প্রবন্ধ : ‘বিপ্লবী সাহিত্য’ বিতর্ক : শামসুদ্দিন চৌধুরী

বিপ্লবী সাহিত্যে’র প্রতিষ্ঠান কী রকম হবে এবং বিপ্লবের যুগে সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিকতা কী চেহারা নেবে—সে সম্পর্কিত মতামত এই প্রবন্ধের আলোচ্য। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে রাশিয়ায় বইকে ‘আত্মার খাদ্য’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সোভিয়েত রাশিয়ায় সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিকতা এর দৃষ্টান্ত। নির্দিষ্ট শৈলীতে বিপুল গণসাহিত্য রচিত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য সমালোচনা নিয়ে শতাব্দী জুড়ে আলোচনা গড়ে উঠেছে, এমনকি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পীঠস্থান রাশিয়া ছাড়িয়েও। ধনঞ্জয় দাশ সম্পাদিত তিন খণ্ডের মার্কসবাদী সাহিত্য বিতর্ক রয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘বিপ্লবী সাহিত্য’ বিতর্ককে দেখা যেতে পারে। বিপ্লবীদের জীবনে সাহিত্যের ভূমিকা কতটুকু, বিপ্লব হবার ক্ষেত্রে বইয়ের উপস্থিতি, বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্রে বইয়ের ভূমিকা কী হবে―এসব প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিকতা নিয়ে অল্প আলোচনা হয়েছে।
একজন বিপ্লবী নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একগুচ্ছ পাঠক্রমের মধ্য দিয়ে যান। বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাস, পলিটিকাল ইকোনমি বিপ্লবের চিত্রণসমৃদ্ধ সাহিত্যও তিনি অধ্যয়ন করেন। বিপ্লবী পার্টি সেসব নির্বাচন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত সাহিত্য তাদের উদ্বুদ্ধ করে। একইভাবে রাশিয়ায় জারের প্রজন্মের সাহিত্যকর্মী, সাহিত্যরস-পিপাসুদের জন্য প্রয়োজন হয় বিপ্লবী সাহিত্য হয়ে ওঠার প্রকরণ। এমনকি, স্বয়ংপ্রজ হলেও বিপ্লবী সাহিত্যরাশির মধ্যে নিহিত কাঠামো শনাক্ত হতে পারে।
মার্কসীয় দর্শনে চলিত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং চীনের গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হবার পরিপ্রেক্ষিতে এই ধরনের সৃষ্টির পাশাপাশি এর কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন জন মত উপস্থাপন করেছেন।
২
উনিশ শতকের শুরুতে রাশিয়ায় ডিসেম্বর বিপ্লব অসফল হবার পরে এবং পেত্রাশেভস্কি চক্র ধরা পড়ার পরে বিপ্লবীরা অনেকেই প্রবাসে আশ্রয় নেন। উনিশ শতকের শেষ পাদে আততায়ীর হাতে জারের মৃত্যু হবার পরে আশির দশক নাগাদ প্রবাসী বিপ্লবীদের জীবনী, আত্মকথা প্রকাশিত হতে থাকে। এসব জীবনী, স্মৃতিচারণ বিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গে মিলে স্বতন্ত্র পাঠ্যবস্তুর স্থান করে নেয়। দেশে বিদেশে প্রচুর বিপ্লবী সাহিত্য মুদ্রিত হতে থাকে। সেসব সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসের পাশাপাশি রচিত হয় লেনিনের কী করিতে হইবে এবং তুর্গেনেভের পিতা পুত্র-এর মতো রচনাও।
প্রাসঙ্গিক হতে পারে সমসময়ে রচিত বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন, রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায়—এক একটা গ্রন্থ সমকালীন বিপ্লবীদের নিকট প্রশংসা-নিন্দার বস্তু হয়েছে। প্রত্যেক গ্রন্থকার তার রচনার বিষয়বস্তু বিপ্লব সম্পর্কে নিজের মতামত যেমন হাজির করেন। প্রত্যেক বিপ্লবী দল সমানভাবে সমস্ত বিপ্লবী সাহিত্য গ্রহণ করেন না। মতাদর্শ ও উদ্দেশ্য সাধনের পদ্ধতি অনুসারে এসব রচনা বিপ্লবী দলের কাছে স্বীকৃত হয়। কখনও এসবের জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে রাষ্ট্র এসব গ্রন্থ নিষিদ্ধ করে। তারপরেও গোপনে, হাতে হাতে, কারাগারে পর্যন্ত এর বিতরণ চলে। বলাই বাহুল্য, প্রচলিত জীবনযাপন রীতি-সমাজের আদর্শ রচিত সাহিত্য থেকে বিপ্লবী সাহিত্যের আদর্শ সচরাচর ভিন্ন হয়। এক একটা রচনা হয়ে ওঠে এক একটা বিপ্লবের প্রতীক।
উল্লেখ্য, ১৯১৭ সালে মার্কসবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব সফল হয়। ১৯২৯ সালে চীনের প্রজাতন্ত্র সফল বিপ্লবের মাধ্যমে গণ প্রজাতন্ত্রী চীনে পরিণত হয়। ১৯৬৭ সালে ভারতে কানু সান্যালের নেতৃত্বে সিপিআই (এমএল) গঠিত হয়। এসব বিপ্লব ও বিপ্লবী প্রচেষ্টা বিপুল পরিমাণে বিপ্লবী সাহিত্য সৃষ্টিকে প্রণোদিত করেছে। এসব সাহিত্যের মধ্য দিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি ও সাহিত্য সমালোচনার আদর্শ নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পরিপ্রেক্ষিত অনুসারে বিপ্লবী সাহিত্যের মানদণ্ড নির্ণয় করতে গিয়ে সকলে একমত হননি। বহু মত বহু পথের উদ্ভব হয়েছে।
সামগ্রিক বিষয়টি এক দীর্ঘ নিবন্ধের বিষয়বস্তু, যার মধ্যে একটা বড় অংশ জুড়ে থাকবে মাও সে তুং-এর ইয়েনান বক্তৃতার প্রসঙ্গ। এই রচনাটি তার মুখবন্ধ মাত্র।
এছাড়া রাশিয়া, (গত শতকের) চীন, কিউবা, লাওস, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ ক্লাসিক কমিউনিস্ট শাসনরীতি প্রবর্তন না করেও পরিবর্তিত কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা অভিযোজিত করেছে। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে সমাজতান্ত্রিক বা বিপ্লবী সাহিত্যের উল্লেখের প্রয়োজন হয়েছে। বিপ্লবের লক্ষ্যে কাজ করা দলগুলোতে সমাজতান্ত্রিক সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবী সাহিত্যের আলোচনা চলে। উনিশ শতকের রাশিয়া থেকে যার বড় বর্গ গড়ে ওঠে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পরে এ সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আলোকে বিপ্লবী সাহিত্যের মানদণ্ড দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়।
রুশ বিপ্লবের সময় রুশ সাহিত্যে ফিউচারিজম, কিউবো ফিউচারিজম, প্রাগম্যাটিজম ও কনস্ট্রাক্টিভিজম নামের আভাঁ গার্দ আন্দোলনগুলো সক্রিয় ছিল। তাদের চাওয়া ছিল রুশ সাহিত্যের ট্র্যাডিশন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং নতুন করে সৃষ্টি করা। তাদের প্রতি লেনিনের ব্যক্তিগত সমর্থন থাকলেও শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মার্কস-এঙ্গেলসের মতো ধ্রুপদী মনোভাবের অধিকারী। বিদ্যমান বুর্জোয়া সাহিত্যের সেরাটুকু নিয়ে চলার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। তাছাড়া বিপ্লবের পরে তিনি যখন সবকিছুতে শৃঙ্খলা আনতে চাইছিলেন তাতে আভাঁ গার্দরা শীঘ্রই হতাশ হয়ে পড়লেন। লেনিন বিপ্লবী সাহিত্যের আদর্শ পুরোপুরি স্থির করে দিতে না পারলেও প্রাথমিক শৃঙ্খলা আনার কাজটি শুরু করেন। ‘পার্টি সাহিত্য’ নামের রচনায় লেনিন উল্লেখ করেন―‘পার্টির শাসনের অধীনে এক সাহিত্য, পার্টিমনস্ক সাহিত্য, সোভিয়েত জীবন কেমন হওয়া উচিত তার রেপ্রিজেন্টশন ব্যাখ্যা করে ও প্রচার করে।…
‘একে হতে হবে পার্টি সাহিত্য, বুর্জোয়া রাজনীতি থেকে মুনাফাসন্ধানী বাণিজ্যকৃত বুর্জোয়া প্রকাশনা থেকে অভিজাততান্ত্রিক নৈরাজ্যবাদ এবং মুনাফা অর্জনের তাড়না থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত অবদানে দাঁড়িয়ে, সমাজতান্ত্রিক প্রলেতারিয়েত শ্রেণিকে অবশ্যই তুলে ধরতে হবে, পার্টি সাহিত্যের নীতি, বিকশিত করে তুলতে হবে। এই নীতিটিকে যথাসম্ভব সম্পূর্ণ ও সর্বাঙ্গীন করতে হবে প্রয়োগ ক্ষেত্রে।
‘পার্টি সাহিত্যের এই নীতিটি কী ? এটা কেবল এই নয় যে, সমাজতান্ত্রিক প্রলেতারিয়েতের পক্ষে, সাহিত্য হতে পারে না ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ধনবান করার একটা উপায়; বস্তুতপক্ষে তা হতে পারে না প্রলেতারিয়েত শ্রেণির অভিন্ন আদর্শ থেকে নিরপেক্ষ একটা ব্যক্তিক উদ্যোগ।ৃসাহিত্যকে অবশ্যই হতে হবে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির অভিন্ন ভাবাদর্শের অংশ, সমগ্র শ্রমিক শ্রেণির সমগ্র রাজনৈতিক অগ্রগতির দ্বারা গতি সঞ্চারিত এটি একটি বিরাট সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক অস্ত্রের ‘নাট ও বল্টু’। সাহিত্যকে হতে হবে সংগঠিত পরিকল্পিত ও সুসংহত সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি কর্মসূচির একটি উপাদান।’
বিপ্লব পরবর্তী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পর্বে লেনিন পার্টিকে সর্বোচ্চ স্থান দেন। পার্টি এক সংগঠন হিসেবে রচনাকে তার সাথে প্রয়োগ করে, রচনার স্বার্থ পৃথকভাবে বিবেচিত হয় না।
অনেক ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে রচনার উপরে পার্টির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই ধাপের পরে বড় মাপের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনতে স্তালিন ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা’র আকার দেন। তার আগে সর্ব রুশীয় স্তরে বিভিন্ন প্রস্তাব ওঠে। তবে সেসব রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত হয় না। লেখক কংগ্রেসে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার রূপরেখাটি গৃহীত হয়।
এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আর একটি মত পাওয়া যায়। চীনের মহান সাহিত্যিক লু সুন এক সামরিক একাডেমিতে বিপ্লবীদের মাঝে বক্তৃতা করছিলেন। তাঁর কথায় রেভ্যুলশনারি সাহিত্যের বাস্তবতা বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে ফুটে ওঠে। তবে তাতে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিস্থিতি ছিল না। চীনের অন্যান্য বামপন্থি সংগঠনের মতামতের মতো লু সুনের মতও আলোচনার স্তরে থেকে যায়। তবে, মাও সে তুং ইয়েনান বক্তৃতার শুরুতে তাৎপর্যপূর্ণভাবে লু সুনের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীর উল্লেখ করেন।
লু সুন নিজে সাহিত্য-বিশেষজ্ঞ নন, তবে নিজের উৎসাহে বিভিন্ন সাহিত্য পাঠ করেছেন। সেসব বিপ্লবীদের কাজে আসবে বলে মনে করেন না তিনি। তার বেইজিংয়ে থাকার বিগত সময়ে পুরোনো ধাঁচের সাহিত্য কোনও কাজে আসতে দেখেন না যখন রাষ্ট্রশক্তিগুলি করে ছাত্র হত্যা করে ও কঠোর সেন্সর আরোপ করে। ক্ষমতাহীনরাই কেবল সাহিত্য নিয়ে আওড়ায়, শক্তিমানরা সাহিত্য নিয়ে মাথা ঘামায় না। শোষক শোষিতদের হত্যা করেই চলে। বাস্তব বিশ্বে এমনটাই ঘটে। লেখক ভালো কিছু লিখলে একটা স্মারক বা পুরস্কার জোটে। তারপরেও বিপ্লবের পেছনে সাহিত্যিক প্রণোদনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, বিপ্লব আসতে বিপ্লবীদের দরকার… বিপ্লবীরা যখন লিখতে শুরু করবে তখনই বিপ্লবী সাহিত্য হবে।
লু সুনের এই যুক্তি সত্ত্বেও বিপ্লবের সঙ্গে সাহিত্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিপ্লবের সময়ে রচিত সাহিত্য সাধারণ সময়ে রচিত সাহিত্যের চেয়ে ভিন্ন হয়। সফল বিপ্লব সাহিত্যের কনট্যুর পালটে দেয়। বিপ্লব সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত লোকে আতঙ্কিত হয়। বিপ্লবে বিশেষ বলতে এর সাহায্যে সমাজ সংস্কার হয় এবং মানবজাতি প্রগতির পথে অগ্রসর হয়। বস্তুত, মানবজাতি বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রজাতিকুলে হোমো স্যাপিয়েন্স হিসেবে টিকে রয়েছে। তবে প্রকৃত বিপ্লবের সাহিত্যের উপরে কী কী প্রভাব রয়েছে তা লু সুনের মতে মোটামুটি তিন ধরনের: ক. বিপ্লবের আগে পর্যন্ত সমস্ত সাহিত্য বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে যাতনা ভোগ ও অসাম্য তুলে ধরে। সেসব নিয়ে অভিযোগ তুলে ধরে ও সাম্যহীনতার বিরুদ্ধে ক্রন্দন করে―বিপ্লবের উপরে সেসবের কোনও প্রভাব নেই। কারণ তার শক্তি নেই; শোষক তার প্রতি কোনও মনোযোগ দেয় না। কোনও কোনও জাতি নিষ্ফল জেনে এই অভিযোগ করা থেকে বিরত থেকেছে।
আবার শক্তিশালী ও অস্বীকারকারী জাতির বেলায় তারা দুঃখের মেঘের পেছনে আলো ও প্রগতির রেখা দেখতে পায়। তাতে একটু একটু করে ক্রোধ জমা হয়। তার থেকে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে ও প্রতিহিংসা জন্ম নেয়। রুশ বিপ্লবের আগে এমন সাহিত্য অল্পই। ব্যতিক্রম বলতে পোল্যান্ডে এমন প্রতিরোধ সাহিত্য ইউরোপে মহাযুদ্ধ আনে, যার থেকে পোল্যান্ড স্বাধীন হয়।
খ. তবে বিপ্লব সংগঠিত হলে কোনও কিছু আগের অবস্থায় থাকে না। বিপ্লবই সমস্ত কিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। জীবন দুস্থ হয়ে পড়ে, লোকে অস্তিত্বের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত থাকে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অবকাশ জোটে না। যারা অতীতের জন্য বাঁচে তারা ক্ষিপ্ত হয় এবং সাহিত্যচর্চার মতো ফুরসত পায় না। তখন সামাজিক স্থিতির খোঁজ করাই জরুরি, বিপ্লবের সময়ে সাহিত্য সাময়িকভাবে নীরব থাকে।
গ. বিপ্লব সফল হলে সামাজিক পরিবেশ উন্নত হয়, লোকের জীবনে প্রাচুর্য আসে, তখন আবারও সাহিত্য সৃষ্টি হতে থাকে। এই পর্বে দুই ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি হয়। প্রথম ধরন বিপ্লবের প্রশংসা করে। প্রগতিশীল লেখকরা এই ভাবনাকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন―কীভাবে সমাজ পালটে গেল এবং প্রগতি সমাজের পুরোনো নিয়ম ধসে যাওয়ার ভূমিকা রেখেছে এবং নতুন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে।
আরেক ধরনের সাহিত্য পুরোনো কালের অবসান নিয়ে বিলাপ করে। কেউ একে প্রতিবিপ্লবী সাহিত্য বলতে চায়, কিন্তু লু সুনের মতে এর সৃষ্টিও অবশ্যম্ভাবী। তাই এসব সৃষ্টি করা অপরাধ নয়।
বিপ্লব ক্রমে এগিয়ে গেলেও পুরোনো রীতির বহু মানুষ থেকে যায়; নতুন রীতিতে পরিবর্তিত হতে না পারা অনেক মানুষ থেকেই যায়। যাদের মন পুরোনো চিন্তা ও বিষয়ে ভরা থাকে। তারা সে সমস্ত পুরোনো সময়ের স্মৃতিচারণ করে ও পুরোনো সমাজের জন্য গৃহকাতর হয়ে পড়ে। সেভাবে পুরোনো ও অচল ভাষা ব্যবহার করে এক ধরনের ভাষা সৃষ্টি করে। এই ধরনের সাহিত্য সেই অস্বস্তি ধারণ করে ট্রাজিক ধরনের হয়ে থাকে। পুরোনো রীতির ধ্বংসের পাশে নতুনের প্রতিষ্ঠা তারা শোকগাথা গাইতে শুরু করে। তারা দেখায় বিপ্লব কোনও প্রগতি আনেনি, বিপ্লব না হলে পুরোনো আমলে কী কী হতো। তাই শোকগাথা গাও। তাদের উপরে বিপ্লব কোনও প্রভাব রাখে না।
চীনের ক্ষেত্রে এই দুই ধরনের সাহিত্যের একটাও হয়নি। বিপ্লব তখনও সফল হয়নি। পুরোনো রীতির সাহিত্য বিরাজ করেছে এবং প্রাচীন স্টাইলে সমস্ত রচিত হয়েছে। কোনও অভিযোগ, অসাম্যের কথা নেই, রয়েছে সম্মিলন, যাত্রার ছবি। কোনও গণসাহিত্য নেই চীনে। সমস্তটাই কিছু এলিটদের নিয়ে, অভিজাতের মানদণ্ডে নির্ধারিত ছিল, নিচুতলার মানুষের তাতেই আনন্দ করা ছাড়া উপায় নেই। শ্রমিক বা কৃষকদের নিয়ে রচিত হলেই তা গণসাহিত্য হয় না। তা মানুষের সত্যি কাহিনি হয়।
সদ্যই চীনের কথাসাহিত্য অন্য দেশের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে উঠেছে। এর লেখকরা সবাই পণ্ডিত, মেধাবী।
এতে শ্রমিক ও কৃষকরা যুক্ত না হলে চিন্তার বিন্যাস পালটাবে না।
লু সুন তাই উপস্থিত বিপ্লবীদের সাহিত্যচর্চার পরিবর্তে লড়াই করতে বলেন। তিনি নিজে লেখা ছাড়া অন্য কোনও কাজ শেখেননি। সাহিত্যের ধ্বনির চেয়ে কামানের গোলার আওয়াজ শুনতে মধুর বোধ করবেন।
বিপ্লবীদের সামনে লু সুনের এই বক্তৃতা দেওয়ার সময়ে সোভিয়েত রাশিয়ায় সবচেয়ে টেকসই বৃহৎ কলেবর গণসাহিত্য রচনার আয়োজন চলছে। ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পর থেকেই এই সাহিত্য ‘নব্য সোভিয়েত’ মানুষকে চিত্রিত করা শুরু করে। ১৯৩২ সালে সোভিয়েত লেখকদের ইউনিয়ন সংগঠিত হয় সোভিয়েত সাহিত্যিক বাঁককে চিহ্নিত করে। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এর স্পন্সর করে, যার লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত লেখকদের একত্র করা এবং সাহিত্যিক সৃষ্টিকে একত্র করা। ১৯৩৪ সালে এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। যাতে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাকে সরকারিভাবে সাহিত্যিক শৈলী হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের প্রসারে সাহিত্যের ভূমিকাকে গুরুত্বসহ দেখা হয়। যার লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত জীবনকে চিত্রিত করা। যার ফলে এক ইতিবাচক ও ভাবাদর্শগত গভীর ধরনে সৃষ্টির প্রসার ঘটতে পারে।
এই লক্ষ্যেই ইউনিয়নটি অন্যান্য ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কমিটার্নের পপুলার ফর্মে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দল ও পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে পপুলার ফ্রন্ট গঠন। আসন্ন নাৎসি বাহিনীর শক্তিমান হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে কমিন্টার্নের এই ধাপে গৃহীত উদ্যোগটি ১৯২৩ সালে স্তালিন ঘনিষ্ঠ আঁদ্রে ঝ্দানভ শুরু করেন। ১৯৩৪ সালে অনুষ্ঠিত এই কংগ্রেসে ‘পার্টিনস্ত’ নামে পরিচিত ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’ প্রস্তাবিত ও অনুমোদিত হয়। বিখ্যাত সাহিত্যিকরা যেমন, মাঝারি-ছোটখাটো সাহিত্যিকরাও এতে বড় হন। শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র,তরুণ উদ্যোক্তা ও বুদ্ধিজীবীরা পত্র পাঠিয়ে এই প্রয়াসকে অভিনন্দিত করেন। মিলিয়ন পাঠকের প্রতিনিধি কংগ্রেসে হাজির হন। উপস্থিত লোকরা সভাপতিত্ব করার জন্য ম্যাক্সিম গোর্কিকে নির্বাচিত করেন। এই সহযাত্রী লেখকরা পরে পদত্যাগ করেন।
তাদের লক্ষ্য ছিল ‘নব্য সোভিয়েত’ মানবের উপযুক্ত চিত্রণে সর্বহারা বিপ্লবের উপযোগী সাহিত্য সৃষ্টির আয়োজন করা। এই লক্ষ্যে কংগ্রেসের সময়ে মুদ্রণের নিয়ন্ত্রণ, বিতরণ, প্রকাশনা শিল্প ও থিয়েটার পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় পরম ভেটো প্রদানের ক্ষমতাসহ। লেখক ইউনিয়নের মডেলে শীঘ্র অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
এই লক্ষ্যে গোর্কি সোভিয়েত মানবের ব্যাখ্যা করেন:
সোভিয়েত ইউনিয়নে এক নতুন ধরনের মানবের উদ্ভব হচ্ছে… যে যুক্তির সংগঠনী ক্ষমতায় আস্থাশীল… যে নতুন এক বিশ্ব গড়ছে সে সম্বন্ধে সচেতন এবং তার জীবনের পরিবেশ এখনও পাল্টায়নি পুরোপুরি। সে জানে এ তার লক্ষ্য ও তার যৌক্তিক লক্ষ্যের উদ্দেশ্য ভিন্নতর পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং এর জন্য নিরাশাবাদের কোনো স্থান নেই।
এর প্রবক্তা বাদানভের কথায় সমস্ত শিল্পের লক্ষ্য ছিল, ‘বিপ্লবী বিকাশের আদর্শে বাস্তবতাকে চিত্রিত করা। তাই সমস্ত আর্টিস্টকে মানব আত্মার কারিগর হতে হবে।’ ১৯২০-এর দশক থেকে বিভিন্ন শৈল্পিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী নতুন রাষ্ট্রে আর্টের ভূমিকা কী হবে এ প্রসঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছে। পুরোনো বলশেভিক গোষ্ঠী যার মধ্যে রয়েছে লেনিন, লুনাচারস্কি―যারা মনে করেন নতুন সংস্কৃতি অতীতের সেরা আর্টের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। লড়াকু কম্যুনিস্ট সাংস্কৃতিক সংগঠন যেমন রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রলেতারিয়ান মিউজিশিয়ানস মনে করে আর্টের উপরে সর্বহারার নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
১৯২৮-৩১-এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে লড়াকু গোষ্ঠী প্রাধান্য পেলেও ট্র্যাডিশনাল মূল্যবোধে বাঁক নেওয়ার মধ্য দিয়ে গতিপথ নির্ধারিত হয়। ১৯৩২-এর এপ্রিলে সোভিয়েত নেতৃত্ব সমস্ত সাংস্কৃতিক সংগঠন বন্ধ করে দেয় ও সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের প্রবর্তন করে। প্রথমে যাকে এক ধরনের স্বাধীনতা মনে হয়েছিল পরে লক্ষ করা গেছে বিপ্লব সম্পৃক্ত যুগে ও দেশে বিপ্লবী সাহিত্য নিয়ে এক ধরনের সন্দর্ভ গড়ে ওঠে। ভিন্ন ভিন্ন মতের প্রতিফলন হিসেবে তাকে দেখা যেতে পারে, যার মধ্য থেকে কোনও একটি মতকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সমন্বয় বা সমঝোতা হিসেবে। বিশেষ মতটি প্রাধান্য পেলেও ভিন্ন মতগুলো লুপ্ত না হয়ে আড়ালে চলে যায় মাত্র। দমনের শিকার হওয়া সেই মতগুলো প্রাধান্যকর পরিবেশটি দুর্বল হলে প্রকাশ পেতে থাকে। যেমন করে পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের ক্ষেত্রে বহু লেখক মতপার্থক্য জানিয়ে ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যান বা নির্বাচিত হন।
তাই গৃহীত বা স্বীকৃত সরকারি মতটি যুগের পর যুগ একই রকম তাৎপর্যে গৃহীত হয় না। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার অর্থ পালটে যায়। কোনও মতই পরম মত নয়। বরং এক শতকেরও বেশি সময়ে এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতে দেখা গেছে। এই বিতর্ক ঘিরে নির্দিষ্ট সন্দর্ভ সৃষ্টি হয়েছে সেই সন্দর্ভকে প্রাথমিকভাবে মার্কসবাদের আলোকে বিবেচনা করতে হবে সমগ্র বিপ্লবের অনুষঙ্গ অনুসারে। মার্কসবাদের ইতিহাসে এ আরেক বৈচিত্র্য। মার্কসবাদ একস্বরের প্রাধান্য দিলেও এসব মতের অস্তিত্ব প্রাণবন্ত বিতর্ক সৃষ্টি করে। সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের ক্ষেত্রে রাশিয়ায় তৈরি হওয়া পরিস্থিতির অবিকল ঘটেছে চীনে। চীনের ইয়েনান প্রদেশে মাও-এর শিল্প ও সাহিত্য নিয়ে দেওয়া বক্তৃতায় এর পরিণত রূপ দেখা যায়।
১৯৪১ সালের ২ মে থেকে ২৩ মে হওয়া তিনটি অধিবেশন ছিল ইয়েনান সোভিয়েত এবং রেক্টিফিকেশন আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার অন্যতম। মাও সে তুং-এর দেওয়া আর্ট ও সাহিত্য সম্পর্কে বক্তৃতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যার প্রধান দুটি বক্তব্য হলো :
ক. সমস্ত আর্টকে শ্রমিকের জীবন বিবেচনা করা উচিত এবং তাদের দর্শক হিসেবে।
খ. আর্টকে রাজনীতির সেবা করা উচিত, বিশেষ করে সমাজতন্ত্রের অগ্রগতিকে।
১৯৩৪-৩৫ সালে চীনে লং মার্চের সময়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও পিপলস লিবারেশন আর্মির চেয়ারম্যান গান, নাটক ও বাদ্য ব্যবহার করে নাগরিকদের নিকট আবেদন রাখেন; কিন্তু একীভূত সাংস্কৃতিক নীতি ছিল না। ১৯৩৭ সালে দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হবার পরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শিল্প সংগঠনের প্রধান বার্তা ছিল জাপানকে বিরোধিতা করো, জাপানকে প্রতিরোধ করো। ১৯৩৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ইয়েনান একাডেমি অফ ফাইন আর্টস প্রতিষ্ঠা করে, যা জনগণকে সাহিত্য শিল্প নাটক ও সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ দেয়। ১৯৪০ সালে মাও এক নীতিগত বিবৃতি দেন, বর্তমান স্তরে চীনের নতুন সাংস্কৃতিক নীতি হলো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সামন্তবাদবিরোধী সর্বহারার সংস্কৃতির নেতৃত্বে পপুলার মাসের নতুন গণতন্ত্র। ১৯৪২ সালের রেক্টিফিকেশন আন্দোলনের সময় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি মাওবাদের ক্যাডারদের মাঝে ভাবাদর্শগত বন্ধন জোরদার করতে বিভিন্ন পথ অবলম্বন করে যা সোভিয়েত স্টাইলে মার্কসবাদ লেনিনবাদের থেকে ভিন্ন। ইয়েনানের বক্তৃতাটি ছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে বুদ্ধিজীবীদের দ্ব্যর্থক ভূমিকা নিয়ে এক লেখকের মাও সে তুংকে বলার জন্য অনুরোধের ফল। এভাবে শুরু হয় আর্ট সৃষ্টির লক্ষ্য ও পদ্ধতি নিয়ে তিন সপ্তাহের অধিবেশন। এই বক্তৃতার বিষয়বস্তু হলো গণসংস্কৃতি নিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নীতি, তা হবে বিপ্লবী সংস্কৃতি। এর অন্তঃশীল ধারণা হলো আর্টকে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আইডিয়াকে গ্রামীণ কৃষকদের জন্য বাস্তবায়িত করতে হবে। এতে বলা হয়, সাংস্কৃতিক কর্মী ও মাস একে অন্যের জন্য শিক্ষক ও ছাত্র হিসেবে কাজ করবে। আর্টের এই বিপ্লবী স্টাইল কৃষকদের জীবনকে চিত্রিত করবে এবং তাদের দর্শক হিসেবে চালনা করবে।
মাও সাহিত্যিকদের উৎসাহিত করেন গ্রামাঞ্চলে বাস করে নিজেদের রূপান্তরিত করতে, পপুলার মিউজিক ও লোকসংস্কৃতি অধ্যয়ন করতে এবং উভয়কে তাদের সৃষ্টিতে মূর্ত করতে। আর্টের জন্য শত্রু-মিত্রকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই আর্টিস্টদের অনুরোধ করেন শত্রুদের নিষ্ঠুরতা ও পরাজয়ের অনিবার্যতা প্রকাশ করতে। এর সঙ্গে বলেন আর্ট মূল্যায়নের কোনও পরম মানদণ্ড নেই, কেবল পরিপ্রেক্ষিতগত ও প্যারাডাইমগত বিবেচনা রয়েছে। তাই শিল্পের জন্য শিল্প বলে কিছু নেই। আর্ট ও সাহিত্যে মাওয়ের দাবি রুশ পরিভাষার সঙ্গে পরিচিত থাকায় পরিপূর্ণতা পায় ; প্রকৃতই চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এক্ষেত্রে রাশিয়ার পদক্ষেপ লক্ষ্য রেখেই চলছিল; যেমন, ইডিওনস্ত (ভাবাদর্শগত প্রকাশ), পার্টিনস্ত (পার্টি চেতনা) এবং নারোদনস্ত (জাতীয় বৈশিষ্ট্য)। তাই ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশকারী কোনও লেখকের স্থান ছিল না। এরা চিহ্নিত হয়েছিলেন এক অপর হিসেবে : পার্টির প্রকাশনা দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তের কথায়, বিপ্লবী সাহিত্য ও শিল্পকে সমগ্র বিপ্লবী দায়িত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে মনে করি। কিন্তু তারা সবাই মনে করে সাহিত্য ও শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে, [তাদের মতে] রাজনীতির শিল্প ও সাহিত্যের অধীন হওয়া উচিত, শিল্পীরা রাষ্ট্রনায়কদের চালাবে বা সাহিত্য ও শিল্প এক স্বাধীন রাজ্য গঠন করবে―−শিল্প ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব বা স্বাধীনতা নিয়ে এই ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’ বিভাজন। এই ‘ওরা’ বলতে হিউম্যানিস্ট এবং বিভিন্ন বামপন্থি সাহিত্যিকদের বোঝানো হয়েছে, যাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব মত বিনিময়ের স্থান হিসেবে ইয়েনান ফোরামে উপস্থাপিত হয়েছিল। ঐ আয়োজনে দুইশোর বেশি লোককে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা সদলবলে যোগ দেন, সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। যদিও এই আলোচনার পূর্ণ রূপ পাওয়া যায়নি। মাও এই বিতর্ককে ‘বিরাট’ ও উত্তপ্ত বলে উল্লেখ করেন। মাও যেসবের খণ্ডন করেন তার কিছু আকর্ষণীয় অংশ তার রচনাসংগ্রহে স্থান পেয়েছে। তারা পাতি বুর্জোয়া লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ‘মে ফোর্থ’ ট্র্যাডিশন হাজির করেন, মানবপ্রকৃতির বিকাশের প্রবক্তা ও মার্জিত ভাবাবেগের, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বসহ রোমান্টিকরা, ব্যঙ্গকারী ও নীরব বাস্তববাদীগণ। ফোরামে তারা বক্তব্য রেখেছেন কিন্তু পরে আর তাদের ভুলকে পুনরাবৃত্তি করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাদের চিন্তা ও অনুভবকে রূপান্তর ও পুনঃসজ্জিত করতে হয়েছে।
মাও-এর বক্তব্য উঁচুতে উঠতে থাকে এবং বিতর্ককে নীরব করেন। এই ১৯৪২ সালেই সম্ভবত তাঁকে সবচেয়ে বেশি কর্তৃত্বপূর্ণ শোনা যায়। এই সময়েই সাহিত্যিক শৈলী, সৃজনশীল রচনা, রম্য রচনা, নাটক ও আর্ট নিয়ে কথা বলেন তিনি।
তবে এই ফোরামে যোগ দেওয়া লেখকরা সবাই বুর্জোয়া ছিলেন না। বামপন্থি, কম্যুনিস্ট ভাবাপন্ন লেখকরাও তাতে ছিলেন। এবং ইয়েনান ফোরামে তারা ব্যক্তিগতভাবে অনেক বিব্রতকর প্রশ্ন তোলেন। প্রথমে মাও সে তুং আলোচনাকে পাঁচটি বিভাগে ভাগ করে দেন। সমকালীন চীনে মাওয়ের বক্তৃতা শুনতে আরও অনেক দর্শনার্থী, বিদেশি পর্যটক এসে হাজির হন। ফলে, খোলা জায়গায় আলোচনাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। মাও-এর বক্তৃতার পথ প্রদর্শন দিল। মনে রাখতে হবে, ইয়েনান ফোরামে বক্তৃতার সময়ে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ঐ প্রদেশে রেক্টিফিকেশন আন্দোলন চলছিল। কী কী প্রশ্ন উঠতে পারে এজন্য মাও একাধিক ব্যক্তিকে প্রস্তুত করেছিলেন। এরপর তিনি উদ্বোবোধনী বক্তৃতা দেন এবং আলোচ্য বিষয়টিকে পাঁচটি রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ করেন―মার্কসবাদ-লেনিনবাদে শিল্পীর অবস্থান, দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শক জীবনের সঙ্গে পরিচিতি এবং অধ্যয়ন। ভিন্ন মতাবলম্বীদের এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিক্রিয়াশীল হবার পক্ষে ঝুঁকি ছিল। তারা সে দিকে পা বাড়াননি। কী কী তর্ক-বিতর্ক হয়েছে তা চাপা পড়ে গিয়েছিল। ফোরামের পরে তার থেকে ভিন্ন সমস্ত কিছু রহিত হয়েছিল। বহু লেখক পণ্ডিতও বহিষ্কৃত হন। কিন্তু ফোরামপূর্ব সময়ে লেখকদের দলাদলির ফলে সৃষ্ট ক্ষতের কথা কয়েক বছর পর লেখকদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়। ঈর্ষা ও ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের কারণে তারা সূচনায় কমিউনিজমবিরোধী না হলেও পরে সে অবস্থানে গিয়ে পৌঁছান। গোষ্ঠীবদ্ধতার কারণে তারা এক অবস্থানে গিয়ে পৌঁছান। এছাড়া, ক্রিয়েশন সার্কেল-এর মতো সংগঠন অনেক আগে থেকেই বামপন্থার পথে হাঁটছিল। এভাবে, ১৯২০-র এবং ১৯৩০-র দশকের বামপন্থার চর্চাও এই সঙ্গে এসে মিলেছে। তাদের সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
ওদিকে জাপানি অগ্রাসন থেকে বেরিয়ে আসা লেখকরা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পেছনে শরিক হয়েছে চেতনার লক্ষ্য নিয়ে, কোনওভাবে জয়ী হবার লক্ষ্যে ইয়েনান ফোরামে জড়ো হয়েছে। তাদের কাছে তত বেশি প্রত্যাশা করার নেই।
ইয়েনান ফোরামের অধিবেশন শেষে চীনে পাতি বুর্জোয়া সাহিত্যের কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভিন্ন মতের সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা পরের প্রজন্মের মধ্যে পাতি বুর্জোয়া ভাবালুতার থিম পুনরাবৃত্ত হতে লক্ষ করা গেছে। তাদের অভিজ্ঞতার কথা ভিন্নমতের সাহিত্যিকদের স্মৃতিচারণে ফুটে উঠেছে ততদিনে, যে বিতর্কে অধিবেশনটি মুখর ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে গেছিল। এই ভাষণ প্রচারিত হওয়ার পরই এর রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে বিশ্বের অনেক স্থানে বৈরী সমালোচনার শিকার হয়। নির্দিষ্ট সময়পর্ব পরে বিভিন্ন স্থানে আলোচিত হয় তা। এর ২০ বছর পরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে এক দফা আলোচনা হয়। বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে এর উপযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই তিন পর্বে ইয়েনান ফোরামের ভাষণের তাৎপর্য ভিন্ন দৃষ্টিকোণসহ প্রমাণিত হয়।
এই ভাষণের এক অনুবাদের সম্পাদক জানাচ্ছেন, মাও ক্রমান্বয়ে এই ভাষণ সংশোধন করেছেন, ধীরে ধীরে সহনশীল শব্দবন্ধ দিয়ে তা প্রতিস্থাপিত হয়েছে অথচ তা উল্লিখিত হয়নি। মাও একটা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বিবদমান মতগুলোর মধ্যে সমাধান টানতে এই বক্তৃতার ডিকশন সম্পাদনার প্রয়োজন অনুভব করেছেন। তাই বলা যায়, মাও-এর ইয়েনান ফোরামের ভাষণ আদিঅন্ত অবিকল ছিল না। তা সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে।
ওদিকে উনিশ শতক থেকে বিশ শতক পর্যন্ত বিপ্লবী সাহিত্য বা রেভ্যুলশনারি লিটারেচারের সংজ্ঞার্থ নির্ধারণের প্রয়াস একটাই সূত্রে গাঁথা। তা মার্কসীয় দর্শনের আলোকে বিভিন্ন পথে সাধনের চেষ্টা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত মতটির সঙ্গে বিতর্কে হেরে যাওয়া মতগুলোও মার্কসীয় দর্শনের আলোকে চালিত। মার্কসীয় দর্শনে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি না পেলেও এগুলোকে মার্কসীয় দর্শনের চর্চার ধরন হিসেবে গণ্য করা চলে। এর পাঠান্তরসহ বিভিন্ন তাৎপর্যের আলোচনা সন্দর্ভের চেহারা নিয়েছে; যা থেকে এ বিষয়ে আগ্রহের পরিমাণ বোঝা যায়। সে আগ্রহ আজও অটুট রয়েছে। জারতন্ত্রের পতন থেকে বিশ্বায়নের যুগ পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে। উনিশ শতকের বিপ্লবীদের অভিজ্ঞতা, স্মৃতিচারণ হয়ে বিশ শতকের চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়িয়ে বিশ্বায়ন পাড়ি দিয়েছে এই বিপ্লবী সাহিত্যের চিন্তন। ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
তথ্যসূত্র
সাইদ উর রহমান (সম্পা), মার্কস ও মার্কসবাদীদের সাহিত্যচিন্তা; ঢাকা
পীযূশ দাসগুপ্ত (সম্পা), শিল্প ও সাহিত্য প্রসঙ্গে মার্কস থেকে মাও, কলকাতা
অরুণ সোম, রুশ সাহিত্যের ইতিহাস, কলকাতা
ম্যালকন ডি জোনস ও রবিন ফ্যুয়ার মিলার (সম্পা), কেম্ব্রিজ কম্প্যানিয়ন টু ক্লাসিক রাশিয়ান নভেল, লন্ডন
প্রগ্রেস পাবলিশার্স, মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট অ্যাসথেটিকস অ্যান্ড দ্য আর্টস, মস্কো
এশিয়ান শিয়া, দ্য গেইট অফ ডার্কনেস : স্টাডিজ অন দ্য লেফটিস্ট লিটারারি মুভমেন্ট ইন চায়না, লন্ডন
বোনি মেডুগাল, মাও সে তুংস টকস অ্যাট দ্য ইয়েনান কনফারেন্স অন লিটারেচার অ্যান্ড আর্টস, ইউএসএ
লেখক : প্রাবন্ধিক
সচিত্রকরণ : রজত



