মুক্তগদ্য : বাঙালির পথের খাবার : হামিদ কায়সার

সেটা উনিশশ পঁচাশি সালের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবে ভর্তি হয়েছি। নতুন-নতুন হলে থাকি। মন নানান স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু পকেটে চৈত্রের খাঁ খাঁ ধু ধু প্রান্তর! ছোটখাটো স্বপ্নগুলো অধরাই রয়ে যায়। তাই মনকে বোঝাই, লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে। লেখাপড়ায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করো, ভাবীকালে সব চাওয়া পূর্ণ হবে, স্বপ্ন আসবে বাড়ি! তো, সেই ঘোর নিদানকালেই একদিন হলের এক বন্ধু দুপুরবেলা ডাইনিং-রুমে ঢুকতে গিয়েও ইউটার্ন। সটান দাঁড়িয়ে বলল, চলো আজ ইটালিয়ান হোটেলে খাই!

ডাইনিং হলের একই স্বাদের একঘেয়ে খাবার খেতে হবে না। খুশিই তো হওয়ার কথা; তা না, উলটো মনের ভেতর শুরু হলো প্যালপিটিশন। শালায় চাইনিজেই তো কোনও দিন ঢোকার সাহস হলো না, সেই আমি কি না, যাব ইটালিয়ান হোটেলে লাঞ্চ সারতে! তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে তো কোথাও ইটালিয়ান হোটেলের অস্তিত্ব নজরে পড়েনি। ওরা তাহলে আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে!

জন্মের পর থেকেই তো শুধু সিনেমা হলে দেখে এসেছি, চলো যাই চাংপাই। সে বিজ্ঞাপন দেখার পাশাপাশি অবশ্য বাবার বদৌলতে তিন-চারবার চাইনিজ খাওয়া হয়েছিল, সেও মিথ্যে নয়। চাংপাই ছাড়াও ঢাকা শহরের অলি গলি চিনে-রেস্তোরাঁয় ভরা―গুলিস্তান, ধানমন্ডি, মগবাজার, শান্তিনগর, কোথায় নেই; কিন্তু ইটালিয়ান হোটেলের তো সামান্যও চিহ্ন দেখিনি! সোফিয়া লোরেনের বদৌলতে যা একটু ইটালিয়ান সৌন্দর্যের স্বাদ পেয়েছে চোখ, কিন্তু জিহ্বার স্বাদ জুড়ানোর কোনও বন্দোবস্ত ইটালিয়ানরা ঢাকা শহরে রাখেনি কোথাও বা রাখতে চায়নি!

না না, একটু বুঝি ভুল হলো! আমাদের ঢাকা শহরে বোধ হয় সবেধন নীলমণি একটা ইটালিয়ান আইসক্রিমের দোকান ছিল আমাদের আক্কু ভাইয়ের। আক্কু ভাই মানে মুক্তিযোদ্ধা এবং এক মহান উদ্যোক্তা আক্কু চৌধুরী, যিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। বহুদিন কর্মসূত্রে ইটালিতে দিন গুজরান করে দেশে ফেরার সময় শুধু ডগমগে সুন্দরী ইটালিয়ান স্ত্রীই সঙ্গে আনেননি, সাথে রবার্ত ব্যাজ্জিও মতো মাথার পেছন-দিকে চুলের শেষ সীমান্তে একটি সুশোভিত টিকিও এনেছিলেন, আর এনেছিলেন লা ডলচে ভিটা, আইসক্রিম শপ। বনানিতে তার সেই আইসক্রিমের দোকানটি শহরবাসীকে ভিন্ন স্বাদের আইসক্রিমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ডলচে ভিটার পাশাপাশি সেখানে অবশ্য লা গ্যালারি নামে একটি চিত্র প্রদর্শনীর হলও তৈরি করেছিলেন বহু কেতাদুরস্ত এ-মানুষটি। যেখানে প্রথমবারের মতো রিকশা পেইন্টিংয়ের একজিবিশন হয়। শুভপ্রসন্নের পাখি-সিরিজও লা গ্যালারিতেই আমার দেখা। সে না হয় বুঝলাম কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ইটালিয়ান হোটেল কোথায় ? আমি সরলমনে বন্ধুর কাছে সে-কথাটাই জানতে চাইলাম। বন্ধুর পাশে আরও একজন জুটেছিল, দুজনই সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে উঠল, আরে কি বলো ? আমরা কত খেলাম! তুমি জানো না ?

আমি নিজের অজ্ঞতায় যারপরনাই লজ্জিত হলাম! খোদ ঢাকা শহরে জন্মেও কি না, ইটালিয়ান হোটেলে এখনও খাইনি! আমার বংশের কৌলিন্য বুঝি আর রইল না! কিন্তু নিজের পকেটের নাজুক অবস্থার কথা ভেবে আবারও ডাইনিং রুমমুখো হতে হতে বললাম, তোমরাই যাও। আমার অত পয়সা নেই ভাই। তখন আমার বন্ধু আমাকে একটা হাতের ঠেলা মেরে বলল, আরে চলো, আমিই না হয় তোমাকে খাওয়াব।

হাজার হলেও আমার শরীরে বাঙালির রক্ত! একে তো খাওয়ার কথা শুনলে না করতে পারি না, তার ওপর মাগনা খাওয়ার সুযোগ! কে না জানে বাঙালি মাগনা পেলে আলকাতরাও খায়! সুতরাং আর কিসের বিলম্ব … আর বিলম্ব না, আর বিলম্ব না!

ক্ষুধার্ত অবস্থায় বন্ধুরা আমাকে হাঁটাতে হাঁটাতে ঢাকার যত পথ আছে, তার মধ্যে অন্যতম রূপসী যে পথ,  সেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হল আর বুয়েটের মধ্যবর্তী বড় বড় প্রাচীন গাছের ছায়াঘেরা সড়কে নিয়ে গেল, তার পর ওরা থামল পলাশী মোড়ের কাছাকাছি জায়গাটায়। দেখলাম, বুয়েটের সিরামিক ইট দেয়ালের সীমান্ত ঘেঁষে একটা কাঠের বেঞ্চি পাতা। না না, ঠিক কাঠের বেঞ্চি বলা যাবে না কিছুতেই, কোথাকার কোন ভ্যাগাবন্ড হতচ্ছাড়া লম্বা একটা কাঠের টুকরোকে কোত্থেকে জুটিয়ে এনে দুপাশের দুদিকে ইটের পর ইট সাজানো স্তরের ওপর কেবল কোনওমতে বসিয়ে রেখেছে, মাঝখানেও সমপরিমাণ ইটের স্তর। ফুটপাতের শেষ মাথায় একজন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বয়সি মহিলা যে-চুলায় রান্নাবান্না করছে, সে চুলোটিও ইট সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি মহিলাটি যে জিনিসটায় পয়ো স্থাপন করেছেন, সেও কোনও কাঠের পিঁড়ি নয়, আস্ত একটা ইষ্টকপ্রবর। সব দেখেটেখে আমি কেমন বোকা বনে গেলাম! কোথায় গিয়ে শালার মাগনামাগনা ইটালিয়ান খাবারের স্বাদ আস্বাদন করব! আর সোফিয়া লোরেন-মণিকা বেলুচিরাও যে আমার মতো একই স্বাদ লাভ করেছে, তা ভেবে ভেবে মনেমনে নেচে বেড়াব! তা না! শেষে কি না, লাঞ্চ করতে দাঁড়িয়ে রয়েছি নোংরা ফুটপাতে!

একেই কি বলে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার চিন্তা করা! বোকা-বোকা গলায় জানতে চাইলাম, এটাই কি তোমাদের ইটালিয়ান হোটেল ? বন্ধুরা রাশভারী কণ্ঠে বলতে চাইল, কেন, তোমার কোনও সন্দেহ আছে ? কিন্তু ওরা আর কিছুতেই অটুট গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না, হো হো করে হেসে উঠল, হাসতে হাসতেই একজন আরেকজনকে বলল, দ্যাখ অপুর চেহারা দ্যাখ, কী অবস্থা!

আমরা কিন্তু ওখানে গিয়েই বসার জায়গা পাইনি, দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ। চারজন সে-বেঞ্চিতে কোনোমতে আঁটোসাঁটো হয়ে বসা যায়। থালা রাখতে হয় হাতের মধ্যেই। একহাতে থালা ধরে রাখো, আরেক হাতে লুকমা বানিয়ে মুখে দাও। তিনজন পরপর উঠে যাওয়ার পর আমরা ওই ইটের ঠেকনা দেওয়া বেঞ্চিতে বসতে পেরেছিলাম। একজন মধ্য-বয়সি পুরুষ, ওই মহিলার বয়সিই হবে, বোধ হয় স্বামী, খাবার পরিবেশন করছিলেন। রান্নার পাশাপাশি থালা ধুয়ে পরিষ্কার করে পাশে রাখা পাতিলা থেকে ভাত-তরকারি বেড়ে দিচ্ছিলেন সে মহিলা। প্লেটে ভাত দিয়ে পুরুষ মানুষটি জানতে চাইলেন, কী খাবেন ? একনাগাড়ে কী কী সব আইটেমের কথা বলে গেলেন! সব নাম তো আর মনে নেই, তবে মনে আছে আমি বাইলা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম। বাইলা মাছ বলাটাও ভুল হলো। কচি তারা কথা ফুটে নাই! ছোটো ছোট গুঁড়া বাইলা।

পেট পুরে খেয়েছিলাম সেদিন। এত ঝাল ছিল। সেটার জন্য আরও বেশি অমৃত মনে হয়েছে। খাওয়া শেষে বন্ধুকে আর টাকা দিতে দিইনি। আমার মনে হয় বাঙালি যে মাগনা পেলে আলকাতরা খায়, এ কথাটা মোটেও ঠিক নয়। জানি না কারা এটা রটিয়েছিল ? ইংরাজ ? পর্তুগিজ ? না ওলন্দাজ ? বোধ হয় চাইনিজরা। ওরা বাংলায় এত চাইনিজ রেস্টুরেন্ট করেছে যে, বাঙালির ফুড হেবিটের কথা ওদের চেয়ে ভালো আর কারও জানার কথা নয়! 

প্রথম ধাক্কায় ইটালিয়ান হোটেল না চিনলে কী হবে, আমি কিন্তু পথের খাবারের সঙ্গে সেই শৈশব থেকেই পরিচিত। ছোটবেলায় আমার দাদাবাড়িতে আখুকার মতো অপেক্ষায় থাকতাম কখন আসবে টানাওয়ালা। এই টানা… টানা, টানা নিবেন টানা … বলে চেঁচাতে চেঁচাতে সে-মানুষটা বাড়ির পর বাড়ি ঘুরত। কাঁধের মধ্যে রাখা একটি বাঁশখণ্ডের দুই প্রান্তে ঝোলানো দুই চাঙারি বয়ে যে শুধু টানাওয়ালা আসত, তা না, আসত কটকটিওয়ালা, দইওয়ালা, মাঠাওয়ালা, খেজুরের রসওয়ালা, তালের রসওয়ালা। তালের রসটা পরে ভারী অপবাদের সম্মুখীন হলো, ওটা নাকি কীভাবে কীভাবে তাড়ি হয়ে যায়। নেশাখোরদের কাছে বেশ সমাদর লাভ করেছিল, তাড়িখোর নামের যেমন আলাদা একটা গোষ্ঠী তৈরি হলো গ্রামে, তেমনি তাড়াতাড়ি আন্ডারগ্রাউন্ডেও চলে যেতে হলো সে বেতালের রসকে। আমাদের গ্রামের বশির মাস্টার তো তাড়ি খেয়ে বড় বেতাল কাণ্ড করে বেড়াত। গ্রামের নামা অঞ্চল কদমতলায় সে তাড়ি খেয়ে বাড়ি ফেরার পথে যাকে সামনে পেত তাকেই ক্যাপাস্টিং কট বলে গালাগালি শুরু করত, তার সমস্ত জ্বালা বাড়িতে এসে মেটাত বউ পিটিয়ে! বউ চেঁচামেচি কান্না আর চিৎকার জুড়ে দিয়ে সারাপাড়া ঠিক ওই তালগাছের মাথাতেই উঠিয়ে ফেলত। কতবার যে দৌড়ে যেতে হয়েছে ও-বাড়ি!

চৌকোনা বাক্স মাথায় নিয়ে আসত আইসক্রিমওয়ালা। শক্ত বরফখণ্ডের লাল, সবুজ, সাদা কালারের সেসব আইসক্রিম খাওয়াটা ছিল গরমের দিনের নৈমিত্তিক ব্যাপার। আমার শৈশবকে রাংতা মোড়ানো করতে আরও আসত হাওয়াই মিঠাই, শনপাপড়ি আর হজমিওয়ালা! হাওয়াই মিঠাইওয়ালা এলে পুরো গ্রামটা লাল রঙিন হয়ে যেত। বড় বড় হাওয়াই মিঠাই সে ঝুলিয়ে রাখত তার হাতের লম্বা বাঁশমতো জিনিসটায়।

তখন আমাদের গ্রামে কোনও হোটেল ছিল না, বাজার ছিল না, দোকানপাট কিসসু ছিল না। পথ যাও ছিল, তাও ক্ষয়িষ্ণু কাঁচা। তখনও নৌকার চল। গয়নার নৌকায় ঢাকা থেকে মাল আনা-নেওয়া চলে আর আমরা লেখাপড়া করি হারিকেনের টিম টিমে আলোয়।

সেই অজপাড়াগাঁয়ে শুধু কি খাবারদাবার আসত ? প্রায় সকল রকম পণ্য নিয়ে ফেরিওয়ালারা গ্রাম থেকে গ্রামে হেঁটে বেড়াত! লেইসফিতাওয়ালা, চুড়িওয়ালা, শাড়িওয়ালা। কুমাররা আসত মাটির জিনিসপত্র নিয়ে, বিক্রমপুরের বেপারি আসত সিলভারের জিনিস বেচতে। আরও অনেক প্রকারের মানুষের আনাগোনা ছিল, সে-সব বলাটা বোধ হয় এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে, কেননা আমি তো শুধু পথে পথে যেসব খাবার বাঙালির রসনা ভরেছে, অল্প খরচে ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা করেছে, মাতিয়েছে মন―সেসব খাবারের কথাই বলব বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

বলছিলাম টানাওয়ালার কথা। টানা হলো গুড় আর ময়দা দিয়ে বানানো এক প্রকার কাঠির মতো দেখতে অপূর্ব স্বাদের খাবার। বেশ শক্ত আর খানিকটা আঠালো। কেনার জন্য পয়সা লাগত না। মাগনা দিত কি ? জি না। লোহালক্কড়ের ভাঙা জিনিস দিয়ে কিনতে হতো। বাড়িতে কোনও জিনিস নষ্ট হলে আমরা তা টানা খাওয়ার জন্য জমিয়ে রাখতাম। টানাওয়ালার কাছেই আরেকটা জিনিস পাওয়া যেত, গুড়ের সাথে হালকা ময়দার মন্ডে বাদাম দেওয়া। কী যে স্বাদ। ভেতরটা ছিল মচমচে। এ জাতীয় খাবারের মধ্যে আরও আসত গুলগুলা, কটকটি। গুলগুলা অনেকটা তেলে পিঠার মতো। তবে দেখতে গোল। কটকটি একটু কাঠখোট্টা টাইপের। ছোট চৌকোনা, লুডু খেলার বলটার মতো, যেটা দিয়ে ছক্কা মারা যায় ব্যর্থ জীবনেও! আমার এসব খাবারের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগত টানাকেই। ধানের বিনিময়েও খাওয়া যেত এসব মুখরোচক মনোহারী খাবার।

সপ্তাহে একদিন আসত দইওয়ালা, মাঠাওয়ালা। তারা সেই কোন দূর গ্রামের আশুলিয়া থেকে কাঁধে বাঁশ দিয়ে দুপাশের দুই প্রান্তে ঝোলান দুই চাঙারিতে দশ-বারোটা দইয়ের পাত্র বয়ে নিয়ে আসত, বারো মাইলের মতো পথ হেঁটে কড্ডার হাটে যেত বিক্রির জন্য। পথে যেখানে ছায়া আর টিউবয়েল দেখত, সেখানে বসেই হাতমুখ ধুয়ে গামছা দিয়ে মুছেটুছে কলের পানি খেত। তারপর ক্রেতা পেলে তাদের কাছে দই বিক্রি করত পাতিলসুদ্ধ। এ দলের সঙ্গেই জুটতো মাঠাওয়ালা, ঘিওয়ালা। গরমের দিনে মাঠা খাওয়াটা ছিল দারুণ প্রশান্তিকর। মাঠার মধ্যে ওপর দিকে মাখন ভাসত। মাঠাওয়ালা মাখন দিতে সাংঘাতিক রকমের কৃপণতা দেখাত। আর যারা খেত তাদের যেন মাঠার চেয়ে ভাসমান সেই মাখনের প্রতিই লোভটা ছিল বেশি। মাঠাওয়ালার কাছে কত যে অনুনয়, আর একটু দাও না মাখন কাকা, দাও না। কাকার মন গললে এক চিমটে হয়ত পাওয়া যেত!

আমার মনে আছে, এখন অভিজাত দোকানে ঠাঁই পাওয়া ক্রিমরোলটাও প্রথম খেয়েছি আমাদের গ্রামের পথ থেকে, ফেরিওয়ালার কাছে। শুধু হজমি বেচতে গ্রামের পর গ্রাম হেঁটে বেড়াত কেউ কেউ। ছোট্ট প্যাকেটে থাকত দারুণ উপাদেয় এই আচার-জাতের খাবার। তবে কি না, ভীষণ ঝাঁঝ ছিল। নাকেমুখে উঠে যেতে চাইত। বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ের মৃত্যুও হয়েছিল হজমি খেতে গিয়ে। সে-কারণেই পরে হজমি ব্যান্ড হয়ে গেল। কাসুন্দিকে আমি আচার-জাতীয় খাবারই বলব। সরিষা দিয়ে করা এ খাবারটি এক বুড়ো মানুষ বয়ে নিয়ে আসত গ্রীষ্মকালে, যখন গাছে গাছে কাঁচা আম। আমরা সেই কাঁচা আম কাসুন্দিতে মাখিয়ে টকের সঙ্গে ঝালের সমন্বয় ঘটাতাম। পাটশাকেরও ভালো জুটি কাসুন্দি।

আশ্চর্য! শৈশবে আমাদের দাদাবাড়ির গ্রামে কোনও আচারওয়ালা আসত না। কিন্তু নানাবাড়িতে বর্ষাকাল ছাড়া সব ঋতুতেই এক চিকনচাকন গড়নের আচারওয়ালার শুভাগমন ঘটত। তার আসাটাকে শুভাগমন বলছি এ-কারণে, বাড়ি-বাড়ির অন্দরমহল থেকে সব সুন্দরী বউঝিরা বেরিয়ে আসত বাইরে, আচারের স্বাদ আস্বাদন করার জন্য। কাজিবাড়ির যুবক শিপলু মোল্লাবাড়ির মেয়ে রোখসানাকে খানিকের চোখের দেখা দেখতে চায়, সে তক্কে তক্কে থাকত কখন আচারওয়ালা গ্রামে প্রবেশ করে। রোকসানাকে দুদণ্ড দেখতে পারলে তার যতটা চোখের শান্তি, রোকসানার তারচেয়ে হাজারগুণ বেশি শান্তি তেঁতুল কি জলপাইয়ের আচার রসিয়ে রসিয়ে চাটাচাটি করতে! সে হয়ত শিপলুর দিকে কোনও দিন তাকাতও না!

আমার নানাবাড়ি ছিল নিম্নাঞ্চল। বর্ষায় পুরো পথঘাট, নিচু মাঠ, ফসলের ক্ষেত জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যেত। আড়াই তিন মাস শেষে পানি চলে যাওয়ার পর যখন পথঘাট শুকাত, তখনই মাথায় আচারের বিশাল ডিশ আর হাতে বাঁশের একটা খাঁচার মতো কী একটা বয়ে নিয়ে চৌরাপাড়া থেকে হাজির হতো সেই আচারওয়ালা। সে হেঁটে বেড়াত গ্রামের পর গ্রাম। কেউ আচার খেতে চাইলেই, সে বাঁশের খাঁচাটা মাটিতে বসিয়ে তার ওপর রেখে দিত আচারের পাত্র। কত রকমের যে আচার সাজান থাকত সে ডিশ-পাত্রে। আম, বরই, জলপাই, তেঁতুল। পাকা কদবেলও পাওয়া যেত। কাঠি দিয়ে খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। ঋতুভেদে ভিন্ন ভিন্ন রকমের আচার হতো। তবে একটা আচার কিনা সব ঋতুতেই ছিল কমন। চালতা। ভালো লাগত না এতটুকু! অথচ আচারওয়ালাও যেমন ওটা সযতনে সাজিয়ে আনত, আমরা আমজনতাও খেতাম বেশ রসিয়ে রসিয়ে অথচ তেমন স্বাদ পেতাম না। চালতার আচারটা আমাদের বিস্বাদ জীবনটাকেও কীভাবে আদরে-মহব্বতে সহবতে রাখা যায়, সে শিক্ষা জুগিয়েছে।

সিঙারা, পিঁয়াজু, মাসের বড়া, পুরি, নিমটি (নিমকি) এসব দারুণ মুখরোচক খাবারগুলোও কিন্তু পথ থেকেই প্রথম খাওয়া। তবে কি না, আমাদের গ্রাম্য-পথে নয়। কাশিমপুরের হাটের পথে। প্রতি সোমবার আমাদের গ্রাম থেকে মাইলখানেক দূর কাশিমপুরে বসত বিশাল হাট। সে হাটে বাইশ গ্রামের মানুষ নিজেদের পশরা যেমন বিক্রয় করতে নিত, তেমনি এক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় পণ্য, খাবারদাবার ব্যাগ ভরে কিনে বাড়ি ফিরত। আমরা সোমবারের হাটের জন্য সবাই মুখিয়ে থাকতাম। কাশিমপুরের হাট এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের স্কুল সেদিন হাফ হতো। হাটে যেন সবাই যেতে পারে সেটা চিন্তা করে। কারণ, হাটের সঙ্গে প্রায় প্রতিটি বাড়ির অর্থনৈতিক গভীর সম্পর্ক ছিল। কেউ হয়তো ক্ষেতের ধান বিক্রি করবে, কেউ বাদাম, কেউ আখের গুড়, শাকসবজি, কেউ হাঁসমুরগি বা হাঁসমুরগির ডিম! আবার সপ্তাহের যত গৃহস্থালি জিনিসপত্র, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে চাল-ডাল-তেল যা যা লাগে সংসারের সব বাজারসওদা ব্যাগ-ভরে নিয়ে আসত। সেই হাটেই, দোকানে নয়, হাটুরেদের জন্য খোলা জায়গায় চুলা সাজিয়ে শিঙাড়া, পিঁয়াজু, মাসের বড়া, পুরি বিক্রয় চলত দেদার।

নিমকি পাহাড়ের মতো সাজিয়ে রাখা হতো জাত বিচার করে আলাদা আলাদাভাবে। কোনো নিমকি হলুদ রঙের, খেতে মচমচা, কোনওটি আবার লাল গুড়মিশ্রিত, আরেকটা ছিল সাদা রঙের, চিনিবেষ্টিত। তিনটির স্বাদ তিন রকম, কিন্তু থাকত একসঙ্গে পাশাপাশি মায়ামমতায় জড়িয়ে। এখনও নিমকি পথের খাবার হয়েই রইল। হাটবাজার থেকে এখন অবশ্য মুভিং ভ্যান-রিকশায় দেখি ওর জায়গা হয়েছে।  কেনা কোনও দোকানেও ঠাঁই পেয়েছে। তবে পিঁয়াজু, পুরি, সিঙাড়া এসব এখন অনেক জাতে উঠেছে। পিঁয়াজু অবশ্য অনেক আগে থেকেই জাতে ওঠার নানান রকম ফিকির খুঁজছিল। আমাদের গ্রামে যারা গুলগুলা বিক্রি করতে আসত, তারা পিঁয়াজুও রাখত প্রথমদিকে। কিন্তু গুলগুলা ঠাণ্ডা অবস্থায় খাওয়া গেলেও পিঁয়াজু কেউ তেমন খেতে চাইত না। কেননা, ওটা কখন চুলা থেকে নামিয়েছে, কখন ঝাঁকায় ভরেছে, তার কি কোনও ঠিক আছে ? ঠাণ্ডা হয়ে গেলে এমনিতেই পিঁয়াজু মুখে দিতে ভালো লাগে না। আর গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে পরিণত হতো বিস্বাদে।

পিঁয়াজুর অবস্থা এখন মধ্যবিত্তের মতো, পথেও আছে, ঘরেও ঠাঁই মিলেছে, অর্থাৎ হোটেলে যত্ন করে তোলা হয়েছে। তবে পুরি-শিঙাড়ার প্রমোশনটাই ভালো হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পথ থেকে ওরা এখন বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম-মফস্সল এবং শহরের হোটেলে হোটেলে পরম আদরে বিক্রি হচ্ছে। ওহ, সঙ্গে জুটেছে সমুসা। সমুসার আকৃতি অনেকটা শিঙাড়ার মতই। তবে কি না, ভেতরের মালমলসা যেমন আলাদা, বাইরের গড়নও ভিন্ন। সিঙারা মোলায়েম, সমুসা মচমচে। তবে সে শিঙাড়ার জাতভাই। চয়চেহারায় তেল চকচকে হলে কী হবে সাধারণ রঙের শিঙাড়ার জনপ্রিয়তাকে ছাড়াতে পারেনি।

বনেদি অফিসগুলো মিটিংয়ের ক্লান্তি দূর করতে, পিয়নকে পাঠিয়ে দেয় শিঙাড়া কিনে আনতে। পথের শিঙাড়া অতি আদরের সঙ্গে ঢুকে পড়ছে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সাজান গোছান বোর্ডরুমে। আর পথের মানুষের পছন্দ হিসেবে তো রয়েছেই ওর আলাদা জয়জয়কার। পুরির আদর হয় বিকেলের দিকে। বাসাবাড়ি থেকে গৃহকর্মী বা ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, পাঁচটা বা দশটা পুরি নিয়ে এসো তো। আমাদের দেশের পলিটিক্যাল দল জাসদ ভেঙে যেমন জাসদ অমুক-বাসদ তমুক এভাবে দশ টুকরো হয়েছে, পুরির মধ্যেও দেখি এই বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক দলটার ঝোঁক ষোল আনাই আছে। প্রথম প্রথম আমরা খেতাম ডালপুরি, ডালপুরি থেকে হলো আলুপুরি, আলুপুরি থেকে কিমাপুরি, কিমাপুরি থেকে এখন যে কী এক আজব টাইপের পুরি হয়েছে, তাতে ডালও থাকে না, আলুরও দোষ নেই, কিমার তো থাকার প্রশ্নই ওঠে না, ওটাকে যে কী নাম দেব? ফুলপুরি ? হ্যাঁ, এ নাম দিলে মুখের স্বাদ না জুটলেও মনের স্বাদ পাওয়া যাবে পুরোপুরি, মনে হবে ফুলপরীর সঙ্গে মেতে আছি!

অফিস-বাসাবাড়িতে  পুরি-সিঙাড়া- সমুসা-পিঁয়াজুর এত আদর-সমাদর জুটলেও আমি এদেরকে পথের খাবারই বলব। স্বভাব যায় না মলে। এখন দেখি তো কেউ কেউ দিব্যি ওদেরকে হোটেল থেকে ফুটপাতেও নামিয়ে রাখতে চায়! সারা বছর তো রাখেই, রমজানেও রাখে মাসজুড়ে! রমজানের সময় গ্রামে-মফস্সলে আগে শুধু বুট আর পিঁয়াজুর অস্তিত্ব ছিল। সবাই পথের বুট, পিঁয়াজু কিনে মুড়ি দিয়ে মাখিয়ে খেত। এখন বুট-পিঁয়াজুর সেই জুটিতে ভাগ বসিয়েছে আরও কত না খাবারের সমারোহ! বুট, পিঁয়াজু, চপ, বেগুনি, সিঙারা, পুরি তো আছেই। সঙ্গে আছে বুন্দিয়া, জিলাপি!

যাই হোক, আমি আমার শৈশবকে ধরে আমার গ্রামের পথ-খাবারের কথা বলছিলাম। তবে আমি যেমন এখন জীবনের মধ্য প্রদেশে প্রবেশ করেছি, নাকমুখ চেহারা সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে, গ্রামবাংলাও আর সে জায়গায় নেই। বাংলাদেশের জনজীবন এবং পথঘাটের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কোনও গ্রাম এখন আরবান, কোনও গ্রাম সেমি-আরবান, কোনও গ্রাম পুরোই শিল্পাঞ্চল। পথের খাবারের ধরনেও এসেছে ভিন্নতা। যে চানাচুর খেতাম শুধু নাটক দেখতে গিয়ে, সে কবেই বাসস্টেশন, ট্রেনস্টেশন, স্কুল-কলেজের গেট থেকে শুরু করে এখন নগর বন্দর ফেরিঘাটসহ সব জায়গায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করে নিয়েছে।

আমার বাল্যকালে নাটকের পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে হতো যাত্রা আর সার্কাস। এ তিন জায়গাতেই ঝাল চানাচুরের একচ্ছত্র রাজত্ব ছিল। ছোটো কাগজের ঠোঙায় সবাই ঝাল চানাচুর না খেয়ে যেন পুরো বিনোদন পেত না। আর ছিল বাদাম ভাজা এবং সিদ্ধ ডিম। সিদ্ধ ডিম ছাড়া যেন ওসব অনুষ্ঠানের কথা কল্পনা করা যেত না। বাদাম তখন ঢাকা শহরের পার্কের প্রেম জমাতেও দারুণ ভূমিকা রাখত। প্রেমিক জুটি দেখলেই বেরসিক বাদামওয়ালা হানা দিত ওখানে। কথা বলার রসাস্বাদে আবার দ্রুত প্রবেশ করার লক্ষ্যেই হোক বা প্রেমশক্তিকে নতুনভাবে বাদামের তেলে তেলতেলা করতেই হোক, অতি দ্রুত একটা ঠোঙা নিয়ে বাদামওয়ালার প্রস্থানের অপেক্ষা করত। বাদামওয়ালা অত বেরসিক নয়। বাদামটা বেচা হলেই দ্রুত সে স্থান পরিত্যাগ করত।

বাদাম বুঝি যুগ যুগ ধরেই নিজের মহিমা প্রদর্শন করে যাবে। এখনও দেখি, পার্কসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা ট্রেনে, বাসে, লঞ্চে নিজের জায়গাটা ভালোই অধিকার করে রেখেছে। এখন আবার ওকে বেশবাসে সুসজ্জিত রাখা হয়। বাদাম আর কষ্ট করে ছুলতে হবে না। প্লাস্টিক-বন্দি প্যাকে খানিকটা লবণের মিশ্রণসহ পাওয়া যায় যত্রতত্র। চানাচুরও নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত। বেশ কটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি নানান পদ ও স্বাদের চানাচুর উৎপাদন করে থাকে। জামাই বউ চানাচুর বলে একটা চানাচুর তো ঢাকার রাজপথে বেশ জনপ্রিয়। ভ্যান রিকশার চারদিকে কাচে ঘিরে রাখা এ চানাচুর খেতে বেশ পরিতৃপ্তি মেলে। হাতের কাছে থাকলে হাত ও জিহ্বার ক্রিয়া-প্রক্রিয়া থামানো মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। দর্জাল টাইপের বউরা তাই আলসার আক্রান্ত জামাইয়ের সামনে থেকে এক পর্যায়ে চানাচুরের বাটিটা সরিয়ে নেয়।

আগেই বলেছি গ্রামবাংলা আর আগের মতো নেই। বিদ্যুত গ্যাস যেমন ছড়িয়েছে, পথঘাটেরও উন্নতি হচ্ছে, পথের খাবারেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এখন মোবাইল ভ্যান রিকশায় কেউ চিংড়ি ভাজা বেচে বড়ো উপাদেয় করে। তার সাথে চপ কাটলেটও বিক্রি হয়। বট বলে একটা খাবারও খুব জনপ্রিয়। শহরের কী গ্রামের রাস্তায় মোবাইল ভ্যানে বট রান্না করা হয় ঝালমসলা দিয়ে। এটি গরুর ভুঁড়ি দিয়ে তৈরি। এক প্লেট বটের সঙ্গে দুটি রুটি বা পরোটা কিংবা লুচি নিয়ে পরম আয়েশে খেয়ে নেয় লোকজন। পরোটার সঙ্গে আলুভাজি বা ডিমও মোবাইল ভ্যান-রিকশায় বিক্রি হয়। আর ঝাল চানাচুর আগে যারা বিক্রি করত, তারা ব্যাপারটাকে পুরো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সে-কারণে চানাচুর তার একচ্ছত্র রাজত্ব হারিয়েছে। এখন চানাচুরওয়ালার বিশেষ ধরনের তৈরি পাত্রের মধ্যে সাজানো থাকে, চানাচুর, বাদাম, বুট, ছোলা, চিড়াভাজা, ডাবলি যাকে ঘূর্ণিও বলা হয়। কোনটা খাবা, শুধু বললেই হলো, চানাচুর তো চানাচুর, বুট বললে বুট, ছোলা বললে ছোলা, ঘূর্ণি বললে ঘূর্ণি। মুহূর্তেই তেল, মশলা, ধনেপাতা মিশিয়ে ঘুটা দিয়ে সামনে হাজির। কেউ কেউ দেখেছি সব আইটেম একসঙ্গে নিয়ে ককটেল বানিয়ে খায়। সুরাপ্রিয়রা যেমন বৈচিত্র্যের জন্য হুইস্কি ভদকা মিশিয়ে ককটেল বানায়, তেমনি চানাচুরওয়ালারাও প্রতিটি পদ দিয়ে তালি বাজিয়ে বাজিয়ে বানিয়ে চলে ককটেল।

আমার একবার নেত্রকোণার কৃষ্ণপুর হাওরে বেড়াতে গিয়ে এমন এক চানাওয়ালার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যে কি না, মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা করে থাকে। কীভাবে সেটা ? তার বাহারি বিশাল পাত্রটার যেমন পাশাপাশি খাঁজে খাঁজে আলাদাভাবে থাকে বাদাম, চানাচুর, ছোলা, চিড়াভাজা, তেমনি আরও থাকে পেঁয়াজ, মরিচ, ধনেপাতা, নানা মশলা আর একটা তেলের কৌটা, সরিষা তেলের। সে ওই তেলের কৌটার মধ্যে এক টুকরো রান্না করা গরুর মাংস রাখে, ছোট আকারের। যা কিনা বাদামই হোক আর চানাচুর অথবা চিড়েভাজা―তার সঙ্গে আরামসে মিশে যাবে। তারপর সে নিজেও ভুলে থাকে সেই মাংসের টুকরোর কথা। এরপর বিক্রি করতে বের হয়, স্কুল-কলেজের গেট থেকে শুরু করে নৌকার ঘাট, বাজারহাট সর্বত্র। সে তো তেল মিশিয়ে বিক্রি করে যাচ্ছে ঝটাঝট, এখন তার অজান্তেই যার পাতে পড়বে তেলের ওই গরুর মাংসের টুকরো, তারই নাকি মনের আশা পূরণ হবে। যেমন কৃষ্ণপুরের কোনও ছেলে যদি রাধানগরের কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, অটোমেটিকই তা সার্থকতা পাবে। আবার কেউ যদি মিড্ল্ ইস্টে চাকরির চেষ্টায় আছে, তার সেখানে গমনও ত্বরান্বিত হবে। গ্রামের কারও কোনো সাফল্য দেখলে সে চানাচুরওয়ালা পরমতৃৃপ্তি পায় এই ভেবে যে, সে বুঝি তার চানাচুরের গরুর মাংসের টুকরোটা খেয়েছিল। নিজের ব্যর্থ জীবনেও সে অপূর্ব এক সাফল্যের আনন্দ উপভোগ করে!

তিন-চারদিন সেই হাওরে থাকায় আর চানাচুরওয়ালার সাথে গভীর সখ্য হাওয়ার কারণে আমি তার পেট থেকে এই দারুণ তথ্যটি বের করে এনেছিলাম। তাকে অনুরোধ অনুনয় করে সেই মাংসের টুকরোটাও দেখে নিয়েছি। ভাগ্যিস আমার পাতে পড়েনি, তাহলে মুম্বইয়ের ঐশ্বরিয়া রাইয়ের ফিল্ম-ক্যারিয়র পুরোই শেষ হয়ে যেত। বেচারিকে ইন্ডাস্ট্রির মায়া পরিত্যাগ করে হয়তো ছুটে আসতে হত বাংলাদেশে! লে হালুয়া! অবশ্য হালুয়াও এখন গৃহস্থবাড়ির রান্নাঘর থেকে পথের খাবারের অংশ হয়েছে। আজকাল পথে যারা রুটি, পরোটা বিক্রি করে লোকজনকে খাওয়ায়, তারা ডিম, ভাজি, ডাল-এর সঙ্গে কেউ কেউ হালুয়াও রাখে।

ও আচ্ছা, পিঠার কথা তো বলাই হয়নি। আজ বিশ কি পঁচিশ বছর হলো গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময়ী পিঠা এখন পথের খাবারে পরিণত হয়েছে। শহর-বন্দর-গ্রাম সব জায়গায় দেখা যায় কোনো মহিলা বা পৌঢ় পথের সুবিধাজনক, অবশ্যই লোক সমাগম ঘটে এমন স্থানে, চুলা ধরিয়ে পাত্র সাজিয়ে চিতুই পিঠা বানাতে বসে গেছে। সঙ্গে থাকে নানান পদের ভর্তা। মরিচ বাটা, সরিষা বাটা, চ্যাপা শুটকির ভর্তা, কালিজিরার ভর্তা, ধনেপাতার ভর্তি। যার যে ভর্তা ইচ্ছে খুশিমতো পাতে তুলে নিচ্ছে। এখন মোবাইল ভ্যানেও বিক্রি হয় পিঠা। শুধু কি চিতুই, ভাপাপিঠাও অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। অবশ্য ভাপা পিঠা বানান হয় শীতকালে।

ফেরিঘাটের কথাটা কোথায় যেন সামান্য এসেছে, মনে পড়ছে যখন এখানেই সেরে ফেলি। একটা সময় ফেরিঘাটের খাবারের বেশ নামডাক ছিল। বিশেষ করে আরিচাঘাটের, বাহাদুরাবাদঘাটের। সেখানে এত বেশি লোক সমাগম হতো যে, দুপাড়জুড়েই প্রচুর সংখ্যক খাবারের হোটেল বসেছিল। সেসব হোটেলে নদীর টাটকা মাছ যেমন মিলত, মুরগির মাংস, গরুর মাংস, খাসির মাংসও মিলত সমান তালে। যাত্রীরা কখনওই ফেরিঘাটের খাবার মিস করত না। শোনা যায়, হিন্দু-মুসলমানদের জন্য আলাদা হোটেল ছিল। আবার হিন্দুদের মধ্যে জাতবিচার করে কায়স্থদের জন্য, ব্রাহ্মণদের জন্য নমশূদ্রদের জন্য আলাদা আলাদা হোটেল ছিল। ফেরিঘাটের সেই রমরমা অবস্থা আজ আর নেই। ফেরিঘাটই থাকবে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। যমুনা সেতু আগেই হয়েছে, মাওয়ায় হয়ে যাচ্ছে পদ্মা সেতু, আরিচা-পাটুরিয়ার দিকেও নাকি ব্রিজ করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে। তবে মাওয়া ফেরিঘাটে এখনও বাঙালির রসনাবিলাসের অপূর্ব চিত্র প্রতি মুহূর্তেই দৃশ্যমান হয়। এ প্রান্তে মাওয়া আর ওপ্রান্তের সারিয়াকান্দিতে শয়ে শয়ে হোটেল। সব হোটেলেরই প্রধান আকর্ষণ ইলিশভাজা। টাটকা টাটকা ইলিশ সেইসব হোটেলেই কিনতে পাওয়া যাবে, একটা পছন্দ করে ওদের দিলেই, ওরা সঙ্গে সঙ্গে ইলিশটা কেটে-ধুয়ে দ্রুত ভাজা করে পরিবেশন করে, সঙ্গে থাকে পেঁয়াজ আর শুকনা মরিচ। টাটকা ইলিশের স্বাদটা যে কী, মাওয়াতেই কেবল বোঝা যায়। 

নতুন পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে কী শহর কী মফস্সল আর কী গ্রাম, পথে পথে যোগ হয়েছে ফলজাতীয় খাবারের প্রাধান্য। আমড়ার সিজনে আমড়া, বড়ুইয়ের সিজনে বড়ুই, বিশেষ করে বড় বড় কুল বরই ছেলেছোকরারা বাসে ট্রেনে ঘুরে ঘুরে পথে পথে দৌড়ে দৌড়ে বিক্রি করে। আনারসও বিক্রি হয় মোবাইল ভ্যানে। কেটে কেটে পরিবেশন করা হয়। আর ডাবের কথা কি বলব, সে তো অনেক আগে থেকেই, এখন বরঞ্চ ডাবের কদর আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্যসচেতন লোকজন চলতি পথে ডাব খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা করে নেয়। কেউ কেউ আবার কচি ডাব ছেড়ে ভেতরে আঁশ হয়েছে এমন ডাব চায়। অর্থাৎ তলারটাও খাবে ভেতরটাও কুড়োবে। ডাবের পানি শেষ হলে ডাবটা দু-টুকরো করে আঁশটা চুষে চুষে খাবে।

মুখ্যুসুখ্যু মানুষরা জীবনানন্দ দাশকে না চিনলে কী হবে বরিশালের ডাবের খুব প্রশংসা করে বেড়ায়। করবে না ? এত বড় বড় সে ডাব যে, একজনে খেয়ে শেষ করতে পারে না। গার্লফ্রেন্ড থাকলে এক স্ট্র দিয়েই দুজন মিলেমিশে খায়, একবার যদি লায়লা চুমুক দিয়ে টেনে নিল রস তো আরেকবার মজনু সে স্ট্র দিয়েই দেয় আরেক চুমুক, তারপর আবার লায়লা, তারপর আবার মজনু, করোনাতেও এসব থেমে নেই, হুম, বাঙাল জাত! প্রেমে কোনও ভেজাল নেই! তবে কিনা একবার ডাবের ভেজাল নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছিল। দেশের বেশ ক’জায়গায় পথের ডাব কিনে খেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলত মানুষজন, আর সে-অবসরের মোবাইলসহ যত জিনিসপত্তর, পকেটের, ভ্যানিটি ব্যাগের টাকাপয়সা সব হাপিস হয়ে যেত। এখন অবশ্য সেই অজ্ঞান পার্টিরর হাত থেকে ডাবের মুক্তি ঘটেছে বলেই মনে হচ্ছে, বেশ ক-বছর হলো এমন ঘটনার কথা শোনা যায় না।

জাম্বুরারও বেশ কদর। জাম্বুরা ছুলে কাঁচামরিচ লবণ দিয়ে মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। জামের দিনে জাম, আমের দিন আমও মেলে পথে পথে। আর আছে লেবুপানি। বিশেষ এক রকম জার নিয়ে বসে থাকে এরা। লেবুরসের সঙ্গে চিনি আর জিরা মিশিয়ে পানিটাকে বড় বেশি উপাদেয় করে তোলে। এ ধরনের পানীয় মধ্যে আখের রসেরও খুব কদর। কীভাবে রটে গিয়েছে আখের রস খেলে জন্ডিস হয় না, হলেও সেরে যায়, ব্যস কদিন দেদারসে আখের রসের রাজত্ব ছিল। শহর গ্রামের মোড়ে মোড়ে আখমাড়াইয়ের কল বসিয়ে বিক্রি করা হয় আখের রস!

কলার কথা কী বলব, সে তো আদি এবং অকৃত্রিম। তবে এখন অনেকেই কলা খেতে দ্বিধান্বিত থাকে। কলা পাকানোতে নাকি কিসব কেমিক্যাল মেশায়, সে ভয় আজ পথিকদের বিশেষ ভাবিত করছে। তবে পেঁপে পেলে নির্দ্বিধায় খায়। পাকা পেঁপের কদর আমড়া পেয়ারার চেয়ে কম নয়। ওহ আরেকটা ফলের কথা তালে তালে বলা হয় না। সে ওই তাল, যাকে আহারিও বলা হয়। আজকাল তালও বিক্রি হচ্ছে নির্দিষ্ট মৌসুমে সর্বত্র।

কোথায় ঢাকার ইটালিয়ান হোটেলের খাবারের কথা বলছিলাম, তা ফেলে কত গ্রাম-গঞ্জ-শহর-মফস্সলের পথ হাট- বাজার ফেরিঘাট ঘুরে এলাম। কিন্তু খোদ ঢাকার কথাটাই বলা হলো না। আমার শৈশব কিন্তু ঢাকা-বঞ্চিত নয়। আমার জন্মই হয়েছিল পুরনো ঢাকার লালবাগে, নানারা তখন ঢাকায় বাসাভাড়া থাকতেন, পরে চলে যান গ্রামের বাড়ি। আর আমিও পরে গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে চলে আসি। কিন্তু দুই খালার বাসা আর মায়ের সুবাদে কয়েকজন পরমআত্মীয়ের বাসা ঢাকা হওয়ায় প্রায়ই আমাকে ছোটবেলা থেকেই ঢাকা যেতে হতো, নিছক বেড়াতে, কখনও বিয়ে খেতে, পরে উনিশশ পঁচাশি সালে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে একেবারেই চলে এলাম ঢাকায়। সেই সূত্রে ঢাকার পথের খাবারের বিবর্তনটাও আমার কমবেশি জানা।

 শৈশব থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগ অবধি ঢাকায় বেড়াতে আসতাম পুরান ঢাকার ৪১ উমেশ দত্ত রোডে, যেটাকে আবার উমেশ দত্ত রোড নাম পাল্টিয়ে উর্দু রোড রাখার চেষ্টা হয়েছে। এ-বাসায় আমার আসার কোনও সময়-অসময় ছিল না। আর একুশে ফেব্রুয়ারি এবং মহররমের সময় আসাটা ছিল অনিবার্য ব্যপার! জাতীয় শহিদ মিনার আর হোসেনি দালান কাছাকাছি হওয়ায় এ দুটো শোকোৎসবই আমি প্রায় প্রতিটি বছর পালন করতে এ বাসায় এসে হাজির হতাম। মোয়াজ্জেম নামে ছিলেন এক ছোটোমামা, যার বয়স আমার প্রায় কাছাকাছি, দুজনই ছিলাম সিনেমা দেখার পোকা। সুযোগ পেলে বেরিয়ে যেতাম সিনেমা দেখতাম।

কোথায় হারিয়ে গেল আজ সেইসব প্রেক্ষাগৃহ ? মুন, স্টার, শাবিস্তান, গুলিস্তান, নাজ, তাজমহল! চকবাজার, বংশাল, সোয়ারিঘাট, মৌলভিবাজার অর্থাৎ প্রায় পুরান ঢাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেসব সিনেমা হল আমরা চষে বেড়িয়েছি। নিউ মার্কেটের বলাকা হলও ছিল দারুণ এক ঠিকানা। আর এসব হলে আমরা সিনেমা দেখতে যেতাম পায়ে হেঁটে হেঁটে। ছোটোমামার আবার পথের খাবারের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল না। চকবাজারে সকালে গিয়ে শাহী হোটেলের খাসির রেজালা দিয়ে গরম পরোটা বা কলিজা দিয়ে পরোটা অথবা আলাউদ্দিনের লুচি ভাজির প্রতিই ছিল অধিক নজর। কী যে অপূর্ব স্বাদ আর ঘ্রাণ ছিল সেসব খাবারের। তবে পথের খাবারও যে আমরা খাইনি, তা বলা যাবে না। চকবাজারের পথের পাশে একটা দোকান ঘেঁষে শরবত বিক্রি হতো। সে শরবত খাওয়ার জন্য প্রতিবারই লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। ঠাণ্ডা বরফের সঙ্গে দইসহ কী কী সব উপাদান মিশিয়ে বিক্রি হতো সে শরবত। আমার এত বছরের জীবনে এমন স্বাদের শরবত আমি আর বাংলাদেশ কী ভূ-ভারত কোথাও পেলাম না। সেই শরবতের দোকানটিও কালের কোন অতল তলে তলিয়ে গিয়েছে।

তখনও চকবাজার জায়গাটায় গেলে টের পাওয়া যেত যে, এদেশে ইংরেজদের আগে মুঘলরাও দেশটা শাসন করেছে। হোটেল আর পথঘাটের খানাদানা দেখলেই বিষয়টা অনুধাবন করা যেত। সেই শান আর নেই এখন তবে রমজানের সময় এলে টের পাওয়া যায় চকবাজারের উত্তাপ। চকবাজার মোড়ের পুরো পথই বন্ধ হয়ে যায় ইফতারির পদে পদে। রমজানের সেইসব খাবারের তালিকা দিতে গেলে আরেক মহাভারত লিখতে হবে! মুসলমানদের পবিত্র এই ধর্মীয় আচার পালনের সন্ধ্যেবেলার ইফতারে ঢাকাবাসীরা পথের খাবারকে পরম আদরে জায়গা দেয় ঘরে। এ প্রসঙ্গে মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা খ্যাত সম্পাদক লেখক মীজানুর রহমানের ঢাকা পুরাণ বই থেকে খানিকটা অংশ উদ্ধৃতির লোভ কিছুতেই সামলাতে পারলাম না :

 ‘নবাবী আমলে রমজান মাসে নাকি পেস্তা, বাদাম, দুধ, জাফরান এবং আরও কত কি মেশান শরবত খাওয়ান হতো মিনিমাগনা পথচারী রোজাদারদের। যত পাও, তত খাও। কিন্তু সোনার চেয়ে দামি সেই জাফরানও নেই আর সেই নবাবি শরবতের স্বাদও নেই। তারপরও যা টিকে আছে, যে খেয়েছে, সে বারবার ছুটে যায় ওই চকবাজারে। আমার বেশ মনে পড়ে, তিরিশ-চল্লিশের যুগে কলকাতায় মহররমের সময় ট্রাকবোঝাই শরবত পূর্ণ পিপে থেকে ওই জাফরান-পেস্তা মেশানো শরবত পথচারীদের খাওয়াতে দেখেছি। আমার জিভে না অমৃতই ঠেকত!

যেসব মুখরোচক খাবার সেকালে কি একালে খদ্দেরদের বিশেষ করে আকর্ষণ করে থাকে, তার মধ্যে সিরমল পরাটা প্রধান। এই পরোটা চিনি মেশান ঘিয়ে ডোবান থাকে। ডুবন্ত ঘি থেকে উঠিয়ে পরিবেশন করা হয়। আজকাল ঘি, দুধ ও পরোটা তৈরির অন্যান্য উপকরণের দাম চড়া হওয়ায় বিশেষভাবে অর্ডার দিলেই এই পুরোটা মুখে রোচে। এছাড়া বোঁদের চেয়ে বড় চিনির রসে ডোবান রসবড়ি, দুধের মালাই দিয়ে তৈরি মালাই দুধ, ফুলকো চাপ দিলে ঝুর ঝুর করে ভেঙে যায় ক্রেসবৃন্দিয়া নামের পরোটা, এক থেকে দুই কেজি ওজনবিশিষ্ট বড় জিলাপি, গজা, দইবড়া, ফালুদা, সুতি কাবাব, শামি কাবাব, নার্গিস কাবাব, জালি কাবাব, শিক কাবাব, গুর্দা কাবাব, ৮০-৯০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বড় বাপের পোলায় খায় আইটেমটিও দারুণ আকর্ষণীয়।’

মীজানুর রহমান আরও অনেক ইফতারের আইটেমের কথা উল্লেখ করেছেন, যার তালিকা বিশাল ও দীর্ঘ। তার লেখা থেকেই জানতে পারি ভিমটো নামের এক সুপেয় পানীয়র কথা। যা ফুটবলসহ নানা খেলাধুলা দেখতে আসা পথচারীরা খুব পান করত। মীজানুর রহমান লিখেছেন, ‘ভিমটো―সেকালের একমাত্র স্থানীয় সফট ড্রিংক। কতিপয় ধনবানের বাড়িতে ছাড়া তখন ফ্রিজ ব্যাপারটা ছিল অসূর্যস্পশ্যা। কাজেই কাপ্তন বাজারের বরফ কল থেকে বরফের কুঁচি ছিল ভরসা। ভিমটোর বোতল ছিল ওই সেকালের সোডা ওয়াটার বোতলের মতো। ভেতরের তরল পানীয়ের রং ছিল ফান্টা ,মিরিন্ডার মতো হলদেটে। ভিমটো আজ শুধু স্মৃতিই।’

মীজানুর রহমানের এই ঢাকা পুরাণ বই থেকেই জানতে পারি সেই চল্লিশের দশকেও পিঠা ছিল ঢাকার পথের খাবার। ‘শীত এল কি ঘরে ঘরে ভাপা, আন্দেশা, পিঠেপুলি, দুধকলি, পাটিসাপটা, বিবিখানা ও মামুলি মালপো বানানোর ধুম পড়ে যেত। শুধু কি ঘরে, বাইরেও ছিল তার ভারি চপট। রাস্তার ধারে (তখন তো বাংলাবাজার-পাটুয়াটুলির মোড় থেকে কুমিল্লা ব্যাংকের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি সদরঘাটের দিকে চলে গিয়েছে, তার দুই ধারের ফুটপাতছাড়া শহরের কোথাও ফুটপাত ছিল না।) পিঠারিদের হাতের গরম পিঠাও কম-বেশি সব পল্লীতেই পাওয়া যেত। যাদের পিঠা বানানোর সুযোগ ছিল না, তাদের জন্য এই পিঠারিওয়ালারা ছিল একমাত্র ভরসা, অবলম্বন―যাই বলি না কেন।’

 সদরঘাট, বাংলাবাজার, সোয়ারিঘাট অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা পাড়ে আজও পাওয়া যায় অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবার। এর মধ্যে সবচেয়ে সুলভ হলো লাচ্ছা পরোটা। ওটার জন্য স্পেশাল গরুর মাংসও ছিল। ছোটমামার সঙ্গে মুন-স্টারে সিনেমা দেখতে গেলে লাচ্ছা পরোটা খাওয়াটা ছিল পার্ট অফ সিনেমা। আব্বা-মায়ের সঙ্গে আমরা যখন বর্ষাকালে চার পাঁচঘণ্টার নৌকাযাত্রায় নানাবাড়ি যেতাম, আব্বাও সোয়ারিঘাটের এক দোকান থেকে লাচ্ছা পরোটা আর মাংস নিয়ে উঠতেন নৌকোর মধ্যে। আমাদের জার্নি বাই বোট সে অপূর্ব স্বাদে হয়ে যেত জার্নি বাই হেভেন!’

হোটেলের খাবারের প্রতি আসক্ত ছোটমামার সঙ্গে পথে যেতে যেতে পথের খাবারও যে খাইনি, তা না, পুরি, সিঙাড়া, পিঁয়াজু এসব চির চেনা খাবার খেয়েছি। আর ছিল শুকা রুটি। শুকা রুটির অপর নাম বাকরখানি। এটি পুরনো ঢাকা তো বটেই নদীর ওপার জিঞ্জিরাতেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত। অনেকে পথে যেতে যেতে যেমন খায়, বাসায় নিয়ে যায় প্যাকেট ভরে ভরে।

ছোটোমামার সঙ্গে বলাকা হলে সিনেমা দেখতে গেলে নিউ মার্কেটেও চক্কর লাগাতাম। আমাদের নতুন যৌবনের চোখের ক্ষুধা মেটাতে তো বটেই, নিউ মার্কেটের স্বর্ণের দোকানের পাশে যে একটা হটপ্যাটিসের দোকান ছিল, ওটার প্যাটিস না খেলে বাসায় অন্তত দুরাত ঘুম হতো না। হটপ্যাটিস আর পেস্ট্রির তখন বেশ অভিজাত একটা চরিত্র ছিল। ও দুটো খাবার খেতে পারলে যে কেউ যেন জাতে উঠে যেত। সেই হটপ্যাটিস আর প্রেস্ট্রির দুরবস্থা দেখলে এখন চোখে পানি চলে আসে! পথের ফেরি-দোকানওয়ালারা যে ওদের দুজনকে আজ কোথায় নামিয়েছে, ভাবলেও কষ্ট হয়। মনে হয় যেন ইংরাজ সাহেবকে পথেঘাটে ন্যাংটো করে অপদস্থ করা হচ্ছে। হটপ্যাটিস দেখি এখন যত্রতত্র চৌকোনো কাচের বাক্সে নিয়ে রাস্তাঘাটে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করা হচ্ছে। যার চেহারাসুরত আর স্বাদ দেখলে খাওয়ার রুচি উবে যায়। তবু লোকজন পথের প্যাটিস খায় বটে। পেস্ট্রিও তো নানা হালে নানা রূপে যেখানে সেখানে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। পথের দোকানে দোকানে এখন কেকের ছড়াছড়ি। লাচ্ছিও তখন থেকেই দেখে আসছি বেশ জমজমাট ও প্রেসটিজিয়াস খাবার। লাচ্ছি এবং ফালুদা এখনও নিজেদের  কৌলিন্য ধরে রেখেছে, কিন্তু হালিম বাহারি রেস্তোরাঁর ঘের জাল বেরিয়ে নেমে এসেছে কিছু কিছু ফুটপাতে।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন ১৯৭৬ সালে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পাশাপাশি আরও অনেককিছু ঢুকে গেল ঢাকার পথেঘাটে। নিউ মার্কেট আজিমপুরের বড়বড় গাছগুলো যেমন কাটা পড়ে, ভিডিও সিনেমার যুগও শুরু হয়ে যায় আড়ম্বরে। বাসায় বাসায় সবাই হিন্দি ফিল্ম দেখে। গোপনে গোপনে ব্লু ফিল্ম। সংস্কৃতির বিশাল পালাবদল। পুরনো ঢাকার বেগমবাজারে ১৫ টাকা দিয়ে হিন্দি ছবি দেখা যায়, বেশি রাতে বিশ টাকায় ওই ব্লু ফিল্ম। তারপর শীতের সিজনে শেরে বাংলা নগরে বসে শিল্পমেলা। সে মেলার সঙ্গে অনেক রকমের বিনোদনের বন্দোবস্ত। ম্যাজিক শো, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ। যাত্রাপালায় ঘটে প্রিন্সেসদের আগমন। আমি সেই শিল্পমেলাতেই প্রথমবারের মতো মোগলাইয়ের সঙ্গে শিক কাবাব খাই। তখন থেকেই আমার নজরে পড়ে ঢাকার পথেঘাটে ব্যাপক হারে শিক কাবাব, বটি কাবাব, মোগলাইয়ের বিস্তার। পরে যখন ফার্মের মুরগির ব্যাপক প্রসার ঘটলো, কাবাবের সঙ্গে যোগ হলো ফ্রাইড চিকেন, চিকেন তন্দুরির মতো খাবার। আগেও যে ছিল না তা নয়, দেশি মুরগিতেও পাওয়া যেত। কিন্তু ফার্মের মুরগি আসার পর এর ছড়াছড়ি ব্যাপক।

এই যে আমি বললাম যে, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার ফুটপাতের খাবারেও পরিবর্তন এসেছে, এ ধারা কিন্তু আজকের নয়। সেই মোগল আমল থেকেই লক্ষ্য করা যাবে দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পট পরিবর্তনের একটা প্রভাব পথের খাবারের ওপরও পড়ে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকার পায়জামা, পাঞ্জাবির জায়গা দখল করে নিল প্যান্ট, শার্ট, টাই। সুগন্ধি তামাকের জায়গায় এল সিগারেট। বাকরখানি, গরুর সুতা কাবাব, তেহারি পোলাও, মোরগ পোলাও, মুরগি মোসাল্লমের পাশাপাশি প্রসার ঘটল খাসি-বিরিয়ানি, চা বিস্কুটের।

এই পরিবর্তনের ধারা এখনও আছে। খোদ ঢাকাই তো বদলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। গুলশান বনানি থেকে বারিধারা বসুন্ধরা, মিরপুর চারদিকে তার বিস্তৃতি। আমরাও বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে এলাম কর্ম জীবনে, কারও কারও কর্ম জীবনও শেষ। জীবনের চলার পথে যেভাবে ইটালিয়ান হোটেলের খবর পেয়েছিলাম, সেভাবে নানান রকম খাবারের সন্ধানও আপনাআপনি পেতে থাকি।

একদিন শুনলাম কলাবাগানের মামা হালিম নাকি সেই রকম ওড়াধরা স্বাদের। ছুট লাগাও সেখানে। সত্যি সে হালিম লাইন ধরে খেতে হতো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। আরেকদিন শুনি বেইলি রোডের ফুচকার মতো স্বাদ অন্য কোথাও হয় না। সেখানেও যাওয়া হলো। ঢাকার যেখানে একটু ভিড়বাট্টা, গর্জিয়াস ভাব সেখানেই দেখতে পেতাম ফুচকা, চটপটির দোকান বসে যাচ্ছে।

ফুচকা চটপটি চলে আসায় নীরবে-নিভৃতে একটি খাবারের মর্যাদা যেন সামান্য হলেও হারিয়ে গেল। আগে পার্কে বসে যারা প্রেম করত বাদাম চিবোতে চিবোতে, তারা এখন প্রেমের সূচনা ঘটাতে শুরু করল ফুচকা চটপটি দিয়ে। নতুন নতুন মোবাইল আসার পর প্রেমিক তার প্রেমিকাকে ভজাতে এ ডায়লগটা থ্রো করতই, আসেন একদিন ফুচকা খাই। 

এখন অবশ্য চটপটি ফুচকাও মার খেয়ে গেছে। মোবাইল যুগ তো আর নেই। এখন হলো ফেসবুকের যুগ। ফেসবুকের ইনবক্সে হাই হ্যালোর পর্ব শেষ হতেই হিরো সাহেব অফার দিয়ে বসেন, আসেন একদিন কফি পান করা যাক! ঢাকায় এখন বেশ নামিদামি কফি ব্যান্ডের দোকান। তাও আবার আভিজাত্যপূর্ণ। তরুণ-তরুণীরা সেখানে সময় কাটাতে দারুণ ভালোবাসে।

তবে, উনিশশ পঁচাশি সালের আমি যে-ইটালিয়ান হোটেলের কথা বলছিলাম, সেই ইটালিয়ান হোটেল বা সেই ইটালিয়ান হোটেলগুলিই কিন্তু কম পয়সার মানুষকে, সোজা বাংলায় যদি বলি, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, ক্ষেত্রবিশেষে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বাঁচিয়ে রেখেছে! সব জায়গায় অবশ্য ইটালিয়ান হোটেল একে বলে না, সব জায়গায় অবশ্য ইটের তৈরিও সে হয় না। কোথাও টিনের ঘের, কোথাও খালপাড় বেড়া দিয়ে ছোট্ট খানিকটা পথের জায়গাকে আশ্রয় করে গুটি কয়েক বা একটা টুলবেঞ্চ নিয়ে বসে যায় এসব ভাতের হোটেল। ফুটপাত ছাড়িয়ে বিভিন্ন অলিগলির খালি জায়গাতেও এসব অস্থায়ী হোটেল চোখে পড়ে। এসব পথের হোটেলে ভাতের সঙ্গে থাকে পুকুরচাষের রুই, ইলিশ মাছ, ইলিশের ডিম, গরুর মাংস, ফার্মের মুরগি, ফার্মের মুরগির ডিম,  পাঁচমিশালি সবজি। আগে ডালটা হয়তো ফ্রি দেয়া হতো, এখন আর দেয় না।

কম খরচে মেলে এসব ফুটপাতের দোকানের খাবার। কম রোজগারের মানুষরা এসব হোটেলেই খায় পরম তৃপ্তি ভরে। সবাই তো আর বাড়ি থেকে খাবার বয়ে আনে না অফিস-আদালতে। সে ধৈর্য্যও নেই, রুচিও হয়তো হয় না। অহেতুক একটা বাড়তি ঝামেলা মনে করে। তারা অফিসের মাঝের বিরতিতে টুক করে বাইরের এসব ফুটপাতের দোকানে ভাত খায়। হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেয়ে মোটা টাকার গচ্চা কে দেবে।

শুধু যে অফিসকেন্দ্রিক লোকজন খায়, তা না, তাদের চেয়ে বেশি বোধ হয় খায় বাইরে থেকে ঢাকায় উড়ে আসা ভাসমান লোকজন। প্রতিদিন তো আর কম মানুষকে ঢাকায় আসতে হয় না। নানা রকমের কাজ থাকে। কেউ অফিস-আদালত, কেউ নিছক বেড়ানো, কেউ কারও সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, কেউ বা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে―সব মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষ ঢাকাকে রোজ রোজই ব্যস্ত নগরীতে পরিণত করে রেখেছে। তাদের জন্য পথের এই ভাতের হোটেল আশীর্বাদের মতো। হোটেলের তুলনায় টাকা দিতে হয় কম। ফুটপাতে বসার জন্য তো আর কাউকে ভাড়া দিতে হয় না, বিদ্যুৎ বিলেরও ঝামেলা নাই। তাই কম টাকায় বিক্রি তাদের পোষায়। তবে পুলিশ বা পলিটিক্যাল পাণ্ডাদের তোলা দিতে হয়, এটুকুই ঝামেলা।

এসব ফুটপাতকেন্দ্রিক ভাতের হোটেলগুলো সাধারণত গড়ে ওঠে যেখানে অফিস আদালতের মানুষ ভিড় করে সেসব জায়গায়। ঢাকার মতিঝিল অফিস পাড়ার ভেতর সাইডের গলিঘুপচি, পল্টন, ফকিরেরপুলসহ ধানমন্ডি বা গুলশানের পাশের এরিয়ায় এমন ধরনের হোটেলের ব্যাপক দেখা মেলে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকায় যেসব ছাত্র হলে থেকে লেখাপড়া করে, তাদের জীবনও সাশ্রয়ী করে দিয়েছে এসব ভাতের হোটেল। আমি যখন ক্যাম্পাসের বাইরে যেতাম লেখা দিতে কোনও পত্রিকা অফিসে কিংবা অন্য কোনও কাজে, ইটালিয়ান হোটেল চেনার পর হোটেল-রেস্তোরাঁতে খেয়েছি কম। এসব ইটালিয়ান হোটেলই হয়ে উঠেছিল আশ্রয়। এখন অবশ্য ফুটপাতের এসব খাবারেও বৈচিত্র্য এসেছে। পথচারীদের জন্য কেউ কেউ নুডলস বানিয়ে রাখে, কেউ চিড়া দই, কেউ হালিম। ফুটপাতে যে কেবল ভাতের হোটেল থাকে, তা না, আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই দেখেছি একটা পত্রিকা অফিসকে ঘিরে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলকে ঘিরে কিংবা একটা কারখানাকে ঘিরে পরোটা, ডিম, ভাজির টংঘর গড়ে ওঠে। এসব দোকানে পাউরুটিরও বিশেষ প্রাধান্য থাকে। পাউরুটি ডিম মাখিয়ে টোস্ট করে দেওয়া হয়। কিংবা পাউরুটিটাকে খানিকটা তাওয়ায় গরম করে ডিমের সঙ্গে জুড়ে নেওয়া হয়। কেউ কেউ একটা কলা দিয়েও একটা পাউরুটি পুরোটাই খেয়ে নেয়।

এখানে আরেকটি কথা বলাটা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না, আজকের এই যে ঢাকার বিখ্যাত হাজির বিরিয়ানি, ফখরুদ্দিন বাবুর্চির বিরিয়ানি, ওয়ারি চৌরাস্তার চুন্নুর মোরগপোলাও কিংবা নান্নুর বিরিয়ানি, তাদের যাত্রাও কিন্তু শুরু হয়েছিল পথ থেকে। হাজির বিরিয়ানি পথের পাশে একটা ড্যাগ নিয়ে খরচ বাঁচানোর জন্য প্যাকের পরিবর্তে গাছের বড়পাতায় পরিবেশন করত। সে বিরিয়ানির স্বাদের কথা এতটাই প্রবলভাবে রাষ্ট্র হয়ে গেল যে, পরে তাদেরকে একটা হোটেলে আশ্রয় নিতে হলো, সেই হোটেল থেকেই তারা আজও প্রতিদিন কত কত ড্যাগ যে হাজির বিরিয়ানি বিক্রি করে তার হিসেব নেই। বেলা বারোটা থেকে শুরু হয় বিরিয়ানি বেচা, শেষ হয় রাত বারোটায়। ক্লান্তিহীন সেকেন্ডে সেকেন্ডে পরিবেশনা চলতেই থাকে। কেউ বসে বসে গরম খেয়ে যায়, কেউ সেই আদি এবং অকৃত্রিম পাতায় করে নিয়ে যায় নিজের বাসায়। শোনা যায়, ফখরুদ্দিন ছিলেন ভিকারুন্নেসা স্কুলের সামান্য পিয়ন। স্কুলে চাকরির পাশাপাশি আচার বিক্রি করতেন। সেই আচার বিক্রি করেই জমে ওঠে পসার, বাবুর্চি হিসেবেও সুনাম ছড়ায়। চারদিক থেকে বিভিন্ন বিয়েসহ নানা অনুষ্ঠানে বিরিয়ানি রান্নার দাওয়াত আসে। পরে সে ভিকারুন্নেসা স্কুলের এক কোণে বিরিয়ানির দোকান খুলে বসে। এখন অবশ্য সেখানে দোকানটি নেই, ফখরুদ্দিন সাহেবও নেই, কিন্তু ফখরুদ্দিন সাহেবের বিরিয়ানির দোকান ছড়িয়ে পড়েছে গুলশান, ধানমণ্ডি, মগবাজার, মতিঝিলসহ তামাম ঢাকায়। চুন্নু, নান্নুর উত্থানও সেই ফুটপাত থেকেই।

তবে সম্প্রতিকালে শহর ঢাকার যেমন খোলনলচে পালটে গেছে বা ক্রমাগত যাচ্ছে, তার সঙ্গে পথের খাবারের ঘটেছে নতুন নতুন সব সংযোজন। আজ যে কেউ অনেকদিন পর ঢাকায় আসলে চমকে উঠবেন। গুলশানের দুপাশের ভবনগুলো সাজছে আধুনিক নতুন সাজে, হাতিরঝিলের রাস্তা ঢাকাকে দিয়েছে নতুন পালক, মিরপুর, পুরনো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গাতেও লেগেছে আধুনিকতার নবতর ছোঁয়া। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েরও বেশ নব নব বিকাশ। ওদিকে বিশ্বরোডকে ঘিরে তিনশো ফিট রাস্তার অনাবিল সৌন্দর্য! এইসব পরিবর্তনকে ঘিরে পথের খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে ঘটে গেছে নতুন বিপ্লব। তিনশো ফিট, হাতিরঝিল, বনানি থেকে মিরপুর ডিওএইচএস যাওয়ার পথে কালশিতেই শুধু নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণকে ঘিরে মোবাইল রেস্তোরাঁর ঘটেছে ব্যাপক বিস্তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরম চত্বরই হোক কিংবা মিরপুরের কোনো নিভৃত প্রান্তই হোক কিংবা হাতিরঝিলের লেকপাড়ের সুরম্য পথই হোক, পথের পাশ ঘিরে বা ফুটপাতে এসব অস্থায়ী মোবাইল দোকানে পুরনো খাবারের সঙ্গে মিলবে অনেক নতুন নতুন খাবারের সম্ভার। নতুন জেনারেশনের খাওয়ার রুচি তো আর আগের মতো নেই। এসব খাবারের সম্ভারের মধ্যে যেমন রয়েছে হালিম, চটপটি, ফুচকা, ভেলপুরি, পানিপুরি, বাদাম-চানাচুর- ছোলার ঝাল ভর্তা, ঘটি গরম, তেমনি মিলবে চিতুই পিঠা, ভাপা পিঠা, কুলি পিঠা, কুলি পিঠা আবার দু রকমের―সিদ্ধ এবং ফ্রাই।

কয়লা থেকে মুরগি, গরুর কাবাবের নানান পদ, ছোলা-বাটোরা। চিকেন চাপ, বিফ চাপের সঙ্গে লুচি, মগজ ফ্রাই-লুচি, ঐতিহ্যবাহী শাহী মুড়ি―যা আবার পাওয়া যায় ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে―চিকেন দিয়ে, গ্রিল দিয়ে, হাস দিয়ে। দই ফুচকার সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্রিম ফুচকা।

নতুন যুগের খাবার হিসেবে যোগ হয়েছে নুডলস, বার্গার, পিৎজা, পাস্তা, ছাপ বার্গার, স্যান্ডউইচ, ফ্রাইড রাইস, চাওমিন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফ্রাইড চিকেন, তন্দুরি চিকেন, গ্রিল চিকেন, রেগুলার নান, বাটার নান, কর্ণ স্যুপ, থাই স্যুপ, পুরি-সমুচা- সিঙ্গারা-পিঁয়াজু তো আছেই আরও মিলবে চিকেন নাগেট, চিকেন বলম স্পাইসি চিকেন, চিকেন সসেজ, ছোলা, বুট, ডিম সিদ্ধ, গরম দুধ।

এসবের সঙ্গে আছে গ্রিন লেমুনেড, জিরা পানি, লাচ্ছি, সব রকমের ফলের জুস। দেশিবিদেশি এমন কোনও ফল বাকি নেই, যার জুস মিলবে না। বিপ্লব ঘটে গেছে চা কফিতেও। গরম কফির পাশে মিলবে কোল্ড কফি, ব্ল্যাক কফি। আরও নানাজাতের কফি আছে। চায়ের মধ্যেও আছে নানান রকমফের। দুধ-চা তো আছেই, লাল চা, গ্রিন টি, তুলসীপাতার চা, কালিজিরামিশ্রিত চা, লেবুর রসযুক্ত চা, আদার রসযুক্ত চা, মশলার চা, এমনকি জবাফুল মিশ্রিত চা-ও মেলে। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে মটকাটা চা। এই চা বিশেষভাবে বানিয়ে পোড়ামাটির একটি পাত্রে ঢেলে তারপর পরিবেশন করা হয়। এর ফলে এ চায়ের মধ্যে স্মেইল পাওয়া যায় পোড়ামাটির। এটাই নাকি তরুণদের ভালো লাগে। খানিকটা কি অস্বাস্থ্যকর মনে হচ্ছে ? তা তো বটেই। পথের যে দুরবস্থা আজ, পরিবেশের যে কলুষতা, তাতে পথের কোন খাবারটিই বা স্বাস্থ্যকর, বলতে পারেন ?

বাঙালি কোনোকালেই পথের খাবার খেতে অতসব চিন্তাভাবনা মাথায় আনেনি, এখনও নেয় না। খেলেও মরতে হবে, না খেলেও মরতে হবে। তাহলে খেয়েই মরা যাক, এমনই যেন একটা তাচ্ছিল্যের ভাব! তবে দোষটা কিন্তু বাঙালিকে দেয়া যাবে না কিছুতেই, খাবারের মধ্যে এত স্বাদ থাকলে সে খাওয়া অগ্রাহ্য করে, কার সাধ্য ?

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares