বুড়ো বন্দুক : মূল : মো ইয়ান

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা অনুবাদ : ছন্দা মাহবুব
[মো ইয়ান (Mo Yan)-এর জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, চীনের শানডং এলাকার গাওমি গ্রামে। চীনের সমসাময়িক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হিসেবে পরিচিত। তাঁর সাহিত্য লোককথা, ইতিহাস ও আধুনিক জীবনের উপাদান নির্ভর। লেখায় হ্যালুসিনেটরি রিয়ালিজম তৈরি করার জন্য বিখ্যাত। জাদুবাস্তবতার সেই চিত্র কখনও বিভ্রান্তিমূলক, কখনও স্বপ্নের মতো। সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে ২০১২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। মো ইয়ানের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে Red Sorghum, The Republic of Wine ও Life and Death Are Wearing Me Out। তাঁর গল্পগুলোতে গ্রামীণ জীবন, ইতিহাস ও মানবিক বোধের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। ]তর্জনীবিহীন ডান হাত দিয়ে কাঁধের বন্দুকটা নামাতে নামাতে একফালি সোনালি রোদে আটকে গেল ছেলেটা। মসৃণ ছোট এক খাদের আড়ালে সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, থেমে থেমে ছলছল শব্দ ভেসে আসছে, যেন মাঠ থেকে জোয়ারের পানি নেমে যাছে। একই সাথে সুর মিলিয়ে ভেসে আসছে নির্জনতার বাতাস―কখনও বেশ জোরে, কখনও মৃদু। খুব সাবধানে সে হাতের বন্দুকটা মাটিতে রাখল, পয়সার মতো ছোপ ছোপ শ্যাওলাধরা মাটিতে। মাটির স্যাঁতস্যাঁতে ভাব দেখে বিরক্তও হলো মনে মনে। লম্বা নল আর মেহগনি কাঠের হাতলওয়ালা বন্দুকটা ভেজা মাটির ওপর আড়াআড়িভাবে পড়ে রইল। ঠিক পাশেই সন্ধ্যার পড়ন্ত সূর্যের আলোয় চোখে পড়ছিল ছোট্ট এক জোয়ার গাছ, যার গায়ে গজিয়ে উঠেছে নরম চিকন সোনালি অঙ্কুরের এক ঘন গুচ্ছ। সোনালি আলোয় সেগুলোর বিবর্ণ ছায়া পড়েছে গাঢ় কালো বন্দুকের নলে আর ঘন লাল হাতলে। কোমরে বেঁধে রাখা বারুদের শিঙাটি খুলে নিল সে, সাথে সাথে গায়ে চাপিয়ে রাখা কালো জ্যাকেটটাও। ছিপছিপে হাড়ের শরীর বেরিয়ে এল সাথে সাথে। কালো জ্যাকেটে বন্দুক আর বারুদে ভরা শিঙাটি জড়িয়ে মাটিতে রেখে তিন পা এগিয়ে গেল সে। খানিক ঝুঁকে রোদে পোড়া হাত প্রসারিত করে জোয়ারের বিশাল গুচ্ছ থেকে একটা আঁটি টেনে বের করল।
শরতের দাপুটে বন্যায় হাজার হাজার হেক্টর জমি পানিতে ডুবে সমুদ্রের মতো দেখাচ্ছে। পানির ওপর জোয়ারের লালচে শীষ মাথা উঁচু করে আছে। মেঠো ইঁদুরের দল পানিতে ভেসে থাকা জোয়ারের আঁটির উপর দিয়ে দ্রুত ছোটাছুটি করছে, যেন আকাশে উড়া পাখির ঝাঁক। ফসল কাটার সময় বন্যার পানি গাছের বুক সমান ছিল। চাষিরা নৌকা করে এসে শীষ তুলে নিয়ে গেছে। লাল পাখনার কার্প মাছ আর কালো পিঠের গ্রাস কার্প মাছ কোথা থেকে যেন উদয় হয়ে জোয়ারের সবুজ রঙের বায়বীয় মূলের মধ্যে দিয়ে ছোটাছুটি করত সময় সময়। মাঝে মাঝে দেখা যেত পান্না সবুজ মাছরাঙা ঢুস করে পানিতে মাথা ঢুকিয়ে ররুপালি ছোট্ট মাছ ঠোঁটে তুলে আনছে। আগস্ট মাস থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছিল, মাঠ-ঘাট সব কর্দমাক্ত করে। নিচু, ঢালু জমিতে অবশ্য তখনও পানি জমে ছিল। দেখে মনে হতো ছোট বড় নানা আকারের পুকুর। ফসল তোলা জোয়ারের কাণ্ডগুলোকে টেনে উঠানো যেত না; পানির মধ্যে দিয়ে টেনে রাস্তায় অথবা পুকুরের পাশের উঁচু জমিতে স্তূপ করা হয়েছিল।
নিচু সমতল ভূমিতে সূর্যের আলো ঝিকমিক করছে। মাইলের পর মাইল কোনও গ্রাম চোখে পড়ে না। রোদে ঝলমল করা পুকুরের পানিতে কাটা জোয়ারের ডালগুলো দাঁড়িয়ে আছে যেন একগুচ্ছ কাঠের দুর্গ। বিশাল জলরাশির সামনে, উষ্ণ সূর্যের বিপরীতে ছায়া ফেলে একটার পর একটা জোয়ারের আঁটি টেনে তুলে পুকুরের ধারে স্তূপ করে তুলল, যতক্ষণ পর্যন্ত না আধা মানুষ সমান উঁচু চৌকা একটা লুকানোর জায়গা তৈরি হলো। তারপর বন্দুকটা তুলে এনে লাফ দিয়ে সেই চৌকা লুকানোর জায়গায় বসে পড়ল। তার মাথা ঠিক ছুঁইছুঁই করে আছে চৌকানা লুকানো জায়গার ওপরের অংশে। বাইরে থেকে সে অদৃশ্য, কিন্তু ভেতর থেকে ফাঁকফোকর দিয়ে সে ঠিকই দেখতে পাচ্ছিল সামনের জলরাশি আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো বালির বাঁধ। সন্ধ্যার গোলাপি আকাশ আর নিচের খয়েরি মাটিও সে দেখতে পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আকাশ নিচে নেমে এসেছে। শেষ সূর্যের আলো পানির উপর লালচে আভার জলরং তৈরি করেছে। কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যার মধ্যে জলরাশিকে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত লাগছিল। ঝলমল করছে শেষ আলোয়। শেষ মুহূর্তের তীক্ষè আলোর ধারা পুকুরের চারপাশ ঘিরে নাচছে উষ্ণ চোখের পাপড়ির মতো। পুকুরের মাঝখানে বিবর্ণ নীলচে ছায়ার মতো বালুর বাঁধের ওপর একগুচ্ছ হলদে নলখাগড়া গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ঝিকিমিকি আলোয় ঘিরে থাকা বালুর বাঁধকে মনে হচ্ছে হালকা দুলছে পানির সাথে। পুকুরের চারপাশ ঘিরে আলো যতই ঝাপসা হয়ে আসছিল, পুকুরের পানি ততই উজ্জ্বল স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, বালুর বাঁধটা নড়ছে এই অনুভূতিটাও প্রকট হয়ে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল বালুর বাঁধটা তার দিকেই এগিয়ে আসছে, ক্রমশ আরও কাছে আসছে, আর একটু এগোলেই সে হয়তো লাফ দিয়ে বাঁধের উপরে উঠে পড়তে পারবে। এখনও তারা এসে পড়েনি বালুর বাঁধে, একটু অবাক হয়ে সে ফের তাকাল আকাশের দিকে, মনে মনে ভাবল, সময় হয়ে গেছে, যে কোনও সময় তারা চলে আসবে।
কোথা থেকে তারা আসে কোনও ধারণা ছিল না তার। সেদিন শ্রমিকেরা সারা বিকেল ধরে জোয়ারের ডাঁটা সরাতে ব্যস্ত ছিল। যখন তাদের দলনেতা কাজ থামানোর কথা বলেছিল, তখন সব লোক সারি বেঁধে তাদের বাসার পথ ধরেছিল। ডজন খানেক মানুষ, নিজের শরীরের লম্বা ছায়া দুলিয়ে ফিরে যাচ্ছিল তাদের পথে। সেই সময় এইখানে ছুটে এসেছিল সে, মূত্রত্যাগ করে নিজেকে হালকা করতে। হঠাৎ করেই তার চোখে পড়ে যায়। মনে হয়েছিল তার বুকে কেউ ঘুষি মেরেছে, এক মুহূর্তের জন্য হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে ফের চলতে শুরু করেছিল। সাদা বালির উপর নেমে আসা বন্য হাঁসের ঝাঁক তার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। গত দু সপ্তাহ ধরে রাতে সে নিয়মিত আসছে এখানে, জোয়ার গাছের গুচ্ছের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। সে খেয়াল করেছে প্রতি সন্ধ্যায় ঠিক এরকম সময়ে তারা জোরে ডাকতে ডাকতে আসে, যেন আকাশের অন্য কোনও পাড় থেকে আসছে। মাটিতে নামার আগে পুকুরে উপরে রাজকীয়ভাবে গোল হয়ে ওড়ে, যেন বিশাল এক সবজেটে ধূসর মেঘ এই খুলে যাচ্ছে, এই গুটিয়ে নিচ্ছে। সাদা বালুর বাঁধের ওপর যখন নেমে এসেছিল, পাশেই বসে ছিল সে। ছোট্ট একটু জায়গার মধ্যে একসাথে এত বন্য হাঁস কখনও দেখেনি এর আগে।
এখনও আসেনি হাঁসগুলি―কিন্তু এতক্ষণে তো আসার কথা! তাহলে কেন এখনও আসেনি নাকি আর আসবেই না ? অস্থির লাগছিল তার। এমনকি একসময় মনে হলো আগে যা দেখেছিল তা হয়তো কেবলই এক ভ্রম ছিল। এই জায়গায় সত্যিই এত বড় একটি বুনো হাঁসের ঝাঁক থাকতে পারে, এই কথা কখনই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না সে। গ্রামের মুরুব্বিদের মুখে প্রায়ই স্বর্গীয় হাঁসের গল্প শুনত, কিন্তু গল্পের হাঁসগুলো ছিল একেবারে ধবধবে সাদা। এই বুনো হাঁসের ঝাঁক সেরকম নয়। মাথা ও গলায় সুন্দর সবুজ পালক, গলার চারপাশে সাদা গোল, নীল আয়নার মতো ঝকঝকে ডানা―ওগুলো কি পুরুষ হাঁস, নাকি ? শরীর সোনালি-বাদামি, গা জুড়ে গাঢ় বাদামি ছোপ―ওগুলো কি তাহলে স্ত্রী হাঁস ?
ওগুলো যে স্বর্গীয় হাঁস নয়, তা মোটামুটি নিশ্চিত―কারণ বালুর উপরে ছোট ছোট সবুজ আর বাদামি পালক ফেলে গেছে। পালকগুলো দেখে মনে গভীর স্বস্তি এল, সে বসে পড়ল। মাটিতে রাখা জ্যাকেটটি তুলে ঝাঁকি দিয়ে খুলে ফেলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বন্দুক আর চকচকে বারুদভরা শিং। জোয়ারগাছের শুকনো ডাঁটার উপর বন্দুকটি শান্তভাবে রেখে দিল। বন্দুকের শরীরের গাঢ় লালচে রং ঝলমল করছে, প্রায় মরিচার রঙের মতো। এর আগে বহুবার লাল মরিচায় ছেয়ে গিয়েছিল বন্দুকটা, জায়গায় জায়গায় ধাতু ক্ষয়ে গর্ত আর দাগ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আর কোনও মরিচা নেই―সে সবটুকু ঘষে তুলে ফেলেছে। শীতনিদ্রায় থাকা কুণ্ডলী পাকানো সাপের মতো বন্দুকটা পড়ে আছে শান্তভাবে। মনে হচ্ছিল, যে কোনও মুহূর্তে জেগে উঠে আকাশে লাফ দেবে আর তার ইস্পাতের লেজ দিয়ে জোয়ারগাছের ডাঁটাগুলোকে আছাড় মারবে।
হাত বাড়িয়ে বন্দুকটি যখন ছুঁল, একটা বরফশীতল অনুভূতি প্রথমেই তার আঙুলের ডগা থেকে শিরশিরিয়ে ধীরে ধীরে বুকে ছড়িয়ে পড়ল। বেশ খানিকক্ষণ সেই কাঁপন অনুভব করল সে। সন্ধ্যার সূর্য ক্রমাগত আকার বদলাতে বদলাতে ডুবে যাচ্ছিল―গোল থেকে চ্যাপ্টা, তারপর আরও বিকৃত আকার, যেন আধা-তরল এক গোলক, মসৃণ ইস্পাতের উপর আছড়ে পড়ছে। নিচের দিকটা সোজা সরলরেখা, গোল বাঁকানো পিঠ যেন চরম টানটান অবস্থায়; শেষে ফেটে গিয়ে ফেনায়িত, বরফ ঠান্ডা লাল তরল চারদিকে গড়িয়ে পড়ল। লালচে সেই তরল ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকায় পানির উপর এক ধরনের তন্ময় নীরবতা নেমে এল। পানি যেখানে গভীর সেখানে ঘন লাল ঝোলের মতো লাগলেও উপরের অংশ স্ফটিকস্বচ্ছ আর চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলই রয়ে গিয়েছিল। হঠাৎই সে দেখতে পেল, শুকিয়ে যাওয়া লম্বা এক ঘাসের ডগায় সোনালি ছোপ এক ফড়িং ঝুলে আছে; তার ফোলা চোখ দুটি বেগুনি রত্নের মতো ঝলমল করছে। ঘুরছে কখনও বামে, কখনও ডানে―সাথে সাথে আলোও প্রতিসরিত হচ্ছে।
বন্দুকটি তুলে নিয়ে পায়ের উপর আড়াআড়ি করে রাখল। ঊরু আর পেটের সমকোণে বন্দুকের দেহটি পিছনের দিকে আর নলটি তার থুতনির নিচ দিয়ে ফ্যাকাসে ধূসর দক্ষিণের আকাশের দিকে উঁকি দিল। বারুদভরা শিংয়ের ঢাকনা খুলে পকেট থেকে একটি লম্বা, সরু মাপজোকের নল বের করে তাতে বারুদ ভরল। তারপর মেপে নেওয়া বারুদ বন্দুকের নলের ভেতর ঢেলে দিল। নল দিয়ে বারুদ নামার মসৃণ শব্দ মুখ দিয়েও প্রতিধ্বনিত হলো। এরপর ছোট একটি লোহার বাক্স থেকে অল্প কিছু লোহার ছররা গোলা তুলে বন্দুকের নলের মুখে ঢেলে দিল। নলের ভেতর থেকে লোহা নেমে যাওয়ার কর্কশ শব্দ শোনা গেল।
এবার সে নলের নিচ থেকে একটি লম্বা দণ্ড বের করে অমসৃণ প্রান্ত দিয়ে নলের ভেতরে বারুদের সঙ্গে ছররা মিশিয়ে ঠেসে নামাল। এমন সতর্কভাবে কাজটি করছিল যেন ঘুমে থাকা কোনও বাঘের ঘা চুলকে দিচ্ছে―স্নায়ুগুলো টানটান, হৃৎপিণ্ড ধকধক করছে। তৃতীয় দফায় নলে বারুদ আর মুঠো ছররা ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গেই এক তীব্র শীতলতা তাকে আঁকড়ে ধরল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঠান্ডা ঘাম। তুলা দিয়ে তৈরি ছিপি বের করে বন্দুকের মুখে ঢোকানোর সময় খেয়াল করল হাত কাঁপছে। প্রবল ক্ষুধা তার সারা শরীর অবশ করে দিচ্ছে, সারা শরীর ঢলে পড়তে চাইছে। দ্রুত মাটি থেকে ঘাসের একটি ডাঁটা ছিঁড়ে নিয়ে তাতে লেগে থাকা কাদা ঘষে পরিষ্কার করে মুখে পুরে চিবোতে শুরু করল। কিন্তু ক্ষুধা তাতে কমল না বরং আরও বেড়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই শোনা গেল জলাভূমির উপরে পাখির ডানায় বাতাসে শিস কাটার শব্দ। দ্রুত তাকে প্রস্তুতির চূড়ান্ত কাজটা শেষ করতে হবে―পারকাশন ক্যাপ লাগানো। হাতুড়ির মতো বেরিয়ে থাকা মাথাটি টেনে পেছনে নিল, সাথে সাথে বন্দুকের নলের সঙ্গে যুক্ত নিপল-আকৃতির একটি উঁচু অংশ দেখা গেল। সেই উঁচু অংশের উপর গোলাকার একটি খাঁজ, মাঝখানে অতি ক্ষুদ্র একটি ছিদ্র। খুব সাবধানে সোনালি রঙের পারকাশন ক্যাপের চারপাশের কয়েক স্তর কাগজ ছিঁড়ে সেটিকে খাঁজের ভেতর ঠিকমতো বসিয়ে দিল। পারকাশন ক্যাপের ভেতরে হলুদ বারুদ; হাতুড়ি সেটিতে আঘাত করামাত্রই তা বিস্ফোরিত হয়ে নলের ভেতরের বারুদে আগুন ধরিয়ে দেবে আর বন্দুকের মুখ থেকে আগুনের সাপের মতো এক শিখা লাফিয়ে বেরিয়ে আসবে―প্রথমে সরু, তারপর ধীরে ধীরে বড় হয়ে, শেষ পর্যন্ত বন্দুকটিকে একটা লোহার ঝাঁটার মতো বানিয়ে ফেলবে। এতদিন ধরে বন্দুকটা তাদের ছাদঘরের ঘন কালো কোণে লুকিয়েছিল যে, এটা কীভাবে কাজ করে সেটা বের করা রীতিমতো এক রহস্য উদ্ঘাটনের মতো বিষয় ছিল। দু দিন আগে, যখন বন্দুকটি নামিয়ে এনে এর গায়ের মরিচা ঘষে ঘষে পরিষ্কার করেছিল, তখন অবশ্য সে বেশ স্বচ্ছন্দই ছিল।
বুনো হাঁসগুলো এসে পড়েছে। প্রথমে তারা আকাশে প্রায় একশো মিটার উপরে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে চক্কর দিল। কখনও হু হু করে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আবার মুহূর্তেই ওপরে উঠে যাচ্ছে; কখনও একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে, তারপর আবার ছড়িয়ে পড়ছে―চারদিক থেকে ছুটে এসে লালচে হয়ে ওঠা ঝলমলে জলের উপর দিয়ে গা ঘেঁষে উড়ে যাচ্ছে।
সে হাঁটু গেড়ে বসল, নিঃশ্বাস আটকে, চোখ আটকে রইল বেগুনি আভায় ভরা একের পর এক বৃত্তের দিকে। ধীরে ধীরে সে জোয়ার গাছের ডাঁটার ফাঁক দিয়ে বন্দুকের নলটা এগিয়ে দিল; তার হৃৎপিণ্ড পাগলের মতো ধুকধুক করছে। বুনো হাঁসগুলো তখনও ক্রমাগত আকার বদলে যাওয়া বৃত্তে ঘুরছে, মনে হচ্ছিল, জলাভূমিটাই যেন তাদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। বেশ কয়েকবার সবুজ পালকের কয়েকটি পুরুষ হাঁস সোজা তার বন্দুকের নলের সামনে দিয়ে উড়ে গেল। তাদের ফ্যাকাসে সবুজ ঠোঁট আর কালো চতুর চোখের ঝিলিক বেশ ভালোই দেখতে পেল সে। ডুবন্ত সূর্য তখন আরও চওড়া ও আরও চ্যাপ্টা হয়ে উঠেছে; কিনারার কালচে রঙের মাঝে গলানো লোহার মতো চড়চড় শব্দে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটাচ্ছে চারিদিকে।
হঠাৎ হাঁসগুলো ডাকতে শুরু করল। পুরুষ হাঁসদের ‘কোয়াক কোয়াক কোয়াক’ ডাকের সঙ্গে মেয়ে হাঁসদের ‘কোয়াক কোয়াক কোয়াক’ ডাক মিলেমিশে এক ভয়ংকর কোলাহলে পরিণত হলো। সে বুঝতে পারল হাঁসগুলি এখনই নামতে যাচ্ছে। এতদিন ধরে, প্রায় বারো দিন ধরে খুব সূক্ষ্মভাবে তাদের আচরণ লক্ষ করার পর সে বুঝে গিয়েছিল, নামার ঠিক আগমুহূর্তে তারা এভাবে ডাক ছাড়ে। আকাশে প্রথমবার তাদের দেখার পর থেকে মাত্র কয়েক মুহূর্তই পার হয়েছে, অথচ তার মনে হচ্ছিল যেন অসীম দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে। পেটের ভেতরের তীব্র মোচড় আবার তাকে তার ক্ষুধার কথা মনে করিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত হাঁসগুলো নিচে নামতে শুরু করল। মাটির একেবারে কাছাকাছি এসে তারা তাদের বেগুনি পা সামনে ছড়িয়ে দিল আর ডানা দুই দিকে টানটান করে মেলে ধরল। পালকের পাখার মতো ফুলে উঠা তুষার-সাদা লেজ এমন বেগে মাটিতে আছড়ে পড়ল যে গতি থামাতে গিয়ে দু-এক কদম টলমল করে উঠল মাটিতে নামা হাঁসগুলো। কাদামাটিকে আর বাদামি লাগছে না, ঝলমলে পালকে অসংখ্য সূর্যের মতো ঝিকিমিকি আলো নিয়ে পুরো ঝাঁকটা এদিক-ওদিক হাঁটতে থাকল শেষ রোদ্দুরকে সাথে নিয়ে।
নিঃশব্দে বন্দুকটা কাঁধে তুলে নিয়ে ঘন হয়ে আসা হাঁসের ঝাঁকের দিকে নলের মুখ তাক করল। সূর্যের অর্ধেক অংশ যেন মিলিয়ে গেছে, বাকিটুকু দেখতে লাগছে অদ্ভুত, কিম্ভূত ধরনের। কিছু হাঁস মাটিতে বসে পড়েছে, কিছু দাঁড়িয়ে আছে, কেউ কেউ অল্প একটু উড়ে গিয়ে আবার নামছে। এখনই সময়―সে ভাবল, গুলি চালানো উচিত―কিন্তু গুলি করতে পারল না। ট্রিগারের উপর হাত বুলাতে বুলাতে হঠাৎ করেই সে নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা টের পেল। তীক্ষè এক ব্যথার অনুভূতির সাথে মনে পড়ল তর্জনীর কথা। মনে পড়ে গেল তর্জনীর উপরে দুটি গিঁট নেই, শুধু শেষের একটিই বাকি আছে। বুড়ো আঙুল আর মধ্যমার মাঝখানে বসে থাকা একটা গ্রন্থিল গাছের গুঁড়ির মতো।
মা যখন বাবার শেষকৃত্য শেষ করে ফিরলেন, তখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর। মার গায়ে শোকের পোশাক, সুতির সাদা গাউন, কোমরে শনের দড়ি বাঁধা, চুল খোলা। মার চোখের পাতা এতটাই ফুলে গিয়েছিল যে সেগুলো স্বচ্ছ মনে হচ্ছিল। চোখ দুটোর সরু ফাঁক দিয়ে দেখা যাছিল অশ্রুভেজা ধূসর চাহনি। মা তাকে ডেকে বলেছিলেন ‘দাসুও, এখানে এসো।’ ভয়ে ভয়ে কাছে গিয়েছিল সে।
মা তার হাত ধরে দুবার ঢোক গিললেন, গলা লম্বা করে যেন শক্ত কিছু গিলে ফেলার চেষ্টা করছেন। বললেন―‘দাসুও, তোর বাবা মরে গেছে, বুঝতে পারছিস ?’ মাথা নাড়ল সে, শুনতে পেল মা বলেই চলছেন―‘তোর বাবা মারা গেছে। কেউ মারা গেলে আর কখনও জীবিত ফিরতে পারে না, তুই কি সেটা বুঝতে পারিস ?’ খুব অবাক হয়ে মাকে দেখছিল, মা কথা বলার সময় সারাক্ষণই মাথা নাড়ছিল সে।
‘বাবা কীভাবে মারা গেছেন জানিস ?’ মা আবারও বলে চললেন, ‘তাকে এই বন্দুক দিয়ে গুলি করা হয়েছিল; এই বন্দুকটা তোর দাদির কাছ থেকে পাওয়া। কখনও ধরবি না এই বন্দুক। আমি এটা দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখব। প্রতিদিন চোখের সামনে দেখবি এই বন্দুক আর বাবার কথা মনে করবি আর কঠোরভাবে পড়াশোনা করবি, যাতে একটা ভালো জীবন পেয়ে যাস, পূর্বপুরুষদের জন্য কিছুটা কৃতিত্ব বয়ে আনতে পারিস।’ মায়ের কথা ঠিক কতটা বুঝতে পেরেছিল সে জানে না, তবু জোরে জোরে মাথা নাড়তেই থাকল।
ছাদের কোনায় বন্দুকটার ঝুলে থাকার কাহিনি এটাই। বছরের পর বছর চিমনির ধোঁয়ায় কালচে আর চকচকে হয়ে উঠেছিল। প্রতিদিন সে বন্দুকটাকে দেখত। পরে, সে যখন প্রথম শ্রেণি পেরিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠল, তখন মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছাদের কোনায় বন্দুকটার পাশেই একটি কেরোসিনের বাতি ঝুলিয়ে দিতেন, যাতে তার পড়ার জন্য যথেষ্ট আলো পাওয়া যায়।
বইয়ের পাতায় কালো অক্ষরগুলো দেখলেই মাথা ঘুরত তার। নিজের অজান্তেই বন্দুকটার কথা, এর পিছনের গল্পের কথা ভাবতে শুরু করত। নির্জন প্রান্তর থেকে আসা হাওয়া জানালার পর্দা গলে ঢুকে কেরোসিন বাতির শিখাটিকে যখন দোলাতো তখন মনে হতো কেরোসিনের এই শিখা যেন লেখার তুলি, আর এর মাথায় কালো ধোঁয়ার রেখা সুতার মতো দুলছে। যদিও বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো তার সমস্ত মনোযোগ পড়ায়, কিন্তু তার আসলে সব সময় বন্দুকটার কথাই মনে হতো। এমনকি কখনও কখনও তার মনে হতো, বন্দুক ক্লিক করার শব্দও সে শুনতে পাচ্ছে। তার অনুভূতিটাই ছিল সাপ দেখার মতো―তাকাতে ভয়ও লাগত আবার ইচ্ছেও করত। বন্দুকটা ঝুলে ছিল―নল নিচের দিকে, বাট উপরে, তার কালো দেহ থেকে এক বিষণ্ন আভা ছড়িয়ে পড়ত। বন্দুকটার ঠিক পাশেই ঝোলানো ছিল বারুদের শিঙা, পেঁচানো ফিতায় জড়াজড়ি করা সরু কোমরটা এসে ঠেকেছিল বাটের কাছে। লালচে―সোনালি রঙের শিঙা-মোটা দিকটা নিচের দিকে, চিকন দিকটা উপরে। অনেক উঁচুতে ঝোলানো ছিল বন্দুক আর বারুদের শিঙাটা। ঝুলন্ত এই যুগলকে কী যে সুন্দর দেখাতো! একটা প্রাচীন বন্দুক আর একটা প্রাচীন বারুদের শিঙা, প্রাচীন এক বাড়ির ছাদ কার্নিশে ঝুলে থাকার দৃশ্য সবসময়ই তার মনকে বেদনার্ত করে তুলত।
এক সন্ধ্যায় সে একটা উঁচু টুলে উঠে বন্দুক আর বারুদের শিঙাটা নামিয়ে ফেলল। কেরোসিন বাতির কাছে তুলে ধরে সে খুব সাবধানে দেখছিল। অসাড় বন্দুকের ভার তাকে বেদনার্ত করে তুলল। ঠিক সেই সময় মা ঢুকেছিলেন সেই ঘরে। মায়ের বয়স তখনও চল্লিশ হয়নি, অথচ তার চুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল। থমকে দাঁড়িয়ে মা জিজ্ঞেস করলেন―‘দাসুও, কী করছিস তুই ?’ দাসুও তখন বোকার মতো দাঁড়িয়ে―এক হাতে বন্দুক আরেক হাতে শিঙা।
‘তোর ক্লাস পরীক্ষার খবর কী ?’ মা জিজ্ঞেস করলেন।
‘নিচের দিক দিয়ে দ্বিতীয়।’ সে উত্তর দিয়েছিল।
‘অকম্মা কোথাকার, ঝুলিয়ে রাখ বন্দুক।’ মা বললেন
কেন জানি তার জেদ চেপে গিয়েছিল। সে জেদির মতো বলল―‘না, আমি খুন করতে যাব…’
মা ঘুরে ঠাস করে থাপ্পড় মেরেছিলেন তার গালে, কঠিন গলায় দাতে দাঁত চেপে বলেছিলেন, ‘ঝুলিয়ে রাখ বন্দুক। তোর একটাই কাজ এখন, পড়াশোনা করা। এটা যেন মাথায় থাকে।’ সে বাধ্য ছেলের মতো ছাদের কার্নিশে ফের বন্দুকটা ঝুলিয়ে রেখেছিল। মা চুলার কাছে এগিয়ে গিয়ে একটা দা বের করে আনলেন, শান্তভাবে বললেন ‘তর্জনী আঙুলটা বের কর।’ সে বাধ্য ছেলের মতো তার তর্জনী এগিয়ে দিল। মা একটা কাঠের পাটাতনে তার আঙুলটা চেপে ধরলেন, ভয়ে দাসুও শরীর মোচড়াতে শুরু করল। মা তাকে ধমকে উঠলেন―‘নড়বি না।’ তারপর শান্তভাবে বললেন, ‘মনে রাখিস, আর কখনও এই বন্দুক যেন ছোঁয়া না হয়।’ মা দাটা উপরে তুললেন…শীতল ইস্পাতের ঝলকানির মতো একটা তীব্র তীক্ষè ঝাঁকুনি তার আঙুলের ডগা থেকে কাঁধ পর্যন্ত বয়ে গেল। ব্যথায় মেরুদণ্ড বেঁকে গেল। কাঁটা আঙুল থেকে রক্তের ধারা নেমে এল। মা যখন চুন নিয়ে এসে তার কাটা আঙুলের ক্ষতে প্রলেপ দিচ্ছিলেন তখন চোখ দিয়ে অবিরাম পানি পড়ছিল, মা কাঁদছিলেন নীরবে।
তর্জনীর টিকে থাকা একমাত্র নিঃসঙ্গ গিঁটটাকে দেখতে দেখতে তার নাক কুঁচকে উঠল। কতদিন পার হয়ে গেছে সে মাংস খায়নি ? ঠিকঠাক মতো মনে পড়ছে না, কিন্তু ছোটবেলায় খাওয়া মাংসের কথা তার ঠিকমতোই মনে আছে। মনে হচ্ছিল সে জীবনে কখনওই পেট ভরে মাংস খায়নি। প্রথম যখন সে এই মোটা তাজা বুনো হাঁসগুলি দেখেছিল, তার মাথায় শুধু মাংসের কথাই এসেছিল। এরপরেই মাথায় এসেছিল বন্দুকটার কথা। মায়ের আঙুল কেটে ফেলার কথা মনে হওয়ার সাথে সাথেই তার শরীর ভয়ে কাঁটা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, গতকাল বিকেলে, সে বন্দুকটা নামিয়েই ফেলল। মাকড়শার জালে জড়াজড়ি বন্দুকটার গায়ে পুরু স্তরের ধুলা জমে ছিল। পোকায় খাওয়া চামড়ার ফিতাটা ধরা মাত্র ছিঁড়ে গিয়েছিল। কিন্তু শিঙাটায় যথেষ্ট পরিমাণ বারুদ রয়ে গিয়েছিল। যখন সে শিঙা থেকে বারুদ ঢালছিল শুকানোর জন্য, সে খেয়াল করল ভেতরে একটা সোনালি পারকাশন ক্যাপ। নিঃসঙ্গ পারকাশন ক্যাপটি সে হাতে তুলে নিয়েছিল, তার হাত কাঁপছিল। প্রথমেই তার মনে পড়েছিল তার বাবার কথা। তার মনে হলো সে কতটা ভাগ্যবান―কারণ আজকের দিনে এই ধরনের পারকাশন ক্যাপ কই বা পাওয়া যেত ? মনে মনে ভাবল―আমার কাছে এক পয়সাও নেই; থাকলেও তো মাংস জুটত না। আমি বোকা; বোকা না হলে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেতাম না, আর পেলেও, কীই-বা হতো। নিজের আঙুলের কাটা অংশটার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। তার মা শুধু আঙুলের ওপরের অংশটুকু কেটেছিলেন, কিন্তু পরে ক্ষতটায় পচন ধরে গেলে আরও খানিকটা কেটে ফেলতে হয়েছিল―এই কারণেই এখন আঙুলটার এই অবস্থা। এসব ভাবতে ভাবতেই ভেতরের রাগ-ঘৃণা ফের ফুঁসে উঠল। রাগ উঠল এই বন্য হাঁসগুলোর উপর, তাদের ঝকঝকে সুন্দর পালকের উপর। ‘আমি তোদের মেরে ফেলব, সব কটাকেই মেরে ফেলব, যদি এটা জীবনের শেষ কাজও হয় তারপরেও! তারপর তোদের খেয়ে ফেলব, হাড়গুলো চিবিয়ে চুরচুর করে খাব।’ তার কল্পনায় কুড়কুড়ে হাড়গুলো সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল। মধ্যম আঙুলটা ট্রিগার গার্ডের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
তবু সে ট্রিগার টানল না। কারণ ঠিক তখনই আকাশ থেকে আরেক দল বন্য হাঁস ঘুরন্ত রঙিন মেঘের মতো পাক খেতে খেতে নেমে এল। বালির বাঁধের ওপরে থাকা হাঁসগুলো হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল। কেউ পা দিয়ে মাটি ঠুকছে, কেউ ঝটপট উড়ে যাচ্ছে―ঠিক বোঝা যাচ্ছে না তারা খুশি হয়ে সঙ্গীদের স্বাগত জানাচ্ছে, না কি রাগ প্রকাশ করছে। বিরক্ত দৃষ্টিতে পাখিদের তোলপাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে বন্দুকটা সরিয়ে নিল। সূর্যকে দেখতে তখন লাগছিল মিষ্টি আলুর মতো চিকন। গাঢ় সবুজ আর উজ্জ্বল বেগুনি রশ্মি ঝলমল করছিল। হাঁসগুলোর এই হুটোপুটিতে সোনালি বৃত্ত-ঘেরা ফড়িংটি চমকে উঠে উড়ে গেল। পানির খুব কাছ দিয়ে উড়ে গিয়ে বসলো নতুন জায়গায়। ছয়টি পা শক্ত করে একটি জোয়ার পাতাকে আঁকড়ে ধরল আর লম্বা সোনালি-বৃত্ত-ঘেরা লেজটা ঝুলে রইল নিচে। সে ফড়িংটির চোখে আলোর মতো জ্বলজ্বলে দুটি উজ্জ্বল দানা দেখতে পেল।
বন্য হাঁসের ঝাঁকটি ফের জড়ো হতে শুরু করেছে, ধীরে ধীরে তাদের হুটোপুটি শান্ত হয়ে আসছে। পানির উপরে তাদের পায়ের থাবায় গোল ঢেউ তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দূরে, আর যেখানে ঢেউগুলো একটা অন্যটার সাথে ধাক্কা খাচ্ছে, সেখানে ফের তৈরি হচ্ছে নতুন আরেক ঢেউ।
দুটি হাঁসের ঝাঁক এখন এক হয়ে গেছে। যদি আমার কাছে একটা বড় জাল থাকত, সে ভাবল, তাহলে হুট করে ওদের উপর ছুড়ে দিতে পারতাম কিন্তু সে জানত, তার কাছে কোনও জাল নেই―আছে শুধু একটি বন্দুক। খুব সাবধানে সে পারকাশন ক্যাপটি খুলে নিল, তুলোর ছিপিটা বের করল, তারপর নলের ভেতরে আরও তিন মাপ বারুদ আর তিন মাপ ছররা ঢেলে দিল। আবার সে হাঁসগুলোর দিকে নিশানা করল―আদিম এক রক্তনেশার পিপাসা তার মনকে ছেয়ে ফেলেছে। এত বিশাল হাঁসের ঝাঁক, আর এত সরু বন্দুকের নল… নিঃশব্দে একটু পিছিয়ে গিয়ে নলের ভেতরে আরও দুই মাপের বারুদ ঢেলে দিল, তারপর আবার মুখটা বন্ধ করল। এখন নলটা প্রায় পূর্ণ; বন্দুকটা তুলতেই সে টের পেল, সেটি কতটা ভারী হয়ে গেছে।
কাঁপতে থাকা মধ্যমা দিয়ে ট্রিগারের উপর চাপ দিল―গুলি ছোড়ার ঠিক মোক্ষম মুহূর্তে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে।
হাতুড়ির মাথা সোনালি পারকাশন ক্যাপে ক্লিক করে আঘাত করল, কিন্তু গুলির শব্দ হলো না। পানির ওপরের গোল গোল ঢেউগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে যেন। আকাশ আর দুনিয়ার মাঝে ঝুলে থাকা বেগুনি বাষ্প আগের চেয়ে আরও ঘন হয়ে উঠছে, লাল আভা দ্রুত ম্লান হয়ে যাচ্ছিল, পানির ওপরের উজ্জ্বলতা এখনও স্পষ্ট, তবে ধীরে ধীরে আরও গাঢ় রং ধারণ করছে। একসাথে ঘন হয়ে থাকা হাঁসগুলিকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। মসৃণ, উষ্ণ, পরিষ্কার, নরম, পালক ঝলমল করছিল। তাদের চতুর চোখ খুব তাচ্ছিল্যের সাথে বন্দুকের নলের দিকে তাকিয়ে দেখল, যেন তার অক্ষমতাকে উপহাস করছে। পারকাশন ক্যাপটা ফের বের করল সে। ফায়ারিং প্লেটে হাতুড়ির আঘাতের চিহ্ন পড়েছে, তাকিয়ে দেখল সে। হাঁসের শরীরের বোটকা গন্ধওয়ালা বাতাস তাদের ঘন ঝাঁকের উপর দিয়ে ভেসে এল তার দিকে। হাঁসেদের শরীর একে অপরের সাথে ঘষা লেগে নরম, মসৃণ এক শব্দ বের হয়ে আসছে। সে পারকাশন ক্যাপটা আবার লাগাল। বিশ্বাস হচ্ছিল না, এমনটা ঘটতে পারে। বাবা, দাদি―এই বন্দুক কি একবারের চেষ্টাতেই তাদের জন্য গুলি বের করেনি ? বাবা মারা গেছেন দশ বছর বা তারও বেশি সময় আগে, কিন্তু তার গল্প কি এখনও গ্রামে মুখে মুখে ফেরে না ? খুব লম্বা একজন লোকের কথা তার মনে পড়ে―মুখে ব্রনের গর্ত ভরা আর হলদেটে গোঁফ।
বাবার গল্প সারা গ্রামজুড়ে এতবার বলা হয়েছে, এতবার বলা হয়েছে যে তিনি মোটামুটি কিংবদন্তির পর্যায়ে চলে গেছেন গ্রামবাসীর কাছে। চোখ বন্ধ করলেই খুঁটিনাটিসহ পুরো ঘটনাই তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। শুরুটা হয়েছিল মাঠে যাওয়ার ধূসর মাটির রাস্তায়। কাঁধে ভারী কাঠের বীজ-বপন যন্ত্র নিয়ে বাবা যাচ্ছিলেন মাঠের দিকে জোয়ার বীজ বুনার জন্য, সাথে ছিল একদল একগুঁয়ে কৃষক। রাস্তার দু পাশে সারি সারি তুঁতগাছ, তামার মুদ্রার মতো বড় বড় পাতাগুলো দুই দিকে প্রসারিত হয়ে ছিল। রাস্তার ধারে টাটকা সবুজ, পাখিদের কিচিরমিচির, নালার গভীর পানি আর ফ্যাকাশে হলুদ নলখাগড়ার ঝোপে ব্যাঙের ডিমের ঝিলমিলি ঝাঁক মিলে সব কিছু সুন্দর আর স্বাভাবিক ছিল।
বীজ রোপণ যন্ত্রের ভারে বাবা হাঁপাচ্ছিলেন জোরে জোরে―ঠিক তখনই হঠাৎ কোথা থেকে একটি সাইকেল ছুটে এসে পাশ থেকে তাকে ধাক্কা দিল। বাবা কয়েক কদম টলমল করে এগোলেন, কিন্তু পড়ে গেলেন না। সাইকেলটি অবশ্য পড়ে গেল। বাবা বীজ রোপণ যন্ত্রটা নামিয়ে রেখে সাইকেলটি তুললেন, তারপর সাইকেলের আরোহীকেও তুলে দাঁড় করালেন। লোকটি ছিল বেঁটে-খাটো; হাঁটার চেষ্টা করতেই তার হাঁটুর জোড়াগুলো খটখট শব্দ করে উঠল যেন। বাবা খুব সম্মানের সঙ্গে সম্ভাষণ করলেন ‘অফিসার লিউ’।
অফিসার লিউ :কানা হয়ে গেছিস নাকি কুত্তার বাচ্চা ?
বাবা : হ্যাঁ, এই কুকুরটা অন্ধই স্যার। রাগ করবেন না।
লিউ : কী! আবার মুখে মুখে কথা, আমাকে অপমান করার সাহস দেখাচ্ছিস ? শালা হারামজাদা!
বাবা : অফিসার, ধাক্কাটা তো আপনিই দিছেন।
লিউ : নিজের পাছায় ঢুকা শালা!
বাবা : গালি দিবেন না স্যার। ধাক্কাটা আপনিই দিয়েছিলেন।
লিউ : শালা মা…দা…
বাবা : আপনি অহেতুক, কারণ ছাড়া রাগ করছেন স্যার। আগের জমানায় তো কিছু সৎ অফিসার ছিল, তারা কারণ শুনতেন, যুক্তির কথা শুনতেন।
লিউ : কী বললি ? নতুন সমাজ নতুন ব্যবস্থা তাহলে পুরোনো সমাজের চেয়েও খারাপ―এই কথাই তো বলতে চাইছিস ?
বাবা : না, আমি তা বলিনি।
লিউ : প্রতিবিপ্লবী! বিদ্রোহী! এখনই তোকে উড়িয়ে দেব!
অফিসার লিউ কোমরের বেল্ট থেকে একটি মাউজার পিস্তল বের করে কালো নল বাবার বুকের দিকে তাক করল।
বাবা : মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো কোনও কাজ আমি করিনি।
লিউ : একদম তাই করেছিস।
বাবা : তাহলে গুলি করেন।
লিউ : গুলি নিয়ে আসিনি সাথে
বাবা : দূরে গিয়ে মরেন তাইলে!
লিউ : গুলি আনিনি তো কী হইছে, তোরে পিটাইতে তো কেউ বাধা দিচ্ছে না।
অফিসার লিউ তিরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার উপর। আঘাত পাওয়া হাঁটুতে টলমল করে এগিয়ে গিয়ে পিস্তলের লম্বা নল দিয়ে সোজা বাবার নাকের মাঝখানে আঘাত করল। নাকের ছিদ্র দিয়ে কালচে রক্ত ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ল। সাথের কৃষকেরা তাকে টেনে সরিয়ে নিল, আর বয়স্ক কয়েকজন অফিসার লিউকে শান্ত করার চেষ্টা করল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে লিউ বলল :‘এইবারের মতো ছেড়ে দিলাম।’
বাবা একপাশে দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে রক্ত মুছলেন, আঙুল তুলে সাবধানে দেখলেন রক্ত।
লিউ বলল―এখন থেকে নিশ্চয়ই বুঝবি, কাকে সম্মান করতে হয়।
বাবা বললেন, ‘বন্ধুরা, তোমরা সবাই দেখেছ―তোমরাই আমার সাক্ষী।’ তিনি কয়েকবার জোরে মুখ মুছলেন, মুখটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। ‘বুড়া লিউ, তোর বাপ-দাদার চৌদ্দগুষ্টিকে চুদি!’
বাবা পা দাপাতে দাপাতে এগিয়ে গেল। বুড়া লিউ পিস্তল উঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠল―আর একটু এগোলে গুলি করব!
বাবা বললেন―তোর বন্দুক থেকে এক ইঞ্চি গুলিও বের হবে না।
বাবা বুড়ো লিউর কব্জি ধরে পিস্তলটি ছিনিয়ে নিলেন, তীব্র ক্ষোভের সাথে জোরে পাশের খালে ছুড়ে ফেললেন। চারদিকে পানি ছলকে উঠল।
বাবা বুড়ো লিউয়ের কলার টেনে ধরে সামনে-পিছনে জোরে জোরে খানিকক্ষণ ঝাঁকালেন, তারপর পাছা লক্ষ করে হালকা একটা লাথি দিলেন।
অফিসার লিউ সোজা খালে পড়লেন, পাছা উপরের দিকে, মাথা কাদায়, পানিতে পড়া পা চারিদিকে পানি ছিটিয়ে দিল।
যারা দাঁড়িয়ে দেখছিল সকলের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল, কেউ কেউ সরে গেল ভয়ে, কয়েকজন নিচে নেমে গেল লিউকে টেনে তুলতে।
একজন বুড়ো লোক বাবার দিকে ফিরে বলল―ভাতিজা, জলদি পালাও!
বাবা বললেন―সেজো চাচা, যমালয়ে যাওয়ার পথে আমাদের আবার দেখা হবে। এ কথা বলেই তিনি বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
স্থানীয় লোকজন বুড়ো লিউকে খাল থেকে টেনে বের করল। শিশুর মতো কাঁদছিল সে, প্রলাপও বকছিল। দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে অনুরোধ করল তার পিস্তলটা খুঁজে দিতে। অন্তত ডজনখানেক লোক খালে নেমে গেল পিস্তল খুঁজতে। তাদের হাত পানি আর কাদায় হুটোপুটি করে আজলা ভরে কাদা তুলে আনল পানির নিচ থেকে কিন্তু পিস্তলটা খুঁজে পেল না কেউ।
বাবা বাসায় ফিরে কড়িকাঠের উপর জমে থাকা ধুলোর ভেতর হাত ঢুকিয়ে লম্বা তেল-কাগজে মোড়া থলি নামিয়ে আনলেন। সেখান থেকে তিনি বের করলেন লম্বা, বাঁকানো বন্দুক। তার চোখে পানি টলমল করছে।
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন―মানে কী ? এখনও আমাদের ঘরে বন্দুক ?
বাবা বললেন―শোনো নাই ? আমার মা কীভাবে আমার বাবাকে গুলি করেছিল ? এই সেই বন্দুক।
ভয়ে মার চোখ বড় বড় হয়ে গেল―তাড়াতাড়ি এটা ফেলে দাও। বললেন তিনি।
বাবা বললেন―না।
মা বললেন―তাহলে তুমি কী করবে ?
বাবা বললেন―কাউকে মারব।
তারপর তিনি সরু কোমরওয়ালা বারুদের শিং আর একটা টিনের বাক্স নামালেন, আর নিপুণ হাতে বন্দুকে বারুদ আর ছররা ভরতে লাগলেন।
বাবা বললেন―দাসুও যেন মন দিয়ে পড়াশোনা করে, এটা দেখবে। আর এই বন্দুকটা সে যেন প্রতিদিন দেখে―শুধু দেখে, বুঝেছ ? ছুঁতে দেবে না। কথা রইল ?
মা বললেন―কী পাগলের মতো কথা বলছো ?
বাবা এবার বন্দুকটা তার দিকে তাক করে বললেন―সরে যাও!
নাশপাতি বাগানের দিকে হেঁটে গেলেন বাবা। ফুলে ফুলে ঢাকা গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল সাদা বরফে ঢাকা। তিনি বন্দুকটাকে গাছের সাথে ঝোলালেন, নল নিচের দিকে। সরু এক টুকরো সুতা বন্দুকের হাতুড়ির সাথে বাঁধলেন। তারপর মাটিতে শুয়ে বন্দুকের নলটা মুখে ঢুকিয়ে নিলেন। ফুলের চারদিকে উড়তে থাকা সোনালি মৌমাছিগুলোর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে টান দিলেন সুতায়। তুষারকণার মতো সাদা নাশপাতি ফুল ঘুরে ঘুরে পড়ল চারদিকে। কিছু মৌমাছি নিচে মাটিতে পড়ে গেল, মৃত।
দাসুও ট্রিগার টানল আবার, কিন্তু তবু কোনও শব্দ হলো না। মন খারাপ করে বসে পড়ল সে। দিগন্তে সূর্যের শেষ আলো, একেবারে গাঢ় সোনালি-বাদামি। পুকুরটাকে আরও ছোট লাগছে, সমতটের কিনারা কুয়াশায় আরও ঝাপসা হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই আকাশে আধখানা চাঁদ উঠেছে―সাদাটে। দূরে, নলখাগড়ার ঝোপে, সবুজ আলোর কিছু পোকা ঝলঝল করছে।
ঠোঁট ডানার ভেতর গুঁজে হাঁসগুলো তার দিকে তাকালো বিদ্রƒপের দৃষ্টিতে। ওরা এত কাছে এখন! আকাশ যত অন্ধকার হচ্ছিল, ততই যেন আরও কাছে সরে আসছিল হাঁসগুলি। পেট তীব্রভাবে জানান দিচ্ছিল নিজের কথা; তেল ঝরা অসংখ্য ভাজা হাঁসের ছবি ভাসছে চোখের সামনে।
মরিয়া, সে একের পর এক ট্রিগার টানতে লাগল। শেষমেষ হাতুড়ির আঘাতে পারকাশন ক্যাপটা বেঁকে গিয়ে খাঁজের ভেতর এমনভাবে আটকে গেল যে আর বের করার উপায় রইল না। লুকানোর জন্য যে দেয়াল তুলেছিল, তার গায়ে ঢলে পড়ল বিষণ্নভাবে, ঠিক যেন মাত্রই চামড়া ছাড়ানো কোনও পশু। তার শরীরের নিচে জোয়ারের শুকনো কাণ্ডগুলো মচমচ করে ভেঙে গেল।
বন্য হাঁসগুলোর কোনও ভ্রƒক্ষেপই নেই―না শব্দে, না নড়াচড়ায়। চুপচাপ, নিশ্চল, দাগছোপ দেওয়া নুড়ি-পাথরের স্তূপের মতো রয়ে গেল তারা। সূর্য ডুবে গেছে একেবারে, লাল-সবুজসহ সব রঙের ছায়া নিয়ে। পৃথিবী ফিরে গেল তার আদি ধূসর-সাদা রূপে। ঝিঁঝিঁ আর ঘুর্ঘুরে পোকার ডানা ঝাপটানোর শব্দ মিলেমিশে একটানা গুঞ্জনে পরিণত হলো। কান্না পাচ্ছিল তার, জল ভরে আসা চোখে সে তাকিয়ে থাকল বিবর্ণ ঘাসের মতো আকাশের দিকে। একবার পাশ ফিরে ঘৃণাভরা চোখে তাকাল বন্দুকটার দিকে। এই জরাজীর্ণ বুড়ো বন্দুকটাই কি সত্যি সেই একই বন্দুক ?
এত বিশ্রী ভাঙাচোরা একটা জিনিসের সত্যিই কি এমন অসাধারণ ইতিহাস থাকতে পারে ?
কিন্তু ওয়াং লাওকা যখন পুরোনো দিনের গল্প বলতে শুরু করত, তখন সত্যিই মনে হতো―সবকিছু যেন গ্রামবাসীদের চোখের সামনেই ঘটছে। ছোট-বড় সকলে তার গল্প শুনতো মুগ্ধ হয়ে।
ওয়াং লাওকা তাদের বলত:
বর্তমান কমিউনিস্ট শাসন আমলের আগে যখন প্রজাতন্ত্রের আমল, তখন বড় তিনটা প্রদেশের কোনওটাই এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করত না। এখানে ডাকাত ছিল গরুর গায়ের লোমের চেয়েও বেশি। পুরুষ-নারী সবাই ছিল হিংস্র। পান থেকে চুন খসার আগে ভয়ংকর মারামারি হয়ে যেত। তারা মানুষ খুন করত, যেন সামান্য একটা তরমুজ কাটছে, দ্বিধাহীন ভাবে।
তোমরা নিশ্চয় দাসুওর দাদির গল্প শুনেছ, তাই না ? দাসুওর দাদা ছিল জুয়াড়ি―পুরোপুরি নেশাগ্রস্ত। সে বেঁচে ছিল দাসুওর দাদির রোজগারে। ছোটখাটো এই নারী সাংঘাতিক শক্ত। বলতে গেলে একেবারে শূন্য থেকে নিজের ঘরদোর বানিয়েছিলেন তিনি। একজন নারীর জন্য খুব সহজ ছিল না এই কাজ। তিন বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর সে কয়েক বিঘা জমি আর দুটো ঘোড়া কিনতে পেরেছিল। কী যে সুন্দর ছিল দাসুওর দাদি! গ্রামের লোকেরা তাকে ডাকত ‘আট গ্রামের রানি!’ সরু নিটোল হাত আর পা, রেশমের মতো কালো চুল কপালের ওপর ঝুলে থাকত ঝালরের মতো। নিজের ঘরবাড়ি বাঁচাতে সে একখানা মূল্যবান পাথর আর দুই ব্যাগ শস্যর বিনিময়ে একটা বন্দুক নিয়েছিল।
সেই বন্দুকের নল ছিল লম্বা, বাটটা মেহগনি কাঠের। লোকে বলত―ঘোর অন্ধকার রাতে ওই বন্দুকের হাতুড়ি নিজে নিজেই টিকটিক করত। তিনি বন্দুক পিঠে ঝুলিয়ে বড় ঘোড়ায় চেপে মাঠে যেতেন শিয়াল শিকার করতে। নিখুঁত নিশানা ছিল তার, বরাবর শিয়ালের পাছায় গুলি লাগত।
কিন্তু তারপর হঠাৎই একদিন অসুখে পড়ল সে, ভয়ংকর অসুখ। টানা সাত সপ্তাহের সাত দিনই জ্বরে পড়ে থাকলেন। দাসুওর দাদা ভাবল এই সুযোগ। বেশ্যাপাড়া আর জুয়ার আড্ডায় দিনরাত মাতাল হয়ে থাকল সে। জমিজমা উড়িয়ে দিল জুয়ার আড্ডায়। এমনকি একদিন ঘোড়া দুটোও বাজি ধরে হেরে বসলো সে।
জুয়ায় জেতা লোক যেদিন ঘোড়া নিতে এল, দাসুওর দাদি তখন শক্ত পাটাতনের বিছানায় শুয়ে হাঁপাচ্ছিল। দাসুওর বাবা তখন পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চা। সে দেখল কিছু লোক তাদের ঘোড়াগুলো নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সে চেঁচিয়ে উঠল―মা! লোকে আমাদের ঘোড়া নিয়ে যাচ্ছে!
এই কথা শোনা মাত্র দাসুওর দাদি বিছানা থেকে গড়িয়ে নামল, দেয়াল থেকে বন্দুকটা তুলে নিল, আর অনেক কষ্টে নিজেকে টেনে টেনে উঠানে এসে দাঁড়াল।
কার এত সাহস! আমার ঘোড়া নিয়ে যাচ্ছিস ?―সে চিৎকার করে উঠল।
ঘোড়া ধরতে আসা লোক দু জন ভালোই জানত যে দাসুওর দাদি খুব সহজ কোনও নারী নয়, সে কাউকে ছাড়ে না।
তারা বলল―দেখুন, আপনার স্বামী আমাদের মালিকের কাছে ঘোড়া হেরেছে।
দাসুওর দাদি বলল―যদি তাই হয়, তাহলে তোমরা দু ভাই একটু কষ্ট করে আমার স্বামী লোকটাকে ডেকে আনো। তার সঙ্গে আমার কথা আছে।
দাসুওর দাদার নাম ছিল সান্তাও। স্ত্রীকে ভয় পেত সে। সেদিনও দরজার বাইরে লুকিয়ে ছিল। কিন্তু স্ত্রীর চিৎকার শুনে বুঝল, এখন সামনে না গিয়ে উপায় নেই।
সে খুব সাহস সঞ্চয় করে, শক্ত মুখ করে উঠোনে ঢুকে, বুক ফুলিয়ে বলল―খুব বাজে গরম পরেছে আজ, তাই না ?
দাসুওর দাদি বিদ্রƒপের হাসি হেসে বললেন―ঘোড়াগুলোও হেরেছিস, তাই তো ?
সান্তাও বলল―হ্যাঁ, হেরেছি।
দাদি বললেন―তো বল এখন, এরপর আর কী হারাবি, কী বাকি রইল ?
সান্তাও বলল―তোকে হারাব।
দাদি বললেন―বাহ রে সান্তাও, বাহ! ভাগ্যই বটে আমার। এক শত্রুর সাথে বিয়ে হয়েছিল। আমার ঘোড়া হারছিস, আমার জমি হারছিস, ঊনপঞ্চাশ দিন ধরে আমি অসুস্থ, বিছানায় পড়ে আছি, এক গ্লাস পানিও এনে দিসনি। আর এখন বলছিস আমাকে বাজি ধরবি, আমাকে হারাবি ? এর থেকে আমার মনে হয় আমার তোকে হারালেই ভালো হবে। সামনের বছর আজকের দিনে, শুনে রাখ সান্তাও, তোর কবরের কাছে ছেলেটাকে নিয়ে গিয়ে কাগজের টাকা পোড়াব…
কথাগুলো শেষ হতেই একটা বিকট শব্দে উঠানে লাল আলো ছড়িয়ে পড়ল… দাসুওর দাদা―মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, মৃত।
দাসুও প্রথম যখন এই গল্প শুনে তখন সে বেশ ছোট, তখন বাবা বেঁচে আছেন। সে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমাদের সেই বন্দুকটা কোথায়, কিন্তু তার বাবা প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়েছিলেন তার ওপর। চিৎকার করে বলেছিলেন―দূর হ এখান থেকে।
বাঁকা আধখানা চাঁদ ক্রমেই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। জোনাকিরা উড়ছে শান্তভাবে, মুখের উপর সবুজ আভার রেখা এঁকে দিয়ে। পুকুর পানিসহ গম্ভীর, ম্লান, ইস্পাতের মতো ধূসর রং ধরে আছে, কিন্তু আকাশ এখনও পুরোপুরি কালো হয়ে যায়নি। এখনও সে বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারছিল সোনালি দাগের ফড়িংয়ের ম্লান সবুজ চোখ। পোকাদের ঝিঁঝিঁ তীব্র হচ্ছে আরও, একটা থামার আগেই আরেকটা ডেকে উঠছে যেন। সোঁদা বাতাস জমাট বেঁধে ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। সে আর দেখছে না গুচ্ছ গুচ্ছ হাঁসের দলকে। সে শুধু ভাবছে হাঁস খাওয়ার কথা, তেল ঝরানো হাঁস ভাজা। আবার তার পেটে ক্ষুধা মোচড় দিয়ে উঠল। শরীরে মৃত হাঁস ঝোলানো শিকারির ছবিটা ক্রমে ফিকে হয়ে ভেসে উঠছে ঘোড়ার পিঠে বসা এক নারী শিকারির ছবি―কাঁধের উপর দিয়ে আড়াআড়ি করে বন্দুক ঝোলানো। শেষ পর্যন্ত দুটো ছবি মিলেই স্পষ্ট হয়ে উঠল শান্ত ভদ্র এক পুরুষের ছবি, ফুলে ফুলে ঢাকা নাশপাতি গাছের নিচে।
সূর্য চলে গেছে আকাশ থেকে। পশ্চিম আকাশে এক ফালি সোনালি মৃদু উষ্ণতা ছুঁয়ে আছে শুধু। দক্ষিণ পশ্চিম আকাশে ওঠা আধখানা চাঁদ পানির মতো কোমল এক মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। পুকুরের পানি থেকে ঘন কুয়াশা উঠছে যেন ঘন গাছের ঝোপ। সেই কুয়াশার ঝোপের মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে বুনো হাঁসের ঝাঁক, কখনও স্পষ্ট, কখনও মিলিয়ে যাচ্ছে কুয়াশায়। বড় বড় মাছের ঘাই মারা শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছে জলের ভেতর ।
সে উঠে দাঁড়াল, যেন মাতাল, নেশাচ্ছন্ন। ধীরে ধীরে মেলে ধরল বিবশ হাত পা। বারুদের শিঙাটা বেঁধে নিয়ে, কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে বের হয়ে এল তার লুকানো জায়গা থেকে।
‘আমি ট্রিগার চাপলে গুলি বের হয় না কেন ?’ বন্দুকটা নামিয়ে কোলে তুলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। চাঁদের আলোয় নীলচে আভা ছড়াচ্ছে বন্দুকটা।
‘কেন তুমি গুলি ফুটাও না ?’
বন্দুকের হাতুড়িটা ঘুড়িয়ে, উদাসীনভাবে ট্রিগারে টান দিল। বিস্ফোরণের মৃদু গর্জন নির্জন শরতের মাঠের উপর দিয়ে ঢেউয়ের মতো গড়িয়ে গেল আর হঠাৎ লাল আলোর ঝলকানিতে উজ্জ্বল দেখা গেল পুকুরের শান্ত পানি আর বুনো হাঁসগুলোকে। কাঠ আর লোহার টুকরো গুলো বাতাসে ছিটকে গেলে হাঁসগুলো ভয় পেয়ে উড়ে গেল। ধীরে ধীরে মাটিতে পড়ে গেল সে, খুব চেষ্টা করল চোখ খুলে রাখার। মনে হলো, হাঁসগুলো পাথরের মতো ভেসে ভেসে চারদিক থেকে নেমে আসছে, শরীরের উপর পড়ছে, স্তূপ হয়ে জমছে, এমনভাবে তাকে চেপে ধরছে যে শ্বাস নেওয়া ক্রমেই কষ্টকর হয়ে উঠছে।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



