আমি একটা বাল্ব কিনতে বেরোচ্ছি : মূল : ভালদাস পাপিয়েভিস

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা অনুবাদ : বিকাশ গণ চৌধুরী
[ভালদাস পাপিয়েভিস (Valdas Papievis) : জন্ম ১৯৬২ সালে লিথুয়ানিয়ার এক গ্রাম অ্যানিক্সকিয়াইয়ে। পড়াশোনো ভিলনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে পরবর্তী সময়ে তিনি পড়িয়েছেন। মূলত গদ্য লেখক ও অনুবাদক। বর্তমানে ফ্রান্সে প্রবাসী। লেখার প্রিয় বিষয় ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব, তার স্মৃতি, পারিপার্শ্বিক সম্পর্ক এবং মনের আর বাইরের জগতের মধ্যে নিরন্তর গতায়াত। তাঁর লেখায় পরিলক্ষিত হয় প্রতিচ্ছায়াবাদী (Impressionistic) কবিতার ভাষা আর এক ঢেউতোলা ছন্দের কারুকাজ।]এই শহরটায় আমার ঘেন্না ধরে গেছে! যদি আমি জানলা দিয়ে তাকাই তবে দেখতে পাব, কেমন করে রাস্তা দিয়ে বাতাস তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধুলোবালি, পোড়া সিগারেটের টুকরো, সকালের খবরের কাগজের ছেঁড়া টুকরো ; কেমন করে ট্রলি বাসের স্টপে ঠেলাঠেলি করছে মানুষজন, আর কেমন করে লোকজন ওঠার পর রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে চলছে ট্রলিবাস, একটা খবরের কাগজের ঠেলাদোকানের নিচে ধাক্কা মারল, যদিও ওটার ভেতরে ঘুমিয়ে রয়েছে দোকানি মহিলা। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামছে, এখানে সব কিছুই খুব বিচ্ছিরিভাবে এলোমেলো হয়ে আছে। আর, সত্যিই তো, ঐ মহিলার কাছ থেকে এর বেশি কীই বা আশা করতে পারি আমরা। বাড়িওয়ালার গুদাম ঘর থেকে টেনে আনা একটা ভাঙাচোরা ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন তিনি, কারণ আমাদের নিজের বলতে তো আর কিছুই নেই, আর পায়ের উপর পা তুলে অলসভাবে নিজেকে দোলাচ্ছিলেন সামনে পেছনে। ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঢাকনা হারিয়ে যাওয়া একটা আধখালি টুথপেস্টের টিউব, বাচ্চার একটা সাদা ন্যাপি, গতকালের খবরের কাগজ, একটা ছেঁড়া মোজা। এ জিনিসগুলো যেভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে পারে দুর্ভাগ্যবশত আমরাও ঠিক সেভাবেই নিজেদের একে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারি।
‘ও আবার কাঁদছে, আচ্ছা কী জন্য কাঁদছে, সারাদিন সারারাত ও খালি কাঁদে, ভীষণ ক্লান্ত আমি, আয়নায় নিজেকে দেখতে ভয় পাই, কী চাও তুমি ছোট্ট সোনা, পুঁচকু সোনা ?’
বাইরে তাকিয়ে সে দেখতে পেল, কীভাবে রাস্তা দিয়ে বাতাস তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধুলো বালি, পোড়া সিগারেটের টুকরো, সকালের খবরের কাগজের ছোঁড়া-ফাটা টুকরো; কীভাবে ট্রলি বাসের স্টপে ঠেলাঠেলি করছে মানুষজন, কীভাবে…বাতাস! হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল ঘরের বাতাস। বাতাস চাই, এখানে তোমার দম বন্ধ হয়ে যেতে পারে! বুঝতেও পারল না যে সে হাত বাড়াল, ছিটকিনি খুলল, আস্তে ঠেলে খুলল জানলা, আর পেট্রোলের বিচ্ছিরি গন্ধ, শহরের হৈ-হট্টগোল নিয়ে ঘরের মধ্যে আছড়ে পড়ল একটা দমকা হাওয়া।
‘এবার তুমি ওটা পাবে! কী করেছো ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল ? তুমি কি বাচ্চাটাকে মারতে চাও ?’ লাফিয়ে উঠে জানলাটা বন্ধ করল ও। ‘পাগল!’ বাচ্চাটার বিছানার উপর ঝুঁকল : ‘কাঁদে না, কাঁদে না।’ বাচ্চাটাকে বুকে চেপে ধরল। ‘তোমার বাবা একটা মানসিক রোগী, সে জানে না সে কী চায়, তার চেয়েও খারাপ হলো কেউ জানে না তারা কী চায়, তোমার বাবা খালি বাল্ব লাগাতে পারে।’
আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামল। খাটের তলা থেকে একটা লাইউডের বাক্স বার করল সে! একটি ছেঁড়া ন্যাপি, একটি ঝুমঝুমি, একটা বেঁকে যাওয়া অ্যালুমিনিয়ামের চামচ কিংবা অনেক স্বপ্ন। দুম―বাল্বটা কেটে গেল, আর কিছুই রইল না। দুম―অন্ধকার, আর তোমার বাবা জানে না সে কী চায়, আর সবকিছু মিলেমিশে যায় বাক্সটার অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর মতো : ছেঁড়া ন্যাপি আর চিরন্তন ভালোবাসা, অ্যালুমিনিয়ামের চামচ আর ইউনিভার্সিটি। কিন্তু, হতচ্ছাড়া বাল্বটা গেল কোথায় ? অবশেষে ওটা খুঁজে পেল সে, কিছু, করার উদ্দীপনায় সে একটা টেবিল টানল। ওটার নিচে ঝুলছিল খোলা সব তার। ওটার ওপরে উঠে সে মাথার ওপর বাল্বটাকে তুলে ধরল। এবার ওটা যথাস্থানে ঘুরিয়ে লাগিয়ে নিতে হবে।
কিন্তু কাচটা এত পাতলা আর পিচ্ছিল, সুতোর মতো তারটা এত ভঙ্গুর। দুম―দুটো পৃথিবী, দুটো সুযোগ―থাকো কিংবা ছেড়ে যাও ? আঙুলগুলো একটু আলগা করল সে, লক্ষ করল কীভাবে, আস্তে আস্তে হাতের তালু, বেয়ে তার কব্জি ছুঁয়ে দুম―ওটা পড়ে গেল। ভেঙে গেল।
‘তুমি ইচ্ছে করে এটা করেছো! মতলব করে! যে কারণেই হোক এখান থেকে বেরোবার জন্য, যাতে তুমি এখান থেকে বেরোতে পারো, যাতে তোমাকে এখানে থাকতে না হয়। কেন আমি বাচ্চাটাকে নিয়ে এই অন্ধকারে বিড়বিড় করে মরব, দেখবে, শিগগির একদিন আমি ঠিক চলে যাব, পালিয়ে যাব! তোমরা সবাই এটা জেনে রাখো। আমার ছোট্ট সোনা। পুঁচকে সোনা, আমি বড় ক্লান্ত, আর পারছি না।’
টেবিল থেকে সে নামল। আগে যেখানে ছিল সেখানে রাখল টেবিলটা। ও ভান করছিল যেন, ও কাঁদছে। এদ্দিনে ও জেনে গেছে ওটা কীভাবে করতে হয়। কিন্তু তুমি কিছুই বদলাতে পারবে না; দুটো সুযোগের মধ্যে তুমি একটাই বেছে নিতে পারো; কারণ, শেষমেষ, একই সময়ে তুমি দু’জায়গায় থাকতে পারো না, দুম! বাস্তবই সমাধান করে দেয় সমস্যার আর এখন সেরকমই একটা সময়, এভাবেই আর কোনওভাবেই নয়, কাউকে দোষারোপ নয়―দেখো, আমাকে বেরোতেই হবে। সে জুতো পরল, ওভারকোট পরল, আর এই মুহূর্তে ওকে মনে হচ্ছিল যেন অবহেলিত ন্যাকড়ার একটা পুতুল।
‘আমি একটা বাল্ব কিনতে বেরোচ্ছি।’
বাইরে দুর্যোগ, রাস্তা সুনসান। জল থেকে স্যাঁতসেঁতে একটা ভাপ উঠে আসছে। তার মুখে ঝাপটা মারছে কনকনে হাওয়া। এটাকে যদি ঠান্ডা বলা হয় তবে খুব কম বলা হবে। নদীর ধার দিয়ে হাঁটছিল সে। টানা তিন দিন ঠান্ডা হাওয়া বইছে আর মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। আর পাঁচটা ঠান্ডা দিনের থেকেও বিষণ্ন হয়ে আছে শহরটা, ডুবে আছে দীর্ঘ এক ক্লান্তিকর একঘেয়েমির আরও এক গভীরতায়। ঠান্ডায় জমে যাওয়া হাত দুটো ওভার কোটের পকেটে ঢোকাল সে, নুড়িপাথরে লাথি মারতে মারতে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল, এটা বিশ্বাস করতে না পেরে যে, কোনওকিছুই একটু অন্যরকম হতে পারে; এক কোণে পড়ে থাকা একগাদা ন্যাপি, একটা ভাঙা বাল্ব, একটা বিষণ্ন বিবর্ণ দিন। সে একটা খালি বোতলে লাথি মারল আর ওটা ফুটপাথে শব্দ তুলে গড়াতে গড়াতে জলে পড়ে স্রোতে ভেসে গেল।
ফলের রসের দোকানের খানকি মাগিটা বোতল খুলতে খুলতে এমনভাবে তাকাল যেন আমি বিনি পয়সায় ফলের রস চাচ্ছি! রোদজ্বলা ফুটপাথ―গ্রীষ্ম, এরকম কি কখনও ঘটেছিল ? রোদের তাপে এলিয়ে পড়া সব গাছ, যাদের বিধ্বস্ত সব ডালপালা প্রায় মাটি ছুঁচ্ছে, তার সবুজ পোশাক, ঠিক সেই মুহূর্তে―সবুজের ওপর সাদা সাদা ফোঁটা। ‘না, আমি পারব না, কালকেও পারব না, পরশুও না, আমার পরীক্ষা আছে, পড়াশোনা আছে, রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে, না, সত্যি সত্যি, আমি পারব না, আমার নাম ইরিনা, ইরিনা, ভালো কথা। হয়তো রোববারে, কিন্তু তাও আমি জানি না, রোববার।’ একটা গ্রামের ছেলের রোমান্টিক প্রেমের গল্প―গেদিমিনাস দুর্গ, ভেনৎরেগিস উপত্যকা, সেই পুরোনো শহর, তিন ক্রোশের পাহাড়। এসব জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম আমরা। সন্ধ্যায়, যখন ঠান্ডা নেমে আসত, নেরিজের পাড়ে বসে থাকতে কী ভালো যে লাগত―সেই সব গ্রীষ্মগুলো সত্যিই কি ছিল ? সত্যিই কি ছিল সেই সব সন্ধেগুলো! প্রত্যেকবার তার সঙ্গে দেখা হবার আগে আমার যে ধুকপুকানি, সেগুলো কি সত্যি ছিল ? আর সেই সব আশা, ভয়াল মুহূর্ত, দ্রুত থেকে দ্রুততর হওয়া পদক্ষেপ ?
সিমেন্ট ব্রিজের রেলিং-এর ওপরে ঝুঁকে দাঁড়াল সে, বয়ে যাওয়া জলের দিকে তাকিয়ে রইল। এখানে এলে সবসময় সে একটা অদ্ভুত শোকে আচ্ছন্ন হয়, হয়তো বিগত সময়ের ছোট্ট রহস্যময় নিঃশ্বাসের কারণে, যা কুয়াশায় মিশে যাওয়া জলস্রোতের দিকে তাকালেই সে অনুভব করে।
আমি জানি না কেন, কিন্তু সেই সব সময়ে তোমার সত্যি সত্যি মনে হবে মদ খাই―এক পাত্তর গিলে ফেলি, ধর বিগত গ্রীষ্মকে মনে করে, সেই গ্রীষ্মের সন্ধ্যাগুলোকে মনে করে, পুরোনো প্রেমের কথা মনে করে―যা ছিল এই মদ্যপানের মতোই রোমান্টিক, সেই সব দিনগুলো, যেগুলো অনেকদিন আগেই চলে গেছে। যখন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবার পরও আমি তোমাকে কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করে তোমাদের জানলার পাশে বসে থকেতে দেখতাম না―চেষ্টা করো, বোঝো, আমি তোমার সঙ্গে সবসময় থাকতে পারি না, কখনও কখনও আমার একলা থাকার প্রয়োজন পড়ে, সকলেরই কোনও না কোনও সময় একলা থাকার প্রয়োজন পড়ে। তোমার আহত অহং, সবরকম দোষারোপ, অদ্ভুত সব কল্পকথা, আর কাঁড়ি কাঁড়ি নিন্দামন্দ : ‘এটা কীরকম জীবন ? এ জায়গাটা একটা আগুনের ফাঁদ, এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলাই ভয়ংকর, আমার অবস্থাটা কী হয়েছে দেখো, তুমি একটা অপদার্থ, শুধু স্বপ্নই দেখো, দিবাস্বপ্ন। আমরা যা আমরা তাই। যখন শুয়ে থাকি, তখন আমি খাটের ঠিক ওপরে থাকা রুগ্ণ বাল্বটার দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকতে পারি। সবশেষে মনে হয় ভালোবাসা একটা সাদা ন্যাপি নয়, নয় ভাঙা একটা খাট, ভালোবাসা অনেকটা নদীতলের মতো, আর সবকিছু ওর ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঠিক জলের মতো, ডুবে থাকা ন্যাপির মধ্য দিয়ে, আধখালি টুথপেস্টের টিউবের মধ্যে দিয়ে, কেটে যাওয়া বাল্বের মধ্যে দিয়ে, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বিশৃঙ্খলা যার মধ্যে তুমি তলিয়ে যাও প্রত্যেক দিন, তলদেশের দিকে, শাস্তির দিকে, বোঝাপাড়ার দিকে, একটা অম্লমধুর স্থিরতার দিকে, আর না হলে… না হলে… তুমি এর জন্য কাউকে দোষারোপ করতে পারবে না, কারণ―ফলাফল―শুধুই তোমার দিদিমার বিয়ের পণে পাওয়া গয়নার বাক্সে রাখা একটা ফেটে যাওয়া সাবানের বুদ্বুদ। প্রায়ই, মনে করো, পুরোপুরি তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে, কোনও অভিপ্রায় ছাড়াই তুমি সম্পূর্ণ বেপরোয়া কিছু একটা করে ফেলে হতবাক হয়ে গেলে, তোমার মনে হবে উলটোদিকের কোনও অদমনীয় শক্তি অধিকার করেছে তোমাকে, আর তার কারণ খুঁজে বার করলে বা করার চেষ্টা করলে পুরোপুরি আশাহত হবে তুমি। যেমন ধরো, শেষ বাল্বটাও তুমি ভাঙলে, অথবা কেন তুমি নিচ থেকে সিঁড়ি বেয়ে ব্রিজের ওপরে উঠলে, তুমি ঘুরলে পুরোনো শহরের ক্যাফেগুলোর দিকে, যেন কোনও উদ্দেশ্য আছে।
পকেটে হাত দুটো ঢুকিয়ে সে চলতে শুরু করল। সব কিছুই যেভাবে চলার সেভাবেই চলতে লাগল : কাজ থেকে লোকজন বাড়ি ফিরছে, দিনের ব্যস্ত একটা সময়।
‘একটা আলো ? হ্যাঁ, কোনও অসুবিধে নেই।’ ক্যাথিড্রাল আর ঘণ্টাওয়ালা ঘড়ির মিনার, আরও অন্ধকার নামছে, এটা বিশ্বাস করা কি বোকামো নয় যে, প্রত্যেক সন্ধ্যায়, যেন এমনটা হতেই পারে, এই সরু সব রাস্তার কোনও একটাতে তোমার সঙ্গে দেখা হতে পারে প্রভু যিশুর―এক পয়গম্বরের―যে তোমাকে তোমার সব সমস্যার উত্তর খুঁজে পেতে সাহায্য করবে ?
কোটের পকেট থেকে তিন কোপেক বার করে সান্ধ্য কাগজ কিনল সে : ‘ফ্রাঙ্কোর পারিবারিক কিসসা ? কারা উগ্রপন্থিদের তাতাচ্ছে,’ ‘মানুষের নৈতিক অবস্থান।’ একটা দমকা হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত থেকে কাগজটা প্রায় ছিনিয়ে নিচ্ছিল। প্রথমে দুই ভাঁজ করে তারপর গোল করে গুটিয়ে ওটাকে সে বগলদাবা করল। হঠাৎ কিছু একটা মনে হলো তার, স্মৃতিতে জ্বলে যেতে লাগল, আর সেই অদ্ভুত অবস্থা থেকে যে পালাতে পারল না, সেই বিবর্ণ মুখের সীমারেখা থেকে, সেইসব লম্বা লম্বা কমনীয় আঙুলগুলো থেকে, যাদের রাঙানো নখগুলো দেখে! মনে হয় শিরিষের আঠা দিয়ে আটকানো আছে সদ্যফোটা ফুল। গোধূলি-আলোয় যা কিছু, তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, ভেসে উঠল তার চিন্তার মধ্য দিয়ে, এক অভিঘাতে বিচ্ছিন্ন সব দিন কিংবা ঘটনার মতো। ঠিক এখানে, সবকিছু, এত কাছাকাছি ছিল! মুহূর্তের জন্য সে দাঁড়াল, আবার কাগজটা খুলল : ‘কারা উগ্রপন্থিদের তাতাচ্ছে,’ মানুষের নৈতিক অবস্থান―আর হঠাৎ একটা আলোর তির বিঁধে গেল তার চেতনায় : ‘নৈতিক বিষয় নিয়ে আমি লিখি, আমি একজন সাংবাদিক, মণিকা, এটা সত্যি, আমি এখনও আগামী দিনের একজন সাংবাদিক, কিন্তু আমার তো আর দু বছর বাকি আছে, ওটা কিছুই না, ঝড়ের বেগে। ওটা কেটে যাবে, উড়ে যাবে, এত তাড়াতাড়ি যে তুমি বুঝতেও পারবে না, তুমি শুধু পা বাড়িয়ে থাকো।’ কোনও কারণে সারাক্ষণই ও ওর পায়ের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ছিল, ও এক মুহূর্তের জন্যও দোলানো থামায়নি : ‘আসছে যাচ্ছে, একটা পেণ্ডুলামের মতো, আবার ও সিগারেটে একটা জোর টান দিল, আর আবার বিষণ্ন কণ্ঠে, দারুণ সাজানো সব কথার মৌচাক থেকে বোনা, আসছে-যাচ্ছে, আসছে যাচ্ছে : ‘তোমার সাথে’ আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগল, এই আমার টেলিফোন নাম্বার, কখনও যদি তোমার দরকার পড়ে, কখনও, কখনও,…”
একটা টেলিফোন বুথে―টুক করে কয়েন গলার জায়গা দিয়ে দু কোপেকের একটা কয়েন গলে গেল : ‘আমাদের নিশ্চয়ই দেখা করা উচিত, হত্যা, এখন, ঠিক এক্ষুনি, সেই ক্যাফেটায়।’
একটা ঠান্ডা শিরশিরানি নিয়ে টেলিফোন বুথ থেকে বেরিয়ে এল সে―‘লম্বা লম্বা কমনীয় সব আঙুল, একটা বিবর্ণ’ মুখে, একটা মিষ্টি অবাক কণ্ঠস্বর। কী লাভ―প্রতিহিংসা, কিংবা হয়তো একাকিত্বের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ, যাই হোক তুমি বলতে পারো না আরামদায়ক ক্যাফেতে বসে কোনও পুরোনো জীর্ণ রেকর্ড শুনতে ভালো লাগবে না; ওরা সবসময়ই একই রেকর্ড বাজায়; ওর মুখ, যদিও একদম নতুন নয়, সেই মুখ নয় যা তুমি প্রাত্যহিক ধূসর অস্তিত্বে অনবরত তোমার সামনে দেখো। তারপর একটা নতুন মোকাবিলার চিন্তায়, অবচেতনে উত্তেজিত হলো সে। এটা উপলব্ধি না করেই গতি বাড়ল তার পদক্ষেপের। ক্যাসেল ক্রস স্ট্রিট। দেওয়ালের ওপর বড় বড় করে লেখা দাদা, পাশে একটা লাল রঙের পোচ। তুমি কখনও জানতেও পারো না অবচেতনার গোপন সব নদীর স্রোত তোমাকে কোথায় টেনে নিয়ে যাবে। মনের ভেতরটা বিশৃঙ্খলা আর বিচ্ছিন্নতার প্রতীক দিয়ে চিহ্নিত করা যেতে পারে, বিচ্ছিন্নতা আর বিশৃঙ্খলা―সেটা স্বাধীনতা, আর স্বাধীনতা হলো বিচ্ছিন্নতা আর বিশৃঙ্খলা, অবশ্যই। ইরিনা কখনওই এ ব্যাপারে একমত হবে না, অবশ্যই, কান্না, মূর্ছা, একটা রেখা যা আমাদের বিভক্ত করে, যা আমরা কেউই কখনও আবার অতিক্রম করতে পারব না। একটা নুড়িপাথরে লাথি মেরে সামনে হাঁটতে লাগল সে। গতানুগতিক ভাবনা-চিন্তা, আগে থেকে ঠিক করে রাখা জীবনের সব সূত্র : প্রত্যেক আত্মসচেতন যুবক-যুবতী, বিশ্ববিদ্যালয় (কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান), ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নিজেদের পাঁচ বছর হিঁচড়ে নিয়ে যাবার পর একটা ডিপ্লোমা পায়, একটা আদরের দাগ, পেশায় উন্নতির সিঁড়ি, একজন সুন্দর সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট, একটা ছিমছাম সংসার। কোনও কিছু ভ্রান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত―এ ব্যাপারটাই স্বপ্নে নিষিদ্ধ। একজন শিল্পী―কিংবা একজন মানসিক রোগী―‘তোমার বাবা একটা মানসিক রোগী, সে জানে না সে কী চায়।’ প্রথম প্রথম এটা দারুণ ছিল, প্রথম প্রথম এটা ছিল দারুণ আশ্চর্যের, যে এটা তোমার মতো করে করতে পারতে―কী রহস্যময় একটা ঘর, কী অবাক করা একটা সোফা, গ্রীষ্মের অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার মতো রোমান্টিক প্রেম। ‘এখানে অতীতের’ গন্ধ, ঘরময় ধূসর হয়ে যাওয়া পোস্টকার্ডের সুবাস, আমরা এখানে সুখী হব, ‘কিন্তু সত্যি সত্যি দেওয়ালে সেই লেখাটা ছিল, অবশেষে, যথাসময়ে কারণ তোমার দরকার শক্তসমর্থ একটা হাত যা তোমার চোখের সামনে উদ্ভ্রান্ত গতিতে ঘুরতে থাকা বিশৃঙ্খলাকে থামানোর ক্ষমতা রাখে আর তারপর প্রত্যেকটা জিনিসে লাগিয়ে দিতে পারে সাদা-কালো টানা টানা দাগ আর লেবেল : এটা ভালো, এটা খারাপ, কারণ তোমার একটা বাল্ব চাই যা কখনও কাটবে না, কারণ তোমার নিজস্ব জিনিসপত্র আর তোমার মাথার ওপর একটা ছাদ চাই―তোমার নিজস্ব ; এটা একটা রসিকতা, একটিবার ঐসব ক্লান্ত লোকগুলোর দিকে চেয়ে দেখো, যারা ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারছে না, যারা তাদের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে পৃথিবীটাকে বাগে আনতে চাইছে। এ সবই অর্থহীন, অবশ্যই, এটা ভাবনা-চিন্তার যোগ্যও না, এই সব মুহূর্তে তোমার ইচ্ছে হবে কোনও গাট্টাগোট্টা বয়স্ক লোকের মাথায় গাট্টা মারার কিংবা, জোরে জোরে শিস দেবার, ক্যাসেল ক্রস স্ট্রিট ধরে কারও হাতে হাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার।’
অবশেষে যেখানে দেখা করার কথা সেই ক্যাফেতে পৌঁছল সে। পা টিপে টিপে এগিয়ে কাঠের দরজায় লাগানো চৌকো কাচের জানলাটা দিয়ে ভেতরে তাকাল। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল তার, প্রায় যেন সে পালিয়ে এসেছে স্বাধীনতায়, সে ভেতরে ঢুকল ।
‘একশো গ্রাম ভদকা, রাশিয়ান ভদকা, আর কফি।’ মদ দিচ্ছিল যে লোকটা সে পান্ডুর দৃষ্টিতে ঘরের কোণের দিকে তাকাল, তারপর বোতলটা খুলে ঠিক যতটা প্রয়োজন ততটাই মদ ঢালল, এক বিন্দুও বেশি পড়ল না। বিরক্তিকর একটা অবস্থা, গোধূলি আর বিরক্তি, কফির আধখাওয়া কাপগুলো থেকে ওঠা ধোঁয়ার সঙ্গে উঠতে লাগল একসঙ্গে, বিরক্তি উঠতে লাগল ড্রাইওয়াইনের খালি গ্লাসগুলো থেকে, নিচু গলায় বলা কথাবার্তা থেকে। একসময় সে ঐ নিখুঁত করে মাপা একশো গ্রাম টুক করে গলায় ঢালল, কফিটা নিল, বসার জন্য একটা জায়গা খুঁজে নিল একটা কোণে, পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করল। এটা ভালো যে ওরা এখানে সিগারেট খেতে দেয়। তার পাশে বসা মেয়েগুলোর, যেন গত শতকের যক্ষ্মারোগী সব, হলদে মুখগুলো থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে হলদে একটা আলো। ভাঙাচুরা সব মুখে, বিষাদাচ্ছন্নতায় যেন মুছে যাচ্ছে এবং পরম বিষাদে তাদের কোনো ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে―বিষাদ ফুটিয়ে তোলার এই বিষাদাচ্ছন্ন অভিনয় তাদের নিজের ভেতরেই এত বিষাদগ্রস্ত। কোনওভাবে ওদেরই মতো ছিল মণিকা―ওর লম্বা মুখ আর মাছের মতো চোখ। ‘নৈতিক বিষয় নিয়ে আমি লিখি, পায়ের উপর পা, আসছে যাচ্ছে, আসছে যাচ্ছে। আলোর ঝলকানি, দেয়ালে ছায়ার খেলা; নিচু গলার হাসি, তুমি বলতে পারো না, এটা কোনও ব্যাপারই না, তুমি কতটা পরিহাসের চোখে তোমার চারপাশে ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো দেখছো, তুমি এখনও অনুভব করতে পারো না কোনও এক রকম দূরায়ত আধ্যাত্মিকতার যোগ আছে ঐসব হলুদ মুখগুলোর সঙ্গে, ঐসব বেরিয়ে থাকা গালের হাড়গুলোর সঙ্গে, ঐসব ক্লান্ত চোখগুলোর সঙ্গে। তলে তলে, দৈনন্দিনতার চাপে গুঁড়িয়ে যাওয়া ভীষণভাবে চাওয়া রোমান্টিক স্বপ্ন ভেঙে বেরিয়ে যায় আপাত-বাস্তবতার মুখোশ।
সিগারেট জ্বালাল সে, একটা লম্বা টান দিল, অনুভব করল কেমন করে একটা হালকা নির্ভরতা আস্তে আস্তে গ্রাস করছে তাকে। শয়তানে ধরেছে, তুমি তোমার সঙ্গে কথা বলছো, যেন কথা বলছো কোনও আগন্তুকের সঙ্গে, যেন তুমি দু ভাগে ভাগ হয়ে গেছো, ভাগগুলো দ্বিগুণ হয়ে গেছে, এদিকে অর্ধেকটা, ওদিকে অর্ধেকটা―অন্যদিকে কোনও এক স্থানে, কুয়াশার মধ্যে, ধোঁয়াশার মধ্যে, দূরে, ধরাছোঁয়ার বাইরে, অবচেতনার নদীর ভেতর শুকনো, সবকিছু এভাবেই চলছে : সতর্ক হয়ে তৈরি করা একটা নানা রঙের নকশা, দুম―নুড়িপাথরের ওপর ভেঙে পড়ল হাজার হাজার কাচের টুকরো, এক গাদা ন্যাপি, একটা ছেঁড়া মোজা, দুর্ভাগ্যবশত আজেবাজে জিনিসে ভরা একটা প্লাইউডের বাক্স। অবশ্যই, সবচেয়ে ভালো হলো এ বিষয়ে না ভাবা, এটা ভুলে যাওয়া―এটা কি জরুরি ? মধ্যেই মনিকার এসে যাওয়া উচিত। ‘আমি একজন সাংবাদিক, ছাই রংয়ের চোখ আর বড় বড় চোখের পাতা; অবশ্যই আমাদের দেখা হবে,’ আচ্ছা, তুমি কি ওকে আর বলতে পারো, দারুণ সাজানো সব কথার মৌচাক থেকে ছড়ানো আতশবাজির রোশনাই, একটা পায়ের উপর তোলা আর একটা পা, আসছে যাচ্ছে, আসছে যাচ্ছে―পেণ্ডুলামের মতো। হঠাৎ কাঁপতে লাগল সে; শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এল একটা ঠান্ডা স্রোত। ইরিনা এখানে কী করছে ? ইরিনা, বাচ্চার খাটের ওপর ঝুঁকে পড়া, বাচ্চার দিকে বাড়ানো দুটো হাত, বুকে চেপে ধরেছে বাচ্চাটাকে, বাচ্চাটা পেটে আসার আগে আরও সুন্দর দেখতে ছিল : ‘আমার ছোট্ট সোনা, আমার পুঁচকে সোনা; উপরে-নিচে, ঘুমোতে যাওয়া, ঘুমিয়ে পড়া, বাচ্চাটাও বাচ্চাটাকে দোল খাওয়ায়, সামনে পেছনে, ওপরে নিচে। পড়ে গিয়ে ভেঙে যাচ্ছে কফির কাপ আর বিশ্রী শব্দ করে চেয়ারটা পেছাল সে। দরজার মুখে অবাক হওয়া হলদেটে সব মুখ।’
‘তুমি কোথায়… ? তুমিই তো আমায় ডেকেছিলে।’
‘দুঃখিত, আসলে আমি…’
একটা হেলাফেলায় পড়ে থাকা পার্কে নিজেকে আবিষ্কার করল সে। বেঞ্চটা ভিজে ছিল―গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। ইডিয়ট, ইডিয়ট, ইডিয়ট। শুধু বুড়ো-বুড়ি আর ছন্নছাড়ারাই এখানে আসে―তার উলটোদিকে বসে ছিল একটা বুড়ি, জাবর কাটার মতো মুখ নাড়ছিল আর তার নোংরা ঝোলা থেকে পাউরুটির খারাপ হয়ে যাওয়া সব টুকরো বার করছিল। অনেক পুরুষ-মানুষের জুতো পরা পায়ের মাঝখানে তার পায়ের কাছে ভিড় করে ছিল এক ঝাঁক পায়রা। ইডিয়ট। সামনে-পেছনে, ওপরে-নিচে। পেচ্ছাপ আর নোংরা না-কাচা মোজার গন্ধ ছড়াচ্ছিল ওটা। আমাকে যেতেই হবে। খুঁজে পেতেই হবে একটা বাল্ব। যখন অন্ধকার হয়েই গেছে, তখন শুধু চেষ্টা করেই যেতে হবে আর খুঁজে বার করতেই হবে বাল্বটা, যখন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে, যখন অনেকক্ষণ আগেই বন্ধ হয়ে গেছে সমস্ত দোকানপাট, আর ফাঁকা হয়ে গেছে পুরো শহর। যদি না কোনও লাইটপোস্টে উঠে এটা খুলে না নাও, যদি না… সে থামল, মাথা ঝাঁকাল পিছনে : একটা নীলাভ আলোর রেখা, সন্ধ্যার আকাশ থেকে নামতে লাগল বড় বড় ফোঁটা, আস্তে আস্তে ওগুলো মাটিতে পড়তে লাগল। বৃষ্টি হতে পারে না। এটা একটা রসিকতা, অবশ্যই, বাল্ব, শেষ হয়ে যাওয়া আশা… কলারটা তুলল সে, হাত দুটো ভালো করে পকেটে ঢুকিয়ে হাঁটতে লাগল, চেষ্টা করতে লাগল কোনও কিছু নিয়ে না ভাবার; চেষ্টা করতে লাগল তার চিন্তাগুলো যাতে একটা বড় গর্তে এসে পড়ে আর তারপর গর্তটা যেন শূন্য হয়ে যায়।
ফাঁকা শহরটাতে হাঁটতে লাগল সে, দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ভীষণভাবে গুটিয়ে যাওয়া নিঃসঙ্গ একটা মানুষ। মাঝে মাঝে ছোট ছোট নুড়িপাথরে লাথি মারছিল, মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছিল, কোনও না কোনও স্মারক-উপহারের দোকানের জানলার দিকে দেখছিল―মনে হচ্ছিল ভেতরটায় কী আরাম আর উষ্ণতা। মাথাটা পেছনে ঝাঁকিয়ে সে দেখতে পেল অন্ধকারে মাথা তুলেছে সেন্ট জন ক্যাথিড্রালের ছায়াবয়ব; পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ঘণ্টা-মিনার, বিশাল চত্বর। ‘এখানে আমি একসময় পড়তাম : ক্লাসের পড়া, সেমিনার, অধ্যাপকেরা, সবকিছু এখন ধোঁয়া ধোঁয়া, সামনে দিয়ে, পিছন দিয়ে যাওয়া সব রাস্তা, কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলছে ইরিনা―ইরিনা ছাড়া আর কে হবে―‘আমি তোমাকে বলেছিলাম, বলেছিলাম না এটা এরকমই হবে : ক্লাস পালানো তুমি, একটা অলস কুষ্মাণ্ড, অপদার্থ, সারাটা দিন তো সোফার ওপরেই কাটাও।’ প্রত্যেকটা ব্যাপারকে নাটকীয় করে না তুলে সবকিছু করার চেষ্টা করো না, আসলে সবকিছু বড্ড সাধারণ, একটা অ্যালুমিনিয়ামের চামচ আর একটা বিশ্ববিদ্যালয়। জানলার ধারটায় একটা মাছি ঘুরছিল, আচমকা ওখানে এসে পড়ল, দুম, সেখানে, ফেটে চ্যাপটা হয়ে গেল, আর বেশি কিছু নয়, শুধুই চ্যাপটা, একটা বিশ্বদৃষ্টি নিয়ে ভাব। বিশ্বদৃষ্টি নিয়ে ভাব―অ্যাসপিরিন, জল দিয়ে যেটা তুমি খাও, সমস্ত রকম ট্যাবলেট খাওয়া থেকে রেহাই, দুর্ভাগ্যবশত, দ্বন্দ্বময় বাস্তবতা থেকে কোনও রেহাই নেই। ক্যাফেতে বোকা-বোকা একটা ব্যাপার হয়েছিল। একটা পায়ের ওপর তোলা আরেকটা পা, ঘুমোতে যাও, ঘুমিয়ে পড়ো, সোনা, শেষমেশ তুমি তো বিশ্বস্ত হবার ভান করেছো, পুরোনো শহরের এলোমেলো হয়ে থাক। চৌমাথায় দড়ি নিয়ে লাফিয়েছো। কে তোমাকে দাগের বাইরে যেতে আটকাচ্ছে, কে তোমাকে জোরে জোরে শিস দিতে দিচ্ছে না, পুরোনো শহরের বড় রাস্তায় হাত দিয়ে হেঁটে যেতে দিচ্ছে না, আর কেন, শেষমেষ, একদিন ওকে বলো, আর নিজেকেও, যে অনেক দিন আগেই সবকিছু চুকেবুকে গেছে, ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, ভেঙে গেছে, ঝরে গেছে, জলে ভেসে গেছে, ভেসে গেছে হাওয়ায় আর রাস্তার আর্বজনায়। আমাদের শেষ আশা ছিল বাচ্চাটা, আমরা দু’জনেই ছিলাম ক্ষ্যাপা, সে সময়টুকু কেবল বাচ্চাটাই আমাদের একসঙ্গে রেখেছিল―পরে সেটা উড়ে দূরে চলে যাবে, একসঙ্গে বোনা, একসঙ্গে গিট বাঁধা হাজারো সুতোয়―একটার সঙ্গে আরেকটা, একটা সুতোর কাজ যা আর ফিরে করা যাবে না, দুটো আত্মার একটা আশ্চর্য ঐকতান, একটা রসিকতা, ছেলেমানুষি স্বপ্ন, বালিশের ওপর গোঙাতে থাকা একটা লালবাতি, নিদ্রাহীন সব রাত্রি, তাকে ঘিরেই শুরু হয় আর শেষ হয় ইরিনার পৃথিবী। এটা একটা নাটকের মতো : তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে আছো আর আমি এখানে, আমাদের মধ্যে আছে এই বাচ্চাটা―তোমার একটা অংশ, আমার একটা অংশ, আর এটা ছাড়া সবকিছুই খুব হাস্যকর : আমার দিকে তুমি হাত বাড়িয়ে দিলে; সেদিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম আমি, কিন্তু একটা হাত কখনওই ছুঁলো না আরেকটা হাত, আমাকে কিছু বলতে চাইছো তুমি, তোমাকে কিছু বলতে চাইছি আমি, কিন্তু আমরা কেউই কখনও মন খুলে কথা বলিনি, তুমি চাও সবকিছু ঠিকঠাক চলবে, আমি চাই সবকিছু ঠিকঠাক চলবে, কিন্তু সবসময় সবকিছুই খারাপ হয়েছে। এর জন্য তুমি শুধু বসে বসে কেঁদেছো কিংবা বসে বসে হেসেছো, আর সেটাই একটা বিষণ্ন কমেডি।
শহরের যে দিকটায় একদম আলো জলে না, অন্ধকার, সেখানে এসে থামল সে। মাঝখানে একটা সরু গলি রেখে প্রায় গা-ছুঁয়ে রাস্তার দু ধারে একটার গায়ে হেলে পড়েছে আরেকটা বাড়ি। আরও জোরে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। দেয়ালে জলের লম্বা ধারাগুলোকে জীবন্ত মাকড়সার জালের মতো দেখতে লাগছিল―ওগুলো নড়ছিল, স্পন্দিত হচ্ছিল, বিচ্ছিন্ন হবার জন্য একসঙ্গে বইছিল, তারপর ছড়িয়ে গেল আবার, যতক্ষণ না একেবারে শেষে বৃষ্টির বড় একটা ধারা হয়ে ওপর থেকে নিচে পড়তে লাগল, বৃষ্টি পড়ছিল।
তাই―একটা বিষণ্ন কমেডি। ওভারকোটের বোতাম খুলল সে, বৃষ্টির দিকে মুখ করে হাঁটতে লাগল। বাইরে একটা জনপ্রাণিও নেই, ভিজে যাওয়া সিগরেটটা নর্দমায় ফেলে দিল। তুমি কী করতে পারো, এর জন্য বসে বসে কাঁদবে, বসে বসে হাসবে। সেই বাল্ব―আলো। আলো হোক! যেন প্রয়োজন মাফিক―অন্ধকার, তুমি খুঁচিয়ে বার করে আনতে পারো কারও চোখ। তারপর হঠাৎ থেমে গেল সে, একটা টেলিফোন পোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়াল, মাথার ভিজে চুলের ভেতর, মুখের ওপর হাত বোলাল; তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করল। দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল টেলিফোন পোস্ট, মাথা হেলাল পেছনে; তার মুখে যন্ত্রণায় বিঁধে দিতে লাগল বৃষ্টির ধারা, তারপর কপাল বেয়ে, চুল বেয়ে গলা অবধি নেমে গেল, আর সে পাগলের মতো হাসতেই থাকল : এটা হাস্যকর নয়, এটা কি হাস্যকর নয়, বোকা বোকা নয়―একটা দেয়াল। দেয়ালটার দিকে এগিয়ে গেল সে, দু হাতে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল―ভিজে আর খরখরে ছিল দেয়ালটা। রাস্তার উলটোদিকেও একটা দেয়াল ছিল। সে পাগলের মতো হাসতে লাগল―একটা কানা গলি। তুমি এটা জানতে না, সবকিছুই তো এরকম, তুমি জানতে না। অবশ্যই―চারদিক অন্ধকার, তুমি খুঁচিয়ে বার করে আনতে পারো কারও চোখ, কোনও আলো নয়, কোনও বাল্ব নয়, অবশ্যই একটা কানাগলি। আস্তে আস্তে স্থির হলো সে। নিচের নুড়িপাথরের দিকে ডুবতে থাকল, আড়াআড়িভাবে পা দুটো রেখে, দুহাতের মধ্যে মাথা রেখে বসল। ধ্যান। অন্তর্দর্শন। আত্মবিশ্লেষণ। চুলোয় যাক সব! সে বুঝতে পারল কীভাবে সে কাঁপছে। আশ্চর্যভাবে সেই নুড়িপাথরগুলো সেই কানাগলি অবধি গিয়েই শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথবা হয়তো নয়―সাদৃশ্যের শৃঙ্খলটা কানাগলির সঙ্গেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই, হয়তো এটাই চলে যাবার, ধারণা আর চিন্তার সমুদ্রে হেঁটে বেড়াবার সঠিক সময়, বলা যায়, সংকল্পেরও। অ্যাসপিরিন। আজেবাজে জিনিসভরা একটা প্লাইউডের বাক্স। তলহীন একটা নদী। একটা কানাগলি।
সে দেখতে পেল তেরছাভাবে অনেক আলোর রেখা এসে পড়ছে দেয়ালে। লাফিয়ে উঠে বাড়িটায় গা সাঁটিয়ে দাঁড়াল। তীক্ষè আওয়াজ তুলে ঐ সরু রাস্তাটা দিয়ে চলে গেল একটা গাড়ি। এক মূহূর্তের জন্য থামল গাড়িটা, একটা চত্বরে ঢুকল, ঘুরল, আবার রাস্তায় বেরিয়ে এসে থামল। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল মাঝবয়সী একটা লোক, এক হাতে মাথার ওপর ছুড়ে দিল বর্ষাতি, আর এক হাতে খবরের কাগজে মোড়া একটা বড় জিনিস নিয়ে, কুঁজো হয়ে, ছুট লাগাল সবচেয়ে কাছের বাড়িটায় আর সিঁড়ি দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল, সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ না করেই।
তার মাথা ঘুরতে লাগল। রাস্তা, ফ্ল্যাটবাড়ি, হঠাৎ সব জড়াতে আরম্ভ করল; মনে হলো যেন গোটা পাড়াটাই নড়ছে আর জলে গলে যাচ্ছে, স্পন্দিত সীমারেখা; শত্রু, তার মুখ বেয়ে নামতে থাকল জলের ধারা। এটা কি আমার পায়ের পাতা ? নাকি আমার পদক্ষেপের প্রতিধ্বনি ? নাকি আমার বুকের ধুকপুকানি―যেন একটা ট্রেন চলে গেছিল আর তারপর কিছুই ছিল না, শুধু বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল, শুধু―শুধু… আবার পুরোনো শহরের বাড়িগুলো বৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল―এখন ওগুলো আরও বড়, এমন কি আরও ভয়াবহ। আবার ওগুলো লাফিয়ে উঠছিল আকাশে। মনে হচ্ছিল ঝাঁকুনি লাগাচ্ছে একটার পর একটা বাড়ি, এর মধ্যে দেয়ালগুলো থেকে খুলে আর দুলতে দুলতে ভেঙে পড়ছে। পড়ছিল ইট, সবকিছু, নড়ছিল আর ধোঁয়া উঠছিল। এখান থেকে বেরোতেই হবে, এখান থেকে বেরোতেই হবে! সে জানেও না কীভাবে, কিন্তু এর মধ্যেই সে ভেতরে, স্টিয়ারিং-এ ঠেস দিয়ে বসে আছে। বিশ্বদৃষ্টি দিয়ে ভাবো, শান্ত হও, ভয় পাবার কিছু নেই, ঠান্ডা হও, ঠান্ডা হও, সোনা, এটা এরকমই। আর লাফিয়ে এগিয়ে গেল গাড়িটা, আর সরু রাস্তাটা দিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল; গাড়ির আয়নায় সে দেখল অসহায়ভাবে দুহাত নাড়ছে একটা লোক, তারপর সামনের দিকে কয়েক পা ছুটে, মুখ থুবড়ে পড়ল নুড়িপাথরগুলোর ওপর। তারপর তৃতীয়বারের মতো সবকিছু লাফিয়ে উঠল আকাশে আর নিচে পড়তে লাগল :
পড়তে লাগল, ধোঁয়া উঠতে লাগল, একটা পাগল করা তীক্ষè আওয়াজ, হৈ-চৈ, বজ্রপাত, ভয়, আরও দ্রুত, আরও। দ্রুত এখান থেকে বেরোনো যাক। বাঁধানো রাস্তা ছুঁয়ে ছিল না তার গাড়ির চাকা, একটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটা সরু রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে চলছিল গাড়িটা―রাস্তায় একটা বাঁক, আরেকটা বাঁক, তৃতীয় একটা বাঁক, এবার অন্যদিকে, অবশেষে তীক্ষè আওয়াজ করতে করতে পুরোনো শহরের বড় রাস্তায় লাফিয়ে উঠল গাড়িটা। চিঁচিঁ করে উঠল গাড়ির ব্রেক, সামনের দিকে যেতে লাগল, স্টিয়ারিং টেনে সে পেছনে আনল স্টিয়ারিং, আর আবার বিচ্ছিরি আওয়াজ করতে করতে এগোতে থাকল গাড়ি। একটা আগুনের গোলায় মিশে গেল সব ঝিকমিক আলো : আরও জোরে, ট্রাফিকের লাইট, ভয়ে একটা হলুদ হয়ে যাওয়া বেড়ালের মতো লাফিয়ে এক পাশে সরে গেল একটা বুড়ি, তার ব্যাগ পড়ে গেল, একটা বাঁকা রেখা। পৃথিবীটা বদলে গেছে গলি, রাস্তা প্রত্যাশা, ট্রলিবাস, দোকানের জানলা, নানা মুখে, একসঙ্গে পড়তে থাকা আলো এবং ছায়া, এসবের একটা পাগলা ঘূর্ণির বিশৃঙ্খলায়―আস্তে আস্তে ভেসে বেড়াচ্ছে সবকিছু, ঘুরছে, দূরে সরে যাচ্ছে, গোঙাচ্ছে, যেন হঠাৎ লোপ পেয়ে গেছে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি । অবশেষে সে এসে পৌঁছাল শহরতলীতে। তিরের মতো সোজা একটা রাস্তায় সে আরও জোরে গাড়ি চালাল। সামনের কাচে ওয়াইপারগুলো এপাশ-ওপাশ করে একটা ছন্দে জলের ধারা সরাচ্ছিল; গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখা দিয়ে সরে যাচ্ছিল সব ঝোপঝাড়, গাছপালা, রাস্তার চিহ্ন। একটা বাঁকা রেখা! নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল গাড়িটা, স্টিয়ারিং, স্টিয়ারিং! রাস্তার ঠিক ধারে হেলে পড়ে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল গাড়িটা। ইরিনা, মনিকা, বাচ্চার চিৎকার, একটা আধখালি টুথপেস্টের টিউব, ছেড়ে যাবে না থাকবে, পড়ছে, ভাঙছে, আমি একটা বাল্ব কিনতে বেরোচ্ছি, একটা অন্ধকারের কুয়োয় আমরা মাছ ধরছি, যেখানে কিছু নেই সেখানে আমরা খুঁজছি, সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা পরস্পরকে জিজ্ঞেস করছি, আমরা কোথায় ? আমরা কোথা থেকে এসেছি ? এখানে ? কোথায় ? আমরা এত নিঃসঙ্গ, পরস্পরের কাছে এত অচেনা, আমরা খুঁজে চলেছি সেই জিনিস যা সবকিছু পালটে দেবে, যেমন ধরো, বাল্ব, যেমন ধরো―সবকিছু, যা যা মনে হয় তাই। তারপর তুমি ক্লান্ত হবে। এভাবেই সবকিছু শেষ হয়। একটা জরাজীর্ণ খাট। আজেবাজে জিনিসে ভরা একটা প্লাইউডের বাক্স। রাত্রিতে উড়ে চলা একটা গাড়ি।
সে একটা লেভেল ক্রসিং দেখতে পেল আর ভয়ে কেঁপে উঠল, যখন দেখল কীভাবে নেমে আসছে গেট, যখন দেখল সময়মতো থামতে পারবে না, যখন দেখল রেললাইনটা―যেখানে কী সুন্দরভাবে বাঁক নিচ্ছিল উজ্জ্বল একটা ট্রেন। চোখের পলকে, একটা দীর্ঘশ্বাস, সে অ্যাকসিলেটারটা চেপে ধরল গাড়ির মেঝেতে, আর তখন ট্রেনটা ঠিক সেখানে―ধোঁয়া ওগরাচ্ছে, গাঁক গাঁক করে গর্জন করছে। আচমকা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলে গেল ট্রেনটা, টায়ারের ঘসটানির শব্দ, ধাতুতে ধাতুতে ঘষা খাওয়ার কর্কশ আওয়াজ, বিগত আর আগামী সময়ের হিসহিসানি, হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন―যে কোনও কানের পর্দা ফাটিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট হট্টগোল―ছিন্নভিন্ন একটা দেহ, ঝনঝন শব্দ, গাঁক গাঁক আওয়াজ, ব্রেকের গোঙানি আর একটা গাড়ি―সবকিছু, গড়িয়ে এক হয়ে পিছলে পড়ছে পিচের রাস্তায়, একটা গাড়ি, শেষমেশ রাস্তার ধারে থেমেছিল। স্টিয়ারিং হাতে স্থাণু, হয়ে বসে সে শুনেছিল দূরে গর্জন করতে করতে যাচ্ছে ট্রেনটা।
আস্তে আস্তে দরজা খুলে সে গাড়ির বাইরে এল। পা দিয়ে স্পর্শ করল মাটি। টলতে টলতে রাস্তার ধারে এসে, মাথাটা পেছনের দিকে নিয়ে, লাফিয়ে পড়ল খানায়। বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। সারি সারি বড় বড় গাছ যেন লাফ দিয়ে নিজেদের গুঁড়ি থেকে আলাদা করছিল, সাঁতার কাটছিল, আকাশের দিকে উঠছিল, ভেসে বেড়াচ্ছিল মেঘের মতো, তুমি শুনতে পাবে কীভাবে হট্টগোল করছিল গাছগুলোর মোটা মোটা সব ডালপালা, কেমন করে নিঃশ্বাসের আওয়াজ তুলছিল তাদের পাতা, কীভাবে পাতা থেকে পিছলে পড়ছিল জল, কেমন করে ঝড়ে পড়ছিল পাতা, তুমি শুনতে পাবে অন্য সব জলবিন্দুর সঙ্গে মিশে গিয়ে তোমার পায়ের নিচে বগ বগ করছে জলের ধারা; কীভাবে মাটি পান করছে ওপরে সব জল ধারা, আর কীভাবে আগামী দিনের ঘাসগুলোকে দিচ্ছে নতুন জীবন। সে পুরোনো গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরল, আকাশের দিকে তাকাল, জলের শব্দ শুনল, অনুভব করার চেষ্টা করল ঐ গাড়ির বাইরে কী আছে, আকাশের বাইরে, জলের বাইরে, একজনকে ছাড়া আরেকজনের না থাকতে পারার বাইরে। সেটা কী যা আমাদের নেই, যা ছাড়া আমরা কোনওমতেও বাঁচতে পারি না ? তাই সুতোর শেষটা খোঁজার পালা আবার শুরু হবে। এটা একটা অন্ধকার কুয়োয় মাছ ধরার মতো, কারণ, সেই জিনিসটা অবশেষে যাকে তুমি বাল্ব বলো সেটা আদপেই একটা বাল্ব নয়, আদপেই নয়। আবার সবকিছু প্রথম থেকে শুরু হচ্ছে, আর এভাবেই আবারও, প্রত্যেক দিন।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



