
তমা বাসা খুঁজছে। তার ওই ‘পেট’ কুকুর দুইটা নিয়ে নাকি সে আলাদা বাসায় থাকবে। বাসা পেলেই এখান থেকে চলে যাবে।
স্ত্রী মোহিনীর মুখে খবরটা প্রথম শুনে চমকে উঠেছিলেন রোহিতবাবু। মাথা ঘুরতে শুরু করেছিল রীতিমতো। কী অদ্ভুতুড়ে কথা! কুকুরের জন্য বাবা-মাকে ছেড়ে আলাদা হয়ে যেতে হবে! এও কি সম্ভব ? অবিবাহিতা তরুণী একটা মেয়ে, ঢাকা শহরে কেমন করে একা বাসা নিয়ে থাকবে ? এত দুঃসাহস তমা করে কীভাবে ? আর্থিকভাবে হলোই না হয় স্বাবলম্বী। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তার তো একটা ব্যাপার আছে। মেয়ের মাথায় কি এই চিন্তা নেই ? নাকি আড়ালে অন্য ঘটনা আছে এবং পেছনে অন্য কেউ আছে ?
এমন সব আকস্মিক ভাবনার অভিঘাতে মুষড়ে পড়েছিলেন রোহিতবাবু। জীবনে এমন হতাশা আর বোধ করেননি কখনও। হতাশায় নিমজ্জিত হতে হতে আত্মজিজ্ঞাসায় বিদ্ধ করেন নিজেকে। এ বাসায় কুকুর নিয়ে অনেক ঘটনা ঘটেছে বটে, সমস্ত ঘটনায় আমার দায় কতটুকু ? আর কীই-বা করা যেত ? কেনই-বা তা হলো না। প্রিয়-অপ্রিয় সব স্মৃতি ভিড় করে আসে মনের দরজায়।
রোহিতবাবুরা এ এলাকায় এসেছেন বেশিদিন হয়নি। এটা তাদের কেনা ফ্ল্যাট। নতুন এ বিল্ডিংটা মোটামুটি বড়। ইংরেজি এল প্যাটার্নের ছয় ইউনিটের দশতলা বিল্ডিং, ৫৪টি পরিবার। বিল্ডিংয়ের সামনে ডান পাশের কোনায় পূর্ব-পশ্চিম লম্বালম্বি তিনতলা একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুল। স্কুলের পেছনে দক্ষিণ পাশে আরেকটি দশতলা বিল্ডিং। স্কুলের দু পাশে সামনে তিন দিকে রাস্তা। উত্তর-পূর্ব কোনায় রাস্তার দিকে স্কুলের গেট। রোহিতবাবুদের বাসার গেটও পশ্চিমে রাস্তার দিকে প্রায় স্কুল গেটের মুখোমুখি। সামনে বেশ খানিকটা জায়গা ফাঁকা। তাই আগে থেকেই এখানে কুকুরের আস্তানা। স্কুলের পুব পাশ আর রোহিতবাবুদের বাসার সামনের ছোট রাস্তাটায় অন্তত ছয়/সাতটা কুকুর সব সময় থাকেই। কখনও রাস্তায় ঘোরে, কখনও আবার বিল্ডিংয়ের নিচতলার কোনা-কাঞ্চিতে অলস শুয়ে থাকে। অনেকেই কুকুরগুলোকে এক-আধটু প্রশ্রয় দেয়, স্কুলের ছেলেপেলেরা এঁটোকাঁটা উচ্ছিষ্ট বাসি বিস্কুট খাবারও দিয়ে থাকে। এসব কারণে কুকুরগুলো এ জায়গাটাকে ভেবে নিয়েছে নিজেদের নিরাপদ আবাস। বসবাসের জন্য জায়গাটা অনুকূলও বটে। রোহিতবাবুদের বিল্ডিং আর স্কুলের সামনে দিয়ে রাস্তাটা ডানে মোড় নিতেই ওপাশে পাশাপাশি দুটো সাততলা বিল্ডিং। এ বিল্ডিং দুটোর ছেলেমেয়েরাও কুকুরদের তেমন বিরক্ত করে না। বড়দের কেউ কেউ আলগা আদর দেয়। আদরে-আপ্যায়নে কুকুরেরা এখানে থাকে খোলা মনে।
এই বিল্ডিংয়ের ছোট-বড় অনেকে কুকুর-প্রেমে মজলেও শুরুর দিকে কিন্তু কুকুরের কাছটি ঘেঁষত না তমা। কুকুরকে ভয় পেত ভীষণ। কুকুর থেকে দশ হাত দূর দিয়ে চলত। বাসা থেকে বেরুবার সময় যদি কখনও একবার কুকুরের সামনে পড়ে গেল তো শেষ, হয় সে দৌড়ে আবার গেটের ভেতরে ঢুকে পড়বে, না হয় কুকুরের কবল থেকে বাঁচার জন্য কেঁদেকেটে আশপাশের লোকজনকে ডেকে এক করবে। কুকুরও তখন পেয়ে বসে তাকে, একটানা ঘেউ ঘেউ ঘেউ…। একদিন তো গেটে দুটি কুকুর বসেছিল বলে ভয়ে বাসায়ই ঢুকতে পারেনি। গেটের আশেপাশেও তখন কেউ ছিল না। তার ভয়ার্ত চেঁচামেচিতে আটতলা থেকে নেমে আসতে হয়েছে মাকে। তারপর বাসায় ঢুকেছে বেচারি।
আসলে ছোট বোন তৃণাই ছিল কুকুরের ভক্ত। বিল্ডিংয়ের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা তার সঙ্গী। ছুটির ফাঁকে অবসরে নিচে গ্যারেজে-রাস্তায় নেমে সমবয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তৃণা কুকুরদের এটা সেটা খেতে দিত। কখনও কুকুরের গায়ে মাথায় হাত রাখত আলতো করে। পশু-প্রাণিও অকৃত্রিম আদর-সোহাগ বোঝে। তার মধ্যে কুকুর বোঝে সবচেয়ে কম সময়ে এবং জবাবও দেয় দ্রুত। লেজ নাড়ায়, হাতে পায়ে মুখ ঘঁষে। কুকুরেরাও তৃণার সঙ্গে এমন ভাব বিনিময় করতে থাকে। মানুষে কুকুরে মেলামেশাটা কদিনেই সহজ হয়ে গেল বেশ। ছোট বোন তৃণার এসব কীর্তি দেখে তমা কি আর থাকতে পারে! যদিও সে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে এখন কর্মজীবী। তৃণার দেখাদেখি সেও শুরু করল কুকুরদের কাছে যাওয়া। এমনি করে কদিনেই তমাও হয়ে গেল কুকুর-সমাজের কাছের মানুষ! এখন একা কুকুরের কাছে যেতে ও কুকুর ধরতে ভয় পায় না। কুকুররাও আর তাড়া করে না। বরং এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে উলটো। তমা কখন বাসার গেট থেকে বের হবে তার জন্য পাহারায় থাকে কয়েকটা কুকুর। অফিসে বা বাইরে যাওয়া-আসার সময় তমাকে দেখলেই ঘিরে ধরে লেজ নাড়ায়, পথ আগলে ধরে আর আদরের আতিশয্যে সামনের দুই পা বাড়িয়ে যেন বুক মেলাতে চায় তমার সঙ্গে। কুকুরের পায়ের ধুলা-বালিতে কখনও জামাকাপড় একাকার হয়। তবু তমা হাসিমুখে কুকুরদের খাবার বিলায়। খাবার বিলাতে বিলাতে সামনে এগোয়। কুকুরগুলো লেজ নাড়াতে নাড়াতে তমার হাতে পায়ে মুখ ঘষতে ঘষতে অনেক দূর চলে যায়। তারপর তমা রিকশা বা গাড়িতে উঠে গেলে আবার ফিরে আসে বাসার সামনের রাস্তায়।
এভাবেই চলছিল।
প্রথমদিকে তমার কুকুরের ভয় জয় করার সময়টায় বাসার সবাই মজাই পেত। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হলো পুরোপুরি কুকুর-ভীতি কেটে যাওয়ার পর। হঠাৎ কুকুরের প্রতি তমার টান বেড়ে গেল অনেকখানি, তৃণার থেকেও বেশি। কুকুরের কারণে তৃণার সমবয়সীরাও এখন তমার বন্ধু হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে হলেই এখন ওদের সঙ্গে নিয়ে দল বেঁধে কুকুরের কাছে যায় তমা। এটা-সেটা খাওয়ায়। কিন্তু এটা আবার তৃণার পছন্দ নয়। বড় বোন কেন তার বন্ধুদের সঙ্গে এভাবে মিশবে ? শুরু হলো দুই বোনের আড়াআড়ি, ঝগড়া। বাসায়ও ছড়িয়ে পড়ল সেই ঝগড়ার জের, বাসা রীতিমতো তোলপাড়। বাবা-মাও এর সুরাহা দিতে ব্যর্থ হলেন। কুকুরের কারণে দুই বোনের কথা বলাই বন্ধ হলো একসময়। কিন্তু বোন বলে কথা! বোনের সঙ্গে বোন কথা না বলে থাকতে পারে কতদিন ? একসময় কথা বলা আবার শুরু হলো বটে, কিন্তু ঘাট মানতে হলো ছোটকে। অতিমাত্রায় কুকুরপ্রীতিতে ক্ষান্ত দিল তৃণা। তৃণার সমবয়সী ছেলেমেয়ে, যাদের দেখাদেখি তৃণা প্রথম দিকে কুকুরদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, তারাও এখন আর বেশি কুকুরদের কাছে ঘেঁষে না, তেমন খাওয়াতেও আসে না। সেখানে এখন একচ্ছত্র আধিপত্য তমার। তমা একা একাই যখন তখন কুকুরদের আদর-আপ্যায়ন করে। কুকুরদের পছন্দনীয় খাবার খাওয়ায়। কেক-বিস্কুট তো নিয়মিত। প্রায়ই সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় পথের দোকান থেকে কিনে নিয়ে আসে ডিম সেদ্ধ বা মাংস-পোলাও। কখনও সবার অগোচরে বাসা থেকে মজার খাবার নিয়ে গিয়ে চালায় পথকুকুর সেবা।
এদিকে দেখতে দেখতে শীতকাল এসে গেল। আর এই শীতকালই তো কুকুরদের সংসারে নতুন অতিথি আগমনের সময়। অগ্রহায়ণ মাসের শেষেই তমাদের বাসার সামনের রাস্তাটা সরগরম হলো নতুন কুকুর-অতিথি মানে কুকুরছানাদের আগমনে। তিনটি মা-কুকুরের সংসারে এসেছে বারোটি কুকুরছানা। রঙিন তুলার বলের মতো তুলতুলে ছানাগুলো। ছোট ছোট চোখে পিটপিট করে তাকায়। একটু এদিক ওদিক হলে কুঁই কুঁই করে ডাকে। কিছু কুকুরছানা ঠাঁই পেয়েছে তমাদের বাসার সামনের গ্রিল ঘেরা উঁচু বাগানটায়। কিছু ঠাঁই নিয়েছে স্কুলের পেছনের বিল্ডিংয়ের পুব পাশের উঁচু বাগানের মধ্যে। দুই বাগানের গাছের ফাঁকে ছায়ায় মা-কুকুরের বুকে শুয়ে বসে থাকে কচি কচি ছানাগুলো। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। তমার সঙ্গে সঙ্গে তৃণারও উৎসাহ বেড়ে গেল আবার। দুই বোনের সারা দিনের জল্পনা-কল্পনা কেবল কুকুরছানাগুলো নিয়ে। ব্যস্ত রাস্তা, সারা দিন কত রকমের গাড়ি ভ্যান রিকশা চলে। এর মাঝে ছোট ছোট বাচ্চাগুলো বাঁচবে কী করে ? তার ওপর শীতও এসে গেল জাকিয়ে। হিম হিম বাতাসের সঙ্গে টুপটাপ শিশির ঝরে রাতে। তমা-তৃণা বাসা থেকে নিজেদের কিছু পুরোনো গরম জামা মোটা তোয়ালে আর চট-ছালা রেখে দিয়ে এলো কুকুরদের পাশে। এগুলো দিয়ে কুকুররা কিছুটা শীত নিবারণ করুক।
দিনের বেলা খুব একটা সময় পায় না তমা। সারা দিন অফিস। অফিসও বাসা থেকে বেশ দূর―উত্তরা। তবু কাজের চাপ সামলে সন্ধ্যায় ও ছুটির ফাঁকে কুকুরগুলোকে নিয়ে মেতে ওঠে। ছানাগুলোও এখন একটু বড় হয়েছে। নাদুস-নুদুস বাচ্চাগুলো রাস্তায় নেমে এখন টুকটুক করে হেলেদুলে হাঁটে। এখনই এগুলোর জন্য বিপদের ভয়। তমা ভাবে কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে ?
কয়েক দিন পরের কথা। তমা রাস্তায় এসে দেখে ছয়টি কুকুরছানা নেই। দারোয়ানরা জানায় কয়েকটি রাস্তার লোকেরা ধরে নিয়ে গেছে, কয়েকটি হারিয়ে গেছে। তমা নিজের অজান্তেই কেঁপে ওঠে। ভাগ্যিস কোনওটি গাড়ি চাপা পড়েনি।
কিন্তু দু দিন বাদে তা-ই হলো। তমা অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় দেখে দুটি কুকুরছানার নিথর রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে রাস্তায়। তমা নিজেকে স্থির রাখতে পারে না আর। কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে বাসায়। মনমরা হয়ে বসে থাকে চুপচাপ। তার এখন একমাত্র ভাবনা বাকি চারটি কুকুরছানা রক্ষা পাবে তো ?
এখন গ্রীষ্মকাল। আকাশ কালো করে কালবৈশাখী হানা দেয় যখন তখন। ঝড়োবৃষ্টির সঙ্গে শিল পড়ে, বাজ পড়ে। তমা বাসার বারান্দার রেলিং ধরে নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে তখন। কুকুরগুলোর কী হবে ? ওরা বাঁচবে কী করে ? ধীর পায়ে বাবা রোহিতবাবুর কাছে গিয়ে বলে, বাবা, কিছু ভালো লাগে না, এমন বৃষ্টি কেন হয় ?
Ñএখন ঝড়বৃষ্টির দিন না ? এ সময় ঝড়বৃষ্টি হবেই। তুমি এসব এত ভাবছো কেন ?
Ñএমন ঝড়বৃষ্টি হলে কুকুরগুলো কোথায় যাবে বাবা ?
রোহিতবাবু এবার তমার দিকে তাকান। মেয়েকে বোঝার চেষ্টা করেন। মেয়েটি বলে কী! ভেতরে ভেতরে অবাক হন। রাস্তার কুকুরের জন্য কেউ এত ভাবে ? কিন্তু মুখে কিছু বলেন না।
তমা এবার রোহিতবাবুর গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। বলে, বাবা, কুকুরগুলোকে আমাদের বাসায় নিয়ে এলে হয় না ?
রোহিতবাবু গম্ভীর মুখে আবার তমার দিকে তাকান। বুঝতে পারেন কুকুরগুলোর প্রতি ওর গভীর মমতা তৈরি হয়েছে। অবলা জীব―প্রাণির প্রতি এই সহানুভূতি মন্দ নয়। একে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বাবা এবার বলেন, তুমি কুকুরগুলোকে বাসায় আনতে চাও ? কিন্তু কয়টা কুকুর আনবে ? এতগুলো রাস্তার কুকুরকে বাসায় এনে রাখা কি সম্ভব, তুমি বলো। এই ঝড়বৃষ্টিতে বাইরে ওদের কিচ্ছু হবে না, ওরা নিজেরাই বাঁচতে জানে। এটা প্রকৃতির নিয়ম। তুমি ভেব না বাবা, একটু পরেই এই বৈশাখী তাণ্ডব থেমে যাবে।
শেষ দিকে কথা বলতে বলতে রোহিতবাবু একটু হেসে বিষয়টাকে হালকা করার চেষ্টা করেন। তমা বাবার কাছ থেকে সরে গিয়ে আবার বাইরের দিকে তাকায়। ওর চোখে-মুখে করুণ অপেক্ষার আকুতি, ঝড়বৃষ্টি কখন থামবে!
কুকুরই যেন এখন তমার ধ্যানজ্ঞান। কুকুরের স্বাস্থ্য-সুস্থতা নিয়েও ভাবে। রীতিমতো গবেষণায় রত সে। কিন্তু কাউকে কিছু বলে না। অফিস খোলার দিন কাজে ব্যস্ততায় কাটে একরকম। মাঝে মাঝে সাপ্তাহিক ছুটির দিন সকালেই লেগে যায় কুকুর নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে নিচে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাজেরো গাড়ি আসে একটা। দু-তিনটা কুকুর ধরে ওঠায় গাড়িতে। তারপর চলে যায় কোথায়। ফিরে আসে ঘণ্টা দুই পরে। কুকুরগুলোকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আবার দু-তিনটাকে ধরে ওঠায় গাড়িতে। তারপর আবার চলে যায় কোথায়। ঘণ্টা দুই পরে ফিরে আসে আবার। কয়েকবার পালা করে যাওয়া-আসা চলে এমন। সবার কৌতূহল কুকুরগুলোকে নিয়ে যায় কোথায় ? অনেক খোঁজ-খবর নিয়ে শেষমেষ জানা গেল ফুলবাড়িয়া পশু-ডাক্তারখানায় নিয়ে যায় কুকুরগুলোকে। স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করায়, ভ্যাকসিন-ইনজেকশন দেয়, পরে খাওয়ানোর জন্য ট্যাবলেটও নিয়ে আসে। নিয়ম করে ওষুধ খাওয়ায়। চুপচাপ একাই সামলায় এইসব ঝকমারি। কোনও হাঁকডাক হইচই ক্লান্তি-আপত্তি নেই। যেন সব তার বিধিবদ্ধ দায়িত্ব।
আরও কদিন পরের কথা। দুপুরবেলা। বাসায় রোহিতবাবু আর তমা। মা মোহিনী তৃণাকে নিয়ে গিয়েছেন কোচিংয়ে। তার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা কদিন পর।
রোহিতবাবু খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হঠাৎ তমা এসে দাঁড়াল বাবার সামনে। তার চোখেমুখে বিরক্তিভরা বিস্ময়।
Ñস্কুলের মাস্টারগুলো কেমন যেন।
রোহিতবাবু হকচকিয়ে মেয়ের দিকে তাকান, কেনরে মা, হঠাৎ কী হলো আবার ?
Ñস্কুলে ঈদের ছুটি হয়ে গেল, ছুটি তো সপ্তাহ দশ দিনের কম হবে না। গেটের বাইরে ইয়া বড় এক তালা লাগিয়ে দিয়েছে।
Ñস্কুলে দীর্ঘ ছুটি হলে গেটে তালা লাগাবে না ? তাতে অসুবিধা কী ? বাবা অবাক হয়ে জানতে চান।
Ñঅসুবিধা তো একটা হয়েছে বাবা। তা না হলে কী বলছি আমি ?
Ñআরে, অসুবিধাটা কী সরাসরি বললেই পারো।
Ñশোনো, কী হয়েছে। স্কুল বাউন্ডারির ভেতরে একটা কুকুর রেখে গেটে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। গত রাত থেকে কুকুরটা কান্না করছে। হয়তো কিছু খেতেই পায়নি। তমার কণ্ঠে রাজ্যের উদ্বেগ।
কুকুর আটকা পড়েছে! বাবা অন্যমনা কিছু বলবেন ভাবছিলেন। পরক্ষণেই সামলে নিলেন নিজেকে। না, ব্যাপারটা একেবারে হেলা করার মতো নয়। কুকুরের প্রতি মেয়ের অন্যরকম টান। তাছাড়া অবলা একটি প্রাণি আটকা পড়েছে এবং ওর জীবন সংশয়। স্কুল কবে খুলবে ? ততদিন ও কি বাঁচবে ? রোহিতবাবুও চিন্তিত, বললেন, তুমি এক কাজ করতে পারো। আমাদের দারোয়ানদের একবার বলে দেখো। তারা যদি কিছু করতে পারে!
তমা তার ঘরে ঢুকে গেল চুপচাপ। রোহিতবাবু নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন। ভাবলেন, তমার আজ ছুটির দিন, হয়তো বিশ্রাম নেবে।
কিন্তু রোহিতবাবুর ধারণা মিথ্যে হলো। মিনিট দুই তিন পরেই তমা বাইরের জামা পরে বেরিয়ে এলো আবার। তার চোখে মুখে বেশ তাড়া। আমি নিচে যাচ্ছি বাবা, দরজাটা বন্ধ করো।
রোহিতবাবু বুঝলেন, কথা বলে আর কাজ হবে না। কুকুরটাকে মুক্ত না করা পর্যন্ত মেয়ের শান্তি নেই। মুক্ত করার বুদ্ধি তো সে পেয়েই গেছে। একটু আগে নিজেই তো পথ বাতলে দিলাম! এখন তাকে আর পায় কে!
কুকুরটাকে ঠিক মুক্ত করে এক ঘণ্টা পর বাসায় ফিরে এল তমা। সেই কুকুরটার প্রতি তার মায়া বেড়ে গেল ভীষণ। কুকুরটার সে নাম দিয়েছে টাইগার। এখানকার সব কুকুরকে সে আলাদা আলাদা নামে ডাকে। সবগুলোকে আদর-আপ্যায়নও করে প্রায় সমান। তবে ‘টাইগার’ আর ‘এলি’ নামের কুকুর দুটিকে সে মনে করে তার ‘পেট’। এ দুটি কুকুরও তার ন্যাওটা। বাবা-মা না থাকলে মাঝে মাঝে সুযোগ বুঝে কুকুর দুটিকে তাদের আট তলার বাসায়ও নিয়ে আসে। অবশ্য অল্প সময় রেখে আবার রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসে।
বিল্ডিংয়ের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও কেউ কেউ কুকুরদের আদর-যত্ন করে এটা-ওটা খাওয়ায়। বয়স্কদের মধ্যেও কেউ কেউ খাবার দেন মাঝে মাঝে। কেউ কেউ খাবার কেনার জন্য টাকাও দেন তমাকে। সব মানুষের কুকুরপ্রীতি যেমন সমান নয়, তেমনি কারও কারও কুকুর-ভীতিও আবার মাত্রাতিরিক্ত। এমনিতে এলাকায় আগন্তুক ও নতুন লোক দেখলে তেড়ে-ফুঁড়ে ওঠা কুকুরের স্বভাব। তার ওপর এত বড় বিল্ডিং, আগন্তুক, নতুন ও অপরিচিত দু-একজন লোক তো প্রায় প্রতিদিনই আসে। তখন যথারীতি এখানেও কুকুরদের ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার ঘটনা ঘটে। কখনও কখনও বিল্ডিংয়ের কোনও কোনও বাসিন্দাও কুকুরদের আক্রমণের শিকার হয়। এজন্য বিল্ডিংয়ের কুকুর-প্রেমীদের অনেকে আবার বাঁকা চোখে দেখে। তাদের অনুযোগ বিল্ডিংয়ের কিছু লোক নিয়মিত খাবার দেয় আর আদর-যত্ন করে বলে কুকুরগুলো আশকারা পাচ্ছে। তাই অন্যদের প্রতি এমন ক্ষিপ্র আচরণ করছে এবং দিন দিন আগ্রাসী হয়ে উঠছে।
অল্প কদিনের মধ্যেই কুকুরবিরোধী এই আলোচনা টক অব দ্য বিল্ডিং-এ রূপ নিল। শুধু আলোচনার মধ্যেই বিষয়টি সীমিত থাকল না। আকস্মিকভাবে কুকুর-ধাওয়া অভিযানও চলল কয়েকবার। কিন্তু ওতে সুফল মিলল না কোনও। ধাওয়া খাওয়ার পর ঘণ্টা পার না হতেই কুকুরদল দৃশ্যপটে স্বমহিমায় আবির্ভূত হয় আবার। কুকুরও যেন মানুষের কুকুররূপী আচরণকে পাত্তা দেয় না, বরং একই সঙ্গে উপভোগ ও উপহাস করে।
কিন্তু বিষয়টা রোহিতবাবুর টনক নাড়িয়ে দিল। একদিন রাতের বেলা খাওয়ার টেবিলে কথাটা তুললেন তিনি। মেয়েদের তিনি বললেন, তোমাদের কুকুর-প্রীতির লাগাম এবার একটু টানো। বিল্ডিংয়ে এসব নিয়ে নানা বাজে কথা হচ্ছে। এসব শুনতে ভালো লাগে না।
দিন কয়েক পরের কথা। সকাল থেকে তমা বাসায় একা। বাবা-মা, তৃণা তিন জনই গেছে এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে। সুযোগ পেয়ে তমার ইচ্ছে হলো তার ‘পেট’ টাইগার আর এলিকে বাসায় আনবে। ঘণ্টা দুই তিন রেখে আদর-আপ্যায়ন করবে। এই ভেবে নিচে নেমে টাইগার আর এলিকে গেটের ভেতরে ডেকে এনেছে। ওপরে উঠবে বলে লিফটের গোড়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। লিফট উপর থেকে নামছে। আশেপাশে আর কেউ নেই। এমন সময় দ্বাররক্ষী রহমানউল্লাহ গুটি গুটি পায়ে কাছে এসে দাঁড়াল, আপু, কুকুরগুলা কি উপরে নিবেন ?
হ্যাঁ, নিব।Ñ তমার নির্লিপ্ত উত্তর।
রহমানউল্লাহ হাত কচলাতে শুরু করল, কিন্তুক আপু, একটু য্যা সমিস্যা। কমিটির লোকরা বইলছেনÑ লিপ্টে কইরা কুকুর তুলা যাইব না। এই কাম কইরতে নিষিধ কইরছেন।
নিষেধ করছেন!Ñতমা থমকে দাঁড়াল। চিন্তিত মনে লিফটের গোড়া থেকে পিছিয়ে এল। তবে দারোয়ানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বাড়াতে ইচ্ছে হলো না তার। বাবার সেদিনের কথাগুলো মনে পড়ছে। তাহলে ব্যাপারটা এই, নাকি আরও কিছু আছে ? হতাশ ভঙ্গিতে বেরিয়ে এল গেটের বাইরে। রাস্তায় দাঁড়াতেও ভালো লাগছে না আজ। কুকুর দুটিকে ছেড়ে চুপচাপ উঠে এল বাসায়।
কয়েক দিন পর রাত বারোটার দিকে বাসার ইন্টারকম টেলিফোন বেজে উঠল হঠাৎ। এত রাতে কার কী সমস্যা! ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গিয়ে রিসিভার ওঠালেন রোহিতবাবু। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল আওলাদ সাহেবের গলা। তিনি ভবন পরিচালনা কমিটির সভাপতি। তার ‘হ্যালো’ শব্দ শুনেই বুঝে গেলেন, অন্যরকম কোনও সমস্যা। যা হোক, আওলাদ সাহেব বললেন, দাদা, দুঃখিত এত রাতে ফোন করতে হলো। শোনেন, নিচে থেকে কোনও শোরগোল শুনতে পাচ্ছেন ?
রোহিতবাবু বলেন, মনে হয় একটু একটু পাচ্ছি।
আওলাদ সাহেব আবার বলতে শুরু করেন, আমাদের গেটের ভেতরে ঢোকার জন্য একদল লোক দারোয়ানদের সঙ্গে ঝামেলা করছে। তারা স্কুলের পেছনের বিল্ডিংয়ের লোক। তারা বলছে, আমাদের বিল্ডিংয়ের সামনের একটা কুকুর নাকি তাদের ছেলেকে কামড় দিয়েছে।
এটুকু শুনে ভেতরে ভেতরে শক্ত হলেন রোহিতবাবু। তিনি বলেন, তাতে কী হয়েছে দাদা ?
লোকগুলো বলছে―আমাদের বিল্ডিং থেকে অনেকে সামনের কুকুরগুলোকে নিয়মিত খাবার দেয়, আদর-যত্ন করে, তাই কুকুরগুলো এলাকা ছেড়ে যায় না, এখানেই পড়ে থাকে। সেজন্য তাদের ছেলেকে কামড়ানোর দায় নাকি আমাদের ওপর বর্তায়।
আওলাদ সাহেবের কথার সুর বুঝতে সময় লাগল না রোহিতবাবুর। বিল্ডিংয়ের অনেকে যেখানে খাবার দেয়, সেখানে ফোনটা কেবল এই বাসায় করা হলো কেন ? তার মানে দায়টা এককভাবে তমার ওপর চাপানোর ইঙ্গিত। কিন্তু কুকুরগুলো কি তমার পোষা ? বলতে গেলে ওগুলো রাস্তার কুকুর। রাস্তার কুকুরকে কতজনে খাবার দেয়, তার কোনও হিসাব আছে ? আর রাস্তার কুকুর কাকে কামড়াবে না কামড়াবে তা কি কেউ বলে-কয়ে দেয় ? সে দায় একজনের ঘাড়ে চাপবে কেন ? এসব প্রশ্ন মনে হতেই মাথা গরম হয়ে উঠল রোহিতবাবুর। তার জানতে ইচ্ছে হলো, সুনির্দিষ্টভাবে এই বাসায় কেন ফোন করেছেন ? কিন্তু প্রশ্নটা খুব রূঢ় শোনাবে এবং আরও অপ্রিয় কথার উৎসমুখ খুলে যাবে। তাই নিজেকে সামলে নিলেন পরক্ষণে। এখন রাগান্বিত হওয়ার সময় নয়। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ভাবনার কথাটা ঘুরিয়ে বলেন, রাস্তার কুকুর কাকে কামড়াল না-কামড়াল সে-দায় আমাদের ওপর বর্তাবে কেন ?
আওলাদ সাহেব বলেন, এসব কথা আমি তাদের বলেছি। কিন্তু তারা মানতে নারাজ। আপনি একটু নিচে গিয়ে তাদের সাথে দেখা করেন। তা হলে তারা শান্ত হয়ে ফিরে যাবে।
রোহিতবাবু এবার মনে মনে আরও কঠিন হলেন। না, কোনও অবস্থাতেই এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তিনি নিচে যাবেন না। এখন কথা বলা ঠিক হবে না। এসব উগ্র লোকের মুখোমুখি হওয়া মানে আগুনে ফড়িং। কারও সঙ্গে যুক্তি-তর্কে যাওয়ার দরকার কী। কথায় কথা বাড়ে। কম কথা কম বাগাড়ম্বর। ভাবতে ভাবতে তিনি আগের কথাটাকেই একটু এদিক-ওদিক করে বলেন, রাস্তার কুকুরকে কতজনে খাবার দেয়, সেটার যেমন লেখাজোখা নেই, রাস্তার কুকুর কাকে কামড়াবে না-কামড়াবে তারও ঠিক নেই। এ বিষয়ে কথা বলতে যাওয়া নিরর্থক।
দেখা না করলে তারা নাকি থানায় যাবে, জিডি করবে।Ñআওলাদ সাহেব যেন চরম কথাটা শুনিয়ে দিলেন।
রোহিতবাবুর গলা আগের চেয়ে আরও শীতল, দাদা, তারা কী করবে সেটা তাদের ব্যাপার।
নিচে গিয়ে একবার দেখা করলে ভালো হতো মনে হয়।Ñ বলতে বলতে ফোনটা রাখলেন আওলাদ সাহেব।
রোহিতবাবুও রিসিভার রেখে ঘুরে দাঁড়ালেন। স্ত্রী মোহিনী আর দুই কন্যা তমা-তৃণা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেননি। এতক্ষণ কথা বলার ঘোরের মধ্যে ছিলেন তিনি। মেয়েদের দেখে ভেতরে চেপে রাখা রোষটা ফুঁসে উঠল হঠাৎ, তোমাদের সেদিনও বললাম রাস্তার কুকুরের সঙ্গে মাখামাখি গলাগলি ছাড়ো। কাদের ছেলেকে কুকুর কামড় দিয়েছে, এখন দায়ী করছে আমাদের, বিচার নিয়ে এসেছে এখানে। তারা নাকি থানায় যাবে। মামলা সামলাও এবার।
তমার অবিচলিত ভাব, এখানকার কুকুর কামড় দিলে কিছু হবে না বাবা। কুকুরগুলোকে ভ্যাকসিন দেওয়া আছে।
রোহিতবাবু আরেক দফা জ¦লে উঠলেন, এ্যা, ভ্যাকসিনের কথা বলে দোষটা আরও ভালো করে নিজের ঘাড়ে নিই আর কি! রাস্তার কুকুর কখন কাকে কামড়াল না-কামড়াল সেই দায় কেন আমরা স্বীকার করে নেব ?
রোহিতবাবুর কথার তোড়েজোরে চুপসে গেল সবাই।
কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই ধামাচাপা পড়ল না। কুকুর-কাণ্ডে যোগ হলো নতুন মোড়। দু দিন পর বিল্ডিং মালিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঢুকে রোহিতবাবু অবাক। আগামী শুক্রবার রাত আটটায় ফ্ল্যাট মালিকদের জরুরি সভা। আলোচ্য বিষয় একটিÑভবনে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতকরণ ও বিবিধ।
সভার আলোচ্য বিষয় দেখে রোহিতবাবু হতচকিত। এর অর্থ কী ? চলাচল অনিরাপদ হলো কীভাবে ? আসলে কি কুকুরের ব্যাপার নিয়েই আলোচনা ? এ ছাড়া অন্য কিছু মাথায় আসে না তার। যদি তা-ই হয় তোপের মুখে পড়তে হবে তাকেই। মেয়েদের কুকুরপ্রীতির জন্য দাঁড়াতে হবে কাঠগড়ায়। এই সভায় উপস্থিত হওয়া কি ঠিক হবে ?
নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে করতে সভার দিন সমাগত। রোহিতবাবু সভায় উপস্থিত হওয়ার পক্ষেই সায় পেলেন মন থেকে। আলোচ্য বিষয় যা-ই হোক সভায় উপস্থিত হওয়া সৎসাহসের ব্যাপার। এমন কিছু ঘটেনি যার জন্য মুখ লুকাতে হবে। ভালোমন্দ সব আলোচনা সামনাসামনি হওয়াই ভালো।
যথাসময়ে রোহিতবাবু সভায় উপস্থিত হলেন। তার ধারণাই ঠিক। আলোচনাটা কুকুর নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিষয়ে। প্রথমে একটু বিব্রত বোধ হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিলেন তিনি। তবে অন্য দিনের মতো আলোচনায় তেমন সরব হতে পারলেন না আজ। শুধু মনে হয়েছে ঘটনার অন্যতম কুশীলব যেখানে নিজের কন্যা সেখানে চুপ থাকাই সঙ্গত। সভায় আকারে-ইঙ্গিতে অনেকে অভিযোগের তীর তাক করারও চেষ্টা করেছেন তার দিকে। অবশ্য এসব হীন উসকানি-ইঙ্গিত তিনি স্বভাবসুলভ ঔদার্যে ও কৃত্রিম ঔদাসীন্যে এড়িয়ে গেলেন। তার নীতি-শিক্ষা একসঙ্গে বসবাসের পূর্বশর্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। কুকুরের কারণে তা নষ্ট করা যায় না। সুতরাং তার মৌনতায় সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রণীত হলো, ভবনের সম্মুখস্থ রাস্তায় কুকুরকে কোনওরূপ খাবার প্রদান করা যাবে না। কাউকে খাবার প্রদান করতে দেখা গেলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চরম অপমান করা হবে। এর ফলে নিয়মিত খাবার খেতে না পেয়ে কুকুরগুলো এই এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে এবং ভবনে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত হবে।
বাসায় এসে রোহিতবাবু সভার সিদ্ধান্ত জানালেন এবং সিদ্ধান্তটি কঠোরভাবে মানার জন্য মেয়েদের বলে দিলেন। সঙ্গে আরও বললেন, এর অন্যথা হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। এ কথা যেন মনে থাকে।
কমিটির পক্ষ থেকে নোটিশ দিয়েও রাস্তায় কুকুরদের খাবার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হলো সবাইকে। বিল্ডিংয়ের সবাই মোটামুটি সতর্ক। এখন আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে কুকুরদের খাবার দেয় না কেউ। কুকুরের সঙ্গে আগের সেই ভাব-মাখামাখিও নেই। তমাও চলে রয়েসয়ে। সামনের রাস্তায় খাবার দেয় না সেও। তবে সে এ কাজে বিরত হয়নি পুরোপুরি। বাসার সামনে থেকে কুকুরদের দূরে ডেকে আড়ালে নিয়ে খাওয়ায়। তাও আবার দিনের আলোতে নয়, রাতের অন্ধকারে।
কিন্তু দুদিন গত হতে না হতেই স্ত্রী মোহিনীর মুখে রোহিতবাবু শুনলেন বুকভাঙা কথাটি।
তমা নাকি আলাদা বাসা নিয়ে থাকবে। বাসা খুঁজছে। বাসা পেলেই চলে যাবে।
সোফায় বসে মোহিনীর দিকে বিমর্ষমুখে তাকিয়েছিলেন রোহিতবাবু।
মোহিনী আবার বলতে শুরু করেন, তমা বলেছে রাস্তার কুকুর দুটোকে সে তার বাসায় নিয়ে পুষবে। ওই ‘পেট’ ছাড়া সে নাকি থাকতে পারবে না।
রোহিতবাবুর জীবন-ভাবনা-দর্শন-মূল্যবোধ সব কেমন মুহূর্তেই তালগোল পাকানোর জোগাড় হলো এবার। কুকুরের জন্য মেয়ে বাবা-মাকে ছেড়ে যাবে! বাবা-মার চেয়ে কুকুর বড়! কুকুর নিয়ে বাসায় যা-ই ঘটুক, তাই বলে ঘটনা এই পর্যন্ত গড়াবে! একেবারে সেপারেশান! পরিবারের মধ্যে ভাঙন! পিতা-মাতা আর সন্তানের সম্পর্কে ফাটল! আর ভাবতে পারছেন না তিনি।
হলোই না হয় তমা বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার, মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির লম্বা বেতনের চাকুরে। কিন্তু সে তো অবিবাহিতা। ঢাকা শহরে একা বাসা নিয়ে থাকবে, নিরাপত্তার প্রশ্ন তো আছে। নাকি ওর পেছনে আছে আরও কেউ ? রোহিতবাবু অস্থির হতে হতে সান্ত্বনা খোঁজেন। মেয়ে একেবারে অপরিণত নয়, ভালোমন্দ বোঝার বয়স হয়েছে। আশা করি ভুল কিছু করবে না। ওর সঙ্গে যদি কেউ থাকে বাসা নিক। আর যদি কেউ না থাকে একা থাকার জন্য কোন বাড়িওয়ালা ওকে বাসা ভাড়া দেবে ? আবার বলছে সঙ্গে দুইটা কুকুর রাখবে। দেখা যাক, ঘটনা কতদূর গড়ায় ? তবে মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা বলতে হবে একবার। তাৎক্ষণিকভাবে স্ত্রীকে বলেন, তুমি তমার সঙ্গে কথা বলো। এসব কী উদ্ভট ব্যাপার! ওকে ভালো করে বোঝাও।
মোহিনী বলেন, তুমি কি মনে করো আমি চুপ আছি ? বোঝাবার চেষ্টা করছি সেই প্রথম থেকে। ওরা কি আমাদের কথা কানে তোলে ? ওরা চলে ওদের ইচ্ছা-খেয়ালে। বিয়েশাদির কথা তো শুনতেই পারে না। সে নাকি আগে বিদেশে পড়তে যাবে। এমএস করে এসে তারপর বিয়ে।
রোহিতবাবু মর্মে জ¦লেন। ভেতরে ভেতরে তক্কে তক্কে থাকেন কখন কথা বলার সুযোগ মেলে। এক ছুটির দুপুরে সুযোগটা পেয়ে গেলেন বাসায়। তমাকে একা পেয়ে বললেন, কী খবর তোমার ? তুমি নাকি বাসা খুঁজছো ?
তমার ছোট্ট উত্তর, হ্যাঁ।
কেন, এ বাসায় তোমার অসুবিধা কী ?
অনেক অসুবিধা। এত টক্সিক লোকের সঙ্গে বাস করা যায় না।
টক্সিক লোক! মেয়ে এমন চড়া সুরে কথা শুরু করবে ভাবতে পারেননি। তমা যেন সবার ওপরে মহাবিরক্ত। রোহিতবাবু শুরুতেই খেই হারালেন। আর বেশি কথা বলতে ইচ্ছে হলো না তার। বুঝে গেলেনÑবলে তেমন লাভও নেই। এরপর কথা বলতে গেলে রাগারাগি হবে। তিনি সংযত হলেন। শেষে শুধু বললেন, সিদ্ধান্তটা বুঝেশুনে নিও।
সিদ্ধান্ত মেয়ের ওপর ছাড়লেন বটে, কিন্তু পিতার মন কি আর মানে ? অফিস কাজ কিচ্ছু করতে ভালো লাগে না। রোহিতবাবুর মাথায় দিন-রাত কেবল ঘুরতে থাকে তমার চিন্তা। কী সিদ্ধান্ত সে নিচ্ছে ?
এক সপ্তাহ কেটে গেল। সন্ধ্যার সময় মোহিনী বলেন, তমার বাসা নাকি ঠিক হয়েছে। সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের কাছে। আট তলা বিল্ডিংয়ের পাঁচ তলায় তিন রুমের বাসা। ত্রিশ হাজার টাকা ভাড়া।
খবরটা শুনে রোহিতবাবুর বুকটা মোচড় দিল আবার। মেয়ে শেষ পর্যন্ত বাসা নিয়েই ফেলল! ত্রিশ হাজার টাকা ভাড়া! অথচ এই বাসায় নিজের থাকা-খাওয়া বাবদ দশ হাজার টাকা দিতে কত গড়িমসি! হায়রে মেয়ে! তবু তুই ভালো থাক।
কিন্তু রোহিতবাবুর মাথায় সঙ্গে সঙ্গে উঁকি দিল নতুন চিন্তা। কথাটা তো সবাই জানবে। কাছের দূরের আত্মীয় স্বজন তমার আলাদা বাসায় থাকার ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখবে ? ঢাকায় বাবা-মার নিজেদের ফ্ল্যাট থাকতে অবিবাহিতা একটি মেয়ে আলাদা বাসা নিয়ে থাকে। সমস্যাটা কার ? মেয়েটার কি চরিত্র ঠিক আছে ? এই প্রশ্ন কি উঠবে না ? ওর ভবিষ্যৎ কী ? বিয়েশাদি কি আর হবে ?
মোহিনীর কাছে এসব প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি যেন হতাশায় আরও ভেঙে পড়েন। দিশেহারা চোখে তাকান, আমি জানি না কোন মাকড়শার জালে আটকা পড়লাম। বের হওয়ার উপায় দেখছি না। তমার সঙ্গে সব আলোচনা আমি শেষ করে ফেলেছি। বিয়েশাদি নিয়ে ওর ভাবনা-চিন্তার কোনও লক্ষ্য-নিশানা পাচ্ছি না। ওর এক কথাÑওসব নিয়ে তোমাদের মাথা ঘামাতে হবে না।
রোহিতবাবু এবার একেবারে নির্বাক। মনে হলো এর কোনও সহজ সমাধান আপাতত নেই। জীবন-জগৎ-সংসারের অনেক কিছুই তো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কখনও কখনও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরাও তেমনি। যাক, যতদিন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে, ভালো-মন্দ শেখানো হয়েছে, আলো-আঁধার দেখানো হয়েছে। তাদের ভূত-ভবিষ্যৎ এখন তাদের হাতে। ভেবে ভেবে বৃথাই আয়ু ক্ষয় করা। তার চেয়ে ভালো নিজের অফিস-কাজ এসবে ডুবে থাকা। নিজেকে নিজে প্রবোধ দেন রোহিতবাবু।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে হঠাৎ সেল ফোন নড়ে উঠল রোহিতবাবুর। অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসা তিনি। অফিস ট্যুরে এসেছেন টাঙ্গাইলে। সঙ্গে একজন বিদেশ থেকে আসা অতিথি। আলোচনার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। ফোন যদিও সাইলেন্ট মুডে তবু ভাইব্রেশন থেকে তিনি বুঝলেন কল এসেছে। ফোন হাতে নিয়ে দেখেন মোহিনীর কল। নিশ্চয় জরুরি।
রোহিতবাবু আগে থেকেই জানেন তমা আজ তার নতুন বাসায় উঠবে। বিকেলের মধ্যে তার নতুন বাসা গোছানোর কাজ হয়ে যাওয়ার কথা। হয়তো সে-বিষয়েই আলাপ। মিলনায়তন থেকে বেরিয়ে একটি নিরিবিলি জায়গায় এলেন রোহিতবাবু। রিং ব্যাক করলেন মোহিনীকে। মোহিনী বললেন, তমা বেডিং-পত্র নতুন বাসায় রেখে খেতে এসেছে। একটু পরে ওর ‘পেট’ দুইটা নিয়ে সেখানে চলে যাবে।
রোহিতবাবু বলেন, আচ্ছা, তুমি আর তৃণাও আজ তমার সঙ্গে যাও। ওর বাসার অবস্থা আর আশপাশটা একটু দেখে এসো। ওর সঙ্গে ঘণ্টা দুই-তিন থেকো। বেশি দূরে তো আর নয়, একটু রাত হলেও দুজন মিলে চলে আসতে পারবে। আমাদের অনুষ্ঠান এখনও শেষ হয়নি। শেষ হলেই আমরা রওয়ানা দেব। পৌঁছতে পৌঁছতে বারোটা পর্যন্ত হতে পারে। রাখি।
অনুষ্ঠান শেষে খাওয়া-দাওয়ার পর আয়োজকরা বিদায় দিল রোহিতবাবুদের। গাড়ি রিজার্ভ করাই ছিল। রোহিতবাবুর সহযাত্রী অতিথি শাহীনুল হক পেশায় ডাক্তারÑমনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সিলর। সুইডেনে থাকেন, বাড়ি বাংলাদেশের খুলনায়। তিনি কাজ করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে। বিভিন্ন দেশের কিশোর-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা তার কাজ। বাংলাদেশের কিশোর-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও প্রবণতা পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে তিনি বিভিন্ন জেলা পরিদর্শন করছেন। তার টাঙ্গাইল জেলা পরিদর্শনের জন্য স্থানীয় প্রতিনিধি মনোনীত হয়েছেন যুব উন্নয়ন দপ্তরের উপ-পরিচালক রোহিত বরণ সিংহ। সেই সূত্রে তার এই টাঙ্গাইল সফর।
স্ত্রী মোহিনীর ফোন আসার আগ-পর্যন্ত সফরটা ভালোই উপভোগ করছিলেন রোহিতবাবু। ফোন আসার পর যথারীতি বিষণ্নতার বৃত্তেই যেন ঢুকে পড়েন আবার। সহসাই দুশ্চিন্তার মেঘ জমতে শুরু করে মনের আকাশে। মেয়েটা সত্যি সত্যি আলাদা হয়ে গেল ? বাসা ছেড়ে চলে যেতে পারল ? বাবা-মার চেয়ে রাস্তার কুকুরই তার আপন হলো ? হায়! হতাশার ছায়া ক্রমেই গাঢ় হলো রোহিতবাবুর চেহারায়। মুখে কোনও কথা নেই তার। গাড়ি চলছে।
এনি প্রবলেম দাদা ?Ñ শাহীনুল নীরবতা ভাঙলেন।
রোহিতবাবু শাহীনুলের দিকে তাকিয়ে রইলেন চুপচাপ। কী বলবেন ভেবে পান না। শাহীনুল তার পূর্ব পরিচিত। আগেও দুবার একসঙ্গে এমন জেলা ভ্রমণ করেছেন দু’জন। শাহীনুলকে সজ্জনই মনে হয় রোহিতবাবুর। শেয়ার করলে করা যায়। অন্তত সাময়িক বিষণ্নতা কাটবে। আলতো করে মুখ খোলেন তিনি, হ্যাঁ, মাইনর ফ্যামিলি ইস্যুস।
ওহ, শাহীনুল হালকা আগ্রহ দেখান, আমাকে বলার মতো হলে বলতে পারেন।
রোহিতবাবু এবার একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করেন, হ্যাঁ, বলা যায়। আমার বড় কন্যা তমা, শি ইজ এন ইঞ্জিনিয়ার ফ্রম বুয়েট। নাও শি ওয়ার্কস ফর এ ফরেন কোম্পানি। অ্যান্ড শি ইজ আনম্যারিড। তাকে নিয়ে সঙ্কট। সংক্ষেপে বলি, আমাদের বাসার সামনের রাস্তায় অনেকগুলো কুকুর, সেগুলোকে আমার মেয়ে তমা রেগুলার এটা সেটা খাওয়ায়। অবশ্য বিল্ডিংয়ের অন্য বাসিন্দারাও কেউ কেউ খাবার দেয়। কিন্তু যারা খাবার দেয় তারা ছাড়া একটু অচেনা কাউকে দেখলেই কুকুরগুলো আক্রমণ করে। সেজন্য বিল্ডিং কমিটি রাস্তায় কুকুরগুলোকে খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ করেছে। কুকুরগুলোর মধ্যে দুটিকে তমা মনে করে তার ‘পেট’। সেই কুকুর দুটিকে তমা যখন-তখন নিয়ে আসতে চায় বাসায়। আট তলায় বাসা, কিন্তু লিফটে কুকুর ওঠানো নিষেধ। এজন্য তমা এ বাসায় থাকবে না। তার ‘পেট’ কুকুর দুটি নিয়ে সে আলাদা বাসায় থাকবে। আজকে সে তার নতুন বাসায় উঠেছে। ক্যান ইউ ইমাজিন দিজ ইন এ সিটি লাইক ঢাকা ?
শাহীনুলকে খুব বিস্মিত বা চিন্তিত মনে হলো না। সাবলীল তার কণ্ঠস্বর, মে বি ইট’স রেয়ার ফর ঢাকা, হোয়াটএভার, আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না। পুরো ঘটনা সহজভাবে নেন। মেয়ের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ সম্পর্ক রাখেন। ওকে অ্যাপ্রিসিয়েট করেন। আপনারা কঠোর হলে কিন্তু ক্ষতি হবে। তাহলে মাঝখানে তৃতীয় কেউ ঢুকে পড়বে এবং দুর্বলতার সুযোগ নেবে। এটুকু কেয়ারফুল থাকতে হবে। ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে, চিন্তার কিছু নেই। ট্যালেন্ট মানুষেরা যুগে যুগে এমন রেয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে।
রোহিতবাবু এবার একেবারে ধাঁধায় পড়ে গেলেন। শাহীনুল সাহেব তরুণ-যুবাদের মনোজগতের মাঝি, বহুজাতিক ধ্যান-ধারণায় ঋদ্ধ মানুষ। দেশীয় সমাজ সংস্কার মূল্যবোধ কতটা ধারণ করেন কে জানে ? তবু তার কথাগুলো উড়িয়ে দিলেন না রোহিতবাবু। পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে শুরু করেন আপন মনে।
রোহিতবাবুর বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত একটা বেজে গেল। ফ্রেশ হতে হতে আরও আধা ঘণ্টা। তারপর স্ত্রী মোহিনী বলেন, তমার বাসা তো মন্দ নয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো মনে হলো। আমরা সাড়ে দশটার দিকে সেখান থেকে বেরিয়ে আসছি। আসার সময় গেটে ওই বাসার কেয়ারটেকারের সঙ্গে দেখা। কেয়ারটেকার বলে কি, ম্যাডাম চলে যাচ্ছেন যে, আপনারা থাকবেন না ? আমি বলেছি, থাকব, আগের বাসায় আমাদের জিনিসপত্র রয়েছে তো। সেগুলো আস্তে আস্তে আনি, তারপর আমরাও এসে উঠব। বাসায় কয় জন থাকবে, কে কে থাকবে এ বিষয়ে তমা ওদের কী বলেছে কী জানি ? ওদের ভাবসাব যেন কেমন মনে হলো।
যা-ই বলুক। তুমি আর তৃণা ওই বাসায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকবে। যাতে কেউ বুঝতে না পারে, তমা একা থাকার জন্য বাসা নিয়েছে। বলতে বলতে ঘরের লাইট নিভিয়ে দিলেন রোহিতবাবু।
ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে তার। বিছানায় শুয়ে আছেন অনেকক্ষণ। কিন্তু ঘুম আসছে না চোখে। এপাশ ওপাশ করতে করতে রোহিতবাবু ডাকেন, মোহিনী, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ ?
না, ঘুম আসছে না তো। ভাবছি, একসময় মেয়েটা বাসায় একা থাকতে কত ভয় পেত। সেই মেয়ে এখন একা বাসা নিয়ে থাকছে।
রোহিতবাবু বলেন, মিছাই ভাবছো তুমি। এখন ভয় কীসের ওর। ভয় না পাওয়ার জন্য দুইটা বডিগার্ড নিয়ে রাখছে।
বাসায় খাটের ম্যাট্রেস-চাদর-বালিশ সামান্য ময়লা বা স্যাঁতসেতে হলে শুতে চায় না। আর নিজে বাসা নিয়ে এখন মেঝেতে সাধারণ বেডিং পেতে শুতে গেছে। আমরা তো এর জন্য ওকে বড় করি নাই। বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে ওঠেন মোহিনী।
আচমকা রোহিতবাবুর ভেতরে কোথায় যেন কোন গোপন তন্ত্রী কেঁপে উঠল। সত্যি তো, এই ছাব্বিশ বছর বয়সে মেয়েটা ঢাকা শহরে কোনও রাতে একা বাইরে থাকেনি। এমন করে বাইরে থাকবে আমরা কল্পনাও করিনি। অথচ সে বাসা ভাড়া নিয়ে দিব্যি বাইরে আছে আজ। এদিকে নিজের বাসায় তার জন্য হাহাকার করে মরছি আমরা। আহা মেয়ে, তুই বুঝি সেই দিগি¦জয়ী নদী যার জন্মদাত্রী পাহাড়ের অন্তজর্¦ালার খোঁজ রাখতে হয় না! তোরও কোনওদিন জানা হবে না বাবা-মায়ের এই মর্মজ¦ালা। রাতের অন্ধকারেই চাপা পড়ে যায় বাবা রোহিতবাবু আর মা মোহিনীর মনের অন্তহীন হাহাকার কান্না দীর্ঘশ্বাস।
এভাবেই কাটতে থাকে রাতদিন। রাতের পরে দিন আসে আবার। প্রতিদিনই তমা কুকুর দুটিকে বাসায় রেখে যায় অফিসে। অফিসের পরে প্রথমে আসে তার বাসায়। তারপর শান্তিবাগের বাসায় এসে খেয়ে যায় রাতের খাবার। ছুটির দিনে খেতে আসে তিন বেলা। খেয়েই আবার চলে যায় তার বাসায়। মাঝে মাঝে দিনের বেলা মোহিনী আর তৃণা গিয়ে ঘুরে আসে ওই বাসা থেকে।
এভাবেই কেটে গেল তিন সপ্তাহ। তারপর এক শুক্রবার সকালবেলা। হঠাৎ দীর্ঘ ডোরবেল বাজার শব্দ। দরজার বাইরে কেউ যেন ব্যস্ত-সমস্ত। রোহিতবাবু দরজা খুলে দেখেন বাইরে তমা। তার পেছনে মাথায় বেডিং ও হাতে টুল-বেঞ্চ ঘটিবাটি বইয়ের বোঝা নিয়ে এক লোক দাঁড়িয়ে।
রোহিতবাবু দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ালেন। তিনি বুঝে গেলেন তমা তার নতুন বাসার পাততাড়ি গুটিয়েছে। জিনিসপত্র বাসার ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে নিজেই বলল, বাবা, যাওয়ার সময় তোমাকে বলেছিলাম এত টক্সিক লোকের সঙ্গে বাস করা যায় না। নতুন বাসায় গিয়ে বুঝলাম, ওখানকার লোকেরা আরও বেশি টক্সিক।
রোহিতবাবু মনে মনে হাসেন, তা হবে না কেন রে ? ওই বাসাটা কি ঢাকা শহরের বাইরে ? বাংলাদেশের বাইরে হলেও না হয় একটা কথা ছিল।
হ্যাঁ, এবার বাংলাদেশের বাইরেই আমাকে বাসা নিতে হবে। দেশের বাইরে নিয়েই আমি আমার ‘পেট’দের পুষব। তোমরা দেখো’।
কিন্তু তোমার সেই ‘পেট’ এখন কোথায় ?
Ñরোহিতবাবু কৌতূহল চাপতে না পেরে জানতে চান।
কোথায় আবার ? তারা তাদের স্থায়ী ঠিকানায় পুনর্বহাল হয়েছে। হাসি চেপে বলতে বলতে নিজের ঘরে চলে গেল তমা।
সহসা বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল রোহিতবাবুর। অনেক দিন পর পাখির পালক গায়ে লাগিয়ে ওড়ার মতো হালকা মনে হচ্ছে নিজেকে। মেয়ে বাসায় ফিরে এসেছে, আপাতত এটাই স্বস্তি। দেশের বাইরে আবার কবে যাবে না-যাবে সে পরের ভাবনা।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



