আর্কাইভগল্প

গল্প : সিরিয়াল কিলার : আবদুল ওয়াহাব

খুন করা একরকম নেশার পর্যায়ে চলে গেছে আমার। প্রথম দিকে কষ্ট পেতাম, বুকের ভেতরটা হুহু করত, চোখে পানি আসত। এখন কিছুই হয় না। চোখ শুকিয়ে গেছে একেবারে ভেতর থেকে, যেন মরুভূমি, যেখানে একসময় জল ছিল, এখন কেবল বালি ওড়ে। আমি জানি আমি খুনি না, তবু মনে হয় আমার চোখেই তো মৃত্যু থাকে। যেদিকে তাকাই, সেদিকে একটা না একটা মৃত্যু ঘটে। প্রথমে এসব কাকতাল ভেবেছিলাম, কিন্তু কাকতাল যদি রোজ রোজ ঘটে, তাহলে সেটা কাকতাল থাকে না, সেটা একটা অভিশাপ। আমি এখন সেই অভিশাপের বাহক।

আমার নাম রফিক। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। মাস্টার্স শেষ করে কয়েক বছরের প্রাণপণ চেষ্টার পরও যখন কোনও চাকরির দেখা পেলাম না, তখন বাধ্য হয়েই আমার এক সময়ের শখ আমার পেশায় রূপ নিল। শহরের হাসপাতাল রোড-এর এই দিকটায় সবাই আমাকে চেনে ‘স্পিড রফিক’ নামে। আমি একটা সাদা গাড়ি চালাই, লাশবাহী গাড়ি। আমার গাড়ির মালিকের গ্যারেজের ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা আছে, ‘দ্রুত, নিশ্চিন্ত ও সুরক্ষিত সেবা।’ মানুষ মরার পরও কেউ কেউ নিশ্চিন্ত হতে চায়, যেন অন্তত লাশটা ঠিক সময়ে পৌঁছায়। তাই আমি আছি। আমি সাবধানে দ্রুত চালাই। আমি সময়মতো নিরাপদে পৌঁছে দিই। 

আমি জানি, আমি যখন ইঞ্জিন স্টার্ট দিই, তখন কারও ঘরে আলো নিভে যায়। আমি জানি, আমার গাড়ি চললে কেউ কাঁদে, কেউ একদম নিথর হয়ে পড়ে, কেউ আবার ভেঙ্গে পড়ে।

আমার কাজ শুরু হয় সন্ধ্যার পরে। হাসপাতালে গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, যেন কোনও অদৃশ্য ডাকের অপেক্ষা করছি। একসময় ফোন আসে, বলে, ‘ভাই, লাশ রেডি।’ আমি বলি, ‘আসছি। এক মিনিট।’ ইঞ্জিন চালু করি। শহরের বাতাস তখন ভারী হয়ে যায়, হাওয়ায় থাকে কান্নার গন্ধ।

আমি হেডলাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে যাই। সামনে দেখি সাদা কাপড়ে মোড়া একটি শরীর, চারপাশে কান্না, চিৎকার, হতভম্ব নিথর মুখ। কেউ বলে, ‘আল্লাহ ভরসা।’ কেউ বলে, ‘ভাই, আস্তে নিয়েন।’ আমি মাথা নাড়ি। জানি, এখন আর ব্যথার কোনও বিষয় নেই। তবু মানুষের কণ্ঠে আবেগ ঝরে।

কিন্তু আমার চোখ, এই চোখটাই আমার শত্রু। আমি আগে থেকেই বুঝে ফেলি কে মরবে, কে যাবে ওপারে। কে বাঁচবে না, সেটা আমি এখন একেবারে ভেতর থেকে অনুভব করি। আগে ভাবতাম এটা আমার অভিজ্ঞতা, এখন জানি এটা আমার জন্য অভিশাপ। মাঝে মাঝে ভাবি, এই অভিশাপটাই হয়তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। চোখ বন্ধ করলেই সব শেষ হয়ে যাবে। তাই আমি চালাই, যতক্ষণ চোখ খোলা থাকে।

সেই বিকেলটার কথা ভুলতে পারি না। হাসপাতালের গেটের পাশে চা খাচ্ছিলাম। এক লোককে স্ট্রেচারে করে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, মুখে অক্সিজেন মাস্ক। আমি তাকিয়ে ছিলাম, নির্বিকারভাবে। এক ঘণ্টা পর তাকে বের করা হলো সাদা কাপড়ে মোড়া অবস্থায়। সেদিনই প্রথম বুঝলাম, মৃত্যু আমার চোখে বাসা বেঁধেছে।

তারপর থেকে একের পর এক ঘটনা ঘটেছে। একবার সাত-আট বছর বয়সের এক বাচ্চা ছেলে হাসপাতালের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে-মুখে ভয়। আমি তাকালাম, কয়েক সেকেন্ডের জন্য। রাতে শুনলাম, সে মারা গেছে। আমার মনে হলো আমি তাকিয়েছিলাম বলেই সে মরেছে। সেই দিন থেকে আমি নিজের চোখকে ভয় পাই।

কিন্তু যাই ঘটুক না কেন, চোখ বন্ধ রাখলে আমার কাজ চলে না। আমি চালক, আমাকে দেখতে হয় রাস্তা, মানুষ, আলো। দেখা ছাড়া আমার অস্তিত্বই নেই। এই দেখা আর খুনের ভয় এখন আমার শ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে।

আমি এখন আমার মেয়ের দিকে তাকাতে ভয় পাই। মায়ের দিকে চোখ পড়লেই আঁতকে উঠি। বউকেও ভালো করে দেখি না অনেকদিন। মনে হয়, আমার চোখে পড়লে ওদের আবার না কিছু হয়ে যায়। ওরা হাসে, কথা বলে, আমি মুখ ফিরিয়ে থাকি। ওরা ভাবে আমি বদলে গেছি। আসলে আমি শুধু ভয় পাই। যাদের দেখি, তারা বাঁচে না। যদি কোনওদিন এই চোখের দৃষ্টিতে আমার নিজের মানুষগুলোও নিভে যায় ?

আমার মা জানে আমি গাড়ি চালাই, কিন্তু কী গাড়ি চালাই তা জানে না। মেয়ে ভাবে আমি রাতে গাড়ি চালানোর চাকরিতে আছি। ওরা জানে না, আমি ঘরে ফেরার আগেই শহরের কয়েকটা ঘরে মৃত্যু ঢুকে পড়ে।

এক রাতে মালিক বলল, ‘রফিক, তুই এখন আমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ড্রাইভার।’ আমি হাসলাম। ভেতরে কেমন যেন অস্বস্তি লাগল। কীভাবে বলি, আমি নির্ভরযোগ্য না, আমি ভয়ংকর।

আমি অনেকবার চেয়েছি এই ড্রাইভিং ছেড়ে দিতে। কিন্তু এই কাজই আমার সব। এই কাজেই বাড়ি ভাড়া আদায় হয়, মেয়ের স্কুলের ফি জমা হয়, মায়ের ওষুধ আসে। তাই ছেড়ে দিতে পারি না। মানুষের মৃত্যু আমার জীবনের আয়। কত ভয়ংকর কথা তাই না ? আমি চাই না কেউ মরুক, তবু মানুষ মরলে তবেই আমার ভাত জোটে। এই মৃত্যু আর আয়ের সমন্বয়েই আমি বাঁচি।

একবার চোখ বন্ধ করে পরীক্ষা করেছিলাম। ভেবেছিলাম যদি না দেখি, তাহলে মৃত্যু আসবে না। সেদিন গাড়ি নিয়ে বের হইনি। রাতে খবর এল, হাসপাতালে লাশ জমে আছে, পৌঁছে নিরাপদে দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে শেষ ঠিকানায়। পরের দিনও গেলাম না। তৃতীয় দিন সকালে শুনলাম, যাদের দেখতে চাইনি বা কোনওদিন দেখিনি তারাও চলে গেছে ওপারে। বুঝলাম, মৃত্যু আমার দেখা ছাড়াও আসে, কিন্তু আমার চোখ যেন তার গন্ধ আগে পায়।

একদিন রাস্তায় এক লোক হঠাৎ পড়ে গেল। আমি দৌড়ে গিয়ে তুললাম, হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বলল, ‘খুব ভালো কাজ করেছো। তুমি দ্রুত না আনলে লোকটা মরেই যেত।’ সেদিন রাতে কেঁদেছিলাম, বহু বছর পর। মনে হয়েছিল হয়তো আমি অভিশপ্ত না, হয়তো মানুষ। কিন্তু তিন দিন পরেই লোকটা মারা গেল। ডাক্তার বলল, ‘অবস্থা খারাপ ছিল।’ আমি চুপ করে ছিলাম। তারপর থেকে আর কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করিনি।

সেই রাতে ঘুম আসছিল না। ক্লান্ত শরীরের কাছে ঘুম একসময় হার মানে। স্বপ্নে দেখি আমি গাড়িতে বসে আছি, পেছনে শত শত লাশ, সবাই চোখ মেলে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সবাই একসাথে বলছে, ‘তুমি আমাদের দিকে তাকিয়েছিলে, তাই আমরা মরে গেছি।’ আমি চিৎকার করছিলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোনও শব্দ বের হয়নি।

ঘুম ভাঙলে দেখি, জানালার বাইরে আলো নেই, কেবল একটা নিঃশব্দ অন্ধকার। তখন বুঝলাম, ভয়টা বাইরের না, ভেতরের। মৃত্যু আমার ভেতরেও বাসা বেঁধেছে। হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালে গেলে মনে হয় আমার শরীর থেকেই গন্ধ বের হয়। ওষুধ, ফিনাইল আর কাঁচা মৃত্যুর গন্ধ।

এসবে এখন আর কষ্ট পাই না, কেবল ক্লান্ত হই। চোখ বন্ধ করলেই দেখি অসংখ্য মুখ, যারা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, একে একে চলে গেছে। তারা আমাকে ডাকছে, ‘তুইও আয়।’ আমি চুপচাপ বলি, ‘আসছি।’

ড্রাইভিং সিটে বসলে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি কোনও ধর্মীয় যাত্রায় যাচ্ছি, কিন্তু সেটা মুক্তির নয়, শোকের যাত্রা। পেছনে সাদা কাপড়ে মোড়া মানুষ, সামনে আমি। আমি এক জীবন্ত দেহ, যে প্রতিদিন লাশ হয়ে যায়।

কখনও মনে হয় আমি যদি অন্ধ হতাম। তাহলে কেউ মরত না। কিন্তু তখন কাজও থাকত না, ভাতও আসত না, মেয়ে স্কুলে যেতে পারত না। তাই অন্ধ হতে পারি না। আমার দেখাই আমার বেঁচে থাকা। আমার অপরাধও সেই দেখা।

রাতে ভ্যান চালাতে চালাতে রাস্তার আলো যখন নিভে যায়, মনে হয় এই শহরটা এক বিশাল লাশঘর। প্রতিটি জানালার ভেতর একটা করে শেষ নিশ্বাস জমে আছে। আমি শুধু অপেক্ষা করি কখন ডাক আসবে। আমি মৃত্যুর চালক। একদিন আমিও হব যাত্রী, তখন চালক হবে আমারই কোনও সহকর্মী।

ভোরে গ্যারেজে ফিরি, কাচে নিজের মুখ দেখি। চোখ লালচে, ক্লান্ত, তবু জীবিত। মনে হয় এই চোখ দুটোই বেঁচে আছে অন্যদের মৃত্যুর বিনিময়ে।

মেয়ে মাঝে মাঝে বলে, ‘বাবা, তুমি এত চুপচাপ থাকো কেন ?’ আমি বলি, ‘রাস্তায় শব্দ বেশি, তাই ঘরে শান্ত থাকি।’ কিন্তু আসলে আমার ভেতরেই এত শব্দ, যদি মুখ খুলি, সব বেরিয়ে যাবে কোলাহল হয়ে। 

বউ একবার বলেছিল, ‘আপনি এত শান্ত থাকেন কীভাবে ?’ আমি বলেছিলাম, ‘যাদের নিয়ে যাই, তারা তো কিছু বলে না। ওদের নীরবতাই আমার শিক্ষক।’

এখন আমি শান্ত। ভয় পাই না। কারণ বুঝে গেছি মৃত্যু আমাকে ব্যবহার করে। আমি শুধু হাতিয়ার। আমি চলি, কিন্তু আমার দিক ঠিক করে অন্য কেউ। হয়তো ভাগ্য, হয়তো সৃষ্টিকর্তা, হয়তো মৃত্যু নিজেই।

চা দোকানের ছেলেটা রোজ জিজ্ঞেস করে, ‘ভাই, আজও কাজ ছিল ?’ আমি মাথা নাড়ি। ও জানে না আমি কার জন্য কাজ করি। আমি জানি, একদিন ওকেও হয়তো নিতে হবে। তখন এই শহরের আলো নিভে যাবে, কেবল কাপ থেকে ওঠা একরাশ ধোঁয়া ভেসে থাকবে, সেই ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে আমি আবার তাকাব।

ভোর হলেই গাড়ি ধুয়ে রাখি, গ্যারেজের ছাদে উঠে বসি। দূরে হাসপাতালের গেট দেখা যায়। প্রতিদিন মানুষ ঢোকে, কেউ আশা নিয়ে, কেউ ভয় নিয়ে, কেউ একমুঠো প্রার্থনা নিয়ে। আমি দূর থেকে দেখি, তাদের কারও চোখে তাকাই না। জানি, একদিন তাদেরই কাউকে আমার গাড়িতে উঠাতে হবে।

আমি জানি না আমি খুনি কি না, পাপী কি না। কিন্তু আমি জানি আমি অত্যন্ত দরকারি একটা কিছু। এই শহরে মৃত্যু দরকার, আর মৃত্যুর জন্য দরকার একজন ড্রাইভার। আমি সেই ড্রাইভার। আমি চোখ খোলা রাখি, যেন কাজটা ঠিকমতো হয়।

রাত যত গভীর হয়, রাস্তা তত নিস্তব্ধ হয়, বাতাস ঠান্ডা হতে থাকে, চায়ের দোকান বন্ধ হয়ে যায় একসময়। আমি গাড়ির সিটে বসে সিগারেটের শেষ ধোঁয়া ছাড়ি, ভাবি, আজ আর কার চোখে তাকাব। কে আবার আমার ভ্যানে উঠবে। হয়তো কেউ এখনই হাসপাতালে ঢুকছে, যাকে আমি চিনব না, কিন্তু সে আমার অপেক্ষায় আছে।

আমি জানি, মৃত্যু খুব কাছেই থাকে, মানুষের শ্বাসের ফাঁকে। আমি শুধু তার গন্ধ পাই আগে, তার পদশব্দ শুনি দূর থেকে। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যা দেখি তা হয়তো সত্যি না, আমার চোখই আমাকে ধোঁকা দেয়। আমি তাকাই, দেখি মানুষ, কিন্তু হয়তো তার ভেতরটা অনেক আগেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। আমি শুধু শেষ দেখা পাই।

ভোরের প্রথম আলোয় শহরটা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। হাসপাতালের গেট খুলে যায়, নতুন মানুষ ঢোকে, কেউ ওষুধ কিনে, কেউ রিপোর্ট নেয়, কেউ আশায় বুক বাঁধে। আমি দূরে বসে দেখি, সব একই নাটক, শুধু চরিত্র বদলায়। আর আমি, আমি সব সময় একই চরিত্রে অভিনয় করি, লাশবাহী গাড়ির ড্রাইভার, চোখ খোলা রেখে ধোঁয়া আর গন্ধের ভেতর বেঁচে থাকা এক মানুষ, যে জানে তার চোখেই লুকিয়ে আছে মরা আলো।  

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button