প্রচ্ছদ রচনা : একগুচ্ছ কবিতা

শিহাব সরকারের গুচ্ছকবিতা

বেড়ানো

রাতে ফিরলেই শ্যাওলা ধরা দেয়াল

সেই চল্লিশ ওয়াটের বাল্ব

পাশের নর্দমা থেকে উপচানো পানি চৌকাঠে

চা-দোকানে পেয়ালায় চামচ নড়ছে

এখানে কারও হাতে কেউ কাপ দেখেনি।

তবু রাত যত বাড়ে কাপ-পিরিচের টুংটাং

রাত্রিকে নিঝুমের অতলে টেনে নিয়ে যায়।

অন্ধকারে ঝাপটানো কামরায় চলে প্রত্নভাষা

কারা যেন রাতদুপুরে গুপ্ত বৈঠকে।

বাড়ি থেকে ফিরে এসেছি, ফাঁকা প্ল্যাটফরম

তবুও নিশিথিনী মেইল আসে,

কোনও সিট খালি নেই, জোছনায়

শরীরী রেখা দেখি, জানালার কাচে কুয়াশা-মুখ

সেই নৈঃশব্দ্য কেটে ছুটে যায় মেইল ট্রেন।

ট্রেন মিস গেলে কেউ কাঁদে ফাঁকা ওয়াগনে

অনেকে কাঁদে না থাকে হিম, স্থাণু, যুগ যুগ।

রাত্রির খোঁজে

দিনেরা কেবলই দীর্ঘ হয়, দিন মানে দহন

শার্টের বোতাম নাই, ছেঁড়া গেঞ্জি

বুকে বাঘনখের আঁচড়ে কাঁচা রক্ত জমে আছে।

ভবঘুরের দিনগুলো দীর্ঘ, দিনেরও গূঢ়ার্থ হয়

রাত্রিরা সব গিয়েছে বনবাসে, ফিরবে না ?

নিশিপদ্ম কুঁড়িতেই মৌমাছিকে টানে।

দিনগুলি দীর্ঘ হলে ভিখিরি বালিকা

কোথায় পালাবে। কুঁকড়ে থাকে ছিন্ন তাঁবুতে

দিনগুলি দীর্ঘ হলে সূর্যেরও জিভ দীর্ঘতর।

রাত্রি নেই আর গহিন অরণ্যে, চরাচরে

ট্যাংকের বহর যায় ফিল্ডগান আর থামবে না

কীটপতঙ্গ পিপীলিকা কেঁচো কেউটে যত

মটি ফুঁড়ে আসে পিলপিল, এঁকেবেঁকে

এ কোন দীর্ঘদিন, অচেনা নীল আলো।

বালুর ভাগাড়ে শকুন, অন্ধকারে নেমে যারা ফেরে না

গুচ্ছ গুচ্ছ জুনিপোকা পকেটে ভরেছে।

 আমরা জ্যোৎস্নার খোঁজে নেমেছি দূর-পাতালে

সুড়ঙ্গ ধরে এগুলে পাব মমিদের মদ।

এক পাখিতে, দুই পাখিতে

একটি শালিক ব্যালকনিতে

আসছে উড়ে হাওয়ার ভাঁজে

যতই তাড়াই শুনছে না যে,

আবার আসে শোক জানাতে।

শালিক কাঁদে আমি ধুঁকি

কান্না প্লাবন কেমনে রুখি

কত যে মানুষ জন্মপাখি,

কলধ্বনিরও জীবন ফুরায়

আর-জনমে আবারও পাখি

বাঁধবে বাসা পাহাড়চূড়ায়।

জোড় শালিকের গীতগুলো সব

হাওয়ার নীড়ে জাগছে সরব

কোন ভুবনে ছিল যে ভেসে

(ঠিক) ঐ সময়ে উড়ে এসে

আরেক শালিক বসলো ঘেঁষে।

দুই পাখিতে দ্বৈত গেয়ে

কাঁদছে হঠাৎ খুশিতে পেয়ে।

তারা ফোটালো সন্ধ্যা কেন

(পাখি) এখনই রাত হয় না যেন।

সবশেষে ছায়া সত্য

আমার পিছু-পিছু আমার ছায়া

অথচ মাথার ওপর সূর্য

এসময়ে মানুষেরা ছায়াহীন, মধ্যাহ্ণের ভূত

শীতবিকেলে সামনে ছায়া রেখে চলি

নাকি আমাকে টানে আমারই ছায়া।

সামনে ছায়া পেছনে ছায়া

দু’রকমের ছায়া নিয়ে জীবনের খসড়া

ভোর থেকে শুরু হলো ছায়া-ভজনা

ছায়া তো জানো অপচ্ছায়া, বয়সের সঙ্গে

হাত ধরে ছায়ার মিতালি গাঢ় হয়।

শৈশবের ছায়া ডানে-বাঁয়ে ঘুরে মুখোমুখি

কখনও বাম থেকে ডানে ঘুরে

পিছনে যায়, মধ্যযৌবনে মানুষের

কোনও ছায়া থাকে না।

এদের কেউ কেউ মহাযৌবনের রাজা

অন্যদল দেশান্তরি মুসাফির যৌবনবাউল

ছায়ার ভিতরে আমার আত্মা

ছায়া থেকে জীবজগৎ ফুটে আসছে শতদলে

পেছনে আসুক বা সামনে হাঁটুক

সবশেষে ছায়া সত্য, ছায়া ধ্রুব

সকলে মূলত বেঁচে আছি ছায়াছায়া

পায়রার পায়ে

কলিকাতা আছে নিশ্চয় কলিকাতাতেই

আছে কি তবু সব আগেরই মতো

উড়াল সেতুর নীচে, মেট্রোর পাশে

পার্ক স্ট্রিটে, গড়িয়ায়, মীর্জা গালিবে

চাওমিন, নিম্বু পানি, হরেক বার্গার …

এলাম কতদিন পর! ব্যোমকেশ নেমেছে,

দুঃস্বপ্ন তার পিছুপিছু

আমি কারফিউতে বেড়েছি ঢাকায়

দিনরাত কারফিউ, হল্ট, বাইরে খাকি

কুকুরে লাশ খেয়েছে একাত্তরে, ভরদুপুরে।

মুর্দাফরাশ উধাও, কুকুরও বমি করে

এখন তো লকডাউন ডালভাত

কতদিন পর কলকাতায়।

ঘুরে-ফিরে দেখি নন্দন চত্বর, বাইরে কিউ

ঢুকে পড়ি অন্ধকার এসি ঘরে

অহল্যা-রাধিকার জম্পেশ তেলেভাজা খেয়ে

 মৈত্রীর ল্যাগ আমাকে কাটাতেই হয়।

তরুণ কবিরা খালাসিটোলা ছেড়ে

এখন নাকি বার মাতিয়ে রাখে

দমদমে থাকে কবি, মাত্র খাওয়া ধরেছে।

তিন পেগ শেষ না হতে টেবিলে মাথা

কেউ বলল, আমি নেই, কে নেবে ওকে

এখনই ঠিক করো,

কেন্দ্রের পুলিশ এখনও আছে রাস্তায়,

ওরা কবি-টবি বুঝবে না।

ওরা শুধু লকডাউন বোঝে।

‘এই যে ভাই, ঢাকার কবি

করোনা ছুটি নিচ্ছে, আপনারা ডাকুন না!

চড়ে আসি আপনাদের উড়াল মেট্রো

পদ্মা সেতুর রেল

আমরা পড়ে আছি কলিকাতার অন্ধকূপে,’

কে বলে, ফের লকডাউন হবে ?

না, পৃথিবীর কোথাও নয়

 কোনও ভিনগ্রহ থেকে আসবে ভাইরাস

তাহলে, সুরঞ্জনা, তুম্মো লকডাউনে, আম্মো।

চলো পায়রার পায়ে বাঁধি চিঠি

এখনও সময় আছে, পাখির সবক্ ঠিক করো,

পায়রার পায়ে মনের খড়কুটো বেঁধে

এপারে-ওপারে হবে আমৃত্যু মিতালি।

৪ জুলাই ২০২১


বিমল গুহ-গুচ্ছকবিতা

হে পৃথিবী

হে পৃথিবী লিখে রাখো প্রামাণ্য অক্ষরে

গলিত লাভার স্রোত নুড়ি ও পাথরে

―এইগ্রহে ফলন্ত বৃক্ষ ছিল, বসবাস ছিল মানুষের

আদিগন্ত শস্যক্ষেত ফুলে-ফলে ছিল স্বয়ম্ভর;

অসংবৃত লোলজিহ্বা সামুদ্রিক ঝড়

দুকুল ভাসিয়ে দিত মানুষের বুকটান থেকে;

লিখে রাখো―আগামী প্রজন্ম যেন সন্ত্রস্ত না-হয় আরবার

নাভিমূলে মানুষের কষ্টক্লেশ দেখে!

লিখে রাখো তালপাতা মাটি উইঢিবি পুবাকাশ;

লিখে রাখো গাঢ়নীল মানুষের জন্ম-ইতিহাস।

আমি তো দেখেছি চোখে ধাবমান অগ্নিলাভাস্রোতও

ঊর্ধ্বমুখী বেগবান, যেরকম কোভিড-আক্রান্ত রোগী ওতপ্রোত

শুয়ে থাকে গলিত লাভার স্রোতে ক্লান্ত বিছানায়;

তবুও আশায় বাঁচে মাটির পিদিম

গিরিখাদে নুয়ে-পড়া বটবৃক্ষ মাথা তুলে আবার দাঁড়ায়!

লিখো হে পৃথিবী―এইখানে জন্মেছিলো আনন্দ কুসুম

চন্দ্রালোকে হেসেছিল সংবৎসর আলোভরা ঘর;

তোমার আকাশভরা মেঘের আস্তিনে―দেখো হে পৃথিবী

ত্রস্তগতি আলোবর্ষ পুরাকীর্তি প্রামাণ্য অক্ষর!

আঁধারের রূপ

সুন্দর দঁড়িয়ে আছে সম্মুখে আমার

―জীবন সুন্দর;

অন্ধকার হাতছানি দেয় বারবার

কেঁপে ওঠে লহমায় সন্ত্রস্ত ঘর!

মৃত্যু পুঁতিগন্ধময় বীভৎস হাওয়া

মৃত্যু দীর্ঘ-দীর্ঘতম শ্বাস;

জীবনের কাছে যাই, ছুটে-ছুটে যাই

বিছানার দুইপাশে বাড়ে মুথাঘাস!

জীবন সুন্দর আহা! জীবনই সুন্দর;

আঁধার কুৎসিত কদাকার

জীবনের অবজ্ঞার লিখবো কী নাম

ড্রাগনের অগ্নিরূপ―ভীতি, অন্ধকার!

লাইফ সাপোর্ট

শুধু বালিয়াড়ি, শুধু রাশি রাশি জল

সমুদ্র সমুদ্র―চারদিকে জলের উল্লাস

এ রকম মহা এক ঘোরের ভেতর

হেঁটে যাচ্ছে আমার সময়।

শুধু বালিয়াড়ি শুধু জল

ভেতরে শৈশবনৃত্য―শুধু কোলাহল ভরবেলা!

কোথায় কী হলো আজ―আগুনের মতো

তীর্যক রোদ এসে পড়েছে সৈকতে

পাশে নৃত্যরত সমুদ্র―জলের উল্লাস, তবু

ভেতরে ভেতরে সব ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে মনে হয়;

আগুনের মতো লেলিহান ছিটকে পড়েছে সবখানে

পুড়ে যাচ্ছে মোহ

সমুদ্রের জলও কি টের পায় কিছু ?

শুধু জল―শুধু বালিয়াড়ি―শুধু কোলাহল

এ রকম লাগে―যারা মৃত্যুপূর্ব লাইফসাপোর্ট নিয়ে বাঁচে।

একটি প্রাণ

একটি প্রাণ জেগে আছে লক্ষ প্রাণের মাঝে

আমি তার নাম দিয়েছি আয়ু;

একটি প্রাণ আমার পরমায়ু

একটি প্রাণ গড়িয়ে পড়ে লখিন্দরের ভেলায়

একটি প্রাণ রূপকথা-রূপ আদিম কাতরতা।

একটি প্রাণ―প্রাণ পেয়েছে ফিরে

একটি প্রাণে বাঁধা আছে সত্য-জাগরণ

একটি প্রাণে ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো জমা।

আত্মার স্বরূপ

আত্মা কি ? ―আত্মা হলো আয়ু

আত্মা প্রাণবীজ

আত্মা হলো অক্সিজেন গ্যাসীয়মণ্ডল

সচ্ছল প্রাণের বন্দর―দূরগামী জাহাজের শিস্;

আত্মার স্বরূপ এক মাঙ্গলিক বাঁশি

প্রাণের কল্লোলে সারাদিন সারাক্ষণ বেজে ওঠা সুর!

আত্মার স্বরূপ খুঁজে পেতে, আত্মার প্রকৃতি খুঁজে পেতে

মানুষের কত আয়োজন!

আমি তো দেখেছি স্থির অপলক চোখে গতকাল

আত্মার গতিবিধি―রূপ ও স্বভাব

নিজ-চোখে প্রত্যক্ষ করেছি এর জাগ্রত আকার!

আত্মা এক গ্যাসীয়বলয়

পৃথিবীর চারপাশে ঘূর্ণমান প্রকৃতির শোভা;

যেমন আমরা জানি মঙ্গল-বৃহষ্পতি-শনির স্বভাব

তেমনি আত্মাও এই মানব শরীর জুড়ে ঘূর্ণমান বায়ু

প্রাণের কল্লোলে বেজে-ওঠা আনন্দের সুর।

এমনি তো হয়―

ঘূর্ণির কবলে পড়ে পাল্টে যায় আত্মার স্বরূপ

অনাদি শক্তির রূপে মিশে যায় পুনর্বার প্রকৃতির মাঝে!

মাস্ক

শোন্ আজ―কষ্ট হচ্ছে খুব

মুখ থেকে মাস্ক খুলে ঝুলিয়েছি ঘরের পাঁচিলে!

হে আজব প্রকৃতি

হ্যাঁ, তোকেই বলছি কড়া সুরে―

এ দুঃসাহস তুই কোত্থেকে পাস ?

আমরাই তো সৃষ্টির সেরা―

মৃত্যুর বিভীষিকা দেখিয়ে আমাকে কি কাবু করতে চাস

― তোর লজ্জা করে না!

যদি ঠেকে যায় পিঠ অস্থির দেয়ালে

যদি ক্ষেপে যাই

তোর হীন অহংকার বিচূর্ণ করে তোকে চুলোয় পোড়াব!

শোন আজ―কষ্ট হচ্ছে খুব

তুই পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যা,

দেখ্ আমি মুখ থেকে মাস্ক খুলে ঝুলিয়েছি ঘরের পাঁচিলে!

মৃত্যু

মৃত্যু কারও কাম্য নয়

স্বাভাবিক কোনও মৃত্যু আমাদের কুঞ্চিত করে না;

কারণ আমরা জানি

মৃত্যু মানে রূপান্তর

এক রসায়ন থেকে অন্য রসায়নে;

আদিশক্তি বিগব্যাং পুনর্বার স্পষ্ট হয় দুই চোখে

পৃথিবী তখন থেকে পদার্থের অণু নিয়ে পলায়নপর

খুঁজে ফেরে প্রাণবীজ রসায়ন-অণু,

মৃত্যু মানে সৃষ্টির মৌল রূপান্তর সম্মিলিত যৌগরসায়ন!

শাসন

ঘুম নেই―সারারাত ঘুমের সঙ্গে বোঝাপড়া চলে

উদ্ভট শব্দগুলো মাথার ভেতর পীড়া দেয় সারারাত

গলা বাড়িয়ে বলে একই কথা―ধমকের সুরে,

দেখি, কবিতার খাতাজুড়ে

আলোছায়া খেলার ভেতর কিলবিল করে লাল-পিঁপড়ার দল

রৌদ্রের রঙ মেখে

আমার সময় ডিগবাজি খায় ঘরের মেঝেয়

আমাকে শাসন করে আমার কলম

বড় হলে সন্তানও বাবাকে শাসনে রাখতে চায় যে-রকম!

মাথার ভেতর কালো-সাদা মেঘ ঢুকে পড়ে অকস্মাৎ

আমাকে শেখাতে আসে সমাজবিধির নীতিশ্লোক―

বিজ্ঞানের সূত্র টেনে মাস্ক পড়ার বিধি শেখায় আমাকে

যে রকম আমার কনিষ্ঠকন্যা মিথিলাও

দিনযাপনের মাহাত্ম্য বোঝাতে চায় সারাক্ষণ, আর

বইয়ের তাক থেকে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো ভেংচি কাটে

মুখভার করে বসে থাকে,

আমি চোখ বুজে কবিতার মন্ত্র আওড়াই

পৌরাণিক দেবতার মতো!

পৃথিবী বাঁচানো দরকারি

করোনার তীব্র থাবায়

মানুষ কাঁদছে বড়―খুব,

বুক ভেঙে গোঙানির সুর

ছেয়ে আছে পশ্চিম ও পুব!

মানুষ শান্ত হও―ভাবো;

দরকারি দূরত্ব মানা,

ছুঁড়ে ফেলো মানসিক দ্বিধা

ভেঙে দাও মৃত্যুর ডানা।

আকাশে আকাশে দেখো আজ

বার্তা দিয়েছে সাদামেঘ,

চলো―দূরত্ব মেনে চলি

ঝেড়ে ফেলি অজানা উদ্বেগ।

মানব-প্রজাতি যদি ভাবো

এর প্রতিরূপ নেই আর,

এ বায়ুমণ্ডল যত বড়

আকাশটা ততটা উদার!

করোনার অভিশাপ থেকে

পৃথিবী বাঁচানো দরকারি,

এসো সমবেত হই, বলি―

দূর হ করোনা অতিমারি!

ঋণ

এই প্রকৃতির কাছে আমার অনেক আছে ঋণ;

এই বায়ু-প্রাণবীজ এই নদী দীঘি ও সাগর

গিরিখাদ পর্বত উপত্যকা দূর দিগন্তরেখা

এ প্রাণিজগৎ মোহ জলাশয়ভর্তি ফেনাজল

এই গৃহ কিশলয় উঠোনের তৃণগুল্মলতা

এই কাঁকড়ার ঝাঁক, পিলপিল পতঙ্গকুল শামুক ঝিনুক

                              ―আমি এসবের কাছে ঋণী!

এই ঢেউয়ের উল্লাস―কুলুধ্বনি তরঙ্গদোল

ওই দূর ঝরনাধারা তীব্র পতনশীল স্রোত

এই শান্ত জলরেখা জলজপ্রাণির কেলিরূপ

এই গুল্মলতা ঝিঁঝি বাতাসের কানে নম্রদোল

এই পক্ষীকুল কিচিরমিচির; এই মাছরাঙা ডুব

এই শস্যখেত উদ্যান আমার আহার্য পাকাফল

এই মৌমাছি মধুবন সন্ধ্যাতারা জোনাকির আলো

                              ―আমার রয়েছে ঋণ এদের কাছেও!

ওই দূর সুন্দরবন ঝাউপাতা, জারুল, গর্জন

রয়েল বেঙ্গল টাইগার হাতি হনু শূকর ভল্লুক

এই উইপোকা সর্পিল প্রাণিকুল বনশোভা চঞ্চল হরিণ

এই বিস্তীর্ণ আকাশ, ছায়াপথ, গ্রহ-উপগ্রহ

এই নক্ষত্ররাজি, ওই দূর ভাসমান মেঘ

এ বায়ুমণ্ডলঘেরা আমার পৃথিবী ধুলোওড়া পথ

―আমি সকলের কাছে ঋণী!

এই ঋণ শোধ দিতে দিতে

দিতে দিতে একদিন আমারও অস্তিত্ব হবে লয়

এই প্রকৃতির বুকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুরূপে;

আমি ঋণী―আমার আজন্ম ঋণ প্রকৃতির কাছে!


নাসির আহমেদের গুচ্ছকবিতা

পৃথিবী ধ্বংসের আগে

পৃথিবী ধ্বংসের আগে কাঁচারোদ অবিকল ছড়াবে সকাল

অরণ্যের আলোছায়া রুপালি পর্দার ছায়াছবি

সোনালি মুদ্রার ঢঙে খেলবে অন্তিম খেলা রৌদ্র ছায়াময়

থেমে থাকবে না কিছু আসবে রাত্রিও যথারীতি।

অথচ এখন আর আমাদের দেখাশোনা নেই, সব দূরে

সম্পর্কের নৈকট্যের স্মৃতিরাও ঘুরে ঘুরে আসে

জীবনের এত মায়া বাঁচার পিপাসা সব ছাপিয়ে উঠেছে

বাগানে ফুটেছে কিন্তু ফুল আর পাতার সবুজ।

দূর থেকে শুনি আজ সজন তোমাকে, দেখি দূরে

প্রযুক্তির বদৌলতে আমাদের দেখা হয় ছায়াছবিময়।

পৃথিবী ধ্বংসের আগে আরও কত কিছু দেখা হবে

স্পর্শাতীত থেকে যাবে শুধু এই তীব্র ভালোবাসা!

অন্ধকার বারান্দায় একা বসে বসে ভাবছি এসব কথা,

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বসে ঘামছি গলগল সন্ধ্যেবেলা

কেন এই আসা-যাওয়া, কেন এই আলো-অন্ধকার

প্রতীকী রহস্য দেখি মানুষের সুখ-দুঃখ খেলা।

পাতাগুলো ঝরে যায়, পাতাগুলো অঙ্কুরিত হয়

বেঁচে আছি এখনও যে সেই তো আনন্দ আর অপার বিস্ময়!

দেবী বন্দনা

জানি স্পর্শাতীত তুমি দূরের আকাশ কিংবা মেঘ

বালকের দুরন্ত স্বভাবে তোমাকেই

ছুঁতে চায় অতৃপ্ত আবেগ।

তুমি নীল সমুদ্রের অতল উচ্ছ্বাস মহাঢেউ

তোমার গভীরে অবগাহনের স্বপ্ন যদি তবু দেখে কেউ

সে তো আমি ছাড়া আর কে হবে তুমি বলো এত বেহিসেবি

রক্ত-মাংসময় তমি হালাল রমণী কারও, আমি শুধু মনে করি দেবী!

তুমি নীল নিসর্গের দিগন্ত রেখার সঙ্গে মিশে যাওয়া গ্রাম

অথৈ সবুজে আমি তোমার সঙ্গেই মিশে থাকি অবিরাম।

তুমি মেঘ ছুঁয়ে যাওয়া অচেনা পাখির নীল ডানা

তোমাকে দেখেই মুগ্ধ, কখনও হবে না পরিপূর্ণতায় জানা!

তবু আমি পরিতৃপ্ত সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ সেই দেবীর পূজারি

যাকে কেউ চিনবে না, এ সংসারে সামান্যা সে নারী!

ফিরে আসতে হয়

চলে গেছি অনেক দূরে ছেলেবেলার উঠোন ছেড়ে একা

কলমিলতা-ঝোপের পাশে সোনালুু ফুল উঁকি দেওয়া ডাল

সেই যে আমার পোষা টিয়ের খাঁচা কিংবা ঘুঘুর বাসা

এসব ছেড়ে অনেক দূরে বৃথাই আমার অচিন পথে যাওয়া।

সেই যে বাউল চৈত্রমাসে একতারাতে সুরের মায়ায়

ভুলিয়েছিল খুব। সেই সুরে ডুব দিত আমার কত দুপুর-রাত

কোথায় আমি সেই বাউলের খোঁজ পাব আজ আর!

ভুল ভ্রমণে হারিয়ে গেল সব।

নির্জনতায় পাখির বাসা, ভরদুপুরের তালপাতাদের

শো-শো সুরের গান! সেসব ছবি কবির মতো মন-গহনে

হাহাকারের চিত্র আঁকে রোজ। কেউ কখনও পাবে কি তার খোঁজ!

কে যে কোথায় কী হারিয়ে ফতুর হয়ে যায়!

ঝাঁক বেঁধে যায় আকাশজুড়ে পরিযায়ী পাখিরা

ওই দেখো মনকে বলি শেখো, গেলেও আবার ফিরে আসতে হয়।

স্বপ্ন-কোলাজ

একটি স্বপ্ন তরল পর্দা কুয়াশার ছায়া-ছায়া

একটি স্বপ্ন আত্মমগ্ন, তার বড় মোহমায়া।

একটি স্বপ্নে যুদ্ধের ভয়াবহ গোলাগুলি-ঝড়

একটি স্বপ্নে শ্বেতসন্ত্রাস ভাঙে শান্তির ঘর।

একটি স্বপ্ন স্বপ্ন হারানোর শূন্যের একা চিল

একটি স্বপ্ন দুঃস্বপ্নের আতঙ্কে কী যে নীল!

একটি স্বপ্ন বাঙ্কার থেকে লেখা কারও প্রিয় চিঠি

একটি স্বপ্ন চির প্রতীক্ষা, অশ্রুসজল দিঠি।

একটি স্বপ্ন কান্নার হুহু বিষাদের ভারী হাওয়া

একটি স্বপ্ন একাত্তরের গৌরব খুঁজে যাওয়া।

একটি স্বপ্ন রক্ত বারুদে তপ্ত দিনের ঘ্রাণ

একটি স্বপ্ন অকূল নদীর উত্তাল ঝড়োবান।

একটি স্বপ্ন খুঁজছি এখনও, যে স্বপ্নে শুধু আশা

সেই স্বপ্নের অবয়বজুড়ে মানবিক ভালোবাসা।

শাশ্বত সত্যের দিকে

কিছু কথা সোনারোদ উজ্জ্বল সকাল চিরকাল

কিছু কথা অনিবার্য সত্যের দোলকের দোলে একা,

কিছু কথা চিরকাল আনন্দ ‘অমৃত মৃত্যু’ রবি ঠাকুরের

কিছু কথা বেঁচে থাকে, থাকবে অনন্তকাল জেনেছি নিশ্চিত।

জেনেছি এসব কথা জুড়ে থাকে অক্ষয় প্রকৃতি

মৃত্যুর বিষাদ নিয়ে, জন্মের আনন্দ সঙ্গী করে

সূর্যের সোনালি বিভা চিরদিন অমরতা নিয়ে

গাছের চিরল পাতা, ঘন পাতাদের অন্তরালে

রচনা করবে জানি আলো-আঁধারির চিত্রকলা,

চাঁদের উজ্জ্বল আলো রূপকথা হয়ে বেঁচে আছে।

জন্ম-মৃত্যু সত্য-মিথ্যা আর যত আনন্দ বিষাদ

আজীবন ছুঁয়ে থাকে হৃদয়ের উন্মুক্ত প্রান্তর

চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা, নক্ষত্রমণ্ডলী চিরন্তন

আবর্তনে জীবনের মহাকাব্য লিখে যাবে অনাগতকাল।

শাশ্বত সত্যের দিকে যেতে যেতে জেনে যাই

সবই জীর্ণ ধুলো জন্ম-মৃত্যু চন্দ্র-সূর্য

অনন্ত আকাশ সবই শূন্যতায় ভাসে।

এক ক্ষুধার্তের আক্ষেপ

চাইনি এমন কিছু, সামান্য ভাতের দাবি দুবেলা-দুমুঠো

সে দাবি রুখতে দেখি কত তিরন্দাজ যুদ্ধ সাজ!

যেন মহা দাঙ্গাবাজ ভিমরুলের চাকে আমি কিছুই না বুঝে

‘ভাত দিন’ শব্দঢিল ছুঁড়ে দিয়ে ভয়াবহ বিপদে পড়েছি!

অর্ধাহারে-অনাহারে দিন যায়, মাস যায়, বছর ফুরোয়

পুষ্টিহীন দিন দিন শুকিয়ে উজ্জ্বল দেহ যেন পোড়াকাঠ!

সবিনয়ে শুধু এই অস্তিত্ব সংকটে তাকে জানিয়েছিলাম

আমাকে দুমুঠো ভাত দিতে না দিতেই একী মহা হইচই!

চর দখলের জন্য যেমন জোতদার তার শক্ত লাঠিয়াল

পাঠায় হুংকার দিয়ে, ততোধিক ক্ষিপ্রতায় নাগরিক লাঠিয়াল ভাইয়েরা আমার

নেমে পড়েছেন মহা মেধার শাণিত অস্ত্রে প্রতিপক্ষ ভেবে

এই নিরস্ত্র আমাকে!

আমার সশস্ত্র কোনও শক্তি নেই, আমি গাঢ় অন্ধ কুয়াশায়

ডুবে যেতে যেতে শুধু সূর্যোদয় প্রার্থনা করেছি, কিছু আশা

এবং সামান্য ক্ষুৎপিপাসা মিটাতে শ্রদ্ধাভাজনের কাছে

প্রার্থনা করেছি স্নেহ ভালোবাসা আর তার মমত্ব আশ্রয়!

সামান্য আমার চাওয়া, হে বিদগ্ধ নাগরিক উচ্চ জ্ঞানীগণ!

আমাকে ক্ষুধার্ত রাখতে এত ভয়াবহ আয়োজন!

গভীর বিশ্বাসে

প্রতিটি সকাল এসে টোকা দিলে খুলে দিই একটি দুয়ার

প্রতিটি দুপুর আর বিকেলের দরোজায় মৃদু টোকা পেলে

খুলে দিই নিজ হাতে রাত্রির রহস্যঘন স্বপ্ন কবিতা কবিতার

কবিতা আসে না, শুধু সময় মোমের শিখা নিঃশব্দেই গলে।

প্রতিটি ভোরের কানে নায়ক সূর্যের জন্য বন্দনা গেয়েছি

প্রতিটি দিনের কানে জীবনের আলোকিত প্রার্থনা রেখেছি

আলো আর অন্ধকারে অর্ধেক জীবন গেছে শুধু অপচয়ে,

ঘুমের ভেতর কোনও কবিতা স্বপ্নেও যদি ধরা দিত এসে!

শুধু কবিতার জন্য, শুধু মানুষের জন্য ব্যর্থ এ ঘূর্ণন,

মানুষের মন আমি বুঝতে পারিনি ঠিক কবিতার মতো

গহন জটিল ওই মানুষের মানচিত্র বুঝতে পারিনি

শুধু পিপাসায় গেল মানুষ ও কবিতার ব্যর্থ অন্বেষণে।

পায়ের তলার মাটি একদিন সরে যাবে, সূর্য অস্তমিত চিরতরে

সেদিনও খুলব এই দরোজা আশায় শুধু গভীর বিশ্বাসে।

প্রার্থনা শব্দের জন্য

প্রখর রোদের তাপে পুড়ে যাওয়া পৃথিবীর বুকে

ছায়া হয়ে এসো প্রিয় শব্দের আমার, ঘন ছায়া

মেঘের মমতা দিয়ে ঢেকে দাও কবিতার সব

দুঃখ আর দীর্ঘশ্বাস। পৃথিবীতে আনো সুবাতাস।

মৃত স্বপ্নদের আমি সমাহিত করেছি এখানে

এই মাটি বড় প্রিয় কত যে স্বজন-পরিজন ঘুমিয়েছে

এইখানে চৈত্রে পোড়া মাটির ভেতরে মাটি হয়ে!

এখানে ফসল চাই, আহত স্বপ্নেরা চায় বৃষ্টির সঙ্গীত।

মানুষের ক্লান্ত চোখে শুশ্রƒষার শান্তি দাও দয়াবতী মেঘ

বৃষ্টি হোক এই পোড়া মাটির হৃদয় ছুঁয়ে শব্দ বৃষ্টি হোক;

মানুষে মানুষে আজ কেবল ভীতির চিহ্ন চোখে

হে পবিত্র শব্দ এই রুগ্ণ পৃথিবীর যত ভয়াল অসুখ ধুয়ে দাও।

অপেক্ষার বাঁধ ভেঙে নেমে আসো মুক্তিদাতা শব্দেরা আমার

শস্যের খামার তবে সাজাক এবার প্রিয় কবিতা-মানবী।


গোলাম কিবরিয়া পিনুর গুচ্ছকবিতা

নন্দনকাননের ভাষা

একটা ফুল দীর্ঘদিন ও দীর্ঘ সময়

ফুটে থাকে না,

 সুবাসও ছড়ায় না!

তার সৌন্দর্যও―

সবসময়ে ধরে রাখতে পারে না!

নগররক্ষক তা জানে

কোতোয়ালও জানে,

জানে মালিও!

সে-কারণে অন্য ফুলের আগমন

অন্য ফুলের প্রস্ফুটন!

বাগানও থাকে অবারিত―

পুরনো ফুলকে জানায়―‘বিদায়’

নতুন ফুলকে জানায়―‘স্বাগত’।

শুধুই খ্যাংরোমুখো নন্দনেরা―

নন্দনকাননের ভাষা বোঝে না!

আমার উঠান

আমার উঠানে আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি

সে-কারণে ‘না’ বলতে পারছি!

এইটুকু উঠান রয়েছে, তাই―

ঝুমকোজবা বাঁচিয়ে রাখতে পারছি!

আমের মুকুল ধরে

উঠানের কোনায় থাকা আম গাছে!

এইটুকু উঠান বাঁচিয়ে রাখতে

কী কঠিন আঘাত সহ্য করতে হলো

―সারাজীবন!

লোকসানও গুনতে হয়েছে অনেক

মনে তো জখমও লেগে আছে কত!

এই উঠানে দাঁড়িয়ে আছি বলে

সূর্যের আলো কী আপন হয়ে দেহ ছুঁয়ে থাকে,

মনও প্রফুল্ল থাকে―মরিচা পড়ে না!

এইটুকু উঠান রয়েছে বলে

দীপিত থাকতে পারছি,

নিজেকে নিতান্ত দীনভাবাপন্ন ভাবি না!

উত্তেজনা ও প্রলোভনে

নিয়নবাতিতে শোভা পাওয়া উৎসবে,

যাব না বলে―‘না’ বলতে শিখেছি!

ভুলটা

ভুলটা ভাঙতে বেশি সময় লাগল না!

ফুলটা হলো গন্ধরাজ!

গন্ধ বিলায় নিভৃতে!

সে তো বাগানেরই সৌন্দর্য

গন্ধ ছড়ানোর মূল!

তা বুঝতে দেরি হলো না!

ভাঙল শেষে ভুল!

এত দিন ফুলটা থেকে দূরে দূরে ছিলাম

অন্য ফুলের প্ররোচনায়,

রাখিনি নিজের দৃষ্টি!

বৃষ্টির দিনেও সে গন্ধ ছড়ায়

ঘরে থেকেও তা পাই টের!

মায়ামাখা দৃষ্টি দিলেম ফের!

ফুলের বাগানটা কী মমতায় গড়েছিলাম!

ফুলটাকে বিক্রি করার জন্য

ডেকেছিলাম―নিলাম!

ফুলটাকে ভুল ভেবে

কষ্টও দিলাম!

ভুলটা ভাঙতে সময় বেশি লাগল না!

ভুল যদি ভাঙে!

জোয়ারও আসে মরা গাঙে!

 

আড়ংধোলাই

কিছু লোক গোসল না করেই থাকছে!

ময়লা ঘাটাঘাটি করে

আবর্জনার স্তূপে ডুবে গিয়ে―ওঠার পরও,

গোসল করছে না!

জঞ্জালের সাথে ডাস্টবিনে চলে যাওয়ার পরও

কোনও ভাবান্তর নেই!

ছাইগাদার ভেতর থাকার পরও

কোনও স্নায়ুচাপ নেই!

প্রাতঃস্নান তো নেই―

হাত ও মুখও ধোয় না!

জলে গা ভেজানো স্বভাব নেই!

গাত্রপ্রক্ষালন করে―

সূর্যস্নান করবে―তা তো দূরের কথা!

কাছে থাকা নদীর কাছেও যাচ্ছে না,

ঝরনার জলের কাছেও না!

টিউবওয়েলের হাতলে চাপ দিয়ে

ক’মগ জল নিয়েও গোসল করছ না!

সমুদ্রের জলে ডুব দিয়ে―গা ধুয়ে নেবে

সেই দৃঢ়তাও নেই!

তুমি যে গোসল না করে থাকছ!

তোমার গা থেকে―দুর্গন্ধ বের হচ্ছে,

মানুষ তা তো বুঝতে পারছে!

তোমাকে নিয়ে তো থাকা যাচ্ছে না!

চমরী গরুর চামড়া দিয়ে ঢেকে রাখছ নিজেকে

নয়ানজুলি এখন তোমার ঠিকানা!

আপাদমস্তক ময়লায় ঢেকে আছ!

গা ঘিনঘিন করছে―

নাক সিঁটকানোর পরও,

তুমি নিজে পরিষ্কার না হলে―

মানুষই আড়ংধোলাই করবে―প্রয়োজনে পেট্রোলওয়াশ।

ছোঁক ছোঁক শব্দ

এঁদোপুকুরের জলে

বড়শির ফাৎনা নড়ে!

বড়শিতে পচা ইঁদুরের টোপ!

তা গিলতে জড়ো হচ্ছে শুধু কি

ভেদা মাছের দল ?

কাতলা, কালবাউস ও শোলমাছও―

বাদ পড়ছে না,

টেংরা ও চুনোপুঁটিও!

মাখনের গাদ দিয়ে তৈরি নয় টোপ

গাওয়া ঘি ও গমের ভুসি দিয়েও নয়,

তৈরি নয় জায়ফল দিয়েও―

এমন কি মুরগির নাড়িভুঁড়ি দিয়েও নয়!

সরোবর থেকে―বড় পুকুর থেকে

মাছেরা ছুটছে এঁদোপুকুরের দিকে!

ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার জল থেকেও―

পদ্মা ও কীর্তিনাশার জলের মাছেরাও

রওনা দেবে নাকি ?

ঘুরণজালেও না―টানাজালেও উঠল না!

ছুটছে কি না ?

পচা ইঁদুরের টোপ গিলতে!

ধরা দিচ্ছে কোন ধড়িবাজের বড়শিতে ?

সজ্ঞান হারিয়ে ফেলছে!

ছোঁক ছোঁক শব্দ চারদিক!

মুখরোচক

নিজের সুবিধে অনুযায়ী

ধারাক্রম সাজাই আমিও―

কাকে কখন বাতিল করি―কাকে কখন গ্রহণ করি!

প্রয়োজনে তার কাছে হেঁটে যাই,

তাকে ছুঁয়ে দেখি!

নিজের সুবিধে অনুসারে―

জমিতে তরমুজ ফলাই,

দ্বিতীয় মৌসুমে তরমুজের বদলে

আনারস চাষ করি!

একে বাদ দিয়ে ওকে ধরি!

কে যে কখন হয়ে ওঠে

―অপরিহার্য!

কোন্ ফল-ফলাদি হয়ে ওঠে

―মুখরোচক ও আহার্য!

ঋতুসন্ধিতে বসন্ত

অপেক্ষায় থাকি―

মুলতবি করে রাখি―রঙিন হওয়ার সাধ,

আসুক বসন্ত!

তারপর হই আনকোরা―

টাটকা ও তাজা হয়ে

ঋতুসন্ধিতে হই অভিনব জোড়া!

পূর্বজ্ঞানে―মাত্রাজ্ঞানে ফেলে রাখি

প্রত্ন ও ধ্বংসাবশেষ,

পরি―হলুদ রঙের প্রকৃতির বেশ!

ভবিতব্য জেগে তুলি পুষ্পের বোঁটায়

তা-দেখে ধনিয়া ও মটরশুঁটির জমিও দুলতে থাকে,

আমি আরও রাঙা হই―সৌরতাপে ফাল্গুনে!

বসন্তভৈরবী নিয়ে―

কুঠরিতে থাকি না―থাকি না কোনও কোঠায়

নদীর জলও শেষ হয়ে যায়―তৃষ্ণার ফোঁটায়!


মাহমুদ কামালের গুচ্ছকবিতা

স্বয়ং বিশাখা তুমি

স্বয়ং বিশাখা তুমি দ্রবীভূত রাতের নিস্বনে

প্রজাপতি পাখা মেলে ঝলসানো আগুনের কাছে

বিশাখা―নক্ষত্র হয়ে আছড়ে পড়ে যমুনা নদীতে

শুধু তুমি শুধু তুমি এককের উচ্চকিত বাঁশি

প্রকৃতি নির্ভর হয়ে দেহাতীত জ্যা মুক্ত জ্যামিতি

সৌন্দর্যের সকল সংবেদ পরাজিত তোমার রোদ্দুরে

বিপাশাও হতে পারো চারুশীল কিংবা শতভিষা

স্বয়ং বিশাখা তুমি শোণিতের দ্রুতগামী ঢেউ।

বাঁধের কিনারে ব্যাধের তীব্র তির

আকাশে এখনও তারা জ্বলে ঠিক ঠিক

জোছনায় মাখা শরীরে শরীরে ঢেউ

স্থির নয় বৃতি অবগাহনের সুরে

তোলপাড় নদী সীমারেখা ভেঙে যায়

চোখ যদি করে প্রতারণা মনসিজ

বাঁধের কিনারে ব্যাধের তীব্র তিরে

জীবনের স্রোত মিশে যায় অনায়াসে

একটি পাখির গান ভাসে দূর ডালে

আকাশ তখনও আকাশের ধৃতি নয়

আকাশেই তাই তারা জ্বলে ঠিক ঠিক।

মাছকিশোরী

দূরন্ত ঢেউ নদীর জায়া সেইখানে এক মাছ

ঘাই মেরে সে প্রকাশ করে চলছে ঋতুকাল

নদীর সাথে মাছের যখন মিতালি হয় লীনে

নিস্তরঙ্গ নদী দ্রুত পূর্ণ ঋতু নিয়ে

বাঁক হয়ে যায় নির্নিমেষে রোদ্দুরে রোদ্দুরে।

ভরা জোছনায় নদী স্ফূরে মাছ হয়ে যায় মেয়ে

পাড় ঘেঁষে এক নবীন যুবক মাছকিশোরীর চোখে

অলৌকিক এক রাগ-অনুরাগ চিত্রকল্প ব্যাপে

প্রেমিক পুরুষ এক নিমিষেই স্রোতের সঙ্গী হয়ে

আভিজাত্য বিলীন করে ধীবর হয়ে যায়।


জুয়েল মাজহারের গুচ্ছকবিতা

স্ত্রীফুলের দিকে

চলো স্নায়ুর শিখরে

উরগলতার মতো চলো যাই লিবিডোপাহাড়ে

বরফ গলাতে হবে, চলো

অতিশয় ধ্যান থেকে নিশ্চলতা থেকে

ইন্দ্রিয়-চমকে জেগে ওঠো

ধ্যান থেকে

অশ্মীভূত ঋষি, দ্যাখো, জাগছে ইশারায়

যে আছে ক্ষুধায় স্পর্শ-ব্যঞ্জনের ডালা

থরে থরে ভরে তাকে দাও

নেশা-কূপজল ঘিরে অপেক্ষায় আছে অগ্নিস্নান

এবার স্নাতক হবে চলো

স্নায়ু-জানালার পাট খুলে, গলাটি বাড়িয়ে

ঋষিকে ডাকছে দেহযান

ধ্যানে তার মতি নাই কোনও

আমিও জ্বলছি-জ্বলছি, অহো …

জ্বলছি জ্বলছি আর

আমার মাস্তুল, দ্যাখো, শক্ত আর হরষিত … লাল !

নিজেরই বরফ ভেঙে জাগে ফের আমার লিবিডো ।

স্ত্রীফুলের দিকে ফের, নীল গর্ভকেশরের দিকে ফের

আমার ঘুমন্ত পুংকেশর

পাগল হাওয়ায় আজ দিগি¦দিক উড়ে যেতে চায়

পদ্মাসনে বসে থেকে মনোযানে উড়ে চলি আমি

পাখি ডাকে স্নায়ুর শিখরে বাইরে বরফ ঝরে মর্মে জ্বলে আগুনের জ্বর

স্ত্রীফুল শুশ্রƒষা দিলে জ্বর খুব দ্রুত সেরে যায়

হাসি ও বসন্ত

কী সুন্দর পাখির মতো হাসি এসে বসে রইল

নানা রকম মেয়েলোকের গালে

ধূমাবতীর কোলে বড়ো

দোলনা দ্যায় পেতে

হাজার লাল বসন্তের আগুনলাগা ডালে

পিঁপড়েদের সঙ্গমের হা-শীৎকারকালে

যেই আসুক কোল পেয়ে, স্তন ধরে, দুধ পিয়ে―শেষে―

ডাল ধরে দোল খেয়ে ঘুমায় শান্তিতে !

লাল্লা লা …

লাল্লা লা …

লাল্লা লা গানে

আসমানে চুপ-জড়িম

আসমানে

ঝাড়বাতির

বিজলিদিন

জ্বলে

স্ত্রীলোকের গাল ছেড়ে

কোল ছেড়ে

আর কোথায়

যাবে ?

কোল ছেড়ে যাবেই না ? তবু যায় … চুপে

এক বিঘত, আধ বিঘত, দশ বিঘত দূরে

পিঁপড়েরাও জ্বালায় খুব

মাইলোভী নেংটোদের দাঁত নখের ভয়ে

বাম স্তনের ডাঁশ জড়ুল পালায় ডান স্তনে;

একটা খাক সে-ও মানি;

অন্যটায় আর যেন

দাঁত নখে লাল করে

আঁচড় না কাটে

দাও ওকে দুধ-আদর … দুধ-আদর দিয়ে

ওকে আরও নামাও নিচে ঘুমের নেশাঘোরে

পাঁচিলঘেরা-গুল্মঘেরা লবণভরা হ্রদে

টেলিগ্রাম

হাওয়াচুম্বিত রাতের টেলিগ্রামে

তোমার আমার কথা হবে অঘ্রাণ

হাওয়ালিপি

গাছেদের সব পাতা একে একে

ঝরে যেতে-যেতে

সমস্বরে আমাকে শোনাল :

তোমাদের উত্তম যুদ্ধের চেয়ে

খারাপ শান্তিও কত ভালো!

দাম্পত্য

সমুদ্রকে কুড়িয়ে এনে টেবিলে রাখলাম

তারপর অলক্ষ্যে তাকে

গৃহশাসনের বেড়ি পরালাম

সে কেমন আচরণ করে সব লিখে রাখি

তারপর তাকে দুটো জালে-ধরা চিংড়ি আর কাঁকড়া খেতে দিই

তাতেই ব্যাচেলরদের অবাস্তব তীব্র মেসবাড়ি

সামুদ্রিক দাম্পত্যে ক্রমে লাল-নীল পুষ্টি পেতে থাকে


সৈকত হাবিবের গুচ্ছকবিতা

যাও

যাও, কোথাও যাও

রোদ্দুরে না হয় সমুদ্দুরে

ভাসো হাওয়ায়

কিংবা জলে

না হয় ডুবে যাও

স্বপ্নে,

সত্তার গভীরে

ভালোবাসি, যখন বলি

‘ভালোবাসি’, যখন বলি কিংবা

তুমি বলো আমাকে

বলো তো আমরা আসলে কী বলি ?

আমরা কি বলি না, ‘আমি তোমাকে

ঘৃণা করি!’

ভালোবাসা কি নয় ঘৃণার অধিকার,

এমনকি অধিকার রক্তাক্ত করার ?

ভালোবাসা কী দেয় আমাদের―

দেয় লোভ ও পিপাসা, ক্ষোভ ও কামনা

দেয় দুঃস্বপ্ন, দুর্দৈব, বন্দিত্ব

তোমাকে আমাকে পরস্পর

অধিগ্রহণের দেয় অন্ধ-অধিকার

কোনও এক স্বপ্ন

কোনও এক স্বপ্নের কথা মনে পড়ে, সত্য ছিল না

কখনও যা, হয়ত কোনও দিন হবেও না। জীবন

এমন সব স্বপ্ন দেখায়, নিজেও তার মানে জানে

না। আর কী অসম্ভব দুঃস্বপ্নে গেঁথে গেঁথে আমাদের

বয়ে নিয়ে চলে। অথচ কেমন অনিঃশেষ স্বপ্নে স্বপ্নে

ভরে রাখে এই জীবন …

কোনও এক স্বপ্নের কথা মনে পড়ে, সে যে কী স্বপ্নীল!

আর ভাবি, হায়, যদি সত্যিই সেই মগ্ন-স্বপ্নের মতো হতো

এই জীবন!

সন্তানের স্পর্শ

কিছু কিছু স্পর্শ আছে, যার চেয়ে

স্নিগ্ধ এমনকি এমনকি সুন্দরতম

ফুলও নয়।

মা যখন স্পর্শ করেন সন্তানের শরীরে,

হোক সে শিশু কিংবা বৃদ্ধ, পৃথিবীও

গভীর স্নিগ্ধ হয়ে যায়।

প্রিয় পুত্র আমার, যতদিন তোমার শিশুস্পর্শ

পেয়েছি, কোমল শরীর তোমার ছুঁয়েছে এই

মুখ হাত চোখ কপাল কণ্ঠ কিংবা মাথা―

এর চেয়ে স্নিগ্ধতা কোনও পৃথিবী আমাকে

কখনও দিয়েছে বলে মনে পড়ছে না বাছা―

কেবল মায়ের স্পর্শটুকু ছাড়া।

ভালোবাসা-শরে

আমাকে বানিয়ে মদির

তুমি কেন এত যে বধির

তাতে যে আমিও অধীর!

ভালোবাসা-শরে ভিখিরি হয়ে যায় বীর

এ যে কী আশ্চর্য সুতীক্ষè তির

তবু তুমি কীভাবে এত নীরব, নিবিড়।

আমার হৃদয় কি এই তুমি-নদীর

খুঁজে পাবে ঠিকানা, পাবে কি তীর

হৃদয় কি বোঝে কিছু তুমি-মানবীর!

বৃথা কাঁপে না তো এই হৃদয়-নীড়

কীভাবে বোঝাব তোমায় অন্তর-মীড়

এ যেন কান্না কোনও আহত অগ্নির।

কিউপিড কি আমাকেই মেরেছে তির

যেন পড়েছি হাতে কোনও সূক্ষè-শিকারির

এ কি খেলা আমাকে নিয়ে নিঠুর নিয়তির…


মাসুদ পথিকের গুচ্ছকবিতা

৫০

সাডেনলি ধানক্ষেতের থেকে এক ঝাঁক পাখি আসছে উড়ে, মাই চাইল্ড হুড মেমোরি জানাচ্ছে,

তারা ভাত শালিখের বংশজাত

তো, শালিখ উড়ে যাচ্ছে নগরের শাপলাচত্বর বরাবর

স্থাপত্যে, নৃ ইতিহাসের রুটে এক কাঁদাকাদা রাস্তা গেছে

আমার বয়সোত্তর হৃদপিণ্ডের ভেতর, আছে শৈশব

এই জায়গাটা যুদ্ধোত্তর … অতঃপর

এইখানে রক্ত, স্রোত, এখানে অনেক শহিদ, মা-বোনের সম্ভ্রমের ক্ষত

রাজপথের মোড়ে দাঁড়িয়ে আমি, ভাবি আমি কে ?

কোনও যুদ্ধাহত চাষার সন্তান!

খেয়ালি ট্র্যাফিক ইতিহাসের যানগুলোকে দিচ্ছি ইশারা

দেখাচ্ছি গন্তব্যের বাঁক

অথবা আমি সৌখিন ফটোগ্রাফারের কেউ

ক্যামেরায় দিচ্ছি ক্লিক, ফোটোর পাঁজরে উঠছে ভেসে বিগত ৫০ বছর

এইযে উড়ন্ত শালিখের সারি, দূর দিগন্তরাজি

বহুবিধ ন্যাচারের আড়ে ধানক্ষেতের সারি

চাষাদের দল বন্দুক হাতে ছুটছে যুদ্ধক্ষেত্রে

এবং ছাত্র শ্রমিক পেশাজীবী

যুদ্ধের নিহিত মেটাফর থেকে উদয় হয় অনুসূর্য কোনও

কাঁটাতার বরাবর

সীমান্তের দু’পার থেকেই হাতছানি দিচ্ছে,

রিলোডেড গান যেন চেনা শালিখগুলোর ভাষিক মুক্তি

সময়ের হেজিমনি ছিঁড়ে পাখিদের একান্ত হারিকিরি

হচ্ছে দিগন্তের ঠিক কাছে

কানাবিলের শালুকেরা শুনছে বহুরৈখিক সঙ্গীত, চৈতন্যের, মুক্তির …

তো, বসে আছেন তিনিও মোড়ের ফুটপাতে, এক পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা!

টিয়ে পাখিটির মুখে শুনছেন তাঁর ভাগ্য ও আগামী

যদিও তাঁর অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল হতে গাইছে সমূহ

কিংবা শুনছেন গান ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সে যে আমার জন্মভূমি’ …

কাছের স্টেডিয়াম থেকে উড়ছে ৫০টি কবুতর, মাল্টিকালার

মাথার ওপর, ছুটছে করতালি

আমারও,

বোধের ভেতর হচ্ছে ভয়েজওভার ‘এবারের সংগ্রাম

মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’

আর আমারও, ধানক্ষেতের থেকে ভাত শালিখের দলে হেঁটে ভেসে যেতে যেতে,

কিংবা না-যেতে যেতে

এইসব, রিয়্যলি এসব আকাশের গান খুব ভালো লাগে!

০২.

আবার ভারতবর্ষ

অর্থাৎ যেসব পাখি সীমান্তের কাঁটাতারে

বিভক্ত বাক্যের কারাগারে

আটকে যায় না আমিও তাদের অনুগামী

কেননা ওপারে প্রিয়তমা বউ―এপারে আছি স্বামী

আমাদের বাড়ি আসে তোমাদের পাখি

তোমাদের বাড়ি যায় আমাদের পাখি

আমাদের মনগুলো তোমাদেরও মন

তোমরা-আমরা অনাদিকালেরই সজন

এই-মতো আসা-যাওয়া করে ব্যথা ও বেদন

ঘরে ঘরে আজও আছে ভাঙনের রোদন

সীমান্তে যারা-তোমরা তাক করেছ বন্দুকের নল

কাঁটাতারে পিঁপড়ে সদৃশ আমরাও করি বাস্তু বদল

আর আকাশ-তো হয়নি ভাগ; মনকেও করোনি দুভাগ

মনের ডানায় ঘুরছি―যতই করছ রাজনীতির দাগ

এপারে প্রেমিক―ওপারে প্রেমিকার বাড়ি

একই চালের ভাত খাই ভিন্ন কেবল হাঁড়ি …!

০৩.

সিনথিসিস

কিংবা আমি মরে গেছি ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে

আমি এক ব্যর্থ প্রেমিক, এবং

জীবনযুদ্ধে পরাজিত কেউ

আমার লাশ পড়ে আছে ইরি ক্ষেতের আলে

 লোকজন যায় আর আসে এই পথে

ফোঁড়ন কাটে ‘মারা গেছে বিশ্বপ্রেমিক’

দোয়েল পাখি এসে ডাকে―শীষ দেয়

আর হেগে যায়

আমি কোনও সময়ের আবাল অব্যয়

লাশ ঘিরে গন্ধ ছড়ে মাঠময়

চাষারা নাক গুঁজে চাষ দেয় ভূত ও ভবিষ্যৎ

আমার দেহের জৈবসারে হাইব্রিড ভালো ফলে

বুদ্ধিজীবীর সুচিন্তা বাড়ে―সুশীল হয় তৈরি হয় মৃত্যুবিষয়ক হাইপোথিসিস

ফলে আমার দেহের পচা মাংস খায়

আমার বাপে আর চৌদ্দ দাদায়

তথাপি খায় আমার পুত্র ও কন্যায়

প্রেমিকার নামে তারা হয় মিথ ও মিথস্ক্রিয়া

তো

এই লজ্জায় ক্ষুধায় আমি আমার মাংস খাই

কেননা আজ

আমি অব্যয় আমি নিরুপায় আমি নিরুপায়

০৪.

আমার মা ০৩

আমার মা ধান মাড়ান

চাল কাড়েন

ভাত রাঁধেন

মাছ কাটেন

খান কেবল ভাতের ফেন

ভাত তুলে দেন স্বামীর প্লেটে

মাছ তুলে দেন পুতের পাতে

ভাত ছড়িয়ে দেন পিঁপড়ে ও কবুতরের সামনে

প্রিয় গৃহস্থালির আকালে

মা নিজের কলিজা রেঁধে খাওয়ান আমাদের

আমার মা পুকুর ঘাটে বাসন মাজেন

বাসন মাজার শব্দে মাছেরা আসে ছুটে

আমার মা খুদকুঁড়ো দেন তাদের

মাছেরা মায়ের লক্ষ্মী সন্তান

মা আমার মুতের কাঁথা দেন ধুয়ে

আমরা মা আমার ছেঁড়া মন করেন সেলাই

আমার মা আমাকে রোদে ছড়িয়ে দেন

ভেজা জবজবে আমার আমি শুকিয়ে দেন

আমার মা ধর্ষিত হন বাবার হাতে

অর্গাজমহীন রাত্রিগুলো কাটে, তো

আমার মা’র কিছুতেই নেই চাহিদা ও তাড়া

মা রাত্রি জেগে কান্না দিয়ে স্বপ্ন বুনেন আমার

আমার মায়ের জ্বর হলেও পড়ে থাকেন বিছানায়

একা, আমার মায়ের অসুখ-বিসুখ নাই

আমার মা একদিন বুনো হাঁস হয়ে যান উড়ে

আমার মাকে সখের বন্দুক দিয়ে শিকার করি

আমার মাকে আমরা জবাই করি

মাংস খাই মায়ের, পুত্র-কন্যা মিলে

তথাপি আমার মা প্লেটের ভাতে ওঠেন হেসে

বলেন, এ বড় অবিচার বাপ

পৃথিবীতে পাইনি সুখের কিছু

মৃত্যুর পরেও পেলাম না কিছু

আমি বলি, মা তুমি তো বেহেশতবাসী

মা হেসে কুটিকুটি, বলেন, নারী দুকূলেই নরকবাসী

জানিস না! এ গ্রন্থ রচনা করেছে প্রাচীন পুরুষ

বেঁচে থাক, বেঁচে থাক

সুখে থাক তোরা…

সুখে থাক আমার সকল সন্তান

মা সবার জীবনী লিখে লিখে

নিজেই জীবনী-বিহীন হয়ে, দেন

কান্নার রান্না করতে থাকেন ঈশ্বরের সংসারে

আরও কেবল ম্লান হতেই থাকে মায়ের সব যাপিত সুখ

শোকের জরিতে ঝলমল করে লজিকের বিমর্ষ মুখ

০৫.

কবর থেকে বাবাকে লেখা অঋব অনুসূর্যের চিঠি

প্রিয় বাবা, কেমন আছ ? মা কেমন আছে ?

আমি ভালো নেই বাবা। একদম ভালো নেই।

এখানে বিছানা ভেজা, মাটির। চারধারে দেয়াল। পাখির খাঁচাটার মতো।

একটা বালিশও নাই। ঘুম আসে না আমার। দম বন্ধ হয়ে আসছে।

আমাকে কেন রেখে গেলে ? আমার কি এমন অপরাধ ?

আমাকে নিয়ে যাও বাবা। প্লিজ

এখানে আমি কিন্তু বেশিদিন বাঁচব না।

মা‘কে বলো আমি আর দুষ্টুমি করব না। এখন থেকে পাঠ্যবই-ই বেশি পড়ব।

‘পৃথিবীর ইতিহাস ও সুফির জগৎ’ বই দুটির দুটো পাতা ছিঁড়ে গেছে।

প্লিজ তুমি কিছু মনে করো না।

বাবা, এখানে আমি খুব একা হয়ে গেছি।

মিমি, তোয়া-বান্টি, বারান্দার পাখিগুলো, বই, গিটার, খেলনা, ল্যাপটপ সবাইকে মিস করছি।

আমার শরীরের মাংসগুলো পচে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। মিশে যাচ্ছে মাটিতে।

বাবা আমার আত্মা একা হয়ে পড়েছে। বড় একা। ভীত।

আমাকে বাঁচাও বাবা। আমাকে বাঁচাও।

নানু বলেছিল, হুর ও গিলমানরা সঙ্গে থাকে মৃত্যুর পর। কিন্তু ওরা-তো কেউ আসল না।

আমি কি করে একা থাকব ? বল বাবা!

বাবা আমার অনেক কষ্ট। অনেক শীত লাগছে।

কতদিন হলো তোমাকে জড়িয়ে ঘুমাই না। তোমার বুকের ওমে ঘুমাব বাবা।

বাবা আমি কিন্তু এইখানে বাঁচব না। আমাকে নিয়ে যাও,

প্লিজ প্লিজ … বাবা, বাবা আমাকে বুকে তুলে নাও।

ইতি, তোমার অঋব অনুসূর্য

০৬.

অনার্য আনন্দ

একদল অনার্য পাখি হতে একা হয়ে পড়া

ভাত হালিকের ঠোঁট থেকে খসে পড়া শোকের দানাকে

ধারণ করে নিল গোত্রচ্যুত কাদা, আর কাঁদায়

জন্ম নিলা ধানগাছ

দেন, আমি ও তুমি ভাত হয়ে পরিবেশিত হলাম

পুত্রের খাবারের শানকিতে

তো আমরা, এখন শহরের কোলাহলে পুত্রের পেটে চড়ে

ঘুরছি,

একা

আহা ভ্রমণ! আহা শোকের কী আনন্দ!


পিয়াস মজিদের গুচ্ছকবিতা

ধূলিবিধৌত

ভালো তো এই এমন

ধূলির বসন্ত,

ফোটা ফুলই তো

ফাল্গুন মূলত।

আর ফুলও তো

একপ্রকার সুবাসি ধূলি;

রাতের ঘুমন্ত সুন্দর

ভোরের গানের ধুলায়

যে পাহাড় জন্মায়,

তার রূপসী চূড়া থেকে লাফ দিতে

ভীতু প্রেমিকের সাহস লাগে না।

সে তো মুহুর্মুহু আকাশে পড়ে যায়

স্মৃতির ধূলির দিঘল ধাক্কায়।

ইত্যাদির মোড়ে

প্রিতম আর আমি

মাদারীপুর যাব বলে

ইত্যাদির মোড় পার হতে হতে

দেখি আর শুনি

১টা ছেলে আর ১টা মেয়ে

ঝগড়া করতে করতে

রাস্তা পার হচ্ছে।

তবে হঠাৎ শান্ত হয়ে

ছেলেটা পাশের মেয়েটাকে বলছে,

‘বুঝছ, অধরা চিরকাল অধরাই থেকে যায়।’

কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে ওরা দু’জন মুহূর্তে

ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলে

প্রিতম আর আমি

ইত্যাদি মোড় ছেড়ে

মাদারীপুরের অধরা গাড়ি ধরতে ছুটি।

এই যা যা করার থাকে

বসন্তে কত কী বাহাদুরি করার থাকে!

এই ধরেন, কোক স্টুডিও নিয়ে

প্রচুর পক পক শুনতে শুনতে

১ তারকার মৃত্যু হতে না হতে

আরও ১ জবরদস্ত তারকার মৃত্যু ঘটলে

উভয় ‘আরআইপি’ পোস্টের

রিচের ১২টা বাজলে

নিউজিফিডের শোকার্ত মালিকদিগের

ত্যক্ততা দেখেশুনে বরং ঘুরে আসা ভালো

রাজীব দত্তের প্রচ্ছদে;

কোথাও যথাযথ জায়গা না পেয়ে

যেথায় ঘাপটি মেরে থাকে ফুলন্ত ফাল্গুন।

শাওন আর মিনহাজের গল্পের ঘাসে আটকা

কোনও ১ মালা মাহমুদের টাটকা শব্দের শব

কাঁধে বয়ে যখন নাকে নিতে হয়

যুদ্ধের ইউক্রেনে আটকা পড়া

বন্ধু জনির হাঁসফাঁসের ঘ্রাণ।

এই ঋতুসন্ধিক্ষণে ব্যবস্থা ১টা হয়েই যাবে

হাত মারা, ভাতে মারা, নিদেনপক্ষে

কোকিলের কুহুতে মরা;

তারপর ঝরার সুবাসে ঝরে

ঝরা পাতার দল ভারী করা।

গাজীপুর চন্দ্রার মোড়ে

শুক্রবার বিকালে গাজীপুর চন্দ্রার মোড়ে

শাওন আর চাঁদনীর অপেক্ষায়

মিনহাজ আর আমার মতো দাঁড়িয়ে থাকলে

আপনাদেরও মনে উদয় হতে পারে

মহাবিশ্বের নতুন ধারণা।

হাজারে হাজারে মানুষের মাথা যখন

খেতে থাকে বলে বোধ হয় মানুষেরই মাথা

তখন দূর আকাশের নক্ষত্র আর চন্দ্রের বদলে

আপনার গায়ে ধাক্কা লাগা আরও ১০টা মানুষকেই

মনে হতে পারে নতুন চাঁদ কিংবা তারা।

আমাদের বস্ত্রভাই ও বস্ত্রবোনেরা

সপ্তাহের ৬ দিন

গার্মেন্টসের আকাশহীন গুমোট-ঘরে থেকে থেকে

ছুটির দিনে

নিজেরাই হয়ে ওঠে আস্ত একটা আকাশ।

একের গায়ে অপরে ধাক্কা খেয়ে

হেসেখেলে

সপরিবারে ঘুরতে বেড়িয়ে

কেনাকাটা করে

ফুচকা-চটপটি খেয়ে

কিংবা পরের দিন আবার

আকাশহীন গার্মেন্টসের গুমোট-ঘরে ঢুকে পড়ে,

মরে বাঁচার স্বপ্নে বা দুঃস্বপ্নে কাতর

তারাই তো এই বাংলার নতুন চাঁদ ও তারা!

জানা কথা কিংবা কবিতা

জানতাম তো আগেই

বছরটা নতুন হলেও

নতুন কিছুই হওয়ার না।

মাঞ্জাসুতা, নয়া আঠা

ঘুড়ি তো সেই ঘোলাই;

আকাশের নীল থাকে

দূর আকাশেই।

মাঘের মাসের বাঘি হাওয়া

শীতের শানে কাছে আসা

প্রেমসূত্রের-ঘৃণাসূত্রের

তাবত, যাবত আত্মীয়া।

কতটুকু সমর্পণ আর

কত ছটাক বিদ্রোহ;

ভারসাম্য বিধান ভেবে

বেঁচে থাকা বাস্তবায়নের

আজদাহা এই কবরখানার

প্রীতিকুসুম-মায়া ছেড়ে

যে যার মতো রাস্তা খোঁজা

ভালয় ভালয় পৌঁছে যাওয়া

নিজ নিজ সাড়ে ৩ হাত।

ধমক

ছোটবেলায়

আব্বার ধমককে কী ভীষণ

ভয় করতাম!

এখন কেউ সামান্য একটু

ধমকের স্বরে কথা বললেও

কান্নাকাতর সন্তানের বলতে ইচ্ছা হয়,

আমার আব্বা বেঁচে থাকলে

আপনি পারতেন না এভাবে বলতে…


হাসনাত শোয়েবের গুচ্ছকবিতা

ফেলে আসা কবিতারা-

কেউ কোথাও বসে সুতো কাটছে। তবু কদিন পর পর মানুষের চিড়িয়াখানা দেখার ইচ্ছে জাগে। আমরা জানি, দূরে বেড়াতে গেলে পকেটে বাঘের ছবি রাখতে হয়। তুমি তো জানোই, পৃথিবী একটা ঘোড়ার ডিম। আবার জিজ্ঞেস করো না ঘোড়া কী ? ঘোড়া যেহেতু ওড়ে না, সেহেতু সেটা পাখি না। আর পাখি যেহেতু ওড়ে, সেটা নিশ্চয় ঘোড়া না। মানুষ ঘোড়াও না, পাখিও না। মানুষ হলো ঘোড়ার ডিম।

ফেলে আসা কবিতা-

আজকাল আমি পোস্ট অফিস পর্যন্ত এসে ফিরে যাই। পোস্টমাস্টারের বউয়ের চিঠি পড়ি। বাঘ দেখার লোভে সে পালিয়ে গিয়েছিল চিডিয়াখানার দারোয়ানের সঙ্গে। এখনও সে প্রতিদিন পোস্টমাস্টারকে চিঠি লিখে। চিঠিতে থাকে চিডিয়াখানার গল্প। এখন পোস্টমাস্টার বাঘ দেখতে চিডিয়াখানায় আসে। চিড়িয়াখানা অনেক দূরে। আমিও মাঝেমাঝে তার সঙ্গে যাই। সে বাঘ দেখতে দেখতে বলে, পৃথিবী নিশ্চয় তার প্রেমিকের কাছ থেকে পালিয়ে আসা গোল কমলালেবু।

ফেলে আসা কবিতারা-

এখনও কেউ কেউ পা থেকে জুতা খুলে রাখে। জুতার নাম হতে পারে মাস্টার শু। পায়ের কোনও নাম নেই। পায়ের নাম দিলাম মহানন্দা। মহানন্দা নদীর নামও হতে পারে অথবা সেতুর। সেতু নামে আমার এক বন্ধু ছিল। স্কুলে থাকতেই যে পানিতে ডুবে মারা যায়। পানি একটা তরল পদার্থ। নদী এবং সমুদ্রের পানি এক নয়। সমুদ্রের পানি খুব সম্ভবত নদীর পানি চেয়ে হালকা। ছোটবেলায় পড়েছিলাম নদীর পানিতে সাঁতার কাটা সহজ। সাঁতার কাটতে গিয়ে আমি সাইকেল চালানো শিখতে পারিনি। সেতু সাইকেল চালাতে পারত, তবুও সে নদীতে ডুবে মারা যায়। নদীর নাম মহানন্দা। যার চারটি উপনদী আছে। যার একটি পুনর্ভবা। এই নামের এক মেয়ে প্রতি সোমবার আমাকে চিঠি লিখত। চিঠির শেষে থাকত চারটি কমলা ফুল। কমলা ফুল হলুদও না কমলাও না। দুটোর মাঝামাঝি কিছু একটা হবে। সেটা নিশ্চিত বেগুনিও না নীলও না। মহানন্দা তুমি উত্তর দিও!

ফেলে আসা কবিতারা-

সকাল থেকে একটানা লিখছি ‘ইভিনিং ইন প্যারিস’। দূরে কেউ কেউ আশ্চর্য দেওয়াল লিখন হয়ে যাচ্ছে। আমরা কি জানি শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের দিকে যেতে হবে ? আরও দূরে আছে নোয়া’র নৌকা। ‘তোমরা কিন্তু জোড়ায় জোড়ায় উঠবে।’ আমার জোড়া বলতে কেবল মৃত প্রেমিকাদের স্মৃতি এবং মাস্তুল। সে বলেছিলে তুমি এসো নভেম্বর রেইনের শেষ দিকে। নোয়ার নৌকা দুলছে। দূর থেকে পাহাড়গুলো মেঘ। মেঘ মানে বৃষ্টি। বৃষ্টি মানে নভেম্বর রেইন। নোয়া দুলছে, আমিও দুলছি। ছড়িয়ে পড়ছে ইভিনিং ইন প্যারিসের গন্ধ। তুমি প্যারিস কেটে লিখে দিলে কায়রো। নোয়ার ঘুম পাচ্ছে। আমাদেরও ঘুম পাছে। পাহাড়গুলো আরও এবং আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে।

—-

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares