বইকথা : মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ : রক্তস্রোতের শীতলক্ষ্যা : স্বপন নাথ

রীতা ভৌমিক একাধারে সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক হিসেবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। সন্দেহের অবকাশ নেই যে, অনেক লেখার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ [২০১৮] তাঁর অনন্য একটি গ্রন্থ। এর মধ্যে তিনি কয়েকটি পুরস্কার অর্জন করেছেন। সেগুলো হলো :  এফবিএবি পুরস্কার [২০০৪], এ এসএফ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড [২০০৭], ইউএনএফপিএ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড প্রথম পুরস্কার [২০০৯], বজলুর রহমান স্মৃতিপদক [২০১০], প্রথম আলো মাদকবিরোধী সেরা প্রতিবেদন [২০১১], প্রজ্ঞা তামাকবিরোধী সাংবাদিক অ্যাওয়ার্ড বিশেষ পুরস্কার, পরিবার পরিকল্পনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড [২০১১], মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড প্রথম পুরস্কার [২০১৪], প্রথম আলো মাদকবিরোধী সেরা প্রতিবেদন পুরস্কার (প্রথম), এবং পরিবার পরিকল্পনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড [২০১৪]। এসব পুরস্কার ইতিবাচক অর্থেই তিনি অর্জন করেছেন। তাঁর লেখার সম্ভারও কম নয়। তিনি সক্রিয় ও চর্চারত রয়েছেন কথাসাহিত্য, জীবনীগ্রন্থ, গবেষণায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো : গল্পগ্রন্থ : স্বপ্নিল প্রভাত, নিসর্গের দিনগুলি, জীবনীগ্রন্থ : অ্যাডিয়াট্রিক  সাগরকন্যা মাদার তেরেসা, ছোটদের নজরুল, ছোটদের বেগম রোকেয়া, ছোটদের সুফিয়া কামাল, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা, একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রঙ তুলির জাদুকর, নেলসন ম্যান্ডেলা, হেনাদাসের জীবন ও কর্ম, ২৪ জন ভাষাসংগ্রামীর জীবনকথা, একাত্তরের সেই গেরিলা। শিশুসাহিত্য : রূপকথা, জাদুঘর। প্রবন্ধসাহিত্য : রবীন্দ্রনাথ : নাটকে নারী। সম্পাদনা করেছেন, পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলনের দলিলপত্র (১৯৪৮- ১৯৫২), প্রভৃতি। রীতা ভৌমিকের লেখার বিষয় নির্বাচন  থেকেই বোঝা যায় তিনি কী ঘরানার লেখক এবং তাঁর ভাবনার জগৎ। এসব থেকেই তাঁর ব্যক্তি ও লেখক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা যায় সহজে। স্পষ্টত তিনি মুক্তিযুদ্ধ, প্রগতিশীল রূপান্তর, সুস্থ সমাজ নির্মাণের ভাবনায় স্বতন্ত্র ভুবনে নিজেকে স্থাপন করেছেন।

 এ-গ্রন্থের পটভূমি নারায়ণগঞ্জের। নারায়ণগঞ্জ অতীত থেকেই গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু নয়, বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, ভাষা আন্দোলন, শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনসহ জনমুক্তির পথে নারায়ণগঞ্জ এলাকার লড়াকু মানুষ পালন করেছেন অনন্য ভূমিকা। এ জন্য লেখক মুক্তিযুদ্ধ লক্ষ্যে রেখে নারায়ণগঞ্জের পূর্বাপর ইতিহাস এখানে বয়ান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এলাকার অনেক বিষয়াবলি আমাদের পাঠ করা হয়ে যায়।

রীতা ভৌমিকের লেখার শৈলীও পাঠককে আকৃষ্ট করে। তিনি এ গ্রন্থের অধ্যায়বিন্যাস করেছেন সুচিন্তিতভাবে। এর মধ্যে এক ধরনের ক্রম সমন্বয় রয়েছে। অর্থাৎ,  বিষয় সম্পর্কে হঠাৎ বলা শুরু করেননি। অধ্যায়-বিভক্তি তিনি যেভাবে করেছেন, তা হলো : নারায়ণগঞ্জ জেলার ভৌগোলিক বিবরণ; ১৯৪৭ পূর্ব প্রতিরোধের ঐতিহ্য; জেলার সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ইতিহাস; নির্বাচন পর্যন্ত কালানুক্রমিক ঘটনা প্রবাহের বিবরণ; ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও তার প্রতিক্রিয়া; অসহযোগ আন্দোলন ’৭১; পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ এবং বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধ; জেলার মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ছাত্র ও পেশাজীবী সংগঠন এবং ব্যক্তির ভূমিকা; গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি, সামগ্রিক যুদ্ধ, বিজয় অর্জন; পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরদের তৎপরতা; নির্যাতন ও গণহত্যা; মুক্তিযুদ্ধের স্মারক। পরিশিষ্টে আছে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা, শহিদদের নামের তালিকা, রাজাকারদের নামের তালিকা, আলবদরদের নামের তালিকা, শান্তি কমিটির তালিকা, লাঞ্ছিতা নারীদের নামের তালিকা প্রভৃতি। সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ না হলেও এর ছায়া অস্বীকার করা যায় না। অবশেষে যে কোনও পাঠক নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যাবেন এ গ্রন্থে। লেখক আন্তরিকতার সঙ্গে সমস্ত ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাকর্মের মতো লেখক নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিচিতি সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন।

আমাদের মনে রাখতে হয়, নারায়ণগঞ্জ ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক একটি এলাকা। রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর বহমানতা। সম্প্রতি বহুমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান যেখানে গড়ে উঠেছে, ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে, এখানে নানা ধরনের মানুষের গতিশীলতাও লক্ষ্য করেছি। নিকট অতীতে বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে এ এলাকার বিশ^ব্যাপী সুখ্যাতিও রয়েছে। ফলে, এ দেশের আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সংযোগ জনমনে স্বীকৃত ও প্রশংসিত।

বাংলা অঞ্চলজুড়ে নারায়ণগঞ্জের পরিচিতি ব্যাপক। সেই প্রাচীন কাল থেকে বাংলার প্রতিটি বিদ্রোহ এদেশের মুক্তি আন্দোলনে প্রেরণা জোগায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সন্ধানে রীতা ভৌমিক পর্যবেক্ষণ করেছেন ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী ধারা। কারণ, হঠাৎ করে কোনও আন্দোলন হয় না। এরও ভিত্তি দরকার হয়। সেক্ষেত্রে বিপ্লবী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন ছিল বলে আমরা ধারণা করতে পারি। এর ওপর ভিত্তি করেই প্রবহমান থাকে নতুন উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম। এ পরিণতিতে নির্মিত হয় স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র। রীতা ভৌমিকের বিবরণ থেকে খণ্ডাংশ উপস্থাপন করা যাক :

‘১৯৩৪ সালের ১০ এপ্রিল। অনেক রাত। দেওভোগের রজকুমার মল্লিকের ছেলে মতিলাল মল্লিক দার্জিলিংয়ের লিবং অপারেশনের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তাঁর বাড়ির পূর্বদিকে পুকুর পাড়ের মন্দিরে বসে একটি গোপন সভা করেন। শীতলক্ষ্যা মহল্লার একটি বাড়িতে অবস্থানরত উক্ত অপারেশনের অন্যতম নেত্রী উজ্জ্বলা মজুমদারের সঙ্গে এই ব্যাপারে সলাপরামর্শ করতে তিনি গোপনে বের হন।… পথে বাবুরাইলের মাঝামাঝি স্থানে কমরউদ্দিন সর্দারের বাড়ির সম্মুখস্থ খালের পাড়ে পাকা ঘাটলার সামনে মেটে বসা রমজান সর্দার, মুজফফর আলী, সাদে মল্লিকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে সুকুমারের গুলিতে রমজান সর্দার এবং মধু ব্যানার্জির গুলিতে মুজাফফর আলি আহত হয়। সুকুমার ও মধু ব্যানার্জি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও মতি মল্লিককে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। … ১৯৩৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রত্যুষে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে মতি মল্লিকের দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। [৩০-৩১]

উপনিবেশবিরোধী এমন চেতনার ধারা অব্যাহত রাখতে হয় প্রয়োজনে। কারণ পাকিস্তান প্রস্তাব ও বাস্তবায়নে বাঙালির অবদান থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার ভোক্তা হয় পশ্চিম পাকিস্তান। সবকিছু গ্রাস করে পশ্চিম পাকিস্তান। ফলে বাঙালিরা এ অসমতা মেনে নেয়নি। দখল, আগ্রাসন, আধিপত্য বিস্তারে প্রথমেই শুরু হয় ভাষার ওপর আক্রমণ। ১৯৪৮ সাল থেকেই দেশের সর্বত্র আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এর জন্য তেমন সংগঠনেরও প্রয়োজন হয়নি। কারণ ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চনার অবসান চেয়েছে। আবার যখন আক্রান্ত হলো, তাতে আর বলা লাগেনি কিছু। একইসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের পুলিশ ও বিহারি-অবাঙালিদের হিংসাত্মক ভূমিকায় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে পড়ে।

উল্লেখযোগ্য যে, ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে রীতা ভৌমিক কিছু উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। এরপর একে একে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইউববিরোধী আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জবাসীর ভূমিকা স্মরণযোগ্য। বাঙালির সর্বাত্মক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে টেনে নেওয়া, বিভক্তি সৃষ্টিতে, পশ্চিমা সমর্থক, অবাঙালি, বাঙালিবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দাঙ্গা সৃষ্টি করে। তারা সফলও হয়। ফলে, অসংখ্য ট্রাজিক ঘটনাবলির সাক্ষী হয় নারায়ণগঞ্জ। সবকিছু মিলিয়ে যা লক্ষণীয়, পাকিস্তান কখনও জনগণের রাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি। এসব ঘটনাবলি আরও প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালে হত্যা-নির্যাতনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। মহড়া আগেই অনুষ্ঠিত হয়, আর ব্যাপকভাবে গণহত্যা চলে ’৭১ সালে। রীতা ভৌমিক নানা সূত্রে এসব হিংসাত্মক হত্যার কিছু বিবরণ এ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :

‘১৯৬৪ সালের ১৪ জানুয়ারি আদমজী নগরে প্রচণ্ড আকারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। আদমজী জুট মিলের শ্রমিকদের একাংশ সক্রিয়ভাবে হামলা, লুটপাট, হত্যাযজ্ঞ চালায়।… হিন্দু বাড়িঘর জ¦ালিয়ে দেয়। লুটপাট করে জিনিসপত্র নিয়ে আসে। মৈষটেক, নানাখী, নয়াপুর, লাঙ্গলবন্দ গ্রামগুলো শ্মশানে পরিণত হয়। … আদমজী, করিম, বাওয়ানি জুট মিল শ্রমিকদের একাংশ রূপগঞ্জে প্রবেশ করে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত করে। এই শ্রমিকরা কায়েতপাড়া, ভুলতা, তারাব, মুড়াপাড়া, গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের হিন্দু পরিবারের ওপর জুলুম ও গণহত্যা চালায়। কয়েক হাজার হিন্দু অসহায় অবস্থায় বোস্টেল স্কুল (জেলখানা) মুড়াপাড়া আশ্রয় নিলে, দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা সমস্ত হিন্দুদের থানা থেকে বের করে দেয়। আনুমানিক ১৫০-২০০ জন হিন্দু নিধন করে শ্রমিকরা। লুটপাট করে জিনিসপত্র, টাকা পয়সা নিয়ে বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।’ [পৃ ৪৯]

এমনি এক ভূতুড়ে রাষ্ট্র নামের জনপদ তৈরি করে পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নারায়ণগঞ্জে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর সদস্যরা ব্যাপক গণহত্যা চালায়। তালিকাভুক্ত ও তালিকা ছাড়াও অগণিত মানুষকে ধরে নিয়ে যায় ও হত্যা করে। এসব হত্যার হিসাব আসলে গণনা করা যায় না। অনেক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিবরণ লেখকও উল্লেখ করেছেন। এসব ট্রাজিক ঘটনা পাঠককে নির্মমতার কাছে নিয়ে যায়, আপ্লুত করে। দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেন ছিল অনিবার্য ও আবশ্যিক। আরও প্রমাণ করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের গঠন ছিল কতটা অযৌক্তিক। রীতা ভৌমিকের বর্ণনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও এদেশীয় দোসরদের আক্রমণ এবং নির্মমতা। ‘সকল যুগের সমস্ত অত্যাচার, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনকে ছাড়িয়ে গেল পাকবাহিনী। সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় প্রবেশ করেই শুরু হলো তাদের গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ। গোদনাইল বাজারটা আগুন দিয়ে জ¦ালিয়ে দিল। লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ধরে নিয়ে গেল বার্মা ইস্টার্নে। এদের সঙ্গে হাত মিলালো লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের পিয়ন সবদার খান এবং তার পুত্র ইয়াকুব খান। … সবাইকে হাত পা বেঁধে বার্মা ইস্টার্নের পদ্মা অয়েল কো. লি. এর জেটিতে দাঁড় করাল। গর্জে উঠল জল্লাদ বাহিনীর অস্ত্র। শীতলক্ষ্যার জল রক্তে একাকার হলো। সাইদুল মাতব্বর হলো এই হত্যাযজ্ঞের নায়ক। বার্মা ইস্টার্নের নিরীহ যুবক ও নারীদের ধরে আনত পিশাচরা। মেয়েদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করত। এলাকার রাজাকাররাও ছিল তৎপর। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখামাত্র খবর পৌঁছে দিত হানাদার শিবিরে। এতে এলাকাবাসীর ওপরও চলত অকথ্য নির্যাতন। মৃত্যুর বিভীষিকায় তটস্থ থাকত গ্রামবাসী। বার্মা ইস্টার্নের জেটিতে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে টাঙ্গাইলের বিখ্যাত সমাজসেবক রণদাপ্রসাদ সাহা ও তাঁর ছেলে ভবানীপ্রসাদ সাহাকে।’ [পৃ ২১৬-২১৭]

 ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ঘোষণা করেন। এরপর নারায়ণগঞ্জে সাধারণ মানুষ অবিরাম সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধাপে ধাপে আন্দোলনের একপর্যায়ে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে উপনীত হয়। এক কথায় নারায়ণগঞ্জ হয়ে ওঠে অশান্ত জনপদ। সকলের মনে আকাক্সক্ষা ও লক্ষ্য―সার্বিক মুক্তি। উত্তাল পরিবেশের মধ্যে অুনষ্ঠিত হয় ’৭০ এর নির্বাচন। এতেও নারায়ণগঞ্জবাসীর ভূমিকা পশ্চিমাদের বিপক্ষে যায়। অভ্যুত্থান ও নির্বাচনে কোনও ফল না এলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় সর্বাত্মক আন্দোলন। দেশ চলে আসে বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণে।

অন্য এলাকাগুলোর মতোই নারায়ণগঞ্জ হয়ে ওঠে মুক্তিকামী মানুষের উত্থানের জনপদ। কেউ ঘরে বসে থাকেনি। অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া পড়ে সবখানে। লেখক জানাচ্ছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিলেন শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, ও নাট্য শিল্পীরা। নারায়ণগঞ্জ জেলার ঢাকা বেতারের কণ্ঠশিল্পী এবং পৌর পাঠাগারে সহকারী পাঠাগারিক মো. আসমত আলী চৌধুরীর নেতৃত্বে কণ্ঠশিল্পীদের নিয়ে গঠিত হলো ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী গোষ্ঠী’।’ [পৃ ৯৮] অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয়। স্মরণীয় : নারায়ণগঞ্জ সব সময়ই সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এগিয়ে ছিল।

সকলেই জানেন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুধু ঢাকায় গণহত্যা পাকিস্তানিরা শুরু করেনি। ঘটে নারায়ণগঞ্জেও। ওইদিনই নারায়ণগঞ্জে সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ শুরু করে। সাধারণ মানুষ বুঝে নেয়―আর পেছনে ফেরার কোনও সুযোগ নেই। সবকিছু বিচ্ছিন্ন করা, ও ব্যারিকেড তৈরির চেষ্টা করা হয়। রীতা ভৌমিকের লেখার বিবরণেও সেসব রয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা হওয়ার আগেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ ও গণহত্যা শুরু করে। লেখক বিবরণে জানাচ্ছেন, ‘পাকসেনারা ২৬ মার্চ শ্যামপুর, পাগলা হয়ে ফতুল্লা প্রবেশ করে গুলিবর্ষণ করতে করতে। সারা রাস্তায় পড়ে রইল অগণিত লাশ। মাগরিবের নামাজের আগে হানাদাররা পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল মিলে (বর্তমান যমুনা অয়েল মিল) আক্রমণ করে। … নারায়ণগঞ্জবাসী রাজারবাগ পুলিশ দফতর আক্রমণের সংবাদ ওয়ারলেসের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ থানা থেকে পাওয়া মাত্রই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মীরা ২ নং রেলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে মর্টারের সেলের শব্দ আর অগ্নিশিখা প্রজ¦লিত হতে দেখে। জাতীয় সংসদ সদস্য এ. কে. এম. শামসুজ্জোহা, এম.পি. আফজাল হোসেন, এম.পি. গোলাম মোর্শেদ ফারুকীসহ আরও কয়েকজন নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খবর আনেন পাকবাহিনীরা রাতেই আক্রমণ করবে। নদীবন্দর এলাকার নৌযানগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।’ [পৃ ১০৬-১০৭]

প্রতিরোধ থেকেই নারায়ণগঞ্জবাসী গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বিভিন্ন সংগঠিত হতে থাকে বিভিন্ন সংগঠন। পর্যায়ক্রমে গড়ে ওঠে বিভিন্ন কমান্ড। একইসঙ্গে চলে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের প্রশিক্ষণ। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রকৃতি ও প্রাণের টানেই যেন সকলেই সে অভিজ্ঞতা অর্জন করে নেয় দ্রুত। এটা শুধু নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নয়। সারা বংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শুরু হয় পথে পথে যুদ্ধ। এ গ্রন্থে শতাধিক সফল অপারেশনের বর্ণনাও দিয়েছেন লেখক। যা অবশ্যই পাঠককে একাত্তরের রণাঙ্গনে নিয়ে যায় এবং বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। প্রতিরোধ, সংগ্রাম, রক্তদান, ত্যাগের বিনিময়ে আসে পরম স্বাধীনতা। যা ছিল বাঙালির অনিবার্য চাওয়া। ‘শীষমহলে অবাঙালি ও পাকআর্মিদের ওপর আক্রমণ’ শিরোনামের অপারেশনের বর্ণনায় লিখেছেন, ‘১৬ডিসেম্বর এ কে এম ফজলুল হকের নেতৃত্বে আবদুল মান্নান, কনক কুমার দাস, আমিনুল ইসলাম, এম এ গনি, অরুণ কুমার দাস, শফি, ছানা রায়, হাবিবুর রহমান, আবদুল আওয়াল প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধা ফতুল্লা থানার শীষমহলে (হরিহরপাড়া) অবাঙালিদের ওপর আক্রমণ করেন। মুক্তিযোদ্ধারা শীষমহল থেকে ঢাকা ভেজিটেবিলের দিকে অগ্রসর হন। মুক্তিযোদ্ধারা পাক আর্মিদের চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে গোলাগুলি শুরু করেন। দুইঘণ্টা যুদ্ধের পর পাকআর্মিরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সারেন্ডার করে।’ [পৃ ২০৪] শত্রুমুক্ত হয় নারায়ণগঞ্জ। অর্জিত হয় বাঙালির কাক্সিক্ষত বিজয়। অনেক রক্তের মূল্যে আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ আবেগ ও চেতনা থেকেই রীতা ভৌমিক গবেষণা করেছেন নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে। আমরা উপলব্ধি করি, ―কেমন ছিল মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো। অনুভব করি হারানোর বেদনা সকল কষ্ট যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে যায়। সবকিছুর ওপর সত্য হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতা। বস্তুত, তা নারায়ণগঞ্জে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কারণ মুক্তিযুদ্ধের কোনো সীমানা থাকে না। রীতা ভৌমিকের এ গবেষণাগ্রন্থে সার্বজনীন ওই চেতনার অনুরণন শোনা যায়।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares