আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : পানেছারবানুর নকশীকাঁথা : নারীমুক্তির সোচ্চার গাথা : মোহীত উল আলম

ঠিক এক ডজন বছর আগে ঈশাখাঁবাদ নামক গ্রামে বাস করত এক কৃষক দম্পতি। কাজল নামক সীমান্তবর্তী এক নদীর তীরে ছিল তাদের গেহ। স্বামীটির নাম ছিল ইলিয়াস, আর স্ত্রীটির নাম ছিল পানেছারবানু। তাদের একটিমাত্র ছেলে ছিল, যার নাম আলি আক্কাস, যাকে মা আদর করে ডাকত ইদ্রিস। ইলিয়াস ছিল দশম শ্রেণি পাস,  কিন্তু ইংরেজিটা এক আধটু বুঝত। আর পানেছারবানু ছিল অপরূপ সুন্দরী, যার নাম রাখা হয়েছিল বানেছার পরীর ইচ্ছানুযায়ী। এই বানেছা পরীর সঙ্গে পানেছারবানুর মায়ের কথাবার্তা হয়েছিল, যখন পানেছারবানু তার মায়ের গর্ভে ছিল। এ পর্যন্ত বর্ণনায় কেমন একটা বাস্তব এবং পরাবাস্তবের মধ্যে মিশেল মনে হচ্ছে না ? হ্যাঁ, পাঠক ব্যাপারটি আসলে তাই। এই উপন্যাসে সময়ের প্রেক্ষাপটটি কাহিনির প্রয়োজনমতো সামনে পেছনে খানিকটা টেনেএকদিকে যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলটাকে নেওয়া হয়েছে বিস্তৃত প্রেক্ষাপট হিসেবে, তেমনি বানেছার পরীর আবির্ভাবসহ  আলি আক্কাসের ডোঙায় বসে হ্যালুসিনেশান হওয়া বা ইলিয়াসের একই ডোঙায় বসে আত্মহত্যার নিমিত্তে ডুবে যাওয়া, কিংবা ইলিয়াসের ঘোড়া দাবড়ানোএইসব মিলে উপন্যাসটিতে কিছুটা অতিবাস্তবতার সঙ্গে অতীত যুগের হাঁটাচলা দেখতে পাই। সেজন্য আমিও বর্ণনায় একটু অতীতকালের ব্যবহার করলাম।

হ্যাঁ, বলছি হাসনাত আবদুল হাইয়ের (বাকি আলোচনায় যাঁকে শুধু হাসনাত সম্বোধন করা হবে) পানেছারবানুর নকশীকাঁথা শীর্ষক উপন্যাসটির কথা। অন্যপ্রকাশ থেকে বের হয়েছিল ২০১০ সালে। উপন্যাসটির কাহিনি শুরু হবার আগেই ইলিয়াস ভাগ্যোন্বেষণে ইউরোপের গ্রিস দেশটিতে কার্যোপলক্ষে রওনা দিয়েছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৃথিবীর দুরূহতম শরণার্থী রুট ধরেকাজল নদী দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারত, ভারত থেকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান- ইরান-ইরাক হয়ে তুরস্ক, তারপর তুরস্ক থেকে চোরাপথে নৌকা দিয়ে গ্রিসের তীরে পৌঁছানো। গ্রামের আদম ব্যবসায়ী আড়তদার কুদরতউল্লার কাছে জমি বিক্রি ও বন্ধকী দিয়ে মোট চার লাখ টাকা খরচ করে, ইলিয়াস তার স্বপ্নের গ্রিস দেশে যাওয়ার আয়োজন করে নিজের এবং পাশর্^বর্তী গ্রামের জনা বারো এ রকম ভাগ্যেন্বেষী বিভিন্ন বয়সী লোকের সঙ্গে। এটা হলো ইলিয়াসের জগৎ, যেন সে ইউলিসিসের মতো অভিযাত্রিক, যে তুলনাটা করছি এজন্য যে হাসনাত শুরুতেই হোমারের এপিক ওডিসির কাঠামো মোতাবেক উপন্যাসটি লিখেছেন বলে ছোট্ট ‘ভূমিকা’য় বলেছেন। আর, অডিসিউস যদি হয় ইলিয়াস (হোমারের আরেক এপিক ইলিয়ড-এর সঙ্গে ইলিয়াসের নামের ব্যঞ্জনাগত সামঞ্জস্য লক্ষ্যণীয়।), তা হলে তার রেখে যাওয়া স্ত্রী পানেছারবানু হচ্ছে ইউলিসিসের স্ত্রী পেনেলোপি। অডিসিউস ট্রয়ের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল এবং যুদ্ধ শেষে তার নিজ দ্বীপ ইথাকায় ফিরে আসতে সময় লেগেছিল বিশ বছর। এই বিশ বছরে সময় পার করছিল স্বামীর জন্য অপেক্ষমানা স্ত্রী পেনেলোপি চরকায় তার শ^শুরের জন্য শাল বুনন কাজে ব্যাপৃত থেকে। কিন্তু তাঁর নিস্তার ছিল না। কারণ অডিসিউস যুদ্ধে মারা গেছে বা আর কোনোদিন ফেরত আসবে না মনে করে সুন্দরী পেনেলোপির পাণিপ্রার্থী হয়ে প্রতিদিন শহরের রাজযুবারা এসে তার প্রাসাদে নানারকম অর্ঘ্য নিয়ে হাজির হতো। কিন্তু পেনেলোপি ছিল স্বামীর প্রতি একান্ত অনুরক্ত, তাই সে যুবাদের ঠেকিয়ে রাখতে এই বুদ্ধি বের করে যে যতদিন পর্যন্ত তার শাল বুনন শেষ না হবে, ততদিন পর্যন্ত সে কারও পাণি গ্রহণ করবে না। তো পেনেলোপি করত কি, প্রতিদিন রাতে সে বুননকৃত অংশটি খুলে ফেলত, আবার পরদিন সকাল থেকে আবার বুননে নামত। এভাবে বুনন আর শেষ হয় না, যুবাদের প্রতীক্ষারও শেষ হয় না, আর তারা সময় কাটাতে পরষ্পরের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হতো। আর এমন চলতে চলতে একদিন অডিসিউস ফেরত আসে।

হাসনাতের পানেছারবানুও অনুরূপ স্বামীভক্তা, এবং ইলিয়াসের অনুপস্থিতিতে গ্রামের মুরব্বিরা একগাদা তার সঙ্গে নানা ছলাকলায় প্রণয়বাসনা জানাতে চায়, কিন্তু পেনেলোপির মতো সেও সবাইকে ফিরিয়ে দিতে পারে। পেনেলোপির মতো পানেছারবানুর জন্যও একটি নকশীকাঁথার কাজ জোগাড় হয় (এই পর্যায়ে কবি জসীমউদ্দিনের পুঁথিকাব্য নকশীকাঁথার মাঠ-এর কথা মনে পড়বেই।), কিন্তু সেটি হয় একটু অন্যভাবে। গ্রামাঞ্চলের নিঃস্ব এবং স্বামী-প্রত্যাখ্যাত গরিব মহিলাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য ব্যাপৃত একটি এনজিও সংগঠনের সঙ্গে পানেছারের যোগাযোগ হয়। সে সংগঠনটির প্রতিনিধি রিয়া, তরুদু’জন তরুণী এবং শান্ত ও সাগরদু’জন তরুণের মারফতে পানেছারবানু পনের হাজার টাকার একটি ঋণও পায়, আর পায় নকশীকাঁথা তৈরি করার দেশি-বিদেশি অর্ডার। এ কাজে পানেছারবানুকে সাহায্য করে তারই পালিতা একটি মেয়ে নসিরন,  যার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় পানেছারবানুরই কামলা লোক সমেদের সঙ্গে। কিন্তু গ্রামের মুরব্বিরা, যে দলের মধ্যে আছে ওয়ার্ডের নির্বাচিত মেম্বার কুদ্দুছ শেখ, ওয়াকফ সম্পত্তির সচিব মুন্সি কেফাতুল্লাহ, এলাকার মাতবর ইসহাক মিয়া, আরেক মাতবর ধনাঢ্য মহাজন মোহাব্বতজান, হাজি রমজান আলি (সম্পদশালী এবং তিন স্ত্রী সহকারে আরও সম্পদশালী) যে নাকি তার পাইক মধু খাঁ সহকারে বিয়ের নওশা সেজে পানেছারবানুকে চতুর্থ স্ত্রী বানানোর তালে জেওরতের বাক্সসহকারে প্রস্তাব দিতে গেলে আলি আক্কাসের হাতে চরমভাবে নিগৃহীত হয়, এবং সুরজ মিয়াএই দুর্ধর্ষ অর্থলোভী ও নারীলোভী মাতবরশ্রেণির সঙ্গে হাত মেলায় ইলিয়াসেরই আপন বড় ভাই মোখলেছ রহমান, যার ষড়যন্ত্রে ইলিয়াসের বন্ধকী জমি এক বিঘা থেকে তিন বিঘায় পরিণত হয়, এবং যে কিনা সবসময় পানেছারবানুকে এই বলে বিভ্রান্ত করতে চায় যে স্বামী-বিনা এত রূপ যৌবন নিয়ে পানেছারবানু এ রকম নিরাপত্তাহীন থাকা ঠিক না, বরঞ্চ তার বাড়িতে থাকলে পানেছারবানু নিরাপদ থাকবেযে প্রস্তাব প্রতিবারই পানেছারবানু সরোষে প্রত্যাখ্যান করে। ইলিয়াসবিহীন পানেছারবানুর সংসারে আছে তার শাশুড়ি, কোমর ব্যথায় আজীবন জর্জরিত, লুৎফুন্নেসা যে সব সময় শোয়া অবস্থায় বিছানা থেকে হাঁক পাড়ে যখনই বাড়িতে কোনো পুরুষ কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসে এবং যে কিনা উপন্যাসের একেবারে শেষ অংশে পাঠককে চমকে দিয়ে জানায় যে সে শুধু হাঁক পাড়ত না, বরঞ্চ যখনই কোনো পুরুষ লোক বাড়িতে আসত, তখনই সে একটি কৌশলে দড়ি টেনে তার বেড়ায় একটি ফাঁক সৃষ্টি করতে পারত, যে ফাঁক দিয়ে পানেছারবানুর উঠোন, বাড়ির অন্দরমহল, রান্নাঘর সব গোপন ক্যামেরার মতো দেখা যেত। হাসনাতের সাংস্কৃতিক রুচি বৈশি^ক, তাই লুৎফুন্নেসার এই অবাঙালিসুলভ ফিল্মিক কৌশলটি পাশ্চাত্য ঘরানার বলেই মনে হয়। এই প্রসঙ্গে এটিও বলে নিই যে উপন্যাসটিতে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ঘোড়ার ব্যবহারও দেখানো হয়েছে। বস্তুত ইলিয়াস বিদেশ পাড়ি দেবার সময়ও একটি বাদামি রঙের মর্দা ঘোড়া রেখে যায়। আর পানেছারবানু যখন এনজিও সংস্থা থেকে পনের হাজার টাকার ঋণ পায় (যে কথা আগে উল্লেখ করেছি), এবং সে টাকা দিয়ে আলি আক্কাসকে হাটে পাঠায় চুরি হওয়া বলদ দুইটার বদলে আরেক জোড়া বলদ কিনে আনতে, কিন্তু সে ঘটায় এক মহাকাণ্ড, সে বলদের বদলে কিনে নিয়ে আসে একটি সাদা মাদী ঘোড়া। কী উদ্দেশ্যে ? সে বলদের বদলে ঘোড়া দিয়ে হাল চাষ করবে। হাসনাত নেপথ্যে থেকে অথরিয়াল লাইসেন্স অর্থাৎ লেখকের সর্বগমনতা নিয়ে (প্রায়শই লেখক এই ক্ষেত্রে ‘আমরা’ সর্বনাম ব্যবহার করেছেন, যেমন ‘আমরা এখন জানব’ ইত্যাদি।) জানান যে আগে বাংলাদেশে ঘোড়া দিয়ে ক্ষেত চাষ করার রেওয়াজ ছিল। কিন্তু যে কারণে আমি এই প্রসঙ্গটা এখানে আলোচনার জন্য নিয়ে আসলাম, সেটি হলো ঘোড়ার ট্রিটমেন্ট পুরোটাই, যাঁরা ওয়েস্টার্ন কিংবা স্প্যাগেট্টি ওয়েস্টার্ন ফিল্ম দেখতে অভ্যস্ত তাঁরা জানবেন যে প্রশিক্ষিত ঘোড়াকে কীভাবে টোকা দিলে ঘোড়া দৌড়ে অনভিপ্রেত জায়গা থেকে চলে যায়, যেটি উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে ইলিয়াসের ডোঙায় করে সে¦চ্ছায় মরণের সময় সে ঘোড়াকে যেভাবে টোকা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় সেখানে ফুটে ওঠে, মনে হয় যেন পরিষ্কার একটা ওয়েস্টার্ন ছবির দৃশ্য দেখছি।  

এবং হাসনাতের কৃতিত্ব হচ্ছে পশ্চিমা ফিল্মিক কৌশলগুলো তাঁর উপন্যাসের কাঠামোয় অন্তর্লীন করে নেওয়া। সেই ছোট্ট ‘ভূমিকা’য় হাসনাত বলেছেন যে অডিসিউস যেমন একটির পর একটি প্রতিবন্ধকতার বিপক্ষে বিজয়ী হয়ে তাঁর অভিযাত্রাকে সাফল্যমণ্ডিত করেছিল, তেমনি ইলিয়াসও সীমান্ত পার হওয়া মাত্রই বিপদের পর বিপদে পড়তে থাকে। এবং সবগুলোই প্রাণসংহারী অভিজ্ঞতা। নকশালীদের হাতে পড়ে প্রথমে (এখানে কালানুগতা ও কালানুক্রমতা একটি বিষয়, কারণ নকশালী বিপ্লব ষাট-সত্তর দশকের ঘটনা, আর উপন্যাসটির কালিক প্রেক্ষাপট একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকঅবশ্য গল্পের কাঠামোকে এই অনৈতিহাসিকতা দুর্বল করেনি), তারপর পড়ে মধ্যপ্রদেশে ফুলন দেবীর মতো এক নারী-সর্দারনির হাতেযে কি না বন্দিদের মধ্যে ইলিয়াসকে বেছে নেয় তার শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য, এবং প্রতি রাতেই তার ওপর চালায় স্যাডিস্টিক আচরণ; তারপর পাকিস্তানের লাহোরে গিয়ে পড়ে আবার বিপদে; আবারও বিপদে পড়ে আফগানিস্তানের বাগরাম শহরের কনেসেন্ট্রশন ক্যাম্পে আমেরিকান সৈন্যদের হাতে, সেখান থেকে কোনোভাবে রক্ষা পেলেও ইরানের ধূ ধূ মরুভূমি রেগিস্তান দিয়ে পার হবার সময় তাদের বাহন ট্রাকটি খারাপ হয়ে গেলে প্রচণ্ড সূর্যালোকে প্রাণ হারানোর উপক্রম হয়। আর ইরাকে যখন বন্দি হয় তারা, তখন আরেকটি পশ্চিমা ফিল্মি কায়দায় দেখা যায় ইরাকি কারা প্রহরীদল, আমেরিকান প্রহরীদল থেকে এই ফেরারি শরণার্থীদের লুকিয়ে রাখছেটাকার লোভে। এরপর তুরস্ক, এবং এর পর গ্রিস। গ্রিসে গিয়ে ইলিয়াস কি তার অভীষ্ট কর্ম পেল ? না, পেল বরঞ্চ কারাজীবন। আবার ফিল্মি কায়দায় দেখা যায় কারাগারের প্রহরীদলযারা ছিল সবাই পুরুষ, তাদেরকে সম্পূর্ণ বদলে নারী প্রহরী দলে সুসজ্জিত করা হয়েছে। কারণ ? কারণ হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন রাষ্ট্রীয় সমস্ত ক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত হয়েছে।

গ্রিস! কিন্তু তখন ইলিয়াসের সঙ্গে বেরিয়ে আসা বারোজনই এই বিশাল ভ্রমণের জায়গায় জায়গায় মৃত্যু বা নিরুদ্দেশের মাধ্যমে লোপ পেয়েছে, বাকি ছিল তারা চারজন। কিন্তু গ্রিসে ইলিয়াস টিকতে পারে না, বরঞ্চ ডিপোর্টেড বা দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হয়। প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হয়, হাসনাত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ইলিয়াসের ভাগ্যান্বেষণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক রুট দৃশ্যায়িত করেছেন। এবং বাস্তবে অবৈধভাবে অভিভাসনে ইচ্ছুক শরণার্থীদের দুর্ঘটনায় পতিত হবার বিভিন্ন বিবরণ প্রচারমাধ্যমে সর্বক্ষণ আসে। এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল যখন ভূমধ্যসাগরে নৌকাতে ৩৯ দিন ভাসমানরত একটি শরণার্থী দলে বহু বাংলাদেশি ছিল যাদের অনেকে মারা যায়। যেখানে ক্ষুধায় একে অপরের মাংস পর্যন্ত ভক্ষণ করে তারা কেউ কেউ ক্যানিব্যালিস্টে রূপান্তরিত হয়। সে যাত্রা থেকে উদ্ধার পাওয়া একজন যুবক দেশে ফেরত এলে একটি বিশ^বিদ্যালয়ে তার সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা হয় তরুণ শিক্ষার্থী সমাজের সঙ্গে। তাকে যখন এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করা হয় যে সে আবার এই ধরনের বিপদসংকুল অভিযান নেবে কি না। সে এক মুহূর্তও না ভেবে বলে যে সে আবার যাবে।

হাসনাতের উপন্যাসটি ২২২ পৃষ্ঠার, আর ইলিয়াসের দেশে প্রত্যাবর্তন হয় ১৭৫ পৃষ্ঠায়। তা হলে বাকি প্রায় ৫০ পৃষ্ঠায় পাঠকের হয়তো আশা থাকবে যে পানেছারবানু আর ইলিয়াস সুখের দাম্পত্য জীবন যাপন করবে। না, হাসনাত লক্ষ্যণীয়ভাবে এখানে ওস্তাদি দেখিয়েছেন, কারণ সে আশায় গুড়েবালি।

ব্যাপারটি দেখা যাক।  

অডিসিউস ফেরত এসেছিল পেনেলোপির কাছে বিশ বছর পর। আর পানেছারবানুর কাছে ইলিয়াস ফেরত আসে বিশ মাস পরে। একটা ঘন ড্রামা তৈরি হচ্ছে এখানটাতে: (উদ্ধৃতি দিই)

লোকটি বড়ঘরের দাওয়ায় উঠে আসে লাফ দিয়ে। জোরে জোরে ডাকে, পানেছার। পানেছার। আমি আয়িছি।

বিশ মাস পর। বিশ মাস পর। তার কথা শুনে ভাবল পানেছার।

কণ্ঠস্বর শুনে তার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। বুকের ভেতর জেগে ওঠে এলোমেলো ঝড়। বুক কেঁপে ওঠে দ্রিমি দ্রিমি শব্দে। উথাল-পাথাল হাওয়া বয় মনে। সে দরজার কাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করে। পারে না। ধীরে ধীরে এলিয়ে পড়ে, যেন মূর্ছা যাবে। মেঝেতে পড়ে যাবার আগে সবল দুটি বাহু তাকে জড়িয়ে টেনে রাখে ওপরে। তার ঘোমটা খোলা মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, পানেছার আমি আয়িছি। দ্যাহো চোখ মেলি, আমি আয়িছি। (পৃ. ১৭৫)

পাঠকের বুক রোম্যান্টিক উত্তাপে ভরে উঠল, হ্যাঁ, এবার আর রোমিও- জুলিয়েটের বিচ্ছেদের গল্প হবে না, হবে হার্মিয়া- লাইস্যান্ডারের  মিলন কেচ্ছা।

কিন্তু না হাসনাত যে উপন্যাসটি লিখেছেন সেটির কাঠামো সামাজিক অন্ধতাকে নগ্ন করার প্রচেষ্টায় নিবদ্ধ। এতক্ষণ পর্যন্ত লোভাতুর মুরব্বিদের যে ফার্সিক্যাল বা ভাঁড়ামি আমরা সহ্য করেছি, সেটি দেখা যাচ্ছেইলিয়াসের প্রত্যাবর্তনের পরএকটি মূল বিনষ্ট মূল্যবোধের সঙ্গে সমন্বিত হয়েছে, যেটি উত্তরাধুনিক সাংস্কৃতিক পাঠে পুরুষতান্ত্রিকতা হিসেবে পরিচিত। ইলিয়াস বাঙালি সমাজের শতকরা নিরানব্বই জন পুরুষ নামক আস্ফালনকারী শিশ্ন- চেতনাধারী একটি গোষ্ঠী, যারা একান্তভাবে নারীবিদ্বেষী একটি বানোয়াট ধর্মীয় ও সামাজিক চেতনায় সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন থাকে এবং যে অভিব্যক্তির প্রকৃষ্ট প্রতিফলন হয় নারীকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে অবদমিত করে রাখার মধ্যে কিংবা তাকে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত রাখার মধ্যে, সেই মূঢ় পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠীরই আসলে একজন সম্মুখবর্তী প্রতিনিধি হচ্ছে ইলিয়াস। তখন আমরা বুঝতে পারি, আগে যে ইলিয়াসের অনুপস্থিতির সময় এই ভাঁড় মুরব্বিগুলো ইলিয়াসের/পানেছারবানুর ছাগল খেয়েছিল, গরু চুরি করেছিল, করেছিল সব্জি চুরিএগুলো শুধু ভাঁড়ামি ছিল না, ছিল অরক্ষিত নারী  যে সমাজে কত অসহায় তারই প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ। আর ইলিয়াস, সে কোথায় না পানেছারবানুর ত্যাগের মর্ম বুঝবে, বরঞ্চ ঐ ভাঁড় মুরব্বিগুলোর কথা শুনে সে সালিশি ডাকে যেখান থেকে পানেছারবানুর ওপর এই নির্মম সিদ্ধান্ত নেমে আসে যে সে যে এনজিওর ছেলেগুলোর সঙ্গে রসকষে মেতেছিল এবং গ্রামের মুরব্বিদের বারণ শোনেনি, তার ফলে সে কুলটা নারীতে পরিণত হয়েছে, এবং তাকে তাই অসতী নারীর কালিমা নিয়ে গ্রাম ছাড়তে হবে (অনেকের এই জায়গায় নাথানিয়েল হর্থনের উপন্যাস দ্য স্কারলেট লেটার-এর নায়িকা হেস্টার প্রিনের ওপর আরোপিত দণ্ডের কথা মনে পড়তে পারে। কিংবা শার্লি জ্যাকসনের গল্প দ্য লটারির কথা, যেখানে মেরি হাচিনসনের ওপর আরও নিদারুণ দণ্ড নেমে আসে।) বস্তুত আদম ব্যবসায়ী কুদরতউল্লাহ যখন ইলিয়াসকে বলে যে, ‘মন খারাপ করে এইডা ঠিক। আবার পরিবার সম্বন্ধে যা হুনিছো তা যাচাই করতি হবি। দেখতি হবি হেইসব কথা হাচা না মিছা।’ ইলিয়াস প্রত্যুত্তরে বলে, ‘আবার আপনে একই কথা কতিছেন। আমি বলি, হগগলে মিছা কতি পারে না।’ তখন কুদরতউল্লাহ যোগ করে, ‘আমিও কয়িছি, এখনও কই, পারে। পারে। একই স্বার্থ আর উদ্দেশ্য থাকলে পারে।’ (পৃ. ২১১)।

পানেছারবানুকে অবিশ^াস করে ইলিয়াস আসলে ওথেলোর মতো বিভ্রান্তিতে পড়েছে। ওথেলো ইয়াগোকে বলছে, তুমি যে বলছ দেসদেমোনা পরপুরুষগমন করছে, ক্যাসিওকে দেহ দিয়েছে তার প্রমাণ দাও। ইয়াগো বলে আমি চাক্ষুষ প্রমাণ কীভাবে দেব, কেউ কি দৃশ্যমানভাবে রমণক্রীয়া করে, বরঞ্চ আমি আপনাকে ‘ডোর অব ট্রুথ’ বা সত্যের দরজার কাছে নিয়ে যেতে পারব, যেখান থেকে আপনাকে অনুমান করে নিতে হবে যে দেসদেমোনা আপনার প্রতি অসৎ ছিল। ওথেলো আহাম্মক বুঝতে পারে না যে ‘ডোর অব ট্রুথ’ আর ‘ট্রুথের’ মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। ঠিক সেরকম ইলিয়াস আহাম্মক বুঝতে পারে না যে এনজিওর কর্মীগুলোর সঙ্গে পানেছারবানুর সংযোগটি নিতান্তই ব্যবসায়িক সম্পর্ক। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় যেহেতু পুরুষের জন্য অবারিত অধিকার স্বীকার করে নিয়েছে নারী নির্যাতন ও নিপীড়নসহ বিভিন্ন রকম উৎপীড়নের ওপর, সেজন্য নারী মাত্রই আমাদের চোখে বিশ^াসঘাতিনী, স্বামীর আড়ালে পরকীয়ায় মত্ত হতে পারে এমনতরো জীব। হাসনাত এই জায়গাটিতে পুরোপুরি অবজেক্টিভ, বলা যায় নির্মমভাবে সমাজের এই নির্মমতা তুলে ধরেছেন ইলিয়াসের এই অন্ধ আচরণের মাধ্যমে। এই অন্ধতা নকশীকাঁথা বুননের চেয়েও অনেক জটিল, তাই দেখা যায় ইলিয়াসকে এই অন্ধতা থেকে ফেরাতে পারে না কুদরতউল্লাহ, আলি আক্কাস, স্বয়ং পানেছারবানু এবং পরিশেষে ইলিয়াসের মা লুৎফুন্নেছা। কিন্তু ইলিয়াস তার ভুলটা বুঝতে পারে যখন সে শয়তান মুরব্বিগুলোর কথোপকথন আড়ি পেতে শুনতে পায়, যেখানে তারা বলছে যে ‘ইলিয়াসরে যে এত সহজে বোঝান যাবি, লাইনে আনন যাবি আশা করি নাই কেউ।’ (পৃ. ২১৩)

ইলিয়াস ভুল বুঝতে পেরে ঘোড়া ছুটিয়ে উপজেলার শহরে যায়, সেখানে এনজিওর অফিসের আওতায় মহিলাকর্মী নিয়ে দায়িত্বে ব্যস্ত পানেছারবানুকে এক পলক দূর থেকে দেখে আবার ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে আসে সে জলাশয়ের কাছে যেখানে ডোঙা চালিয়ে বিলের গভীরে গিয়ে সে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দেবে। ইলিয়াসের এইরূপ আচরণের ব্যাখ্যা হাসনাত পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, যার একটা ব্যাখ্যা আমি দিচ্ছি এ রকম যে যেহেতু পানেছারবানু এক ধরনের অর্থনৈতিক মুক্তি পেয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে, তাই ইলিয়াসের মধ্যে এই বোধোদয় হয়ে গেল যে পানেছারবানুকে আবার ফিরিয়ে এনে সে পুরুতান্ত্রিক শৃঙ্খলের মধ্যে আবদ্ধ করলে, তার ক্ষতিই করা হবে। এই বোধোদয় হচ্ছে চরিত্র হিসেবে ইলিয়াসের উত্তরণ। তাই সে সলিলসমাধি মেনে নিয়ে পানেছারবানুকে মুক্তি দিয়ে দিল, আর নিজের জীবন থেকে নিজেই নিল মুক্তি।

অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিকতার ওপর একটি বিজয়ধ্বজা ওড়ালেন নারীবাদী পানেছারবানু তথা হাসনাত আবদুল হাই।

এখানে একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রশ্ন গুরুত্ব পাবে। সেটি হলো পানেছারবানুর স্বাবলম্বী হওয়ার অর্থ হলো যে স্বামীর (বা গোঁড়া স্বামীর) সংসার ছাড়লে নারী স্বাবলম্বী হবে। এটা নিয়ে হয়তো কোনো তর্ক নেই বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটের দোলাচলে। কিন্তু পানেছারবানুর এই মুক্তিটি এলো এনজিওর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। এখন এনজিওর উদ্দেশ্য ও কর্মপরিধি নিয়ে যেসব বিতর্ক আছে, হাসনাত সেগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে এনজিওকে সামাজিক সমস্যা বা নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। আমার এতে ব্যক্তিগতভাবে কোনো আপত্তি নেই। তবে, অনেক পাঠকের মনে এটা প্রশ্ন তুলবে।

পীর সাহেবের পাশর্^ চরিত্রটি একজন ভালো পীরের চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে, যে নাকি একটি হরিণের বদলে ইলিয়াসকে বাদামী ঘোড়াটি  দিয়েছিল। কিন্তু আলি আক্কাসের চরিত্রটি দাঁড়ায়নি। তার বয়স বলা হয়েছে পনের/ষোলো, অথচ উপন্যাসে সব জায়গায় মুরব্বিরা তাকে নাবাল হিসেবে দেখছে, আর সে পড়ে স্কুলের নবম দশম শ্রেণিতে এবং সে তার মায়ের ওপর মুরব্বিদের হ্যাংলামির যথেষ্ট প্রতিবাদও করে, পীরের দরবারের বড় ফটকের কাছে সে ইসহাক মিঞার সঙ্গে গরু-চুরি নিয়ে মারামারিও করে এবং ইলিয়াস তাকে পানেছারবানুর বিষয়ে তর্ক উঠলে ট্যাঁটা নিয়ে মারতে গেলে সে বাপকে ঠেকিয়েও দেয়। অর্থাৎ সে একজন উঠতি তাগড়া গ্রাম্য কিশোর, যার প্রতিবাদী মনোভাব শরীরের ভাষায় ব্যক্ত হতে সময় নেয় না। ঠিক আছে। কিন্তু সেগল্পের কাঠামোর প্রয়োজনেই হয়তোবারবার তার মায়ের কাছে আবদার করে বানেছার পরীর গল্প শুনতে এবং প্রায় তারমায়ের সঙ্গে একই বিছানায় সে ঘুমাতে যায় মা-কে জড়িয়ে ধরে। ঠিক মেলে না।

হাসনাতের এই উপন্যাস থেকে পরম পাওনা হলো দক্ষিণাঞ্চলের কোনো একটি জেলার আঞ্চলিক ভাষার চমৎকার ব্যবহার। এত নিটোল এবং সম্পূর্ণ। দারুণ সাফল্য। আর হাসনাতের দুর্বলতা হলো চরিত্র চিত্রণে মনোজগত বর্ণনার ক্ষেত্রে তার পাঠককে ইনভলব করানোর ক্ষমতার অভাব। একটু যেন দূর থেকে তাঁর অবলোকনের ভঙ্গি। ভাষাটা তাই কামড় দিয়ে ওঠে না, মনের ভিতরে ঢুকে আইঢাই করে না। এটি সম্ভবত এজন্য হয়েছে যে কাঠামোকে ঠিক রেখেছেন তিনি, কিন্তু ভিতরের বিষয়াবলিতে মানুষের আবেগের নানারকম স্তরের মধ্যে ভাবনার আসা-যাওয়ার বর্ণনায় একেবারেই শিথিল তাঁর ভাষা। তবে এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উপন্যাসটি দারুণ একটি উতরোনো উপন্যাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares