আর্কাইভগল্প

গল্প : কবিতারা ভেসে যায় : মাহমুদুর রহমান

টাউন হল থেকে কত দূরত্বে জায়গাটা ? কাদের মেপে দেখেনি কখনও কিন্তু সামাদ তাকে হিসাবটা বলেছিল একদিন। কাদের ভুলে গেছে এখন। দেড় বছর আগে যখন সে মোহাম্মদপুরে আসে তখনই জায়গাটা তার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল। না, মানে, সেভাবে বরাদ্দ হয়নি। সামাদের কাছে ধর্না দিতে হয়েছিল চারদিন। তারপরই সাত ফুট বাই চার ফুটের জায়গাটা পেয়েছিল কাদের। শর্ত হলো মাসে দশ দিন পকেটমারির বখরা দিতে হবে সামাদকে।

কাদের থাকে ইকবাল রোডে। তার বাসা সাজানো। ৬২ জন পকেটমার এখন সে সামলায়। সবাই মোহাম্মদপুরে না। খিলগাঁও, মহাখালী, পুরান ঢাকা মিলিয়ে এই ৬২ জন। সামাদকে দেখলে কেউ বুঝবে না সে পকেটমারদের সর্দার।

তবে কাদেরকে দেখলে সবাই বুঝবে এটা ডাইলখোর। ডাইল অবশ্য খায় না কাদের। মাঝে মাঝে ডেন্ডি টানে। খিদা কমে। আবার পকেট মারতে গিয়ে ধরা খাইয়া মাইর খাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ডেন্ডি ভালো কাজ করে।

রসুলপুর থেকে ঢাকা আসার সময় কাদের জানত না এরকম একটা অবস্থা হবে। ওদের টিনের ঘর ছিল। দুই বেলা খাবারের জোগাড় ছিল। কিন্তু মনুর কথামতো বাঁশবাগানে ফাতেমারে লাগাইতে গিয়াই সব সমস্যা শুরু হইল। ফাতেমার বাপ ওর নামে ডাকাতির কেস দিল। তারপর থেকেই কাদের ফেরার। আসল ঢাকায়। সাত দিন পুলিশের লাথি, মস্তানদের গুঁতা আর গোয়া মারা খাওয়ার পর জুটল সাত ফুট বাই চার ফুটের এই জায়গা। নীল পলিথিন কিনতে টাকাও দিছিল সামাদ। তারপর থেকে এইটাই সামাদের বাসা। তার পাশে রুবেল, তার পাশে কাবিলা, তার পাশে আনোয়ার।

পাবলিক টয়লেটে হাগা-মোতা নিয়া চিন্তা নাই। আর তিন দিনে একদিন পাবলিক টয়লেটেই গোসল। লাইফ বিন্দাস লাগে সামাদের। যেদিন খারাপ লাগে, ডেন্ডি টানে। তখন আর ভালো-মন্দের কোনও চিন্তা থাকে না।

কাদেরের শুধু খারাপ লাগে এই বৃষ্টির রাতগুলা। দিনে হইলে সমস্যা নাই। এইখানে সেইখানে থাকা যায়। পকেট মারতেও সুবিধা। ব্যাগ, ছাতা, পানিপুনি সামলাইতে গিয়া মানুষের পকেটের খেয়াল থাকে না। কুটকুট করে কাটা যায়।

কিন্তু রাতে বৃষ্টি নামলে কাদেরের অসহ্য লাগে। একে তো শীত করে। তার ওপর মশা বাড়ে। ফুটপাথের পাশে এই জায়গা মশাগো বেহেস্ত। মনে হয় এক একটা হাতির সাইজ।

এদিকে ডেরেনের ময়লার গন্ধও পাক দিয়া উঠতে থাকে। মনে হয় খাওন সব মুখ দিয়া উইঠা যাবে। সেই সাথে আবার পলিথিনের উপর টপটপ টপটপ পানি পড়তে থাকে। পানি পড়ার শব্দে ঘুমের বারোটা বাজে কাদেরের।

আজকেও একই অবস্থা। সন্ধ্যা থেইকা শুরু হওয়া বৃষ্টি এখনও চলতেছে। রাইত বাজে একটা না দেড়টা। মোবাইলের চার্জও ফুরায়া গেছে। বড়লোকগো এইসব ফোনে চার্জ থাকে না বেশিক্ষণ। আর কাদেরের তো দোকানঘর ছাড়া চার্জ দেওনের কোনও উপায় নাই।

কাদের তার ময়লা বালিশটা মাথার উপর চেপে ধরে। চেষ্টা করে পলিথিনের ওপর পড়তে থাকা পানির শব্দটা এড়াতে। কিন্তু পারে না। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়ছে। আবার কখনও থেমেই যাচ্ছে। এত সবের মধ্যে একটা সময় ক্লান্তিতেই হয়তো কাদেরের চোখে ঘুম নামতে শুরু করে।

ঘুম আসে কিন্তু ঘুম নামে না। ঘরের কাছে এসে থেমে থাকার মতো একটা অবস্থা। কাদেরের মনে হয় তার মায়ের কথা। তার স্কুলের কথা। আর তিন মাস থাকলে সে এসএসসি পরীক্ষাটা দিতে পারত। পাস করলে এখন থাকত কলেজে। কিন্তু হয়ে উঠল না তা। একবার জেদ করে বাড়ি ছাড়ল তারপর আর ফেরা হলো না। ফেরা হবে না, মনে হয় কাদেরের।

সামাদ তাকে বলেছে রাস্তার পাশে বেশিদিন থাকতে হবে না। সামাদ তার বড় ভাইয়ের মতো। সেভাবেই দেখে কাদেরকে। বলেছে ঠিকমতো কাজ করতে পারলে তিন মাস পর করাইল বস্তিতে ওকে একটা ঘর ভাড়া করে দেবে। বেশি ভাড়া লাগবে না। অল্পতেই হবে। সাথে দেবে তিনজন স্যাঙাত। ওদের নিয়ে পকেটমার করবে বনানীর দিকে। ওদিকে মার্কেট ভালো অন্য অনেক জায়গার থেকে। বড়লোকদের এলাকা, সিকিউরিটি বেশি, তাই মানুষের খেয়াল কম থাকে।

কাদেরও কয়েক দিন ধরে সেই স্বপ্নে বিভোর। স্বপ্ন সে আগেও দেখত। তখন অবশ্য দেখত ফুটবল খেলার স্বপ্ন। রসুলপুরের সঙ্গে গাজীগঞ্জের খেলা। কাদের সব সময় স্ট্রাইকার। সে বহুদিন স্বপ্ন দেখেছে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে গোলপোস্টে ভরে দিয়েছে।

সে ছিল সুখের স্বপ্ন। আজ দেড় বছর পর আসলে স্বপ্ন বদলে গেলেও স্বপ্নের মূল সুর বদলায়নি। করাইল বস্তিতে একটা ঘর, মানে সুখের স্বপ্নই দেখে কাদের। তখনও তার নীল পলিথিনের ছাদে টপটপ করে বৃষ্টি পড়ছে।

কাদের তবু ঘুমাতে পারছে। কিন্তু কেশবের সেই উপায়ও নাই। সে বসে আছে একটা যাত্রী ছাউনির নিচে। ভয় করছে তার খানিকটা।

প্রতিদিন ডেমরা থেকে কেশব প্যাটিস নিয়ে বিক্রি করতে আসে। ভোর ছয়টায় বাড়ি থেকে বের হয়। প্যাটিসের বাক্সটা নিয়ে উঠে বসে বাসের পেছনের সিটে। তারপর লম্বা যাত্রা। ঘণ্টাখানেক লাগে ফার্মগেট পৌঁছতে। সেখান থেকে তার কাজের শুরু।

প্যাটিসের বাক্সটা হাতে ঝুলিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়। ফার্মগেট, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার তার কাজের পরিধি। মাঝে মাঝে অবশ্য জায়গা বদল করে। আলফাজের সাথে তার বন্দোবস্ত আছে। এক জায়গায় বেশিদিন ঘুরতে মন চায় না কেশবের। আলফাজ ঘোরে ধানমন্ডি লেকে। মাঝে সাঝে সেখানেই চলে যায় কেশব। ওখান থেকে আলফাজের সঙ্গে একটা বিড়ি টানে। আলফাজ আসে ফার্মগেট আর কেশব প্যাটিস বিক্রি করে ধানমন্ডি লেকে।

আজও সেটাই করেছিল। দুপুরে আলফাজকে ফোন করে সে এসেছিল ধানমন্ডি লেকে। আলফাজের সঙ্গে কেশবের পরিচয় তিন বছর আগে। প্যাটিস বিক্রি করতে করতেই। সেদিন মন ভালো না লাগায় টিএসসি গিয়েছিল সে। ওখানে তখন আলফাজ বেচত। তাই লেগে গিয়েছিল ঝগড়া। মজার ব্যাপার, সেই ঝগড়া থেকেই বন্ধুত্ব। তারপর দুজন মাঝে মাঝেই আড্ডা দেয়।

আলফাজ একটা বাক্সে করে খাবার আনে নিজের জন্য। ভাত, তরকারি আর পলিথিনে বাঁধা ডাল। বাইরের খাবার সে খেতে পারে না। সেই একজনের খাবারই দুজন ভাগ করে খাওয়ার পরে বসে থাকে রবীন্দ্র সরোবরের সিঁড়িতে।

ফেরার সময়েই ভুলটা করে বসে কেশব। গুলিস্তান হয়ে সে চলে যেতে পারত কিন্তু মুগদার বাসে উঠে পড়েছিল। কমলাপুর পার হতে হতেই বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির তোড়ে কোথাও একদণ্ড স্থির হয়ে বসাও অসম্ভব। কোনওমতে একটু জায়গা করে দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার পাশে।

রাত এগারোটার সময় বাস পাওয়া কেশবদের জন্য কোনও সমস্যার ব্যাপার না। মাঝে মাঝে লরি, ট্রাকেও উঠে যায়। কিন্তু আকাশভাঙ্গা এই বৃষ্টির রাতে সে কোনও বাহনেই উঠতে পারল না।

একটা যাত্রী ছাউনির নিচেই বসে থাকল অনেকটা সময়। এমনিতে অনেক রাত রাস্তায় কাটিয়েছে কেশব। তার জন্য এসব তেমন কোনও ব্যাপার না। কিন্তু আজ তার একটু ভয় লাগে। বাজ পড়ছে ঘন ঘন। এমন বাজ পড়তে সে দেখেনি অনেকদিন। একটা বাজ পড়তেই মনে হলো সে অন্ধ হয়ে যাবে। মরেই হয়তো যেত শব্দে। কেন মরেনি সে জানে না।

কেশবের আরও বড় ভয়, উমারানি একা আছে ঘরে। কদিন হলো উমা তাকে বলেছে মনসুর নামের উঠতি গুন্ডাটা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে নাকি ইশারা ইঙ্গিতে অনেক কিছু বলারও চেষ্টা করে। সেসব পাত্তা দেয় না উমা। কিন্তু ভয় করে তার।

বাঁশ আর টিন দিয়ে বানানো কেশবের ঘরটা। টিনে দুই একটা ফুটোও আছে। সেসব হয়তো উমারানি সামলে নেবে কিন্তু এমন ঘন দুর্যোগের রাতে দরজায় ধাক্কা দিলে উমা হয়তো কেশব ভেবেই খুলে দেবে দরজা।

এত সব ভাবতে ভাবতে কেশবের ঘুম উড়ে যায়। চোখের সামনে দেখতে থাকে অঝোরে পড়তে থাকা বৃষ্টি। সেই সময় কেশব আরও লক্ষ করে একটা ইঁদুর বেরোলো কোনও এক ফাটল থেকে। কতক্ষণ দৌড়ল। অন্ধকারেই তাকাল কেশবের দিকে। তারপর ফিরে গেল কোটরে।

কেবল কেশবই ঠাঁয় বসে থাকল। বৃষ্টির ছিঁটে এসে পড়তে থাকল তার গায়।

শহুরে বৃষ্টির একটা ধারা আছে। গ্রামের বৃষ্টির সঙ্গে তা মিলবে না। গ্রামে বৃষ্টি হয়, গাছের পাতা নড়ে। পাতার উপর টুপটুপ করে বৃষ্টির পানি পড়ে। সেখানে পুকুর আছে, উঠান আছে। বৃষ্টি পড়ে পুকুরে-উঠানে। মনে হয় গ্রামের বৃষ্টি কিছুটা বিস্তৃত। কিন্তু শহুরে বৃষ্টি সেরকম না। শহুরে বৃষ্টি জীবনকে থামিয়ে দিতে চায়। জীবন থেমে থাকে না। মানুষ ঘর থেকে বের হয়। কাজ করে, ঘরে ফেরে। কিন্তু সেই বৃষ্টি কোনওভাবে কবিতাকে হারিয়ে দেয়। অনুপমের একটা গান আছে, গানের মধ্যে বলে শহরে বৃষ্টি নামে জল জমে রাস্তায়/নাগরিক অভিশাপে কবিতারা ভেসে যায়।

সুরথের মনে হয় অনুপম সত্যিই বলেছে। শহরে বৃষ্টি নামলে কবিতা ভেসে যায়। কেননা শহর কর্পোরেট। শহর যন্ত্রের মতো চলে। তার সময় মতো কাজ হতে হবে, সময় মতো বাঁচতে হবে। এমনকি শহরে মানুষ হয়তো মরেও সময় মতো। এখানে বৃষ্টি নামলে রাস্তায় পানি জমে যায়। নালা উপচে পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টি হয়তো বলতে চায়, ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে। কিন্তু শহুরে মানুষ ঘরে থাকতে পারে না। তাদেরকে বেরোতে হয়। কেননা কাজ তাদের করতেই হবে। ফলে কবিতা লেখা হয় না। ফলে কবিতা পড়া হয় না।

কিন্তু তবু কিছু মানুষ কবিতা পড়ে। কিছু মানুষ কবিতা লেখে। পড়ে বলেই হয়তো লেখে। কিংবা লেখে বলেই হয়তো পড়ে। সুরথ কবিতা লেখে না, সুরথ কবিতা পড়ে। এই তো পরশু দিন একটা বই কিনে আনল। হঠাৎ লেখকের নাম দেখে তার মনে হয়েছিল, এর বইটা কেনা যায়। এমনটা চিন্তা করা হয়তো বোকামি কিন্তু সুরথ মাঝে মধ্যে এরকমই কাজ করে। আজ বৃষ্টির দুপুরে সেই বইটাই খুলে বসল। ওর আরও একটা অভ্যাস আছে বই হুট করে মাঝখান থেকে খোলে, তারপর সামনে যে পাতাটা থাকে সেখান থেকেই পড়তে শুরু করে। আজও শুরু করল।

বেলা দুইটা সাইত্রিশ মিনিটে বারান্দার গ্রিলের ওপারে বৃষ্টির বড় বড় ফোটা আছড়ে পড়ছে। সুরথ ভাত খায়নি সকালে। বৃষ্টির জন্যই। তার কেন যেন মনে হয়েছিল, খাবে না। বৃষ্টি নামলে খিদেও কম লাগে। অন্তত সুরথের তাই। সুরথ কবিতার বই খুলে বসে। দুইটা সাঁইত্রিশ মিনিটে যখন অঝোরে বৃষ্টি পড়তে থাকে, সুরথ তখন কবিতার বই খুলে প্রথমেই একটা বৃষ্টির কবিতা পেয়ে যায়। কবিতাটা খুব একটা খারাপ না। ভাবের একটু গোলমাল আছে কিন্তু পড়তে ভালো লাগে। অনেকটা ওই অনুপমের গানের মতো।

এই শহুরে বৃষ্টি দেখে আসলে রবীন্দ্রনাথের মতো বর্ষার কবিতা লেখা যায় না। রবীন্দ্রনাথ তাও লিখতে পেরেছিলেন। আর কিছুদিন পরে জন্মালে লিখতে পারতেন না। যেমন রবীন্দ্রনাথ পারেননি কালিদাসের মতো বর্ষাকে আঁকতে। তবু বলেছিলেন অবশ্য গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা/ কুলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। এটুকু দিয়েই বর্ষাকে আঁকা যায়, রবীন্দ্রনাথ পেরেছেন। কিন্তু নাগরিক কবিতার পক্ষে আর কতটা পারা সম্ভব ?

সুরথ নিজেই কি আজকের বৃষ্টিকে কোনওভাবে শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে পারবে ? সুরথ জানে, পারবে না। কেননা এই যে তার দালানের বাইরে রাস্তাটা ভেসে যাচ্ছে, সেখানে কোনও সৌন্দর্য নেই সেখানে এক ধরনের বাস্তবতা আছে। তবু সুরথ যেহেতু ঘরের ভেতরে, সে কিছুটা রোমান্টিসিজম করতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে সুরথকে যদি কোনও কোম্পানির মার্কেটিং এজেন্ট হয়ে ক্লায়েন্টের কাছে যেতে হতো, তার পক্ষে এই বৃষ্টিতে রোমান্টিসিজম সম্ভব হতো না।

ঢাকার এমন বৃষ্টিতে বহুদিন সুরথকে বাইরে বেরোতে হয়েছে। কখনও ছাতা হাতে, কখনও ছাতা ছাড়া। কখনও রিকশায়, কখনও বাসে, কখনও পায়ে হেঁটে। তবে বাসের ভেতরে এমন বৃষ্টির দিনে কোনও উপায় থাকে না শ্বাস নেওয়ার। যখন মনে হয় দম আটকে মরে যাচ্ছে, তখন কেউ একটু আধটু জানলার পাশ থেকে খোলার চেষ্টা করে। অল্পেই বৃষ্টির ছাট এসে ভিজতে থাকে শরীর। নাগরিক জীবনে হঠাৎ করে বৃষ্টির ছিটে কেউ গায়ে মাখতে চায় না, অবশ্য অনেকেই বাস থেকে নেমে নোংরা পানিতে প্যান্ট ভেজাবে। ও নিয়ে তাদের চিন্তা নেই!

কুচি কুচি করে পেঁয়াজ কাটল সুরথ। চুলার ওপরে বসাল কড়াই। তারপর একটা ডিম ফেটতে শুরু করল। পেঁয়াজের সাথে মরিচ নিল। তার আজ ইচ্ছা হয়েছে, এই বর্ষার দিনে পানি ভাতের সাথে ডিম ভাজা খাবে। এটুকু রোমান্টিসিজম করতেই পারে। কেননা সে আজ ঘরে আছে। অনেকে তো বৃষ্টি হলেই খিচুড়ি গরুর মাংস কিংবা খিচুড়ি আর ডিম এই নিয়ে রোমান্টিসিজম শুরু করে। যেন বৃষ্টি মানেই খিচুড়ি খাওয়ার উৎসব।

অথচ এই শহরে বহু মানুষ বৃষ্টির দিনে ভাত খেতে পায় না। অবশ্য এই সময়ে এসে ভাত খেতে পারে না, কথাটা খুবই ভুল। কেননা রোজগার করার অনেক মাধ্যমই এখন আছে। ন্যূনতম পরিশ্রম করলে ভাত জুটে যায়। আরেকটু পরিশ্রম করলে তরকারিও একটা জুটে যায়। তবে অনেকে হয়তো সেটা মেলাতে পারে না। কিংবা তারা বুঝতে পারে না।

অদ্ভুত শহর এটা। সুরথ জানে এখন, আজ এই সময় এই বৃষ্টির মধ্যে একই শহরে বহু রকম মানুষ বৃষ্টিটাকে বহু রকমভাবে দেখছে। সাত দিন আগে হলেও হয়তো সুরথ এই বৃষ্টিকে দেখত তার অফিসের জানলা দিয়ে। ঠিক সাত দিন আগেই সুরথ চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। এখন সে বেকার। তা নিয়ে অবশ্য খুব একটা মাথাব্যথা নেই! জানে বেশিদিন এমন অবস্থায় থাকলে তারও ভাত নিয়ে টানাটানি হবে কিন্তু চাকরিটা থাকলে এই মুহূর্তে তাকে যেতে হতো হয়তো মোহাম্মদপুর কিংবা উত্তরা কিংবা রামপুরা। বৃষ্টিটা দেখতে পারত না, নিজের মতো একটা কবিতা পড়তে পারত না। এ শহরে অনেকেই পারে না। তারা ছুটে চলে। ছুটতে থাকে। তাদের কোনও বিরাম নেই, কোনও বিশ্রাম নেই। বৃষ্টি তাদের থামাতে পারে না। তারাই বৃষ্টিকে কখনও কখনও থামিয়ে দেয়।

এই তো কয়েক দিন আগের কথা। সেদিনও বৃষ্টি নেমেছিল। সুরথ গিয়েছিল চানখারপুল। ওখানে একটা কাজ ছিল। এগারোটায় বের হয়ে পৌঁছল চানখারপুল। একটায় কাজ শেষ করে রওনা দিলো। আর বৃষ্টিটা নেমেছিল ঠিক সাড়ে বারোটায়। কিন্তু সাড়ে বারোটায় হলেও সুরথের বারোটা বেজে গিয়েছিল। চানখারপুল থেকে ঢাকা মেডিকেল হয়ে তার আজিমপুর পৌঁছাতে সময় লাগল তিন ঘণ্টা। কেবল রাস্তায় জ্যাম, আর কিছুই না। অন্য সময় এই রাস্তা পার করা যায় সর্বোচ্চ ত্রিশ মিনিটে, কখনও কখনও কমেও হয়। 

কিন্তু চারটার সময় আজিমপুর কবরস্থানের গেটে এসে সুরথ দেখল যেন কিছুই হয়নি। প্রতিদিনের মতোই মানুষগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদিকে যাচ্ছে, ওদিকে যাচ্ছে। রাস্তায় জমা পানির দিকে তাদের কোনও ভ্রƒক্ষেপ নেই। যেন এমন হতেই পারে। যেন এটা রাস্তা না। যেন এটা কোনও একটা নদী। আর মানুষগুলো নদীর উপর দিয়ে হাঁটতে পারে। কিন্তু দুই বছর শহরবাসের পরও সুরথ এই শহরের রাস্তা নামক নদীর উপর দিয়ে হাঁটতে পারে না।

তবুও আজকের বৃষ্টিটাকে সুরথ উপভোগ করে কেননা এই শহরে আসার পরে সে সত্যিকার অর্থে কোনও বৃষ্টির দিন উপভোগ করতে পারেনি। হ্যাঁ দু-একটা বৃষ্টির রাত উপভোগ করেছিল তবে সেটা ঘুমিয়ে। এক রাত সম্ভবত সজাগ ছিল, সেদিনও দেখেছিল চারদিকে অন্ধকার, কেননা লোডশেডিং ছিল।

আজ মোবাইলে একটা সিনেমা দেখতে বসে, তখন বিকেল চারটা। অদ্ভুতভাবে সিনেমাতেও বৃষ্টি হচ্ছে। পরিচালক এমন গল্প নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন যেখানে গল্পের বাইরে বৃষ্টিটাই যেন আসল হয়ে উঠেছে। যেন তিনি দেখাতে চান তার গল্পের প্লটে সারাক্ষণই বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি দিয়ে মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, কামনা-বাসনা, আনন্দ, যৌনতা সবই প্রকাশ করতে চান। সেখানে এমন প্রশ্ন তোলা উচিত হয় না যে আদৌ কোথাও দিনভর বৃষ্টি হতে পারে কি না ? অবশ্য কখনও কখনও তো এই শহরেই দিনভর বৃষ্টি হয়।

আজ তার মনে হয়, সারা রাত বৃষ্টি হবে। আর যেহেতু সুরথের সকালে অফিস যাওয়া নেই, তাই সে এই বৃষ্টিটা দেখবে। কিন্তু আদৌ কি দেখার কিছু থাকে ?

শুরুতে মনে হয়েছিল দেখার মতো কিছু থাকবে না। কিন্তু বারোটা থেকে বারান্দায় বসে সুরথ দেখল, রাত একটু বাড়তে বৃষ্টির ছন্দটাই বদলে গেল। কখনও সে নামছে ধীর লয়ে যেন প্রেমিকার সঙ্গে কথোপকথন। কখনও আবার দুর্বার গতিতে যেন ফুটবল পাস করছে। আবার কখনও ঝিরিঝিরি হয়ে ঝরছে, তার কিছু বলার নেই যেন। তার কিছু করার নেই। যেন সে একটা কবিতা লিখতে চাইছে, কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। যেন সে কোথাও পৌঁছতে চাইছে কিন্তু রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না। একটা শব্দ তার মাথায় এল, কাগজে সে লিখল। কিন্তু তারপরের বাক্যটা প্রতারণা করল তার সঙ্গে। সুরথ জানে, প্রতিদিন এই শহরে হাজার হাজার প্রতারণার ঘটনা ঘটে। তবে মানুষ সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলো করে নিজের সঙ্গে।

বাড়ির সামনের রাস্তাটা অদ্ভুত হয়ে ওঠে। যে রাস্তাটা দিয়ে রাত দুটোর সময়ও রিকশা চলে, সে রাস্তাটা আজ একদম সুনসান। কেউ আসে না, কেউ যায় না, এমনকি এলাকার কুকুরগুলোও আজ নেই। রাস্তাটা কেবল পড়ে থাকে। তার বুকের ওপর একটু একটু করে পানি জমতে থাকে, কেননা তখনও বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে।

সুরথের কানে নতুন এক ছন্দ বাজে। তার মনে হয় এ শহরে রাতে যখন বৃষ্টি নামে, তখন শহরের বুকে ঘুমিয়ে থাকে এ শহরের ব্যস্ত মানুষগুলো। শহর তখন একদম একা। সে যেন সেই একাকিত্বকে অনুভব করতে চায়। যেহেতু এই শহর মানুষদের পায় না, তাই বৃষ্টির রাতগুলোতে সে একদম একা হয়ে যায়। আসলে সে একা হতে চায়। কেননা এই শহরের অলিগলি, প্রতিটা পথ, প্রতিটা জানালা, প্রতিটা দালান প্রতিটা ইলেকট্রিকের খাম্বা, মাথার উপরে বিশাল আকাশটা একটু স্বস্তি চায়। তাই মূলত আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে। সে বৃষ্টি মাটির কাছে নিয়ে আসে বার্তা। আকাশের সঙ্গে মাটির কথা হয়। যেমন জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটির কথা হয়। সুরথের মনে হয়, বৃষ্টির রাতে এমনই কোনও কথোপকথন লিপিবদ্ধ হতে থাকে কিংবা রচিত হয় সুর, রচিত হয় গীতি, কেননা সুর তো বৃষ্টির মধ্যেই থাকে। কেবল বৃষ্টি না সঙ্গে বইতে থাকা রাতের বাতাস মিলে সুর তৈরি করে।

সুরথের খুব ইচ্ছা হয়, সকাল হওয়ার অনেকটা আগে আকাশ দেখতে। সে গুটিগুটি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে যায় ছাদে। তখনও বৃষ্টি ঝরছে। তবে আগের চেয়ে ক্লান্ত। হতেই পারে। আকাশ তো কাঁদছে। তার তো শ্রান্ত লাগতে পারে।

আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকায় সুরথ। নক্ষত্রগুলো দেখা যায় না। আর বেশিক্ষণ তাকিয়েও থাকা যায় না। কেননা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সরাসরি চোখের পাতায় পড়ে চোখ বন্ধ করে দেয়। সুরথ তাকিয়ে দেখে। সে মেঘের খোঁজ পায়। মেঘের ওপারে কি থাকতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হয় একদম কালো হয়ে গেছে। সে কিছুই খুঁজে পায় না। কিছুই বুঝতে পারে না কেননা ওই আকাশ সুরথকে আপন করে নিতে পারে না। কিংবা সুরথ আপন করে নিতে পারে না আকাশকে। তাই আকাশ কেঁদে চলে ভোর না হওয়া অবধি।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button