বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত (২০২১) কবি ও কথাশিল্পীদের সাহিত্যপ্রভা : কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমান : এক বহুমাত্রিক প্রতিভার নাম : জাকিয়া রহমান

[কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমানের জন্ম ২৮ জুন ১৯৫৯ সালে ঢাকার বিক্রমপুর, তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম রওশন আখতার। পরবর্তীকালে ঝর্না রহমান নামে লেখক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পিতা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং মাতা রহিমা বেগম। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন। বর্তমানে ‘অগ্রসর বিক্রমপুর’ ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। আশির দশক থেকে তিনি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, নাটক, কবিতা, ছড়া, ভ্রমণসাহিত্য এবং শিশুসাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেছেন। শিল্প-সাহিত্যের প্রবহমান ধারায় সব্যসাচী ভূমিকায় উত্তীর্ণ ঝর্না রহমান একাধারে একজন সঙ্গীতশিল্পী, গল্পকার, কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও শিশু সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ‘ছেলেটা’ শীর্ষক ছোটগল্প রচনা করে বাংলাদেশ পরিষদের একুশে সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে পুরস্কারটি ছিল উদীয়মান লেখক-কবিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পুরস্কার। যা পরবর্তীকালে কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমানের লেখকসত্তা গঠনে অনুপ্রেরণার স্বাক্ষর রেখেছে। পরবর্তী সময়ে ‘ছেলেটা’ শীর্ষক গল্পটি কালঠুঁটি চিল নামে বই আকারে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। কাঠুঁটি চিল ঝর্না রহমানের প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ।―

বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৬০টি। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি-বাংলাদেশ পরিষদের একুশে সাহিত্য পুরস্কার (ছোটগল্পে) ১৯৮০, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২৭, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব সাহিত্য পুরস্কার ২০২০ এবং ২০২১ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। প্রথম রচিত গল্প ‘ছেলেটা’র মাধ্যমে ঝর্না রহমান লেখালেখির আসরে নামেন। পরবর্তীকালে মানুষের যাপিত জীবনের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখকে তিনি শিল্পিত প্রয়াসে সাহিত্যের উপকরণ করে তুলেছেন। ঝর্না রহমানের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে―কালঠুঁটি চিল (১৯৮৫), অন্য এক অন্ধকার (১৯৮৬), ঘুম মাছ ও এক টুকরো নারী (২০০২), স্বর্ণতরবারি (২০০৩), অগ্নিতা (২০০৪), কৃষ্ণপক্ষের ঊষা (২০০৫), শঙ্খমালার হাড় (২০০৬), নাগরিক পাখপাখালি ও অন্যান্য (২০০৮), পেরেক (২০০৯), জাদুবাস্তবতার দুই সখী (২০১২), নিমিখের গল্পগুলো (২০১২), উধহি ড়ভ ঃযব ডধহরহম গড়ড়হ (২০১২), বিপ্রতীপ মানুষের গল্প (২০১৪), সবুজ ডানার দেবদূত (২০১৫), বিষপিঁপড়ে (২০১৬), তপতীর লাল ব্লাউজ (২০১৮), আয়নামামি (২০২০), জলপরী ও নূহের নৌকা (২০২১), সমাধি প্রাঙ্গণে দুই বোন (২০২২)। প্রকাশিত উপন্যাসের তালিকায় রয়েছে―পিতলের চাঁদ (২০১৭), কাঁক জোসনা (২০১৭), ভাঙতে থাকা ভূগোল (২০১৯)। কিশোর রচনার মধ্যে রয়েছে―আপার ক্যাবিনেটের বাচ্চা (২০০৪), ইচ্ছেপূরণ রাজা ও বুড়িমা’র একটি ইচ্ছে (২০০৬), আদ্রিতার পতাকা (২০১০), স্কুল বাড়ির ছেলে (২০১০), এক বাক্স অলৌকিক মিষ্টি (২০১২), আজব দালান (২০১৫), হাতিমা ও টুনটুনি (২০১৮), একদিনের সিংহাসন (২০২২)। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নষ্ট জোসনা নষ্ট রৌদ্র (২০০৩), নীলের ভেতর থেকে লাল (২০১২), জলজ পঙ্ক্তিমালা (২০১২), জল ও গোলাপের ছোবল (২০১৪), ঝরে পড়ে গোলাপি গজল (২০১৪), চন্দ্রগ্রহণ (২০১৬), হরিৎ রেহেলে হৃদয় (২০১৯) এবং চন্দ্রদহন (২০১৬) নামক প্রতিচিত্রী কাব্য। এছাড়াও উড়ন্ত ভায়োলিন (২০১৮) নামক নাট্যকাব্য, বৃদ্ধ ও রাজকুমারী (২০১০) নামক নাটক এবং আমরা যখন নেপালে (২০১০) নামক ভ্রমণ সাহিত্য, মায়ের হাতের অন্নব্যঞ্জন (২০১৩) নামক স্মৃতি গদ্য, রবীন্দ্রনাথ : সেঁজুতি (২০১২) নামক আলোচনা গ্রন্থ, রৌদ্র জলের গদ্য (২০১৬) নামক মুক্তগদ্য, যুদ্ধদিনের নীলখাতা (২০২১) নামক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আখ্যান রচনা করেছেন। শিশুতোষ গল্পের মধ্যে রয়েছে―মম’র জন্মদিনের কেক (২০০৭), ছোট্ট ছেলে উষ্ণীষ (২০১১), নীরাজনা ও নীল আমগাছ (২০১৭), অ্যাকুয়ারিয়াম ও খাঁচা (২০১৭), নীল কুমিরের বাচ্চা (২০২০), পরমা হারিয়ে গিয়েছিল (২০২০), দাঁতপরীর উপহার (২০২০), হুলে কিড়াল টুলো বিড়াল (২০২০)। শিশুতোষ ছড়ার মধ্যে রয়েছে―ছন্দে আনন্দে বাংলা পড়া (২০০৩), ছড়াগাছে ছড়াফুল (২০০৬) ছড়া পড়ে টুপটাপ (২০২০)। সম্পাদিত গ্রন্থের তালিকায় রয়েছে―গাঁথা গল্প (২০১০), তোমারি নাম বলবো (২০১১), এক সূর্যের অজস্র রশ্মি (২০১৩), মাটির মানুষ (২০১৩), সোনা বাঁধানো ছবি (২০১৮)। পরানকথার গল্প সংখ্যা, অতিপ্রাকৃত গল্প, অনুগল্প, নির্বাচিত গল্প পাঠ ও পর্যালোচনা এবং ত্রৈমাসিক অগ্রসর বিক্রমপুর-এর সম্পাদনা।]

আ লোচ্য প্রবন্ধে ঝর্না রহমানের লেখার ভাণ্ডার থেকে কতিপয় লেখা আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে। ‘যুদ্ধদিনের নীল খাতা’―নামক স্মৃতিগদ্যে সংযোজিত ভূমিকায় সৃজনশীলতার প্রশ্নে লেখকের দায়বদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। লেখক ঝর্না রহমান বাল্য জীবনের স্মৃতিগদ্যে বাল্যস্মৃতির সঙ্গে সঙ্গীত প্রিয়তার বিষয়টিকে উপজীব্য করে কলম ধরলেও সময়ের প্রেক্ষিতে লেখকের কলম বেয়াড়া হয়ে বেঁকে বসেছিল। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেন―‘লিখতে গিয়ে আমার স্মৃতিময় দিনগুলো যখন উনিশশ আটষট্টির চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকে পড়ল ঊনসত্তরে, সত্তরে, সে সময়ে কলম উঠল বেয়াড়া হয়ে। তাকে আর থামান গেল না, শুধু গানের খেয়া বাইতে সে রাজি নয়, সময়ের কথা লিখতে চায়।’ অর্থাৎ একজন লেখক তার সময়কে উপেক্ষা করতে পারেন না। সঙ্গত কারণেই কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমানের রচনায়ও স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ বীভৎসতা, চলমান যাপিত জীবনের সীমাহীন ক্ষোভ, ক্লেদ, শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত গণমানুষের হাহাকার, আর্তনাদ এবং অন্তঃক্ষরণের বিপুল শূন্যতা। পাশাপাশি শিশুসাহিত্য রচনায় তিনি অনন্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। সহজ-সরল গদ্যে উদ্ভূত অন্তর্ভাবনাকে গভীর সূক্ষ্মমনোবিশ্লেষণিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শিল্পময় করে উপস্থাপন করেছেন। সার্থক শিল্পীর এটিই বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে তিনি সৃষ্টি নৈপুণ্যে সাধারণের মধ্যে অসাধারণত্বকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়ে ওঠেন।

পেরেক গল্প গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলো কাহিনি প্রধান গল্প নয়। মানুষের চেতনাগত সংস্কার, অন্তর্গত বোধ, সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং মানস প্রবৃত্তি তথা অন্তর্গত ভাবানুভূতির প্রাবল্যে জীবনের ছোট ছোট অধ্যায়গুলো এ গল্পগ্রন্থের গল্প হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক ঝর্নারহমান পেরেক গল্পগ্রন্থের সূচনায় ‘গল্পগুলো নিয়ে অল্প কিছু কথা’ শীর্ষক অংশে বলেছেন―‘পেরেক গল্পে অভিজ্ঞতা নয় আছে একটি বোধ―যে বোধ আমাকে তাড়িত করে নানাভাবে।… বাকি গল্পগুলোর পরিপ্রেক্ষিত কখনও সমাজ, কখনও সময়, কখনও কাল-নিরপেক্ষ মানসক্রিয়া―শুধুই একটা বোধ, গভীরতম সত্যোপলব্ধি।’ পেরেক গল্পগ্রন্থের অন্তর্গত নয়টি গল্পের মধ্যে সূচনা গল্প পেরেক। এই গল্পে জয়নুল আবেদীন চরিত্রে প্রযুক্ত মধ্যবিত্ত মানস প্রবৃত্তিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্পের সূচনায় জয়নুল আবেদিনের অস্বস্তির কারণ অনুসন্ধানে যেমন মধ্যবিত্ত পিছু টান উপলব্ধ হয়ে ওঠে, তেমনি গল্পের শেষ পর্যায়েও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী সুবিধাবাদী স্বরূপ এ চরিত্রের প্রেক্ষিতে আর অপ্রকাশ্য থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের গল্প হলেও এ গল্পটি গতানুগতিক কাহিনির ঘেরাটোপ অতিক্রম করে বোধসর্বস্ব একটি গল্প হয়ে উঠেছে। সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সময় ছোট ভাই জহিরুল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও সরকারি চাকরিজীবী জয়নুল আবেদিন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি। কেননা, সরকারি অর্থেপুষ্ট মধ্যস্বত্বভোগী সুবিধাবাদী চরিত্র হিসেবে নিজের সুবিধা ষোলো আনা প্রাপ্ত হওয়ায় দেশ ও দশের চিন্তা তার কাছে নিরর্থক মনে হয়েছে। সময়ের বিবর্তনে নির্জীব স্বার্থপরতার চিত্র অনুধাবনে কিছুটা আক্ষেপ ধূমায়িত হয়ে উঠলেও তিনি নিজেকে দোষারোপ করেন না। মনগড়া যুক্তির ছাঁচে নিজেকে নিষ্কলুষ ভাবতে থাকেন।

‘এখানে কোনও গল্প নেই’―শিরোনাম গল্পে কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমান মর্মস্পর্শী সংগ্রামী জীবনচিত্রের সঙ্গে মর্মস্পর্শী কাহিনির অবতারণা করেছেন। এঁদো গলির ভেতরে বসবাসরত নিম্নবিত্তের জীবনচিত্র এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বর্ণনায় লেখক এক অনবদ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বীভৎস ভ্যাপসা স্যাঁতসেঁতে অন্ধ গলির ভেতরের মানুষগুলো যেন পৃথিবীর নগরায়নের ইতিহাসে সভ্য শিক্ষিত সমাজজীবনে মুদ্রার অপর এক পিঠ। এ গলিতে সকাল হলেই কেউ অফিসে যায় না, বাচ্চারা কোলাহল করে স্কুলে যায় না। রাস্তার ধারে ফুলের মালা বিক্রি করা বালিকা বা অনাথ, অসুস্থ, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর শিশুকোলে কোনও ভিখারিণির হাত বাড়িয়ে রাখার চিত্র অথবা হোটেলে পেঁয়াজকুচি সরবরাহ করা নিম্নশ্রেণির নারী চরিত্র কোনও না কোনও এঁদো গলি থেকে রোজ সকালে বেরিয়ে আসে। এ গলিতে ক্ষুধা-দারিদ্র্যই মূল সমস্যা। পাঁচ টাকার ফুলের মালা নষ্ট করার অপরাধে বালিকার মা বালিকাকে যে কোনও মূল্যে সে টাকা সংগ্রহের তাগাদা দেন। প্রয়োজনে বালিকার অপুষ্ট শরীরের বিনিময়ে হলেও এ পাঁচ টাকার ক্ষতিপূরণ তিনি প্রত্যাশা করেন। জীবন-জীবিকার জটিল আবর্তে ক্ষুধা নিবৃত্তিই যেন এ মানুষগুলোর একমাত্র লক্ষ্য। এ গলিতে স্নেহ, মমতা, মাতৃত্বসহ জীবনের সব রং মলিন ধূসর। সকাল হলেই তাই দুগ্ধপোষ্য শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলকেই জীবিকার প্রয়োজনে বেরিয়ে পড়তে হয়। দুগ্ধপোষ্য শিশুকে অনাথ পরিচয়ে কোলে নিয়ে পথে দাঁড়ালে ভিক্ষার থলিটি অপেক্ষাকৃত ভারী হয়ে ওঠে। সে অর্থে অবোধ শিশুটিও জীবিকার সংগ্রামে, সন্ধানে ছুটে চলা চরিত্রদের দলে মিশে যায়। হয়ে ওঠে তাদের একজন। এমনই যাপিতজীবনে কোনও এক ভোরে অন্ধ গলিতে পরে থাকা বস্তাবন্দি অজ্ঞাত নারীর লাশ সমকালীন সমাজে ঘটে চলা অনাচার, হত্যা, খুন, জখমের প্রতিচ্ছবিকে স্পষ্ট করে পাঠকের মনকে আতঙ্কিত করে তোলে। অজ্ঞাত নারীর বস্তাবন্দি লাশ সকল নারীর হৃদয়কে নাড়া দেয়। মানবিকতার দাবিতে সহানুভূতি বর্তমান সময়ে কখনও কখনও বিপদ ডেকে আনে। অজ্ঞাতনামা নারীর লাশ দেখে ক্রন্দনরত নারীকে সঙ্গত কারণেই পুলিশ সন্দেহভাজনের তালিকায় রেখে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। উত্তরাধুনিক সমাজের সর্বত্র বিরাজমান এক অস্থিরতার চিত্র, নিম্নবিত্ত জীবনের চালচিত্র শিল্পিতভাবে উপস্থাপনে লেখক দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

‘জানালার পাশে বসা মেয়েটি’―গল্পের শেষ লাইনের বিভ্রমভাব যেন গল্পের মূল সুরকে সুস্পষ্ট করে তোলে। ‘আমি দেখতে পাই আমার মনগড়া যুক্তির জাল ছিন্ন করে শারমিন নামের সাধারণ কিন্তু জলজ্যান্ত মেয়েটি জলের ভেতর থেকে একটি জ্যান্ত ক্ষিপ্র মাছের মতোই পিছলে বেরিয়ে পড়ে সারা কক্ষে সাঁতার কাটতে থাকে।’ (পৃ. ৩৬) পরীক্ষা কেন্দ্রের একটি রুমের আসন বিন্যাস এবং একজন নারী কক্ষ পরিদর্শকের মনে উদ্ভূত কিছু চিন্তার বিস্তৃতিতে এ গল্পের কাহিনি পূর্ণতা পেয়েছে। পেরেক গল্পগ্রন্থের সূচনায় লেখকের দাবিকৃত বোধ বা অনুধাবনের তীব্রতা এ গল্পে যেন ষোলো আনা সংযোজিত হয়েছে। কক্ষে চুয়াত্তরজন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একটি মেয়ে বাকি তেয়াত্তরজন ছেলে শিক্ষার্থী। মেয়েটি শেষ বেঞ্চের এক কোনায় জানালার পাশে বসেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের একই ইউনিফর্ম হওয়ায় নারী পরিদর্শক মেয়েটিকে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে খেয়াল করেন। কক্ষে একটি মেয়ের উপস্থিতি এত দীর্ঘ সময় পরে চোখে পড়ায় তিনি কিছুটা বিস্মিত হন। তাঁর সহকর্মী দুজন পুরুষ পরিদর্শক বিষয়টি প্রথম থেকেই জানেন ভেবে তিনি আরও বিস্মিত হন। প্রকৃতপক্ষে একজন পরিদর্শকের ছাত্রীটিকে দেখতে পাওয়া বা না পাওয়া মুখ্য বিষয় নয়। এই গল্পে মুখ্য হয়ে উঠেছে পারস্পরিক বিপরীত লিঙ্গের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক সচেতন প্রবণতা। ছাত্রীটি একটি এক্সট্রা কাগজ চাইলে সহকর্মী দুজন পুরুষ পরিদর্শক মধ্যে নারী পরিদর্শক প্রতিযোগিতার মনোভাব উপলব্ধি করেন। সঙ্গত কারণেই বলেছেন―‘জহিরুল আর সালেহীন দুজনেই কাগজ নিয়ে ওর কাছে যেতে উদ্যত হন। শেষ পর্যন্ত জহিরুলেরই জয় হয়।’ কাগজ নেওয়ার মুহূর্তে শারমিন নামক একমাত্র ছাত্রীর উপস্থিতি কক্ষে উপস্থিত তেয়াত্তরজন ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সকলের চেতনায় শারমিনের জ্যান্ত মাছের মতো সারা কক্ষে সাঁতার কাটতে থাকাও অস্বাভাবিক নয়।

‘গজার পীর’ গল্পটি পেরেক গল্পগ্রন্থের অন্তর্গত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক রচনা। মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধ-বিগ্রহ হত্যা লুণ্ঠের বীভৎসতায় সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসা একটি বড় স্থান দখল করে আছে। এ গল্পে সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসার বলি হয়েছে বনলতা ও তার পরিবার। গজার মাছ কাটার সময় মাছটি হাত ফসকে লাফ দিলে প্রাণ ভয়ে লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশি আমেনা অর্থাৎ বনলতার মাথার ঘোমটা সরে যায়। বনলতার সিঁথি রাঙানো সিঁদুরে তার আসল পরিচয় প্রকাশ্যে চলে আসে। এ অবস্থায় জাহেদার আশ্রয় থেকে বিতাড়িত বনলতা আত্মহত্যা করে সম্ভ্রম রক্ষা করে। জনমনে বিরাজমান কুসংস্কারে বনলতার পরিচয় উন্মোচনকারী পুকুরের গজার মাছ পির সম্মানে ভূষিত হয়। বিধর্মীর মুখোশ উন্মোচন করতে এবং সংকট মুহূর্তে জাহেদার পরিবারকে পাপের ও বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পির গজার মাছের রূপ ধরে তাদের কাছে ধরা দিয়েছে। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন বিশ্বাসকে তারা লালন করে এবং এই কুসংস্কারের কালো ছায়াতেই মানবিকতার বলি হয়। বর্ণনা কৌশল, অভিনব ভাষার ব্যবহার এবং বোধের গভীরতায় জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে শিল্পসমৃদ্ধ করে পেরেক গল্পগ্রন্থের গল্পগুলোর অবয়ব নির্মিত হয়েছে। পেরেক গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্প লেখকের শিল্পবোধের সমৃদ্ধির পরিচায়ক।

‘রথ ও দ্বৈরথ’ গল্পে আমি এবং তুমি চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে মানব জীবনের অপ্রকাশ্য চিরসত্য। সূক্ষ্ম অনুভূতি বা নারী পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক আবিলতা যা স্বাভাবিক অবস্থায় স্বীকার্যের বিষয় নয়। কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমান এমন অপ্রকাশ্য সত্য বিষয়কে সহজ ভাষায় জীবনের খণ্ডচিত্রে দুঃসাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ্যে এনেছেন। আমি এবং তুমি চরিত্রের কথোপকথনে উপলব্ধ হয়ে ওঠে চরিত্র দুটির একজন নারী অপরজন পুরুষ পরস্পর কাজের সূত্রে পরিচিত। দুপুরে রেস্টুরেন্টে দুজন মানুষের নিজের অজান্তেই অহেতুক নিরিবিলি পরিবেশ খোঁজা, পরস্পরের কথোপকথনে একজনের অজ্ঞতা এবং কৌতূহলে অপরজনের বাকচাতুর্যের রসময়তা, মুখোমুখি বসে থাকা, খাবারের দৃশ্যের বর্ণনা, মাদকতার ঘোরের মধ্যে পরস্পরের ঠোঁটের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেওয়ার ঘটনায় নারী-পুরুষের যৌনতার অনুষঙ্গ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমানের শিল্পসত্তার সৃষ্টি নৈপুণ্যে আমি ও তুমি চরিত্রের মাধ্যমে অতিসাধারণ একটি আলোচনা, একটি কথোপকথন, একটি রেস্টুরেন্টের আবহকে বোদ্ধা পাঠকের কাছে রসময় এবং দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলেছেন। গল্পে বর্ণিত পরিবেশ পাত্র-পাত্রী সবই যেন পরিচিত। নিজেকে গল্পের চরিত্রের প্লটে প্রতিস্থাপন করেও যে সত্য উপলব্ধিতে আসে না। আবছা আঁধারেই থেকে যায় যে চিরসত্য। সাধারণের দৃষ্টিতে যা অপ্রকাশ্য থেকে যায় ঝর্না রহমানের দৃষ্টিতে তা সহজ সত্যে ধরা দিয়েছে। নারী-পুরুষের পারস্পরিক প্রকৃতিগত সহজাত আকর্ষণ রয়েছে যা বিনা বাধায় অবাধ যৌনতায় রূপ নিতে পারে। কেবলমাত্র নিজেদের সচেতনতার মাধ্যমেই এ বোধকে সুরক্ষিত এবং সংযত রাখা সম্ভব।        

‘তাহমিনার খোঁপা’ গল্পে নারীর চিরাচরিত স্বভাব এবং রূপের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আবহমানকাল থেকে পুরুষ সমাজ নারীকে একই রূপে দেখে অভ্যস্ত। নারীর আচার-আচরণ সাজসজ্জার বিন্দুমাত্র পরিবর্তনকে তারা গ্রাহ্য করতে পারে না। হোক সে পরিবর্তন সুদুরপ্রসারী, হোক তা পরিপাট্যের পরিচায়ক। প্রকৃতপক্ষে নারীর স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাচারিতাকে তারা মেনে নিতে পারে না। সঙ্গত কারণে স্বাধীনচেতা নারী মৌমিতার সংসার স্থায়ী হয় না। চিরপরিচিত রূপের পরিবর্তনে স্বামী তার দূরত্ব বাড়িয়ে নেয়। পার্লারে চুল কেটে ছোট কারায় তাহমিনা খোঁপা বাঁধতে পারে না। পাঞ্চ ক্লিপে চুল আটকে স্বামীর অবহেলায় তাহমিনা অনুভব করে খোপার মাঝে তার সমস্ত গৌরব লুকিয়ে ছিল। তার চিরপরিচিত পূর্বরূপই ছিল তার স্বামীর কাছে প্রিয়। ঘষে মেজে নতুনরূপের চাকচিক্যে তাহমিনার বয়স কমে গেলেও স্বামীর কাছে সে সৌন্দর্য গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না। সাংসারিক অস্বস্তিকর পরিবেশে স্বামীর কাছে চুল লুকাতে তাহমিনা বাথরুম থেকে ভেজা চুলও পাঞ্চ ক্লিপে বেঁধে বের হয়েছে। অস্বস্তির রুদ্ধশ্বাসে তাহমিনা যেন প্রতি মুহূর্তে তার পূর্বরূপে ফিরে যেতে চেয়েছে। সময়ের ব্যবধানে মনের অজান্তে চুল বড় হয়ে আবারও আড়াই প্যাঁচের হাত খোঁপা বাঁধতে পাড়ার গৌরব তাহমিনার নিজেকে লুকিয়ে রাখার প্রবণতাকে দূর করেছে। তাহমিনার খোঁপা গল্পটিও একটি বোধকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে।

‘পেরেক’ গল্পগ্রন্থের অন্তর্গত মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত তৃতীয় গল্পের নাম ‘জনপোড়া মানুষ’। এই গল্পগ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত তিনটি গল্পই ভিন্নআঙ্গিকে, ভিন্নতর ভাবব্যঞ্জনায় রচিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে পাকিস্তানি আর্মির নির্বিচার হত্যা, রাজাকারের শোষণ-দুবৃত্তায়নে সর্বস্বান্ত লালের মায়ের জীবন ইতিহাস এবং যুদ্ধপরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে তার নিঃসঙ্গ নিঃসহায় জীবন বর্ণিত হয়েছে। গল্পের গতিশীলতায় মুক্তিযুদ্ধের নৃশংস ভয়াবহতা, পাকিস্তানি আর্মির অমানবিক কার্যকলাপ এবং সুযোগ সন্ধানী রাজাকারের সর্বগ্রাসী শোষণ-উল্লাস সংযোজিত হয়েছে। ভিটেমাটি সন্তান-সন্ততি হারিয়ে লালের মা যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে রাজাকারের সন্তানসম্ভবা কন্যার বাড়িতে কাজ করে অনেকটা গৃহবন্দি অবস্থায় জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হয়েছে।

‘পারমিতা ও এক টুকরো কাঠ’-গল্পে পারমিতাকে নারী ও আকাশ বাড়ির কন্যা এবং একটুকরো কাঠকে পুরুষ চরিত্রের রূপকাশ্রয়ী বর্ণনায় অসাধারণ শিল্পসম্মত এক গল্প রচিত হয়েছে। পারমিতা ও এক টুকরো কাঠের দেখা হলে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে পরোপকারী ব্যক্তি শেষাবধি নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে অপরের উপকারে নিয়োজিত রাখে। এক টুকরো কাঠ পথপরিক্রমায় নৌকা থেকে ভেঙে সাধারণ বিচ্ছিন্ন এক কাঠের টুকরায় পরিণত হলেও তার পরোপকারী মানসিকতা থেকেই পারমিতার উপকার করতে এগিয়ে এসেছে।

সমাধি প্রাঙ্গণে দুই বোন গল্পগ্রন্থের নামকরণে বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল এবং তাঁর দুই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নামটি পাঠকমনে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গ্রন্থের অন্তর্গত নাম গল্প ‘সামাধি প্রাঙ্গণে দুই বোন’ শীর্ষক গল্পের কাহিনি বিন্যাসে বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলে দুই কন্যার আগমন এবং তাদের অন্তরে রক্ষিত পিতার প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা-ভালোবাসাপূর্ণ স্মৃতির অনুরণন ঘটেছে। অনুরণিত সমূহ স্মৃতি পাঠক মনকে গভীর আবেগে দুঃখ ভারাক্রান্ত অশ্রুসিক্ত করে তোলে।

সমাধি প্রাঙ্গণে দুই বোন গল্পগ্রন্থের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গল্পের নাম ‘প্রাচীরের পাখি।’ বঙ্গবন্ধু রচিত অনবদ্য আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ অসমাপ্ত আত্মজীবনী। এ গ্রন্থের প্রথমার্ধের বর্ণনার মূলভাব থেকে লেখক সচেতন প্রয়াসে শিল্পসম্মতভাবে ‘প্রাচীরের পাখি’ গল্পের অবয়ব নির্মান করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থ থেকে আলোচ্য গল্পে বঙ্গবন্ধুর সুদীর্ঘ কারাজীবন, সে জীবনের বিড়ম্বনা, একাকিত্ব, স্ত্রী সন্তানদের প্রতি মায়া-মমতাকেন্দ্রিক শূন্যতা, বাড়িতে চিঠি পাঠানোতে সীমাবদ্ধতা, কারাগারের বিভিন্ন দফার বর্ণনা, বন্দিদের দুর্দশাময় জীবন, কারাঅভ্যন্তরেও বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা, কারাঅভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধুর হাতে করা বাগান, আম গাছের ডালে কাকেদের সভা এবং দুটি বন্ধুসুলভ হলুদ পাখির পুনঃআগমনের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। উত্তরাধুনিক সমাজে বঙ্গবন্ধুর জীবনেতিহাস নতুন আঙ্গিকে, নতুন প্রজন্মের হাতে পাঠ উপযোগী করে গল্পের ছলে পৌঁছে দেওয়ায় ‘প্রাচীরের পাখি’ গল্পটি অসাধারণ শিল্পসৃষ্টির দাবিদার।

‘অন্ধকূপ’-গল্পে কতিপয় মানুষের চেতনার অন্ধত্ব, কুসংস্কারের লালন ও অন্ধবিশ্বাসে হিংস্রতার চরম প্রকাশ ঘটেছে। সমকালীন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অনেক ঘটনার নায়ককে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। ঘটমান বাস্তবতার নিরিখে অন্ধকূপ গল্পের কাহিনি রচিত হয়েছে। অন্ধবিশ্বাসে বিশ্বাসী মানস চেতনায়  প্রগতিশীলতার আলো বিবর্জিত যুক্তিহীনতার লালন এবং মানবিকতার অবক্ষয়ে শ্বাপদসম হিংস্রতার নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে। সঙ্গত কারণেই গল্পে মহাস্থানগড়ের অন্ধকূপের ছবি সম্বলিত প্রগতিশীল লেখা ক্যাপশনসহ ভাইরাল হলে ঘটনার নায়ক আটষট্টি বৎসরের বৃদ্ধ আলি হোসেনকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে।

‘মা-মেয়ের মনোলগ’ গল্পে কদবানু, তার মা এবং কদবানুর মেয়ে জরিনার নিম্নশ্রেণির জীবনবৃত্তে একটা পর্যায়ে এসে সন্তানের প্রতি মায়ের নির্ভরশীলতার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। পেটের দায়ে বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশে বৃষ্টিতে ভিজে, পানিতে ডুবে, পঁচাপাট সংগ্রহ করার মধ্যে বিভীষিকাময় সাবঅলটার্ন জীবন চিত্রের রূপায়ন ঘটেছে। বৃষ্টিতে ভিজে পাঠ সংগ্রহ করা, সেদ্ধ মিষ্টি আলু খেয়ে কাজের সন্ধানে বের হওয়ার মাঝে আবু ইসহাকের জোঁক গল্পের সাদৃশ্য উপলব্ধ হয়ে ওঠে।

বিষপিঁপড়ে গল্পগ্রন্থের ‘বিষপিঁপড়ে’ গল্পসহ অন্যান্য গল্পগুলো যেন মানুষের যাপিত জীবনের চলমান সমস্যার মূর্তিমান প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। নামগল্প বিষপিঁপড়েতে সমকালীন সময়ের বিষম সংকট, মূর্তিমান আতঙ্ক নারীর স্তন ক্যান্সার এর প্রসঙ্গ এসেছে। এ গল্পের লাবণী চরিত্রের মাধ্যমে স্তন ক্যান্সারে সম্পর্কে সচেতনতার বিভিন্ন ধাপ, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া এবং পরবর্তীকালে চিকিৎসার বিষয়টি সংযোজিত হয়েছে। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন  নারীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটও শিল্পিতভাবে এই গল্পে প্রাণ পেয়েছে।

বিপ্রতীপ মানুষের গল্প-নামক গল্পগ্রন্থে ‘নাম’ এবং ‘বিষাক্ত রক্তজবা’ শীর্ষক গল্পদুটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত। অনন্য গল্পে সংযুক্ত হয়েছে সামাজিক এবং মানস্তাত্ত্বিক সমস্যার প্রতিচ্ছবি। ‘বিষাক্ত রক্তজবা’―গল্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ধর্ষিতা নারীর মাতৃত্বের মহিমা ফুটে উঠেছে। ধর্ষণের বিষাক্ত বীজ গর্ভে ধারণ করে ঘৃণা আর মাতৃত্বের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত চরিত্রের টানাপড়েনে এই গল্পে মাতৃস্নেহের মহিমা প্রকাশিত হয়েছে। জাদুবাস্তবতার দুই সখি―গল্পগ্রন্থে ‘হাত’ গল্পটি অসাধারন শিল্পসৃষ্টির দাবিদার। দুটি ‘হাত’ কীভাবে একটি গল্পের কাহিনির নিয়ন্তা বা কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠতে পারে তা লেখক অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। বিলকিসের দুই হাত কীভাবে তার ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, শৈশব কৈশোরের গণ্ডি পেরিয়ে বন্ধনমুক্ত দুই হাতের কারসাজিতে বিলকিস কিভাবে সাফল্যের পথে এগিয়ে গেছে সে আখ্যান বর্ণিত হয়েছে।

অগ্নিতা গল্পগ্রন্থের অন্তর্গত―‘দিকচক্র ক্রসিং’ গল্পটিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি চলমান অত্যাচার-নির্যাতন, লুটতরাজ, সংখ্যালঘু নারী ধর্ষণ তথা নির্বিচারে সংঘটিত সামাজিক বিশৃঙ্খলার এক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এই গল্পে আব্দুল হাই চরিত্রের বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে আলোড়িত করে। কাহিনিতে কখনও কখনও আব্দুল হাই চরিত্রের তোষামোদকারী মনোভাবে মদদপুষ্ট হয়েছে এলাকার উঠতি মাস্তান তরুণরা। তবু আব্দুল হাই এই গল্পে মানবিক দয়া, মায়া ও  মমতার প্রতীক। প্রাণ রক্ষায় বিরুদ্ধ শক্তির ভয়ে ভীত আব্দুল হাই সংকটকালে বুদ্ধিমত্তার সংযোগে জীবনকে বিপন্ন করে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বড় করে দেখেছেন। এখানেই এই চরিত্রের সার্থকতা।

কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমান তাঁর লেখনী-প্রতিভায় একাধারে শিশু সাহিত্য বিভাগকেও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর রচিত দাঁতপরীর উপহার যেন প্রতিটি ঘরের গল্প হয়ে উঠেছে। শিশুদের দুধের দাঁত পড়ে যাওয়া নিয়ে প্রচলিত কিছু রীতির আলোকে তিনি ‘দাঁতপরীর উপহার’ গল্পটি রচনা করেছেন। দাঁত পড়ে গেলে, পড়ে যাওয়া দাঁতকে বালিশের নীচে রেখে ঘুমালে দাঁতপরী এসে দাঁতের বিনিময়ে শিশুর জন্য কিছু উপহার রেখে যাবে এমন গল্প যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। গল্পের সুহা চরিত্রটি তার পড়ে যাওয়া দাঁত নিয়ে দাঁতপরীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সুহার মুখে নতুন দাঁত ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দাঁতপরীর আগমন কল্পনায় সুহা আনন্দিত হয়ে ওঠে।

‘নীল কুমিরের বাচ্চা’ গল্পে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক্সপেন্ডেবল ওয়াটার টয়। এই ওয়াটার টয় মূলত সিলিকনের তৈরি। পানিতে চুবিয়ে রাখলে তা ফুলে ওঠে বড় আকার ধারণ করে। বাচ্চারা অনেক সময় ফুলে ওঠা বড় আকৃতির এ খেলনা দেখে ভয় পায়। নীলকুমিরের এক্সপেন্ডেবল ওয়াটার টয় পানিতে ভিজিয়ে রাখায় তা বড় হয়ে বড় কুমিরের আকৃতি নিলে নিশিতা ঘুম থেকে উঠে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে কুমিরটা বিছানায় এসে আমাকে কামড় দিয়েছে। পানিতে ফুলে ফেঁপে বড় হওয়া কুমির দেখে নিশিতার ভয় পাওয়া যেন প্রতিটা ঘরের গল্প হয়ে উঠেছে।

‘পরমা হারিয়ে গিয়েছিল’-গল্পে ছয় বছর বয়সী পরমার হারিয়ে যাওয়া এবং বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বাড়িতে ফিরে আসার বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। এই গল্প পাঠে শিশু এবং তাদের অভিভাবক শিশুদেরকে তাদের বাড়ির ঠিকানা শেখানোর গুরুত্ব অনুধাবনে তৎপর হবে। উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করে পরমা বাবা-মার কাছে ফিরে গিয়েছিল। শিশুদের তাদের নাম পরিচয় জানার এবং মনে রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এই গল্প সামাজিক উপযোগিতার  দাবি রাখে।

হুলো বিড়াল আর টুলো বিড়াল গল্পে পশু বা প্রাণীর প্রতি শিশুর ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। শিশুদের মনস্তত্ত্ব গঠনে এবং সামাজিকীকরণে, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনে পশুপাখি তথা প্রাণীর প্রতি ভালবাসার বোধ সৃষ্টি হওয়া এক অপরিহার্য বিষয়। হুলো বিড়াল এবং টুলো বিড়াল গল্পে বিড়ালের প্রতি ভালোবাসা থেকে শিশুরা এ বিষয়টির সংস্পর্শে আসতে সক্ষম হবে। কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৬০টি হলেও উপন্যাস তিনটি। বহুমাত্রিক রচনার মধ্যে ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্যের ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ এবং তালিকাও বেশ সুবিস্মৃত। তিনটি উপন্যাস যথাক্রমে পিতলের চাঁদ, কাক জোসনা, ভাঙতে থাকা ভূগোল-এ পারিবারিক সমস্যার জটিল আবর্তে ধূমায়মান জীবনের টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, উত্থান পতন, চেতনার নবজাগরনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে। ছোট গল্পের অনুরূপ উপন্যাসেও জীবনের বিশেষ বোধ উপলব্ধ হয়ে ওঠে।

২০২২ বইমেলায় প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ সমাধি প্রাঙ্গণে দুই বোন-এ গৌরচন্দ্রিকা শিরোনামে লেখক বলেন―‘কালি কলম মন লেখে তিনজন’―অর্থাৎ লিখতে গেলে কলম লাগবে, কলমে কালিও থাকতে হবে আর সবচেয়ে বেশি জরুরি যা তা হল লেখকের মন। কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমানের জীবনবোধ এবং অনুভূতি প্রবণতার তীক্ষ্মতা থেকেই সচরাচর প্রচলিত গল্পের কাহিনিপ্রধান ফর্মকে উপেক্ষা করে তিনি বোধসর্বস্ব নিমগ্নতায় উপলব্ধ আত্মমতকে গল্পে রূপায়িত করেছেন। মানব জীবনের তুচ্ছাতি তুচ্ছ ঘটনাকে উপস্থাপন-নৈপুণ্যে বিশিষ্টতা দান করেছেন। কলা নৈপুণ্যের প্রয়োগে কীরূপে শিল্প-সাহিত্য সুষমামণ্ডিত ও পাঠ উপযোগী হয়ে ওঠে, সে সম্পর্কিত বিশেষ বোধ কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমানের গল্পের পাঠকপ্রিয়তার মূল রশদ। সময়ের বিবর্তনে এ গল্পগুলো অগণিত পাঠকের গল্পপাঠের ক্ষুধা নিবৃত্তিতেও সহায়ক হয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়।

লেখক : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, এমফিল গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares