ভ্রমণ : পশ্চিমে হেলিছে রবি, আরও দূর যেতে হবে কবি : মাহবুবা হোসেইন

হবিগঞ্জের সাতছড়ি ইকোপার্ক

কে বলে জীবন সুন্দর নয় ? দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেটে পা ফেলে ফেলে যারা ঘুরে বেড়ায় তাদের জন্য কথাটা সত্য নয়। প্রকৃতি সেখানে নিপুণ হাতে সাজিয়েছে নিজের সংসার। শুধু চোখ থাকা চাই আর চাই নূর কামরুন নাহার আর আল্পনা ভাবির বন্ধুত্বের রসায়ন। বিষয়টি হবিগঞ্জ যাবার আগেও বারকয়েক বুঝেছিলাম মেঘনায়, মুন্সীগঞ্জে, সেন্টমর্টিনে এবং সর্বশেষ হবিগঞ্জে। এসব কথা পরে হবে, আগে হবিগঞ্জের কথাটা সেরেনি।

আল্পনা আপা যখন বললেন আমার ভাই হবিগঞ্জের ডিসি (ফুড), আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, চোখের তারা চকচক করতে লাগল লোভে, আর নূর কামরুন নাহার আপাকে সারপ্রাইজ দেবার আনন্দে। কিন্তু ভাবিই নি ঘটনাটা এত সহজে ঘটবে। এক করোনা, দুই আমি না হয় ‘নীড় ছাড়া পাখি’ কিন্তু আল্পনা আপা তো ‘সংসারি’―হাজারটা সামলাতে হয় কিন্তু আশ্চর্য, বলার সঙ্গে সঙ্গে কেমন সামলে-সুমলে ফেললেন সব, রচনা করে দিলেন এক অপূর্ব আনন্দ সফর।

ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস। নিজেকে লাল সবুজে সাজিয়ে নেওয়া মন্দ কি ? কথাটা যদিও কামরুন আপার আমি লুফে নিলাম, পরে নিলাম অ-মিশেল গঙ্গা যমুনার মতো লাল সবুজের জামদানি, গলায় রক্তিম কণ্ঠহার। আশা ছিল কামরুন আপাও সাজবেন একই সাজে কিন্তু তিনি সাবধানী, লাল সবুজকে দিতে চাননি রাস্তার ধকল, বেচারা লাল সবুজ এমনিতেই সয়েছে ‘নয় মাসের’ অসহনীয় অত্যাচার, আর কেন ? তবে যত্নে গুছিয়ে নিয়েছেন ব্যাগে, পরদিন সযত্নে পরবেন বলে। আল্পনা আপার শাড়ি ভীতি প্রচণ্ড, তাই তাকে নিস্তার দিয়েছি লাল সবুজ সালোয়ার কামিজেই।

হাতির ঝিল থেকে রওনা দিলাম যখন মনের ফুর্তি কি আর বাঁধ মানে ? প্রকৃতি কি করে জানল আমার মনের কথা ? কুয়াশার চাদর খানিক সরিয়ে হেসে বললে ফিরে এসে যেন ভ্রমণ বৃত্তান্ত শুনতে পাই, ঝিলের পানিও সায় দিল চিকচিক হাসিতে ‘হ্যাঁ শোনানো চাই’। হাত নেড়ে সায় দিলাম সানন্দে।

ঢাকা টপকে যেতেই কত কি যে। প্রকৃতি যে কত কথা বলে, যদিও নির্বাক তবু তার কথা আছে কিন্তু অনেকটা নির্বাক ছবির মতো।

কোথাও কাশফুলের পাড় দেওয়া এক টুকরো পুকুর, ঝোপের আড়াল শেষেই উঁকি দেয় টুকরো মেঘ আর নীল আকাশের ছবির বিশাল ঝিল, দিগন্ত সীমায় গ্রামের সীমারেখা, তারপরই শাই শাই করে ছুটে চলে হলুদ আর সবুজের লুকোচুরি .. শর্ষে আর কচি ধানের আড়াআড়ি-মাসটা যে পৌষ আর দিনটা কাচের আয়নার মতো। চোখে মুগ্ধতা কিন্তু আমাদের মুখে খই  ফোটা কি আর বন্ধ নাকি ? কামরুন আপা আছেন না ? এত জানা যার তার মুখ বন্ধ থাকে কি করে। আল্পনা আপার পিছে লেগে হাসির হররা ছুটিয়ে দিতে আর কতক্ষণ, হাহা হিহি অজস্র ধারা, আমি কেবল ধুনু দিতেই জানি।

সময়গুলো কি-রে ? তাদের পাখা আছে নাকি ? শাই শাই করে শেষ হয়ে গেল কখন ? সাইন বোর্ডগুলো সমানে বলে চলেছে হবিগঞ্জ হবিগঞ্জ। তাই নাকি ? এত তাড়াতাড়ি ? কেন ? কেন ম্যান ?

হবিগঞ্জে ব্যবস্থা তো একেবারে পাকা। ‘আমাদ’ হোটেলে। বিশাল রুমে শ্বেত কপোতের মতো তিনটা বিছানার হাতছানি, হাহা হিহির কি দারুণ আয়োজন। ধন্যবাদ দিতে হয় মেঝ ভাইয়াকে (ডিসি ফুড)-কোনও কোনও মানুষ কি করে বুঝে যায় সব ? তা না হলে সামাদ সাহেবেরই সংযোজন হবে কেন ? তার মতো উৎসাহী ফটোগ্রাফারের অভাবে আমাদের এত সাধের সাজগোঁজের বারটা বাজত নাকি ?

দাঁড়ান এ নিয়ে আরও পরবর্তী কথা হবে আপাতত পেটে তো কিছু পড়ুক ? সামাদ সাহেব জোগাড় করে পাঠালেন পরোটা ভাজি ডিম। সদ্ব্যবহার যখন হচ্ছে তখনও দিনের অর্ধেক। তবে আর দেরি কেন ? দেখে নেওয়া যাক না আশেপাশের কয়েকটা জায়গা। আধাবেলায় হবিগঞ্জের বিশাল ঐশ্বর্যের আর কতটুকুই বা দেখা যাবে ? তবু।

সামাদ সাহেব শুরু করলেন ‘সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান’ দিয়ে। ‘ইকোপার্ক’ এটি অর্থাৎ ন্যাচারাল বনাঞ্চলের সঙ্গে একটু ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা করে পর্যটকদের সুবিধা করে দেওয়া আর কি। কাজটি করে বনবিভাগই তবে ‘নিসর্গ’ নামে একটি এনজিও হাত মেলায় তাতে। ওরা স্থানীয় অধিবাসীদের হস্তশিল্প দিয়ে যেমন একটি সোভেনির শপ চালায় তেমনি স্টুডেন্ট ডরমেটরিতে একশ পঁচিশ টাকায় থাকার ব্যবস্থাও করে। শুনেছি, দেখিনি অবশ্য।

সামাদ সাহেব স্থানীয় মানুষ গলিঘুপচি তাঁর সব জানা, তাঁর ওপর নিশ্চিন্তে সব ছেড়ে দেওয়া যায়। জানেন তো পর্যটন এলাকার মানুষের এস্থেটিক সেন্স খুব প্রবল, মানুষ আর প্রকৃতির সঙ্গে থেকে থেকে তারা জেনে যায় পর্যটকদের কী ভালো লাগে আর কীভাবে ভালো লাগে, সামাদ সাহেব প্রটোকলের মানুষ, তিনি যে এটা জানেন তা তার ছবি তোলার বহর, আর কৌতূহলের পরিমাণ দেখে বোঝা যায়। ভ্রমণে তিনি অক্লান্ত, তার হাতে ভ্রমণ হয়ে ওঠে আনন্দময়।

সাতছড়ি যাবার পথটা কি দারুণ! এক ঘণ্টার পথ, দুপাশে সবুজ গালিচার থাকে থাকে উঠে যাওয়া চা বাগান, গাছের ছায়ার শান্তশ্রী। বিরাট ডানকান টি এস্টেট-আকুল হয়ে ডাকে ছবি তুলতে। এখানে নাকি এ রকম বেশ কয়েকটা চা বাগান আছে, নলুয়া, লালচাঁন, চান্দপুর, সাতছড়ি, তেলিয়াপাড়া। শুনেছি বাংলাদেশের একশ বাষট্টিটি চা বাগানের মধ্যে তেইশটি হবিগঞ্জে, একানব্বইটি মৌলভী বাজারে, উনিশটি সিলেটে, বাকিগুলো অন্যান্য জায়গায়, সর্বশেষটি পঞ্চগড়ে।

পথে যেতে সবগুলোকে কিন্তু আপনি দেখতে পাবেন না, সুন্দরী ডানকানকে দেখে তাদের সৌন্দর্যের কিছুটা আঁচ করা যাবে, আকবরের হেরেমের সুন্দরীদের না দেখেও যেমন তাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই তেমনি আর কি।

পথের ঝোপঝাড়ে অজানা বুনোফুল উঁকি দিয়ে জানাবে অভিনন্দন, ক্ষণিক মাত্র, তারপর বাঁশঝাড়ের সুড়ঙ্গ, প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে চলতে হবে খানিক, তারপর আবার ডানকান, কত বড় টি এস্টেট রে বাবা। সামাদ সাহেব বলেন দ্বিতীয় বৃহত্তর বাংলাদেশে, আচ্ছা ক্ষুদ্র-বৃহৎ যাই হোক না কেন এমন সাজানো গোছানো, ব্রিটিশদের হাতে জন্ম কি না।

এর মধ্যেও কেমন করে ঘুমায় মানুষ, তাও আবার কবি, সহ্য হয় বলুন। কামরুন নাহার আপাকে ডেকে বললাম আরে ঘুমান কেন, প্রকৃতি চলে যায় যে। তিনি সুন্দর চোখটি মেলে তাকান। আল্পনা ভাবির হিহি কখন বন্ধ হয়ে গেছে, চোখে মুখে মুগ্ধতা, শুধুই মুগ্ধতা, পারলে সবটাই তিনি ধারণ করে নিয়ে যান ঢাকায়, তারপর একটু একটু বের করে করে এনজয় করবেন আর হাসবেন, টুকটুক করে পাঠাবেন ছবি, বেশ কিছুদিন তার কাটবে সম্মোহনে। নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে মানুষ এভাবেই পাশ কাটায় নাকি ? একেকজন একেকভাবে ?

নূর আপা ঠিকঠাক ‘প্রকৃতি’ দেখছে কি না জানতে জিজ্ঞেস করলাম আপা প্রকৃতি দেখছেন ? আপার হেয়ালি উত্তর ‘প্রকৃতি কোথায় ?’ হাসির ছররা ছোটে আবার। দাঁড়ান গল্পটা বলেনি, তা না হলে সুবিধা হচ্ছে না।

আমার একজন স্টাফ কেবল কাজ করে কেবল কাজ করে। কোনও দিন ছুটিছাটা নেয় না। একদিন বললাম আচ্ছা আরিফ সাহেব আপনি কখনও ছুটি নেন না কেন ? আপনাকে তো কখনও ছুটি নিতে দেখলাম না ? উনি অবাক হয়ে বললেন ‘কেন ছুটি  নেব কেন ?’

এই আপনার ছেলে মেয়ে আছে, একটু বেড়াবেন টেরাবেন ? আপনি টায়ার্ড হন না ?

তিনি বিস্মত কাজের আবার ক্লান্তি কী ? বুঝলাম বাস্তবতাকে এভাবেই পাশ কাটান তিনি। বললাম না তা হবে না। আপনি আজই তিন দিনের ছুটির দরখাস্ত করবেন, ফ্যামিলি নিয়ে বান্দরবন ঘুরে আসবেন। ‘প্রকৃতি’ দেখে আসবেন একটু। তিনি যথারীতি ছুটি নিয়ে বউ বাচ্চাসহ বান্দরবন ঘুরে এলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম আরিফ সাহেব প্রকৃতি কেমন দেখলেন ? তিনি হতাশ হয়ে উত্তর দিলেন প্রকৃতি তো কিছু দেখলাম না ম্যাডাম। শুধু পাহাড় আর পাহাড়। গল্পটা আমাদের মধ্যে বেজায় চালু, সময় সময় লবণের ছিটা।

‘সাতছড়ি’ উদ্যানে ঢুকতে টিকিট কাটতে হয়। ‘সাতটি’ ছড়ার নামে এই উদ্যানের নাম। নূর কামরুন নাহার আপা বলেন, এর আগের নাম ছিল ‘রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট’―তা উনিই জানেন ভুল হলে দায় তাঁর। একটা ট্রেইল ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। এ রকম নাকি তিনটা ট্রেইল আছে তিন ঘণ্টার একটা, এক ঘণ্টার একটা, আরেকটা আধ ঘণ্টার। নির্দিষ্ট গাইড নিয়ে ট্রেইলগুলো ঘুরে আসা যায়। ছোট ট্রেইলটির শেষে আছে টিপড়া পাড়া যেখানে চব্বিশটি উপজাতীয় পরিবার বাস করে। তাদের জীবনযাত্রাও দেখে নেওয়া যায়।

সংকীর্ণ পথের আশপাশ থেকে অজস্র প্রজাতির গাছ লতাপাতা আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। আলো অন্ধকার, আলো অন্ধকার। একটা বুনো গন্ধ। বারবার শ্বাস টানতে ইচ্ছা করে। চিরহরিৎ ও পতনশীল পত্রযুক্ত সংরক্ষিত বনটি ১৯৭৪ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংশোধন আইনের আওতায় ২০০৫ সালে ২৪৩ হেক্টর এলাকা নিয়ে ‘সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে নাকি দুশ প্রজাতির গাছপালা, একশ সাতান্ন প্রজাতির পশু এবং দুশ প্রজাতির পাখি আছে। পাখিদের অভয়াশ্রমও। যদিও এখানে লজ্জাবতী বানর, উল্লুক, চশমা পরা হনুমান, মেছো বাঘ, মায়া হরিণ, আরও কিছু প্রাণী আছে। তবু দু-একটা বানর ছাড়া কারও সঙ্গেই দেখা হলো না। উনারা বোধ হয় মনুষ্য প্রাণীটিকে একটু সমঝেই চলেন, এদের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একটু উত্ত্যক্ত করার অভ্যাস আছে কি না। কামরুন নাহার আপা দেখলাম আল্পনা ভাবিকে গাছপালা বেজায় চেনাচ্ছেন … বুঝলেন এটা শাল, এটা গর্জন, এটা ডুমুর, আমাদের গ্রমের বাড়ির ডুমুর না বুঝছেন―বিদেশি ডুমুর, অভিজাত, এইটা আকাশমনি, আর এইটা-এইটা হলো পাম। আল্পনা ভাবি ভালো ছাত্রীর মতো সব শুনেটুনে মাথা নাড়েন কিন্তু উত্তর দিতে গিয়ে গরবর করে ফেলেন―শাল হয়ে যায় সেগুন, সেগুন হয়ে যায় শাল। কেমন টিচার দেখুন … ছাত্রীর ভাল্লুক দেখার শখ, হতেই পারে, বনে যখন ভাল্লুক আছেই, যদিও ভাল্লুক মামার পাত্তা নেই, টিচার অগ্যতা কি করেন অরণ্যের অন্ধকারে এক জায়গায় গাছের গুঁড়িতে শেওলা পড়ে ঘুপটি মেরে আছে যেন ভল্লুক মামা থাবা গেড়ে বসে আছেন, সেটাই দেখিয়ে দিলেন, ছাত্রীটি অম্লান বদনে বেদবাক্য মেনে নিলেন, আমি আর কী বলব ঘোলে যদি দুধের স্বাদ মিটে ক্ষতি কি ?

বেত গাছের আধিক্য ছিল আর ছিল নানারকম বাঁশ। আল্পনা ভাবী বেতগাছ কখনও দেখেননি, একটা ধরে টানাটানি করলেন যদি সঙ্গে যায়, উহু বেচারা নড়ল না তার কাছে অরণ্যই ভালো, শহুরে জীবন তার পছন্দ নয়, মাঝখান থেকে ভাবির হাতটা কিছু রক্তাক্ত হলো। নাহার আপা বেতফল খুঁজে খুঁজে হয়রান, আর আমার তখন … বেতের ফলের  তো তার ম্লান চোখ মনে আসে।

আমাদের সামনে এঁকেবেঁকে চলে আরণ্যক পথ ঝোপঝাড়ের ফাঁকে উঁকি দেয় সাদা বালুর নৃত্যছন্দ আরণ্যক ছড়া। ওখানে ছবি তুললে নাকি সমুদ্রের আবহ পাওয়া যায় তবে ডিঙিয়ে যেতে হয় কিছুটা জঙ্গুলে পথ, তাই সাহস হলো না।

পথের শেষে শত খানেক সিঁড়ি ডিঙ্গোলেই ওয়াচ টাওয়ার-পুরো বনটা দেখে নেওয়া যায় তাতে চড়ে কিন্তু এই বয়সে আরও পঞ্চশটা সিঁড়ি বাওয়ার সাহসই বা কার তবু যদি হতেম আমি আরব বেদুইন। সেই দুঃখ ভুলতে বন্যফুল মাথায় গুঁজে ছবি তুলে নিলাম কতেক।

‘পশ্চিমে হেলিছে রবি, আরও দূর যেতে হবে কবি’… কিন্তু আমাদের হেলদোল কই-ক্লান্তিহীন মুগ্ধতা আর ছবি তোলা, নড়বার নামটি নেই ? সামাদ সাহেবের তাগাদা আছে আরও কয়েকটা জয়াগা যে পথে পড়ে আছে তাই নামতেই হলো। নামার পথে আবার সেই চা বাগান―নামটি তার সাতছড়ি। যদিও নামবার উদ্দেশ্য মহৎ ছবি তোলা কিন্তু আশ্চর্য হলাম চায়ের ফুল দেখে-চায়েরও যে ফুল হয় এই প্রথম জানলাম, ছোট পাপড়ি মেলা সাদা ফুল, ভেতরে উত্তল কমলা কেশর। সুন্দর। গন্ধটাও মৃদু কিন্তু মিষ্টি, অনেকটা লেবু ফুলের মতো। চা বাগানের আলো আঁধারীতে ছবি তেমন ভালো আসে না, কিন্তু কি ক্যারিশমায় কে জানে সামাদ সাহেব অদ্ভুত সব ছবি তুলে ফেললেন। স্মৃতি হয়েই রয়ে গেল ওসব।

ভোলাগঞ্জ―‘বাংলাদেশের কাশ্মীর

অনেকগুলো সুন্দরের মধ্য একটাকে বেছে নেওয়া যে কী কঠিন কনে দেখা সম্ভাব্য পাত্রই কেবল তা জানে, আমাদেরও তখন সেই অবস্থা। আমাদের হাতে মাত্র একটা দিন, একগাদা সৌন্দর্যের মধ্যে বাছতে হবে মাত্র দুটো। কোনটা ? বিছানাকান্দি, মাধবকুণ্ড, ভোলাগঞ্জ না রাতারগুল ? বিছানাকান্দি আর মাধবকুণ্ড প্রচুর জনপ্রিয়, অলরেডি ব্যান্ড, এর-ওর-তার প্রায় সবারই দেখা, আনকোরার মধ্যে কেবল দুটো-ভেলাগঞ্জ আর রাতারগুল, তাদের সৌন্দর্যও অতুলনীয় কিন্তু যোগাযোগের অবস্থা খারাপ তাই অতি উৎসাহী ছাড়া তেমন কেউ যেতে পারে না। ততটা জনপ্রিয় নয় কিন্তু সিলেট-কোম্পানিগঞ্জ হাইওয়ে হয়ে যাওয়ায় এখন আর সেকথা খাটে না, সুন্দর প্রশস্ত রাস্তায় সিলেট থেকে দেড় ঘণ্টায় তেত্রিশ কিলোমিটার অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায় সাদা পাথরের দেশ ভোলাগঞ্জে। অনিন্দ্য সুন্দরীর কেন এমন নাম ? তার সৌন্দর্যের সঙ্গে নামটা ঠিক যায় না, আগের নামটাই বরং সার্থক, ‘পা-ধোয়া’ মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তাপুর-চেরাপুঞ্জির অজস্র বারিবর্ষণ মহান হিমালয়ের পা-ধুয়ে স্বচ্ছ-শীতল জল পিয়াইন-দোলাই নামে আপনার পায়ের কাছে এসে যখন ‘ধোলাই’ নামে নামবে আপনি ‘পা না ধুয়ে’ পারবেনই না। প্রাচীন বাঙালির সৌন্দর্য জ্ঞান এবং নাম দেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ অন্তত ব্রিটিশদের চেয়ে অনেক বেশি। হবে না কেন ? ব্রিটিশ কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসে যখন অনেক কষ্টে নিস্তব্ধ নির্জন সবুজ পাহাড়ে ঘেরা দিগন্ত বিস্তৃত সাদা পাথর, স্বচ্ছ নীল সবুজ পানির অপূর্ব সুন্দর দুর্গম এই স্থানটি আবিষ্কার করলেন তখন তিনি এর অকৃত্রিম সৌন্দর্যে অভিভূত হয়েছিলেন নিশ্চয় কিন্তু সেই সঙ্গে আদিগন্ত পাথর কোয়েরি দেখে প্রথমেই ঠিক তার মাথায় এসেছিল ব্যবসায়িক চিন্তা। প্রচুর অর্থ খরচ করে শুরু করে দিলেন পাথর, চুন, হাতির চামড়া বিক্রির ব্যবসা, সেই উদ্দেশ্যে ছাতকে বসালেন পাথর ক্রাশিং প্ল্যান্ট, হাতিয়ে নিলেন কোটি কোটি তংকা, নিজ দেশে কিনলেন ফার্ম সেই সঙ্গে কিনে নিলেন ব্রিটিশ লর্ডশিপ। পাথর সরানোর জন্য পরবর্তী সময়ে তিন কোটি টাকা খরচ করে বানানো হলো বাংলাদেশের প্রথম রোপওয়ে, জায়গাটার নামটাও পরিবর্তিত হয়ে হয়ে গেল ভোলাগঞ্জ। যদিও রোপওয়ে এখন পরিত্যক্ত, খুঁটিগুলো ছাড়া অবশিষ্ট নাই কিছুই তবু তা এখনও দর্শনীয়, নামে কিইবা এসে যায়।

সিলেট থেকে বেরুতেই মালিনিছড়া চা বাগান। দেশের বৃহত্তম চা বাগান। নামটা কি সুন্দর না ? মালিনিছড়া মালিনিছড়া, সারা পথ আমার মন গাইতে লাগল মালিনিছড়া মালিনিছড়া। ভোলাগঞ্জ বাজার ছাড়াতেই বাঁকা রাস্তার প্রান্ত শেষে ভেসে উঠল পাহাড় শ্রেণির ধূসর ছায়া, আঁকাবাঁকা ল্যান্ডস্কেপ সমতল বাঙালির কাছে আনন্দ-বিস্ময়, আনন্দে আমার হৃৎপিণ্ড প্রায় লাফাতে লাগল। সিলেট থেকে মাত্র তেত্রিশ কিলোমিটার উত্তরে স্বর্গীয় এক ল্যান্ডস্কেপ,  নদী পাথর পাহাড় আর মেঘের এক দেশ, নাম তার ভোলাগঞ্জ―টুকের বাজার, কে ভাবতে পারে মাত্র দেড় ঘণ্টায় চলে আসা যায় যেখানে অপেক্ষায় থাকে অজস্র দৃষ্টিনন্দন সুসজ্জিত ট্রলার, লাল, নীল সবুজ―যেনবা বিশ্ব সুন্দরীদের কিউই―বেছে নেওয়া যায় যে কোনটা, মাত্র আটশ টাকায় আটজনকে তিরিশ মিনিটে দুই ঘণ্টার জন্য নিয়ে যাবে মেঘালয়ের পায়ের কাছে, বিস্তর বিস্তৃত সাদা পাথর আর স্বচ্ছ নীল শীতল পানির দেশে। যাবার পথটা কি বলব, দূরে মেঘ আর পাহাড়ের হাতছানি, নিচে পাথর আর হাত দুয়েক স্বচ্ছ নীল পানি, তার নিচে কুচি পাথর-সাদা নীল, হলুদ, সবুজ, সাদারই আধিক্য। মাছেরা খেলা করে আপন মনে, মনে হবে হাত বাড়ালেই ধরা যাবে কিন্তু উহু ত্বরিত সরে পালাবে কিন্তু ততক্ষণে চোখ আপনার আপনি বুজে আসবে আরামে। আহ্ পানি এত ঠাণ্ডা ? বারবার হাত দিতে ইচ্ছা করবে, কিন্তু পথটা বড় সংক্ষিপ্ত―বড়জোর তিরিশ মিনিট, আশ মেটে না, তবে অপূর্ণ বলেই অবিস্মরণীয় ?

জিরো পয়েন্টে নেমেই অবাক হয়ে যেতে হয়, ওমা এ যে পাথরের সমুদ্র, দূরে স্বচ্ছ নীল পানি, মনে হবে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি কিন্তু না অত সহজ নয়, পাড়ি দিতে হবে পাথরের সমুদ্র, সে এক ভীষণ ভীষণ কঠিন কাজ কিন্তু পানির কাছে পৌঁছে গেলে নিজেকে ঠেকিয়ে রাখা কঠিন, নেমে পড়তেই হবে পানিতে, তবে সাবধান পাথরগুলো বড় পিচ্ছিল। ছেলেরা নেমে নিজেকে ভাসিয়ে দেয় পানিতে, মেয়েরা বড় বড় পাথরে বসে ঠাণ্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকে। কিছু দূর বাঁ পাশে ভারত সীমান্ত তা পাড়ি দেওয়া নিষেধ তবে নোটিশ বোর্ডের সামনে ছবি টবি তুলে ভারত ভ্রমণের আশ মিটিয়ে নেওয়া যায়।

পাথরের সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার আগেই মুগ্ধতা আপনাকে গ্রাস করে  নেবে। ওপাড়ে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মেঘের ভেলা, নিচে সবুজাভ নীল পানি, স্বচ্ছ আকাশে পেঁজা পেঁজা মেঘ। অপূর্ব। মেঘালয়ের অসংখ্য ছড়া, পিয়াইন আর দোলাই নদীর মিলিত ধারা ভোলাগঞ্জের ধলাই নদী ওপাশের অসংখ্য উঁচু নিচু পাহাড়, শতশত পাহাড়ি ছড়া আর বর্ষায় পাহাড় থেকে নেমে আসা দিগন্ত বিস্তৃত পাথর কোয়ারি, আকাশের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মিলিত নির্যাস―এর সৌন্দর্য কি বর্ণনা করা যায় ? শীতে তবু কিছুটা বর্ণনার যোগ্য―তখন সৌন্দর্যের সমাহার মিলিত না হয়ে আলাদা আলাদা থেকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য কিছুটা বজায় রাখে কিন্তু বর্ষার মিলিত সৌন্দর্য―বর্ণনাতীত।

মেঘালয়ান মেঘের অনবরত বর্ষণ, বালুকাময় দোলাইয়ের ঢেউভাঙা পাড় আর সাদা পাথরের সমুদ্র ভ্রমণপিপাসুকে বিমোহিত করবেই। বর্ষাই ভোলাগঞ্জ ভ্রমণের সঠিক সময়।

ভোলাগঞ্জকে বলা হয় বাংলাদেশের কাশ্মীর, হাসবেন না সত্যি কিন্তু তাই, আমাদের ছোট্ট দেশ, শিশিরেই আমাদের সমুদ্র দর্শন, নান্দনিকতা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ আকারে কিবা এসে যায়, একবার গিয়েই দেখুন না।

রাতারগুল―‘সিলেটের সুন্দরবন

রাতারগুল নামটা কেমন অদ্ভুত, সিলেটের অন্য নামগুলোর সঙ্গে যেন ঠিক মেলে না সেখানে ‘ছড়া-ছড়ির’ ছড়াছড়ি যেমন মালনিছড়া, সাতছড়ি, লোভাছড়া। মেঘালয় বেষ্টিত সিলেট হাজার ঝরা বা ছড়ার দেশ তাই ‘ছড়ার’ ছড়াছড়ি কিন্তু রাতারগুল ? এ কেমন নাম অর্থই বা কী ?

সিলেট শহর থেকে মাত্র ছাব্বিশ মাইল উত্তরে পাঁচশ চার একরের এক জায়গা, জায়গাটা একেবারেই অন্যরকম। অনন্য। যেন একখণ্ড সুন্দরবন গোটা তুলে এনে কেউ বসিয়ে দিয়েছে শিমুলবিল, নোয়াবিল, গোয়াইন নদীর মাঝে যার নাব্যতা ধরে রাখে চেংঙ্গির খাল। দূর থেকে মনে হয় ছায়া ঘেরা সবুজ সরোবরে জমাট শেওলা, হাওরের মাঝে দারুচিনি দ্বীপ, আসলে ওটা বন, রাতার (মুতার) বন যে বনের ঘাস দিয়ে তৈরি হয় রাতা বা পাটি, আসলে ভাসন্ত পাটির বন বা রাতারগুল, মিঠা পানির ম্যানগ্রোভ, পৃথিবীর সংখ্যালঘু সোয়াম্প ফরেস্টের একটি, আমাদের দুর্লভ ঐশ্বর্য। ঐশ্বর্যই বটে না দেখলে অনুভব করা কঠিন। সিলেটের এয়ারপোর্ট রোড থেকে সিলেট-কোম্পানিগঞ্জ হাইওয়ে ধরে পৌঁছতে হবে ধোপাগুল পয়েন্টে, সেখান থেকে ধোপাগুল হরিপুর রাস্তা ধরে গোয়াইন নদীর মটরঘাট, সেখান থেকে ট্রলারে দশ মিনিটে রাতারগুল বন।

ছোট ছোট খাল চলে গেছে বনের  ভেতর দিয়ে, দু’পাশে করচ কদম হিজলের বন, আরও অনেক প্রজাতি আছে, অসংখ্য তাদের নাম, কিন্তু এখানে সকলের মিলিত প্রচেষ্টা এক, পানিতে বেঁচে থাকা … বর্ষায় কিংবা শীতে, সময়ে শুধু তাদের মৌসুমি সৌন্দর্যের পার্থক্য হয়ে যায়, বর্ষায় ভাসন্ত ফুলের মতো, শীতে প্রাগৈতিহাসিক ভাস্কর্যের ন্যায়।

বর্ষায় গাছেদের গুচ্ছ ভাসে বিশ তিরিশ ফিট পানির ওপরে, শীতে দশ ফিট পানি কেবল, তার ওপরে শিকরের ঝালর, তার ওপরে গাছের চাঁদোয়া। বর্ষার নৌকো চলার খাল শীতে হয়ে যায় পায়ে চলার পথ। নিচে রাতার বন ওপরে প্রাচীন বৃক্ষের ভাস্কর্য। ছায়াচ্ছন্ন চিরল চাঁদোয়ার নিচে রাতার ঘেরা সরু পায়ে চলার পথ, কোথাও শেওলার চাতালে সরু সরু আঁকাবাঁকা পথ।

বর্ষায় গাছের শিকড় স্বচ্ছ পানির নিচে দোল খায়। ভ্রমণ পিপাসুরা কোষা নৌকায় যেতে যেতে গাছের ডালে হাত রেখে মাথা বাঁচাতে বাঁচাতে অবাক হয়ে দেখে গাছের শিকরের সঙ্গে মাছেদের লুকোচুরি, আর শীতে সরু খালের ঘোলা পানিতে কোষা নৌকায় চলতে চলতে ঝুলন্ত শিকড়ের জঞ্জালে অভিভূত হয়ে ভাবে এ কোনও সুদূর অতীতের মধ্য দিয়ে চলেছি ? সাপেরা, পাখিরা, সরীসৃপেরা চলতে চলতে হঠাৎ থেমে ভাবে এই মরা সময়ে ওরা কি দেখতে এসেছে ? ওরা কীভাবে জানবে আসলে ওরা খুঁজতে এসেছে ট্র্যাংকুইলিটি-বিরল নির্জনতা।

বিরল সেই নির্জনতা এখানে এই রাতারগুলে অনায়াসে খুঁজে পাওয়া যায়-শীতে কিংবা বর্ষায় যখন পর্যটক গোয়াইনের মটরঘাট থেকে ট্রলারে রাতার বনের কোলে নেমে প্রগৈতিহাসিক জড়ানো-প্যাঁচানো শিকড়বাকড়ের ভেজা ভেজা সরু পথ ধরে চলতে থাকে কোষা নৌকার সন্ধানে যা তাকে এঁকেবেঁকে নিয়ে যাবে সবুজ পানি আর গাছের ছায়ার আচ্ছাদনের ভেতর দিয়ে রাতার বনের একদম হৃদয়ের কাছটিতে, যেখানে দু’একটি পাখির কু কু কুজন ছাড়া আর সব শব্দেরা নিষিদ্ধ। এখানে শব্দেরা নিষিদ্ধ কিন্তু আলো আর ছায়ারা নয় তাই সেখানে গাছের ফাঁকে ফাঁকে সবুজ পানিতে চাঁদ বা সূর্যেরা ছায়া ফেলে, দিনে সূর্য চিরল পাতার ফাঁকে বিচ্ছুরিত করে আলো, জলের ছোঁয়ায় মাখন হয়ে গলে, আর রাতে চাঁদ নরম আলোয় আচ্ছন্ন করে পুরো বন, পাতার ফাঁকে চুমকড়ি আঁকে সবুজ শান্ত জলে, সকাল সন্ধ্যায় নিঃশব্দে পখিরা কুলায় ফেরে, ফেরে অনিশ্চিত পৃথিবীর বুকে থেকে একখণ্ড নিশ্চিত ‘অভয়ারণ্য’। রাতারের সকাল, সন্ধ্যা আর রাতের সৌন্দর্য তাই আলাদা, যেমন আলাদা দুপুরের―শীত কিংবা বর্ষায়।

তবে সেখানেও আছে বাস্তবতা, টুকরো টুকরো স্বার্থের দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা। তবে সেই প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে যায় নিস্তব্ধতা। নির্জনতার স্বরভঙ্গ করে না কখনও নৌকার মাঝিদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব অথবা সেই সব কচি শিশুদের গান যারা কোনও কোনও নৌকায় ভ্রমণকারীদের বিনোদন দিতে গায় … মধু হই হই বিষ হাওয়াইলা অথবা পুরনো কথাগুলো, অতীতের কথাগুলো কিংবা সিলেটের পোয়া আমি বাবা লন্ডনি … বরং তাতে মাত্রাই যোগ হয় কিছু।

এসছেন তো রাতারগুলে ?  কিন্তু সাবধান নির্জনতা ভাঙবেন না, এখানে গাছেরা ভাঙে না, পাখিরা ভাঙে না, ভাঙেনা সরীসৃপেরাও, তাহলে আপনি!

নেত্রকোনার সোমেস্বরী নদী

সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে বিরিশিরি যাওয়া এক মহাযজ্ঞ। সে কেবল পারা যায় সুসং দুর্গাপুর আর বিরিশিরি যদি আকুল হয়ে ডাকে। সে ডাক শুনতে পায় মুষ্টিমেয় কিছু পাগল পর্যটক। আমি শুনতে পেয়েছিলাম অনেক আগে, জানতাম একদিন না একদিন সাড়া  দেবই। সুযোগ হচ্ছিল না। এখন অপার অবসর-বাঁধা বন্ধনহীন। ফয়সালকে ফোন দিলাম―আমাদের নেত্রকোনার সহকারী কর কমিশনার, বলল, ‘ম্যাডাম জাস্ট চলে আসেন বাকিটা আমি দেখছি।’ সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল হাবিব ও তার পরিবার―ওরা ঘোরাঘুরির মাস্টার, নূর কামরুন নাহার আপা-কবি, লেখক, সাহিত্যিক সঙ্গে নিলে জাতি উপকৃত হবে আমি জানি, দু’চারটা দুর্দান্ত কবিতা বা ভ্রমণ বৃত্তান্ত নিশ্চিত বেরিয়ে যাবে। আমার ছোট ছেলে ফাইয়াজ আর নূর আপার বড় ছেলে তূর্য সঙ্গত করার জন্য সঙ্গে গেল। পরে জানবেন ছেলে দুটোকে সঙ্গে নেওয়ায়  কী যে জমে গেল। আমার ড্রাইভার আরিফ, বয়স ষাটের কাছাকাছি কিন্তু কৌতূহলের বয়স তার ছয়, সব কিছুতেই বিস্ময়-কৌতূহল আকাশ পরিমাণ। সঙ্গে হাবিবের ড্রাইভার সমির―পিতৃপ্রদত্ত নামটা তার পছন্দ নয় তাই চেঞ্জ করে রেখেছে শাকিল। নামে ভুল করলে মনে করিয়ে দিতে মুহূর্তমাত্র। বাড়ি নেত্রকোনায় তাই, উৎসাহ তার বাঁধভাঙা।

ঢাকা থেকে সকাল ছয়টায় রওনা হয়ে নেত্রকোনা না গিয়ে সরাসরি সুসং দুর্গাপুর। সেখানে গ্রান্ড লাক্সারি হোটেলে ব্রাঞ্চ তারপর উদ্দেশ্য বিরিশিরি। আহ্ সেই সোমেস্বরী নদী-যার নামের আকর্ষণ পর্যটককে পথে নামায়। সার্থক তার নাম। শান্ত মৌন গম্ভীর। দিগন্তে মেঘালয়-পাহাড়শ্রেণি আমার ছোট ছেলেটার মতোই সোমেস্বরীকে আদরে আগলে রাখে। সোমেস্বরীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বড় করে শ্বাস নিতে হয় প্রকৃতির বিস্তৃতি বুকে ধারণ করতে। নদীতে হাঁটু বড় জোর কোমর পানি তারপরও পার হতে নৌকা  তো লাগেই। ফয়সালের ভাবনা-অশেষ, আরাম দেবার কায়দাও ভিন্ন। কোত্থেকে নৌকায় বিছিয়ে দিল শীতল পাটি, মাথার ওপর ধরে দিলো ছাতা। পায়ের নিচে শান্ত নদী কিন্তু মাথার ওপর সূর্য মার্তণ্ড, ছাতার আড়াল খুব দরকার। নৌকা তো ভটভট করে চলল কিন্তু সে আওয়াজ শহুরে আওয়াজ নয় কারণ শান্ত প্রকৃতি তার বেশ কিছুটা শুষে নেয়। দিগন্ত বিস্তৃত মেঘালয়ের হাতছানি, সেই শব্দ শোনার সময় কোথায়। নৌকা থেকে নামতে কিছু কসরত কিন্তু করতেই হয় তবে সাহায্যের হাতগুলো বাড়ানো থাকলে সে-কিছুই নয়। ওপারে ইজি বাইকে উঠে পড়লে তারপর দুপাশে প্রকৃতিতে নিজেকে কেবল ছেড়ে দাও যতক্ষণ না বিস্ময়ে হতবাক হতে হতে বিরিশিরির লাল, নীল হলুদ আর সবুজ পানি পাহাড়ের অপরূপ কারুকাজে মিশে যাবে। প্রকৃতির এ এক অপার বিস্ময়―শুধু চেয়ে দেখ আর থেমে যাও, অপেক্ষা করতে থাক দিন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের সময়টা ক্যামেরায় ধরে রাখতে।

ততক্ষণে গাছের নিচে শীতল পাটি পড়ে গেছে, ছোট একটা স্পিকারও রেডি হয়ে গেছে। প্রতিভা কোথায় না লুকিয়ে থাকে। নূর কামরুন নাহার আপার ছেলে তূর্য, আমার ছেলে ফাইয়াজ মুগ্ধ করল গেয়ে। অবাক হতে হলো হাবিবের বড় মেয়ে রোজার গান গাওয়ার ক্ষমতা দেখে। সত্যি বলছি, তালিম দেওয়া গেলে সন্ধ্যার কাছাকাছি পৌঁছে যেত। হাবিবের ছোট ছেলেমেয়ে দুটোর গানও মনে মায়া ছড়ায়। বাঁশিতে সুর তুলল ফয়সাল, স্বকৃত সেই সুর প্রকৃতিকে একেবার কাছে টেনে নিলো। আমাদেরও ছাড়াছাড়ি নেই। নূর আপা আর আমাকে গাইতে হলো রবীন্দ্রসঙ্গীত। ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ বেঁচে নেই, তা না হলে কি হতো কে জানে। দিগন্তে পৃথিবী ঘোমটা টেনে দিলে সেই গান আমরা নিয়ে এলাম নেত্রকোনার হোটেলে। রাত দুটোয় শেষ হলো আসর। কিন্তু রেশ শেষ হলো না এখনও।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.