প্রবন্ধ : বাংলাদেশের কবিতায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন : বিশ্বজিৎ ঘোষ

১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী শীর্ষক গ্রন্থের সম্পাদকের আরম্ভটা ছিল এরকম : ‘একটি মহৎ দিন হঠাৎ কখনো জাতির জীবনে আসে যুগান্তের সম্ভাবনা নিয়ে। পূর্ব-পকিস্তানের ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারী এমনি এক যুগান্তকারী দিন। শুধু পাক-ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে নয়, একুশে ফেব্রুয়ারী সারা দুনিয়ার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা। দুনিয়ার মানুষ হতচকিত বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়েছে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য পূর্ব-পাকিস্তানের জনতার দুর্জয় প্রতিরোধের শক্তিতে, শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছে ভাষার দাবীতে পূর্ব-পাকিস্তানের তরুণদের এই বিশ্ব-ঐতিহাসিক আত্মত্যাগে। জাতিগত অত্যাচারের বিরুদ্ধে, জনতার গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য দুনিয়াজোড়া মানুষের যুগ যুগ ব্যাপী যে সংগ্রাম, একুশে ফেব্রুয়ারী তাকে এক নতুন চেতনায় উন্নীত করেছে।’ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে একুশের আবির্ভাব ছিল, প্রকৃত প্রস্তাবেই, একটি যুগান্তের সূচনা। সম্পাদকের ওই ভূমিকাংশে একুশে ফেব্রুয়ারি তথা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মৌল চারিত্র্য যেমন উন্মোচিত, তেমনি প্রকাশিত এই আন্দোলনের ভবিষ্য-বিস্তারী প্রভাবের পূর্বাভাস। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাঙালিকে দিয়েছে নতুন পথের সন্ধান, নির্মাণ করেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নতুন সড়ক।
ভাষাভিত্তিক একটি জাতি হিসেবে বাঙালির ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের ইতিহাসে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি যথার্থই একটি মহত্তম দিন। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির আত্মজাগরণের দিন, স্বাধিকারের স্বপ্ন বপনের দিন, আপন সত্তাকে বিপুল মহিমায় ঘোষণা করার দিন, সংঘশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে শোষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণের দিন। বাস্তিল দিবসে ফরাসি জাতি শত বছরের গ্লানি মুছে যেমন লাভ করেছিল নবজন্ম, তেমনি একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাঙালি জাতি খুঁজে পেয়েছিল তার আত্মপরিচয়ের সূর্যকরোজ্জ্বল নতুন ঠিকানা।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্ভুবনে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মতো প্রভাবসঞ্চারী কোনও অনুষঙ্গ নেই। উনিশশো বায়ান্ন সালে বাঙালি জাতির রক্তাক্ত উজ্জীবনের অব্যবহিত পরেই আমাদের সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। বাংলাদেশের এমন কোনও লেখক হয়তো নেই, যিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি কবিতা-নাটক-ছোটগল্প-উপন্যাস-ছড়া কিংবা প্রবন্ধ লেখেননি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা আমাদের লেখকদের সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছে; একুশে ফেব্রুয়ারি তাঁদের শুনিয়েছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার মাভৈ বাণী। বাংলাদেশের সাহিত্যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বহুমাত্রিক প্রতিফলন ঘটেছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্রীয় বিষয়াংশ নির্বাচন করে যেমন সাহিত্য রচিত হয়েছে, তেমনি আবার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল চেতনাকে মর্মে ধারণ করে আমাদের সাহিত্যে লেগেছে নতুন হাওয়া। বস্তুত, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনই আমাদের সাহিত্যিকদের সামনে তুলে ধরে জাতিসত্তার মূল পরিচয়, আমাদের গন্তব্যের যথার্থ ঠিকানা। তাই সাহিত্যে সে-আন্দোলনের প্রতিফলন একান্তই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত।
বিগত প্রায় পঁচাত্তর বছরে (১৯৫২-২০২৬) বাংলাদেশের সাহিত্যে জড়িয়ে আছে সংগ্রাম ও সাহস ও সংঘশক্তির বিমিশ্র অভিব্যক্তি, যা একান্তই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের গর্বিত উত্তরাধিকার। অর্ধ-শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের কবিতায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে প্রতিফলন ঘটেছে তার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য, রূপ ও রূপান্তর অঙ্কনই বর্তমান প্রবন্ধের অন্বিষ্ট বিষয়। তবে সংক্ষিপ্ত পরিসরের একটি নিবন্ধে পঁচাত্তর বছরের কবিতায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিফলনের রূপ ও রূপান্তর অঙ্কন প্রায়-অসম্ভব এক বিষয়। তাই বর্তমান নিবন্ধে বিগত পঁচাত্তর বছরে বাংলাদেশের কবিতায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চারিত্র্য ও চেতনা কীভাবে অঙ্কিত হয়েছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় পাওয়া যাবে। অপ্রধান অনেক বিষয়কে, সজাগ থেকেই, আমি আলোচনায় অনুক্ত রেখেছি; অনুপস্থিত থেকে গেছেন অনেক কবি, অনেকের নামই এখানে উচ্চারিত হয়নি। আমি ধরতে চেয়েছি মূল স্রোতধারা, দেখতে চেয়েছি পঁচাত্তর বছরের কবিতায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রধান প্রবণতাসমূহ। এ কারণে জেনে-শুনেই আমাকে মেনে নিতে হয়েছে সংক্ষিপ্তির আপাত অপূর্ণতা।
২
সূচনা-সূত্রেই ব্যক্ত হয়েছে যে, বাংলাদেশের সাহিত্যে, বিশেষত কবিতায়, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিফলন ঘটেছে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায়। বাংলাদেশের সাহিত্যের অন্যান্য শাখা অপেক্ষা কবিতাতেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিফলন ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা কবিতার সংখ্যা এখন হিসেবের বাইরে। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে আমরা প্রথমেই উল্লেখ করতে চাই হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী গ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুচ্ছের কথা। ওই সংকলনে পত্রস্থ হয়েছিল মোট এগারোটি কবিতা, আর কবিরা ছিলেন : শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালুদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক এবং হাসান হাফিজুর রহমান। এইসব কবির সম্মিলিত শব্দস্রোতে উদ্ভাসিত হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির কালজয়ী তাৎপর্য, সমবায়ী জাগরণ, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অভ্রান্ত ইঙ্গিত আর অত্যাচারিতের বিরুদ্ধে সংঘশক্তির প্রতিবাদের উত্তাপ। স্মরণ করা যায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক একুশের প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলার পর আলাউদ্দিন আল আজাদের ছন্দোবন্ধ প্রতিবাদ উন্মথিত জাগরণ :
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমার এখনো
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো। যে-ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
হীরার মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটিকা ধূলায় চূর্ণ যে পদ-প্রান্তে
যারা বুনি ধান
গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য
ইটের মিনার
ভেঙেছে ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী
চার কোটি পরিবার।
(আলাউদ্দিন আল আজাদ/‘স্মৃতিস্তম্ভ’)
―একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতিকে যে ঐক্যবদ্ধ করেছে, জাগ্রত করেছে যে জাতীয়তাবাদী চেতনা, আলাউদ্দিন আল আজাদের উপর্যুক্ত কবিতাংশে তারই সংহত উদ্ভাসন ঘটেছে।
হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’ কবিতায় শিল্পিত হয়েছে বাঙালির আত্মজাগরণের ইতিহাস। বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার―এইসব থোকা থোকা জ্বলন্ত নাম কীভাবে বাঙালির হৃদয়ে বর্শার ফলার মতো গেঁথে আছে, হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতায় তার পরিচয় উদ্ভাসিত। দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তকে উন্মাতাল করেছে এইসব শহিদের নাম―যে নাম কখনও বাঙালির হৃদয় থেকে, বাংলাভাষী মানুষের মন থেকে মুছে যাবার নয়। এইসব নামের মহিমাই উচ্চারিত হয় হাসানের কবিতায় :
আবুল বরকত নেই; সেই অস্বাভাবিক বেড়ে-ওঠা
বিশাল শরীর বালক, মধুর স্টলের ছাদ ছুঁয়ে হাঁটতো যে তাঁকে ডেকো না;
আর একবারও ডাকলে ঘৃণায় তুমি কুঁচকে উঠবে―
সালাম, রফিকউদ্দিন, জব্বার―কি বিষণ্ন থোকা থোকা নাম;
এই এক সারি নাম আর বর্শার তীক্ষè ফলার মতো এখন হৃদয়কে হানে;
… … …
যাঁদের হারালাম তাঁরা আমাদেরকে বিস্তৃত করে দিয়ে গেল
দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, কণা কণা করে ছড়িয়ে দিয়ে গেল
দেশের প্রাণের দীপ্তির ভেতর মৃত্যুর অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে।
আবুল বরকত, সালাম, রফিকউদ্দিন, জব্বার
কি আশ্চর্য, কি বিষণ্ন নাম। একসার জ্বলন্ত নাম।
(হাসান হাফিজুর রহমান/‘অমর একুশে’)
বাংলাদেশের সমস্ত প্রান্তকে উন্মাতাল করে দেওয়া একুশের ভিন্নতর এক ব্যঞ্জনা প্রকাশিত হচ্ছে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোনো এক মাকে’ কবিতায়। খোকা, যে শহিদ হয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে, যে আর কখনও উড়কি ধনের মুড়কি হাতে প্রতীক্ষারত মায়ের কাছে ফিরে আসবে না, সে-কথা তার মা কিছুতেই বুঝতে চায় না। এ কবিতার মর্মস্রোতে প্রবহমান শহিদের রক্ত-নিংড়ানো আবেগ, যে-আবেগের ধারাজলে স্নাত হয়ে খোকার মা হয়ে ওঠে দেশজননী :
কুমড়ো ফুল
শুকিয়ে গেছে,
ঝরে পড়েছে ডাঁটা;
পুঁই লতাটা নেতানো,―
‘খোকা এলি ?’
ঝাপসা চোখে মা তাকায়
উঠানে, উঠানে
যেখানে খোকার শব
শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।
এখন,
মা’র চোখে চৈত্রের রোদ
পুড়িয়ে দেয় শকুনিদের।
তারপর,
দাওয়ায় বসে
মা আবার ধান ভানে,
বিন্নি ধানের খই ভাজে,
খোকা তার
কখন আসে! কখন আসে!
এখন,
মা’র চোখে শিশির ভোর
স্নেহের রোদে
ভিটে ভরেছে।
(আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ/‘কোনো এক মাকে’)
এইভাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আমাদের সামূহিক কবি-চৈতন্যে নিয়ে আসে নতুন মাত্রা; রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়ে ওঠে বাংলাদেশের কবিদের অবিনাশী শিল্প-আয়োজন। যখনই শৃঙ্খলমুক্তির প্রয়োজন আসে, যখনই প্রয়োজন শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণ, কিংবা জনস্রোতের জোয়ার―রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আর তার শহিদেরা তখনই দ্রোহের ভূমিকায় হয় অবতীর্ণ। ওই অবিনাশী শক্তি-উৎস তাই বায়ান্ন-উত্তর বাংলাদেশের কবিতার এক প্রধান অনুষঙ্গ। বিশেষ কোনও কবি নয়, সকলের ক্ষেত্রেই এ কথা সত্য, যেমন সত্য শামসুর রাহমানের ‘ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৯’ কবিতায় :
বুঝি তাই উনিশশো ঊনসত্তরেও
আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ
বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।
সালামের বুক আজ উন্মথিত মেঘনা
সালামের চোখ আজ আলোকিত ঢাকা
সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ববাংলা।
(শামসুর রাহমান/‘ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৯’)
একুশের প্রথম সৃষ্টি মাহবুব-উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতায়ও ধ্বনিত হয়েছে যুগ-পরম্পরায় একুশের অবিনাশী আহ্বান―মৃত্যুকে জয় আর প্রতিবাদে উচ্চকিত হওয়ার ডাক। সমুত্থিত বাঙালির সম্মিলিত আবেগ আর ঘৃণা আর প্রতিশোধ-বহ্নি যেন সংহতি লাভ করে শতাধিক পঙ্ক্তির একটি কবিতায় :
এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়
যেখানে আগুনের ফুলকির মতো
এখানে ওখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছাপ
সেখানে আমি কাঁদতে আসিনি।
আজ আমি শোকে বিহ্বল নই
আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই
আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল।
হে আমার মৃত ভায়েরা
সেই নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে
তোমাদের কণ্ঠস্বর
স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চিৎকার
ভেসে আসবে
সেইদিন আমাদের দেশের জনতা
খুনি জালিমকে ফাঁসির কাষ্ঠে
ঝুলাবেই ঝুলাবে
তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে
প্রতিশোধ আর বিজয়ের আনন্দে।
(মাহবুব-উল আলম চৌধুরী/‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’)
ফ্যাসিবাদ আর উপনিবেশবাদ-বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে বায়ান্নর শহিদেরা বাঙালিকে চিরকাল পথ দেখাবে। শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে বাঙালি সংঘবদ্ধ হবে―গড়ে তুলতে প্রতিরোধ সংস্কৃতির দেয়াল। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালি লড়াইয়ের অন্তহীন শক্তি পাবে বায়ান্নর শহিদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি থেকে―দূরগামী জাহাজের কাছে বাতিঘরের আলোকস্তম্ভের মতোই ভাষা—শহিদরা প্রতিরোধী বাঙালিকে চিরকাল পথ দেখাবে। এ কথাই যেন উচ্চারিত হয় মাহবুব-উল আলম চৌধুরীর নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিমালায় :
যদিও অসংখ্য অস্পষ্ট স্বর নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ করবে একদিন
তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘণ্টাধ্বনি
প্রতিদিন তোমাদের ঐতিহাসিক মৃত্যুক্ষণ
ঘোষণা করবে
যদিও ঝড়-ঝঞ্ঝা-বৃষ্টিপাত বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিত্তি পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে
তবুও তোমাদের শহিদ নামের ঔজ্জ্বল্য
কিছুতেই মুছে যাবে না।
(‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’)
একুশে ফেব্রুয়ারি ব্যক্তি-মানুষকে কীভাবে জনস্রোতের অংশ হতে অনুপ্রাণিত করে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের বোধে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কীভাবে নতুন প্রতিজ্ঞায় উদ্ভাসিত হয়, তারই অন্তর্নিহিত অনুরণন শিল্পিতা পেয়েছে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ‘এই দুঃখ ভুলে যাব’ কবিতায়। নতুন প্রজন্মের হাতে পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মৃত্যু ঘটে না, বরং পুরোনোর সারাৎসার আত্তীকরণ করেই জন্ম নেয় নতুন প্রজন্মের নিজস্ব সংস্কৃতি―এই অনুভব ও উপলব্ধিকে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায় :
সে প্রতিজ্ঞা বারবার ভাঙে। একুশের অমোঘ মিছিলে
বারবার মিশে যাই। কবরের ঘাস বর্ষাকালে
ঘনশ্যাম হয়ে ওঠে, শরতের শিশির কুড়োয়।
নতুন কবিতা এসে মুছে দেয়, পুরনো কবিতা,
নতুন গানের সুরে মিশে যায় পুরনো গানের
ভুলে যাওয়া সুর। এই হয়। নতুনের ব্যস্ত হাত
নিত্যনব শহিদ মিনার গড়ে তোলে।
(জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী /‘এই দুঃখ ভুলে যাব’)
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অভিঘাত যতটা জাগতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি চৈতন্যগত। এই ভাব নিয়েই শিল্পিত হয়েছে অসীম সাহার ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতা। এ কবিতায় শহিদের যে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, সে-মৃত্যুর প্রতিমা বস্তু-পৃথিবীতে নেই, এ মৃত্যু চিরঞ্জীব রূপ লাভ করেছে মানুষের সামূহিক চৈতন্যে। শহিদদের স্মরণে নির্মিত মর্মর স্মৃতিস্তম্ভে এ চেতনার স্থিতি নেই; কেবল মানুষের চেতনায়, স্মরণ ও বেদনায় রক্তিম সে-স্মৃতির সঞ্চয় সম্ভব। একুশের এমন এক গভীরতর অনুভব ব্যঞ্জিত হয়েছে অসীম সাহার কবিতায়। জাগতিক নিয়মে মৃত্যুতে বিলয়ই জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি, তবে চেতনা অক্ষয়―কাল থেকে কালান্তরে উত্তরাধিকার সূত্রে চেতনার বিস্তার ঘটে। ভাষা-শহিদদের মৃত্যুর ভেতর দিয়ে পাওয়া সেই চেতনার বিজয় ঘোষিত হয় অসীম সাহার উদ্দীপ্ত চরণগুচ্ছে :
একুশ আমার জন্মের চিৎকার
একুশ আমার রক্তের পরিচয়
একুশ আমার আত্মার ক্রন্দন
একুশেই আমি মৃত্যুকে করি জয়।
… … …
জীবনের কাছে মৃত্যু তো হার মানে
মৃত্যুতে জাগে একুশে ফেব্রুয়ারি।
(অসীম সাহা/‘একুশে ফেব্রুয়ারি’)
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকে একাত্মসত্তায় গ্রথিত করেছে। আল মাহমুদের কবিতায় মা- মাতৃভাষা—মাতৃভূমির একাকার-সত্তা অপূর্ব ব্যঞ্জনায় শিল্পরূপ লাভ করেছে। তাঁর ‘নিদ্রিতা মায়ের নাম’ কবিতায় একুশের অমলিন স্মৃতি বাক্সময় হয়ে উঠেছে। একুশের মিছিলে দ্রোহী বাঙালির শাণিত হাত আর দীপ্ত স্লোগান আল মাহমুদ একটি অসামান্য চিত্রকল্পে তুলে ধরেছেন এভাবে :
তাড়িত দুঃখের মতো চতুর্দিকে স্মৃতির মিছিল
রক্তাক্ত বন্ধুদের মুখ, উত্তেজিত হাতের টঙ্কারে
তীরের ফলার মতো
নিক্ষিপ্ত ভাষার চিৎকার :
বাংলা, বাংলা―
কে নিদ্রামগ্ন আমার মায়ের নাম উচ্চারণ করো ?
(আল মাহমুদ/‘নিদ্রিতা মায়ের নাম’)
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কীভাবে বাঙালির চেতনায় অভিঘাত তুলেছিল, তার পরিচয় পাওয়া যায় ফররুখ আহমদের সৃষ্টিতে। পাকিস্তান আন্দোলনের একনিষ্ঠ অনুসারী ফররুখ আহমদকেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সন্দীপিত করে তুলেছিল―ফলে তিনি লিখতে পেরেছেন এমন প্রত্যয়দীপ্ত শব্দগুচ্ছ : ‘যাদের বুকের রক্তে মাতৃভাষা পেয়েছে সম্মান,/ সঙ্গিনের মুখে যারা দাঁড়ায়েছে নিষ্কম্প, অম্লান,/ মানে নাই কোনো বাধা, মৃত্যুভয় মানে নাই যারা/ তাদের স্মরণচিহ্ন এ মিনার―কালের পাহারা!/ এখানে দাঁড়াও এসে মনে করো তাদের সে-দান/ যাদের বুকের রক্তে মাতৃভাষা পেয়েছে সম্মান’। (ফররুখ আহমদ/‘ভাষা আন্দোলনে নিহত আত্মার প্রতি’)
কথা তথা ভাষাই যে মানুষকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে, তাকে করে তোলে জননী ও জন্মভূমির প্রতি অনুরাগী―সে-কথাই ব্যক্ত হয়েছে আহসান হাবীবের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ শীর্ষক কবিতায়। কথার অস্তিত্ব রক্ষায় শহিদদের আত্মত্যাগ কবি প্রতীকী ব্যঞ্জনায় রূপ দিয়েছেন এই কবিতায়। কবির কাছে কথা তথা ভাষাই তাঁর অস্তিত্বের প্রহরী। কথা বেঁচে থাকলে বাঁচবে বাঙালি―এমন এক অন্তর্গত ভাবনা এ কবিতার মূল আবেদন। ভাষা-জননী-স্বদেশ―এই ত্রিসত্তা এ কবিতাতেও হয়ে গেছে একাত্ম―আবার একই সঙ্গে কথা তথা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি নিজেও ঘোষণা করেন এই অঙ্গীকার :
কথারা যতদিন সোচ্চার
আমি আছি
অম্লান অস্তিত্বে আমি অজেয়। আমাকে
কথারা লালন করে
আমি তার পরিচর্যাভার
নিয়েছি এবং তার লালনেই থাকতে চাই সমর্পিত প্রাণ।
(আহসান হাবীব/‘একুশে ফেব্রুয়ারি’)
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যাঁরা শহিদ হয়েছেন, তারা বাঙালির চিরকালীন প্রেরণা―আমাদের শক্তি ও সাহসের শাশ্বত উৎস। ভাষা-শহিদরা বাঙালির চিরকালের আপন জন―তাই তাঁদের প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। প্রতিদিনের জন্য স্মরণীয় ভাষা-শহিদদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা শিল্পিতা পেয়েছে দাউদ হায়দারের কবিতায় : ‘চেয়ে দেখো, রাজপথে দুরন্ত রক্তের স্রোত’/ পুলিশের লাল গাড়ির অক্লান্ত মহড়া :/ মা আমার বস্তির কুঁড়েঘর থেকে শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে/ চেয়ে দেখছেন তার আদুরে ছেলেরাই/ বার বার হৃত অধিকার ফেরাবার সংগ্রামে/ মিশে যায় এ মাটির বুকে―কেমন হাসিমুখে।/ এই ঘাস এই মাটির বুকে পা রেখো আস্তে করে/ এখানে আমার ক-টি ভাই রক্তাক্ত শরীরে শুয়ে আছে’ (দাউদ হায়দার/‘একুশ’)
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাঙালির চেতনায় জন্ম দিয়েছে প্রগতিশীল সমাজবাদী ভাবনা―জাতীয়তাবাদী চেতনায় সকল বাঙালিকে করেছে একত্র। কিন্তু উত্তরকালে সেখানে দেখা দিয়েছে নানামাত্রিক বিভ্রান্তি―ফলে খণ্ডিত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চেতনা। তবে যতই আঁধার আসুক, একুশের মর্মকোষে আছে জাগরণের মন্ত্র, উত্তরণের ফিনিক্স-সত্তা―তাই হতাশা-ব্যর্থতাও একসময় ঢাকা পড়ে বাসন্তী প্রলেপে। রুবি রহমানের ‘সেই চাবিশব্দ’ কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে উপর্যুক্ত ভাব :
চারদিকে জমে উঠছে অন্ধকার, কুয়াশা
নদীর উৎসে যাবার পথ ঝাপসা হয়ে আছে
… … …
সেই জয়ধ্বনি সেই চাবিশব্দ আমরা ভুলে ফেলে এসেছি
এখন হাতড়ে বেড়াচ্ছি খানাখন্দে
উদাসীন পথের বাঁকে উধাও বীজতলায়।
শীত আর কুয়াশা বিশ্রী জোব্বা পরিয়ে রেখেছে
আমাদের দিনরাতগুলোকে;
আমাদের পাঁজরের হাড়ে আর গলায় গুনগুনিয়ে ওঠা গানে
আমরা টের পাচ্ছি বসন্ত।
(রুবী রহমান/‘সেই চাবিশব্দ’)
এইভাবে উনিশশো বায়ান্ন-উত্তর কালখণ্ড একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে বাঙালি জাতির প্রতিদিনের পথ চলার পাথেয়। একুশের আর এক নাম হয়ে ওঠে সংক্ষোভ, একুশের অর্থ দাঁড়ায় মাথা নত না-করা, একুশ হয়ে ওঠে স্বপ্ন আর সম্ভাবনার প্রতীক। অনেক কবিই কবিতায় একুশকে ব্যবহার করেছেন প্রতীক হিসেবে, যেমন করেন মহাদেব সাহা তাঁর ‘একুশের গান’ কবিতায় :
একুশ মানেই আসছে, স্বপ্ন আসছে, ভবিষ্যৎ আসছে
একুশ মানেই অতীত নয়, আগামী
মৃত্যু নয়, জন্ম;
একুশ মানে শহীদদের পায়ের শব্দ
একুশ মানে অজর, অমর, অবিনশ্বর।
(মহাদেব সাহা/‘একুশের গান’)
প্রাক-মুক্তিযুদ্ধ কালখণ্ডে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের এই প্রতিবাদী চেতনা মধ্য-আশির স্বৈরবৃত্ত সময়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ে; ধাতব অস্ত্রধারী শাসকের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে ভীতির কারণ, যেমন ভীত হয়েছিল পঞ্চাশ-ষাটের পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা। একুশে ফেব্রুয়ারি এ সময় রূপান্তরিত হয় স্মৃতির অনুষঙ্গে। কালিক এই প্রবণতাই কবির শব্দস্রোতে অভিব্যক্ত হয় রূপক ব্যঞ্জনায় :
কবি ও কুকুরদের এইখানে আসতে দিও না।
… … …
আমাদের সুখের নিদ্রায় ওরা বড়ো উৎপাত
কবি ও কুকুরদের দূরে রাখো
বিশেষত এই মাসে,
ওরা শুধু কবরের মটি খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে।
… … …
মাটিতে ভায়ের লাশ পচে গিয়ে কবে যেন নিমেষে নিঃশেষ,
তাদের দেহের মেদ, সকল লাবণ্য মিশে হয়েছে উর্বর
এ বাগান, হায় আমাদের এই জীবনের সকল বাগান।
কবি ও কুকুরদের এইখানে আসতে দিও না।
ওদের নখরে শুধু উঠে আসে স্মৃতির কবর থেকে মৃত
ভায়ের বোনের লাশ, আমাদের সমাহিত স্মৃতির কাফন।
(খোন্দকার আশরাফ হোসেন/‘ফেব্রুয়ারিতে জনৈক বাগান মালিক’)
কালিক এই প্রবণতার কারণে প্রতিজ্ঞার কথা উচ্চারিত হয়েও অন্তিমে প্রশ্ন, কিংবা বলি সংশয়, দেখা দেয়। একুশের আন্তরপ্রেরণায় যে-কবি জনতার সমুদ্রে মিশে গিয়ে শপথে প্রদীপ্ত হয়ে ওঠেন, তিনিই শেষে বরকতের মতো শহিদ হতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। আল মাহমুদের ‘একুশের কবিতা’য় ফুটে ওঠে এই ছবি : ‘আমিও অন্তরঙ্গ হয়ে যাই হঠাৎ তখন/জনতার সমুদ্রের সাথে/ বাঘের হাতের মতো সনখ শপথ/সোহাগের গাঢ় ইচ্ছা নিয়ে/ নেমে আসে মনের ওপর!/নির্মম আদর পেয়ে আমিও রক্তাক্ত হবো/বরকতের শরীরের মতো’ (আল মাহমুদ/‘একুশের কবিতা’) ?
বায়ান্ন-উত্তর কালে বাংলা ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক কবিতা, যা গৌরবোজ্জ্বল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্বতন্ত্র এক উত্তরাধিকার। বাংলা বর্ণমালাকে কবিরা বিবেচনা করেছেন সত্তার পতাকা হিসেবে। কিন্তু বায়ান্ন-উত্তর কালেও বর্ণমালার অপমান কবিচিত্তে জন্ম দেয় সংক্ষোভ, বর্ণমালার জন্য তাঁর হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় অফুরান অনুরাগ :
নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।
… … …
হে আমার আঁখিতারা তুমি উন্মীলিত সর্বক্ষণ জাগরণে।
তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কি থাকে আমার?
উনিশশো বাহান্নর কতিপয় তরুণের খুনের পুষ্পাঞ্জলি
বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।
সে-ফুলের একটি পাপড়িও আজ ছিঁড়ে নিতে দেবো না কাউকে।
এখন তোমাকে ঘিরে ইতর বেলেল্লাপনা চলছে বেদম,
এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি,
এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস।
তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,
বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।
(শামসুর রাহমান/‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’)
বাংলা বর্ণমালা বাঙালির সামাজিক সংহতির অন্যতম শক্তি-উৎস। বর্ণমালাই বাঙালি জাতিকে একাত্ম সত্তায় করেছে গ্রথিত। মাতৃভূমির যে-কোনও সংকটে বাঙালিকে একত্র করে বাংলা বর্ণমালা―ফিনিক্স পাখির মতো বাঙালিকে প্রতিদিন নবজন্মের আহ্বান জানায় বাংলা বর্ণমালা। বাংলা বর্ণমালার মর্মে আছে অনন্ত শক্তি-উৎস―এই শক্তি-উৎসের ছোঁয়ায় বাঙালি নির্ভয়ে এগিয়ে যায় জীবনজয়ের যুদ্ধে। বাংলা বর্ণমালার এই মৃত্যুঞ্জয়ী শক্তি ময়ূখ চৌধুরীর পঙ্ক্তিমালায় শিল্পিতা পেয়েছে এভাবে :
বর্ণমালা উড়ে আসে পলাশের লাল আন্দোলনে,
আগামীর মানচিত্র এঁকে যায় গাঢ় অনুরাগে।
পাখির ডিমের মধ্যে শুয়ে থাকে সমস্ত আকাশ,
প্লাবনের মধ্য থেকে নতুন পলির চর জাগে।
যখনই জননী কাঁদে শ্রাবণের কঠিন অসুখে
একুশটি পালক গেঁথে বর্ণমালা উড়ে আসে বুকে।
(ময়ূখ চৌধুরী/‘বর্ণমালা পাখি হয়ে যায়’)
বাংলা বর্ণমালার হাতে-তৈরি টাইপ তৈরি করেছেন পঞ্চানন কর্মকার। একুশ-উত্তরকালে বাংলা পাইকা টাইপের উদ্ভাবক পঞ্চানন কর্মকারকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন রফিক আজাদ, যা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্বতন্ত্র এক প্রভাবের ফসল। পঞ্চানন কর্মকারের মাতৃভাষা-প্রীতি বায়ান্নর পথ পেরিয়ে বাঙালির চেতনায় চির বহমান। রফিক আজাদের পঙ্ক্তিস্রোতে উদ্ভাসিত পঞ্চানন কর্মকারের মাতৃভাষা-প্রীতির এই উত্তরাধিকার :
ভাষা-সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র তোমার কামারশালা,
পঞ্চাশ বছর ধরে ত্রিবেণী গ্রামের কর্মকার
পরিবারে পরিচর্যা পায় বাঙালির মাতৃভাষা;
প্রকৃত প্রস্তাবে এই পাইকা হরফে বাঙালির
নিজস্ব সভ্যতা, কৃষ্টি যথাযোগ্য সমাদর পায়।
তোমার আঙুল থেকে উৎসারিত অন্তহীন নদী
উনিশ শতকে রুগ্ন বাঙালির পুনর্জাগরণে
বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। আধুনিক বাঙালির
রক্তে আজো ঢেউ তোলে আরক্তিম পাইকা টাইপ।
তোমার ছেনির ঘায়ে তৈরি হলো প্রিয় বর্ণমালা।
(রফিক আজাদ/‘পঞ্চানন কর্মকার’)
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম অনুষঙ্গ শহিদ মিনার। শহিদ মিনার বাঙালির জাতীয়তাবাদী উত্থানের অমোঘ এক স্মারক। বাঙালি জাতির পরম পরিচয় ভাষা-সংগ্রামীদের স্মৃতিতে সৃষ্ট শহিদ মিনার। ভাষা-সংগ্রামীদের সাহস আর ভালোবাসা আর আত্মত্যাগ যেন বাক্সময় আছে নত-মস্তকের শহিদ মিনারে। সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসা আর মমতাই যেন মিনারের নত মস্তকে উদ্ভাসিত। বস্তুত, শহিদ মিনার এখন বাঙালির সংগ্রাম আর সংক্ষোভের অমলিন এক আইকন। বায়ান্ন-উত্তর কালে বাঙলির এই পরম আইকন কবির কাছে হয়ে ওঠে শিল্প-সৃষ্টির উজ্জ্বল এক অনুষঙ্গ। কবির শব্দস্রোতে শহিদ মিনারের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা শিল্পিতা পায় এভাবে :
ভাষা-বৃক্ষ নড়ে ওঠে
বর্ণশোভিতপল্লব ঝরে যায়
মিছিলের পুরোভাগে ওরা
হাওয়ায় স্পন্দন জাগে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’
ধাতব মাছিরা এসে বসে কপালে ও বুকে
রক্তে লেখা হয় জীবনকাহিনি,
আকাশে আকাশে ওড়ে স্বাধিকারের পতাকা,
ওরা হয়ে ওঠে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার
শহিদ মিনার।
(মুজিবুর হক কবীর/‘শহিদ মিনার’)
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত পর থেকে পূর্ববাংলাকে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক কবিতা। দেশপ্রেমমূলক এই কবিতা রচনার ধারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ভিন্নতর এক প্রতিফলন। ওইসব কবিতার শরীরে ও মর্মে উৎকীর্ণ হয়ে আছে দেশের প্রতি আমাদের কবিদের গভীর অনুরাগের ছবি। প্রকৃতি ও মানুষের মিলিত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি, সেই জন্মভূমির ছবি চিত্রিত হয় সৈয়দ আলী আহসানের কবিতায় :
আমার পূর্ব-বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ
অন্ধকারের তমাল
অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়
একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ
সন্ধ্যার উন্মেষের মতো
সরোবরের অতলের মতো
কালো-কেশ মেঘের সঞ্চয়ের মতো।
বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি… ॥
(সৈয়দ আলী আহসান/‘আমার পূর্ব-বাংলা’)
সূচনা-সূত্রেই আমরা উল্লেখ করেছি, পুনরুক্তি হলেও আবার বলি, বর্তমান আলোচনায় বাংলাদেশের সকল কবির সৃষ্টিসম্ভার আলোচিত হয়নি; কবিতায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিফলন দেখাতে গিয়ে প্রতিনিধিস্থানীয় কয়েকটি কবিতা গ্রহণ করেছি মাত্র। আমরা দেখাতে চেয়েছি মূল প্রবণতাগুলো, ফলে অনেক কবির নাম এবং তাঁদের কবিতা থেকে গেছে অনুক্ত। লেখাই বাহুল্য যে, অনুচ্চারিত ওই কবিদের রচনাতেও প্রতিফলিত হয়েছে উপর্যুক্ত কোনও-না-কোনও প্রবণতা।
বিগত পঁচাত্তর বছরে বাংলাদেশের কবিতায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিফলনের স্বরূপ অঙ্কনের সময় কয়েকটি পর্যায় আমাদের সামনে বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে গবেষক সাঈদ-উর রহমার-এর ভাষ্য উল্লেখ করা যায় : ‘প্রথম সামরিক শাসন জারির পূর্ব পর্র্যন্ত রচিত কবিতার বিশেষ কোনো বক্তব্য স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি; সেগুলোতে পাওয়া যায় এটা অনির্দেশ্য সম্ভাবনার কথা, এবং একটা বেদনা-করুণ ব্যঞ্জনা।… সামরিক শাসন জারি হলে (১৯৫৮) প্রদেশে প্রতিক্রিয়াশীলতার শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং নানাভাবে চেষ্টা চলে আন্দোলনের লক্ষ্যকে বানচাল ও বিপথগামী করার। এই নৈরাজ্যজনক অবস্থা ছায়া ফেলেছে ওই সময়ের কবিতায়। তৎকালে ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক কবিতায় লক্ষ করা যায় অসহায়তা ও আশাভঙ্গের চিত্র, কিন্তু সেগুলোতেও বলা হয়েছে একুশের অপরাজেয় ঐতিহ্যের কথা। তারপর থেকে এই ভাব ক্রমশ কেটে গিয়ে শেষ পর্যায়ে কবিতায় প্রধান হতে থাকে প্রতিবাদী বক্তব্য, সেকালের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে’ (সাঈদ-উর রহমান /পূর্ব বাংলার রাজনীতি-সংস্কৃতি ও কবিতা, পৃ. ২৮৬)। মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালখণ্ডে একুশের এই প্রতিবাদী চেতনাই আমাদের কবিতায় শিল্পিত হতে থাকে, তবে কখনও কখনও তা যে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তা-ও নির্মম সত্য। একুশকে নিয়ে কবিতা লেখা, কিংবা একুশ উদ্যাপন, এখন, কখনও কখনও মনে হয়, সাংবাৎসরিক এক অনুষঙ্গ মাত্র। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একুশের বেদনা ও শোক বাংলাদেশের কবিদের যত না প্রভাবিত করেছে, তার চেয়ে বেশি প্রাণিত করেছে একুশের সংক্ষোভ ও প্রতিবাদী চেতনা।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও লেখক
সচিত্রকরণ : রজত



