আর্কাইভগল্প

গল্প : বিধবা প্রথার নতুন দিশা : গোপাল দাশ

রামু বর্মন, হরিশ মাঝি, নন্দু―সবাই ভোরে বেরিয়েছে। খালি পেটে। হাতে জাল, মনে আশা―‘আজ যদি কিছু মাছ পাই।’

দিনভর পরিশ্রম শেষে সন্ধ্যার দিকে সবাই ফেরে। হাওরের বাতাসে ঠান্ডার সঙ্গে থাকে এক ধরনের হাহাকার। যার ভাগে মাছ বেশি এসেছে, সেও চিন্তায়―কাল যদি না আসে ?

বাড়িতে ফেরার পর গরিব ঘরে রান্নার ধোঁয়া ওঠে। বিধবার ঘরে অবশ্য ধোঁয়া ওঠে কমই। কেউ রান্না করে দেয়, কেউ খাওয়ার ভাগ দেয়। আর এভাবেই টিকে থাকে হাওরের অসংখ্য বিধবা নারী। কারণ হাওরে নৌকাডুবির কারণে অনেক পরিবারের মেয়েরা অল্প বয়েসে বিধবা হয়ে যায়।

বিধবাদের চোখের চাহনি আলাদা। দিনের বেলা তারা পর্দার আড়ালে, সংসারের নিয়মের ভেতরে আটকে থাকে। কিন্তু রাত যত গাঢ় হয়, তত মনে পড়ে পুরোনো স্মৃতি। স্বামীর মুখ, তার ছোঁয়া, তার হাসি। সেই অভাব নিঃশব্দে বুকের ভেতর গর্জে ওঠে।

গ্রামের পশ্চিম পাড়ে এক টিনের ঘরে থাকে হারানের বিধবা বউ―সবাই ডাকে ‘হোয়ান বউ’। বয়স কুড়ি বাইশের বেশি না। স্বামী হারান মাঝি মারা গেছে দুই বছর হলো। মাছ ধরতে গিয়ে নৌকা ডুবে আর উঠতে পারেনি। তখন থেকেই হোয়ান বউ একা। সংসার বলতে ছোট্ট কুঁড়েঘর, আর মায়ের দেওয়া পুরোনো খাট। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই গ্রামের লোকজন তাকে দেখে কেমন যেন অন্যভাবে। মেয়েরা সহমর্মিতা দেখায়, কিন্তু পুরুষদের চোখে জ্বলে ওঠে লুকোনো আকাক্সক্ষা।

একদিন রাতের বেলা সে উঠোনে বসে ছিল। ঠান্ডা বাতাসে শরীর কেঁপে যাচ্ছিল। তখনই হরিশ মাঝি কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

হরিশ চুপচাপ বলে,

‘বউ, এমুন কইরা একলা বইস না। ঠান্ডায় জ্বরে পড়তা।’

হোয়ান বউ অবাক হয়ে বলে,

‘এইডা কিতা কইতাছ ? আমি একলা থাহি মানে কাউর দোহাই লাগত নাকি ?’

হরিশ নরম গলায় বলে,

‘দোহাই না। তয় মন তো একলা থাহে না। আমাগো দাগে দাগে কাম শ্যাষ কইরা ঘরে ফিইরা আই, তয় রাইতডা খালি লাগে। ভাবী―তুমিও একলা, আমিও একলা…’

হোয়ান বউ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর মাথা নিচু করে বলে―

‘মানুষ জানলে কপালডা পুইড়া যাইব।’

এই কথাগুলোতে হাওরের বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। সমাজ বলে বিধবার চোখ শুকনো থাকবে, হৃদয় মরুভূমি হয়ে যাবে। কিন্তু আসল সত্যি অন্য। রক্ত, মাংস, হাড়―সব মানুষেরই এক। শরীরের টান, ভালোবাসার অভাব, কাছে থাকার আকাক্সক্ষা বিধবারও থাকে। তবে তাদের ভয়ও সবচেয়ে বেশি। একবার যদি গাঁয়ে খবর ছড়ায়―অমুক বিধবার সাথে অমুক পুরুষের সম্পর্ক, তবে সর্বনাশ। তবু রাতে হাওরের আঁধারে, বাঁশঝাড়ের আড়ালে, কিংবা ডোবা-পাড়ের পাশে―অসংখ্য গোপন দেখা হয়। কেউ জানে না, কেউ বলে না। কিন্তু হাওর জানে। হাওরের বাতাস জানে। যৌবন জোয়ার তো জাতপাত কিছু মানে না।

বিধবারা মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে জলে হাঁড়ি ধুতে নামে। তখন ফিসফিস করে নানা কথা হয়। রত্না বিধবা হয়েছে পাঁচ বছর আগে। এখন বয়েস ত্রিশ হবে, সে বলে

‘তোরে কই, বউ। নিশিরাইতডা অইলে বুকডা ফুইটা যায়। মনে অয় কেউ যদি বুকডা জাইড়া ধরত…’

পদ্মা হেসে বলে,

‘চুপ! এমুন কতা কইস না। হুনলে গেরামের বউরা জিহ্বা কামড়াইত।’

রত্না : ‘কামড়াক। কামড়াইলে কি হুদা মিটব ? শলীরডা তো হুদার্তই রইল।’

সবাই হেসে ফেলে। হাসির আড়ালে লুকানো সত্যি―তাদের অভাব, আকাক্সক্ষা আর শরীরের ডাক। অন্যদিকে, গ্রামের পুরুষেরাও একলা বিধবার কথা ভাবতে থাকে। খরচা কম, সংসার নাই, কিন্তু নারীশরীর আছে―এই চিন্তা তাদের টানে।

হরিশ মাঝি এক রাতে নন্দুকে বলে :

‘নন্দু ভাই, তুই কি জানস ? হোয়ান বউরে দ্যাহলে বুকডা ধকধক করে।’

নন্দু : ‘এইডা তোর ভাবনা ম্যাত্র। মানুষ জানলে গেরাম থেইক্কা তোরে বাইর করত।’

হরিশ : ‘মানুষডা কি জানত ? রাইতডা আঁধারে, গগন ছাড়া কেউ কিছু দ্যাহে না।’

হাওরের রাত মানে শুধু অন্ধকার না―ওখানে আছে ভেসে ওঠা হাহাকার। দিনের বেলায় মানুষ যতই খেটে খায়, রাত হলেই বুকের ভেতরের শূন্যতা ছায়ার মতো বড় হয়ে যায়। হারানের বিধবা বউ―যাকে সবাই হোয়ান বউ বলে ডাকে―সে একরকম দিনের বেলায় মুখ লুকিয়ে চলে। শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথা ঢেকে রাখে, ঘরে ঢুকলে দরজা লাগায়। কিন্তু রাত এলেই তার বুকের ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে।

এক রাতে, শীতের হাওয়া বইছে। চারপাশে শুধু কুয়াশা আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। উঠানে দাঁড়িয়ে হোয়ান বউ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ করেই বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে শব্দ এল।

‘বউ… বউ…’

হরিশ মাঝির গলা। হোয়ান বউ প্রথমে ভয় পেল। আশেপাশে কেউ আছে কি না বুঝতে পারল না। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

হোয়ান বউ চুপচাপ,

‘এত রাইতে ডাকস ক্যারে ? মানুষ জানলে সর্বনাশ অইত।’

হরিশ : ‘মানুষ জানত না। দাগের শ্যাষ থাইক্যা আইছি। মনডা ফুইটা যাইতেছিল। তাই দ্যাহতে আইলাম।’

দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের অন্ধকার যেন তাদের আড়াল করল। তারপর হরিশ আস্তে হাত বাড়িয়ে হোয়ান বউয়ের উচু বুক ছুঁয়ে দিল। শরীর কেঁপে উঠল বিধবার। এতদিন কেউ তাকে ছোঁয়নি। স্বামীর মৃত্যুর পর শুধু শীতলতা। আজ যেন হঠাৎ শরীরে আগুন জ্বলে উঠল। ওরা দেখা করতে শুরু করল মাঝে মাঝেই। কেউ জানত না, জানলেও কেউ কিছু বলত না―কারণ হাওরের অন্ধকার ঢেকে রাখত সবকিছু।

কখনও হাওরের ডোবার পাড়ে, কখনও বাঁশঝাড়ের আড়ালে। হোয়ান বউ ফিসফিস করে বলত:

‘হরিশ, আমি পাপ করতাছি না তো ?’

‘পাপ কইরা থাকলে, হারা হাওরডা পাপী অইয়া যাইত। বউ, তুই মানুষ। তোরও পরান আছে।’

এই কথাগুলো হোয়ান বউয়ের বুক কাঁপিয়ে দিত। সমাজের ভয় থাকলেও তার ভেতরের শূন্যতা ভরতে শুরু করেছিল। তবে হাওরের গ্রামে কিছুই গোপন থাকে না। এক রাতে পাশের বাড়ির রত্না বিধবা দূর থেকে দেখল―হোয়ান বউ আর হরিশ একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়।

সকালে সে পুকুরপাড়ে হাঁড়ি ধোয়ার সময় অন্যদের বলল―

‘গত রাইতে দ্যাহলাম, হোয়ান বউ আর হরিশ বাঁশঝাড়ের আড়ালে কতা কইতেছিল, ঘরে ঢুইক্কা দোর লাগাইয়া দেয়…’

পদ্মা চোখ বড় করে,

‘ইডা নাকি ? এইডা যদি হাচা অয়, গেরামডা আগুন অইয়া যাইত।’

কথা ছড়াতে লাগল। বউরা মুখে মুখে বলল, পুরুষরা আড্ডায় ফিসফিস করতে লাগল। এক রাতে চায়ের দোকানে নন্দু কর বলল―

‘হুনছস ? হরিশ নাকি হোয়ান বউয়ের লগে রাইত কাটায়।’

গোকুল মাঝি হাসতে হাসতে কয়,

‘হা হা, হরিশডা বেয়াদব। তয় কি জানস, হোয়ান বউ একলা। স্বামীর মরণ অইছে। মনডা কার লগে কাটাইত ?’

নন্দু : ‘মনডার কতা ঠিক আছে, তয় গেরামের নিয়ম আছে। বিধবারে যদি এইডা করতে দিই, কাইলডা আরেকজনও শুরু করতা। তহন সমাজডা ভাইঙ্গা যাইব।’

এইভাবেই গেরামের পুরুষদের মধ্যে দ্বিধা বাড়তে লাগল। কেউ সহানুভূতি দেখাল, কেউ কড়া সমালোচনা করল। একদিন রাতে হোয়ান বউ আর হরিশ ডোবার পাড়ে দেখা করছিল। হঠাৎ পাশ দিয়ে গেল দুজন কিশোর―তারা সব দেখে ফেলল। পরের দিন সকালেই খবর ছড়িয়ে পড়ল।

মনু মোল্লা, গ্রামের প্রভাবশালী বলল :

‘এইডা আর চলত না। গেরামের নিয়মডা ভাইঙ্গা আওয়া লাগছে। সালিশ বসান লাগব।’

এভাবেই শুরু হলো প্রস্তুতি। হোয়ান বউয়ের বুক কেঁপে উঠল। সে জানত, সমাজের দরবারে দাঁড়ানো মানে অপমান, অপদস্থ হওয়া। হরিশও ভয় পেতে লাগল, কিন্তু তবু বলল―

‘বউ, ডরাইস না। আমি আছি। যদি গেরাম শাস্তি দেয়, আমি মানতাম। কিন্তু তোরে একলা ছাইড়তাম না।’

এই স্বীকৃতি হাওরের সমাজে বিধবার ভালোবাসার এক অদৃশ্য রীতি হয়ে টিকে থাকে। বহু নারীর মনে এই ঘটনা নতুন আশার আলো আনে―কারণ তারা বুঝতে পারে, সমাজ সবকিছু দমিয়ে রাখলেও জীবনের টানকে পুরোপুরি আটকানো যায় না।

গ্রামের মানুষ যতই কথা পাকাক আর সমালোচনা করুক, শেষ পর্যন্ত সালিশ বসল না। গগন মণ্ডল ছিল চতুর মানুষ। সে জানত, সালিশ বসলে গ্রাম দুই ভাগ হয়ে যাবে―একদল বলবে, হোয়ান বউ পাপ করেছে; আরেক দল বলবে, বিধবারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। গগন এসব ঝামেলায় পড়তে চাইল না। তবে একদিন সন্ধ্যায়, গগন মণ্ডল চোখে কঠিন দৃষ্টি নিয়ে হরিশকে একপাশে ডেকে বলল―

‘হরিশ, তোর বউ নাই, বিধবা বউরে নিয়া গেরামে কানাহুশি লাগছে। এইডার সেরা উপায় অইল বিয়া করন। সমাজও চুপ থাকত।’

হরিশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

‘মণ্ডল ভাই, আমার পরান চায়, তয় বিয়া করলে বউরে কি গেরামের মানুষ মানত ? আমি ডরাই।’

গগন মণ্ডল হেসে উঠল।

‘মানুষডা কিসুদিন চেঁচাইত, তহন চুপ কইরা যাইত। গেরামে এমুন অনেক নজির আছে। তয় হাহস লাগব।’

এই কথার পরও বিয়ে আর হয়ে উঠল না। হোয়ান বউ দ্বিধায় ভুগল―সে ভয় পেল সমাজের কটূক্তি, ভয় পেল আবার হরিশ তাকে ছেড়ে চলে যাবে। হরিশও খামাখা দড়ি টানাটানি করতে চাইল না। তবে একটা জিনিস ঘটল―এরপর থেকে তাদের সম্পর্ক লুকানো থাকল না। বাঁশঝাড়ে বা ডোবার ধারে তাদের একসাথে দাঁড়াতে দেখে আর কেউ তেমন কিছু বলত না। শুধু আড়ালে ফিসফিস করত। কিন্তু গগন মণ্ডল কথা বলার পর থেকে যেন সমাজের চাপটা একটু কমে গেল।

হোয়ান বউ-হরিশের সম্পর্ক হাওরের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় হয়ে গেল। বিধবা নারীরা মনে সাহস পেল।

একদিন পদ্মা বিধবা রত্নাকে বলল―

‘দ্যাহস, হোয়ান বউও এহন লুকাইয়া চইলত না। গগন মণ্ডলও কিসু কয় নাই। অয়তো আমরাও একদিন…’

রত্না হেসে মাথা নাড়ে―

‘মনডা তো চায়, তয় গেরামের ডর। তয় হোয়ান বউডার কাহিনি দ্যাহলে বুঝি, হগল আটকাইত পারত না মানুষ।’

সমাজের ভেতরে টানাপোড়েন চলছিল। তবে সবাই খুশি ছিল না। একদল পুরুষ ফিসফিস করত। নন্দু কর বলল―

‘এইডা যদি চলত থাহে, কাইলডা গেরামে শাসন থাকত কই ? যে যার ম্যাত বিধবারে ঘরে তুলত। সমাজ ভাইঙ্গা যাইত।’

নন্দু করের হোয়ান বউয়ের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। গোকুল মাঝি বলল :

‘বিধবা মানুষডা সারাজীবন কান্দত থাহব ? স্বামীর মরণ মানে কি জীয়নের মরণ ? হরিশডা ঠিক কাম করছে।’

এভাবেই দ্বন্দ্ব থেকে গেল। বছর ঘুরে বছর গেল। হোয়ান বউ আর হরিশের সম্পর্ক টিকে থাকল। আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়নি, কিন্তু সবাই একে একরকম মেনে নিল। হোয়ান বউ আর হরিশের ঘটনার পর গ্রামে যেন এক অদ্ভুত স্রোত বইতে শুরু করল। এতদিন পর্যন্ত বিধবাদের জীবন মানেই ছিল―সাদা কাপড়, কপালে সিঁদুর না, গলায় শাঁখা না, সারা জীবন অন্যের দয়ার ভাত খেয়ে কাটানো। কিন্তু গগন মণ্ডল যখন প্রকাশ্যে বলল :

‘বিধবারা তো মানুষ, তারো তো চাওনডা আছে।’

তখনই যেন এক অঘোষিত অনুমতি পাওয়া গেল।

গগন মণ্ডল কোনওদিন সরাসরি গ্রাম্য মিটিংয়ে না বললেও, শালিশে, হাটে, এমনকি হাওরের ধারে বসে স্পষ্ট করে মত দিল―

‘বিধবার জীয়ন কইরা সমাজডা খালি কান্দন-চিৎকার বাড়ায়। বিধবারে বিয়া করন যাইত না এইডা কার আইনে লেইখ্যা ? গীতা-কোরান কুনখানে এইডা লেইখছে ? বিধবা মানে মরা মানুষ না, হেইতে বাঁচতে চাইত। রাজা রামমোহন রায় বিধবা বিয়্যার চালু কনরা গেছে না!’

এই কথাগুলো দ্রুত আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। হাওরের ব্রাহ্মণরা ব্যাপারটা একদম মানতে পারল না।

 দীনবন্ধু চক্রবর্তী : ‘এইডা গেরামের ধর্মভ্রষ্ট করনের পাঁয়তারা। বিধবারে আবার বিয়া দিত ? পুরাণে কুনখানে আছে ? শাস্ত্রে কুনখানে আছে ? সমাজ ভাঙনের পতে  যাইতেছে। রাজা রামমোহন রায় ধর্মবিরোধী আছিল, হেই লাইগ্যা হেই প্রথা চালু করছিল। আমাগো হাওরে গগনও রাজা রামমোহনের ম্যাতো চালু করতে চায়। গগনের ভালা অইত না।’

কিন্তু সমস্যা হলো―শুধু কথায় কিছু হচ্ছিল না। গগন মণ্ডল ছিল হাওরের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধনী নেতা। তার হাতে জমি, অর্থ, দান-খয়রাত―সবকিছু। এই সময় এগিয়ে এলেন চেয়ারম্যান মজনু মোল্লা। মজনু ছিলেন চালাক মানুষ, তিনি জানতেন গগনের সাথে থাকলেই ভোট তার হাতের মুঠোয় থাকবে।

মজনু মোল্লা হাটে দাঁড়িয়ে বললেন―

‘দ্যাহো ভাইসব, বিধবা মাইয়ারে আবার সংসার করতে দিলে কি দুষ অইল ? খালি ধর্মের বুলি কইরা কি পেট ভরান যাইত ? গগন মণ্ডল ঠিক কাম করছে। আমিও চাই, বিধবারা নয়া জীয়ন পাক।’

মজনুর এই সাপোর্ট গগনের শক্তি আরও বাড়িয়ে দিল। ব্রাহ্মণরা যতই ফুঁসে উঠুক, শেষ পর্যন্ত তারা কিছু করতে পারল না। বিধবা প্রথার ‘চালু’ হলো। এভাবেই হাওরে গগন মণ্ডল আনুষ্ঠানিকভাবে বিধবার নতুন সংসার করার অনুমতি চালু করল। কোনও সালিশের দরকার হলো না। শুধু গগনের এক কথায়―

‘যদি বিধবা চায় আর মাইনষে রাজি থাহে, কেউ আটকাইত পারত না।’

এই ঘোষণা যেন হাওরের নারীদের জীবনে নতুন সূর্যের আলো হয়ে উঠল।

হাওরের পল্লিজীবনে এটা ছিল যুগান্তকারী ঘটনা। বিধবারা নতুন করে সংসার করতে শুরু করল। অনেকে গোপনে, অনেকে প্রকাশ্যে। ব্রাহ্মণরা যতই মন্ত্র পড়ে, যতই ধর্মের ধামা দেখাক, হাওরে গগনের কথাই শেষ কথা হয়ে গেল।

হাওরের কাদামাটি নরম, জলের ঢেউ ধীরে ধীরে পল্লির ধারে আছড়ে পড়ছে। রত্না, হরিশ, আর গ্রামের কিছু বিধবা নারীরা আজ সকাল থেকেই উত্তেজনায় ছিল। খবরটা ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে―ব্রাহ্মণদের একদল মানুষ, যারা প্রথমে এই বিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল, এবার নিজেই এসে বিয়ে সম্পন্ন করবে।

হারান বউ উচ্ছ্বাসে : ‘দ্যাহছস হরিশ ? হগ্গলই আছে। আইজ আমরা নয়া জীয়ন শুরু করতাছি।’

‘হ, মালতী। আইজ থাইক্যা আমাগো জীয়নে ম্যাত্র আশা আর ভালাবাসা থাহব।’

হরিশ মৃদু হেসে বলল,

‘না নন্দু ভাই, সমাজ ভাঙে নাই। বিধবারা বাঁচত।’

গগন মণ্ডলের সাহসী উদ্যোগ এবং মজনু মোল্লার সমর্থন সমাজপতিদেরকে পরিকল্পনা পাল্টাতে বাধ্য করল। তারা বুঝল, সরাসরি বিরোধ করলে হাওরের মানুষ ও গগনের শক্তি তাদের ধ্বংস করবে। তাই তারা ধাক্কা খেল―বাধা দেওয়ার ভান করে, পরে নিজেই বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করল।

রাধাকান্ত চক্রবর্ত্তী বলল :

‘আমরা বিয়া করাইতাম, তয় মনে রাহন, আমাগো ইজ্জত রাহন লাগব, জাইল্যাগো বিধবা বিয়াতে গেইলে ট্যাহা  ডাবল দেওন লাগব।’

মজনু মোল্লা বলল―

‘তোমাগো ইজ্জত থাহব। আর কুনু সমইস্যা অইলে আমরা দ্যাহতাম।’

রাধাকান্ত চক্রবর্ত্তী নিজ হাতে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করল। তারা সিঁদুর, মালা ও আশীর্বাদের মাধ্যমে বিয়ের ধারা পূর্ণ করল।

মালতী বর্মন হাসতে হাসতে বলল :

‘দ্যাহছস, হারান বউ! আইজ থাইক্যা আর কুনু বিধবা কষ্ট পাইত না। হগ্গলে নয়া জীয়ন শুরু করতে পারত।’

নন্দু মাঝি :

‘ভাই, এইডা কি সত্যি হইতেছে ? সমাজ কি ভাঙেনি ?’

গোকুল মাঝি :

‘না নন্দু ভাই, সমাজ ভাঙে নাই। বিধবারা বাঁচত আর সংসার করতে পারত―এইডাই নয়া নিয়ম।’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button