আর্কাইভগল্প

গল্প : কাটাঘুড়ির সুতোয় বোনা : পারভেজ হোসেন

অল্পদিনের মধ্যেই বিনষ্টের পথে পা রাখতে যাই আমরাও। উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেরা পুলিশের দাবড়ানির উপরেই থাকে সবসময়। কলেজে ক্লাস করে কি করে না, বাড়িতে আজ ফেরে তো কাল যেখানে খুশি পড়ে থাকে। মদ-গাঁজা-চরস এসব এখন আর ভালো লাগে না ওদের। ওরা ম্যানড্রাক্স খায়, হাতে সুই ফুটিয়ে প্যাথেডিনের ঘোরে বেহুঁশ হয়ে থাকে দিনের পর দিন। একেবারে ঘুণে ধরা, ফ্যাতফ্যাতা, হাজা-মজা জীবন যাকে বলে!

তখনও আমরা ওসব ধরি নাই। আমাদের আশেপাশেই ঘুড়ে বেড়াত ওদের কয়েকটি দল, ওসব দলে মেয়েও আছে দুএকটা করে। একসময় মদ-গাঁজার মধ্যে বেশ আমোদেই ছিল, এখন অনেকটা এড়িয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত আসক্তির জীবন বেছে নিয়েছে।

এক পর্যায়ে কলেজের বেতন ছাড়া বাড়ি থেকে আর কোনও টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলে বেতন না দিয়ে মাসের পর মাস ওই টাকায় চালিয়ে যায় ওরা। কিন্তু তা আর কতদিন! ওভাবে তো আর কুলিয়ে ওঠে না। ছ্যাঁচড়ামি দিয়ে শুরু হয় তখন। অনবরত মিথ্যা বলতে বলতে সত্যের চেয়েও অনেক সুন্দর, মায়াময় এবং কোমল হয়ে ওঠে ওদের মিথ্যাগুলি। নানা উসিলা হাজির করে আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজন কোথাও আর টাকা চাওয়া বাকি থাকে না তাদের, কোথাও আর কিছু বলার থাকে না। সাজিয়ে-গুছিয়ে নাটক ফেঁদে টাকা চাইবার মতো আর কোনও কৌশল, নতুন আর কোনও কেরামতিও মাথায় আসে না। বাড়িতে উত্তাল-উদ্বিগ্ন হাওয়ার অকল্পনীয় ঝড় বইতে থাকে তখন। সেই ঝড়ে কোনও এক দিন ক্যাসেট প্লেয়ার নাই হয়ে যায়। ভিসিআর নাই হয়ে যায়। শখ করে কেনা ইয়াসিকা ক্যামেরা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আলমারি ভেঙে মায়ের গয়না সরিয়ে ফেলে ঘরের ছেলেরাই। একেবারে দিশেহারা অবস্থা। অবশেষে সব পথ হারিয়ে ছিনতাই আর হাতসাফাইয়ের মতো দুর্বিনীতের পথটাই হয়ে ওঠে ওদের একমাত্র পথ।

গঞ্জিকায় আসক্ত আমরা চার বন্ধু―আমি, রঞ্জু, মাযহার আর জুবায়ের মিলে একটা জোট এখন আর মদফদ খাই না। গাজা-চরসে বুদ হওয়া পরিপাটি শুকনা জীবন আমাদের। জুবায়ের বয়সে বছর দুয়েকের বড়। মাযহারের বন্ধু, তাই আমাদেরও বন্ধু। জিন্সের প্যান্ট, কেডস আর টি-শার্টে মোড়া ঝাকড়া চুলের নায়কোচিত এই ছেলেটা যেমন পড়ুয়া তেমনি বাকপটু―মাঝে মধ্যে আসে আড্ডায়। আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো সে। ঢাকা মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র এটুকুই ওর সম্পর্কে জানি। যথেষ্ট রাশভারি কিন্তু যে কোনও বিষয় নিয়ে আলাপে বিদ্যুৎচ্ছটার মতো। ও যেদিন আসে টাকা-পয়সা লাগে না আমাদের, নির্ভার হয়ে বুক ভরে টানতে পারি।

হন্তদন্ত হয়ে জুবায়ের আসে একদিন। কালো কর্ডের ওপর মেরুন রংয়ের টি-শার্ট পরেছে সে। প্যান্টের পকেট থেকে একটা পোটলা বের করে নাকের সামনে দোলাতে দোলাতে বলে, ‘খাঁটি নেপালি, জটা ধরা, দু টানেই এমন ঘোর লাগব, খালি উড়বা মিয়া।’ 

নেপাল থেকে ফিরে বন্ধুদের এমন জিনিস খাওয়ানোর জন্যই ছুটে এসেছে সে। আমাদের পরানে আমোদ উথলে আসে। বলি, ‘খোলা আকাশের নিচে উদ্যানে যাই চলো।’ 

ওরা রাজি হলে আর্ট কলেজের উলটো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটা ঝোপের আড়ালে সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর গিয়ে বসি। মাযহার পেপার বিছিয়ে ছোট্ট একটা কাঁচি দিয়ে নিপুণ হাতে গাঁজা-পাতার জট কুচি করতে শুরু করে। সিগারেটের শলা দুই আঙ্গুলের ডগায় রেখে টিপে টিপে শুকা বের করে সেই শুকার সঙ্গে গাজার কুচি হাতের তালুতে বেদম পিষে আবার শলার খোলে ভরতে থাকে রঞ্জু। গ্রামের বাড়িতে সবাই মিলে পিঠা বানানোর উৎসবের মতোই আজ আমাদের গঞ্জিকা সেবনের এটা একটা মচ্ছব যেন।

সত্যি এরকম জিনিস আর হয় না! মাযহার জোর দমের কয়েকটা টান দিয়েই ক্ষণিকের মধ্যে ভোম হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে জুবায়েরের দিকে দু হাত বাড়িয়ে বলে, ‘আহো বাবা নেপালি, কোলে আহো, ঠোঁট ভিজাইয়া তোমারে একখান চুমা খাই।’

এই শুনে জুবায়েরের হাসি আর থামে না। গাম্ভীর্য খসিয়ে ওকে এই প্রথম প্রাণ খুলে হাসতে দেখি। সন্ধ্যা নামতেই গার্ডদের হুইসেল শোনা যায়। আমরা উঠব এমন সময় চোখে পড়ে জুবায়েরের পেছন পকেট থেকে তার মানিব্যাগটা ঘাসের ওপর পড়ে গেছে। এই ছায়া-অন্ধকারে আমি ছাড়া আর কেউই তা দেখেনি। ওরা তিনজন পরস্পরের গা ঘেষে এগোতে থাকলে ব্যাগটা তুলে পকেটে রেখে আমিও যুক্ত হই। একবার মনে হলো ফিরিয়ে দিই ওকে। আবার ভাবি, কী লাভ, যা আছে ব্যাগে তা দিয়ে সবাই মিলেই তো খাব। শুধু বলব, আমি খাওয়াচ্ছি। তাতে আর কি এমন আসে যায়! আবার ভাবি, এখনই যদি খোঁজাখুঁজি শুরু হয় তবে বলব, যা আছে তার অর্ধেক দিবি বল, তাইলে পাবি। আর যদি আমরা চলে যাওয়ার পর খোঁজ পড়ে বেমালুম চেপে যাব।

ওরা চলে গেলে ঘোর কাটাতে টিএসসিতে, শাহবাগে আরও ঘণ্টাদুয়েক কবিবন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হলো। এমন প্রায়ই হয় বলে কারও সঙ্গে টুঁ-শব্দটি না করে নিজের ঘরে ঢুকে চুপ মেরে থাকি। মনের মধ্যে খামচাতে থাকে জুবায়েরের মানিব্যাগটা। যথেষ্ট অপরাধী লাগে, চোর চোর লাগে। নিজেকে প্রবোধ দিই, বোঝাই।

পকেট থেকে বের করে মানিব্যাগ হাতড়ে দেখি একশ টাকার আটটা নোট। কিছু ভাংতি, কয়েকটা ভিজিটিং কার্ড আর খোঁপায় ফুল গোঁজা একটা মেয়ের ছবি। মাথাটা চক্কর দেয় আমার। এত টাকা একসঙ্গে হাতে পাইনি কোনও দিন। আমার ভালো-মন্দ ভাবনায় জট লেগে যায়।

আম্মা খেতে ডাকেন। এটাকে ডাকা বলে কি না কে জানে। বলেন, ‘এত রাইতে বাসায় আইসা ম্যাদা মাইরা রইছে ক্যান লাটসাহেবের বেটায় ? খাবার বাড়া আছে, খাইয়া উদ্ধার করলেই বাঁচি।’

আমাদের বাবা থেকেও নেই। মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে মায়ের চাকরিতেই চলে সংসার। গোপনে আর একটা বিয়ে করেছেন শুনে বাবাকে ছেড়ে এসে আমাদের তিন ভাইবোনের ল্যাঠা টানতে টানতে কিছুটা বিগড়ে গেছে আম্মার মাথা। সে আরেক কেচ্ছা, সেদিকে আজ আর না যাই।

আমার চাল-চলনে-চরিত্রে কিছু একটা গোলমাল আছে এমনটাই ধারণা আম্মার। তাঁর ধারণা বাবার স্বভাব নিয়ে বড় হচ্ছি আমি আর এতেই ঘোর আপত্তি। মা কি তবে আন্দাজ করেন ছাইপাঁশ কিছু একটা খেয়ে ফিরি ? যদি তা-ই মনে করেন তবে সেটা তাঁর আনাড়ি আন্দাজ। আগে বেতাল কিছু পেলেই পায়ের স্যান্ডেল খুলে লাগাতেন কয়েক ঘা কিন্তু ছেলে এখন বড় হয়েছে তাই গালমন্দ আর গজগজানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। আম্মার চেঁচামেচির কোনও উত্তর না দিয়ে ভুখা পেটে ঘুমিয়ে পড়ি।  

মানিব্যাগ পাওয়ার পর প্রায় সপ্তাখানেক কেটে গেল। সেই যে গেছে জুবায়ের আর আসেনি। মানিব্যাগেরও তালাশ নেয়নি। ওর ফেলে যাওয়া টাকায় রোজ রোজ বসি কিন্তু ও আর আসে না। প্রায় দিনই আমি খাওয়াচ্ছি দেখে ঢাকাইয়া মাযহার বলে, ‘মায়ের সিন্দুক ভাঙছোসনি হালায়, তুই যেই জাউড়া আছোছ!’

রেগে গিয়ে বলি, ‘হ, ভাঙছি তো কি অইছে ? আমার মায়েরটা আমি ভাঙছি, তুই ফাল পারতেছিস কেন ?’

আমার কথায় চামড়া পোড়ে না মাযহারের, কাঁচি চালানো থামে না। গাজার পাতা থেকে নিপুণ হাতে বিচি সরিয়ে ডাঁটা-ডাল আলাদা করে পাতাগুলো মনমতো কুচি করতে ব্যাপক সময় নিচ্ছে সে। এই-না দেখে সিগারেট শলার খালি খোল নিয়ে বসে থাকা রঞ্জু ওকে উদ্দেশ করে খেঁকিয়ে ওঠে, ‘আসল কাম থুইয়া তুই হালায় আজিরা খাইটা মরোস। বাছতে বাছতে তো সবই ফালায়া দিলি। ভালোমতো কুচি কর অহোন, শুকার লগে য্যান মেশে!’

ওর দিকে তাকিয়ে কাঁচি থামায় মাযহার, ‘এইডা নেপালি নিহি ব্যাডা, বোডাগুলান যে আড্ডি অইয়া রইছে, দেহোছ না ? বিষপাতাগুলান তো সরাইলামই না!’ বলেই আবার নিবিড়ভাবে কাজে মনোযোগ দেয় সে। বলে, ‘জুবায়েরের কেচ্ছা কিছু জানছ ?’

অনেক দিন পর ওর মুখে জুবায়ের নামটা শুনে বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে আমার! বলি, ‘তুই না কইলে জানুম কেমনে। জুবায়েরের লগে তো কোনও যোগাযোগ নাই আমাদের।’

মাযহার বলে, ‘আগে কইনাইক্কা তগো। হ্যায় তো একখান ধরা খাইছে। একটা মাইয়ার লগে ম্যালা ভাব আছিলো বছর তিনেক। মাইয়ায় তো গেল বিষ্যুধবার উড়াল দিছে। অহন বেসামাল অবস্থা জুবায়েরের। কাইলকা দেখলাম ম্যানড্রাক্স হামেদের লগে। রিকশা থামাইল না। হুদাই হাত নাড়াইল।’

ওর কথা শুনে আমি আর রঞ্জু টাসকি খাই। এমন পোলারে কেউ দাগা দিতে পারে ? ওর মানিব্যাগের শাড়ি-পরা খোঁপায় ফুলগোঁজা ফটোখান নিশ্চয়ই সেই মেয়ের! তার নিবিড় মুখচ্ছবি আমার স্মরণে আসে। অপরূপ সুন্দর চেহারা। যেটুকু শুনলাম তার চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারে না মাযহার।

সেই দিনের পর থেকে আর কখনওই আমাদের আড্ডায় পাইনি ওকে। মাযহারের কাছেই শুনি সে এখন হামেদ-তুহিনদের সঙ্গে নিয়মিত ম্যানড্রাক্স, প্যাথেডিনে বুঁদ হয়ে থাকে।

শহরের অবস্থা দিনকে দিন উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। ভার্সিটি আর কলেজের ছাত্ররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্বৈরাচারী সরকারকে মোকাবিলা করতে সব দল এখন একজোট হয়ে কর্মসূচি দিচ্ছে। জ্বালাও-পোড়াও আর মিছিলে মিছিলে ছয়লাব। আন্দোলনের মুখে পুলিশের গুলি খেয়ে মারাও যাচ্ছে কেউ কেউ। কিন্তু কী আশ্চর্য, কলেজের ছাত্র হয়েও আমরা ওসবের মধ্যে একেবারেই নেই।

যখন-তখন ধরপাকড় চলছে। মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে। আম্মা রোজ সাবধান করেন, গালমন্দ করেন, তবুও রাত না করে বাড়ি ফেরা হয় না আমার।

সেদিন শাহবাগের পিজি হাসপাতালের বটতলায় বসে আছি আমি আর রঞ্জু। আর কারও কোনও পাত্তা নেই। বিকেলে নাকি রণক্ষেত্র হয়েছিল গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম। ওখান থেকে ফেরা এক পরিচিত সাংবাদিকের কাছে শুনলাম দুজন মারাও গেছে। পরদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়েছে। এরকম কর্মসূচি দিলেই ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়ে যায়। দেখতে দেখতে এসব এমনই গা সওয়া হয়ে গেছে যে, আমরা নির্বিকার থাকি। একটা স্টিক শেষ করে উদ্যান থেকে বের হয়ে আমি আর রঞ্জু যখন পাবলিক লাইব্রেরির সামনে দিয়ে যাচ্ছি কোথা থেকে মুহূর্তে টহল পুলিশের একটা গাড়ি এসে সামনে দাঁড়ায়। ওদের গাড়িতে হাতকড়া পরানো নানা পদের লোক, কারও চেহারাই তেমন সুখকর নয়। আমরা দুজন ছাড়া বোধহয় কেউ ছাত্রও নয়।

এদিক-ওদিক কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ধানমন্ডি থানায় এনে নামায়। ওসি সাহেব ‘এই মাদারচোদগুলারে ঢুকা’ বলতেই দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন কনস্টেবল অকথ্য ভাষায় গাল দিতে দিতে ধাক্কা মেরে এনে লকআপে ঢোকাল। যারা হাতকড়া পরা অবস্থায় ছিল তারাই রইল গাড়িতে।

‘ওই, তোরা কয়জন ওই বেঞ্চের উপরে চুপচাপ বইসা থাক, স্যার আসুক।’ বলে আমাদের একটা বেঞ্চের উপর বসিয়ে রাখে। ভয়ে আমি ঠুটা হয়ে আছি। পরানের তলটা থরথর করছে। গলা শুকিয়ে পানির তেষ্টা পাচ্ছে। রঞ্জুর অনেক সাহস। ও বলে, ‘ডরাইস না, আমরা তো কিছু করি নাই। বুকে বল রাইখা সত্য কথা কবি, তারপর যা অওনের অইব।’ 

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ওসি সাহেব এলে আমাদের ডাক পরে। দুরু দুরু বুকে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি আমাদের দিকে না তাকিয়ে একটা ফাইলের ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে বলেন, ‘কালকে যে হরতাল ডাকছে জানো না ? এত রাইতে ঘোরাঘুরি কিসের ? বাসাবাড়ি নাই ?’

রঞ্জু বলে, ‘বাসার দিকেই তো যাইতাছিলাম, ধইরা আনল।’

এবার ফাইল থেকে নিষ্প্রভ চোখ তুলে বিরাট করে তাকালেন ওসি সাহেব। পাশে দাঁড়ান পুলিশটি বলল, ‘এই শালারা গাজাখোর স্যার। পাক্কা গাঞ্জুট্টি। পকেটে পুড়িয়া পাইছি স্যার।’

ওসি সাহেব হাতের ইশারায় তাকে থামতে বলেন। ধীর-স্থির গলায় আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আমরা সত্যিই ওসব খাই কি-না ? রঞ্জু সব খুলে বলতে থাকলে গম্ভীর হয়ে শোনেন তিনি। বলেন, ‘জুবায়েরকে চেনো ? মেডিকেলের জুবায়ের ?’

আমার বুকে একটু বল ফিরে আসে। হরহরিয়ে বলি, ‘চিনি তো স্যার। আমাদের বন্ধু, আগে আইত, অনেক দিন আসে না। শুনছি চানখার পুলের হামেদগো লগে ঘোরে।’

ওসি সাহেব আবারও গম্ভীর হয়ে যান। একেবারে পিনপতন নীরবতার মধ্যে ভারী গলায় নরম করে বলেন, ‘ওরে তোমাদের সঙ্গে গাজাটাজার মধ্যে রাখতে পারো না ?’

শুনে আবার আমাদের আত্মা শুকিয়ে আসে। এ কেমন রসিকতা! এমন কথার কি মানে হতে পারে ? এর কী উত্তর দেব বুঝে উঠতে পারি না। থানার ওসি দেখি ঘরের মানুষের মতো কথা বলেন! শুনেছি এরকম আচরণের পরেই নাকি শুরু হয় খেইল। আমরা দম বন্ধ করে দুরুদুরু বুকে সেই বেদম খেইলের অপেক্ষায় থাকি।

আমাদের হাতে ঘড়ি নেই। রাত কত হলো তাও জানি না। বাকিদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বেঞ্চিতে বসে আছি আমরাই। দু প্যাকেট বিরিয়ানি আর বোতলে পানি এনে দেয় এক পুলিশ। বলে, ‘স্যার পাঠাইছে, খাইয়া লন।’

আমরা বিরিয়ানি খাই আর ভাবি কখন শুরু হবে প্যাঁদানি। শুকনা বিরিয়ানি গলা দিয়ে নামে না। পেটে তো বেশুমার খিদে, সেই খিদের তাড়নায় খেয়েদেয়ে প্যাঁদানির ভয় নিয়ে বেঞ্চিতে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ি।

ঘুম ভাঙতেই দেখি বাইরে নরম রোদের ছটা। পাখিদের কিচিরমিচির। বাসার কথা মনে হতেই বুকটা ধড়াস করে ওঠে। ফিরি নাই বলে আম্মা হয়তো সারা রাত ঘুমাননি। বড় হয়েছি তাতে কি, বাসায় গেলে অনেক দিন পর এবার স্যন্ডেল তুলবেন নিশ্চিত।

ভোরবেলা ফিরে এসে দেখি মামা এসেছেন আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাই। চারদিকের পরিস্থিতি এমনই সবাই ধরে নিয়েছে খারাপ একটা কিছু ঘটেছে অবশ্যই। নির্বিঘ্নে ফিরে এসেছি দেখে ভাই-বোন আর আম্মা জড়িয়ে ধরে কান্না করল কিছুক্ষণ।

এর প্রায় মাসখানেক পর ঢাকার পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় তো প্রতিদিনের একটা রণক্ষেত্র। সেদিন ছিল ১৯ এপ্রিল, রোববার। সকালে পত্রিকা হাতে নিয়ে চোখ বুলাতেই হতভম্ব হয়ে যাই। আমাদের জুবায়েরের ছবিসহ একটা খবর দুই কলাম জুড়ে। শিরোনামটা এরকম―‘ধানমন্ডি থানার ওসির একমাত্র পুত্রের গুলিবিদ্ধ লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায়।’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button