গল্প : পাপ : সাঈদ আজাদ

এমন গরম, যেন সারা শরীর আগুনে সেঁকছে কেউ! পিঠের নিচটায় ভীষণ কুটকুট করছে। গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে গামছাও এখন ভিজা। সারা শরীর যেন জ্বলছিল আকাশের। অন্ধকারে পাশ ফিরতে গিয়ে টের পায় সে, ঘেমে সারা শরীরই ভিজে জবজব। পিঠের নিচে, কাঁথাটা ভিজে উঠেছে নোনতা পানিতে। ভিজে উঠেছে কাঁথার নিচে পাটিটা পর্যন্ত।

 ঘরটায় একমাত্র দরজা। সেটাও উত্তর দিকে। কোন জানালা নেই এই ঘরে। এক ফোঁটা বাতাস ঢোকার জো নেই। মুরব্বিদের কাছে শুনেছে আকাশ, চোর আর বাতাস নাকি বের হওয়ার পথ না থাকলে ঢুকতে চায় না! একারণেই বোধহয় ঘরটায় বাতাস  ঢোকে না। দম নিতেও কেমন কষ্ট হচ্ছে আকাশের।

আসলে এটা ঠিক ঘরও না। এ বাড়ির গুদাম হিসেবে ঘরটা ব্যবহৃত হয়। ঘরের এক পাশে বড় বড় ধানের গোলা। গোলা ভরতি ধান। আরেক পাশে সারা বছর ব্যবহারের জন্য স্তূপ করে রাখা পাট। তার পাশে কিছু লাকড়ি পাঁজা। এর মাঝে দরজার কাছটায় এক ফালি জায়গায় বিছানা করে শোয় আকাশ।

ধানের গোলা আর পাটের স্তূপ থেকে কেমন একটা গরম ভাপ আসছে। তাতে যেন ঘরের গরমটা  আরও বাড়ছে।   

বৈশাখের এ সময়টাতে খুব ঝড় বৃষ্টি হয়। কিন্ত এ বছর কেন জানি এখনও বৃষ্টি হয়নি এক ফোঁটা। বৃষ্টি হলে হয়তো ধরণী কিছুটা ঠাণ্ডা হতো। নাহ, এ গরমে ঘুমানো অসম্ভব। তার ওপর মশার কামড়। ছেঁড়া একটা মশারি আছে অবশ্য, কিন্তু মশারি টাঙ্গালে গরম আরও বেড়ে যায় বলে সেটা টাঙ্গানো হয় না কদিন ধরে। 

গরম সহ্য করতে না পেরে দরজা খুলে বাইরে বের হয় আকাশ। আহা, বাইরে কেমন ফুটফুট করছে জোছনা। এখন কত রাত কে জানে! মধ্য গগনে গোল চাঁদটা ছাড়া আর কোন কিছুর অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে না। চারপাশটা কেমন নিঝুম এখন। ঝিঁঝিরা ডাকছে না কেন কে জানে! তবে, বাইরে গরমটা একটু যেন কম। অন্তত ঘরের মতো শরীর জ¦ালা করছে না। হাঁটতে হাঁটতে আকাশ বাড়ির ছোট বউয়ের ভিটায় উঠে পড়ে।

প্রায় বছরদশেক ধরে এ বাড়িতে আছে আকাশ। কিন্ত কোনওদিন এত রাতে উঠানে দাঁড়িয়ে এভাবে বাড়ির চারপাশ দেখা হয়নি। কখন জোছনা ফুটফুট করে, কখন কুয়াশায় চারপাশ মায়াবী লাগে―ঘরের বের হয়ে  যে দেখবে, সে সময়টাই নেই তার। কাজে কাজেই দিন যায়। রাত পোহায়।

চাঁদের আলোতে সবকিছু কেমন শান্ত আর অদ্ভুত লাগছে। উঠানে কিছুক্ষণ পায়চারি করে আকাশ। ঘুমে চোখ বুজে বুজে আসছে। সারাদিন এক মুহূর্ত বসার সুযোগ হয় না বললেই চলে। সে কারণেই বুঝি দাঁড়িয়ে থাকতেও ভালো লাগছিল না এখন।

বড় গেরস্থের বাড়িতে কাজের অভাব হয় না। উঠতে হয় সেই ফজরের আজানের পর পর। আধার থাকতেই শুরু হয় কাজ। কাজ শেষ হতে হতে চারপাশে মাগরিবের আজান। মাঝে, দুপুরে তাড়াহুড়া করে খাওয়া। সন্ধ্যার পরই শরীর দখল করে নেয় ক্লান্তি। বিছানায় যেতেই দেরি। ঘুমাতে দেরি হয় না তার। এখন এই যে হাঁটছে, কেমন যেন শরীর টলছে ঘুমে। মনে হচ্ছে, যে কোনও সময় পড়ে যাবে সে। ইচ্ছে করছে উঠানেই শুয়ে পড়তে।

উঠানের কোণে বাঁশের মাচা। সেখানে গিয়ে শোয় আকাশ। আরামই লাগছে, শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে। আজ তারা নেই। চাঁদের আলোয় তারারা হারিয়ে গেছে! দেখেছে আকাশ―মানুষের জীবনেও এমনই হয়, বড়র দাপটে ছোটরা হারিয়ে যায়। … মেঘেরা কেমন ভেসে ভেসে যাচ্ছে! কালো কালো মেঘ। কালো মেঘেই তো বৃষ্টি হয়। হয় যদি বৃষ্টি, গরমটা তাহলে কমবে। ঘুমটা ভালো হবে। না ঘুমালে শরীর চলবে না। সকালেই উঠেই তো আবার কাজ। মেঘেরা চাঁদটাকে একবার আড়াল করছিল। আবার প্রকাশ করছিল। দেখতে দেখতে ঘুমটা যেন আরও বেড়ে যায় তার।

বাড়ির মালিক মমিনুল। অঢেল যার সম্পত্তি। মাঠের পর মাঠ ধানী জমি। পুকুরের পর পুকুর চাষ হয় মাছ। বাজারে ধানের আড়ত, পাটের আড়ত, মাছের আড়ত। তা মমিনুলের আয় যেমন, খরচটাও তেমন। বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকার বাড়াতে মমিনুল বিয়ে করেছে তিনটা। আলাদা তিন সংসার তার। বউরা পাশাপাশি তিন ভিটায় থাকে। সতিনসহ সংসার করতে বড় বউ আর মেঝ বউয়ের কোনও অনুযোগ নেই। যত সমস্যা ছোট বউয়ের। তার বয়স অন্যদের চেয়ে কম। বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি। প্রায় বাপের বয়সি বুড়ো স্বামীকে সে ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। বিয়েতে তার মতও ছিল না। কিন্তু তার বাপ বুড়ো মমিনুলের টাকাটাই দেখেছে। মেয়ের মনের কথা ভাবেনি। তা গরিবের চোখে টাকাই তো সব। মমিনুল অনেক চেষ্টা করে ছোট বউ তপুকে ঠিক বাগে আনতে পারেনি। গ্রামের সবাই তা জানে।

গরমে ঘুম আসছে না তপুরও! সারা শরীর যেন জ¦লছে। আগুন গরমেও পাশেই আম্বিয়া নাক ডাকছে। কদিন ধরেই বিকালে আকাশে মেঘ জমে, কিন্তু বৃষ্টি হয় না। অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে তপু বিছানা ছাড়ে। আম্বিয়াকে রেখে বাইরে এসে দাঁড়ায়। উঠানে পা দিয়েই মনটা ভালো হয়ে যায় তার। হায়রে, কী জোছনা বাইরে! আর তপু ঘরে গরমে পুড়ছে। এমন রাতে না ঘুমালে কী হয়!

তপু একটু কল্পনা বিলাসী। বিয়ে হয়েছে তিন বছর আগে। কিন্তু সংসারে তার মন নেই। অত বিত্ত আর সম্পদের মাঝেও চিত্ত তার সুখহীন। কেউ বিশ্বাস করবে না, তপু ভাবে, এখনও তার বিয়ে হয়নি। ভাবে, এখনও সে কুমারি। কল্পনা করে, তার বিয়ে হবে। শক্ত সমর্থ জোয়ান, শ্যামলা রঙের একটা ছেলে তার বর হবে। বরের সাথে জোছনা রাতে তপু শীষ ভরা ধানক্ষেতের আল ধরে হাঁটবে। শীতের পড়ন্ত বিকালে হলুদ ফুল ভর্তি সরিষা ক্ষেতের পাশ দিয়ে হাত ধরাধরি করে খালি পায়ে চলবে বরকে নিয়ে। তপ্ত দুপুরে, যখন খুব বৃষ্টি হয়, তপুর ইচ্ছে হয় অদেখা শ্যামলা বরকে নিয়ে ভিজতে। মাঝে মাঝে একাই ভিজে তপু। একাই হাঁটে। বাড়ির লোকেরা প্রথম প্রথম তাকে পাগল ভাবত। এখন তপুর পাগলামি তাদের চোখে সয়ে এসেছে।

গরিব ঘরের মেয়ে বলেই হয়ত তপু ঘর গেরস্থালির কাজ করতে পারে খুব। এবং দিনমান কাজ করেও সে। এ কারণেই কি না কে জানে, স্বামী আর বাড়ির লোকেরা তার পাগলামিগুলো মেনে নেয়।

আকাশ যেখানে শুয়ে আছে, সে জায়গাটায় চাঁদের আলো পড়েনি। উপরে তাল গাছ থাকায় জোছনা আটকে গেছে। দেখে চট্ করে কেউ বুঝতে পারবে না, যে ওখানে কেউ শুয়ে আছে। আকাশ কিন্তু শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে পাচ্ছিল ঠিকই।

তপু দেখেনি আকাশকে। তার ঘরটা বাড়ির এক পাশে। এরপরেই ধানের জমি। গরম লাগছিল বলে, তপু শাড়ি খুলে ফেলেছে। ওর পরনে এখন ব্লাউজ আর পেটিকোট। তপুর লজ্জা এমনিতেই কম। তার ওপর এখন বেশ রাত। আর ধারে-কাছে লোক বলতে এখন বুড়ি আম্বিয়া। যে রাতে তার সাথে থাকে। আসলে তাকে পাহারা দেয়। সে বুড়ির আবার গরম-শীত বোধ নেই। বিছানায় শরীর রাখলেই নাক ডাকা শুরু করে। গায়ের ওপর দিয়ে গরু হেঁটে গেলেও হুঁশ হয় না। মরার ঘুম ঘুমায়।

খড়ের গাদায় শাড়িটা জড়িয়ে রেখে, তপু আপন মনে উঠানে ঘুরছিল।

মৃদু একটা হাওয়া দিচ্ছে নাকি ? নাকি বাইরে বলে গরমটা কম লাগছে ? আকাশের চোখ লেগে এসেছিল। পদশব্দে চটকা ভাঙ্গে তার। কেউ কি হাঁটছে উঠানে ? আকাশ হঠাৎ বুঝতে পারে, কে হাঁটছে। 

এ বাড়ির ছোট বউটা কেমন যেন! মাথায় বোধহয় ছিট আছে। রাত-বিরাতে ক্ষেতের আইল ধরে হেঁটে বেড়ায়। মাঝে মাঝে উঠানে বসে গান গায়। গ্রামের সবাই এসব জানে।

আকাশ উঠে বসে।

তখনই তাকে দেখতে পায় তপু। স্বাভাবিক ভাবেই হেঁটে তপু আকাশের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। শাড়ি পরার কথা তার মনে হয় না। তার মনে হয় না, আকাশ কেন এত রাতে তার উঠানে শুয়ে আছে। তার দাঁড়ানোর মধ্যে কোনও জড়তাও নেই।

তপুকে দেখে শঙ্কিত হয় আকাশ। তপুকে সে আসলে ভয়ই পায়। সঙ্গত কারণও আছে ভয় পাওয়ার। ছোট বউ তার দিকে কেমন নজরে যেন তাকায়। সে তাকানোতে কী যেন আছে। আকাশের গা শিরশির করে। আবার ভালোও যেন লাগে। ছোট বউয়ের মত সুন্দরি তেইশ বছরের জীবনে আকাশ আর দেখেনি। কী গায়ের রঙ। যেন সদ্য পাকা গম দিয়ে চামড়া বানান! আর এমন চুল, গ্রামে কার আছে! আজকাল মেয়েদের তো লম্বা চুল দেখাই যায় না। চুলের দিকে তাকালে আকাশে জমা বর্ষার মেঘের কথাই মনে হয়। তপুর মুখখানাও দারুণ। তার চোখের দিকে তাকালে আকাশের বুকের মধ্যে যেন ঢোল বাজে।

আকাশ ভয় পায়। ভয় পায় সব কিছুতেই। তার মা নেই, বাপ নেই। স্বজন কেউ নেই। কিশোর বয়সতক সে বাজারে টুকটাক ফরমায়েশ খাটত। পেট ভরে খেতেও পারতো না। মমিনুল তাকে সেখান থেকে এনে কাজে লাগিয়েছে। সে জীবন দিয়েই খাটে। তা লোকজন বলে বটে সে বেশি খাটে। গাধার মতো। এ বাড়ির অন্য কামলারাও তাই বলে। কিন্তু আকাশ কৃতজ্ঞতা থেকেই সব করে। সে আশ্রয়টা হারাতে চায় না। 

তপু আকাশের পাশে বাঁশের মাচায় বসে। আকাশ ভয়ে ভয়ে একটু সরে যায়।

বাইরে কেন ? গরমে ঘুম আসতাছে না ? তপু খুব স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করে।

আকাশ দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত ভাবে জবাব দেয়, হুঁ।

আসলে খুব গরম লাগতাছিল তো, তাই শাড়িটা খুইল্যা ফেলছি। আমি আবার বেশি গরমে গায়ে কাপড় রাখতে পারি না। পরথম পরথম তোমার চাচা খুব রাগ করত। এখন কিছু কয় না। মাইন্যা নিছে। তা রাত ছাড়া তো আর কম কাপড়ে ঘুরাঘুরি করন যায় না। দিনে সারা বাড়িতে মানুষ গিজগিজ করে।

আকাশ চুপচাপ শোনে তপুর কথা। কিছু বলে না। 

একটু একটু বাতাস বইছে। দেখতে দেখতে হঠাৎ বাতাসের গতি বাড়তে থাকে। কেমন একটা শো শো আওয়াজ হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি হবে বোধহয়। আকাশ উদ্বিগ্ন স্বরে বলে, ঝড় অইব মনে অয়। চাচি, আপনি ঘরে যান।

ঘরে গিয়া কী অইব! বৃষ্টি আসুক, ভিজলে শরীরটা ঠাণ্ডা অইব। আসুক ঝড়। দুনিয়া ওলটপালট কইরা দিক। শইল্যের গরমটা আর সহ্য হইতাছে না। … আইচ্ছা, তুমি আমারে এত চাচি চাচি করো কেন ?

চাচি হন আপনি, চাচি ডাকমু না তো কী ডাকমু!

চাচি হই ঠিকই। কিন্তু তোমার মুখে চাচি ডাক শুনতে কেমন যানি লাগে। তুমি তো আমার বয়সিই হইবা।

হয়ত সমানই হমু। তা, সম্পর্ক বইল্যা একটা ব্যাপার আছে না। … আমি যাই। গরমটা এখন কমছে। ঘরে গিয়া ঘুমানোর চেষ্টা করি। সকালে উঠ্যাই তো কাজ শুরু করতে হইব।

আকাশ ঘরে পৌঁছতে পৌঁছতেই প্রচণ্ড বাতাস শুরু হয়। সেই সাথে বড় বড় ফোটার বৃষ্টি। টিনের চালে কেমন চিন চিন একটা আওয়াজ হচ্ছে। শোয়ামাত্র এই আওয়াজেই ঘুম চলে আসবে তার। সে দরজা বন্ধ করে না। থাকুক কিছুক্ষণ খোলা। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকলে ঘরের ভেতরেটাও ঠাণ্ডা হবে। হারিকেনের আবছা আলোয় আকাশ বিছানাটা ঠিকঠাক করে। টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দটা বেড়েই চলছে। কেমন একটা ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়ে আকাশের সারা শরীরে। যাক, বাকি রাতটা ভালো ঘুম হবে। … আাচ্ছা, তপু কি ঘরে গেলো ? না কি এখনও বাইরে বৃষ্টিতে ভিজছে ?

ভাবতে ভাবতে দরজা বন্ধ করতে উদ্যত হয় আকাশ। কিন্তু দরজা বন্ধ করতে পারে না। তপু কখন এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। ভেজা কাপড় থেকে পানি পড়ে দরজার কাছটা ততক্ষণে ভিজে উঠেছে।

চাচি, আপনে! ঘরে যান নাই ?

না। ভাবলাম তোমার লগে একটু গফ সফ করি। হারিকেনের আলোটা আরেকটু বাড়াও। কিছুই তো দেখি না। বলতে বলতে তপু নিজেই হারিকেনের সলতেটা উসকে দেয়। 

         হারিকেনের স্বল্প আলোতে আকাশ দেখে তপুর প্রায় পুরো শরীর ভেজা। উপরে টিনের চালে বৃষ্টি তুমুল নৃত্য করেছে। বোধহয় শীলও পড়েছে। শো শো আওয়াজটা জোরালো হচ্ছে। ঝড় হচ্ছে বাইরে।

ঝড় বইছে আকাশের মনেও। গা কেমন কাঁপছে তার। সে আড়চোখে তপুকে দেখে। তপুর সুছাঁদের দেহ তার মনে কামনা জাগায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে ভয়ও পায়। তপুর আচরণ অবশ্য স্বাভাবিক। সে বিছানায় বসে। তার গায়ের কাপড়ের পানিতে বিছানা ভিজে ওঠে। আকাশ বলে, চাচি ভিজা কাপড়ে বসলেন, কাঁথা-বালিশ সবতো ভিজ্যা গেল।

ভিজুক না। সকালে রোদ উঠলে, রোদে দিবা। বও তুমিও।

আকাশ কেমন যেন সম্মোহিতের মত তপুর পাশে বসে।

তপু সহজ গলায় বলে, তোমার চাচা তিন দিন ধইরা বাড়িত নাই। কী কাজে জানি ঢাকা গেছে। একা একা ঘুম আইতাছে না। তাই বাইরে বাইর অইছি। যে গরমটা পড়ছে! বৃষ্টি আসাতে তবু শান্তি।

হুম, কয়দিন ধইরা গরমটা বেশিই। আর এই ঘরে দরজা জানালা নাই বইল্যা আরও গরম। গরমের কারণেই বাইর হইছিলাম আমিও।

আহারে তাইলে তো তোমার এই ঘরে থাকতে অনেক কষ্ট অয়। তোমার চাচারে তোমার লাইগ্যা আলাদা একটা ঘর বানাইয়্যা দিতে কমু। বিয়া-শাদি কইরা তো সংসারি অওন লাগব। তখন এই ঘরে থাকবা কেমনে ?

আকাশ কিছু বলে না। ও বুঝতে পারে, এসবই হলো কথার কথা। সে যে এ বাড়িতে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, এই বেশি। আবার আলাদা ঘর! শুনলে হয়ত লাথি দিয়ে বাড়ি থেকে বেরই করে  দেবে মমিনুল।

তুমি এমন কেন!

কেমন চাচি ?

আবার চাচি! কী হয় চাচি না কইলে। কইতাছিলাম, আমি তোমার কাছে বসতে চাই, আর তুমি দূরে গিয়া বসতাছ।

আমার শইলডা ভালা লাগতাছে না চাচি। আপনে যান। আমি ঘুমামু। 

যামুই তো। থাকতে আইছি নাকি ? আর থাকতে চাইলেই তুমি থাকতে দিবা ?

আকাশ চুপ। কথা বলে না। তার বুকের ভেতর কেমন ঢিপঢিপ করছিল। তপুর উদ্দেশ্য যে ভালো নয় সে বুঝতে পারছে। সত্যি বলতে কী, তার যে খারাপ লাগছে তা না। তবে, সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও লাগছে। তপুর কারণে আবার তাকে না আশ্রয়হীন হতে হয়। অবশ্য এখন তার যে বয়স, তাতে যে একেবারে না খেয়ে থাকতে হবে তা নয়। দিনমজুরি বা মাটির কাটার কাজ সহজেই করতে পারবে। আবার ইটের ভাটিতেও কাজ করার সুযোগ আছে। তবে কি না, সেসব জায়গায় বড় খাটুনি।

আকাশ তার শ^াসের পরিবর্তন টের পায়। কোন মেয়ের এত কাছাকাছি কখনও বসেনি সে। কেমন যেন একটা উত্তাপ আসছিল তপুর গা থেকে। আর কেমন একটা গন্ধও যেন!

তপু বিবাহিতা বলেই হয়তো অভিজ্ঞ। সে আকাশের একটা হাত ধরে। বলে, তোমার সারাদিন অনেক কাজ করতে হয় না ?

 না তেমন আর কই! আকাশ হাত ছাড়িয়ে চোখ রগড়ায়। তার চোখ থেকে ঘুম পালিয়েছে। তবে, শ^াস আরও ঘন হচ্ছে সে বুঝতে পারছে।

তপু ফের তার হাত ধরে। বলে, এত ভয় পাইতাছ কেন ? কেউ তো দেখব না। হারিকেনটা নিভাইয়্যা দেও।

আকাশ অবাক চোখে তাকায় তপুর দিকে। তপু কী বুঝেছে ? সে তো মনের ভাব আচরণে কিছু প্রকাশ করেনি। তার গলা শুকিয়ে আসছিল। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তাকায় তপুর দিকে। আবছা আলোতে দেখে, তপু তার দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি কেমন যেন তপুর। বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব বাড়ছেই। বিদ্যুত চমকের সাথে সাথে বিকট গর্জন করছে আকাশ। তপু চোখের ইশারায় হারিকেন দেখায়।

যেন আকাশ না, অন্য কেউ হারিকেন নিভিয়ে দেয়। ততক্ষণে উত্তেজনায় আকাশের সারা শরীরের রক্ত যেন নাচছে।

      বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, তবু ঘামছিল আকাশ। তার ঘাড় বেয়ে ঘামের একটা স্রোত যেন নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। সারা শরীরেই কেমন একটা শিহরণ। এমন অনুভূতি তার আগে আর হয়নি।

তপু ফিসফিস করে, তোমার চাচা কিছু পারে না। যখন আমার কাছে আসে, মরার মত ঘুমায়।

আকাশ দীর্ঘ একটা শ্বাস নিতে নিতে বলে, যদি কিছু হয় ?

হোউক। আমিও তাই চাই। তোমার চাচা বুইড়া অইয়্যা গেছে। তার জন্মদানের ক্ষমতা নাই। আমার একটা সন্তান দেও। না অইলে এই বাড়িত আমার অধিকার জন্মায় না। 

সন্তান! অধিকার!

মুহূর্তে সমস্ত শরীর কুঁকড়ে যায় আকাশের। নিস্তেজ হয়ে পড়ে ও। ছিটকে সরে যায় তপুর কাছ থেকে। তারপর দরজা খোলে, খোলা দরজায় দাঁড়ায়। বৃষ্টির ছাটে ভিজে যেতে থাকে আকাশের গা। কিন্তু সে গা করে না। বিদ্যুত ঝলকাচ্ছে আকাশে। তার আলোতে তপুর আদুড় গতরের দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয় আকাশ।

 আকাশ লোক মুখে শুনেছে, তাকে জন্ম দিয়েই তার মা আত্মহত্যা করেছে। ছোট থেকেই শুনে এসেছে আকাশ, সে বেজন্মা। শৈশবে বেজন্মা শব্দটার মানে জানত না। যোয়ান হয়ে বুঝেছে। আজ কি এমন কাজ করতে যাচ্ছিল সে, যার কারণে আরেকটা বেজন্মা আসত পৃথিবীতে ?

তপুও উঠে দাঁড়িয়েছে। আকাশের পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে সে বলে, তোমার কী অইল আৎকা ? ভালো লাগে নাই আমারে ?

যদি সত্যই কিছু অয়, বাচ্চার বাপের পরিচয় কী অইব ? ভাবতেই আমার ভয় লাগতাছে। 

বোকা তুমি একটা। আমি তুমি না কইলে, কেউ জানব বাচ্চার বাপ কে! আমি বিয়াতা। সবাই জানব বাচ্চার বাপ তোমার চাচায়।

কিন্তু আমার যে পাপ হইব।

পাপ! অত ভাবলে অয়। মাঝে মাঝে পাপ করতে হয়ই। মানুষ যে আমরা। কোন মানুষ পাপ না করে ?

পাপ যে আমি করি না, তা না। নামাজ পড়ি না। রোজা রাখি না। মিছা কতা কই। আরও কত কত পাপ করি সারা দিন।… কিন্তু এই পাপ আমি করতে পারতাম না চাচি। … আমার মা আত্মহত্যা করছে। বলতে বলতে আকাশ আনমনা হয়ে যায়।… ছোটবেলা সবার কাছে শুনতাম। বড় অইয়্যা আমি এর কারণ বুজ্জি। আমি একটা বেজন্মা। বেওয়ারিশ। বাপ ছাড়া মানুষ আমারে কী চোখে দেখে, আমি জানি। আমার মত আরেকজনরে জন্ম আমি দিতাম না চাচি। মাফ করেন আমারে। বেজন্মার কষ্ট, অপমান, জ¦ালা―আমি জানি। একটা প্রাণরে জীবনভর কষ্টের মধ্যে ফালাই দিতে পারতাম না আমি চাচি।

আবারও চাচি। চাচির ডাকো বইল্যাই কি তোমার লজ্জা লাগতাছে ?

না, লজ্জা না। অন্য কিছু। এত বড় পাপ আমি করতে পারতাম না। আপনে ঘরে যান চাচি।

পাপ! তুই নিজেই তো একটা পাপ। যার জন্মের ঠিক নাই, তার মুখে পাপের কতা মানায় না! হিসহিস করে তপু।

এই যে আপনে আমারে পাপ কইতাছেন চাচি, এই কতা জীবনভরই শুইন্যা আইতাছি। আমার কারণে আরেকটা পাপ জন্ম নেউক আমি চাই না। তার দিকেও তো মানুষ আঙুল তুইল্যা কইব, তুই একটা পাপ। পাপ কোনওদিন গোপন থাকে না। মানুষ না জানুক―চাচায়, আপনে আর আমিত জানমু। … এর লাইগ্যাই আমি পাপটা করতে চাই না।

তপু কিছু বলে না। কেমন স্তব্ধ হয়ে যায় সহসা। বিদ্যুৎ চমকে তপুর ভেজা মুখ পলকের তরে নজরে আসে আকাশের। সে বলে, আপনে যান চাচি। ঘরে যান। বলতে বলতে আকাশ ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসে। তুমুল বৃষ্টি ঝাপিয়ে পড়ে তার উপরে। কী ঠাণ্ডা পানি! শরীরের সমস্ত জ¦ালা নিভিয়ে যেন মনটাকেও শান্ত করে দিচ্ছে বারিধারা। 

ভিজতে ভিজতে আচমকা আকাশের শান্ত মনটা অশান্ত হয়ে যায়। বৃষ্টির ছোঁয়াতেই বোধহয় সারা শরীরে একটু আগের শিহরণটা হঠাৎই ফিরে আসে। যেন আকাশ না, অন্য কেউ দ্রুত পদে ঘরে গিয়ে  ঢোকে। ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয়। 

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares