গল্প : খবরটা জানবার পর এসে কি বলবে ? : জাহিদ হায়দার

‘ইন্দ্রিয়ের দ্বারাই আমরা সকল প্রকার জ্ঞান লাভ করি। ইন্দ্রিয় না থাকিলে, আমরা কোনও বিষয়ে কিছুমাত্র জানিতে পারিতাম না।’

ইন্দ্রিয় : বোধোদয় : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

মনস্তত্ত্বের সাবেক অধ্যাপক সাব্বির করিমের মতে, ‘বোধোদয়’ একটি উত্তম গ্রন্থ। ‘একটি জাতির বোধবুদ্ধির উদয় না হলে মন এদিক-ওদিক চলে যায়’ ক্লাসে প্রায়ই বলতেন। মন ও বোধকে পাঁচ ইন্দ্রিয় কীভাবে প্রভাবিত করে―এই বিষয়ে ক্লাসে যত কথা বলেছেন, তার নোট যদি কোনও ছাত্র করত, দেখা যেত, আরও নোট করতে হবে।

একদিন, তখন শ্রাবণের শুরু, খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, কী একটা মনে করে তিনি ক্লাসে ব্যাগ থেকে ‘বোধোদয় বের করে বললেন, ডিকটেশন নাও, ত্বক অংশ থেকে পড়ছি, যা পড়ছি তার উপর আগামীকাল এক পৃষ্ঠা লিখে আনবে, ‘ইন্দ্রিয়গুলোর দ্বারা আমরা জ্ঞান লাভ করি। ইন্দ্রিয় না থাকিলে আমরা সকল বিষয়ে অজ্ঞ থাকিতাম। ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যে সকল জ্ঞান হয়, তাহা একত্র করিলে অভিজ্ঞতা জন্মে। অভিজ্ঞতা জন্মিলে, ভালো, মন্দ, হিত, অহিত, এই সমস্ত বিবেচনা করিবার শক্তি হয়।’

ডিকটেশন দেবার পর ডায়াস থেকে নেমে ক্লাসের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে, সাধারণত তিনি পড়াবার সময় ডায়াসে দাঁড়িয়েই পড়ান, বললেন, ‘ইন্দ্রিয় ও মনের রেসপন্স, রেসপন্সের পজিটিভ ও নিগেটিভ তোমরা লিখবে। আজ ক্লাস শেষ।’  তখনও বাকি ছিল পনেরো মিনিট। 

স্যার চলে যাবার পর একজন ছাত্রী তার বান্ধবীকে বলল, ‘স্যার বেছে বেছে ত্বক নিয়ে পড়লেন কেন ? শরীরের সব জায়গার ত্বকের রেসপন্স তো এক রকম নয়।’ 

আজ ১৮ এপ্রিল, ২০২০। অধ্যাপক করিমের সত্তরতম জন্মদিন। বিকালে নিজের বাড়ির দোতলার বারান্দায় বসে দু’জন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে বললেন, ‘আজ থেকে নব্বই বছর আগে ১৯৩০ সনের আঠারোই এপ্রিলে লন্ডনের সময় রাত আটটা পঁয়তাল্লিশের বুলেটিনে বিবিসি থেকে বলা হয়, ‘দেয়ার ইজ নো নিউজ।’ উনিশশ পঞ্চাশে ঐ দিনে আমার জন্ম। আমার জন্মের পর বিবিসি পনেরো মিনিট পিয়ানো বাজায়। আর আব্বা আজান দেন।’

এক বন্ধু বলেন, ‘তার মানে তোর জন্ম কোনও খবর নয়।’

সাব্বির করিমের বউ হেলেনা পাশের ঘর থেকে তিন বন্ধুর হাসির শব্দ শোনে। 

বন্ধুদের একজন বললেন, ‘এখনও প্রতিদিন বোধোদয় পড়িস ?’

‘প্রতিদিন না হলেও মাঝেমধ্যে পড়ি।’

বড় হয়ে মার কাছে জন্মসময় শুনে তিনি হিসাব করে দেখেছেন, হিসাবে একটু এদিক-ওদিক হতে পারে, পাবনার বাজিতপুরে দুপুরের পর যখন নানাবাড়ির টিনের ঘরে তার জন্ম হয় তখন বিবিসি বলেছিল, ‘দেয়ার ইজ নো নিউজ’।

জন্ম বৈশাখ মাসে। ঝড়ো বাতাস আর মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছিল। ‘টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজের ভিত্তির তুই জন্মালু’ সাব্বিরকে মা বলত। 

একদিন ক্লাসে, সেদিনও ছিল ১৮ এপ্রিল, সাব্বির করিম বলেননি, আজ তার একান্নতম জন্মদিন। কিন্তু সেদিন বিবিসির বিখ্যাত ‘দেয়ার ইজ নো নিউজ’ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

যখন রেডিও থেকে বলা হয়, ‘দেয়ার ইজ নো নিউজ’ তখন শ্রোতাদের মনের উপর কী রকম প্রভাব পড়তে পারে ? খবর ছাড়া মানুষ থাকতে পারে না নেই, সবরকম কথা তো একরকম খবর বা সংবাদ, মানুষ খবর ছাড়া থাকতে পারে না। যারা নিয়মিত খবর শোনে, খবরের কাগজ পড়ে, দেখা গেছে তাদের চিন্তা খবর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর যদি কোনও খবর না থাকে তা-হলে কী হবে ? খবর নেই শুনে শ্রোতারা অস্থির হয়ে যাবে। সেদিনও গিয়েছিল। শ্রোতাদের মধ্যে এক রকমের হতাশা দেখা দেয়। হতাশার কারণ, মানুষ সব সময় কোনও না কোনও খবর নিয়ে, কথা নিয়ে বাঁচতে চায়। খবর না থাকলে নিজেকে শূন্য মনে করে। হতে পারে, সেই রাতে বিবিসির শ্রোতারা ইংল্যান্ড বা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কোনও খবর না পেয়ে নিজেরা অনেক রাত পর্যন্ত অনেক রকম সন্দেহ আর ভয় নিয়ে কথা বলেছিল।

স্যারের আলোচনার সময় একজন ছাত্র বলেছিল, ‘দেয়ার ইজ নো নিউজ-ও তো একটা নিউজ।’  সাব্বির করিম ছাত্রের মন্তব্যের সঙ্গে একমত হন।

২.

শাদা চাদরের বিছানার ওপর খাবার টেবিল। ছোট। রং আবলুশ। কাঠের টেবিলের উপর হাতলঅলা স্বচ্ছ কাচের একটা বড় মগের গলা পর্যন্ত গরম পানি। ভাপ উঠছে।

মনস্তত্ত্বের সাবেক অধ্যাপক সাব্বির করিমের মেয়ে, ব্যক্তি স্বাধীনতায় আস্থাশীল কিন্তু স্বেচ্ছাচারী নয়, রেহানা ছ’মাস আগে সিডনি থেকে এসে বাবা ও মাকে জানায়, ‘শাকিল একটা বাস্টার্ড আর পারলাম না, ডিভোর্স দিয়েছি’, মগের মধ্যে দুটো টি-ব্যাগ দিল।

ব্যাগের সঙ্গে লাগান সুতোর অন্য মাথায় চা কোম্পানির হলুদ ট্যাগ ফ্যানের বাতাসে দু’বার দোল খেয়ে মগের গায়ে পড়ে আটকে যায়। সাব্বির করিম ট্যাগটা তুলে মগের হাতলে জড়িয়ে দিয়ে তাকালেন মেয়ের দিকে। কাজটা তো তারই করা উচিত ছিল। চা-এর দানাগুলো থেকে খয়েরি রস বের হয়ে পানির মধ্যে ধীরে ধীরে পড়ার সময় যে-দৃশ্য ‘সৃষ্টি’ হবে তা দেখতে, উপভোগ করতে যেন ঐ ট্যাগ চোখে না বাধে।  

‘নীরবতার মধ্যে সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয়। সৌন্দর্য কোনরকম শব্দ সহ্য করে না।’ অনেকবার বলেছেন অধ্যাপক।  প্রথম প্রথম তার এ-রকম কথায় কেউ কেউ হাসত।  এখন সবাই মেনে নিয়েছে, চা গলে পড়া একটা সাধারণ দৃশ্য, হয়ত ঐ-দৃশ্যের মধ্যে মানুষের মনের কোনও রহস্য অধ্যাপক বুঝতে চান, মানুষটা তার মতো করে মানুষের আচরণ ও কর্মচিন্তাকে বিভাজিত করুক না।

একজন সহকর্মী সাব্বির করিমকে বলেছিলেন, সৌন্দর্যের কি মানুষের মতো বোধবুদ্ধি আছে ? ফলে কোনও শব্দ হলে বিরক্তি দেখাবে ?’ সাব্বির করিমের জবাব ছিল, ‘আপনার সাথে এ-নিয়ে আমি তর্কে যাব না, কারণ এটা উপলব্ধির ব্যাপার।’

যখন টি-ব্যাগ থেকে খয়েরি রং পানির নিচের দিকে ধীর গতির পতনে দ্রবীভূত হতে হতে নামতে থাকে, রেহানা ছাড়াও বাসার অন্যরা, ভাই শিহাব, ভাবি সুলতানা ও মা এবং ক’জন আত্মীয় ও বন্ধু জানে সাতাত্তর বছর বয়সি মানুষটা তখন কথা বলা বা শুনতে পছন্দ করেন না।

রেহানার চার বছরের ইন্ট্রোভাট স্বভাবের মেয়ে সিনথিয়া, ইংরেজি ও বাংলা শব্দ মিশিয়ে কথা বলে। বেশিরভাগ সময় ওর চোখমুখ থাকে বিষণ্ন, হতে পারে মা ও বাবার ঘটনার কষ্টের ছাপ ঐ বিষণ্নতা। সকাল ও বিকালে নানা যখন চা খান, চায়ের গলে পড়া দৃশ্য সে মনোযোগ দিয়ে দ্যাখে। এবং সে-ও জানে, এই সময় নানা কথা বলা পছন্দ করেন না। টি-ব্যাগ মগ থেকে তোলার পর মায়ের সঙ্গে সিনথিয়া তার ছবি আঁকার টেবিলে চলে যায়। তার ছবিতে আগে থাকত পাখি, গাছ, আঁকাবাঁকা মুখ, সারিবদ্ধ গাড়ি, সিডনির অপেরা ও বড়ো বড় বিল্ডিং এবং তরঙ্গ জু’র রয়েলবেঙ্গল টাইগার ও বানর। আগের বিষয়গুলোর জায়গায় নতুন বিষয় এসেছে : নানার মগে চা গলে পড়া, রিকশা, ফুটপাতে মানুষের ভিড়। কখনও ব্রাশে নীল রং লাগিয়ে চায়ের খয়েরি রঙের ওপর পাখি আঁকে।

চলে যাবার সময় কোনও কোনও দিন নানা তাকে ডেকেছেন, এসেছিল, সিনথিয়া কোনও কথা বলেনি। নানা তার হাতে হাত রাখবার পর নানার মুখের দিকে সে তাকায় মাত্র। ক’দিন আগে নানা সিনথিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘গলে পড়তে থাকা চা দেখতে কেমন লাগে ?’ অধ্যাপক ভাবতেই পারেননি তিনি শুনবেন, ‘ড্যাড ওয়াজ ড্রাঙ্কেন, মিডনাইট, মমের দাঁত ভেঙে দেয়, ওয়াজ ব্লিডিং, টি-কালার ইজ সেইম অ্যাজ ব্লাড, বাট ইউ এনজয়।’ 

সাব্বির করিম তার পড়াশোনার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন, সিনথিয়া গলে পড়া চা-এর রঙের মধ্যে কী খোঁজে ? নাকি দেখতে দেখতে কষ্টকে দূর করতে চায় ?

সাব্বির করিম যখন বিশ^বিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র, বাইশ বছরের তরুণ, কিছুদিন আগে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দিয়েছেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এনএসএফের ছাত্র নামধারী গুণ্ডারা সব হলের দখল নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াচ্ছে, এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যেয়ে দ্যাখে, বন্ধুর বাবা গরম পানি ভর্তি স্বচ্ছ কাচের মগের ওপর চা-ছাঁকনি রেখে দু’চামচ চা দিলেন, আর চায়ের রং, এখন যেভাবে পানির মধ্যে নামছে, নেমেছিল। এবং বন্ধুর বাবা এক দৃষ্টিতে দেখছিলেন ঐ রঙের নেমে আসা। ‘অ্যামাজিং। লুক, অ্যালাইভ আর্ট ইজ মুভিং অ্যাজ লাইফ’ বলে তাকান সাব্বিরের দিকে।

হলে ফেরার সময় সাব্বিরের মনে সহজ সমীকরণের প্রশ্ন আসে, ‘নাফিসের বাবা, সন্ধ্যায় মদ না পেয়ে, মদের রং দেখে এক তৃপ্তি বা আনন্দ নিয়ে কি ঐ রঙের চা খান ?’ বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিল, ওর বাবা মদ্যপান করেন না। তিনি ছিলেন টিটোটেলার।

তখন কেবল বছর দুয়েক হয় শিক্ষক হয়েছেন সাব্বির, প্রেম শুরু করবার পনেরো দিনের মধ্যেই হেলেনা, বিশ^বিদ্যালয়ে সাব্বিরের বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী, পরে হবে বউ, জেনেছিল শাদা কাচের গ্লাসে বা মগে সাব্বিরের চা খাওয়ার আনন্দ-কারণ। শিক্ষকের ধারণা, জীবন অনেকটা এ-রকম, সময়ের পরিস্থিতির সঙ্গে মিশে যাবার চেষ্টা করে, কখনও ব্যর্থ হয়, যখন হয় না, ভাবে বিজয় হলো।

হেলেনা তখন সাব্বিরের বিভিন্ন আচরণ, রুচি এবং কোন কথার কী অর্থ বোঝার চেষ্টা করত। একদিন বলেছিল, ‘তুমি মনস্তত্ত্বর ভালো টিচার হতে পার, বিষয়টা হয়ত অনেকের থেকে ভালো বোঝো কিন্তু তুমি কখনও কখনও মানুষের আচরণ ও কথাবার্তা নিয়ে যা বলো, সবসময় ঠিক হয় না।’

সাব্বির হেলেনার কথার সঙ্গে দ্বিমত করেননি। বিয়ের পর বলেছিলেন, ‘মানুষের মন একটা অনন্ত নদী। সবসময় বহমান। সেখানে একইসঙ্গে আলো, অন্ধকার আর কুয়াশা ভেসে যাচ্ছে। মানুষ তো আনসার্টেনিটির প্রডাক্ট। অনেক সময় জানে না, কখন কী করণীয়, একটা ইনকমপ্লিট টাস্ক নিয়ে সব মানুষই একটা বিচ্ছিন্ন একজিস্টেন্স, খুবই অসহায়।’

৩.

সাব্বির করিম পারকিনসনের রোগী। বাম পা প্রায় পঙ্গু। বছর পাঁচেক আগে অসুখটা প্রথম ধরা পড়ে। এই রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা তখন বলেছেন, অসুখটা অনেক বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছিল, আপনি খেয়াল করেননি।

ক্লাস নিতেন হেঁটে হেঁটে। দুইপাশে বসা ছাত্রছাত্রীরা কী করছে আর কী করছে না পুরু চশমার কাচের ভেতর থেকে সবকিছু দেখতেন। ‘ফ্রয়েড আর ইয়ুঙ-এর পর সাইকোলজিতে অনেক নতুন নতুন মাত্রা, শুধু মানুষের মন নয়, রাষ্ট্রের, রাজনীতির, অর্থনীতির, ধর্মের এবং সমাজের যোগ… এই মেয়ে তোমার মন কোথায় ?’ ছাত্রীটা অবাক হয়ে গেছে, তার মন আসলেও ছিল অন্য কোথাও। খাতায় অনেকগুলো বৃত্ত আঁকছিল আর কাটছিল। স্যারের কথায় মন ছিল না। স্যার মেয়েটিকে কিছু বলেননি। একজন মানুষ কেন একমনে অনেক বৃত্ত আঁকে আর কাটে সেই প্রসঙ্গ এনে, ‘মানুষটা কোনও একটা সম্পর্কের শেষ খুঁজছে, ঘুরছে বৃত্তে কিন্তু সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না’, বলেছিলেন।

সে-দিন ক্লাস থেকে বের হওয়ার সময় একজন ছাত্র, তাঁরই টিউটোরিয়াল ক্লাসের, খেয়াল করেছিল, স্যার বাম পা একটু টেনে বাম দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটছেন। দ্বিতীয় দিনও ঐ ছাত্র একই অবস্থা দেখে। টিউটোরিয়াল ক্লাস শেষে সবাই চলে যাবার পর ছাত্রটি বলে, ‘স্যারকে একটা কথা বলতে চাই।’ স্যার ভেবেছিলেন পড়াশোনার কোনও বিষয়। ‘বলো, বলো।’ ছাত্র পায়ের ব্যাপারটা তার স্যারকে জানায়। তিনি শুনে হেসে বলেছিলেন, ‘তুমি কি জানো চীনা বিজ্ঞানী মাদাম য়্যুর গবেষণার ফল ? তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রকৃতি সামান্য মাত্রায় বামপন্থি। বাম দিকে একটু হেলানো। আমার বাম পা তার সৎ সাক্ষী।’

বিছানায় শুয়ে সাব্বির করিম মাঝে মাঝে হিসাব করেন, ঐ ছাত্র ঠিকই খেয়াল করেছিল। ডাক্তার অনেক পরীক্ষার পর, পারকিনসন শুরুর যে-সময় হিসাব বলেন তার সঙ্গে ঐ ছাত্রের বলা সময়-দিন মিলে যায়।

সাব্বির করিম কখনও কাউকে, অসুখ খুব দৃশ্যমান না হলে, অসুখের কথা বলেন না। অসুখ খুবই ব্যক্তিগত একটা বিষয়। এমনও দেখা গেছে, দু’একটি অদৃশ্যমান অসুখের কথা, যেমন রক্তে কলেস্টরেলের মাত্রা বেশি, সাব্বির করিমের বইয়ের মধ্যে বউ হেলেনা রক্তের রিপোর্ট পেয়ে জিজ্ঞেস করাতে জেনেছে। 

প্রতিটি মানুষই তো নিজেকে সুস্থ রাখতে চায়। অধ্যাপক দেখেছেন, যে-মানুষ অনেকরকম নেশার মধ্যে ডুবে গিয়ে অন্য এক অবাস্তব, হেঁয়ালিপূর্ণ, কুয়াশাপীড়িত আর নিজের বানানো স্বপ্নের জগতে আনন্দ খোঁজে, সে কেন এইভাবে নিজেকে ধ্বংস করে, জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়, ‘আমার এই পলায়নই আমার জন্য সুস্থতা।’ হয়ত ঐ নেশাগ্রস্ত মানুষটার গণনায়, সমাজের সব সত্য বা মান্য আচরণ বিচ্ছিন্ন বা শূন্যতায় ভরা, একটা সীমানা পর্যন্ত মানুষ সবসময়ই কোনও না কোনও অবস্থার কয়েদি।

মানুষকে অসুখের কথা জানালে অনেকরকম কথা শুনতে হয়। সে-সব কথা, বেশিরভাগ সময় অর্থহীন। অধ্যাপকের অভিজ্ঞতা বলে, মানুষ কোনও মানুষের অসুখের কথা শুনলে, সে মানুষ চিকিৎসক না হলেও, কত রকম পরামর্শ, পরামর্শ না দিতে পারলে অনেক মানুষ নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করে, যেচে দিয়ে আনন্দ পায়। শুধু আনন্দ নয়, সে যে পরামর্শ দিল তার অনেক রকম স্টেটমেন্ট আরও অনেক মানুষকে বলে, ‘সাব্বিরকে বললাম, পঁয়তাল্লিশের পর বছরে একবার হলেও থরো চেক-আপ করান দরকার, ফুড-হ্যাবিট বদলাতে হবে, রেডমিট খাওয়া যাবে না, হাঁটতে হবে, ও অবশ্য সিগারেট খায় না, সাব্বির তো কারও কথা শোনে না, ওর তো যুক্তির শেষ নেই, আরে জীবন কি সব যুক্তি হিসাব করে চলে ? তোর ঐ সাইকোলজিই তো এক হিসাব-ছাড়া কারবার। একদিন বলছিল, বাংলা সংখ্যা ‘চার’ আর ইংরেজি সংখ্যা ‘এইট’ আসলে দুটো শূন্যের আলিঙ্গন, কেউ কাউকে ছাড়তে পারছে না, একটি শূন্য নারী আর অন্যটি পুরুষ, হে হে হে হা হা হা।’

৪.

দুটো শুকনো পা ছোট টেবিেিলর নিচে লম্বা নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে। রেহানা বাবার পাশ থেকে চলে যাবার আগে মগে চিনির দুটো দলা, বহুমূত্রের রোগীরা খায়, দিয়ে গেছে। 

অধ্যাপকের ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি মগের ওপর। টি-ব্যাগ থেকে চা আর বের হচ্ছে না। মগ ভরা শুকনো রক্তের রং চা।

রেহানা ঘরে ঢুকল। মগ থেকে দুটো টি-ব্যাগ নিয়ে বিছানার নিচে বাম পাশে রাখা প্লাস্টিকের বালতির মধ্যে ফেলবার সময় বাবাকে বলল, ‘তোমার দুজন বন্ধু বিকাল পাঁচটার দিকে একটা বিবৃতিতে সিগনেচার নিতে আসবেন। আমি বলেছিলাম তুমি তখন ঘুমাবে। খালেদ চাচা বললেন, তা হলে সন্ধ্যা সাতটার পর আসবেন।’

আজকাল সব মানুষের সঙ্গ সাব্বির করিমের ভালো লাগে না। এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু খালেদ সরকার এখন কাউকে কথা বলতে দেন না, যে-কোনও বিষয়ে কথা শুরু হলে তার ব্যাখ্যা এমন ভাবে বলেন, মনে হয়, এর থেকে শ্রেষ্ঠ সমাধান নেই। সন্ধ্যা সাতটায় এসে কতক্ষণ থাকবেন আর কথা বলবেন, কে জানে। সাব্বির করিম বাধ্য হয়ে একসময় বলবেন, ‘খালেদ আমি এখন বিশ্রাম নেব।’ ‘বিশ্রাম’ শব্দটি শোনার পর হয়ত খালেদ বিশ্রামের উপকারিতা এবং বেশি বিশ্রাম নিলে শরীরের কী কী ক্ষতি হতে পারে তা নিয়ে আবার কথা বলবেন।

এই দেশের বুদ্ধিজীবীরা সরকারের অনেকরকম অপকর্মর প্রতিবাদ কখনও মানববন্ধনে, কখনও বিবৃতিতে এবং কলাম লিখে করছেন। কিন্তু খুব একটা কাজ হচ্ছে না। শুধু এই দেশেই কেন, পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সরকারই তার নীতিশাসনের চৌহদ্দির থেকে কখনও বের হয় না। সাব্বির করিম বিবৃতিতে স্বাক্ষর দিতে পছন্দ করেন না। কিন্তু বন্ধুদের অনুরোধে কখনও কখনও বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর দেন।

রেহানা জানে, তার বাবা বিবৃতিটা দু’তিনবার পড়বেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিবাদের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বলতে একটা সময়ে বলবেন, সরকার কি জনগণের নার্ভ বোঝে না, ঠিকই বোঝে, জনগণের সাইকোলজি কখন কীভাবে সরকারের পক্ষে নিতে হবে তার জন্য সব সরকারই লেখাপড়া  জানা একটা দালালশ্রেণি তৈরি করে, তার মধ্যে অনেক অধ্যাপক ও লেখকরা আছেন, ঐ শ্রেণির কথাবার্তা প্রতিদিন কয়েকটা টিভি টকশোর মাধ্যমে জনগণকে শোনানো হয়। সরকারের পক্ষের খবরের কাগজগুলোতে তারা পোস্ট এডিটোরিয়াল লিখে প্রমাণ করতে চায়, সরকারের পদক্ষেপ সঠিক। এখন সরকারের আশপাশে অনেক রত্ন আছে কিন্তু আকবরের নবরত্ন নেই।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর দেবার আগে সাব্বির করিম আগে কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিবৃতি দেওয়া এবং তার ফল যে শূন্য সে-সম্পর্কে কিছু কথা বলবেন। ‘আমরা বেশ ক’বছর আগে সরকার যখন একটি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করে শিক্ষানীতি বদলালো তখনও বিবৃতি দিলাম, সরকার কিন্তু তার সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়েনি।’

৫.

বছর পাঁচেক আগে ডাক্তার মেজবাহ পারকিনসন সম্পর্কে একটা নোট তার অধ্যাপক বন্ধুকে দিয়ে কী কী ব্যায়াম করতে হবে এবং ব্যায়ামগুলো নিয়মিত করলে সুস্থ থাকা যাবে বলে যখন আরও কিছু লিখিত নির্দেশনা দিলেন, সাব্বির করিম দুটো কাগজ পড়ে বললেন, ‘মনে হচ্ছে, বাম পা-টাকে বেশি যত্ন করিনি।’

ডাক্তার মেজবাহ যাবার সময় বাসার সবাইকে বললেন, সাব্বির যেন ব্যায়ামগুলো সকালবিকাল করে। যদি হাঁটতে বিরক্ত লাগে তা হলে বিছানায় শুয়েই দুটো পা ওপরে তুলে সাইকেল চালানোর মতো ব্যায়াম করতে হবে। আর লেখালেখির জন্যে আঙুলের আড়ষ্টতা কমাতে দিনে কুড়ি বার করে দু’বার বার মাকড়সার মতো ওপর-নিচে দশটি আঙুল দেয়ালে ওঠানামা করাবে। তা ছাড়া দুটো বল যখন তখন টিপবে।

বড় ছেলে শিহাব করিম বাবার জন্যে ওয়াকিং স্টিক কিনে আনল। প্রথম সাতদিন স্টিকের ব্যবহার হলো সকালবিকাল। বন্ধু ও আত্মীয়রা বাসায় এলে অধ্যাপক স্টিকটা দেখিয়ে হেসে বলেন, ‘দ্যাখো লাঠিতে ভর দিয়ে জাতির মনস্তত্ত্ব হাঁটছে। গন্তব্য অজানা। আচ্ছা তোমরা বলো, যে-মানুষটা চরম খারাপ অবস্থায় না পড়লে কোনও দিন পরের ওপর নির্ভর করেনি সে কীভাবে লাঠিতে ভর করে সামনে যাবে, নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখবে ?’  তাঁর কথা শুনে উপস্থিত শ্রোতারা হেসেছে। বউ বলেছে, ‘আমি জানি, তুমি একটু ভালো হলেই, লাঠি আর ব্যবহার করবে না।’ ‘শোনো লাঠি সবার হাতে মানায় না, গান্ধীর লাঠি ছিল পলিটিকাল আর চ্যাপলিনের লাঠি ছিল লাইফকে  খোঁচা দিয়ে দেখার।’ 

৬.

দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত অধ্যাপক সাব্বিরের ফোন বন্ধ থাকে। ঘুম থেকে উঠে তিনি ফোন অন করলেন। সাত জন ফোন করেছে। চার জন চেনা। তিনটি নাম্বার অচেনা। আননোন নাম্বারে অধ্যাপক কল ব্যাক করেন না। একটা সময়ে করতেন, দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অভিজ্ঞতা ভালো হয়নি। একদিন একটি মেয়ে বলেছিল, ‘আমরা কি কোথাও বেড়াতে যেতে পারি না ?’

চারজনের মধ্যে প্রথম কল ছিল প্রিয় ছাত্র ইকবাল আহমেদের। ইংল্যান্ড থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে এসেছে। তার থিসিস পেপার স্যারকে দিতে চায়। বিষয় ছিল : উপনিবেশের নাগরিকদের মন থেকে, জীবনচর্চা থেকে কলোনিয়াল হ্যাঙওভার এবং হীনম্মন্যতা দূর হয় কি না।

দ্বিতীয় ফোনটি ছিল তাঁর সহকর্মীর। তিনি তাঁর বউকে নিয়ে এক সময়ের সহকর্মীকে দেখতে আসতে চাইছেন। কখন এলে কিছু সময় কাটান যাবে। বন্ধুকে বলেছেন, সন্ধ্যার দিকে আসতে। এক ঘণ্টা কথা বলা যাবে।

তৃতীয় ফোনটি ছিল বন্ধু ডাক্তারের। নিয়মিত ব্যায়াম করা হচ্ছে কি না। ওষুধ যেন বাদ না পড়ে। পায়ে যখনি অন্যরকম অনুভ’তির লক্ষণ দেখা যাবে, ডাক্তারকে রিপোর্ট করতে হবে। অধ্যাপক যেন গুগলে পারকিনসন বিষয়ে বেশি পড়াশোনা না করে। বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সব জ্ঞান সবার জন্যে নয়।

চতুর্থ ফোনটি ছিল একজন সম্পাদকের। কাগজের জন্য একটি লেখা তার প্রয়োজন। বিষয় : ক্ষমতার শীর্ষে দীর্ঘদিন কেউ থাকলে তার চিন্তাচেতনা, আচার-আচরণ কীভাবে বদলায়।

অধ্যাপক সাব্বির চারজনের সঙ্গেই বেশ সময় নিয়ে কথা বললেন। এবং ছাত্র ও সহকর্মীকে বাসায় আসবার দিন ও সময় জানাবার পর ডাক্তারকে আশ^স্ত করলেন, নির্দেশনা মানা হচ্ছে।

কাগজের সম্পাদককে জানালেন, তাঁর পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। কারণ, ইদানীং তিনি ভয় পান। কী কী কারণে ভয় তাঁকে কাবু করে তার ব্যাখ্যা করেননি।

৭.

অসুখ বাড়ছে। ডাক্তার বাসার অন্যদের বলে গেছেন, ধীরে ধীরে সাব্বির নিশ্চুপ হয়ে যাবে। এবং এক সময় পারকিনসন ঢুকবে মাথায়। ওর যা যা ভালো লাগে, যেমন যে-সব ছবি, গান, খেলা ও দেখতে চায়, শুনতে চায় তা ইউটিউব বা সিডি চালিয়ে দেখাবে। ওর চিন্তা ও মন তো সচল জীবন্ত, ভালো থাকবে। যদিও ও মৃত্যুকে ভয় পায় না। মৃত মানুষকে নিয়ে অযথা কথা শুনলে খুব বিরক্ত হয়।

রেহানা ও তার ভাবি শিহাবের বউ সুলতানা ছবি ও গানের তালিকা করে অধ্যাপককে দেখালো। দেশি ও বিদেশি বিখ্যাত কিছু ছবির নাম এবং কোন কোন গায়ক-গায়িকার গান এবং কার কার সরোদ, সেতার ও বেহালা বাদন ভালো লাগে জানিয়ে তিনি হাসলেন।

‘হাসলে কেন বাবা ?’ রেহানার প্রশ্ন শুনে বললেন, ‘এখন ঐ-সব ছবি দেখলে আর গান শুনলে কি আগেকার আনন্দ আর পাওয়া যাবে ? শুধু স্মৃতিচর্চা হবে। তরুণ আর বুড়ো কি এক ? মানুষ তো স্মৃতির জাবর কাটা প্রাণী।’

বাসার এই মানুষটা যতদিন কর্মক্ষম ছিলেন, কখনও পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুদের পাশে, যাকে বলে বিশেষ সময়ে কর্তব্যপালন, করতে পিছপা হননি। কী কী করলে মানুষটা যতদিন বাঁচে, কিছুটা আনন্দ বা শান্তি পায়, তার ত্রুটি কেউ করছে না। বাসার বড়রা বুঝে গেছে, মানুষটার আয়ু বেশিদিন নেই।

তাঁর বিছানার পাশে, এখন তো সবসময় সবরকম ফুলই পাওয়া যায়, সাইড টেবিলে, তাঁর প্রিয় ফুল চার/পাঁচটি রজনীগন্ধার সঙ্গে একটি গোলাপ, শাদার মধ্যে লাল, ‘কী সুন্দর না ?’ তিনি বলবেন, প্রতিদিন রাখা হচ্ছে। এবং ঘরে তাঁর পছন্দের সুগন্ধি সকালবিকাল ছিটান হয়। 

খুব মৃদু আওয়াজে কখনও বাজছে ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে-যে নাচে/ তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ’। কখনও ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব/ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ।’

একদিন ক্লাসে তিনি গীতবিতান নিয়ে এসে একজন ছাত্রীকে ডায়াসে তুলে বলেছিলেন, ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে-যে নাচে’ গাইতে। ছাত্রছাত্রীরা অবাক। গানটি শেষ হলে সাব্বির করিম বলেন, প্রকৃতির যে মনস্তত্ত্ব, মানুষের ডিজায়ার এবং বিচ্ছিন্নতা, ব্যর্থতা এবং জন্ম ও মৃত্যু সব প্যারালাল ভাবে চলাচল করে, তার সবকিছু এই গানটিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন। ফর অল টাইম হি ইজ ওয়ান অব দ্যা গ্রেট ফিলোসর্ফাস অ্যন্ড সাইকোলজিস্টস্।

ঘরে যখন সরোদ বাজে, সাব্বির করিমের চোখ বন্ধ থাকে। ডান হাতের তর্জনী বাম হাতের উপরে নিঃশব্দে তাল ঠুকে যায়। তখন তার ঘরে বাসার কেউ ঢোকে না। মানুষটা যেন প্রার্থনায় ডুবে আছে। কোনও একটা অদৃশ্যের সঙ্গে কোনো একটা বিষয় মিলাচ্ছেন।  

ক’দিন আগে বাসার সবাইকে ডেকে বলেছেন, আমার জন্যে তোমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম, আনন্দ করা, এই যেমন তোমার মায়ের জন্মদিন পালন করা, মোট কথা কোনও কিছু যেন আটকে না থাকে। মানুষ তো মরবেই। একটু আধটু শোক তো হবেই। মানুষ শোকাবস্থা দেখাতে ভালোবাসে। কথাগুলো শেষ করেই বলেন, রেহানা ‘রোমান হলিডে’ ছবিটা লাগিয়ে দে।

কোনও কোনও দিন নিজের পুরনো ডায়েরি পড়েন। এবং কাঁপতে থাকা হাতে কিছু কথা লিখে, আশপাশে তাকিয়ে হাসেন, যেন কেউ হাসি দেখতে না পায়। গত পরশু লিখেছেন, কেবল ঘরের মানুষরা ছাড়া বন্ধু বা অন্য পরিচিতরা মৃত্যুর খবর জেনে কি করবে ? 

৮.

সাধারণত অসুস্থ মানুষ অনেকদিন বিছানায় পড়ে থাকলে বাসার মানুষরা মানুষটার কষ্ট দেখে কখনও কখনও সৎ ভাবেই আড়ালে বলাবলি করে, এত কষ্ট পাচ্ছে, তার থেকে মরে গেলে ভালো।

এবং অসুস্থ মানুষটা প্রিয়জনদের বলে, তোমাদের খুব কষ্ট দিচ্ছি, তোমাদের চোখের সামনে একজন মৃত্যুমুখী মানুষ পড়ে আছে, তোমাদের স্বাভাবিক কাজে, আনন্দে বাধা হয়ে আছে। তখন এক বিশেষ সৌজন্যে বাসার মানুষেরা বলে, ‘কী যে বলো না।’ ঐ কথা শুনে সাব্বির করিম মনে মনে হাসেন। মানুষকে কত রকম অভিনয় করতে হয়।

সাব্বির করিম কোনও কোনও রাতে দেখেছে তার বউ, মেয়ে ও ছেলে পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে মশারির পাশে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করেছে, মানুষটার শ^াস-প্রশ^াস চলছে কি না।

একদিন রেহানা মশারির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন তার মা-ও পা টিপে টিপে ঘরে ঢোকে। রেহানা মাকে দেখে মার কাছে যায়। ঘরের বাইরে যেয়ে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।

সাব্বির করিমের কথা বলা কমে আসছে। একটানা ছয়সাতটি কথা বলে থামছেন। থামবার পর আবার যখন কথা বলতে যাচ্ছেন, জিজ্ঞেস করছেন, কি যেন বলছিলাম ? কথার সূত্র কেউ ধরিয়ে দিলে যে-কথাটি বলছিলেন তা না বলে বলেন, হ্যাঁ ডাক্তার তো তাই বলেছিল, অসুখটা যখন মাথায় ঢুকতে থাকবে তখন আমার কথা বলা ধীরে ধীরে কমে যাবে আর আমি….’। ঐ পর্যন্ত বলবার পর থেমে যান।

বাসার সবাই জানে, সারা জীবন অনেক প্রসঙ্গে নিয়ে কথা বলা আর অপ্রসঙ্গ নিয়ে আড্ডা জমিয়ে রাখা মানুষটা এক সময় নিশ্চুপ হয়ে যাবে, ডাক্তার ঐরকমই বলেছেন, শুধু নিশ্চুপই নয় চোখ দুটো সামনে ঘটে চলা সব দৃশ্য নিঃসহায়ের মতো দেখে যাবে। মন অনেক কাজের প্রতিবাদ করবে কিন্তু বলতে পারবে না।

অধ্যাপক সকালে বাসার সবাইকে ডাকলেন। ছেলে শিহাব করিমকে আনতে বললেন কাগজকলম। তার শেষ ইচ্ছা লেখা হলো, ‘আমার মতু্যুর পর কাউকে মৃত্যুর খবর জানানো যাবে না। আমার সবচেয়ে কাছের প্রিয় মানুষগুলো, হেলেনা, শিহাব, সুলতানা, রেহানা ও সিনথিয়া সবাই তো এখানে আছে।’

ঐ পর্যন্ত বলে থামলেন। সবাই দেখছে তার ঘোলাটে চোখ। পাংশুবর্ণ মুখ। শুকনো ঠোঁট।

একটা দীর্ঘশ^াস পড়ল। সাব্বির করিম, আশ্চর্য, এবার কথার সূত্র হারাননি। স্বর দৃঢ়।

‘যা বলছিলাম, আমার কথাটি কাগজে লেখ এবং আমাকে কথা দাও, কাউকে বলবে না। মৃত্যুর পর যত তাড়াতাড়ি পারো, তোমরা জানো আমার ডেডবডি ঢাকা মেডিকেলে দান করা আছে, সেখানে দিয়ে দেবে। সারাজীবন আমি তোমাদের কাছে কিছুই চাইনি, আমার এই শেষ চাওয়া তোমরা পূরণ করবে।’

বাসার সবাই পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। হেলেনা কাঁদছে। তার মুখ দেখে সাব্বির করিম বললেন, ‘আরে একান্ন বছর তো একসঙ্গে ছিলাম। আনন্দের স্মৃতি বলবার সময়ও তোমার খারাপ লাগবে।’

তিনি আরও বললেন, ‘কেউ যদি আমার খবর নিতে ফোন করে তাকে বলতে হবে, আমি ভালো আছি, লাঠির সাহায্য ছাড়া হাঁটছি। ক’দিন পর কক্সবাজার যাবে। আমি তো সমুদ্র ভালোবাসি। তোমরা জানো, আমি আগেও বলেছি, সমুদ্রের সামনে বসলে আমি সবচেয়ে বোকা হয়ে যাই। বোকা হয়ে থাকার আনন্দই আলাদা।’ 

৯.

পৃথিবীতে এ-পর্যন্ত নির্মিত শ্রেষ্ঠতম ক্যামেরায় যদি দৃশ্যগুলো ধারণ করা যেত, প্রদর্শনীর আগে অসম্পাদিত সেলুলয়েডে যা আসত : একজন মানুষের শায়িত মুখের কঙ্কালের ভেতর থেকে সর্ব অর্থে জীবিত দুটি চোখ দেখছে, আশপাশে ক’জন মানুষ জীবনের সবরকম প্রবাহের মধ্যে গ্রহণযোগ্য নিয়মে চলমান। এবং সারাদিনে কয়েকবার মানুষটির আত্মজা রেহানা, ঐ চোখ দুটির সামনে দাঁড়িয়ে, এক আশাবোধ থেকে, ডাকছে, ‘বাবা, বাবা’। কম্পমান দুটি চোখ সাড়া দিল বোধ হয়, দেখে এবং কখনও স্পষ্ট, কখনও অস্ফুট কণ্ঠ শুনে তার আত্মীয় ও বন্ধুদের রেহানা, স্বরের আর্দ্রতা অনুমেয়, টেলিফোনে বলে, ‘বাবা আজ দুটি, আজ তিনটি কথা বলেছে, ডান হাত তুলে টিভি বন্ধ করতে ইশারা দিয়েছিল। এবং একবার হেসেছে।’

যে-কোনও কথা-স্বর  হচ্ছে সেই ধ্বনিময় উচ্চারণ, যা সাক্ষী দেয় জীবন এখনও বেঁচে আছে।

ভোর রাত। ফজরের আজান হয়ে গেছে। দোতলার ঘরের পাশে আম গাছে কাক ডাকছে। কাকের ডাকে নয়, ভোরে এই সময় রেহানার ঘুম ভেঙে যায়। দেখে সিনথিয়া খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। রেহানা উঠে বসে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে, ‘কখন ঘুম ভাঙল, বসে আছিস কেন ?’  সিনথিয়া দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, ‘নানা এসেছিল, এখনি চলে গেল।’ ‘আচ্ছা’ বলে মেয়ের মাথা বুকের উপর নিয়ে বলে, ‘তুই স্বপ্ন দেখছিলি।’ সিনথিয়া দু’তিন বার হাত নেড়ে বোঝায়, না । এবং বলে, ‘লুক অ্যাট দ্য ডোর।’ রেহানার মনে প্রশ্ন আসে, ‘রাত এগারোটার দিকে বাবাকে পানি খাইয়ে যখন ঘরে ঘুমাতে আসে তখন কি দরজা বন্ধ করিনি ?’  

রেহানা বাবার ঘরে যায়। আলো জ¦ালে। মশারি তোলে। বাবার মুখ হাঁ। চোখ খোলা। বড় করে তাকানো। কপালে হাত দিয়ে ডাকে, ‘বাবা, বাবা।’ কপাল ঠাণ্ডা। ভয় হয়। আবার ডাক দেয়। কোনও সাড়া নেই। রেহানা মা, ভাই ও ভাবিকে ডাকে।   

মনস্তত্ত্বের সাবেক অধ্যাপক সাব্বির করিম, বয়স তখন আটাত্তর বছর দুই মাস আট দিন, রাতের কোনও এক সময়ে  ঘুমের মধ্যে মারা গেছেন।  

রাতে, তখন একটা কিংবা দেড়টা হবে, হেলেনা একবার ঘরে এসে ডিম লাইটের হালকা নীল আলোতে দেখেছিল, স্বামী ঘুমাচ্ছে। তার কানে শ^াসের শব্দও আসে। মা যাবার কিছুক্ষণ পর ছেলে শিহাবও দেখে গেছে, বাবা ঘুমাচ্ছে। এবং তখন তাঁর মুখ ও চোখ খোলা ছিল না। 

মৃত্যুর পরপরই মুখ যেন হাঁ হয়ে না যায়, চোখের পাতা যেন থাকে ঘুমন্ত, নিচের চোয়াল ও মাথা গামছা বা ঐ-রকম কাপড় দিয়ে পেচিয়ে বেঁধে না দিলে মৃত মানুষের মুখ ও চোখ খোলা থাকে।

সাব্বির করিমকে একটু দূর থেকে এই অবস্থায় কেউ দেখলে প্রথমেই তার মনে হবে, মনসস্তত্ত্বের অধ্যাপক মানুষের মনের শেষহীন বৈচিত্র নিয়ে সম্মুখের ছাত্রদের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বোধ হয় কিছু বলছিলেন।

এগারো মাস ধরে বিছানায় শোয়া,পারকিনসন ও বয়সজনিত কিন্তু নিয়ন্ত্রিত বহুমুত্রে আক্রান্ত, শাদাটে চামড়ায় সেঁটে যাওয়া, হয়তো তখন শরীরের ওজন বিশ বা বাইশ কেজির কাছাকাছি, পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতার কঙ্কাল-কাঠামোর মানুষটি রাত এগারোটার দিকে পানি খাবার আগে, তাঁর মেয়ে রেহানার আশাপীড়িত ‘বাবা, বাবা’ ডাক শুনে, ক্ষীণ স্বরে শেষ উত্তর দিয়েছেন : ‘মা’। 

১০.

সাব্বির করিমের মৃত্যুর দু’দিন পর বিকালে সিনথিয়া তার মাকে বললো, সে নানার মতো করে চা খেতে চায়। রেহানা মেয়েকে কোনো প্রশ্ন না করে, স্বচ্ছ কাচের অন্য একটি মগে গরম পানি এনে সিনথিয়াকে তার ঘরে দিয়ে গেল। মেয়ের হাতে দুটো টি-ব্যাগ দিয়ে বলল, ‘তুমি পানিতে ব্যাগ দাও।’ সিনথিয়া একটা কাজ পেয়ে খুশি হয়। 

গরম পানির মধ্যে খয়েরি রঙের চা ধীরে ধীরে গলে পড়ছে। সিনথিয়ার স্থির দৃষ্টি ঐ দ্রবণের দিকে।

রেহানা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দু’বার মাথা ঘুরিয়ে মেয়েকে দেখলো। ‘ও কি কাঁদবে ?’ মেয়ে হয়তো নানাকে খুব মিস করছে বলে নানার একটি ভালোলাগার সঙ্গে নিজেকে সঙ্গী করতে চাইছে।

রেহানা একটু পর ঘরে ঢুকে দেখে সিনথিয়ার স্থির দৃষ্টি মগের উপর। চা আর গলছে না। ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় আসে। সামনের রাস্তায় একটা বিশ বাইশ বছরের মেয়ে ‘ছাই কিনবেন, ছাই’ বলতে বলতে যাচ্ছে।

ডাক্তার মেজবাহ’র ফোন। চারবার রিং হওয়ার পর রেহানা ধরলো। তার বন্ধু এখন কেমন আছে জিজ্ঞেস করলেন।

‘বাবা দু’দিন আগে সকালে মারা গেছেন। লাশ মেডিকেলে দিয়ে এসেছি।’

‘কি ? কি বলছ ? কি আশ্চর্য ! জানাবে না ?’

‘বাবা কাউকে জানাতে বারণ করেছিলেন।’      

‘কি বলছ ? ও বলল আর তোমরা শুনলে ? কেন না করেছিল।’

ডাক্তার মেজবাহ শুনলেন রেহানার দীর্ঘশ^াস। 

আবার জিজ্ঞেস করলেন, কণ্ঠে উত্তেজনা এবং রাগ, ‘কথা বলছ না কেন ? কি এমন হয়েছিল যে মৃত্যুর খবর জানাতে না করেছিল ? আমরা কি কেউ না ?’ ডাক্তারের একবার মনে হয় বলবেন, বলেননি, মনোবিদের এই ব্যবহার একটা নিষ্ঠুরতা।

রেহানা বললো, ‘না কিছু হয়নি। বাবা বলেছিলেন, মৃত্যুর খবরটা জানবার পর আত্মীয় ও বন্ধুরা মৃতের বাড়িতে এসে কি বলবে ?’

১১.

সিনথিয়া জানে মগ খুব গরম। সে খুবই সতর্ক হয়ে, যেন পানিতে দ্রবিভূত হওয়া ঐ রং ছুঁয়ে দেখতে চায়, মগে তর্জনি দ্রুত  লাগিয়েই সরিয়ে নেয়।

সে এখন ছবি আঁকবে।

১২.

রেহানা ঘরে ঢোকে। চোখ পড়ে সিনথিয়ার পড়ার টেবিলের উপর। সিনথিয়ার বইপত্র আর খাতার পাশে সাব্বির করিমের ডায়েরি। রেহানা ডায়েরি হাতে নিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, ‘এই ডায়েরি তোমার টেবিলে কেন ? কোথায় পেয়েছ ?’ সিনথিয়া তার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে লুকিয়ে রেখেছিল। ছবি আঁকতে বসার আগে ডায়েরিটা বের করে। কয়েকবার নেড়ে আবার ড্রয়ারে রেখে দিতে চেয়েছিল। ভুলে গেছে।

প্রায় সাত আট মাস আগে, তখনও সাব্বির করিম কথা বলতে পারতেন, কিছু লিখতে গেলে হাত কাঁপত, তবে বোঝা যেত বাঁকা বাঁকা অক্ষরে কী লিখেছেন।

এক বিকালে সিনথিয়াকে ডায়েরি দিয়ে নানা বলেন, কাউকে বলবে না, এই ডায়েরি তোমাকে দিলাম। লুকিয়ে রাখবে। আমাকে তোমার মা যদি ডায়েরির কথা বলে আমি একটা উত্তর দেব।

এবং সত্যি রেহানা বাবার বালিশের পাশে ডায়েরি না দেখে একদিন বাবাকে জিজ্ঞেসও করে, ‘ডায়েরিটা কোথায়?’       

 ‘এক বন্ধুকে দিয়েছি। অনেক কথা লেখা আছে, ওর কাজে লাগবে।’

রেহানা ডায়েরিটা নিয়ে পাতা ওলটায়। এপ্রিলের ১৭ তারিখ পর্যন্ত সব পাতায় নয়, কোনও কোনও পাতায় দু’চার লাইন লেখা। ১৮-ই এপ্রিল সাব্বির করিমের জন্মদিন। তারিখের নিচে লাল কালিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘নিজের মৃত্যুর শোকলিপি।’

অক্ষরগুলি আঁকাবাঁকা, তবে বোঝা যায়। লেখার শিরোনামের বেশ নিচে ডান দিকে একটা সরলরেখাসহ তিরচিহ্ন। সরলরেখার শেষ চলে গেছে বাম দিকে। এবং আর একটি অনুরূপ তিরচিহ্ন বাম দিকে, তার সরলরেখাও চলে গেছে পাতার ডান দিকের শেষ পর্যন্ত। তির ও সরলরেখা দেখে বোঝা যায়, খুবই ক্ষিপ্রতায় তির ও রেখা টান হয়েছে।  

রেহানা ১৯,২০,২১, ২২,২৩,২৪ তারিখের পাতাগুলো ওলটায় এবং ওল্টাতেই থাকে। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় ডান ও বাম দিকে সমান্তরালভাবে চলে গেছে তির। যেন শেষহীন দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা। এবং জুন মাসের ১৮ তারিখের পাতায় দুটো তির ও সরলরেখার নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা :

কোথায় যেন পড়েছিলাম, ‘শোককে ঠিক অসুখ বলা যাবে না।’

ঐ বাক্যের নিচে লেখা :

‘মৃত বাড়িতে অনেক মুখ। কিছুক্ষণের জন্যে কিছু মামুলি কথার অসুখে ব্যস্ত থাকে।’

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares