ফসলের ডাক : মঈন শেখ

ধারাবাহিক উপন্যাস : তৃতীয় পর্ব

[মঈন শেখ। জন্ম ২২ নভেম্বর ১৯৭৯, রাজশাহির তানোর উপজেলার পাড়িশো গ্রামে। পেশা শিক্ষকতা। গল্প ছাড়াও লিখেছেন উপন্যাস, প্রবন্ধ, কিশোর সাহিত্য, কবিতা ও গান। সম্পাদনা করেছেন কয়েকটি ছোট কাগজ। তিনি বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার।

মঈন শেখের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘কুসুমকথা’ ছাপা হয় ভারতের দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ২০১৯ সনে (১৪২৬ ব.)। এর পরপর তাঁর নাম অনেকটা আলোচিত হতে থাকে সাহিত্যিক মহলের বিভিন্ন আড্ডায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অল্প সময়ের মধ্যে দেশ-এর ওই শারদীয় সংখ্যা ফুরিয়ে যায় বাংলাদেশের পত্রিকার বিভিন্ন স্টল থেকে। সেই বছরই কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা উপলক্ষ্যে কুসুমকথা বই আকারে প্রকাশ করে আনন্দ পাবলিশার্স। এই উপন্যাসের জন্য রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা-উর্দু লিটারারি ফোরামের সাহিত্য পুরস্কার-২০২০’ প্রদান করা হয় মঈন শেখকে। তারই ধারাবাহিকতায় ‘ফসলের ডাক’ মঈন শেখের দ্বিতীয় উপন্যাস। কুসুমকথা আপাদমস্তক নিটল প্রেমের উপন্যাস। ‘ফসলের ডাক’ও তাই। তবে এই প্রেম সম্পূর্ণ আলাদা প্রেম। এ প্রেম ধানের প্রেম, ফসলের প্রেম। ফসল ফলানোর কষ্ট এবং আনন্দ যাদের বুঝবার কথা তারা বুঝতে না পারলেও ফসল কিন্তু তা ঠিকই বুঝতে পারে। কৃষকের দির্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার হওয়া এবং তা ক্রমে ক্রমে পুঞ্জিভুত হওয়া ও তার বিস্ফোরণই হল এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য।]

দ্বিতীয় ডাক

সাইনবোর্ড সবার চোখে পড়ল। রাস্তার তেমাথায় সেভাবে ঝোলানো হয়েছে এটি। নিয়ত করে তাকাতে হবে না। ওপথ দিয়ে চললেই হবে। বরং সাইনবোর্ডই ইশারায় ডাকবে; আমার দিকে তাকাও।

সাইনবোর্ডে সুন্দর করে লেখা―ভোট বিক্রয়! ভোট বিক্রয়!! ভোটের সংখ্যা পাঁচ। মূল্য দেড় লক্ষ টাকা। তারপর কিছুটা ছোট ফন্টে লেখা―যোগাযোগের ঠিকানা। কালো মেঝের ওপর সাদা অক্ষরে লেখাগুলো চকচক করছে।

বিক্রয় সংক্রান্ত হাজারও বিজ্ঞাপন দেখেছে মানুষ। বাড়ি বিক্রি, জমি বিক্রি, ফ্লাট বিক্রি ইত্যাদি। কিন্তু এমনতর চোখে পড়েনি। আজ পড়ল। চোখ উঠল কপালে। কেউ বলল, বুড়ো বয়সের ভীমরতি। আবার কেউ ভাবল, মাথাটা গেছে। কেউ টিটকারি কাটে, আবার কেউ বিজ্ঞাপনদাতাকে রাগাবার চেষ্টা করে। কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতা রাগে না। সব দায়ভার নিয়ে বসেছে; লোকে রাগাবে কিন্তু সে রাগবে না। তাই তো শুধু সাইনবোর্ড নয়, গোড়াতে একটি ঘরও তুলেছে। ঘর না বলে একটা অস্থায়ী ক্যাম্প বলা যেতে পারে। চার কোণায় চার খুঁটি পুঁতে উপরে কাপড়ের ছাউনি। ঠিক নির্বাচনী অফিসের মতো। কিন্তু না, এটা ভোট বিক্রির অফিস। না, তাও নয়। দোকান। যেমন মুদি দোকান।

তাসু মাস্টারের এমন কাণ্ড দু’দিন পরে কিছুটা দানা বাঁধল। এলাকার কারও কারও কপালে ভাবনার ভাঁজ যে পড়েনি, তা নয়। কৃষক শ্রেণির দু-একজন এসে বসতে লাগল তার বিছানো চটে। তাসুর দেওয়া ব্যাখ্যা কয়েকজনের মনেও ধরেছে। বেশির ভাগ হাসলেও, কেউ কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনছে।

তাসু কোথাও শিক্ষকতা করে না। কোনো যাত্রাদলের প্রমোট মাস্টারও ছিল না। সিএনজি, টেম্পো কিংবা বাসস্ট্যান্ডেরও নয়। তবু সে মাস্টার। তাসু মাস্টার। তবে তার মাস্টার-জীবনের একটা সূত্র আছে। তারা কয়েক বন্ধু মিলে এক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল; চারদিকের গ্রাম থেকে খানিক দূরে ধুধু মাঠে। যে মাঠে এক বুড়ো বটগাছ আর মাজাভাঙা নিমগাছ ছাড়া কিছু ছিল না সে সময়। সেখানেই চাটাই দিয়ে ঘিরে, বাঁশ দিয়ে বেঞ্চি বানিয়ে, জুড়ে দিল স্কুল। বিনা বেতনে পড়ালো অনেক দিন। একদিন শিকা ছিঁড়বে, এমন আশা অবশ্য ছিল। তবে শিকা ছিঁড়বার আগেই তাদের শিকে, শিকেয় উঠল। পালালো দু’জন; কিনু সরকার আর তাসিরুদ্দিন ওরফে তাসু। একদিন বাঁশের চড়াটে কারা যেন পায়খানা করে গেল। এমন ঘটনা পরপর কয়েকদিন ঘটল। সে শিশু হোক আর বুড়ো হুনুমান হোক; মানুষ তো। মানুষের জঞ্জাল পরিষ্কার করা মুখের কথা নয়। দু’চারদিন পরিষ্কার করবার পর আর পারল না। বউ-বেটির কথার তোড়ে তারা মাস্টারিটাই ছেড়ে দিল। কিনুর কিছুটা অনটন থাকলেও তাসুর ছিল না। জমি-জমা যা ছিল তা মন্দ নয়। অন্তত ছোটখাটো অনুষ্ঠান বা গ্রাম্য সালিশে ডাক পাবার জন্য এই-ই যথেষ্ট। ডাকও পেত। বলা চলে এলাকাকে আলোকিত করবার জন্যই মশালটা পুঁততে চেয়েছিল। লেখাপড়া খুব একটা কম করেনি। অন্তত একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াবার জন্য তা যথেষ্ট। ছাত্র হিসেবেও মন্দ ছিল না। কতকটা ইচ্ছা করেই পড়াশোনার শেষ ধাপটা পার হয়নি। অথচ হতে পারত। তার এক কথা, বড় ডিগ্রি নিয়ে কী হবে; যদি এলাকার মানুষের পাশে না থাকতে পারি। বড় চাকরি করব, বাইরে বাইরে জীবন কাটবে। ফোন করে মাকে বলতে হবে, মা ওষুধ খেয়েছ। বাবা, ভারী জিনিস তুলবে না। অথচ উপদেশ দাতার কিছুটি করবার নেই। যত্তসব আলুনি কারবার। কোনো যুক্তিই তার কাছে শক্ত করতে পারল না বাবা-মা। হার মানল সবাই। ছাত্রবেলা থেকেই মানুষের পাশে সব সময়। তার কাছে আসেও সব। কী ছোট কী বড়। আর্থিক সহযোগিতা না পেলেও পাশে পাবে সব সময়। সবার ধারণা, এ ছেলে বড় হয়ে নির্ঘাত মেম্বার না হয় চেয়ারম্যান হবে। কিন্তু যৌবন গেল, মধ্যাহ্ন গেল। এখন অপরাহ্ণ। কোনোটিই হয়নি তাসু। তবে তার অধিক হয়ে থেকেছে মানুষের পাশে। সেই তাসু আজ পড়তি বয়সে এমন একটি কাণ্ড করল।

জাতীয় নির্বাচনের আর মাসখানেক বাকি। এলাকায় নেতাদের যাওয়া আসা শুরু হয়েছে। চায়ের দোকানে মানুষের ওঠা-বসা বেড়েছে। বাজারের দোকানের চেয়ে মোড়ের দোকানটাতেই ভিড় বেশি। কারণ মোড়ের ওপরই বসেছে তাসু। আদিখ্যেতা করেই হোক আর ভালোবেসে হোক, তাকে চা-বিস্কুট এনে দিচ্ছে কেউ কেউ। তাসু মুচকি হাসে আর খায়। কখনও সে নিজেও পাশে বসা কাউকে খাওয়ায়। মেঝেতে বিছানো চটে লোক আঁটে না। দুটো খেজুরপাটি বিছিয়েছে দু’পাশে।

তাসুর এই বিজ্ঞাপন বা দোকানদারির খবর নিজ গ্রাম টপকে যে ভিন গ্রামেও পৌঁছেছে, তা বুঝা গেল আজ। স্থানীয় কোনো পত্রিকার দুজন উঠতি সাংবাদিক এলো সন্ধ্যার খানিক আগে। পরিচয় দিতেই পাশে বসা কয়েকজন উঠে দাঁড়িয়ে তাদের বসতে দিল। মরা বসন্তের বিকালে সূর্যের টকটকে আলো সেখানে সবার মুখে জ্বলছে। সাংবাদিকের একজন অন্যজনকে ইশারা করল, আলো থাকতে ছবিটা তুলতে হবে। পটপট করে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে কয়েকটি ছবি তোলা হলো। ছবি তোলা হলো ডানে বামে; ধান ক্ষেতের সঙ্গে তাসুকে মিলিয়ে। এখন ভিড় আরও বেড়েছে। কেউ কেউ জোর করে ছবির ফ্রেমে থাকবার চেষ্টা করল। তাসুর মধ্যে কোনো বিচলতা নেই। ভাবলেশহীনভাবেই উপভোগ করছে বিষয়গুলো। সাংবাদিক দুজনের মধ্যে যে বয়সে বড়, সে তাসুর কাছে এগিয়ে বসল। অন্যজন মোবাইলের রেকর্ডিং বোতামটা চেপে দিয়েছে এরমধ্যে। সিনিয়র তাসুকে জিজ্ঞাসা করল―চাচা মিয়া, আপনি যে কাজটা করছেন, মানে এই যে ভোট বিক্রির কথা বলছেন, এটা তো আইনের পরিপন্থী ?

শোন বাছা, তুমি আইনের কথা বোলো না। সেটা আমি জানি। তা তুমি যে ছবিগুলো ওঠালে, তা কোন্ আইনে। আমার অনুমতি নিয়েছ ? ঘাবড়ে গেল সিনিয়র। নিজের প্রতি রাগ হলো, এমন বোকামির জন্য। তাসু যে বড় দৃঢ় মানুষ তা অনুমান করল। ক্ষমা চাইল অবশেষে।―চাচা ক্ষমা করবেন, আমি আসলে ওভাবে কথাটা বলতে চাইনি।

তা বাপু যেভাবেই বল, আমার সঙ্গে কথা বললে ঠিকভাবে বলো, না হলে চলে যাও। শোন, অনেকে ঠাট্টা করছে আমার বিষয় নিয়ে। আমি মনে কিছু করিনি। কারণ তারা না বুঝেই তা করছে। কিন্তু তুমি তো বাপ তাদের দলে নও ? অথচ কথা বলছ তাদের মতো।

স্যরি চাচা। ভুল হয়ে গেছে। তবে আমি বুঝতে পারছি কোনো একটা ক্ষোভ থেকে এমন করছেন। আমরা আপনার পাশে থাকতে চাই। বিষয়টা খুলে বললে আমাদের পক্ষে সহজ হবে।

আবারও ছেলেমানুষির পরিচয় দিল সিনিয়র। তাসুকে লোভ দেখাবে এমন লোক নেই বোধ হয়। তবে তাসু এবার রাগল না। মুচকি হাসল। ব্যাগ থেকে একটা ক্যালকুলেটর আর খাতা-কলম বের করল তাসু। কিছুটা থমকালো সবাই। সবচেয়ে বেশি থমকালো সাংবাদিক দু’জন। বেশি ভয় পেল এই ভেবে, মাস্টার তাদের লিখতে বলে, পুরো বর্ণনা! একটা হাই তুলল জুনিয়র। তবে সবার চোখ খাতা-কলম আর ক্যালকুলেটরের দিকে। সাপুরের সর্বশেষ ছোট বাক্সটার দিকে যেমন থাকে।

শোন বাবা, আমি বলি আর তুমি এক এক করে হিসাব কর। তাসু খাতা আর ক্যালকুলেটরটা এগিয়ে দিল।―অবশ্য  আমার কাছে হিসাব করা আছে। সেই ফর্দি দেখতে চাইলেও দেখতে পার।

তাহলে আর হিসাব করবার দরকার কি। আসলে আমরা জানতে চাচ্ছি, এমন একটা নতুন চিন্তা হঠাৎ আপনার মাথায় এলো কেন ?

হঠাৎ আসেনি রে বাছা। কথাটা বলতে বলতে পাশে রাখা ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকালো মাস্টার। সবার ঔৎসুক্য বাড়ল। তবে চোখ কপালে উঠল হাত বের হবার পর। হাতের সঙ্গে বের হলো কাগজের বান্ডিল। ভোটের পোস্টারের বান্ডিলের মতো। তবে মাঝারি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হলে কেউ হয়তো বলেই বসত, মাস্টার ভোট করবার পাঁয়তারা করছে। বান্ডিল খুলতেই সবাই হুমড়ি খেল সেদিকে। না, পোস্টারে কোনো ছবি নেই। একটা ইস্তেহারের মতো মনে হলো। তাসু এমন একটা জিনিস ব্যাগে চাপা দিয়ে রেখেছিল, তা ভাবতে পারেনি কেউ। ভেতর ভেতর এতকিছু করেছে লোকটা। অথচ দেয়ালে বা দড়িতে ঝুলায়নি একটিও। সিনিয়র জুনিয়র দুজনকে দুটি দিল মাস্টার। তারা যতটা পড়ে ততটাই অবাক হয়। পোস্টারের শুরুর ভূমিকাটা আরও চমৎকার। কেন এই আয়োজন তার ব্যাখ্যা আছে একটা। তা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় লোকটার পড়াশোনা আছে। বর্তমান দুনিয়ার খোঁজখবর আছে। ভূমিকার শেষে মোটা দাগে গত তিন বছরের একটা হিসেব দেওয়া আছে। দেওয়া আছে গত তিন বছরে তার উৎপাদিত আবাদ-ফসলের ক্ষতির পরিমাণ। মোট ধান উৎপাদন কত মন, খরচ মণপ্রতি কত। দাম পেয়েছে কত, আর লোকসান হয়েছে কত। তার হিসাব আছে প্রথমে। এরপর একইভাবে আতপ ধান, একইভাবে আলু। ভিন্ন ভিন্নভাবে তিনটি কলামে তিন বছরের ক্ষতির পরিমাণ লেখা। অবশেষে একটা যোগফল টানা। যার পরিমাণ দেড় লক্ষের অধিক। এবার সিনিয়র সাংবাদিক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটা তাড়া অনুভব করল। বিষয়টা হালকা করে দেখল কিনা বোঝা গেল না, তবে মাস্টারকে সরাসরি একটা প্রশ্ন করে বসল―আচ্ছা আঙ্কেল, একজন এমপি প্রার্থী পাঁচটি ভোটের জন্য কেন দেড় লক্ষ টাকা দিতে যাবে ?

ক্যান, তুমি দিবা নাকি ? দাও। আর বলে যাও ভোটটা কাকে দিতে হবে। মাস্টারের কথাতে ঝাঁজ থাকলেও চারপাশের সবাই হেসে উঠল। অপ্রস্তুত হলো সাংবাদিক। তারা বুঝল, লোকটা যথেষ্ট বাঁকা।

না চাচা, আমি সেভাবে বলিনি। আপনি শুধু শুধু রেগে গেলেন। আমি বলছি অন্য কথা। এই যে ধরুন, আপনি বা আপনার একটা পরিবার ভোট দিতে গেল না, এতে কি ইলেকশন বন্ধ হয়ে যাবে ? সেই এমপির পাস ঠেকাতে পারবে। তাসু তাৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না। শুধু তাকিয়ে থাকল সাংবাদিকের মুখ বরাবর। চুপচাপ সবাই। সিনিয়র ভাবল, তাসু কাবু হয়েছে। চারধারের মানুষ অপেক্ষা করে, মাস্টার কী বলে। যেন পালাগানের লড়াই বসেছে এখানে। একপক্ষ মাস্টার, অন্যপক্ষ সাংবাদিক। মাস্টারের পক্ষেই দর্শক-শ্রোতা বেশি। মাস্টার চোখের পলক না ফেলে মুচকি হাসল। চোখ লাল হয়েছে কিছুটা।―হায়রে সাংবাদিক! যাই হোক, তোমাকেই বা কী বলব। টকশো তো শুনি। একটু দম নিল তাসু।―আরে সাংবাদিক, আমি তাসু কেন, আমার পরিবার তাসুর পরিবার কেন ? আমি কৃষক আর আমার পরিবার কৃষকের পরিবার।

এবার উপস্থিতির কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না। তবে সাংবাদিক বুঝল ঠিকই। মাথা তুলে চারদিকে দেখে আরও একবার চমকে উঠল। তারা খেয়াল করেনি, চারিদিকে এত লোক জমে গেছে। যারা সবাই কৃষক। অন্তত সাংবাদিক দুজন তাই ভাবল।

পরদিন কয়েকটি স্থানীয় কাগজে ছাপা হলো তাসু মাস্টারের ক্যাম্পের খবর। যতটা গুঞ্জন হলো গ্রামে, তার অধিক হলো শহরে। মোড়ে, চায়ের দোকানে, খেলার মাঠে। মহল্লার মুদি দোকানে, লন্ড্রি বা ছোটখাটো দোকানে, যারা স্থানীয় কাগজ শুধু রাখবার জন্যই রাখে, তারাও সেই খবরটা পড়ল। কেউ হাসল, কেউ চিন্তার ভাঁজ ফেলল কপালে। ঘটনাটাকে এগিয়ে নিয়ে গেল অনেক দূর। কাণ্ড গ্রামেও কম হয়নি। যারা মোড়ে তেমন আসত না, বা চায়ের দোকানে বসত না; তারাও এখন নিয়মিত মোড়ে আসা শুরু করেছে। চায়ের দোকানে বসে, ঠোঁট পুড়িয়ে চায়ে চুমুকও দেয়। কেউ আসে তাসুর সঙ্গে সহমত প্রকাশ করতে, আবার কেউ আসে ঠাট্টা তামাশা করতে। অবশ্য মাস্টারের এতে মন্দ লাগে না, উপভোগ করে।

দুই

সেঁজুতি বাজারে গিয়েছিল। সাহেব বাজার। ফিরল। একটা বই কিনতে গিয়েছিল। বইটা পেয়েছে। পেয়েছে অতিরিক্ত কিছুও। বইটার থেকেও তৎক্ষণাৎ মূল্যবান হয়েছে সেটি। আর সেটা নিয়েই হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটে অটো থেকে নেমেই মিনহাজকে ফোন দিল।

হ্যাঁ, তুমি কোথায় ?

তোমার বাম দিকের ধুকপুকানিতে। মিনু ঠাট্টা করে বললেও সেঁজুর বুকের মধ্যিখানে তা সত্য হয়ে উঠল।

বামদিকে না, তুমি মধ্যিখানে। ঠাট্টা রেখে বল; এক্ষুনি দেখা করব। খুব জরুরি।

মনে হচ্ছে লটারির টিকিট ভাঙাতে নিয়ে যাবে। আচ্ছা চলে এসো; শহীদুল্লাহ ভবনের সামনে আছি। সেঁজু ফোনটা রেখে সেদিকেই ছুটল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড ধরে হাঁটছে সেঁজু। রাস্তাটার নাম প্যারিস রোড হলো কেন, তা সেঁজু জানে না। তবে রাস্তাটা তার ভালো লাগে। এখানে এলে এক ধেয়ানে তাকিয়ে থাকে সামনে বরাবর। কেন জানি মনে হয়, রাস্তাটা মাইলের পর মাইল চলে গেছে। খুব আপন মনে হয় রাস্তাটাকে। তাড়া থাকলেও না তাকিয়ে পারল না। রাস্তার দু’ধারের শিরিষ গাছগুলো যেন তাদের পেশিবহুল বাহু ওপরে তুলে গাইছে―গোপাল গোবিন্দ রাম শ্রীমধুসূদন। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে গাছগুলোর দিকে। ওপর দিয়ে সামনে খানিক দূরে তাকাতেই সেঁজুর মনে হলো, পেশিগুলো উপরের দিকে ডালপালা সমেত মিলে ঠিক তোরন। তারা স্বাগত জানায় সেঁজুকে।

বিকেলের শেষ ভাগ। সন্ধ্যা তখনও নামেনি। তবে যুগলদের  মধ্যে আবেগী ও উত্তাল সন্ধ্যা নেমে গেছে অনেকটা। তারা এখন গা ঘেঁষে বসে। নোট দেওয়া-নেওয়া, পড়ার আলোচনা, গ্রুপ-স্টাডি; সব গুটিয়ে নিয়েছে যে যার মতো। স্বল্প আলোতে তা বেমানান। এখন যা মানানসই, সেটাই করছে তারা।

পাওয়া গেল মিনহাজকে। ইট-সিমেন্ট-বালির বেঞ্চিতে বসে উবু হয়ে মোবাইল ঘাঁটছে। নিশ্চয় অনলাইনে কিছু একটা খুঁজছে নয়তো পড়ছে। সেঁজু বেঞ্চের ফাঁকা অংশে ঝপাং করে বসে পড়ল। বলা চলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বসল। অনেকটা খ্যাপলা জালের মতো। মিনু রুই-কাতলা বা গুচি-গজার হলে মাথার ওপর ঠিকই পড়ত। মাছ না হওয়াতে গা ঘেঁষেই পড়ল। এতেও চমকে উঠত না হয় তো, যদি খবরের কাগজটা শব্দ করে  মিনুর কোঁছাতে না রাখত। মিনু খবরের কাগজটা হাতে তুলে নিতেই কতকটা ধড়ফড়িয়ে সেঁজু বলল―দেখ দেখ ভালো করে; কী ঘটে গেছে! মিনহাজের একটা গুণ আছে। সে অনেকের কণ্ঠ নকল করতে পারে। সবচেয়ে ভালো পারে তার প্রিয় অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের কণ্ঠ। মিনু ঠিক তার মতো কণ্ঠ ও অভিনয় করে পেপারটা খুলে ধরে বলল―কই কই দেখি; লটারির ড্রয়ের খবরটা প্রথম পাতাতেই আছে বোধ হয়। প্রথম পুরস্কার নিশ্চয় তোমার ? এবার রেগে গেল সেঁজু।―কম সাধে কি আর তোমাকে মাথা মোটা বলি। আরে গাধা, দেখ তোমার উপজেলার মজার খবর আছে। অবশ্য গতকালের পেপার এটি। চোখে পড়ল, তাই নিয়ে এলাম। সেঁজু তার আঙ্গুল নিয়ে গেল সেই খবরের কাছে। মিনু দেখল―শিরোনামে লেখা, এবারের ভোটে তানোরের তাসু মাস্টারের ইস্তেহার। এরপরে লেখা  আছে রাজশাহীর তানোর উপজেলার তাসু মাস্টারের এক নতুন ইস্তেহার… ..। তাসু মাস্টারের সকল কথা লেখা আছে এক এক করে। স্থানীয় কাগজ হলেও যে সাংবাদিক লিখেছে, তার হাত আছে। লেখা সাজাতে মুন্সিয়ানা আছে। খুব খুঁটিয়ে পড়ল মিনু। সে চিনতে পারল তাসুকে। তাদের পাশের গ্রামেই বাড়ি। তার অনেক খবরই জানে মিনু। তবে সকল খবরকে টপকে সামনে এলো এটা। মিনু ভাবেনি তাসু এমন একটা কাণ্ড ঘটাতে পারে। হয়তো ভাবেনি কেউই। মিনুর ইচ্ছা হলো সেঁজুকে জড়িয়ে ধরতে। আদর করে বলতে―ইউ আর গ্রেট ডিয়ার। তুমি চমৎকার খবর এনেছ আমার জন্য। বাম হাতটা বাড়িয়ে সেঁজুর বাম বাহুতে রেখে নিজের দিকে টেনে নিতে চাইল। সেঁজু বাধা দিল না। সেঁজুর মাথাটা মিনুর মুখ বরাবর আসতেই কপালে একটা আলত চুমু দিল। ভাবলেশহীন চুমু। তবুও পুলকিত হলো সেঁজু। তবে চুমুর জন্য নয়। পুলকিত হলো পত্রিকাটা মিনুকে এনে দেবার অহংকারে। পুলকিত হলো মিনুর ভেতরের আলোড়ন দেখে। মিনু সেঁজুর কাঁধে হাত রেখে বলল―তুমি কি এটা পড়েছ ?

হ্যাঁ পড়েছি।

পড়ে কী বুঝলে ?

বুঝলাম মাস্টারের অনেকদিনের জমা ক্ষোভ এটা।

একটা কিছু বোধ হয় ঘটতে যাচ্ছে। একদিন দেখবে হাজারও মাস্টার এক হবে।

বুঝলাম না।

আসলে তুমি খবরটা ভালো করে পড়নি। পড়ার জন্যই পড়েছ। শোন ডিয়ার―রিডি বিটুইন দ্যা লাইনস্।

তোমার সব কথাতেই ধোঁয়াশা। আমাকে কি খুব বোকা মনে হয় ?

না মোটেও নয়। তবে খবরের দুই লাইনের মধ্যে আর একটা অদৃশ্য লাইন থাকে; সেটা পড়তে পারাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ঐ জন্যই তো বুদ্ধিমানের  সঙ্গে অর্কিড হয়ে লেগে থাকা। তুমি চুম্বক আমি লোহা। কিঞ্চিৎ আবেশিত হলেও লাভ। সেঁজু নিজে থেকেই গা ঘেঁষল এবার। মিনু হাসল। অভিযোজিত হলো না। মিনু বলল―সেঁজু, আমি কালকে বাড়ি যাব।

হঠাৎ বাড়ি কেন ?

হ্যাঁ যাব। তোমাকেও নিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু এখন থাক। পরে হয়তো যেতে হতে পারে। তোমার হাতে ওটা কীসের বই। সেঁজু বইয়ের প্রথম মলাট মেলে ধরল মিনুর সামনে। একটি সংকলিত বই। নাম কৃষক আন্দোলনের সংগ্রামী অধ্যায়। মিনু মনের মধ্যে হাসল। সেঁজুর দিকে তাকিয়ে বলল―রোগ তোমাকেও পেয়েছে। তুমিও বসতে পার তাসু মাস্টারের মঞ্চে।

বারে, তুমিই তো সেদিন বললে, তেভাগার ওপর একটা প্রবন্ধ লিখতে। তাই তো বইটা আনলাম।

ঠিক আছে বন্ধু চালিয়ে যাও। চল উঠি এবার। ফোনে কথা হবে। বাড়ি গিয়ে এলাকার খবর জানাব।

আচ্ছা ঠিক আছে।

উঠল দু’জনেই।

তিন

মিনহাজ গ্রামে এসেছে দু’দিন হলো। প্রতিদিন সে মোড়ের ওপর গেছে। গ্রাম থেকে বের হয়ে আসা রাস্তাটা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তার সঙ্গে যেখানে মিলেছে, সেখানে। সেদিক থেকে বলা চলে এ মোড় তিন রাস্তার মোড়। সেই তেমাথাতেই বসেছে তাসু মাস্টার। মোড়টা এখন ছোটখাটো বাজার। দোকানপাটের আধিক্য না থাকলেও, মানুষের আছে। মোড়টা তাসুর গ্রাম থেকে যতদূর, মিনহাজের গ্রাম থেকে প্রায় ততদূর। মিনহাজ এই দু’দিনেই তাসুর সঙ্গে খাতির জমিয়ে নিয়েছে। তাকে নিয়ে যে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হচ্ছে, ফেসবুকে দেওয়া-নেওয়া চলছে, একটা গ্রুপ তৈরি হয়েছে তাসুর প্রতিবাদের পক্ষে, সব কথা হয়েছে তাসুর সঙ্গে। মজার ব্যাপার এলাকার অনেকেই এখন বসছে তাসুর আস্তানায়। বিশেষ করে মধ্যবিত্তরা। ছোটরা যারা বসছে, তারা উপভোগ করে ঘটনাকে। দু’একজন বসে থাকে সাংবাদিকের অপেক্ষায়। গত দিনে যে ক’জনের ছবি তাসুর সঙ্গে পত্রিকায় উঠেছে, তারা বুক ফুলায়। যে মূল্যেই হোক, এবার ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়তেই হবে।

মিনহাজ তাসুর বিছান পাটিতে বসে থাকে না। আজও বসে আছে খানিক দূরে। পাকুড় গাছের শিকড়ে। সঙ্গে দুই বাল্যবন্ধু রেজা আর উপেন। তারা মাধ্যমিক পার হয়ে আর আগায়নি। এখন খেত-কৃষি আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। দু’জন মিনহাজকে বোঝাতে চায়, সবাই তাসু মাস্টারকে ঠাট্টা করলেও তারা তাসুর সঙ্গে আছে। তারা মিনহাজকে এটাও বোঝায়, সেও যেন তাদের সঙ্গে থাকে। নানাভাবে সাহায্য করে। মিনহাজ হাসে তাদের কথা শুনে। তার হাসি দেখে রেজা, উপেনের রাগ হয়। তারা ভাবে মিনহাজ তাদের অনুরোধকে উপেক্ষা করছে। ঠাট্টা করছে তাসুর প্রতিবাদের ভাষাকে। তারা জানল না, মিনহাজ এখন পুরোদমে তাদের দলেরই একজন। মিনহাজও উপভোগ করে পুরো ঘটনা। আন্দোলিত হয় ভেতরে ভেতরে। তবে যতটা না অবাক হয় তাসুর ঘটনাতে, তার অধিক অবাক হয় মানুষের উৎসাহ দেখে; জেগে ওঠা দেখে। তাসুর পাশে এখন আরিফ মোল্লা। মোল্লা গোছের আরও কয়েকজন।

আজ সকালে মিনহাজ বাইক নিয়ে বেরিয়েছিল। নিজ ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামের মধ্যে দিয়ে ঘুরেছে। বেশি চা খাবার অভ্যেস না থাকলেও আজ যথেষ্ট খেয়েছে। গুনে গুনে দশটি চায়ের স্টলে বসেছে। চা খেয়েছে, প্রাণ খুলে কথা বলেছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়েছিল, তা ষোলআনা পূর্ণ। সব স্টলেই সে কমবেশি শুনেছে একই আলোচনা। তাসু মাস্টার। তা পক্ষে বা বিপক্ষেই হোক; আলোচনা একটা আছেই। অনেক সময় নিজে থেকেই কথা তুলবার বা উসকে দেবার চেষ্টা করেছে। কেউ যখন তাকে বলেছে, তোমার বাড়ি কোথায়? সে বলেছে―তার গ্রামের নাম। চিনতে পারলেও গ্রামের নামের সঙ্গে জোড়া দিয়ে সে বলেছে, তাসু মাস্টার যে মোড়টায় বসেছে, তার পাশে। তখন দু’একজন জানতে চায় তাসু সম্পর্কে, তার প্রতিবাদের ভাষা সম্পর্কে। মিনহাজ ব্যাখ্যা করে ঘটনা। যারা বিপক্ষে যেতে চায়, তাদের পক্ষে আনবার চেষ্টা করে। অবশেষে মিনহাজের পক্ষে মাথা হেলিয়ে সায় দেয় তারা। মিনহাজ উঠে যায় আর এক গ্রামে। সে কেন জানি অদৃশ্য এক রথ দেখতে পায়। রথে সোয়ার তাসু মাস্টার। পাশে আরও কয়েকজন। সে আরও দেখতে পায়, সারথির আসনটা শূন্য। মনে মনে তার ইচ্ছা হলো, ওখানটায় গিয়ে বসতে। আপাতত পারল না।

আজ বিকালে লোক সমাগম আরও বেশি। তিনজন বসে আছে এক সঙ্গে। মিনহাজ, রেজা আর উপেন। জমিতে কাজ-কাম তেমন নেই। মাঠ ভর্তি ফসলের বলক। এক জমির ধান পাশেরটার সঙ্গে পাল্লা দেয়। ধানের শিষগুলো প্রসবিত হয়ে মাথা তুলে কেবল দেখছে নতুন পৃথিবীকে। আঁতুরের গন্ধ এখনও গা থেকে যায়নি। সব ধান ফুল নিয়ে বসে আছে পরাগায়নের আশায়। তারা ভুলে যায়, তারা স্বপরাগায়নী। কেউ আবার আগাম আড়মোড়া ভেঙে নিজেকে জানান দিতে ব্যস্ত। বাতাসে শব্দহীন দোল খায় শিষের মিছিল। দূর থেকে এখন সেটাই দেখবার পালা সবার। অপেক্ষায় থাকা, হৈমন্তিক উৎসবের জন্য। ধান কাটার উৎসবে শক্তি খরচের জন্য এই বিশ্রাম। শক্তি জোগাড়ের বিশ্রাম। বলা চলে প্রস্তুতির বিশ্রাম। আর এই বিশ্রামটা সবাই যেন নিচ্ছে এই মোড়ে। তাসুকে ঘিরে।

আজ বিকালেও এলো দুই সাংবাদিক। স্থানীয় নয়, নামি দামি জাতীয় দৈনিকের। তারা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবি তুলল। ভোট বিক্রির সাইনবোর্ড, মাস্টার, উপস্থিত জনতার, ধানভর্তি মাঠের, গ্রামের, আরও সাত-পাঁচের। বিষয়গুলো মাস্টারের কাছে বেশ বাড়াবাড়ি মনে হলেও রাগ দেখালো না। তবে সাংবাদিকের কয়েকটি প্রশ্নে তার রাগ হলো। তারা কথা বলে বড় অগোছালভাবে। এক সময় রেগে তাসু মাস্টার বলল―

শোন বাছা, তোমরা যেন কার মধ্যে কী গুলিয়ে ফেলছ। তোমরা আমার এই ক্ষুদ্র প্রতিবাদকে বড় একটা আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছ।

আপনি আসলে বুঝতে পারছে না আঙ্কেল, আপনি কত বড় ঘটনা ঘটিয়েছেন। আন্দোলন কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। এই আন্দোলন হয়তো রাস্তাতে নামেনি, তবে মনের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। যেমন শুরু হয়েছিল ১৯৪৭-এ, ৫০-এ কিংবা তার আগের আন্দোলনগুলো। সাংবাদিক জ্ঞান ফলালো যেন।

মুচকি হাসল তাসু। শোন, তোমাদের এই নতুন প্রজন্মের একটা রোগ হয়েছে। তোমরা একটার মধ্যে আর একটা গুলিয়ে ফেলো। কোথায় তেভাগা আর কোথায় ইলা মিত্র। ওদের মধ্যে এর কী সম্পর্ক দেখলে?

যেটাই বলেন না কেন আঙ্কেল; একটা আন্দোলনের সঙ্গে আর একটা আন্দোলনের অদৃশ্য সম্পর্ক থাকবেই। আপনি এখন হয়তো বুঝতে পারছেন না, ক’দিন পরে  দেখবেন সবাই বলছে, তাসু মাস্টারের এই প্রতিবাদ বা অধিকার আদায়ের আন্দোলনের বীজ লুকিয়ে ছিল তেভাগার মধ্যে, ইলামিত্রের মধ্যে।

বলবে কি গো, বলতে শুরু করেছ তো। শোন বাছা, বটগাছের বীজ কোনদিন তেঁতুল গাছের বীজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। আসলে তোমরা ইতিহাস পড় না। তোমাদের দোষই বা দেয় কি করে। শোনা কালচারে  ভাসছে সবাই। আর হয়েছে এক টকশো। যে যার মতো করে বয়ান দিচ্ছে। সরকারি বা বিরোধী দলের লেজ হলে তো কোনো কথাই নেই। শরীরের থেকে লেজের লাফালাফিই বেশি। রাত জেগে সবাই টকশো শুনছে, সকালে এসে উগড়ে দিচ্ছে স্টলে। এই হলো তোমাদের ইতিহাস জ্ঞান। সাংবাদিক দু’জনের চোখ কপালে উঠল। এই তাসু গ্রাম্য-তাসু নয়। এর বহর অনেক নিচে। অনেকটা গুটিয়ে গেল তারা। চুপসে গেল। তারা এও বুঝল, মাস্টারের সঙ্গে কথা বলতে হবে মেপে মেপে। এবার দ্বিতীয় সাংবাদিক বলল―

চাচা মিয়া, আপনার কথাতে যুক্তি আছে। যুক্তি কাটার সাধ্য আমাদের নেই। আপনি জ্ঞানী মানুষ। গ্রামে পড়ে আছেন বটে, তবে শহরের কথিত বুদ্ধিজীবীদের থেকেও বোধ হয় সফল আপনি। কী জ্ঞানে কী প্রয়োগে।

হাওয়া দিচ্ছ বাপ, দাও। তবে এ চাকা ট্রেনের চাকা।

এবার সাংবাদিক দু’জনে দাঁতে জিভ কাটল। হুমড়ি খাওয়া লোকজন হাসল হো হো করে। তাসু সবাইকে থামতে বলল। তারা চুপ মারলে মাস্টার আবার শুরু করল―

শোন বাছা, তোমরা পড়াশোনা কে কী করেছ জানি না। তবে তোমাদের  বয়স কম। এখনও সময় আছে। ইতিহাস পড়। তাছাড়া তোমরা তো সাংবাদিক। সাংবাদিককে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের থেকেও বেশি পড়তে হয়। না বাছা, আমি জ্ঞান ফলানোর জন্য বলছি না। এই যে কৃষক আন্দোলনের কথা বলছ না, তার সঙ্গে আমার আন্দোলনের কোনো সূত্র নেই। দু’টোর প্রেক্ষাপট আলাদা। আমাদের দাবি খুব সাদামাটা। ন্যায্য দাম। বছরের পর বছর লোকসান আর লোকসান। এটা একবার থামা দরকার। জানি না এ ঢেউ কতদূর পৌঁছাবে, তবে ঢিল আমি ছুড়েছি।

শুধু ঢেউ কেন চাচা, সুনামি হয়ে আছড়ে পড়বে নীতিনির্ধারকদের পাড়ে। পাড় ভেঙে তবেই থামবে এই ঢেউ। সাহস জোগানোর ঢঙে বলল এক সাংবাদিক।

তাসু হেসে বলল―কী গো বাছা, সাহিত্যচর্চা কর নাকি ? কথাতে যে কবিতা আছে।

অন্য সাংবাদিক চিল্লিয়ে বলল―ঠিক ধরেছেন চাচা, ও গল্প লিখে। বিভিন্ন কাগজে ছাপা হয়। খুব ভালো গল্প লিখে।

 সাংবাদিকের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হলো, গল্প ছাপা হওয়া একটা কাগজ সঙ্গে থাকলে ভালো হতো, মাস্টারকে দেখানো যেত। গল্প লিখিয়ে সাংবাদিক তাকে থামালো, লজ্জা পাবার ঢঙে। সে হাত বাড়িয়ে মাস্টারের হাতে হাত রেখে বলল―

চাচা, চালিয়ে যান, আমরা আপনার পাশে আছি। অনেক ন্যায্য কথাই আমরা বলতে পারি না ইচ্ছা থাকলেও। তবে আপনারটা আলাদা। আমরা শহরে থাকলেও শিকড় পড়ে আছে গ্রামে। আমাদের বাপ-চাচারাও কৃষক। বর্তমান সময়ে কৃষকের কষ্টটা কী, আমরা জানি। এ প্রতিবাদ শুধু আপনার নয়, আমাদের সবার।

সাংবাদিক দু’জন আরও সময় ধরে থাকল সেখানে। অনেক কথা হলো মাস্টারের সঙ্গে। কথা হলো তার চারপাশে বসা মাস্টারের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে। মিনহাজও তাদের সঙ্গে মিশে গেছে। সাংবাদিক দু’জনের একজন মিনহাজের বিভাগেই পড়াশোনা করেছে। এতে পরিচয় আর গাঢ় হলো। মোবাইল নম্বর দেওয়া-নেওয়া হলো। সাংবাদিকের অনেক কাজই সহজ করেছে মিনহাজ। একটা ভালো সম্পর্ক হলো তাদের সঙ্গে।

চার

চলমান বিষয়টা মিনহাজের মাথায় গেড়ে বসেছে। হয়তো মিনহাজের মাথাটাও গেড়ে বসেছে বিষয়গুলোর ওপর। কী কী ভাবে তাসু মাস্টারের চেষ্টাতে সাহায্য করা যায়, তা ভাবে মিনহাজ। হাজার পরিকল্পনা মাথার মধ্যে বাড়ি খায়। ভাবনা ভাগ করে রেজা, উপেনের সঙ্গে। কথা বলে আরিফ মোল্লার সঙ্গে, বাপের সঙ্গে। কখনও ফোনে কথা বলে তার সেঁজুর সঙ্গে। তার বন্ধুদের সঙ্গে। মিনহাজের কাছে সুখের কথা হলো, সবাই বিষয়টাকে উপভোগ করছে।

আজ সন্ধ্যা পার হতেই বাইকটা নিয়ে বের হলো। পিছনে বসালো উপেনকে। উপেন কাঠমিস্ত্রি হলেও সব কাজেই ষোলআনা ঠোকা ধরতে পারে। কাজে কর্মে দক্ষ। এলাকাতে দর-দামের দিক দিয়ে উপেনের একটা জায়গা তৈরি হয়েছে। সেই উপেনকে সঙ্গে নিয়ে সে ছুটল তাসু মাস্টারের বাড়ি। এরমধ্যেই তাসুর খুব কাছের হয়ে উঠেছে। তাসু চিনেছে মিনহাজকে। মিনহাজও তাসুকে।

মাটির দোতলা বাড়ি। বরেন্দ্রভূমির এ এক ঐতিহ্য বলা যেতে পারে। শক্ত আর লালচে মাটির গাঁথুনি। পেরেক ঠুকলেও ঢুকতে আপত্তি তোলে। বেঁকে বসে। সুন্দর করে পুরো বাড়ি লেপা। এতে নতুনত্ব পেয়েছে বাড়িটা। বাড়ির সম্মুখ ভাগে মাটির দেয়ালে খোদাই করে লেখা ‘মাস্টার বাড়ি’। মাস্টারি ছাড়লেও মাস্টার পদবিটা গেঁথে গিয়েছে মাস্টারের মনে। মন থেকে দেয়ালে। মূল বাড়ির সঙ্গে লাগানো বাহিরমুখী এক ঘর। বড় ঘর। বৈঠক ঘর। তার সঙ্গে লাগানো বাহির বারান্দা। সেখানে হেলান চেয়ারে বসে আছে তাসু। মিনহাজ সালাম দিতেই তাসু উঠে দাঁড়াল। মিনহাজকে হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল সে। বৈঠক ঘরেও বসল না। তাসু অবশ্য এ ঘরকে বলল টঙ্গির ঘর। মিনহাজ এই প্রথম শুনল শব্দটা। সে জানত না, বৈঠক ঘরকেই টঙ্গির ঘর বলে। মিনহাজকে তাসু সোজা নিজের ঘরে নিয়ে গেল। উপেনও পিছু পিছু।

ঘরে ঢুকেই মিনহাজের চোখ ছানাবড়া। চারদিকে শুধু বই আর বই। মিনহাজকে তাসু বসবার জন্য ইশারা করলেও সে বসল না। সে দাঁড়াল বুক শেল্ফের গা ঘেঁষে। এক সেল্ফ ইতিহাস তো আর এক শেল্ফ গল্পের। অন্য শেল্ফ উপন্যাসের। বেশ কয়েকজনের রচনা সমগ্রও আছে। মিনহাজের প্রিয় লেখকের অধিকাংশ বই রয়েছে এখানে। রয়েছে প্রিয় উপন্যাস―বিটি রোডের ধারে, গঙ্গা, ঢোঁড়াই চরিত মানুষ। রয়েছেন গুরু তারাশঙ্কর, মানিক আর বিভূতি। কয়েকজনের কবিতাসমগ্রও আছে। রয়েছে পুঁথি সাহিত্যের বেশকিছু বই। মিনহাজ এবার আকাশ থেকে পড়ল। চোখে পড়ল দু’টি নাম। ‘কলিকাতার বয়ান’ আর ‘শকের মেলা’। এ পুথি দু’টি কয়েক বছর ধরে খুঁজছে মিনহাজ। তার উপজেলার অহংকার মৌলবি এনায়েত কাজীর লেখা এই পুঁথি। ইতিহাস গ্রন্থে পায়, গেজেটিয়ারে পায় কিন্তু পুঁথি দু’টি কোথাও খুঁজে পায় না মিনহাজ। দেশের প্রায় সব লাইব্রেরি দেখা হয়ে গেছে। তার আগ্রহের কারণ একটাই, এনায়েত কাজী তার এলাকার মানুষ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মারা গেছেন তিনি। তাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চায় মিনহাজ। আজ পেল। দু’টি পুঁথি নয়, যেন দু’টি দ্যুতি হয়ে জ্বলছে মিনহাজের চোখের সামনে। সে প্রথমে কাকে জড়িয়ে ধরবে বুঝতে পারছে না। তাসুকে নাকি পুঁথি দু’টিকে। পিছন থেকে ডাক আসাতে নিজেকে থামাতে হলো। তাসু ডাকল―কি হে, এখনও বসনি যে, আগে চা খাও, পরে কথা হবে। মিনহাজ নিজেকে সামলিয়ে খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবে, কী বলবে তাসুকে। তাসুর এই লাইব্রেরি নিয়ে কোন প্রশ্নটা করলে এই মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক হবে। তাসুকে কোনো প্রশ্ন করলে যে জুতসই করেই করতে হবে, তা মিনহাজের জানা। সে এটাও জানে, উপেনের কাছে এ বিষয়ে সাহায্য পাওয়া যাবে না। তাসু চায়ে চুমুক দিয়ে মুচকি হাসে। সে বুঝে গেছে, মিনহাজ কেন উসখুস করছে। অবশেষে তাসুই মুখ খোলে―

শোন ভাই, কী বলতে চাচ্ছ আমি তা জানি। এই ঘরে যারাই প্রথম আসে তারাই তোমার মতো করে। প্রশ্ন করে বই নিয়ে। তোমার কি ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িনি বলে আমার কাছে এত বই থাকতে নেই ?

ছিছি দাদা, ও কথা বলছেন কেন ? আসলে আমি অবাক হয়েছি অন্য কারণে। আপনার কাছে যতগুলো বই আর যত পুরাতন বা মূল্যবান বই আছে তা আমাদের অনেক শিক্ষকের বাসাতেও নেই। তাছাড়া দুষ্প্রাপ্য কিছু বইও আছে আপনার কাছে।

শোন দাদু, আমার এই বইয়ের সংসার একদিনের নয়। এ সংসার তিন প্রজন্মের। দাদা শুরু করেছিলেন। তিনি খুব ভালো পুঁথি পাঠ করতেন। রাতের বেলা আমাদের উঠানে নাকি ভিড় জমতো। বিশেষ করে গরমের দিনে প্রায়ই বসত পুঁথি পাঠের আসর। আমার দাদার পুঁথি পাঠের কণ্ঠ নাকি দু’পাঁচ গ্রামের মধ্যে সেরা ছিল। পাশের গ্রাম থেকেও হারিকেন জ্বালিয়ে মানুষ আসত।

তা হলে কলিকাতার বয়ান, শকের মেলা, এগুলো আপানার দাদার সংগ্রহ করা ?

না, ওগুলো আমার বড় আব্বা মানে দাদার বাবা দাদাকে দিয়েছিলেন। এনায়েত কাজী নাকি আমার বড় আব্বার বন্ধু ছিলেন। শোন দাদু, শুনেছি তুমি নাকি লিখালিখি কর। তুমি অন্নদাশঙ্করের পথে প্রবাসে পড়েছ ?

না দাদু পড়া হয়নি, তবে সংগ্রহে আছে।

পড়ে ফেল তাড়াতাড়ি। দেখবে ভাষার চাতুরী আর সৌন্দর্য দিয়ে কীভাবে পাঠককে ধরে রাখা যায়। পড়তে বাধ্য করা যায় পাঠককে। আর অচিন্ত্যের গল্প উপন্যাস পেলে পড়বে। বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে তার মতো ভালো বুঝি কেউ লেখেননি। অন্তত সেই সময়তো নয়ই। মিনহাজ কী বলবে তার জোগান পেল না। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে এই বৃদ্ধের কাছে। বিস্মিত হয় তাসুর পড়াশোনার বহর দেখে। বরং আত্মসমর্পণ করার ঢঙে সাদামাটাভাবে বলল―দাদু, আপনার লাইব্রেরিতে আমাকে পড়বার সুযোগ দিতে হবে কিন্তু ?

বই-ই তো পড়বে, বউ তো আর নয়।

আমার দাদি এখনও কিন্তু কম যায় না। থ্রিপিস পরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গেলে সুন্দরীদের সঙ্গে নির্ঘাত ফাইট করবে।

নিয়ে যেও তবে। তা ওসব কথা থাক। কাজের কথা বল।

হ্যাঁ দাদু সেটাই ভালো। উপেন বলল। উপেনের মনের কথাটাই যেন মাস্টার বলল।

চায়ের কাপটা রেখে মিনহাজ বলল―দাদা আপনি বুদবুদ তুলেছেন ঠিকই, আমরা একে তরঙ্গে রূপ দিতে চাই। আপনি শুধু সঙ্গে থাকবেন।

সঙ্গে কিরে, সামনে থাকব। আমার ভালো লাগছে তোমাদের মত তরুণরা আমার অর্থাৎ কৃষকের কষ্টটা বুঝেছে।

দাদা আমরাও কৃষকের সন্তান। আপনার এই চিন্তার স্রোত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে। আপনার দেখানো পথের পথিক হতে চাই।

শোন ভাই, পায়ে হাঁটা পথ তৈরি করতে পরিকল্পনা লাগে না, এটা এমনি এমনি হয়ে যায়। তবে হাইওয়ে করতে গেলে পরিকল্পনা লাগে। আমার পথটা হয়তো পায়ে হাঁটা। পরিকল্পনা ছাড়াই হয়ে গেছে। পরিকল্পনা করতে হয় তোমরা কর। হাইওয়ে বানাতে চাইলে তোমরা বানাও। ও পথে আমি বেঁচে থাকতে থাকতে কখনও শোভাযাত্রা হলে আমিও শরিক হবো। হাঁটতে না পারলেও হুইল চেয়ার নিয়ে হবো।

দাদা, আমরা আগাব আপনাকে সঙ্গে নিয়েই। আপনি আমাদের এখন আইকন। আপনি হয়তো জানেন না, আমরা এখন একটা ফেসবুক গ্রুপ হয়েছি। যার সদস্য সংখ্যা এ ক’দিনেই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। নাম দিয়েছি বাংলাদেশ কৃষক অধিকার গ্রুপ, সংক্ষেপে বিএফআর গ্রুপ। মিনহাজ তার মোবাইল ফোনটা বের করে ফেসবুক খুলে দেখাল পাতাটা। দেখাল গুরুত্বপূর্ণ কিছু কমেন্টস। দেখাল মাস্টারের ছবি, সেই মোড়ের ছবি। আরও অনেক বিষয়। অন্য সময় হলে হয়তো তাসু একে বাড়াবাড়ি মনে করত। আজ মনে করল না। বরং খুশি হলো মনে মনে। বয়সটাও যেন কমে এলো মিনহাজের কাছাকাছি। আনন্দ আর আবেগ মিশিয়ে শুধু বলল―করেছ কী তোমরা! আরও অনেক কথা হলো তাদের তিনজন মিলে। পরিকল্পনাও হলো অনেক। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করতে হবে। প্রথমে যে কাজগুলো করা দরকার তারও একটা পরিকল্পনা হলো কাগজে কলমে। তাসু শুধু এটাই সাবধান করে দিল, ভাই তোমরা যা করবে, তা ভেবে চিন্তে করবে। তোমাদের যেন কোন বিপদ না হয় আমার জন্য।

শুধু আপনার বলছেন কেন, এই আন্দোলন সবার। অধিকার আদায়ের আন্দোলন। কোন আন্দোলনই ঝামেলা মুক্ত ছিল না। এটাও হবে না। তবে সামাল দেবার ক্ষমতা আছে আমাদের। তাসু কিছু বলল না। চোখের কোণা ভিজে এলো। এরমধ্যে আরও একবার চা এলো। সঙ্গে চটকিয়ে মাখানো ঝালমুড়ি।

পাঁচ

মিনহাজ শহরের উদ্দেশে বের হয়েছে। সে এখন মাস্টারের মোড়ে বসে আছে। মোড়টা এখন মাস্টারের মোড় হয়ে উঠেছে। ভ্যানে বা অটোতে চেপে মাস্টারের মোড় বললেও ঠিক চেনে। রেজা ও উপেন এসেছে মোড়ে। তারা এসেছে মিনহাজকে এগিয়ে দিতে। মিনহাজ কিছু কাজ ভাগ করে বুঝিয়ে দিল রেজা ও উপেনকে। তাসু তখন মোড়ে ছিল না। তবে তাসুর বসবার জায়গায় বসার মানুষের অভাব নেই। অনেকেই বসছে এখন। চা খায়, কখনও বিতর্কে জড়িয়ে চায়ের কাপও ভাঙে। জরিমানা দেয়। মিনহাজ, রেজা আর উপেন চা খাচ্ছে। এমন সময় থানা সদর থেকে দু’জন ছুটে এলো বাইক নিয়ে। হাতে কয়েকটি দৈনিক। জাতীয় দৈনিক। যারা এলো তারা তাসুর গ্রামের নয়। ধারে-কাছের গ্রামেরও নয়। থানা সদরের। তারা কাগজ নিয়ে এসে হইচই ফেলল। হুমড়ি খেল সবাই। বড় বড় ছবিসহ ছাপা হয়েছে মাস্টারের খবর। এই মোড়ের খবর। কেউ হুমড়ি খেল শিরোনাম দেখতে, কেউ পড়তে আবার কেউ শুধু ছবি দেখতে। কেউ হুমড়ি খেল, মাস্টারের সঙ্গে তার ছবিটা এসেছে কিনা, তা দেখতে। যারা পত্রিকা আনল তারা খুব বাহাদুরি নিল। জানান দিল, তারাও তাসু মাস্টারের সঙ্গে আছে। মিনহাজ ফোনটা বের করে  সেঁজুকে ফোন দিল। ওপাশ থেকে সাড়া পেতেই সে কয়েকটি পত্রিকার নাম করল। যেগুলোতে তাসুর খবর আছে। প্রতিটি ডবল করে কিনতে বলল। আর শেষে যেটা বলল তা শুনে রেজা আর উপেনের মনে প্রশ্ন জাগল। আর সেই প্রশ্নটাই করল রেজা―এই কী বললি; বিকালে কীসের মিটিং হবে ?

কই কী বললাম ?

এই যে কাকে যেন বললি, সবাইকে খবর দেওয়া হয়েছে কি না ?

হ্যাঁ পরশু বিকালে আমরা বসব। কাজ অনেকটাই আগানো আছে। কিছু পাকা সিদ্ধান্ত নিব সেদিন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে এই আন্দোলনটা জোরদার করতে হবে।

বন্ধু, তোর কথা শুনে আমাােও যেতে ইচ্ছা করছে। আমাকে না হয় নিয়ে চল। উপেন কথাটা বলে মিনহাজের কাঁধে হাত রাখল।

তোকে নিয়ে গিয়ে কী করব; তোকে খাওয়াবে কে ? বরং তুই এখানেই থাক। মাস্টার দাদার পাশে থাক। ফোনে আমি নিয়মিত খোঁজখবর রাখব। আমরা কী করছি তোদের জানাব। তা ছাড়া ফেসবুকে, টুইটারে  সবকিছুতে তো জানতেই পারবি।

মিনহাজ একটা অটো আসাতে তাতে উঠে বসল। অটো চলল থানা সদরের দিকে। উপেন আর রেজা ফিরে গেল পত্রিকাগুলোর কাছে।

এখন শুধু গ্রাম নয়, ইউনিয়ন টপকে অন্য পাঁচ ইউনিয়নের লোকের আনাগোনা হতে লাগল সেখানে। এ মধ্যে নিজ দায়িত্বে কয়েকজন ভলেন্টিয়ারও জুটেছে। এলাকার জোতদার কৃষকরা এখন মাস্টারের পাশে। নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে। তবে ভাটা পড়েছে তার উৎসবে। উৎসব স্থানচ্যুত হয়েছে। এলাকার উৎসব এখন একটাই। ভোটের উৎসব প্রায় ম্লান। উৎসব একজনকে ঘিরে। নির্দিষ্ট বিষয়কে ঘিরে। তাসু মাস্টার, তার ক্যাম্প আর ন্যায্য অধিকার আদায়ের সাইনবোর্ডকে ঘিরে। অবশ্য ভোট বিক্রির সাইনবোর্ড এখন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেখানে যুক্ত হয়েছে নতুন সাইনবোর্ড। ন্যায্য অধিকারের সাইনবোর্ড। আন্দোলনের সাইনবোর্ড। আন্দোলন নয়, বরং উৎসব। উৎসব আর আন্দোলন এখানে সমার্থক। এমন উৎসব এর আগে কেউ দ্যাখেনি। এমনকি পাশের গ্রামে গুপ্তযুগের বিহারৈল বৌদ্ধবিহার যখন নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছিল, তখনও এমন সাড়া পড়েনি এলাকায়। কিন্তু আজ পড়ল। শুধু এলাকায় নয়, সারা দেশজুড়ে এখন এই আলোচনা। তাসু মাস্টারের ভোট বিক্রির বিষয় ঢাকা পড়েছে। সামনে এসেছে অধিকারের কথা। এসেছে ন্যায্যমূল্য পাবার কথা। কোনো না কোনো কাগজে প্রায় প্রতিদিনই থাকছে সেই খবর। দুই একটা টিভির টকশোতেও প্রসঙ্গক্রমে উঠছে কথাটা। সরকারও হুট করে কিছু করতে পারছে না। নির্বাচন নাকের ডগায়।

[চলবে]

  লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares