দাঁড়ায় কনক। চলো―

কোথায় যাব ?

তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই, খুউব সুন্দর জায়গা। দেখলেই তোমার ভালো লাগবে। চলো―ডান হাত ধরে লাইজুর।

তোমার সাহস অনেক বেড়েছে চান্দু, তুমি এখন আমার হাত ধরেছো―

আপু, দুলাভাই হাত ধরবে না তো আপনার হাত কে ধরবে ? ফুচকা খেতে খেতে ফোঁড়ন কাটে দীপালি রায়। দুলাভাই অনেক ভালো লোক, যান, যেখানে নিয়ে যেতে চায়, যান। ভালো লাগবে আপনার।

ফুচকা খেয়েই এত দালালি ?

দুলাভাই তো! কৌতুকের স্বরে বলে দীপালি রায়।

এই রিকশাঅলা যাবে ? পাশ দিয়ে একটা রিকশা যাচ্ছিল, কনকের ডাকে থামে।

কই যাইবেন মামা ?

কনক রিকশায় উঠতে উঠতে বলে―চলো, যেদিকে দু চোখ যায়―এক ধরনের টেনেই রিকশায় তোলে লাইজুকে। দুজনে উঠে বসলে রিকশা চলতে শুরু করে। শাহবাগের দিকে যেতে যেতে রিকশাঅলা পিছনে ফিরে জিজ্ঞেস করে, মামা কই যামু ?

ধানমন্ডির দিকে যাও। কনক তাকায় লাইজুর দিকে, তুমি এত গম্ভীর কেন লাইজু ?

আমাকে টেনে আনলে কেন ?

আনব না তো কী করব ? তুমি তো আমাকে পাত্তাই দিচ্ছো না। সেই সেকেন্ড ইয়ার থেকে তোমার…

কী আমার ?

তোমার পিছনে ঘুরছি চরকির মতো। তুমি আমাকে পাত্তাই দিচ্ছো না, আমার মনটাকে বুঝতেই চাইছ না।  তোমার মন বুঝতে আমার ইচ্ছে করে না!

কনক হাতটা ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। বাতাস কেটে কেটে রিকশা এগিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে লাইজুর চুল উড়ছে। একটা রিকশা ওদের রিকশা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে, রিকশায় একটা মেয়ে একটা ছেলে। ছেলেটা প্রায় জড়িয়ে ধরেছে এক হাতে মেয়েটিকে। মেয়েটি উপভোগ করছে প্রিয় মানুষের এই অন্তরঙ্গতার অত্যাচার। আশেপাশের রিকশার যাত্রীরা দেখছে আর হাসছে। অনেকের চোখে মুখে বিরক্তির প্রকাশও ঘটছে।

কিন্তু কনক হাত ছেড়ে দেওয়ায় খারাপ লাগছে লাইজুর। হাতটা ধরে যখন ছিল কনক, ভেতরে একটা আনন্দ তরঙ্গ বইছিল নিবিড়ের গহিনে। আসলে কনককে পছন্দই করে লাইজু। কিন্তু প্রকাশ করে না। এই যে একটা তরতাজা ছেলে প্রেম অনুরাগে ওর পিছনে পিছনে ঘুরছে, যত্ন নিচ্ছে―ভীষণ উপভোগ করে লাইজু। কিন্তু ভাব দেখায়, হালকা বিরক্ত ও। ক্লাসের বন্ধুরা নানাভাবে উৎসাহ জোগায়, কেউ কেউ ঠাট্টা করে দুজনকে নিয়ে, কনক করিম নির্বিকার। কিন্তু লাইজুর মাঝে মধ্যে খারাপ লাগে―একজন পুরুষকে কেন ভালো লাগবে ? ভালো না লাগলে কী করা যায় ? জোর তো করা যায় না। শুরুর দিকে, যখন বুঝতে পারছিল কনক ওর প্রতি আগ্রহী, দুর্বল, যখন তখন তাকিয়ে থাকে। নানা ছুতোয় পাশে পাশে থাকার চেষ্টা করে―নোটের খাতা রাত জেগে লিখে পরের দিনে দেয়, ভালোই লাগে।

রিকশা থামে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ির সামনে। রিকশা ভাড়া দিয়ে ব্রিজ পার হয়ে বত্রিশ নম্বর বাড়ির উলটোদিকে ছায়া সুনিবিড় বৃক্ষের নিচে পাকা বেঞ্চে বসে, পাশাপাশি। বসার সঙ্গে সঙ্গে বাদামঅলা হাজির, নেবেন মামা ?

দাও দশ টাকার বাদাম।

বাদামঅলা দ্রুত বাদাম দিয়ে চলে যায়। লাইজু নীরব। অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল, কনক করিমের কাছে একদিন জবাব দিতেই হবে। সেই জবাবের সময়টা ঠিকই নির্বাচন করেছে কনক। ফাইনাল পরীক্ষার আর মাত্র তিন মাস বাকি। পরীক্ষার পর কে কোথায় চলে যাবে, ঠিক আছে ?

কনক বাদাম খুঁটে হাতে দেয় লাইজুর। লাইজু একটা বাদাম মুখে দিয়ে চিবোতে থাকে, নুন আছে ?

নাও, পাশে কাগজের উপর রাখা বিট লবণ দেখিয়ে দেয়। বাদামের সঙ্গে বিট লবণ মুখে দিলে খুব ভালো লাগে লাইজুর। জিহ্বার সঙ্গে মুখের সংযোগ ঘটিয়ে মুখ মোচরায়..।

ভালো লাগছে ?

মাথা নাড়ায় লাইজু, খুউব। আর জায়গাটও ভীষণ সুন্দর।

অনেক দিন তোমাকে চেয়েছি এখানে নিয়ে আসতে কিন্তু তুমি রাজি হওনি। কেন ?

কনক, তোমাকে আমার প্রকৃত সত্যটা বলি ? বলব ?

তোমার প্রকৃত সত্যটা শুনবার জন্য এখানে নিয়ে এসেছি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে―দিনের পর দিন তুমি আমাকে অপেক্ষায় রাখছো। এখন বলো, তোমার সত্যটা।

তুমি মানুষ এবং বন্ধু হিসেবে অসাধারণ সন্দেহ নাই। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা আমার দিক থেকে তোমাকে জানাতে চাই…

থামলে কেন ? নিঃসংকোচে বলো। আমি কিছুই মনে করব না। কষ্ট পেলেও তো একটা রেজাল্ট পাব।

আমি তোমাকে অনুভব করি কিন্তু…

ভালোবাসলে আবার কিন্তু কেন ?

তুমি আমি তো একই ক্লাসের…

তো ?

একই বয়সেরও…

হ্যাঁ, তুমি আমি একই ক্লাসের, একই বয়সের― সমস্যাটা কোথায় ? অসহিষ্ণু মনে হয় কনক করিমের গলা।

আমাকে অনেকে বলেছে একই ক্লাসের একই বয়সের দম্পতিরা দাম্পত্যজীবনে সুখী হয় না।

তাই ?

হ্যাঁ।

হাসে কনক করিম, তোমার এই ধারণা শুনে আমার ভীষণ ভালো লাগল। কারণ, তুমি আমাদের রসায়নটা নিয়ে অনেক ভেবেছো। তোমার এই ভাবনাটাই আমাকে আনন্দ ও সুখ দিচ্ছে। এখন শোনো, বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। নইলে দুজনেই পস্তাতাম। আমি তোমার জন্ম তারিখ জানি―তুমিও আমারটা জানো। আমি তোমার থেকে কম পক্ষে তিন বছরের বড়। এমন কী চার বছরও হতে পারে―

কীভাবে ? চমকে যায় লাইজু।

আমি যখন এইটে পড়ি তখন আমার শক্ত টাইফয়েড হয়েছিল। মফসসলের ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। তখন আব্বা আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। পিজি হসপিটালে আমি প্রায় এক বছর চিকিৎসাধীন ছিলাম। অনেক টাকাও খরচ হয়েছিল। তিন বছর পর স্কুলে যাই আবার। স্বাভাবিকভাবে আমার বয়স কমিয়ে লেখা হয়েছিল। সেই সময়ে তো জন্ম তারিখ লিখে রাখার প্রচলন ছিল না। আমি হিসেব করে দেখেছি―আমার ক্লাসের বন্ধুদের চেয়ে আমি তিন থেকে চার বছরের বড় বয়সে। কিন্তু সেটা আমার কাছে বড় বিষয় না। আমি বয়স অতিক্রম করে মানুষের অন্তর আত্মার কাছে পৌঁছে যেতে চাই, যেমন চাই তোমার অন্তর আত্মার কাছে আমার আত্মাকে লগ্নি করে রাখতে… হাত ধরো আমার, তোমার সন্দেহটা গেছে লাইজু ?

লাইজু বিস্ময়ে দুটি আঁখি তুলে তাকিয়ে থাকে কনক করিমের দিকে, করিমের মধ্যে চমৎকার একটা মন আছে, অন্তরবোধ আছে, নিঃসন্দেহে নিজেকে নিবেদন করা যায়―তুমি আগে যদি বলতে তাহলে তো এত কষ্ট পেতে হতো না। সামান্য একটা বিষয়।

হাসে কনক, একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে লাইজুর―তুমিও তো আগে বলতে পারতে তোমার মনের এই জটিলতাটুকু ? বললে না কেন ?

অনেকবার ভেবেছি, তোমাকে বলব কিন্তু কেমন এক ধরনের ইতস্ততার কারণে বলতে পারিনি। এখন নির্ভার লাগছে।

সত্যি ? খুব আলতো স্বরে জানতে চায় কনক করিম।

মাথা ঝাঁকায়, হ্যাঁ।

আচমকা লাইজুর কপালে একটা চুমু খেয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কনক, লাইজুও দু হাতে জড়িয়ে ধরে কনক করিমকে। দীর্ঘদিন ধরে দুটো শরীরে ও মনের জমিনে খরা জমেছিল, সেখানে ঝম ঝম করে আকাশে মেঘ না থাকলেও নামলো মুখর বৃষ্টি। খুব নিবিড় আবেগে জড়িয়ে রাখে দুজন দুজনকে। অনেক দিনরাত্রি যে তৃষ্ণা, যে আকুল আবেদন, যে নীরব যন্ত্রণা―কুরে কুরে খাচ্ছিল দুজনকে, সকল যন্ত্রণার অবসান হলো নিমিষে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়। ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের লেকের পাশের রাস্তা দিয়ে প্রচুর পথিকের আগাগোনা। যেতে যেতে হাসছে ফিসফিসিয়ে!

মামা ?

চট করে দুজন আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হয়ে অগোছালো বিন্যাসে তাকায়। পিছনে, একেবারে ঘা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বকুল ফুল বিক্রেতা, মিষ্টি একটা মেয়ে।

কী রে ?

দুইজনে দুইডা মালা নেন।

কনক তাকায় লাইজুর দিকে, নেবে বকুল ফুলের মালা ?

আমার খুব প্রিয় বকুল ফুলের গন্ধ।

তাই ? তাকায় ফুলবিক্রেতার দিকে, তোর কাছে কয়টা আছে বকুল ফুলের মালা ?

চাইরডা মামা।

সব কটা দিয়ে দে তো―ইশারায় দেখায় লাইজুকে।

হাসে লাইজু, পাগল নাকি তুমি ? আমি একলা মানুষ চারটি বকুল ফুলের মালা নিয়ে কী করব ?

তোমার ব্যাগে রাখবে, বকুল ফুলের মালা শুকিয়ে গেলেও ব্যাগে রাখা যায়, পুরোনো ধূপ জ্বালানো স্মৃতির মতো। এবং তখন গন্ধটা অন্যরকম লাগে।

তুমি কেমন করে জানলে ?

হাসে কনক করিম, জানি।

কিন্তু হাসছো কেন ?

একটা দারুণ স্মৃতি আছে আমার বকুল ফুল কুড়ানো নিয়ে…

কী রকম ?

বলা যাবে না তোমাকে।

বললে সমস্যা কী ?

অনেক বড় সমস্যা।

কোনও মেয়েকে বকুল ফুলের মালা দিতে গিয়ে ধরা খেয়েছো ? আড়চোখে তাকায় জাহানারা লাইজু।

হো হো হাসি কনক করিমের মুখে, আরে ওসব না।

তাহলে কী ?

বলা যাবে না।

কেন বলা যাবে না ? বলো, তোমাকে বলতেই হবে।

মামা, মেয়েটি ব্যাগের মধ্যে থেকে আরও তিনটি বকুল ফুলের মালা বের করে হাতেরটি একত্রে করে―চারটি মালা মেলে ধরে, এই ন্যান চারডা মালা।

লাইজু মালা চারটা হাতে নিয়ে নাকের কাছে ধরে ঘ্রা নেয়। ফুলবিক্রেতা মেয়েটিকে টাকা দিয়ে দেয় কনক। টাকা হাতে পেয়ে দ্রুত চলে যায় মেয়েটি। বকুল ফুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে তাকায় লাইজু, তোমাকে বলতেই হবে কনক বকুল ফুলের ঘটনা, নইলে…

শুনবেই ?

ঘাড় নাড়ায় লাইজু, হ্যাঁ শুনব।

আমাদের বাড়ি থেকে তিনটা বাড়ির পর পূর্বের বাড়ি। পূর্বের বাড়িতে ছোট বড় মিলিয়ে দশটা ঘর। সেই বাড়ির পর বিরাট একটা পুকুর। ঘন ময়লায় ভরাট সেই পুকুরের পানির মধ্যে কয়েক কুড়ি পাতিহাঁস সাতার কাটে আর প্যাক প্যাক করে। সেই পুকুর পার হলে একটা ঘন ঝোপঝাড়ে ঢাকা বাগান। সেই বাগানের শেষ মাথায় বকুল ফুলের বড় একটা গাছ। বকুল ফুল তো বর্ষার সময়েই ফোটে কিন্তু সব সময়ে তো বর্ষা থাকে না। তো এক বকুল ফোটার দিনে, ধরো সকাল দশটা হবে, আমি পূর্বের বাড়ির সেই পুকুর পার হয়ে জঙ্গল পার হয়ে বকুল ফুল কুড়ানোর জন্য যাচ্ছি। গাছের চারপাশটা মাটি থেকে উঁচু। কিন্তু নানা ধরনের ঝোপঝাড়ে ঢাকা। আমি বকুল ফুল গাছের নিচে গিয়ে দেখি, অনেক ফুল মাটিতে পড়েছে। আর মৌ মৌ গন্ধ। মনের আনন্দে ফুল কুড়িয়ে লুঙ্গির কোঁচড়ে রাখছি। রাখতে রাখতে পুন পুন শব্দে আশেপাশেই মানুষের কথার শব্দ শুনতে পাই, সঙ্গে হাসিরও শব্দ। আমি অবাক―কিসের এই শব্দ ?

নিশ্চয় ভূত ?

না, আমি ভূত-টুত ডরাই না। আর ওই সব আমার মাথায়ও ছিল না, বুঝতে পারছি মানুষের কথার শব্দ। সেই সঙ্গে অদ্ভুত গোঙ্গানির শব্দও পাচ্ছিলাম। ফুল কুড়ানো রেখে আমি দাঁড়াই শব্দের উৎস লক্ষ করে। তাকিয়ে দেখি, একটু দূরে আর একটু উঁচু জায়গায় ঘন ঝোপের আড়ালের গাছপালাগুলো নড়ছে। আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই ওই ডাল নাড়া লক্ষ্য করে।

তোমার তো অনেক সাহস ?

হ্যাঁ, ছোটবেলায় আমার অনেক সাহস ছিল। যাই হোক―আমি বন জঙ্গল পার হয়ে শব্দ ও ডালপালা নাড়া লক্ষ করে একেবারে কাছে গিয়ে দাঁড়াই। আমি দেখতে পাই, পূর্বের বাড়ির হামিজ চাচার বউ নিচে মাটিতে শুয়ে আছে দুই দিকে দুই পা ছড়িয়ে…

লজ্জায় মাথা নিচু করে লাইজু, না, আর শুনব না।

এখন সবটুকু শুনতে হবে তোমাকে।

না, থাক―

আরে মজাটুকু বাদ যাবে কেন ? শোনো…

মাথা নিচু করে বসে থাকে জাহানারা লাইজু।

চাচির উপরে আমাদের বাড়ির গনি চাচার ছেলে, আমাদের চেয়ে বয়সে তিন-চার বছর বড় শিশির ভাই। শিশির ভাই নাইনে পড়ে। আর চাচির তিন ছেলে মেয়ে। বুঝতে পারছো ? আমাকে দেখে দুজনে বাঘ দেখার মতো চমকে ওঠে। শিশির ভাই মুহূর্তের মধ্যে চাচিকে ওইভাবে রেখেই দৌড়ে পালিয়ে যায়।

মিচকি হাসে লাইজু, আর তোমার চাচি কী করল ?

চাচি খুব স্বাভাবিকভাবে উঠে বসে শাড়ি ঠিক করে আমার দিকে তাকায়, তুই ? তুই এখানে কী করস ?

তোমাদের শব্দ শুনে এলাম।

কিসের শব্দ ?

তোমরা কেমন যেন শব্দ করলা …

দাঁড়ায় চাচি, তুই দুপুরে ঘরে আসবি। তোরে হাসের মাংস দিয়া ভাত খাওয়ামু। বলতে বলতে প্রায় আমাকে জড়িয়ে ধরে, তুই ছোট তো নাইলে তোরেও দিতাম।  যা দেখছোস, কাউকে বলবি না। বললে শিশির তোর ঠ্যাং  ভেঙে দেবে। সত্যি বলতে কী তখন শিশির আমাদের গ্রামের ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন। যখন-তখন মারপিট করে, আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

কাউকে কিচ্ছু বলো নাই ?

মনে হয় না। অনেক বছর তো হয়ে গেল―বকুল ফুল কুড়াতে যাওয়ার ঘটনা!

হাঁসের মাংস খাওনি ?

হাসিতে ফেটে পড়ে কনক, নাগো সোনা খাইনি।

সেই চাচির সঙ্গে তোমার দেখা হতো না ?

অনেকবার হয়েছে, আমার সামনে পড়লেই চাচির চোখে-মুখে এক ধরনের আতঙ্ক ফুটে উঠত। প্রায়ই ঘরে যেতে বলত। কিন্তু আমার কেমন জানি এক ধরনের বিরক্তি উৎপাদন করত। যাই হোক―একদিনে অনেক শুনলে, এবার যাওয়া যাক। বিকেল চারটে, পেটে ভয়ানক খিদে।

আমারও।

দুজন উঠে হাত ধরাধরি করে রেস্টুরেন্টের দিকে যায়।

তিন

অফিসে প্রথম যে মানুষটির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়, সেই মানুষ মহিবুর মহিম। দীর্ঘ লম্বা শরীর। সব সময়ে জীবনটাকে কৌতুকে উপভোগ করে। কখনও দুঃখবোধ প্রকাশ করতে দেখেনি ওকে। চাকরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুজনকে পাঠায় চট্টগ্রাম অফিসে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার কারণে বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়―কারণ সারা অফিসে দুজন চেনে দুজনকে। অফিস কালুরঘাট, দুজনে একটা বাসা ভাড়া করে থাকে জামালখানে। ছোট বাসা, আড়াইটে রুম। কোনও রকমে একটা বাথরুম। আর পূর্ব দিকে এক চিলতে বারান্দা। দুই বন্ধু থাকে দুই রুমে। পাশের বাসায় কাজ করে, এমন এক বুয়া রান্না ও ঘরদোর পরিষ্কার করে। এইভাবে দুই মাস চলার পর, এক দুপুরে, ছুটির দিনে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় জাহানারা লাইজু।

দরজা খুলে লাইজুকে দেখে অবাক কনক, তুমি ?

পরিষ্কার উচ্চারণ, তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছিলাম না আমি।

ভেতরে ভেতের খুশিতে ফেটে পরে কনক, এসো। ভেতরে এস।

পায়ের কাছে রাখা ব্যাগটা নিজেই হাতে তুলে স্ত্রী লাইজুকে নিয়ে নিজের রুমে ঢোকে। রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে জড়িয়ে ধরে লাইজুকে। বাসায় নেই মহিবুর মহিম। দুজনের শরীর ক্লান্ত হলে গোসল সেরে রান্নায় বসে যায় লাইজু। কনক দ্রুত একটা মুরগি কিনে আনে। বুয়া, রাহেলার মা মুরগি জবাই করে ছাল ছাড়িয়ে কেটে কুটে মাংস বানিয়ে দিলে, অল্প সময়ের মধ্যে রান্না শেষ করে লাইজু। দুপুরের খাবারটা তিনজনে মিলে মজা করে খায়। খাওয়া দাওয়ার পর মহিম বাইরে যায়।

এখন কই যাও দোস্ত ? মাত্র খাওয়া দাওয়া হলো―একটু রেস্ট নাও।

নিলাম তো রেস্ট। তোরা বাসায় থাক―আমি আসতেছি। সন্ধ্যার দিকে ভাবিকে নিয়ে পতেঙ্গায় যাব।

পতেঙ্গা ? শুনেই উৎফুল্ল লাইজু। খুব ছোটবেলায় একবার এসেছিলাম আব্বার সঙ্গে। ইস, পানিতে ঝুপ ঝুপ লাফিয়ে পড়তাম। আর মা চিৎকার করে আমাকে জড়িয়ে ধরত। আব্বা ছবি তুলতো।

বুয়া থালাবাটি রান্নাঘর গুছিয়ে মুছে দিয়ে চলে গেলে, দুজনে আবার দরজা বন্ধ করে। জড়িয়ে ধরে লাইজুকে, তুমি কোনও খবর না দিয়ে চলে এলে কীভাবে ?

বুকে মাথা রাখে, তোমাকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও চলছিল না। তুমি চিঠিতে জানিয়েছো বাসার পরিস্থিতি। যখন বুঝতে পারলাম, ছোট বাসা হলেও দুটো আলাদা রুমে থাকো, তাই রিস্ক নিয়ে চলে এলাম। আর যাই হোক, তাড়িয়ে তো দেবে না!

জড়িয়ে ধরে বুকের সঙ্গে, তোমার মতো মিষ্টি বউকে তাড়াব কেন সোনা ? কি করব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। তোমাকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও চলছিল না। কিন্তু কী করব―

আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল তোমার জন্য। অন্যদিকে বড় ভাইয়ের বাড়িতেও ঝামেলা চলছিল…

কী রকম ঝামেলা ?

আমি যে তোমাকে বিয়ে করেছি, সেটাতো বড় ভাই, ভাবি মেনে নিতে পারেনি।

জানি তো, ভাবি তার মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে তোমার বিয়ে দিতে চাইছিল না ? সেটা শুনেই তো আমরা কোর্ট ম্যারেজ করলাম।

সেই থেকে তো খাপ্পা আমাদের উপর। কিন্তু সমস্যা হয়েছে―আমাদের বড় বোন ছন্দা আপার জামাই হাবিব এসেছে জমিজমার ভাগ নিতে।

মানে ?

হ্যাঁ। বাড়িতে হুলুস্থুল ঘটনা।

ছন্দা ? ছন্দা আপা কী বলে ?

ছন্দা আপাও চায়। যদিও আপার জামাই হাবিব দুলাভাই লোকটা বজ্জাত টাইপের―কিন্তু আপাকে তো কিছু বলতে পারি না।

পরের ঘটনা কী ?

হাবিব দুলাভাইয়ের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ছোট ভাই রনি। মাঝখানে আমি। এখন আমাকে খুব দরকার বড় ভাই আর ভাবির। ভাবি হঠাৎ করে খুব ভালো ব্যবহার শুরু করলে, আমার খুব অসহ্য লাগে। আমি দু মুখো সাপের মানুষ একদম দেখতে পারি না। কী করব, ভেবেছিলাম তোমার গ্রামের বাড়ি যাই। কিন্তু সেখানের পরিস্থিতিও খুব ভালো না। বাধ্য হয়ে তোমার কাছে এসেছি―

জড়িয়ে ধরে বুকের সঙ্গে, খুব ভালো করেছো সোনা। লাইজুর দুই বুকের মধ্যেখানে নাকটা ডুবিয়ে দেয় কনক―তুমি আমাকে পূর্ণ করে দাও।

লাইজুও মুখ রাখে কনকের মাথার চুলে, গোটা শরীরটাকে নিজের শরীরের সঙ্গে জাপটে ধরে। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। দুজনে চমকে ওঠে। বিরক্ত লাগলেও কিছু করার নেই, পৃথক হয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে লাইজু। দরজা খোলে কনক করিম। দরজার ওপাশে দাঁড়ানো মহিবুর মহিম। দুই হাতে ব্যাগ নিয়ে রুমে ঢোকে। একটায় মিষ্টি, আর একটা বড় ব্যাগ রাখে বিছানার উপর। বড় ব্যাগ খুলে দুটো শাড়ি বের করে লাইজুর সামনে ছড়িয়ে ধরে, ভাবি পছন্দ হয়েছে ?

শাড়ি দুটো খুবই দামি, দেখেই বুঝতে পারে লাইজু―ভাই কী দরকার ছিল! আমি তো ব্যাগ ভরে আমার জামা কাপড় নিয়ে এসেছি।

আপনি দশটা ব্যাগ ভরে নিয়ে আসেন, সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আপনি আমার বন্ধু, কলিগ―কনক করিমের স্ত্রী। আমার ভাবি। প্রথম আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ আপনার একটা সম্মান আছে না ? আপনার প্রতি আমার দায়িত্ব আছে না ? তাকায় কনকের দিকে, বন্ধু তোর জন্য একটা প্যান্ট আর একটা শার্ট পিস এনেছি। নে―বাড়িয়ে ধরে কনকের দিকে।

তোর এসব আনার দরকার ছিল ?

দরকার ছিল কী ছিল না, সেটা তোর চিন্তা। কিন্তু আমার তো একটা ভালোলাগা আছে ? ঘড়ির দিকে তাকায়, পাঁচটা বাজে। আমার রুমে যাচ্ছি―ভাবি, পনেরো মিনিটের মধ্যে রেডি হবেন―তিনজনে মিলে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যাব।

রুম থেকে বের হয়ে যায় মহিবুর মহিম।

তোমার বন্ধুটা তো দারুণ!

হ্যাঁ, অনেকটা গর্বিত গলা কনক করিমের―ওর মনটা অনেক বড়।

তোমার বন্ধু বিয়ে করেছে ? প্রশ্ন করে লাইজু।

না, তোমার ছোটবোন থাকলে ওর সঙ্গে বিয়ে দিতাম।

হলে ভালোই হতো, সায় জানায় জাহানারা লাইজু।

কিন্তু ওর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। ওর গ্রামে বড় চাচার মেয়ে। দীর্ঘদিনের প্রেম।

তাই নাকি ?

হ্যাঁ, ওর চাকরির জন্য বিয়ে আটকে ছিল। এখন বিয়ে করে বউ নিয়ে ঢাকায় আসবে। আগাম দাওয়াত দিয়েছে আমাকে, তোমাকে।

আমাকে কখন দিল ?

ওই তো বলার সময়ে বলেছে আমাকে, দোস্ত তোর নতুন বউকে নিয়ে যাবি আমার নতুন বউয়ের কাছে। ভাবিই সাজাবে আমার বউকে।

এসব বলেছে ?

হ্যাঁ, বলেছে।

ধ্যাৎ মিথ্যা কথা।

ঠিক আছে, মহিম আসুক সামনাসামনি বলব। তুমি কি পতেঙ্গায় যেতে চাও ?

হ্যাঁ, যেতে চাই তো, লাইজুর গলায় আগ্রহ। তুমি যেতে চাও না ?

না।

ওমা, কেন ?

তোমাকে নিয়ে রুমে থাকতে চাই…

কপট রাগে তাকায়, খাই বেড়েছে না ? একটু আগেই তো…। রাত সামনে পড়ে আছে।

না, আর একবার হলে ক্ষতি কী, হাত বাড়ায় লাইজুর দিকে। দ্রুত লাইজু গড়ান দিয়ে বিছানা থেকে নেমে যায়, কুমির একটা। ভাই এসে পড়বে এখনই।

আসুক, নিজেও খাট থেকে নামে, লাইজুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় এসে দাঁড়ায় মহিবুর মহিম।

দোস্ত, ভাবি রেডি ? চল।

চোখে মুখে বিজয়ের হাসি জাহানারা লাইজুর, চলো।

চলো।

দুজনে দরজা থেকে বাইরে নেমে দাঁড়ায়। পকেটে হাত দিয়ে চাবি বের করে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয় কনক। তিনজনে একসঙ্গে হাঁটতে থাকে সামনের দিকে। বাসাটা রাস্তা থেকে একটু উপরের দিকে। নিচে নেমে রাস্তায় দাঁড়াতেই একটা অটো পেয়ে উঠে যায় তিনজনে। পনেরো মিনিট পরে অটো চলে আসে পতেঙ্গার পাড়ে। প্রথমে নামে মহিম, দ্বিতীয় নামে কনক এবং শেষে লাইজু।

জোর করে ভাড়া দেয় মহিম। তিনজনে দাঁড়ায় পতেঙ্গা সমুদ্র তীরে। ফুরফুরে বাতাস বইছে। ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। কনকের হাত ছেড়ে দিয়ে লাইজু ছুটে যায় সমুদ্রের কাছে, সৈকতে পা ডুবাতে। হাসে দুই বন্ধু।

কনক, তুই ভাবির সঙ্গে থাক, আমি আসছি।

মানে ?

তোরা দুজনেই থাক, ভাবিকে সময় দে। আমি একটা কাজে যাই, রাতে ফিরব বাসায়। কেমন ? চোখ টেপে মহিম। আমি থাকলে ভাবি সহজ হতে পারবে না। তোর সঙ্গে প্রথম সমুদ্র সৈকতে, বুঝলি না ?

কিছু বলার থাকে না কনক করিমের, হাসতে হাসতে চলে যায় মহিম লম্বা পা ফেলে। কনক হাঁটতে শুরু করে লাইজুর দিকে। সৈকতের অল্প পানিতে দুই পা ভিজিয়ে হাসছে আর হাসছে। বাতাসে মখমলে চুল পেখম মেলছে। পাশে দাঁড়ায়, কেমন লাগছে ?

দারুণ, তাকায় চারদিকে―তোমার বন্ধু কই ?

চলে গেছে।

কেন ? খানিকটা অবাক লাইজু, উনিই তো জোর করে সৈকতে নিয়ে এল। আর এখন চলে গেল ? অবাক লোক তো!

বুঝলে না ? তোমাকে আমাকে মিশবার সুযোগ করে দিয়ে ও চলে গেছে।

স্মিত হাসে লাইজু―বাহ, মানুষটা ভালো।

আমার বন্ধু না ? লাইজুর কাঁধে হাত রাখে কনক। দুজনে মিলে পা ডুবিয়ে হাঁটতে থাকে সামনের দিকে। চারপাশে কিছু পর্যটক জড়ো হয়েছে। এখনও বিকেল, আর একটু পরেই পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে পর্যটকের ভিড় বাড়বে। লাইজুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে সৌভাগ্যের বরপুত্র মনে হয় কনক করিমের―লাইজু বুদ্ধি করে বাড়ি থেকে হঠাৎ চলে আসায় এমন মধুর সময় কাটাতে পারছে। চট্টগ্রাম এসেছে তিন মাস। দুই বন্ধু মিলে পরামর্শ করে ঠিক করেছে―ঢাকায় পৌঁছেই লোন করে হলেও আদাবর বা মোহাম্মদপুরের দিকে দুই কাঠা জমি কিনবে। এখনই কিনে রাখলে ভবিষতের জন্য ভালো। ছেলে মেয়ে হওয়ার সময়ে নিজেদের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হলে, জীবনের রং পালটে যাবে আনন্দে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে―ঢাকায় কবে যাওয়া যাবে ?

আসার সময় অফিস প্রশাসনের প্রধান আকবর মিয়া আশ্বাস দিয়েছে―ট্রান্সফারের অর্ডার যখন হয়েছে, ফেরানোর কোনও সুযোগ নেই। যান আপনারা চট্টগ্রাম, থাকেন কয়েক মাস―আমি নিজ উদ্যোগে আপনাদের দুজনকে ফিরিয়ে আনবো। বুঝতে পারছেন, অনেক চাপ আছে আমার উপর।

স্যার, ক মাস হতে পারে… আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করে কনক করিম।

হাসে আকবর মিয়া, বুঝতে পারছি নতুন বিয়ে করেছেন, তাও মাত্র প্রথমবার। রুমের সকলেই হাসে। হাসি থামার পর বলে, যত তাড়াতাড়ি পারি আনবো আপনাকে। নতুন বউকে রেখে দূরে থাকা খুবই কঠিন…আচ্ছা, আপনি তো ভাবিকে নিয়ে যেতে পারেন চট্টগ্রাম।

পারতাম স্যার, কিন্তু আমাদের তো কোন কোয়ার্টার নেই চট্টগ্রামে।

মাথা ঝাঁকায় আকবর মিয়া, তাইলে তো সমস্যাই। স্ত্রী পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামে এই বেতনে থাকা একটু কঠিনই। আচ্ছা, আমি দেখি কী করতে পারি। আপতত দুজনে জয়েন করেন। আমি তিন চার মাস পরে এমডি স্যারকে বুঝিয়ে একটা না একটা ব্যবস্থা করে দেব।

প্রশাসন প্রধানের আশ্বাস পেয়ে একেবারে আপ্লুত হয়ে দুই বন্ধু বের হয়ে আসে বসের রুম থেকে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনের সুখে দুটো সিগারেট ধরিয়ে টান দিয়ে ধোঁয়া উগড়ে দেয়ার পরপরই প্রশাসনের কর্মকর্তা, মহিবুর মহিবের দূর সর্ম্পকের আত্মীয় মোকারম আহমদ পান চিবুতে চিবুতে সামনে আসে। মোকারমকে দেখে দুজনেই সিগারেট পিছনে নিয়ে এক ধরনের সম্মান দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু লোকটা নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে সামনে দাঁড়ায়, পানের পিক ফেলে পিচিৎ করে দেয়ালে, তাকায় দুজনের দিকে―আমার  সঙ্গে আসো। আর বিড়ি সিগারেট খাইতেছো খাও, লুকনোর কী আছে ? আসো…

দু’জনে পিছনে পিছনে হাঁটছে মোকারম আহমদের। লোকটাকে দেখলে খুব সহজ আর সরল মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব শক্ত। হাঁটতে হাঁটতে এদিকের বারান্দা শেষ করে এল টার্ন নিয়ে উলটো দিকের বারান্দায় গিয়ে থামে মোকারম। আবার পানের পিক ফেলে। নিচ দিয়ে একটা রিকশা যাচ্ছিল, তিন ইঞ্চির জন্য রিকশা যাত্রীর শরীরে পড়ল না পিক। কিন্তু সেদিকে কোনও ভ্রƒক্ষেপ নেই মোকারম আহমেদের। পিক ফেলে ঘুরে দাঁিড়য়ে বলতে শুরু করে, প্রশাসন প্রধানের আশ্বাসে খুব সন্তষ্ট মনে হইল তোমাদের।

আঙ্কেল, মোকারম আহমেদের কথার মধ্যে ঢুকে যায়।

ঈষৎ বিরক্ত মোকারম আহমেদ, কী বলবা ?

সিগারেটটা পুড়ে যাচ্ছে, টানবো ?

লোকটার মুখে তিতকুটে হাসি ছড়িয়ে পড়ে, টানো টানো। একটা সিগারেটের দাম তিন টাকা, এমনি এমনি পুড়ে যাবে ?

সঙ্গে সঙ্গে কনক করিম পেছন থেকে হাত সরিয়ে এনে সিগারেট টানতে শুরু করে। কিন্তু মহিম পিছন থেকে হাত আনছে না। সিগারেট পুড়ে পুড়ে প্রায় হাতের সঙ্গে লাগলে, সিগারেটটা ফেলে দেয়।

শুকনো মরুভূমিতে মায়াবৃক্ষ জন্মানোর মতো অবিশ্বাস্য আশ্বাসে বিশ্বাস করে দুই বন্ধু চলে আসে চট্টগ্রাম। এবং অফিসের এক কলিগের সহায়তায় মোটামুটি একটু সস্তায় বাসাটা পেয়ে যায়। প্ল্যান ছিল, এক রুমের একটা সাবলেট নিয়ে কষ্ট করে কাটিয়ে দেবে কয়েকটা মাস।

আকবর স্যারকে তো আমার ভালোই মনে হয়েছে―কেমন অমায়িক কথাবার্তা…

মহিবুর মহিমের মুখের শব্দ টেনে নেয় মোকারম আহমেদ, অমায়িক কথাবার্তাই ওই ভদ্রলোকের একটা বড় পুঁজি। তোমরা জয়েন করলে কয় মাস ? তিন মাস তো ? এখনই কেন তোমাদের ট্রান্সফার করতে হবে ? যারা দুই বছর, তিন বছর আগে জয়েন করেছে, তারা না ট্রান্সফার হবে সবার আগে। কিন্তু তারা রইল বহাল তবিয়তে…। তাছাড়া তোমাদের সঙ্গে জয়েন করেছে মিস রুমানা শারমিন। মিস রুমানা শারমিন কিন্তু তোমাদের অমায়িক প্রশাসনিক প্রধান আকবর আলির শালিকা। তো সেই শ্যালিকাকে তো কাছেই রেখেছে… এখন বুঝে দেখো, তোমাদের অমায়িক আকবর মিয়ার চরিত্র, কথা শেষ করে হন হন করে চলে যায় মোকারম আহমেদ। দুই বন্ধু ছাল তোলা  মোরগের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

চার

বগুড়া শহর থেকে গাবতলি উপজেলার বড় সাগাটিয়া গ্রাম অটোতে যেতে পয়তাল্লিশ মিনিট লাগে।

বাস থেকে নেমেছে কনক করিম আর জাহানারা লাইজু বগুড়ার হার্টপয়েন্ট সাত রাস্তার মাথায় দুপুর আড়াইটায়। আগে দুইবার এসেছে কনক। সাত রাস্তার ডান পাশেই কয়েকটা ছোট ছোট হোটেল। হোটেল মাছরাঙায় ঢোকে কনক, পিছনে লাইজু। ওয়েটার একটা টেবিল পরিষ্কার করে বলে, বসুন স্যার। কী খাবেন ?

টেবিলের দুই পাশে দুজনে বসে। লাইজুর দীর্ঘ যাত্রার অভ্যাস নেই। ঢাকা থেকে বগুড়া প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার। সকাল সাড়ে সাতটার বাসে উঠে আড়াইটায় নামল, যদিও পথে একটা ফুড ভিলেজে বিশ মিনিটের জন্য বাস থেমেছিল। এই ফুড ভিলেজগুলো ডাকাত আর অরুচির আখড়া। সেই কবে তৈরি করেছে দোতলা পেল্লায় সাইজের ফুড ভিলেজ, আর কোনওদিন দেয়াল পরিষ্কার করেনি। চারদিক থেকে আসছে এক ধরনের বোটকা গন্ধ। বাথরুম তো ব্যবহার করা যায় না গন্ধে আর ময়লার বিপুল উপস্থিতির কারণে। বাথরুম নিচ থেকে গর্ত হয়ে গেছে সেই কবে―গর্তে দিনের বেলায়ই ইঁদুর দৌড়ায়, রাতের পরিস্থিতি কী বোঝাই যায়। লাইজু কিছুটা সূচিবায়ুতে আক্রান্ত। বাথরুম থেকে বের হয়ে হাত ধরে কনকের, চলো বাইরে।

কেন ? গরম রুটি আর গরুর মাংস খাই। সেই সকালে দুটি রুটি আর ভাজি খেলাম।

মুখে শাড়ির আঁচল চেপে দ্রুত চলে আসে ফুড ভিলেজের বাইরে। বাইরে অবশ্য খোলামেলা অনেক জায়গা। দশ বারোটা বাস দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধ লাইনে। ডান দিকে কয়েকটা চা বিস্কু মিষ্টি আর লুঙ্গি গামছার দোকান। লাইজু একটা চায়ের দোকানের সামনে যায়।

দুধ চা দিন এক কাপ, হাত বাড়িয়ে একটা কেক নিয়ে তাকায় কনকের দিকে, তুমি কী খাবে রং চায়ের সঙ্গে ?

আমার তো খিদে লেগেছে, একটা কিছু খাওয়া দরকার! তুমি ভেতর থেকে বের হয়ে এলে কেন ?

তুমি ভেতরের গন্ধ টের পাওনি ? কেক মুখে দেয় লাইজু।

একটু একটু পেয়েছি কিন্তু সবাই তো খাচ্ছে গোগ্রাসে।

কিন্তু এই ফুড ভিলেজে খেলে আমার শরীর খারাপ করবে, তুমি খেতে চাইলে যাও। আমি চা আর কেক খাচ্ছি। যাও তুমি।

হাসে কনক করিম, তাকায় চাঅলার দিকে―ভাই আমাকে এক কাপ আদা চা দিন। আর ওই রুটিটা দেন তো, চায়ের আগে একটা কিছু খাই।

এই খাওয়া তিন ঘণ্টা আগে।

কী আছে তোমার খাবার ? হোটেল বয়কে জিজ্ঞেস করে কনক।

স্যার নদীর বাইলা, টেংরা আর শোল মাছ আছে।  মুরগি আছে―

কী মুরগি ?

সোনালি মুরগি।

তুমি বাইলা মাছটা গরম করে দাও, অর্ডার দেয় কনক। তুমি কী খাবে ? তাকায় লাইজুর দিকে।

আমি মুরগির মাংসের সঙ্গে ভাত।

বেয়ারা খুব দ্রুতই ওদের খাবার সামনে দেয়। দুজনেই ক্ষুধার্ত। খেতে শুরু করে এবং অনাস্বাদিত স্বাদে মুখ পূর্ণতা লাভ করে। মজা করে খাচ্ছে দুজনে। খেতে খেতে প্রায় শেষ, ফোন বাজে কনকের, হ্যালো ?

স্যার, আমি মনজু বলছি।

হ্যাঁ, মনজু, আমরা হোটেল মাছরাঙায়।

আমি তো হোটেলের সামনে, বলতে বলতে মোবাইল কেটে দিয়ে লম্বা টিঙ্গে সাইজের একটা ছেলে ঢোকে।

স্যার আপনারা খাচ্ছেন কেন ? গলায় বগুড়ার টান স্পষ্ট।

খিদে লাগলে কী করব বল ? খুব খিদে পেয়েছিল আমাদের, সহ্য করতে পারছিলাম না।

স্যার, বাড়িতে আপনাদের জন্য নদীর বোয়াল মাছ রান্না করিয়েছেন―গরুর দুধ, মুরগি…

লোভ বাড়িয়ে আর লাভ নেই মনজু। খেয়ে এখন একটু সুস্থ বোধ করছি, কিসে যাব তোমার স্যারের বাড়ি ? সাতমাথা থেকে কত দূর ?

স্যার, সাত আট কিলোমিটার হবে। আমি আপনাদের জন্য সুন্দর একটা অটো এনেছি। বাড়িতে যাবার সময়ে পথের দুই ধারের দৃশ্যাবলি দেখতে পারেন।

খুব খুশি জাহানারা লাইজু, আমি তো এসেছি বগুড়ার পথ মাঠ আর বৃক্ষরাজি দেখতে, তুমি কেমনে জানলে ?

টিনটিনে ছেলে মনজু দাঁত বের করে হাসে, চলেন।

খাওয়ার বিল দিয়ে দুজনে বের হয়ে আসে। পিছনে মনজু। মনজুর দুই হাতে দুইটা ব্যাগ। মনজুর পিছু পিছু এসে রাস্তার পাশে অপেক্ষায় থাকা অটোতে চড়ে বসে। পিছনের লম্বা সিটটা বেশ উঁচু। সামনে চালকের বসার সিট একটু নিচের দিকে। ফলে, অটো চলতে শুরু করলে সামনের দৃশ্যাবলি দেখতে সমস্যা হয় না। চালকের পাশে বসে মনজু। অটো চলতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যে সাত রাস্তা পার হয়ে হোটেল আকবরিয়া অতিক্রম শেষে রেল লাইন পর হয়ে অটো ছুটতে শুরু করে গাবতলির দিকে, বড় সাগাটিয়া গ্রামের পথে। সাগাটিয়া নামে পাশাপাশি তিনটা গ্রাম। বড় সাগাটিয়া গ্রামের মানুষ মহিবুর মহিম। পিতা আবদুল বারী। মহিমেরা চার ভাই, তিন বোন। মোটামুটি এলাকার বনেদী পরিবার। আবদুল বারীর বয়স প্রায় সত্তুর বছর। ছেলেরা চারজন চাকরি ও ব্যবসা নিয়ে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরবাসী হয়েছে। মহিবুর মেজো ছেলে, সব সময়ে একটা না একটা ঝামেলার মধ্যে রাখত বাপকে। গ্রামের এমন কোনও বাড়িঘর ছিল না, মহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসেনি। কিন্তু আবদুল বারী মেজো ছেলেটাকে খুব পছন্দ করেন। কারণ, দুষ্টমি যতই করুক―সব সময়ে ক্লাসে প্রথম হয়। সেই মহিবুর মেট্রিক পাস করে বগুড়া স্যার আজিজুল হক কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে। চাকরিতে ঢুকছে। সব মিলিয়েই মেজো ছেলের প্রতি একটা দরদ অনুভব করেন আবদুল বারী। কিন্তু যখন জানল আবদুল বারীর ছোট ভাই আবদুল মোমিনের বড় মেয়ে রুমানাকে পছন্দ করে, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। আবদুল বারীরাও চার ভাই। কোনও বোন নেই। আবদুল বারী মেজো। বড় ভাই আবদুল করিম মারা গেছেন অনেক আগে। সে কারণে, তিন ভাইয়ের মধ্যে এখন আবদুল বারীই বড়। ছোট ভাই আবদুল মোমিনের পর ছোটজন আবদুল বারিক। সমস্যা হলো―আবদুল মোমিন লোক হিসেবে খামখেয়ালি স্বভাবের। বাড়ির মধ্যে তিনটে ঘর। মোমিনের ঘরের পাশ দিয়ে বাড়িতে ঢোকার পথ। নতুন করে ঘর তোলার সময়ে বাড়ি ঢোকার পথটাকে সংকুচিত করে ঘরের সীমানা বাড়ায়। দুই ভাই আবদুল বারী আর বারিক মিলে বাধা দিতে গেলে তীব্রভাবে রুখে দাঁড়ায় মোমিন।

আমি মাপ দিয়ে দেখেছি―এই জমি আমার ভাগে পড়েছে।

কে বলল তোকে ? বোঝানোর চেষ্টা করে আবদুল বারী। বাড়ির এই জমি আব্বা বেঁচে থাকার সময়েই আমাদের মাপজোক করে দিয়েছে না ?

সেই সময়ে তো আমি ছোট ছিলাম। আমাকে তোমরা ঠকিয়েছ।

কী বলছিস তুই ? আব্বা তোকে ঠকিয়েছে ? নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মাপ দিয়ে চার ভাইয়ের ঘরের জায়গা ঠিক করে দিলেন, তোর মনে নাই ? তুই তো তখন ইন্টারমিডিয়েড পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে। এলাকার লোকজনও ছিল অনেক। বাড়ি মাপজোক করে দিলদার আমিন চাচা যে কাগজে লিখে দিয়েছে, সেই কাগজ আমার কাছে আছে। তুই চাইলে দেখাতে পারি। আব্বার নিজের দস্তখত আছে।

ওই সব ভুয়া কাগজপত্র দেখে আমার লাভ নাই…।

ভাই, পিছনে এসে দাঁড়ায় একেবারে ছোট ভাই  আবদুল বারিক, শোনেন।

কী ? ভীষণ মন খারাপ আবদুল বারীর।

ও যা করতে চায়, করতে দেন।

তোর মাথা খারাপ হয়েছে ? বাড়িতে ঢুকতে বের হতে হবে না ? এতটুকু পথ দিয়ে কীভাবে আসা যাওয়া করব―দুজন মানুষ পাশাপাশি চলতে পারবে না বারিক।

আমি তো চোখের সামনে দেখতেছি সব ভাই। আপনি আমার পরিকল্পনা শুনুন।

ছোট ভাইয়ের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন আবদুল বারী, বল। কী বলবি ?

আপনার ঘরতা পুরোনো হয়েছে―আপনার ছেলে তো ঘর ভেঙে নতুন ঘর তৈরি করবে, রফিক আমাকে বলেছে।

মাথা নাড়ায়, হ্যাঁ।

আমিও আমার ঘর নতুন করে বানাবো।

তো লাভটা কী হবে ? মোমিন তো পথ রাখছে না।

আপনি আর আমি―দুই ঘরের মুখ ঘুরিয়ে ওর ঘর পিছনে দিয়ে দেব। তখন ওর পথই বন্ধ হয়ে যাবে।

অনেকক্ষণ ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন আবদুল বারী। বারিকের বুদ্ধিটা মাথায় খেলান, খুবই দারুণ বুদ্ধি। নিজের পথই বন্ধ হয়ে যাবে মোমিনের। ছোট ভাইয়ের পরামর্শ মেনে আবদুল বারী চুপচাপ হয়ে যান। দুই তিন বছরের মাথায় দুই ভাই বাড়ির মুখ উলটোদিকে ঘুরিয়ে তৈরি করার সময়ে মোমিন দেখে, তার বাড়ির সামনের দিকে কোনও জায়গা নেই। একেবারে আটকে গেছে সে।

প্রথম দিকে বড় ভাইয়ের সঙ্গে খুব চোটপাট করে কিন্তু কিছু করার থাকে না। সালিশিও হয়েছে―কিন্তু বিগত কর্মের কারণে হেরে গেছে মোমিন। ফলে, দুই ভাইয়ের মধ্যে কথাবার্তা একদম বন্ধ প্রায় এক যুগ, বারো বছর। সেই ভাইয়ের মেয়ে রুমানাকে পছন্দ করে প্রিয় পুত্র। রুমানা অবশ্য পছন্দ করার মতো মেয়ে। গাবতলি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছে। বছর কয়েক ধরে আবদুল বারী লক্ষ করেছেন―ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কথাবার্তা না হলেও ছোট ভাইয়ের বউ হামিদা বেগম প্রায়ই আবদুল বারীর বউ ছালমার সঙ্গে কথা বলে, গল্প করে। মাঝেমধ্যে স্বামীকে লুকিয়ে ঘরেও আসে। দুই জা বসে গল্প করে, পান খায়। মোমিনের তিন মেয়ে এক ছেলে। বড় সন্তান রুমানাও ঘরে আসে। বড় চাচাকে দেখলে মাথায় ঘোমটা তুলে সালাম দেয়। আহা, ছোট ভাইটার অসৎ আচরণের জন্য দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ নেই। অথচ থাকলে কত ভালো লাগত। হারামজাদা, অপরাধ করেছে, স্বীকারও করতে চায় না। ছোট ভাই মোমিনের মেয়ের সঙ্গে মহিমের বিয়ের ব্যাপারে আবদুল বারী ভেটো দিলে, মহিম সোজা জানিয়ে দেয়―আমি জীবনে বিয়েই করব না।

আবদুল বারী পড়ে যান ভয়ানক বিপদে। সবচেয়ে প্রিয় পুত্র বিয়ে না করলে কি ভালো লাগে ? কী করবেন, কোনও সিদ্ধান্ত যখন নিতে পারে না, তখন সমাধানের পথ অনেকটাই খুলে দেয় রুমানা ইয়াসিনের মা হামিদা বেগম। একরাতে খাওয়া-দাওয়া করে কেবল খাটের উপর পান সুপারির ডালা নিয়ে ছালমা বেগম আর আবদুল বারী বসেছেন, ঘরে ঢোকে আবদুল মোমেনের বউ হামিদা।

ভাইজান, কেমন আছেন ?

সরাসরি কথায় প্রথমে ভড়কে যান আবদুল বারী―এই মেয়েকে তো আমিই পছন্দ করেছিলাম আমার ছোট ভাইয়ের বউ হিসেবে। মেয়েটি তখন মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে স্থানীয় কলেজে এইচএসসি ক্লাসে ভর্তির জন্য অপেক্ষা করছিল। তাও প্রায় সাতাশ-আঠাশ বছর আগের স্মৃতি, অথচ মনে হয় গতকালের। হামিদাকে দেখে পছন্দ হলে তিনি বাপজানকে জানান, বাপজান তখনও বেঁচেছিলেন।

যা ভালো মনে করো, আমার আপত্তি নেই। আমি আর কয়দিন―বড় ভাই হিসেবে সব দায়িত্ব তোমার…। বাপজানের কথায় জোর পেয়ে তিনি মোমিনকে বিয়ে করান। ছালমার বাবার একটা দাবি ছিল, তার হাত ধরে বলেছিলেন, বড় বাড়ি আর ভালো ছেলে পেয়ে মেয়ের ভবিষৎ সুখ ভেবে বিয়ে দিলাম আপনার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। আমার একটাই আবেদন―আমার মেয়েটাকে বিএ পাস করানোর খুব ইচ্ছা আমার। কিন্তু খোদার ইশারায় বিয়ে হয়ে গেল, আপনারা কথা দেন―আপনাদের বাড়ির কাছের কলেজে আমার হামিদাকে পড়াবেন, বিএ পাস করাবেন ?

হাসেন আবদুল বারী, এটা তো খুব ভালো আবদার তালইজি। সংসারে মা যদি শিক্ষিত হয়, লেখাপড়া জানে―সেই সংসার উন্নত হয়, রুচিশীল হয়। ছেলেমেয়েরা গাইডেন্স পায়। আমার ছোটবোন তো কলেজে যায়―ভাবি আর ননদ মিলে গল্প করতে করতে কলেজে যাবে, আসবে। কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু ছোট ভাই আবদুল মোমিন বউকে আর পড়তে দেয়নি। হামিদার বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন।

আপনি উত্তর দিচ্ছেন না কেন ? আবদুল বারীর ভাবনার মধ্যে ঢুকে যায় ছালমা বেগম।

তাকান রুমানার মায়ের দিকে, হ্যাঁ বউ কেমন আছো ? আমি আছি… বয়স হয়েছে। বুঝতেই পারো। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন একটা, বসো তুমি।

হামিদা বসে ছালমা বেগমের পাশে, ভাইজান―আপনিই আমাকে পছন্দ করে এই বাড়ির বউ করে আনছিলেন। আপনার ভাইয়ের কারণে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে দুই পরিবারের মধ্যে। মানুষের জন্ম-মৃত্যুর কোনও নির্দিষ্ট টাইম নাই। আমি চাই, আপনার ভাইরে আপনি ক্ষমা করে দিন।

ছালমা বেগমের বানানো পান মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে বলেন আবদুল বারী, ক্ষমা তো চাইতে হবে, না চাইলে কেমনে ক্ষমা করা যায় ?

রুমানা ? রুমানা ?

দরজায় অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে রুমানার মুখ দেখা যায়, মা!

তোর বাপকে নিয়ে ভেতরে আয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব আবদুল বারী। তাকায় দরজার দিকে, তাকায় হামিদার দিকে। কিন্তু নিজের স্ত্রী ছালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে আরও বিস্মিত। ভদ্রমহিলা পান চর্চিত লাল মুখে স্মিত হাসছে। বুঝতে পারে, আবদুল বারী―ঘটনার সঙ্গে আগে থেকেই জড়িত আছে ছালমা।

দরজা পার হয়ে ভেতরে ঢোকে আবদুল মোমিন। মোমিনের মুখ নত। পিছন থেকে পিতার হাত ধরে রেখেছে আদরের কন্যা রুমানা। অনেক বছর পর নিজের ঘরের মধ্যে ছোট ভাইকে দেখে আবদুল বারী আনন্দে আত্মহারা হয়ে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ান। কন্যার হাত ধরে সামনে আসে আবদুল মোমিন, ভাইজান! কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে―আমারে মাফ কইরা দেন।

আবদুল বারী জড়িয়ে ধরেন ছোট ভাইকে। মোমিন ভাইকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চোখ ভিজে যায় আবদুল বারীরও। ভাইয়ের বুকে ভাইয়ের বুক―আহা, কী পরম শান্তি! পুরো ঘরটা যদিও কান্নার আবহে ডুবে আছে কিন্তু অপার শান্তিরও একটা সুর বাজে। বেশি কাঁদছে রুমানা। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে হামিদা বেগম ও ছালমা বেগম।

ভাইজান, আমারে মাফ কইরা দিছেন ? বড় ভাইয়ের বুক থেকে বুক সরিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায় আবদুল মোমিন।

হাসেন আবদুল বারী, তোরে আমি অনেক আগেই মাফ কইরা দিছি। জানি তো, তুই ছোটকাল থেকে যেমন গোঁয়ার তেমন বোকা।

আপনি ঠিকই বলেছেন ভাইজান, সুযোগ বুঝে অভিযোগ করে হামিদা―আপনি আমাকে গোঁয়ার মানুষটার সঙ্গে বিয়ে দিলেন। আমার পড়াশোনাটা পর্যন্ত করতে দিল না!

থাক, ছালমা বেগম হাত ধরে ছোট জায়ের, আজ কোনও অভিযোগ না। আজ কেবল শান্তি, শান্তি আর শান্তি…।

তুমি ঠিকই বলেছো ছালমা, বয়স হয়েছে, অভিযোগ করে কী হবে ? ভাইবোন সবাই মিলে একসঙ্গে, এক ছাদের নিচে থাকার মতো সুখ দুনিয়ায় আছে ? ছালমা―কিছু খাওন দাও আমাগো।

রাত হয়েছে, সবাই রাতের খাবারও খেয়েছে―আগামীকাল দুপুরে মোমিনগো দাওয়াত।

আবার চোখে পানি আসে আবদুল বারীর, ছালমা এখন আমি মরেও শান্তি পাব। কিন্তু একটা কাজ করলে হয় না ?

কী কাজ ?

আমরা ভাইবোন জীবিত যে কজন আছি, সবাইরে…

না, ছালমা বেগম ঘোষণা করে, কালকে শুধু মোমিনের পরিবারের আমাদের বাসায় দাওয়াত। তোমার সকল ভাইবোনের দাওয়াত হবে মহিম আর রুমানার বিয়ের সময়ে, তাও খুব তাড়াতাড়ি।

হতভম্ভ আবদুল বারী, কার কার বিয়ের কথা বললে ?

আমার ছেলে মহিব আর মোমিনের মেয়ে রুমানার মধ্যে বিয়ে হবে খুব শীঘ্রই।

তাই নাকি ? হাসেন আবদুল বারী―একসঙ্গে এত আনন্দ আমি কোথায় রাখি ? আবদুল বারী পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুমানার দিকে হাত বাড়ান, তুই কিন্তু অনেকটা আমার মায়ের মতো।

রুমানা ইয়াসমিন টুপ করে পায়ে সালাম করে বড় চাচা আবদুল বারীর। দু হাতে তুলে দাঁড় করান রুমানাকে, তোরা আমাকে অন্ধকারে রেখে এত নাটক জমিয়েছিস, আমার কিছু বলার নেই। বরং আমি আনন্দিত হব, যদি তোরা সুখে থাকিস!

পাঁচ

বগুড়া শহরের রাস্তা পার হয়ে গাবতলির বড় সাগাটিয়া গ্রামের দিকে ছুটতে শুরু করল অটো, চারপাশের প্রকৃতির অফুরন্ত নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি দেখে চিৎকার করে ওঠে লাইজু, দারুণ, দারুণ, অসহ্য সুন্দর..। চলন্ত অটোর খোলা সিটের উপর দাঁড়ায় লাইজু। বাম পায়ে ভর রাখে কনকের ওপর। দুই দিকে দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে দাঁড়ায়। উড়ছে চুল। দুই হাতে ছড়িয়ে দিয়েছে ওড়না। ড্রাইভার হাসে, মনজু অবাক। কনক করিম দু হাতে জড়িয়ে রাখে লাইজুর পা জোড়া। উলটোদিক যাওয়া যাত্রীদের কেউ কেউ পুলকিত, উচ্ছ্বসিত। কেউ কেউ বিরক্ত, ভ্রƒ কোচকায়। পথের দুই পাশের মানুষজন এমন অভাবনীয় দৃশ্য দেখে অবাক হলেও হাসে, উপভোগ করে। ভাবে, কোন বাড়ির মেয়ে ? এক পলক দেখেই বুঝতে পারে, এই এলাকার মেয়ে নয়। শহরের মেয়ে হবে, নইলে এমন করে গ্রামের পথে যেতে যেতে উচ্ছ্বসিত হবে কেন ?

সাগাটিয়া গ্রামের পথে ঢুকবার সময়ে মনজু অটো দাঁড় করায় রাস্তার পাশে। লাইজু হাতের ওড়না গুটিয়ে প্রশ্ন করে, কী হলো ? চন্দ্রযান থামল কেন ?

ভাবি, এখন আমরা গ্রামে ঢুকবো তো…

কনক স্ত্রী লাইজুর পা ছেড়ে দেয়, অনেক হয়েছে লাইজু। এখন নামো, আমার পাশে বসো।

ঘাড় নাড়ে লাইজু, বুঝতে পেরেছি। বসে স্বাভাবিক হয়ে কনক করিমের পাশে―আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটালাম কনক।

আমি বুঝতে পেরেছি। তোমার নামটা কিন্তু আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।

নাম ?

হ্যাঁ, ওই যে বললে চন্দ্রযান থামল কেন ?

দূর, আমি অতো চিন্তা করে বলেছি নাকি ? উচ্ছ্বাসের সঙ্গে মুখে এসেছে, বলেছি। কিন্তু মনে হচ্ছিল―আমি আকাশে উড়ছি দু হাতে ডানা মেলে।

তোমার উচ্ছ্বাস আমাকেও আনন্দ দিয়েছে।

তুমি মানুষটা আসলে খুব ভালো। আমার সকল অপকর্ম তুমি নির্দ্বিধায় সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছো।

আমার কী দশটা পাঁচটা বউ ? আমার তো চাঁদের কণার মতো একটা মাত্র বউ। সেই একটা মাত্র বউয়ের সুখ-দুঃখ দেখব না ?

মিষ্টি হাসে লাইজু, এখন আমার কী ইচ্ছে করছে জানো ?

কী ইচ্ছে করছে ?

কানের কাছে মুখ নেয় জাহানারা লাইজু, তুমি আমার খোলা বুকে মুখ রেখে… সেটাই দিতাম। কিন্তু এখন তো সুযোগ নেই…টাকরার সঙ্গে জিহ্বা লাগিয়ে শব্দ করে হাসে।

তুমি একটা জাদুর বাক্স―আমাকে কেবল জাদু দেখিয়ে যাচ্ছো কন্যা।

আরও দেখাব, সময় আসুক।

 আকর্ণ হাসে কনক করিম, তুমি কখনওই তোমার জাদু দিয়ে আমাকে ক্লান্ত করতে পারবে না হে ময়ূরী! আমি তোমার জন্য অনন্ত যৌবনের দেবতা হয়ে থাকব।

আমিও চাই―তোমার আমার মধ্যে এই প্রতিযোগিতা চলতে থাকুক, অনন্তকাল।

আবার অটো ড্রাইভার ব্রেক করে অটো সাইড করে। সামনে তাকায় কনক, উলটোদিক থেকে মাঝারি আকারের একটা ট্রাক আসছে। ট্রাকটাকে সাইড দেয়ার জন্য অটো রাস্তা থেকে নেমে দাঁড় করায় চালক। হাফটনি ট্রাকটা চলে যাবার পর চালক অটো রাস্তায় উঠে চালাতে শুরু করে।

লাইজু তাকায় কনকের দিকে, গ্রামের রাস্তা এত সুন্দর ?

গত কয়েক বছরে গ্রাম কেন, প্রায় সারা বাংলাদেশের রাস্তাঘাট খুব সুন্দর হয়েছে।

মনজু, ডাকে লাইজু, আর কতদূর তোমাদের বাড়ি ?

আর দশ মিনিটের পথ আন্টি।

আমার কী মনে হয় জানো মনজু ?

কী মনে হয় আন্টি ? মনজু বুঝতে পেরেছে চাচার বন্ধু কনক করিমের স্ত্রী একটু অন্যরকম, খ্যাপাটে কিন্তু আকর্ষণীয়।

এই রাস্তার চলাটা যদি কখনও শেষ না হতো, কেবলই বিরামহীন চলতে থাকত―এই পাকা মসৃণ পথে। পথের দু ধারে নারকেল গাব অশ্বত্থ বাবলা শিরিস কড়ই আম কাঁঠালের ছায়া সুনিবিড় থাকত আমাদের সঙ্গে―তাহলে তোমাকে বলতাম, চলতেই থাকে। রাস্তার দুই পাশে বিচিত্র ধরনের নানা আকারের ঘরবাড়ি গরু ছাগল সবুজ ঘাস পুকুর ঘুঘুর ডাক আমাকে পাগল করে তুলেছে।

থামলে কেন ? শুনতে ভীষণ ভালো লাগছিল লাইজু―আনন্দ টইটম্বুর কণ্ঠে বলে কনক করিম।

একটু লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকায় জাহানারা লাইজু।

রাস্তার পাশেই অপেক্ষায় ছিল মহিবুর মহিব বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে। দূর থেকে অটো দেখেই সবাইকে নিয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ায়। দলটার সামনে এসে থেমে যায় অটো। এগিয়ে গিয়ে মহিবুর মহিব জড়িয়ে ধরে প্রিয় বন্ধু কনক করিমকে। অটোতে বসে দুই বন্ধুর আলিঙ্গন দেখে লাইজু। আলিঙ্গন শেষে কনকের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেয় মহিব।

আরে আরে ফুলের মালা কেন ? গলায় ফুলের মালা নিতে নিতে হালকা রসিকতা আর গর্বের স্বরে বলে কনক।

দোস্ত, তুমি আমার নেতা। নেতাকে বরণ করতে হয় ফুল দিয়ে, বুঝলে ?

একদল এগিয়ে যায় জাহানারা লাইজুর কাছে। লাইজুকেও মালা পরিয়ে দিয়ে হাত ধরে নামায় নিচে। অন্যরা ব্যাগ মিষ্টির প্যাকেট হাতে নেয়। পঁিচশ ত্রিশ জনের একটা দল প্রায় মিছিল হাসি উল্লাসের সঙ্গে বাড়ির দিকে যাত্রা করে। বাড়ির উঠোনে ঢুকলে দেখা পায় মহিবের বাবা আবদুল বারী ও মা ছালমা বেগমের। দুজনকে সালাম করে বিশ্রাম করার জন্য কনক লাইজুর জন্য নির্দিষ্ট কক্ষে নিয়ে যায়। যদিও গ্রামের বাড়ি, ইলেকট্রিসিটি এসেছে কয়েক বছর আগে, সেই সুযোগে প্রায় প্রতিটি ঘরের সঙ্গে পাকা বাথরুম করেছে। সুন্দর পরিপাটি সাজানো রুম পেয়ে দারুণ খুশি জাহানারা লাইজু। মহিবুর মহিবের বাড়িতে আসার সময়ে মনে মনে একটাই চিন্তা ছিল, কেমন হবে বিছানা, বাথরুম, থাকার ঘরটা ? হোক গ্রাম, কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ চায় লাইজু, নইলে থাকতে খুব মানসিক সমস্যা হয়। কিন্তু ঘরটা পেয়ে ভেতরে ভেতরে উল্লসিত। প্যান্ট শার্ট পরিবর্তন করে ঘরের প্রিয় পোশাক লুঙ্গি আর গেঞ্জি গায়ে বিছানায় শুয়ে পরে কনক।

কী ব্যাপার, তুমি শুয়ে পড়লে ?

একটু বিশ্রাম নিই, মাথার নিচের নরম বালিশ ঠিক করতে করতে জবাব দেয় কনক। তুমি কী করবে ?

আমি ভেবেছিলাম তোমাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বিকেল দেখতে বের হব।

আছি তো তিন দিন। বিকেল দেখা যাবে। তুমি বরং একটু বিশ্রাম নিতে পারো।

বন্ধু, আসব ? কক্ষের দরজায় মহিব।

শোয়া থেকে উঠে বসে কনক, আরে আয়, ভেতরে আয়।

মহিব ভেতরে ঢোকে, হাত ধরা একজন কিশোরীর হাত―ভাবি খাবেন না নাকি ?

কেমনে খাই ?

একটু অবাক মহিব, মানে ?

বগুড়ার সাত রাস্তার মোড়ে নেমেই আমরা হোটেলে খেয়েছি―

ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে মহিব, এটা ঠিক করলেন ভাবি ?

শোন, এত রাগ করস ক্যা ? অনেক সময়ে কনক খাঁটি বরিশালের ভাষা বলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। সকালে, অত ভোরে তেমন নাস্তা না করেই বের হয়েছি তো, খুব খিদে পেয়েছিল। সামনে হোটেল দেখে আর খিদে সামলাতে পারিনি। আর আছি তো মাসখানেক তোর বাড়িতে, কত খাওয়াবি ?

হাসে মহিব, ছুটি এনেছিস তিন দিনের। থাকবি মাসখানেক ?

সবাই হাসে।

ভাবি, আমার সঙ্গের এই সুন্দরী ভদ্রমহিলার নাম জোনাকি। দেখবেন সারা বাড়ি জোনাক পাখির মতো এখানে ওখানে জ্বলে আর জ্বলে। এক মুহূর্ত স্থির নন তিনি। আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে।

জোনাকি লজ্জা পেয়ে চাচার পিছনে মুখ লুকায়।

ভদ্রমহিলা জোনাকি কিন্তু অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। এবং ক্লাসে প্রথম হয়। দারুণ গানের গলা। রাতে এই বিশিষ্ট শিল্পীর গলায় আমরা গান শুনব।

বাহ, চমৎকার তো―মন্তব্য করে লাইজু।

অবশ্যই চমৎকার, সে বিষয়ে অমত কার, ফোঁড়ন কাটে মহিব। এই শিল্পী আপনাদের জন্য নিয়োজিত। কখন কী লাগবে, বলবেন।

লাইজু এগিয়ে এসে হাত ধরে, তুমি কেমন আছো জোনাকি ?

ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন ?

তোমার মতো এমন ফুটফুটে মেয়ে সামনে থাকলে খারাপ থাকা যায় ?

ফিক করে হাসে জোনাকি।

তোমার নতুন কাকি কোথায় ?

নিজের ঘরে শুয়ে আছে দেখলাম।

চলো, নতুন বউ দেখে আসি। তাকায় স্বামী কনক করিমের দিকে, তুমি তোমার বন্ধুর সঙ্গে থাকো। আমি জোনাকির সঙ্গে গিয়ে নতুন বউ দেখে আসি। দরজার দিকে এগোয় লাইজু আর জোনাকি।

সেই ভালো, যার যা কাজ―আবার শুয়ে পরে কনক। বের হয়ে যায় লাইজু, জোনাকির হাত ধরে। লাইজু বের হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুর পাশে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে মহিবুর মহিব। আড়মোড়া ভাঙে।

কনক, আসতে কষ্ট হয়নি তো ?

উত্তরে হাসে কনক, কষ্ট হলে কী করবি ?

মানে ?

তোর বিয়ের দাওয়াতে আসছি, কষ্ট হবে কেন ? আর দূরের যাত্রায় পথে নানা ধরনের সমস্যা হতেই পারে। যাত্রায় এই সমস্যাও আনন্দ। সুতরাং আসতে কষ্ট হয়নি তো জিজ্ঞাসা করাটাই অন্যায়।

এই জন্যই তো তুই আমার নেতা।

বুঝছি।

কী বুঝছো ?

আমাকে ডুবানোর তালে আছো।

তোকে ডুবাবো কেন ?

আজকাল কোনও ভালো মানুষ নেতা হয় ? নেতা হয় অশিক্ষিত বাটপার লুটেরারা…

তোর মন্তব্য ঠিক, সবটা না হলেও অনেকটা। কিন্তু তোর মতো ভালো মানুষেরও নেতা হওয়া দরকার। নইলে সবটাই নষ্টদের অধিকারে যাবে।

বুঝতে পারি, কিন্তু নেতা প্রসঙ্গ এলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়।

কেন ?

একটা দেশ তলানি থেকে জেগে ওঠে অনেক উঁচুতে পৌঁছে যায়। যেমন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর। আমরা কেন পারলাম না ? যে দেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন দেয়, পাঁচ লক্ষ মা বোন নির্মমভাবে ধর্ষণের শিকার হয়, সেই দেশটার তো মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দায় ছিল। কেন হলো না ? হলো না―একজন যথাযোগ্য নেতার অভাবে। যে ক্ষমতায় যায়, সেই চাটে। চেটে চেটে দেশটাকে ছোবলা বানিয়ে দরিদ্র জনতার উপর করের বোঝা বাড়িয়ে চলে যায়, বিদেশে।

দোস্ত, তুই তো রাজনীতির দিকে ঢুকে গেলি।

আমি ঢুকি নাই, তোর কথায় প্রসঙ্গক্রমে আসল তো, তাই…তুই কী কইতে চাস ?

তুই তো অনেক দিক দিয়ে আমার সিনিয়র।

তো ?

একটু জ্ঞান-বুদ্ধি দে।

কোন বিষয়ে তোর জ্ঞান-বুদ্ধির অভাব ঘটল ?

প্রথম বিয়ে তো, জ্ঞান-বুদ্ধির বড়ই অভাব!

হো হো হো হাসিতে ফেটে পড়ে কনক করিম। মনে হচ্ছে টিনের ঘরের টিন টন টন করে নৃত্য করছে। উঠানে আড্ডা দেওয়ারা আলাপ থামিয়ে দেয়। দু-একজন ছুটে আসে ঘরের দিকে, কে হাসছে আকাশ-মাটি কাঁপিয়ে! দরজায় এসে যখন উঁকি দেয়, তখন হাসি অনেকটা থামিয়ে দিয়েছে কনক করিম। পাশে শুয়ে বাড়ির মানুষের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে মহিবুর মহিব―বাড়ির লোকজনের মাথাটাই নষ্ট করে দিলিরে দোস্ত!

আসলে, হাসিটা বড় বেশি জোরে হয়ে গেছে কিন্তু আমি কী করব হাসি এলে ? হাসি তো আটকে রাখা যায় না ব্রার মধ্যে স্তনের মতো।

কী বললি ? ব্রার মধ্যে আটকে থাকা স্তনের মতো! এখন তো হাসিতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে… বিছানার উপর গড়িয়ে গড়িয়ে হাসতে থাকে মুহিব। ওর অসহায় হাসি দেখে মিটিমিটি হাসে কনক করিম। হাসির মধ্যে জোনাকি ঢোকে। সঙ্গে আর একজন। জোনাকির হাতে চায়ের ট্রে, অন্যজনের হাতি পিঠা আর পানির গ্লাস।

তোমার হাসিতে বাড়ির মাটি কাঁপছে, টেবিলের উপর ট্রে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায় জোনাকি।

তাই নাকি ? খাট থেকে নেমে একটা পিঠা হাতে নেয় কনক।

মাথা নাড়ায় জোনাকি, হ্যাঁ।

তোমার সঙ্গী কে ?

আমার বন্ধু, পাশেই বাড়ি। আমরা একসঙ্গে পড়ি।

দারুণ তো। তোমার নাম কী মিস্টার ?

হরিশংকর দাস।

তোমাদের বাড়ি কোথায় ?

হাত উচিয়ে ইশারা করে, রাস্তার ওই পারে।

কাকা, তুমি পিঠা খাবে না ?

খাব তো, আমার হাতে দে।

জোনাকি একটা পিঠা মুহিবের হাতে দিলে, ওঠে বসে খেতে শুরু করে, বাহ খুব মজা তো। কে বানিয়েছে রে জোনাকি ?

মা বানিয়েছে।

তোর মায়ের তো অনেক গুণ। ঠিক আছে, তোর মাকে নতুন জামাই পেলে বিয়ে দিয়ে দেব।

নিজের বিয়েটা আগে করো… জোনাকি রুম থেমে চলে যায়। পিছনে পিছনে হরিশংকরও। এবার দুই বন্ধু মিলে হাসে! পিঠা খাওয়ার পর চা খেতে খেতে মুহিব প্রশ্ন করে, দোস্ত শেষ পর্যন্ত বিয়ে করাটা ঠিক হচ্ছে ?

আবার হাসতে শুরু করে কনক। হাসির কারণে কাপের চা ছলকে উঠতে চাইছে। দ্রুত কাপটা টেবিলের উপর রেখে একটা চেয়ার টেনে বসে, পাঁচ-ছয় বছরের প্রেমের পর বিয়ের পিঁড়িতে যখন বসতে যাচ্ছো, তখন এই প্রশ্ন করে লাভ আছে ?

কিন্তু সকলেই বলে যে বিয়ের পর পস্তাতে হয় ?

সেই সকলে কি বিবাহ করে নাই ?

সব শালাই তো করেছে। 

তাহলে ? প্রশ্ন কেন ? বিয়েটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নারী পুরুষ সকলের জীবনে। আমি মনে করি বিয়ের মধ্যে নারী ও পুরুষ দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। একে অপরকে ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে মানুষের মধ্যে গভীর বোঝাপড়ার সূত্র জন্ম নেয়।

আমার শুধু একটাই ভয়, রুমানা বড় সরল মেয়ে। সংসারের অনেক মারপ্যাঁচ বোঝে না। একটু কষ্ট পেলেই কান্না করে। গাল ফুলায়। সামলানো বড় মুশকিল হয়।

বিয়ের পর সামলাতে সুবিধা হবে।

কী রকম ?

কোনও রকম সকম নেই। বিয়ে বা সংসার গহিন বিদ্যা―যা শেখার কোনও স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নেই কিন্তু সব স্বামী-স্ত্রীর শেখা হয়ে যায়―জীবনের অভিজ্ঞতায়। কিন্তু প্রত্যেকের ফরমুলা আলাদা।

ছয়

রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমুতে আসে নিজেদের কক্ষে কনক করিম আর জাহানারা লাইজু। বিছানায় আধশোয়া কনক জিজ্ঞেস করে লাইজুকে, আমার বন্ধুর বই কেমন দেখলে ?

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ঘুরে তাকায় লাইজু, কী বললে তুমি ?

তুমি যা শুনেছো আমি সেটাই বলেছি।

আবার বলো, যা বলেছ সেটাই বলবে, যদি সাহস থাকে।

ওমা সাহসের কী হলো ? বললাম―আমার বন্ধুর বই কেমন দেখলে ?

তুমি বউকে বই বললে কেন ?

কেবল বউ না, স্বামীও স্ত্রীর কাছে একখানা বইমাত্র।

মাথা আঁচড়ানো রেখে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে লাইজু। জানে, কনক করিম মাঝে মধ্যে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য বা ধারণা উপস্থিত করে, অনেককে মুগ্ধ করে। কেউ কেউ হতবিহব্বলও হয়। কিন্তু স্বামী স্ত্রী―একে অপরের কাছে একটা বইমাত্র ?

তুমি কি মনে কষ্ট পেয়েছ বউকে বই বলায় ? আমি তো স্বামীকেও বই বলেছি, বলেছি না ?

মাথার চুল আঁচড়ানো শেষ করে বিছানায় এসে পাশে বসে লাইজু, তুমি আসলে কী বলতে চাও, পরিষ্কার করো।

শোয়া থেকে উঠে বসে কনক করিম, তুমি গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করো মানুষ মূলত একটা বই। একটা মানুষ, একটা বই। সেই হিসেবে স্বামী-স্ত্রী―একেকটা বই। ধরো, তুমি সৈয়দ শামসুল হকের খেলারাম খেলে যা উপন্যাসটা পড়লে। যখন শুরু করলে, তখন অন্যরকম লাগছিল, যত ভেতরে প্রবেশ করলে কত বিচিত্র ধরনের চরিত্র, ঘটনার মধ্যে দিয়ে গেলে। পড়া শেষ হলে তোমার মধ্যে একটা তৃপ্তি, কিছু প্রশ্নের জন্ম হলো। কয়েক দিন খেলারাম খেলে যা উপন্যাসটার পটভূমি করোটির মধ্যে আপন মহিমায় গেঁথে রাখলে। দিন গেল, সপ্তাহ গেল, পনেরো দিনের মাথায় তুমি বইটির অনেক কিছুই ভুলে গেলে কিন্তু প্রিয় বই হিসেবে তাকের মধ্যে রেখে দিলে। তাই না ?

মানুষও অনেকটা পঠিত বইয়ের মতো। বই পড়ার মতো―প্রথম দিকে উত্তেজনা, ভেতরের দিকে অন্তর্মুখী আনন্দ প্রক্রিয়ায় তুমি মুগ্ধ হলে, পাঠ এক সময়ে শেষ হয়ে যায় বইয়ের মতোই কিন্তু তাকে রাখো না কিংবা ফেলেও দাও না―কিন্তু পঠিত বইয়ের চেয়েও খুব বেশি মূল্যও আমরা দিই না। বই এবং স্বামী-স্ত্রী শেষ পর্যন্ত অনেকটা তাকে রাখা…

তোমাকে যতটা সহজ মনে হয় কনক, প্রকৃতপক্ষে তুমি ততটা সহজ নও। লাইজুর কণ্ঠে এক ধরনের নৈরাশ্য প্রতিধ্বনি তোলে। তোমার মনের মধ্যে জটিল জাল মাছ শিকার করে বেড়ায়।

লাইজুকে জড়িয়ে ধরে বুকের সঙ্গে, লক্ষ্মী সোনা―তুমিও কিন্তু জটিল কম না।

কীভাবে ?

এই যে বাক্যটা বললে―তোমার মনের মধ্যে জটিল জাল মাছ শিকার করে বেড়ায়! দুর্দান্ত বাক্য―আমি ঢাকায় গিয়ে আমার বন্ধু গল্পকার মনি হায়দারকে এই বাক্য ধার দিয়ে বলব, তোমার নামে কোনও গল্পে লিখে দিতে।

তুমি ছাড়ো―

কেন ?

আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে গো।

ওকে, একুট ঢিলে করে বাঁধন কিন্তু সম্পূর্ণ ছাড়ে না লাইজুকে, বললে না কেমন লাগল মুহিবের স্ত্রীকে ?

উঁহু, এভাবে কি আলাপ করা যায় ? ছাড়ো না, বলছি―

লাইজুকে ছেড়ে দিয়ে খাট থেকে নামে কনক। টেবিলের উপর রাখা জগ থেকে পানির গ্লাসে পানি ঢেলে মুখে দেয়। পানি পান শেষে বসে বিছানায়। তাকায় স্ত্রী লাইজুর দিকে, বললে না লাইজু ?

কী বলব ?

আমার বন্ধু মুহিবের স্ত্রী দেখতে কেমন ?

বন্ধুর স্ত্রী সর্ম্পকে তোমার এত আগ্রহ কেন ?

আগ্রহ! কারণ, আমি জানতে চাই আমার স্ত্রী লাইজুর চেয়ে বন্ধুর স্ত্রী রুমানা সৌন্দর্যে এগিয়ে না পিছিয়ে ?

স্বামী কনক করিমের মুখের কাছে মুখ আনে লাইজু―তুমি কোনটা শুনতে চাও সোনা ?

আমি জিততে চাই, আমার স্ত্রী, আমার লাইজু হবে সেরা!

লাইজু চোখে চোখ রাখে স্বামীর, কিন্তু বন্ধু তুমি হেরে গেছো!

কী বলতে চাও তুমি ?

তোমার স্ত্রী লাইজুর চেয়ে তোমার বন্ধু মহিবুর মুহিবের স্ত্রী রুমানা ইসলাম অনেক সুন্দরী। চোখ ফেরানো যায় না―আমি নারী হয়ে যদি রুমানার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, তুমি পুরুষ, তুমি কী হবে ?

একটু সময় নেয় কনক। হাত ধরে লাইজুর―সত্যি বলছো ?

সত্যি বলছি। আর ভাবি মানুষটা খুব সরল। আমি যাবার পর রুমের সবাইকে বের করে দিয়ে কেবল আমার সঙ্গে গল্প করেছে। এই বিয়ে হওয়া না হওয়ার অনেক জটিলতা ছিল, ভাবির মায়ের বুদ্ধিতে সব সমস্যার সমাধান হলো―

তাই ?

হ্যাঁ।

আমার চেয়ে তোমার বন্ধুর বউ বেশি সুন্দর―এই সংবাদে তোমার মন খারাপ ?

আমার বউ আমার কাছে প্রাচীন মিশরের রানি ক্লিওপেট্রার চেয়েও সুন্দরী… জড়িয়ে ধরে বুকের সঙ্গে, বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। তৃষ্ণার্ত লাইজুও জড়িয়ে ধরে বুভুক্ষ স্বামীর শরীর।

সাত

গ্রামীণ পরিবেশে খুব ধুমধামের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় মহিবুর মুহিবের সঙ্গে রুমানা ইয়াসমিনের।

বিয়ের পর বন্ধুর স্ত্রী রুমানাকে দেখে সত্যি অবাক হয়েছে―রুমানা এত সুন্দর ? মেয়েটা তো চেষ্টা করলে সিনেমার নায়িকা হয়ে পারত। হালকা গড়নের লাল-সাদা শরীরের রুমানার দিকে পুরুষ হিসেবে একবার তাকালে, তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়, রুমানার ঠোঁট জোড়া। ভেজা, চওড়া, কোমল। প্রিয় বন্ধুর বউ দেখে মনে মনে ঈর্ষায় পুড়লেও মেনে নেয়, বন্ধুর বউকে মাঝে মধ্যে দেখা তো যাবে, সেটাই অনেক বড়।

মুহিব রুমানার বিয়ের তিন দিন পরে জাহানারা লাইজু আর কনক করিম বগুড়া ছেড়ে ঢাকা চলে আসে। আগের সংবাদ বছর খানেক হলো মুহিব এবং কনক ট্রান্সফার হয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা চলে এসেছে। ওদের প্রশাসনের বস  আকবর মিয়া অবসরে গেছে। অবসরে যাবার আগে শালি রুমানা শারমিনকে ক্ষমতা খাটিয়ে অবৈধভাবে একটা প্রমোশন দিয়ে গেছে। ফলে, অফিসে একসঙ্গে একত্রিশ জন জয়েন করলেও ত্রিশ জনের বস হয়ে গেছে রুমানা শারমিন। যেহেতু সরকারের উচ্চস্তরে কোনও মামা খালু নেই―প্রতিকার বা প্রতিরোধের কোনও সুযোগ না পেয়ে সবাই হাসিমুখে মেনে নিয়েছে।

বিয়ের তিন মাস পরই মুহিব বউসহ ঢাকায় চলে আসে প্রায় স্থায়ীভাবে। দুই বন্ধুর বাসা একটু দূরে―মুহিব বাসা নিয়েছে জিগাতলা, একাত্তরে পাকিস্তানিদের তৈরি জল্লাদখানার কাছে, বিলের পাশে। কনক বাসা নিয়েছে লালবাগ, আমলিগোলায়। আমলিগোলায় লাইজুর ছোট চাচার সাততলা বাড়ি। লাইজু চেয়েছিল, চাচার বাসায় ভাড়া থাকবে।

কিন্তু রাজি হয়নি কনক, আত্মীয় থেকে দূরে থাকাই উত্তম। বিশেষত শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের থেকে। আর শ্বশুরবাড়ি তো ভাড়া থাকাই যাবে না।

পাঁচতলা বাড়ির তিনতলায় বড় বড় তিনটে রুম। তিনদিকে খোলামেলা, হাওয়া আসে। আমলিগোলায় জাহানারা লাইজু একটা বেসরকারি কলেজে লেকচারার হিসেবে ঢুকেছে। যতটা না ইনকামের জন্য, তার চেয়ে বেশি সময় কাটানোর জন্যই অধ্যাপনায় যুক্ত হয়েছে। বিয়ের বয়স তিন বছর, পেটে এখন পর্যন্ত সন্তানের কোনও ভ্রƒণ আসেনি। অন্যদিকে, বিয়ের এগারো মাসের মাথায় এক ছেলের মা হয়েছে বন্ধু মহিবুল মুহিবের সুন্দরী স্ত্রী রুমানা ইয়াসমিন।

হাসপাতালে সন্তান হওয়ার সময়ে লাইজু এবং কনক উপস্থিত ছিল।  বাচ্চা পেটে আসার পর বন্ধুর স্ত্রীর মাতৃত্ব সফলতায় বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে। প্রচুর খাওয়া দাওয়া আনন্দ উৎসবে কাটিয়েছে দুটি পরিবার। মনে হয়েছে―আগত নতুন অতিথি দুই পরিবারেরই সন্তান। রুমানা হাসপাতালে ভর্তি হলে কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে লাইজু উপস্থিত থাকে রুমানার সঙ্গে। বাচ্চা হওয়ার সময়ের তীব্র যন্ত্রণার ভয়ে সংকুচিত থাকে রুমানা। সাহস জোগায় লাইজু, আরে অত ভয় পেলে চলে ? আপনার মা আপনাকে, আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছে না ?

হাসপাতালে বেডে শুয়ে রুমানা। পাশে হাত পা ছড়িয়ে বসেছে লাইজু। মুহিবেরা আসবে বাইরের কাজ সেরে সন্ধ্যার পর। বিকেলের দিকে দুই বন্ধুর অখণ্ড অবসর।

ভাবি, আমার গ্রামে বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে এক মা মারা গেছে, চোখের সামনে  সেই মায়ের কষ্ট দেখেছি। মেয়েটির ব্যথার চিৎকার এখনও আমার কানে বাজে।

ওইটা হাজারে দু একটা ঘটে, আশ্বাস দেয় লাইজু―কিন্তু আপনি তো আছেন ঢাকা শহরে, বড় হাসপাতালে, বড় গাইনি ডাক্তারের অধীনে। আছে নার্স। ঘণ্টায় ঘণ্টায় আপনাকে দেখছে। তাছাড়া আমরা তো আপনার চারপাশে আছি সব সময়ে।

 সেটাই তো ভরসা। আপনি তো মায়ের কাজ করছেন, আমার জন্য।

আরে না, জড়িয়ে ধরে জাহানারা লাইজু, প্রিয় মানুষের জন্য মানুষ এটুকু করে। নইলে আবার মানুষ কেন ?

ভাবি, চারপাশে এত অমানুষ, আমার তো মানুষ দেখলে ভয় লাগে।

মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো ঠিক নয় ভাবি।

উঁচু পেটটাকে ডান হাতে ধরে কোমর সোজা করে বসার চেষ্টা করে রুমানা ইয়াসমিন। পিছন থেকে দু হাতে ধরে লাইজু। বিছানার পিছনে উঁচু দেয়ালের সঙ্গে বালিশ দিয়ে আড়াআড়ি বসিয়ে দেয় রুমানাকে, এখন ঠিক আছে ?

শুয়ে আরামের নিঃশ্বাস ফেলে রুমানা। হাত ধরে লাইজুর, ভাবি আপনি মানুষটা খুব ভালো।

তুমি আরও ভালো। সরি, তুমি বললাম আপনাকে।

আপনি আমাকে তুমি বলবেন, আমি আপনার বয়সে ছোট। আপনার ছোটবোন মনে করুন। আপনি আছেন বলে ঢাকা শহরে শক্তি পাই। আমি কত চিন্তিত ছিলাম―এই অচেনা শহরে আমি কেমন করে থাকব ভেবে।

ঠিক আছে, জড়িয়ে ধরে রুমানাকে, কপালে একটা চুমু খায়। তোমার মতো একটা বোন আছে আমার। ওর বিয়ে হয়েছে গ্রামে।

আমি তো শহরে আসতে চাইনি…ওই লোকটার জন্য আসতে হলো! অনুযোগ রুমানা ইয়াসমিনের কণ্ঠে।

হাসে লাইজু, এত রাগ কেন লোকটার প্রতি!

আমি শুরু থেকে বলেছি ভাবি, শহরে আমি যাব না। শহর আমার ভালো লাগে না। কিন্তু লোকটা বিয়ের এক মাসের মাথায় আমাকে ঢাকা নিয়ে এল। বলল, তোমাকে ছাড়া ঢাকায় আমি থাকতে পারব না।

বলল ? মৃদু হাসে লাইজু।

হ্যাঁ বলল। আমি বললাম―এতদিন আমাকে ছাড়া থাকলে কেমন করে ?

কী বলল লোকটা ?

লোকটার পকেট ভরা কথা, ফুরায় না। বলে, এতদিন তো প্রেম ছিল। অনুরাগ ছিল। কিন্তু এখন তো তুমি আমার বউ। তোমার গন্ধ, তোমার আদর, তোমার শরীর ছাড়া আমি নেই হয়ে যাব।

পুরুষগুলো ওইরকমই… নারীর শরীরের গন্ধে পাগল হয়ে থাকে!

ভাবি, ওটা যে খুব ভালোও লাগে… ভীষণ ভালো লাগে। ভাবুন তো, এক সকালে উঠে দেখলেন, পৃথিবীতে পুরুষ নেই, কেমন লাগবে আপনার ?

রুমানার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে লাইজু, আমি ভাবতেই পারি না পৃথিবীতে পুরুষ নেই। কেবল নারী আর নারী… উঁহু, অসম্ভব। হয়তো রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সুলতানার স্বপ্ন উপন্যাসে নারীস্থান হলে মন্দ হয় না। পুরুষরা ঘরের মধ্যে থাকল আর আমরা অফিস আদালত কল কারখানা কৃষিকাজ করলাম―কেমন হয় ব্যাপারটা ? উচ্ছ্বসিত লাইজু জড়িয়ে ধরে রুমানাকে।

ভাবি, খুবই রোমাঞ্চকর হয় যদি ঘটনাটা সত্যি ঘটানো যায় ?

শোনো রুমানা, তোমার লোকটাকে বসো করলে কীভাবে ?

ইস, নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় জাহানারা লাইজুর বেষ্টন থেকে, আমি বসো করব কী ? সে-ই আমাকে বসো করার জন্য পিছনে ঘুরঘুর করত।

সেটাই বাস্তবসম্মত।

মানে ?

রুমানার ঠোঁট স্পর্শ করে লাইজু, এত সুন্দর রাজকন্যার পিছনে নায়ক ঘুরবে, এটাই স্বাভাবিক। তো শুরু হলো কখন থেকে ?

ভাবি, আমাদের বাপ আর বড় চাচার মধ্যে ভীষণ ঝগড়া ছিল। বড় চাচার ঘরের পিছনে আমাদের ঘর। আমরা বাইরে যেতে অনেক ঘুরে যেতে হতো। একটু বড় হয়ে জানতে পেরেছি, আমার আব্বার খামখেয়ালির কারণে অনেক ঝামেলা হতো। ভাইয়ের সঙ্গে ভাই কথা বলত না। দুই পরিবারের মধ্যে আসা-যাওয়া নেই। চাচার মেজো ছেলে এই লোকটাকে দেখতাম―ফুটবল খেলে, মাছ ধরে, স্কুলে যায়। খুব ডানপিটে। দেখি কিন্তু কথা হয় না। তো লোকটা মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে গাবতলি উপজেলায় কলেজে ভর্তি হলো। থাকে হোস্টেলে। বাড়ি আসা যাওয়া কমে যায়, আমিও ভুলে যাই। কিন্তু যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি, একদিন দেখি―সামনের বিরাট পুকুরের পাড়ে বসে লোকটা বড়শি দিয়ে মাছ ধরছে। আমাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আমি পাশ দিয়ে হেঁটে প্রাইভেট পড়ার জন্য যাচ্ছিলাম। লোকটা বড়শি রেখে আমাকে ডাকে, তুই রুমানা না ?

আমি মাথা ঝাঁকাই।

কোথায় যাচ্ছিস ?

প্রাইভেট পড়তে।

কোন ক্লাসে পড়িস ?

নবম শ্রেণিতে।

আচ্ছা, যা!

আমি চলে গেলাম। পরের দিন আবার সেই জায়গায়, পুকুরের পাড়ে আসতেই দেখি, লোকটা বড়শি ফেলে মাছ ধরছে। দূর থেকে আমাকে দেখে বড়শি রেখে পথে এসে দাঁড়ায়। আমি কাছে আসতেই আমার সঙ্গে হাঁটা শুরু করে। আমি মনে করলাম―লোকটা অন্য কোনও কাজে যাচ্ছে। পুকুর পার হয়ে একটু এগোলেই পথটা সরু হয়ে গেছে। আর চারপাশে প্রচুর গাছপালায় ঢাকা। ওই পথটা আমাদেরই বাড়িতে ঢোকার পিছনের দিকের একটা পথ। বাইরের লোকেরা খুব কমই ব্যবহার করে। সর্টকাট বা জরুরি প্রয়োজনে আমরাই পথটা ব্যবহার করে রাস্তায় উঠে যাই। লোকটা সরু রাস্তার পারে একটা নুয়ে পরা কাঁঠাল গাছের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়, রুমানা শোন।

আমি বই হাতে দাঁড়ালাম। মজার ঘটনা হচ্ছে, লোকটাকে আমি কিছুই ডাকি না। কারণ, খুব ছোটবেলায় তো কথাই বলা হয়নি। আমি একটু বড় হলে লোকটা চলে গেছে দূরে। আর দুই পরিবারে চলছে নীরব কিন্তু তুমুল ঝগড়া।

রুমানা, তুই যখন বড় হবি, কলেজে পড়বি বা পড়া শেষ করবি, তখন তোকে আমি বিয়ে করব। সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি কি বলছি বুঝতে পারছিস কিছু ?

আমি অবাক হয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। সরু মেঠোপথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, গাছপালায় প্রায় অন্ধকার একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে নবম শ্রেণি পড়ুয়া একটা মেয়েকে, তেমন কোনও কথাবার্তা ছাড়াই বলে ফেলল, তোকে আমি বিয়ে করব। তাও দিন ঠিক রেখেছে!

তুই তো দেখতে সুন্দর, তোর কাছে অনেক ছেলেরা প্রেমের প্রস্তাব দিতে পারে, সেই কারণে তোকে আগেই বলে রাখলাম। কোনও ঝামেলা করলে কিন্তু তোকে খুন করে ফেলব। কী করব বুঝতে পেরেছিস ? এক্কেবারে খুন। আর একটা বিষয়―আমার বউ হওয়ার বড় যোগ্যতা হলো, পড়াশোনা। ভালো করে পড়বি। তোর কোনও বান্ধবী আছে, যার ঠিকানায় চিঠি লিখলে পাবি ?

তুমি কী বললে ?

আমি কী বলব ? শরীর থরথর কাঁপছে। আর কথাবার্তা তো নরম সুরে বলছে না, বলছে ধমকের সুরে। আমি কোনও কথা বলছি না দেখে রেগে যায় লোকটা। কথা কানে যায় না ? তোর কোনও বান্ধবী আছে ?

আমার চোখ ফেটে পানি আসছে। দেখে লোকটার বুঝি মায়া হলো। খুব করুণার স্বরে বলল―এখন যা। কিন্তু কালকে চিঠি লেখার ঠিকানা দিস একটা।

আমি ঘাড় নেড়ে চলে যাবার জন্য পা বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে ডাকে, এ্যাই শোন।

আমি দাঁড়াই। আমার কাছে এসে মুখটা দু হাতে তুলে ধরে, আমি লোকটার চোখে চোখ রাখতে পারি না। চোখ বুজে আসে। লোকটা আমাকে আলতো করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে, বুঝলি গতকাল তোকে দেখার পরই সিদ্ধান্ত নিই, তুই আমার বউ।

আমাকে বুকের ভেতর থেকে মুক্তি দিয়ে কপালের ঠিক মাঝখানে একটা চুমু খায়। আমার সারা শরীর কেঁপে ওঠে। অবশ হয়ে আসে। কিন্তু লোকটার কোনও মায়া-দয়া নেই, দেখার মতো দৃষ্টিও নেই। আমাকে ছেড়ে দিয়ে আস্তে করে বলে, যা প্রাইভেট পড়তে যা লক্ষ্মী মেয়ের মতো।

আমাকে ছেড়ে দিয়ে লোকটা হন হন করে পুকুরপাড়ে চলে যায়, বড়শি ফেলে মাছ ধরতে। আমি অচল মুদ্রার মতো পথে দাঁড়িয়ে থাকি। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম বলতে পারব না, আমার পা চলছে না। শরীর কাজ করছে না। মস্তিষ্ক অসার। দূর থেকে দেখতে পেলাম―আমার বাপজান আসতেছে। আমি দ্রুত পা চালিয়ে প্রাইভেট পড়তে যাই। কিন্তু সেদিন স্যার কী পড়িয়েছে, আমি জানি না। কে কী বলছে, আমি শুনিনি। কানেই ঢোকেনি। কেবল লোকটার বাক্যটা―বুঝলি গতকাল তোকে দেখার পরই সিদ্ধান্ত নেই, তুই আমার বউ। আমি কখন কীভাবে ঘরে এসেছি, জানি না। ঘরে এসে আমার কোঠায় ঢুকে চুপচাপ শুয়ে থাকি―আর লোকটাকে ভাবতে থাকি। ভাবি, কী বলব―জীবনে এত ভালোলাগা, এত সুখ আমি পাইনি।

বান্ধবীর ঠিকানা দিতে পেরেছিলে ? লাইজু দেখতে পায়, তন্ময় হয়ে জীবনের প্রেমের উপাখ্যান বলতে গিয়ে রুমানা ইয়াসমিন পেটের ব্যথা ভুলেই গেছে।

ভাবি, আমি কাকে বলব ? গ্রামে আমার ওই ধরনের কোনও বান্ধবী নেই। আমি পড়ে গেলাম মহাযন্ত্রণায়। আমি তো চাই লোকটা আমাকে চিঠি লিখুক, প্রতিদিন দশটা করে লিখুক। আবার ভয় ছিল, আমার আব্বা যদি জানতে পারে, আমাকে মেরে ফেলবে পিটিয়ে।

 হাসে মিষ্টি মুখে লাইজু, যোগাযোগ হতো কীভাবে ?

পরের দিন লোকটা আবার পথে ধরে আমাকে। কাঁঠালগাছের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে, তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন ? আমার ওপর ভরসা রাখ পাগলি! তোর বাপ যদি বেশি ঝামেলা করে, তোকে আমি ঢাকায় নিয়ে যাব, আমার কপালে চুমু খায়, পারবি না আমার সঙ্গে থাকতে ?

হ্যাঁ সূচক ঘাড় নাড়ি আমি।

গুড। তুই বোবা নাকি ? কথা বলছিস না কেন ?

লোকটাকে কী করে বোঝাই, আমি মনে মনে কোটি কোটি কথা বলছি…। আমার নিজস্ব নিরাবরণ জগৎটা উলোটপালট করে দিয়েছে লোকটা, আবার আমাকে বকে!

শোন, আমি আগামীকাল ঢাকা চলে যাব। আমার মাস্টার্সের প্রথম ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা। মাসখানেক লাগবে পরীক্ষা শেষ হতে। তুই কিন্তু মনোযোগ দিয়ে পড়বি, নইলে… আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় কপালে। যা…।

আমার দিনরাত্রি একেবারে পালটে যায় ভাবি। যেদিকে তাকাই, আমি কেবলই লোকটাকে দেখি। আমি সময় পেলেই সেই কাঁঠাল গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার মনে হতে থাকে, লোকটা পাখির ডানায় ভর করে চলে আসবে। আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না। পড়ায় মন বসাতে পারি না। কিন্তু লোকটা ভয় দেখিয়েছে―না পড়লে বউ হতে পারব না। কী মুশকিল…

হাসে জাহানারা লাইজু, দারুণ গ্যাড়াকল আর কী!

আপনি হাসছেন ভাবি, আমার অবস্থাটা কত সঙ্গীন! বাধ্য হয়ে বই খুলে পড়তে বসি। সপ্তাহখানেক পর দুপুরের দিকে স্কুল থেকে ফিরছি। পথে আদ্যিনাথ দাদার আদ্যিনাথ টেইলার্স। আমাদের জামা-কাপড় দাদার টেইলার্সেই দিই। আর দাদা সালোয়ার কামিজ খুব যত্ন করে বানায়। আমাকে ডাক দেয়, রুমানা এদিকে আসো।

আমি টেইলার্সের সামনে যাই। দাদা বলে, তুমি ভেতরে এসো তোমার কামিজের মাপ নেব।

আমি অবাক―আমি তো কামিজের কোনও কাপড় দেই নাই।

রহস্যময় হাসি দাদার ঠোঁটে, তোমার আব্বা দিয়ে গেছে। ভেতরে আসো।

ভেতরে ঢুকে দাঁড়াতেই আমার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বলে, মুহিব পাঠিয়েছে।

আমি দ্রুত বুকের মধ্যে গুঁজে বাড়ির দিকে উড়ে উড়ে আসি। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে চিঠি বের করে পড়তে থাকি। ভাবি, সে যে কী উত্তেজনা! এক দিকে জীবনে প্রথম প্রেমের চিঠি, অন্যদিকে ভয়―যদি কেউ দেখে ফেলে ? শরীর মন থর থর কাঁপছে―কিন্তু পড়ছি। কী সব লিখছে ভাবি লোকটা―লজ্জা শরমের বালাই নাই। আমার বুক দুটো নাকি গোলাপ ফুলের বাগান… আমি পড়ি, একা একা বিছানায় গড়াগড়ি খাই, আর হাসি।  ঢাকায় থেকেও  সে নাকি আমাকে সঙ্গে নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে মাছ ধরতে যায়। সিনেমা দেখে। পার্কে বসে বাদাম খায় প্রতি মিনিটে আমাকে চুমু খায়… এসব পড়লে একটা সদ্য যৌবন-ফোটা মেয়ে ঠিক থাকতে পারে ?

পারে না, পারে না… তো কীভাবে ঠিক থাকলে ?

কী আর করব, সারা দিন রাত লোকটাকে ভাবি, আর চিঠি লিখি। চিঠিতে হুমকি দিয়েছে―তিন দিনের মধ্যে চিঠির উত্তর দিতে। না হলে বাড়ি এসে আমাকে পুকুরে চুবিয়ে মারবে। চিঠি লিখে খামে ভরে আদ্যিনাথ দাদার কাছে দিয়ে এলেই হবে। আমিও চিঠি লিখে খামে ভরে আদ্যিনাথ দাদার কাছে দিয়ে আসি। এইভাবে চলে আমাদের চিঠির যোগাযোগ। মাসখানেক পর দেখি, লোকটা বাড়িতে। পুকুরে বড়শি ফেলেছে। দেখে তো আমার পা চলে না। লোকটা বড়শি রেখে আমার কাছে আসে।

কেমন আছিস ?

কোনও রকমে বলি, ভালো।

তুই তো অনেক ভালো চিঠি লিখতে পারিস। আমাকে ছাড়া আর কাকে কাকে চিঠি লিখেছিস ?

বলেন তো, আমার রাগ হয় না ? ইচ্ছে হয় লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে পুকুরে ফেলে দিই। কিন্তু মায়া হলো, ফেলে দিলে লোকটা তো ভিজে যাবে।

বললি না, আর কাকে কাকে চিঠি লিখেছিস ?

আমি কিন্তু আপনাকে পুকুরে ফেলে দেব… প্রথম বললাম একটা বাক্য অনেক সাহস করে।

বাহ, তুই দেখি কথাও বলতে পারিস, রাগও করতে পারিস! শোন, আমি তোকে সারা জীবন তুই করে বলব, আর তুই আমাকে আপনি করে বলবি। মনে থাকবে ? বিয়ের পর তুমি বলার চেষ্টা করলে চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেব।

আমি হাসি আর পাশে পাশে হাঁটি। যেই কাঁঠাল গাছের কাছে যাই, আমার হাতটা ধরে দাঁড় করায়, তুই কিন্তু একটা ডাইনি।

আমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, লোকটা বলে কী ?

তোর জন্য আমি ঘুমুতে পারি না। হাঁটতে পারি না। কোথাও তাকাতে পারি না―সব জায়গায় তুই। আসলে তুই ডাইনি না, পেতনি। তুই অনেকগুলো পেতনি হয়ে ঢাকায় চলে গেছিস, আমাকে পাহারা দিতে। তুই এমন জাদুকর কেন ?

আমি নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম―আমার অবস্থাও খারাপ। যেদিকে তাকাই কেবলই আপনাকে দেখতে পাই কিন্তু আপনি তো ঢাকায়। তখন আমার খুব খারাপ লাগে―কী যে হলো ভাবি, লোকটার সামনে আমি কেঁদে ফেললাম।

লোকটা তো প্রস্তুতই ছিল, আমাকে পাখির বাসার মতো বুকের মধ্যে খুব আদরের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। ভাবি, কী বলব আপনাকে, কী যে সুখ পেয়েছিলাম! আমার সকল ভয় ডর কোথায় যে গেল। লোকটাকে বললাম―আপনি আমাকে এভাবে ধরে রাখুন। ছাড়বেন না।

কেন ছাড়ব না ?

আমার ভীষণ ভালো লাগছে।

লোকে, তোর বাপে যদি দেখে ?

দেখুক, আপনি আমাকে নিয়ে ঢাকা চলে যাবেন।

যাবি আমার সঙ্গে ?

যাব।

এখনই যাবি ?

বললাম তো, যাব।

এখন তোকে ঢাকা নিয়ে গেলে আমার পড়াশোনা হবে না। আমি চাকরি বাকরি পাব না। তোকে খাওয়াব কী ? থাকব কোথায় ?

আপনার সঙ্গে ঢাকা গেলে আমারও পড়াশোনা হবে না।

এই তো লক্ষ্মী মেয়ে, বুঝতে পেরেছিস। আমাকে বুক থেকে সরিয়ে পাশে দাঁড় করায়, লোকটা হেলান দেয় কাঁঠালগাছের সঙ্গে। আমার একটা হাত ধরেই আছে―জীবন পরিকল্পনা মতো না গড়তে পারলে খুব দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হবে। তোর মতো টিয়া পাখি মেয়েকে আমি কষ্ট দিতে চাই না। সেইজন্য তোর পড়াশোনাটা শেষ করা দরকার, আমারও। দুজনে পড়াশোনা শেষ করে বিয়ে করব, একসঙ্গে থাকব। দুজনে মিলে চমৎকার একটা সংসার রচনা করব কিন্তু এখন সেই সোনায় মোড়ানো সুন্দর নিরুপম ভালো থাকার জন্য আমাদের এই বিরহকালটা দরকার। বিরহ প্রেমকে মাধুর্যে পরিপূর্ণ করে। বুঝতে পেরেছিস, কী বলছি ?

আমি মাথা নাড়ি, বুঝেছি।

বাড়িতে আছি পাঁচ সাত দিন। প্রতিদিন দেখা করবি―

আমার ভয় লাগে, আব্বায় জেনে গেলে মেরে ফেলবে।

দেখি, কী করা যায়! লোকটাকে চিন্তিত মনে হলো, বলল―তোর তো প্রাইভেটের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। যা, কাল এখানে দেখা হবে, একটু আগে বের হতে পারবি না ঘর থেকে ?

পারব।

ঠিক আছে, যা।

কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে আছি মাথা নিচু করে।

যাচ্ছিস না কেন ? সময় চলে যাচ্ছে, লেখাপড়ায় অবহেলা একদম সহ্য করব না।

তবু আমি দাঁড়িয়ে আছি।

কী হলো, দাঁড়িয়ে আছিস কেন ?

আমি কপালটা দেখালাম…একটা আদর…

লোকটা অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল। হঠাৎ জড়িয়ে ধরে কপালের উপর গালে ঘাড়ে পর পর কয়েকটা চুমু দিয়ে ছেড়ে দেয়। আমি আমার পাওনা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাইভেট পড়তে হাঁটতে শুরু করি।

ভাইরে, লম্বা কাহিনি প্রেমের, রাত পার হয়ে যাবে শুনতে শুনতে…। হাই তোলে জাহানারা লাইজু।

ভাবি, তোমাকে সবটা শুনতেই হবে। কাউকে তো বলতে পারিনি―কিন্তু আমার ভীষণ বলতে ইচ্ছে করছে।

চা খাবি ?

দাও।

লাইজু উঠে টেবিলের উপরে রাখা ফ্লাস্কে রাখা চা দুটি কাপে ঢালে। ফ্লাস্ক বন্ধ করে, বিস্কুট বের করে আগের জায়গায় ফিরে আসে। বাড়িয়ে দেয় রুমানার চা-বিস্কুট। কষ্ট করে ঠেস দিয়ে বসে রুমানা, চায়ে চুমুক দিয়ে ভালোলাগার অনুভূতি জানায়, তুমি না থাকলে কী যে হতো আমার ভাবি ?

ঘোড়ার আন্ডা হতো, সামনে একটা চেয়ার টেনে বসে লাইজু, শেষ করো তোমার হাজার দিনের কাহিনি।

তুমি তো ভালো বলেছো ভাবি। আরব্য রজনীর হাজার রাতের কাহিনি, আমারটা দিনের কাহিনি। চায়ে চুমুক দিয়ে শুরু করে রুমানা―এভাবে মেট্রিক পর্যন্ত যাই। মেট্রিকে ভালো রেজাল্ট করি―প্রথম আমাদের হাই স্কুলে, ফার্স্ট ডিভিশন পায়, সেটা আমি। বাড়িতে, স্কুলে খুবই আলোড়ন তোলে ঘটনা। সবাই আমাকে নিয়ে আনন্দিত। কিন্তু মানুষজন তো জানে না, আমার ভালো রেজাল্টের পিছনে এই লোকটার অবদান। মেট্রিক পরীক্ষার আগে থেকেই প্রচুর বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে…

আমি এটাই জানতে যাচ্ছিলাম, চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলে জাহানারা লাইজু―তোমার যে রূপ, তাও গ্রামের মেয়ে, তোমার তো  মেট্রিক পরীক্ষার আগে বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

তুমি ঠিকই ধরেছো ভাবি, কিন্তু মা সামলিয়েছে বাবাকে। বলেছে―আমার মেয়ের মেট্রিক পাস না করা পর্যন্ত কোনও বিয়ের প্রস্তাব আমি শুনতে চাই না। এই জায়গায় আব্বা ধরা খাওয়া ছিল মায়ের কাছে।

মানে ?

কথা ছিল, বাড়িতে এনে আব্বা পড়াবে। কিন্তু আব্বা কথা রাখেনি।

বুঝতে পেরেছি। ধরা খাওয়ার কারণে তোমার বাপ অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছে মেট্রিক পর্যন্ত।

ঠিক ধরেছো। কিন্তু মেট্রিক পরীক্ষার পর ডিগ্রি পর্যন্ত কীভাবে পড়লে, বিয়ে ছাড়া ?

মা আমার সামনে সূর্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কীভাবে ?

মেট্রিক পরীক্ষার পর আমি লোকটার চিঠিসহ ধরা পড়ে যাই মায়ের কাছে। আমি তো ভয়ে অস্থির। কিন্তু মা আমাকে খুব ভালোবাসে। বোঝে। চিঠি দেখার পর আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুই সত্যি ওকে পছন্দ করিস ? আমি সম্মতি জানাই। মা আমাকে বলে―ছেলেটা ভালো। চার চাচার এতগুলো ছেলেমেয়েদের মধ্যে একমাত্র মুহিবই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মেট্রিক তো হয়ে গেল―এখন বিয়ে করবে ও ?

না, এখন বিয়ে করবে না।

কেন ?

আমাকে ডিগ্রি পাস করার পর বিয়ে করবে।

মা একটু ভাবে, ঠিকই বলেছে। তুই ডিগ্রি পাস করতে করতে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকলে আর সমস্যা নেই।

কিন্তু আব্বা ? আব্বা তো রাজি হবে না।

সে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। কিন্তু কেউ যেন টের না পায় তোদের সম্পর্ক, তাহলে কিন্তু দুই পরিবারের মধ্যে খুনোখুনি হয়ে যাবে। কে মরে, কে বাঁচে―বলা যায় না।

রুমানা, তোমার মা তো অসাধারণ এক মহিলা!

ভাবি, তুমি ঠিকই বলেছো। কিন্তু আমাদের সম্পর্ককে সহজ পরিণতির ক্ষেত্রে আমি আমার শাশুড়ি, ছালমা বেগমকেও কৃতিত্ব দিতে চাই। চাচি একদমই লেখাপড়া জানে না। বাপের বাড়িতে কোরআন পড়েছেন মাত্র, তাও মুখস্থ। কিন্তু চাচির সামাজিক ও পারিবারিক বোধ ব্যবস্থা অসাধারণ। দুই পরিবারের মধ্যে, বিশেষ করে আমার আব্বা আর বড় চাচার মধ্যে মিটমাট করার ব্যাপারে দুই নারীই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। দুই নারীই আমার জন্য, লোকটার জন্য ঝুঁকি নিয়েছে পরিকল্পিতভাবে, ধীরে ধীরে।

দারুণ তো!

ভাবি, আমার মেট্রিক পাসের পর বিয়ের প্রস্তাবের বান ডাকে নানা জায়গা থেকে। ভালো রেজাল্ট সর্বনাশ করল বেশি। আব্বা তো দিশেহারা। মায়ের এখন নতুন ঘোষণা―আমার মেয়েকে ডিগ্রি পাশ করিয়ে বিয়ে দেব। আব্বা পড়ল মহাবিপদে। আব্বা আমাকে স্থানীয় কলেজে ভর্তি করাল ঠিকই কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব আসতেই থাকে। বাড়িতে ঘটক আসলে খাওয়া-দাওয়া, নাস্তা দেয়া, সঙ্গে কিছু টাকাকড়ি দেয়া―আব্বা বিরক্ত হয়ে উঠেছে। একদিন এক ঘটক এসেছে দুপুরের দিকে―আব্বা বাড়িতে ছিল না। মা লাঠি হাতে খুব বকাবকি করে বিদায় করে দেয়। কিন্তু ঘটক বাজারে গিয়ে চায়ের দোকানে বসে আব্বা ও মায়ের বিরুদ্ধে বিশ্রী ধরনের গালাগাল করতে থাকে। পরিচিতজনেরা আব্বাকে বললে, সেই ঘটকের সঙ্গে ঝগড়া করে। মান-সম্মান  ধুলোয় শুয়ে পড়ল। রাতে বাড়ি এসে আব্বা মাকে বকতে শুরু করলে, মা জবাব দেয়। দুজনে মিলে তুমুল ঝগড়া। এক সময়ে আব্বা মায়ের শরীরে হাত তোলে। পুরো বাড়িঘর স্তব্ধ। মা একটা শব্দ উচ্চারণ না করে চুপচাপ আমার ঘরে এসে শুয়ে থাকে। জীবনে আব্বাকে মায়ের সঙ্গে এমন ঝগড়া করতে শুনিনি। টুকটাক কথা কাটাকাটি হয়েছে, এই যা। আমি তো বুঝতে পারছি―মা কেন ঘটকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে।

খুব সকালে উঠে মা বাপের বাড়ি চলে যায়, একা।

একা চলে গেল ? বিস্মিত জাহানারা লাইজু।

হ্যাঁ, মামাবাড়ি খুব দূরে না, হেঁটে গেলে এক ঘণ্টার পথ। আমরা তো নানাবাড়ি হেঁটেই আসা যাওয়া করতাম। এখন না হয় রাস্তা পাকা হয়েছে―গাড়ি চলে। বাড়িতে আমরা চারটে ভাইবোন। আব্বাসহ পাঁচজন। রান্না কে করবে―কোথায় চাল ডাল নুন মরিচ―আমি কিছুই জানি না। মা আমাকে কখনও রান্নাঘরে ঢুকতে দেয়নি। আমার ছোট বোন মিনারাই মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে কাজ করত। ও হাত-পা পুড়িয়ে দুপুরের ভাত, তরিতরকারি রান্না করে। রাতে আমি ওর সঙ্গে হাত লাগাই। কোনওভাবে রাতটাও পার করি। আব্বা ভয়ানক গম্ভীর। আমাদের কারও সঙ্গে একটা কথাও বলে না। বড় চাচি আমাকে ডেকে দুপুরের খাবার পাঠিয়ে দেয়।

আমি ভয়ে ভয়ে আব্বাকে জিজ্ঞেস করি, আমি কি মাকে আনতে যাব ?

না। জলদগম্ভীর আওয়াজ ওঠে গলা দিয়ে।

জোড়াতালি দিয়ে তিন দিন পার করলাম। কিন্তু বিকেল থেকে আব্বা বাড়িতে নেই। আমাদের কোনও খবর না দিয়েই আব্বা কোথায় যেন চলে যায়। বড় চাচিই আমাদের খাবার দেয়, আমরা খাই। ঘরের মধ্যে কোনও সুখ নাই…। আমি চিঠির পর চিঠি লিখে সব জানাই লোকটাকে। ওই কদিন প্রতিদিন চিঠি লিখেছি। রাতের দিকে দেখি মা ঘরে ঢুকছে হাসিমুখে। আব্বা উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। সেই থেকে আমার বিয়ে পর্যন্ত আর কোনও ঘটক বাড়ি আসেনি।

বিরাট কাহিনি তো! সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে।

নার্স ঢুকে ডাক্তার আসবার আগাম সংবাদ দিয়েছে। লাইজু উঠে রুমানাকে ভালোভাবে শুইয়ে দেয়, ঢোকে দুই বন্ধু মহিবুর মুহিব এবং কনক করিম। দুজনার হাতে নানা ধরনের ফল, খাবার।

বাহ, আমাদের না এলেও চলত মনে হচ্ছে―ফোঁড়ন কাটে মুহিব।

কে তোমাদের আসতে বলেছে ? শুয়ে শুয়ে মন্তব্য করে রুমানা ইয়াসমিন। আমরা দুজনে সব সামলাতে পারব, কী বলো পারব না আপা ?

লাইজু মিটি মিটি হাসে।

তুমি আমার বন্ধুর বউকে তো ভাবি ডাকতে, হঠাৎ আপা হলো কেমন করে ? বিস্ময় প্রকাশ করে মুহিব।

এখন থেকে উনি আমার বোন। বড় বোন। আমি আপার ছোট বোন।

কিন্তু আমি আপা ডাকতে পারব না, বন্ধুর বউকে আপা ডাকলে কেমন কেমন লাগে, কী কস তুই ? তাকায় কনক করিমের দিকে মুহিব।

মুহিবকে সমর্থন করে কনক, আমারও এক কথা, বন্ধুর বউ আপা হয় কী করে ? ভাবি ডাকাই ভালো লাগে।

মনেও লাগে, গলা মুহিবের।

ডাক্তার জয়শ্রী ঘোষ রুমে ঢোকে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে ডাক্তার দেখে রুমানাকে। কালই অপারেশন করব, দুপুরের দিকে। সবই ঠিক আছে রোগীর। তাকায় নার্সের দিকে, ফাইল দাও।

নার্স ফাইল দিলে ডাক্তার জয়শ্রী নির্দেশনা লিখে দিয়ে চলে যায়। রাত প্রায় এগারোটা পর্যন্ত রুমানা ইয়াসমিনের রুমে আড্ডা দেয় চারজন―জাহানারা লাইজু, রুমানা ইয়াসমিন, মহিবুর মুহিব এবং কনক করিম। রাতে বাসায় ফেরার সময়ে রুমানা ভেঙে পড়ে, আমি একা থাকতে পারব না। ভয় লাগবে।

বিচলিত মহিবুর দ্রুত ছুটে যায় হাসপাতালের প্রশাসনিক রুমে, জানায় রাতে আমি থাকব।

না করে দেয় কর্তৃপক্ষ। গাইনি হাসপাতালে রাতের বেলা কোনও পুরুষ এলাউ না। মন খারাপ করে রুমানার কক্ষে ফিরে এলে লাইজু প্রস্তাব দেয়, ঠিক আছে। রুমানার সঙ্গে আমি থাকি।

অবাক মহিবুর, আপনি থাকবেন ?

হ্যাঁ থাকি, একটা রাতই তো। দেখতে দেখতে, গল্প করতে করতে চলে যাবে।

রাইট, স্ত্রীকে সমর্থন করে কনক।

তাহলে দুই বন্ধু দয়া করে গাইনি রুম থেকে চলে যান, আমরা রেস্ট নেব।

তথাস্তু, চল দোস্ত―কনকের হাত ধরে বের হয়ে আসে মহিবুর মুহিব।

হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে আপন মনে বলে মুহিব, ভাগ্যিস আজকে তোর লক্ষ্মী বউ, আমার ভাবি ছিল, নইলে কী যে হতো!

সুযোগ নেয় কনক করিম, লাইজু ভীষণ পরোপকারী আর মানবিক মানুষ। রাস্তাঘাটে অসহায় মানুষ দেখলে কেঁদে ফেলে। ওর অভ্যাস আছে।

আট

বিশিষ্ট গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ফরিদ হোসেনের চেম্বারে বসে আছে জাহানারা লাইজু আর কনক করিম। ডাক্তার খুব মনোযোগ দিয়ে টেস্ট রিপোর্টগুলো দেখছে। গভীর কৌতূহল আর আশার সঙ্গে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে দুজন। একটা রিপোর্ট দেখে কম্পিউটারে ঢোকে ডা. ফরিদ হোসেন। ভ্রƒ কুঁচকে রিপোর্ট দেখে আর কম্পিউটারে একটা কিছু খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে হয়তো পায়, অথবা পায় না, কম্পিউটার সরিয়ে রেখে তাকায় রোগীদের দিকে।

আমি তেমন কোনও সমস্যা পেলাম না আপনাদের রিপোর্টে। চোখ রাখে লাইজুর দিকে, আপনি তো পরিপূর্ণ স্বাভাবিক। মা হওয়ার জন্য যত অর্গান দরকার―সবই আপনার স্বাভাবিক। আপনার স্বামীরও স্বাভাবিক। তবে একটু সমস্যা আছে―

কী সমস্যা ? ব্যাকুল হয়ে জানতে চায় কনক করিম।

চেয়ারে হেলান দিয়ে ডাক্তার হাতে টেবিল থেকে একটা কলম তুলে নেয়, কলমটা নানা অ্যাঙ্গেলে নাড়াতে নাড়াতে বলে, দেখুন কনক সাহেব পৃথিবীটা বিচিত্র। আরও বিচিত্র পৃথিবীর মানুষ, এবং মানুষের সমস্যাসমূহ। আপনার রিপোর্টে সামান্য একটা ব্যাপার আছে কিন্তু এই সামান্য ব্যাপারের চেয়ে অনেক বড় সমস্যা নিয়েও অনেক দম্পতি সফলভাবে বাবা-মা হয়েছে খুব স্বাভাবিকভাবে। ওই দম্পতিরা জানেও না, তাদের মধ্যে কোনও সমস্যা ছিল।

ঠোঁট চাটে কনক করিম, প্রকৃতপক্ষে কী হয়েছে আমার ?

নারী ও পুরুষের মিলনের সময়ে পুরুষের যে শুক্রাণু স্ত্রীর গর্ভে যায়, তাতে যে পরিমাণ শুক্রাণু থাকা দরকার, আপনার বীর্যে তার পরিমাণ একটু কম। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। ওই যে, আমি আগেই বলেছি, অনেক স্বামী আপনার চেয়েও কম শুক্রাণু নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে সন্তানের বাবা-মা হয়েছে। আপনারদেরও মা বাবা হওয়ার ক্ষেত্রে আমি কোনও বাধা দেখছি না। কিন্তু কেন আপনারা সফল হচ্ছেন না, আমি বুঝতে পারছি না।

ডা. ফরিদের দীর্ঘ বক্তব্য শুনে দুজনে বুঝতে পারে, বাচ্চা না হওয়ার জন্য দুজনের কারওই গুরুতর কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু বাচ্চা তো হচ্ছে না।

আপনাদের বিয়ে হয়েছে কত বছর ?

পাঁচ বছর তিন মাস―চট করে জবাব দেয় জাহানারা লাইজু।

ডা. ফরিদ হাতের কলম নাড়াতে নাড়াতে আপন মনে বলে, পাঁচ বছর ? খুব বেশি সময় নয়, আবার কম সময়ও নয়। আপনাদের বয়সের ব্যবধান মাত্র এক বছর এক মাস আঠারো দিন।

আমাদের বয়স কাছাকাছি হওয়া কি কোনও সমস্যা ডাক্তার ? ব্যাকুল গলায় জানতে চায় কনক।

হাসে ডাক্তার, আরে না। বয়স কোনও সমস্যা হবে কেন ? যদি নারীর বয়স বেশি হয়, পুরুষের বয়স কম হয়, বাচ্চা তো হচ্ছে। বয়স কোনওই সমস্যা নয়―সমস্যা হলো আপনার শুক্রাণু। কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যে বাচ্চা হওয়ার মতোও সমস্যা নয় আপনাদের। অনন্ত দুই তিন বছর আগেই আপনাদের সন্তান আসা উচিত ছিল, কেন আসে নাই, গড নোজ।

তাহলে এখন কী করব আমরা ? জানতে চায় লাইজু।

কলমটা টেবিলের উপর রেখে চেয়ারে সোজা হয়ে বসে, আপনারা আরও বছর দুই আগে আসলেন না কেন ?

আমি দু তিন বছর থেকে লাইজুকে বলছিলাম ডাক্তারের কাছে আসতে কিন্তু ও রাজি হয়নি, বিষণ্ন গলা কনক করিমের।

এসব ক্ষেত্রে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা নেয়, ডা. ফরিদ চোখ রাখে লাইজুর উপর, আপনি পিছিয়ে গেছেন কেন ?

লাইজু নিচের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়, আমার এক আত্মীয় দম্পতির বাচ্চা হয়েছে বিয়ের সাত বছর পর…

বুঝতে পেরেছি, ডা. ফরিদ আবার চেয়ারে হেলান দেয়―আপনি ভেবেছিলেন আপনার আত্মীয়দের মতো দেরি হলেও সন্তান আসবে ?

জি, আমি অপেক্ষা করছিলাম, জানায় জাহানারা লাইজু।

হতে পারে, হয়ও। ডা. ফরিদ সমর্থন করে লাইজুকে। অভিজ্ঞতায় দেখেছি―আট নয় বছরেও বাচ্চা হয়েছে।

কিন্তু আমরা এখন কী করব ?

যাই হোক―শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণুর মিলন ঘটে প্রায় অলৌকিক ন্যাচারাল পদ্ধতিতে। ডাক্তারি বিজ্ঞান সব সময়ে সবটা অনুধাবন করতেও পারে না।  আমি একটা ওষুধ দিচ্ছি―একটু দামি, অস্ট্রেলিয়ার। এটা দুজনে খাবেন―ট্যাবলেট। এই ওষুধটা পাশ্চাত্যে খুবই কার্যকর। আমাদের দেশে কয়েক বছর চলছে―এটা খেলে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মধ্যে সংযোগ ঘটাতে সাহায্য করে―ডা. ফরিদ হোসেন প্যাড টেনে নিয়ে খস খস করে ওষুদের নাম লিখে দেয়।

 প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে কনক করিম প্রশ্ন করে, আমরা কবে আসব আবার ?

ওষুধটা একটানা তিন মাস খাবেন, আশা করি ভালো ফল পাবেন। যদি কোনও পজিটিভ ফলাফল না হয়, তিন মাস পর আসবেন।

ওকে, দুজনে বিশিষ্ট গাইনোক্লোজিস্ট ডা. ফরিদ হোসেনের চেম্বার থেকে বের হয়ে আসে। থমথমে মুখ দুজনারই। ডা. ফরিদ হোসেনের চেম্বার ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের কাছে, একটা চারতলা বাড়ির তিনতলা জুড়ে। প্রচুর রোগীর আনাগোনা দেখে লাইজু বুঝতে পারে, মাতৃত্বের সমস্যা কেবল আমারই নয়, অনেকের।

রাত নটা বাজে লাইজু, চলো একটা রেস্টুরেন্টে বসি, প্রস্তাব দেয় কনক করিম।

লাইজু হাতের ঘড়ির দিকে তাকায়, নটা বাজে। সেজন্য পেটে খিদে অনুভব করছে। কনকের প্রস্তাবে ঘাড় নেড়ে সাড়া দেয়, কাছে কোনও রেস্টুরেন্ট আছে ?

হাতের ইশারায় দেখায় কনক, ওই যে দশ তলা বিল্ডিংটা দেখছো, ওটার সব কটা ফ্লোরে দশটা রেস্টুরেন্ট। চল, হাত ধরে লাইজুর।

একটু অপেক্ষা করো, লাইজু রেস্টুরেন্টের ভিতরে ভালো করে তাকায়। দেখছো, রেস্টুরেন্টটার মধ্যে সিঁড়িটা খুব সরু।

তাতে কী ? আমরা লিফটে উঠব, তাড়া দেয় কনক করিম―সাত তলার আশা রেস্টুরেন্টটার খুব নাম শুনেছি। খাবার নাকি খুব সুস্বাদু। চলো―

আমি যাব না, তুমি অন্য রেস্টুরেন্ট দেখো।

মানে কী লাইজু, চটে যায় কনক।

তুমি ভুলে গেলে ?

কী ভুলব ?

বেইলি রোডে আটতলা রেস্টুরেন্টে আগুন লাগলে কতজন মানুষ পুড়ে মারা গেল―রেস্টুরেন্টের সিঁড়ি ছিল, কিন্তু ব্যবহার উপযোগী ছিল না।

ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের কাছে দাঁড়িয়ে কনক করিম বিস্মিত। এত সহজে আমরা সব ভুলে যাই ? কিন্তু জাহানারা লাইজু ঠিকই মনে রেখেছে। কারও কি কোনও শাস্তি হয়েছিল ? কেউ গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছে ? সেই সময়ে সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ, র‌্যাবের কত কর্মতৎপরতা। কয়েকটা রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিয়েছিল―কিন্তু ওই পর্যন্তই। বন্ধ রেস্টুরেন্টগুলো ধীরে ধীরে চালু হলো―মানুষ হত্যার ঘটনা মানুষ বেমালুম ভুয়ে গেছে!

হাত ধরে কনক, চলো লাইজু। রাস্তার পাশে ফুটপাথে চটপটি খাই, খাবে ?

চলো, অনেক দিন খাই না।

দুজনে রাস্তার পাশে বাকের ভাই চটপটির দোকানের সামনে পাতা প্লাসটিকের চেয়ারে বসে। চওড়া ফুটপাথে বাকের ভাই চটপটি হাউজ। তরুণ মালিক একের পর এক চটপটি তৈরি করছে, দুজন কর্মী সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। ময়লা প্লেট তুলে নিয়ে পাশের গামলায় ধুয়ে আমার মালিকের সামনে, চটপটির ভ্যানে রাখছে।

একটা ছেলে এসে সামনে দাঁড়ায়, কী খাবেন আপনারা ?

লাইজু চটপট জানায়, দুটো চটপটি দাও।  

পাঁচ মিনিট সময় দেন―ছেলেটা চিৎকার করে মালিককে জানায়, ওস্তাদ দুইটা চটপটি….। চটপটি  খেতে খেতে কনক ডাকে তরুণ মালিককে, আপনার চটপটির দোকানের নাম বাকের ভাই চটপটি হাউজ কেন ?

ঝটপট হাসে তরুণ, ছোটবেলায় টিভিতে হুমায়ূন আহমেদের বাকের ভাই নাটক দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম…

বুঝতে পারছি, আমিও দেখেছি নাটকটা। সেই সময়ে কোনও টিভি চ্যানেল ছিল না, বিটিভি যা দেখাতো দেখতাম। সেই সময়ে এই নাটক, আর শোনো এই নাটকের নাম বাকের ভাই না, নাটকের নাম―

কোথাও কেউ নেই, পাশ থেকে বলে জাহানারা লাইজু।

হাসে কনক করিম, রাইট। নাটকের নাম কোথাও কেউ নেই। অভিনয় করেছে এক ঝাক তারকা―আসাদুজ্জামান নূর, আবুল খায়ের, আবদুল কাদের, সুবর্ণা মোস্তাফা, লুৎফর রহমান জর্জ, মাহফুজ আহেমদ। ভালো লাগল আপনি সেই বাকের ভাইকে মনে রেখে চটপটির দোকানের নাম রেখেছেন বাকের ভাই চটপটি হাউজ।

তুমি একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নামই বলোনি, চটপটির প্লেট ফেরত দিতে দিতে বলে জাহানারা লইজু।

কোন চরিত্র ভুলে গেলাম ?

হুমায়ূন ফরিদী।

আঁতকে ওঠে কনক, আরে তাই তো। আইনজীবীর ভূমিকায় অসাধারণ মেকাপে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন তিনি, আমাদের লিজেন্ড শিল্পী। সত্যি, আমি কী করে ভুলে গেলাম। থ্যাঙ্ক ইউ লাইজু মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।

―যাই, ক্রেতারা অপেক্ষা করছে, বাকের ভাই চটপটি হাউজের তরুণ মালিক হাবিব মিয়া চলে যায় ভ্যানের কাছে।

লাইজু, তুমি এখানে বসো। রাস্তার ওই পাড়ে বড় একটা ওষুধের দোকান, দেখি ওষুধটা পাওয়া যায় কি না।

যাও, আমি বসে বসে রাস্তার মানুষ দেখি।

হাসতে হাসতে দাঁড়ায় কনক করিম রাস্তার ওপাশে যাবার জন্য। জানে, রাস্তায় বের হলে জাহানারা লাইজু নিবিষ্ট মনে মানুষ দেখে। মানুষ দেখতে নাকি খুব ভালো লাগে। রাস্তার চলমান মানুষ আর যানবাহন দেখতে দেখতে লাইজু ফিরে যায় নিজের মনের আয়নায়।

কলেজের ফিজিক্সের সহকারী অধ্যাপক রিয়ানা মাহমুদ ঠোঁট কাটা ধরনের মানুষ। যাকে যা বলার মুখের উপর বলে দেয়। ফলে দঙ্গলবাজরা এড়িয়ে চলে। আর নিজের কাজ করা যায়, ডিসটার্ব করার কলিগ কম। রিয়ানাকে ভালো লাগে শুরু থেকেই জাহানারা লাইজুর। দুজনে দুই সাবজেক্টের হলেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়। কলেজের কমনরুমে দুজনে পাশাপাশি বসে, গল্প করে। গল্প করতে করতেই একদিন রিয়ানা বলে, লাইজু তুমি একটা কাজ করতে পারো।

কী কাজ আপা ?

তুমি ডাক্তারের কাছে যাও। দেখো, তোমার নিজের কোনও সমস্যা আছে কি না ?

বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে, সেটা ঠিক হবে ?

কেন নয় ? নিজের প্রতি নিজের একটা জাজমেন্ট তো তৈরি হবে।

কিন্তু যদি কনক জানতে পারে ? ও খুব কষ্ট পাবে আপা। আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে―

কী আশ্চার্য, কনক তোমাকে ভালোবাসে―তার সঙ্গে তোমার সন্তানসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কী সর্ম্পক ? এটা হচ্ছে নিজেকে নির্ভুল প্রমাণ করার বা রাখার একটা উপায় মাত্র। তুমি জাজমেন্ট করতে পারলে…

কিন্তু কোথায় করানো যায় ?

তুমি কাল আমার সঙ্গে বিকেলে কলেজ থেকে যাবে একটা হাসপাতালে।

আপা, খরচ কেমন হবে ?

হাজার পাঁচেক টাকা।

ঠিক আছে আপা, আমি যাব।

পরের দিন রিয়ানা মাহমুদের সঙ্গে জাহানারা লাইজু যায় গাইনোকলোজিস্ট ডা. শারমিন রহমানের চেম্বারে। রিয়ানা আর শারমিন বন্ধু―স্কুল জীবন থেকে। তুই তোকারি সম্পর্ক।  রক্ত, প্রস্রাব রেখে দিয়ে বলল ডা. শারমিন, দুই দিন পরে আসার জন্য।

দুদিন পরে রিপোর্ট আনতে গেলে ডা শারমিন রহমান জানায়, আপনার কোনও সমস্যা নেই। আপনি যথেষ্ট ফারটাইল লেডি। আমার ধারণা, সমস্যা আপনার স্বামীর। কিন্তু আমাদের দেশের পুরুষদের সমস্যা হচ্ছে, পুরুষেরা ধারণা করে সন্তান না হওয়ার জন্য দায়ী একমাত্র নারী, মানে স্ত্রী। আমি জানি না, আপনার স্বামী…

আপা, ডা. শারমিনকে থামিয়ে দেয় লাইজু, আমার স্বামী একদম ও রকম নয়। খুবই স্বাভাবিক মানুষ, ভালো মানুষ। আমরা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি।

এখন আপনার স্বামীকে বলতে পারবেন…

না, আমি তাও বলতে পারব না। কারণ, ও খুব কষ্ট পাবে। আমি ওকে কষ্ট দিতে চাই না।

তাহলে তো ঝুলে থাকতে হবে আপনাকে।

তাই তো মনে হচ্ছে।

যেহেতু আপনাদের বোঝাপাড়া ভালো, একদিন আমার কাছে নিয়ে আসুন। আমি বুঝিয়ে আপনার স্বামীর শুক্রাণু পরীক্ষাটা করাই…

আমি ওকে বলতে পারব না আপা, দাঁড়ায় লাইজু, আমাকে মার্জনা করুন। বের হয়ে আসে ডা. শারমিন রহমানের চেম্বার থেকে। বাইরে এসে হাসপাতালের সামনে একটু খোলা জায়গায় দাঁড়ায় জাহানারা লাইজু। মনটা বিষণ্ন, কী করবে―ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছে না। তাহলে এই জীবনে মা হতে পারব না ? করুণ সুরে হৃদয়টা উথাল-পাথাল হয়ে যাচ্ছে লাইজুর… সব চেয়ে গভীর তৃষ্ণা, বেদনার এই পাথরের গল্প আমি কনককেও বলতে পারব না। কনক খুব সহজ, প্রবল অনুভূতিশীল মানুষ। ঘটনাটা বললে খুব ভেঙে পড়বে। আবার প্রশ্ন তুলতে পারে, আমাকে না জানিয়ে কেন ডাক্তারের কাছে গেলে ? তখন কী বলব ? খুব সাবধানে থাকতে হবে―খুব সাবধানে, মনের ভুলে কিংবা রাগ করেও বলা যাবে না। আপন মনে হাসে লাইজু, রাগ ? পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে তো ঝগড়াই হলো না একদিন দুজনের মধ্যে। আমি যদিও মাঝে মধ্যে ফুঁসে উঠি কিন্তু কনক একেবারে চুপ করে থাকে।

নিজেকে সামলে জাহানারা লাইজু হাসপাতাল এলাকা ছেড়ে রাস্তায় আসে। খুব গরম পড়ছে। যদিও আষাঢ় মাস, আকাশ মেঘলা, বৃষ্টি হচ্ছে হালকা কিন্তু গরম যাচ্ছে না। রাস্তার পাশে খুব সুন্দর করে সাজানো ফলের জুসের দোকান দেখে ঢোকে। টেবিলে বসে পেঁপের ঠান্ডা  জুস দিতে বলে ওয়েটারকে। ওয়েটার অর্ডার নিয়ে যেতে দরজা পার হয়ে ঢোকে টুকটুকে মেয়ে, চার পাঁচ বছর হবে মেয়েটার। সঙ্গে মেয়েটার মা।

মা আমি পেপের জুস খাব, বলেই মেয়েটি ঠিক মুখোমুখি টেবিলটায় বসে লাইজুর।

পদ্ম তুমি তো পেঁপের জুস খেতে পার না, মা মতামত জানায়। তুমি বরং একটা আইসক্রিম খাও।

না, দুদিকের বেণী দুলিয়ে প্রবলভাবে প্রতিবাদ করে পদ্ম, আমি পেঁপের জুস খাবো।

হতাশ মা পদ্মর পাশে বসে, ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে ফোন দিয়ে কানে নেয়―হ্যালো বকুল আশরাফ ? তুমি কোথায় ? আসতে দেরি করছো কেন ?

ঠিক আছে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসো। পদ্মর মা মোবাইল রেখে তাকায় সামনের দিকে। লাইজুর অর্ডার নেওয়া ওয়েটার এসে সামনে সুদৃশ্য লম্বা গ্লাসে পেঁপের জুস রেখে পদ্মর মায়ের সামনে যায়, কী দেব ম্যাম ?

আগে একটা পেঁপের জুস দিন―আমি একটু পরে অর্ডার দিচ্ছি।

ঠিক আছে, ওয়েটার চলে যায়।

পদ্ম মিষ্টি চোখে তাকিয়ে আছে লাইজুর সামনে রাখা পেপের জুসে ভরা গ্লাসের দিকে, তুমি পেঁপের জুস পছন্দ করো ?

হাসে লাইজু, হ্যাঁ। তুমিও পছন্দ করো তাই না ?

ঘাড় নাড়ায় পদ্ম, করি তো। কিন্তু মা না.. মায়ের দিকে তাকিয়ে থেমে যায় পদ্ম।

লাইজু নিজের জুসের গ্লাসটা হাতে নিয়ে পদ্মদের টেবিলের সামনে আসে। বসে একটা চেয়ারে। এখন পদ্মদের টেবিলে তিনজন। লাইজু গ্লাসটা বাড়িয়ে দেয় পদ্মর সামনে, তুমি নাও।

এটা তো তোমার…

আর বলবেন না, যেখানে যায় সবার সঙ্গে কথা বলে, এক ধরনের মিষ্টি অনুযোগ পদ্মর মায়ের।

বলুক না, আপনার মেয়েটা দারুণ মিষ্টি। পদ্ম, তুমি আমারটা খেতে শুরু করো, স্ট্র এগিয়ে দেয় মুখের কাছে। তোমারটা এলে তখন আমি খাবো।

স্ট্র ধরে তাকায় মায়ের দিকে, মা  আমি কিন্তু চাইনি। আন্টি নিজে দিয়েছে―খাবো ?

দেখলেন মেয়ের কৌশল ? হাসে পদ্মর মা, ওর কথার কৌশলের কাছে পারি না আমি। খাও, আন্টি আদর করে দিয়েছে।

স্ট্র মুখে দিয়ে আবার বের করে, তোমাকে ধন্যবাদ। মুখে স্ট্র দিয়ে পেঁপের জুস খেতে শুরু করে পদ্ম।

জানেন, অভিযোগ করে পদ্মর মা, ওকে নিয়ে খুব টেনশনে থাকি। পদ্ম সবার সঙ্গে মেশে, গল্প করে একেবারে আপনজনের মতো। কোনও জড়তা নেই।

 উৎসাহের সঙ্গে সাড়া দেয় লাইজু, খুব ভালো তো। আপনার মেয়েটা সপ্রতিভ। জড়তা নেই―

কিন্তু আপনি যেভাবে সহজে নিলেন, অনেকে নেয় না আপা! প্রত্যেকের তো নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকে।

তাই বলে এমন চাঁদের কণার মতো একটা মেয়ের..

তোমরা কী করছো ?

পাপা! পদ্ম খাওয়া রেখে তিরের গতিতে ছুটে গিয়ে পিছনে দাঁড়ানো বাবা বকুল আশরাফকে জড়িয়ে ধরে। তুমি আসতে দেরি করলে কেন ?

দেরি কই ? অফিসের কাজ শেষ করে তো আসতে হয়, ঘুরে বকুল আশরাফ বসে স্ত্রীর পাশে। বুকের কোণে দু হাতে আঁকড়ে ধরেছে মেয়েটাকে। বকুল তাকায় পদ্মর মায়ের দিকে, কে আমাদের সামনে বসে আছেন ?

তোমার মেয়ে যা করে, উনি পেঁপের জুসের…

আপা, আপনাদের মেয়ে কিচ্ছু করেনি। পদ্ম একটা মিষ্টি মেয়ে।

আমি বুঝতে পেরেছি। অর্ডার দিয়েছ কিছু ?

ওয়েটার পেঁপের জুস নিয়ে আসে, টেবিলের উপর রাখে।

এই তো আপনার জুস এসে গেছে―উৎসাহের সঙ্গে বলে পদ্মর মা।

উনি একলা খাবেন কেন ? আমরাও অর্ডার করি, বকুল ডাক দেয় ওয়েটারকে―আমাদের দুজনকেও দিন। লাইজুর দিকে তাকায় বকুল, জুসের সঙ্গে আরও কিছু খাবেন ? এই দোকানটা নতুন হয়েছে। আমার ব্যাংকের অফিস কাছেই, পদ্ম আর পদ্মর মা এখানে এসে আমাকে ফোন দেয়। আমি এলে একটু খাইদাই করে চলে যাই।

খুব চমৎকার, মন্তব্য করে লাইজু। হাত বাড়ায় পদ্মর দিকে, আমার কাছে একটু আসো তো মামণি ?

তাকায় বাপের দিকে, যাব ?

নিশ্চয়ই যাবে।

গুটি গুটি পায়ে পদ্ম এসে দাঁড়ায় জাহানারা লাইজুর সামনে, হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে, তুমি আসমানের একটা চাঁদের বুড়ি। ভুল করে মাটির পৃিথবীতে এসে পড়েছো।

খিল খিল হাসে, আমি চাঁদের বুড়ি ?

হ্যাঁ  চাঁদের বুড়ি বটে কিন্তু খুব সুন্দর, একটা বার্বি ডল।

আমার অনেক ডল আছে। তুমি চলো আমার সঙ্গে―দেখে আসবে। জানো একটা ডল তো আমার সঙ্গে কথা বলে। গল্প করে। হাসে। কিন্তু পাপা বিশ্বাস করে না।

খুব খারাপ কথা তো, তাকায় বকুলের দিকে, আপনি বিশ্বাস করেন না কেন ?

আজ থেকে করব।

গুড বয় পাপা।

তুমি চকলেট পছন্দ কর ? কানে কানে জিজ্ঞেস করে লাইজু।

পদ্মও চুপি চুপি জবাব দেয়, করি তো। আমার ডলগুলোও পছন্দ করে।

তাহলে চলো, পদ্মর হাত ধরে দাঁড়ায়, এগিয়ে যায় থরে থরে সাজানো চকলেট বক্সের দিকে। দ্রুত দেখে পদ্ম একটা বক্স পছন্দ করে, দাম দিয়ে পদ্মর হাতে দিয়ে ফিরে আসে টেবিলে।

এটা তো ঠিক হলো না মা ? বকুল একটু গম্ভীর গলায় বলে।

কী করলাম আমি ?

তুমি আন্টির কাছ থেকে চকলেট নিয়েছো না ?

আমি কি নিয়েছি ? তাকায় লাইজুর দিকে, আন্টিই তো দিল আমাকে, তাই না ?

ভাই, আপনি এমন করছেন কেন ? পদ্ম আপনাদের মেয়ে, আমার সঙ্গে সামান্য সময়ের পরিচয়। একটু পরেই চলে যাব। আপনাদের সঙ্গে, পদ্মর সঙ্গে হয়তো আর দেখাই হবে না। না হয় থাকুক পদ্মর সঙ্গে আমার এই স্মৃতিটুকু… বলতে জাহানারা লাইজুর গলা অনেকটা ভারী হয়ে আসে। মাথা নিচু করে পদ্মকে ধরে বসে থাকে।

বকুল আশরাফও খুব আবেগপ্রবণ মানুষ। কী বলতে কী হয়ে গেল―কী করে সামলে নেবে বুঝতে পারছে না।  তাকায় স্ত্রী রওনক আরার দিকে।

রওনক আরা উঠে কাছে আসে লাইজুর, আপা ও কিছু মিন করে বলেনি। এমনি ঠাট্টার ছলে বলেছে। বাসায় যতক্ষণ থাকে―বাপ মেয়ের এই ধরনের গল্পে ঠাট্টায় আমিও অতিষ্ঠ হয়ে যাই। মাথার উপর হাত রাখে, প্লিজ আপনি কষ্ট নিয়েন না।

দ্রুত নিজেকে সামলে নেয় লাইজু। টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে বলে, আমারও যে কী হলো! হঠাৎ চোখ পড়ে তিনটি গ্লাস ভরা পেঁপের জুসের দিকে―আসুন আমরা জুস খাই।

রাইট, হাতে নিয়ে গ্লাসে চুমুক দেয় বকুল।

সঙ্গে সঙ্গে রওনক আরা এবং জাহানারা লাইজুও গ্লাস হাতে নিয়ে  খেতে শুরু করে। খাওয়ার মধ্যে আর কথা হলো না। পুরো পরিস্থিতিটা কেমন শোকাচ্ছন্ন। বকুলের মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করছে।

আপনার বাসা কোথায় আপা ?

আমার বাসা পুরোনো ঢাকায়। আমলিগোলা। আমি সেখানে একটা কলেজে পড়াই। এদিকে এসেছিলাম এই হাসপাতালে। ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিচে এসে এখানে ঢুকেই পদ্মর সঙ্গে দেখা, একটানে ইতিহাস ভূগোল বলে থামে জাহানারা লাইজু।

আপনি কোন সাবজেক্ট পড়ান―পরিবেশটা অনুকূলে আনার জন্য বকুল আশরাফ কথার পিঠে কথা বলছে।

আমি ? আমি পড়াই জিওগ্রাফি।

সঙ্গে সঙ্গে বকুলের দিকে তাকায় রওনক আরা। দুজনে মৃদু হাসে।

হাসলেন কেন ? প্রশ্ন করে লাইজু।

ওর সাবজেক্টও ছিল জিওগ্রাফি।

হাসে জাহানারা লাইজু, আমি চলি। অনেক লেট হয়ে গেল, নুয়ে আদর করে পদ্মকে, ভালো থেকো মামণি। আপনারা ভালো থাকবেন।

রওনক আরা একটা কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ না করে লাইজু দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে।  লাইজু দরজা পার হয়ে রাস্তায় নেমেই একটা রিকশা পেয়ে উঠে যায়। পদ্ম তাকিয়ে আছে, চোখ পড়ে পদ্মর দিকে। হাত নেড়ে টা টা জানায় পদ্ম, জানায় লাইজুও। কিন্তু ততক্ষণে রিকশা চোখের আড়ালে চলে যায়।

গ্রীবা ঘুরিয়ে তাকায় রওনক আরা, তুমি এত কথা বলো কেন ? যেখানে যাও―তোমাকে কথা বলতেই হবে। আমি নিশ্চিত―মহিলার মা হতে সমস্যা হচ্ছে, সেজন্যই হাসপাতালে এসেছিল।

তুমি কী করে বুঝলে ?

বোঝা যায়, চল পদ্ম বাসায় যাই―দাঁড়ায় রওনক আরা। মেয়ের হাত ধরে তাকায়, তুমি কখন আসবে ?

অফিস শেষে, স্ত্রী কন্যার সঙ্গে গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনটা একেবারে খারাপ হয়ে যায় বকুলের, নাম না জানা মানুষটার জন্য বুকের মধ্যে একটা মমতার জন্ম হয়। মাতৃত্বের সন্ধানেই পদ্মকে…।

নয়

দোস্ত, একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে বাসায়।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আলাপ করছে দুই বন্ধু, কনক করিম এবং মহিবুল মুহিব।

জটিলতা কী ?

হাসে মুহিব, জটিলতা মধুর।

মানে ?

এত সাবধানতা অবলম্বন করার পরও তোর ভাবি কনসিভ করেছে।

তাই নাকি ?

হ্যাঁ।

প্রথমটা ছেলে হওয়ায় আমি দ্বিতীয় বাচ্চা নিলাম একটা মেয়ের জন্য। কিন্তু দ্যাখ সেটাও ছেলে হলো। তুই তো জানিস, একটা মেয়ের জন্য আমার আকুলতা। সংসারে একটা মেয়ে না থাকলে সংসারটাই পূর্ণতা পায় না। কিন্তু এটাও যদি মেয়ে না হয় ? আমি খুব সংকটে আছি।

কিসের সংকট ?

তিন তিনটা সন্তান―লালন পালন করা বড় করা কী চাট্টিখানি ঘটনা ? খরচ আছে, সামলানোও কঠিন।

কত মাস হলো ? জিজ্ঞেস করে কনক করিম।

আড়াই মাস হলো।

তাইলে অত চিন্তা করছিস কেন ? কোনও ক্লিনিকে নিয়ে…

শেষ করতে পারে না কনক, ধরে ফেলে মুহিব, আমি সেটাও তোর ভাবিকে বলেছিলাম কিন্তু তোর ভাবি কোনওভাবেই রাজি হচ্ছে না।

কেন রাজি হচ্ছে না ?

ভুল করে এলেও আমার পেটের সন্তান আমি অ্যাবরশন করাবো না।

সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে তাকায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে কনক, ভাবিরও যুক্তি আছে। মা জানে পেটের সন্তানের মমতা!

ঠিকই বলেছিস কিন্তু আমি পড়ে গেছি গ্যাঁড়াকলে, আমি বাসায় যাব। রুমানাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তুই অফিস শেষ করে বাসায় যা। আর ঘটনাটা ভাবিকে বলিস… লম্বা পা ফেলে চলে যায় মুহিব।

যদিও মহিবুল মুহিব বলছে আমি পরে গেছি গ্যাঁড়াকলে কিন্তু চোখে-মুখে কোনও প্রতিক্রিয়ার ছাপ দেখতে পায় না কনক। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, ঘনিষ্ঠতা। একে অপরকে অনেকটাই চেনে। প্রকৃতপক্ষে, এই দুশ্চিন্তার ভান হচ্ছে এক ধরনের গৌরবের নিঃশব্দ প্রকাশ।

অফিসের ব্যালকনিতে একা একা দাঁড়িয়ে থাকে কনক করিম। সবই আছে কিন্তু কোথায় যেন একটা নিরঙ্কুশ শূন্যতা ঝুলে আছে। বিশাল একটা বিল্ডিংয়ে কনক করিমদের অফিসটা। এগারো তলা। আধুনিক নির্মাণ প্রকৌশলে রাজধানীর একেবারে হার্ট পয়েন্ট পল্টন এলাকায় অফিস। কিন্তু কনক করিমের মনে হচ্ছে―আমি দাঁিড়য়ে আছি এক শূন্য কাঠামোর মধ্যে। আমার চারপাশে কেউ নেই। নেই কোনও ইট-সিমেন্টের আস্তরণ, নেই কোনও বিল্ডিংয়ের চিহ্ন, আমি দাঁড়িয়ে আছি বিশাল এক শূন্য কাঠামোর রেলগাড়ির ওপর। যাবার সময়ে মুহিব বলল, ঘটনাটা ভাবিকে বলিস!

হ্যাঁ নিশ্চিতই বলব। প্রিয় বন্ধুর এমন সুখবর আমি লাইজুর কাছে বলব না কেন ?

স্যার ? সামনে এসে দাঁড়ায় পিওন ওমর আলী।

কী ওমর ?

বড় স্যার আপনাকে সালাম দিয়েছে!

ওকে, যাও আমি আসছি।

ওমর চলে গেলেও দাঁড়িয়ে থাকে কনক করিম। মনটাকে আটকাতে পারছে না মনের ঘরের মধ্যে। মনটা সকল দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অসহায় লাগছে খুব।  কান্না আসতে চাইছে দু চোখ ভেঙে প্লাবনের গতিতে। এই জীবনে কখনও এমন প্রতিক্রিয়া হয়নি আমার। আমি কি বন্ধুর সাফল্যে ঈর্ষাকাতর ? আমি ওর আগত সন্তানের জন্য শোকার্ত ? ছিঃ আমার নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণার উদ্রেক হচ্ছে। আমি এত নীচ ? এত হীন ? এত নির্মম ? আমার মধ্যেও বাস করে হীনম্মন্যতা ? আমি তো আমাকে এসবের ঊর্ধ্বে একজন স্বাভাবিক মানুষ ভাবতাম। কিন্তু ভাবনা আর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ালে আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ঈর্ষা এভাবেই প্রকাশিত হয় ?

আচ্ছা, আমাদের যদি কোনও সন্তান থাকত, তাহলে কি আমার মধ্যে এমন গভীর গোপন ঈর্ষার করাত প্রকাশিত হতো ? হয়তো হতো না―আমার পকেট শূন্য তাই আমি অন্যের ভরা পকেটের দিকে তাকিয়ে মর্মাহত ? মানসিক যন্ত্রণায় পীড়িত ? আমি এতটা পরশ্রীকাতর ? মুহিব তো আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। আমি কেন… নিজের প্রতি এক ধরনের ধিক্কার অনুভব করে কনক করিম। দ্রুত যায় বাথরুমে। ডিরেক্টর স্যার বিকেলে কেন ডেকেছেন ? চোখে-মুখে পানি দিতে দিতে নিজেকে নিজের গভীরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে কনক করিম। পানি দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, আয়নায় প্রতিফলিত আমি তো ঠিকই আছি। কিন্তু ভেতরের ওই ঈর্ষাকাতর আমিকে চাই না আমি, হে আয়না তুমি আমার অন্তরাত্মার কাছে সুন্দরের বাণী পৌঁছে দাও…।

স্যার ডেকেছেন আপনি ?

বড় স্যার ইরফান মজিদ একটা ফাইল দেখছেন। রুমে ঢুকে টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই মুখ তোলে, আপনি তো অনেক দিন বিদেশে যান না। থাইল্যান্ড ঘুরে আসুন আগামী মাসে।

আগামী মাসে ? যদিও প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে বস ইরফান মজিদকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব পুলকিত। খরচ বেঁেচ যাবে অনেক।

হ্যাঁ। আগামী মাসে। আমাদের একটা বিজনেস গ্রুপের বৈঠক, আমিই যেতাম। কিন্তু আমার মেয়ের বিয়ের তারিখ ওই সময়ে। সে জন্য আপনাকে পাঠাচ্ছি।

ঘাড় কাত করে কনক করিম, ঠিক আছে স্যার। যাব।

গুড। আপনি আপনার পাসপোর্ট আগামীকাল হিউম্যান রিসোর্সে  দিয়ে দেবেন। বাকিটা ওরাই সামলামে। আর যাবার আগে আপনার সঙ্গে আমার আরও বৈঠক হবে। আপনি দাঁড়িয়ে কেন কনক ? বসুন না।

কনক করিম যে দাঁড়িয়ে আছে, নিজেও বুঝতে পারেনি। ইরফান মজিদের বলার সঙ্গে সঙ্গে বসে চেয়ারে। কলিং বেল টিপলে পিএ রাধারানি এসে দাঁড়ায়, দু কাপ চা দাও রাধা।

জি স্যার। রাধা বের হয়ে যায়।

আপনি এই ফাইলটা নিন, অফিসে বা বাসায় খুব মনোযোগ দিয়ে দেখবেন, কোনও প্রশ্ন মনে এলে আমার সঙ্গে আলাপ করবেন, চেয়ারে হেলান দেন ইরফান।

জি স্যার, প্রয়োজন মনে করলে আপনার সঙ্গে আলাপ করব।

রাইট, এই ব্যাপারে প্রশাসনের অনামিকা কলি আপনাকে হেল্প করতে পারবে, বলতে বলতে রাধা ট্রে হাতে প্রবেশ করে। রাধা টেবিলের ওপর চায়ের কাপ ও বিস্কুটের পিরিচ রেখে দাঁড়াতেই ইরফান মজিদ বলেন, তুমি অনামিকা কলিকে আসতে বলো তো!

জি স্যার। চলে যায় রাধা।

বিস্কুটের সঙ্গে চায়ে চুমুক দেয় কনক, ঢোকে অনামিকা কলি। পরনে শাড়ি। ম্যাচ করে ব্লাউজ, জুতা। দুই হাতে কাচের চুড়ি। কানে বড় বড় দুটো ঝুমকো। চুল উঁচু খোঁপা করে বাঁধা। বিশাল খোঁপা থেকে আড়াআড়ি সুদৃশ্য একটা কাটা বের হয়ে আছে। লম্বা একহারা গড়নের অনামিকা কলির প্রতি অফিসের সকলেরই আশা আছে, কম বেশি। কিন্তু কলিকে স্পর্শ করার সাহস এখন পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেনি। সেই অনামিকা কলির সঙ্গে কাজ করতে হবে! শরীর একটু নড়ে চড়ে ওঠে। মনে মনে নিজেকে বলে কনক করিম, অপেক্ষা করো কনক করিম। সবুরে ফল পাওয়া যায়। দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায় ?

স্যার ?

বসুন।

অনামিকা কলি বসে কনকের পাশে। কলির শরীর থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ পায় কনক। খুব ভালো লাগে গন্ধটা। মনে হয়, সুরভিত গন্ধের মধ্যে ডুবে থাকলে ভালো লাগত অসীম।

রাধা আবার ট্রে নিয়ে ঢোকে। কলির সামনে বিস্কুট আর চায়ের কাপ রেখে চলে যায়। ডান হাতে একটা বিস্কুট তুলে মুখে দেয়, পাশে বসে কলির দুই মাড়ির দাঁতের মধ্যে বিস্কুট ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবার মুড় মুড় শব্দ শুনতে পায় কনক করিম। শরীর শিউরে ওঠে।

আপনি গত বছর থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন―

 জি স্যার। আমরা চারজনে গিয়েছিলাম আপনার নেতৃত্বে।

এবার যাচ্ছেন আমাদের রিসোর্স ডির্পাটমেন্টের কনক করিম।

ঘাড় বাঁকা করে তাকায় অনামিকা কলি পাশের চেয়ারে বসা কনক করিমের দিকে, অভিনন্দন। থাইল্যান্ড দেশটা খুব সুন্দর…। ভালো লাগবে আপনার।

 যেহেতু আপনার অভিজ্ঞতা আছে, সে কারণে বলছি, ওকে এক সময়ে ব্রিফ করে দেবেন।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে তাকায় কলি, এটা কোনও বিষয় না। কনক সাহেব, আপনি আগামীকাল আমার রুমে আসেন। তখন বিস্তরিত বলা যাবে।

ঠিক আছে ম্যাম।

ওকে, তাড়া দেন ইরফান মজিদ, আমি একটা বৈঠকে যাব―দাঁড়ান বস।

সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়ায় কনক এবং কলি। চেয়ার ঘোরাবার সময়ে শরীর একটু বেঁকে অনামিকা কলির দিকে হেলে পড়লে, কলির শরীরের সেই গন্ধটা নাক দিয়ে একেবারে হৃদয়ের নিলয়ে ঢুকে যায়।

দশ

আপা, এখন আমি কী করব ?

কী করবে ? বাচ্চা পেটে আসছে, নেবে। চারদিকে তাকাও, কত দম্পতি একটা বাচ্চার জন্য হাহাকার করছে। সেখানে না চাইতেই জল নেমে এসেছে তোমার সোনার সংসারে। নিশ্চয়ই বাচ্চা নেবে―রুমানা ইয়াসমিন চলে এসেছে জাহানারা লাইজুর বাসায়।

রুমানার সংসারের কোনও সমস্যা উপস্থিত হলে সমাধানের জন্য ছুটে আসে লাইজুর কাছে।

কিন্তু হিল্লোল আর কল্লোলের বাবা তো…

মাথা নষ্ট হয়েছে নাকি ? ডাইনিং টেবিল ঘিরে বসেছে―দুই ছেলে হিল্লোল আর কল্লোল। লাইজুর বাসা মানে ওদের নিজের বাসা। হিল্লোল পছন্দ করে লাইজুর হাতের পোলাও। কোফতা পছন্দ কল্লোলের। যতবারই বাসায় আসে, লাইজু দুটো রেসিপি বানিয়ে ওদের দেবেই। আসলে, সবই প্রায় প্রস্তত করে রাখে লাইজু ফ্রিজে। ওরা এলেই ঘণ্টাখাকের মধ্যে বানিয়ে দেয়। হিল্লোল বড়। ছোট কল্লোল। দুই ভাই খাচ্ছে, লাইজু-রুমানা পাশে বসে দেখছে আর আসছে সন্তানের গল্প করছে।

হিল্লোলের বাবা কী বলে ?

আজকালকার কঠিন জীবনে তিন তিনজন বাচ্চা মানুষ করা অনেক কঠিন। শুধু তো জন্ম দেওয়া নয়, লেখাপড়া ঘরবাড়ি থাকা খাওয়ার বিষয় তো জানো। আমাদের ইনকাম তো ওর চাকরিই, অনেকটা করুণ স্বরে বলে রুমানা।

সেটা তো ঠিকই, সংসার চালানো আজকাল কঠিন। মেয়েদের চেয়ে পুরুষেরা সেই সংকট মোকাবিলা করে সরাসরি। কিন্তু যে সন্তান আসছে, ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক―তাকে দুনিয়ায় আসতে দেওয়াই উচিত, অন্তত আমি মনে করি―সিদ্ধান্ত জানায় লাইজু।

অনুযোগ করে রুমানা, আমিও সেটা বলি, কিন্তু ও মানতে চায় না। তবে একটা মেয়ে হলে ভীষণ খুশি হবে।

মেয়ে না ছেলে হবে, সেটা তো খোদার অভিপ্রায়, হাসে লাইজু।

লোকটা আসলে পাগল, বুঝলেন, পাগল―ক্ষেপে যায় রুমানা। মাঝে মাঝে ওকে আমি চিনতেই পারি না। কী সব উদ্ভট কথাবার্তা বলে, বুঝতেই পারি না।

তাই নাকি ?

হ্যাঁ, বলে কি শুনবে ? বলে আমি নাকি পুরোনো হয়ে গেছি। দেখেন তো, বিয়ের বয়স মাত্র দশ বছর। আমি কী… গলা আটকে যায় রুমানা ইয়াসমিনের।

হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে লাইজু, বলো কি তুমি ?

জি আপা। কাউকে বলি না আমার দুঃখ। আবার মাঝেমধ্যে আমার জন্য এমন পাগলামি করে যে, আমি দিশা পাই না।

পুরুষ মানুষ! এক ধরনের অন্ধকার। অন্ধকার থাকলে ভয় লাগে, না থাকলে আলোর সন্ধান অনুভব করা যায় না।

বাহ, দারুণ বললে আপা, পুরুষ এক ধরনের অন্ধকার! বিস্ময় প্রকাশ করে আপন মনে রুমানা।

জানো, যখন বলে রুমানা তুই পুরোনো হয়ে গেছিস, তখন আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আমি সামনাসামনি কিছু বলতে পারি না। সেই যে শুরু থেকে লোকটাকে ভয় পেয়ে এসেছি, সেটা দুটো বাচ্চার মা হয়েও কাটাতে পারছি না।

হিল্লোল পড়ে ক্লাস ফোরে। থ্রিতে পড়ে কল্লোল। হিল্লোল খুবই শান্ত কিন্তু কল্লোল ডানপিটে। হিল্লোল ধীরেসুস্থে পোলাও খেয়ে এক গ্লাস পানি খায়, তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। কিন্তু কল্লোল কোফতা শেষ না করেই তাকায় মা রুমানার দিকে, মা আমি পোলাউ খাব।

তুই না কোফতা পছন্দ করিস, আপা তোকে কোফতা দিল। পুরোটা তো খাওয়া হয়নি তোর।

না, কোফতা খাব না, আমি পোলাও খাব।

উঠে দাঁড়ায় লাইজু, ঠিক আছে রুমানা। পাতিলে আছে, আমি এনে দিচ্ছি।

আপা, তুমি ওকে চেনো না। হিল্লোলকে খেতে দেখে এখন খেতে চাইছে কিন্তু খাবে না। নষ্ট করবে।

করুক, আমি দেখছি, রান্নাঘরে ঢুকে যায় লাইজু।

তোমার বাসায় আর ওদের আনা যাবে না, খেদ প্রকাশ করে রুমানা ইয়াসমিন। তোমার আল্লাদে ওরা দুই ভাই গাছে উঠেছে।

হাসতে হাসতে কল্লোলের সামনে পোলাওয়ের প্লেট এনে রাখে। সামনে পোলাওয়ের প্লেট দেখে ফিক করে হাসে, থ্যাঙ্ক ইউ।

দেখেছো, কী চমৎকার হাসি আমার বাবুটার ?

তুমি পেট ভরে ওর হাসি দেখো আর খাইয়ে খাইয়ে মাস্তান বানাও।

ও মাস্তান হবে কেন ? নিশ্চয়ই ভালো মানুষ হবে ভবিষ্যতে―বলতে বলতে লাইজু বসে আগের জায়গায়, রুমানার পাশের চেয়ারে।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে লাইজু, রুমানা আজ যা বললে আমাকে, আমি খুবই চিন্তিত। তোমার লোকটা যদি তোমাকে বলে থাকে, তুমি পুরানো হয়ে গেছো, সেটা ভয়ের, ভীষণ ভয়ের।

জানো, অনেক রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়, আমি লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই পুকুর পাড়ে, সেই কাঁঠালতলায় চলে যাই। তখন আমার বুক ফেটে কান্না আসে, গলা ভিজে যায় রুমানার।

মাথায় হাত রাখে জাহানারা লাইজু, নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হবে রুমানা। ভেঙে পড়লে তো চলবে না। দুটো ফুটফুটে ছেলে, পেটে আর একজন আসছে। তুমি মা, বাবারা অনেক কিছু পারে কিন্তু মায়েরা সন্তানের মঙ্গল ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না।

মা! দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করে রুমানা।

কলিংবেল বাজে। লাইজু দরজা খোলে। ভেতরে ঢোকে কনক করিম। কনককে দেখে হিল্লাল আর কল্লোল এগিয়ে যায়। কনক ওদের দেখে হাসে, আরে বাসায় মেহমান এসেছে দেখছি। লাইজু, খেতে দিয়েছ মেহমানদের ?

ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না তোমাকে, ভেতরে যাও, জামা-প্যান্ট পরিবর্তন করে এস।

যাচ্ছি কিন্তু মেহমানদের পোলাও আর কোফতা দিয়েছো ?

হাসে রুমানা, ভাইয়ার দেখি মনে আছে।

থাকবে না ? আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মেহমান যে―বসো রুমানা, আমি আসছি। কনক রুমের দিকে যায়।

রাতে খাওয়া-দাওয়া করে চলে যায় রুমানা ছেলেদের নিয়ে। কিন্তু রেখে যায় জীবনের ক্লেদ, বিবমিষা, দুঃখ, পরাজয় আর অপমানের জ্বালা। জাহানারা লাইজু অনুভব করার চেষ্টা করে, মানুষ জীবনের এত আগুন ও অন্ধকার নিয়ে কীভাবে বাঁচে ? কেমন করে বাঁচে ? প্রকৃতপক্ষে কি বাঁচে ? নাকি বাঁচার ভান করে ?

তোমাকে দুটো খবর দেই ? খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বিছানায় বসে কনক।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে শরীরে পাফ মাখতে মাখতে ফিরে তাকায়, দাও তোমার ভালো খবর। অনেক দিন ভালো সংবাদ পাই না।

প্রথম খবর হলো, বন্ধু মহিবুল মুহিব আমার বাবা হতে চলেছে।

সেই খবর দিতেই তো এসেছিল রুমানা।

তাই ?

ঘাড়ের উপর পাফ দিতে দিতে মাথা নাড়ায় লাইজু, মিষ্টি নিয়ে এসেছে পাঁচ কেজি। তোমার পছন্দের রসোগোল্লাও আছে।

বাহ, খুব আনন্দের খবর। সকালে গরম পরোটার সঙ্গে খাবো।

দ্বিতীয় খবর বলো, তাড়া দেয়।

আমরা আগামী মাসে থাইল্যান্ড যাচ্ছি ?

সত্যি ? ড্রেসিং টেবিল থেকে উঠে কনকের কাছে বসে, কবে যাচ্ছি ?

বললাম তো, আগামী মাসে। তারিখ এখনও ঠিক হয়নি। তিন চার দিনের মধ্যে তারিখ জানা যাবে।

যাব তো তুমি আমি, ছুটি নিয়ে চলে যাব আমরা…

শোনো, যাচ্ছি অফিস থেকে। আমাদের অর্ধেক খরচ বেঁচে যাবে।

কনকের বুকের উপর হাত রেখে আদর করে, তোমার অফিসের আরও লোক যাবে না ?

না, আমি একা যাচ্ছি।

বুকের উপর মাথা রাখে লাইজু, তাহলে দারুণ হবে ব্যাপারটা।

গত কয়েক মাস ধরেই লাইজু আর কনকের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে, দেশের চিকিৎসা তো করা হলো গত বারো বছরে, কোনও রেজাল্ট নেই। দুজন পির-ফকিরের কাছেও গিয়েছিল লাইজু, যদিও সায় ছিল না কনক করিমের। কিন্তু স্ত্রীর মাতৃত্বের ইচ্ছের কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা করুণ এবং মর্মান্তিক জাহানারা লাইজুর জন্য। সব গোপন করেছে কনকের কাছে, প্রকাশ করেনি। করা সম্ভবও না।

সেই সব দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার পর কনক প্রস্তাব দেয়, লাইজু বাংলাদেশের সব ডাক্তার শালাদের তো দেখা হলো। চলো থাইল্যান্ড যাই একবার।

সেখানে কী করব ?

যাব তোমার আমার চিকিৎসা করাতে।

থাইল্যান্ডে এই জাতীয় চিকিৎসা ভালো ?

অনেক ভালো। আমার গ্রামের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সেই বন্ধু বলল, এগারো বছর পর ওদের বাচ্চা হয়েছে থাইল্যান্ডের এক হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে। আমাকে সেই হাসপাতালের ঠিকানাও দিয়েছে।

সমর্থন করে লাইজু, চলো।

লাইজুর ভাবনা―নিজের ইচ্ছেয় থাইল্যান্ড গেলে হয়তো বুঝতে পারবে কনক করিম নিজের পরিস্থিতি। আর বেড়ানোও হবে একটা দেশ। যদিও পরিকল্পনা করে রেখেছে দুজনে, দুই তিন বছর পরপর এক একটি দেশ ভ্রমণে যাবে। তো থাইল্যান্ড দিয়েই শুরু করা হোক।

কনক করিম স্ত্রী লাইজুকে থাইল্যান্ড যাবার অগ্রগতি জানায় নিয়মিত। কিন্তু অনামিকা কলির বিষয়ে একদম চেপে যায়। গত সপ্তাহে কলির সঙ্গে দুপুরে একসঙ্গে খেয়েছে। মহিলা খুবই চার্মিং। যদিও অফিসে থাকে একটা কঠিন খোলসের মধ্যে। দুপুরে খাওয়া হয়েছে সদরঘাটের চার তলার উপর পানসি রেস্টুরেন্টে। সদরঘাটের পানসি রেস্টুরেন্টের প্রস্তাব দিলে আপত্তি তোলে কলি, ওসব ঘিঞ্জি এলাকায় যাওয়া ঠিক হবে কনক ?

যদিও ঘিঞ্জি কিন্তু আমরা তো যাব গাড়িতে। একটু সময় লাগবে, কিন্তু যাওয়ার পর পরিবেশটা আপনার ভালো লাগবে। চার তলার ছাদে উঠে বসলেই আপনার চোখে পড়বে, বুড়িগঙ্গার বিশাল এলাকা। আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাওয়া লঞ্চগুলো।

কিন্তু শুনতে পাই যে, বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে দুর্গন্ধ আসে ?

আসে, কিন্তু এখন সেই দুর্গন্ধ নেই।

এখন নেই কেন ?

এখন বর্ষাকাল। বুড়িগঙ্গার উপর দিয়ে প্রচুর পানি প্রবাহিত হয়। ফলে ময়লা মাখানো পানি নদীতে নেই। আর ছাদে বসবার সময়ে হালকা বৃষ্টি হলে অন্য রকম অনুভূতির সৃষ্টি হবে ম্যাম।

আপনি তো লোভ ধরিয়ে দিলেন দেখছি কনক। ঠিক আছে, আগামীকাল যাওয়া যায়।

অনেক ধন্যবাদ ম্যাম। একটা গাড়ি রিকুইজেশন দিই দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত।

আরে দূর, এসব প্লেজার ট্রিপে অফিসের গাড়ি নিতে নেই। ড্রাইভারেরা পাজিরও পাজি। অফিসে গল্পে গল্পে ডালপালা ছড়িয়ে আপনার সঙ্গে আমাকে বিয়েও দিতে পারে। মানসম্মান নিয়ে অফিস করা যাবে না!

এদিকটা ভেবে দেখিনি আমি, দ্রুত নিজেকে সামলে নেয় কনক করিম। উবার নিয়ে নেব একটা।

সেই ভালো। আর উবার না পেলে আমার গাড়ি চলে আসবে। তবে অফিসের সামনে না। গাড়ি আসবে, পাশের গলির কলমিলতা রেস্টুরেন্টের সামনে। আমি আগে অফিস থেকে বের হবো, পরে আপনি যাবেন। গাড়ি নাম্বার লিখে দিচ্ছি…। অনামিকা কলি একটা ছোট কাগজে গাড়ির নম্বর লিখে দেয়।

খুব যত্ন করে কাগজটা বুক পকেটে রাখে কনক করিম। মনে হচ্ছে যক্ষের ধন। মনের মধ্যে তৃষ্ণার আগুন বয়ে যায়। এত সহজে অনামিকা কলি রাজি হয়ে যাবে, ভাবতেও পারেনি কনক। অথচ অফিসে চালু আছে, অনামিকা কলি আলাদা পার্সোনালিটি নিয়ে চলে। কথা বলে খুব কম। বনেদি পরিবারের মেয়ে। বাপ নাকি মন্ত্রী ছিলেন কোনও এক সময়ে। ভাই-বোনেরা থাকে বিদেশে, ইউরোপে। স্বামী ডাকসাইটে রাজনীতি করে। যদিও ব্যাংকের টাকা মেরে দেবার কারণে একবার জেলে গিয়েছিল গিয়াসউদ্দিন মিয়াজি।

কটায় বের হবেন আগামীকাল ? রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে কনক করিম।

কালকে ? ঘিঞ্জি এলাকা যখন, একটু আগেই বের হওয়া ভালো। ঠিক বারোটায় আমি বের হবো। আপনি বের হবেন বারোটা পাঁচ মিনিটে। ঠিক আছে ?

অসম্ভব মৌন উল্লাসে মগ্ন কনক করিম মাথা নাড়ায়, ঠিক আছে।

অনামিকা কলির রুম থেকে কনক বের হয়ে গেলে ফোন করে একটা নম্বরে, সোহাগ তুমি এখনও রেগে আছো আমার উপর ?

এগারো

থাইল্যান্ডে যাবার ভিসা চলে এসেছে কনক করিম আর জাহানারা লাইজুর। আগামী মাসের বারো তারিখ বিমানের টিকিটও কনফার্ম করা হয়েছে। অনেক বেশি উত্তেজিত লাইজু, প্রথম বিমানে ভ্রমণ করার বাসনা। দ্বিতীয়ত থাইল্যান্ড ভ্রমণ। কলেজের তিন কলিক বছর খানেক আগে থাইল্যান্ড গিয়েছিল। ওরা কয়েকটা দর্শনীয় জায়গার নাম দিয়েছে―কম তো নয়―নয় দিন থাকবে। অফিসের কাজ শেষ হবে দুই দিনে। অফিসের কাজ শেষে দুজনে বেড়াবে সমগ্র থাইল্যান্ড। লাইজু জামাকাপড় লন্ড্রিতে দিচ্ছে।

রুমানা একদিন একা এসে ঘুরে গেছে। ওরও বাচ্চা প্রসবের দিন চলে এসেছে। রুমানার ভরসা লাইজু আপা এবার বাচ্চা প্রসবের সময়ে থাকতে পারবে না কাছে, কারণ সে সময়ে থাকবে ভ্রমণে। কিন্তু আগের হাসপাতাল তো, দুজনে গিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছে। ডাক্তার আশ্বাস দিয়েছে―দুটি বাচ্চা তো আমার হাতেই হয়েছে। সুতরাং ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। আপনার বোন এবার না থাকলে কী হবে, আমি সব দেখব।

পরিকল্পনা অনুসারে থাইল্যান্ডে পৌঁছায় লাইজু এবং কনক। অফিসের কাজ শেষ করে দুজনে ঘুরতে শুরু করে ব্যাংককের নানা জায়গা। তার আগেই ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কনক। দুজনে দেখা করে। দীর্ঘ আলাপে দুজনের রক্ত, কফ, প্রসাব পরীক্ষার জন্য জমা দিয়ে মুক্ত পাখির মতো ঘুরতে থাকে। দেশে ফেরার আগের দিনে ডাক্তারের দেওয়া টাইম অনুসারে দেখা করে কনক এবং লাইজু।

ডাক্তার টেস্টের কাগজপত্র নিয়েই অপেক্ষায় ছিল। ডাক্তার কোনও গল্প না করে জানায়, মি. কনক, করিম, আমি দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনার স্পার্মে পিতা হওয়ার মতো যথেষ্ট শুক্রাণু নেই। এবং আপনি কখনওই পিতা হতে পারবেন না।

বিষণ্ন মনে চলে আসে দুজনে। লাইজু চেষ্টা করছে বিষণ্ন কনককে নানাভাবে স্বাভাবিক রাখতে। বোঝায়, আমাদের বাচ্চা না হলে আমরা দত্তক নেব একটা না, দুটো বাচ্চা নেব। একটা মেয়ে, একটা ছেলে।

দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে চাও ? লাইজু।

কঠোর শোনালেও বাস্তব যা, মানতে হবে তো।

থাইল্যান্ড থেকে যেদিন ঢাকা এয়ারপোর্টে নামে সেদিনই বাচ্চা হয় রুমানার আবারও ছেলে। বাসায় এসে বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন যায় হাসপাতালে নতুন বাচ্চা দেখতে। রুমানার কোলে নতুন বাচ্চা দেখার সঙ্গে সঙ্গে জাহানারা লাইজুর মনে অসম্ভব একটা ভাবনা আসে। কিন্তু সেই ভাবনাটা প্রকাশ করা যাবে কী যাবে না―এই সমস্যার পথ খুঁজে পায় না। অনেক ভাবনার পর, এক রাতে খুবই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে জানায় স্বামী কনক করিমকে।

সেই থেকে কনক করিম আর জাহানারা লাইজুর মধ্যে দেয়াল। দুজনে বাসায় থাকে ঠিকই, কথা হয় কম। খাওয়া দাওয়া হয়, আলাদা। কিন্তু হাঁটতে বসতে শুইতে লাইজুর ধারণা মাথার মধ্যে ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরতে থাকে। সমাজ সন্তান না হওয়া পিতা মাতাকে এক ধরনের নীরব করুণা বিলি করে, সান্ত্বনা দেয়। সামনে না হলেও পিছনে ‘আটকুড়া’ নামে একটি শব্দে চিহ্নিত করে। আমার কারণে মা হওয়ার সাধ থেকে বঞ্চিত হবে লাইজু। জীবনে ওকে তো আমি কিছু দিতে পারলাম না―কিন্তু কীভাবে সম্ভব ? কে বলবে মহিবুরকে ? আমি ? আমার পক্ষে কখনওই বলা সম্ভব না―বন্ধু তুই আমার স্ত্রীর সঙ্গে বাচ্চা হওয়ার জন্য শয্যায় যাবি… ছিঃ, জীবন তুমি করুণাধারায় এসো…। নিজের জীবনের প্রতি এক ধরনের ঘাতক ঘৃণার জন্ম হয়। আমি জানব, আমার বউয়ের পেটে যে বাচ্চা সেই বাচ্চার ঔরসজাত পিতা আমি নই, পিতা আমার বন্ধু, তিন পুত্রের পিতা মহিবুর মুহিব। কিন্তু আমার লাইজুকে আমার কাছে ফিরে পেতে সামনে তো বিকল্প নেই। দত্তক নিতে চায় না লাইজু। প্রস্তাব দিলে বলেছে―দত্তক নিলে আমি কী মা হওয়ার যন্ত্রণার সুখ পাব ? দত্তক নিলে আমাদের কারওরই রক্তের নালি থেকে বের হওয়া সন্তান তো পাব না। আমি চাই আমার নারী ছেঁড়া সন্তান, যেভাবে হয়েছে রুমানার।

রাতে বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে আছে জাহানারা লাইজু। অনেক দিন রাত্রির পর স্ত্রীর শরীরের উপর হাত রাখে কনক, লাইজু আমি নিজের মুখে বলতে পারব না মুহিবকে।

জড়িয়ে ধরে স্বামীকে, আমি বলব। তোমার কিচ্ছু বলতে হবে না। তুমি শুধু বলবে, আগামী পরশু দুপুরের দিকে যেন আমার সঙ্গে বাসায় দেখা করে।

ঠিক আছে, চুপ করে পাশে শুয়ে পরে অস্ত্রহীন পরাজিত সম্রাটের মতো কনক করিম।

বারো

ভাবি হঠাৎ তলব করলেন যে!

ড্রয়িংরুমে ঢুকেই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে মহিবুর মুহিব। তাকিয়ে দেখে, লাইজু ভাবির সাজগোজ একটু বেশি। ঠোঁটে কড়া লিপস্টিক। বিস্মিত মুহিব, বাসার মধ্যে এমন মেকআপ কেন ?

আসুন ভাই, আপনি কেমন আছেন ?

আমি ভালো ভাবি। কনক কোথায় ?

আপনার বন্ধু জরুরি কাজে বাইরে গেছে, আসবে এখনই। এক কাজ করুন ভাই, ভেতরের ঘরে আসুন।

ঘরের ভেতরে কেন যাব ?

হাসে লাইজু, আপনাকে একটা মজার জিনিস দেখাব।

মজার জিনিস দেখাবেন ? ঠিক আছে চলুন।

মুহিব আর লাইজু ঢোকে বেডরুমে। সুন্দর করে সাজানো বেডরুম। জানে, লাইজু ভাবি রুচিস্নিগ্ধ নারী। সেই তুলনায় রুমানার সৌন্দর্য সচেতনতা একটু কম, অনেকটা আছিই তো আর কী দরকার ? রুমের দেয়ালে দেয়ালে শিশুদের নানা আকৃতির ছবিতে ঠাসা। বুঝতে পারে, নিঃসন্তান ভাবি ছবির সঙ্গে সময় কাটায়। লাইজু ভাবির জন্য বুকের মধ্যে কষ্ট চেপে বসে বিছানার উপর, পা ঝুলিয়ে।

ভাবি কী দেখাবেন আমাকে ? আমি দেখার জন্য উদ্রগ্রীব হয়ে আছি।

দেখাব তো, এত চঞ্চল হচ্ছেন কেন ? আপনি একটু পিছনে ফিরে তাকান, আমি যখন ফিরতে বলব, তখন তাকাবেন।

হাসে কৌতুকের সঙ্গে মুহিব, ছোটবেলায় অনেক খেলেছি ভাবি।

ধরে নিন, সেই ছোটবেলার খেলাটা বড় বেলায় খেলবেন আমার সঙ্গে। তাকান পিছনের দিকে… সুরেলা গলায় আদেশ করে লাইজু।

ওকে, তাকালাম―

এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ… এবার আমার দিকে ফিরে তাকাতে পারেন।

সঙ্গে সঙ্গে তাকায় মুহিব এবং তাকিয়েই বিস্মিত। সামনে দাঁড়িয়ে যে লাইজু ভাবি, সেই লাইজু এই লাইজু নয়। পরনে কেবল পেটিকোট আর ব্রা। দাঁড়িয়ে আছে উদ্যত ফণার ভঙ্গিতে। সারা শরীরে রাশি রাশি সৌন্দর্য ঠিকরে পড়ে মুহিবের চোখ ঝলসে যাচ্ছে।

বিছানা থেকে চট করে নেমে দাঁড়ায়, ভাবি কী হচ্ছে এসব ?

আমি আপনার কাছে একটু করুণা চাইছি ভাই…

বুঝতে পারছি না কিছু, কনক কোথায় ? ও এলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমাকে যেতে দিন ভাবি। কনক ? জোরে জোরে ডাকে। ভেতরে একটু ভয়ও কাজ করছে। এটা কী কোনও ষড়যন্ত্র ?

আপনার বন্ধু আসবে না এখন।

মানে ?

আমি আপনার সন্তানের মা হতে চাই। আপনার বন্ধুর পিতা হওয়ার কোনও যোগ্যতা নেই। গত মাসে থাইল্যান্ডে গিয়ে পরীক্ষা করে জেনে এসেছি।

বলেন কী ? মুহিব তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো আগুনের বিস্ফোরিত কণার দিকে। এত বছরে বাচ্চা না হওয়ায় লাইজুর শরীরের অবকাঠামো শিল্পীর তুলির আচড়ের মতো নির্মল সুন্দর লোভাতুর।

হ্যাঁ, কিন্তু আমার তো মা হতে ইচ্ছে করছে। খুব ইচ্ছে করছে, আমার শরীরের মধ্যে একটা শরীর জন্ম নেয়, ধীরে ধীরে বড় হয়, মাতৃত্বের যন্ত্রণা কেমন―আমি অনুভব করতে চাই। আপনি তিন তিনটি বাচ্চা উপহার দিয়েছেন রুমানাকে। আমাকে একটা সন্তান দিন, করুণা করুন…এগিয়ে যায় এক পা দু পা করে মুহিবের দিকে।

মুহিব স্থির দাঁড়িয়ে কিন্তু চোখে জ্বলছে কামনার আগুন। হঠাৎ হাতের মুঠোয় অসম্ভব রাজ্যপাট পেলে যা হয়, এক মুহিবের মধ্যে অজস্র মুহিব জন্ম নিয়ে গোটা রাজ্যটাকে হাতের মধ্যে পিষে ফেলার এমন অলৌকিক সুখ কে হারাতে চায় ?  হাতের কাছে ভরা কলসি থাকতে কেন মেঘনায় ডুবে মরবো…জড়িয়ে ধরে লাইজু, আপনার আমার এই অভিসার আপনার বন্ধু ছাড়া কেউ জানবে না।

ভাবি, আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে!

অস্বস্তির কিছু নেই ভাই। অনেক ভেবে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মানুষ আমাকে, আপনার বন্ধুকে করুণা করে―কী নেই আমার ? সবই আছে তবু আমি শূন্যতার অসীম নরকে বাস করছি। চারদিকে কোটি কোটি শিশু―বিচিত্র ধরনের শিশু। ওদের কলহাস্যে মুখরিত পৃথিবী কিন্তু আমার জঠর, আমার বিশ্ব নিঃস্ব। পর নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ চিরকালের, আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বউয়ের প্রতি থাকে বাড়তি আবেদন। বলুন দেখতে কি আমি অসুন্দর ?

ভাবি, আপনি অসম্ভব সুন্দর।

তাহলে ? নিন আমাকে! আমি তো আপনাকে উজাড় করে দিতে চাই আমাকে। আপনি নিতে দ্বিধা করছেন কেন ?

আপনি সুখ পাবেন।

ভেতরের কামনার বাঘ তেতে উঠছে মহিবুর মুহিবের―সত্যিই তো। মহাসুযোগ―এমন মহার্ঘ সুযোগ দুনিয়ার কম পুরুষের জীবনে আসে। আমি তো চাইনি, বরং আমাকে চাইছে। এই রমণে আমার কোনও অন্যায় নেই। বরং আছে বাড়তি রতিসুখের মহাযজ্ঞ।

কী ভাবছেন আপনি ? খুব কাছে এসে দাঁড়ায় জাহানারা লাইজু।

ভাবছি, যদি অন্যরা জেনে যায় ?

মুহিবের ডান হাত ধরে লাইজু, কেউ জানবে না। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি আপনাকে। এত যুদ্ধ করে সব আয়োজন শেষে আমি পিছিয়ে যেতে চাই না।

যদি রুমানা জানে ?

নিজের রূপ-লাবণ্য দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করে লাইজু, কীভাবে জানবে যদি আপনি না জানান! আপনি কত সৌভাগ্যবান―নিজের স্ত্রী তো আছেই আরও পাচ্ছেন বন্ধুর স্ত্রীকে।

কিন্তু সমাজ…

সমাজ কি আমাকে মাতৃত্বের সাধ দেবে ? আমার প্রতি মুহূর্তের বেদনার ভার নেবে ? নেয় ? নিচ্ছে ? সমাজ কেবল বেড়া দিয়ে, দেয়াল দিয়ে আটকে রাখে মানুষের বুভুক্ষু মনের সাধ ও সাধ্য।

মহিবুর মুহিবের শরীরের মধ্যে বাঘটা লেজ নাড়ায়―শালা এই সুযোগ মানুষ কোটি বছর সাধনা করেও পায় না। তোর শরীরের মধ্যে তো কামনা কুমিরের বান ডেকেছে, আর অপেক্ষা করিস না, গিলে ফ্যাল এই মোক্ষ ফল। সুখ পাবি অন্যতর। জীবন পূর্ণ হয়ে উঠবে কানায় কানায়।

আমি পরিকল্পনা করেছি, আমার পেটে বাচ্চা এলে আর কোনও যোগাযোগ রাখব না আপনার সঙ্গে, রুমানার সঙ্গে…।  ঘনিষ্ঠতম বন্ধু কনক করিমের সুন্দরী স্ত্রী জাহানারা লাইজু দুই হাতে  কামসুখ ও মাতৃত্বের কামনা আকাক্সক্ষায় জড়িয়ে ধরে মুহিবুর মুহিবকে। বাসনার কড়াইয়ের তেলে জ¦লতে থাকা লোভাতুর মুহিবও জড়িয়ে ধরে লাইজুকে।

তেরো

তিন মাসের মাথায় জাহানারা লাইজু বুঝতে পারে, আমি মা হতে চলেছি।

দীর্ঘ বছরের অপেক্ষার ক্লান্তি শেষে শূন্য বাগানে ফোটে অজস্র ফুল। আনন্দে আত্মহারা, শত জনমের গৌরব আনন্দস্রোতে ভাসতে থাকে লাইজু। খবর জানায় স্বামী কনক করিমকে―তুমি পরিচিত প্রত্যেকের বাসায় পাঁচ কেজি মিষ্টি আর এক গুচ্ছ ফুলের তোড়া পাঠাও।

পাঠাচ্ছি, সন্তানের মা আদেশ করেছে, মানতে তো হবেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্লেদাক্ত বিষণ্ন অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে কনক করিম। দুনিয়াটা হঠাৎ করে নাই হয়ে যায় দৃষ্টির সামনে থেকে। আবার ফিরে আসে হেমলকের পেয়ালা হাতে অথৈ নদীর ভাসিয়ে যাওয়া স্রোত। আয়নায় মুখ দেখতে গেলে, দেখতে পায় আয়নার ভেতরের আয়না ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। বন্ধুরা, পরিচিতজনেরা, আত্মীয়রা ফোনে অজস্র অভিনন্দন জানায় পিতা হওয়ার গৌরবে। অনেকে বাসায় চলে এসেছে ফুল ফল মিষ্টি নিয়ে। পরম উচ্ছ্বাস আনন্দের কলরবে সকলের প্রতি শুভেচ্ছা প্রণতি জানায় জাহানারা লাইজু।

সকলেই এল, অথচ আপনি এলেন না ? ফোনে অভিযোগ জানায় লাইজু।

অবাক ফোনের ওপাশে মুহিবুর মুহিব, কেন ? কী হয়েছে ?

আপনি জানেন না ? খিলি পানের হাসিতে মুখর লাইজু।

না, আমি কিছুই জানি না।

আপনার বন্ধু জানায়নি ?

না, আমার বন্ধু তো আমার সঙ্গে আজকাল কথা বলে না। দেখলে অন্যদিকে চলে যায়। অফিসে আমাদের বলা হতো মানিক জোড়। অথচ সেই বন্ধু যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন অফিসে নানা ধরনের গাল গল্পের জন্ম হয়। যা হবার হবে, খবর বলুন তো।

আমি মা হয়েছি… আমার চির বাসনার ফল পেলাম। আমার শরীর মন আত্মা জুড়ে অবিরল আনন্দধারা বইছে…আপনি আমার জীবনে এক অনন্য অলৌকিক সার্থক পুরুষ। আপনাকে অভিনন্দন, কোনওদিন আপনাকে ভুলব না। আর ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারব না।

কেন ভুলতে পারবেন না ?

আমার চোখের সামনে জেগে থাকবে আপনার ঔরসের চিহ্ন, কেউ না জানুক আমি তো জানব।

লাইজু!

এই প্রথম মহিবুর মুহিব নাম ধরে ডাকে। অবাক হলেও ভালো লাগার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে, মনের কোণে কোণে।

বলুন, দেখুন মানুষ চির চলমান মনের প্রাণী। আপনার কার্য সিদ্ধি হয়েছে আপনারই সাহস ও সাধনায় কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবাসি, ভীষণ ভালোবাসি। এখন এই মাত্র যখন জানলাম আমার সন্তান তোমার গর্ভে, আমি তোমার জন্য আকুল হয়ে উঠেছি…

কিন্তু আমাদের মধ্যে শর্ত ছিল…

শর্ত ছিল, শর্ত আছে, শর্ত থাকবে কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি। সেই ভালোবাসটা আজকের নয়, যেদিন তুমি প্রথম আমাকে সব দিয়েছিলে উজাড় করে, সেইদিন থেকেই…। তোমার মতো সুন্দর শরীর মন আর আবেগের নারী জীবনে দেখিনি। তুমি বলতে মাসের নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় মেইনটেন করে তোমার কাছে যেতে কিন্তু আমি মানিনি তোমার পরামর্শ। আমি ইচ্ছে করেই কনক বাসায় না থাকলেই চলে আসতাম, তুমি তো ফেরাতে না বরং আনন্দ অবগাহনের সুরে আমাকে গ্রহণ করতে। তো, আমিও মনে করি, তুমি আমাকে ভালোবাসো।

জাহানারা লাইজু কীভাবে অস্বীকার করবে, না আমি তোমাকে ভালোবাসি না। যদিও মুহিবের সঙ্গে ছিল এক ধরনের শরীর মন্থনের চুক্তি, কিন্তু চুক্তির মধ্যে কি শরীর মন আটকে থাকে ? শরীর ও মন মিলে জীবনের দুরন্ত দুর্বার আত্মনিবেদন, আনন্দ, সুখ ও তীব্র বাসনার জারক রসে ডুবে যাওয়ার মোহন ক্ষণ―কী করে ভুলে থাকা যায় ?

লাইজু ?

বলো।

তুমি চুপ করে গেলে কেন ?

আমি চুপ করে যাইনি। একদম তোমার মতো করে আমার মনেও বাজছে অজস্র নূপুরের গান। আমিও প্রথম দিন থেকে যেমন তোমার শরীরের স্রোতে ভেসে গেছি, তেমনি ভেসে গেছি মনের স্রোতেও। যদিও তোমার বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ প্রেম, পনেরো বছরের সংসার―কিন্তু গত তিন মাসে তুমি মনে হয় আমার সবটুকু অধিকার করে ছিলে। গত কয়েক দিন ধরে পেটের মধ্যে ভ্রƒণের অস্তিত্ব টের পাওয়ার পর থেকে তুমি আমার কণ্ঠে আমার বুকের গহিনে আমার সকল স্মৃতিতে আমার প্রতিটি দৃষ্টিপাতে কাজলের মতো জড়িয়ে আছো…

লাইজু, আমি আসছি… ফোন ছেড়ে দেয় মহিবুল মুহিব। লাইজু বলার সুযোগ পায় না, আজ এখন এসো না। তোমার বন্ধু বাসায়।

এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বাসায় চলে আসে মহিবুর মুহিব। কলিং বেল বাজলে দরজা খোলে কনক। দুজন দেখে দুজনকে। কিন্তু দরজা থেকে সরে না কনক, তুমি ?

হ্যাঁ বন্ধু, লাইজু জানাল তোমাদের শুভ সংবাদ, যে সংবাদের জন্য তোমরা অপেক্ষা করেছিলে বছরের পর বছর। আমি এসেছি সেলিব্রেট করতে।

কিন্তু তোমার তো আসার কথা ছিল না, অনেকটা ভেঙে পড়া তরমুজের মতো থ্যাঁতলানো গলা কনক করিমের। নিজের বাসা, নিজের স্ত্রী অথচ মনে হচ্ছে সবটাই মুহিবুর মুহিবের পায়ের তলায় নৃত্য করছে। দরজা থেকে সরছে না কনক, মুহিবও ঢুকবে ভেতরে। ভেতরের দুয়ারে এসে দাঁড়ায় জাহানারা লাইজু।

আরে তুমি দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে কেন ? ভেতরে এসো… আন্তরিক প্রণয়ে স্বাগত জানায় লাইজু স্বামী কনক করিমের সামনে দাঁড়িয়ে। তাকায় কনকের দিকে, কনক তুমি ওকে ঢুকতে দিচ্ছ না কেন ? দরজা থেকে সরে দাড়াও..।

কনকের মনে হলো, গালে কেউ আগুনের ছ্যাঁকা দিয়েছে। দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়, দাঁড়াতে বাধ্য হয়। আকর্ণ বিস্তৃত বিজয়ীর হাসি মুখে প্রবেশ করে মুহিব। হাতে টকটকে লাল গোলাপের বিশাল ঝাড়। লাইজু এগিয়ে এসে গোলাপের ঝাড় হাতে নেয়। দুজন হাসে দুজনার দিকে তাকিয়ে―সেই হাসির মধ্যে সকল বাসনার তৃপ্তি প্রকাশিত হচ্ছে মেঘের দৌরাত্ম্যে। এইসব দৃশ্যের জন্য কমপক্ষে একজন দর্শক না হলে চলে না, দৃশ্যটা পরিপূর্ণতা লাভ করে না। দৃশ্যর পরিপূর্ণতার জন্য দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে একজন কনক করিম।

তুমি তোমার রুমে যাও কনক, আমরা একটু ভেতরে যাই―কনকের স্ত্রী জাহানারা লাইজু বন্ধুর হাত ধরে, লাল গোলাপের গন্ধ নিতে নিতে চোখের সামনে দিয়ে ভেতরে যায়।

বাসার মালিক, জাহানারা লাইজুর স্বামী এক টুকরো পরিত্যক্ত কাগজের মতো দাঁড়িয়ে থাকে ড্রয়িংরুমে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button