লাশ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আবার পড়ি : সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প

পুলিশ বলেছে রাজুর মা-বাবাকে, থানার বারান্দায় বসে থাকতে, তারা সেখানেই বসে আছে। দুপুর গড়িয়ে গেছে, শীতের রোদ তির্যকভাবে পড়েছে বারান্দায়। গাদাগাদি কিছু মানুষ এর একটা মাথায়, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, তাদের কারও ঘাড়ে, কারও মাথায় পড়েছে রোদ। বারান্দার এদিকটাতে মানুষজন বেশি নেই। রাজুর মা-বাবা বসেছে পা ছড়িয়ে, তাদের পায়ের শক্তি নেই শরীরের ভার ধরে রাখে।

একটা কুকুর ঘুরঘুর করে বারান্দার নিচে, একজন তার দিকে কলার খোসা ছুড়ে মারে। কুকুরটার মর্মবেদনা হয়। সে ঘেউ ঘেউ করে। রাজুর বাবা তাকায় রাজুর মায়ের দিকে, কিন্তু তার চোখ কুকুরটার দিকে অথবা কুকুরটা শেষ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সে স্থানটার দিকে অথবা সে স্থান ঢেকে রাখে যে ধুলোবালি এবং ঘাস, তার দিকে।

তারা বসে আছে দুই ঘণ্টা হয়। দুই ঘণ্টা আগে পুলিশ তাদের আদেশ দিয়েছে বসে থাকতে। তারও এক ঘণ্টা আগে তারা থানায় এসেছে এবং এই এক ঘণ্টা রাজুর মা আকাশ ফাটিয়ে কেঁদেছে। তার কান্নায় থানার বাতাস এলোমেলো হয়ে গেছে। একটি পুলিশের চোখে জল এসেছে, থানাভর্তি মানুষজন স্তব্ধ হয়ে গেছে। খবরের কাগজের ফটোসাংবাদিকেরা সে কান্নার ছবি তুলেছে। একজন সাংবাদিক রুমালে চোখ মুছেছে এবং তারপর সে রুমাল দিয়ে ক্যামেরার কাচ মুছেছে। রাজুর বাবা প্রবোধ দিতে চেয়েছে রাজুর মাকে কিন্তু নিজেকেই সে প্রবোধ দেয় কীভাবে ? ওই প্রবোধের তো তারও প্রয়োজন। নিজের ছেলে পুলিশের গুলি খেয়ে মরেছে, তার লাশ দেখতে এসেছে থানায়। তারও তো কাঁদবার কথা। কিন্তু ছেলের মা যে আকাশ ফাটিয়ে কাঁদছে, তাতে নিজের কান্নাকে শাসন করতে হচ্ছে। সে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ক্রমাগত বলেছে রাজুর মাকে, ‘কেঁদো না রাজুর মা। আল্লাহ দিয়েছে, আল্লাহ নিয়ে গেছে। কেঁদে কী হবে ?’

রাজুর বাবা অবশ্যই কথাগুলো এইভাবে বলেনি। থানার এত মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমিও এভাবে শুনিনি। রাজুর মা-বাবা কেরানিগঞ্জের মানুষ, কেরানিগঞ্জ থানার সুধারামপুরে তাদের বাড়ি। তারা আমাদের এই ছাপানো ভাষায় কথা বলে না। কিন্তু রাজুর বাবার কণ্ঠে যে শূন্যতা ছিল, তা ধরে রাখতে পারে, এমন ভাষা কই ? বাংলা দৈনিকের শুদ্ধ ভাষা অথবা সুধারামপুরের মাটিঘেঁষা ভাষা কেউ তা পারে না। তাহলে আমার রিপোর্টিংয়ের জন্য এত কষ্ট করে সুধারামপুরি উচ্চারণ নিয়ে আমার কী দরকার ? বিশেষ করে রাজুর বাবার প্রবোধ শুনে যেখানে মাথা হেঁট করেছেন ওপরওলা স্বয়ং ?

রাজুর মা যেভাবে কাঁদছিল, তাতে ফটোসাংবাদিকদের কিছুটা সুবিধা হয়েছিল, আমি দেখতে পেয়েছি। সে দুহাতে বুকে চাপড় দিচ্ছিল। রাজুর মা যখন থানায় আসে, তখনও শাড়ির ওপর একটা চাদর প্যাঁচানো ছিল। রাজুর মা-বাবা এসেছে হাসপাতাল থেকে, সেখানে বলেছে, লাশ থানায় নিয়ে গেছে। হাসপাতালেও কেঁদে কেঁদে একবার মূর্ছা গেছে রাজুর মা, কিন্তু চাদরটা তখনও শরীরে জড়ানো ছিল। সেখান থেকে ‘সাংবাদিক’ লেখা একটা বেবিতে চড়ে তারা থানায় এসেছে, বেবিতেও সে রাজুর বাবার হাতে নেতিয়ে পড়েছিল, হয়ত মূর্ছা গিয়েছিল। থানায় এসে তারা দেখল, অনেক মানুষ, সাংবাদিক। রাজুর মারা যাওয়ার খবর শুনেছে এরা সবাই। রাজুর লাশ থানায় আসবে, এ খবরও সবাই জানত। কিন্তু এ কারণে শুধু যে তারা এখানে জড়ো হয়েছে, তা নয়। এর আরেকটা বড় কারণ রাজুর লাশ নিয়ে মিছিল হবে এবং নেতা আসবেন, ছাত্রনেতারা আসবে। একটা বড়সড় আয়োজন। সাংবাদিকেরা এসব খবর জেনেছে আগেভাগে, আমিও এসেছি বজলু ভাইকে হোন্ডায় চাপিয়ে। বজলু ভাই ছবি তুলছেন রাজুর মায়ের বুক চাপড়ানোর। একসময় মা, শোকে ও সন্তাপে, পাগল হয়ে গেল। সে গায়ের চাদর ছুড়ে ফেলল। শাড়ির আচল ছিঁড়ে ফেলল। তার শীর্ণ, ক্ষয়ে পড়া নগ্ন বুক বেরিয়ে এল। সেই বুকে চাপড় দিয়ে সে রক্ত বের করে ফেলল। বজলু ভাই ক্লিক ক্লিক করে সেই নগ্ন শীর্ণ ক্ষয়ে আসা বুকের অনেকগুলো ছবি তুললেন। কিন্তু রাজুর মায়ের বুক চাপড়ানোর শব্দটা অথবা তার ‘রাজু, আমার বাজান রে’ বলে ক্রমাগত আকাশফাটানো কান্নাকে তার ক্যামেরায় ধরতে পারলেন না। আমিও এই পৌনঃপুনিক আর্তনাদকে এক লাইনের বেশি স্থান দিতে পারলাম না আমার নোট প্যাডে। আমি দৃশ্যটা দেখছিলাম। রাজুর বাবা চাদরটা কুড়িয়ে একসময় আবার জড়িয়ে দিয়েছিল রাজুর মায়ের শরীরে। সে সময় বজলু ভাই ক্যামেরা বন্ধ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়েছিলেন।

রাজুর বাবারও দরকার ছিল ওই রকম কান্নার, কারণ, স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলাম, তার ভেতরটা ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। একটা বদ্ধ ঘরের ভেতরে বোম ফাটালে যেমন হয়। কিন্তু তার ওপর দায়িত্ব পড়েছে রাজুর মাকে দেখে রাখার, তাকে প্রবোধ দেওয়ার। তার কথাটিও ক্লান্তিকরভাবে পৌনঃপুনিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ‘আল্লাহ দিয়েছে, আল্লাহ নিয়ে  গেছে’ ইত্যাদি। এ প্রবোধ শুনে ওপরওলা অশ্রুপাত করছিলেন। কিন্তু রাজুর বাবার চোখে পানি দেখা যাচ্ছিল না। চোখ দুটি ফুলে এমন হয়ে গিয়েছিল, যেন কেউ দুহাত দিয়ে আচ্ছামতো ডলে দিয়েছে। রাজুর মায়ের কান্না শুনতে শুনতে একসময় ধৈর্যচ্যুতি ঘটল বড় দারোগার। দারোগাদের ধৈর্য এমনিতে মন্দ নয়, কিন্তু থানাটি তার অথচ এ থানা দখল করে নিয়েছে এক ক্রন্দনরতা মহিলা, কোন কেরানিগঞ্জের কোন সুধারামপুর থেকে এসে! এই দখলদারত্ব শেষ করতে হয়, আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হয়। দারোগা ঘরের বাইরে এসে হঠাৎ হুংকার দিলেন, থামা, কান্না থামা। তিনি অনেকগুলো পুলিশকে বললেন, ‘এই মেয়েলোকটির কান্না থামাও। তাকে ওই দিকে নিয়ে যাও।’ ওই দিকে মানে বারান্দার ওই মাথায়।

না, রাজুর লাশ থানায় নেই। হাসপাতাল থেকে এসে রাজুর লাশ না-দেখেই কান্না শুরু করেছিল রাজুর মা। আমার কাছে বিষয়টা এ রকম মনে হচ্ছিল, যেমন রাজুর মা ভেবেছিল থানায় এসে দেখবে রাজু বেঁচেবর্তে আছে। যেন লাশ থেকে হঠাৎ জ্যান্ত মানুষ হয়ে ফিরবে রাজু এবং ঝাঁপ দিয়ে পড়বে মায়ের কোলে।

মায়ের কোলে ? আমি যে খবর পেয়েছি, তাতে রাজুর বয়স বাইশ। তা যা-ই হোক, মায়ের কোলে একটা কথার কথা মাত্র। মা নিশ্চয়, ওই রকম কিছু হলে, অর্থাৎ লাশ থেকে জ্যান্ত মানুষ হয়ে ফিরলে রাজুকে কোলের দিকেই টেনে নিত। মায়েরা সাধারণত সে রকমই করেন। কিন্তু থানায় লাশ আসেনি। আমি খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এসআই ফরিদ আমার বন্ধু মানুষ, আমাকে নানা খোঁজখবর দেয়। এসআই ফরিদ বলেছে হাসপাতাল থেকে লাশ পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়েছে দশটার দিকেই। হাসপাতালে মহাহাঙ্গামা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। হাসপাতালটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গায়ের ওপর, ওই লাশটা নিয়ে মিছিল-টিছিল শুরু হলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, কে জানে। এসআই ফরিদ আমাকে বলেছে, লাশ এসে যাবে, ময়নাতদন্ত ছাড়াই মা-বাবাকে দিয়ে দেবে। তারপর লাশ আর মা-বাবাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে সোজা যাবে কেরানিগঞ্জে। তারপর দাফন। মাঝখানে কোনও ঝুঁকির ঘটনা ঘটতে দেবে না পুলিশ। উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত। এসআই ফরিদ আরও জানাল, এই দাফনটা হবে সন্ধ্যার পর। দিনের বেলা দাফনে ঝামেলা আছে। সন্ধ্যার পর ঝুঁকিটা কম।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এসআই ফরিদকে, ‘লাশটা গুম করে ফেললেই তো পারতেন, করেননি কেন ?’

এসআই ফরিদ বলেছে, ‘জানাজানি হয়ে গেছে। এখন গুম করা মুশকিল।’ তারপর সে একটা আঙুল আমার দিকে তাক করে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসে আর বলে, ‘আপনারা যেখানে খবর পেয়ে যান, সেখানে পুলিশ আর কী করে।’

বজলু ভাই কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছেন, বলেছেন, ‘লাশটা আসতে দেরি হচ্ছে কেন ? আমার তো অন্যদিকেও যেতে হবে।’

অন্যদিকে তো আমাকেও যেতে হবে। আজ খবরের অভাব নেই, মুহূর্তে মুহূর্তে খবর তৈরি হচ্ছে। শহরজুড়ে গোলাগুলি, বোমাবাজি, হরতাল চলছে, বিক্ষোভ চলছে। মিটিং-মিছিলে বিক্ষুব্ধ ঢাকা শহর। সরকারের প্রেসার বেড়েছে। সরকারের নেতা-নেত্রীরাও সন্ত্রস্ত। পুলিশ বন্দুকের ট্রিগারে হাত রেখে বসে আছে। মহাব্যস্ত।

এসআই ফরিদ আলিও কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে গেল। রাজুর লাশটা আজকের অনেকগুলো খবরের একটামাত্র। কিন্তু খবরটা জানাজানি হয়ে গেছে, এ জন্য বেঁচে গেছে রাজু। বেঁচে গেছে মানে তার লাশটা বেঁচে গেছে। অন্তত মা-বাবার হাতে তুলে দেওয়া হবে সেটিকে এবং তারা কেরানিগঞ্জের সুধারামপুরে নিয়ে রাজুর দাদুর পাশে মাটিতে তাকে শুইয়ে দেবে। জানাজানি না হলে কোথায় কোন ভাগাড়ে ফেলে দিত তাকে পুলিশ, নয়ত রাস্তার পাশে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দিত। আর জানাজানি হয়েছে এ জন্য যে দিনের শুরুতেই সেই সাতসকালে সে মারা গেছে পুলিশের গুলিতে। কমলাপুর থেকে একটা ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছিল চাঁটগার দিকে―আগের দিন মন্ত্রী কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন রেল কর্তৃপক্ষকে, যেন ট্রেন চলে। রাজু অনেকের সঙ্গে কমলাপুরে পিকেটিং করছিল ট্রেনটা যাতে না যায়, সে জন্য। বোমা-টোমাও ছুড়েছিল। কিন্তু ট্রেন না-ছাড়লে মন্ত্রীর কথা অমান্য করা হয়, তার মুখরক্ষা হয় না, তাই সাতসকালে পুলিশ গুলি ছুড়েছে। কেরানিগঞ্জ থেকে ভোরবেলা রিকশাভ্যানে এসেছিল রাজু, কামাল আর তোতা তিন বন্ধু। তারা কমলাপুরে মিশে গিয়েছিল প্রতিরোধকারী জনতার সঙ্গে। সেই জনতা দেখতে দেখতে বিশাল এক আকার নিয়ে ফেলে। পুলিশ প্রথমে ছোড়ে টিয়ার গ্যাস, তারপর গুলি, তারপর চালায় লাঠি, যখন গুলি খেয়ে মানুষ ছত্রভঙ্গ এবং ছুটছে এদিক-সেদিকে।

সাড়ে আটটার দিকে বিষণ্ন এবং বিধ্বস্ত কামাল সুধারামপুরে পৌঁছে দুঃসংবাদটা দেয় রাজুর বাবাকে। কামাল টিয়ার গ্যাসের হামলায় পড়েছিল। তার দুচোখ অন্ধ হয়ে এসেছিল প্রায়। গুলির শব্দ শুনে সে ভয় পেয়ে দৌড় দিয়েছিল। কিন্তু রাজু গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। ‘কামাল রে’ বলে সে আর্তচিৎকার করে উঠেছিল। এই ছিল রাজুর শেষ কথা, এই জীবনে।

সুধারামপুরে কামালের বমি হচ্ছিল সারা সকাল। এত বমি, যেন সব নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসবে।

দারোগার চিৎকারে হঠাৎ যেন সংবিৎ ফিরে পেয়েছিল রাজুর মা। কিন্তু কান্না তার তখনও থামেনি। দারোগা তাকে একটা লাঠি দিয়ে গুঁতা দিলেন বারকয়েক। পরে দুটি পুলিশ এসে তাদের দুজনকে ধাক্কা দিয়ে থানার বারান্দার ওই দিকটাতে নিয়ে গেল। একজন পুলিশ তাদের হাত ধরে বসিয়ে দিল। এই পুলিশটির চোখ একটু আগে সজল হয়েছিল। সে বলল, ‘এখানে বসে থাক। নড়বি না। লাশ এলে লাশ পাবি, এখন কান্নাকাটি করিস না।’ রাজুর বাবা ও মা শরীরের সমস্ত ওজন মেলে বসে পড়ল। তাদের পা এখন তাদের দখলে নেই।

রাজুর বাবা ও মা কী ভাবছে এ সময় আমার খুব জানতে ইচ্ছা হয়। কী ছবি, কী দৃশ্য অথবা ছবিহীন, দৃশ্যহীন অন্ধকার ভেসে যাচ্ছে তাদের চোখের ভেতর দিয়ে আমার জানতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু আমি সংবাদপত্রের একজন রিপোর্টার মাত্র, আমি কী করে বলি ? আমি তো অন্তর্যামী নই। আর অন্তর্যামী এ মুহূর্তে কষ্টে চোখ বন্ধ করেছেন।

আমার কেন জানি শেষটা দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। আজ শহরে অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমার প্রচুর তাড়া। বজলু ভাই চলে গেছেন, বলেছেন আবার আসবেন। আমারও যাওয়ার কথা। শুনেছি এক মন্ত্রীর গাড়িতে হামলা হয়েছে―এসআই ফরিদ সেদিকেই চলে গেল। মোক্ষম এক সংবাদ। অথচ এই থানা আমাকে টেনে রেখেছে। রাজুর মা যখন বুক চাপড়ে কাঁদছিল, তখন তার শীর্ণ, জরাজীর্ণ বুক আমি দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হয়েছিল ওই বুকে মুখ দিয়ে একদিন রাজু স্তন্যপান করেছিল এবং আজ ওই বুক খালি করে চলে গেছে। আমার কেন জানি এই শূন্যতার গল্পের শেষ দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। যখন রাজুর লাশ সত্যিই আসবে, সে লাশ দেখে রাজুর মা কী করে, তা দেখার এক অদ্ভুত ইচ্ছা আমাকে পেয়ে বসেছে। আমি আন্দাজ করি, এই পুরো ব্যাপারটা একটা সস্তা হিন্দি চিত্রনাট্যকারের জন্যই শুধু মানানসই―এই স্তন্যপান এবং বুকের খাঁচা খালি করে চলে যাওয়া ইত্যাদি। কিন্তু আজকের দিনটিতে এর থেকে আকর্ষণীয় আর কী আছে ? আমাদের জীবনকে এই সস্তা চিত্রনাট্যের পর্যায়েই তো আমরা নামিয়ে এনেছি, নাকি ? এই পুলিশ, এই মন্ত্রী, এই বজলু ভাই, এই আমি―আমরা পাত্রপাত্রী হিসেবে সস্তা সিনেমাতেই তো শুধু স্থান পেতে পারি। সেখানে রাজুর মা-বাবাকে আর কতটা উচ্চতা আমরা দিতে পারি ?

থানার সামনে একটা দোকান থেকে পাউরুটি আর কলা কিনি। থানা লাগোয়া বলে দোকানটি হরতালের আওতামুক্ত। রাজুর মা-বাবা সকাল থেকে কিছু খায়নি। তাদের সামনে সেগুলো মেলে ধরি। রাজুর বাবা ঘোলাটে, ফোসকা পড়া চোখে আমার দিকে তাকায়। তারপর সে তার চোখ দুটি অদৃশ্য জলে ভিজিয়ে তাকায় রাজুর মায়ের দিকে, বলে, ‘খাও, রাজুর মা।’

রাজুর মা তাকায় আমার দিকে। অথবা আমি যে শূন্যতা পূরণ করেছি আমার শরীর দিয়ে, সে শূন্যতার দিকে। তার চোখেও ফোসকা পড়েছে। ঘোলাটে তারও চোখের দৃষ্টি। কিন্তু কোনও পলক পড়ে না অনেকক্ষণ। সে কথা বলে না। খাবার পড়ে থাকে খাবারের জায়গায়। একটি ঘণ্টা নিষ্পলক রাজুর মাকে দেখেছি। তার শরীরে এখন চাদর জড়ানো। তাতে রক্তের দাগ এখানে-সেখানে। তার মুখ ফুলে গেছে, চুল উড়ছে অবাধ্য। তার পা দুটি সামনে মেলা। পিঠটা দেয়ালে ঠেকানো। সে বসে আছে যেন এই রকম একটা ভঙ্গিতে তাকে সৃষ্টি করেই সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন।

রাজুর বাবা পাশাপাশি বসেছে রাজুর মায়ের। কিন্তু তার শরীর বেঁকে আছে রাজুর মায়ের দিকে, তার একটা হাত রাজুর মায়ের মাথায়। আপাতত আরেকটি পৌনঃপুনিক বাক্য সে পেয়েছে ক্রমান্বয়ে বলে যাওয়ার মতো, আমার বদৌলতে। সেটি হলো : ‘খাও রাজুর মা, একটু খাও।’

এবারও রাজুর বাবার বুকের শূন্যতা, যা মিশে যাচ্ছিল প্রতিবার বলা ওই কথাগুলোতে, ধরে রাখতে অপারগ হলো আমার ভাষা অথবা তার সুধারামপুরি ভাষা। সে জন্য পত্রিকার ভাষাকেই বেছে নিলাম, কথাগুলো লিখে রাখতে।

চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমিও যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি এবং ভাবছি চলে যাব কি না, আর কি পারা যায়, রাজুর লাশ এসে উপস্থিত হলো। এসআই ফরিদ একটা জিপের পেছনে বসে এসেছে, সে লাফ দিয়ে নামল। জিপের সামনে বড়কর্তা এসেছেন, তিনিও নামলেন ধীরেসুস্থে। তারা থানায় উঠলেন। তারপর একটা ট্রাক এসে ঢুকল থানায়। বিশ-পঁচিশজন পুলিশ নামল। একটা খাটিয়া রাখা ট্রাকটিতে। থানার বড় দারোগা বেরিয়ে এসেছিলেন, স্যালুট দিতে দিতে। তাকে বড়কর্তা বললেন, ‘লাশটা নিতে এসেছে কে ?’

‘লাশের বাপ-মা স্যার,’ দারোগা বললেন।

‘তাদের গাড়িতে তুলে গাড়ি নিয়ে চলে যান।’ বড়কর্তা আদেশ দিলেন।

এসআই ফরিদ আমাকে দেখে বিষণ্ন হাসল। আমি বুঝলাম অবস্থা ভালো নয়। শহরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বজলু ভাই এসেছিলেন, চলেও গেলেন। বলেছেন ঢাকা শহর পুড়ছে। বজলু ভাই নাটকীয় ভঙ্গিতেই কথাবার্তা বলেন, তার বক্তব্যও চিত্রকল্প ও উৎপ্রেক্ষাপ্রধান। কিন্তু বুঝতে পারলাম, বড় ধরনের আগুন-টাগুন লেগেছে নিশ্চয় কোনওখানে। এই থানার আশপাশেও প্রচুর মানুষের জটলা।

এসআই ফরিদের বিষণ্ন দৃষ্টিপাতকে সত্য প্রতীয়মান করার জন্যই কি না, কে জানে, থানার আশপাশ থেকে হইহই শুরু হলো। ‘শহিদ রাজুর রক্ত/ বৃথা যেতে দেব না’ বলে একদল লোক এগিয়ে এল থানার দিকে। একটু দূরে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল আরও একটা মিছিল। তৃতীয় একটা মিছিল চালিয়ে নিয়ে এলেন মধ্যম সারির এক নেতা। থানার ভেতর উত্তেজনা বাড়তে থাকল। একটু আগে আসা বড়কর্তাকে দেখা গেল টেলিফোনে, ওয়্যারলেসে ব্যতিব্যস্ত হয়ে কথা বলতে। তার কপালে ঘাম জমেছে শীতের অপরাহ্ণে। থানার বড় দারোগা এখন হুকুম তামিলকারীর ভূমিকায়। হুকুমপ্রাপ্ত হয়ে তিনি বড় ট্রাকটিকে গেট দিয়ে বের হয়ে যেতে বলেছিলেন, এখন গেটের বাইরে মানুষের ঢল দেখে দারোগা ঘাবড়ে গেলেন। এখন গেট দিয়ে গাড়ি যেতে পারবে না। এসআই ফরিদ দ্রুত ছোটাছুটি করছে। আমাকে এক ফাঁকে জানাল, বড়ই বিপদ। লাশটা নিয়ে গাড়িটা বেরোতে পারবে না, বেরোতে গেলে জনতার ওপর গুলি ছুড়তে হবে, তাতে আরও লাশ পড়বে। জনতা রাজুর লাশ চাইছে, লাশ নিয়ে মিছিল হবে।

মধ্যম সারির আরও দুজন নেতা এসে পড়েছেন। ছাত্রনেতারাও এসেছে নিজেদের মিছিল নিয়ে। আজ সারা শহরে উত্তেজনা, জ্বালাও-পোড়াও হচ্ছে। আজ প্রথম সারির নেতারা অন্যত্র ব্যস্ত। থানার গেট দিয়ে হইহই করে লোক ঢুকে পড়েছে ভেতরে, পুলিশ বাধা দেবে কী, দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। ট্রাকটা ঘিরে ফেলেছে মানুষ।

পুলিশের কর্তা এখন বারান্দায় বেরিয়ে দারোগাকে পাঠালেন নেতাদের এবং ছাত্রনেতাদের কাছে। তাদের বললেন, ‘লাশ নিয়ে যান, কিন্তু ভায়োলেন্স করবেন না, ভাঙচুর করবেন না।’ বড়কর্তাকে খুব বিচলিত মনে হলো না। লাশ পেলেই জনতা চলে যাবে, এ রকম একটি প্রত্যয় তার কথায় ফুটে উঠল।

কিন্তু লাশ নিতে এসেছে যে দুজন মানুষ, রাজুর মা-বাবা, যাদের দাবিটাই মুখ্য হওয়া উচিত এই লাশের ওপর, তাদের কী হবে ? আমি এতক্ষণে উত্তেজনায় ভুলে গিয়েছিলাম তাদের কথা। এখন তাকিয়ে দেখি, বিহ্বল দৃষ্টিতে জনতার আনাগোনা দেখছে রাজুর বাবা। তার হাতে এখনও পাউরুটি আর কলা ধরা। তার ফোসকা পড়া চোখ দুটিতে এখন অনেক ক্লান্তি অথচ এক নতুন অবিশ্বাসের সঙ্গে তার যেন প্রথমবারের মতো পরিচয় হচ্ছে, এ রকম একটা বোধ কাজ করছে তার মধ্যে এবং তারই প্রতিফলন ঘটছে তার চোখে। সে একজন পুলিশকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার রাজুর লাশ ?’ পুলিশটি কোনও উত্তর দিল না, শুধু দারোগার দিকে ইঙ্গিত করল। রাজুর বাবা এবার উঠে দাঁড়াল। দ্রুত, যেন একটু দেরি করলেই দারোগা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। ‘দারোগা সাহেব, আমার রাজুর লাশ ?’ সে বলল। দেখা যাচ্ছে আরেকটি পৌনঃপুনিকতার বৃত্তে সে পা রেখেছে। এখন যাকেই দেখবে, সে ওই একটি কথা বলবে। বস্তুত তাকে বলতেও হচ্ছে। কারণ, দারোগা দেখিয়ে দিচ্ছেন নেতা ও ছাত্রনেতাদের। ‘এনাদের জিজ্ঞেস করো। এনারা লাশ নিয়ে মিছিল করবেন।’ বলছেন দারোগা। এবার রাজুর বাবা দম দেওয়া পুতুলের মতো লাফ দিয়ে নামল বারান্দা থেকে, সিমেন্টে বাঁধা চত্বরটাতে, যেখানে রাজুর লাশবাহী গাড়িটা দাঁড়ানো, যা ঘিরে রেখেছে অসংখ্য মানুষ। আমি দেখে অবাক হলাম, রাজুর বাবার হাতে এখনও সেই পাউরুটি আর কলা, যেন সেগুলো তার হাতের অংশ হয়ে গেছে। ‘আমার রাজুর লাশ ?’ সে বলে যাচ্ছে নেতাকে, মানুষকে, ছাত্রনেতাকে। কেউ তার কথা শুনছে না। একজন নেতা ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘ভাই সব, এখনই মিছিল হবে। আমরা মিছিল নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করব। এই হত্যার অভিযোগে তাকে কাঠগড়ায় তুলব।’ নেতার বজ্রনির্ঘোষে রাজুর বাবার প্রশ্ন তলিয়ে গেল। তার পরপরই রাজুর নামে স্লোগান উঠল। রাজুর বাবা হকচকিত হয়ে গেছে। সে তাকাচ্ছে রাজুর মায়ের দিকে। কিন্তু কী আশ্চর্য, রাজুর মা বসে আছে বারান্দার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে, পা মেলে। তার চোখ সামনে মেলে ধরা, যেন ভাবলেশহীন। নিষ্পলক। রাজুর বাবার গলা চড়তে থাকে, কিন্তু সেখানে জমে ভীতি ও অনিশ্চয়তা। ‘আমার রাজুর লাশ,’ সে ক্রমাগত বলে যায়। এক ছাত্রনেতা দয়াপরবশ হয়ে তাকে বলে, ‘চিন্তা নেই, আমরা আছি। আমরাই তার লাশ নিয়ে যাব।’ কিন্তু এর মধ্যে ট্রাকে উঠে পড়েছে কয়েকজন তাগড়া মানুষ। তারা ধরাধরি করে খাটিয়াটা নামিয়ে ফেলছে। ট্রাকের সামনে, বারান্দাটার গা ঘেঁষে, একটু জায়গা খালি করে দিচ্ছে মানুষ। সেখানেই নামানো হবে লাশটা। সবাই দেখতে উৎসাহী। গুলিটা কোথায় লেগেছে। কীভাবে লেগেছে। মুখের চেহারাটা কেমন হয়েছে। এসবই এক নিরন্তর কৌতূহলের বিষয়। মানুষ জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু চলে যাচ্ছে না। গলা বাড়িয়ে আছে, দেখার জন্য।

খাটিয়াটা নামানো হলো। বড়কর্তা তাড়া দিচ্ছেন, নেতারাও। বড়কর্তার ক্রোধ হচ্ছে, এত বড় একটা পিছুহটা তার ভাগ্যে ছিল। কেন তিনি এখানে এসেছিলেন ? মরতে ? এখন আরও বড়কর্তাদের কাছে কৈফিয়তের একটা ব্যাপার রয়ে গেছে। নেতারা দ্রুত রাস্তায় বেরোতে চাইছেন, ঘটনা যা, তা তো ঘটেছে। শহিদ রাজুর লাশ নিয়ে এখন যত তাড়াতাড়ি বেরোনো যায়।

একটা চাদরে শরীর আর মুখ ঢাকা রাজুর। হাসপাতালের চাদর। রক্তের ছোপ এখানে-সেখানে। ফটোসাংবাদিকদের ক্যামেরা শব্দ করে উঠল, ফ্ল্যাশ জ্বলল। আমি তাকিয়ে দেখলাম, না, বজলু ভাই নেই। হয়ত অন্যত্র আরও সিরিয়াস কিছু ঘটেছে। হয়ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির কাছেই বসে আছেন। রাজুর লাশের চাদর পায়ের দিকে কিছুটা উঠে গিয়েছিল। একটা পুলিশ নিচু হয়ে সেটা গুঁজে দিল। শহিদ রাজুর নামে আরেকবার স্লোগান উঠল। একজন নেতা বললেন, ‘ভাই সব, এখন আমরা মিছিল করব।’

কিন্তু নেতাকে, আমাকে এবং এসআই ফরিদকে এবং সব পুলিশ, সাংবাদিক এবং জনতাকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ গর্জে উঠল একটি কণ্ঠ। সে কণ্ঠটি সুধারামপুরের, তার ভাষাটিও, কিন্তু তার শক্তিটা সারা পৃথিবীর অথবা সারা পৃথিবীর লাশ হয়ে যাওয়া ছেলেদের বাবার। সেই গলার শব্দ স্তব্ধ করে দিল বড়কর্তার গর্জন, নেতার বজ্রনির্ঘোষ। সে গলা থেকে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটেছে এই থানার চত্বরে।

আমি―আমরা―দেখলাম এবং শুনলাম, রাজুর বাবা তার পাউরুটি ধরা হাতটি উঁচিয়ে বলছে নেতাকে, জনতাকে, পুলিশকে, ‘আমার রাজুর লাশ কেউ নেবে না। আমার রাজুর লাশ আমি নিয়ে যাব।’ এবং আশ্চর্য, এ কথাটার সে পুনরাবৃত্তি করল না। জনতার মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠল। কিন্তু রাজুর বাবা তা আমল দিল না। সে পেছনে ফিরে তাকাল, তার ফোসকা পড়া চোখ অদৃশ্য জলে ভিজিয়ে এবং ডাকল রাজুর মাকে, ‘এখানে আসো, রাজুর মা।’

এই বলে সে নিচু হয়ে বসল লাশের পাশে। জনতার কৌতূহল আরেকটা কেন্দ্র পেয়ে গেল। তারা গোল হয়ে উঁকি মারতে থাকল দৃশ্যটার ওপর। নেতারা ভাবলেন, একটু সময় দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। লাশটা দেখা শেষ হোক, বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজুর বাবাকে রাজি করানো যাবে। বড়কর্তা আর দারোগাও তাদের ভাবনায় নেতাদের চিন্তা প্রতিফলিত করলেন। যদিও দারোগা ভাবলেন, রাজুর বাবাটাকে লাশসুদ্ধ থানার বাইরে বের করে দিলেই আপদটা মিটত।

রাজুর বাবা নিচু হয়ে কাপড় সরালো রাজুর মুখ থেকে। আমি দেখলাম বারান্দা থেকে ছায়ার মতো রাজুর মা উঠে এসেছে, যেন তার কোনও তাড়া নেই। যেন এই রাজুর লাশ হয়ে যাওয়া, লাশ নিতে আসা, লাশের মুখ দেখা, এগুলো অনন্তকাল ধরে বারেবারে ঘটে যাবে। যেন ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে রাজুর মুখটা দেখলেই চলবে― রাজু তো আর জ্যান্ত হয়ে উঠে তাড়া লাগাবে না, চল চল, বাড়ি চল।

আমার সংবাদই দেখা গেল সত্য। কুড়ি থেকে বাইশ ছেলেটির বয়স, কালো মুখের রং, চোখ দুটি নিমীলিত। দেখে মনে হয় যেন ঘুমাচ্ছে। সমস্ত দিনের টানা-হ্যাঁচড়ার কোনও স্পর্শ নেই সে মুখে, শুধু নীল হয়ে কিছুটা যেন ফুলে উঠেছে।

‘রাজুর মা, এ লাশ তো রাজুর না!’ বিহ্বল হয়ে ডাকে রাজুর মা। রাজুর মা বসে পড়েছে লাশটির পাশে। একটা হাত লাশের বুকে আলতো করে রেখে, তার ঘষা কাচের মতো চোখ দুটি দিয়ে যেন রাজুর বন্ধ চোখের ভেতরটা দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছে রাজুর মা।

‘রাজুর মা, এ লাশ তো রাজুর না!’

অসম্ভব একটা গুঞ্জন ওঠে জনতার মধ্যে। অবিশ্বাস্য! অশ্রুতপূর্ব ব্যাপার! যাকে সারা দিন রাজু বলে ভাবা হয়েছে, সে রাজু নয়!

‘রাজুর মা!’ আবারও বলে রাজুর বাবা, ‘এ তো তোতা! তোতার লাশ!’ বলেই সে উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে ওঠে। ‘রাজু, আমার বাজান রে! তুই বেঁচে আছিস!’

কিন্তু রাজুর বাবার উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ে। সে দেখে, তোতার লাশটা একটা হাতে জড়িয়ে ধরে যেন হুমড়ি খেয়ে তার ওপর পড়েছে রাজুর মা। অন্য হাতটা পাগলের মতো বোলাচ্ছে সে তোতার মুখে, গালে-চিবুকে। ‘আমার তোতা রে, আমার বাজান রে,’ বলে সে আকাশফাটানো কান্নায় ভেঙে পড়ল, দ্বিতীয়বারের মতো।

ফটোসাংবাদিকদের ক্যামেরা আবার সচল হলো। ক্লিক ক্লিক।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares