শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু : মানবর্দ্ধন পাল

ভাষা-গবেষণা ধারাবাহিক

দ্বিতীয় পর্ব

[প্রাচীন ভারতীয় আলংকারিকেরা শব্দকে ‘ব্রহ্ম’ জ্ঞান করেছেন―শব্দ যেন ঈশ্বরতুল্য। পাশ্চাত্যের মালার্মেসহ নন্দনতাত্ত্বিক কাব্য-সমালোচকদেরও বিশ্বাস, শব্দই কবিতা। যা-ই হোক, শব্দের মাহাত্ম্য বহুবর্ণিল ও বহুমাত্রিক। বাংলা ভাষার বৃহদায়তন অভিধানগুলোর পাতায় দৃষ্টি দিলেই তা প্রতিভাত হয়। আগুনের যেমন আছে অসংখ্য গুণ তেমনই ভাষার প্রায় প্রতিটি শব্দেরও আছে অজস্র অর্থের সম্ভার। কালস্রোতে ও জীবনের প্রয়োজনে জীবন্ত ভাষায় আসে নতুন শব্দ, তা বিবর্তিতও হয়। পুরোনো শব্দ অচল মুদ্রার মতো ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে মনি-কাঞ্চনরূপে ঠাঁই নেয় অভিধানের সিন্দুকে।

বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার সমুদ্রসম―মধুসূদনের ভাষায় : ‘ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন’। বৈঠকি মেজাজে, সরস আড্ডার ভঙ্গিতে লেখা, এই ‘শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু’। ব্যক্তিক ও নৈর্ব্যক্তিক―সবকিছু মিলিয়ে শব্দের ভেতর ও বাইরের সৌন্দর্য-সৌগন্ধ এবং অন্তর্গত আনন্দধারার ছিটেফোঁটা ভাষিকরূপ এই ‘শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু’ ধারাবাহিক।]

সাত

সাত একটি সংখ্যা―সংখ্যাবাচক শব্দ। সংস্কৃত ‘সপ্ত’ থেকে তদ্ভব শব্দ সাত। এই সাত সংখ্যাটি অন্য অনেক সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়। গাণিতিক বিবেচনায় যা-ই হোক, সাত সংখ্যাটি বাঙালির ধর্ম, ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ-মনস্তত্ত্বের অনেকাংশ জুড়ে আছে। পৃথিবীর ইতিহাসেও সাত সংখ্যাটির জয়জয়কার।

সবারই জানা, পৃথিবীতে মহাদেশের সংখ্যা সাতটি―এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এন্টার্কটিকা। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে কত রাক্ষস-খোক্কসের গল্পই-না ছোটবেলায় শুনেছি দাদু-দিদার কাছ থেকে! তা ছাড়া, পৃথিবীতে আছে প্রাচীনকালের সাতটি আশ্চর্য বস্তু। ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান, চীনের প্রাচীর এবং ভারতের তাজমহল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঢাকার মোহাম্মদপুরে ঐতিহাসিক সাত গম্বুজ মসজিদের কথা এদেশে কে না-জানেন? আর কবি ফররুখ আহমদের সাত সাগরের মাঝি নামে একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থও আছে। বিশ্বসাহিত্যের খ্যাতিমান কয়েকজন লেখককে নিয়ে লেখা আবদুল মান্নান সৈয়দের একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত। মনে পড়ছে পদ্মাপুরাণের কথা। সর্পকুলের দেবী মনসার সঙ্গে চরম বৈরিতা ছিল চাঁদ সওদাগরের। বাণিজ্যের জন্য তার ছিল সাতটি বড় নৌযান। এর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্টটির নাম ‘মধুকর’। বলা হয় ‘সপ্তডিঙা মধুকর’। এখানেও সাত সংখ্যার প্রভাব।

হাসি-কান্নার অনুভূতি প্রকাশের প্রক্রিয়া যেমন মানবজাতির মধ্যে একরকম, তেমনই সুরের ভাষাও এক। সংগীতের ভাষায় আছে সাতটি মৌলিক সুরের প্রকাশ―সা (সরভ), রে (ঋষভ), গা (গান্ধার), মা (মধ্যমা), পা (পঞ্চম), ধা (ধৈবত), নি (নিষাদ)। এই সাতটি সুরের সাতটি পাখি নিয়তই ডাকাডাকি করে আমাদের মনের দুয়ারে! সুরের সাম্রাজ্যে এই সপ্তসুর সংগীত-সংস্কৃতির ভিত্তি। সপ্তসুর ও সংগীতের কথা উঠলেই মনে পড়ে ভাইবোনের সম্প্রীতিময় পুরোনো দিনের সেই গানটির কথা―‘সাত ভাই চম্পা জাগোরে/কেন বোন পারুল ডাকো রে’।

‘কাণ্ড’ শব্দটির অন্যতম অর্থ―অংশ, ভাগ, পরিচ্ছেদ, পর্ব। ভারতবর্ষের প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণের আছে সাতটি অংশ। তাই বলা হয় সপ্তকাণ্ড রামায়ণ। প্রাচীনকালেও সম্ভবত জাতীয়ভাবে শোকপ্রকাশের জন্য সাত দিন নির্ধারণ করা হতো। তা-ই লক্ষ্য করা যায়, মধুসূদনের মেঘনাদবধ মহাকাব্যে রাম-রাবণের যুদ্ধে রাবণের বীরপুত্র মেঘনাদের মৃত্যু হলে লঙ্কাপুরীতে সপ্তাহব্যাপী শোক ঘোষণা করা হয়েছেল। মাইকেল মধুসূদন লিখেছেন, ‘সপ্তদিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে।’ ইসলাম ধর্মেও সাত আসমান, সাত জমিন এবং সাত সালামের কথা আছে।

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষার রক্তাক্ত বর্ণমালা কথা বললেও সাত সংখ্যাটিও উঁকি দেয়। আমাদের স্বরধ্বনি এগারোটি হলেও মৌলিক স্বরধ্বনি সাতটি―অ আ ই উ এ ও এবং অ্যা। এই মৌলিক স্বরগুলোই স্বরধ্বনির প্রাণ। বাংলা ব্যাকরণে সমাসের নিয়মে ‘সেতার’ মানে তিন তারের সমাহার বা তিন তার আছে যার। তবে ব্যাকরণ যা-ই বলুক, সেতারে কিন্তু সাতটি তার―তিনটি নয়!

মহাকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডলের কথা তো আমরা সবাই জানি! মেঘমুক্ত সন্ধ্যার শুক্লপক্ষের আকাশে শৈশবকালে কী অবাক-বিস্ময়ে চেয়ে থাকা প্রশ্নবোধক চিহ্নটির মতো সাতটি উজ্জ্বল তারার দিকে! দ্বিতীয় শতকে জ্যোতির্বিদ টলেমি আবিষ্কার করেছিলেন এই সপ্তর্ষিমণ্ডল―যা আটচল্লিশটি তারকামণ্ডলের অন্যতম। ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা উজ্জ্বল এই সাতটি নক্ষত্রের নাম রেখেছেন প্রাচীনকালের সাতজন ঋষির নামে। এঁরা হলেন―ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য, অঙ্গিরা, অত্রি, বশিষ্ঠ, মরীচ।

বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীতে মৌলিক রঙের সংখ্যাও সাতটি―বেগুনি, নীল, আকাশি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল। যাদের সংক্ষেপে বলা হয় ‘বেনীসহকলা’। এখানেও সাত সংখ্যাটির প্রাধান্য! এগুলোর একটির সঙ্গে অন্যটির পরিমিত মিশ্রণের ফলেই সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর অযুত রঙের মেলা। মনে হয়, পুরানো দিনের সেই গানটির কথা―‘সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে না-পাই/জানি না তো কেমন করে কী দিয়ে সাজাই।’

বাঙালির ভোজনবিলাসিতা সর্বজনবিদিত। পঞ্চব্যঞ্জনের পরে আসে সপ্তব্যঞ্জনের কথা। বাঙালি খেতে যেমন ভালোবাসে তেমনই খাওয়াতেও। ভূরিভোজন, আকণ্ঠভোজন, নাক ডুবিয়ে খাওয়া, কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া―এসব তো সপ্তব্যঞ্জন দিয়েই সম্ভব। আর এই ভূরিভোজন অধিকাংশই হয় সাত পাকে বাঁধার সময়। বাঙালি হিন্দুদের বিয়ের অন্যতম আনুষ্ঠানিকতা হলো―বরকে ঘিরে বধূর সাত পাকের বন্ধন। তাই বাঙালির রসনাবিলাসেও সাত সংখ্যাটির গুরুত্ব কম নয়! সাত পাকের বন্ধন ও সপ্তব্যঞ্জনের সমাহার একসূত্রে গাঁথা।

একটু ঘুরে আসি বাংলা বাগধারার রাজ্যে। আমাদের মাতৃভাষার প্রবাদ-প্রবচন এবং বাগধারায়ও সাত সংখ্যাটির সমুজ্জ্বল উপস্থিতি। সাতকথা শুনানো (কটুকথা বলা)। সপ্তকাণ্ড রামায়ণ (মস্তবড়ো ব্যাপার)। সাতকাহন (প্রচুর পরিমাণ)। সাতখানা করে লাগানো (অতিরঞ্জন করা)। সাতখুন মাফ (বড় অন্যায় করে অব্যাহতি)। সাত ঘাটের জল খাওয়া (নানা স্থানে ঘুরে বেড়ানো বা নানাভাবে অপদস্থ হওয়া)। সাত চড়ে রা নেই (সমস্ত পীড়ন-অত্যাচার নীরবে সহ্য করা)। সাত তাড়াতাড়ি (খুব দ্রুত)। সাতপাঁচ (নানা ঝামেলার বিষয়)। সাত পুরুষের ভিটা (পূর্বপুরুষের আবাসস্থল)। সাত রাজার ধন (অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস)। সাত-সকাল (ভোরবেলা)। সাত-সতেরো (নানারকম জিনিসপত্র)। সাতেপাঁচে না-থাকা (কোনও ঝামেলায় না-জড়ানো)।

তাই লক্ষ্য করা, নানাবিধ ভাবপ্রকাশে এবং বাকচাতুর্যে সাত সংখ্যাটি কতভাবেই-না জড়িয়ে আছে আমাদের মাতৃভাষায় এবং জীবনযাপনে। ইংরেজি ভাষায় সেভেন―যাকে বলা হয় ‘লাকি সেভেন’―তার কথা না হয় বারান্তরে লিখব। তবে বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট বা ঐতিহাসিক মাইলফলক সাত মার্চের কথা যদি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ না-করি তবে তো সবই ব্যর্থ এবং এ লেখাও ছাইভস্ম। বায়ান্নর একুশে যদি বাংলাদেশের ভ্রুণ হয় তবে সাত মার্চ, জন্মদিন না-হলেও, বাংলাদেশের প্রসববেদনার দিন।

কাল

‘বিষাদবিন্দু আনন্দসিন্ধু’র এ পর্বের শিরোনাম ‘কালো’ নয় ‘কাল’। অর্থাৎ এর উচ্চারণ ও-কার মাত্রিক স্বরান্ত নয়―ব্যঞ্জনান্ত। এই ‘কাল’ শব্দটিও আমাদের মাতৃভাষায় বহুমাত্রিক অর্থ ধারণ করে। কালের সাধারণ অর্থ ‘সময়’―আমরা সবাই জানি। তাই রবীন্দ্রনাথের গানে পাই : ‘দুই হাতে―কালের মন্দিরা-যে সদাই বাজে, ডাইনে-বাঁয়ে দুই হাতে…’ কিংবা কবিতায় বলেছেন : ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?’ অথবা ‘যায় যদি লুপ্ত হয়ে, থাকে শুধু থাক একবিন্দু নয়নের জল/কালের কপোল তলে শুভ্রসমুজ্জ্বল তাজমহল।’ যখন বলা হয়, লোকটির তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে তখন আমরা বুঝি―শৈশব, যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব কাটিয়ে তিনি বার্ধক্যে উপনীত। এসবই কালের পরিক্রমণ এবং সময়ের প্রবহমান গতিধারা।

পৃথিবীর সব ভাষার ব্যাকরণে কালের এই অন্তহীন প্রবহমান গতিধারাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে―অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ―এসবও আমরা জানি। এরও আছে বারোটি উপবিভাগ―তাও আমাদের অজানা নয়। কিন্তু এই ‘কাল’ শব্দটিরও-যে কত কারিগরি, কারিশমা ও অর্থের রূপ-রূপান্তর তা আমাদের বিস্ময় জাগায়। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একবার ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন, “বাংলা ভাষার মজাটাই এখানে যে, ‘আসছি’ বলে নিশ্চিন্তে চলে যাওয়া যায়।” এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনেক শব্দের মধ্যেই লক্ষ করা যায়। যদি বলি―সে কাল এসেছিল আবার কাল আসবে। তখন কিন্তু নিকট অতীত এবং নিকট ভবিষ্যৎ দিনটির কথাই বোঝায়। আবার শব্দটিতে সপ্তমী বিভক্তি যুক্ত করে দ্বিত্ব করলে সুদীর্ঘ সময়ের ব্যাপ্তি বোঝায়। যেমন নজরুলের কবিতায় আছে : ‘দিনেদিনে শুধু বাড়িতেছে দেনা শোধিতে হইবে ঋণ।’

এই ‘কাল’ শব্দটির সামনে-পেছনে নানা শব্দ যুক্ত করে অনেক নতুন শব্দ তৈরি করা যায়। এর ফলে অর্থপ্রকাশেও ঘটে বিচিত্রবিধ ভিন্নতা এবং রূপরূপান্তর! অর্থের পরিবর্তনে শব্দের নতুন জন্মান্তর হয়। কয়েকটি উদাহরণই দিই :

কালগ্রাস (মৃত্যুর মুখে পড়া)।

কালঘাম (অত্যধিক পরিশ্রমে প্রাণান্তকর অবস্থা)।

কালঘুম (যে-ঘুম ভাঙে না, মৃত্যু)।

কালপেঁচা (অশুভ পেঁচার ডাক)।

কালবৈশাখী (চৈত্রমাসের বৈকালিক ঝড়)।

কালসিটে (আঘাতের কালো দাগ)।

কালনেমি (রাবণের চক্রান্তকারী মামা)।

কালকুণ্ঠ (যম, মৃত্যুদূত)।

কালকূট (যা জীবনীশক্তি নষ্ট করে, তীব্র বিষ, গরল)।

কালকেতু (শাপভ্রষ্ট ইন্দ্রপুত্র নীলাম্বর, পুরাণে বর্ণিত ব্যাধপুত্র)।

কালগঙ্গা (কালিন্দী নদী, যমুনা)।

কালচক্র (সময়ের অনন্ত আবর্তন)।

কালচিহ্ন (মৃত্যুর লক্ষণ)।

কালচিন্তক (যে সময়ের শুভাশুভ চিন্তা করে, জ্যোতির্বিদ)।

কালভৈরব (কালরূপী যে ভৈরব, শিব)।

কালপাশ (মৃত্যুর বন্ধন)।

কালপুরুষ (যমরাজের ভৃত্য)।

কালবেলা (অশুভ সময়, জ্যোতির্বিদদের মতে সপ্তাহের প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় অশুভ থাকে)।

কালসাপ, কালনাগিনী, কালভুজঙ্গ ইত্যাদি শব্দের অর্থ জীবনঘাতী ছোট্ট বিষধর সাপ। পদ্মাপুরাণ বা মনসামঙ্গলে যে সাপের দংশনে বাসরঘরে লক্ষ্মীন্দরের মৃত্যু হয়েছিল।

এই ‘কাল’ শব্দটি বুকে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যে বেশ কিছু চমৎকার বই আছে। শব্দটি মনে হলেই করোটিতে বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়ে যায় তারাশঙ্করের নদীভিত্তিক উপন্যাস কালিন্দী এবং শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুপ্তবংশ নিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস কালের মন্দিরার কথা। সমরেশ মজুমদারের কালবেলা। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কালকেতু উপাখ্যান সকলে না-পড়লেও বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই পড়েছেন। কালকেতু ছিলেন স্বর্গভ্রষ্ট নীলাম্বর, যিনি চণ্ডীদেবীর ষড়যন্ত্রে ও মহাদেবের অভিশাপে মর্ত্যলোকে ধর্মকেতুর ঘরে ব্যাধরূপে জন্মেছিলেন। আনিসুজ্জামানের আত্মস্মৃতিমূলক বইটির নাম কাল নিরবধি আর যতীন সরকারের একটি প্রবন্ধগ্রন্থের নাম কালের কপোল তলে। কবি শামসুর রাহমানের স্মৃতিকথাটির নাম কালের ধুলোয় লেখা। আল মাহমুদের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম কালের কলস। এখন কালের কণ্ঠ ও সমকাল নামে দুটি বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা তো আছেই―বিগত ষাটের দশকে কবি সিকান্দর আবুজাফরের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো বিখ্যাত সাহিত্য-মাসিক ‘সমকাল’।

কাল নিয়ে যত কথাই বলি, কালরাত্রির কথা না-বলা পর্যন্ত কথা যেমন ফুরোবে না, নটেগাছটিও মুরোবে না! কালরাত বা কালরাত্রি অশুভ রাত, করাল রাত, মৃত্যুমথিত রাত, বিভীষিকাময় রাত, যে রাতে মৃত্যু ঘটে ইত্যাদি। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বিয়ের রাত থেকে তৃতীয় রাতটি এখনও ‘কালরাত্রি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেদিন বরকনেকে আলাদা রাখা হয়―একে অপরের মুখদর্শন করাও নিষিদ্ধ। মনসামঙ্গলে বাসররাতে চাঁদ সওদাগরের পুত্র লক্ষ্মীন্দরকে সর্পদংশনের ঘটনার আলোকেই এই সংস্কার আবহমান কাল ধরে প্রচলিত। তবে একালের বাঙালির জীবনে কালরাত্রির তাৎপর্য সম্পূর্ণ অন্যরকম। তা ব্যক্তিক বা সামাজিক নয়―জাতীয় বা রাষ্ট্রিক। আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারায় স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বলগ্নে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে বর্বর পাকবাহিনী এদেশে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করেছিল। সেই হত্যাযজ্ঞের রাতটিকেই আমরা বলি ‘কালরাত’। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন গণহত্যার রাত। তাই জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে আমাদের দাবি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো পঁচিশে মার্চ তারিখটিকেও আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের মর্যাদা দেওয়া হোক। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ সূচনার পূর্বলগ্নে কালরাত্রির গণহত্যার ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে এক মহা কলঙ্কতিলক।

পদ

পদের যৎসামান্য পদাবলি বর্ণনা করাই এ লেখার উদ্দেশ্য। অবশ্য পদের কথা লিখতে গেলে দ্বিপদ প্রাণী হিসেবে আপদ-বিপদ দুই-ই আছে। চতুষ্পদ বা ষটপদের সেই আশংকা নেই। বহু অর্থের মধ্যে পদের সুপ্রচলিত অর্থ পা। এই অর্থে আবার হুমায়ুন আজাদ তাঁর প্রবচনগুচ্ছে একটি চমৎকার কথা বলেছেন : ‘পা, বাংলাদেশে, মাথার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পদোন্নতির জন্য এখানে সবাই ব্যগ্র, কিন্তু মাথার যে অবনতি ঘটছে, তাতে কারও কোনও উদ্বেগ নেই।’ বক্রোক্তি এবং শ্লেষপূর্ণ এই বক্তব্যে পদ-পদবিধারীদের স্বার্থপরতা ও আত্মঅহমিকাকেই তিনি আক্রমণ করেছেন। গদির লোভ এবং পদবির লালসা, বলতে দ্বিধা নেই, রাজনীতিবিদ, আমলা এবং ক্ষমতালিপ্সুদের মধ্যেই বেশি। এতে তারা ব্যবহার করে প্রথমত তোষামোদের তেল, দ্বিতীয়ত অমৃত কুম্ভ, তৃতীয়ত অস্ত্রের বলদর্পী হুংকার। সরলপ্রাণ জনগণের পিঠ ও কাঁধ তাদের ওপরে ওঠার সিঁড়ি।

মানবদেহের শীর্ষে থাকে মাথা এবং মাথাই মন-মনন ও দেহের নিয়ন্ত্রক। কিন্তু পা নিম্নাঙ্গের শেষাংশ। গুরুত্বের বিবেচনায়ও মাথাই শ্রেয়। কিন্তু আমরা পদপ্রার্থী ও পদলেহী হয়ে পদমর্যাদাকেই গুরুত্ব দিই এবং সেলাম ঠুকি! পদ যাদের আছে তারাই করে ঊর্ধ্বতনের পদলেহন এবং অধস্তনকে পদাঘাত ও পদপীড়ন। আবার পদাধিকারীদেরই পদস্খলনও হয় বেশি। পৃথিবীব্যাপী প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে নির্বাচনে পদপ্রার্থীদের ডামাডোলের অন্ত নেই! বাঙালিরা এ ব্যাপারে এককাঠি সরেস! জান-কোরবান করতেও পিছপা হয় না! এ যুগে সর্বত্র পদের লোভ-লালসা প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে।

বাংলায় ‘পা’-এর সমার্থক শব্দ―পদ, পাদ, চরণ, কদম। পায়ের কথা বললেই মনে পড়ে সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্য ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর কথা। মনে পড়ে মার্কসবাদী বিপ্লবী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথা। সমাজতন্ত্রের দ্রুত আগমন প্রত্যাশায় তিনি দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন―পদাতিক এবং একটু পা-চালিয়ে ভাই! ভ্রমণবিলাসী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সুখপাঠ্য একটি স্মৃতিকথার বই পায়ের তলায় শর্ষে। আর কে না-শুনেছেন রবীন্দ্রনাথের গান―‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ কিংবা ‘ওই শুনি যেন কার চরণধ্বনি রে! অথবা ‘কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও।’ নজরুলও ভক্তিমূলক একটি গানে লিখেছেন : ‘হৃদিপদ্মে চরণ রাখ নবঘন শ্যাম’। ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচিছে ঘূর্ণিবায়।’ স্মরণ হয় মধ্যযুগে কবি ভারতচন্দ্রের অমর পঙ্ক্তি : “কে বলে শারদশশী সে-মুখের তুলা,/পদনখে পড়ে তার আছে কতগুলা।” কিংবা যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘অন্ধ বধূ’ কবিতায় পাই : “পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী/একটু ধীরে চল্ না ঠাকুরঝি।” ―একলহমায় মনে পড়ে যাবে এ রকম বহুবর্ণিল হীরকখণ্ডের মতো পঙ্ক্তিমালা―যাতে আছে চরণের মহিমা। তা ছাড়া এ যুগে পদায়ন, পদোন্নতি এবং পদক কে না-চায়? এসবই ‘পদ’ শব্দের গর্ভে জন্ম―রূপান্তরিত এবং অর্থান্তরিত। ‘পদবি’ আলংকারিক শব্দ। তা নামের উৎস চ সামনে বা পেছনে থাকে। পদ হতে পারে বংশধারার পরিচয় এবং সামাজিক বা রাষ্ট্রিক সম্মানের। খান-পাঠান-সৈয়দ-শেখ কিংবা পাল-সাহা-রায়-দত্ত বংশানুক্রমিক পদবি। বিদ্যাসাগর, বঙ্গবন্ধু, কবিশেখর, ভাষাশহিদ, বীরশ্রেষ্ঠ―এসব সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সম্মানসূচক পদবি। এসব মহত্ত্বপূর্ণ উপাধি মানুষকে অমর করে।

‘পা’ এবং ‘পদ’ শব্দের সঙ্গে জুতোর সম্পর্কও গভীর। কারণ পা থেকেই ‘পাদুকা’ শব্দের উৎপত্তি। এ জন্যই জুতোর শিল্পিত নাম―পাদুকা, পদশোভা, পদাবরণ। কবি যখন বলেন, ‘একদা ছিল না জুতা চরণযুগলে/দহিল হৃদয়-মন সেই ক্ষোভানলে’ তখন পা ও পাদুকার গভীর সম্পর্ক বোঝা যায়। বৈষ্ণবধর্মে চরণসেবা, শ্রীচরণবন্দনা, চরণাশ্রিত এবং চরণামৃতের কথা না-হয় না-ই বললাম। কিন্তু চরণস্পর্শের কথা তো বলতেই হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে/নিও না, নিও না ফিরায়ে।’ রামায়ণে অভিশপ্ত অহল্যার কথা আমরা পাই―যে পাথর হয়ে পড়েছিল রামচন্দ্রের বনবাসে গমনপথের পাশে। তখন দাশরথির পদস্পর্শে অহল্যা শাপমুক্ত হয়েছিল। পায়ের কোমল ছোঁয়ার সঙ্গে কাঠিন্যের ঘাতের কথাও কিন্তু মনে পড়বে। তখন আসবে পদাঘাতের কথা! কবি সুকান্ত তারুণ্যের স্বভাব বর্ণনায় লিখেছেন : ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ, পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথরবাধা!’ ‘পা’ আবার সংগীতশাস্ত্রের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সংক্ষেপে সংগীতের পঞ্চম স্বরের নাম ‘পা’। সংগীতশাস্ত্রবিদেরা বলেন, এই পঞ্চম স্বরটি কোমলতায় প্রলেপিত।

 বাংলা ব্যাকরণে পদের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন! সেখানে বাক্যে প্রযুক্ত প্রতিটি শব্দই একেকটি পদ। কিংবা বিভক্তিযুক্ত শব্দকে বলে পদ। বাংলা ব্যাকরণে পদবিন্যাস রীতির অবশ্যপালনীয় শর্ত আছে তিনটি―আকাক্সক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা। বিস্তৃতভাবে পদপ্রকরণের অধ্যায়ও আছে। এখানে এর চেয়ে বেশি আর কিছু বললে ব্যাকরণ-বিভীষিকায় ধরবে পাঠকদের! বরং বলি ‘পদ’-এর বহুমাত্রিক ভাব এবং অনুষঙ্গের কথা। পায়ের কাজ কেবল হেঁটেচলা নয়―লাথিমারাও! সুভদ্র বাংলায় যাকে বলে ‘পদব্রজে গমন’ এবং ‘পদাঘাত করা’। সংস্কৃত ‘হণ্টন’ থেকে তদ্ভবরূপ ‘হাঁটা’। মানবদেহের গঠন অনুসারে আমাদের পা দুটি ইংরেজি এগারো সংখ্যার মতো। তাই হেঁটেচলাকে কৌতুক করে আমরা বলি ‘ইলেভেন এক্সপ্রেস’। এই শব্দবন্ধ এখন বাগধারায় পরিণত হয়েছে। ‘পায়ে পড়া’, ‘পায়ে ধরা’ দরিদ্র ও দুর্বলদের আত্মরক্ষার শেষ অবলম্বন। আর ধনবান, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবানদের শক্তি-প্রদর্শনের সূচনা মুষ্টাঘাত পদাঘাতে! আবার পদাঘাত বা পদপীড়ন করতেও তারা খোঁজে পশ্চাদ্দেশ―যেন ব্যথা না-লাগে পদমূলে!

পদপিষ্ট, পদদলিত, পদপীড়ন―এই শব্দগুলো প্রায় সমর্থক। ভারতের বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে এবং এদেশে জাকাত-ফিতরা নিতে এসে কত দরিদ্র মানুষ প্রায় প্রতিবছর প্রাণ হারায় পদদলিত হয়ে ! পদধূলি, চরণধূলি, পদরেণু, পদরজ―এই বৈষ্ণবীয় শব্দগুচ্ছ সমার্থক। গুরুবাদী পদসেবকদের পদধূলি লাভেচ্ছা প্রবল বলেই তাদের আকাক্সক্ষা ‘পদরেণু দিয়া মুক্ত করহ শ্রীহরি।’ পদশব্দ, পদধ্বনি, পদাভাষ, চরণ-সংকেত―এই শব্দগুলোও প্রায় একই অর্থ বহন করে। তাই ভূপেন হাজারিকার গানে পাই―‘নতুন দিনের যেন পদধ্বনি শুনি।’ কিন্তু স্বপ্নময় সেই পদধ্বনি কেবল শোনাই সম্বল―দেখতে তো পাই না কোথাও!

‘পদ’ বলতে আমরা নানা প্রকার এবং বিভিন্ন রূপভেদকেও বুঝি। যখন বলি, পাত্রের চেহারা কোনও পদের না―তখন দৈহিক নানান অসঙ্গতি আমাদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর যখন কেউ বলে, সব পদই খুব সুস্বাদু হয়েছে তখন তৃপ্তিকর খাবারের নানা উপকরণ বুঝি। পদের বহুমাত্রিক অর্থের এখানেই শেষ নয়। ‘পদ’ বা ‘চরণ’ কেবল ‘পা’ অর্থে নয়―কবিতার পঙ্ক্তিকেও বোঝায়। এ জন্য পদরচয়িতা, পদকার, পদকর্তা―এ রকম শব্দবন্ধ দিয়ে প্রাচীন ও মধ্যযুগে কবিকেই বোঝানো হতো। কাব্যের উপযুক্ত পদবিন্যাস এবং মোক্ষম শব্দটির প্রয়োগ বড়োই কঠিন কাজ। এ বিষয়ে মধ্যযুগের সংস্কৃত ভাষার কবি ‘গীতগোবিন্দ’-রচয়িতা জয়দেবের জীবনে চমকপ্রদ একটি ঘটনা আছে। কবি লিখেছিলেন―‘স্মরগরল খণ্ডনম/মম শিরশী মণ্ডনম’ পর্যন্ত। এরপর সমিল উপযুক্ত বাক্যটি কী হবে তা আর সুদীর্ঘ বারো বছর চিন্তাভাবনা এবং সাধনা করেও খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি! অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং জয়দেবের রূপ ধরে এসে বহুপ্রার্থিত পঙ্ক্তিটি লিখে দিয়ে যান! এভাবেই সমাপ্ত হয় ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্য। কাব্যের ইতিহাসে সেই স্মরণীয় চরণটি ছিল এ রকম : ‘দেহি পদপল্লব মুদারম্।’

কিংবদন্তি কি না, জানি না। এসব কথা ভক্তিবাদের ও বৈষ্ণবতত্ত্বের। তবে যা-ই হোক, কবিতার অব্যর্থ শব্দবাণ ও অনিবার্য চরণবিন্যাস সহজ কাজ নয়―নিরন্তর চর্চা ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনার। অথচ সাম্প্রতিককালে কাব্যাকৃতির দু-চারটি অকবিতা লিখেও ‘কবি’ পদবাচ্য হওয়া কত সহজ!

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares