প্রচ্ছদ রচনা―সাহিত্যকর্ম : আলোচনা : সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পের গড়ন-গঠন : কয়েকটি অনুসিদ্ধান্ত : হামীম কামরুল হক

‘হ্যাঁ মৃত্যু, হে কামশক্তি, হে বিষদশন

তোমাকে ঐশ্বর্য করে গড়েছি লেখন!’

―জয় গোস্বামী (‘কলম, লেখনক্রিয়া’, শ্রেষ্ঠকবিতা)

১.

সাহিত্যের দাবি বা কাজ সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘সাহিত্যের কাজ হচ্ছে জীবনকে নানানভাবে দেখানো এবং তাকে সহনীয় হতে সাহায্য করা, আনন্দ-বিষাদ, দ্বন্দ্ব-সংহতির নতুন নতুন ব্যাখ্যা হাজির করা। জীবনের নানান ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণকে একটা জায়গায় সন্নিবেশিত করা। আর পাঠকের কাছে  সাহিত্যের দাবি হচ্ছে কল্পনার জায়গাকে অবারিত রাখা।’―তাঁর এই কথার সঙ্গে লেখকের যোগ্যতা সম্পর্কে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের একটি উক্তি স্মরণে এসে পড়ে। হেমিংওয়ের মতে, ‘ঞযব সড়ংঃ বংংবহঃরধষ মরভঃ ভড়ৎ ধ মড়ড়ফ ৎিরঃবৎ রং ধ নঁরষঃ-রহ, ংযড়পশঢ়ৎড়ড়ভ, ংযরঃ ফবঃবপঃড়ৎ.’ ফলে যা যা সাহিত্যের কাজ―সেসব স্বয়ং লেখকেরই প্রকৃত সামর্থ্য বা যোগ্যতা।

আমরা জেনেছি জগতের প্রায় সব লেখকই যে যার মতো, প্রকৃত লেখকেরা কেউ কারও অনুলিপি নন, তবু লেখা ও সাহিত্য নিয়ে তাদের যাপন ও প্রয়োগে একেবারে ভিত্তিগত কিছু মিল আছে। যেমন জয় গোস্বামীর কবিতা ‘কলম, লেখনক্রিয়া’য় পড়তে গিয়ে লেখা সম্পর্কে এমন কিছু দিকের অনুভব করতেই হয় যা সর্বকালে সর্বস্থানে লেখকভেদে অভিন্ন। যেমন তিনি যখন বলেন, ‘যখনই কলম/আঁকড়েছে, চিন্তা অগ্নি, ওড়ায় সক্ষম।’ ফলে লেখকের কাছে, ‘কলম একমাত্র সত্য। বায়ু, অগ্নি জল/প্রবাহিত তার মধ্যে। জগৎ নিশ্চল।’ তবে সবচেয়ে অমোঘ উক্তি বলে মনে হয় জয় গোস্বামী যখন ঘোষণা করেন, ‘কবি নির্বাপিত হন। কবিরা জন্মান।/ কলম ? সে ধাবমান ইতিহাসযান।’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পের আলোচনায় এভাবে নানান কিছু স্মরণ করে নিতে হলো এজন্য যে, গল্পকার হিসেবে তিনি কতটা অমোঘভাবে নিজের ভূমিকা পালন করেছেন, সেটি দেখে নেওয়ার জন্য। তাঁর ছোটগল্প সম্পর্কে যে তিনটি কথা বলা হয় : এক. তিনি যত না গল্প লেখেন, তার চেয়ে বেশি গল্প বলেন। দুই. তাঁর গল্প জাদুবাস্তববাদী। তিন. তাঁর গল্প উত্তরাধুনিক গল্পের দৃষ্টান্ত।―এই তিনটি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অপেক্ষাকৃত বিপুল পরিসর দরকার। কারণ এই তিনের প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলাদা আলাদা অধ্যায় তৈরি করে এবং এর সঙ্গে মনজুরুলের প্রায় প্রতিটি গল্পকে সংযুক্ত করে আলোচনা করতে হবে। আপাতত এতে আমরা তাঁর ছোটগল্পকার হিসেবে কিছু দিক হাজির করার প্রয়াসী। প্রসঙ্গত, তিনটি বিষয়কে অনিবার্যভাবেই ছুঁয়ে যাওয়ারও চেষ্টা থাকবে।

সবার আগে একটা সহজ বিষয় ধরিয়ে দেওয়া দরকার। সেটি হলো : লেখা কী ?―নিশ্চয়ই এর উত্তর অতি সহজে দেওয়া যায়, তেমন দেওয়া যায় সুবিস্তৃত জটিল উত্তর। মিশেল ফুকো ‘রচয়িতা বলতে কী বোঝায় ?’ বা ‘লেখক কী ?’ শনাক্ত করতে আমাদের আরব্য রজনীর শাহেরজাদির কথা একবার স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন, যাতে আমরা বুঝতে পারি সে গল্প বলছে বেঁচে থাকার জন্য, মৃত্যুকে ঠেকিয়ে দেওয়ার জন্য। ধ্বংসের বিপরীতে এই অবিরাম নিরবচ্ছিন্ন নির্মাণ রচয়িতা, গল্পকার বা লেখকের প্রধানতম দিক। কিন্তু সে তো গল্প বলার ভূমিকা, কিন্তু গল্পলেখা বা স্বয়ং লেখা কী ?

আমরা লক্ষ্য করেছি, যখন আমরা কথা বলি, তখন ওই কথাই যদি কদিনের ব্যবধানে আবার বলি, তা অর্থের জায়গায় ঠিক থাকলেও, দেখা যাবে, সেটি কিছুটা হলেও বদলে যাচ্ছে, অনেকটা থিয়েটারের মতো―কোনও নাটক যেমন হুবহু কখনও আর মঞ্চায়িত হয় না, প্রতিটি মঞ্চায়ন নতুন, নাটকটা একই, কিন্তু মঞ্চায়ন প্রতিবারে নবায়নকৃত। যেমন মুখে আমরা একবার যেটাকে বলি, ‘অস্থির চিত্তে কাল প্রবেশ করে’, এই কথাটিই কোথাও আবার বলতে গিয়ে বলে ফেলতে পারি, ‘চঞ্চল মনে কাল ঢুকে পড়ে’,―এই যে একই কথা প্রায় একই অর্থ নিয়ে বলা হলো, তারপরও তা বদলে গেল। সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে, কেউ কেউ আপত্তিই করবেন যাকে ‘অস্থির চিত্ত’ বলা হচ্ছে, তা-ই ‘চঞ্চল মন’ নয়। পবনদাস বাউলের গানে আছে, ‘চঞ্চল মন আমার শোনে না কথা।’―এটিকে আমরা যদি বলতে চাই ‘অস্থির মন আমার শোনে না কথা।’―তাতে ব্যঞ্জনা দ্যোতনা বদলে যায়। লেখাটি ঠিক এর বিপরীতে কাজ করে, এই যে শব্দকে হুবহু রাখা, এবং অর্থকে সংরক্ষণ করার কাজটি লেখা করে, বিচ্যুতি-বিস্মৃতি থেকে বাক্যকে রক্ষা করে। এজন্যই বর্ণকে বলা হয় অক্ষর, যার ক্ষরণ হয় না, যা ক্ষয়ে যায় না, রয়ে যায়। ঠিক এ জায়গা থেকে ছোটগল্পকার সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের জিৎ হলো : তিনি গল্প বলাটিকে লিখে রাখেন।

গল্প বলার এই রীতি সর্ব দেশেই কমবেশি ছিল, কিন্তু প্রাচ্যে বা বাংলা অঞ্চলেও কথকতার যে ভঙ্গি আমরা দেখি একদিকে অন্তস্থভাবে তিনি যেমন সেটি রক্ষা করেন, অন্যদিকে ছোটগল্প লেখার সবচেয়ে আধুুনিক বা হাল আমলের চালগুলো তিনি চেলে যান। ফলে টেক্সটের এক দিকে থাকা লেখক ও অন্যদিকে থাকা পাঠক নামের দুই দাবাড়ুর খেলা বেশ জমে ওঠে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প প্রায় প্রত্যেকটি জমজমাট গল্প। এমন সব গল্প বললে যেমন আসর জমে যায়, এমন সব গল্প লিখলে পাঠকও জমে যান।

২.

১৮ জানুয়ারি ১৯৫১ সালে সিলেটে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের জন্ম। পড়ালেখা ও পরে শিক্ষকতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ১৯৬১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় একটি স্মরণিকায় প্রথম গল্প মুদ্রিত হয়, পরে নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় রংধনু নামের পত্রিকায় কিছু লেখা। সেসব মূলত হাত মকশো বলা চলে। তাঁর ছোটগল্পের যাত্রা শুরু হয় গত শতকের সাতের দশকের গোড়ার দিকে। ১৯৭৩ সালে তাঁর প্রথম গল্প ‘বিশাল মৃত্যু’ প্রকাশের দীর্ঘ প্রায় বাইশ বছর পর ১৯৯৫ সালে কলকাতার প্রমা থেকে স্বনির্বাচিত গল্প এবং ১৯৯৬ সালে ঢাকার প্রগতি প্রকাশনী থেকে থাকা না-থাকার গল্প বই দুটোর মাধ্যমে তিনি প্রত্যাবর্তন করেন বাংলাদেশের ছোটগল্পের জগতে, এবং ২০০৫ সালে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রেম ও প্রার্থনার গল্প তাঁকে বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাভাষী বিদগ্ধ পাঠকের কাছে বিপুল পরিচিতি এনে দেয়।

আমরা মূলত দেখি, গত শতকের নয়ের বা নব্বই দশকের শেষ দিক থেকে শূন্যদশকের প্রথমভাগে সৈয়দ মনজুুরুল ইসলাম তৈরি করতে থাকেন বাংলা ছোটগল্পের এক বিস্ময় জাগানিয়া জগৎ। বলে রাখা ভালো, তাঁর এই জগতের প্রায় সমান্তরালে চলেছিলেন আরেক বিস্ময় জাগানিয়া গল্পকার শহীদুল জহির। আমরা দেখি বাংলাদেশে ছোটগল্পের ধারা তৈরিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ থেকে শহীদুল জহির এর আগে পরে মাঝে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় সরদার জয়েনউদ্দীন, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্, শওকত ওসমান, রশীদ করীম, জহির রায়হান, শহীদুল্লা কায়সার, আবু রুশদ থেকে হুমায়ূন আহমেদ, মঈনুল আহসান সাবের, ইমদাদুল হক মিলন, আতা সরকার, মঞ্জু সরকার, সুশান্ত মজুমদার, জুনাইদুল হক থেকে মামুন হুসাইন, শাহাদুজ্জামান, সেলিম মোরশেদ, পারভেজ হোসেন, নাসরীন জাহান, জাকির তালুকদার, হামিদ কায়সার, মশিউল আলম, ফয়জুল ইসলাম, আহমাদ মোস্তফা কামাল, প্রশান্ত মৃধা অব্দি আরও অনেকের নাম। (যাঁদের নাম এখানে নেওয়া হলো না তারা নিজে থেকে সেখানে নিজেকে অনুভব করে নিতে পারেন, তিনি যদি বাংলা ছোটগল্পের সেবা করে থাকেন তো বর্তমান রচয়িতার তার নাম নেওয়া ও না-নেওয়ায় তাঁর কোনও মাত্র ক্ষতি হবে না। যেমন হারিয়ে যাওয়া ষাটের উজ্জ্বল গল্পকার শহীদুর রহমানের পাশাপাশি বারেক আবদুল্লাহ বা সত্তরের শেখর ইমতিয়াজের কথাও স্মরণে আসবে কারও কারও।) কিন্তু একেবারে ছোটগল্পকেই নিজের লেখালেখির প্রধান ক্ষেত্র করে তুলেছেন এবং ছোটগল্পকার হয়েই কোনও ভাষার প্রধান লেখক হয়েছেন, এমন লেখক সব ভাষায়ই বিরল। সেটি অ্যাডগার অ্যালেন পো হন কি আন্তন চেখভ হন বা হোর্হে লুই বোর্হেস হন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে প্রধানত হাসান আজিজুল হক তেমন একজন লেখক এবং এর পরই সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে দেখি―যিনি মূলত ছোটগল্পচর্চার ভেতর দিয়ে তৈরি করেছেন তাঁর বিশিষ্ট পরিচয়। মামুন হুসাইন এবং অতিসম্প্রতি দেখতে পাই ফয়জুল ইসলাম―বাংলাদেশে ছোটগল্পের ধারায় বিশিষ্ট দুই নাম হিসেবে ভাস্বর হয়ে উঠেছেন। বলাবাহুল্য, এই চারব্যক্তির ছোটগল্পগ্রন্থের সংখ্যার তুলনায় উপন্যাস একেবারেই হাতে গোনা। এঁদের আরও মিল হলো, এঁদের কোনও কোনও গল্প আয়তনে প্রায় উপন্যাসিকা বা নভেলেটের সমান। গল্পগ্রন্থগুলো আকারে প্রকারে দীর্ঘ। প্রচুর গল্প সন্নিবেশিত হয় কারও কারও গল্পগ্রন্থে, কারো বা চার/পাঁচটি দীর্ঘ গল্প নিয়ে পূর্ণ হয় একেকটি বই। ছোটগল্পের কারিগর হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পগ্রন্থ ও গল্পসংখ্যা বোধ করি বর্তমানকালে সবাইকে ছাপিয়ে গেছে। স্বনির্বাচিত গল্প (১৯৯৫), থাকা না-থাকার গল্প (১৯৯৬), কাচ-ভাঙ্গা রাতের গল্প (১৯৯৮), অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প (২০০১), প্রেম ও প্রার্থনার গল্প (২০০৫), সুখদুঃখের গল্প (২০১১), বেলা অবেলার গল্প (২০১২), মেঘশিকারি (২০১৫), তালপাতার সেপাই ও অন্যান্য গল্প (২০১৫), একাত্তর ও অন্যান্য গল্প (২০১৭), কয়লাতলা ও অন্যান্য গল্প (২০১৯) এবং গল্পসকল প্রথম খণ্ড (২০২০)। এছাড়া তিনি উপন্যাস লিখেছেন, লিখেছেন বিপুল পরিমাণে প্রবন্ধ এবং করেছেন গবেষণামূলক কাজ। বিশ্বসাহিত্য নিয়ে দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত তাঁর একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় কলাম ‘অলস দিনের হাওয়া’র একটি কলাম থেকে জাদুবাস্তবতার কথা জেনেছিলেন শহীদুল জহির, আর বদলে নিয়েছিলেন তাঁর নিজের রচনার ধারাগতি। এই কলামটি সৈয়দ শামসুল হকের হৃদকলমের টানের মতো আজও পাঠকের স্মরণে এক সাহিত্যভোজের স্মৃতি হয়ে আছে।

৩.

বাংলা সাহিত্যে বিপুল পরিমাণ ছোটগল্পের রচয়িতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নরেন্দ্রনাথ মিত্রের নাম। বিশ্বছোটগল্পের ইতিহাসে গী দ্যা মোপাসাঁ, আন্তন চেখভ, ও’হেনরি বিপুল পরিমাণ ছোটগল্প রচনার কৃতিত্বের অধিকারী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সংখ্যায় কম লেখেননি। কম লেখেননি বিভূতি-তারাশঙ্কর ও মানিক। প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুবোধ ঘোষ, সমরেশ বসু, রমাপদ চৌধুরীদের ছোটগল্পের পাল্লা গুণে-মানে যথেষ্ট ভারী। যেমন ভারী আলাউদ্দিন আল আজাদ ও সৈয়দ শামসুল হকের গল্পের ভাণ্ডার। কিন্তু আমরা এর ভেতর একটি ঘটনা দেখি, যিনি ছোটগল্পকার হিসেবে প্রায় বিস্মৃত হয়ে গিয়ে আবার বিপুলভাবে ফিরে এসেছেন, সেই জগদীশ গুপ্তের কথা বাদ দিয়ে এখন বাংলা ছোটগল্পকে আর ভাবা যায় না। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ক্ষেত্রে জগদীশ গুপ্তকে বিশেষভাবে মনে রাখতেই হচ্ছে। বাংলা কথাসাহিত্যে নিয়তিবাদ ও অতিপ্রাকৃত ধারায় গল্পকে অত্যন্ত নির্মোহ ও নিমর্মভাবে কিন্তু গভীর সংবেদনশীলতার সঙ্গে হাজির করতে জগদীশ গুপ্ত এক তুলনারোহিত লেখক। তাঁর এই মনোবৃত্তির সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও হাসান আজিজুল হককেই পাশে রাখতে হয়। জগদীশ গুপ্তের মতোই সৈয়দ মনজুুরুল ইসলামের গল্প আমাদের বিমূঢ় করে দেয়, কিন্তু একইভাবে নয়। কারণ জগদীশ গুপ্তের মতো তিনি অত্যন্ত উপভোগ্য ভাষায় গল্পটি বললেও ততটা নির্মম নন। অমিয়ভূষণ মজুমদার বা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মতে, জগদীশ গুপ্ত যতই প্রকট বিকট নির্মম বাস্তবতার গল্পলেখক হন না কেন কিন্তু তিনি ভেতরে ভেতরে আসলে ওই শরৎচন্দ্রগোত্রীয়ই। এখানে আমরা শরৎচন্দ্রের বৈঠকি মেজাজের কথা বলতে পারি। কিন্তু চমকপ্রদ বিষয় হলো জগদীশ গুপ্ত গল্প বলার চেয়ে গল্প লেখেন, একই কাজ করেছেন বাকিরা প্রায় সবাই। সেদিক থেকে গল্পকথনে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও যুক্ত হতে পারেন শরৎচন্দ্রের মেজাজের সঙ্গে। বলাবাহুল্য গল্পকথনের ও গল্পলেখনের ঐতিহ্য বাংলা ছোটগল্পের রথীমহারথীরা কমবেশি সবাই পালন করে এসেছেন। যেমন হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত কুশলী ছোটগল্পকার। তাঁর লেখায় কথন ও লেখন সমান্তরালে চলমান, একদম হাত ধরাধরি করেই চলমান। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নিজে যেমন বোধ করেন, তাঁর গল্প লেখায় কথনের ভঙ্গিটাই বেশি এসেছে, তাঁর পাঠকরাও সেটি বোধ করেন। গল্পের শুরুতে, গল্পের ভেতর এবং গল্পের শেষেও এই কথকের মেজাজটা তাঁকে বজায় রাখতে দেখা যায়, যেমন ‘রেশমি রুমাল’ গল্পের এই অংশটি :

‘আমার অস্বস্তি হচ্ছে কারণ আমি জানি। আমি এই গল্পের প্রতিটি মানুষের মনের কথা জানি। মেয়েটি যে ইংরেজি বলছে, তার কারণ সে বুয়েট থেকে আর্কিটেকচার পড়েছে, এখন নির্মাণবিদ নামে একটা ফার্মে কাজ করে। স্বামী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, স্বামীর বন্ধুটিও। মেয়েটি, যার নাম স্বাতী, প্রেম করে বিয়ে করেছিল। কিন্তু স্বামী, যার নাম মাহফুজ, ভুল মানুষ প্রামণিত হয়েছে। মাহফুজকে দেখে আমার বৃদ্ধ যাত্রীর ছেলের মতো নিস্পৃহ মনে হয়েছে। স্বাতীর অনেক কষ্ট, কিন্তু সবচেয়ে বড় কষ্ট, তাকে বিয়ের এক বছর পর থেকেই ঘরের আসবাবপত্রের মতো সাধারণ এবং অনুল্লেখযোগ্য ভাবতে শুরু করেছে মাহফুজ। কোনও উচ্ছ্বাস নেই তাকে নিয়ে, কোনও রোমান্স নেই তাদের সম্পর্কে। একটা চোষ কাগজের মতো শুকনো জীবন।

অবশ্য সেই জীবনে বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে এসেছে স্বামীর বন্ধু গনি। বছরদুয়েক হলো। গনি এসে ছোটখাটো একটা ঝড়ই তুলেছে স্বাতীর মনে। অনেকদিন পর, গনির চোখে চোখ রেখে স্বাতী কামনা কী জিনিস, আবিষ্কার করেছে। গত সপ্তাহে তারা সিলেট এসেছিল বেড়াতে। এসে গনির সঙ্গে সম্পর্কটা ভারী হয়েছে : এক সন্ধ্যায় গনি তার হাত ধরে নিজের বুকে ঠেকিয়ে বলেছে, ইংরেজিতে, দ্যাখো, এই বেয়াড়া হৃৎপিণ্ডটা কার জন্য অমন ধুকপুক করছে।

এতসব জানার পর অস্বস্তি কেন হবে না, বলুন ?’

(‘রেশমি রুমাল’, প্রেম ও প্রার্থনার গল্প)

―সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের যেকোনও গল্প থেকেই এমন উদাহরণ দেওয়া যায়। যেখানে তিনি যেন সামনে বসে থাকা কোনও ব্যক্তিকে গল্প শোনাচ্ছেন। কখনও চলতে চলতেই এগিয়ে চলে তাঁর গল্প, কখনও সদ্য বা দূর অতীত থেকে হাজির হয় তার গল্প কোনও এক জানা বা অজানা পাঠকের সামনে।

৪.

মনজুরুল জীবনের একবারে দৈনন্দিনতা থেকে অতি সহজে চলে যেতে পারেন মানুষের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনযাপনের ভেতরে। ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’, ‘ফেরিঘাটের রান্নাবান্না’ বা ‘তিন টাকার নোট’-এর মতো গল্পগুলোতে অপমৃত্যু, বেশ্যাবৃত্তি ও চোরাকারবারিদের অন্ধকার জগৎ, আর জালিয়াতির বিষয়গুলো হাজির হয় গল্প শোনানোর কোমলতা নিয়ে। ভাষায় দেওয়া হয় না তীব্রতা, ঢালা হয় না হলাহল। বলা যায়, মনজুরুল কখনও খুব শক্ত বা কঠোর চোখে জীবনের দিকে, মানুষের দিকে তাকান না। আমরা চমৎকৃত হই তাঁর গল্পের বৈচিত্র্যে, কারণ যিনি ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রয় বিক্রয়’-এর মতো গল্প লিখেছেন, তিনি অবলীলায় লেখেন ‘জলপুরুষের প্রার্থনা’ বা ‘জিন্দা লাশ’-এর মতো গল্প, যেখানে মানুষ তার কায়ার সঙ্গে ছায়া হয়ে যেতে পারে, কল্পনার দুয়ার খুলে গল্প হয়ে উঠে যায় চিত্রকল্পের স্তরে। ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রয় বিক্রয়’ গল্পটি এতই বিশ্বাসযোগ্যতার স্তরে চলে যায়, আমরা বিহ্বল হয়ে উঠি এই গ্যাসক্ষেত্রের ভাগবাটোয়ারার মতো তলের কাহিনি তাহলে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পেছনে কাজ করেছে ? তেমনটাই ‘পরকীয়া’ গল্পের কাহিনি জয়সালমির না ভারতবর্ষের যেকোনও অঞ্চলে আঠারো শতক থেকে হানা দিয়ে আসে অতীত ও অতি সাম্প্রতিক মন ও প্রবণতার আদানপ্রদান ঘটতে থাকে। সঙ্গে চট করে এও মনে হয় নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘রস’ গল্পের ছায়াও যেন এতে মিশে আছে। তালাক দেওয়া স্ত্রী অন্যের ঘরনি হয়ে গেলে আগের স্বামী একটি বিশেষ শূন্যতাবোধে জারিত হয়ে তার প্রতি বোধ করতে থাকে অপ্রতিরোধ্য এক টান।

মনজুরুলের গল্পের আরও একটি দিক হলো : তিনি অনেক সময়ই পাঠকের ওপর ছেড়ে দেন গল্পটির ইতি টানার দায়িত্ব। তাঁর নিজের কিশোরবেলায় তাঁদের এলাকায় থাকা বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক হিন্দু বিধবা নারী ও মনজুরুলদের বাড়ির গৃহপরিচারক হাবিব ভাইয়ের কাছে গল্প শোনার সময় এই ধরনটি লক্ষ করেছিলেন। এই দুজনই গল্প নিয়ে খেলতেন, অনেকক্ষেত্রেই গল্প শেষ করতে চাইতেন না। শেষ না হওয়া গল্পের ভেতর আরও আরও গল্পের সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতেন। মনজুরুলও প্রায় একই কাজ করেন। তবে এই শেষ না হওয়া রবীন্দ্রনাথের বর্ষাযাপন কবিতায় বলা ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ ধরনের নয়। সেটি আসলে একটা মুক্ত অভিমুখ লাভ করে, পাঠকই এর অনেকগুলো অভিমুখ তৈরি করে নিক, মনজুরুল যেন সেটাই চান। আবার কোনও গল্পের ভেতরে কাজ করে ইতিহাসের একটি দীর্ঘ পরম্পরা, যেমন ‘ফার্গুসন ডিনারওয়ালার গল্প’। ঔপনিবেশিক বাস্তবতা, ধর্মান্তর, নাম বদলের, পদবি বদলের কি পেশাবদল বিচিত্র চমকপ্রদ কাহিনি থেকে মুক্তিযুদ্ধের পরিণতিতে হানা দেন মনজুরুল। এখানে স্বপ্নাবেশ আর বাস্তবতা এবং প্রতিশোধ―অদ্ভুত এক জোড়াতালি এতে ভারসাম্য লাভ করে। একইসঙ্গে উত্তরাধুনিক গল্পের মেটাফিকশনের ধাঁচ ও যুক্তি-বাস্তবতা-অতিক্রমী ধরন তাঁর গল্পে ফিরে ফিরে আসে। কোথাও কোথাও হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো নিজের নির্মিত ইতিহাসের ক্ষণ থেকে তৈরি করেন গল্প। বিশ্বসাহিত্যের নানান গল্পকার ও বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার বুম পরবর্তী লেখকদের অনেকের ভেতর এই ধরন লক্ষ্য করা গেছে। ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রয় বিক্রয়’, ‘পরকীয়া’ বা ‘ফার্গুসন ডিনারওয়ালার গল্প’ মতো আরও অনেক গল্পে ইতিহাসের লেনাদেনা ও কায়কারবারে মানুষের নিয়তি ও পরিণতিকে গেঁথেছেন মনজুরুল তাঁর গল্পকথনের অভূতপূর্ব সৃষ্টিশীলতায়। আবার ‘মলিনার এক রাত্রি’, ‘মেয়ে’ বা ‘দুই খুনী’ গল্পে নারী শরীর ও মনের দোলাচল, তাদের আনন্দ ও অসহায়ত্ব লীলাময় হয়ে ওঠে। যেকোনও জায়গায় চোখ রাখা যাক ‘দুই খুনী’ গল্পে, দেখা যাবে এই লীলাময়তা বা গল্প বলায় মনজুরুলের প্লেফুলনেস :

‘রাতটা খুব উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় গেল মোমিনুন্নেছা ও করবীর। করবীর বেশি কষ্ট হলো, দুটো কারণে : এক, সামনে বসিয়ে নাজিবকে সে আলু-কিমা দিয়ে ভাত খাওয়াতে পারল না। অথচ তরকারিটা কি উজ্জ্বল গন্ধ ছড়াচ্ছে, এবং দুই, আনন্দময় কন্ডমহীন রতিক্রিয়ায় এবার ছেদ পড়ল। তার ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।’

(‘দুই খুনী’, সুখদুঃখের গল্প)

এই গল্পে শাশুড়ি ও পুত্রবধূ একে অন্যের মৃত্যু চাইতে চাইতে জীবনযাপন করে ও পথ চলে, আবার নৌকাডুবিতে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে শাশুড়িকে জল থেকে তুলে সাঁতার দিয়ে ডাঙায় তোলে স্বাস্থ্যবতী করবী। ‘দুই খুনী’ নামটায় পাঠক যেটা আগে ধরে নেবেন যে এটা কোনও দুজন খুনির গল্প, আদতে তা নয়, বরং খুনি মানসিকতার গল্প, জীবনের বহুক্ষেত্রে একদম কাছের লোকটা মরে যাক―এমন চাওয়ার বিষয়টি বহু মানুষের বেলায় ঘটে। মনজুরুলের এ গল্পের নামটি তাই পাঠ করার পুরো সময়জুড়ে অদ্ভুত এক ঠাট্টার মতো বেজে চলে।

অদ্ভুত ও বিরল চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায় তাঁর ‘খোদারাখার জন্ম’, ‘যে মানুষ আলো দেখেছিল’, ‘পরিতোষের পায়ের নিচে মাটি’ এবং ‘কাঁঠালকন্যা’র মতো গল্পগুলোতে। খুব স্বাভাবিক মেজাজে সহজভাবে তিনি যে গল্প বলেন তাতে বাস্তবতা ও জাদু এসে মেলে। তবে এ জাদু যতটা জাদুবাস্তববাদী, তার চেয়ে অতিপ্রাকৃত ও ফ্যান্টাসির সঙ্গে বেশি লগ্ন। আমরা ‘জলপুরুষের প্রার্থনা’ গল্পে মৎস্যকন্যাকে যেভাবে হাজির হতে দেখি তাতে এটি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যদিও ওই গল্পে শেকুল আরেফিন ও জলকন্যা রেহানা বা ঊর্মিলা আকতার মানুষের অপরাধবোধের বিপরীতে সৃষ্টি হওয়া ট্রমার অন্যরূপ বা তা ট্রমাতাড়িত জগৎ থেকে উঠে আসা কিনা―তাও আমাদের ভাবতে হয় না―অন্তত গল্পটি পাঠ করার সময়, আমরা অবলীলায় এটি পড়ি এবং উপভোগ করি। এভাবেই গল্প বলেন মনজুরুল। তাঁর গল্প বলার ধরনটি পাঠকের মন ও মননে কোনও চাপ তৈরি করে না। একেকটি চরিত্রের রূপ ও রূপান্তরের গল্প তিনি বলে চলেন সোজাসাপ্টা ভাষায়। কিন্তু এর ভেতর থেকে উন্মোচিত হয় জীবনের বিচিত্র বক্র ও দোমড়ানো মোচড়ানো পরিস্থিতিগুলো।

তবে কথনের ভঙ্গিতে গল্প বলার জন্যই হয়ত মনজুরুলের গল্পের গদ্য অপেক্ষাকৃত ঢিলেঢালা। গদ্যে কোনও টান টান নির্মেদ গড়ন নেই, কিন্তু গল্পের বুননে আছে এক অপ্রতিরোধ্য টান টান আবহ, যেজন্য তাঁর গল্প পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ছেড়ে দেওয়া কঠিন। এর ভেতরেই তিনি জন্ম-মৃত্যু-অপমৃত্যু, শৈশব-কৈশোর-যৌবন-বার্ধক্য, নিঃসঙ্গতা-প্রেম-পরিণয়-দাম্পত্য ও সম্পর্কের ভাঙাগড়াগুলো হাজির করেন, পাশাপাশি চলতে থাকে সমাজ-রাষ্ট্র ইতিহাসের পালাবদল। জীবনের সামগ্রিকতাকে যেভাবে একজন ঔপন্যাসিক ছুঁতে চান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর ছোটগল্প দিয়ে আমাদের নিয়ে যেতে চান মানবপরিস্থিতি ও ভুবনের সমগ্রতায়; ব্যক্তিকে ছুঁয়ে ছেনে দেখেন, মনকে ঘাতসহনীয় করে তোলেন আর পাঠকের কল্পনাকে অবারিত করেন। এইভাবেই তিনি সাহিত্যের দাবি পূরণ করেন আর পালন করেন একজন লেখকের ভূমিকা।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.