যে জীবন আমার ছিল : ইমদাদুল হক মিলন

ধারাবাহিক জীবনকথা

নবম পর্ব

তালুকদারবাড়ির ওপর দিয়ে আমি ভোরের স্কুলে যাই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমিনুল মামাদের বাড়ি, তারপর হাজামবাড়ি বায়ে রেখে হালটে উঠি। আমিন মুন্সীর বাড়ির ওদিক দিয়ে ধানীমাঠ ভেঙে গিয়ে উঠি তালুকাদারবাড়িতে। শীতসকালে ‘ওসে’ আমার পা ভিজে যায়। পা দুটো হয়ে ওঠে বরফের টুকরো। স্কুলে যাওয়ার উত্তেজনায় শীত টের পাই না। পরনের শার্ট হাফপ্যান্টের ওপর ছেঁড়া ফুলহাতা সোয়েটার। খালি পায়ে আমি একা একা হেঁটে যাচ্ছি। এখনও সেই-আমাকে আমি পরিষ্কার দেখতে পাই।

তালুকদারবাড়ির মানুষরা সংসারকর্মে ব্যস্ত হয়েছে। শিশুরা কাঁদছে, বৃদ্ধরা উঠোনের রোদে বসে শীত পোহাচ্ছে, মহিলারা রান্নাঘরে। তুলসীতলায় কয়েকটা গন্ধরাজ আর জবাফুল ছড়ানো। বাড়ির কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। তালুকাদারবাড়ির পুবপাশে বিশাল পুকুর। পুকুরের মাঝখানে জল মাপার জন্য লম্বা একটা বাঁশ পুঁতে রাখা হয়েছে। তার ডগায় ছোট্ট একটা মাছরাঙা বসে ধ্যান করছে। পাখিটার দিকে আমি খানিক তাকিয়ে থাকি।

স্কুলে আমার কয়েকজন বন্ধু হয়েছে। বাতেন আর হেনা দুই ভাইবোন। হেনা দেখতে ভারি সুন্দর। টকটকে ফর্সা মিষ্টি মুখখানি যেন ফাগুন দিনের আলো-মাখা। বাতেনও দেখতে সুন্দর। বন্ধুত্ব হয়েছে আসলে তার সঙ্গে। কিন্তু হেনা আমাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। টিফিন পিরিয়ডে মুড়লি ভাজা কিনে খায় দু’ ভাইবোন। আমি খেতে পারি না। পয়সা পাবো কোথায় ?   অল্প বয়সেই মেয়েদের একটা তৃতীয় নয়ন তৈরি হয়। সেই নয়ন দিয়ে হেনা আমাকে একদিন দেখতে পেয়েছিল। মুঠোতে মুড়লি ভাজা নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। ‘খাইবা ?  ’

লজ্জায় আমি ম্লান হয়ে গিয়েছিলাম।

বর্ষাকালে বাতেন আর হেনা যখন ওদের গ্রামের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নৌকায় করে মৌছামান্দ্রা গ্রামে চলে যেত, আমার মনটা তখন কেন যে খারাপ হতো! অসহায় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখতাম।

ঢাকায় চলে আসার পর দেখি হেনাও চলে এসেছে। ডিস্ট্রিলারি রোডে রাস্তার ওপার ভাড়া বাসায় হেনারা থাকে। বাতেন ভর্তি হয়েছে জুবলি স্কুলে আর হেনা পড়ছে মণিজা রহমান গালর্স স্কুলে। কিন্তু ঢাকায় এসে হেনা কেমন যেন বদলে গেছে। আমাকে তেমন করে চিনতে চায় না। বাতেনেরও নতুন ফ্রেন্ড সার্কেল হয়েছে। সেও তেমন পাত্তা দেয় না আমাকে। বোধহয় আমাদের গরিবিহাল জেনে ওরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

সাতষট্টি আটষট্টি সালের বহু বছর পর পূর্বাণী হোটেলে হঠাৎ করে হেনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। আমি তাঁকে চিনতে পারিনি, সে আমাকে চিনেছিল। আবদুল কাদির নামে একজন অভিনেতা ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে নিয়মিত অভিনয় করতেন কাদের ভাই। আমার অনেক নাটকও করেছেন। যার সঙ্গে মন দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক ছিল কাদের ভাইয়ের তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল অন্যত্র। চুয়াল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে সন্তান নিয়ে সেই প্রেমিকা ফিরে আসেন কাদের ভাইয়ের জীবনে। কাদের ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বাটা কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তিনি। পূর্বাণী হোটেলে বিশাল আয়োজন করলেন বিয়ের।

সেই অনুষ্ঠানে হেনার সঙ্গে দেখা। হেনার স্বামীও বাটা কোম্পানিতে চাকরি করেন। হেনা শাশুড়ি হয়ে গেছে। একটু মুটিয়েছে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চিনতে পারো ?’

এভাবে প্রশ্ন করার পর মানুষটিকে চিনতে না পারলে ভারি অসহায় লাগে। সেই অসহায়ত্ব নিয়ে কোনও রকমে বললাম, না আমি ঠিক…

‘আমি হেনা। কাজির পাগলা স্কুল।’

সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে ভেসে উঠল ছেলেবেলার স্কুল জীবন। হাতের মুঠোয় মুড়লি ভাজা নিয়ে হেনা বলেছিল, ‘খাইবা ?’

মোশররফ নামে কাজির পাগলার একটি ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল। আর হয়েছিল দেলোয়ারের সঙ্গে, হীরুর সঙ্গে। গ্রীষ্মের ছুটি যেদিন হবে, সেদিন প্রত্যেক ক্লাসের ছেলেমেয়ে দুআনা চারআনা করে চাঁদা দিয়ে বিস্কুট কিনত। বিস্কুটের মালা বানিয়ে স্যারদের পরিয়ে দিতো। যারা সচ্ছল পরিবারের, তারা আটআনা একটাকাও দিত বিস্কুট কেনার জন্য। মোশাররফ একবার পাঁচটাকা দিল। শুধু আমাদের ক্লাসে না, পুরো স্কুলেই সাড়া পড়ে গেল। এইটুকু একটা ছেলে পাঁচটাকা দিয়েছে ? 

মোশাররফ বলল, ‘এক পয়সাও কেউর দেওন লাগব না। আমার এই পাঁচ টাকায় বিরাট বিরাট মালা হইব। বিস্কুট যা লাগে আমি একলা কিনুম।’

হলোও তাই। মোশাররফের টাকায় কেনা কিছু বিস্কুট আমরা খেলাম, কিছু মালা বানিয়ে স্যারদের পরালাম। বাড়িতে না বলে টাকাটা মোশাররফ এনেছিল। তবে বাবা তাকে কিছু বলেনি। মোশাররফ নিজেই কথাটা আমাদের বলেছিল।

দেলোয়ার একটু ডাকাবুকো ধরনের ছিল। বয়সেও আমার চেয়ে একটু বড়। সে ওপরের ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছিল। তবে আমার গভীর বন্ধুত্ব হয়েছিল নূহ আর মফির সঙ্গে। মফিদের বাড়ি কুমারভোগ। ওর বড়ভাই শফি আজাদের বন্ধু। আমি তাঁকে শফিদা ডাকি। তাঁর হাতের লেখা খুব সুন্দর। সে ছাত্রও খুব ভালো। ক্লাসে ফার্স্ট হত। দাদা আর শফিদা ছুটিছাটার সময় একজন আরেকজনকে ডাকে চিঠি লিখে পাঠাতো। শফিদার বড়ভাই রফিদাও আমাকে খুব ভালোবাসতেন। মফি আমার চেয়ে এক ক্লাস নিচে পড়ত। একটু মোটাসোটা নরম ধরনের ছেলে। এক দুবার বিকেলবেলা মফিদের বাড়িতে গিয়েছি। ওর মা দুধ সেমাই রান্না করে খাইয়েছেন। কালু ছিল মফির বিয়াই। সে আমার সঙ্গে পড়ত। কালুর সঙ্গেও বন্ধুত্ব হয়েছিল। পরে কালুকে দেখেছি ঢাকার একটি বিখ্যাত চায়নিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার হিসেবে। চেহারা তেমন বদলায়নি কালুর। মিষ্টভাষী, অমায়িক মানুষ।

আমার খুব ইচ্ছে মফিকে একদিন আমাদের বাড়িতে এনে খাওয়াব। বুজিকে বলে রেখেছি। বুজি মোরগ পোলাও আর পায়েস বানিয়ে রেখেছেন। মফিও বলেছে আসবে। পরদিন স্কুল ছুটির সময় বলল, আসবে না। আমি অনেক সাধাসাধি করলাম, মফি কিছুতেই এলো না। মন খারাপ করে ফিরে এলাম। সব শুনে বুজি হাসিমুখে বললেন, ‘মন খারাপ কইরো না মিয়াভাই। তুমি পেট ভইরা খাও।’

মফির সঙ্গে ঢাকায় বেশ কয়েকবার আমার দেখা হয়েছে। যাত্রাবাড়ির ওদিকে থাকত। কিন্তু সেই বয়সের বন্ধুত্বটা আর ফিরে আসেনি।

নূহর সঙ্গেও তাই হয়েছে। আমরা দুজন দুজনার জন্য পাগল ছিলাম। নূহদের বাড়ি শিমুলিয়ায়। বেশ অবস্থাপন্ন ওরা। মফিকে নূহ খুব একটা দেখতে পারত না। বোধহয় আমার কারণেই। আমি মফিকে বেশি পছন্দ করি, না নূহকে, এই নিয়ে ওর ভিতর এক ধরনের ঈর্ষা কাজ করত।

টিফিন পিরিয়ডে হঠাৎ একদিন ছুটি হয়ে গেছে। নূহ আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল। দোতলা ঘরের নিচতলায় বসিয়ে ওর মা আমাকে ভাত খাওয়ালেন। এত বড় একটা কইমাছ ভুনা পাতে তুলে দিলেন! কী স্বাদ সেই রান্নার! কইমাছ খেয়েই পেট ভরে গেল। আরেকবার রাতে গিয়ে নূহদের বাড়িতে ছিলাম। দু’বন্ধু জেগে জেগে সারারাত গল্প করলাম। তার পরের বারের স্মৃতিটা ভালো না। বিকেলের দিকে গেছি নূহদের বাড়িতে। ভেবেছি রাতে থাকব, কিন্তু নূহর মা তেমন আগ্রহ দেখালেন না। নূহর ছোট বোনটি চা আর মুড়ি এনে খেতে দিয়েছিল।

রাতেরবেলা যেদিন নূহদের বাড়িতে ছিলাম তার পরদিন হলদিয়া স্কুলের মাঠে নূহদের ক্রিকেট খেলা ছিল। আমি খেলতে পারি না। তাও নূহ আমাকে জোর করে নামালো। অতিকষ্টে আমি বোধহয় দুই রান করেছিলাম।

আমি ঢাকায় চলে এলাম আর নূহ বোধহয় ওর ভাইয়ের কাছে চলে গেল খুলনায়। আটষট্টি উনসত্তর সালের দিকে আমাদের মুরগিটোলার বাসায় নূহ একদিন এল। সে লম্বা ফর্সা ঝকঝকে ছেলে। খুব ইচ্ছা সিনেমায় নামবে। খান জয়নুল নামে একজন কৌতুক অভিনেতা ছিলেন। খুবই জনপ্রিয় অভিনেতা। রাজ্জাক সুচন্দা বা রাজ্জাক কবরীর সিনেমাতে খান জয়নুলও থাকতেন। তিনি বিক্রমপুরের লোক। নূহর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এফডিসির কাছাকাছি এলাকায় খান জয়নুলের বাসা। আমাকে নিয়ে সেই বাসায় গেল নূহ। খান জয়নুল দেখি খুবই খাতির করে তাকে। দুপুরে ভালো খাবার এনে খাওয়ালো। নূহ থেকে গেল খান জয়নুলের বাসায়। আমি চলে এলাম।

তারপর নূহর সঙ্গে বহু বছর আমার আর যোগাযোগ নেই। তবে সিনেমায় নামা নূহর হয়নি। শুনেছি সে চট্টগ্রামে থাকে। পড়াশোনা শেষ করেছে কিনা জানি না। ভালো ব্যবসা করে। এক সন্ধ্যায় শ্যালে বার-এ গিয়েছি। আমার সঙ্গে বোধহয় রহমান। নৃত্যপরিচালক আমির হোসেন বাবুর সঙ্গে এক ভদ্রলোক বসে পান করছেন। বাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় বাহাত্তর সাল থেকে। ওয়াইজঘাটের বুলবুল একাডেমিতে সে নাচ শিখতো। আমি মুকুল আর কামাল গিয়েছিলাম রবীন্দ্রসংগীত শিখতে। লিয়াকত আলী লাকিও তখন আমাদের সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত শিখছিল।

সেই সন্ধ্যায় পাতলা নেশা হয়েছে আমার। বাবুর সঙ্গে বসা ভদ্রলোকটি হঠাৎ বলল, ‘এই, তুই আমারে চিনতে পারতাছস না ?   আমি মাহবুব।’

আমি চিনতে পারি না।

ভদ্রলোক আবার বললেন, ‘আমি মাহবুব, মাহবুব।’

কোন মাহবুব ? 

