অনুবাদ গল্পআর্কাইভবিশ্বসাহিত্য

ডেলিভারি : মূল : ঝুম্পা লাহিড়ী

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প

বাংলা অনুবাদ : এলহাম হোসেন

ম্যাডাম যখন অবকাশ যাপনের জন্য বাইরে ছিলেন তখন বিদেশ থেকে ডাকযোগে তাঁর ঠিকানায় একটি প্যাকেট এল। তবে এর ডেলিভারি ফি পরিশোধ করা ছিল না। ডেলিভারি ফি না দেওয়ার কারণে ডাকহরকরা দারোয়ানের কাছে একটা বার্তা দিয়ে প্যাকেটটি ফেরত নিয়ে চলে গেল। বার্তায় বলা হলোÑপ্যাকেটটি পোস্ট অফিসে সংরক্ষণ করা হবে। একদিন গাছে পানি দেওয়ার সময় পোস্টকার্ডের মতো দেখতে কাগজের টুকরোটি সরিয়ে রাখলাম। বিলের কাগজপত্র ও অন্যান্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজের সঙ্গে বইয়ের তাকে রাখলাম।

ম্যাডাম অবশ্য এখন গ্রামে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। মাসের শেষে ফিরবেন। গরমের তেজ কমে গেলে।

কিন্তু সপ্তাহখানেক বাদে ফোন দিয়ে জানালেন, তিনি ইতিমধ্যে শহরে ফিরেছেন।

বললেন, অন্ধকারে লনে হাঁটার সময় তিনি একটি গর্তে পড়ে পা মচকান। তাঁর ধারণা, ওটা কোনও একটা প্রাণির গর্ত ছিল। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ডিনারে আসা অতিথিদের মধ্যে একজন ছিলেন ডাক্তার । তিনি বলেছেন, তাঁর পা স্ক্যান করার জন্য তাঁকে শহরে থাকতে হবে। ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন। উনি গাড়ি চালাতে পারেন না। তাই যে পরিবার ডিনারের আয়োজন করেছিল সেই পরিবারের এক ছেলে তাঁকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেয়। ওখান থেকে সোজা তিনি গ্রামে চলে যান।

সত্য কথা বলতে কি, ব্যাপারটি ছিল তাঁর জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। আমি যখন তাঁর স্যুটকেস খুললাম তখন তিনি বললেন, ‘ঘুমটা ছিল ভয়ঙ্কর রে বাবা। ঘুমের মধ্যে দেখলাম দুনিয়ার সব দুঃস্বপ্ন। প্রতিদিন রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে যেত। এরপর আর ঘুম আসত না।’ তবে আমার মনে হয় না যে, ফিরে এসে তিনি খুশি হয়েছেন। সব সময় বিষণ্ন মনে তাকে সোফায় বসে থাকতে দেখতাম। উপর তলায় তাঁর ঘর। ঠিকমতো পা ফেলতে পারতেন না। ওখানে ঘুমাতে যেতে পারতেন না। ওই ঘরটা তাঁর ছোট্ট একটা আস্তানা বটে। চারপাশে কাপড়চোপড় আর অলংকারে ঠাসা। রঙিন সব পুঁতির মালা ঠাসাঠাসি করে দেয়াল থেকে ঝুলছে। মোটা মোটা চকচকে সব চুড়ি তাকে থরে থরে সাজানো।

ম্যাডাম পেশায় একজন স্থপতি। তাঁর চোয়ালের উপরের চামড়া শুকনো ডুমুরের মতো কুচকে গেলেও আদতে তিনি ততটা বয়স্ক নন। বাড়ি থেকে কাজ করতে পছন্দ করেন। তবে তিনি একজন কর্মঠ নারী। প্রায়ই ডিনারের আয়োজন করেন। ডজনখানেকের বেশি লোককে দাওয়াত দেন। প্রায়ই এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ান। আমি সপ্তাহে অল্প কয়েকবার এসে তাঁর কাপড় ইস্ত্রি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করি।

তিনি আমার গ্রামে কয়েকবার গেছেন। ফলে, তাঁর সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যে বাক্যালাপ হয়েছে। শীতে বেড়াতে যান সমুদ্র সৈকত লাগোয়া শহরে, যা আমি কখনওই দেখিনি।

প্রায়ই মন্দির দেখতে যান। শরীরে জমে থাকা সব বিষ বের করে ফেলেন। অদ্ভুত তাঁর খাদ্যাভ্যাস। উদাহরণস্বরূপ, একবার তাঁকে প্রচুর লেবুর রস খেতে হয়েছিল।

ফিরে আসার পর দেখা গেল তাঁর গায়ের চামড়া তামাটে হয়ে গেছে। শরীর শুকিয়ে গেছে। তবে তিনি আগের চেয়ে বেশি কর্মঠ। আমাকে বললেন, তিনি কাপড়-চোপড় বেশ পছন্দ করেন। ইমারতগুলোর রংও তাঁর ভালো লাগে। আর ভালো লাগে নারীদের হাঁটার ভঙ্গি। মোবাইল ফোনে তিনি আমাকে লাল রং করা রাস্তা আর সাদা বালুময় সমুদ্র সৈকতের ছবি দেখান।

ম্যাডাম একাই থাকেন। একসময় অন্য একটা ফ্ল্যাটে স্বামী আর দুই বাচ্চাকে নিয়ে থাকতেন।

ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য লেখাপড়া করছে। আর মেয়েটা ছেলেবন্ধুর সঙ্গে চলে গেছে। ওরা উভয়ে অন্য একটা দেশে থাকে।

ওদের বাবা একজন লেখাপড়া জানা লোক। মাঝে মাঝে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে কথা বলেন। ওদের মেয়ের চাইতে মাত্র তিন বছরের বড় এক মহিলাকে বিয়ে করেছেন। ওই কথা অবশ্য তিনি নিজেই আমাকে বলেছেন।

ম্যাডাম এখন বাইরে যেতে পারেন না। পায়ের গোড়ালিটাকে বিশ্রাম দেন। তাই প্রতিদিন সকালে মনোহারী মালামাল নিয়ে এসে সারা দিন তাঁর সঙ্গে তাঁর বাড়িতেই থাকি।

ম্যাডাম সবসময় নিজের কাজ নিজে করেন। এখন যেহেতু তিনি সেরে উঠছেন, তাই বাড়ির আশেপাশের প্রকল্পগুলো নিয়ে নিজেই কাজ করছেন। তাঁকে সাহায্য করতে তেমন কিছু মনে হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, তিনি আমাকে বাক্স খুলে ওর ভেতরের জিনিসগুলো বিছানায় ছুড়ে দিতে বলেন। সোফায় ও মেঝেতেও। ফলে, তাঁর কিছু কাপড়-চোপড় আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে গেছি।

প্রথম প্রথম দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতাম। তাঁর সব কাপড়-চোপড়, স্কার্ট হাটু পর্যন্ত লম্বা। কিন্তু আমি আবার লম্বা পোশাক পরতে অভ্যস্ত। তবু তিনি জোরাজুরি করতেন। বলতেন, ‘মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখা তো অনেক হয়েছে। এখন খুব গরম। তোমার পা দুটোও বেশ। এখানে কেউ কিছু মনে করবে না। এগুলো পরলে তোমার বেশ ভালো লাগবে।’ একদিন আমার গুছিয়ে রাখা সব মেইল তিনি দেখতে চাইলেন। ওগুলো দেখতে দেখতে পোস্টঅফিসে রাখা প্যাকেটটি সম্বন্ধে অবহিত হলেন।

‘কে জানে এটা আবার কী ? সম্ভবত বই। অথবা আমার সন্তানদের কেউ একজন কিছু একটা পাঠিয়েছে। তুমি পোস্ট অফিস থেকে প্যাকেটটি নিয়ে আসবে।’

কার্ডে সাইন করে আমাকে অথোরাইজ করলেন।

খুব গরম পড়েছে। দিনের এই সময় হেঁটে ব্রিজ পার হয়ে যেতে মন চাইছিল না। সূর্যটা যেন আগুন বর্ষণ করছে। বাস ধরলাম। কিন্তু বাসটা আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিল। ড্রিল মেশিনের মতো এমন গগনবিদারী শব্দ করছিল যেন আমার পাঁজর ভেদ করে শব্দটি পার হয়ে যাচ্ছে।

বসে কোনও লাভ নেই। সিটগুলো অস্বস্তিকর। এত উঁচু যে, সিটে বসলে পা আর মেঝে স্পর্শ করে না। ভাবলেশহীন ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতেই বরং ভালো ঠেকলো।

তবে ম্যাডামের দেওয়া এই পলকা ডট স্কার্ট আমার পছন্দ হয়েছে। বড় বড় দুটো পকেট আর নরম ফেব্রিক্স। রংটা গাঢ় নীল। মধ্যে ছোট ছোট সাদা ফোটা। স্কুলজীবন থেকে এখন পর্যন্ত এমন পোশাক আমি পরিনি।

পোস্ট অফিস লোকে লোকারণ্য। একটা সিরিয়াল নম্বর নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

কাঠের চেয়ারগুলো একটা লম্বা দণ্ডের সঙ্গে আটকানো। তারপর সেগুলো মার্বেলের মেঝের ওপর স্থাপন করা হয়েছে।

জানালাগুলোর দিকে দেখলাম। স্ক্রিনটার দিকেও। সেখানে ক্ষণে ক্ষণে সিরিয়াল নম্বর পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তন হওয়ার সময় এক ধরনের ঝনঝন শব্দ হয়। তারপর নতুন নম্বরটি ঝলসে ওঠে।

সব কর্মচারী নারী। ওরা জানালাগুলোর ওপারে বসে আছেন। বিয়েবাড়িতে খালা, চাচি, ফুফুরা যেমন গল্পগুজব করে, তেমনি ওরাও একে অপরের সঙ্গে গালগল্পে লিপ্ত।

আর আমরা কয়েকজন দর্শক ওদের এই কীর্তি নীরবে দেখে যাচ্ছি। উপরের দিকে বেলকনির মতো একটি জায়গা রয়েছে। উচ্চপদস্থদের বসার জন্য। ভাঁজ করা কাচের দেয়ালে ঘেরা।

সবাই বলে, এই জায়গাটা আরও খারাপ হতে পারত। হৈ চৈ পূর্ণ জায়গা। তবে এখানে একটু হলেও ঠান্ডা আছে। আমার ঠিক পরের লোকটি সংবাদপত্র পড়ছেন। আড়চোখে সামনের পাতায় একটি ছবি দেখলাম। শিরোনাম পড়ে বুঝলাম―এটি আমার শহর লাগোয়া একটি গ্রাম থকে তোলা ছবি। ওখানে গ্রীষ্মকালে অনেক বৃষ্টি হয়। অথচ এখানে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয়নি। লোকজন বলাবলি করছে, সারা দিনরাত যে সুপেয় পানির সরবরাহ চলে, ওরা সেটি বন্ধ করে দেবে। ছবিতে এক সারি মৃতদেহ দেখা যাচ্ছে। ওগুলো সব শিশুর। ওরা সীমান্তের কাছে একটি নদী পার হচ্ছিল। তখন ডুবে গেছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, দুজন মা একটা বড় কাপড় দিয়ে দেহগুলো ঢেকে দিচ্ছেন। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লে তাদের শরীর উষ্ণ রাখার জন্য মায়েরা যেমন করে তাদের উষ্ণ কাপড়ে ঢেকে রাখে, ঠিক তেমন। আকাশের দিকে হা করে তাকিয়ে বাচ্চারা চিত হয়ে শুয়ে আছে। কিন্তু দেখলাম, ওদের মধ্যকার ছোট্ট একটা বাচ্চার মুখ বাম দিকে একটু ফেরানো। চোখ দুটো বন্ধ। যেন ঘুমের ঘোরে ঝিমোচ্ছে।

স্ক্রিনে আমার নম্বর আসার আগ পর্যন্ত আমাকে প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো। অবশেষে জানালার কাছে গেলাম। কিন্তু তারপরেও আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। কারণ, আমার সামনের মেয়েটি তখনও মহিলাটির সঙ্গে কথা বলছিল। তার আরও কয়েকটি প্রশ্ন ছিল। ওর স্বচ্ছ পোশাক ভেদ করে কালো ব্রা দেখা যাচ্ছিল। পা দুটোর পুরোই দেখা যাচ্ছিল। কাঁধ খোলা। চটি পরা। কিন্তু ম্যাডাম আমাকে যেমনটা বলেছেন, এখানে কেউ কিছু বলে না। একটা পাতলা ফিতা ওর কাঁধ থেকে নেমে এসেছে। কিন্তু বিষয়টিকে সে পাত্তা দেয় না। এটি ঠিক করার ব্যাপারে তাঁর কোনও ভ্রƒক্ষেপ নেই। জানালার ওপারে বসা মহিলার সঙ্গে সে কথা বলেই যাচ্ছিল। ওদের দুজনের যেন অনেক অনেক কথা বাকি রয়েছে। যেন ওরা বান্ধবী।

মেয়েটির সঙ্গে কথা বলার সময় মহিলাটি মুচকি হাসছিল। কিন্তু আমার পালা আসা মাত্রই মহিলার হাসি উবে গেল।

ম্যাডামের সাইন করা কার্ডটা বের করলাম। সঙ্গে আমার পরিচয়পত্র।

কিন্তু মহিলা বেশ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বলল, ‘প্যাকেটটি আর আমাদের কাছে নেই। ওটি ফেরত পাঠানো হয়েছে।’

হাতের আঙুলের স্পষ্ট ইশারা করে মহিলা বলল, নোটিশ পাঠানোর পর সাত কর্মদিবস পর্যন্ত প্যাকেট রাখার নিয়ম আছে।

‘কোথায় ফেরত পাঠানো হয়েছে ?’

‘জানি না।’

‘কে পাঠিয়েছিল ?’

‘আমার কোনও ধারণা নেই।’

‘এখন কী করব ?’

‘এখন লাইনে দাঁড়ানো পরের জনকে সাহায্য করুন। লাইন ছাড়ুন।’ খুব খারাপ লাগল। ভয় হচ্ছে, ম্যাডাম রাগ করেন কি না। বাইরে একটু আধটু বাতাস বইছে। হেঁটেই ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। ব্রিজ পার হওয়ার সময় আমার স্কার্ট মেঘের মতো যখন উড়ছিল, তখন দেখতে ভালোই লাগছিল।

নদীটার দিকে ভালো করে তাকানোর জন্য ব্রিজের ওপর থামলাম। যেমনটি আশা করেছিলাম নদীটি তার চাইতেও বেশি দ্রুত বয়ে চলেছে। সবুজ। সবুজ পাতার মতো। সবুজ গাছগুলো নদীটির তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আমার ঠিক কনুইয়ের পাশেই অনেকগুলো পিঁপড়ে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও ঝাঁক বেঁধে অবস্থান করছে। ওদের চাইতে অনেক বড় ও অনেক ভারী একটা মৃত মাছি ওরা পিঠে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের দৃঢ় সংকল্প আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করে।

সচরাচরের মতোই দেখলাম, এক তরুণ দম্পতি ধীরে ধীরে একে অপরকে চুমু দিচ্ছে। আশেপাশের কাউকে পাত্তাই দিচ্ছে না। ওদের জগতে ডুবে আছে। লোকটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর মহিলাটি আলতোভাবে বসে আছে। রেলিং-এর ওপর। বেশ সাহস করে। সামান্য ধাক্কা, এমনকি হালকা দমকা হাওয়াও ওকে একেবারে নীচে ফেলে দিতে পারে।

ব্রিজ পার হয়ে একটা পরিত্যক্ত গম্বুজাকৃতির ছাদের নীচ দিয়ে হেঁটে চলে গেলাম। ওখানে সব আগাছা জন্মেছে।

অনেকগুলো দোকানের পাশ দিয়ে গেলাম। ওগুলোতে বাইসাইকেল বিক্রি হয়। হঠাৎ বাইসাইকেল চালাতে মন চাইলো। যদিও জানি না, কীভাবে চালাতে হয়। কৈশোরে শিখেছিলাম। আমার ভাই আমাকে শিখিয়েছিল। আমরা বিশাল, ধূলিধূসরিত রাস্তা চষে বেড়ানোর জন্য বের হতাম। গালে বাতাস লাগার সেই স্মৃতি আজও মনে পড়ে। যাই হোক, ম্যাডামের বাড়ির দিকে হেঁটে চলেছি। ঠান্ডা, সবুজ ছায়া মাড়িয়ে। সুনসান রাস্তা। শুধু দু-একটি গাড়ি ছাড়া রাস্তায় আর তেমন কিছু নেই। ভাবলাম, প্যাকেটটা না পাওয়া দুঃখের বিষয়। এটি সংগ্রহ করতে যাওয়া উচিত। কিছুক্ষণ নানা ভাবনার সমুদ্রে ডুবে রইলাম। পেছনে মোটরসাইকেলের শব্দে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।

খুবই কাছে এসে পড়েছিল। আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম। মোটরসাইকেলটি যখন কাছে এল তখন একটা কণ্ঠ চিৎকার করে বলল, ‘যাও, যাও, ময়লা পা দুটো ধুয়ে এসো।’

মাথাটা ঘুরিয়েই এক সেকেন্ডের মধ্যেই ওদের দেখতে পেলাম। মোটরসাইকেলে দুটো ছেলে। হেলমেট পরা। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। এরপর কাঁধে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলাম। উপরের দিকে তাকিয়ে শুধু আকাশটাই দেখতে পেলাম।

গতবার যে সমুদ্রসৈকতে গিয়েছিলাম এবারও ঐ একই সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঐ একই মেয়েরা হয়তো এবারেও আড্ডা দিতে এসেছে। নখে নীল নেইলপলিশ এবং বাহুতে ট্যাটু আমার খারাপ লাগে না। সম্ভবত কয়েক মিনিট হাঁটি। আমাকে দেখে ওরা চমকে যাবে।

শহর থেকে বের হতে দু পাশে দেয়ালবিশিষ্ট রাস্তা বেছে নিলাম। লম্বা, পাতলা ফিতার মতো রাস্তা। প্রথমে পাহাড়ে উঠলাম, পরে আবার নীচের সৈকতে নেমে এলাম। এরপর গ্রামের মধ্য দিয়ে চলতে লাগলাম। বামে ছড়িয়ে থাকা সমুদ্র রেখে ভ্রমণ করা আনন্দের ব্যাপার। অতঃপর এমন এক রাস্তায় এসে পড়লাম যেটি এতটাই সমতল যে, ওখান থেকে দিগন্তরেখার অনেকখানি দেখা যায়। বড় বড় সফেদ মেঘ দিগন্তের কোলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মহাসড়কটির মসৃণ ও কালো রাস্তার পিচ দেখে মনে হচ্ছে একেবারে নতুন, ঝকঝকে। যেন আমরাই প্রথম এই রাস্তায় নেমেছি।

এক পর্যায়ে পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা শহরের পাশ দিয়ে গেলাম। মনে পড়ল, ছোটবেলায় আমার দাদা ঐ শহর নিয়ে আমাকে কিছু একটা বলেছিলেন। অনেক অনেক দিন আগে সমুদ্রটা শহরে এসে আছড়ে পড়েছিল। তখন অবশ্য এই রাস্তার অস্তিত্ব ছিল না।

সমুদ্র সৈকতে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল চারটা পার হয়ে গেল। বেশ গরম তখনও। সবকিছু যেন ঝলসে গেছে। লোকজন বলল, প্রায় এক শ দিনেরও বেশি হবে কোনও রকম বৃষ্টি হয় না। পার্কিংÑএর জায়গা ধূলিতে ঠাসা। আর ঝোপগুলো পোকামাকড়ে ঠাসা।

আমার বন্ধু মোটরবাইক পার্ক করল। দেখলাম, এক লোক হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে এদিকে এগিয়ে আসছেন। আরেকজন বসে আছেন হুইলচেয়ারে। সম্ভবত সে তার ভাই। চেহারার মিল আছে। কিন্তু হুইলচেয়ারে বসা লোকটির পা বিকৃত হয়ে গেছে। পাগুলো খুব ছোট ছোট। গোড়ার দিকে এসে বেশি ছোট হয়ে গেছে।

জুতা খুলে ফেলি। এবার শুধু পানিতেই নামতে চাই। কিন্তু আমার বন্ধুর হঠাৎ একজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তাকে সে আগে থেকেই চিনত। ওর সঙ্গে আমরা বারে গেলাম। ওখানে বসে কফির স্বাদ নিই। ওরা যখন গল্প করছিল তখন কিছু একটা আমাকে বিচলিত করল। পায়ের কাছে। নীচে তাকিয়ে দেখি পা দুটো পিঁপড়েয় ঢেকে গেছে। দ্রুত বেয়ে বেয়ে উপরের দিকে উঠে আসছে। এলোমেলো ভাবে। আমার বন্ধু কিছু একটা খেতে চাইল। কিন্তু আমার কোনও খিদে নেই। ও একটা স্যান্ডউইচ খেল আর এক বোতল পানি পান করল। একেবারে কোনওদিকে না তাকিয়ে থালায় দৃষ্টি নিবন্ধ করে সে খেয়ে নেয়। অবশেষে আমরা সমুদ্র সৈকতের দিকে গেলাম। আমার বন্ধু বালিতে দাঁড়িয়ে রইল। আমি নেমে গেলাম জলে। ও বলল, ওখানে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। তারপর মুখটা বালির মধ্যে গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। সূর্যটা উপরে জ¦লজ¦ল করছে।

জলের মধ্যে লোকজন গিজগিজ করছে। বাচ্চা-কাচ্চা, নারীরা একে অপরের সঙ্গে গল্পে লিপ্ত। সৈকতে এক বাবা বৃথাই তার সন্তানকে ডেকে চলেছেন। ‘ফেড, ফেডেরিকো, ফে-ডে-রি!’ চারপাশ থেকে মেঘ এসে আমায় ঘিরে ধরল। মনে হলো মেঘের টুকরোগুলো যেন টিলার ওপর বসে পড়েছে। এখানে পানি কিছুটা ঘোলা। তবে এতে ভিজলে সতেজ লাগে। আমার একটু আধটুু টেনশন হয়।

জলে ভেসে ভেসে সব লোককে দেখছি। সৈকতের অপর পারে  ক্লাবগুলো একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছে।

নীল স্বচ্ছ আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্তি পাই। জলে-নামা জনতার দিকে তাকিয়ে অবশ্য অতটা শান্তি পাই না। কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে উঠে পড়ি। তারপর হেঁটেই চলে যাই। দেখি, কেউ কেউ সূর্যস্নানরতদের মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে হাঁটছে। ওরা টুপি, তোয়ালে ও সুতির স্কার্ট বিক্রি করে। একটার পর একটা সৈকতে স্থাপন করা চেয়ারের কাছে যায়। যে মহিলারা ওখানে অর্ধঘুমে আচ্ছন্ন, তারা কিছুটা বিরক্ত হন। আবার জিনিসগুলোর ব্যাপারে কৌতূহলও প্রদর্শন করে।

লোকদের একজনের হাত থেকে একগাদা ছোট ছোট ব্যাগ ঝুলছে। মনে হয়, ওগুলো খালি। একটা গোলাকার রডের সঙ্গে হুক দিয়ে লাগানো। কাছে গিয়ে দেখলাম, পুরো হাতে ট্যাটু আঁকা। ঐ তো সেই মেয়ে। একই বন্ধুর সঙ্গে। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম। দেখলাম, ওরা সৈকতে বিছানো কম্বলে বসে আছে। ওর ব্যবসার পণ্য, পায়ের মোজা নিয়ে গল্প করছে। ফিসফিস করে। বিভিন্ন রংয়ের স্কার্ফ বিক্রি করে। প্রতিবার এক ডজনের কম নয়। ওগুলো নরম, পাতলা। এপার ওপার দেখা যায়। মেয়েরা ওর সঙ্গে গল্প করে। মুগ্ধ হয়। ভেবে পায় না, কী করবে। প্রলুব্ধ হয়।

লোকটি একই শহরের। আমার পরিবারের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো। এক সময় এটি রেললাইন ও জলপ্রবাহের খালের ধারে ছিল। এক সম্রাট এই খাল কাটেন।

ওদের নিজেদের মুদি দোকান রয়েছে। ওরা জানালায় সাইনবোর্ড লাগিয়ে রাখে। আমার পরিবারের লোকজন ঐ সাইনবোর্ডের ভাষা পড়তে পারে না। ওরা একটা জীর্ণ ভবনে খালি পায়ে প্রার্থনা করে। ওদের ছেলেমেয়ে খালটার ওপারে এক টুকরো মাঠে ফুটবল খেলে।

আমার বাবা-মা অভিযোগ করে বলেন, শীঘ্রই ওদের সংখ্যা আমাদেরকেও ছাড়িয়ে যাবে। ইতিমধ্যে আমার বন্ধুর বাবা-মা যে বারটি চালায় তা আর মুনাফা করতে পারছে না। তাদের অভিযোগ, ওপারের লোকজন এই বারে আসে না। এমনকি আমাদের কফিও পছন্দ করে না। সকালেও আসে না। লাঞ্চের পরও আসে না।

যে লোকটি ব্যাগ আর স্কার্ফ বিক্রি করে সে মেয়েদের নিয়ে ঘুরেফিরে বেড়ায়। মেয়েরা কেন ওকে চলে যেতে বলে না ?

কিছু একটা বলার ছিল। কিন্তু এখন আর আমার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছি না। মেয়েরা হাসছে, হো হো করে। ওয়ালেট থেকে টাকা বের করছে। এটা-সেটা কিনছে।

হাতে ট্যাটু করা মেয়েটি জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার নাম কি ?’

মেয়েটি একবারও আমার দিকে তাকায় না। আমার খুব ঘাম হয়। কাজেই, আবার জলে নেমে পড়ি। সূর্য ডুবতে শুরু করার আগ পর্যন্ত জলের মধ্যেই থাকি। সৈকতে থাকা সবার শরীর তখন সোনালি দেখায়। তল স্পর্শ করার জন্য কয়েকবার ডুব দিই। দেখার তেমন কিছু নেই। কিছু এবড়োথেবড়ো দেখতে মাছ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। ওগুলো ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। আর কিছু গুল্ম লতাপাতা।

আমার বন্ধু মোটরসাইকেল থেকে যে পিস্তলটি নদীতে ফেলে দিয়েছে ওটার মতো কোনওকিছুই তেমন উজ্জ্বল নয়।

ও দুবার গুলি চালায়। মেয়েটি মাটিতে পড়ে যায়। ওর লম্বা কালো চুলের বেণী আছে। উজ্জ্বল লাল বর্ণের চুলের গোছা। ও খাটো। একটা পলকা ডট স্কার্ট পরা।

বললাম, ‘ধুত্তারি, তুমি তো সত্যি সত্যিই ওকে গুলি করে দিলে।’

কিন্তু আমার বন্ধু কোনও উত্তর না দিয়ে হন হন করে চলে গেল। চিৎকার করে বললাম, ‘তুমি তো বলেছিলে কাউকে গুলি করবে না!’

আবার বলি, ‘ও তো একটা মেয়েমানুষ।’

আমার বন্ধু থেমে পিস্তলটা ঝাঁকায়। তারপর বলে, ‘ওদের শুধু ভয় দেখানোর জন্য এ কাজ করা। মেয়েটা মরবে না।’

কিন্তু এখন আমার সত্যি সত্যিই ভয় লাগছে। যে রাতে আমরা মাতালদের সঙ্গে মার্কার হাতে দেয়ালে বার্তা লিখছিলাম বা রাস্তার সাইনবোর্ডের পেছনে লিখছিলাম, সে-রাতেও আমার এতটা টেনশন হয়নি।

যখন সূর্য সমুদ্রের মধ্যে ডুবে যেতে থাকে, তখন নিরাপত্তাকর্মীরা পাশের সৈকতের ছাতাগুলো বন্ধ করতে থাকে। ওগুলো সব লাল বর্ণের। তরুণ নারীদের নিতম্ব পর্যন্ত লম্বা লাল চুলের গোছার আগায় ব্যান্ড পরানো। এই ব্যান্ডগুলো পরানোর পর যখন শক্ত করে বাঁধা হয়, তখন তার লম্বা বেণীর কথা মনে পড়ে। কিন্তু ও যখন হাঁটে তখন স্কার্টটা বাতাসে উড়ে এবং ওর কালো পা দুটো দেখা যায়।

আরও কিছুক্ষণ সাঁতার কাটি। তবে এখন শীত করছে। আমি একা আর পানিতে থাকতে চাই না। শুধু একজন লোক এখন সাঁতার কাটছে। ও সৈকত থেকে অনেক দূরে, জলের ভেতরে।

টেনশন করছিলাম, কেউ আমাদের সাইকেলের দোকানে দেখে ফেলে কি না। কেউ একজন আমাকে মেয়েটিকে চিৎকার করে ডাকতে দেখেছে কি না, তা নিয়ে খুব টেনশন হয়। তাকে কেউ অপমান করতে দেখেছে কি না, সেটি ভেবেও টেনশন হয়।

জল থেকে উঠে আসি। তোয়ালে নেই। যারা সৈকতে তোয়ালে বিক্রি করে তারা এতক্ষণে চলে গেছে।

ক্লান্ত লাগছে। তবে অন্যদের মতো ভালো লাগছে না। একটু রোদে দাঁড়িয়ে নিজেকে সেঁকে নিয়ে পার্কিং লটের দিকে চলে যাই। বাড়ি যাব বলে।

যখন পা শুকানোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন দমকা হাওয়ার শব্দ এসে কানের কাছে সাপের মতো হিস হিস করছিল।

আমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। বলল, ও একটু ঘুমিয়ে নিয়েছে। এখন রওনা দেবে। অভিযোগ করে বলে, রোদে তার কাঁধ দুটো একেবারে পুড়ে গেছে।

আমরা মোটরসাইকেলে চড়ে যখন শহরে ফিরছিলাম তখন দেখলাম, আমার বন্ধুরও গলার পেছনের অংশ রোদে একেবারে পুড়ে গেছে। আকাশে সাদা-কালো মেঘের হুড়োহুড়ি। বিশাল বিশাল মেঘের ফালি। মেঘের ফালিগুলো নীচে নেমে এসেছে এমনভাবে যেন দিগন্তে আগুন লেগেছে এবং সেখান থেকে ধোঁয়া উঠছে। মোটরসাইকেলে ছুটছি। ঠাণ্ডা বাতাসের স্রোত এসে মুখমন্ডলে আছড়ে পড়ছে।

পুলিশের গাড়ি দেখার পর আমার বন্ধু মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে দেয়। সহজাতভাবে আমি পেছন ফিরে তাকাই।

কেউ আমাদের আটকায় না। সম্ভবত সামনে ওরা অন্য কাউকে ধাওয়া করছে। মাথার উপরের আকাশ পান্ডু রং ধারণ করেছে। আর বাঁকা চাঁদটা তো সারাটা দিনই আমাদের সঙ্গ দিয়েছে।

হাসপাতালে সবাই আমাকে বলল, ওকে দশ মিটার দূর থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে। তারপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পাশ দিয়ে যাওয়া এক মোটরসাইকেল আরোহী অ্যাম্বুলেন্স ডাকে।

জরুরি সেবাদানকক্ষে ওরা আমাকে চিকিৎসা দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়নি। ওরা বুলেট পেয়েছে। হাসপাতালের লোকজন বলল, ঐ বুলেটগুলো ছোড়া হয়েছে এয়ারগান থেকে। দুটো এক্সরে করে দেখা গেল বুলেটগুলো আমার শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালের লোকজন আমাকে ছেড়ে দেয়। বুলেটগুলো দেখতে রাতের বেলা পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে কোনও শহরের দিকে তাকালে যেমন দেখায়, তেমন। ম্যাডামের স্কার্টের ছোট ছোট ফোটার মতো দেখাচ্ছিল।

ম্যাডামের মতো আমাকেও এখন দ্রুত সেরে উঠতে হবে। আর একটু ভালো বোধ না করলে তাঁর কাজকর্মগুলো করতে পারব না। সেরে ওঠার জন্য যতটুকু সময় দরকার, তা উনি নিতে বললেন। সত্য কথা বলতে কি, আমার তাঁর বাড়িতে বেশি একটা থাকতে হলো না। ওখানে হয়তো সেই বিকেলের কথা ভাবতে হতো যখন আমি পোস্ট অফিসে গিয়ে ম্যাডামকে পাঠানো প্যাকেটের খোঁজ করেছিলাম। অথচ প্যাকেট ইতিমধ্যে প্রেরকের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

আমার এক খালাতো বোন ম্যাডামকে সাহায্য করছে। আমি এখন আমার আরেক কাজিনের দোকানে কাজ করছি। রাত দুটো পর্যন্ত বিয়ারের বোতল, শস্য, জলের কেস, টয়লেট পেপার বিক্রি করতে হয়। ক্যাশ রেজিস্টার দেখতে হয়। ধীরস্থির হয়ে যতক্ষণ বসি ততক্ষণ এ কাজ করতে পারি।

আমার কাজিন বলে, আমি সৌভাগ্যবান কারণ, যে ধরনের ক্ষত আমার হয়েছে, তা সাধারণত সারে না। সে একজনকে চেনে যাকে বাসস্টপে অপেক্ষারত অবস্থায় পেটানো হয় এবং ফলে সে তার একটি চোখ হারায়।

ও আমাকে থানায় মামলা করতে নিরুৎসাহিত করে। তার মতে, পুলিশের আশেপাশে না যাওয়াই ভালো।

ওদের বয়স কম বলে আমি মেনে নিলাম। সম্ভবত ওরা আমাদের বন্ধু। ওদের এর চাইতে অধিকতর ভালো কিছু করার নেই।

ওরা কিশোর। রাত এগারোটায় দোকানে গিয়ে বিয়ার কেনে, আর কোনও একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানে।

এই বাচ্চারা আমাকে ভাবায় না। ওরা অনেক রাত পর্যন্ত গল্পগুজব করে। দোকানের বাইরের সিঁড়িতে বসে বা পার্ক করে রাখা কোনও গাড়িতে হেলান দিয়ে। ওরা সেইসব বিড়াল বা পোকামাকড়ের মতো, যেগুলো শুধু রাতের বেলা বেরিয়ে আসে। রাস্তার পাশ দখল করে উপনিবেশ স্থাপন করে। প্রেমার্ত হৃদয়ে ওরা অন্ধকারে ঘুরঘুর করে। ওদের কথাবার্তা আমি শুনি। গোপন ফিস ফিস শব্দ আমার কানে আসে। কিন্তু গোটা পৃথিবী আমার কাছে তালগোল পাকিয়ে ফেলে।

মাঝে মাঝে ওরা হাসে। সেটিও আমার কানে আসে। ইঁচড়ে পাকা সব আশা-আকাক্সক্ষার আস্ফালনের শব্দও শুনি। ওগুলো আকাশছোঁয়া। ভিত্তিহীন।

ওদের বয়সে কমবেশি আমি ওই কাজগুলোই করতাম। স্কুলের পর বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তার নির্দিষ্ট একটি স্থানে সমবেত হতাম। ওসব স্থানে ছাত্ররা সাধারণত সমবেত হয়।

আমরা নিজেরা ঠাট্টা-মশকরা করতাম। কিছু খেতাম। এক অস্থিচর্মসার ছেলের কথা আমার মনে পড়ে। ও তখন কলেজে পড়ে। পদার্থবিদ্যার ছাত্র। চোখের ইশারায় আমাকে আলাদা করতে পারত। ও আমাকে কী একটা পানীয় কিনে দিয়েছিল। কিন্তু আমি সে জগৎটিকে পেছনে ফেলে চলে এসেছি। কারণ, আমি জীবনে আরও কিছু করতে চাই। এখানে স্বেচ্ছায় এসেছিলাম। মাঝে মাঝে বিশেষ বিশেষ রকমের চেহারার মানুষ দেখি। ঠোঁটগুলো ফ্যাকাশে, উজ্জ্বল ত্বক। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় মুখগুলো জ¦লজ¦ল করে।

মধ্যরাতের পর কয়েক ঘণ্টার জন্য এই শহরটাকে শুধুই তরুণদের শহর মনে হয়। আনন্দনগরী। সব দিক থেকে ক্ষণস্থায়ী।

এদের মধ্যে কয়েকটা বাচ্চাও দেখা যায়। ওদের চেহারা আলাদা। আমার মতো শ্যামবর্ণের। ওদের মধ্যকার এক অদ্ভুত ঐক্য ওদের একত্র করে। নিশাচরদের কুকর্মের শাগরেদ ওরা। সবার চোখে-মুখে একই চাহনি।

ওরা একে অপরের সঙ্গে খোশগল্প করে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। আবার সব জায়গা থেকে এসে একত্র হয়। দেখতে ভালোই লাগে। ওরা কখনও জানবেই না যে, ওদের উপস্থিতি আমাকে প্রশান্তি দেয়। আবার একই সঙ্গে মনের গভীরে একটা বেদনা অনুভব করি। যেন একটা বুলেট আমার হৃৎপিণ্ডের ভেতরে এখনও রয়ে গেছে। ঈর্ষায় প্রায় মরে যাই।

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button