‘আরে নূহ, আমি নূহ।’

সামান্য মাতাল অবস্থায়ও নূহর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের দিনগুলোয় আমি ফিরে গেলাম। এত অভিমান হলো নূহর ওপর! বার বার মনে হচ্ছিল কেন সে আমার সঙ্গে এত এত বছর কোনও যোগাযোগ রাখেনি। পরিষ্কার গলায় বললাম, তোর সঙ্গে আমি কথায়ই বলব না।

পুরো ব্যাপারট বুঝল বাবু। সে দুই বন্ধুকে মিলিয়ে দিল। আমার তখন আটশো সিসির পুরনো একটা লাল রংয়ের মারুতি সুজুকি গাড়ি ছিল। পঁচাশি হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। ছয় বছর চালিয়ে এক লাখ বিশ হাজার টাকায় গাড়িটা আমি বিক্রিও করেছিলাম। বড় মেয়েটিকে নামাতে ভিকারুননেসা নূন স্কুলে এসেছি। স্কুলের উত্তর কোণে গাড়িটা পার্ক করার সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন থেকে আগুন বেরুতে লাগল।

এই গাড়িটা আমাকে কিনে দিয়েছিল গৌতম। তার এক বান্ধবীর ছিল গাড়িটা। গৌতম পরে ব্যাংককে রাস্তা পার হবার সময় গাড়ি চাপায় মারা যায়। তিনদিন হাসপাতালে পড়েছিল। দেশে কেউ জানতেও পারেনি। ’৯৭ সালে গৌতম আর তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ইউরোপে বেড়াতে গিয়েছিলাম আমি।

সেই মাতাল সন্ধ্যায় নিজের গাড়ি রেখে আমার ওই ছোট্ট মাররুতিতে উঠল নূহ। সে ব্যবসা করে বেশ টাকা পয়সার মালিক হয়েছে। মতিঝিল থানার সামনে নামল। নামার আগে প্যান্টের পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করল। দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম। নূহ হেসে বলল, ‘ডরাইতাছস ক্যান’ ?   এইটা আমার লাইসেন্স করা পিস্তল। পলিটিক্স করি তো। নিজের সেফটির জন্য পিস্তল লাগে।

একবার চট্টগ্রামে নূহর সঙ্গে দেখা হল। বাসস্ট্যান্ডে নূহ তার বড়মেয়েকে নিয়ে বসে আছে। ঢাকায় আসবে। মেয়ে বোধহয় ডাক্তারিতে পড়ার ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। টুকটাক কথা হলো সেদিন। তারপর দু চার বছরে হঠাৎ হঠাৎ নূহর ফোন আসে। ওর ছেলেমেয়েরা লন্ডনে সেটেল করেছে। সে আর তাঁর স্ত্রী প্রায়ই লন্ডনে আসা যাওয়া করে।

ঢাকায় আমার প্রথম বন্ধু বীণাখালা। সেই বন্ধুত্বের কথা বলবার আগে আরও কয়েকজনের কথা বলি। শুরু করি হামিদুলকে দিয়ে।

হামিদুল এক বিচিত্র স্বভাবের ছেলে।

পরিচয়ের এক দুদিন পর থেকেই আমি তার স্বভাবের বৈচিত্র টের পেতে লাগলাম। দ্বিতীয় দিন ভোরবেলায় সে কাগজের ঠোঙায় ভিজানো বুট নিয়ে ধুপখোলা মাঠে এসেছে। একা একা দাঁড়িয়ে আছে শিমুল গাছটার তলায়। আমি গেছি। আমাকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এলো। এত দেরি কইরা আসলা ক্যান ?   বেলা হইয়া গেলে বুটের ত্যাজ কইমা যায়। নেও, খাও।

ঠোঙা থেকে একমুঠ বুট নিয়ে আমাকে দিল, নিজে একমুঠ নিয়ে খেতে লাগল। আমরা বুট খাই মাঠভর হাঁটি আর গল্প করি। সবই স্বাস্থ্যের গল্প। হামিদুল খুবই স্বাস্থ্য সচেতন ছেলে। পাঠ্য বইতে সে পড়েছে ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’। সে ওই সুখের চর্চা করছে। রাতেরবেলা বুট ভিজিয়ে রাখে। ভোরবেলা উঠে মাঠে আসে। এসে মাঠের তাজা হাওয়া আর ভিজা বুট খায়। খেলাধুলা একদম পছন্দ করে না। দৌড়াদৌড়ি করতেও তার ভালো লাগে না। তবে বাড়িতে সে ব্যায়াম করে। একদমে বিশ তিরিশটা বুকডন দিতে পারে, বিশ তিরিশটা বৈঠক দিতে পারে। আর তার হাতে অনেক জোড়। পাঞ্জা লড়ায় তার বয়সী কেউ তো তার সঙ্গে পারেই না, বয়সে বড়ও অনেকে কুলাতে পারে না।

হামিদুলের এইসব গল্প শুনি আর মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখি। কী সুন্দর চেহারা হামিদুলের। গায়ের রং  সত্যি সত্যি দুধে আলতায় মেশানো। লম্বায় আমার সমান। কথা বলতে বলতে সে একবার ডানহাতের বাহুর কাছটা ফুলালো। দেখে আমি বিস্মিত। বড় সাইজের পোটকা মাছের পেটের মতো ফুলে উঠেছে বাহু। তারপর শরীর শক্ত করে বলল, বুকে হাত দেও। দিয়ে দেখো, আমার বুক কেমুন ? 

শার্টের ওপর দিয়ে আমি হামিদুলের বুকে হাত দিলাম। পাথরের মতন শক্ত মনে হলো বুক। এই রকম বুকে শক্তি এবং সাহস দুটোই বুঝি অনেক বেশি থাকে। এই বয়সি একটা ছেলের এরকম শরীর হলো কী করে ?  

হামিদুল বলল, আমি রোজ বিকালে ব্যায়াম করি। ভোরবেলা মাঠে আসি, বুট খাই। তুমিও ব্যায়াম করো আর বুট খাও, তাইলে তোমারও স্বাস্থ্য হইব আমার মতন।

আমার তখনও ধারণা, সাইজে আমার সমান হলেও হামিদুল বয়সে আমার চে’ বড় হবে। হয়তো আমার চে’ দুয়েক ক্লাস উপরে পড়ে। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোন ক্লাসে পড়ো ? 

ক্লাস সিক্সে।

আমি তো পড়ি সেভেনে।

সেইটা আমি জানি। ইসকুলে তোমারে দেখছি।

তয় তুমিও গেণ্ডাইরা ইসকুলে পড়ো ? 

হ। কেলাস ফোর পরযন্ত জুবলি ইসকুলে পড়ছি। ফাইভে আইসা গেণ্ডাইরা ইসকুলে ভর্তি হইছি। আমারে প্রাইভেট পড়াইতো গেণ্ডাইরা ইসকুলের হামিদ স্যার। স্যারই আমারে জুবলি ইসকুল থিকা গেণ্ডাইরা ইসকুলে আইনা ভর্তি করছে।

ভিতরে ভিতরে বেশ একটা হোঁচট খেলাম। আরে, যা ভেবেছি ঘটনা দেখি তার উল্টো। হামিদুল তো আমার একক্লাস নিচে পড়ে। বয়সেও কি আমার চে’ ছোট হবে ?  

না, একক্লাস নিচে পড়লেও বয়সে হামিদুল একদমই আমার সমান। আমাদের জন্ম একই বছরে। বরং আমার কয়েক মাস আগে জন্মেছে হামিদুল।

সেই সকালেই হামিদুল আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। কাঠেরপুল পার হয়ে কলুটোলা। কলুটোলার হিন্দু পাড়াটা চিপা চিপা গলিতে ভর্তি। কোথাও ড্রেন উপচে ময়লা নোংরা মলমূত্র ভরা পানি নেমে যাচ্ছে ধোলাইখালের দিকে। পথপাশের ড্রেনে বসে কাজ সারছে পিচ্চিপাচ্চি পোলাপান। তাদের কাঁচা ওই জিনিসের গন্ধ ভাসছে হাওয়ায়। কোথাও বাড়ির পিছন দিককার খাটা পায়খানার ছালার চট সরিয়ে লোটা কিংবা বদনা হাতে বেরিয়ে এলো হোৎকা মতন একটা লোক। বেশ পরিতৃপ্ত মুখ।

হামিদুল বুঝে গেল পরিবেশটা আমি পছন্দ করছি না। নাকমুখ কুঁচকে আছি। বলল, তোমারে শটকাট রাস্তায় আনলাম। মেইন রোড দিয়া ঘুইরা আসলে টাইম বেশি লাগব। আমগ বাড়িতে যাওয়ার তিনটা রাস্তা। সবথিকা খারাপ রাস্তাটা তোমারে আগে চিনাইলাম। তারপর অন্য দুইটা চিনামু। একটা রাস্তা এত সোজা, দুই তিন মিনিটে তোমগ বাসায় চইলা যাইতে পারবা।

হাত তিনেক চওড়া অতিচিপা সর্বশেষ গলিটা আমরা তখন পেররুচ্ছি। গলির চারপাশে গায়ে গায়ে লাগানো একতলা দোতলা পুরনো দালান, মাথার ওপর ঢেউটিনের চালা আর চারদিকে বাঁশের বেড়া এরকম কিছু ঘর। কোনও বাড়ির ছোট্ট আঙিনায় তুলসি মঞ্চ, সাদা থান পরা মধ্যবয়সী মোটা এক হিন্দু মহিলা এইমাত্র স্নান সেরে এসেছেন। তাঁর থলথলে শরীরে লেপটে আছে শাড়ি। কোন এক বাড়ির ভিতর দিককার ঘরে বসে হারমোনিয়ামের সঙ্গে গলা মিলিয়ে রেওয়াজ করছে এক কিশোরী। ‘পিয়া বিনা ক্যায়সে কাটাও ইয়ে রাতিয়া’।

হামিদুলদের বাড়িটাও বিচিত্র। হাত বিশেক চওড়া কিন্তু লম্বায় শদেড়েক হাত। পশ্চিম পাশে দোতলা টিনের লম্বা একটা ঘর। নিচতলায় তিনটা রুম। দোতলায় ছোট্ট একটা বারান্দা। তারপর নিচতলার তিনটা রুমের সমান একটা রুম। দোতলার পুব দিকটায় হাত দুআড়াই চওড়া বারান্দার তলায়, নিচে ঠিক ওইটুকুই চলাচলের রাস্তা বাড়িটায়। উত্তর দিকে টিনের গেট, দক্ষিণ দিকে গোসলখানা, চাপকল আর পায়খানা। ওইদিকে আমাদের হাইটের লোহার একটা গেট আছে। ওই গেট দিয়ে বেরুলে সেই চিপাচাপা হিন্দুপাড়া যেখানে ভোরবেলা কিশোরী গায়িকা হারমোনিয়ামে সুর তোলে।

ধীরে ধীরে আমি তারপর হামিদুলের ভিতরটা আবিষ্কার করতে লাগলাম। ধীরে ধীরে আমি হামিদুলের হৃদয়টা দেখতে পেলাম। সত্যি সে এক বিচিত্র স্বভাবের ছেলে, হৃদয়বান ছেলে। পরোপকারী, সহমর্মী। কারও জন্য কিছু করতে পারলে খুশি হয়।

নিচতলার তিনটা রুমের প্রথমটা বসার ঘর। হামিদুল আর ওর ছোটভাই শহিদুল পড়াশোনা করে। ওরা চারভাই আর একটাই বোন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বড়ভাই সদ্য বিয়ে করেছেন। ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি বউ নিয়ে দোতলায় থাকেন। মেজো ভাইটা পড়াশোনা তেমন করেননি। সদরঘাটে ‘কাটা কাপড়ের দোকান’ হামিদুলদের। দুটো না তিনটা যেন দোকান। হামিদুলের বাবা অসুস্থ। তিনি এখন আর দোকানে বসতে পারেন না। সারাদিন বাড়িতে শুয়ে থাকেন। দোকান চালায় হামিদুলের মেজোভাই।

হামিদুলরাও বিক্রমপুরের লোক। হামিদুলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ায় বেশ কিছুদিন পর জেনেছিলাম হামিদুলের বাবার সঙ্গে আমার আব্বার খুবই খাতির। হামিদুলের বাবা আব্বার চে’ বয়সে অনেক বড়। আব্বা তাঁকে ‘দাদা’ ডাকতেন।

প্রথম দিন হামিদুলদের বাড়িতে গিয়েই টের পেয়েছিলাম হামিদুলের বেশ একটা দাপট আছে বাড়িতে। ছোট বড় সবাই সমীহ করে হামিদুলকে। আমাকে বসার ঘরে বসিয়ে ভিতরে চলে গেল সে। খানিকপর ফিরে এসে বলল, লও।

বানিয়ানগর থেকে আমাকে নিয়ে ডালপট্টির মোড়ে এল হামিদুল। মিষ্টির দোকানে ঢুকল। বিশাল একটা তাওয়ায় পরোটা ভাজছে কালো মতন একটা লোক। ডালডার গন্ধে ম ম করছে চারদিক। মিষ্টির আলমারির পাশে একটা কড়াইতে সুজির হালুয়া। হালুয়ার ওপর ঘি ভাসছে। দোকানটায় ঢুকে খিদেয় আমি একেবারে দিশেহারা হয়ে গেলাম।

সেইসব দিনে আমার পেটভরা খিদে। ভালো খাবার দাবার চোখেই দেখি না। এই অবস্থায় হামিদুল আমাকে নিয়ে এসেছে নাম-করা এক মিষ্টির দোকানে।

বাড়ির মতো এলাকায়ও দেখি হামিদুলের মহাদাপট। মিষ্টির দোকানের কর্মচারীরা তাকে শুধু চেনেই না, ভালো রকমের একটা মান্যগন্যও করে। আমাকে নিয়ে গম্ভীর মুখে একটা টেবিলে বসল সে। নিজের ডাবল বয়সি একটা ছেলেকে বলল, পরোটা আর হালুয়া দে। দুই জাগায়।

আহ, কী যে তৃপ্তি করে পরোটা হালুয়া খেলাম আমি। দুটো বিশাল সাইজের পরোটা আর অনেকখানি হালুয়া। একেকটা পরোটার দাম চারআনা। দুটো পরোটা আটআনা আর আটআনার হালুুয়া। মোট একটাকায় প্রায় দিনের খাওয়া হয়ে গেল। দুপুরের ভাত না খেলেও চলবে।

সাতষট্টি সালে দুই টাকা মানে অনেক টাকা। আমি চারআনা আটআনা পয়সাই বলতে গেলে চোখে দেখি না। আর হামিদুল অনায়াসে একটাকার নাশতা খাওয়ালো আমাকে, নিজে খেল একটাকার! টাকা কোথায় পেল ?   নিশ্চয় আমাকে বসার ঘরে বসিয়ে ওই যে ভিতরে ঢুকেছিল ওই সময় বাড়ি থেকে চেয়ে এনেছে। বাড়িতে টিনের দোতলা ঘর ঠিকই কিন্তু বাড়িটা হামিদুলদের নিজস্ব। সদরঘাটে দোকান। ঘরে আসবাবপত্র তেমন নেই কিন্তু টাকা পয়সা আছে এটা বোঝা যায়।

আমি যে খুবই তৃপ্তি করে পরোটা হালুয়া খেলাম এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছিল হামিদুল। তারপর   থেকে প্রায় প্রায়ই ধুপখোলা মাঠ থেকে আমাকে সে নাশতা খাওয়াতে এদিক ওদিক নিয়ে যায়। কখনও কখনও নারিন্দায় গিয়ে মুরগির বিরানি খেয়ে আসি আমরা। তন্দুর রুটি আর খাসির পায়া, গরুর গোস্ত আর পরোটা। মিষ্টির প্রতি বেজায় লোভ আমার। হামিদুল আমাকে মিষ্টি খাওয়াতে সোনামিয়ার দোকানে নিয়ে যায়। মিল ব্যারাকের বুদ্ধুর দোকানের বিরিয়ানি খুবই নাম-করা। হামিদুল আমাকে খাওয়াতে নিয়ে যায়। গরমের দিনে বিকেলবেলা লাচ্ছি বিক্রি হয় কাঠেরপুলের ওইদিকে। এক গ্লাস চারআনা। হামিদুল আমাকে দুতিন গ্লাস পর্যন্ত খাওয়ায়। পয়সা কম থাকলে নিজে খায় না, আমাকে খাওয়ায়। আমি যদি বলি, তুমি খাও না ক্যান?   হামিদুল হাসিমুখে বলে, আমার খাইতে ইচ্ছা করতাছে না। তুমি খাও। বুঝতে পারতাম, ওর পকেটে পয়সা কম। এজন্য নিজে না খেয়ে বন্ধুকে খাওয়াচ্ছে।

ততদিনে আমাদের সঙ্গে আরও দুইবন্ধু। বেলাল আর আনারুল। আনারুলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল হামিদুলের সোর্সে। দীননাথ সেন রোডে, বীণাখালাদের বাড়ির কাছাকাছি একটা বাসায় ভাড়া থাকত আনারুলরা। হামিদুলের মতো সেও আমার একক্লাস নিচে পড়ে। আশ্চর্য ব্যাপার, হামিদুল বেলাল আনারুল ওরা তিনজনেই আমার একক্লাস নিচে পড়ত। আনারুল পড়ত হাম্মাদিয়া হাইস্কুলে, বেলাল পড়ত জুবলি স্কুলে।

আনারুল দেখতে রোগা পটকা। একটু লম্বা মতন। গায়ের রং আমাদের মধ্যে সবচে ময়লা। চেহারায় কী রকম একটা রুক্ষতা আছে। গায়ে অসম্ভব শক্তি। হামিদুলকে দেখতাম সব সময়ই আনারুলকে কী রকম একটু তোয়াজ করে। তার শক্তির প্রশংসা করে। পাঞ্জায় শুধুমাত্র আনারুলের কাছেই সে হারে। তোয়াজটা এই কারণে কী না জানি না, তবে আনারুলকে আমি তেমন পছন্দ করতাম না।

আমি পছন্দ করতাম বেলালকে।

বেলাল দেখতে হামিদুলের চেয়েও সুন্দর। একেবারেই রাজপুত্র। একটু মোটা ধাঁচের শরীর। লম্বায় আমার চে’ কম। হামিদুল আর বেলাল একই মাপের। টকটকে ফর্সা, অসাধারণ সুন্দর চেহারা। আমাদের চারজনের মধ্যে সে সবচাইতে বড়লোকের ছেলে। নিজেদের বিশাল দোতলা বাড়ি কলুটোলায়। কাঠেরপুল থেকে পশ্চিম পাড়ে নেমে হাতের ডানদিকে মোড় নিলেই ডানদিককার বিশাল দোতলা বাড়ি বেলালদের। এই বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে পাশাপাশি দুটো তিনতলা বাড়ি। দ্বিতীয় বাড়িটি মিনুখালার বাড়ি। পরবর্তীকালে এই বাড়িটি আমার শ্বশুরবাড়ি। বেলালের স্ত্রী বীথিরাও থাকতো এই বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাটে।

বেলালের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বিকেলবেলা। স্থান ওই ধুপখোলা মাঠ। বড়ভাই নেসার আর বেলাল একই ক্লাসে পড়ত। নেসারও দেখতে সুন্দর। ওরা চারভাই তিনবোন। সবার বড় বোন তারপর মহিউদ্দিন ভাই। ভাইদের মধ্যে বেলাল সবার ছোট। বেলালের ছোট দুইবোন মমতাজ আর কচি।

মহিউদ্দিন ভাই খুবই বিখ্যাত মানুষ। বডি বিল্ডার। মিস্টার ইস্ট পাকিস্তান হয়েছেন। দেখতে দুর্দান্ত সুন্দর। স্বাস্থ্যবান সুন্দর মানুষটি যখন বাড়ি থেকে বেরোন, চারদিক যেন আলোকিত হয়ে যায়। চারদিক ভরে যায় সুগন্ধে। যেমন সুন্দর পোশাক পরেন, তেমন দামি দামি পারফিউম ইউজ করেন। চালচলনে বনেদিভাব। মহিউদ্দিন ভাইয়ের প্রিয় বন্ধু হচ্ছেন মেজবাহ ভাই। পরবর্তীকালে যিনি বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের নামকরা নায়ক ওয়াসিম।

মহিউদ্দিন ভাই আমাকে খুবই ভালোবাসতেন।

নেসারের সঙ্গেও আমার বেশ ভাব। বন্ধুর বড়ভাই তবু আমি তাকে তুমি করে বলি। সেই শুরু থেকেই। বেলালের ছোট দুটিবোন, বাবা মা সবাই আমাকে পছন্দ করে। শুধু মেজোভাই, জিন্নাহভাই, তিনি একটু গম্ভীর ধরনের। কাউকেই তেমন পাত্তা দেন না।

বেলালের বাবাও খুবই স্বাস্থ্যবান, লম্বা সুন্দর মানুষ। জিন্দাবাহারে তাঁর ‘ক্রাউন মিরর কোম্পানি’। ওসমানিয়া গ্লাস কোম্পানির ডিলার। বেলজিয়াম থেকে কাচ আমদানি করেন। বেশ বড় ব্যবসায়ী। সুত্রাপুর বাজারে গিয়ে প্রতিদিন মিন্তির মাথায় বিশাল বাজার চাপিয়ে বাড়ি ফেরেন। বড় বড় মাছ, পাঁচ দশসের গরু খাসির মাংস। ছটা আটটা মুরগি। জমিদার বাড়ির মতন অবস্থা।

এই বাড়ির ছেলে বেলালের সঙ্গে পরিচয় হলো। বিকেলবেলা সে আর নেসার বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গেছে ধুপখোলা মাঠে। বেলালের পরনে নীল রংয়ের দামি হাফপ্যান্ট আর হাফহাতা সুন্দর সাদা শার্ট। পায়ে কেডস। বিকেলবেলার রোদে বেলালকে দেখাচ্ছিল দেব কিশোরের মতো। রোদে গরমে ছুটোছুটি করে খেলছে, নাকের তলায় আর গলায় জমেছে চিনির রোয়ার মতো ঘাম।

আমি আর হামিদুল ধুপখোলা মাঠে ঘুরছি। বেলালকে দেখে হামিদুল বলল, ওই যে বেলাল খেলতাছে। লও বেলালের কাছে যাই।

বেলাল আর নেসার হামিদুলের সঙ্গে জুবলি স্কুলে একই ক্লাসে পড়ত। হামিদুল গেণ্ডারিয়া হাইস্কুলে এসে ভর্তি হয়েছে আর ওরা রয়ে গেছে জুবলি স্কুলেই। কিন্তু পরিচয় তো আর মুছে যায়নি।

সেই বিকেলে হামিদুলের মাধ্যমেই বেলালের সঙ্গে পরিচয় হলো। দেখতে দেখতে এমন বন্ধুত্ব, হামিদুলকে আমি তুমি করে বলি, বেলালের সঙ্গে হয়ে গেল তুই তোকারি। নেসারকে তুমি করে বলি, কিন্তু বন্ধুত্ব হয়নি। ওদিকে আনারুলের সঙ্গেও তুমি তুমি। চারজনের বেশ একটা দল হয়ে গেল।

হামিদুল একা একা ব্যায়াম করত তার ঘরে। বুকডন দেয়ার দুটো কাঠের যন্ত্র ছিল। আর্মসের ব্যায়াম করার দুটো ডাম্বল লাগে, হামিদুল জোগাড় করেছে একটা। ওই একটা দিয়েই কাজ চালায়। বেলালের সঙ্গে বন্ধুত্বের পর আমরা চারজনই বিকেলবেলা ব্যায়াম করতে লাগলাম। স্কুল ছুটির পর বাড়িতে এসে খাওয়া দাওয়া শেষ করেই চলে যাই বানিয়ানগর। শটকাট রাস্তাটা সেই প্রথম দিনই হামিদুল আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুবদিককার তিনচারটা বাড়ি ছাড়িয়ে ধোলাইখাল। তখন শুকনার দিন। খালে হাঁটু ডোবার মতন নোংরা ময়লা কালোজল। তার ওপর সাঁকো বেঁধে দুপয়সা, নাকি পাঁচপাই টোলের ব্যবসা ফেঁদেছে ধান্দাবাজলোক। এপার ওপার দুপারেই ছালা বিছিয়ে বসে পয়সা আদায় করা হচ্ছে। ওইটুকু সাঁকো পেরুলেই মুরগিটোলা। আমাদের বাসা। তার মানে এপারে মুরগিটোলা ওপারে বানিয়ানগর। তিন চার মিনিটে হামিদুলদের বাড়ি।

সাঁকোর কোণায় এসে টোল তুলতে বসা লোকটিকে গম্ভীর গলায় হামিদুল বলল, চিনা রাখো।  আমার বন্ধু মিলন। ওর কাছ থিকা পয়সা নিবা না। ওই পারে যে বহে তারেও কইয়া দেও।

লোকটা বিনীত গলায় বলল, আইচ্ছা আইচ্ছা।

সাঁকো পেরিয়ে বাসার গেটে আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেল হামিদুল। শুরু হলো হামিদুলের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের জীবন। বেলাল আনারুলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। চারজন দলবেঁধে আমরা ব্যায়াম করি কখনও হামিদুলদের বসার ঘরে, কখনও বেলালদের বাড়ির রাস্তার সঙ্গের পরিত্যক্ত ছোট্ট রুমটায়।  পরে কতদিন বেলাল আমি হামিদুল এই তিনজন বেলালদের ওই রুমটায় রাত কাটিয়েছি। ছোট্ট একটা চৌকি ছিল রুমটায়। তিনজন গাদাগাদি করে ঘুমিয়েছি।

আনারুল কখনও আমাদের সঙ্গে রাতে থাকত না। তাকে বাড়ি ফিরতেই হতো। হামিদুলও বাইরে তেমন থাকতে পারত না। পারতাম শুধু আমি। আমাদের ছোটবাসা। অতগুলো মানুষ। আমি প্রায় রাতেই পড়াশুনা খাওয়া দাওয়া শেষ করে আলির সঙ্গে গিয়ে ঘুমাতাম। হামিদুল বেলালের সঙ্গে বন্ধুত্বের পর ওদের সঙ্গে গিয়ে থাকি। তবে বেশি থাকা হয় হামিদুলের সঙ্গে। রাত আটটা নটার দিকে পড়াশুনা শেষ করে সাঁকো পেরিয়ে হামিদুলদের বাড়ি যাই। হামিদুল আগেই জানে আমি আসব। আমি গেলে আমাকে নিয়ে সে ভাত খায়। ইয়া বড় বড় কইমাছ, রুই মাছের অতিকায় টুকরো, আমাদের কবজির মতো মোটা মাগুর মাছের টুকরো, কখনও কখনও মুরগির রান, খাসির বড় বড় টুকরো, গরু ভূনা। এত ভালো খাবার আমাদের বাড়িতে কোথায় পাবো ?   হামিদুল নিজের ভাগেরটা আমাকে খাওয়ায়, নিজের পাতেরটা আমার পাতে তুলে দেয়। খাও, ভালো কইরা খাও।

বেলালও কখনও কখনও রাতেরবেলা দোতলার রান্নাঘরে গিয়ে আমার জন্য খাবার নিয়ে আসে। ওদের বাড়িতে ভালো খাবার থাকবেই। মহিউদ্দিন ভাই বিখ্যাত বডি বিল্ডার, জিন্নাহ ভাই বক্সিং প্রাকটিস করেন, নেসার বক্সিং প্রাকটিস করে। বেলাল মহিউদ্দিন ভাইর মতো বডি বিল্ডার হতে চাচ্ছে। বাবা মা দুজনেই চান ছেলেরা এসব করুক। সুতরাং সেই মতোই খাবার দাবার থাকে বাড়িতে।

বেলাল হামিদুল দুজনেই অতিভদ্র। আবার একটু গুণ্ডা গুণ্ডা ভাবও আছে দুজনার মধ্যেই। পাড়ার আমাদের বয়সী ছেলেরা তো বটেই, আমাদের চে’ বড়রাও ওদের দুজনকে একটু যেন মান্য করে।

হামিদুল বেলালদের বাড়িতে আমার অবাধ যাতায়াত কিন্তু আমাদের বাসায় ওদেরকে আমি তেমন আনতাম না। গেটের সামনে হামিদুল আমাকে পৌঁছে দিয়ে চলে যেত, আমি তাকে বাসায় ঢুকতে বলতাম না। সংকোচ হত, আমাদের গরিব বিশাল সংসার বন্ধুদেরকে আমি দেখাতে চাইতাম না। আমার খুব লজ্জা করত। ওরা আমাকে এতকিছু খাওয়ায়, বাড়িতে কত ভালো ভালো রান্না হয় ওদের, আর আমাদের বাড়িতে ? আমি একবেলা কাউকে বাড়িতে ডেকে খাওয়াতে পারি না, চারআনা পয়সা কারও জন্য খরচা করতে পারি না। ভিতরে ভেতরে ওই লজ্জায় আমি সংকুচিত হয়ে থাকতাম।

মনে আছে, প্রচণ্ড গরমে বেলালদের ছোট্ট রুমে চারবন্ধু ব্যায়াম করে বেরিয়েছি। বুক ফেটে যাচ্ছে তৃষ্ণায়। কাঠেরপুলের কোণের লাচ্ছির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, সেদিন হয়তো হামিদুলই চারজনকে লাচ্ছি খাওয়াচ্ছে। ঠাণ্ডা লাচ্ছিতে চুমুক দিয়ে আমি ছেলেমানুষি গলায় বলছি, লাগেটা কেমুন ?  

হামিদুল পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী না। নানা রকম বিষয় নিয়ে সে ব্যস্ত। খরগোশ পালে, বেজি পালে। নানা রকম পাখি পালে। একুরিয়ামে মাছ পালে। আর কুকুর বিড়াল তো আছেই। একবার একটা সাপও পালতে আনলো। এটা আমাদের সেই ছেলেবেলার অনেক পরের ঘটনা। গুলশানের ওদিককার এক কোরিয়ান ভদ্রলোকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। ভদ্রলোক বাংলাদেশে কোনও প্রজেক্টের কাজে এসেছেন। ভাঙা ভাঙা বাংলা বলেন। মাঝে মাঝে পুরান ঢাকায় বেড়াতে আসেন। এক বিকেলে হামিদুলকে নিয়ে ঘুরছেন। সাপের খেলা দেখাচ্ছিল এক সাপুড়ে। সব মিলিয়ে তিনটা সাপ তার। কোরিয়ানটি হামিদুলকে বলল, আমি সাপ তিনটা কিনতে চাই।

হামিদুল অবাক। সাপ দিয়ে তুমি কী করবে ? 

খাবো। আমরা সাপ খেতে খুবই পছন্দ করি। তুমি দাম করো।

ঘটনা সাপুড়েকে বলল হামিদুল। সাপুড়ে বলল, এই সাপের রোজগারে আমার সংসার চলে। বিক্রি করলে খাবো কী ?   তবে ভালো দাম পেলে খাওয়ার মতো সাপ আমি জোগাড় করে দিতে পারি।

কোরিয়ানকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল হামিদুল। শুনে কোরিয়ান বলল, কোনও অসুবিধা নেই। একেকটা সাপ আমি একহাজার টাকা করে দেব। যে কয়টা পারো আমাকে এনে দাও।

কয়েকদিন পর সেই মোচঅলা সিনেমা টাইপ সাপুড়ে কাছির মতো মোটা মোটা ছখানা ঢোড়াসাপ জোগাড় করে নিয়ে এলো। কোরিয়ান মহাখুশি। নগদ ছহাজার টাকা গুনে দিল সাপুড়েকে আর হামিদুলের ওপর খুশি হয়ে তাকে উপহার দিলো কড়ে আঙুলের মতো চিকন, সাত আটইঞ্চি লম্বা সোনালি বর্ণের একটা নাম না জানা কোরিয়ান সাপ। সেই সাপ বাস করে বেনসান সিগ্রেটের বাক্সে। কোরিয়ানরা নাকি অতিযত্নে এই সাপ প্রতিপালন করে। সাপের একমাত্র খাদ্য জ্যান্ত টিকটিকি।

হামিদুলের তো পালাপালির অভ্যাস আছেই। সাপ উপহার পেয়ে সে মহাখুশি। পালতে নিয়ে এল। বেনসান হেজেজের বাক্সে বাস করে সাপ। বুক পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট খুলে ম্যাজিক দেখাবার মতো করে সাপটা সবাইকে দেখায় হামিদুল। দিনে তিনচারটা টিকটিকে ধরে খাওয়ায়। নিজেদের বাড়ির টিকটিকি ফুরিয়ে যাওয়ার পর পাড়ার এবাড়ি ওবাড়ি থেকে টিকটিকি জোগাড় করে। এই করতে করতে একসময় তার মনে হলো, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। একটা বিদেশি সাপ সমানে খেয়ে যাচ্ছে দেশি টিকটিকি। না না এই সাপ পালা ঠিক হচ্ছে না। এক বন্ধুকে তারপর সাপটা দিয়ে দিল হামিদুল।

‘আসলি মুরগি’ নামে এক প্রকারের ফাইটার মুরগি আছে। লম্বা লম্বা ঠ্যাংয়ের বিশাল দেহী মুরগি। দামও বেশ। আমাদের কিশোর বয়সেই সাত আটশো হাজার টাকা দাম একেকটা আসলি মুরগির। এই মুরগি নিয়ে বাজি হয়। দশ বিশটাকা, কখনও কখনও পঞ্চাশ একশো টাকা বাজি ধরে এর মুরগি আর ওর মুরগি ফাইট করে। কেউ কেউ মুরগির পায়ে বেঁধে দেয় ধারাল চাকু। চাকু বাঁধা পায়ে এক মুরগি কাবু করে আরেকটিকে।

আসলি মুরগির নেশা হয়ে গেল হামিদুলের। কোত্থেকে বিশাল এক আসলি কিনে আনল সাতশ টাকা দিয়ে। সেই মুরগি কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পায়ে চাকু বেঁধে দিয়ে মুরগি নিয়ে ফাইট করাতে যায় বড়কাটারার ওদিকে। কোনও কোনওদিন পঞ্চাশ একশো টাকা জিতে ফিরে তার মুরগি। আবার কোনও কোনওদিন হারে।

বাজি ধরে পাঞ্জাও লড়ত হামিদুল। আনারুলকে নিয়ে বাজি ধরত। বেশিরভাগ সময়ই জিতত দুইবন্ধু। আমি আর বেলাল ওসবে নেই। ওদের সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম করার পরও আমার শরীরে তেমন শক্তি নেই। চারজনের মধ্যে আমি সবচাইতে দুর্বল। বেলালের শরীরেও অনেক শক্তি। কিন্তু পাঞ্জা খেলায় সে তেমন সুবিধা করতে পারত না দেখে ব্যাপারটা এড়িয়ে চলতো।

হামিদুল একবার গরুর কাঁচা গোসত চিবিয়ে চিবিয়ে খেল।

খুবই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ঘটনাটা সে ঘটালো আমার চোখের একেবারে সামনে। কোরবানির দিন। বেলাল আনারুল ওরা যে যার বাড়িতে কোরবানি নিয়ে ব্যস্ত। আমরা কোরবানি দিতে পারি না। কোরবানির দিন হামিদুলদের বাড়িতে গিয়ে বসে আছি। বিশাল এক গরু কোরবানি দিয়েছে ওরা। কসাইদের সঙ্গে হামিদুলও কাটাকুটির কাজ করছিল। লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা। গেঞ্জিতে রক্ত লেগে আছে। আমি বসে আছি ওদের বসার ঘরে। হাতে ছোট সাইজের এক টুকরো কাঁচা মাংস নিয়ে হামিদুল আমার সামনে এসে দাঁড়াল। দেখো গো¯স্তটা কী সুন্দর। কাঁচাই খাইয়া ফালাইতে ইচ্ছা করতাছে।

আমি ঠাট্টা করে বললাম, খাও।

তুমি কইলে সত্যই খামু।

খাও তো দেখি।

হামিদুল সত্যি সত্যি মাংসের টুকরোটা মুখে দিল। কচকচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল। আমি হা করে হামিদুলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। এও কী অসম্ভব ?   এক্ষুনি তো বমি করবে হামিদুল। অসুখ হয়ে যাবে।

কিছুই হলো না হামিদুলের। কাঁচা মাংস খেয়ে সে নির্বিকার ভঙ্গিতে ভিতর বাড়িতে চলে গেল। পোলাও আর গরুর মগজভুনা, কলিজাভুনা নিয়ে এল। আমরা দুইবন্ধু মিলে মজা করে খেলাম।

শ্যামবাজার ছাড়িয়ে, বুড়িগঙ্গার তীর ধরে কিছুটা এগোলে ‘কায়দে আজম ফিজিক্যাল সেন্টার’। বাংলাবাজারের যে গলিটায় এখন অনন্যা প্রকাশনী, বিদ্যা প্রকাশ এইসব প্রকাশনী ওই গলিটা তখন বলতে গেলে ফাঁকা। ওদিক দিয়ে ফিজিক্যাল সেন্টারের একটা গেট আছে। আমরা চারজন এক বিকেলে বেড়াতে গেছি সেখানে। লম্বা হল ঘরটায় ব্যায়াম করছে তাগড়া জোয়ান যুবকেরা। কেউ ওয়েট লিফটিং করছে, কেউ বুকডন দিচ্ছে, বৈঠক দিচ্ছে কেউ কেউ। বাইরে রিং ঝোলার ব্যবস্থা, আমাদের তুলনায় রিং একটু উঁচুতে।

হামিদুল বলল, আমি এই রিং ধইরা, পাও দুইটা রিংয়ের ভিতরে দিয়া, মাথা নিচের দিকে দিয়া ঝুলতে পারুম।

বেলাল বলল, আরে না ব্যাটা, পারবি না।

পারুম।

আনারুল বলল, পারলে করো তো।

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। হামিদুল লাফ দিয়ে রিং ধরল। তারপর সত্যি সত্যি পা দুটো উপর দিকে নিয়ে রিংয়ের ভিতর আটকে মাথা নিচের দিকে দিয়ে ঝুলে পড়তে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একটা পা রিং থেকে পিছলে গেল। ঠিক নুনের বস্তার কায়দায় ধপ করে মাটিতে পড়ল হামিদুল। ব্যথা পেল কী পেল না কে ভাবে, আমরা তখন হো হো করে হাসছি।

হামিদুল খুবই পরোপকারী স্বভাবের। কার্তিককে অনেক রকমের সাহায্য সহযোগিতা করেছে সে।  একাত্তর সালে সুভাষকে সাহায্য করেছে। জীবনের রিস্ক নিয়ে একটি হিন্দু ছেলেকে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল। সুভাষ নাম বদলে তার নাম দিয়েছিল হানিফ। এই দুজনের কেউ পরবর্তীকালে হামিদুলের কোনও খোঁজখবর রাখেনি।

পরিচয়ের তিন চারদিন পর সকাল দশটার দিকে সুত্রাপুর থেকে বাজার করে ফিরছি। বাসার বাজার কোনওদিন বড়ভাই, কোনওদিন আমি করি। সেদিন ছিল আমার পালা। ব্যাগভর্তি বাজার। মিন্তি নেয়ার সামর্থ্য নেই। আমাদের বড় সংসার। বাজারের ব্যাগ বেশ ভারী। হাতে সেই ব্যাগ নিয়ে একদিকে কাত হয়ে গেছি। বহন করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। কাঠেরপুলের ওইদিকটায় আসতেই হামিদুলের সঙ্গে দেখা। আমার অবস্থা দেখে পাগলের মতো দৌড়ে এলো সে। আমার হাত থেকে ব্যাগটা টেনে নিল। তুমি পারবা না। দেও দেও, আমারে দেও।

এই ঘটনার চব্বিশ বছর পর ঠিক হামিদুলের মতো করেই আমার হাত থেকে ভারী ব্যাগ টেনে নিল বীণাখালা। স্থান, ফোর্ট লটারডেল এয়ারপোর্ট, ফ্লোরিডা।

ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পামবিচে বীণাখালার ছবির মতো বাড়ি।

বাড়ির লাগোয়া পশ্চিম দিকে লেক। লেকের এপার ওপার নানারকম অচেনা ফুল আর গাঢ় সবুজ ঝোপঝাড়ে ভর্তি। সারাদিন হু হু করে হাওয়া বয়। লেকে কত রকমের যে হাঁস। কয়েকটা হাঁস এপারে বীণাখালার ছোট্ট বাগানটায় এসে পিঠে মাথাগুজে বসে থাকে। বাংলাদেশ থেকে পেয়ারা চারা এনে বাগানে লাগিয়েছে বীণাখালা, বরই আতা করমচা আর পাতিলেবুর চাড়া এনে লাগিয়েছে। প্রতিটি চারাই বড় হয়েছে। ফল দিতে শুরু করেছে। পেয়ারা গাছটায় এত্ত বড় বড় পেয়ারা হয়। কী যেন কী কারণে পেয়ারাগুলো মুখে দেয়া যায় না। ডাসা হতে শুরু করলেই ছোট কালো দাগে ভরে যায়। কদিন পর হলুদ হয়ে ঝরে পরে বাগানের ঘাসে। বিরাট সাইজের এক প্রকারের কালো হাঁস, গলার কাছটা লাল, মাথায় লাল ঝুটি, সেই হাঁসেরা গাছতলায় পড়া পেয়ারা ঠুকরে ঠুকরে খায়। আধখাওয়া পেয়ারাগুলো অবহেলায় পড়ে থাকে। সেই ফাঁকে দেখা যায় ভিতরে এক প্রকারের সাদা সাদা পোকা। আমেরিকান পোকা এবং হাঁসেরা খাচ্ছে বাংলাদেশী পেয়ারা।

আমি আর বীণাখালা দোতলার বারান্দায় বসে এই দৃশ্য দেখি।

লেকের দিকে মুখ করা দোতলার বারান্দাটা কাঠের। হালকা ধরনের দুটো চেয়ার পাতা। আমরা দুজন সেই চেয়ারে বসে, বিকেল কিংবা সন্ধ্যা হয়ে আসা আলোয় ফিরে যাই আমাদের কিশোরবেলায়। কত কথা যে মনে পড়ে।

গেণ্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডে বীণাখালাদের বাড়িটায় সুন্দর একটা দোতলা টিনের ঘর ছিল। এরকম সুন্দর একটা বারান্দা ছিল। উত্তরমুখি বারান্দা। সেই বারান্দায় যাওয়া আমাদের নিষেধ ছিল। পুরনো দিনের ঘর। পাটাতনের কোনও কোনও কাঠ নরম হয়ে গেছে। কোনও কোনওটা একটু আলগা। যদি ভেঙে নিচে পড়ে যাই ? 

দোতলায় দুটো পালঙ্ক ছিল। সেই পালঙ্কে ঘুমাতেন আমার টুনুমামা অনুমামা। মিনুখালা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতেন। খোকনমামা মিন্টমামা স্কুলে পড়েন। কী যে দুষ্টুমি করেন সারাদিন দুজনে। বাড়ির পশ্চিম পাশটায় এক টুকরো ঘাসে ভরা জমি পড়ে আছে। একটা দুটো মেহেদি ঝোপ, কয়েকটা বেলি আর মোরগ ফুলের চারা, একটা গন্ধরাজ আর মাঝারি সাইজের একটা জামরুল গাছ। জামরুল গাছটায় কখনও জামরুল হতে দেখিনি। কেমন নি®প্রাণ ধরনের গাছ। সেই গাছে দুয়েকটা শালিক কিংবা চড়ুইপাখি বসে থাকে। খোকনমামা মিন্টুমামা গুলাল হাতে সেইসব পাখির পেছনে ছোটেন।

দোতলা ঘরের দক্ষিণে একটুকরো উঠোন আর রান্নাঘর। আরও দক্ষিণে একচালা টংঘরের মতো পায়খানা ঘর। তার পিছনে কচুড়ি ভর্তি বিশাল একটা জলাভূমি চলে গেছে গেণ্ডারিয়া স্টেশানের দিকে।

দোতলা ঘরের উত্তর দিকটায় উঠোন। উত্তর পুব কোণে বাংলাঘর। চার পাঁচটা লিচুগাছ বাংলাঘরটার পুবপাশে। লিচুগাছগুলোর ওদিকে টিনের গেটটা দিনমান খোলা থাকে। আমি আর বীণাখালা ছুটে ছুটে বাইরে যাই। কী আছে বাড়ির বাইরে ?  

বাড়ি থেকে বেরুলেই লিচুগাছগুলোর ওপাশে টলটলের জলের একটা পুকুর। এপারে সুন্দর বাঁধানো ঘাটলা। ঘাটলার পিছনে সবুজ ঘাসের লনঅলা একটা বাড়ি। পুরনো দিনের জমিদার বাড়ির মতো একতলা একটা দালান। দালানে ঢোকার মুখে তিন দিক খোলা একটা বারান্দা মতো। ইট রঙের দুখানা বাঁধানো বেঞ্চের মাঝখান দিয়ে ভিতর বাড়িতে ঢোকার পথ।

ঘাটলার বেঞ্চ দুটোও ঠিক ওই রংয়ের।

পুকুরের ওপারে রেললাইন। ফুলবাড়িয়া থেকে গেণ্ডারিয়া হয়ে চলে গেছে নারায়ণগঞ্জে। ভোর রাতের দিকে ঝিকঝিক করে একটা রেলগাড়ি যায়। দূর থেকে ভেসে আসে তার হুইসেলের শব্দ। আমরা শুয়ে আছি দোতলায়। পালঙ্কে অনুমামা টুনুমামা আর আমরা ছোটরা ঢালাও বিছানা করে মেঝেতে। কারও ঘুম ভাঙেনি, শুধু আমার ভেঙেছে হুইসেলের শব্দে। জেগে কান খাড়া করে আছি কখন ঝিকঝিক শব্দটা এগোতে থাকবে, বীণাখালাদের বাড়ির পাশ দিয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে চলে যাবে রেলগাড়ি।

বীণাখালাদের বাড়িটা আমার মায়ের মামাবাড়ি। বীণাখালা হচ্ছে আমার মায়ের মামাতো বোন। ওই একজনই মামা, মায়ের। তাঁর ডাকনাম আবেদিন। ভালো নাম আবুল হোসেন খান।

কোনও কোনও শীত কিংবা বর্ষাকালে বেড়াতে যেতাম বীণাখালাদের বাড়িতে। আমার মায়ের তখন বছর বছর একটি করে ছেলেমেয়ে জন্মায়। বীণাখালাদের বাড়িতেও একই অবস্থা। বীণাখালার পর তাঁর একভাই আর দুটো বোন জন্মেছে। সেন্টু রিনা আর দীনা। দীনা এখন বিখ্যাত শিল্পী লায়লা শারমিন। আমার ছোটখালা। বয়সে আমার চে’ কমপক্ষে দশবছরের ছোট। তারপরও দীনা আমার বন্ধু। বীণাখালাদের বাড়িতে আমার দুজনই বন্ধু। বীণাখালা আর দীনা। দীনা আমাকে ‘মিলন মামা’ ডাকে। ওর দেখাদেখি ওর মেয়ে হায়াসিন্থও আমাকে ‘মিলন মামা’ ডাকে।

দীনা তখনও জন্মায়নি। সেন্টুমামা এই এতটুকু। রিনা বোধহয় নানির কোলে। আমি আর বীণাখালা টু থ্রিতে পড়ি। বর্ষাকালে তুমুল বৃষ্টিতে বিক্রমপুর থেকে আমরা হয়তো সরাসরি এসে উঠেছি বীণাখালাদের বাড়িতে। বৃষ্টিতে কাঁদায় প্যাঁচ প্যাঁচ করছে চারদিক। এত মানুষ আমরা হঠাৎ করে এসে উঠেছি, কী যে উৎসব শুরু হয়ে গেছে বীণাখালাদের বাড়িতে! বুজি পিঠা বানিয়ে নিয়ে এসেছেন ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের জন্য। দশবারোটা ইলিশ মাছ জ্বাল দিয়ে নিয়ে এসেছেন, আনতে আনতে যাতে নষ্ট হয়ে না যায়। টিনভর্তি মুড়ি, খেজুরে গুড়, কত কী! আমার মা অলসভঙ্গিতে বসে কোলের বাচ্চাটিকে বুকের দুধ দিচ্ছেন, পুনুখালা গল্প করছেন টুনুমামা মিনুখালা আর অনুমামার সঙ্গে। বুজি বসে কথা বলছেন তাঁর একমাত্র আদরের ভাইটির সঙ্গে। আজাদ দুষ্টুমিতে মেতে গেছে খোকনমামা মিন্টুমামার সঙ্গে। বৃষ্টিতে কাদায় ছুটে গেছে বাড়ির বাইরে। খোকনমামার হাতে গুলাল। আজাদ আর মিন্টুমামা প্রায় একবয়সী। ওরা দুজন খোকনমামার সাগরেদ।

আমার বড়বোন মণি বীণাখালার বয়সী। সেই বর্ষার দিনে দুপুরের পর মণি হয়তো ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। যে যার বয়সীদের সঙ্গে গল্পগুজবে মেতে আছে। বাড়িতে হঠাৎ এত মানুষ এসে উঠেছে, নানি রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়েছেন রান্নাবান্নায়। বিকেলের দিকে মেঘলা আকাশ ভেঙে একটুখানি রোদ উঠেছে, লিচুতলা থেকে ছুটতে ছুটতে এল বীণাখালা। ডালিম ফুলের মতো গাঢ় লাল রংয়ের ফ্রক পরা। লাল ফিতে দিয়ে নানি কিংবা মিনুখালা কে তার মাথায় বেঁধে দিয়েছেন ঝুটি। বীণাখালার গায়ের রং দুধেআলতায় মেশানো। কী যে সুন্দর চেহারা! বীণাখালার হাসিতে চারদিক যেন উজ্জ্বল হয়ে যায়।

আমি চোরাচোখে বীণাখালাকে দেখি। আমার মনেই হয় না বীণাখালা এই পৃথিবীর কোনও মানুষ।  মনে হয় বীণাখালা এইমাত্র নেমে এসেছে স্বর্গ থেকে। সে যেন স্বর্গের এক লালপরি। কিন্তু বীণাখালা মণিকে নিয়ে ব্যস্ত। আমার দিকে তেমন করে তাকায়ই না।

সেই বয়সে ঈর্ষায় আমার বুক জ্বলে যেত। মনে হতো, ইশ আমি কেন মেয়ে হয়ে জন্মাইনি। মণির জায়গায় যদি আমি হতাম তাহলে তো বীণাখালার সঙ্গে আমারই ভাব হতো! আমিই তো হতাম তাঁর বন্ধু। যখন তখন আমার হাত ধরে বীণাখালা ছুটে যেত লিচুগাছতলায়, পুকুরঘাটে। ঘাটলার বেঞ্চে শেষ বিকেলের মনোরম আলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে গল্প করত আমার সঙ্গে।

সেই বিকেলে সত্যি সত্যি এরকম এক ঘটনা ঘটে গেল।

মণি ঘুমিয়ে আছে দেখে বীণাখালা আর তাকে ডাকেনি। লিচুগাছতলার ওদিক থেকে ছুটে এলো। এসে দেখে আমি দাঁড়িয়ে আছি বাংলাঘরের সামনে। হাসি আনন্দমাখা মুখখানা উজ্জ্বল করে বলল, রেলগাড়ি দেখবি?   আয়।

আনন্দ উত্তেজনায় আমার তখন বুক ভরে গেছে। মণিকে না ডেকে আমাকে ডাকছে বীণাখালা ?   বীণাখালার সঙ্গে ছুটতে শুরু করেছি। আমাকে নিয়ে ঘাটলার দিকটায় গেল না বীণাখালা, পুকুরের পুব দক্ষিণ কোণের লিচুগাছটার তলায় দাঁড়াল। এক্ষুনি রেল আসবে। তুই আর আমি রেলের বগি গুনবো।

যাত্রীবাহী রেল এল না, এল একটা মালগাড়ি। বগির রং ইটের মতো। এত ধীরগতি সেই গাড়ির, দৌড়ে তো বটেই, জোরে হাঁটলেও এই গাড়িকে পিছনে ফেলা যাবে।

মালগাড়ি দেখে বীণাখালা হতাশ হলো না, বরং খুশি হলো। মালগাড়িতে অনেক বগি, আর এত আস্তে আস্তে যায়, বগি গুনতে কোনও অসুবিধা নাই। শুরু কর। তবে ইঞ্জিন বাদ দিয়ে গুনবি।

আমরা দুজন গুনতে শুরু করলাম।

সেই বিকেলেই বীণাখালার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তারপর জীবনের যত দিন গেছে, বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়েছে। আমরা দুজন এখন পৃথিবীর দুই প্রাস্তে। বীণাখালা আমেরিকায়, দুচার বছর পর পর দেখা হয় আমাদের। কিন্তু প্রতিটা দিন কোনও না কোনও সময় বীণাখালার কথা আমার মনে হয়। বীণাখালার প্রিয়মুখ আমি আমার চোখের সামনে দেখতে পাই। মনে মনে কত কথা যে বলি বীণাখালার সঙ্গে। মনখারাপ হলে বলি, মন ভালো হলেও বলি।

আমি জানি বীণাখালার অবস্থাও আমার মতোই। দিনরাত্রির কোনও না কোনও সময় আমার কথা ভাবে সে। মনে মনে কথা বলে আমার সঙ্গে। মন আর হৃদয়ের অনুভবে তার সেসব কথা আমি শুনতে পাই।

সেই বিকেলের পর মণির সঙ্গে আর তেমন ভাব দেখি না বীণাখালার। সারাক্ষণ সে আছে আমাকে নিয়ে, আমার সঙ্গে। এই এদিকে যাচ্ছে, এই ওদিকে যাচ্ছে। আমি ছায়ার মতো আছি বীণাখালার সঙ্গে। শেষ বিকেলের রোদ মুছে গিয়ে কালো হয়েছে শ্রাবণ মাসের আকাশ। বিকেলেই যেন সন্ধ্যা নেমে গেছে। আর সেই সন্ধ্যার সঙ্গে ঝমঝমিয়ে নেমেছে বৃষ্টি। আমরা দৌড়ে এসে ঢুকেছি বাংলাঘরে আর নয়তো দোতলা বড়ঘরে। ঘরে ঘরে জ্বলে গেছে হারিকেন। টুনুমামা কলেজে পড়েন, অনুমামা আর মিনুখালা স্কুলের উপরের ক্লাসে। খোকনমামা মিন্টুমামা পড়েন গেণ্ডারিয়া হাইস্কুলে, কিন্তু কেউ সেই সন্ধ্যায় বই নিয়ে বসছে না। গল্পগুজব হাসি আনন্দ চলছে বাড়িজুড়ে। এর মধ্যেই মিনুখালা হয়তো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করছেন। আমরা সবাই গোল হয়ে বসে শুনছি। হয়তো লুডুখেলা চলছে আর নয়তো অনুমামা গ্রামোফোন বাজাচ্ছেন। বাইরে মুষলধারে ঝরছে বৃষ্টি।

তখনকার দিনে কী যে বৃষ্টি হতো! চারদিন পাঁচ দিন, চলছে তো চলছেই। থামার নামগন্ধ নেই। রোদের মুখ দেখাই যায় না।

একদিন মেঘলা দুপুরে বীণাখালা ছুটতে ছুটতে এসে বলল, তাড়াতাড়ি আয়। তাড়াতাড়ি।

উত্তেজনায় বীণাখালার চোখ বড় হয়ে গেছে, মুখ যেন ফেটে পড়তে চায়। দৌড়ে গেছি তার  সঙ্গে বাংলাঘরে। গিয়ে দেখি পুরনো টেবিলটার উপর ডানাভাঙা ছোট্ট এক শালিক পাখি। সেই পাখি ঘিরে খোকনমামা মিন্টুমামা আর আজাদ। খোকনমামার মুখে ভারী একটা গৌরবের হাসি। গুলালের রাবার টানতে টানতে বললেন, আমি গুলাইল দিয়া শালিকটা ফালাইছি।

সেই পাখি দেখে আমার খুব মন খারাপ হয়েছে। বীণাখালার মুখেও বেদনার ছায়া। আমাকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে বলল, পাখিটার জন্য আমার খুব মায়া লাগছে।

আমারও লাগছে।

শুনে বীণাখালা আমার মুখের দিকে তাকাল। ওই প্রথম আমরা দুজন দুজনার মনের ভিতরটা যেন কিছুটা দেখতে পেলাম। পরবর্তী জীবনে বীণাখালার এই নরম মনের কত যে পরিচয় আমি পেয়েছি।

ফোবানা সম্মেলনে গেছি ডালাসে। সেখান থেকে ফ্লোরিডায় গেছি বীণাখালার বাড়িতে। একটানা দুসপ্তাহ বীণাখালার সঙ্গে। জীবনে এতগুলো দিন কখনও একসঙ্গে তার কাছে থাকা হয়নি। আমি যাব বলে সে কাজ থেকে ছুটি নিয়ে রেখেছে। বীণাখালার বরের নাম মিন্টু চৌধুরী। আমি তাঁকে খালু ডাকি না। ডাকতাম ‘মামা’। যেহেতু বীণাখালার পিঠাপিঠি বড়ভাইয়ের নামও মিন্টু, তাঁকেও ডাকি ‘মিন্টুমামা’। দুই মিন্টুমামায় একটু গণ্ডগোল হয়ে যায় দেখে বীণাখালার বর বললেন, আমাকে ‘মামু’ ডাকলেই তোমার সমস্যাটা মিটে যায়।

আমি তাঁকে মামুই ডাকতে লাগলাম।

মামুর বাবা মারা গেছেন ছেলেবেলায়। আর কোনও ভাইবোন নেই। একমাত্র পিছুটান মা। নিজে আমেরিকায় সেটেল করার সঙ্গে সঙ্গে মাকে নিয়ে এসেছেন। ওয়েস্ট পামবিচে বাড়ি করেছেন। দুই ছেলে, শান্তনু  আর অনিন্দ্য বড় হয়ে গেছে। মামু বিজনেস করেন। বেশ কয়েকটা গ্রোসারি শপ ফ্লোরিডায়। খুবই সিরিয়াস ধরনের মানুষ। বীণাখালার ডিপার্টম্যান্টেই পড়তেন। বাংলা বিভাগ, দুতিন ক্লাস সিনিয়র। দেখতে খুবই সুপুরুষ ধরনের। চমৎকার গান করেন। শিল্প সাহিত্যের বোধ চমৎকার। আমি যাচ্ছি শুনে তিনি দোকানের কর্মচারীদের বলেছেন, তোমরা দোকান চালাবে। আমি কয়েকটা দিন খুবই ব্যস্ত থাকব।

বীণাখালা আর মিন্টুমামু এসেছেন এয়ারপোর্টে। ডালাস থেকে আমি গিয়ে নেমেছি। আমার হাত থেকে প্রথমেই ব্যাগটা টেনে নিতে চাইল বীণাখালা। তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কেঁদে ফেলল। আমিও বীণাখালাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি। আমেরিকানরা আমাদের দেখে ভাবছে বোধহয় পুরনো প্রেমিক প্রেমিকা বহুদিন পর মিলিত হয়েছে।

দুসপ্তাহ থাকলাম বীণাখালার ওখানে। কী যে আনন্দে কাটে এক একটা দিন। ওদের একটা সংগঠন আছে। সেই সংগঠন থেকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনুষ্ঠান করল। অনুষ্ঠানের নাম ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’। সমমনা অনেক বাঙালি একত্রিত হয়েছে। দর্শকসারিতে বীণাখালার শাশুড়িও আছেন। তাঁর ডাকনাম খুকি। খুবই আমুদে এবং প্রাণবন্ত মানুষ। আমি ঠাট্টা করে ডাকি ‘খুকিনানি’। নানি কিন্তু খুকি।

কোনও কোনও বিকেলে মায়ামি বিচে চলে যাই। বীণাখালা মামু আর আমি। নীল আটলান্টিকের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি তিনজন। মামুকে দেখি খুবই উদাস। সারাক্ষণ কী যেন ভাবছেন। বীণাখালা অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারছেন না কী হয়েছে তাঁর। বিচে বসে আমি তাঁকে ধরলাম। কী হয়েছে বলতে হবে ?  

মামু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চারদিন আগে আমার ছোটমামা মারা গেছেন। এই মামাটা আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। চারদিন আগে দেশ থেকে আমার সেলফোনে ফোন করে জানিয়েছে। মুশকিল হলো মাকে খবরটা দেব কেমন করে ?   মা তো কান্নাকাটি করে পাগল হয়ে যাবে।

আমি আর বীণাখালা স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

তারপর মামু নিজেই সমাধান বের করলেন। মিলন যে-কদিন আছে সে-কদিন ঘটনাটা মাকে  জানাব না। মিলন চলে যাওয়ার পর জানাব। মনের কষ্ট মনে চেপে আমাকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠতে চাইলেন মামু। দুদিন পর আমরা চলে গেলাম ‘কীওয়েস্ট’এ। সেখানে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’র বাড়ি। দিনভর সেই বাড়ি ঘুরে দেখলাম। দি ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সীর প্রথম বাংলা অনুবাদ, আমার জন্মের বছর প্রকাশিত, সেই বই দেখলাম হেমিংওয়ের আলমারিতে।

এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। ‘হেমিংওয়ের বাড়িতে বাংলা বই’ নামে একটা লেখা লিখেছিলাম।

দুটি সপ্তাহ কোথা দিয়ে কেমন করে কেটে গেল টেরই পেলাম না। বীণাখালা আমাকে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায় খাওয়াতে। অরল্যান্ডোতে নিয়ে গেল ডিজনিওয়ার্ল্ড দেখাতে। যাওয়ার পথে কত যে কমলা বাগান। মামুকে নিয়ে আমরা তিনজন কখনও কখনও যাই শপিংমলে। গ্যাপের জিন্স, সুন্দর দামি শার্ট, জুতো আর পারফিউম, আমার পছন্দের জিনিস গাদা গাদা কিনে দেয় দুজনে। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে আমরা আড্ডা দিই। খুকিনানি অসাধারণ রান্না করে খাওয়ান। বীণাখালা আর আমি দোতলার বারান্দায় বসে কিশোরবেলায় ফিরি। ফেরার দিন যত ঘনায় বীণাখালার মুখ তত বিষণ্ন হতে থাকে। আমার মুখের দিকে তাকায় না। আড়ালে তাকে চোখ মুছতে দেখি।

আমার অবস্থাও একই রকম। যখন তখন চোখ ভিজে আসে। ফেরার দিন এয়ারপোর্টে আমরা দুজনেই একদম শিশু হয়ে গেলাম। দুজন দুজনকে জরিয়ে ধরে কী যে কান্না!

সেই ছেলেবেলায়ও এমন হতো আমার। বীণাখালাদের বাড়ি থেকে চলে আসার আগের দিন থেকেই মন খারাপ। কাল চলে যাব। বীণাখালার সঙ্গে কত কতদিন আর দেখা হবে না। কোথায় কোন গ্রামে পড়ে থাকব আমি, আর কোথায় বীণাখালা!

হয়তো একদেড় বছর পর আবার গিয়েছি বীণাখালাদের বাড়ি। ততদিনে আমরা দুজনেই সামান্য বড় হয়েছি। বীণাখালা মেয়ে বা আমি ছেলে এই বোধ আমাদের নেই। আমরা একরমই। দুজন দুজনার জন্য কাতর।

তখন হয়তো শীতকাল। কুয়াশা জড়ানো ভোরবেলায় ঝিকঝিক করে রেলগাড়ি চলে যায় ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ। একজন বাকরখানিঅলা বাকরখানি বিক্রি করতে আসে। সঙ্গে ছোট ছোট রসগোল্লা, চিনিমাখানো বালুসাইও বিক্রি করে। সকালের নাশতার জন্য বাকরখানি আর মিষ্টি কেনেন নানি। আমরা রোদ পোহাতে পোহাতে খাই। নিজের ভাগ থেকে বীণাখালা চুপি চুপি আমাকে কিছুটা দেয়।

দুপুরের মুখে মুখে খোকনমামা মিন্টুমামা আর আজাদ পায়খানাঘর থেকে ধরে এনেছে বড় সাইজের একটা টিকটিকি। ট্রান্সপারেন্ট ধরনের পেটে তিন চারটা ডিম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। খোকনমামা কোত্থেকে একটা জংধরা ব্লেড জোগাড় করেছেন। এখন টিকটিকির পেট অপারেশন করে ডিম বের করা হবে। বীণাখালা ঘেন্নায় নাক কুঁচকে আমার হাত ধরল। চল এখান থেকে যাই। এসব দেখতে আমার বিচ্ছিরি লাগে।

বীণাখালা এখনও ওইরকম। কোনও খারাপ দৃশ্য দেখতে পারে না। কিশোরবেলার মতো গভীর আবেগে মন ভর্তি। চমৎকার কবিতা লেখে আর কী যে সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি বেরিয়েছে, কবিতার বই বেরিয়েছে। হৃদয় মন আর মুখখানি বীণাখালার এখনও সেই কিশোরবেলার মতো সতেজ।

ডালাস থেকে ফেরার তিন বছর পর ফোবানা সম্মেলন হলো আটলান্টায়। আমি অতিথি হয়ে গেছি। ফ্লোরিডায় বীণাখালার ওখানে যেতে পারছি না শুনে সে এত মন খারাপ করল। ফোনে কাঁদল কিছুক্ষণ। তারপর সুন্দর কাগজের মোড়কে নিজের কবিতার বইটি পাঠালো এক বান্ধবীর সঙ্গে আটলান্টায়। মোড়ক উন্মোচনের একটি অনুষ্ঠান হবে সম্মেলনে। সেই অনুষ্ঠানে আমি যেন ওর বইটির মোড়ক উন্মোচন করি। সে নিজে আটলান্টায় আসেনি, আমি ওর ওখানে কেন যাব না এই অভিমানে।

বীণাখালার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে গিয়ে আমি কেঁদে ফেললাম। উপস্থিত লোকজন অনেকেই আমার কান্না দেখে হেসে ফেলল। আমার আবেগের অর্থ তারা বুঝতে পারেনি।

বিক্রমপুর থেকে ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় চলে এসেছি। গেণ্ডারিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি। বীণাখালা পড়ে মনিজা রহমান গার্লস-য়ে। একই ক্লাস আমাদের। দুয়েকদিন পর পর আমি চলে যাই বীণাখালাদের বাড়িতে। বীণাখালার সঙ্গে আড্ডা গল্প গান। ওই বয়সেই কী যে সুন্দর গান করে বীণাখালা। রাতে প্রায়ই গিয়ে থাকি বীণাখালাদের বাড়িতে। ফুটফুটে জ্যোৎøা রাতে ছাদে বসে বীণাখালা আমাকে গান শোনায়। ‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে’।

ততদিনে দোতলা কাঠের ঘরটি আর নেই। তিনতলা বিল্ডিং উঠেছে টিনের ঘরের জায়গায়। লিচুগাছগুলো কবে উধাও হয়ে গেছে। পশ্চিম দিককার বাগানমতো জায়গাটি নেই। চারদিকে অজস্র নতুন নতুন বাড়ি। পুকুরটা কোনওমতে টিকে আছে। তিনতলার ছাদে বসে চারদিক তাকালে অন্যরকম লাগে। তবুও বীণাখালার সঙ্গে আমিও কখনও কখনও গলা মিলাই। নিচতলায় নিজের রুমে বসে সেন্টু হয়তো তখন নতুন কোনও গানের সুর তুলছে হারমোনিয়ামে।

সেন্টু তখন টেলিভিশনের বিখ্যাত সুরকার। তার ভালো নাম সাঈদ হোসেন সেন্টু। আহা, কত কম বয়সে চলে গেল সেন্টু!

দুচার বছর পর পর দেশে আসে বীণাখালা। আগেই আমাকে জানায় কবে আসবে। তারপর বীণাখালা যতদিন ঢাকায়, প্রায় প্রতিরাতে আমি চলে যাই গেণ্ডারিয়ায় বীণাখালাদের বাড়িতে। রাত দেড়টা দুটো পর্যন্ত আড্ডা। দীনা চমৎকার রান্না করে খাওয়ায় আর হাসে। বছরভর তোমার কোনও খবর থাকে না মিলন মামা। বন্ধু আসছে আর এখন রোজ তোমার চেহারা দেখছি।

জীবনের কত স্মৃতি আমার এই বীণা বন্ধুকে নিয়ে। মিন্টুমামুর সঙ্গে তাঁর অ্যাফেয়ার চলছে। টিএসসিতে বসে আড্ডা দিচ্ছে দুপুরবেলা। জগন্নাথের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমি গেছি দিদারদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। বীণাখালার সঙ্গে দেখা। মামু লাজুক মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। বীণাখালা তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল, এই হচ্ছে মিলন। আমার বাল্যসখা।

বীণাখালার সঙ্গে দেখা হলে, বীণাখালার পাশে দাঁড়ালে আমি আমার বয়স টের পাই না। মনে হয় আমি এখনও আছি আমার সেই কিশোর বয়সে। বীণাখালা এখনও সেই লাল ফ্রক পরা মেয়েটি। এক্ষুনি যেন আমার হাত ধরে বলবে, চল, আমরা রেলগাড়ির বগি গুনি। অথবা ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাতে মিনুখালার কলুটোলার বাড়ির ছাদে আমার হাত ধরে ঘুরতে ঘুরতে গলা ছেড়ে গাইবে, ‘যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকাবনে’।

এখনও কোনও কোনও শ্রাবণ মাসের দুপুর শেষ হয়ে আসা আলোয়, কিংবা নিঝুম বৃষ্টির রাতে হঠাৎ করেই বীণাখালার কথা মনে পড়ে আমার। দীননাথ সেন রোডের সেই পুরনো দিনের বাড়িটা চোখের সামনে দেখতে পাই, দোতালার ঘরে বসে অনুমামা গ্রামোফোন বাজাচ্ছেন। গ্রামোফোনকে আমরা বলতাম ‘কলেরগান’। সেই কলেরগানে সেভেন্টি এইট আরপিএমের রেকর্ডে বাজছে হেমন্তের মন খারাপ করা গান।

‘আমি বন্ধুবিহীন একা

আঁধার ঘরে, বাহিরে বাদল ঝরে

ঝরো ঝরো অবিরল ধারে’।

বীণাখালার জন্য এখনও কোনও কোনও বৃষ্টির দিনে, অন্ধকার জমে ওঠা ঘরে আমি সত্যি সত্যি একা হয়ে যাই।

বীণাখালার কথা, ওদের পরিবারের কথা লিখেছি আমার আত্মজৈবনিক উপন্যাস জিন্দাবাহার, মায়ানগর আর একাত্তর ও একজন মা উপন্যাসে।

বেলাল একেবারে রাজপুত্রের মতো। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বেলালের পকেট ভরা টাকা। যখন তখন এটা কিনছে, ওটা কিনছে। দামি দামি শার্ট প্যান্ট, জুতা। একেকদিন একেকটা ঘড়ি। হঠাৎ ইচ্ছা হলো, বলল, ল।

কই যাবি ? 

আবে ল না!

কাঠের পুলের ওখান থেকে রিকশায় উঠলাম আমরা। লক্ষ্মীবাজার পেরিয়ে রিকশা চলে এলো কোর্টের ওদিকটায়। কোর্টের পুবদিকটায়, রাস্তার ওপারে ‘মুকুল’ সিনেমা হল। হলের উত্তর পাশে খুবই নামকরা একটা রেস্টুরেন্ট। দিল্লী মুসলিম হোটেল। রিকশা থেকে নেমে বেলাল আমাকে নিয়ে সেই রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে মোরগ পোলাওয়ের অর্ডার দিল।

বেসিন থেকে হাতটাত ধুয়ে এসে আমরা খেতে বসছি, বেলালের মনে হলো, খাবারের পরিমাণ কম। পোলাওটা ঠিক আছে, মোরগ ঠিক নেই। হাত ইশারায় ওয়েটারকে ডাকলো। একটা ফুল মুরগি আনো।

সঙ্গে সঙ্গে আস্ত একখানা মুরগির রোস্ট চলে এল। দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। দুইজনে এত খামু কেমনে ? 

বেলাল আমাকে একটা ধমক দিল। খা ব্যাডা।

প্রায় গলা পর্যন্ত খেয়ে বিল হয়েছে হয়তো আঠারো টাকা। তখনকার দিনে আঠারো টাকা বিশাল ব্যাপার। বেলাল কেয়ারই করলো না। নির্দ্বিধায় পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে দিল। কাউন্টারে রাখা কোয়ার্টার প্লেট থেকে একমুঠ ভাজা ধনে মুখে দিয়ে বড়দের কায়দায় চিবাতে চিবাতে হাঁটতে লাগল। আমি তখন পেটের ভারে হাঁটতে পারছি না। বললাম, বেলাল, রিকশা ল।

আবে না। হাঁট।

হাঁটতে পারতাছি না তো ? 

তাও হাঁটতে হইবো। রাত্রে খাওয়ার পর হাঁটন ভালো।

আমি আর কী করি, বেলালের পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে বেলালদের বাড়িতে এসে পৌঁছেছি। ততক্ষণে রাত আটটা সাড়ে আটটা বেজে গেছে। বেলাল বলল, বাসায় যাওনের কাম নাই। আমার লগে থাক।

বেলালের সঙ্গে থেকে গেলাম। বাসায় আমাকে নিয়ে কেউ চিন্তা করবে কি না, কোথায় থাকলাম, কোথায় খেলাম কেউ ভাববে কি না একবারও সে কথা মনে হলো না। বেলালদের বাড়ির যে রুমটায় আমরা ব্যায়াম করি সেই রুমের চৌকিটায় শুয়ে ঘুমিয়ে গেলাম দুইবন্ধু। সকালবেলা বাড়ি ফেরার পর কেউ জিজ্ঞেসও করল না, কোথায় ছিলাম কালকে রাতে।

পরবর্তী জীবনেও বহু বহু রাত আমি বন্ধুদের বাড়িতে থেকেছি। বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি তাদের বিছানা। রাত জেগে আড্ডা হাসি আনন্দ গান গল্প! আহা কী যে মধুর সেই জীবন!

ক্লাস সেভেন এইটে পড়ার সময় থেকেই বন্ধুবান্ধবের দুটো তিনটে সার্কেল তৈরি হয়েছে আমার। একদিকে মুরগিটোলার (জায়গাটার কেতাবি নাম ডিস্টিলারি রোড) বাসার পাশের বাড়িটির ছেলে আলির সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব। অন্যদিকে বেলাল হামিদুল। গেন্ডারিয়া স্কুলের ক্লাসমেটদের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব হয়েছে মানবেন্দ্রর সঙ্গে, মুকুলের সঙ্গে। সুভাষ আচার্য, সুভাষ মণ্ডল, শংকর ওরাও দারুণ বন্ধু। হারুন, ইসরাজুল ওরাও আমার বন্ধু। কিন্তু মানবেন্দ্র কিংবা মুকুলের মতো প্রিয় না, সুভাষ মণ্ডল কিংবা আচার্যের মতো প্রিয় না।

ক্লাস নাইনে ওঠার পর বন্ধুত্ব হয়েছিল মোহাম্মদ আলির সঙ্গে, জাহিদের সঙ্গে। মোহাম্মদ আলি আমাদের চে’ বয়সে বছর দেড়বছরের বড় হবে। বিশাল লম্বা ছেলে। একটু মাস্তান টাইপ। দুদিকে ডানা ছড়িয়ে মা পাখি যেমন আগলে রাখে ছানাদেরকে, বুলু সেভাবে আমাকে আর মানবেন্দ্রকে আগলে রাখতো। কারণ লেখাপড়ায় ভালো বলে ক্লাসের দুষ্টু ধরনের কয়েকটি ছেলে আমাদেরকে তেমন পছন্দ করতো না। চান্স পেলে ধাক্কাটা, ল্যাংটা মারতো। বুলু এসব থেকে আমাদের রক্ষা করত। বুলুুর ভয়ে কেউ আমাদের ধারে কাছে আসত না। বুলুদের পোস্তগোলার বাড়িতে আমরা অনেক রাত থেকেছি। আমি আর মানবেন্দ্র। একাত্তর সালের পর পর বুলু আর মানবেন্দ্রর সঙ্গে বেলালের খুব জমে গেল। ওরা তিনজন আছে গলায় গলায়। আমিই যেন দল থেকে একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। তবে সেটা খুব বেশি দিনের জন্য না।

মানবেন্দ্রদের বাড়িতে, ওদের সামনের দিককার রুমে আমরা তিনবন্ধু গাদাগাদি করে থেকেছি এক বিছানায়। গ্রীষ্মকালের কোনও কোনও রাতে ওদের বাড়ির ছাদে গিয়ে পাটি বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। একদিকে মশার কামড়, অন্যদিকে মানবেন্দ্রদের বিশাল বাড়িটি অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা থেকে আসা ঝিরঝিরে হাওয়া, আমাদের মুখ বরাবর আকাশে হয়তো উঠেছে পূর্ণচাঁদ, চাঁদের আলোয় আমরা তিনটি বন্ধু শুয়ে আছি চারদিক ঘের দেয়া বহুকালের পুরনো ছাদে। হয়তো আমাদের সঙ্গে কোনওরাতে মুকুলও আছে। আরও পরে, কলেজে পড়ার সময় হয়তো আছে কামাল।

একটা সময়ে মুকুলের সঙ্গে বহুরাত কেটেছে আমার।

পরিচয়ের প্রথম দিকে মুকুলদের বাসা ছিল বীণাখালাদের বাড়ির কাছে। মুকুলদের সেই বাসার কথা আমার তেমন মনে নেই। তারপর ডালপট্টির ওদিকে বাসা নিলেন মুকুলের বাবা, সেই বাসায় আমি কখনও ঢুকেছি বলে মনে পড়ে না। তবে বাসাটার কথা মনে আছে। রাস্তার সঙ্গে বাসা। ওদিক দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তা থেকেই মুকুলকে আমরা ডাকতাম, মুকুল বেরিয়ে আসত। খানিক এগোলেই মুকুলদের প্রেস। প্রেসের নাম ‘মুকুল প্রেস’।

এই প্রেসে মুকুলের সঙ্গে বহুরাত থেকেছি আমি।

মুকুলরা মানিকগঞ্জের লোক। ঢাকা থেকে পুরো পরিবার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন মুকুলের বাবা। শুধু মুকুল ঢাকায়। প্রেসটা তেমন বড় না। সামনের দিকে একটা ট্রেডেল মেশিন, কম্পোজ সেকশান। তারপর হার্ডবোর্ডের একটা পার্টিশান। পার্টিশানের ওপাশে একটা চৌকি। বাবার সঙ্গে মুকুল সেখানে থেকে আমাদের সঙ্গে গেণ্ডারিয়া হাইস্কুলে পড়ে। বাবা কখনও কখনও বাড়ি চলে যান। তখন আমি গিয়ে মুকুলের সঙ্গে থাকি। কোনও কোনও রাতে খুব খিদে পায় আমার। মুকুল ওই অতরাতে উঠে হয়তো খিচুড়ি রেঁধে ফেলল। কিংবা গরম ভাত আর আলুভর্তা, ডাল। আমরা খুব মজা করে খেলাম।

তারপর প্যারিদাস রোডে একরুমের একটা বাসা নিলেন মুকুলের বাবা। সেই বাসায়ও রাতের পর রাত থেকেছি আমি। ততদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। কামালের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। কামালও থাকছে আমাদের সঙ্গে।

কামাল এবং মুকুল দুজনেই এখন জার্মানিতে। প্রথমে চলে গেল মুকুল আর বজলু। সেটা সাতাত্তর সাল। তারপর গিয়েছিলাম আমি আর কামাল। উনআশি সাল। মুকুল আর কামাল দুজনেই রয়ে গেছে জার্মানিতে। আমি দুবছর থেকে ফিরে এসেছিলাম। বজলু জার্মানি থেকে চলে গেল আমেরিকায়। নিউইয়র্কে দুবার বজলুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তারপর ঢাকায় এসে মারা গেল। মানবেন্দ্র আমাকে ফোনে জানিয়েছিল।

মুকুল কোনও কোনও গভীর রাতে জার্মানি থেকে আমাকে ফোন করে। কথা বলতে বলতে রাত কাবার করে ফেলি আমরা। মনেই থাকে না কত কতকাল আমাদের দেখা হয় না। যেন বা আমাদের কিশোরকালটাই এখনও কাটেনি। যেন বা এখনও আমরা আছি সেই বয়সে। সেই বয়সের মতোই উচ্ছ্বাস আমাদের, সেই বয়সের মতোই আবেগ অনুভূতি আর ভাষা।

কদিন ধরে কামালের কথা খুব মনে হয় আমার। কামালকে একটা ফোন করব ভাবছি, এক বিকেলে হঠাৎই কামালের ফোন। আমি ছেলেমানুষি গলায় বললাম, কামাল, কদিন ধরে তোর কথা খুব মনে হয়। খুব মিস করছি তোকে।

আমার কথা শুনে কথা বলতে পারল না কামাল। শিশুর মতো কেঁদে ফেলল। আমিও তোকে খুব মিস করছি, দোস্ত।

কামালের সঙ্গে কত রাত থেকেছি ওদের বাড়িতে। পরবর্তী জীবনে সবচাইতে বেশি থেকেছি আফজালের সঙ্গে।

আফজালের সঙ্গে যখন পরিচয় তখন সে চারুকলার ছাত্র। নিউমার্কেটের ওদিকে ছিল চারুকলার একটা হোস্টেল, সেই হোস্টেলে থাকে। এক দুবার আফজালের হোস্টেলে গেছি। তারপর শেরেবাংলা নগরের ওদিকে একটা বাসায় থাকত। সেই বাসায় যাওয়া হয়নি। তারপর এলো মতিঝিলে, এজিবি কলোনিতে। ওখানে দুয়েক রাত ওর সঙ্গে থেকেছি। সবচাইতে বেশি থাকা হয়েছে আফজাল যখন পান্নার সঙ্গে মণিপুড়ি পাড়ায় থাকে, ওই বাসাটায়। কাছাকাছি ছিল হারুদের বাসা। তারপর গ্রিনরোডে চলে এলো পান্না আর আফজাল। ওই বাসাটাতেও অনেক থেকেছি। কোনও কোনও রাতে রহমান আলম দিদার হারু পাভেল, ধুমছে আড্ডা দিয়েছি আমরা।

রহমানদের শহিদবাগের বাড়িতেও থেকেছি অনেকরাত। দিদারের হলে থেকেছি, জুবায়ের সারোয়ারের হলে থেকেছি। হাবিবের বাসায় থেকেছি, সিরাজের বাসায় থেকেছি। আজ যখন পিছনের সেই জীবনটার দিকে তাকাই, আমার মনে হয় নিজের বাড়ির চে’ অনেক বেশি থেকেছি আমি বন্ধুদের বাড়িতে। বন্ধুদের সঙ্গেই কেটেছে জীবনের সবচাইতে বেশি রাত। নারায়ণগঞ্জে ধলার বাসায় গিয়েও তো একটা সময় নিয়মিত থেকেছি। আর থেকেছি ছানার মেজোভাই সজলদার বাসায়। নীলাবুর বাসার ড্রয়িংররুমের ফ্লোরে তোষক বিছিয়ে আফজাল ছানা আর আমি রাতের পর রাত ঘুমিয়েছি। সদ্য বিয়ে করেছি, সেই স্ত্রীকে ফেলেও বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে থেকেছি। একটাই কারণ, আড্ডা হৈ চৈ আর আনন্দ করা।

সুত্রাপুরের গৌতম, বিখ্যাত অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের ছোটভাই মানিক, লক্ষ্মীবাজারের রওশন ওরা হচ্ছে বেলালের বন্ধু। ততদিনে বেলাল বেশ মাস্তান টাইপ হয়ে উঠছে। সাহসের অন্ত নেই তার। গৌতম মানিক ওরাও বেশ সাহসী। কাউকে তেমন পাত্তা দেয় না। আর রওশনকে তো রীতিমতো ভয় পায় অনেকে। বেলালের কারণে আমারও বন্ধুত্ব হয়েছে ওদের সঙ্গে। গৌতমদের পুরনো দিনের বাড়ি। ওর বাবা কাকারা সোনার ব্যবসায়ী। গৌতমের বাবা নেই। ইসলামপুরে সোনার দোকান আছে। গৌতম সেই দোকানে গিয়ে বসে। মুঠো মুঠো টাকা নিয়ে আসে আর বন্ধুদের নিয়ে উড়ায়। গৌতমের মা জাঁদরেল ধরনের মহিলা। গৌতমকে নানারকম শাসনে রাখার চেষ্টা করেন। শাসনে গৌতম থাকে না। তবে বেলালকে খুব ভালোবাসে, বেলালের কথা খুব শোনে। গৌতমদের বাড়িতে গিয়েও মাঝে মাঝে রাতে থেকেছি আমি আর বেলাল।

টোকিওতে গিয়েছি ২০০৯ সালে। ইকেবুকোরো নিশিগুচি পার্কে হচ্ছে বৈশাখি মেলা। আমার একক বইয়ের স্টল করেছে ‘বিবেকবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক পি. আর প্লাসিড।  আমি আর আমার প্রধান প্রকাশক ‘অনন্যা’র স্বত্বাধিকারী মনির বসে আছি স্টলে। চারদিকে মানুষ গিজগিজ করছে । বেগুনি রংয়ের শাড়ি পরা মিষ্টি ধরনের একটি মেয়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল। সঙ্গে বর আছে। আমার অনেকগুলো বই নিল। মেয়েটি খুবই লাজুক ধরনের। একটিও কথা বলছিল না। বই পছন্দ করে বরকে ইশারা করল। ছেলেটি অটোগ্রাফের জন্য বই এগিয়ে দিল। মেয়েটির নাম ‘মৌ’। আমি ‘মৌকে শুভেচ্ছা’ ইত্যাদি লিখে সই করে দিচ্ছি। মৌ’র বর বলল, আপনি ওকে চিনবেন। ওর বাবার নাম গৌতম। সুত্রাপুরে বাড়ি। শুনে আমি হতভম্ব। ফ্যাল ফ্যাল করে মৌর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। তুমি গৌতমের মেয়ে! বলোনি কেন ? 

মৌ মুখ নিচু করে এই প্রথম কথা বলল, বাবার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে কি না, আপনি তাকে চিনতে পারবেন কি না…

আমার এত মন খারাপ হলো! গৌতমকে আমি চিনতে পারব না ?  হ্যাঁ যোগাযোগ তেমন নেই, কিন্তু চিনতে পারব না কেন ?   সে তো আমার বন্ধু। গৌতমের সঙ্গে কত স্মৃতি।

মোহাম্মদ আলীর ডাকনাম বুলু আর মানবেন্দ্রর ডাকনাম খোকন। স্বাধীনতার পর পর আমার এই দুইবন্ধুর সঙ্গে বেলালের খুবই বন্ধুত্ব হলো। খোকন তখন মোটর সাইকেল চালায়। কোন ফাঁকে যেন একটু ডেয়ারিং টাইপ হয়ে উঠেছে। বুলু তো আগাগোড়াই ডেয়ারিং, বেলালও তাই। ওরা তিনজন মোটর সাইকেল নিয়ে এদিক ওদিক আড্ডা দিতে যায়। অনেক সময় আমি থাকি না। বুলুর চে’ও খোকনের সঙ্গে বেলালের বেশি ঘনিষ্ঠতা। হয় বেলাল মোটর সাইকেল চালাচ্ছে আর খোকন বসে আছে পিছনে, নয়তো খোকন চালাচ্ছে বেলাল বসে আছে পিছনে। দুজনেই ধুমিয়ে সিগ্রেট খায়। পড়াশোনায় বেলালের তেমন মন নেই। বেলালের মা বাবা ভাই বোনদের ধারণা হলো খোকনের সঙ্গে মিশে বেলাল বখে গেছে। এসব নিয়ে বেলালকে একটু বকাঝাকা করলেন মহিউদ্দিন ভাই। বেলালের ধারণা হলো মহিউদ্দিন ভাইকে আমি নানারকম কথা বলে উসকেছি। কিন্তু আমি এসবের কিছুই জানি না।

বেলালের সঙ্গে তেমন দেখাও হয় না। মাসখানেক পর এক বিকেলে দেখা হয়েছে। বেলাল কী রকম একটু গম্ভীর। তারপরও আমাকে নিয়ে লক্ষ্মীবাজারের দিকে রওনা দিল। রওশনদের বাড়িতে গেল। রওশন ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। আমাকে দেখে একটু যেন অবাকই হলো। তারপর ইশারা ইঙ্গিতে বেলালের সঙ্গে কী কী কথা হলো। আমি শুধু পরিষ্কার একটা কথাই শুনলাম, বেলাল বলছে, না বে, আইজ না। পরে।

রওশন বলল, আবে এইটাই তো চান্স।

বেলাল আবার বলল, না না আইজ না।

এই রহস্য জানা গেল কয়েকদিন পর। বেলালই আমাকে বলল, ওদিন রওশন কী কইতেছিল তুই কিছু বুজছস ? 

না তো।

ও তোরে মাইর দিতে চাইছিল।

আমি অবাক। ক্যান ? 

আমিই ওরে কইছিলাম তোরে একটা মাইর দিতে।

ক্যান ? 

মনে করছিলাম খোকনের লগে আমার বেশি খাতির দেইখা তুই জেলাস হইছস। হের লেইগা বানাইয়া বানাইয়া মহিউদ্দিন ভাইর কাছে নানান পদের কথা কইয়া আমারে বকা খাওয়াইছস। এর লেইগাই রওশনরে কইছিলাম তোরে মাইর দিতে।

আমি হতভম্ব। তারপর ? 

তোরে লইয়া এর লেইগাই রওশনগ বাইত গেছিলাম। কিন্তু তোর মুখ দেইখা এত মায়া লাগল। রওশনরে থামাইয়া দিলাম। আইজ জানলাম মহিউদ্দিন ভাইর কাছে তুই কোনও কথাই কচ নাই। সে আন্তাজেই আমারে বকাবকি করছে। আর খোকনেরও কোনও দোষ নাই। ও তো আমার লগে মিশে নাই, আমিই তো ওর লগে গিয়া মিশতাম। আমার লেইগা মাঝখান থিকা খোকনের বদনাম হইল। খোকন তো খুব ভালো ছেলে।

আমাদের জীবনে এরকম কত ঘটনা।

বেলাল খুব সুন্দর সুন্দর শার্ট পরে। দুচারদিন পর পরই দেখি বেলালের গায়ে নতুন দামি শার্ট। আমি খুবই ম্লান পুরনো একটা শার্ট পরে বেলালের সঙ্গে ঘুরছি। একটু লজ্জাও লাগে। একদিন বিকেলের দিকে বেলালদের বাড়ি গেছি। বেলাল দুর্দান্ত একটা শার্ট পরে বেরিয়ে এলো। আমি মুগ্ধ হয়ে বেলালকে দেখছি। বেলাল বলল, কী বে, কী দেখছ ? 

শার্টটা খুব সুন্দর। কবে কিনছস ? 

কাইল। আইজই পয়লা পরলাম।

দারুণ শার্ট।

বেলাল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দুয়েক মুহূর্ত কী ভাবল তারপর ভিতর বাড়িতে চলে গেল। খাড়া, আইতাছি।

কিছুক্ষণ পর অন্য একটা শার্ট পরে বেরিয়ে এলো। খবরের কাগজে প্যাচানো একটা প্যাকেট হাতে।

কী রে, নতুন শার্টটা খুলছস ক্যান ? 

প্যাকেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, শার্টটা তোর পছন্দ হইছে, তুই এইটা লইয়া যা। আমি আর একটা কিনা লমু নে।

এই ঘটনার সাইত্রিশ বছর পর ঠিক বেলালের কায়দায় আমার হাতে একটা পাঞ্জাবির প্যাকেট ধরিয়ে দিল সাগর। আমার প্রিয়বন্ধু ফরিদুর রেজা সাগর। সাগর এবং তার পার্টনাররা ততদিনে চ্যানেল আই প্রতিষ্ঠা করেছে। আমরা, বন্ধুরা ঘুরে ফিরে চ্যানেল আইয়ের সিদ্ধেশ্বরীর অফিসে যাই। সাগরের রুমে বসে চা খাওয়া আর আড্ডা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সঙ্গে আড্ডাও চালিয়ে যায় সাগর। কোনও কোনওদিন আফজাল থাকে, কোনওদিন থাকে আরেফিন, আবার কোনওদিন রহমান। সাগর তো সব সময় সাদা পাঞ্জাবিই পরে। একদিন দেখি নতুন ধপধপে সাদা একটা পাঞ্জাবি পরেছে। বুকের কাছে ফিরোজা রংয়ের সুন্দর কাজ করা। বললাম, বাহ্ সুন্দর পাঞ্জাবি পরেছ বন্ধু।

সাগর আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। পরদিন সাগরের ফোন। মিলন, কোথায় তুমি ? 

বাসায়।

একটু আসো না।

আমার বাসা থেকে সাগরের অফিস সত্যিকার অর্থেই পাঁচমিনিটের পথ। গেছি। চা খাওয়ার পর সাগর আমার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিল।

কী এটা ? 

বাসায় গিয়ে দেখো।

আমার আর তর সয় না। ওখানেই খুলে ফেললাম প্যাকেট। হুবুহু সাগরের গতকালকার পাঞ্জাবিটা।

সাগরের মুখের দিকে তাকিয়েছি। হাসিমুখে বলল, পাঞ্জাবিটা তুমি খুব পছন্দ করেছিলে এজন্য আরেকটা আনিয়েছি।

সেই কিশোর বয়সের একবারকার ঈদের আগে আগে বেলালদের বাড়িতে গেছি। চারদিকে ঈদের কেনাকাটা চলছে। আব্বা তখনও আমাদের কোনও ভাইবোনকে কিছু কিনে দিতে পারেননি। আমি একটু মন খারাপ করেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে সবচাইতে মন খারাপ মণির। মণির বান্ধবীরা এই ঈদে সবাই শাড়ি কিনবে। শাড়ি পরে কিশোরী মেয়েগুলো ঈদের দিন ঘুরে বেড়াবে। সবারই শাড়ি কেনা হয়ে গেছে, শুধু মণিরটা হয়নি। আব্বা তাকে শাড়ি কিনে দিতে পারবেন কি না তাও মণি বুঝে উঠতে পারছে না। ওর মুখ দেখে আমিও খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। ও রকম মুখ নিয়েই গেছি বেলালের কাছে। আমার মুখ দেখে বেলাল বলল, কী হইছে রে ? 

ঘটনাটা বললাম। বেলাল পাত্তাই দিল না। আমরা হামিদুলদের বাড়িতে চলে গেলাম আড্ডা দিতে। খরগোশ পাখি এসব পালার ফাঁকে ফাঁকে হামিদুল তখন আরেক নেশায় মগ্ন হয়েছে। মাটির জিনিসপত্র বানায়। ঘোড়া বাঘ ফুলদানি গ্রামোফোন। এত সুন্দর বানায়, দেখে আমরা মুগ্ধ।

পরবর্তী জীবনে ওই মাটির কাজটাই হামিদুলের পেশা হয়েছে। এখন সে একজন শিল্পী। পড়াশোনা তেমন করেনি। কলেজে ভর্তি হয়েছিল ঠিকই তারপর আর বেশিদূর এগোয়নি। মাটি তাকে শিল্পী করেছে।

যাহোক সেদিন কী কী সব বানিয়েছে হামিদুল। আমাদেরকে খবর দিয়েছে। আমরা গেছি দেখতে। আমার হাতে একটা গ্রামোফোন ধরিয়ে দিল হামিদুল। এত নিখুঁত করে বানানো। আমি মুগ্ধ। বেলালকেও কী একটা দিতে চাইল, বেলাল নিলো না। রাখ। এইসব আমার ভাল্লাগে না।

পরদিন সকালের দিকেই গেছি বেলালদের বাড়িতে। সেই ছোট্ট ঘরটায় বসেছি। খবরের কাগজে জড়িয়ে বেলাল একটা নতুন সুন্দর শাড়ি নিয়ে এলো। তখনকার দিনে সাত আটশো টাকার কম হবে না দাম। এইটা মণিআপারে দিস।

আমি অবাক। শাড়ি পাইলি কই ? 

সেইটা তর জাননের কাম নাই।

পরে একদিন বেলাল হাসিমুখে ঘটনাটা বলল। ওর বড়বোনের জন্য বাবা পাঁচটা ঈদের শাড়ি কিনেছেন। বোন সেগুলো খুলে দেখার সময় পায়নি। বেলাল সেখান থেকে একটা শাড়ি সরিয়ে আমার বোনের জন্য দিয়ে দিয়েছে।

এই ঘটনা মনে হলে আমার চোখে এখনও পানি আসে।

একটা সময়ে আমার বন্ধুত্বের সার্কেল আরও বড় হয়ে গেল। দেশ স্বাধীন হয়েছে। বেলাল পড়ছে সোহ্রাওয়ার্দী কলেজে, আমি জগন্নাথে। যুদ্ধের সময় আব্বা মারা গেছেন। আমরা খুবই স্ট্রাগল করছি।   পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে টিউশনি করতে হয় আমাকে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার সময় পাই না। লেখালেখির পোকাও ঢুকেছে মাথায়। ওসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছি। বেলাল আছে তার মতো। কখনও দামি নতুন মোটর সাইকেল চালাচ্ছে, কখনও হুডখোলা জিপ। রাজকীয় ভঙ্গি। আমার সঙ্গে তেমন দেখাটেখা হয় না। বেশ কয়েক মাস পর একদিন দেখা হয়েছে, দেখি বেলাল খুবই নিরীহ মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরনে মলিন ধরনের জামা কাপড়। মুখে পান। বেলাল পান খাচ্ছে।

আমি অবাক। বেলাল পান ধরল কবে ? 

কিছুক্ষণ পর গৌতম এলো। গৌতমের কাছ থেকে জানা গেল বেলাল আদম ব্যবসা ধরেছে। এক ভদ্রলোকের সঙ্গে মিলে সৌদিতে লোক পাঠাবে।

তখন ম্যান পাওয়ারের বিজনেসটা মাত্র শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। এই ব্যবসায় কী রকম সুবিধা আমি কিছুই জানি না। বেলাল পান চিবাতে চিবাতে গম্ভীর গলায় বলল, চুপ কইরা বইয়া থাক ব্যাডা। আমার টেকা আইব জাহাজ ভইরা।

সত্যি সত্যি জাহাজ ভরেই যেন টাকা এলো বেলালের। মাস ছয়েক পর শুনলাম বেলালের কাছে চার পাঁচকোটি টাকা। ততদিনে বিয়ে করেছে সে, ফুটফুটে একটা ছেলে হয়েছে। কিন্তু বেলাল নির্বিকার। মোটর সাইকেল কিংবা হুডখোলা জিপ কিছুই চালায় না। তার সঙ্গে মানায় না এমন মলিন জামা কাপড় পরে রিকশা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর পান খায়। নদীর ওপারে বিশাল একটা জমি কিনেছে। যে ভদ্রলোকের সঙ্গে বিজনেস করে তাঁর ওখানে আমাকে একদিন নিয়েও গেল। আমি আর গৌতম তখন নানারকম বৈষয়িক বুদ্ধি দিই বেলালকে। এই কর, সেই কর। বেলাল কথা বলে না। পিরিক করে পানের পিক ফেলে।

এক দেড়বছর পর বেলালের কাছে এক পয়সাও নেই। যেভাবে জাহাজ ভরে টাকা এসেছিল সেইভাবে জাহাজ ভরেই যেন চলে গেছে। নদীর ওপারকার জমি কাকে যেন রেজিস্ট্রি করে দিয়ে দিয়েছে। তিনজন মানুষের সংসার প্রায় অচল। বেলাল নিজেই আদম হয়ে পান চিবাতে চিবাতে কুয়েত না কাতার কোথায় যেন চলে গেল। বন্ধুরা কেউ কিছু টেরই পেল না।

তারপর বহু বহু বছর বিদেশে বেলাল। দুচার পাঁচ বছর পর দেশে আসে। বন্ধুদের কারও সঙ্গে দেখা করে না। কয়েকদিন স্ত্রী পুত্রের সঙ্গে কাটিয়ে আবার চলে যায়। বেলালের একমাত্র সন্তান সায়েম। বেশ লম্বা আর বাবার মতোই সুন্দর। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল। এমবিএ করে ভালো চাকরি করছে। বেলাল শ্বশুরও হয়ে গেছে। ছেলে বউ এখন লন্ডনে থাকে। বিদেশের পাট চুকিয়ে পারমানান্টলি দেশে চলে এসেছে বেলাল। কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা করে না। বেলালের স্ত্রী বীথি আর আমার স্ত্রী ছোটবেলার বন্ধু। বীথিকে ফোনে বললাম, বেলালকে একদিন আসতে বলো।

অনেকবার বলার পর সে একদিন এলো। আমি বেলালকে দেখে অবাক। আগের মতোই আছে। বলতে গেলে একেবারেই বদলায়নি। সেই প্রথম যৌবনের মতোই সুন্দর, সেইসব দিনের মতোই জামা কাপড় পরা। তখনকার দিনের মতোই কথাবার্তা। বয়স যেন বাড়েইনি। দেশে এসে দক্ষিণখান না কোথায় যেন কয়েকটা পুকুর করেছে। সেখানে মাছ চাষ করছে। সারাদিন ওই নিয়ে ব্যস্ত। পুরোটাদিন আমার সঙ্গে কাটিয়ে বিকেলের দিকে ফিরে যাচ্ছে বেলাল। আমি নিচে নেমেছি তাকে পৌঁছে দিতে। নেমে দেখি হানড্রেড সিসির একটা মোটর সাইকেল দাঁড়িয়ে আছে। আমি অবাক। এটা কার রে ? 

আমারই। মোটর সাইকেল চালাতে এখনও আমার খুব ভালো লাগে।

মোটর সাইকেল স্টার্ট দিল বেলাল। সাঁ করে বেরিয়ে গেল। বেলালের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমি যেন সেই প্রথম যৌবনের বেলালকেই দেখছি। মাঝখানে যে আমাদের জীবনের দীর্ঘ একটা সময় পেরিয়ে গেছে, সে কথা আমার মনে নেই।

 [চলবে]

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares