হাই বিন ইয়াকজান : মূল : ইবনে তোফায়েল

দুর্লভ
আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ : ইসফানদিয়র আরিওন
[হাই বিন ইয়াকজান: বিশ্বসাহিত্যের প্রথম দার্শনিক উপন্যাস।হাই বিন ইয়াকজান একটি রূপকাশ্রয়ী দার্শনিক আখ্যান। মুসলিম দার্শনিক ইবনে তোফায়েল (১১০৫-১১৮৫) এটি রচনা করেছেন ও নায়কের নামে এর নামকরণ করেছেন। ‘উপন্যাস’ ধারণাটি এর রচনাকালের অনেক পরের ইউরোপীয় উদ্ভাবন হলেও এই আখ্যানে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। সেসব বিবেচনা করে অনেকে একে আরবি ভাষায় রচিত প্রথম উপন্যাস বলে থাকেন। আখ্যানটির যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বিল্ডুংগ্স্রোমানের (এ ধরনের উপন্যাসে নায়কের দার্শনিক ভ্রমণের ধারাবাহিক আখ্যান বর্ণিত হয়) বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায় বলে একে এ-জাতীয় উপন্যাসের পূর্বসূরী বলা যায়। যদিও বিল্ডুংগ্স্রোমান ধারণাটিও অনেক পরের সৃষ্টি। শুধু তাই নয়, এটি পৃথিবীর প্রথম দার্শনিক উপন্যাস। ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুসো ও জঁ-জাক রুসোর এমিল-এর পূর্বাভাস প্রদানের পাশাপাশি লক ও কান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় দার্শনিকদের চিন্তার ভিত্তিভূমি তৈরি করেছে এই আখ্যান।
হাই (অর্থ চিরঞ্জীব) এখানে বিচারবুদ্ধির প্রতীক আর ইয়াকজান (অর্থ সদাজাগরূক) ঈশ্বরের প্রতীক। আখ্যানটি এমনভাবে রচিত হয়েছে যে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে নানাভাবে এর ব্যাখ্যা সম্ভব। এই ব্যাখ্যাগুলোর কয়েকটি সংক্ষেপে নিম্নরূপ :
ক. মানুষের বিবেক-বুদ্ধির/যুক্তিশীল আত্মার অমরত্ব প্রমাণ।
খ. মানবসৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে দ্বৈততত্ত্বের উপস্থাপন
গ. ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক নিরীক্ষণ এবং ‘সমাজের উৎস ব্যক্তি’ এই মতের প্রস্তাবনা প্রদান
ঘ. মানুষের নির্জনতা ও একাকিত্বের বিশ্লেষণ।
শেষোক্ত দুটি ব্যাখ্যা ইবনে তোফায়েল বিরচিত হাই বিন ইয়াকজান গ্রন্থের সঙ্গে দার্শনিক ইবনে বাজ্জাহ্র তাদবিরুল মুতাওয়াহ্হিদ গ্রন্থের তুলনামূলক পাঠের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। শেষোক্ত ব্যাখ্যাটিতে মানুষকে এমন এক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যে এই পৃথিবীতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে আর এখন সেই হৃত সত্তার পুনরুদ্ধারে নিয়োজিত। যদি মানুষ নিজেকে খুঁজে পায় তবে পরিপূর্ণ মানবিকতার স্তরে উপনীত হতে পারবে।
হাই বিন ইয়াকজান আখ্যানটির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো, মানুষ নিজের সত্তার অনুসন্ধানে এমন সব বিষয়ের মুখোমুখি হয় যেগুলোর প্রত্যেকটির সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে, যেমন ধ্বনির অনুকরণ ও ভাষা নির্মাণ, পোশাক উদ্ভাবন, বাসস্থানের ব্যবস্থা, লাঠি ও বর্শার মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুত, গৃহপালিত প্রাণির ব্যবহার, আগুন আবিষ্কার ও তা দিয়ে খাদ্য প্রস্তুতসহ অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ, দেহের অঙ্গসংস্থানের গুরুত্ব বিষয়ে সচেতনতা অর্জন এবং সবশেষে দেহগঠনে হৃদয়ের মৌলিক ভূমিকা উপলব্ধিকরণ, যা সমাজে নেতৃত্বের অপরিহার্যতার রূপক হিসেবে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি।
ইবনে তোফায়েল (১১১১-১১৮৫) পশ্চিমা ইসলামি বিশ্বের দ্বিতীয় খ্যাতনামা দার্শনিক। তাঁর পূর্বসূরি হলেন ইবনে বাজ্জাহ্। ইবনে রুশদের পূর্বসূরি হিসেবে ইবনে তোফায়েল খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকে জীবিত ছিলেন। একাধারে দার্শনিক, কবি, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক বহুশাস্ত্রজ্ঞ এই ব্যক্তি আল-মুওয়াহহিদ সাম্রাজ্যে কিছু সময়ের জন্য খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ (প্রথম)-এর দরবারে চিকিৎসক ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আনদালুসে মুরাবিতদের পতনের পর আবু আব্দুল্লাহ ইবন-এ-তুমার্তের নেতৃত্বে মুয়াহহিদ রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইবনে তোফায়েল ফারাবি, ইবনে সিনা ও সুহরাওয়ার্দীর দর্শনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তবে তিনি ইবনে সিনা ও সুহরাওয়ার্দীর দর্শনকে অস্পষ্ট মনে করতেন। ফারাবির দর্শন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য হলো, তা সন্দেহ ও বিরোধপূর্ণ। ইবনে রুশদও এমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তিনিও ফারাবিকে দার্শনিকের পরিবর্তে কালামবিদদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
ইবনে তোফায়েলের একাধিক রচনা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার অধিকাংশই আজ আর আমাদের কাছে নেই। একমাত্র দার্শনিক যে গ্রন্থটি আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে তা হলো এই হাই বিন ইয়াকজান।]
আ মাদিগের ন্যায়নিষ্ঠ ও পুণ্যাত্মা পূর্বপুরুষগণ (আল্লাহ তাঁহাদের উপর সদয় হোন) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে যে, ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত একটি দ্বীপ রহিয়াছে যাহা বিষুবীয় রেখার নিম্নবর্তী এবং তথায় পিতামাতা ব্যতীত একটি মনুষ্যশিশুর এই ধরাধামে আবির্ভাব ঘটিয়াছে। তথায় এমন বৃক্ষ রহিয়াছে যাহা হইতে রমণীবৎ ফল উৎপাদিত হয়। মাসউদী উহার কথা স্মরণ করিয়া কহিয়াছিলেন, উহাই ওয়াকওয়াক দ্বীপ। কারণ, বাতাবরণ সমভাবাপন্ন, অবলীলাক্রমে সর্বোচ্চ সূর্যালোক নিপতিত হয় এইরূপ স্থানে ইহার অবস্থান। দার্শনিক-সমাজ ও উচ্চমার্গীয় চিকিৎসকগণ ভিন্ন মতে আস্থাশীল। তাঁহাদিগের চিন্তায় ইহা বদ্ধমূল যে, ভূতলের চতুর্থ ভূমিখণ্ড পরম সমভাবাপন্ন। নিরক্ষীয় রেখার উপরস্থ ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা হেতু সে-স্থলে কোনও আবাস গড়িয়া উঠে নাই যদি তাঁহারা এইরূপ বদ্ধমূল ধারণা পোষণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে বলিতে হইবে, ভূতলের চতুর্থ ভূমিখণ্ড যে পরম সমভাবাপন্ন ইহার হেতু রহিয়াছে। যদি তাঁহারা মনে করিয়া থাকেন যে, নিরক্ষীয় অঞ্চলের খরতর নিদাঘই হেতু তাহা হইলে তাঁহাদিগের সবাই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করিতেছেন। প্রমাণ তাহাদিগের বিরুদ্ধে যাইবেক।
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ইহা প্রতিষ্ঠিত (হইতে পারে) যে, গতির নিমিত্তে বস্তু উত্তপ্ত হয়, অথবা উত্তপ্ত বস্তু ও আলোকের সংস্পর্শ ঘটিলে বস্তু উত্তপ্ত হয়। এই বিজ্ঞান ইহাও প্রতিপন্ন করিয়াছে যে, সূর্য নিজেই উত্তপ্ত নহে; নিজের চারিপাশের প্রকৃতিগত অবস্থার কোনও একটি বস্তুর সহিত তাহা অভিযোজ্য নহে। ইহা অধিক প্রতিপন্ন করিয়াছে যে, নিকষিত কিন্তু অনচ্ছ বস্তু আলোককে প্রায় সম্পূর্ণ চুষিয়া লয়। ইহার পার্শ্বে রহিয়াছে ঘন কিন্তু অনিকষিত বস্তুসমূহ। তাহারাও আলোককে চুষিয়া লয়। কিন্তু স্বচ্ছ-নির্মল বস্তুসমূহ যাহাদের অভ্যন্তরে ঘনত্বের লেশমাত্র নাই, তাহারা মোটেই আলোককে চুষিয়া লয় না। শেখ আবু আলীই বিশেষ করিয়া এত সমস্তকে প্রামাণিকতা দান করিয়াছেন। তাঁহার পূর্ববর্তী কেহই এমন কিছু বলিয়া যান নাই।
যদি ইহা যথার্থ হইয়া থাকে তাহা হইলে ইহাও অকাট্য যে, উত্তপ্ত বস্তুসমূহ যেই রূপে অন্যান্য বস্তুর সংস্পর্শে তাহাদিগকে উত্তপ্ত করিয়া তোলে সূর্য সেই রূপে ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে না। কারণ, সূর্য নিজেই উত্তপ্ত নহে; আর গতির নিমিত্তে পৃথিবীও উত্তপ্ত হয় না। কারণ, ইহা স্থির, সূর্য উদিত হইবার ও অস্ত যাইবার মুহূর্তে ইহা যথাস্থানেই স্থিত থাকে।
উল্লিখিত দুইটি মুহূর্তে উষ্ণকরণ ও হিমকরণে ইহার অবস্থা অনুধাবনকল্পে ভিন্ন ঘটনা।
প্রথমত, সূর্যও বায়ুকে উত্তপ্ত করে না। অতঃপর বায়ুর উষ্ণতার দ্বারা ভূপৃষ্ঠও উত্তপ্ত হয় না। ইহাই-বা কীরূপ যে, ভূপৃষ্ঠস্থ বায়ুর সংস্পর্শের বস্তু ভূপৃষ্ঠের চাইতে দূরবর্তী ঊর্ধ্বতলের বস্তুর তুলনায় গ্রীষ্মকালে অধিকতর তপ্ত থাকে! অতঃপর ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করিবার লক্ষ্যে সূর্যের আলোকায়ন ব্যতীত অন্য কিছু অবশিষ্ট রহিল না। কারণ, উত্তাপ সর্বদা আলোকের অনুগমন করে। ফলত যখন অবতল (আতশ) দর্পণে আলোকরশ্মির আধিক্য ঘটে তখন ইহা পার্শ্বস্থ বস্তুকে জ্বালাইয়া দেয়।
চতুঃশাখ্যে (Quadrivium-এর জন্য অনুবাদক কর্তৃক প্রস্তাবিত শব্দ) অকাট্য যুক্তিতে ইহা প্রতিপন্ন যে, সূর্য দেখিতে বর্তুলাকার এবং পৃথিবীও তদ্রƒপ। সূর্য পৃথিবীর চাইতে বহুগুণে বৃহত্তর। ইহার যে অংশকে সূর্য চিরস্থায়ীভাবে আলোকিত করিয়া রাখে সেই অংশ সূর্যের অর্ধেকের চাইতে বৃহত্তর। পৃথিবীর আলোকিত এই অর্ধাংশের মধ্যস্থানে আলোক সর্বদা প্রগাঢ়। কারণ, তমসাবৃত স্থান হইতে ইহা দূরবর্তী। কারণ, বিপুল এই অংশ সূর্যের সাক্ষাতে থাকে। পরিধির সমীপবর্তী যে অংশ থাকে তথায় আলোকরশ্মি স্বল্পই নিপতিত হয়। পৃথিবীর আলোকিত অংশকে ঘিরিয়া যে বৃত্ত তাহার পরিধির সন্নিকটে তমসে আলোক আসিয়া থামিয়া যায়।
সূর্য যখন ঈদৃশ গোলকে বসবাসরত অধিবাসীগণের মস্তকের ঠিক উপর আসিয়া আলোক বিচ্ছুরিত করে তখন আলোকগোলকের মধ্যস্থান মাত্রই অধিকতর উত্তপ্ত হইয়া উঠে। অন্যথায়, সূর্যের সাক্ষাৎ হইতে কোনও স্থান যদি দূরবর্তী হইয়া থাকে যেথায় সূর্য অধিবাসীগণের মস্তকের উপর আসিয়া আলোক বিচ্ছুরিত করে না, তথায় চরম শৈত্য অনুভূত হয়। যদি এরূপ হইয়া থাকে যে, সূর্য তাদৃশ স্থানে শিরোপরি স্থির তাহা হইলে তথায় চরম উত্তাপ হইবে।
জ্যোতিঃশাস্ত্রে ইহা প্রতিপাদিত যে, নিরক্ষীয় রেখার উপরস্থ অঞ্চলে সূর্য বৎসরে দুই বার অধিবাসীদের সমকোণে আলোক নিক্ষেপ করে―যখন সূর্য মেষরাশিতে প্রবেশ করে তখন এক বার১, যখন সূর্য তুলারাশিতে প্রবেশ করে তখন আরেক বার।২
বৎসরব্যাপী সূর্য ছয় মাস উত্তরায়নে থাকে, ছয় মাস দক্ষিণায়নে থাকে। তখন চরম উত্তাপ কিংবা চরম শৈত্য―কিছুই অনুভূত হয় না। তন্নিমিত্তে মাসগুলিতে পরিমিত তাপমাত্রা থাকে।
এইরূপ কথার অধিক প্রমাণ আবশ্যক। আমাদিগের গমনপথ যেই দিকপানে তাহার সহিত এইরূপ স্বল্প প্রমাণ সঙ্গত নহে। আমরা কেবল ইহা ইঙ্গিত করিয়াছি তাহার কারণ হইল, ইহা এইরূপ একটি ব্যাপার যাহা এই ভূলোকে পিতা-মাতা ব্যতীত কোনও মানবের জন্ম সম্ভব―এমনটা প্রত্যয়ন করে।
যাহারা উক্ত ব্যাপারে এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছিল তাহারা এমন কথা বলিয়া থাকিত যে, হাই বিন ইয়াকজান এইরূপ একজন যিনি মাতা-পিতা ব্যতীত জন্ম লইয়াছেন। আর যাহারা ইহা মানিয়া লইতে অসম্মত হইতেন তাহারা নিজেদের সমর্থনে যেমনটা কহিত তেমনটাই আপনাদিগের সম্মুখে পেশ করিতেছি। তাহারা বলিত:
এই দ্বীপের সন্নিকটে বিশাল এক দ্বীপ রহিয়াছে যাহার পার্শ্ব প্রশস্ত, যাহাতে সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা নাই। জনাকীর্ণ সেই দ্বীপ লোকেদের মধ্যস্থ একজন অতি দাম্ভিকতা-ও অহমিকায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি কর্তৃক শাসিত হইত। তাঁহার এক অপরূপা ও অবিশ্বাস্য সুন্দরী ভগিনী ছিল যাহাকে তিনি বিবাহ হইতে বঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছিলেন তথা তাহার বিবাহের উপর নিষেধ আরোপ করিয়াছিলেন। কারণ তাঁহার ভগিনীর যোগ্য পাত্রের সন্ধান দুর্লভ ছিল। ইয়াকজান নাম্নী এক নিকটাত্মীয় ছিল রাজপরিবারের। সে রাজার ভগিনীকে তাহাদের সময়োচিত ধর্মীয় আজ্ঞা মানিয়া গোপনে বিবাহ করিয়া লয়। অতঃপর ভগিনী তাহার সন্তান গর্ভে ধারণ করে ও একটি শিশুর জন্মদান করে। তাহার এই গুপ্ত বিষয় প্রকাশিত হইয়া যাইবে, রাষ্ট্র হইয়া যাইবে এই ভয়ে ভগিনী শিশুটিকে সিন্দুকে ঢুকাইয়া সিন্দুকের অর্গল শক্ত করিয়া নিবদ্ধ করিল। ইহার পূর্বে শিশুটির মাতা শিশুটিকে স্তন্য দান করিল। অতঃপর প্রথম রজনীতেই দাসদাসী ও বিশ্বস্ত লোকজন লইয়া সমুদ্রতটের দিকে রওয়ানা হইল। শিশুটির জন্য তাহার হৃদয় স্নেহে জ্বলিতে লাগিল। অন্যদিকে ভয়ও করিতে লাগিল। অতঃপর মাতা তাহার শিশুকে বিদায় দিতে দিতে কহিল, ‘হে পরওয়ারদেগার! তুমিই তো শিশুটিকে সৃষ্টি করিয়াছ। কোনও কিছুই তোমার অনবহিত নহে। গর্ভের অন্ধকারে তুমি ইহাকে পালিয়াছ, যতদিন ইহা পূর্ণরূপে বিকশিত হইয়া না উঠিবে ততদিন তুমি ইহার দায়িত্ব নিয়াছ। আমি ইহাকে তোমার করুণার কাছে সোপর্দ করিলাম। উৎপীড়ক, পরাক্রমশালী ও অনমনীয় এই রাজার ভয়ে ভীত হইয়া আমি ইহার জন্য তোমার করুণা ভিক্ষা করিলাম। অতএব, হে পরম দয়াবান! তুমি ইহাকে দেখিয়া রাখিও। ইহাকে ত্যাগ করিও না।’ বলিয়া রাজার ভগিনী ইহাকে সমুদ্রপানে ঠেলিয়া দিল।
সিন্দুকটি জলের স্রোতের মুখে পড়িয়া গেল। ভরা কটাল আসিয়া সেই রজনীতেই ইহাকে পূর্বে বর্ণিত দ্বীপের কিনারে আনিল। সেই বার জোয়ার এমন স্থানে আসিবার উপক্রম হইল যেথায় বছরের মধ্যেও কিঞ্চিৎ জল আসে নাই। জল জোয়ারের শক্তিতে সিন্দুকটিকে এমন এক স্থলে আনিয়া ফেলিল যেই স্থানের চারিপাশে কুঞ্জবন, ঝোপঝাড় আর এমন মৃত্তিকার স্তূপ সমাধির মতো জমিয়া রহিয়াছিল যে, বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাত হইতে তাহা সুরক্ষিত ছিল; সূর্য উদিত হইবার ও অস্ত যাইবার ক্ষণে তাহা এমন করিয়া হেলিয়া থাকিত যে তাহা সূর্যালোকের পক্ষেও অগম্য ছিল।
অতঃপর জল ভাটার টানে বাড়ন্ত হইতে লাগিল। সিন্দুকটি এমন এক স্থলে আসিয়া বাধা পড়িল যে, বায়ুপ্রবাহে ইহার উপরে বালুকা আসিয়া জমাট হইতে লাগিল এবং সিন্দুকের উপরস্থ ঝোপের কোটর বন্ধ করিয়া তোলে এমন করিয়া বালুকা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্তূপাকারে জমিতে লাগিল। ঝোপের অভিমুখে জলের প্রবেশপথ বন্ধ হইয়া গেল। জোয়ারের জল আর ঝোপের ধারেকাছে ঘেঁষিতে পারিত না। যখন জলের ছাট ঝোপে আসিয়া লাগিত সিন্দুকের কীলক ও কাষ্ঠফলক কাঁপিয়া উঠিত।
শিশুটির ক্ষুৎপিপাসা চরম হইয়া উঠিলে ইহা কান্নার রোল তুলিল এবং সাহায্য প্রার্থনা করিবার মতো করিয়া নড়িতে লাগিল। শাবককে সদ্য হারাইয়াছে এমন একটি হরিণীর কর্ণে ইহার কান্না গিয়া উপস্থিত হইল যাহার শাবক ডেরা হইতে বাহির হইয়াছিল আর তৎক্ষণাৎ শ্যেনপক্ষী আসিয়া তাহাকে ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছিল। কান্নার রোল শুনিবামাত্র হরিণী ভাবিয়া বসিল, ইহাই তাহার সন্তান। কান্নার উৎসপানে ইহা ধাইয়া চলিল। সিন্দুকের সমীপে পৌঁছানো অবধি ইহা ভাবিল―ইহা বুঝি তাহারই শাবক। খুর দিয়া ইহাকে নিরীক্ষা করিয়া দেখিল যে, ইহা ভেতর হইতে আর্তনাদ করিতেছে, করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া গিয়াছে, এমনকি সিন্দুকের উপরস্থ পাল্লা উড়িয়া গিয়াছে। ইহার উপর হরিণীর মায়া পড়িয়া গেল। হরিণী ইহাকে আদর-স্নেহ করিতে লাগিল। আদর করিয়া মুখে স্তনবৃন্ত গুঁজিয়া দিয়া ইহাকে সুস্বাদু দুগ্ধ পান করাইল। আসিয়া আসিয়া হরিণী ইহার যত্ন করিয়া যাইত, ইহাকে পালন করিয়া যাইত, বিপদ হইতে সুরক্ষা করিত।
পিতা-মাতা ব্যতীত ইহার জন্ম হইয়াছে―যাহারা এই কথা অস্বীকার করিত তাহারা ইহার উৎপত্তি লইয়া এইরূপ বলিয়া থাকিত। আমরা এই স্থলে আসিয়া বর্ণনা করিব কী করিয়া ইহা প্রতিপালিত হইয়াছে, কী করিয়া ইহা পূর্ণবয়স্ক হওয়া অবধি এক এক অবস্থার ভেতর দিয়া পরিবর্তিত হইয়াছে।
যুগপৎভাবে, যাহারা দাবি করিয়া থাকিত যে, মৃত্তিকা হইতে ইহার জন্ম তাহাদিগের ভাষ্য হইল―এই দ্বীপের প্রকোষ্ঠে পঙ্কিল মৃত্তিকা বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া গাঁজিয়া উঠিয়াছিল যেন উত্তাপের সহিত হিম উত্তমরূপে মিশ্রিত হয়, যেন আর্দ্রতার সহিত শুষ্কতা উত্তমরূপে মিশ্রিত হয়, মিশ্রিত হইয়া শক্তিতে সাম্যতা ও ভারসাম্য অর্জিত হয়।
গাঁজিয়া উঠা এই পঙ্কিল মৃত্তিকা আয়তনে বৃহত্তর ছিল। ইহার অভ্যন্তরে এমন অংশ ছিল যাহা অপরাপর অংশ হইতে জননকোষ সৃষ্টি হইবার পক্ষে ভারসাম্য মেজাজের ও সংবেদনশীলতার। ইহার মধ্যস্থ অংশে মনুষ্যের ধাতের সমধর্মী পরম সমতা বিরাজ করিতেছিল। অতঃপর পঙ্কিল এই মৃত্তিকার স্থানে স্থানে পঙ্কের মাত্রাধিক সান্দ্রতা হেতু বলকযুক্ত তরলের বুদ্বুদবৎ আবির্ভাব ঘটিল। ইহাদের অভ্যন্তরেও সান্দ্রতা ঘটিল ও অতি ক্ষুদ্র বুদ্বুদের দেখা মিলিল। অতি ক্ষুদ্র বুদ্বুদসমস্ত দুই ভাগে বিভক্ত যাহার মধ্যবর্তী অংশে সরু অবগুণ্ঠন রহিয়াছে। অতি ক্ষুদ্র এই বুদ্বুদসমস্ত যথোপযুক্ত পরম ভারসাম্যযুক্ত বায়ুপূর্ণ পেলব দেহে আকীর্ণ। অতঃপর আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে আত্মা ইহার সংশ্লিষ্ট হইয়া ইহাতে এমন করিয়া নিবদ্ধ হইয়াছে যে সচেতনভাবে আত্মাকে ইহা হইতে পৃথক করা দুরূহ হইবেক। যেই রূপ বোধগম্য হইয়া থাকিত যে, এই আত্মা পরম পরাক্রমশালী আল্লাহর নিকট হইতে সতত প্রবহমান। সূর্যালোকের সহিত ইহা তুলনীয়―সূর্যালোক প্রতিনিয়ত ব্রহ্মাণ্ডের পানে প্রবহমান।
এমন কতক বস্তুপিণ্ড রহিয়াছে যাহা হইতে কেহ আলোকিত হয় না। অত্যধিক স্বচ্ছ বায়ু এইরূপ। কতক বস্তুপিণ্ড এমন রহিয়াছে যাহা হইতে অল্প হইলেও আলোকপ্রাপ্তি ঘটে। নিকষিত নহে এমন ঘন বস্তুসমূহ এইরূপ। আলোক গ্রহণ করিবার ক্ষেত্রে ইহারা বিভিন্নতা প্রদর্শন করিয়া থাকে। আর এই বিভিন্নতা বস্তুর বর্ণের উপর নির্ভরশীল। কতক বস্তুপিণ্ড এমনও রহিয়াছে যাহা হইতে চূড়ান্তমাত্রায় আলোকপ্রাপ্তি ঘটে। দর্পণ ও তাদৃশ নিকষিত বস্তুসমূহ এইরূপ। বিশেষায়িত গঠনের অবতল দর্পণসদৃশ এইরূপ বস্তু আলোকের প্লাবনহেতু অগ্নি উৎপাদন করে।
একই রূপে সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর উপর আত্মা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে সম্পূর্ণ মুক্তভাবে শাশ্বত বিচরণরত। সৃষ্ট বস্তুসমূহের মধ্যে এমন রহিয়াছে আত্মা যাহাদিগের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা সত্ত্বেও তথায় আত্মার কোনওরূপ প্রভাব দৃষ্টিগোচর হয় না। কারণ ইহারা অসংবেদনশীল। নিষ্প্রাণ বস্তুসমূহ, যাহাদের চেতনা নাই, তাহারা এইরূপে বিবেচ্য। সুচারু দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইহারা বায়ুর সহিত তুল্য। এমনও রহিয়াছে যাহারা আত্মার অনুপ্রবেশে বৃক্ষাদির মতো সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করিয়া থাকে। সুচারু দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইহারা ঘন বস্তুর সহিত তুল্য। আর যাহারা আত্মার অনুপ্রবেশে বিশেষ প্রভাবিত এইরূপ প্রদর্শন করিয়া থাকে তাহারা প্রাণি হিসেবে ধর্তব্য। সুচারু দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইহারা নিকষিত বস্তুর সহিত তুল্য।
এই সমস্ত নিকষিত বস্তুসমূহের ভেতর হইতে যাহাদের সূর্যরশ্মি শোষণ করিবার অত্যধিক ক্ষমতা রহিয়াছে তাহাদিগকে সূর্যের প্রতিচ্ছবি ও তাদৃশ বলিয়া গণ্য হয়।
আবারও একই রূপে প্রাণিসমূহের ভেতর হইতে যাহাদের আত্মাকে ধারণ করিবার অত্যধিক ক্ষমতা রহিয়াছে তাহারা আত্মাকল্প ও আত্মার ছবিতে গঠিত হয়। বিশেষ করিয়া মনুষ্য এইরূপ। মুহাম্মদ (স.)-এর কথায় ইহার ইঙ্গিত রহিয়াছে : ‘আল্লাহ তায়ালা তাঁহার ছবিতে আদমকে সৃষ্টি করিয়াছেন।’
অতএব মনুষ্যের অভ্যন্তরে যদি এই ছবিটি অবশিষ্ট সমস্ত ছবিকে ছাপাইয়া উঠে তাহা হইলে ছবিটি একা হইয়া পড়ে ও তাহার নূরের তাজাল্লিতে পার্শ্বস্থ প্রতিটি বস্তু জ্বলিয়া যায়। তখন ইহার তুলনা আতশ কাচের সঙ্গেই চলিতে পারে যাহা নিজেকে ছাড়া অবশিষ্ট যাবতীয় বস্তুপিণ্ডকে জ্বালাইয়া দেয়। কেবল সমস্ত আম্বিয়া-এ-কেরামের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটিয়া থাকে। যথোপযুক্ত ক্ষেত্রেই তাঁহাদের এমনটা সুস্পষ্ট হইয়া উঠে। যাহা হোক, যাহারা সৃষ্টি সম্পর্কে এইরূপ বর্ণনা করিয়া থাকেন তাহাদের বৃত্তান্ত সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করা যাক।
তাহারা বলিয়া থাকেন: যখন এই আত্মা এই জাতীয় আধারের সহিত সংশ্লিষ্ট হইল তখন তাবৎ শক্তি এই আত্মার প্রতি ঝুঁকিয়া পড়িল ও শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত করিল এবং আল্লাহর হুকুম মানিয়া তাহা পরিপূর্ণ করিতে প্রাণান্ত করিল। অতঃপর এই আধারের উলটা পার্শ্বে অন্য একটি বুদবুদ সৃষ্টি হইল যাহা আরও তিনখানা নিধানে বিভাজিত ছিল এবং তাহাদের পরস্পরের মধ্যে সূক্ষ্ম ঝিল্লি ও ঝরোকাপথ ছিল। ঝিল্লি ও ঝরোকাপথগুলি সেই বায়বীয় বস্তু দ্বারা নিরুদ্ধ ছিল যাহা দ্বারা প্রথমোক্ত আধারটি নিরুদ্ধ ছিল। কেবল প্রথমোক্তটি হইতে ইহা সূক্ষ্মতর ছিল।
এক পার্শ্ব হইতে বিভাজিত এই তিনটি উদরের অভ্যন্তরে সেই শক্তির কিয়দংশ স্থাপিত করা হইল যাহা তাহার প্রতি অবনত হইয়াছিল, তাহার তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার উপর তাওয়াক্কুল করিয়াছিল এবং প্রথমোক্ত আধারটির সহিত সংশ্লিষ্ট প্রথম আত্মার ক্ষুদ্র-বৃহৎ যাহাই ঘটুক না কেন তাহার নিষ্ক্রান্তিতে তাহার উপর তাওয়াক্কুল করিয়াছিল।
এই আধারটির ঠিক উলটা পার্শ্বে এবং দ্বিতীয় আধারটির বিপরীতে তৃতীয় আরেকটি বুদবুদের আবির্ভাব ঘটিল যাহা বায়বীয় বস্তু দ্বারা বোঝাই ছিল এবং প্রথমোক্তদের অভ্যন্তরস্থ বায়বীয় বস্তুর তুলনায় ইহা সান্দ্রতর ছিল। এই আধারটির অভ্যন্তরে বশ্য শক্তির কিয়দংশ স্থাপিত হইল ও তাহার তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার ওপরও তাওয়াক্কুল করা হইয়াছিল। অতএব, তিন প্রকারের আধার গাঁজাইয়া উঠা এই মৃত্তিকা হইতে আমরা যেইরূপ বর্ণনা করিলাম সেইরূপ পদ্ধতিতে অগ্রেই তৈয়ার হইল।
তাহাদের পরস্পরকে পরস্পরের প্রয়োজন পড়িত। অবশিষ্ট দুইটি আধারের নিকট প্রথমটির প্রয়োজন ছিল, তাহারা প্রথমটির নফরগিরি করিবে, তাহাকে সেবা করিবে।
প্রথমটির নিকট অবশিষ্ট দুইটির প্রয়োজন ছিল মালিকের নিকট অধীনস্থদের সদৃশ, হুকুমদাতার নিকট হুকুম তামিলকারীদের সদৃশ। দুইটির প্রতিটিই প্রথমটির ভৃত্য। এই দুইটি হইতে পরবর্তী সময়ে যাহা কিছু আবির্ভূত হইবে তাহা উপর্যুক্ত দুইটির ভৃত্যসুলভ গণ্য হইবে না।
তাহাদিগের মধ্য হইতে একটি অর্থাৎ দ্বিতীয়টি তৃতীয়টির প্রভুত্ব পূর্ণ করিয়া দেয়। অতঃপর দুইটি হইতে প্রথমটি যেহেতু আত্মার সহিত সম্পর্কিত, সেহেতু পাইনবৃক্ষের অগ্নিসৃত হইয়া ইহা জ্বলিত। আর, ইহা হইতে পুরু একটি বস্তুর আকারপ্রাপ্তি ঘটিল যাহা আবার দেখিতে ইহার মতোই হইতে লাগিল। এবং ইহা নিবিড় মাংসের টুকরার আকার নিল যাহার উপরে ইহারই রক্ষাকল্পে ঘন একটি পর্দা পড়িল। সমস্ত অঙ্গটি হৃৎপিণ্ড নামে অভিহিত হইল। যে স্থানে উত্তাপ থাকিবে তথায় আর্দ্রতাও থাকিবে। আর্দ্রতার বিভাজন ও বিলুপ্তি এমন পরিস্থিতিতে উপনীত হইবার প্রয়োজন যাহা হৃৎপিণ্ডকে টানিবে, বৃহৎ করিয়া তুলিবে ও অবিরত উহা হইতে বিশ্লেষিত বস্তুকে প্রতিস্থাপিত করিবে। নচেৎ লম্বা সময় ধরিয়া ইহা টিকিতে পারিবে না। কী উহার সহিত খাপ খাইবে আর কী উহার বৈরী হইবে তাহা বুঝিয়া যথাক্রমে নিকটে টানিবার ও দূরে ঠেলিবার মতো অনুভূতিপ্রবণও তাহাকে হইতে হইবে। অতএব, প্রথম প্রয়োজনের সময় যে শক্তি তাহা হইতে উদ্ভূত হইয়াছিল তাহা শুদ্ধ প্রথম অঙ্গটি হৃৎপিণ্ডটির দায়িত্বভার প্রাপ্ত হইয়াছিল। তদুপরি অন্য প্রয়োজনে অন্য অঙ্গটি তাহার দায়িত্বভার প্রাপ্ত হইয়াছিল।
সুতরাং, অনুভূতির কর্মনির্বাহক হইল মস্তিষ্ক আর ক্ষুৎপিপাসার কর্মনির্বাহক হইল যকৃৎ তথা কলিজা। এই দুইটি অঙ্গের মধ্যে প্রত্যেকটি আবার তাপ ও হৃৎপিণ্ড হইতে উদ্ভূত দুইটি অঙ্গের জন্য যথার্থ শক্তির নিমিত্তে হৃৎপিণ্ডের উপরই নির্ভর করিত। ইহার জন্যই ইহাদের মধ্যে নালি ও পন্থ বিজড়িত হইয়া রহিয়াছে যাহাদের কয়েকটি অবশিষ্টগুলি হইতে বেশ প্রশস্ত, যাহাতে প্রয়োজন পড়িলে তাহারা কাজে লাগিতে পারে। এইগুলিই ধমনী ও শিরা।
অতঃপর প্রকৃতিবিদরা গর্ভের অভ্যন্তরে ভ্রূণের বিকাশ লইয়া যেইরূপ বর্ণনা করিয়া থাকেন সেইরূপ বর্ণনা মোতাবেক গর্ভ ইহার অভ্যন্তরে ভ্রূণ পূর্ণরূপে সৃষ্টি না হওয়া অবধি, ইহার অঙ্গগুলির পূর্ণতাপ্রাপ্তি না হওয়া অবধি এবং উদর হইতে ভ্রূণের বাহির হইবার লগ্ন উপস্থিত না হওয়া অবধি ইহাকে ত্যাগ করে না। ইহাই তাহারা এতকাল ধরিয়া সবাইকে বলিয়া আসিতেছে।
গাঁজিয়া উঠা বিশাল এই মৃত্তিকাখণ্ড যেন উহার পরিপূর্ণ রূপ দান করিতে পারে তাই প্রকৃতিবিদরা ইহার শরণাপন্ন হইল। মৃত্তিকাখণ্ড হইতে একটি মানব জন্মাইতে যাহা যাহা আবশ্যক ঠিক তাহাই ইহাতে প্রস্তুত হইয়াছিল, এমনকি মনুষ্যের সমস্ত শরীরসমেত সবটুকুকে আবৃত করিয়া রাখিবে এমন আবরণও। ইহা পরিপূর্ণ হইলে পরে আবরণসমূহ খসিয়া পড়িল―প্রসব বেদনার সময় যেরূপ ঘটিয়া থাকে―এবং মৃত্তিকার অবশিষ্টাংশ খসিয়া পড়িল যেন উহা পানিশূন্য, শুষ্ক হইয়াছিল।
আহার্য ফুরাইয়া গেলে শিশুটির ক্ষুৎপিপাসা যখন চরম হইয়া উঠিল তখন উহা কাহারও না কাহারও শরণ ভিক্ষা করিতে লাগিলে শাবকহৃত হরিণীটি ইহার নিকটে আসিয়া পড়িল।
এহেন পর্যায় আসিয়া উপস্থিত হইলে পরে শিশুটির প্রতিপালনের ব্যাপারে প্রকৃতিবিদ ও প্রথম পক্ষের মতামত সামঞ্জস্যে আসিল। উভয় পক্ষই বলিল :
প্রাচুর্যময় চারণভূমিতে চরিত বলিয়া যে-হরিণী শিশুটিকে পালিবার ভার লইল উহা হৃষ্টপুষ্ট ছিল, উহার দুগ্ধেরও প্রাচুর্য ছিল যাহা দিয়া শিশুটিকে উহা উত্তমরূপে আহার করাইতে পারিত। উহা সর্বক্ষণ ইহার সঙ্গে কাটাইত। চরিবার প্রয়োজন না পড়িলে কদাচিৎ ইহার সঙ্গ ত্যাগ করিত। শিশুটিও উহার সঙ্গে ঈদৃশ অভ্যস্ত হইয়া উঠিল যে উহা চরিয়া আসিতে বিলম্ব করিলে প্রচণ্ড শব্দে ক্রন্দন আরম্ভ করিত। ফলত উহা তিষ্ঠিতে না পারিয়া ছুটিয়া আসিত। সাধারণত শিকার ধরিয়া খায় এইরূপ কোনও হিংস্র জন্তু দ্বীপটিতে বাস করিত না। এমন করিয়া শিশুটি লালিত পালিত হইতে লাগিল। হরিণীটি ইহাকে স্তন্য দিতে লাগিল আর ইহাও বড় হইয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে দুই বৎসর অতিক্রান্ত হইল। ইহা ক্রমান্বয়ে কীভাবে হাঁটিতে হয় তাহা শিখিতে লাগিল এবং ইহার বালদন্ত পড়িতে লাগিল। এই ক্ষণে আসিয়া ইহাও হরিণীটির পশ্চাদ্ধাবন করিত। হরিণীটি ইহাকে স্নেহ করিত, আদর করিত এবং সঙ্গে করিয়া এইরূপ স্থলে লইয়া আসিত যে-স্থলে ফলবান বৃক্ষ রহিয়াছে। বৃক্ষ হইতে সুমিষ্ট ও পরিপক্ব যেই সমস্ত ফল পড়িত সেগুলি সে ইহাকে খাওয়াইত। সেগুলির মধ্যে যেগুলির খোলস শক্ত মনে হইত সেগুলিকে পেষণদন্ত দিয়া ভাঙিয়া উহা ইহাকে খাইতে দিত। স্তনের নিকটে আসিলে উহা ইহাকে স্তন্য দান করিত, তৃষ্ণার্ত হইলে জলের সমীপে লইয়া যাইত। নিদাঘের মূহূর্তে ইহাকে ছায়া দান করিত, ইহার শীতলতা অনুভূত হইলে ইহাকে উত্তাপ দিবার ব্যবস্থা করিত। রজনী তমসাচ্ছন্ন হইয়া আসিলে উহা ইহাকে পূর্বস্থানের নিকটে লইয়া আসিত। কিঞ্চিৎ স্বশরীর দিয়া জড়াইয়া রাখিত, কিঞ্চিৎ পক্ষ দিয়া আবৃত করিত। পক্ষগুলি উহা সিন্দুক হইতে প্রাপ্ত হইয়াছিল। সেই সিন্দুক যাহার অভ্যন্তর পক্ষপূর্ণ করিয়া তাহাতে ইহা স্থাপিত হইয়াছিল।
তাহাদিগের গমনাগমনের মার্গে মৃগদঙ্গলের সাক্ষাৎ ঘটিত প্রতিদিন। দঙ্গলটি তাহাদিগের সহিত চলিত ফিরিত। যেই স্থানে ইহারা রাত্রিযাপন করিত সেই স্থানে নির্বিঘ্নে রাত্রিও কাটাইয়া দিত।
মৃগদিগের সহিত শিশুটির দিন এই করিয়াই কাটিয়া যাইতেছিল। এমন করিয়া ইহা তাহাদিগের বোল বলিতে লাগিল যে পরস্পরের স্বরের তেমন ব্যত্যয় ঘটিল না। এমন করিয়া পাখপাখালির কূজন ও যাবতীয় জন্তুর বোল যাহা ইহা শুনিত তাহাই নির্ভুল উপায়ে অনুকরণ করিয়া স্ব-উচ্ছ্বাসের প্রাবল্য প্রকাশে ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহার করিত। কিন্তু সাহায্যপ্রার্থী হইয়া কাহাকে আহ্বান করিতেছে, কাহারও সাহচর্য কামনা করিতেছে, কাহাকে সমীপে ডাকিতেছে কিংবা কাহারও সহিত অধিক থাকিতে চাহিতেছে না―এইরূপ ক্ষেত্রে ইহা মৃগদিগের বোলই অধিক ব্যবহার করিত। এতদক্ষেত্রে বন্য জন্তুসমূহের বোলের বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। তথাপি তাহারা ইহার সাহচর্যে আসিত, ইহাও যাইত। তাহারাও ইহাকে অবহেলা করিত না। ইহাও তাহাদিগকে অগুরুত্ববান মনে লইত তাহাও নহে।
বস্তুসমূহ ইহার দৃষ্টির অগোচর হইলে ইহার অন্তরে সে-সমস্ত নানাবিধ রূপে স্থির হইয়া উঠিত। ইহার অন্তরে বস্তুসমূহের কিয়দংশের জন্য আকর্ষণ জন্মিত, কিয়দংশের জন্য বিরাগ জন্মিত।
ইত্যবসরে ইহা সমস্ত প্রাণীর প্রতি লক্ষ করিত। ইহা দেখিত প্রাণিদের কাহারও শরীর পশম দিয়া আবৃত, কাহারও কেশ দিয়া আবৃত। আবার কেহ কেহ নানাবিধ পালক দ্বারা শোভিত। উহাদিগের মধ্যে যাহারা ছুটিতে পারিত ও যাহারা ক্ষিপ্রগতিতে আক্রমণ করিত তাহাদের প্রতিও ইহা লক্ষ করিত। কেহ কেহ এইরূপ ছিল যে, প্রতিপক্ষের সহিত লড়াই করিয়া আত্মরক্ষার নিমিত্তে তাহাদের দেহে শৃঙ্গ, শ্বদন্ত, ক্ষুর, উৎক্ষিপ্ত নখর ও নখরবৎ অস্ত্রাদি বিদ্যমান। ইহা এই সমস্তও নিরীক্ষণ করিত।
অতঃপর ইহা নিজেকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। অনাবৃত, নিরস্ত্র, ছুটিতে দুর্বল ও আক্রমণ করিতে স্বল্প সামর্থ্যবান হিসেবেই ইহা নিজেকে দেখিল। ফলফলাদি খাইবার সময় বন্যপশুরা যখন ইহার সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হইত, ইহাকে হটাইয়া দিয়া খাদ্যের উপর আধিপত্য কায়েম করিত ও ইহাকে পরাস্ত করিত তখন ইহা আত্মরক্ষা করিতে পারিত না এবং বন্যপশুদের নিকট হইতে পলায়ন করিতেও পারিত না।
ইহার সঙ্গে সমবয়সী যেই সমস্ত মৃগশাবক ছিল তাহাদিগকেও ইহা নিরীক্ষণ করিল। দেখিল, তাহাদিগের মস্তকে শৃঙ্গ শোভা পাইতেছে। অথচ পূর্বে তাদৃশ পরিলক্ষিত হইত না। পূর্বে দুর্বল থাকিলেও এক্ষণে আসিয়া তীব্রগতিতে ছুটিতে সক্ষম তাহারা। এই সমস্ত কিছুই ইহা তাহার নিজের ভেতরে দেখিতে পাইল না। না পাইয়া ইহা ধ্যানমগ্ন হইয়া গেল। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর পশ্চাতের কারণ ইহা কিছুই অনুধাবন করিতে পারিল না।
ইহার মনে হইত, এই সৃষ্টিসমূহ শারীরিকভাবে ত্রুটিযুক্ত তথা সৃষ্টিজনিত বিচ্যুতি ইহাদের রহিয়া গিয়াছে। নিজের সঙ্গে তুলনা করিবে তাহাদের মধ্যে ইহা এইরূপ কিছুই পাইল না।
সমস্ত পশুর বর্জ্য নিষ্কাশনের অঙ্গের দিকে তাকাইয়া ইহা দেখিতে পাইল যে, সেগুলি আচ্ছাদিত হইয়া আছে। তাহাদিগের পায়ুপথ লাঙ্গুল দিয়া আবৃত আর মূত্রাঙ্গ পশম কিংবা পশমবৎ বস্তু দ্বারা আবৃত। কারণ পশম তদ্বারা জননাঙ্গকে আবৃত করিয়া রাখে। এত সব দেখিয়া ইহার মন বিষাদগ্রস্ত হইল। এই সমস্তই ইহাকে পীড়া দিতে লাগিল।
এই সমস্ত লইয়া ইহা চিন্তায় বিভোর হইয়া উঠিল। ইহাও সপ্তম বৎসরে আসিয়া উপনীত হইল। ইহার যে বিচ্যুতিগুলি ইহাকে পীড়া দিত ও ব্যতিব্যস্ত করিয়া রাখিত সেইগুলি সম্পূর্ণ করিতে ইহা ব্যর্থ হইতে লাগিল। একটি বৃক্ষের প্রশস্ত কয়েকটি পাতা লইয়া ইহা শরীরের পশ্চাতে তাহার কয়েকটি জড়াইল, সম্মুখেও কয়েকটি জড়াইয়া লইল। এক প্রকার তালজাতীয় বৃক্ষের পত্র ও তৃণবৎ হালফাঘাস দিয়া ইহা কোমরবন্ধনীর মতো দেখিতে কিছু একটা প্রস্তুত করিয়া তাহার মধ্যে ঐ পল্লবগুলি ঝুলাইয়া দিল। সেইগুলি বেশিক্ষণ টিকিল না। সময় আসিলে পল্লবগুলি বিবর্ণ হইয়া শুষ্ক হইয়া গেল। অতঃপর বন্ধনী হইতে ঝরিয়া গেল।
অতঃপর বহুবিধ বস্তু লইয়া দ্বিগুণ শক্তিতে ইহা পরস্পরের সহিত পরস্পরকে সীবন করিতে লাগিল। হয়তো নতুন করিয়া যাহা গড়িল তাহা পূর্বের চাইতে টেকসই হইল। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাহা দীর্ঘ সময়ের জন্য টিকিত না।
বৃক্ষ হইতে ইহা কতেক যষ্টি লইয়া তাহাদিগের প্রান্তদেশ ঋজু করিল ও পৃষ্ঠদেশ সোজা করিল।
যষ্টিগুলি লইয়া ইহা প্রতিদ্বন্দ্বী পশুদিগের সম্মুখে আসিত। ইহাদিগের অভ্যন্তরে যেইগুলি দুর্বল সেইগুলিকে আক্রমণ করিত, যেইগুলি বলিষ্ঠ সেইগুলির সহিত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হইত। ইহাতে নিজের নিকটে নিজের ক্ষমতা লইয়া ইহার কিছুটা মহিমা জাগ্রত হইল। ইহা দেখিল, ইহার বাহুতে যাহা রহিয়াছে তাহা পশুদিগের চতুষ্পদে যাহা আছে তাহা হইতে শ্রেয়। ইহার যৌনাঙ্গকে ঢাকিবার প্রয়োজন পড়িলে কিংবা নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করিতে যষ্টি ধারণ করিবার প্রয়োজন পড়িলে ইহা বাহু দ্বারা সেই সমস্ত কার্যাবলি সাধন করিতে পারে। লাঙ্গুল ও প্রাকৃতিক কোনও অস্ত্র থাকিবার আকাক্সক্ষা পূর্বে যেই নিমিত্তে ইহা পোষণ করিত দেখিল সেই সমস্তের প্রয়োজনমাত্র রহিল না।
ইতিমধ্যে ইহা আরও বাড়িয়া উঠিল ও সপ্তম বৎসরটি অতিক্রম করিয়া গেল। যেই পত্রগুলি ইহা পরিধান করিত সেইগুলি নবায়ন করিতে করিতে ইহার প্রাণান্ত হইত। তক্ষণে ইহার অন্তর ইহাকে কোনও বন্যপশুর লাঙ্গুল গ্রহণ করিয়া নিজের সহিত ঝুলাইয়া দিতে প্রবৃত্ত করিল। কিন্তু ইহা দেখিত জীবিত সমস্ত পশু তাহাদিগের মধ্যে মৃতগুলিকে এড়াইয়া চলিত ও সেইগুলি হইতে পলাইয়া যাইত। সুতরাং এমন কিছু করাও তাহার জন্য সহজ হইল না। কয়েক দিনের মধ্যে একটি মৃত শ্যেনপক্ষী ইহার গোচরীভূত হইল। সুতরাং স্বীয় বাসনা চরিতার্থ করিতে ইহা মৃত পক্ষীর সন্নিকটস্থ হইল ও সুযোগটি হাতছাড়া করিল না। যখন ইহা দেখিল যে মৃত পক্ষীটির জন্য অবশিষ্টদের কোনও বিরাগ নাই তক্ষণে ইহা উহার নিকটস্থ হইয়া উহার পক্ষদ্বয় কাটিয়া লইল। সম্পূর্ণরূপে উহার লাঙ্গুল কাটিয়া লইল। এবং পক্ষ ও লাঙ্গুল হইতে পালক তুলিয়া সমগ্র চর্মকে ছাড়াইয়া লইয়া উহাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া লইল: এক খণ্ড নিজের পিঠের উপর বাঁধিল, অন্য খণ্ড নাভিমূল ও তৎসংশ্লিষ্ট নিম্নাঞ্চলের সহিত যুক্ত করিল। পশ্চাদঞ্চলে লাঙ্গুল ঝুলাইয়া দিল আর পক্ষদ্বয়কে নিজের দুই ঊর্ধ্ববাহুতে ঝুলাইয়া দিল। অতঃপর ইহার এইরূপ আভরণ ইহার সতরস্বরূপ হইল, ইহাকে উত্তাপ প্রদান করিল এবং ইহাকে এইরূপ মহিমা প্রদান করিল যে বনভূমির অবশিষ্ট পশুদের কেহই আর তাহার সহিত লড়াই করিতে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে আসিত না।
যেই হরিণীটি তাহাকে দুগ্ধ পান করাইয়াছিল, লালন-পালন করিয়া বড় করিয়া তুলিয়াছিল উহা ব্যতীত আর কেহই তাহার শরণাপন্ন হইত না। হরিণীটি বৃদ্ধা হইয়া নিস্তেজ হওয়া অবধি ইহা হইতে বিচ্ছিন্ন থাকিত না। ইহাও হরিণীটিকে ত্যাগ করিত না। বরং ইহা উহাকে সঙ্গে করিয়া উর্বর তৃণভূমিতে চরিতে যাইত, সুমিষ্ট ফল পাড়িয়া আনিয়া উহাকে খাইতে দিত।
দুর্বলতা ও ক্লান্তি যেন উহার উপর আধিপত্য বিস্তার করিল এবং উহার পশ্চাদ্ধাবন করিতে লাগিল। এক সময় আসিয়া উহাকে মৃত্যু স্পর্শ করিলে উহার গতি একেবারে থামিয়া গেল। উহার যাবতীয় কর্মতৎপরতায় ছেদ পড়িল।
বালকটি যখন উহাকে এমতাবস্থায় দেখিল ইহার মর্মপীড়া উপস্থিত হইল, ইহার অন্তরে উহার জন্য শোকের প্লাবন বহিতে লাগিল। ইহা উহাকে যাবতীয় সেই সমস্ত ধ্বনিতে আহ্বান করিতে লাগিল যেই সমস্ত ধ্বনি ইহাকে ডাকিতে উহা সচরাচর করিত। সর্বাধিক সামর্থ্য অনুযায়ী ইহা সমস্ত শব্দ করিল। কিন্তু ইহা উহার মধ্যে কোনওরূপ গতি দেখিতে পাইল না, কোনও ব্যত্যয় দেখিল না।
ইহা উহার কর্ণদ্বয় ও চক্ষুদ্বয় পরীক্ষা করিয়া দেখিল। কিন্তু কোনও সুস্পষ্ট বিচ্যুতি দেখিতে পাইল না। একইরূপে ইহা উহার সমস্ত প্রত্যঙ্গের উপর নজর বুলাইল। কোথাও কোনওরূপ বিচ্যুতি দেখিতে পাইল না।
ইহার মনে প্রবল ইচ্ছা জাগিল, বিচ্যুতি কোথায় রহিয়াছে তাহা বাহির করিয়া ইহা তাহা উপড়াইয়া ফেলুক, হরিণীও উহার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া যাক। কিন্তু এইরূপ ভাবনা হইতে কোনও উপায় আসিল না। ইহা সেরূপ করিতেও পারিল না।
ইতঃপূর্বে ইহা নিজের মধ্যে যাহা এক প্রকার ভাবিয়া রাখিয়াছিল তাহা ইহাকে ঈদৃশ নিরীক্ষণ করিতে পথ দেখাইয়াছিল। কারণ ইহা দেখিত যে, যখন ইহা নিজের চক্ষুদ্বয় মুদিত অথবা কোনও বস্তু দ্বারা চক্ষুদ্বয় ঢাকিয়া ফেলিত তখন এই প্রতিবন্ধকতা না সরিলে ইহা দেখিতে পারিত না; তদ্রƒপ কর্ণদ্বয়ের কুহরে অঙ্গুলি প্রবেশ করিয়া তদ্বারা কর্ণদ্বয় বন্ধ করিয়া দিলে অঙ্গুলি না সরানো অবধি ইহা কিছুই শুনিত না; একইরূপে হস্ত দিয়া নাসিকা চাপিয়া ধরিলে তাহা উন্মুক্ত না করা অবধি ইহা কিছুর ঘ্রাণ টানিতে পারিত না।
সমস্ত কিছু দিয়া ইহা অনুধাবন করিল, উহার উপলব্ধি করিবার ও কর্ম সম্পাদন করিবার যাবতীয় ক্ষমতার হয়তো কোনও রূপ প্রতিবন্ধকতা রহিয়াছে যাহা সরাইয়া দিতে পারিলে উক্ত ক্ষমতা পুনরাবর্তিবে।
অতঃপর ইহা উন্মুক্ত সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিরীক্ষণ করিল। কিন্তু প্রকাশমান কোনও বিচ্যুতি নজরে পড়িল না। সঙ্গে সঙ্গে ইহা দেখিল, গতির ক্ষান্তি সমস্ত অঙ্গকেই অধিকার করে। বিশেষ কোনও অঙ্গকে ইহা কেবল অধিকার করে না। ইহার হঠাৎ মনে আসিল, বিচ্যুতি যাহা সমস্ত অঙ্গকেই আঘাত করে তাহা বহিরঙ্গে দৃষ্টিগোচর হইবে না। বরং এই বিচ্যুতি অন্তস্থ কোনও অঙ্গে অগোচরে ঘটিয়া থাকে, দেহের অভ্যন্তরস্থ কক্ষে ইহার নিবাস। অন্তস্থ অঙ্গটির এমনই ক্ষমতা ইহাতে বিচ্যুতি ঘটিলে প্রকাশমান সমস্ত অঙ্গ স্ব স্ব কর্ম হইতে নিবারিত হয়।
তখন বিচ্যুতির জয়জয়কার। বিচ্যুতি আসিয়া গতির চক্রকে স্থবিরতায় পর্যবসিত করে। ইহার প্রবল আকাক্সক্ষা জাগিল, সম্ভব হইলে উক্ত অঙ্গকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া ইহা তথা হইতে বিচ্যুতি বিদূরিত করিত, যাহাতে অঙ্গটি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া আসিত ও সমস্ত শরীর তাহার উপকার পাইত এবং শরীরও পূর্ববৎ কর্মে লিপ্ত হইয়া যাইত।
ইতঃপূর্বে বন্যজন্তুসহ অন্যান্য পশুর শবদেহ নিরীক্ষণ করিয়া ইহা দেখিত, তাহাদিগের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিরেট; করোটি, বক্ষ ও উদরের অংশ ব্যতীত অন্য ফাঁকা গহ্বরের অস্তিত্ব তথায় ছিল না। সুতরাং ইহার মনে হইল, উক্ত বৈশিষ্টসম্পন্ন যে অঙ্গের অনুসন্ধানে ইহা লিপ্ত তাহা তিনটি গহ্বরের একটিতে অবস্থিত। ইহার মানসে ইহাও বদ্ধমূল হইয়া উঠিল, তিনটি গহ্বরের মধ্যে মধ্যেরটিতে ইহার বহুল অনুসন্ধিত অঙ্গটি বিরাজ করে। কারণ ইহা দৃঢ়চিত্তে অনুধাবন করিল, সমস্ত অঙ্গ এই অঙ্গটির মুখাপেক্ষী বলিয়া ইহার অবস্থান মধ্যবর্তী অঞ্চলে হওয়াটাই সমীচীন।
নিজেকে পুনরায় অবলোকন করিয়া ইহার উপলব্ধি আসিল, তাদৃশ অঙ্গ ইহার বক্ষেও রহিয়াছে। হস্ত, পদ, কর্ণ, চক্ষু সমেত যাবতীয় অঙ্গের স্ব স্ব কর্মে ইহা ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে এবং সেগুলি নাই এমন অবস্থায়ও ইহা চলিতে পারে। ইহার নিকট সুস্পষ্ট হইল, এ সমস্ত অঙ্গ না হইলেও ইহার চলে। নিজের মস্তককে বিবেচনায় আনিয়া ইহা ভাবিল, হয়তো তাহা ব্যতীতও ইহার চলিবে। যখনই বক্ষে অবস্থিত বস্তুটির প্রতি ইহার দৃষ্টি পড়িল তখন মনে হইল, ইহা ব্যতীত একদণ্ড বাঁচিয়া থাকা ইহার পক্ষে দুষ্কর হইবে।
একই রূপে, বন্যপশুর সহিত যখন ইহা যুধ্যমান হইত অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহা ইহার বক্ষস্থলকে হিংস্র জন্তুর শৃঙ্গ হইতে অনাহত রাখিবার নিমিত্তে উক্ত স্থানকে দূরে সরাইয়া রাখিত। কারণ, তাহার মনে হইত তদস্থলে কোনও বস্তুর অস্তিত্ব রহিয়াছে।
এমন করিয়া যখন ইহার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হইল যে, বিচ্যুতি হরিণীর যে অঙ্গটিকে অধিকার করিয়াছে তাহা উহার বক্ষস্থলে বিদ্যমান। ইহা সিদ্ধান্ত লইল, ইহা উক্ত স্থানটি পরীক্ষা করবে ও খুঁটিয়া খুঁটিয়া দেখিবে। হইতেও পারে, এমন কর্মটি সম্পাদন করিয়া ইহা বিচ্যুতি বাহির করিবে ও অতঃপর তাহা দূরীভূত করিবে। পরক্ষণেই ইহার মনে ভয় আসিয়া উপস্থিত হইল, যে আশু কর্মটি সম্পাদন করিতে ইহা যাইতেছে যদি উক্ত কর্মটিই বিচ্যুতি হইতে বড় হইয়া দেখা দেয় যাহা প্রথম হইতেই হরিণীকে গ্রাস করিয়াছে তাহা হইলেই মরার উপরে খাঁড়ার ঘা হইবে।
ইহা আরও ভাবিয়া দেখিল: হরিণীটি ব্যতীত বন্যজন্তু আরও যেই সমস্ত রহিয়াছে সে সমস্তে এমন অবস্থা ঘটিবার পরে কাহাকেও কি ইহা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া আসিতে দেখিয়াছে ? অদ্যাবধি এমনটা ঘটিতে তো ইহা দেখিল না! প্রথমোক্ত অবস্থায় ফিরিয়া আসিয়া ইহা যদি মৃতদেহটিকে পরিত্যাগ করে তাহা হইলে হরিণীটিকে পুনরায় ফিরিয়া পাইবার আর কোনও আশা রহিবে না―এমনটা ভাবিয়া হতাশা উহাকে আচ্ছন্ন করিল। সুতরাং এই আশাটুকু অবশিষ্ট থাকিল, যদি ইহা উহার মধ্যে আকাক্সিক্ষত অঙ্গটি খুঁজিয়া বাহির করিয়া তাহাকে ত্রুটিমুক্ত করিতে পারে তাহা হলে হরিণীটি বাঁচিয়া উঠিতে পারে।
অতঃপর ইহা হরিণীটির বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া তাহার অভ্যন্তরে কী রহিয়াছে উহা পরীক্ষা করিয়া দেখিবার সিদ্ধান্তে উপনীত হইল। অতএব, অরণির খণ্ড ও শুষ্ক কীচককে ইহা ছুরির মতো করিয়া ব্যবহার করিল। ব্যবহার করিয়া হরিণীর বক্ষপিঞ্জরের উপরস্থ মাংস কাটিয়া ইহা তন্নিম্নস্থ মধ্যচ্ছদার নিকটে আসিয়া পৌঁছিল। দেখিল, উক্ত পর্দাটি সুদৃঢ়। দেখিয়া ইহার চিন্তা আরও সুদৃঢ় হইল, ইহা যেমন অঙ্গের তালাশ করিতেছে তেমন অঙ্গের নিমিত্তে এইরূপ পর্দাই লাগিবে। ইহার মনে আশার সঞ্চার হইল যে এই পর্দা অতিক্রম করিতে পারিলেই ইহা ইহার অভীষ্ট অঙ্গের সন্ধান প্রাপ্ত হইবে। ইহা পর্দাখানি ছিন্ন করিতে সচেষ্ট হইল। কিন্তু যন্ত্রের অভাব হেতু এবং যেহেতু ইহার নিকট অরণি ও কীচক ব্যতীত অন্য কিছুই ছিল না সেহেতু কর্মটি ইহার জন্য দুঃসাধ্য হইল। অতএব, পুনরায় ইহা অরণি ও কীচক শাণ দিয়া নবায়ন করিয়া আলতো করিয়া পর্দাটি ছিন্ন করতে সচেষ্ট হইল। পর্দাটি ছিন্ন করিয়া ইহা ফুসফুসে গিয়া উপস্থিত হইল। প্রথমে ইহা ভাবিয়া বসিল, যাহা আশা করিতেছিল তাহাই প্রাপ্ত হইয়াছে। ভাবিয়া ফুসফুস নাড়িয়াচাড়িয়া ইহা সম্ভাব্য বিচ্যুতিস্থানের তালাশ করিতে লাগিল।
প্রথমত ফুসফুসের অর্ধাংশের দেখা মিলিল যাহা একপার্শ্বস্থ ছিল। যখন ইহা দেখিল উক্ত অঙ্গটি একদিকে হেলিয়া রহিয়াছে তখন ইহা বুঝিল, ইহা যে অঙ্গটির তালাশ করিতেছে তাহা উদরের প্রশস্ততার মধ্যবিন্দুতে ভিন্ন অন্যত্র অবস্থিত নহে; একইরূপে দৈর্ঘ বরাবর মধ্যবিন্দুতেই তাহার অবস্থান। ভাবিয়া ইহা বক্ষের মধ্যস্থানেই অঙ্গটি খুঁজিতে লাগিল ও প্রচণ্ড শক্তিশালী কোনও আবরণ দিয়া আবৃত, অনড় বন্ধনে আবদ্ধ হৃৎযন্ত্রটি মিলিল। যে পার্শ্ব দিয়া উন্মুক্ত করিয়া ফুসফুসটির দেখা ইহা পাইয়াছিল উক্ত পার্শ্বে ফুসফুস হৃদযন্ত্রটিকে ঘিরিয়া রাখিয়াছিল। ইহার পর নিজেকে ইহা বলিল: যদি অঙ্গটির অন্য পার্শ্ব দেখিতে এই পার্শ্বের মতো হইয়া থাকে তাহা হইলে প্রকৃতই ইহা মধ্যস্থান এবং অনুসন্ধানকৃত অঙ্গটি অবধারিতভাবে ইহাই। মোটের উপর, মনোরম অবস্থান, দেখিতে সুন্দর, নিয়মিত (সুষম) গড়ন, দৃঢ় মাংসপিণ্ড ও অন্য অঙ্গসকল এমন করিয়া ইহার মতো পর্দা দিয়া আবৃত নহে―এ সমস্ত বিষয় অনন্য।
অতঃপর, বক্ষের অন্য প্রান্তে তল্লাশি করিয়া ইহা বক্ষপিঞ্জরের নিম্নস্থ পর্দা দেখিতে পাইল। দেখিল, এই পার্শ্বে যে ফুসফুস ছিল একই ফুসফুস অন্য পার্শ্বেও বিরাজমান। ইহা সিদ্ধান্তে উপনীত হইল যে, এই অঙ্গটিই অভীষ্ট অঙ্গ। অঙ্গটির পর্দা উন্মুক্ত করিতে ও ঝিল্লি বিদীর্ণ করিতে ইহা প্রাণান্ত করিল। সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়া ইহা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িল।
ইহা হৃৎযন্ত্রটি উন্মুক্ত করিয়া দেখিতে পাইল, অঙ্গটি সর্ব দিক দিয়া নিরেট। ইহা অঙ্গটির অভ্যন্তরে কোনও সুস্পষ্ট বিচ্যুতি কি দেখিবে ? না, ইহা কিছুই দেখিল না। অতঃপর ইহা হস্ত দিয়া অঙ্গটি চতুর্পার্শ্ব হইতে চাপিয়া ধরিল। সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল, অভ্যন্তর শূন্যস্থানযুক্ত। ইহা বলিল: তাহা হইলে আমার চূড়ান্ত অভীষ্ট স্থানটি এই অঙ্গের অভ্যন্তরে যে স্থানে অদ্যাবধি আমি উপনীত হইতে পারি নাই।
অতঃপর ইহা উক্ত অঙ্গটিও বিদীর্ণ করিল। অঙ্গটির অভ্যন্তরে ইহা দুইটি শূন্যস্থান প্রাপ্ত হইল। তন্মধ্যে একটি দক্ষিণ পার্শ্বে ও অন্যটি উত্তর পার্শ্বে। দক্ষিণ পার্শ্বস্থ শূন্যস্থানটি তঞ্চিত রক্তে পরিপূর্ণ। উত্তর পার্শ্বস্থ শূন্যস্থানটি ফাঁকা, তথায় কোনও বস্তু নাই। ইহা বলিয়া উঠিল: প্রকোষ্ঠদ্বয়ের একটির অভ্যন্তরেও―যাহার অনুসন্ধানে আমি লিপ্ত―তাহার অস্তিত্ব নাই।
অতঃপর বলিল: পরন্তু দক্ষিণ পার্শ্বের প্রকোষ্ঠটিতে তঞ্চিত রক্ত ব্যতীত অন্য কিছুই আমার নজরে আসিল না।
এই বিষয়ে কোনও রূপ সন্দেহের অবকাশ নাই যে, সমস্ত দেহ এই অবস্থায় আসার পূর্বে রক্তের তঞ্চন ঘটে নাই। কারণ ইহা পূর্বেই প্রত্যক্ষ করিয়াছে, রক্ত যখন শরীর হইতে নিষ্ক্রান্ত হয় তখন ইহা তঞ্চিত হয় ও জমাট বাঁধিয়া যায়। দেহস্থ সমস্ত রক্ত হইতে ইহার যে পার্থক্য রহিয়াছে তাহাও বলা যাইবে না। আর আমি দেখিয়াছি, এই রক্ত শরীরের সমস্ত অঙ্গে বিরাজ করে এবং এমন অঙ্গ পাওয়া যাইবে না যাহা অন্য অঙ্গ হইতে এই রক্তের স্বাতন্ত্র্যসূচক। এমন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোনও কিছুর অনুসন্ধান করাও আমার উদ্দীষ্ট নহে। বরঞ্চ, আমার উদ্দিষ্ট হইল এই স্থানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বস্তুটির অনুসন্ধান করা, যে বস্তুটিকে আমার কাছে মনে হইয়াছিল উহা ব্যতীত এক পলকও আমি তিষ্ঠিতে পারিব না এবং প্রথম হইতেই উহাকে খুঁজিয়া বাহির করিতে আমার যাবতীয় তৎপরতা।
বরঞ্চ এমনটা তো আমি একাধিক বার প্রত্যক্ষ করিয়াছি, লড়াই বাঁধিয়া গেলে আমি বন্যপশু কর্তৃক আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছি আর আমার দেহ হইতে বিপুল রক্ত নির্গত হইয়াছে। তদুপরি আমার কোনও অনিষ্ট ঘটে নাই এবং আমার দৈহিক কার্যাবলি হইতে কিছুই হৃত হয় নাই। অতএব, এই প্রকোষ্ঠে আমার উদ্দিষ্ট বস্তু থাকিতে পারে না।
অন্যদিকে, বাম প্রকোষ্ঠটি যাহাকে আমি ফাঁকা দেখিয়াছি উহার অভ্যন্তরে কিছুই নাই। দেখিয়া আমার মনে হইল, উহা অনর্থক সৃষ্টি করা হইয়াছে। কিন্তু যতটুকু আমি পর্যবেক্ষণ করিয়াছি তাহাতে ইহা বুঝিতে পারি, বরঞ্চ দেহের প্রতিটি অঙ্গের সুনির্ধারিত কর্ম রহিয়াছে। এমন করিয়া বিবেচনা করিলে কী করিয়া আমি বলিব, প্রকোষ্ঠটির সৃষ্টি অহেতুক ? যতখানি মনে হয়, আমার উদ্দিষ্ট বস্তুটি ইহাতেই অবস্থান করিতেছিল! কিন্তু উহা এই প্রকোষ্ঠটি ত্যাগ করিবার সময় ইহাকে শূন্য করিয়া তবেই প্রস্থান করিয়াছে।
এই করিয়া দেহটির অবকাশ মিলিল এবং ইহা জ্ঞানশূন্য ও অসাড় চলচ্ছক্তিহীন হইয়া পড়িয়া রহিল।
ইহা উপলব্ধি করিল, বিনাশ হইবার পূর্বেই প্রকোষ্ঠের অভ্যন্তরে নিঃশব্দে যাহা ছিল তাহা উক্ত স্থান ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছে। ইহা বুঝিতে পারিল, যেমন করিয়া কাটিয়া ছিঁড়িয়া দেহকে একাকার করা হইয়াছে তাহাতে খুব সম্ভবত পূর্বে যাহা ইহার অভ্যন্তরে ছিল তাহা আর দেহে ফিরিয়া আসিবে না। সমস্ত দেহ ইহার নিকট অগণ্য, অকিঞ্চিৎকর হইয়া উঠিল। উহার অভ্যন্তরে ইতঃপূর্বে যাহা ছিল যাহার সম্পর্কে ইহা মনে মনে ভাবিল যে, উহা দেহের ভেতরে অল্পক্ষণের জন্য ঠাঁই নেয় ও সময় ফুরাইয়া গেলে দেহকে ছাড়িয়া চলিয়া যায়। তাহার তুলনায় দেহকে ইহার নিকটে তুচ্ছ মনে হইল।
কী সেই বস্তু ? তাহার কী বৃত্তান্ত ? এই দেহের সহিত তাহাকে কী যুক্ত করিয়াছিল ? কোন গন্তব্যের পানে তাহা চলিয়া গেল ? দেহ ছাড়িয়া চলিয়া যাইবার সময় তাহা কোন দ্বার দিয়া প্রস্থান করিল ? যদি গররাজি হইয়া প্রস্থান করিয়া থাকে তাহা হইলে কী তাহাকে ক্ষুণ্ন করিল ? যদি স্বেচ্ছায় প্রস্থান করিয়া থাকে তাহা হইলে এরূপ কী হইয়াছিল যাহার নিমিত্তে তাহা দেহের উপর বিরক্ত হইয়া স্বেচ্ছায় বাহির হইয়া গেল ?―এইরূপ নানাবিধ চিন্তায় ইহা সমাচ্ছন্ন হইয়া গেল। এ সমস্ত ভাবিতে ইহা এইরূপ নিমজ্জিত হইয়া গেল যে মৃতদেহের কথাই বেমালুম ভুলিয়া গেল। ভুলিয়া অন্য খেয়ালে ভাসিয়া চলিল। ইহা অনুধাবন করিল, ইহার যে মাতা ইহাকে স্নেহ করিত, স্তন্য দান করিত সে মাতা মৃতদেহটি নহে, বরং যে বস্তুটি প্রস্থান করিয়াছে সে বস্তুটিই। সে বস্তুটি হইতেই যাবতীয় ক্রিয়াকর্ম প্রতীয়মান হইত। এই অক্ষম দেহটি সেই-সমস্ত করিত না। এবং এই দেহটি সামগ্রিকভাবে একটি যন্ত্রের মতো, বন্যজন্তুর সহিত লড়াই করিবার সময় হস্তে ধরিয়া রাখা আসাটির মতো।
দেহের সহিত উক্ত বস্তুটির যে সম্পর্ক তাহা চুকিয়া গিয়াছে। বস্তুটি ছিল দেহের অধিপতি। দেহকে তাহাই নাড়াইত। ইহার অধিক কোনও অভিলাষ আর রহিল না।
ইতিমধ্যে উক্ত দেহে পচন ধরিল ও উহা হইতে দুর্গন্ধ নাকে আসিতে লাগিল। ফলে ইহা উহা হইতে অধিক বিরাগ হইল। দেহটিকে সম্মুখে দেখিতেও ইহার প্রবৃত্তি রহিল না আর।
অতঃপর দুইটি বায়স ইহার নজরে পড়িল। উহারা পরস্পর যুদ্ধে অবতীর্ণ হইল। যুদ্ধে একটি অন্যটিকে হত্যা করিল। অতঃপর জীবিতটি মৃত্তিকা খনন করিতে লাগিল। খনন করিয়া উহা গর্তের অভ্যন্তরে মৃত স্বজাতিটিকে সমাহিত করিল। দৃশ্যটি অবলোকন করিয়া বালক নিজেকে প্রবোধ দিল: যদিও বায়সটি স্বজাতিকে হত্যা করিয়া দুষ্কর্ম করিয়াছে তবু ইহা মৃতদেহটিকে সমাহিত করিয়া সুন্দর একটি কর্ম সম্পাদন করিয়াছে! আমার মাতাকে সমাহিত করিয়া উক্ত কর্মটির অনুসরণ করিলে তাহা আমার পক্ষে যথোপযুক্ত কর্ম হইবে! অতঃপর ইহাও গর্ত খনন করিয়া উহার অভ্যন্তরে মাতার মৃতদেহ রাখিল ও মৃতদেহের উপর মৃত্তিকা ছড়াইয়া দিল। কিন্তু ইহার চিন্তা নিরন্তর চলিতে লাগিল: দেহকে পরিচালনা করে যে বস্তুটি সে বস্তুটি প্রকৃতই কী ? কোনও উত্তর ইহা জানিতে পারিল না। ইহা সমস্ত হরিণ পর্যবেক্ষণে নিমগ্ন হইল। উহাদের ভেতরে ইহা মাতার অবয়ব দেখিল, মাতার রূপ দেখিল। তখন ইহার মনে বদ্ধমূল হইল, হরিণদিগকে যাহা নাড়াইতেছে, যাহা নিয়ন্ত্রণ করিতেছে তাহার মতো দেখিতে একই বস্তু ইহার মাতাকেও নাড়াইত, নিয়ন্ত্রণ করিত। এমন সাদৃশ্যের কথা ভাবিয়া ইহা হরিণদিগের সাহচর্য কামনা করিত ও উহাদিগকে স্নেহ করিত।
এমন ঘোরের ভেতরে ইহা আরও স্বল্পক্ষণ অতিবাহিত করিল। নানাবিধ প্রজাতির পশু ও উদ্ভিদ ইহা এক নজর দেখিয়া লইল। দ্বীপটির চতুর্পার্শ্বে তীর ঘেঁষিয়া ইহা চক্রাকারে ঘুরছিল। স্বীয় রূপের কিছুর অস্তিত্ব রহিয়াছে কি না কিংবা তদ্রƒপ নজরে পড়ে কি না তাই এমনটা করিল। কারণ, ইহা দেখিয়া আসিতেছে―প্রতিটি প্রজাতির পশু ও বৃক্ষের অগণিত অনুলিপি দ্বীপটিতে ছড়াইয়া রহিয়াছে। অতঃপর, স্বীয় রূপের কিছুই ইহা খুঁজিয়া পাইল না।
ইহা প্রায়শ দেখিত, সমুদ্র দ্বীপটিকে চতুর্পার্শ্ব হইতে বৃত্তাবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। দেখিয়া মনের অভ্যন্তরে ইহার ধারণা জমাটবদ্ধ হইল, এই দ্বীপটি ব্যতীত বিশ্বে অন্য ভূমিখণ্ডের অস্তিত্ব নাই।
কদাচিৎ দ্বীপের অভ্যন্তরে শুষ্ক শরতৃণের স্তূপে ঘর্ষণের মাধ্যমে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিত। যখন ইহা তাহা প্রত্যক্ষ করিত দেখিতে পাইত যে, তথায় এরূপ দৃশ্যপটের আবির্ভাব হইত যাহা ইহাকে শঙ্কিত করিয়া তুলিত। এইরূপ অদ্ভুত সৃষ্টি ইহার চিন্তার অগম্য ছিল। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া ইহা তামাশা দেখিতে লাগিল। চাহিয়া চাহিয়া অবাক হইয়া গেল। অতঃপর পদ সঞ্চারণ করিয়া শনৈ শনৈ উহার নিকটবর্তী হইল। ইহা শুধু মুগ্ধ নয়নে দেখিয়াই গেল―অগ্নির প্রাখর্য ও ক্ষমতা এইরূপ সর্বগ্রাসী যে যাহাই উহার সন্নিকটে উপস্থিত হয় তাহাকেই উহা নিঃশেষ করিয়া দেয় এবং স্বীয় রূপে রূপান্তরিত করে। অতঃপর আত্মশ্লাঘা ইহাকে পাইয়া বসিল। আল্লাহ তায়ালা যে সাহস ও শক্তি ইহার প্রকৃতিতে যুক্ত করিয়াছিলেন তাহার বশবর্তী হইয়া অগ্নিকে ধরিয়া উহার কিয়ৎপরিমাণ প্রাপ্ত হইবার মনোবাঞ্ছা লইয়া ইহা উহার প্রতি হস্ত প্রসারিত করিল। অগ্নি যখন ইহার হস্ত দগ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইল তখন ইহা উহাকে ধরিতে ব্যর্থ হইল। অগ্নি পুরোপুরি অধিকার করিতে সফল হয় নাই এইরূপ একটি দণ্ডকে ইহা হস্তে ধারণ করিল। দণ্ডটির এক পার্শ্ব নিরাপদ। বিপরীত পার্শ্বে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইতেছে। অতএব, নিরাপদ পার্শ্ব ধরিয়া দণ্ডটিকে স্বীয় আশ্রয়স্থলে বহন করিয়া আনা ইহার পক্ষে সহজ হইল। ইতঃপূর্বেই ইহা একটি গুহায় নির্জনে বাস করিত এবং উক্ত স্থানটি বাস করিবার পক্ষে ইহার নিকট সুখকর বলিয়া মনে হইত।
অতঃপর শুষ্ক তৃণ ও কাষ্ঠ যাহাই ইহা সন্নিকটে উপস্থিত দেখিতে পাইল তাহাতেই এই অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিতে সচেষ্ট হইল। অষ্টপ্রহর এই অগ্নি লইয়া উল্লসিত হইয়া থাকিত, উহার তত্ত্বাবধান করিত। অগ্নি লইয়া এমন করিয়া ইহা পড়িয়া থাকিত যেন তাদৃশ বস্তু ইহা স্বীয় চর্মচক্ষে পূর্বে আর দেখিতে পায় নাই।
অন্ধকার ঘনীভূত হইয়া আসিলে অগ্নির প্রতি ইহার মুগ্ধতা বাড়িয়া যাইত। কারণ, অন্ধকারে উহা সূর্যের মতো করিয়া আলোক ও উষ্ণতা প্রদান করিত। উহার প্রতি ইহার আকর্ষণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাইল এবং ইহার নিকট মনে হইল, সর্বোৎকৃষ্ট বস্তু ইহার হস্তগত হইয়াছে। সর্বক্ষণ ইহা অগ্নির পানে মুগ্ধনয়নে তাকাইয়া থাকিত ও দেখিত, উহা সর্বদাই ঊর্ধ্বগামী ও আরোহণ অভিলাষী। ঊর্ধ্বপানে যেই সমস্ত স্বর্গীয় বস্তুর দর্শন মিলিল এই অগ্নি তাহাদিগের অন্তর্গত―এইরূপ ধারণা বালকের চিত্তে দৃঢ় হইল।
সম্মুখে যেইরূপ বস্তু ইহার গোচরীভূত হোক বালক অগ্নির শক্তিপরীক্ষা লইতে বিলম্ব করিত না। সমস্ত বস্তুকে ইহা অগ্নিতে নিক্ষেপ করিত আর দেখিত, শীঘ্র হোক কিংবা বিলম্বে হোক অগ্নির সম্মুখে নিক্ষিপ্ত বস্তুসকল পরাভব মানিত। ভস্মীভূত করিবার নিমিত্তে ইহা যাহাই অগ্নিতে নিক্ষেপ করিত দাহ্যক্ষমতা অনুযায়ী উক্ত বস্তু পূর্বোক্ত ফল স্বীকার করিত।
কয়েক শ্রেণির সামুদ্রিক জীবকে সমুদ্র তটভূমিতে নিক্ষেপ করিয়াছিল। অগ্নির পরীক্ষা লইতে বালক তাহাদিগকে উহাতে নিক্ষেপ করিল। যখন জীবসমূহের পাচন সমাপ্ত হইল চতুর্পার্শ্বে উহাদিগের সৌরভ ব্যাপ্ত হইল। বালকের ক্ষুধা জাগিয়া উঠিল। কিয়দংশ ইহা ভক্ষণ করিল। খাদ্যটি ইহার নিকটে মনোরম মনে হইল। এইরূপ করিয়া ইহা মাংসভক্ষণে অভ্যস্ত হইয়া পড়িল। বালক বন্যপশু ও সামুদ্রিক জীব বধ করিবার নিমিত্তে মৃগয়ায় গমন করিতে প্রবৃত্ত হইল। শনৈ শনৈ ইহা মৃগয়ায় মাহির হইয়া উঠিল।
উৎকৃষ্ট খাদ্যের সংস্থান করিয়া দিয়াছে বলিয়া অগ্নির উপরে বালকের মমতা উত্তরোত্তর বর্ধিত হইল। যেহেতু ইতঃপূর্বে এইরূপ খাদ্য ইহার নিকট সহজলভ্য ছিল না। অগ্নির তাদৃশ প্রভাব ও অসামান্য ক্ষমতা দেখিয়া ইহার আকর্ষণ এইরূপ বাড়িয়া গেল যে ইহার মনে নিম্নোক্ত চিন্তাটি উঁকি মারিল: মাতৃকল্প হরিণীর হৃদয় হইতে যে বস্তুটি প্রস্থান করিয়াছে সে বস্তুটি বোধ হয় অগ্নির নির্যাস হইতে সৃষ্টি কোনও বস্তু নতুবা অগ্নিকল্প কোনও বস্তু হইবেক। জীবিত জন্তুর উষ্ণতা ও মৃত জন্তুর শৈত্য বালকের জীবনভর দেখিয়া আসা নৈমিত্তিক ঘটনা। জীবিত জন্তু সর্বদা উষ্ণ থাকে ও মৃত জন্তুকে শৈত্য অধিকার করিয়া রাখে। ইহার হেতু বালকের মনে উক্ত চিন্তাটি বদ্ধমূল হইল। মাতৃকল্প হরিণীর বক্ষ যখন বিদীর্ণ করিয়াছিল তখন হরিণীর বক্ষস্থলের চাইতে স্বীয় বক্ষস্থল উষ্ণতর বলিয়া ইহার অনুভূত হইয়াছিল। এত সমস্ত কিছু দৃষ্টকল্পে ইহার মনের কোণে ভাবনার উদয় হইল: জীবিত কোনও জন্তুকে ধরিয়া বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া যদি উহার ফাঁকা প্রকোষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করিতে পারিতাম ও দেখিতে পাইতাম যে, মাতার ক্ষেত্রে যাহা অপূর্ণ ছিল জীবিতটির ক্ষেত্রে উহা নিঃশব্দ বস্তুটি দ্বারা পূর্ণ তাহা হইলে আমি যাহা ভাবিতেছি তাহাই সঠিক―অর্থাৎ নিঃশব্দ বস্তুটি কি অগ্নির নির্যাস হইতে সৃষ্ট এবং তাহাতে আলোক ও উষ্ণতা বলিয়া কি কিছু রহিয়াছে ?
এইরূপ ভাবিয়া বালক একটি বন্যজন্তুর সন্নিকটে উপস্থিত হইল ও উহাকে আবদ্ধ করিয়া যেইরূপে হরিণীটিকে ব্যবচ্ছেদ করিয়াছিল সেইরূপে উহাকে ব্যবচ্ছেদ করিতে প্রবৃত্ত হইল। বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া ইহা হৃদযন্ত্র অবধি আসিয়া উপস্থিত হইল।
এই বার আসিয়া ইহা প্রথমে বাম হৃৎপ্রকোষ্ঠ ব্যবচ্ছেদ করিবার উপক্রম করিল। পূর্বোক্ত শূন্যস্থান ইহা বাষ্পীয় বায়ুপূর্ণ দেখিতে পাইল। তাহা দেখিতে শ্বেতবর্ণের কুহেলিকাময়। তথায় ইহা স্বীয় অঙ্গুলি প্রবেশ করাইয়া স্থানটির উষ্ণতা টের পাইল। স্থানটি এইরূপ উষ্ণ ছিল যে, ইহার অঙ্গুলি পুড়িয়া যাইবার উপক্রম হইল। তৎক্ষণাৎ উক্ত জন্তুটি মরিয়া গেল।
বালকের নিকট সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল, তপ্ত এই বাষ্পের লাগিয়া প্রাণিসকল নড়িয়া উঠে ও সকল স্তরের প্রাণির অভ্যন্তরে ঈদৃশ বস্তু রহিয়াছে যাহা প্রাণিটি হইতে বিচ্ছিন্ন হইলে উহা মরিয়া যায়।
অতঃপর নিজের অভ্যন্তরে এই আশা জাগিয়া উঠিল, প্রাণিটির সমস্ত অঙ্গ, তাহাদের গঠন, অবস্থান, পরিমাণ ও পরস্পরের সহিত যোগাযোগ রক্ষা করিবার যে পদ্ধতি তাহা একবার দেখিয়া লওয়া যাক। এই তপ্ত বাষ্প হইতে অঙ্গসকল উক্ত বস্তুকে কী করিয়া পায় যে উহার নিমিত্তে প্রাণিসকলে জীবনের চক্র চলিতে থাকে, যতক্ষণ বাষ্প দেহে অবস্থান করে ততক্ষণ কী করিয়া উহা অবস্থান করে, কোথা হইতে উহার প্রাপ্তি ঘটে ও কী করিয়াই-বা উহা উষ্ণতা ধারণ করে ?―এইরূপ নানাবিধ প্রশ্ন বালকের মনের কোণে আসিয়া জমিল। ইহার নিমিত্তে বালক জ্যান্ত-মৃত সমস্ত প্রকার পশু ব্যবচ্ছেদ করিয়া গভীর মনোনিবেশ সহকারে উহাদিগকে পর্যবেক্ষণ করিল এবং স্বীয় চিন্তার বিশিষ্টতা অনুসন্ধানে লিপ্ত হইল। ইহাতে ফল হইল যে, বালক বিশিষ্ট প্রকৃতিবিদগণের মতো এ সম্পর্কিত জ্ঞানের শীর্ষে আরোহণ করিল। ইহার নিকট প্রতিভাত হইল, সর্বপ্রকার প্রজাতির প্রতিটি জন্তু আঙ্গিক গঠনে জটিল হইলেও এবং উহাদের ইন্দ্রিয় ও কর্মকাণ্ডের বহুবিধতা থাকিলেও আত্মার বিবেচনায় একক আর এই আত্মার উৎপত্তি একটি সুনির্দিষ্ট স্থান (হৃৎযন্ত্র) হইতে হইয়াছে এবং সমগ্র অঙ্গে ইহার বিভাজন ইহা হইতেই ব্যাপৃত হইয়াছে। সমস্ত অঙ্গ তো ইহারই আজ্ঞাবহ, ইহারই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অন্য সব বন্যপশুর সহিত সম্মুখসমরে বালক যেমন করিয়া নিজের সমস্ত অস্ত্র ব্যবহার করে দেহের অভ্যন্তরে এই আত্মা সেই সমস্তের সহিত তুলনীয়। কয়েকটি অস্ত্র ব্যবহার করিয়া ইহা জল ও স্থলের যাবতীয় শিকার সম্পন্ন করে। কয়েকটি অস্ত্র ব্যবহার করিয়া ইহা বন্যপশুকে হস্তগত করে। যেই সমস্ত অস্ত্র ব্যবহার করিয়া ইহা যুদ্ধে লিপ্ত সে সমস্তের মধ্যে কতক এইরূপ যে সেই সমস্ত দিয়া ইহা আক্রমণ করে, কতক এইরূপ যে সেই সমস্ত দিয়া ইহা আক্রমণ প্রতিহত করে।
তদ্রƒপ, বালকের নিকট শিকার ধরিবার কতক অস্ত্র রহিয়াছে যেই সমস্ত কেবল জলজ জন্তু ধরিবার নিমিত্তে, কতক কেবল স্থলজ জন্তু ধরিবার নিমিত্তে ইহা ব্যবহার করে। যেই সমস্ত অস্ত্র দ্বারা ইহা ব্যবচ্ছেদ করে সে সমস্তও কতক গোত্রে বিভক্ত। কতক বিদীর্ণ করিতে ব্যবহার্য, কতক খণ্ডাংশ করিতে ব্যবহার্য, কতক ছিদ্র করিতে ব্যবহার্য। কিন্তু দেহকাণ্ড একক। প্রতিটি অঙ্গের কর্মক্ষমতা ও নিমিত্তার্থ অনুযায়ী ইহা সে সমস্তকে ব্যবহার করে। প্রতিটি অঙ্গের কতক উদ্দেশ্য রহিয়াছে যাহা অর্জন করিবার নিমিত্তে সেই সমস্ত ব্যবহৃত হইয়া থাকে।
তদ্রƒপ, এই প্রাণির আত্মাও একক। যখন চক্ষুর উপর ইহার কর্ম সম্পাদনের ভার ন্যস্ত হয় তখন বীক্ষণই ইহার কর্ম। কর্ণের উপর ন্যস্ত হইলে শ্রবণ, নাসিকার উপর ন্যস্ত হইলে ঘ্রাণ লওয়া, জিহ্বার উপর ন্যস্ত হইলে স্বাদগ্রহণ ইহার কর্ম হইয়া দাঁড়ায়। যখন চর্ম ও মাংসের উপর ইহার কর্ম সম্পাদনের ভার ন্যস্ত হয় তখন স্পর্শানুভূতি, ঊর্ধ্ববাহুর উপর ন্যস্ত হইলে গতি, যকৃতের উপর ন্যস্ত হইলে পুষ্টিগ্রহণ ইহার কর্ম হইয়া দাঁড়ায়।
সংশ্লিষ্ট কর্ম সম্পাদনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় অঙ্গ প্রতিটির রহিয়াছে। কিন্তু স্নায়ু বলিয়া অভিহিত করা হয় এইরূপ কতক তন্তুবৎ পথের মাধ্যমে আত্মার সহিত ইহাদের সংযোগ স্থাপিত না হইলে ইহারা স্বীয় দায়িত্ব পালন করিতে ব্যর্থ হয়। যখন পথসকল কাটা পড়িয়া যায় অথবা বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন অঙ্গসমূহ স্বীয় কর্মে ক্ষান্ত হয়।
মস্তকের কোটর হইতে আত্মা এই সমস্ত অঙ্গের সহিত সম্পর্কিত হয়। মস্তক এই আত্মাকে পায় হৃদযন্ত্রের মাধ্যমে। মস্তকের অভ্যন্তরে আত্মার নানা ভাগ-উপবিভাগ। এজন্য তথায় আত্মা বহুসংখ্যক। কোনও কারণে যে কোনও অঙ্গ হইতে যদি আত্মার বিলোপ ঘটে তাহা হইলে উক্ত অঙ্গটি স্বীয় কর্মে ক্ষান্ত হয় এবং তখন অঙ্গটি অবস্থাকল্পে পরিত্যক্ত যন্ত্রের মতো হইয়া থাকে যাহাকে বালক ব্যবহার করিতে পারে না ও যাহা হইতে বালকের উপকারও সাধিত হয় না।
দেহ হইতে সমস্ত আত্মা নিষ্ক্রান্ত হইলে অথবা বিলুপ্ত হইলে অথবা কোনও কারণে অনুপস্থিত হইলে দেহ সামগ্রিকভাবে স্বীয় কর্মে ক্ষান্তি দেয় ও মৃত্যুদশায় পতিত হয়। এমন করিয়া জন্মস্থান হইতে ইহা উক্ত অবস্থানে আসিয়া উপনীত হইল। তখন ইহার বয়স একবিংশ বৎসর।
এই স্মরণীয় সময়ে বালক নানাবিধ কৌশল উদ্ভাবন করিয়াছে। যেই সমস্ত প্রাণি ব্যবচ্ছেদ করিত তাহাদিগের চর্ম বস্ত্ররূপে পরিধান করিত, উপানৎরূপে ব্যবহার করিত। কেশ হইতে এবং খাতামি (millow জাতীয় গাছ), খাব্বাজা, শণ ও এই জাতীয় তন্তু উৎপাদক বীরুতের বল্কল হইতে ইহা সূত্র উৎপাদন করিত।
উল্লিখিত কর্মযজ্ঞের সূত্রপাত পূর্বেই হইয়াছিল। পূর্বেই ইহা শরজাতীয় তৃণ হইতে সূত্র তৈয়ার করিয়াছিল। শক্ত কণ্টক হইতে অঙ্কুশ, অরণিশাণিত করিয়া সূক্ষ্মাগ্র বংশদণ্ড তৈয়ার করিতে সচেষ্ট হইয়াছিল।
ইহা আবাবিল পক্ষীর দেখাদেখি গৃহ নির্মাণ করিতে শিখিয়াছিল। উচ্ছিষ্ট খাদ্যসামগ্রী মজুদ করিয়া রাখিবার জন্য ইহা কোষ্ঠ ও গৃহ নির্মাণ করিল। পরস্পরের সহিত আবদ্ধ বংশদণ্ড দ্বারা নির্মিত দ্বার দিয়া কোষ্ঠ ও গৃহকে দুর্ভেদ্য করিল যাহাতে ইহার অনুপস্থিতিতে এতদঞ্চলের পশুপক্ষী গৃহে প্রবেশ করিতে না পারে।
শিকার ধরিতে যেন ব্যবহার করিতে পারে এই নিমিত্তে ইহা শিকারি পক্ষী সঙ্গে রাখিল। ডিম্ব ও শাবক পাইবে এই নিমিত্তে কুক্কুট পালিতে লাগিল। বন্যগরুর অঙ্কুশসদৃশ শৃঙ্গের অগ্রভাগ লইয়া ইহা শক্ত বংশদণ্ড ও বীজবৃক্ষের দণ্ডাদির অগ্রে যুক্ত করিল। অগ্নি ও প্রস্তরের তীক্ষè প্রান্ত ব্যবহার করিয়া ইহা উক্ত অস্ত্রকে বর্শার মতো করিল এবং দোপাট্টা করিয়া চর্মের বর্ম তৈরি করিল। আত্মরক্ষার প্রকৃতিপ্রদত্ত কোনওরূপ অস্ত্র নাই দেখিয়া ইহা এই সমস্ত করিল।
স্বীয় যেই সমস্ত বিচ্যুতির কারণে বালক এতসমস্ত করিল এক হস্তই সে সমস্তর অভাব দূর করিতে যথেষ্ট―বালক ইহা বুঝিতে পারিল। বনের মধ্যে নানা জাতির যেই সমস্ত পশু রহিয়াছে উহাদের কোনওটিই ইহার সহিত যুদ্ধে পারিয়া উঠে না। ইহার সম্মুখে পড়িলে উহারা পলাইবার পথ পায় না। ইহা একটি কৌশল আঁটিল। ভাবিয়া দেখিল, দ্রুতগতিসম্পন্ন বন্যপশুর কতকটিকে যদি ইহা জড়ো করিতে পারে, উহাদের উত্তম ও উপযুক্ত খাদ্যের সংস্থান করিতে পারে তাহা হইলে উক্ত প্রাণিসকলের পৃষ্ঠারোহণ করিয়া অবশিষ্ট প্রাণিসমস্তের পশ্চাদ্ধাবন করিতে পারা যাইবে।
উক্ত দ্বীপটিতে বন্য প্রজাতির কতক অশ্ব ছিল। বন্য প্রজাতির কতক গর্দভও ছিল। ইহার পক্ষে উপযুক্ত হইবে এমন কতক পশুকে ইহা সঙ্গে নিল ও উহাদিগকে পোষ মানাইতে চেষ্টা করিল। যতদিন ইহার উদ্দেশ্য চরিতার্থ না হয় ততদিন ইহা এমনটাই করিতে লাগিল। অজিন ও চর্মের ফালি দ্বারা ইহা খলিন ও পর্যাণ তৈরিতে প্রাণান্ত করিল যাহাতে এই সমস্ত ব্যবহার করিয়া বন্যপশুর পশ্চাদ্ধাবন করিতে পারে। এমনটাই করিতে ইহা এই যাবৎ আশা করিয়াছিল। কারণ বন্যপশুর পশ্চাদ্ধাবন করে পাকড়াও করিবার কোনও কৌশল অবলম্বন ইহার জন্য অত্যন্ত দুষ্কর ছিল।
আর প্রাণিসমস্তকে ব্যবচ্ছেদ করিয়া উহাদিগের কোন অঙ্গের কী বৈশিষ্ট্য ও অঙ্গে অঙ্গে পার্থক্যই বা কোথায় তাহার নিরন্তর অনুসন্ধানে বালক যখন লিপ্ত ছিল তখনই উক্ত সমস্ত ব্যাপারে ইহার পূর্ণজ্ঞান অর্জিত হয়। যেই সময়ের কথা আমরা সুনির্দিষ্ট করিয়া বলিতেছি সেই সময়ের মধ্যে ইহার উক্ত কর্ম সম্পাদিত হইয়া গিয়াছে। বালকের বয়স তখন অনধিক একুশ বৎসর।
এত সমস্ত করিবার পর ইহা দৃষ্টিসীমার মধ্যে পড়ে এইরূপ অন্য এক ক্ষেত্রের পানে ধাবিত হইল। সৃষ্টিজগৎ ও ক্ষয়িষ্ণু জগতের সমস্ত বস্তুপিণ্ডের প্রতি ইহা দৃষ্টিপাত করিল। নানা প্রজাতির পশু, উদ্ভিদ, আকরিক, প্রস্তর-মৃত্তিকা-জল-বাষ্প- করক-ধূম্র-অগ্নিশিখা-অঙ্গার ইত্যাদির রূপভেদ ইহা চক্ষু বুলাইয়া এক নজর দেখিয়া লইল। এ সমস্তে ইহা অসামান্য রূপভেদ দেখিল। নানাবিধ কর্মযজ্ঞ, সমধর্মী ও বিপরীতধর্মী গতিবিধি ইহার নজরে পড়িল। সমস্তের প্রতি বালক পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল, সতর্কতার সহিত সেই সমস্ত দেখিতে লাগিল। অনুধাবন করিতে পারিল যে, কতক বৈশিষ্ট্য সমধর্মী, কতক বিপরীতধর্মী। একদিক হইতে তাহাদের পরস্পরের মধ্যে ঐক্য রহিয়াছে, অন্যদিক হইতে তাহাদের মধ্যে অসঙ্গতিও রহিয়াছে। তাহাদের এই বিভিন্নতা সংখ্যায় অপ্রতুল। একবার বস্তুপিণ্ডের বৈশিষ্ট্য অবলোকন করিল বালক। বৈশিষ্ট্যসমূহ যাহার নিমিত্তে পরস্পরকে পরস্পর হইতে বিশিষ্ট করিয়া রাখে তাহাও দেখিল। তাহা এতটাই বহুবিধ যে বালকের নিকট মনে হইল, তাহার প্রকার অনির্ণেয়। তাহার প্রকারভেদতা চতুর্পার্শ্বে এমন করিয়া ব্যাপ্ত হইয়াছে যে তাহা অনিয়ন্ত্রণযোগ্য।
ইহার স্বকীয় সত্তাকেও নিজের কাছে বহুবিধ মনে হইল। কারণ, নিজেকে নিজে যখন দেখিয়া লইত তখন নিজের অঙ্গসংস্থানের বহুবিধতা ইহার নজরে আসিত। দেখিত, প্রতিটি অঙ্গই কর্মে অনন্য, স্বকীয়তায় বিশিষ্ট। প্রতিটি অঙ্গকে ইহা নিরীক্ষণ করিল। দেখিল, প্রতিটি অঙ্গই স্ব স্ব অঙ্গের বহুলাংশে বহুবিধতা ধারণ করিয়া রহিয়াছে। বহুবিধতাই ইহার নিজস্বতায় বিরাজ করিতেছে। এমন করিয়া সকল বস্তুর সত্তায় ইহাই বিরাজমান।
অতঃপর ভিন্ন এক পরিপ্রেক্ষিত হইতে দেখিতে বালক উদ্যমী হইল। ইহা দেখিল, অঙ্গসংস্থানে বহুবিধতা থাকিলেও তাহারা পরস্পর পরস্পরের সহিত বন্ধনে আবদ্ধ। কোনও কারণে তাহারা বিচ্ছিন্ন নহে। এমন করিয়া অঙ্গসকল একের অধীন। তাহাদের কর্মে বিবিধতা থাকিতে পারে। এই বিবিধতা লইয়াই তাহারা একক। পূর্বে বালক যে প্রাণিজ আত্মার অনুসন্ধানে নিবিষ্ট ছিল তাহা হইতে উদ্ভূত শক্তিই অঙ্গসমূহে উপস্থিত হয় ও তন্নিমিত্তে তাহারা বিভিন্নতা প্রদর্শন করিয়া থাকে। ইতঃপূর্বেই বালক এই আত্মাকে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছিল। আর এই আত্মা স্বকীয়তায় একক। ইহাই প্রকৃত সত্তাসার। অবশিষ্ট সমস্ত অঙ্গ ইহার নিকট যন্ত্রের মতো। এমন করিয়া ইহার সত্তাসারও ইহার নিকট একক বলিয়া মনে হইল।
অতঃপর সমস্ত পশুপক্ষীর প্রতি ইহা দৃষ্টিপাত করিল। উহাদিগের প্রতিটিকে ইহার একক বলিয়া মনে হইল।
অতঃপর প্রতিটি প্রকারের প্রতি ইহা দৃষ্টিপাত করিল। অর্থাৎ, হরিণ, অশ্ব, গর্দভ, সমস্ত প্রকারের পক্ষী প্রতিটিকে ইহা এক এক করিয়া দেখিতে লাগিল। ইহা অনুভব করিল, এই প্রকারের প্রতিটি প্রাণির পরস্পরের সহিত পরস্পরের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত উভয় প্রকার অঙ্গের সংস্থানে ঐক্য রহিয়াছে। এমনকি তাহাদের উপলব্ধি করিবার ক্ষমতা, গতি ও সংকল্পেও ঐক্য রহিয়াছে। যে বিপুল বিষয়ে তাহাদিগের মধ্যে ঐক্য রহিয়াছে তাহার সম্মুখে নগণ্য বিষয়ে তাহাদিগের মধ্যে যে মতানৈক্য সেই সমস্তকে ইহা ধর্তব্য মনে করিল না।
ইহা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইল, সমস্ত চাক্ষুষ প্রাণিতে আত্মা নামক যে বস্তুটি রহিয়াছে তাহা অনন্য, একক। বহু প্রাণির হৃৎযন্ত্রে ইহা বিভাজিত হইলেও ইহা দ্বিবিধ নহে। যদি সমস্ত হৃৎযন্ত্রের মধ্যে বিভাজিত এই আত্মাকে একত্র করা সম্ভব হয় ও তাহাকে একটি পাত্রে ধারণ করা যায় তাহা হইলে এই আত্মা একক বস্তু যেমনটা জল ও অন্য পানীয় বস্তুর মধ্যে দেখিতে পাওয়া যায়। জল ও পানীয় বস্তুসকল বিভিন্ন আধারে বণ্টিত হইলেও উহারা একত্র হইয়া যায়। উহারা বিভাজিত ও জমাটবদ্ধ উভয় অবস্থায় একই বস্তু। কিন্তু কোনও কারণে ইহাকে বহুবিধ বলিয়া মনে হয়। এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে সমস্ত প্রজাতিকে ইহার একক বলিয়া মনে হইল এবং নানা জাতির অঙ্গের বহুবিধতার মতোই বহুবিধতায় বিভাজিত প্রজাতি সামগ্রিকভাবে একক। প্রকৃতই উহারা বহুবিধ নহে।
অতঃপর সমস্ত প্রাণিকে ইহা নিজের মনের মধ্যে স্থাপন করিল ও তাহাদিগকে লইয়া ভাবিতে লাগিল। ইহা অনুভব করিল, সংবেদন, পুষ্টিগ্রহণ ও ইচ্ছেমাফিক যে-কোনও প্রান্তে গমন করিবার ক্ষমতা সকলেরই রহিয়াছে। পূর্বেই ইহার নিকট বোধগম্য হইয়াছিল, প্রাণিজ আত্মার কর্মের সহিত এই সমস্ত কর্ম বিশিষ্ট এবং এত সব ঐক্যের পরও পূর্বোক্ত যেই সমস্ত বিষয়ে অঙ্গসমূহ বিভিন্নতা প্রদর্শন করে সেই সমস্ত বিষয় প্রাণিজ আত্মার সহিত সংশ্লিষ্ট নহে।
গভীর চিন্তা করিবার ফলে ইহার নিকট প্রতিভাত হইল, প্রকৃতই সমস্ত প্রজাতির মধ্যে উপস্থিত এই প্রাণিজ আত্মা একক। যৎকিঞ্চিৎ যে পার্থক্য প্রজাতিতে দৃষ্টিগোচর হয় তাহা সংশ্লিষ্ট প্রজাতিতে স্বকীয়। একই জল বিভিন্ন আধারে বণ্টিত হইলেও বণ্টিত বস্তুটি সমবস্তু। আধারের জলে উষ্ণতার তারতম্য ঘটিলেও আধারে স্থাপিত বস্তুটি সমবস্তু। মূল বস্তুটি একই। একই উষ্ণতার জল উক্ত প্রাণিজ আত্মার এক প্রকার বৈশিষ্ট্যকল্প। কোনও কারণে এই জলকে বহুবিধ বলিয়া মনে হয়। এমন দৃষ্টিতে নানা প্রজাতির প্রাণিসকল বালকের নিকট একক বলিয়া মনে হইল।
অতঃপর নানাবিধতায় পরিপূর্ণ উদ্ভিদজগতের প্রতি ইহা দৃষ্টি নিবদ্ধ করিল। দেখিতে পাইল, সমস্ত উদ্ভিদ শাখা-প্রশাখায় বহুল, পত্রল, পুষ্পবান ও ফলবান, বাড়ন্ত। এই সমস্ত বিষয়ে উহাদিগে ঐক্য দেখিতে পাওয়া যায়। বালক উদ্ভিদকে প্রাণিরূপে বিবেচনা করিল। বুঝিতে পারিল, একই সাধারণ বস্তু উহারা সকলে ধারণ করে। প্রাণিসকলে যেমন আত্মা বিরাজ করিতেছে তদ্রƒপ উহাদিগেও কিছু একটা বিরাজমান। আর সেই বস্তু একক।
একইরূপে প্রতিটি উদ্ভিদ প্রজাতির উপর দৃষ্টিপাত করিয়া ইহা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইল যে, উদ্ভিদজগৎ একক। কারণ, পুষ্টিগ্রহণ ও বাড়ন্ত হইবার মতো কতক বৈশিষ্ট্যে ইহাদিগে বালক ঐক্য দেখিত।
অতঃপর ইহা প্রাণিজগৎ ও উদ্ভিদজগৎ লইয়া একসঙ্গে মনের মধ্যে ভাবিতে লাগিল। ভাবিল, পুষ্টিগ্রহণ ও বাড়ন্ত হইবার মতো বৈশিষ্ট্যে প্রাণিজগৎ ও উদ্ভিদজগতে ঐক্য দেখিতে পাওয়া যায়। অবশ্য, অনুভূতি, চেতনা ও চলচ্ছক্তির কথা বিবেচনায় আনিলে প্রাণি উদ্ভিদকে ছাড়াইয়া যায়। হয়তো এতদসংশ্লিষ্ট কার্যাবলি উদ্ভিদজগতের ভেতরেও দেখিতে পাওয়া যায়। উদাহরণত সূর্যের প্রতি ফুল নিজের মুখ ঘুরাইয়া দেয়, বৃক্ষাদির শিকড় স্বীয় খাদ্যের প্রাপ্তিস্থলের দিকে গমন করে ইত্যাদি। এমন করিয়া ভাবিতে বসিয়া বালকের নিকট মনে হইল, উদ্ভিদ ও প্রাণি মূলত একই বস্তু। কারণ, উভয়ে একই সাধারণ বস্তু ধারণ করে যাহা আবার একটিতে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত, অন্যটিতে বাধাপ্রাপ্ত। ঈদৃশ অবস্থা জলের সহিত তুলনীয়। জল জমাটবদ্ধ ও প্রবাহিত হইয়া থাকে। এমন করিয়া ভাবিতে বসিয়া বালকের নিকট উদ্ভিদ ও প্রাণিতে ঐক্য রহিয়াছে বলিয়া মনে হইল।
অতঃপর এমন সমস্ত বস্তুর পানে ইহা দৃষ্টি নিবদ্ধ করিল যেই সমস্ত বস্তু অনুভূতিহীন, পুষ্টিগ্রহণ করে না, বৃদ্ধিপ্রাপ্তও হয় না। প্রস্তর, মৃত্তিকা, জল, বায়ু, অগ্নিশিখা ঈদৃশ বস্তুর অন্তর্গত। বালক দেখিল, এই জাতীয় বস্তুসকলের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধ সুনির্ধারিত রহিয়াছে ও তিনটি মাত্রায় পরস্পরের মধ্যে কোনওরূপ ভিন্নতা দেখিতে পাওয়া যায় না। কেবল ইহাদিগের মধ্যে কতক বর্ণযুক্ত, কতক বর্ণহীন, কতক উষ্ণ, কতক শীতল এইরূপ ভিন্নতা দেখিতে পাওয়া যায়।
বালক দেখিল, ইহাদিগের মধ্যে যাহারা উষ্ণ তাহারা শীতলতা প্রাপ্ত হয়, যাহারা শীতল তাহারা উষ্ণতা প্রাপ্ত হয়, জল বাষ্পে পরিণত হয়, বাষ্প জলে। দগ্ধ বস্তুসকল অঙ্গার, ছাইভস্ম, অগ্নিশিখা ও ধূম্রে রূপান্তরিত হয়। ধূম্র যদি একটি প্রস্তরের স্তম্ভ বাহিয়া ঊর্ধ্বগামী হয় তবে তাহা প্রস্তরের সহিত জমাট বাধিয়া ভূমিস্থ যাবতীয় বস্তুর ন্যায় রূপ ধারণ করে। এমন চিন্তা করিয়া বালকের নিকট মনে হইতে লাগিল, প্রকৃতই উক্ত বস্তুসকল একক এবং কোনও কারণে প্রাণী ও উদ্ভিদ নামক দুটো ভিন্ন জগতের সহিত তাহারা সংশ্লিষ্ট।
অতঃপর উদ্ভিদ ও প্রাণীতে যেই বস্তুটি সাধারণ বালক উহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিল। ইহা ভাবিল, আকাক্সিক্ষত বস্তুটি দৈর্ঘ্য রহিয়াছে, প্রস্থ রহিয়াছে, বেধও রহিয়াছে এইরূপ বস্তুর মতোই তো হইবে। অনুভূতি শক্তি নাই ও পুষ্টি গ্রহণ করে না এইরূপ কোনও বস্তুর মতো বস্তুটি উত্তপ্ত হইবে নতুবা শীতল হইবে। নতুবা কেবল প্রাণী ও উদ্ভিদের অঙ্গ যেইরূপ কার্যাবলি প্রদর্শন করিয়া থাকে বস্তুটির কর্ম তদ্রুপ হইবে না। হয়তো উক্ত কার্যাবলি স্বেচ্ছাবৃত্তীয় নহে, বরঞ্চ তৃতীয় কোনও বস্তু দ্বারা তাহা পরিচালিত হয়। আর যদি অন্য বস্তু দ্বারা এই সমস্ত কার্যাবলি পরিচালিত হয় তাহা হইলে এই অন্য বস্তু পূর্বোক্ত বস্তুর মতো দেখিতে হইবে। আপাতদৃষ্টিতে উক্ত কার্যাবলি উক্ত বস্তু হইতে উদ্ভূত বলিয়া মনে হয়। এই কার্যাবলি হইতে দৃষ্টি সরাইয়া ইহা কেবল সত্তাসারকে বিবেচনা করিয়া দেখিল। ইহার নিকট উক্ত বস্তুকে দেহ বলিয়া মনে হইল যেমন করিয়া অবশিষ্ট বস্তুকে ইহা দেহ বলিয়া মনে করে। এমন করিয়া ভাবিয়া দেখিয়া বালকের নিকট সমস্ত দেহকে একক বলিয়া মনে হইল। দেহসমূহে প্রাণ থাকিতেও পারে, নাও পারে, দেহসমূহ গতিশীল হইতে পারে আবার নিশ্চলও হইতে পারে। তদুপরি দেহসকল একক। কেবল কতক দেহের দেহাংশ হইতে কার্যাবলি প্রদর্শিত হয়। কিন্তু উক্ত কার্যাবলি যে দেহাংশের স্বেচ্ছাবৃত্তীয় নহে, এইরূপ অন্য কোনও বস্তু হইতে দেহাংশের শরণাপন্ন হইয়াছে―তাহা বালকের নিকট অজ্ঞাত রহিল।
এমতাবস্থায় ইহা দেহ ভিন্ন অন্য কিছুই আর দেখত না। এমন করিয়া ইহা সমস্ত অস্তিত্বকে একক বস্তুরূপে ভাবিল। প্রথম দর্শনে অস্তিত্বকে ইহার বহুত্ববাচক মনে হইয়াছিল। মনে হইয়াছিল, এই বহুত্বের কোনও সীমা নেই, সমাপ্তি নেই।
এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া বালক স্থির হইল। অতঃপর ইহা সজীব ও নির্জীব উভয় প্রকার পদার্থ লইয়া ভাবীতে বসিল। একবার ইহার নিকট মনে হইল সমস্ত একক। আরেকবার মনে হইল, এমন বহুত্বে উহারা বিভাজিত যাহার সীমা-পরিসীমা নাই। ইহার মনে হইল, প্রতিটি পদার্থ নিম্নোক্ত দুইটি বৈশিষ্ট্যের একটি প্রদর্শন করিবেই―
জলের তলদেশে অবস্থান করিলে ধূম্র, অগ্নিশিখা ও বায়ু যেইরূপ ঊর্ধ্বমুখিতা প্রদর্শন করে সেইরূপ প্রদর্শন করিবে
নতুবা, এই গতির বিপরীতমুখিতা প্রদর্শন করিবে অর্থাৎ জল, মৃত্তিকাখণ্ড, প্রাণি ও উদ্ভিদাংশ যেইরূপ নিম্নমুখিতা প্রদর্শন করে সেই রূপ নিম্নমুখিতা প্রদর্শন করিবে। উপর্যুক্ত পদার্থসমূহের কোনওটিই উক্ত দুই রকমের গতির যে কোনও একটি হইতে বিমুখ হইবে না। কোনও প্রতিবন্ধক না থাকিলে এই গতি থামিবার নহে। যেমন, পতনশীল প্রস্তরের মতো পদার্থের সম্মুখে কঠিন মৃত্তিকা আসিয়া উপস্থিত হইলে প্রস্তরের পক্ষে মৃত্তিকাকে বিদ্ধ করা অসম্ভব হইয়া দাঁড়ায়। প্রস্তরের গতিতে যাহা প্রতিবন্ধক হইয়া আসে তাহাকে সরাইয়া দিতে পারিলে ইহা গতিতেই পড়িতে থাকিবে। এইজন্য তুমি যদি ইহাকে উত্তোলিত করিতে পারো দেখিবে নিম্নগামী হইয়া পতিত হইবার প্রতি ইহার যে সহজাত প্রবণতা ইহা তাহাই তোমার উপর প্রয়োগ করিতেছে।
একইরূপে ধূম্র যখন ঊর্ধ্বপানে গমন করে তখন শক্ত গুম্বজ ব্যতীত অন্য কিছুই উহার গতিকে রোধ করিতে পারে না। তখন ধূম্র এই দক্ষিণে মোড় নেয় তো এই বামে মোড় নেয়। অতঃপর যদি উক্ত গুম্বজ অপসারিত হয় তাহা হইলে ধূম্র বায়ুকে ছেদ করিতে পারে, ছেদ করিয়া ইহা ঊর্ধ্বপানে গমন করে। কারণ বায়ুর পক্ষে ধূম্রকে অন্তরীণ করিয়া রাখা অসম্ভব।
বালক অনুধাবন করিত, চর্মপেটিকার অভ্যন্তর বায়ুপূর্ণ করিয়া, মুখ দৃঢ়বদ্ধ করিয়া যদি জলের তলে নিমজ্জিত করা হয় তাহা হইলে ইহা ঊর্ধ্বগামী হইতে চাহে, অতল জলে যাহা ইহাকে ধরিয়া রাখিতে চায় তাহার বিপরীতে ইহা অবস্থান লইতে চাহে। ঈদৃশ ইহা করিতেই থাকিবে যতক্ষণ না ইহা বায়ুর অবস্থানে আসিয়া দাঁড়ায়। এমন করিয়া ইহা জলের অতল হইতে বাহির হইয়া আসে। আসিয়া ইহা স্থির হইয়া দাঁড়ায়। পূর্বে ঊর্ধ্বগামিতার যে প্রবণতা ও ঝোঁক দেখিতে পাওয়া যাইত চর্মপেটিকা হইতে তাহা উধাও হইয়া যায়।
উপর্যুক্ত দুই প্রকার গতি ভিন্ন অন্য প্রকার গতি তথা দুই প্রকার প্রবণতা ভিন্ন অন্য প্রবণতা কখনও কোনও বস্তু ধারণ করে কি না―এমন পর্যবেক্ষণে বালক রত হইল। বালকের নিকটে যেই সমস্ত বস্তু রহিয়াছে সেই সমস্তে তাদৃশ পরিলক্ষিত হইল না। কিন্তু ইহা ভিন্ন কিছুর সন্ধানে লিপ্ত হইল। কারণ, বহুবিধতার উদ্ভব যেই সমস্ত বৈশিষ্ট্য হইতে সেই সমস্ত বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত নহে এমন কোনও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পদার্থের প্রকৃতি অনুসন্ধান করিতে বালক মরিয়া হইয়া পড়িল।
যখন এমন অনুসন্ধান ইহার পক্ষে দুঃসাধ্য হইয়া উঠিল তখন যৎসামান্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পদার্থ নিরীক্ষণে ইহা ব্যাপৃত হইল। কিন্তু উক্ত দুই প্রকারের বৈশিষ্ট্য ব্যতীত তৃতীয় কোনও বৈশিষ্ট্য ইহার দৃষ্টিগোচর হইল না। এই দুই প্রকার বৈশিষ্ট্য হইতে গুরুত্ব ও লঘুত্বের ভাব প্রকাশিত হইয়া থাকে। লঘুত্ব ও গুরুত্ব অবলোকন করিয়া ইহা ভাবিল, এই দুই বৈশিষ্ট্যের কারণেই কি পদার্থটি অন্তর্নিহিতরূপে পদার্থ ? নাকি পদার্থরূপতার অতিরিক্ত যে প্রভাব তাহার কারণ এই দুই বৈশিষ্ট্য ? ইহার নিকট মনে হইল, লঘুত্ব ও গুরুত্ব এই দুই বৈশিষ্ট্য পদার্থরূপতার অতিরিক্ত যে প্রভাব তাহার জন্য হইয়া থাকে। কারণ, অন্তর্নিহিতরূপে পদার্থ এমন পদার্থের জন্যই এই দুই বৈশিষ্ট্য দেখিতে পাওয়া যায়। পদার্থ কিন্তু উক্ত বৈশিষ্ট্যদ্বয় নাই এমন পদার্থ দেখিতে পাওয়া যায় না।
এমন কোনও গুরু বস্তু পাওয়া যাইবে না যাহাতে লঘুত্ব বিরাজ করে। একইরূপে লঘু বস্তুতে গুরুত্ব বিরাজ করে এমন বস্তুর সন্ধানও মিলিবে না। পদার্থ দুই রূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই দুই রূপের প্রতিটির পরস্পর হইতে পৃথক প্রভাব বিরাজ করিবে ও পদার্থরূপতার অতিরিক্ত প্রভাব থাকিবে। এইরূপ যদি না হইয়া থাকে তাহা হইলে সকল ক্ষেত্রে বস্তু দুইটি একক বস্তুরূপে বিরাজ করিবে।
বালকের নিকট প্রতিভাত হইল, গুরু হোক কিংবা লঘু হোক উভয় প্রকার বস্তুর প্রকৃতি দুইটি গুণের মিশ্রিত ফল। একটি গুণ উভয় প্রকার বস্তুতে সাধারণ আর সেই গুণ পদার্থরূপতার গুণ। অন্য গুণ এমন যাহা দ্বারা দুইয়ের প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। আর এই অন্য গুণ এক প্রকার বস্তুতে গুরুত্ববোধক ও অন্য প্রকার বস্তুতে লঘুত্ববোধক। সংশ্লিষ্ট এই দুই গুণ পদার্থরূপতার গুণ। অর্থাৎ, এই গুণ এমন গুণ যাহার জন্য এক প্রকার বস্তু ঊর্ধ্বগামী হয় ও অন্য প্রকার বস্তু নিম্নগামী হয়।
অতঃপর নির্জীব ও সজীব উভয় প্রকারের সমস্ত পদার্থের প্রতি বালক দৃষ্টিপাত করিল। দেখিতে পাইল, উভয় প্রকার পদার্থের সত্তার প্রকৃতি যৌগিক অর্থাৎ ইহা পদার্থরূপতার গুণ ও পদার্থরূপতার অতিরিক্ত একটি বা একাধিক গুণের সংমিশ্রণে তৈরি। অতঃপর বালকের নিকট নানাবিধ পদার্থের প্রতিরূপ গোচরীভূত হইল এবং তাতে এই প্রথম বালকের নিকট রুহানি জগৎ প্রতিভাত হইল। কারণ, সংবেদ দিয়া এই সমস্ত প্রতিরূপ অনুধাবন করা যায় না। বরং, ধীশক্তির ব্যবহারে এই সমস্তের সংজ্ঞা জন্মে।
এই সমস্তের মধ্যে সামগ্রিকভাবে যাহা বালকের নিকট প্রতিভাত হইল তাহা হইল প্রাণি-পরমাত্মা। হৃদযন্ত্রই ইহার নিবাসস্থল। প্রথমেই ইহাকে ঘিরিয়া বালক বিশ্লেষণ করিতে প্রবৃত্ত হইল। পদার্থরূপতার অতিরিক্ত একটি গুণ ইহার থাকিবেই যাহা এই গুণের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ, নানা রকমের সংবেদন, নানা রূপের সংজ্ঞান ও নানা প্রকৃতির গতি ইহার সহিত সংশ্লিষ্ট যাহার নিমিত্তে সমস্ত অদ্ভুত কর্ম সম্পাদিত হয়। আর এই গুণের বিশেষ রূপ রহিয়াছে, বিশেষ শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে যাহার দ্বারা অবশিষ্ট সমস্ত পদার্থ হইতে ইহাকে পৃথক করিয়া লওয়া যায়। দার্শনিকরা ইহাকে প্রাণি-আত্মা বলিয়া অভিহিত করেন।
একইরূপে, ঈদৃশ বস্তু রহিয়াছে যাহা উদ্ভিদে প্রাণির স্বতঃস্ফূর্ত উত্তাপকে প্রতিস্থাপিত করে। এই বস্তু উদ্ভিদসংশ্লিষ্ট। দার্শনিকগণ ইহাকে উদ্ভিদাত্মা বলিয়া অভিহিত করেন।
একইরূপে, ইহলৌকিক এই নশ্বর পৃথিবীতে প্রাণি ও উদ্ভিদ ব্যতীত অন্য যেই সমস্ত নির্জীব পদার্থ রহিয়াছে উহাদের সহিত সংশ্লিষ্ট একটি বস্তু রহিয়াছে যাহার নিমিত্তে উহারা বিশেষ বিশেষ কর্ম সম্পাদন করিয়া থাকে। নানা প্রকার গতি, নানা রকমের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অবস্থার সহিত উক্ত কর্ম সংশ্লিষ্ট। আর উক্ত বস্তু উপর্যুক্ত সমস্ত পদার্থের প্রত্যেকটির প্রতিরূপ। ইহাকেই দার্শনিকগণ প্রকৃতি বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।
প্রাণি-পরমাত্মার প্রকৃতি যাহার প্রতি বালকের চিরায়ত অভিনিবেশ কাজ করিত তাহা পদার্থরূপতার গুণ ও পদার্থরূপতার গুণেরও অধিক অন্য একটি গুণের সমন্বয়ে গঠিত। আর এই পদার্থরূপতার গুণ সমস্ত পদার্থে সাধারণরূপে বিরাজমান। আর অতিরিক্ত গুণটি বস্তুসাপেক্ষ, বস্তুর জন্য অনন্য ও একক যাহার নিকট আবার পদার্থরূপতার গুণ তুচ্ছ। গভীরভাবে ভাবিয়া বালক উপর্যুক্ত ধারণার বশবর্তী হইলে পদার্থরূপতাকে প্রত্যাখ্যান করিয়া বসিল এবং দ্বিতীয় গুণটির প্রতি ইহার চিন্তা আলম্বিত হইল। উহাকে সকলে জীবাত্মা বলিয়া থাকেন। উহার বিশ্লেষণে অধিক ইচ্ছুক ছিল বলিয়া তাহাতে বালকের মন নিবিষ্ট হইল। যাবতীয় পদার্থ অবলোকন করিয়া কিসের হেতু উহারা পদার্থ তাহার প্রতি দৃকপাত না করিয়া অবয়বের প্রতি দৃকপাত করিবার দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া বালক স্বীয় পর্যবেক্ষণে রত হইল। কারণ এই অবয়বের রূপ হইতে পদার্থসমূহের বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটিয়া থাকে যাহা পদার্থসমূহকে পরস্পর হইতে পৃথক করিবার জন্য যথেষ্ট।
অতঃপর উক্ত পর্যবেক্ষণে ইহা নিবৃত্ত রহিল এবং মনকে উহাতে নিবদ্ধ করিল। ইহা বুঝিতে পারিল যে, পদার্থসমূহের সামগ্রিক একটি শ্রেণির একটি সাধারণ রূপ রহিয়াছে যাহা হইতে একটি কাজ অথবা কয়েকটি কাজ সম্পাদিত হয়। ইহা আরও বুঝিল, উক্ত শ্রেণির অন্তর্গত একটি দল রহিয়াছে যাহার সহিত সামগ্রিক শ্রেণিটির উক্ত রূপে সঙ্গতি রহিয়াছে। এই রূপের অধিক অন্য একটি রূপ রহিয়াছে যাহা হইতে কয়েকটি কাজ সম্পাদিত হয়। ইহা আরও দেখিতে পাইল, এই দলের আরও একটি উপদল রহিয়াছে যাহার সহিত প্রথম ও দ্বিতীয় রূপটির সঙ্গতি রহিয়াছে। তৃতীয় একটি রূপ উক্ত দুই রূপের অতিরিক্ত দেখিতে পাওয়া যায় যাহা হইতে তৎসংশ্লিষ্ট বিশেষ কর্ম সম্পাদিত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, মৃত্তিকা, প্রস্তরখণ্ড, আকরিক, উদ্ভিদ, প্রাণি ও যাবতীয় গুরুত্ববহ পদার্থসমূহ একটি সামগ্রিক শ্রেণির অন্তর্গত। ইহাদের সকলের একটি সাধারণ রূপ রহিয়াছে যাহার কারণে অবতরণ করিতে কোনওরূপ প্রতিবন্ধকতা না থাকিলে নিম্নগামী গতি প্রদর্শিত হইয়া থাকে। বলপূর্বক ঈদৃশ বস্তুকে ঊর্ধ্বগামী করিতে চাহিলে বলের অপসারণ ঘটিবার সঙ্গে সঙ্গে বস্তুসকল স্বকীয় রূপের বশবর্তী হইয়া নিম্নগামী হয়।
এই সমগ্রের অন্তর্গত প্রাণিজগৎ ও উদ্ভিদজগৎ রহিয়াছে যাহাতে পূর্ববর্ণিত সমগ্রের গুণাবলি এই রূপে সাধারণত বিরাজ করে। এই রূপের অধিক অন্য একটি রূপ ইহাতে যুক্ত হয় যাহা হইতে পুষ্টি ও পরিবৃদ্ধির আবির্ভাব ঘটে।
পুষ্টি বলিতে ইহাই বুঝিব যাহা পুষ্টিগ্রহণকারীর শরীরে স্থলাভিষিক্ত হয় ও শরীর হইতে যাহা নিষ্কাশিত হয় তাহার পরিবর্তে শরীরের নিকট অধিকতর পাচ্য কোনও সমজাতীয় দ্রব্যে ইহাকে রূপান্তরিত করে ও নিজের মধ্যে ইহাকে গ্রহণ করিয়া লয়।
পরিবৃদ্ধি বলিতে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্ব বরাবর নির্দিষ্ট অনুপাতের ত্রিমাত্রিক বর্ধন বা গতি বুঝিব।
এই দুইটি কর্ম উদ্ভিদ ও প্রাণিতে সাধারণত বিরাজ করিতেছে এবং দুইয়ের সাধারণ রূপ হইতে উক্ত কর্মদ্বয় অনিবার্যত উৎসারিত হইতেছে। এই সাধারণ রূপ উদ্ভিজ্জ জীবাত্মা হিসেবে অভিহিত হয়।
এই জগতেরই অন্তর্গত একটি অংশ শ্রেণি যাহা বিশেষত প্রাণি। পূর্বোক্ত জগতের সহিত ইহার প্রথম ও দ্বিতীয় রূপে ঐক্য থাকিলেও ইহাতে তৃতীয় অতিরিক্ত একটি রূপ যুক্ত হইয়াছে যাহা হইতে অনুভূতিশক্তি ও যত্রতত্র গমন করিবার চলৎচ্ছক্তি উৎসারিত হয়।
প্রাণির সমস্ত প্রকারকে পর্যবেক্ষণ করিয়া ইহা দেখিতে পাইল, প্রাণিতে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে যাহাদের জন্য উহাদিগের পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য দেখিতে পাওয়া যায় আর এই পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্যসমূহ সমস্ত প্রকার হইতে ইহাকে বিশিষ্ট করিয়া রাখে। বালক পূর্বেই জ্ঞাত হইয়াছিল, এমন একটি রূপ হইতে এই পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্যের সূচনা ঘটে যে রূপটি প্রাণিটিতে অনন্য এবং ঐ প্রাণিসহ সমস্ত প্রাণিতে যে সাধারণ গুণের স্ফূরণ দেখিতে পাওয়া যায় তাহার অতিরিক্ত। একই কথা উদ্ভিদজগতের ক্ষেত্রে বলিলেও তাহা যথার্থ হইবে।
ইহার নিকট প্রতিভাত হইয়াছিল, ইহলৌকিক এই নশ্বর পৃথিবীতে যত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পদার্থ রহিয়াছে উহাদের কয়েকটির সত্তাসার পদার্থরূপতার অতিরিক্ত অধিকসংখ্যক রূপের সহিত মিলিত হয়, কয়েকটিতে স্বল্পসংখ্যক রূপের সহিত মিলিত হয়। বালক বুঝিতে পারিল, অধিকসংখ্যক রূপের চাইতে স্বল্পসংখ্যক রূপের বিষয়ে অনায়াসে জ্ঞাত হওয়া যায়। অতএব, স্বল্পসংখ্যক রূপের সহিত যেই কয়েকটির সত্তাসার মিলিত হয় সেই কয়েকটি বস্তুর রূপের প্রকৃতি বুঝিতে বালক প্রথমত সচেষ্ট হইল। এবং বালক দেখিতে পাইল, উদ্ভিদ ও প্রাণি দুইয়ের সত্তাসারে বহুসংখ্যক রূপ আসিয়া সমবেত হয়, কারণ উহাদের পরস্পরের কার্যাবিধি বহুবিধ। অতএব, এই দুইয়ের রূপকল্পের অনুসন্ধানে বালকের বিলম্ব ঘটিল।
একইভাবে, মৃত্তিকার নানা অংশ পর্যবেক্ষণ করিয়া ইহার মনে হইল, এই সমস্ত পরস্পর হইতে সরল। এই কথা ভাবিয়া ইহা ইহার পক্ষে সম্ভব সরলতম অংশ লইয়া অনুসন্ধান করিতে ইচ্ছা করিল। একইভাবে ইহা প্রত্যক্ষ করিল, জলের গঠন অত জটিল নহে। জলের কার্যাবলি হইতে যেমন রূপকল্প দেখিতে পাওয়া যায় তাহা হইতে বালকের মনে এমন ধারণা জন্মিল। অগ্নি ও বায়ুকেও বালকের তাদৃশ মনে হইল।
প্রথমেই বালক ভাবিয়া নিষ্পন্ন করিয়াছিল যে, উপর্যুক্ত চারিটি বস্তুর একটি হইতে অন্যটিতে রূপান্তর ঘটিয়া থাকে। কিন্তু একটি বস্তু উহাদের চারিটিতে দেখিতে পাওয়া যায়। আর সেইটি হইল পদার্থরূপতার ধর্ম। যেই সমস্ত ধর্মের কারণে উক্ত চারিটি বস্তু পরস্পর হইতে বিশিষ্ট হইয়া থাকে সেই সমস্ত ধর্ম হইতে পদার্থরূপতার ধর্ম মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। পদার্থরূপতার এই ধর্ম ঊর্ধ্বে গমন করিতেছে, নিম্নগামী হইতেছে, উত্তপ্ত হইতেছে, শীতল হইতেছে, সিক্ত হইতেছে কিংবা শুষ্ক হইতেছে―এইরূপ কোনওটিই সম্ভব নহে। কারণ, উক্ত বৈশিষ্ট্যাবলির কোনওটিই সমস্ত বস্তুতে সাধারণভাবে বিরাজ করে না। সুতরাং পদার্থ যেই নিমিত্তে পদার্থ এইসমস্ত বৈশিষ্ট্য তাহা নহে।
অতএব যদি এমন কোনও পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায় যাহাতে পদার্থরূপতার অতিরিক্ত কোনও রূপ সংযুক্ত হয় নাই তাহা হইলে উক্ত গুণাবলির কোনও গুণ উহাতে থাকিবে এমনটা সম্ভব নহে এবং উহাতে এমন কোনও গুণাবলি থাকিতে পারে না যাহা রূপের বহুবিধতায় যাবতীয় কল্পিত বস্তুসমূহে বিরাজ করিবে।
অতঃপর বালক জীবিত ও স্থবির যাবতীয় পদার্থে সাধারণ রূপে বিরাজ করিতেছে এমন যে-কোনও একটি গুণের অনুসন্ধানে নিয়োজিত হইল। সমস্ত পদার্থে অস্তিত্বশীল বিস্তারের গুণ ব্যতীত আর কোনও গুণই বালক দেখিতে পাইল না। আর এই বিস্তারের গুণ ত্রিমাত্রিক। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্ব নামে ইহাকে অভিহিত করা হইয়াছে। অতঃপর বালক অনুধাবন করিল, পদার্থ যেই নিমিত্তে পদার্থ তাহা এই গুণটি। কিন্তু কেবল এই গুণটিই রহিয়াছে এবং অখণ্ডরূপে সমস্ত রূপকল্প হইতে মুক্ত এমন কোনও পদার্থের সন্ধান মিলিল না। কারণ, উল্লিখিত বিস্তারের গুণের অতিরিক্ত কিছু না-কিছু গুণ প্রতিটি পদার্থের সহিত বিরাজমান।
ইহার পর বালক চিন্তায় মগ্ন হইল, ত্রিমাত্রিক এই বিস্তার আর পদার্থের গুণ কি তবে একই বস্তু ? না অন্য কিছু ? না তাহা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু একটা ? অতঃপর ইহা প্রত্যক্ষ করিল, এই বিস্তারের পশ্চাতে যাহা রহিয়াছে তাহা ভিন্ন কিছু, তাহাতে এই বিস্তারকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। এই বিস্তার অনন্য। নিজের সহিত ইহা থাকিতে পারে না, যেভাবে বিস্তারিত হইয়াছে এমন বস্তু বিস্তারগুণ ব্যতীত থাকিতে পারে না।
মৃত্তিকার মতো রূপকল্পধারী ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কয়েকটি বস্তুকে ইহা পর্যবেক্ষণ করিল। অতঃপর ইহা বুঝিতে পারিল, গোলকের মতো দেখিতে এমন কিছু একটা যদি এই মৃত্তিকা হইতে তৈয়ার করা হয় তাহা হইলে উক্ত বস্তুর যথাসম্ভব দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্ব থাকিবে। অতঃপর একই গোলক লইয়া উহাকে ত্রিমাত্রিক অথবা ডিম্বাকৃতির কোনও বস্তুতে রূপান্তর করিলে উক্ত দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্বের পরিবর্তন সাধিত হইবে এবং উহা অন্য রূপ দেখিতে এমন বস্তুতে পরিবর্তিত হইবে। কিন্তু মৃত্তিকা যেইরূপ পূর্বে ছিল তেমনটাই থাকিবে। কোনও পরিবর্তন ঘটিবে না। কেবল দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্ব বলিয়া কিছু একটা ইহার থাকিতে হইবে। এই ত্রিমাত্রাকে নতুন করিয়া প্রস্তুতকৃত বস্তু হইতে পৃথক করা যাইবে না। আনুক্রমিক পরিবর্তন সাধন করা যাইবে মাত্র। ইহা হইতে বালকের নিকট মনে হইল, তাহার সম্মুখে যাহা দেখিতে পাইতেছে তাহাই রূপতা যাহা সর্বোপরি মৃত্তিকা হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না। অতএব বালকের মনে হইল, ইহাই তাহার উদ্দিষ্ট মৃত্তিকার সত্তাসার।
উক্ত পর্যবেক্ষণ হইতে বালকের মনে হইতে লাগিল, পদার্থ যাহার নিমিত্তে পদার্থরূপে বিবেচিত তাহা প্রকৃতপক্ষে দুইটি রূপতার সমষ্টি: প্রথমটি, উল্লিখিত উদাহরণে যাহার নিমিত্তে মৃত্তিকা হইতে গোলক প্রস্তুত করা সম্ভব হয়; দ্বিতীয়টি, যাহার নিমিত্তে গোলকটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্ব তথা ত্রিমাত্রিকতা তথা অবয়ব প্রাপ্তি ঘটে।
এই দুই অবিচ্ছেদ্য রূপতার সমষ্টি ব্যতীত অন্য কিছু পদার্থ নহে―ইহা এমনটাই বুঝিল।
কিন্তু যাহার নিমিত্তে পদার্থে পরিবর্তন সাধিত হয় ও বহুবিধ মুরতিতে পদার্থের আনুক্রমিক পরিবর্তন ঘটিতে থাকে তাহা অর্থাৎ বিস্তারের রূপতা রূপকল্পধারী সমস্ত পদার্থে রূপধারণ সম্ভব করিয়া তোলে। তাহা একই অবস্থানে স্থির হয় ও পূর্বের উপমায় উল্লিখিত মৃত্তিকাসদৃশ হয়। তাহা রূপকল্পধারী সমস্ত পদার্থের পদার্থরূপতার প্রতিনিধিত্ব করে।
মৃত্তিকাসদৃশ বস্তুটি যাহার কথা উপমায় বলা হইয়াছে তাহাকে দার্শনিকগণ মূলবস্তু مادة তথা সত্তাসার বলিয়া নামকরণ করিয়াছেন। ইহা সম্পূর্ণরূপে রূপবিহীন হইয়া থাকে।
বালকের অনুধ্যান যখন এহেন পরিস্থিতিতে আসিয়া পড়িল ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হইতে কিয়ৎ ভিন্নতা ইহার দৃষ্টিগোচর হইল এবং বৌদ্ধিক জগতের সরহদ্দ ইহা অবলোকন করিল তখন ইহার একাকিত্ব অনুভূত হইল ও ভবজগতের যেই সমস্ত বস্তুর প্রতি ইহার অনুরাগ ছিল সেই সমস্ত বস্তুর জন্য মন কেমন করিয়া উঠিল। অতঃপর ইহা চিন্তা হইতে কিছুটা পিছু হটিল ও সর্বোপরি বিমূর্ত বস্তু হইতে দৃষ্টি ফিরাইয়া লইল। যদি এমন কিছুর অস্তিত্ব থাকে তবু ইহার অনুভব তাহা বুঝিবে না ও তাহাকে ধরিবে এমন সাধ্যও ইহার নাই।
এই পর্যন্ত বালক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর মধ্যে সব চাইতে সরল যেগুলিকে মনে করিয়াছে সেগুলি বিবেচনায় আনিল। চারটি বস্তুকে ইহার সরলতম বলিয়া মনে হইত।
প্রথমত, জলের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলে ইহা দেখিতে পাইত যে, জল যেইরূপ থাকিতে চাহে সেইরূপে ইহাকে রাখা হইলে ইহা হইতে শীতলতা অনুভূত হইত এবং ইহা নিম্নগামী হইতে চাহিত। অগ্নির প্রজ্বলনে অথবা সূর্যালোকে ইহাকে উত্তপ্ত করা হইলে শুরুতে ইহার শীতলতা দূরীভূত হইত, কিন্তু নিম্নগামী হইবার যে প্রবণতা তাহা ইহাতে রহিয়া যাইত। জলকে মাত্রাধিক উত্তপ্ত করা হইলে নিম্নগামী হইবার ইহার যে প্রবণতা তাহাও দূরীভূত হইত এবং তখন ইহা ঊর্ধ্বগামী হইতে চাহিত। সর্বোপরি, যে দুইটি গুণ জল হইতে ও জলের রূপ হইতে সর্বদা জাহির হইত তাহারা দূরীভূত হইয়া গেল। পানির রূপ হইতে উক্ত কার্যদ্বয়ের অধিক কিছু ইহার জ্ঞাত ছিল না।
যখন উক্ত কার্যদ্বয় রহিত হইয়া যাইত উহাদের রূপের প্রভাবও আর দেখিতে পাওয়া যাইত না। অতএব, জলময় রূপ ঐ বস্তু হইতে বিলীন হইয়া যাইত। অন্য রূপে রূপান্তরিত হইবার পর ইহার নতুন অবস্থা হইতে কার্যাবলি জাহির হইতে লাগিল ও অদৃষ্টপূর্ব রূপ ইহা প্রদর্শন করিতে লাগিল। ইহার প্রথম যে রূপ ছিল ও প্রথম যেইরূপ কার্যাবলি ইহা প্রদর্শন করিয়াছিল তাহা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ও তদরূপের কার্য ইহা প্রদর্শন করিত বলিয়া অদৃষ্টপূর্ব বলিতেছি। সুতরাং বালক বুঝিতে পারিল, সমস্ত সৃজিত বস্তুর একজন না-একজন সৃজনকারী থাকিবেই। এমন করিয়া ভাবিয়া বালকের মনে উক্ত রূপটির নির্মাতা থাকিবার অস্পষ্ট ও সাধারণ ভাবনা উদয় হইল।
অতঃপর পূর্বে যেই সমস্ত রূপকে বালক চিনিত সেইসমস্তকে একটি একটি করিয়া নিরীক্ষণ করিল। দেখিল যখনই কিছু একটা তৈয়ার হইয়াছে তাহার পশ্চাতে কোনও না-কোনও কার্যকারণ ছিল।
অতঃপর ইহা রূপের সারাংশের প্রতি মনোনিবেশ করিল। ইহা দেখিল যে, সমস্ত পদার্থের একটি স্বকীয় প্রবণতা রহিয়াছে যাহা হইতে ইহাদের কার্যাবলি জাহির হইতে থাকে। জলের প্রসঙ্গ এতদস্থলে বক্তব্য। যখন জল অত্যধিক উত্তপ্ত হইত তখন ইহার গতি ঊর্ধ্বমুখী হইত ও জল সেই গতির সহিত সামঞ্জস্য বজায় রাখিত। আর এই স্বকীয় প্রবণতাই ইহার রূপ। কারণ, ইহা কেবলই একটি পদার্থ এবং পদার্থটিতে পূর্বে ছিল না কিন্তু ইহা হইতে এখন অনুভূত হইতেছে এমন কতিপয় বস্তু রহিয়াছে। অতএব, কতক গতি ব্যতীত অবিশিষ্ট কতিপয় গতির সহিত পদার্থের সামঞ্জস্যতাই ইহার স্বরূপের প্রবণতা। সমস্ত রূপের মধ্যে ইহা একই জিনিস দেখিতে পাইল। সুতরাং ইহার নিকট স্পষ্ট হইল যে, সমস্ত রূপ হইতে যে কার্যাবলি জাহির হয় আদতে সেই সমস্ত উহাদের নহে বরং সেই সমস্ত কার্য কার্যকারণের যাহা নিজেদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কার্য সাধন করিয়া থাকে। এমনটাই ইহার মনে হইল। আল্লাহর নবী (স.) তো বলিয়াছেন : ‘আমিই কর্ণ যাহা দ্বারা সে শ্রবণ করে, আমিই চক্ষু যাহা দ্বারা সে দর্শন করে।’ আর আল্লাহর কিতাবে স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে : ‘তোমরা তাহাদিগকে হত্যা করোনি বরং আল্লাহই তাহাদিগকে হত্যা করিয়াছেন। আর তুমি নিক্ষেপ করনি। যখন তুমি নিক্ষেপ করিয়াছিলে তখন আদতে আল্লাহই তাহা নিক্ষেপ করিয়াছিলেন।’
এই কার্যকারণের ব্যাপারটা যখন ইহার মনের মধ্যে আসিয়া পড়িল ও ইহা একপ্রকার ভাবিয়া বসিল যে, মোটের উপর এইরকম কিছু একটা থাকিতে পারে তখন সবিস্তারে তাহা জানিবার জন্য ইহা উৎসুক হইয়া পড়িল। যেহেতু ইহা এখনও অনুভবের জগৎকে নিজের হইতে আলাহিদা করিতে পারে নাই সেহেতু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর ভেতরে ইহা কার্যকারণের অনুসন্ধানে লিপ্ত হইয়া গেল। ইহার নিকট তখনও অজ্ঞাত ছিল যে, এই কার্যকারণ একক কোনও সত্তা, না বহুবিধ ? যেই সমস্ত পদার্থ লইয়া সর্বদা যুবকের মন পড়িয়া থাকিত সন্নিকটস্থ সেই সমস্ত পদার্থকে অনুপুঙ্খভাবে নিরীক্ষণ করিয়া ইহা বুঝিতে পারিল, পদার্থসমূহ একবার সৃষ্টি হয় তো অন্যবার ধ্বংস হইয়া যায়। আর যদি কোনও বস্তুর সামগ্রিক ধ্বংস সাধিত না হয় তাহা হইলে জল ও মৃত্তিকার মতো ইহাদের পার্শ্বিক ধ্বংস সাধিত হয়। যুবক দেখিল যে, জল ও মৃত্তিকার অংশসমূহ অগ্নিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এবং বায়ুর ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটিয়া থাকে। কারণ ইহা দেখিয়াছিল যে, বায়ু অত্যধিক শীতলতায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়; ইহা হইতে হিমানী উৎপন্ন হয় ও পরবর্তী পর্যায়ে হিমানী হইতে জলের ধারাপাত ঘটে।
এমন করিয়া ইহা ইহার সন্নিকটের অবশিষ্ট যাবতীয় পদার্থকে নিরীক্ষণ করিল। মনোনীত কার্যকারণের প্রতি নির্ভরশীল ও নতুন কিছু তৈরি হইতে পারে―এমন তুচ্ছ কিছুও যুবক দেখিতে পাইল না। সুতরাং এ সমস্ত কিছু লইয়া চিন্তা পরিত্যাগ করিল। অমর্ত্যলোকের পদার্থের প্রতি চিন্তা ধাবিত হইল।
এমন করিয়া যুবক তাহার উৎপত্তির পর জীবনের চার সপ্তমাংশ অতিক্রম করিলে তাহার বিচার-বুদ্ধি এমত স্থানে আসিয়া উপনীত হইল। অর্থাৎ, যুবক অষ্টাবিংশতি বয়ঃক্রম প্রাপ্ত হইল এবং জানিতে পারিল যে, খগোল ও তন্মধ্যে যাহা রহিয়াছে সমস্ত কিছুই পদার্থরূপে বিবেচ্য। কারণ, তাহারা ত্রিমাত্রিক: দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধ রহিয়াছে তাহাদের এবং এই বস্তুসমূহ হইতে উক্ত ত্রিবিধ গুণকে আলাহিদা করা যায় না। এবং যেই সমস্ত কিছু হইতে এই ত্রিবিধ গুণকে আলাহিদা করা যায় না তাহারাই পদার্থ। এই নিমিত্তে উপর্যুক্ত বস্তুসমূহ পদার্থ বলিয়া বিবেচ্য।
উপর্যুক্ত বস্তুসমূহ কি অসীম পর্যন্ত বিস্তারিত ? সর্বদা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-বেধ বরাবর অনন্তে গমনশীল ? না, এমন সীমাবদ্ধ পরিসরে ইহারা বদ্ধ যে সে সীমায় ইহাদের অন্ত ঘটে ও ইহাদের পশ্চাতে আর কোনও প্রসারণ সম্ভব নহে―যুবক ইহা ভাবিতে বসিল। ভাবিতে ভাবিতে ইহা হতবাক হইয়া গেল।
অতঃপর যুবকের চিন্তাক্ষমতার বলে ও বিচক্ষণতার চমৎকারিত্বে ইহা অনুধাবন করিল যে, অসীম-অনন্ত পদার্থের চিন্তা অযৌক্তিক-উদ্ভট ও অসম্ভব এবং বোধগম্য কোনও অর্থ ইহার নাই। ইহার এইরূপ বিবেচনা নিজের মধ্যে উদীয়মান অনেক প্রমাণের কারণে বদ্ধমূল হইল। ইহা বলিতে লাগিল : আমার সন্নিকটস্থ প্রান্তে খগোলীয় পদার্থসমূহ সমাপ্ত হইয়াছে ও তাহা আমার দৃষ্টিগোচর হইয়াছে। যেহেতু আমি চাক্ষুষ উপলব্ধি করিয়াছি সেহেতু উক্ত ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহের অবকাশ রহিল না। কিন্তু এই প্রান্তের বিপরীতে অন্য যেই প্রান্তটি রহিয়াছে যাহা আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক করিয়াছিল সেই প্রান্তটিও অসীমে বিস্তারিত হইবে―এমনটা অসম্ভব। আর এ কথাও আমার জ্ঞাত রহিয়াছে। কারণ পদার্থের বিস্তরণের সূত্র মোতাবেক অনন্ত হইতে দুইটি রেখা যাত্রা করিয়া পদার্থটির অভ্যন্তর দিয়া বিপরীত দিকের অনন্তের পানে চলিয়া যায়―এইরূপ দুইটি রেখার কথা আমি ভাবিয়াছিলাম। আমি আরও ভাবিয়াছিলাম যে, উক্ত রেখাদ্বয়ের একটি হইতে অনন্তের পানে বিস্তারমান একটি বৃহৎ অংশ যদি কর্তন করা হয় তাহা হইলে অবশিষ্ট একটি অংশ থাকিবে। কর্তিত অংশটিকে যদি অকর্তিত রেখার সহিত সমান্তরালে স্থাপন করা হয় ও স্থাপন করিয়া আমরা তথাকথিত অনন্তের পানে উক্ত রেখাদ্বয়কে অবলোকন করিতে থাকি তাহা হইলে আমরা দেখিতে পাইব যে, হয় অনন্তের পানে উক্ত রেখাদ্বয় সর্বদা প্রসারমান এবং একটি অপরটি হইতে সংক্ষিপ্ত নহে। অতএব কর্তিত অংশটি অকর্তিত অংশটির সহিত দৈর্ঘ্যে সমান হইবে এমন চিন্তা অযৌক্তিক। একইভাবে, সমস্তটি খণ্ডিতাংশের সমান―এমন চিন্তাও অযৌক্তিক।
নতুবা আমরা দেখিতে পাইব যে, কর্তিত অংশটুকু আস্ত রেখাটির সহিত সর্বদা অনন্তে বিস্তরমান নহে বরং ইহাতে যতিপতন ঘটে ও ইহা স্বীয় বিস্তারের এক স্থানে আসিয়া থামিয়া যায়; অর্থাৎ, ইহা সসীম। প্রথমে যেই অংশটিকে ইহা হইতে কর্তিত করা হইয়াছিল সেই সসীম অংশটিকে যদি ফিরিয়ে আনা হয় তাহা হইলে নতুন আস্ত যেই রেখাটি গঠিত হইবে তাহাও সসীম হইবে। তখন আসিয়া ইহা এমন হইবে যে, অকর্তিত রেখাটি হইতে নতুন গঠিত রেখাটি সংক্ষিপ্তও হইবে না, আবার উহাকে অতিক্রম করিয়াও যাইবে না। অর্থাৎ, উহারা বরাবর হইবে। সুতরাং, নতুন গঠিত রেখাটি যেহেতু সসীম অপরটিও সসীম হইবেক। অতএব, যেই পদার্থে এমন অসংখ্য রেখা কল্পনা টানা হয় সেই পদার্থ সসীম হইবে। আর যেই সমস্ত পদার্থে এমন রেখা টানিতে পারা যায় সেই সমস্ত পদার্থ সসীম হইবে।
সুতরাং আমরা যদি অসীম বস্তুর কল্পনা করি তাহা হইলে বলিব যে, আমরা উদ্ভট ও অমূলক চিন্তাই করিতেছি।
উন্নত সহজপ্রবৃত্তি ছিল বলিয়া এবং সেই সহজপ্রবৃত্তি যুবকের নিকটে এমন প্রমাণগুলো হাজির করিয়াছিল বলিয়া ইহার মনে বদ্ধমূল হয় যে, খগোলকীয় বস্তুসমূহ সসীম। অতএব ইহা খগোলকীয় বস্তুসমূহ দেখিতে কীরূপ ও যেই তলসমূহ উক্ত বস্তুসমূহকে সীমাবদ্ধ করিয়া রাখে উহাদের প্রকৃতি জানিতে আগ্রহী হইল।
সুতরাং ইহা প্রথমে সূর্যের প্রতি নজর করিল। চন্দ্র ও সমস্ত নক্ষত্রের প্রতি নজর করিল। দেখিতে পাইল যে, ইহাদের সমস্তই পূর্ব দিগন্ত হইতে উদিত হয় ও পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যায়। খমধ্য অবস্থানে যেই সমস্ত বস্তুকে যাতায়াত করিতে দেখিতে পাওয়া যায় যুবক দেখিল তাহাদিগের মধ্যে একটি বৃহৎ বলয় রহিয়াছে। খমধ্য অবস্থান হইতে দক্ষিণে বা উত্তরে সরিয়া আসিলে ইহা বৃহৎ বলয় হইতে একটি ক্ষুদ্রতর বলয় দেখিল। খমধ্য অবস্থান হইতে দুই দিকের কোনও দূরবর্তী অবস্থানে যেই সমস্ত বলয় ইহা দেখিতে পাইল সেই সমস্ত বলয় দেখিতে নিকটবর্তী বলয়সমূহ হইতে ক্ষুদ্রতর ছিল। এমনকি, নক্ষত্রসমূহ যেই সমস্ত বলয়কে কেন্দ্র করিয়া ঘুরিত তাহারা সংখ্যায় দ্বিবিধ: একটি দক্ষিণ মেরুর দিকে ও অপরটি উত্তর মেরুর দিকে। দক্ষিণ মেরুর দিকে যাহা অবস্থিত তাহা অগস্ত্য নক্ষত্রের কক্ষপথ ও উত্তর মেরুর দিকে যাহা অবস্থিত তাহা আল-ফরিকাদানের কক্ষপথ।
যেহেতু পূর্বেই আমরা আলোচনা করিয়াছি যে, যুবকের অবস্থান বিষুবীয় অঞ্চলে, সেহেতু উক্ত সমস্ত বলয়ই দিগন্ততলের উপর উল্লম্বভাবে অবস্থান করিত।
দক্ষিণের মেরু ও উত্তরের মেরু উভয়ই যুবকের নিকট একই রকম মনে হইল। ইহা আরও দেখিতে পাইল যে, বৃহৎ বলয়ে যদি কোনও নক্ষত্রের উদয় ঘটিত তাহা হইলে ক্ষুদ্র বলয়েও অপর একটি নক্ষত্রের উদয় ঘটিত। নক্ষত্রদ্বয় একত্রে উদিত হইত। সুতরাং উহারা একত্রে অস্তগত হইত বলিয়া যুবক দেখিত।
সমস্ত নক্ষত্রে ইহা সমস্ত সময় ধরিয়া এমনটাই ঘটিতে দেখিল। সুতরাং ইহার মনে বদ্ধমূল হইল যে, নভোমণ্ডল দেখিতে বর্তুলাকার। পশ্চিম দিগন্তে অস্তগমন করিবার পর পূর্ব দিগন্ত হইতে চন্দ্র-সূর্য ও সমস্ত নক্ষত্রের পুনরায় উদিত হইবার ঘটনা দেখিত বলিয়া ইহার এই ধারণা দৃঢ়তর হইল। ইহা আরও দেখিত যে, উদয়-মধ্যগগনে অবস্থান-অস্তগমন―এই তিন অবস্থানে উক্ত বস্তুসমূহ দেখিতে একই আকৃতির। যদি ইহাদের গতি বর্তুলাকার না হইত তাহা হইলে কদাপি ইহারা অন্য বস্তুসমূহ হইতে যুবকের চক্ষুর নিকটতর মনে হইত। আর যদি এইরূপ হইত তাহা হইলে ইহাদের আকার-আকৃতি দৃশ্যকল্পে ভিন্ন ভিন্ন রূপ হইত। নিকটে থাকিলে সে সমস্তকে ইহা বৃহত্তর দেখিত, দূরে সরিয়া গেলে ক্ষুদ্রতর দেখিত। যুবকের অবস্থান হইতে ইহাদের দূরত্বের ভিন্নতার জন্য এমনটা হইত। যেহেতু এমনটা হয় না তাহার নিকট প্রতীয়মান হইল যে, নভোমণ্ডল দেখিতে বর্তুলাকার।
চন্দ্রের গতি ইহা পর্যবেক্ষণ করিয়া দেখিল যে, চন্দ্র পশ্চিম হইতে পূর্বে গমনশীল। গ্রহের গতিও ইহা তদ্রƒপ দেখিতে পাইল। এমন করিয়া যুবক খগোলবিদ্যার অনেকখানি বুঝিতে পারিল। ইহার নিকট এমন ভাবনা সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল যে, অসংখ্য কক্ষপথে ইহাদের গতি এবং সমস্ত মিলিয়ে একটি সর্বোচ্চ কক্ষপথে ইহারা সংশ্লিষ্ট। এই সর্বোচ্চ কক্ষপথ সমস্ত বস্তুকে পূর্ব হইতে পশ্চিমে দিবারাত্রি আবর্তিত করিতেছে। অবস্থার এই পরিবর্তন ও এই জ্ঞানের ব্যাখ্যা সুদূরপ্রসারিত। পুস্তকে তাহা বর্ণিত হইয়াছে এবং তাহার যতটুকু আমরা এ স্থলে বলিয়াছি ততটুকুই আমাদের উদ্দেশ্যের জন্য যথেষ্ট হইবেক।
যখন যুবক এইরূপ জ্ঞানের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হইল ইহা বুঝিতে পারিল যে, নভোমণ্ডল সামগ্রিকভাবে ও ইহাতে যাহা রহিয়াছে সেই সমস্ত সমেত পরস্পর পরস্পরের সহিত সংশ্লিষ্ট একক বস্তুর মতো এবং প্রথমে ইহা যেই সমস্ত বস্তুকে মৃত্তিকা, জল, বায়ু, উদ্ভিদ, প্রাণী মনে করিত ও সেই সমস্ত নিজেদের অভ্যন্তরে যাহা ধারণ করিত ও যাহা ইহাদের বহিস্থ ছিল না সেই সমস্ত একটি একটি করিয়া ইহার প্রাণি মনে হইতে লাগিল। ইহাদের অভ্যন্তরে উজ্জ্বল নক্ষত্রসমূহ প্রাণির সংবেদনশীলতার মতো, ইহাতে পরস্পর পরস্পরের সহিত সংশ্লিষ্ট নানা মণ্ডল প্রাণির প্রত্যঙ্গের মতো এবং নশ্বর ব্রহ্মাণ্ডের অভ্যন্তরে যাহা রহিয়াছে তাহা প্রাণির উদরবৎ যাহাতে বর্জ্য ও জলীয় পদার্থ রহিয়াছে। সর্বদা যেমন করিয়া প্রাণির অভ্যন্তরে এ সমস্ত তৈরি হয় তেমন করিয়া সীমাহারা বিপুল ব্রহ্মাণ্ডেও এ সমস্ত তৈরি হয়।
যখন যুবকের নিকট মনে হইল যে, বাস্তবে এ সমস্ত কিছুই একক কিছুর মতো এবং ইহার দৃষ্টিতে যেমন করিয়া ইতঃপূর্বে নশ্বর পৃথিবীর নানা পদার্থ একীভূত হইয়াছিল তেমন করিয়া যখন ইহার সমস্ত অংশ একীভূত হইয়াছে তখন ইহা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লইয়া একক চিন্তায় নিমগ্ন হইল: আচ্ছা, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কি এমন কিছু যাহা পূর্বে ছিল না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবির্ভূত হয়েছে এবং নাস্তি হইতে অস্তিতে পর্যবসিত হয়েছে ? নাকি এমন কিছু যাহার অস্তিত্ব পূর্বেও ছিল এবং কোনও না-কোনও কারণে নাস্তি হইতে তাহা পর্যবসিত হয়নি। এমন চিন্তার দোলাচলে ইহা উপর্যুক্ত কোনও একটি ভাবনাকে অপরটির উপর প্রভাবশালী হিসেবে স্থাপন করিতে পারিল না।
সুপ্রাচীন কাল হইতে ইহার অস্তিত্ব রহিয়াছে এমন কিছুতে যখন যুবক দৃঢ়চিত্ত হইল তখন বহু বিরোধী আপত্তি আসিয়া যুবকের চিন্তার গতি রোধ করিল। কারণ, পূর্বে যেইরূপে পদার্থের অস্তিত্বের অসীমতা ইহার নিকট অসম্ভব ছিল সেইরূপে ব্রহ্মাণ্ডের অসীম অস্তিত্বও ইহার নিকট অসম্ভব বলিয়া ঠেকিল। একইভাবে ইহা দেখিতে পাইল যে, এই অস্তিত্ব নব্য কোনও ঘটনা হইতে মুক্ত নহে; সুতরাং নব্য ঘটনা হইতে যেহেতু ইহার উৎপত্তি সম্ভব নহে সেহেতু ইহার অস্তিত্ব নব্যরূপে উৎপন্ন হইতে হইবে। এবং নব্য ঘটনা হইতে যাহার অগ্রসরমানতা সম্ভব নহে তাহারও তো উৎপত্তি ঘটিয়া থাকে।
যখন এমন নব্য ঘটনা থাকিতে পারে বলিয়া যুবক দৃঢ়চিত্ত হইল অন্য আপত্তি আসিয়া তখন ইহার এমন চিন্তার গতিরোধ করিল। ইহা ভাবিতে থাকিল যে, কোনও কিছু পূর্বে ছিল না নব্য সৃজিত হইয়াছে ইহার অর্থ হইল সময় বলিতে কিছু একটা পূর্বেও ছিল। এমন ধারণা ব্যতীত এমনটা বোধগম্য নয়। সময় ব্রহ্মাণ্ডেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং ব্রহ্মাণ্ড ও সময় ইহাদিগের পরস্পরের মধ্যে বিলম্ব ঘটিয়াছে এইরূপ চিন্ত্যনীয় নহে।
একইভাবে যুবক বলিতে লাগিল: কোনও কিছু নির্মিত হইলে তাহার নির্মাতা একজন থাকিবেই। আর যদি তেমনটাই হয় তবে নির্মাতা এই মুহূর্তে কেন ইহা নির্মাণ করিতেছে ? পূর্বে কেন নির্মাণ করিল না ? এমনটা কি দৈবক্রমে ঘটিল ? সেই নিমিত্তে ?―ইহা ব্যতীত অন্যকিছু ঘটিবার মতো সেখানে ছিল না ? না কি ইহার সত্তায় কোনও পরিবর্তন ঘটিয়াছে যাহার নিমিত্তে এমনটা হইয়াছে ?
এমন করিয়া যুবক বেশ কয়েক বছর ভাবিতে লাগিল। যুক্তি-তর্কে ইহার বিশ্লেষণ চলিতে লাগিল। কোনও যুক্তি জুতসই মনে হইলে পালটা যুক্তি আসিয়া উহাকে নস্যাৎ করিতে লাগিল। অতএব, উপরে বর্ণিত কোনও একটি ভাবনাকে ইহা অপরটির উপর প্রভাবশালী হিসেবে স্থাপন করিতে পারিল না।
সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যুবকের জন্য যখন অতিশয় কঠিন হইল তখন দুইটি ভাবনার মধ্যে কোনটি আবশ্যক তাহার চিন্তা ইহাকে পাইয়া বসিল―হয়তো দুইটি ভাবনাই একক বস্তু হওয়া আবশ্যক! অতঃপর ইহা ভাবিল, যদি ইহা একপ্রকার মানিয়া লয় যে, ব্রহ্মাণ্ড নব্য সৃজিত হইয়াছে ও জমজমাট নাস্তি হইতে অস্তিত্বে পর্যবসিত হইয়াছে তাহা হইলে স্বীয় ইচ্ছায় ইহা অস্তিত্বে পর্যবসিত হইয়াছে এমনটা অসম্ভব; ইহার অস্তিত্ববান হইবার পশ্চাতে কার্যকারণ থাকিতেই হইবে। এমন কার্যকারণ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুধাবন অসম্ভব। কারণ, জ্ঞানেন্দ্রিয় যদি তাহা অনুধাবন করে তাহা হইলে ইহাকে পদার্থের মতো দেখিতে হইতে হইবে। আর যদি ইহা পদার্থের মতো দেখিতে হয় তাহা হইলে ইহা ব্রহ্মাণ্ডের অংশ হইবেই। যেহেতু ইহা সৃজিত হইয়াছে সেহেতু ইহার সৃজক থাকিতে হইবে। যদি ইহার দ্বিতীয় সৃজক নিজেই এক পদার্থ হইয়া থাকে তাহা হইলে উহার তৃতীয় সৃজক থাকিবার আবশ্যকতা রহিয়াছে। তৃতীয়টি তদ্রƒপ হইলে চতুর্থ একটি থাকিবে। এমন করিয়া ইহা অসীমের পানে চলিতেই থাকিবে। এবং এমনটা উদ্ভটই বটে।
সুতরাং, এই ব্রহ্মাণ্ডের এমন এক সৃজক থাকিতে হইবে যাহা নিরাকার হইবে। যেহেতু ইহার কোনও আকার থাকিবে না অর্থাৎ ইহা পদার্থ নহে, সেহেতু ইহাকে ইন্দ্রিয় তথা সমবেদনাঙ্গ দ্বারা অনুধাবন সম্ভব নহে। কারণ, পঞ্চেন্দ্রিয় বলিতে যাহা রহিয়াছে তাহা কেবল পদার্থকে ও পদার্থরূপ বস্তুকে অনুধাবন করিতে পারে। কোনও কিছুকে যদি অনুধাবন করিতে না পারা যায় তাহা হইলে উহাকে কল্পনাই-বা করিবে কী প্রকারে ? উহার কল্পনাও অসম্ভব। কারণ, কল্পনা হইল আমাদের নিকট হইতে কোনও বস্তু অদৃশ্য হইয়া যাইবার পর তাহার ইন্দ্রিয়জ রূপ। যেহেতু ইহা পদার্থ নহে, সেহেতু পদার্থের কোনওরূপ গুণাবলি ইহাতে থাকিবে এমনটা অসম্ভব। এবং পদার্থের প্রথম গুণ বলিয়া যাহা কথিত অর্থাৎ পদার্থের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধ তথা বিস্তারের মাত্রাত্রয় থাকিবে তাহা হইতে ইহা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। একইভাবে, পদার্থের যত গুণাবলি রহিয়াছে সেই সমস্ত হইতে ইহা বিমুক্ত।
যদি ইহাই ব্রহ্মাণ্ডের সৃজক হইয়া থাকে তবে ইহার ব্রহ্মাণ্ডের উপরে একচ্ছত্র আধিপত্য ও জ্ঞান রহিয়াছে। সে কি জানে না যে, কে ইহা সৃজিয়াছেন ? যিনি সৃজিয়াছেন তিনি পরম দয়াময় ও মহাপ্রজ্ঞাবান।
ইহা আরও দেখিল, যদি ব্রহ্মাণ্ডের প্রাচীনত্বে আস্থা রাখিতে হয় ও যদি এক প্রকার ধর্তব্যই হয় যে, নাস্তি বলিতে কিছু ইহার পূর্বে ছিল না ও বহমান প্রাগৈতিহাসিক কাল হইতে একই অবস্থা বিরাজমান তাহা হইলে এমন চিন্তা অত্যাবশ্যক যে, ব্রহ্মাণ্ডের এই গতি সুপ্রাচীন ও প্রারম্ভিকা হইতে ইহা অন্তহীন। যদি ইহার পূর্বে বিরাম না থাকিয়া থাকে তাহা হইলে গতির সূচনা এই অবস্থা হইতে হইয়াছে। আর গতিমাত্রই গতি দানকারী কিছু একটা গতির পশ্চাতে থাকিবে। আর গতি দানকারী কিছু একটা মানে হইল, হয় ইহা পদার্থ হইতে পদার্থে সঞ্চারমান কোনও এক শক্তি―যেখানে হয় এই পদার্থ নিজেই গতিশীল নতুবা অন্য এক পদার্থ ইহা হইতে উৎসারিত―নতুবা ইহা এমন এক শক্তি যাহা সঞ্চারমান নহে, এমনকি যাহা পদার্থে ব্যাপ্তিমান নহে।
যেই শক্তি পদার্থে সঞ্চারমান ও ব্যাপ্তিমান হয় সেই শক্তি বিভাজিত ও দ্বিগুণ হয় যেভাবে প্রস্তরের অভ্যন্তরের ভারের জন্য ইহা নিম্নগামী হয়। যদি প্রস্তর দ্বিখণ্ডিত হয় ইহার ভারও দ্বিখণ্ডিত হইবে। যদি ইহাতে আরও অধিক ভার প্রযুক্ত হয় তাহা হইলে ইহার ভারে তদ্রƒপ ভার প্রযুক্ত হইবে। আর যদি অনন্তকাল ব্যাপী ইহাতে প্রস্তরের সংযুক্তি সম্ভব হয় তাহা হইলে এই ভার অনন্তকাল ব্যাপিয়া প্রযুক্ত হইত। আর যদি এই প্রস্তর একটি সীমা পর্যন্ত বাড়িয়া আর না বাড়ে তাহা হইলে ভারও সেই সীমা পর্যন্ত বাড়িবার পর আর বাড়িবে না। কিন্তু ইহা প্রমাণিত হইয়াছে যে, পদার্থমাত্র সসীম হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেই মাফিক পদার্থের শক্তিমাত্র সসীম হওয়া বাঞ্ছনীয়।
অতএব, এমন কোনও শক্তির অস্তিত্ব যদি থাকিয়া থাকে যাহা অসীম প্রভাব সৃষ্টি করিতে পারে তাহা হইলে সেই শক্তি পদার্থের অভ্যন্তরস্থ নহে। আমরা এমন এক অন্তরীক্ষ পাইয়াছি যাহা অনন্ত সময় ধরিয়া বিরামহীনভাবে ঘূর্ণায়মান। যেহেতু আমরা পূর্বেই এক প্রকার সুনিশ্চিত হইয়া ভাবিয়া লইয়াছি যে, অন্তরীক্ষের কোনও সূচনা নাই, সেহেতু ইহাই অবশ্যম্ভাবী যে, যে শক্তিবলে ইহা গতিশীল তাহা পদার্থের নিজের নহে, এমনকি পদার্থ হইতে উৎসারিত অন্য পদার্থেরও নহে। সুতরাং এই শক্তি এমন কিছুর হইবে যাহার অভ্যন্তরে পদার্থের বিন্দুবিসর্গ নাই এবং পদার্থরূপতা যাহাকে বলে তাহার বৈশিষ্ট্যে ইহা বিশিষ্ট নহে (নির্গুণ)। নশ্বর এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রতি নজর করিলে ইহা প্রথমেই দেখিতে পাইত যে, প্রতিটি পদার্থের অস্তিত্বের বাস্তবতা ইহার স্বরূপ হইতে উৎসারিত, যাহা বিভিন্ন প্রকার গতির প্রবণতার সহিত সম্পর্কিত। কিন্তু ইহার মর্মবস্তু হইতে যাহা উৎসারিত তাহা অতিশয় নগণ্য যে তাহার অস্তিত্ব প্রায় অনুধাবন করা যায় না। সুতরাং নির্গুণ যে বস্তুর কথা ব্যক্ত হইয়াছে অর্থাৎ যাহা মর্মবস্তু হইতে বিমুক্ত, যে গুণের নিমিত্তে পদার্থকে স্পর্শ করিয়া অনুভব করা যায় ও কল্পনায় তাহার অবয়ব ফুটিয়া উঠে সেই পদার্থরূপতার গুণ হইতে বিমুক্ত যে নির্গুণ বস্তু তাহার গতি দান করিবার প্রবণতার উপর সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব। তাহার কি মহত্ত্ব! যদি নভোমণ্ডলের নানা প্রকার গতির কোনও কার্যকারণ থাকিয়া থাকে যে বাস্তবিকই তাহাতে কোনও প্রকার অসঙ্গতি, কমতি ও জড়তা নাই, তাহা হইলে অবশ্যম্ভাবী সেই কার্যকারণের ক্ষমতা অসীম ও সমস্ত ব্যাপারে তাহার জ্ঞান রহিয়াছে।
প্রথম যেমন করিয়া ইহার চিন্তার সমাপন হইয়াছিল এইবারও তেমন করিয়া ইহার চিন্তার সমাপন হইল। ব্রহ্মাণ্ডের প্রাগৈতিহাসিকতা লইয়া অথবা অর্বাচীনতা লইয়া ইহার সন্দেহ কোনও ক্ষতির কারণ হইল না। উভয় পন্থাতেই ইহার নিকট সমন্বিত উপায়ে ইহা জলবৎ পরিষ্কার হইল যে, নিরাকার কোনও এক কার্যকারণ রহিয়াছে যাহার সহিত কায়ার কোনও সম্পর্ক নাই, কায়া হইতে উহা উৎসারিত হয় নাই, কায়াতে উহা অস্তিত্বশীল নহে, কায়ার বাহিরেও উহা অস্তিত্বশীল নহে। কারণ, কায়ার সহিত সম্পর্ক, কায়া হইতে উৎসারণ, কায়ার অভ্যন্তরে অবস্থান, কায়ার বাহিরে অবস্থান―সমস্ত কিছুই পদার্থের গুণ আর উক্ত বস্তু এ সমস্ত হইতে বিমুক্ত।
যেহেতু প্রতিটি পদার্থের অভ্যন্তরস্থ মর্মবস্তুই স্বরূপ পরিগ্রহ করিতে চাহে, কারণ উহা স্বরূপের উন্মেষ ঘটানো ব্যতীত তিষ্টিতে পারে না এবং স্বরূপ ব্যতীত উহার বাস্তবতা প্রমাণিতও হয় না। এবং এই কার্যকারণের কর্ম ব্যতীত স্বরূপের অস্তিত্ব নাই। ইহার নিকট প্রতীয়মান হইল যে, সমস্ত অস্তিত্বশীল বস্তু অস্তিত্বের জন্য এই সৃজকের দ্বারস্থ। উহা ব্যতীত এই সমস্ত অস্তিত্বশীল বস্তুর একটিরও তিষ্ঠিবার কোনও ক্ষমতা নাই। সুতরাং উহা যদি কারণ হইয়া থাকে তাহা হইলে অস্তিত্বশীল বস্তুসমূহ সেই কারণের ফলাফল। আর সেই জন্য অস্তিত্ব পূর্বে অস্তিত্বশীল নাস্তির পরে নতুন করিয়া সৃষ্টি হইয়াছে অথবা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে উহার কোনও আরম্ভ নাই―দুইই সমান। নাস্তি উহার পূর্বে কখনও অস্তিত্বশীল ছিল না। সুতরাং উক্ত দুই অবস্থায় তাহারা সৃজকের ফলাফল এবং সৃজকের অস্তিত্বের সহিত তাহারা সম্পর্কিত ও উহার দ্বারস্থ। উহার ধারাবাহিকতা না থাকিলে তাহারাও ধারাবাহিক নহে, উহার অস্তিত্ব না থাকিলে তাহারাও অস্তিত্বশীল নহে, উহার প্রাগৈতিহাসিকতা না থাকিলে তাহারাও প্রাগৈতিহাসিক নহে। আর উহার সত্তাই এইরূপ যে উহা তাহাদিগের উপর নির্ভরশীল নহে, তাহাদিগ হইতে বিমুক্ত! আর কীভাবেই-বা উহা এইরূপ হইবে না যে-স্থলে ইহা প্রমাণিত হইয়াছে যে, উহার ক্ষমতা অসীম এবং সমস্ত পদার্থ ও তাহাদিগের সহিত সম্পর্কিত অথবা তাহাদিগ হইতে উৎসারিত সমস্ত পদার্থ ও এমনকি সংলগ্ন কিছুও সসীম, ক্ষণস্থায়ী।
সুতরাং আকাশ-পৃথিবী-নক্ষত্ররাজি ও তাহাদের অন্তস্থ, উপরস্থ, নিম্নস্থ যাবতীয় বস্তুসমেত সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড ইহারই কার্য, ইহারই সৃষ্টি ও সত্তায় ইহারই পশ্চাৎকালীন না হইলেও পশ্চাদ্বর্তী তো বটেই।
উদাহরণস্বরূপ, স্বীয় হস্তে কোনও একটি পদার্থ ধারণ করিয়া উহাকে মুষ্টিবদ্ধ করিলে ও অতঃপর মুষ্টিবদ্ধ বস্তুকে ঘুরাইলে এই কথা অনস্বীকার্য যে, উক্ত পদার্থ মুষ্টিবদ্ধ হস্তের গতির অনুবর্তী হইবে এবং মুষ্টিবদ্ধ হস্তের এই গতি সত্তার দিক থেকে পশ্চাৎকালীন না হইলেও পশ্চাদ্বর্তী তো বটেই। অধিকন্তু উভয় প্রকার গতি একই সঙ্গে আরম্ভ হইয়াছে। সুতরাং এইভাবেই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড পূর্ববর্ণিত সময়হীন সৃজকের কারণের ফলাফল ও সৃষ্টি: বরং তাঁহার হুকুম এইরূপ যে, যখনই উহা কোনও কিছু আকাক্সক্ষা করে তখন তাহাকে বলে, হও আর তাহা হইয়া যায়।
অতঃপর যখন যুবক বুঝিতে পারিল যে, অস্তিত্বশীল সমস্ত কিছু উহারই কার্য তখন ইহা সমস্ত কিছু নিরীক্ষণ করিয়া তাহাদের সৃজকের ক্ষমতা ভাবিতে লাগিল এবং উহার চমৎকার নৈপুণ্য, যথাযথ প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম জ্ঞানে বিস্ময়বিমুগ্ধ হইয়া গেল। প্রজ্ঞাবহুল নমুনা, কর্মকুশলতার নৈপুণ্য দেখিয়া ইহার যে বিস্ময়ের উদ্রেক হইয়াছিল কেবল তাহাই নহে, বরঞ্চ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অস্তিত্বশীল বস্তুর ভেতরের সূক্ষ্মতা ইহার নজরে পড়িল। সর্বদৃষ্টকল্পে ইহার নিকট স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হইল যে, পরম উৎকৃষ্ট-উৎকর্ষের চূড়ান্ত এক সুনির্দিষ্ট সৃজকের কর্ম ব্যতীত এ আর কাহারও কর্ম নহে : আসমান ও জমিনের অণু পরিমাণ কিছু তাঁহার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে নহে, এমনকি এই অণু হইতে ক্ষুদ্রতর কিছুও নহে বা বৃহত্তর কিছুও নহে। (সুরা সাবা ০৩)
অতঃপর যুবক প্রাণিকুলের প্রতি দৃকপাত করিয়া গভীরভাবে চিন্তা করিল, কীভাবে উহা প্রতিটি বস্তুকে উত্তমরূপে সৃজিল ও সৃজিয়া কীভাবে তাহা ব্যবহার করিতে হইবে তাহার নির্দেশনা তাহাদিগকে প্রদান করিল। এই সমস্ত সদস্য যাহাদিগকে তৈয়ার করা হইয়াছে সুনির্ধারিত কতক প্রয়োজনে ব্যবহার করিবার নির্দেশনা যদি যুবককে দেওয়া না হইত তাহা হইলে এই সমস্ত পশু কোনও কাজে লাগিত না ও উহার সৃষ্টি অনর্থক হইয়া যাইত। এমন করিয়া ভাবিয়া ইহা বুঝিতে পারিল, যে এ সমস্ত সৃজিয়াছে সে অতিশয় উদার, পরম করুণাময়।
অতঃপর ইহা অস্তিত্বশীল জগতের যে বস্তুর দিকে চাহিল দেখিল সে বস্তুর সৌন্দর্য, শোভা, উৎকর্ষ, শক্তি ও কোনও না-কোনও প্রকারের শ্রেষ্ঠতা রহিয়াছে যাহা সুনির্দিষ্ট ঐ মহিমান্বিত সৃজক হইতে উৎসারিত, তাঁহার মহত্ত্ব ও কার্য হইতে উৎসারিত। যুবক বুঝিতে পারিল যে, এই সত্তা অস্তিত্বশীল সমস্ত বস্তু হইতে মহত্তম, পরিপূর্ণ, উৎকৃষ্ট, উত্তম, অনুপম, নিখুঁত ও স্থায়ী এবং এ সমস্ত কিছুর সহিত উক্ত সত্তার কোনও তুলনা নাই।
সুতরাং ইহা পরিপূর্ণতার গুণাবলিকে পর্যবেক্ষণ করিতে থাকিল এবং দেখিল যে, উহার মধ্যে সমস্ত গুণ রহিয়াছে যেই সমস্ত আবার উহা হইতে উৎসারিত এবং দেখিল যে, ইহার সম্মুখে যেই সমস্ত গুণের কীর্তন বর্ণিত হয় সেই সমস্ত তাঁহারই যোগ্য।
এবং যুবক দোষ-ত্রুটির পশ্চাতে কারণ হিসেবে যেই সমস্ত গুণ রহিয়াছে সে সমস্তকে পর্যবেক্ষণ করিয়া দেখিল যে, সৃজক যিনি তিনি এ সমস্ত কিছু হইতে বিমুক্ত, এ সমস্ত দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে। কী করিয়া তাহার পক্ষে এ সমস্ত দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে গমন সম্ভব হইল যেখানে দোষ-ত্রুটি থাকা মানেই হলো অবিমিশ্র নাস্তি অথবা এমন কিছু যাহা নাস্তির সহিত সংশ্লিষ্ট ? আর যাহার অবিমিশ্র অস্তিত্ব রহিয়াছে, আবশ্যিক অস্তিত্ব যাহার সত্তা ও যিনি অস্তিত্বশীল বস্তুকে অস্তিত্ব দান করেন নাস্তির সহিত তাঁহার সংশ্লিষ্টতা অথবা নাস্তির আচ্ছাদন তাঁহাকে কেমন করিয়া মানায় ? সুতরাং তাঁহার অস্তিত্ব না থাকিলে অন্যান্য বস্তুরও অস্তিত্ব নাই। তিনিই অস্তি, তিনিই উৎকৃষ্ট, তিনিই পরিপূর্ণ, তিনিই সুন্দর, তিনিই সর্বোত্তম, তিনিই শক্তি, তিনিই জ্ঞান এবং তিনি তিনিই এবং তাঁহার সত্তা ব্যতীত সমস্ত বস্তুই ধ্বংসোন্মুখ। (সুরা আল-কাসাস ৮৮)
এমন করিয়া জন্মের পর হইতে সময় বহিয়া যাইতে লাগিল ও জ্ঞান ইহাকে ইহার জীবনের পঞ্চ-সপ্তমাংশে উপনীত করিল। তখন ইহা পঞ্চত্রিংশৎ বয়োপ্রাপ্ত হইল। সৃজকের চিন্তা ইহার মস্তকে এমন করিয়া বদ্ধমূল হইল যে, সৃজকের চিন্তা ব্যতীত অন্য সমস্ত চিন্তা হইতে ইহার মনোযোগ সরিয়া আসিতে লাগিল এবং অস্তিত্বশীল বস্তুকে নিরীক্ষণ করিতে, সেই সমস্ত কিছুকে লইয়া অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইতে এক প্রকার ভুলিয়া গেল। পরিস্থিতি এমন হইয়া দাঁড়াইল যে, নানাবিধ বস্তুর প্রতি ইহার চক্ষু নিপতিত হইলে ইহা বস্তুসমূহকে না দেখিয়া সেই মুহূর্ত হইতে উহাদের মধ্যে সৃজকের কার্যকৌশলের প্রভাব দেখিতে পাইত। তৎক্ষণাৎ ইহার চিন্তায় পরিবর্তন আসিল এবং ইহার চিন্তায় সৃজক প্রাধান্য পাইল ও সৃজিত বস্তু উপেক্ষিত হইল। সৃজকের জন্য ইহা ব্যাকুল হইয়া উঠিল, অনুভবের বস্তুসমূহের এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর সমস্ত কিছু হইতে ইহার মন উঠিয়া গেল এবং ইহা বুদ্ধিবৃত্তিক সুউচ্চ জগতের সহিত সংশ্লিষ্ট হইয়া গেল।
এমন এক সুউচ্চ সত্তা উহা যাহার অস্তিত্বের কোনও কারণ নাই, বরং উহাই যাবতীয় বস্তুর অস্তিত্বের কারণ―উহার সুস্থির অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করিয়া ইহার আরও জানিতে আকাক্সক্ষা জাগিল যে, কেমন করিয়া ইহা স্বয়ং এই জ্ঞান লাভ করিল ও কোন শক্তির বলে ইহা এমন সত্তার সন্ধান লাভ করিল। কর্ণ, চক্ষু, নাসিকা, জিহ্বা, স্পর্শ―অনুভূতির সমস্ত প্রত্যঙ্গকে ইহা নিরীক্ষণ করিল। অতঃপর ইহা বুঝিতে পারিল যে, এই সমস্ত প্রত্যঙ্গ শরীরী কোনও বস্তু অথবা শরীরস্থ কোনও বস্তুর অস্তিত্বই কেবল অনুভব করিতে পারে, এর অধিক নহে। সুতরাং পদার্থের সহিত পদার্থের সংঘর্ষে বায়ু আন্দোলিত হয় বলিয়া উৎপন্ন শব্দ কর্ণে অনুভূত হয়। চক্ষুতে বর্ণ অনুভূত হয়। নাসিকায় ঘ্রাণ অনুভূত হয়। জিহ্বায় স্বাদ অনুভূত হয়। স্পর্শে বস্তুর প্রকৃতি-শিথিলতা-কঠিনতা-রুক্ষতা-কোমলতা অনুভূত হয়। একইভাবে, কল্পনাশক্তিও দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-বেধ রহিয়াছে এমন বস্তু ব্যতীত অন্য বস্তুকে অনুভব করিতে পারে না।
এবং অনুভবযোগ্য যাহা রহিয়াছে সমস্তই পদার্থের গুণাবলির অন্তর্গত, তাহা ব্যতীত ভিন্ন কিছু উক্ত ইন্দ্রিয়ের অংশ নহে। ইহা এই জন্য যে, পদার্থের সর্বত্র বিরাজ করিতেছে ও বহুবিভাজিত হইয়াছে এমনই শক্তি ইহা। আর সেই জন্যই কেবল বিভাজিত বস্তুকে ইহা অনুভব করিতে পারে। কারণ এই শক্তি যখন কোনও বিভাজিত বস্তুতে ব্যাপ্ত হয়, আবশ্যিকরূপে ইহা সেই বস্তুকে অনুভব করিবে, যে বস্তু বিভাজিত হইয়াছে। যেই কারণে পদার্থের অভ্যন্তরস্থ কোনও শক্তি কেবল পদার্থকেই অথবা পদার্থে যাহা রহিয়াছে তাহাকেই অনুভব করিতে পারে।
আর এই কথা বর্ণিত হইয়াছে যে, এই সত্তা এক আবশ্যিক সত্তা যাহা সমস্ত দিক হইতে পদার্থের গুণাবলি হইতে মুক্ত। সুতরাং পদার্থ নহে এমন বস্তু, পদার্থের অভ্যন্তরের শক্তি নহে, কোনও না-কোনও কারণে পদার্থের মুখাপেক্ষী নহে, পদার্থের অন্তর্গতও নহে কিংবা পদার্থ হইতে বহির্গতও নহে, পদার্থের সহিত সংশ্লিষ্ট নহে কিংবা পদার্থ হইতে বিচ্ছিন্নও নহে―এমন বস্তু ব্যতীত ইহাকে অনুভব করিবার দ্বিতীয় পন্থা নাই।
আর যুবকের নিকট ইহা প্রতীয়মান হইয়াছে যে, যুবক স্বীয় সত্তার জ্ঞান দিয়া ইহাকে অনুভব করিতে পারে কেবল। ইহার মূলে এই জ্ঞান প্রোথিত হইল। এমন করিয়া ইহার নিকট প্রতীয়মান হইল যে, ইহার স্বীয় সত্তা এক অশরীরী বস্তু, যাহা দিয়া ইহা সৃজককে অনুভব করিতে পারিয়াছে, শরীরের যে কোনও গুণাবলি হইতে এই অশরীরী বস্তু বিমুক্ত এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য হইতে সত্তার প্রকাশ যেমন করিয়া ইহা বুঝিতে পারে তেমন কিছু ইহার সত্তার বাস্তবতা নহে বরং আবশ্যিক এক সত্তা, সুনিশ্চিত এক সত্তার প্রতীতি যে বস্তুর মাধ্যমে জন্মায় সেই বস্তুই ইহার সত্তার বাস্তবতা।
সুতরাং যখন যুবক বুঝিতে পারিল যে, ইন্দ্রিয় দিয়া ইহা যাহাকে অনুভব করিতে পারে ও যাহাকে চতুর্পার্শ্ব দিয়া চর্ম ঘিরিয়া রাখিয়াছে ইহার সত্তা তেমন কিছুর অর্থাৎ শরীরী বস্তুর অন্তর্গত নহে, তখন মোটের উপর ইহার নিকট শরীর গুরুত্বহীন হইয়া পড়িল এবং মহান সেই সত্তার চিন্তা ইহাকে বিভোর করিয়া তুলিল যেই সত্তার মাধ্যমে ইহা সুমহান সত্তাকে, আবশ্যিক সত্তাকে উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিল। এবং ইহা সুমহান সত্তার কথা ভাবীতে বসিয়া চিন্তা করিল, এই সত্তা কি ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া যায় ? নষ্ট হইয়া যায় ? বিলীন হইয়া যায় ? নাকি ইহা চিরজীবন কায়েম করিয়াছে ? কারণ ইহা দেখিত যে, ক্ষয়ে যাওয়া, বিলীন হইয়া যাওয়া কেবল পদার্থের সাজে ও পদার্থ এক রূপ ত্যাগ করিয়া অন্য রূপ ধারণ করে। জল যেমন করিয়া বায়ুতে, বায়ু যেমন করিয়া জলে, উদ্ভিদ যেমন করিয়া ধূলিভস্মে ও ধূলি যেমন করিয়া উদ্ভিদে রূপান্তরিত হয় তেমনই। নষ্ট হওয়া বলিতে এমনটাই বুঝিব।
কিন্তু যাহা পদার্থ নহে, পদার্থের প্রতি যাহার নির্ভরশীলতা নাই মোটের উপর উহা শরীরী বৈশিষ্ট্য হইতে মুক্ত। সুতরাং ইহার ক্ষেত্রে নশ্বরতার কথা কোনও পরিস্থিতিতেই চিন্তায় আসিবে না।
যখন ইহার নিকট সুস্পষ্ট হইল যে, এই প্রকৃত সত্তার কোনও নশ্বরতা থাকিতে পারে না তখন ইহার জানিবার বড় আকাক্সক্ষা জাগিল যে, যখন এই সত্তা দেহ ত্যাগ করিয়া বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে তখন ইহার অবস্থা কীরূপ হয়। পূর্ব হইতে ইহা জানিত যে, নিজের জন্য উপযুক্ত কোনও যন্ত্রের সন্ধান না মিলিলে প্রকৃত সত্তা ইহাকে ত্যাগ করিবে না। যত রকমের ধীশক্তি ইহার ছিল তাহার সমস্ত কিছুকে অবলোকন করিয়া দেখিতে পাইল যে, তাহাদিগের মধ্যে এক প্রকার এমন যে তাহা শক্তিবলে বোধগম্য এবং এক প্রকার এমন যে তাহা কর্মবলে বোধগম্য। দৃষ্টান্তস্বরূপ, চক্ষু নিমীলিত করিবার মুহূর্তে অর্থাৎ দর্শনকর্মে ক্ষান্ত হইবার মুহূর্তে চক্ষুর অবস্থা শক্তিবলে বোধগম্য এবং শক্তিবলে বোধগম্য কথাটির অর্থ হইল, ইহা বর্তমানকালে বোধগম্য নহে ভবিষ্যতে বোধগম্য হইবে। চক্ষু খুলিবার মুহূর্তে ও বস্তুকে দেখিবার মুহূর্ত চক্ষুর অবস্থা কর্মবলে বোধগম্য এবং কর্মবলে বোধগম্য কথাটির অর্থ হইল, ইহা বর্তমান কালে বোধগম্য।
একইভাবে, এই সমস্ত শক্তির প্রতিটিই শক্তিবলে বোধগম্য ও কর্মবলে বোধগম্য। এই সমস্ত শক্তির প্রতিটি কর্মবলে অভীষ্ট লক্ষ্যকে কখনও বুঝিতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত শক্তি বলে তাহা বুঝিতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত ইহা বিশেষ বস্তুকে বুঝিতে না চাহিবে ততক্ষণ ইহা বুঝিতে পারিবে না। কারণ বিশেষ বস্তুটির সহিত ইহার এখনও পরিচয় ঘটে নাই। দৃষ্টান্তস্বরূপ, অন্ধ ব্যক্তির কথা বিবেচনায় আনিতে পারি। একসময় ইহা কর্মবলেই বুঝিত, অতঃপর ইহা যখন শক্তিবলে বুঝিতে শুরু করিল তখন কেবল শক্তিবলেই বুঝিতে থাকিল এবং কর্মবলে বুঝিবার জন্য ইহা আকাক্সিক্ষত হইয়া উঠিবে। কারণ পূর্বেই বস্তুটির সহিত ইহার পরিচয় ঘটিয়াছিল, ইহার সংশ্লিষ্টতা ছিল, ইহার প্রতি অতি আকাক্সিক্ষত ছিল যেমন করিয়া দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি অন্ধ হইয়া পড়িলে দর্শনীয় বস্তু দেখিবার জন্য উদগ্রীব হইয়া থাকে।
বোধগম্য যেই বস্তুকে ইহার নিকট উৎকৃষ্ট, মনোরম ও সুন্দর বলিয়া মনে হইল তাহার নিকট ইহার আগ্রহ উত্তরোত্তর বর্ধিত হইতে লাগিল এবং তাহাকে হারাইয়া ফেলিবার চিন্তা ইহাকে প্রবলভাবে আচ্ছন্ন করিল। আর এই জন্য গন্ধ শুঁকিবার ক্ষমতা যে ব্যক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছে তাহার চিন্তা অপেক্ষা একদা দৃষ্টিক্ষমতা ছিল কিন্তু ভাগ্যদোষে এখন তাহা হারাইয়া ফেলিয়াছে তেমন ব্যক্তির চিন্তা ইহাকে অধিক পীড়া দিতে লাগিল। যেহেতু গন্ধ শুঁকিয়া বস্তু সম্পর্কে যেই ধারণা জন্মে তদপেক্ষা দর্শনে বস্তু সম্পর্কে যে ধারণা জন্মে তাহা অধিকতর পরিপূর্ণ ও সুন্দর। আর যদি কোনও বস্তুতে অপরিসীম পূর্ণতা থাকিয়া থাকে; উৎকর্ষের, মনোরমতার ও সৌন্দর্যের অসীমতা থাকিয়াও থাকে তবু ইহা সেই পূর্ণতা, সেই মনোরমতা ও সেই সৌন্দর্যের ঊর্ধ্বে। ইহার পক্ষ হইতে নিঃসরিত, ইহার তরফ হইতে প্রবাহিত পূর্ণতা, উৎকর্ষ, মনোরমতা, সৌন্দর্য ব্যতীত ইহার অস্তিত্বে তাদৃশ বস্তুর লেশমাত্র নাই। এমন বস্তুর সহিত পরিচয় ঘটিবার পর ব্যক্তিমাত্রই উক্ত বস্তুকে জানিবার-বুঝিবার ক্ষমতা হারাইয়া ফেলে। আবশ্যিকভাবে উহা ততক্ষণ কপর্দকহীন হইয়া পড়ে। অপরিসীম দুঃখে ইহা নিপতিত হয় যেমন করিয়া চিরকাল ইহা উক্ত ব্যাপারে সচেতন ছিল। অতএব ইহা নিরবচ্ছিন্ন আনন্দ, বল্গাহারা পরিতৃপ্তি, অনন্ত সুখশান্তিতে নিমজ্জিত হয়।
সুতরাং ইহার নিকট জলবৎ পরিষ্কার হইত যে, অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বের সেই সত্তা পূর্বোক্ত যাবতীয় পরিপূর্ণতার গুণে বিভূষিত এবং দোষ-ত্রুটি হইতে বিমুক্ত-পরিষ্কার।
এবং ইহার নিকট প্রতীয়মান হইল যে, যে ধীশক্তির বলে ইহা এমন একটি সত্তাকে স্বীয় বোধগম্য আয়ত্তের মধ্যে আনিতে পারিয়াছে তাহা পদার্থের মতো দেখিতে কোনও বস্তু নহে ও ইহার বিলয় নাই। এমন করিয়া ভাবিতে গিয়া ইহার নিকট প্রকাশিত হইল যে, এমন একটি মহিমান্বিত সত্তা যে ধীশক্তির বলে বোধগম্য হইয়াছে তেমন কিছু ইহার রহিয়াছে যাহা মৃত্যুর মাধ্যমে দেহকে ত্যাগ করিয়া যায়। ইতঃপূর্বে―অর্থাৎ এই ধীশক্তি দেহকে আশ্রয় করিয়া থাকিবার মুহূর্তে―হয় এই অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বের সত্তার সহিত কখনও ইহার পরিচয় ঘটে নাই অথবা ইহার সহিত কোনও যোগাযোগ ঘটে নাই অথবা ইহার কথা শ্রুত হয় নাই। সুতরাং যখন ইহা দেহান্তরিত হয় তখন ইহা আর দেহের নিকট প্রত্যাবর্তন করিবার আশা করে না এবং দেহকে হারাইয়া ফেলিবার জন্য ইহার কোনও খেদও থাকে না।
এবং দেহ যখন অনর্থক হইয়া দাঁড়ায় তখন যাবতীয় শরীরী শক্তি অনর্থক হইয়া যায়। তখন উহার এইরূপ শক্তির পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া যাইবার কোনও আকাক্সক্ষাও থাকে না, তাহার জন্য আকুলিবিকুলিও থাকে না, তাহাকে হারাইয়া ফেলিবার জন্য কোনও খেদও থাকে না।
আর এমন অবস্থা কথা বলিতে পারে না তেমন সমস্ত প্রাণির সাধারণ অবস্থা―হতে পারে উহারা দেখিতে মনুষ্যবৎ অথবা তদ্রƒপ নহে।
কিন্তু, ইতঃপূর্বে অর্থাৎ, ধীশক্তি দেহকে আশ্রয় করিয়া থাকিবার সময় উক্ত সত্তার সহিত ইহার পরিচয় ঘটিয়া যায় ও ইহা জানিয়া যায় যে, পরিপূর্ণতা-মহত্ত্ব-কর্তৃত্ব-শক্তি-উৎকর্ষের ঊর্ধ্বে উক্ত সত্তার অবস্থান। কিন্তু ইহা উক্ত সত্তা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ইন্দ্রিয়জ কামনার অনুগামী হয় ও এমন করিয়াই কালাতিপাত করিতে থাকে। অতএব, ইহা উক্ত সত্তার দর্শন হইতে বঞ্চিত হয় ও উহাকে দেখিতে ইহার দারুণ আকাক্সক্ষা জন্মে। ফলে ইহা সুদীর্ঘ দণ্ডভোগী হয়, অশেষ যাতনার মুখামুখি হয়।
হয় দীর্ঘ সময় ধরিয়া সাধনা করিবার পর ইহা এই যাতনা হইতে মুক্তি পাইবে ও যাহা দেখিতে পূর্ব হইতে ইহার দুর্নিবার আকাক্সক্ষা তাহা দেখিতে পাইবে, না হয় ইহার শারীরিক জীবনে দুইটি কারণের প্রতিটির প্রতি স্বীয় প্রবণতা মোতাবেক ইহার যাবতীয় যাতনা চিরস্থায়ী হইয়া যাইবে।
কিন্তু দেহান্তরিত হইবার পূর্বে এই আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে যে ব্যক্তি চিনিয়া লয়, স্বীয় সর্বশক্তি ইহাকে নিযুক্ত করে, ইহার মাহাত্ম্যে, উৎকর্ষে, সৌষ্ঠবে স্বীয় চিন্তাকে ধার্য করে তাহা হইলে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই সত্তা হইতে ঐ ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন হয় না। আর বাস্তবিকই এই নিয়োজন, এই অবলোকন ধারাবাহিকভাবে চলিতে থাকে। অতএব, যখন ইহা দেহান্তরিত হয় তখন ইহা অনন্ত প্রফুল্ল থাকে, ঐ আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার সহিত নিরবচ্ছিন্ন অবলোকন ঘটিবার দরুন ইহার পরিতৃপ্তি, আনন্দ ও সুখ চিরস্থায়ীভাবে বজায় থাকে এবং এই অবলোকন সমস্ত দুঃখ ও আবিলতা হইতে শান্তিদায়ক। শারীরিক শক্তির পক্ষে আবশ্যক বোধগম্য বিষয়াবলি ইহা হইতে অপসারিত হইবে ঠিকই এবং এই পরিস্থিতিতে বোধগম্য বিষয়াবলি হইল যাতনা, মন্দত্ব ও প্রতিবন্ধকতা।
স্বীয় সত্তার পূর্ণতা ও সত্তার প্রফুল্লতা লইয়া যখন ইহা এক প্রকার সুস্পষ্ট ধারণার বশবর্তী হইল তখন ইহা বুঝিতে পারিল যে, ঐ আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার প্রতি চিরকাল একদৃষ্টিতে অবলোকন করিলেই ইহা সম্ভব, এমনকি এক পলক মুহূর্তও উহা হইতে অবলোকন অপসারণ করা যাইবে না যাহাতে মৃত্যু আসিয়া পড়িলে ইহা কার্যত ঐ অবলোকনেই নিরত থাকে। সুতরাং কোনওরূপ কষ্ট আসিয়া ইহার প্রশান্তিতে বিঘ্ন ঘটায় না। সুফিগণের ও তাহাদিগের ইমামগণের অধিনায়ক হজরত জুনাইদ তাঁহার মৃত্যুর সময় স্বীয় অনুসারীগণকে ইহার প্রতি ইশারা করিয়া কহিয়াছিলেন : ‘মহান আল্লাহর নিকট হইতে আনীত সময় ইহাই!’ ইহা বলিয়া তিনি তাকবির-এ-তাহরিমা পড়িয়া নামাজে দাঁড়াইয়া গেলেন।
অতঃপর ইহা চিন্তায় বিভোর হইতে লাগিল, কেমন করিয়া কোনও রূপ প্রতিবন্ধকতা ব্যতীত এই দৃষ্টি চলিতে পারিবে। সমস্ত সময় ধরিয়া ইহা উক্ত সত্তা লইয়া চিন্তায় নিমগ্ন ছিল। কিন্তু ইহার পক্ষে তেমন করিয়া থাকা হইল না। কারণ, ইন্দ্রিয়গম্য কোনও বস্তু আসিয়া ইহার চক্ষে লাগিল অথবা কতক বন্য জন্তুর গর্জন আসিয়া কর্ণে পশিল অথবা অলীক কল্পনা আসিয়া চিন্তায় বিঘ্ন ঘটাইল অথবা দেহের কোনও অংশ ব্যথিত হইয়া উঠিল অথবা ক্ষুৎপিপাসা-উষ্ণতা-শীতলতা ইহাকে কাবু করিল অথবা প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে ইহাকে উঠিতে হইল। সুতরাং ইহা বিচলিত হইয়া উঠিলে ধ্যানের স্তর হইতে নামিয়া যাইত এবং যথেষ্ট উদ্যম না করিলে পরে, দৃষ্টির যেরূপ পরিস্থিতিতে ইহা ছিল তদ্রƒপ স্থলে প্রত্যাবর্তন করা ইহার জন্য কঠিন হইয়া পড়িত।
আবশ্যিক সত্তার দৃষ্টি হইতে বিঘ্ন ঘটিবার প্রাক্কালে মৃত্যু আসিয়া পড়িবে, ইহা চিরস্থায়ী দুঃখ-দুর্দশায় ও বিচ্ছিন্ন হইবার ব্যথায় নিপতিত হইবে―এই শঙ্কায় ইহা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িল।
ইহার অবস্থা মন্দ হইয়া পড়িল এবং উত্তরণের পথও পাইল না।
প্রতিটি জন্তুকে একটি একটি করিয়া নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। তাহাদিগের কর্ম নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। সেই সমস্ত কর্ম কী হেতু প্রযুক্ত হইতেছে তাহা নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। এমন হইতে পারে যে, জন্তুসমূহের কতক উক্ত সত্তাকে অনুভব করে ও উক্ত সত্তার প্রতি নিযুক্ত। এভাবে হয়তো ইহা জন্তুসমূহের নিকট হইতে উত্তরণের উপায় জানিতে পারিবে।
কিন্তু ইহা দেখিতে পাইল যে, প্রতিটি জন্তু স্বীয় খাদ্যবস্তু আহরণে নিযুক্ত; ক্ষুৎপিপাসা ও যৌনক্ষুধা নিবৃত্ত করিতে ব্যস্ত; খরতাপে ছায়াতরুর সন্ধান ও জাড় প্রবাহিত হইলে তপ্তস্থানের সন্ধান করিতে ব্যস্ত। দিবারাত্রি এমনকি মৃত্যুর সময় উপস্থিত হইলে, জীবনের নির্ধারিত সময় ফুরাইয়া আসিলে উহারা এমনটি ব্যতীত দ্বিতীয় কর্ম করিতে সচেষ্ট হয় না।
এমন করিয়া দেখিয়া ভিন্ন কিছু ইহার দৃষ্টিগোচর হইল না। ভিন্ন কিছু দেখিবার নিমিত্তে আর অধিক সময় ইহা সচেষ্টও হইল না। এতৎসাপেক্ষে ইহার নিকট বোধগম্য হইল যে, জন্তুসকল উক্ত সত্তাকে অনুভব করিতে পারে না; ইহার প্রতি উহাদিগের আগ্রহবিশেষ নাই; কোনও না কোনও ছুতায় ইহার সহিত উহাদিগের পরিচিতিও ঘটে নাই। উহাদিগের প্রতিটি বিলীন হইতে উন্মুখ অথবা বিলীন হইবার উপক্রম সদৃশ পরিস্থিতির প্রতি উন্মুখ।
যখন জন্তুসমূহকে ইহা এমন করিয়া বিচার করিল তখন ইহা বুঝিতে পারিল যে, এমন বিচার উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও যথোপযুক্ত হইবে। প্রাণিদের যেমন কতকের অনুভূতি নাই, উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও তেমন।
ইহাদের মধ্যে যাহাদের অনুভূতি প্রবল তাহারা উক্ত সত্তাকে চিনিতে পারে না। যাহাদের অনুভূতিতে কমতি রহিয়াছে তাহারাও তথৈবচ। অধিকন্তু ইহা আরও দেখিল যে, সমস্ত উদ্ভিদ খাদ্যগ্রহণ ও বংশবিস্তার এই কর্মদ্বয়কে অতিক্রম করিতে পারে না।
অতঃপর যুবক তারকারাজি ও নভোমণ্ডলের দিকে নজর করিল। দেখিল, সেগুলির প্রতিটি সুবিন্যস্ত রীতিতে শৃঙ্খলিত গতিতে চলমান। দেখিল, সেগুলি স্বচ্ছ, আলোকোজ্জ্বল, পরিবর্তন ও ধ্বংসে উন্মুখ নহে। এমন করিয়া ভাবিতে গিয়া ইহার শক্ত প্রতীতি জন্মাইল যে, সেগুলির নিকট স্বীয় দেহের বাহিরে এমন নির্যাস রহিয়াছে যাহা উক্ত আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে চেনে। এবং ঐ অবগত নির্যাস কোনও পদার্থের আকৃতির নহে, কোনও পদার্থে সে নির্যাস খোদিতও নহে। পদার্থরূপতা হইতে বিমুক্ত এইরূপ নির্যাস কীভাবেই-বা যুবকের নিজের নেই ? কীভাবেই-বা ইহার ত্রুটি-বিচ্যুতি রহিল ? ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর প্রতি এমন প্রবল চাহিদা রহিল ? নশ্বর পদার্থের কাতারে পড়িয়া গেল ? আর তাহার সহিত ত্রুটিযুক্ত পদার্থের দলেও পড়িয়া গেল ? এ সমস্ত কিছু তাহার সত্তার নিকট অবিনশ্বর পদার্থ হইতে বিমুক্ত সত্তার সত্তার মতো হইতে প্রতিবন্ধক হইয়া দাঁড়ায় নাই। ইহাতে যুবকের নিকট সুস্পষ্ট হইল যে, খগোলকীয় বস্তুসমূহ উক্ত সত্তার অধিকরণের জন্য যথার্থ। ইহা বুঝিল যে, এই বস্তুসমূহ সেই আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে চেনে ও কার্যত অবিরত উহাকে দেখিতেছে। কারণ, ইন্দ্রিয়জ যেই সমস্ত কিছুর প্রতিবন্ধকতার জন্য পূর্বোক্ত সত্তাকে অবিরত অবলোকনে যুবক বাধাপ্রাপ্ত হইতেছিল তদ্রƒপ কিছু খগোলকীয় বস্তুসমূহের ছিল না।
অতঃপর ইহা চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া গেল। ভাবিল: সমস্ত প্রাণিজগতের মধ্যে কেনই-বা তাহাকে এইরূপ একটি সত্তায় বিশিষ্ট হইতে হইবে যাহা খগোলকীয় বস্তুসমূহের সত্তা ?
উপাদানসমূহের বিন্যাস ও সেগুলির পারস্পরিক রূপান্তর এবং ভূপৃষ্ঠের উপরস্থ সমস্ত বস্তু একটিমাত্র রূপে অবস্থান করে না―প্রথমে এমনটা দেখিয়া ইহার মনে বদ্ধমূল হইল যে, ভবতি ও বিলয় চিরকালই আনুক্রমিক এবং এই সমস্ত পদার্থ বিপরীতধর্মী বস্তু কর্তৃক সংমিশ্রিত ও সংযোজিত। আর এইজন্যই পদার্থসমূহ বিলয়োন্মুখ। অবিমিশ্র বলিতে কিছু তাহার মধ্যে নাই। নিতান্ত অবিমিশ্রের কাছাকাছি কিছু একটা উক্ত বস্তুসমূহে রহিয়াছে যাহার বিচ্যুতি বলিতে কিছু নাই। সুতরাং উহা স্বর্ণ ও সূর্যকান্তমণির মতোই বিলয় হইতে বহুদূরে অবস্থিত। খগোলকীয় বস্তুসমূহ সরল, অবিমিশ্র। আর তন্নিমিত্তে সেগুলি বিলয় হইতে বহুদূরে অবস্থিত এবং একরূপ হইতে অন্য রূপে ক্রম পরিবর্তন সেগুলিতে নাই।
ইহার নিকট পরিষ্কার হইল যে, ভবতি ও বিলয়ের এই ভুবনে যাহা কিছু রহিয়াছে সেই সমস্ত কিছুর কয়েকটির সত্তাসার পদার্থরূপতার সহিত সংযুক্ত একটি একক গুণ দিয়া গঠিত যাহাকে চারটি মৌলিক উপাদান নামে অভিহিত করা হয় এবং অধিকাংশতে প্রাণি ও উদ্ভিদের সত্তাসারের মতোই উহাদিগের সত্তাসার।
অতএব যাহাদিগের সত্তাসার স্বল্পতম রূপ দিয়া গঠিত হয় তাহাদিগের কার্যাবলিও স্বল্পতম হইয়া থাকে এবং জীবন হইতে উহারা দূরবর্তী হয়। এবং যদি এই সমস্ত বস্তু সামগ্রিকভাবে রূপতাহীন হইয়া থাকে তাহা হইলে সে সমস্তে জীবন বলিতে কিছু থাকে না ও নাস্তি বলিতে যাহা সাধারণে বুঝিয়া থাকে উহার অবস্থাও তদ্রƒপ হইয়া থাকে। অন্যদিকে, যাহাদিগের সত্তাসার ঢের রূপতা দিয়া গঠিত হইয়া থাকে তাহাদিগের কার্যাবলিও ঢের হইয়া থাকে এবং সজীব অবস্থায় প্রবেশের সম্ভাবনা উহাদিগের সর্বোচ্চ হয়। আর এই রূপতা যদি এমনই হইয়া থাকে যে ইহার বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট যে বস্তুটি রহিয়াছে উহা হইতে ইহার বিচ্ছিন্নকরণ এক প্রকার অসম্ভব, তবে সেই ক্ষেত্রে জীবন অধিকতর সুস্পষ্ট, চিরস্থায়ী ও তেজস্বী হইয়া থাকে।
অন্যদিকে, রূপতাহীন বস্তু বলিতেই পরায়ণ ও মূলবস্তুকে বুঝিতে হইবে। জীবন বলিতে কিছু এমন বস্তুতে পাওয়া যাইবে না। সুতরাং এমন বস্তু নাস্তির সমতুল্য। একক রূপতা দিয়া গঠিত বস্তুই চারটি মৌলিক উপাদান যাহা ভবতি ও বিলয়ের এই ভুবনে অস্তিত্বের আদ্যস্তর এবং তাহা হইতে নানাবিধ রূপতার বস্তুসমূহ বিন্যস্ত হয়।
আর এই চতুর্ভূত অতিশয় স্বল্পায়ু জীবনের হইয়া থাকে। কারণ একটিমাত্র গতিতেই উহারা গতিশীল। উহারা বরং এই নিমিত্তে স্বল্পায়ুর হইয়া থাকে যে, উহাদের প্রতিটির প্রত্যক্ষ একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রহিয়াছে যাহা ইহার আবশ্যিক প্রকৃতিতে ইহার বিরোধিতা করিয়া থাকে এবং স্বীয় রূপতাকে পরিবর্তন করিতে সচেষ্ট হয়।
আর এই নিমিত্তে ইহার অস্তিত্ব টেকসই হয় না, ইহা স্বল্পায়ু জীবনের হইয়া থাকে, উদ্ভিদসকল তদপেক্ষা শক্তিশালী জীবন পাইয়া থাকে ও প্রাণিকুল তদপেক্ষা প্রকাশমান জীবন পাইয়া থাকে।
সুতরাং, যোজিত এই বস্তুসমূহের মধ্যে যখনই এইরূপ ঘটিয়া থাকে যে চতুর্ভূতের একটির প্রকৃতি ইহার উপর জয়ী হয় তখন ইহার শক্তির বলে অবশিষ্ট কয়টির প্রকৃতিকে ইহা পরাভূত করিয়া দেয় এবং তাহাদিগের শক্তিকে রদ করিয়া ইহা বিজয়ী উপাদানটির আয়ত্তাধীন সংযোজিত বস্তু হইয়া পড়ে। ইহার ফলে ইহা জীবনের স্বল্প অংশের উপযুক্ত হয়। কারণ উক্ত উপাদানটি জীবনের জন্য সামান্যই উপযুক্ত ছিল। আর এই যোজিত উপাদানসমূহের কোনওটিকে যদি চতুর্ভূতের মধ্যে একটিও পরাভূত করিতে না পারে বরং চতুর্ভূত পরস্পরের সহিত উত্তম উপায়ে ও সুষমভাবে মিশ্রিত হইয়া থাকে তাহা হইলে একটির শক্তি অন্যটিকে ঠিক ততখানি রদ করে যতখানি অন্যটি প্রথমোক্তটির শক্তিকে রদ করিয়া থাকে। কিন্তু ইহারা পরস্পর সম্মিলিত হইয়া সমান কর্মে অংশ নেয়। ফলে চতুর্ভূতের একটির কর্মও প্রভাবশালী হইয়া পড়ে না ও ইহাদিগের একটিকেও আচ্ছন্ন করিয়া বসে না। সুতরাং ইহা চতুর্ভূতের একটিরও সদৃশ হইতে সুদূরপরাহত হইয়া থাকে যেন ইহার স্বীয় রূপতার প্রতিদ্বন্দ্বী বলতে কিছু নাই। এই নিমিত্তে ইহা জীবনের যোগ্য হয়।
এই সমভাবাপন্ন অবস্থা যখন প্রবল হইল, পরিপূর্ণ হইল ও কোনওরূপ প্রবৃত্তি হইতে দূরবর্তী হইল তখন বৈপরীত্য যে স্থলে নাই সে স্থলে ইহার মাত্রাবিস্তার দেখিতে পাওয়া গেল। এবং তখন ইহার জীবন পরিপূর্ণ হইল।
প্রচণ্ড সমভাবাপন্ন অবস্থার হৃৎপিণ্ডে অবস্থান নেয় জীবাত্মা। কারণ উক্ত অবস্থান মৃত্তিকা ও জল হইতে সুচারু, অগ্নি ও বায়ু হইতে নিবিড়, মধ্যবর্তীস্থলে ইহা রাজ করে এবং চতুর্ভূত হইতে সুস্পষ্ট কোনও বৈপরীত্য ইহাতে ছিল না। সুতরাং জৈবিক স্বরূপতা প্রবণ হইয়া থাকে ইহা। অতএব যুবক ভাবিল যে, ভবতি ও বিলয়ের এই ভুবনে জীবন হইতে হইলে এই জীবাত্মার অভ্যন্তরে সমভাবাপন্ন যাহা রহিয়াছে তাহাকে সম্পূর্ণ প্রবণ হইতে হইবে এবং এর রূপতার বিপরীত নাই বলিয়া যাহা কথিত হয় তাহার সন্নিকটস্থ হইতে হইবে এই আত্মাকে। এই জন্য ইহা খগোলকীয় বস্তুসমূহের মতো হইয়া থাকে যাহাদের নিজেদের রূপতার বিপরীত বলিয়া কিছু থাকে না। উক্ত জীবের আত্মা এইরূপ হইয়া থাকে কারণ সাধারণত ঊর্ধ্বগতি ও নিম্নগতির কোনওটিই প্রদর্শন করে না―এইরূপ চতুর্ভূতের সব কয়টির ইহাই মধ্যমণি। অধিকন্তু, যদি এমনটা সম্ভব হইত যে, কেন্দ্রমধ্য অবস্থানে ও যে স্থলে অগ্নির ঊর্ধ্বগমন সমাপ্ত হয় তেমন স্থলের উপরে খগোলকের মধ্যস্থানে ইহার অবস্থান হয় এবং যদি ইহা ধ্বংসের সম্মুখীন না হয় তবে ইহা উক্ত অবস্থানে স্থির হইবে ও না ইহা উর্ধ্বগামী হইবার না নিম্নে পতনশীল হইবার প্রবণতা দেখায়।
আর যদি ইহা স্বীয় ক্ষেত্রে বিচরণ করে তাহা হইলে খগোলকীয় বস্তুসমূহ যেরূপে বিচরণ করে তদ্রƒপ বর্তুলাকারে ইহাও বিচরণ করিবে। যদি ইহা স্বীয় অবস্থানে বিচরণ করে তাহা হইলে ইহা নিজেরই চতুর্পাশ্বে বিচরণ করে। ইহা দেখিতে বর্তুলাকার হইবে। কারণ এতদ্ব্যতীত দ্বিতীয় রূপ ইহা পরিগ্রহ করিতে পারে না। এ সমস্ত বিবেচনা করিয়া বলিতেই হয় ইহা খগোলকীয় বস্তুসমূহের সদৃশ।
প্রাণিকুলের অবস্থা যখন যুবক কল্পনা করিত তখন ইহা সেগুলিতে এমন কিছুই দেখিতে পাইত না যাহার নিমিত্তে ইহা ধারণা করিতে পারে যে, প্রাণীকুল উক্ত আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে অনুভব করিতে পারে। বরং ইহা বুঝিতে পারিল যে, ইহার নিজেরই সেই সত্তা রহিয়াছে যাহা উক্ত আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে বুঝিতে পারে। এমন করিয়া ভাবিয়া ইহা সিদ্ধান্তে আসিল যে, ইহা নিজেই সেই সমভাবাপন্ন প্রাণি যাহাতে খগোলকীয় বস্তুসমূহরে সদৃশ আত্মা রহিয়াছে। এবং ইহার নিকট সুস্পষ্ট হইল যে, ইহা স্বয়ং অবশিষ্ট সমস্ত প্রাণি হইতে ভিন্ন প্রকারের এক প্রাণি; ভিন্ন এক উদ্দেশ্যে ইহা সৃজিত হইয়াছে; এইরূপ বৃহৎ কোনও লক্ষ্যে ইহাকে তৈরি করা হইয়াছে যে, তন্নিমিত্তে অন্য কোনও প্রাণিকে তৈরি করা হয় নাই। আর এতটুকু সম্মানই যুবকের জন্য যথেষ্ট যে, ইহার দুইটি অংশের মধ্যে নিকৃষ্ট যাহা অর্থাৎ যাহা শারীরিক অংশ তাহা উক্ত খগোলকীয় বস্তুসমূহের সদৃশ যে খগোলকীয় বস্তুসমূহ ভবতি ও বিলয়ের ভুবনের বাহিরের অংশ এবং ক্ষয়, বদল ও পরিবর্তন হইতে বিমুক্ত।
আর দুইটি অংশের মধ্যে উৎকৃষ্ট যে অংশটি, যাহা দিয়া ইহা আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে চিনিতে পারিয়াছিল, তাহাকে পরিচায়ক বলিব। এই সংজ্ঞক হইল ঐশ্বরিক, দিব্য কিছু একটা যাহা পরিবর্তিত হয় না, ধ্বংসপ্রবণ হয় না ও শরীরকে যেই সমস্ত গুণ দিয়া বিশেষায়িত করা যায় সেই সমস্ত গুণ দিয়া ইহাকে বিশেষায়িত করা যায় না; ইন্দ্রিয় দিয়া ইহা বোধগম্য নহে; ইহার কল্পনাও করা যায় না; ইহাকে ব্যতীত অন্য কোনও মাধ্যম ব্যবহার করিয়া ইহার সংজ্ঞার নিকটেও পৌঁছানো সম্ভব নহে। কিন্তু ইহাকে আশ্রয় করিয়া ইহার নিকটে পৌঁছানো যায়। ইহা সংজ্ঞক, সংজ্ঞা, সংজ্ঞিত সমস্ত কিছুই। ইহা জ্ঞানী, জ্ঞাত, জ্ঞান সমস্ত কিছুই। এ সমস্ত কিছুর মধ্যে কোনও পার্থক্য নাই। কারণ পার্থক্য ও পৃথককরণ পদার্থের ধর্ম, পদার্থের সহিত এতদ্বয়ের সংশ্লিষ্টতা। অথচ না পদার্থ, না পদার্থের গুণ, না পদার্থের সহিত সংশ্লিষ্টতা সেখানে ধর্তব্য।
সমস্ত রকমের প্রাণির মধ্যে যখন ইহার নিজেকে মনে হইল যে, ইহার মধ্যে এইরূপ কিছু রহিয়াছে যাহা খগোলকীয় বস্তুসমূহের সদৃশ, তখন ইহার দৃঢ়বিশ্বাস জন্মাইল যে, উক্ত বস্তুসমূহকে গ্রহণ করা, উহাদের কর্মসমূহের অনুকরণ করা এবং প্রচেষ্টায় সে সমস্তের অনুরূপ হওয়া ইহার বাঞ্ছনীয়।
একইভাবে ইহার এই দৃঢ়বিশ্বাস জন্মাইল যে, উৎকৃষ্ট যে অংশটির দ্বারা ইহা আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে চিনিয়াছিল তাহা কিছুটা ইহারই মতো যেখানে যুবক নিজেই আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার মতোই পদার্থের বৈশিষ্ট্য হইতে বিমুক্ত। ইহা আরও বুঝিতে পারিল যে, সম্ভাব্য কোনও উপায়ে নিজের জন্য উক্ত সত্তার গুণাবলি অর্জন করিতে সচেষ্ট হওয়াই ইহার জন্য আবশ্যক হইবে। উক্ত সত্তার গুণাবলি অর্জন করা, উহার কার্যাবলিকে অনুসরণ করা, উহার ইচ্ছার বাস্তবায়ন করিতে তৎপর হওয়া, উহার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা, উহার যে কোনও বিধান সন্তুষ্টচিত্তে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে মানিয়া লওয়া যাহাতে উহা আনন্দিত হয় তাহাতে সচেষ্ট হওয়াই ইহার জন্য আবশ্যক হইবে। এইরূপ করা তার শরীরের জন্য ক্লেশদায়ক, ক্ষতিকর এবং শরীরের সমস্ত মাংসপিণ্ডের জন্য ধ্বংসাত্মক হইলেও এইরূপ করাই তাহার আবশ্যিক কর্ম হইবে।
একইভাবে ইহার এই দৃঢ়বিশ্বাসও জন্মাইল যে, ইহার নিজেরই মধ্যে সমস্ত প্রাণির মতো নিকৃষ্ট অংশটি রহিয়াছে যাহা ভবতি ও বিলয়ের ভুবনেরই একটি অংশ। আর সেই অংশটি হইল অন্ধকারাচ্ছন্ন ও থলথলে এক মাংসপিণ্ড যাহা খাদ্য, পানীয় ও মৈথুনের মতো ইন্দ্রিয়জ কামনায় ব্যাকুল। ইহার এই বিশ্বাস আরও পোক্ত হইল যে, এই থলথলে শরীর অনর্থক সৃজিত হয় নাই, অসার বস্তুর সহিত সংযুক্ত হয় নাই। ইহাকে দেখিয়া শুনিয়া রাখা ও ইহার মেরামত করা ইহার আবশ্যিক কর্তব্য। আর এই দেখিয়া-শুনিয়া রাখার যে কর্মটি তাহা সমস্ত প্রাণির কর্ম ভিন্ন অন্য কোনও উপায়ে করা সম্ভব নহে।
এমন করিয়া ইহার নিকট জলবৎ তরলম হইল যে, যেই সমস্ত কর্ম সম্পাদন করা ইহার জন্য আবশ্যক সেই সমস্ত কর্ম ত্রিবিধ হইয়া থাকে:
১. অবলা প্রাণির কর্মের মতো কর্ম।
২. খগোলকীয় বস্তুসমূহের কর্মের মতো কর্ম।
৩. আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার কর্মের মতো কর্ম।
প্রথম অনুরূপতা অর্থ হইল, নানাবিধ শক্তিসম্পন্ন ও লক্ষ্যবিশিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রহিয়াছে এইরূপ অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি দেহ তাহার থাকিবে।
দ্বিতীয় অনুরূপতার অর্থ হইল, হৃদয়ে নিবাস থাকিবে, সমস্ত শরীরের ও তন্মধ্যে যে শক্তি রহিয়াছে তাহার চালিকাশক্তি হইবে এইরূপ এক হৃৎপিণ্ড তাহার থাকিবে।
তৃতীয় অনুরূপতার অর্থ হইল, ইহা যাহা তাহাই ইহা হইবে। অর্থাৎ ইহার সত্তা হইবে যদ্বারা ইহা আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে চিনিত।
প্রথম হইতেই ইহার নিকট এমনটা সুস্পষ্ট হইয়াছিল যে, ইহার আনন্দ ও দুর্দশা হইতে ইহার উত্তরণ এই দুটো আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার প্রতি অনবরত নিরীক্ষণের উপর নির্ভরশীল। এমনকি একপলও ইহা হইতে দৃষ্টি এড়ানো যাইবে না।
অতঃপর যুবক সেই মাধ্যমটির প্রতি নজর করিল যে মাধ্যমটির জন্য এমন করিয়া অবিরত নিরীক্ষণ করা ইহার জন্য সহজতর হইল। এই নজরের জন্য ইহার নিকট প্রতীয়মান হইল যে, উক্ত তিন ধরনের অনুরূপতার অনুশীলন করা ইহার উচিত। কিন্তু প্রথম অনুরূপতা যাহা তাহা দিয়া উক্ত নিরীক্ষণ অর্জন করা তো দূরের কথা তাহা নিরীক্ষণের জন্য প্রতিবন্ধক ও অন্তরায়স্বরূপ। কারণ ইহা ইন্দ্রিয়জ বিষয়াবলির এখতিয়ারভুক্ত। আর ইন্দ্রিয়জ বিষয়াবলির প্রতিটি প্রতিবন্ধক পর্দার মতো। কিন্তু এই জীবাত্মাকে ধারণ করিবার জন্য এই প্রথমোক্ত অনুরূপতার আবশ্যকতা রহিয়াছে। কারণ এই জীবাত্মার মাধ্যমে ইহা খগোলকীয় বস্তুসমূহের অনুরূপতা অর্জন করে।
অতএব, প্রয়োজনই ইহাকে এই পথ হইতে আহ্বান করিয়া লয়, যদি ইহা ক্ষয়ক্ষতি হইতে মুক্ত না হয়।
দ্বিতীয় অনুরূপতা যাহা তাহা এইরূপ যে অবিরত নিরীক্ষণের একটা বৃহদংশ ইহার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। কিন্তু এই নিরীক্ষণ অবিমিশ্র নহে। কারণ এমন করিয়া যে অবিরত নিরীক্ষণ করে সে এই নিরীক্ষণের সহিত স্বীয় সত্তাকেও অনুভব করিতে পারে ও স্বীয় সত্তার প্রতি ইহার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় যাহার ফলে পরবর্তীকালে ইহা ইহার নিকট সুস্পষ্ট হয়।
কিন্তু তৃতীয় অনুরূপতা এইরূপ যে, ইহার মাধ্যমে এই নিরীক্ষণ বিশুদ্ধতা ও পরম নিমজ্জন অর্জন করে এবং কোনও কারণেই এই নিরীক্ষণ আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে ব্যতীত অন্য কিছুর প্রতি দৃষ্টি সরিয়ে নেয় না। যে এমন করিয়া নিরীক্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হয় উহার নিজের সত্তাই উহার নিজের হইতে অদৃশ্য হইয়া যায়, অপসৃত হইয়া যায়, অন্তর্হিত হইয়া যায়।
এবং সেই সুমহান, সমুন্নত ও মহাশক্তিধর আবশ্যিক অস্তিত্বের এক সত্যের সত্তা ব্যতীত ক্ষুদ্র-বৃহৎ যত কিছু রহিয়াছে তাহাদের জন্য উপর্যুক্ত কথাটি প্রযোজ্য হইবে।
অতঃপর ইহার নিকট পরিস্ফূট হইল যে, ইহার সর্বোচ্চ যে অভিপ্রায় তাহা এই তৃতীয় অনুরূপতা যাহা দ্বিতীয় অনুরূপতার মধ্যে দীর্ঘ সময়ব্যাপী অনুশীলন ও তৎপরতা ব্যতীত অর্জন করা অসম্ভব। আর এই সময় প্রথম অনুরূপতা ব্যতীত অবিরত হইবে না। এবং ইহা জানিত যে, অতীব প্রয়োজনীয় হইলেও ইহা ইহার নিজের সত্তার জন্যই একটি প্রতিবন্ধকতা এবং সত্তাবশত নহে বরং ঘটনাবশত ইহা উক্ত কর্মের সহকারী কিন্তু আবশ্যিকও বটে। সুতরাং প্রথম অনুরূপতার যতখানি আবশ্যক ঠিক ততখানির সহিত ইহা নিজেকে অঙ্গীভূত করিল। ইহাই যথেষ্ট। ইহা হইতে ন্যূনতম হইলে জীবাত্মার জন্য অমরত্ব অর্জন করাটাই দুষ্কর হইবে।
আত্মার অমরত্বের যে আবশ্যকতা ইহাকে আহ্বান জানায় তাহাকে ইহা দ্বিবিধরূপে পাইল: একটি অভ্যন্তর হইতে ইহাকে সাহায্য করে এবং ইহা হইতে যাহা নিষ্ক্রান্ত হয় তাহার পরিবর্তে আগত হয় এবং ইহা হইল খাদ্য।
অন্যটি তাহাই যাহা ইহাকে বহিস্থ কিছু হইতে সংরক্ষণ করে এবং ক্ষতির কারণ, শৈত্য-উত্তাপ-বৃষ্টি-সূর্যের দহন―ক্ষতিকর প্রাণি ও তদ্রƒপ কিছু হইতে দূরে সরাইয়া রাখে।
ইহার নিকট বোধগম্য হইল যে, যদি ইহা এ সমস্ত কিছু হইতে একদম না ভাবিয়া যথেচ্ছভাবে আবশ্যিক কিছু একটা গ্রহণ করে তাহা হইলে সম্ভবত উক্ত বস্তু অতিরিক্ত বলিয়া গণ্য হইবে ও উদ্বৃত্ত বলিয়া ধর্তব্য হইবে। নিজের প্রতি ইহার এই স্বীয় প্রচেষ্টা ছিল নিজেরই অজ্ঞাতসারে। অতঃপর ইহার নিকট বোধগম্য হইল যে, লঙ্ঘন করিবে না এইরূপ একটি সীমা ও অতিক্রম করিবে না এইরূপ একটি পরিমাপ নিজের উপর ইহা আবশ্যক করিবার সিদ্ধান্তে গ্রহণ করিবে। ইহার নিকট মনে হইল যে, ভক্ষণ করিবার বস্তুর প্রকারে উক্ত আবশ্যকতা প্রযুক্ত হইবে। তাহার পরিমাপে, তাহার নিকট প্রত্যাবর্তন করিবার সময়েও উক্ত আবশ্যকতা প্রযুক্ত হইবে।
যেরূপ বস্তু হইতে ইহা পুষ্টিগ্রহণ করিয়া থাকে প্রথমেই যুবক সে সমস্তের প্রকারভেদের প্রতি নজর করিল ও দেখিল যে, উহারা ত্রিবিধ। প্রথমত, এক প্রকার গাছ যাহা এইরূপ যে, অদ্যাবধি পক্বতা অর্জন করে নাই ও পরিপূর্ণতা পায় নাই। অর্থাৎ, খাওয়া যায় এইরূপ তৃণগুল্মের শ্রেণির অন্তর্গত ইহা।
দ্বিতীয়ত, গাছের ফল যাহা পরিপক্বতা অর্জন করিয়াছে, পরিপূর্ণ হইয়াছে ও স্বীয় প্রজাতির অন্য একটি যাহাতে গজাইয়া উঠিয়া উহাকে রক্ষা করে তন্নিমিত্তে বীজ বাহির করিয়া দেয়। সিক্ত ও শুষ্ক উভয় প্রকার ফল এই শ্রেণির অন্তর্গত।
তৃতীয়ত, বন্য ও সামুদ্রিক সেই সমস্ত জীব এই শ্রেণির অন্তর্গত যাহা ইহা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করিয়া থাকে।
যুবক উত্তমরূপে জানিত যে, এই সমস্ত শ্রেণির প্রতিটিই ঐ আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার সৃষ্টি। ইহাতে ইহার নিকট সুস্পষ্ট হয় যে, উক্ত সত্তার নৈকট্যে ও ইহাতে অনুরূপতার অনুসন্ধানেই ইহার খুশি। খাদ্যগ্রহণ অনিবার্যভাবেই ইহাদিগের পরিপূর্ণতা অর্জনে প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ, ইহাদিগের ও ইহাদিগের চূড়ান্ত যে অভীষ্ট লক্ষ্য দুইয়ের মধ্যে ইহা দূরত্ব তৈরি করিয়া রাখে। যেন এই ব্যাপারটা মহান কর্তার কর্মের বিরোধী কিছু। উক্ত সত্তার যে নৈকট্য ও অনুরূপতা ইহা আকাক্সক্ষা করে সেই আকাক্সক্ষা হইতে এই বিরোধিতা ইহাকে দূরে সরাইয়া রাখে।
ইহা বুঝিতে পারিল যে, যদি খাদ্যগ্রহণ হইতে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে বিরত রাখা যায় তবে তাহাই ইহার জন্য যথার্থ হইবে। কিন্তু এইরূপ করাটা সম্ভব নহে। ইহা বুঝিতে পারিল যে, যদি ইহা নিজেকে খাদ্যগ্রহণ হইতে বিরত রাখে তবে তাহাই ইহার শরীর বিনাশ হইবার কারণ হিসেবে বিবেচিত হইবে। সুতরাং এইরূপ করাটা প্রথমোক্ত কর্ম হইতে মহান কর্তার অধিকতর বিরোধিতা করা হইবে। তাহা হইলে ইহা অবশিষ্ট সমস্ত বস্তুর মধ্যে উৎকৃষ্ট হইবে যাহাদিগের বিনাশ ইহার উদ্বর্তনের কারণ।
ক্ষতিকর দুইটি বস্তুর মধ্যে অল্প ক্ষতির বস্তুটি ইহা বিবেচনায় আনিল ও দুইটি বিরোধের মধ্যে লঘুতমটি পালন করিবে বলিয়া সিদ্ধান্ত লইল। ইহা ভাবিয়া রাখিয়াছিল যে, এইরূপ করিবার পর ইহার মর্জিমাফিক কিছু না হইলে এ সমস্ত বস্তুর মধ্যে কোনও একটিতে ইহা গ্রহণ করিবে। কিন্তু যদি এইরূপ হইয়া থাকে যে, সমস্ত বস্তু ইহার নিকট সুলভ তখন মহান কর্তার কর্মের সহিত বিরোধ হইবে না এইরূপ কিছু একটাকে গ্রহণ করার কথা বিবেচনায় আনা ও উহাকে বাছাই করা ইহার উচিত হইবে। যেমনটি ফল উত্তমরূপে পাকিলে ও উহার অভ্যন্তরের আঁটি একই রকম আরেকটিকে জন্মদানের জন্য উপযুক্ত হইয়া উঠিলে যুবক যেন ইহাকে ভক্ষণ না করে, ইহাকে ধ্বংস না করে ও ইহাকে পাথুরে, লবণাক্ত বা অতদ্বয়ের মতো ঊষর মাটিতে নিক্ষেপ না করে তন্নিমিত্তে ফলের শাঁস এই আঁটিকে সংরক্ষণ করে।
যেহেতু সেব, নাশপাতি, ইমরুদের মতো শাঁসযুক্ত ভোজ্য ফল ইহা অতি সহজে হাতের নাগালের মধ্যে পাইত না সেহেতু হয় আখরোট ও কাঁটাবাদামের মতো ফল তথা আঁটি ইহা ভক্ষণ করিত নচেৎ পূর্ণ বিকশিত হয় নাই এইরূপ তৃণগুল্ম ইহা ভক্ষণ করিত।
উক্ত কর্মদ্বয় সম্পাদন করিবার সময় ইহা লক্ষ করিত যাতে অধিক পরিমাণে ফলফলাদি থাকে ও সেগুলির উৎপাদন ত্বরান্বিত হয় এবং যাতে ইহা সেগুলির মূলোৎপাটিত না করে ও সেগুলির বীজের ধ্বংসসাধন না করে। নিজের উপর এই সতর্কতা ইহা এক প্রকার আরোপ করিয়াছিল।
যখন এইরূপ কিছুর দুষ্প্রাপ্যতা ঘটিত তখন ইহা প্রাণি ধরিত অথবা ইহার ডিম্বক লইত। প্রাণির সহিত এমন কর্ম সম্পাদন করিবার সময়ও ইহা সতর্ক থাকিত যাহাতে ইহা অধিক পরিমাণে প্রাণী থাকিবে এমন হইতে একটি প্রাণি ইহা বাছিয়া লয় ও কোনও একটি প্রজাতিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করিয়া না ফেলে। যেই সমস্ত প্রাণি ইহা ভক্ষণ করিত সে সমস্তের জন্য ইহা উক্ত সতর্কতা অবলম্বন করিত। আর পরিমাণের ব্যাপারে ইহা ক্ষুণ্নিবৃত্তি ঘটিবার পর আর অধিক খাদ্য গ্রহণ করিত না।
কিন্তু দুই খাদ্যগ্রহণের মধ্যবর্তী যে সময় ছিল তাহাতে উহা দেখিত যে বাঁচিয়া থাকিবার জন্য যেটুকু খাদ্য গ্রহণ করা ইহার প্রয়োজন ছিল তাহা গ্রহণ করিলে পর ইহা আর খাদ্যের প্রতি উন্মুখ হইয়া থাকে না। এইরূপ ততক্ষণ থাকে যতক্ষণ অন্য দুর্বলতা আসিয়া দ্বিতীয় অনুরূপতার সময়ের করণীয় কর্মে বিঘ্ন ঘটায়। তেমন কর্মের আলোচনায় আমরা এখনই প্রবৃত্ত হইতেছি।
জীবাত্মাকে টিকিয়া রাখিবার জন্য যাহা প্রয়োজন যাহা ইহাকে বহিস্থ কিছু হইতে রক্ষা করে তাহা যেহেতু ইহাকে আহ্বান জানাইতেছে সেহেতু জীবাত্মার ব্যাপারটা ইহার জন্য অধিক গুরুতর নহে। কারণ, চর্ম দিয়া ইহা আবৃত ও ইহার অভ্যন্তরে একটি গৃহ রহিয়াছে যাহা ইহাকে বহিস্থ কিছুর প্রবেশ হইতে রক্ষা করে। ইহাই ইহার জন্য যথেষ্ট এবং যুবক ইহার কার্য দেখিত না। ইহার খাদ্যের সহিত কতক নিয়মনীতি ইহা ইহার নিজেরই উপর আরোপ করিয়াছিল। সে সমস্তের ব্যাখ্যা হাজির করা হইয়াছে।
অতঃপর দ্বিতীয় কার্য সম্পাদন করিতে ইহা আরম্ভ করিয়া দিল। আর তাহা হইল খগোলকীয় বস্তুসমূহের অনুকরণ, সেই সমস্তকে অনুসরণ, সে সমস্তের বৈশিষ্টাবলি গ্রহণ ও গুণাবলির অনুবর্তন করা। সেই সমস্ত ইহার নিকট তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত বলিয়া মনে হইল। প্রথম শ্রেণি: সেই সমস্ত গুণাবলি যাহা ভবতি ও বিলয়ের এই ভুবনের অন্তর্গত বস্তুসমূহের অধিগত এবং যাহা ইহাকে ইহার সত্তার মধ্যেই উত্তাপ অথবা ঘটনাবশত শীতলতা, জ্যোতি, লঘুভবন ও ঘনীভবন দিয়াছে। যেই সমস্ত বিষয় ইহার অভ্যন্তরে ঘটিতে থাকে যাহার মাধ্যমে ইহা আবশ্যিক অস্তিত্বের কর্তার পক্ষ হইতে আগত আত্মিক গুণাবলির অনন্ত প্রবাহের প্রতি উন্মুখ হইয়া উঠে সেই সমস্ত ইহাকে দেওয়া হইয়াছে।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে সেই সমস্ত গুণাবলি অন্তর্ভুক্ত যেই সমস্ত গুণাবলি ইহাদিগের সত্তার অন্তর্গত। দৃষ্টান্তস্বরূপ, স্বচ্ছ, উজ্জ্বল, নির্মল, অনাবিল, যাবতীয় পঙ্কিল বস্তু হইতে মুক্ত থাকা, উহাদিগের কয়েকটির নিজস্ব কেন্দ্রকে ঘিরিয়া বর্তুলাকার পথে ঘূর্ণন, কয়েকটির অপর বস্তুর কেন্দ্রকে ঘিরিয়া বর্তুলাকার পথে ঘূর্ণন ইত্যাদি ধর্মের সহিত সংশ্লিষ্ট গুণাবলি।
তৃতীয় শ্রেণিতে আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার সহিত সংশ্লিষ্ট গুণাবলি অন্তর্ভুক্ত। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোনও প্রকার বিঘ্ন ব্যতিরেকে উহাকে নিয়ত নিরীক্ষণ করা, উহাকে পাইবার তীব্র আকাক্সক্ষা, উহার আদেশমাফিক কর্ম করা, উহার আকাক্সক্ষার তামিল ঘটাইতে নিয়োজিত হওয়া এবং উহার ইচ্ছা বা আয়ত্তের বাহিরে চলাফেরা না করা ইত্যাদি ধর্মের সহিত সংশ্লিষ্ট গুণাবলি।
উপর্যুক্ত তিনটি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত গুণাবলির প্রতিটিকে ইহা যথাশক্তি নিয়োগ করিয়া অনুকরণ করিতে লাগিল।
ইহার প্রথম শ্রেণিতে অন্তর্গত গুণাবলির অনুকরণ প্রসঙ্গে বলিতে হয়, প্রয়োজনীয় কোনও বস্তু, ত্রুটি-বিচ্যুতি রহিয়াছে এমন কোনও বস্তু অথবা যাহার নিমিত্তে বিঘ্ন সংঘটিত হয় উদ্ভিদ বা প্রাণীর অন্তর্গত এমন কেহকে অনুকরণ করা হইতে ইহা নিজেকে এক প্রকার নিবৃত করিয়াই রাখিয়াছিল। এবং যদি ইহা সেই সমস্ত হইতে নিজেকে দূরে সরাইয়া রাখিতে সক্ষম হইত তবে সে সমস্তকে দূরে সরাইয়া দিত।
যখনই কোনও উদ্ভিদের উপর ইহার নজর পড়িত ও যখন ইহা দেখিত যে, কোনও প্রতিবন্ধক ইহাকে সূর্যালোক হইতে বঞ্চিত করিতেছে অথবা অন্য কোনও উদ্ভিদ ইহার বর্ধনশীল অংশে আসিয়া পড়িয়া ইহার বর্ধনে বাধা প্রদান করিতেছে অথবা খরা আসিয়া ইহার ক্ষতি সাধন করিতেছে তখনই ইহা উক্ত উদ্ভিদ হইতে বিরাজমান প্রতিবন্ধক তুলিয়া দিত, উদ্ভিদ ও বাধা দানকারী উদ্ভিদ উভয় হইতে প্রত্যহ তুলিয়া দিত যাহাতে আবার বাধাদানকারী উদ্ভিদও অক্ষত থাকে অথবা যথাসম্ভব জলসিঞ্চনে বদ্ধপরিকর হইত।
এবং যখনই কোনও প্রাণীর উপর ইহার নজর পড়িত ও যখন ইহা দেখিতে পাইত যে উহাকে কোনও হিংস্র জন্তু তাড়া করিতেছে অথবা পাতিয়া রাখা কোনও ফাঁদে উহা আটকাইয়া পড়িয়াছে অথবা উহা কণ্টকবিদ্ধ হইয়াছে অথবা উহার চক্ষু-কর্ণে ক্ষতিকর কিছু প্রবেশ করিয়াছে অথবা উহাকে ক্ষুৎপিপাসা স্পর্শ করিয়াছে তখন ইহা স্বপ্রণোদিত হইয়া উক্ত সমস্যা সমাধানে নিযুক্ত হইয়া যাইত। উক্ত প্রাণির ইহা দানাপানি সরবরাহ করিত।
তদুপরি যখন পানির কোনও প্রবাহের উপর ইহার দৃষ্টি নিপতিত হইল যাহা উদ্ভিদ ও প্রাণির পানির সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং যখন ইহা দেখিতে পাইল যে, প্রস্তরখণ্ড পানির গতিপথে পড়িয়া বাধার সৃষ্টি করিতেছে অথবা খাড়া কোনও পাহাড় আসিয়া প্রবাহের পথ রোধ করিয়া দাঁড়াইতেছে তখন ইহা সমস্ত কিছুকে হটাইয়া পানির প্রবাহ নিশ্চিত করিত।
এমন করিয়া যুবক এই প্রকার অনুকরণে নিবিষ্ট হইল যেন উহার চূড়ান্তে উপনীত হইতে পারে।
ইহার দ্বিতীয় শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত গুণাবলির অনুকরণ প্রসঙ্গে বলিতে হয়, দেহ হইতে যাবতীয় নোংরা ও অশুচিকে দূর করিয়া, অধিকাংশ সময় পানি দ্বারা সে সমস্তকে ধৌত করিয়া, হস্তপদদ্বয়ের নখ, দন্ত ও গোপনাঙ্গ পরিষ্কার করিয়া যতদূর সম্ভব উদ্ভিদের সুগন্ধী বা আতরসুবাসিত প্রসাধনীর ব্যবহার করিয়া সর্বক্ষণ পবিত্র থাকিতে ইহা এক প্রকার সচেষ্ট হইত। আর এমন করিয়া ইহা পরিচ্ছদ পরিষ্কার করিত, সে সমস্তকে আতরসুবাসিত করিত যেন সেই সমস্ত হইতে সৌন্দর্য, সৌকর্য, নির্মলতা, সৌরভ ছড়াইয়া পড়ে।
এ সমস্ত কিছুর পাশাপাশি ইহা কিছু একটাকে কেন্দ্র ধরিয়া নানাবিধ বৃত্তাকার গতির চলনে নিজেকে নিয়োজিত করে। কখনও ইহা দ্বীপটির চতুর্পার্শ্বে ঘুরিয়া আসিত, দ্বীপের চতুর্পার্শ্বের বেলাভূমি প্রদক্ষিণ করিয়া আসিত কিংবা সমুদ্র ঘেষিয়া মৃত্তিকার যে সর্বোচ্চ বিস্তার সেই প্রান্ত ঘিরিয়া চক্রাকারে হাঁটিয়া আসিত। কখনওবা থাকিবার গৃহটিকে অথবা ঊষর প্রস্তর খণ্ডকে কেন্দ্র করিয়া একাধিক বার পায়ে হাঁটিয়া অথবা ধৌরিতক চালে ইহা আবর্তন করিয়া আসিত। কখনও ইহা নিজেকে কেন্দ্র করিয়াও ঘুরিত। যেন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মূর্ছা যায়।
তদ্রƒপ তৃতীয় শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত গুণাবলির অনুকরণ প্রসঙ্গে বলিতে হয়, আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার ধ্যানে মগ্ন হইতে যাবতীয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর প্রতি সংশ্লিষ্টতা ইহা ছিন্ন করিল, চক্ষু মুদিত করিল, শ্রবণ হইতে কর্ণকে ক্ষান্তি দিল, নিজের কল্পনাবৃত্তিকে অনুসরণ করিতে প্রাণান্ত করিল এবং উক্ত সত্তার ধ্যান ব্যতীত অন্য কোনও চিন্তায় যেন ইহার মন চলিয়া না যায়, উক্ত সত্তা লইয়া ইহার চিন্তাকে যেন অন্য কোনও বস্তুর চিন্তা দ্বারা প্রতিস্থাপিত করিয়া না লয় সেই নিমিত্তে সর্বশক্তি নিযুক্ত করিল। নিজেকে কেন্দ্র করিয়া ঘুরিতে ইহা সচেষ্ট হইল, এমন কিছুর অনুবর্তন করিতে নিজের মনকে উদ্বুদ্ধ করিতে লাগিল।
এমন প্রচণ্ডরূপে যখন ইহা ঘুরিতে লাগিল ইহার যাবতীয় অনুভূতি অন্তর্হিত হইল, কল্পনাবৃত্তিসহ দৈহিক যন্ত্রপাতিকে চালনা করিতে যে শক্তির প্রয়োজন হয় সেই সমস্ত দুর্বল হইল। অন্যদিকে, শরীরের অধিভুক্ত নহে সত্তার এইরূপ কর্মসমূহ শক্তিশালী হইল। কখনও কখনও ইহার ধ্যান এইরূপ নিñিদ্র হইল যে, ইহাতে দুনিয়াবি কোনও চিন্তার মিশ্রণ মোটেই ঘটিত না। তখন ইহা আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তাকে দেখিতে পাইত। অতঃপর যখন দৈহিক শক্তি ফিরিয়া আসিত তখন ইহার ধ্যানমগ্ন অবস্থা বিপন্ন হইয়া পড়িত এবং ইহাকে সর্বনিম্ন অবস্থানে নামাইয়া আনিত। ফলে ইহা পূর্ববৎ অবস্থায় ফিরিয়া যাইত। যখন কোনওরূপ দুর্বলতা আসিয়া ইহাকে স্পর্শ করিত, যাহার ফলে ইহার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে বিঘ্ন ঘটিত, তখন পূর্বনির্ধারিত শর্তমাফিক ইহা কিঞ্চিৎ আহার্য গ্রহণ করিত। অতঃপর উল্লিখিত তিনটি শ্রেণির মধ্যে খগোলকীয় বস্তুসমূহকে অনুকরণ করিবার প্রতি ইহা ধাবিত হইত।
কিছুক্ষণ সময় ধরিয়া ইহা পুনঃপুন ঈদৃশ আচরণ করিতে লাগিল। ইহা এবং ইহার শারীরিক বৃত্তি পরস্পরের সহিত প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইল। ইহারা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী হইল। একসময় আসিয়া এইরূপ অবস্থা দাঁড়াইল যে, ইহার ধ্যান অবিমিশ্র হইল এবং তৃতীয় শ্রেণির বস্তুসমূহের অনুকরণে রত এমন কেহর নিকট পরিস্থিতি যেমন করিয়া ধরা দেয় ইহার নিকটও তেমন করিয়া ধরা দিতে লাগিল। অতঃপর তৃতীয় শ্রেণির আত্তীকরণে ইহা সচেষ্ট হইল এবং উক্ত শ্রেণির মাকাম হাসিল করিতে নিবেদিত প্রাণ হইল। আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার গুণাবলি ইহা অবলোকন করিল।
প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করিবার পূর্বে চিন্তাপ্রসূত জ্ঞান হইতে ইহার নিকট পূর্বেই সুস্পষ্ট হইয়াছিল যে, আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার গুণাবলি দ্বিবিধ হইবে : প্রথমত, জ্ঞান, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার মতো ইতিবাচক গুণাবলি এবং দ্বিতীয়ত, জড়ত্ব হইতে মুক্ত বা দৈহিক বৈশিষ্ট্যের মতো নহে এইরূপ কিছু বা তৎসংশ্লিষ্ট নেতিবাচক গুণাবলি যাহা আবার শরীরের সহিত বিস্তর সংশ্লিষ্ট না হইলেও শরীর হইতে দূরবর্তী কিছুও নহে।
শরীরী গুণাবলি হইতে বিমুক্ত হওয়াই যে ইতিবাচক গুণাবলির শর্ত হইবেক এমনটা নহে। বরং ইহাতে শরীরের কোনওরূপ বৈশিষ্ট্যও থাকিবে না। সংখ্যায় অধিক হওয়া তদ্রƒপ একটি বৈশিষ্ট্য। অতএব, ইতিবাচক এই সমস্ত গুণাবলি দ্বারা উক্ত সত্তাটি বহুগুণিত হইবে না। অতঃপর সমস্ত গুণাবলি মিলিয়া ইহা অনন্য, একক হইবে। ইহার সত্তার প্রকৃতিই এইরূপ।
অতঃপর কেমন করিয়া উক্ত দ্বিবিধ গুণাবলিকে অনুবর্তন করিবে ইহা তাহা ভাবিতে বসিল।
ইতিবাচক গুণাবলির কথা যদি বলিতে হয় তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, সেই সমস্ত গুণাবলির প্রতিটিই ইহার সত্তার প্রকৃতির প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল এবং এমন সিদ্ধান্ত কোনও প্রকারেই টানিতে পারা যাইবে না যে, ইহারা সংখ্যাধিক। কারণ, সংখ্যাধিক্যতা শারীরিক গুণাবলির অন্তর্গত। কারণ ইহা জানিত যে, ইহার সত্তা নিয়া ইহার যে জ্ঞান রহিয়াছে তাহা সত্তার অতিরিক্ত কোনও রূপতা নহে। বরং সত্তা লইয়া ইহার জ্ঞানই সত্তা। সত্তাই সত্তা লইয়া ইহার জ্ঞান। ইহার নিকট প্রতিভাত হইয়া উঠিল যে, যদি ঐশ্বরিক সত্তাকে জানিতে পারিত তাহা হইলেই দেখিত যে, যে জ্ঞানের শক্তিতে উক্ত সত্তাকে ইহা জানিত সেই জ্ঞান এই সত্তার অধিক কোনও রূপতা নহে। বরং ইহা যাহা ইহা তাহাই! অতঃপর ইহার নিকট বোধগম্য হইল, শরীরের কোনও গুণের সহিত ইহাকে তুলনীয় জ্ঞান না করিয়া উক্ত সত্তার ইতিবাচক গুণাবলিকে আত্তীকরণ করাই ইহাকে জানিবার নামান্তর। সুতরাং এমন কর্মেই ইহা ইহার মনকে নিবিষ্ট করিল।
আর যদি নেতিবাচক গুণাবলির কথা বলিতে হয় তাহা হইলে বলিতে হইবে, এই সমস্ত গুণাবলির প্রতিটিই শরীরী গুণাবলি হইতে বিমুক্তির অধীন। সুতরাং স্বীয় সত্তাকে ইহা শরীরী গুণাবলি হইতে বিমুক্ত করিতে লাগিল। পূর্বকৃত ইহার অনুশীলনে ইহা অনেকখানি এ সমস্ত হইতে বিমুক্ত হইয়াছিল। বিশেষ করিয়া যখন ইহা খগোলকীয় বস্তুসমূহকে আত্তীকৃত করিতে মনস্থির করিয়াছিল। তবু ইহাতে অবশিষ্ট কিছু রহিয়াছিল। যেমন, ইহার বর্তুলাকার গতি যে গতি একান্তই শরীরী গুণাবলির একটি। যেমন, প্রাণি ও উদ্ভিদের প্রতি যত্ন-আত্তির, মায়া-মমতা এবং উহাদিগের কষ্ট দূর করিতে যত্নবান হওয়া। এ সমস্তও শরীরী গুণাবলির অন্তর্গত। কারণ, প্রথমত শরীরী শক্তি ব্যতীত এ সমস্ত গুণাবলি ইহার নিকট জাহির হইত না এবং শরীরী শক্তি দ্বারাই এ সমস্তকে ইহা কার্যকর রাখে। অতএব, স্বীয় সত্তাকে ইহা এ সমস্ত গুণাবলি হইতে মুক্ত করিতে লাগিল। কারণ, এই মুহূর্তে ইহা যে অবস্থার অনুসন্ধানে লিপ্ত সামগ্রিকভাবে ইহার সত্তা সে অবস্থার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে।
গুহার অভ্যন্তরে দুর্গের ভেতরে ইহা নিজেকে অন্তরীণ করিতে লাগিল। চক্ষু অবনমিত ও মুদিত করিয়া, সমস্ত অনুভূতি ও শারীরিক শক্তি হইতে নিজেকে সরাইয়া রাখিয়া যাবতীয় ধ্যান-জ্ঞান কেবল আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার পানে নিমগ্ন করিল। অন্য আর কিছুতেই ইহার মন রহিল না। যখনই মনের কোণে কোনও খেয়াল উদিত হইত তাহা বিদূরিত করিতে ইহা সচেষ্ট হইত। উক্ত খেয়ালকে এক প্রকার তাড়াইয়া দিয়া ইহা স্বীয় মনকে উদ্দিষ্ট কর্মে বশীভূত করিত। দীর্ঘ সময় ধরিয়া ইহা ঈদৃশ কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করিল। ইত্যবসরে কয়েক দিন অতিবাহিত হইল। ইহা অভুক্ত রহিল। নড়াচড়াও করিল না।
এমন করিয়া কঠোরভাবে চিন্তায় নিমগ্ন থাকিবার কালে হয়তো ইহার স্মরণ ও চিন্তা হইতে নিজস্ব সত্তা ব্যতীত যাবতীয় বস্তু অন্তর্হিত হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু সর্বপ্রথম, পরম সত্য যে আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তা, যাহাকে দীর্ঘ সময় ধরিয়া ইহা নিবিড়ভাবে অবলোকন করিতেছিল, উহা ইহার চিন্তা হইতে উবিয়া গেল না।
এই ব্যাপারটাও ইহাকে চিন্তায় নিমজ্জিত করিয়া দিল। ইহা বুঝিত যে, এমন করিয়া চিন্তা করাটাও অবিমিশ্র অবলোকনে মিশ্রণের নামান্তর, ধ্যানের ভেতর বিরূপ বস্তুর সংযোগের নামান্তর।
স্বীয় সত্তা হইতে বিলীন হইতে এবং পরম সত্যকে পাইবার বাসনায় উহাকে একাগ্রচিত্তে অবলোকন করিতে ইহা জোর তলব করিতে লাগিল। পরিস্থিতি এমন হইয়া দাঁড়াইল যে, আসমান-জমিন ও এই দুইয়ের অন্তর্গত যাহা কিছু রহিয়াছে সমস্ত কিছু, সমস্ত আত্মিক স্বরূপ, দৈহিক শক্তি এবং পরম সত্য সত্তাকে জানে এমন সমস্ত অবস্তুগত শক্তি ইহার স্মরণ ও চিন্তার অতীত হইয়া পড়িল। এ সমস্ত সত্তার সামগ্রিকতা হইতে ইহার নিজের সত্তা অন্তর্হিত হইল। ধীরে ধীরে বিলীয়মান হইতে হইতে সমস্ত কিছু নগণ্য বিক্ষিপ্ত ত্রসরেণুতে রূপান্তরিত হইল। একক, পরম সত্য, ধ্রুব অস্তিত্বের সত্তা ব্যতীত অন্য কিছুই অবশিষ্ট রহিল না।
আর উক্ত সত্তা যাহার স্বীয় সত্তার অধিক কোনও রূপতা উহার সহিত সংযুক্ত নহে নিম্নোক্ত বাণী তো তাঁহারই : ‘অদ্যকার এই সাম্রাজ্য কাহার ? মহা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর।’ ইহা এই আল্লাহর বাক্য বুঝিল, তাঁহার আওয়াজ শুনিল। ইহার ভবতি ইহাকে আল্লাহর বাক্য বুঝিতে বাধা দিল না। যদিও ইহা না ভাষা জানিত, না কোনও কথা বুঝিতে পারিত। উক্ত অবস্থায় ইহা নিজেকে নিমজ্জিত করিল এবং এমন কিছু প্রত্যক্ষ করিল যাহা চক্ষু থাকিলেও দেখিতে পায় না কেহ, কর্ণ থাকিলেও শুনতে পায় না কেহ অথবা কোনও মানবহৃদয়ে তাহার ভাবনা উদয় হয় না।
মানবহৃদয়ে যেইরূপ বিষয়ের ভাবনাই উদয় হয় না সেইরূপ বিষয় লইয়া তোমার হৃদয়ের ব্যগ্রতা বর্ধিত করিও না। এরূপ অধিক ব্যাপার রহিয়াছে যে সমস্তের ভাবনা মানবহৃদয়ে উদিত হয় ঠিকই কিন্তু মানবহৃদয়ে সেই সমস্ত লইয়া ভাবিয়াও কূল করিতে পারে না। তাহা হইলে যেই সমস্ত বিষয় হৃদজগতের চৌহদ্দির সীমান্তকেই স্পর্শ করে না হৃদয়ের নিকট কেমন করিয়া সেই সমস্ত বিষয় বোধগম্য হইবে! যখন আমি হৃদয়ের কথা বলিতেছি তখন আমি শরীরী অবয়বের হৃদয়ের কথা বলিতেছি না কিংবা হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে যে আত্মার বসবাস তাহার কথাও বলিতেছি না। বরং ঐ আত্মার রূপতার কথা বলিতেছি, যাহা ইহার শক্তির মাধ্যমে মানবের সমস্ত শরীরে প্লাবিত আত্মা হিসেবে বিরাজ করিতেছে। অবশ্য, উক্ত তিনটি বস্তুর প্রতিটিই হয়তো হৃদয় বলিয়া কথিত হয়। কিন্তু উক্ত তিনটি বস্তুর যে কোনওটি দ্বারা যেমনটা আমি এ স্থলে বলিতেছি তেমনটা বোধগম্য হইতে হইবে। নচেৎ ইহাকে ব্যক্ত করা সহজ হইবে না।
এমন অবস্থাকে যে ব্যক্ত করিতে তৎপর থাকে, আমি বলিব, উহার এই তৎপরতা ব্যর্থতার নামান্তর। নিম্নোক্ত দৃষ্টান্ত দ্বারা এই কথা বোধগম্য হইবে। নানাবিধ রঞ্জিত পদার্থের বর্ণ বুঝিতে চাহে এমন এক ব্যক্তি কৃষ্ণবর্ণকে মুখগহ্বরের অভ্যন্তরে নিয়া চাখিয়া দেখিতে চাহে যে, কৃষ্ণ বর্ণের স্বাদ সুমিষ্ট না অম্লাক্ত। অতএব, তাহার পক্ষে বর্ণকে যেমন করিয়া বুঝিতে পারা সম্ভব নহে উপর্যুক্ত ব্যক্তির অবস্থাও তথৈবচ।
কিন্তু, সত্যের দ্বারে কড়া না নাড়িয়া কেবল কিছু দৃষ্টান্তের উপর ভর করিয়া ঐ মাকামের বিস্ময়কর যেই সমস্ত কিছু ইহা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল সেই সমস্ত কিছু হইতে প্রাপ্ত ইঙ্গিত হইতে আমি তোমাকে নিঃস্ব করিব না। কারণ, ঐ মাকামে কী রহিয়াছে তাহা তদস্থলে পৌঁছুতে না পারিলে অনুধাবন করিতে পারা যাইবে না।
যাহা বলিয়া আমি তোমাকে ইঙ্গিত করিলাম এক্ষণে তোমার হৃৎকর্ণকে উহার প্রতি উৎকর্ণ করো! তোমার মননের চক্ষুকে শাণিত করো! হইতেও পারে, ইহার মাধ্যমে তুমি তোমার কাক্সিক্ষত পথের সন্ধান প্রাপ্ত হইবে, যাহা তোমাকে যথার্থ মার্গে আনিয়া উপস্থিত করিবে। তবে তোমার প্রতি আমার শর্ত থাকিবে, এ স্থলে পত্রের উপর আমি যাহা লিখিয়াছি তাহার অধিক প্রশ্ন আমাকে তুমি করিবে না, তাহার অধিক মৌখিক ব্যাখ্যা আমার নিকট জানিতে চাহিবে না। কারণ, এ স্থল যথেষ্ট সংকীর্ণ। কারণ, বাচস্পতির বাক্সময়তার অধীন নহে এমন কিছুকে বাক্সময় জ্ঞান করা আশঙ্কার ব্যাপার।
অতএব আমি এ কথা বলিব যে, যখন ইহা নিজের সত্তা হইতে এবং যাবতীয় সমস্ত বস্তু হইতেই বিলীন হইয়া যায়, অস্তিত্ব বলিতে একক-চিরঞ্জীব-চিরস্থায়ী সত্তা ব্যতীত আর কেহর অস্তিত্ব দেখিতে পায় না এবং যখন ইহা অবলোকন করে তখন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবেই অবলোকন করে এবং অতঃপর যখন অন্য বস্তুসমূহ নিরীক্ষণ করিতে শুরু করে তখন ইহার অবস্থা মদ্যপ অবস্থা হইতে জাগরিত ব্যক্তির সদৃশ দেখিতে হয়। ইহার মনের কোণে উদিত হয়―সুমহান সত্য সত্তা বলিতে যাহা ইহার স্বীয় সত্তা তাহা হইতে ভিন্ন নহে এবং ইহার সত্তার যে হাকিকত তাহাই সত্য সত্তা। প্রথমে ইহা যে বস্তু লইয়া ভাবিত তাহা সত্য সত্তা হইতে ভিন্ন। উক্ত বস্তুর বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। কিন্তু যথার্থ অর্থে সত্য সত্তা ব্যতীত তাহা অন্য কিছুও নহে। ইহা অনেকটাই সূর্যরশ্মির মতো যখন তাহা কোনও কঠিন বস্তুর উপর পতিত হয় তখন মনে হয় কঠিন বস্তু ইহার প্রভাবে আলোকিত।
তখন দেখিলে মনে হয় এই আলোক বুঝি-বা উক্ত কঠিন বস্তুর যাহা হইতে ইহা প্রকাশিত হইতেছে। কিন্তু বাস্তবে এই আলোক সূর্যরশ্মির আলোক ব্যতীত অন্য কিছু তো নহে।
কিন্তু যখন উক্ত বস্তু অন্তর্হিত হয়, উহার আলোক অন্তর্হিত হয় তখন কেবল সূর্যালোক স্বীয় অবস্থানে অটুট থাকে। উক্ত বস্তু এতক্ষণ ধরিয়া উপস্থিত ছিল বলিয়া কিন্তু সূর্যালোকের ঘাটতি ঘটিল না। কিংবা এক্ষণে বিলীন হইয়াছে বলিয়া আলোকের বৃদ্ধি ঘটিল না।
উক্ত আলোক যথার্থরূপে গ্রহণ করিতে পারে এমন বস্তু যখন আসিয়া পড়ে তখন তাহা আলোককে গ্রহণ করিবে। আর যদি বস্তুই না থাকে তখন আলোক গ্রহণ তো ঘটিবেই না। তখন ইহার কোনও অর্থই হইবে না। এমন অবস্থায় আসিয়া ইহার পূর্বচিন্তা বেশ সুদৃঢ় হইল। ইহার মনে হইতে লাগিল যে, কোনওভাবেই মহান সত্য সত্তা বহুসংখ্যক হইতে পারে না। এবং উক্ত সত্তা সম্বন্ধে জ্ঞানই স্বতন্ত্র (সুনির্দিষ্ট) এই সত্তা।
ইহা হইতে ইহার চিন্তা এইরূপে পর্যবসিত হয়: যে ব্যক্তি এই সত্তা সম্বন্ধে জ্ঞান হাসিল করিয়াছে সে ব্যক্তি এই সত্তাই হাসিল করিয়াছে। এবং যে ব্যক্তি এই জ্ঞান হাসিল করিয়াছে সে এই সত্তাই হাসিল করিয়াছে।
সুতরাং এই সত্তার স্বীয় সত্তা ব্যতীত উক্ত সত্তা থাকিতে পারে না। এবং এই সত্তার অস্তিত্বই এই সত্তা। অতএব, ইহাই সেই সুনির্দিষ্ট সত্তা।
একইভাবে, যাবতীয় সত্তা যেই সমস্ত উক্ত সত্য সত্তার সহিত পরিচিত এইরূপ ভিন্ন কোনও পদার্থ কর্তৃক প্রস্তুত যে সমস্তকে ইহা পূর্বে সংখ্যাবহুল হিসাবে ভাবিত এক্ষণে চিন্তা করিতে গিয়া দেখিল সেই সমস্ত একটিই বস্তু।
যদি আল্লাহ স্বীয় রহমত ইহার সহিত সংযুক্ত না করিতেন, ইহাকে সঠিক পথে না আনিতেন তাহা হইলে এই ভ্রান্ত ধারণা ইহার মনের মধ্যে প্রায় শিকড় বিস্তার করিয়াছিল। পরবর্তী সময়ে ইহা অবশ্য বুঝিতে পারিয়াছিল, দেহস্থ তমসার যে অবশিষ্টাংশ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর যে আবিলতা ইহার মধ্যে রহিয়াছে সে সমস্তের জন্যই তাহার মনের কোণে এই ভ্রান্তি জমাট বাঁধিয়াছিল। সংখ্যাধিক্য, সংখ্যাসামান্যতা, একক, ঐক্য, বহুত্ববাদিতা, সংলগ্নতা, বিচ্ছিন্নতা―সমস্তই পদার্থের বৈশিষ্ট্য। পদার্থের বৈশিষ্ট্য হইতে বিমুক্ত এই যে সুমহান সত্য সত্তার সহিত ইহার পরিচিত উপর্যুক্ত ভিন্ন সত্তাসমূহ সম্বন্ধে এমন উক্তি করা উচিত হইবে না যে, উহারা সংখ্যাবহুল, একক নহে। কারণ, সংখ্যাধিক্য একটি সত্তার সহিত অন্য একটি সত্তার সাংঘর্ষিক। এবং সংযোগ ব্যতীত ঐক্যও ঘটিতে পারে না। পদার্থের সহিত মিশ্রিত যৌগিক রূপতার ধারণা ব্যতীত ইহার একবিন্দুও বোধগম্য হইবে না।
কিন্তু এহেন পরিস্থিতিতে আসিয়া উক্ত ব্যাপারখানা ব্যাখ্যা করিতে যাওয়া হয়তো বেশ কষ্টকর হইবে। কারণ, বহুত্ববাদিতার রূপতার সহিত ভিন্ন ভিন্ন সত্তার সম্বন্ধকে যদি তুমি এ স্থলে ব্যাখ্যা করিতে বসো তাহা হইলে আমাদিগের ভাষ্য মতে সংখ্যাধিক্যের একটি ভ্রান্ত ধারণা ইহাতে প্রবেশ করিবে। যদিচ ইহা সংখ্যাধিক্যের ধারণা হইতে বিমুক্ত। অন্যদিকে অনন্যতার ধারণা দিয়া যদি ইহাকে ব্যাখ্যা করিতে বসো তাহা হইলে ঐক্যের একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রবেশ করিবে পারতপক্ষে যাহা অলীক কল্পনা ব্যতীত কিছুই নহে।
এহেন পরিস্থিতিকে যদি বর্ণনা করিতে যাই তাহা হইলে বাদুড়জাতীয় ইতর প্রাণির সহিত ইহার প্রসঙ্গ টানিব যাহাদের চক্ষু সূর্যের আলোকে দৃষ্টিভ্রমিত হয় এবং এ সমস্ত প্রাণি দিগি¦দিক বাতুলতার চক্রবৎ ঘুরিতে থাকে। ইহারা বলাবলি করে যে, তোমার সূক্ষ্মতার সীমা তুমি অতিক্রম করিয়াছ, যেন সুবিবেচকদের সুবোদ্ধা যে বৈশিষ্ট্য তাহা হইতে তুমি অপসারিত হইয়াছ এবং বোধগম্যতার কর্তৃত্ব তুমি দূরে নিক্ষেপ করিয়াছ। অতএব ইহা কাণ্ডজ্ঞানের একটি ব্যাপার যে, বস্তুমাত্রই হয় একক কিছু হইবে নতুবা সংখ্যাধিক কিছু হইবে। অতএব সে যেন ধীরে ধীরে স্বীয় উদ্দীপনায় প্রবেশ করে, অজানা কোনও ভাষ্য হইতে নিবৃত হয়, নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করে এবং হাই বিন ইয়াকজান যেমন করিয়া নিজেকে তুচ্ছ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পৃথিবীর কিছু একটা বলিয়া মনে করে ইহাও তেমনি মনে করে। এক নজর থেকে যখন ইহা দেখিত তখন দেখিল যে, ইহা সংখ্যাধিক এবং ইহাকে সীমাবদ্ধ করিতে পারা যায় না কিংবা কোনও সীমানার আওতায়ও ইহা প্রবেশ করে না। অতঃপর অন্য একটি নজর থেকে যখন দেখিত তখন ইহাকে একক বলিয়া মনে হইত। এমন করিয়া এই দুটি ঘটনা ইহার মনে পুনঃপুন সংঘটিত হইতে লাগিল। উক্ত সংঘটনদ্বয়ের মধ্যে একটিকে অপরটির উপর গুরুত্ব দিয়া ইহা স্থির সিদ্ধান্তে আসিতে পারিল না।
আর এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পৃথিবী বহুত্ববাদিতা ও অনন্যতার উৎসভূমি, ইহার মধ্যেই এই দুইয়ের সত্যতার উপলব্ধি জন্মে এবং ইহার মধ্যেই রহিয়াছে বিচ্ছিন্নতা ও সংযোগ, সমন্বয় ও বিভিন্নতা এবং ঐক্য ও অনৈক্য। ঐশ্বরিক পৃথিবী বলিতে ইহা এমনটাই ভাবিয়াছিল যাহার সম্বন্ধে বলা হয় যে, সেখানে সমস্তই রহিয়াছে কিছুসংখ্যক বলিতে কিছু নাই। সত্যের বিপরীত কোনও রূপতার প্রবেশ ব্যতীত শ্রুতিগ্রাহ্য কোনও শব্দে ইহার কথা উচ্চারিত নহে। যে ব্যক্তি ইহাকে অভিনিবেশ সহকারে দেখিয়াছে সে ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেহই ইহাকে চিনে নাই, যে ব্যক্তি ইহাকে পাইয়াছে সে ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেহর নিকটই ইহার সত্যতা নিশ্চিত হয় নাই।
কিন্তু ইহার ভাষ্যমতে, ‘সুবিবেচকদের যে বৈশিষ্ট্য তাহা হইতে আমি অপসারিত হইয়াছি এবং বোধগম্যতার কর্তৃত্ব আমি দূরে নিক্ষেপ করিয়াছি।’ অতএব, আমি ইহার সহিত উক্ত ব্যাপারে সম্মত হইয়াছি এবং ইহার বিচারবুদ্ধি ও সুবিবেচকদের সহকারে ইহাকে ত্যাগ করিয়াছি। কারণ, বিচারবুদ্ধি বলিতে ইহাকে ও ইহার সহিত তুলনীয় কিছু একটাকে নির্দেশ করে। অধিকন্তু ইহা যুক্তির শক্তি বলিয়া অভিহিত যাহার দায়িত্ব হইল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অস্তিত্বশীল বস্তুসমূহের উপর একপলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া উহাদিগকে পর্যবেক্ষণ করা এবং সর্বজনীন রূপতাকে উহাদিগের মধ্যে অনুসন্ধান করা।
সুবোদ্ধা বলিতে আমরা তাহিদিগকে বুঝিব যাহারা এমন করিয়া দেখিতে সক্ষম। কিন্তু যে পদ্ধতির কথা আমরা এ স্থলে বলিতেছি তাহা সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে। অতএব যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু ও উক্ত বস্তুসমূহের সার্বিক বিষয় ব্যতীত অন্য কিছু সম্বন্ধে অবগত নহে তাহাকে তাহার কর্ণ এতদ্বিষয়ে বদ্ধ করিতে দাও এবং তাহার স্বীয় দলভুক্ত জনগোষ্ঠী যাহারা এই দুনিয়াবি জীবনের বাহ্যিক দিক সম্বন্ধে সম্যক অবগত কিন্তু পরলোকের খবর রাখে না তাহাদিগের নিকট প্রত্যাবর্তন করিতে দাও।
সুতরাং ঐশ্বরিক জগতের এই সমস্ত ইশারা ও হাতছানি যদি তোমার বুঝিবার পক্ষে যথেষ্ট হয় এবং তুমি আমার বর্ণিত বক্তব্যের উপর স্বীয় স্বভাবের বশবর্তী হইয়া কোনওরূপ রূপতা আরোপ না করো তাহা হইলে ইতঃপূর্ব যেই রূপ বর্ণিত হইল সত্যবাদীদের অবস্থানে আসিয়া হাই বিন ইয়াকজান যাহা অবলোকন করিতে সক্ষম হইয়াছিল, এ স্থলে আমি যোগ করিব যে, তুমিও তাহা অবলোকন করিতে পারিবে। অতএব আমি বলিব যে, সম্পূর্ণ আত্মনিমজ্জন, পরিপূর্ণ বিলয় এবং প্রকৃত অভিগমনের পর ইহা সর্বোচ্চ নভোমণ্ডলকে প্রত্যক্ষ করিল যাহার কোনও বস্তু নাই। সে স্থলে ইহা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল এমন সত্তাকে যাহা পদার্থরূপতা হইতে বিমুক্ত এবং যাহা না পরম সত্য একক সত্তা, না উক্ত নভোমণ্ডল, না এই দুইটি ভিন্ন অন্য কিছু। আরও স্পষ্ট করিয়া যদি বলিতে হয় তাহা হইলে বলিব, নিকষিত দর্পণে সূর্যের যে প্রতিচ্ছবি আমরা দেখিতে পাই তাহা না সূর্য, না দর্পণ, না এই দুই ভিন্ন অন্য কিছু। উল্লিখিত সত্তাও তদ্রƒপ কিছু একটা।
এই নভোমণ্ডলের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত সত্তায় ইহা ঈদৃশ পূর্ণতা, জৌলুস ও ঐশ্বর্য দেখিতে পাইল যে তাহা ভাষায় প্রকাশ করিবে কিন্তু ভাষা তাহা করিতে অক্ষম। ভাষা এতই তুচ্ছ ও নগণ্য যে, নভোমণ্ডলের ঐশ্বর্যকে অক্ষর ও ভাষার পরিচ্ছদে আচ্ছাদিত করা যায় না। ভাষায় এইরূপ ঐশ্বর্যের বিবরণ পেশ করা সম্ভব নহে। আনন্দ, পুলক, খুশি ও উল্লাসের আতিশয্যে ইহা নভোমণ্ডলের সত্তাকে দেখিল যেন এই নভোমণ্ডল মহিমান্বিত পরম সত্যকে নিরীক্ষণ করে। এই নভোমণ্ডলের তফাতে আরও একটি নভোমণ্ডল যে রহিয়াছে যাহা স্থির নক্ষত্রের এক নভোমণ্ডল তাহাও ইহা প্রত্যক্ষ করিল এবং দেখিতে পাইল যে, তাহাও পদার্থরূপতা হইতে বিমুক্ত―না তাহা পরমসত্য একক সত্তার সত্তা, না তাহা সর্বোচ্চ নভোমণ্ডলের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত সত্তা, না তাহা নভোমণ্ডল স্বয়ং, না তাহা এতদ্ভিন্ন অন্য কিছু। স্পষ্ট করিয়া বলিতে গেলে বলিতে হইবে, ইহা দর্পণের উপর সূর্যের যে প্রতিরূপ প্রদর্শিত হইতেছে তাহার মতো যে দর্পণটি আবার সূর্যের মুখামুখি দণ্ডায়মান এইরূপ অন্য একটি দর্পণের উপর সূর্যের প্রতিরূপকে প্রতিফলিত করিতেছে। এই সত্তার মধ্যেও ইহা একই জৌলুস, ঐশ্বর্য ও পুলক দেখিল যাহা ইহা সর্বোচ্চ নভোমণ্ডলের সত্তায় দেখিয়াছিল। এই নভোমণ্ডলের পশ্চাতে যে আরেকটি নভোমণ্ডল ইহা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল যা শনিগ্রহের নভোমণ্ডল বলিয়া পরিচিত সে স্থলে ইহা অবস্তুগত একটি সত্তা প্রত্যক্ষ করিল, এ যাবৎকাল ইহা যেইসমস্ত সত্তা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল এই সত্তা সে সমস্তের মতো নহে এবং সেই সমস্ত হইতে ভিন্নতর নহে। বরঞ্চ দর্পণের উপর সূর্যের উক্ত প্রতিরূপের মতো যে স্থলে দর্পণটি আবার সূর্যের মুখামুখি দণ্ডায়মান এইরূপ অন্য একটি দর্পণের উপর সূর্যের প্রতিরূপকে প্রতিফলিত করিতেছে। এই সত্তার অভ্যন্তরেও ইহা পূর্ববৎ জৌলুস ও পুলক দেখিতে পাইল।
প্রতিটি নভোমণ্ডলেই ইহা পদার্থরূপতা হইতে বিমুক্ত একটি সত্তা দেখিত পাইল যাহা ইহা ইতঃপূর্বে যেমনটা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল তেমন সত্তাসমূহ নহে এবং সেই সমস্ত হইতে ভিন্নতরও নহে, বরঞ্চ দর্পণের উপর সূর্যের পূর্ববর্ণিত প্রতিরূপের মতো যে স্থলে দর্পণটি আবার নভোমণ্ডলের ক্রমানুসারে সজ্জিত একটি দর্পণের উপরে অন্যটির সূর্যের প্রতিরূপকে প্রতিফলিত করে। এই সত্তাসমূহের প্রতিটিতে ইহা ঐশ্বর্য, জৌলুস, পুলক ও আনন্দ প্রত্যক্ষ করিল। কোনও চক্ষু এমনটা প্রত্যক্ষ করে নাই, কোনও কর্ণ এমনটা শ্রবণ করে নাই এবং কোনও মানবের অন্তরে এইরূপ ভাবনার উদয়ও হয় নাই যতক্ষণ না ইহা ভবতি ও বিলয়ের ভুবনে পদার্পণ করিল এবং দেখিল সমস্তই চন্দ্রের নভোমণ্ডলের আয়ত্তাধীন। অতএব, ইহা এমন একটি সত্তা প্রত্যক্ষ করিল যাহা পদার্থরূপতার গুণ হইতে বিমুক্ত এবং পূর্বে যেইরূপ সত্তা ইহা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল না তাহা তদ্রƒপ, না তাহা তাহা হইতে ভিন্নতর কিছু।
এবং এই সত্তার সত্তর সহস্র মুখমণ্ডল রহিয়াছে, প্রতিটি মুখমণ্ডল সত্তর সহস্র মুখবিবর বিশিষ্ট, প্রতিটি মুখবিবর সত্তর সহস্র জিহ্বাবিশিষ্ট। সমস্ত জিহ্বা মিলিয়া পরমসত্য একক সত্তার গুণকীর্তন করিতেছে, উক্ত সত্তার পবিত্রতা ও মহিমার অবিশ্রান্ত যশোকীর্তন করিতেছে। এই সত্তাকে বহুসংখ্যক বলিয়া ইহার ভ্রম হইয়াছিল। কিন্তু ইহা দেখিতে পাইল যে, পূর্ব হইতে ইহা যেইরূপ দেখিয়া আসিতেছে তদ্রƒপ এই সত্তার পূর্ণতা ও পুলকে বহুসংখ্যকতার লেশমাত্র নাই।
এই সত্তা যেন দোদুল্যমান জলের উপর কম্পিত সূর্যের প্রতিরূপ যাহা স্থাপিত দর্পণসমূহের সর্বশেষটি থেকে ইহার উপর প্রতিফলিত হইয়াছে। আর এই সর্বশেষ দর্পণটির উপর আলোক উপরে বর্ণিত নিয়মানুযায়ী সূর্যের সম্মুখে স্থাপিত প্রথম দর্পণ হইতে প্রতিফলিত হইয়া আসিয়াছে।
অতঃপর নিজের প্রতি লক্ষ করিয়া ইহা বুঝিতে পারিল যে, ইহার নিজেরও পৃথক একটি সত্তা রহিয়াছে। যদি সত্তর সহস্র মুখমণ্ডল রহিয়াছে এইরূপ বস্তুটিকে বিভাজন করা সম্ভব হয় তাহা হইলে ইহার স্বীয় সত্তাকে আমরা বিভাজিত বস্তুটির অন্তর্গত বলিতে পারি। আর যখন কিছুই ছিল না তখন যদি উক্ত সত্তাটি তার পরে সৃজিত না হইয়া থাকে তাহা হইলে আমরা বলিব যে, ইহা একই সত্তা! আর যদি ইহা সৃষ্টির পর হইতে শরীরের সহিত সংশ্লিষ্ট না হইয়া থাকে তাহা হইলে বলিব যে, ইহার সৃষ্টিই হয়নি! এমন করিয়া ইহা স্বীয় সত্তার মতো সত্তাসমূহকে প্রত্যক্ষ করিতেছিল যাহাদিগের শরীর ছিল কিন্তু পরবর্তীকালে তাহা নিঃশেষ হইয়া গিয়াছিল এবং যাহাদিগের শরীর এখনও তাহার সহিত অস্তিত্ববান রহিয়াছে। তাহারা সংখ্যায় এত অধিক যে গনিয়া কূল-কিনারা পাওয়া যাইবে না। অতএব, যদি বলিতে পারি তাহা হইলে বলিব তাহারা সংখ্যায় অধিক। অথবা তাহারা প্রতিটিই মিলিয়া মিশিয়া একাকার। অতএব, যদি বলিতে পারি তাহা হইলে বলিব তাহারা একক।
সুতরাং ইহার স্বীয় সত্তাকে ইহা নিরীক্ষণ করিয়াছিল এবং তৎসঙ্গে ঐ সমস্ত সত্তাকেও ইহা নিরীক্ষণ করিয়াছিল যাহারা অগণিত জৌলুসে, ঐশ্বর্যে ও পুলকে ইহার স্বগোত্রীয়। কোনও চক্ষু এমনটা দেখে নাই, কোনও কর্ণ এমনটা শ্রবণ করে নাই, কোনও মানবের হৃদয়ে এমন ভাবনার উদয় অদ্যাবধি হয় নাই, কোনও বর্ণনাকারী এমনটার বর্ণনা করে নাই, যাহারা ইহাকে অর্জন করিয়াছে ও ইহার বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করিয়াছে, তাহারা ব্যতীত আর কেহই ইহাকে বুঝিতে পারে নাই।
অবস্তুগত এইরূপ বহু সত্তাকে প্রত্যক্ষ করিয়া ইহার মনে হইল যে, ইহারা মরিচাপড়া দর্পণের অনুরূপ যাহাদের উপরে গাদ বসিয়াছে। এতদ্ব্যতীত যেই সমস্ত দর্পণের উপর সূর্যের প্রতিরূপ মুদ্রিত হয় সেই সমস্ত নিকষিত দর্পণের পৃষ্ঠমুখী এবং ইহারা ইহা হইতে মুখমণ্ডল ফিরাইয়া রাখিয়াছে। এই সমস্ত সত্তায় ইহা এমন অনেক আবিলতা ও ঘাটতি দেখিতে পাইল যা কখনও ইহার মনের প্রান্তরে উদিত হয় নাই। সে সমস্তে ইহা বিরামহীন অনেক যন্ত্রণা এবং বিলুপ্তিহীন খেদ দেখিতে পাইল। নিদারুণ যন্ত্রণা সে সমস্তকে ঘেরাটোপের মতো ঘিরিয়া রাখিল, সে সমস্তকে বিচ্ছিন্নতার অগ্নি দাহ্য করিতে লাগিল এবং আকর্ষণ-বিকর্ষণের দোটানায় পড়িয়া সেই সমস্ত চূর্ণবিচূর্ণ হইতে লাগিল। নিদারুণ যন্ত্রণা পাইতেছে এইরূপ সত্তাসমূহ ব্যতীত অন্য কিছু সত্তার আবির্ভাব ঘটিতেছে, অতঃপর সেই সমস্ত বিলীন হইতেছে, আবার জমাট বাঁধিয়া উঠিতেছে অতঃপর পুনরায় ভাঙ্গন ধরিতেছে। এ সমস্তের প্রতি ইহা অত্যন্ত যত্নবান হইল এবং অভিনিবেশ সহকারে সেই সমস্ত দেখিল। অতঃপর ইহা ভীষণ এক শঙ্কা দেখিল, বিপুল কিছু ঘটিতে পারে বলিয়া মনে করিল, তৎপর এক সৃজন ও জোরালো নিয়মনীতি দেখিল, প্রস্তুতি, স্ফীতি, উৎপাদন ও অনুলিপিকরণ দেখিল।
যেই না ইহা অল্প একটু নিশ্চিত হইল তৎক্ষণাৎ ইহার সংবেদ ফিরিয়া আসিল ও যে অবস্থায় ইহা ছিল সে অবস্থা হইতে অর্থাৎ মূর্ছা যাওয়া অবস্থা হইতে জাগরিত হইল। উক্ত অবস্থা হইতে ইহার পদস্খলন ঘটিল। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ ইহার নিকট সুস্পষ্ট হইল এবং ঐশ্বরিক জগৎ ইহার দৃষ্টি হইতে অদৃশ্য হইল। কারণ দুইটি জগতের একক অবস্থায় মিলিত হওয়া সম্ভব নহে। কারণ, ইহলোক ও পরলোক দোজবরে স্বামীর মতো। এক স্ত্রীকে তুমি তুষ্ট করিবে তো দ্বিতীয় জন ক্ষুব্ধ হইবে।
যদি তুমি বল যে, এই অবলোকনের পরিপ্রক্ষিতে যাহা আমি বর্ণনা করিয়াছি তাহা হইতে ইহাই প্রতিভাত হয় যে, এই যে বিচ্ছিন্ন সত্তাসমূহ রহিয়াছে সেই সমস্ত যদি নভোমণ্ডলের মতো কখনও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না ঐরূপ স্থায়ী বস্তুর সত্তা হইয়া থাকে তাহা হইলে সে সমস্তও চিরস্থায়িত্ব কায়েম করিয়া আসিয়াছে; আর যদি ডাকিতে পারে এইরূপ ধ্বংসপ্রবণ জন্তুবৎ কিছুর সত্তা হইয়া থাকে তাহা হইলে সেই সমস্ত সত্তা বিলীন হইয়া যাইবে, নিতান্ত তুচ্ছ কিছুতে পরিবর্তিত হইয়া অন্তর্ধানে চলিয়া যাইবে। যেভাবে দর্পণের উপর পতিত সূর্যরূপকে দিয়া আমি আমার বক্তব্য বর্ণনা করিয়াছি। কারণ দর্পণের ধ্রুবতা ব্যতীত উক্ত প্রতিচ্ছবিরও কোনও ধ্রুবতা নাই। আর যদি দর্পণ বিনষ্ট হইয়া যায় তাহা হইলে সূর্যের প্রতিচ্ছবিও বিলুপ্ত হইবে, নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে। তাহা হইলে আমি তোমাকে বলিব যে, কত দ্রুতই তোমার কৃত প্রতিজ্ঞা তুমি বিস্মৃত হইয়াছ এবং ওয়াদার বরখেলাপ করিয়াছ! পূর্বেই আমি কি তোমাকে জ্ঞাত করি নাই যে, ব্যাখ্যা করিবার জন্য এ স্থল সংকীর্ণ ? শব্দ তো বরাবরই এমন যে ইহার কারণে মিথ্যা কিছুকে সত্য বলিয়া বিভ্রান্তি ঘটে। যে কোনও প্রসঙ্গে উপমা ও উপমিতকে একই নিয়মের অধীন বলিয়া তুমি জ্ঞান করো আর তন্নিমিত্তে তোমার বিভ্রান্তি ঘটে।
প্রচলিত যে কয়টি ভাষ্য রহিয়াছে সে সমস্তকে ধর্তব্য বিবেচনা করা যাইবে না। অতএব কেমন করিয়া সূর্য, সূর্যরশ্মি, ইহার প্রতিরূপ, ইহার অবয়ব, দর্পণ ও দর্পণে অর্জিত প্রতিচ্ছবি সমস্ত কিছু বস্তুসমূহ হইতে অচ্ছেদ্য হইবে। বস্তুসমূহ ব্যতীত ইহারা তিষ্ঠিতে পারে না। কিংবা বস্তুসমূহের মধ্যে না তিষ্ঠিলে ইহারা তিষ্ঠিতে পারে না। আর এই জন্যই অস্তিত্বের লাগিয়া ইহারা বস্তুর মুখাপেক্ষী এবং বস্তু বিলীন হইয়া গেলে এ সমস্তও বিলীন হইয়া যায়।
কিন্তু ঐশ্বরিক সত্তা ও সার্বভৌম আত্মার প্রতিটি পদার্থ ও পদার্থের আনুষঙ্গিক বিষয় হইতে বিমুক্ত এবং বহু দূর নির্বাসিত। উহাদিগের সহিত পদার্থের কোনও সংশ্লিষ্টতা নাই। অধিকন্তু, বস্তুসমূহের বিলীন হইয়া যাওয়া অথবা সে সমস্তের অটলতা অথবা অস্তি-নাস্তি ইত্যাকার সমস্ত কিছুই ইহার নিকট সমান। কেবল একক, পরম সত্য, আবশ্যিক অস্তিত্বের সত্তার সহিতই ইহাদিগের সংশ্লিষ্টতা, সম্বন্ধ। উক্ত সত্তাই এ সমস্তের অগ্রিম, ইহা হইতে অবশিষ্ট সমস্তের আরম্ভ, হেতুও ইহাই, ইহাই সমস্ত কিছুকে সৃজিয়াছে ও স্থায়িত্ব দিয়াছে, অবিনাশিতা ও চিরস্থায়িত্ব দিয়াছে। বস্তুকে ইহার কোনও প্রয়োজন নাই। বরং সমস্ত বস্তুর ইহাকে প্রয়োজন।
যদি এ সমস্তকে ক্ষয়ে যেতেই হয় তাহা হইলে বস্তুসমূহ ক্ষয়ে যায়। কারণ এই সমস্ত বস্তুর মূল হইল এই সত্তাসমূহ। একইভাবে, মহান ও এই সমস্ত হীন বস্তু হইতে পবিত্র যিনি ও যিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনও ঈশ্বর নাই সেই পরম সত্য-একক সত্তার নিঃস্ব হইয়া যাওয়া যদি সম্ভব হয় তাহা হইলে এই সমস্ত সত্তার প্রতিটি নিঃস্ব হইয়া যাইবে, সত্তাধারী বস্তুসমূহ, সমস্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ নিঃস্ব হইয়া যাইবে। অস্তিত্বশীল সত্তা বলিতে আর কিছুই থাকিবে না। কারণ, এই সমস্ত কিছুর প্রতিটি প্রতিটির সহিত সংযুক্ত।
যেমন করিয়া বিম্ব বস্তুর অনুগামী হইয়া থাকে তেমন করিয়া ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ যদি ঐশ্বরিক জগতের অনুগামী হইয়া থাকে তাহা হইলেও ঐশ্বরিক জগতের কিছু যায়-আসিবে না। বরং ইহা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ হইতে বিমুক্ত হইয়া থাকে। অধিকন্তু, ইহার বিলুপ্ত হইবার আবশ্যকতা অসম্ভব হইতে পারে। কারণ, ইহা তো ঐশ্বরিক জগতের অনুগামী। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এই জগতের বিলুপ্তি বরং ইহা পরিবর্তনে, একেবারে নিঃস্ব হইয়া যাওয়াতে নহে। মহিমান্বিত গ্রন্থ যে স্থলে পর্বতরাজির চলিবার কথা বলে, সে সমস্তের পশমি সুতার মতো রূপ পরিগ্রহের কথা বলে কিংবা মানুষকে পতঙ্গের মতো বলে, চন্দ্র-সূর্যের নিষ্প্রভ হইবার কথা বলে, সমুদ্রের উত্তাল হইবার কথা বলে এবং একদিন এই পৃথিবী ও একইভাবে নভোমণ্ডলসমূহ অন্য একটি পৃথিবী ও নভোমণ্ডলসমূহে রূপান্তরিত হইবার কথা বলে তখন ইহা এমনটাই বলিতে চাহে।
এই মহিমান্বিত পর্যায়ে আসিয়া হাই বিন ইয়াকজান যাহা দেখিতে পাইয়াছিল তাহাই এক্ষণে আমার পক্ষে ইঙ্গিতে বর্ণনা করা সম্ভব হইল। শব্দের উপর ভর করিয়া এর চাইতে অধিক আমি বর্ণনা করিব এমনটা আশা করিও না। কারণ তেমনটা এক প্রকার অসম্ভবই বটে।
কিন্তু হাই ইবনে ইয়াকজানের সমস্ত বিবরণ অদ্যাবধি তোমাকে প্রদান করি নাই। আল্লাহ তাআলা যদি ইচ্ছা করেন তাহা হইলে এ স্থলে সে বিবরণ তোমাকে বলিব। হাই যখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে ফিরিয়া আসিল অর্থাৎ এই চক্রের পরে দুনিয়াবি জীবনের প্রতি ইহার বিতৃষ্ণা জন্মিল। এবং অগম্য যে জগৎ ঐ পারে রহিয়াছে উহার জন্য মরিয়া হইয়া উঠিল। যেমন করিয়া ইহা ধ্যানমগ্ন হইয়া প্রথমে একবার উপর্যুক্ত অবস্থায় আসিয়াছিল, এমনকি সহজতর প্রচেষ্টায় সে অবস্থায় উপনীত হইতে পারিয়াছিল, তেমন করিয়া আবার উক্ত অবস্থায় যাইতে চেষ্টা করিতে লাগিল। ধ্যানমগ্ন হইয়া ইহা কাক্সিক্ষত অবস্থাকে পুনরায় হাসিল করিল এবং পূর্বের চাইতে অধিক সময় ইহা উক্ত অবস্থায় অতিবাহিত করিল। অতঃপর ইহা আবার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে ফিরিয়া আসিল। পূর্বোক্ত অবস্থায় ফিরিয়া যাইতে ইহা আবার সচেষ্ট হইল। এহেন পরিস্থিতিতে ইহা অতি সহজেই প্রথম ও দ্বিতীয় বারের চেষ্টা হইতে অতি সহজেই কাক্সিক্ষত পর্যায় হাসিল করিল। প্রতিবারই উক্ত অবস্থায় অতিবাহিত করিবার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।
এই মহিমান্বিত পর্যায়ে প্রবেশ করা ইহার জন্য উত্তরোত্তর সহজ হইতে লাগিল এবং প্রতিবারই অর্জিত পর্যায়ে থাকিবার স্থায়িত্ব প্রলম্বিত হইতে লাগিল। এমনকি পরিস্থিতি এইরূপ হইয়া পড়িল যে, যখন ইচ্ছা করিত তখনই উক্ত অবস্থায় প্রবেশ করিত এবং যদি না চাইত তবে তদবস্থা হইতে বিচ্ছিন্ন হইত না। অতঃপর ইহা এমনাবস্থায় থাকিতে নিজেকে বাধ্য করিত এবং শরীরের কোনওরূপ প্রয়োজন না হইলে এমনাবস্থা ত্যাগ করিত না। ধীরে ধীরে শরীরী প্রয়োজনও ইহা হ্রাস করিয়াছিল। তখন পারতপক্ষে একান্ত প্রয়োজন না পড়িলে ইহা এমনাবস্থা ত্যাগ করিয়া উঠিত না।
সমস্ত শরীর দিয়া ইহা উপরে বর্ণিত উপায়ে তৎপর হইবার পর পরাক্রমশালী, মহান আল্লাহকে রাজি-খুশি করিতে চাহিল। ভাবিল, এইরূপ করিয়া স্বীয় শরীর হইতে পৃথক অবস্থানে যাইতে ইহার ডাক পড়িবে। অতএব এমন করিয়াই স্বীয় ঐশ্বর্য হইতে অনন্তকাল ইহা মুক্ত হইবে এবং শরীরী প্রয়োজনে উক্ত অবস্থায় ধ্যানমগ্ন থাকাকালে ধ্যান হইতে বিচ্যুতি ঘটায় ইহা যেই সমস্ত ক্লেশ পাইয়াছিল সেই সমস্ত হইতেও মুক্তি পাইবে। এমন করিয়াই ইহার দিন গুজরান হইতে লাগিল। জন্মের পর হইতে এইরূপে ইহার জীবনের সপ্তকাল পার হইয়া গেল। ইহা পঞ্চাশৎ বৎসর প্রাপ্ত হইল। তখন ইহার সহিত আবসালের পরিচয় ঘটিল। ইহাদিগের মোলাকাত হইবার ঘটনাবলি এস্থলে বর্ণনা করিতে প্রবৃত্ত হইব। ইনশা আল্লাহ।
হাই ইবনে ইয়াকজানের জন্ম লইয়া যে দুইটি দল বিপরীতধর্মী কথা বলিত তাহাদিগের মধ্যে একটির রায় এইরূপ ছিল যে, হাই পার্শ্ববর্তী দ্বীপে জন্মিয়াছিল। অতি প্রাচীন কালে কিছুসংখ্যক মহাত্মা নবীদের কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল এমন সহিহ মতাবলম্বীদের একটি দল তথায় আসিয়া পড়িল।
একটি দল ছিল এইরূপ যে, অস্তিত্বশীল সমস্ত বাস্তব বস্তুকে উক্ত দলের সবাই রূপকের আদলে বর্ণনা করিত। এমন করিয়া ইহারা বস্তুসমূহের কল্পনা মানবমনে আঁকিত যে সেই সমস্ত চিত্র মানবমনে খোদিত হইয়া যাইত। যেন সেই সমস্ত ঘটনা জনসাধারণের মুখে মুখে ফিরত। এই দলটি উক্ত দ্বীপের চতুর্পার্শ্বে ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল, শক্তিশালী হইতে লাগিল এবং চলিতে-ফিরিতে নজরে পড়িতে লাগিল। এমনকি দ্বীপের রাজা দলটিকে তথায় কায়েম করিলেন এবং স্বীয় প্রজাকে দলটির লোকেদের আদেশ অনুসরণ করিতে এক প্রকার বাধ্য করিলেন।
উক্ত দ্বীপে এইরূপ দুইজন যুবকের জন্ম হইল যাহারা মানসিকভাবে উন্নত গুণের অধিকারী এবং ভালো কিছুর প্রতি ইহাদের নিরন্তর আকাক্সক্ষা। ইহাদের একজনের নাম আবসাল, অপর জনের নাম সালামান। উক্ত দলটির সহিত ইহাদের দুইজনের সাক্ষাৎ ঘটিয়াছিল। দলটিকে তাহারা হার্দিক অভিবাদন জানিয়েছিল। দলটির যত রকমের নিয়মাবলি ছিল সমস্ত কিছু নিজেরা গ্রহণ করিল। সমস্ত কর্মের মধ্যে যেই সমস্ত বাধ্যবাধকতা ছিল তাও গ্রহণ করিল। তাহারা দুইজন উক্ত দলটির প্রতি বন্ধুসুলভ হইয়া উঠিল।
ফুরসত পাইলে ইহারা পরাক্রমশালী মহান আল্লাহর বাখানে ব্যবহৃত যে শব্দাবলি রহিয়াছে, তাঁহার দেবদূত, পরকাল, প্রতিদান, দণ্ডভোগ ইত্যাদি বিষয়ক যে শব্দাবলি রহিয়াছে এই শরিয়তে সেই সমস্ত লইয়া পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানে লিপ্ত হইল।
কিন্তু আবসাল গুপ্ত চিন্তার গহিনে ডুবে গেল, আত্মিক অর্থের অনুসন্ধানের প্রতি অধিক মনস্ক হলো এবং সে সমস্তের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে প্রাণান্ত হলো। আর তাহার বন্ধু সালামান যাহা চাক্ষুষ তাহার সান্নিধ্য পাইতেই পছন্দ করিত, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হইতে দূরত্ব বজায় রাখিত এবং গভীরভাবে ভাবিতে চাহিত না। তদুপরি দৈনন্দিন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা পালন করিতে, কোনও নোংরা কার্য সম্পাদিত হইয়া গেলে আত্মাকে বারংবার ভর্ৎসনা করিতে ও প্রবৃত্তির প্ররোচনা হইতে নিজেকে বিরত রাখিতে দুইজনই সচেষ্ট থাকিত।
এই শরিয়তের মধ্যে এইরূপ কয়েকটি কথন ছিল যাহা পাঠান্তে ইহার মনে হইত যে, এই সমস্ত কথন নির্জনবাস ও নিভৃতচারী হইতে অনুপ্রেরণাদায়ক। সুখ-শান্তি এতদ কর্মেই মিলিবে। ভিন্নরূপ কয়েকটি কথনও উক্ত শরিয়তে ছিল যাহা পাঠান্তে ইহার মনে হইত যে, জনসমাজে বাস করিতে ও পরস্পরের সহিত সাহচর্য বজায় রাখিতে ইহা অনুপ্রেরণাদায়ক।
আবসাল নির্জনের অনুসন্ধান করিতে সচেষ্ট হইল। নিরন্তর চিন্তায় মগ্ন থাকা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ব্যাপিত থাকা ও গূঢ়ার্থ বুঝিতে নিমজ্জিত থাকাই ইহার উদ্দিষ্ট হইল। ইহার প্রকৃতিও ছিল নির্জনতাপ্রিয়। অতএব এইরূপ সাধনায় ব্যাপিত হওয়াই ইহার নিকট গুরুত্ব পাইল। ইহার মনে বদ্ধমূল হইয়াছিল যে, এইরূপ নির্জনবাসেই ইহার মনোবাঞ্ছা পূরণ হইবে।
অন্যদিকে, সালামান জনসমাজের সাহচর্যে থাকিতে সচেষ্ট হইল। ইহার প্রকৃতিই এইরূপ ছিল যে, ইহা চিন্তা করিতে ও স্বেচ্ছায় প্রণোদিত হইয়া কোনও কর্ম করিতে ভয় করিত। সুতরাং জনগণের সহিত অবস্থান করাকেই শ্রেয় জ্ঞান করিল। তাহার নিকট মনে হইতে যে, জনসমাজের সাহচর্যে থাকিলে শয়তানকে তাড়ানো যাইবে, প্রতিবন্ধক চিন্তাকে দূরে হটানো যাইবে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা হইতে নিজেকে রক্ষা করা যাইবে। দুই মতাদর্শের মধ্যে ভিন্নতা থাকায় তাহাদের পারস্পরিক বিচ্ছেদ ঘটে।
হাই বিন ইয়াকজান যে দ্বীপে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছি সে দ্বীপের কথা আবসাল ইতঃপূর্বে শ্রুত হইয়াছিল। অধিকন্তু ইহার প্রাচুর্য, উপযোগিতা ও সমভাবাপন্ন বায়ুর কথাও ইহা জানিত। নির্জনতাপ্রার্থী যে ব্যক্তি তাহার জন্য এইরূপ ঠিকানা আর দ্বিতীয়টি মিলিবে না। তথায় প্রস্থান করিয়া জীবনের যে কয়টি বৎসর অবশিষ্ট রহিয়াছে সে কয়টি বৎসর জনমানবহীন নির্জনে কাটাইয়া দিবে ভাবিয়া মনস্থির করিল।
যাহা কিছু সম্পদ ছিল সমস্ত ইহা জড়ো করিল। তাহার কিছু অংশ দিয়া উল্লিখিত দ্বীপ পর্যন্ত আরূঢ় করিয়া নিতে পারিবে এইরূপ একখানা অর্ণবপোত ইহা কিরায়া লইল। অবশিষ্টাংশ নিঃস্ব-হতভাগ্যদের মধ্যে বিতরণ করিয়া, বন্ধু সালামানকে বিদায় জানাইয়া ইহা সমুদ্রপৃষ্ঠে আরোহণ করিল। মাল্লাগণ ইহাকে ঐ দ্বীপের সমীপে বহন করিয়া আনিল। দ্বীপের বেলাভূমিতে আনিয়া ইহাকে রাখিল এবং ক্রমে ক্রমে দ্বীপ হইতে মাল্লাগণ অন্তর্হিত হইয়া গেল।
অতঃপর উক্ত দ্বীপের মধ্যে আবসাল মহান, পরাক্রমশালী আল্লাহর আরাধনা করিতে লাগিল। তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিল, তাঁহার পবিত্রতার বাখান করিতে লাগিল এবং তাঁহার সুন্দর সুন্দর নাম ও মহৎ গুণাবলি লইয়া ধ্যানে মগ্ন হইল। এমতাবস্থায়, ইহার চিন্তায় কোনও ছেদ ঘটিল না ও মনের মধ্যে কোনও আবিলতাও আসিল না। যখন ইহার খাদ্যগ্রহণ করিবার প্রয়োজন পড়িত তখন ক্ষুন্নিবৃত্তি করিবে দ্বীপের মধ্যে প্রাপ্ত এইরূপ ফলফলাদি ও মৃগয়া হইতে প্রাপ্ত বস্তু ইহা গ্রহণ করিত। উক্ত অবস্থার মধ্যে ইহা কিছুক্ষণ পড়িয়া থাকিত। প্রভুর সান্নিধ্যে গুপ্ত বাকবিনিময়ে ইহার আনন্দের সীমা থাকিত না। এমনটা করিতে পারিয়া ইহা শান্ত-সুনিশ্চিত হইত।
প্রতিদিন ইহা ইহার প্রভুর অনেক অনুগ্রহ ও অগণিত উপহার দেখিতে পাইত। চাহিবামাত্র কিছু একটার প্রাপ্তিঘটা সহজলভ্য করিয়া দিয়াছিলেন তিনি। এমনকি খাদ্যদ্রব্যও। এমনটা হইতে দেখিয়া তাহার প্রতি ইহার বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় হইল এবং ইহার মন খুশিতে ভরিয়া উঠিল। উক্ত সময় হাই বিন ইয়াকজান ইহার মহিমান্বিত অবস্থানে নিমগ্ন হইল। খাদ্যবস্তু যাহা অতি সহজেই সংস্থান হইত তাহা হস্তগত করিতে সপ্তাহান্তে একবার কেবল ইহাকে গুহার বহির্ভাগে দেখা যাইত। তন্নিমিত্তে আবসাল প্রথম দিকে ইহার নজরে পড়ে নাই। কিন্তু ইহা তো দ্বীপের উপকূল ধরিয়া ঘুরিত ও ইহার সর্বত্র চরিয়া বেড়াইত। তবু মনুষ্যপদবাচ্য কিছু ইহার চোখে পড়িল না। তেমন কিছুর লেশমাত্রও ইহার নজরে আসিল না। অতএব এমনটা দেখিতে পাইয়া আবসালের মন অধিক প্রশান্ত হইল। নির্জনবাস ও একাকিত্বের অনুসন্ধান করিতে ইহা যে শেষ পর্যন্ত স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিল তন্নিমিত্তে ইহার মন প্রসারিত হইল।
কোনও একদিন এমনটা সংঘটিত হইল। সেইদিন হাই বিন ইয়াকজান খাদ্যের সন্ধানে বাহির হইয়াছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে দ্বীপের একই দিকে আবসাল বিহার করিতেছিল। উহারা পরস্পর পরস্পরকে দেখিতে পাইল। আবসালের মনে উদয় হইল, উহাও কোনও ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি হইবে যে মানুষ হইতে নির্জনে থাকিবার মতলবে ইহার নিজের মতোই এই দ্বীপে আসিয়া হাজির হইয়াছে। স্বীয় বিশ্বাসের প্রতি ইহা নিঃসংশয় ছিল। যদি পরস্পর মুখোমুখি হইয়া যায়, পরস্পরের সহিত জানাশোনা হইয়া যায় এইরূপ ভাবিয়া ইহা ভীত হইয়া পড়িল। কারণ, ইহার অবস্থাকে নষ্ট করিয়া দিতে এইরূপ ঘটাই কারণ হইবে; ইহার নিজের ও স্বীয় প্রত্যাশার মধ্যে এইরূপ ঘটাই প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ হইবে।
পারতপক্ষে হাই ইবনে ইয়াকজানের বোধগম্য হইল না যে, ইহার সহিত কী ঘটিল। কারণ, ইতঃপূর্বে যেই সমস্ত প্রাণি ইহা পর্যবেক্ষণ করিয়াছিল সে সমস্তের মধ্যে দেখিতে এইরূপ প্রাণি ইহার নজরে পড়ে নাই। চুল ও পশমনির্মিত কৃষ্ণবর্ণের একপ্রকার আবরক ইহার পরিধানে ছিল। দেখিয়া হাই ভাবিয়াছিল, ইহা বুঝিবা ইহার প্রাকৃতিক পরিচ্ছদ। দীর্ঘ সময় ধরিয়া ইহা লইয়া হাই ঘোরের মধ্যে ছিল।
ধ্যান ভগ্ন হইবে এই শঙ্কায় আবসাল পলায়ন করিল। আর হাই তাহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিল। কারণ, বস্তুর প্রকৃত সত্যতা উদ্ঘাটন করাই ইহার প্রকৃতি।
কিন্তু যখন ইহা দেখিল যে আবসাল পলাইয়া যাইতে প্রাণান্ত করিতেছে তখন ক্ষান্তি দিয়া নিজেকে লুকাইয়া ফেলিল যেন আবসাল মনে করে যে, উহাকে যে অনুসরণ করিতেছিল সে চলিয়া গিয়াছে এবং উহার স্বীয় পার্শ্ব হইতে বহু দূর অতিক্রম করিয়াছে। অতঃপর আবসাল নামাজ পড়িতে আরম্ভ করিল। কেরায়াত, দোয়া-খায়ের, রোনাজারি, কাকুতি-মিনতি ও বিহ্বলপ্রার্থনা করিতে লাগিল যেন এই সমস্ত ইহাকে সমস্ত কিছু হইতে অন্যমনস্ক রাখে।
অন্যদিকে হাই বিন ইয়াকজান একটু একটু করিয়া ইহার সমীপবর্তী হইতে লাগিল। হাই সন্নিকটে চলিয়া আসিলেও আবসাল কিন্তু তাহা অনুভব করিল না। হাই এত নিকটে আসিয়া পড়িল যে, ইহা আবসালের কেরায়াত শুনিতে লাগিল, তাসবিহ-পাঠ শুনিতে পাইল, ইহার ঐকান্তিক যাচ্ঞা ও রোনাজারি দেখিতে লাগিল। অতঃপর ইহা এইরূপ সুমধুর সুর, সুসজ্জিত শব্দ শুনিল যাহা ইতঃপূর্বে অন্য কোনও বন্য প্রাণি হইতে শুনিতে পায় নাই।
ইহা আবসালের শারীরিক গঠন ও মুখাবয়বের দিকে তাকাইয়া দেখিল। ইহার অবয়ব দেখিল। দেখিয়া ইহার নিকট সুস্পষ্ট হইল যে, দেহের উপরস্থ ইহার যে আবরক প্রকাশিত হইতেছে তাহা প্রাকৃতিক চর্মের নহে। বরঞ্চ উহার এই পরিচ্ছদ স্বীয় পরিচ্ছদের মতো আরোপিত। উহার বশ্যতা, ঐকান্তিক যাচ্ঞা ও রোনাজারি যখন দেখিল তখন আর সন্দেহের অবকাশ রহিল না যে, যেই সমস্ত সত্তা পরমসত্য সত্তার সহিত পরিচিত উহা তাহাদিগের একজন। এমনটা ভাবিয়া ইহা উহার প্রতি অধিক উৎসুক হইয়া পড়িল এবং উহার কী হইয়াছে, কী কারণে উহা রোনাজারি করিতেছে ও এইরূপ কাকুতি-মিনতি করিতেছে তাহা জানিতে মনোবাঞ্ছা জাগিল। অতএব আবসাল বুঝিতে পারে উহার এইরূপ নিকটে ইহা অগ্রসর হইল। আবসাল প্রাণপণে ধাবিত হইল। উহাকে ধরিতে পারে এইরূপ গতিতে হাই বিন ইয়াকজান উহার পশ্চাদ্ধাবন করিল। কারণ আল্লাহ ইহাকে জ্ঞানের প্রাচুর্য যেমন দান করিয়াছিলেন, তেমনি দৈহিক শক্তির আধিক্যও দান করিয়াছিলেন। সুতরাং ইহা উহাকে পাকড়াও করিয়া এমন শক্ত করিয়া ধৃত করিয়াছিল যাহাতে উহা ছুটিতে না পারে।
আবসাল যখন হাইকে পর্যবেক্ষণ করিল দেখিতে পাইল যে, পশমধারী জন্তুর চর্ম দ্বারা হাই আবৃত এবং ইহার চুল এত দীর্ঘায়িত হইয়াছে তদ্বারা স্বীয় শরীরের অনেকাংশ আচ্ছাদিত হইয়াছে। উহার ক্ষিপ্রগতি ও শক্তিমত্তা দেখিতে পাইল। ইহা দেখিয়া ভীষণ ভীত হইয়া পড়িল। অনুনয়-বিনয় করিয়া কথা বলিতে প্রবৃত্ত হইল। কিন্তু হাই উহার কথার কিয়দংশও বুঝিতে পারিল না। হাইর বুঝিবার কথাও নহে। উহা যে উদ্বিগ্ন হাই কেবল তাহা লইয়াই চিন্তায় পড়িল।
হাই কয়েক প্রজাতির বন্য জন্তুকে দেখিত, অন্যের বিপদের মুহূর্তে শব্দ করিয়া তাহারা উহাকে সান্ত্বনা দিত। উহাদের নিকট হইতে অর্জিত জ্ঞান ইহা বাস্তবায়ন করিতে লাগিল। উহার শিরোপরি স্বীয় হস্ত বুলাইতে লাগিল ও অঙ্গ মর্দন করিতে লাগিল। উহার খোশামুদি করিতে লাগিল। উহাকে পাইয়া আনন্দ-উল্লাস করিতে লাগিল। সমস্ত কিছুই ইহা করিল যেন আবসালের মনের উদ্বেগ দূর হয় এবং উহা বুঝিতে পারে যে, হাই উহার কোনওরূপ অনিষ্ট কামনা করে না।
কোনও বস্তুর গূঢার্থ বুঝিবার প্রতি আবসালের আগ্রহ প্রাচীনতর। ইহা বহু ভাষা অধ্যয়ন করিয়াছিল ও সে সমস্তে দক্ষতাও অর্জন করিয়াছিল। ইহা হাই ইবনে ইয়াকজানের সহিত কথোপকথনে প্রবৃত্ত হইল। যেই সমস্ত ভাষা ইহা জানিত সমস্ত ভাষায় ইহা উহাকে উহার বিবিধ বিষয়াবলি লইয়া প্রশ্ন করিল এবং ইহা বুঝাইতে চেষ্টার ত্রুটি করিল না। সেই সমস্ত বিফল হইল। কিন্তু ইহার এই সমস্ত অশ্রুতপূর্ব ও অজানিতপূর্ব কর্মকাণ্ড দেখিয়া হাইয়ের বিস্ময়ের সীমা রহিল না। কেবল ইহা বুঝিতে পারিল যে, আবসালকে পাইয়া ইহার আনন্দ অশেষ ও ইহা আবসালকে এক প্রকার গ্রহণ করিয়া লইয়াছে। ইহার সাহচর্যে দুইজনই হতবাক হইয়া গেল।
জনবহুল দ্বীপটি হইতে আসিবার মুহূর্তে সঙ্গে আনীত খোরাকির কিয়দংশ ইহার সহিত তখনও ছিল। হাইয়ের প্রতি তাহা ইহা আগাইয়া দিল। হাইয়ের নিকট এই খোরাকি ছিল অদৃষ্টপূর্ব। অতএব ইহা বুঝিতে পারিল না যে, সম্মুখে অর্পিত বস্তুটি কী ?
আবসাল বস্তুটি হইতে খাদ্য গ্রহণ করিল। ঐ বস্তু হইতে খাদ্য গ্রহণ করিতে হাইকে ইশারা করিল। খাদ্যগ্রহণের যেই সমস্ত বিধিনিষেধ ইহা আরোপ করিয়াছিল সেই সমস্ত একবার ভাবিয়া দেখিল। ইহার সম্মুখে অর্পিত বস্তুটির উৎস ইহার জ্ঞাত নহে। কী তাহা ? তাহাকে খাদ্যরূপে গ্রহণ করা কি ইহার উচিত হইবে ? না, উচিত হইবে না ? ভাবিয়া ইহা প্রত্যাখ্যান করিল। আবসাল ক্রমাগত পীড়াপীড়ি করিতে লাগিল, উহা যেন খাইতে প্রবৃত্ত হয় সেই চেষ্টা করিতে লাগিল। এক্ষণে আসিয়া হাই বিন ইয়াকজান উহার প্রতি বিমুগ্ধ হইয়া গেল। আর অধিক প্রত্যাখ্যান করিলে উহা ইহাকে ত্যাগ করিবে এই ভয়ে ভীত হইয়া ইহা তড়িঘড়ি করিয়া খাইতে প্রবৃত্ত হইল।
খাদ্যের আস্বাদ গ্রহণ করিয়া খাদ্যটি ইহার নিকট সুস্বাদু মনে হইল। কিন্তু খাদ্যগ্রহণের বিধিনিষেধ ভঙ্গ করিয়াছিল বলিয়া ইহার নিকট মন্দ অনুভূত হইল। কৃতকর্মের জন্য ইহা অনুতপ্তও হইল। ভাবিল, আবসালকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং ইহার মহিমান্বিত ধ্যানমগ্ন অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করিবার লক্ষ্যে সম্ভাব্য সমস্ত কিছুকে বরণ করিয়া লইবে। কিন্তু, যৎ চিন্তা তৎ কর্ম সম্পাদন অনায়াসে হইল না। সুতরাং ইহা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে ইহা আবসালের সহিতই থাকিবে, যাহাতে আবসালকে লইয়া ইহা কোনওরূপ উদ্বিগ্ন হইয়া না পড়ে। আবসালকে লইয়া কোনওরূপ ব্যাকুলতার অবশিষ্ট রহিল না। অতঃপর কোনওরূপ দুশ্চিন্তা ইহা ভর করিল না। নির্বিঘ্নে ইহা ধ্যানমগ্ন অবস্থায় আত্মনিয়োগ করিল। কিন্তু নিজেকে ইহা আবসালের সাহচর্য হইতে বঞ্চিত করিল না।
অন্যদিকে আবসালও দেখিতে পাইল যে, হাই কথা বলিতে পারে না। অতএব, হাই ইহার পালনীয় ধর্মের জন্য কোনওরূপ অনিষ্টের কারণ হইবে না। হাইকে ইহা কথা বলার শিক্ষা দান করিতে মনস্থির করিল। জ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা দান করিতে আকাক্সক্ষা করিল। আর ইহাই হাইয়ের জন্য আল্লাহর তরফ হইতে প্রাপ্ত সর্ববৃহৎ অনুগ্রহ, তাঁহার অধিকতম নিকটবর্তী হইবার সর্ববৃহৎ সুযোগ।
সর্বপ্রথম আবসাল ইহাকে কথা বলা শিক্ষা দিতে আরম্ভ করিল। বিশেষ বিশেষ বস্তুকে নির্দেশ করিয়া উহাদিগের নাম উচ্চারণ করিতে লাগিল। পুনঃপুনঃ উক্ত নামসমূহ উচ্চারণ করিয়া হাইকে অনুপ্রেরণা প্রদান করিতে লাগিল যেন হাইও এই নাম স্বীয় মুখে তুলিয়া লয়। বস্তুর নাম উচ্চারণ করিবার সময় হাইকে ইহা উক্ত বস্তুর প্রতি অঙ্গুলি দ্বারা নির্দেশ করিত। এমন করিয়া সমস্ত বস্তুর নাম ইহাকে শিখাইল এবং এমন করিয়া ইহাকে শনৈ শনৈ গড়িয়া তুলিল যেন হাই অল্প সময়ের মধ্যে কথা বলিতে পারে।
অতঃপর আবসাল ইহাকে ইহার বিষয়াবলি লইয়া প্রশ্ন করিতে লাগিল। কোন স্থান হইতে হাই এই দ্বীপে আসিয়া পড়িল তাহা জানিতে চাহিল। কিন্তু হাই বিন ইয়াকজান ইহাকে জানাইল যে, স্বীয় উৎস সম্বন্ধে কিছুই ইহার জানা নাই। কাহারা ইহার পিতামাতা তাহাও ইহার জানা নাই। যে হরিণী ইহাকে লালনপালন করিয়া বড় করিয়া তুলিয়াছিল উহার অধিক কিছুই ইহার জানা নাই। সমস্ত কিছু ইহাই উহাকে জ্ঞাত করিল। এমনকি, কেমন করিয়া ইহা মারিফাতের প্রতি অগ্রবর্তী হইল ও স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হইল সে সমস্তও হাই স্বীয় বর্ণনায় অন্তর্ভুক্ত করিল।
সমস্ত কিছু শুনিয়া আবসাল উহার নিকট ঐ সত্য উপলব্ধিসমূহ বর্ণনা করিল। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এই জগতের নিকট অগম্য সত্তাসমূহ যাহারা আবার পরাক্রমশালী ও সুমহান সত্য সত্তা সম্বন্ধে সম্যক অবগত সে সমস্তের কথা বর্ণনা করিল। পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত সত্য সত্তার প্রসঙ্গ উক্ত সত্তার সুন্দর সুন্দর গুণের বর্ণনা করিল। যাহারা ইহার নিকটবর্তী হইয়াছে তাহাদিগের পরমানন্দ এবং যাহারা অবগুণ্ঠনবাসী ও তন্নিমিত্তে ইহাকে দেখিতে না পাইবার তাহাদিগের নিদারুণ যন্ত্রণা―দুই-ই ইহা স্বীয় অভিজ্ঞতার আলোকে যথাসম্ভব বর্ণনা করিল। সমস্ত বস্তু যাহা পরাক্রমশালী ও মহান আল্লাহর শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত, তাঁহার স্বর্গীয় দূত, আসমানি কিতাব, রসুল, শেষ দিবস, বেহেশত-দোজখ কোনও কিছুই যে হাই যাহা অন্তর্বীক্ষণ করিয়াছিল তাহার অভিন্ন―এ লইয়া আবসাল কোনওরূপ সন্দেহ পোষণ করিত না। অতএব ইহার অন্তর্চক্ষু খুলিয়া গেল, চিন্তাশক্তি জ্বলিয়া উঠিল। ইহার নিকট মনে হইল যে, ইহার কাছে যাহা যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মনে হইয়াছে এবং যাহা প্রথাগত দুইয়ের মধ্যে কোনও ফারাক নাই। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পথসমূহ ইহার নিকটবর্তী হইল। যাহা ইহার নিকট স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় না, যাহা স্বয়ং উন্মুক্ত না হইলে আবদ্ধ থাকে, যাহা স্বয়ং প্রকাশিত না হইলে অধরাই থাকে―এ সমস্ত ব্যতীত ঐশ্বরিক বিধানে আর কোনওরূপ সমস্যা ইহার জন্য অবশিষ্ট রহিল না। এবং ইহাও ধীশক্তির অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গেল।
অতঃপর হাই ইবনে ইয়াকজানকে ইহা প্রশংসা ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখিল। ইহা নিশ্চিত হইল যে, হাই আল্লাহর অলিগণের একজন, যাহাদিগের না কোনও ভয়ভীতি রহিয়াছে না তাহারা চিন্তাগ্রস্ত হইবে। অতএব, ইহা হাইর সেবায় নিয়োজিত হইল ও উহাকে অনুকরণ করিতে সচেষ্ট হইল এবং স্বজাতির নিকট হইতে যেই সমস্ত ধর্মীয় বিধিনিষেধ ইহা শিখিয়াছিল সে সমস্তের মধ্যে যাহা ইহার পরস্পরবিরোধী মনে হইত সেই সমস্ত কিছুর জন্য ইহা হাইর নির্দেশনা গ্রহণ করিতে স্থিরচিত্ত হইল।
হাই বিন ইয়াকজান উহার সমস্ত কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিল। আবসাল ইহার স্বীয় দ্বীপের ব্যাপারগুলি উহার নিকট বর্ণনা করিতে লাগিল। ঐ দ্বীপের কী প্রতিবেশ, উহাদিগের নিকট এই ধর্ম আসিবার পূর্বে উহাদিগের জীবনধারা কীরূপ ছিল এবং ধর্ম আসিবার পর তদাকার অবস্থা কীরূপ হইল সব বর্ণনা করিল। ঐশ্বরিক জগতের বর্ণনা, বেহেশত-দোজখ, পুনরুত্থান, হাশর-নাশর, শেষ বিচার, মিজান, সিরাত এতদ্বিষয় লইয়া উক্ত ধর্মীয় বিধানের যাহা বক্তব্য সমস্ত হাইকে বলিল।
হাই বিন ইয়াকজান সেই সমস্ত বিলকুল বুঝিতে পারিল। নিজের পবিত্র বৈঠকে যাহা অবলোকন করিয়াছিল সে সমস্তের কোনওটির ব্যত্যয় এ সমস্তে দেখিল না। অতএব ইহা জানিল যে, যিনি আবসালের নিকট এ সমস্ত বর্ণনা করিয়াছেন তিনি সঠিক কথাই বলিয়াছেন। তাঁহার বর্ণনায় তিনি সঠিক, তাঁহার বাক্যে তিনি তাঁর প্রতিপালকের রসুল। অতএব, হাই তাঁহার প্রতি ঈমান আনিল, তাঁহার সত্যনিষ্ঠায় আস্থা আনিল এবং তাঁহার রিসালাতের প্রত্যয়ন করিল।
অতঃপর উক্ত রসুল কী কী ধর্মীয় আবশ্যকতা লইয়া আসিয়াছিলেন ও সে সমস্তকে উপাসনার অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলেন সে সম্পর্কে আবসালকে প্রশ্ন করিতে লাগিল। আবসাল উহাকে সালাত, জাকাত, সিয়াম, হজ ও অন্যান্য বাহ্যিক কর্মকাণ্ডের সদৃশ কিছু কর্মকাণ্ডের কথা বলিল। হাই সেই সমস্ত গ্রহণ করিল। নিজের উপর সেই সমস্ত আরোপ করিয়া যাঁহাকে পরম সত্য বলিয়া ইহার মন প্রতিপন্ন করিল তাঁহার আদেশসমূহ আরাধনা হিসেবে পালন করিতে ইহা নিজেকে একপ্রকার বাধ্য করিল।
কেবল ইহার মনের গহিনে দুইটি জিজ্ঞাসা বাকি রহিয়াছিল যাহা লইয়া ভাবিতে বসিলে ইহা বিস্ময়ে হতবাক হইত। কিন্তু এই প্রজ্ঞার উৎসমূল এতদ্দ্বয়ের কোথায় তাহা বুঝিতে পারিত না। একটি জিজ্ঞাসা হইল: যেখানে পরম সত্য সত্তা পদার্থরূপতা হইতে বিমুক্ত ও বস্তুর ধারণা হইতে অব্যাহত, সেখানে মানুষজন পরম সত্য সত্তার অস্তিত্বের সঙ্গে মূর্তকরণ ও বস্তুর বিশ্বাসের ধারণাকে একীভূত করিয়াছে, তাহা হইল কীসের নিমিত্তে উক্ত রসুল মানুষজনের নিকট ঐশ্বরিক জগতের বস্তুর বর্ণনা পেশ করিতে গিয়া রূপকের আশ্রয় লইয়াছেন, উহাকে উন্মোচন করা হইতে বিরত ছিলেন ? পুণ্যের প্রতিদান ও পাপকর্মের শাস্তি প্রদানের বর্ণনার ক্ষেত্রেও কেন তিনি এমনটা করিয়াছেন ? অন্য জিজ্ঞাসাটি হইল : যেখানে মানুষজন মূল্যহীন কর্মে নিয়োজিত হইতে সদা তৎপর থাকে ও সত্য বর্জন করিয়া চলে সেখানে কেনই-বা তিনি নগণ্য কিছু ধর্মীয় বিধিবিধান ও উপাসনার কর্তব্য জনগণকে দিয়া উহাদিগকে অর্থের পিছু পিছু ছুটিবার ও অন্নের সংস্থান করিবার অনুমতি প্রদান করিয়াছেন ? এই ক্ষেত্রে উহার রায় ছিল এইরূপ যে, প্রাণ তিষ্ঠিবার জন্য ন্যূনতম যাহা প্রয়োজন তাহার অধিক ভক্ষণ করা অবাঞ্ছনীয়। আর অর্থ বলিতে লোকে কী বুঝিতে পারে উহার নিকট ছিল তাহা দুর্বোধ্য।
জাকাত ও ইহার বিতরণ, বিক্রয়, কুসিদ, তদ্বিষয়ক সীমা ও শাস্তির মতো অর্থসংক্রান্ত বিষয় লইয়া ধর্মীয় যে বিধান তাহা ইহা পর্যবেক্ষণ করিল। সমস্ত কিছু ইহার নিকট উদ্ভট মনে হইল। এ সমস্তকে ইহা বাড়াবাড়ি মনে করিল। তখন ইহা বলিল: মানব যদি সত্যকে উপলব্ধি করিত তবে ইহা এ সমস্ত অনর্থক বস্তুকে পাশ কাটাইয়া সত্যকে গ্রহণ করিত ও সত্য লইয়াই সন্তুষ্টচিত্ত হইত। জাকাতের জন্য দাবিদার কোনও ব্যক্তিকে তখন পাওয়া যাইত না। কিংবা চৌর্যবৃত্তির দায়ে হস্ত কর্তিত হইবে বা জনসম্মুখে লুণ্ঠনের দায়ে প্রাণসংহার হইবে এইরূপ বিশেষ কেহকে সহজে পাওয়া যাইত না।
ইহার চিন্তা ইহাকে এইরূপ ভাবনায় নিপতিত করিল যে, প্রতিটি মানব অত্যুচ্চ মানের প্রবৃত্তির অধিকারী, ক্ষুরধার উপলব্ধির অধিকারী ও দূরদর্শী মননের অধিকারী। কিন্তু ইহা মোটেই জানিত না যে, মানবের মধ্যে স্থূলবুদ্ধি, ত্রুটিবিচ্যুতি, মন্দ মতি ও লঘু মানসিকতাও রহিয়াছে। তাহারা গবাদি পশুতুল্য। ক্ষেত্রবিশেষে গবাদি পশুর চাইতেও নিকৃষ্ট।
মানুষজনের প্রতি অনুকম্পা যখন ইহার প্রবল হইয়া উঠিল এবং যখন স্বীয় হস্তে ইহাদিগের পরিত্রাণের ব্যাপারে ইহা আশান্বিত হইয়া উঠিল তখন ইহাদিগের নৈকট্য লাভ করিতে, ইহাদিগকে সত্য সম্বন্ধে বর্ণনা করিতে ও সত্যের দিশা দেখাইতে ইহা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। বন্ধু আবসালের সহিত এতদ্বিষয়ে ইহা পরামর্শ করিল। বন্ধুর নিকট জানিতে চাহিল যে, উক্ত মানুষজনের নিকট উপনীত হইবার কোনও উপায় করা যায় কি না। আবসাল বন্ধুকে ঐ মানব সম্প্রদায় সম্বন্ধে অবগত করিল। উহাদিগের ত্রুটিগত প্রবৃত্তি ও আল্লাহর নির্দেশ হইতে বিমুখতা সমস্ত অবগত করিল। কিন্তু ইহা সে সমস্তের কিছুই উপলব্ধি করিতে পারিল না। যেমনটা ইহা করিতে ইচ্ছাপূরণ করিয়াছিল তেমনটাই করিতে একাগ্রচিত্ত থাকিল।
আবসাল অভিলাষী হইয়া উঠিল। ভাবিল যে, ঐ সমস্ত ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কতক দল ব্যক্তি রহিয়াছে যাহারা পরিত্রাণের নিমিত্তে উন্মুখ ও যাহারা মারিফাতের জ্ঞানের সহিত পরিচিত, তাহাদিগের হেদায়েত হাইয়ের হাতে ঘটিবে। সুতরাং হাইয়ের সহিত একমত হইয়া সমুদ্রের তীরের নিকটবর্তী হওয়া বাঞ্ছনীয় মনে করিল। ইহার নিকট রাত ও দিনের মধ্যে কোনও পার্থক্য রহিল না। হয়তো মহান আল্লাহ ইহাদের দুইজনের জন্য সমুদ্র অতিক্রম সহজ করিয়া তুলিবেন। বন্ধুদ্বয় উক্ত আকাক্সক্ষায় নিবেদিত হইল। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিতে লাগিল যেন আল্লাহ্ ইহাদিগের কর্ম সিদ্ধি করিয়া দেন।
পরাক্রমশালী মহান আল্লাহর হুকুমে সমুদ্রের একটি বহিত্র দিকভ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। বায়ু ও উত্তাল ঢেউ ইহাকে দ্বীপের কূলে লইয়া আসিল। যখন ইহা স্থলভূমির নিকটে আসিল ইহার অভ্যন্তরস্থ যাত্রীরা সমুদ্র সৈকতে দণ্ডায়মান দুইজনকে দেখিতে পাইল। উহারা দণ্ডায়মান দুই ব্যক্তির নিকটে আসিলে আবসাল উহাদিগের সহিত কথা বলিল। উহাদিগের সহিত লইয়া যাইতে অনুরোধ করিলে উহারা তাহা রক্ষা করিল। দুইজনকে উহারা বহিত্রে তুলিয়া লইল। আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত এক মৃদুমন্দ বায়ু বহিত্রটিকে স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে উদ্দিষ্ট দ্বীপটির তীরে লইয়া আসিল। অতঃপর দুই বন্ধু বহিত্রটি হইতে অবতরণ করিল ও নগর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিল।
আবসালের সুহৃদসখা যাহারা ছিল তাহারা আবসালকে ঘিরিয়া ধরিল। হাই বিন ইয়াকজান সম্বন্ধে আবসাল তাহাদিগের নিকট এক অভিজ্ঞান পেশ করিল। অতঃপর হাইকে ইহার চতুর্পার্শ্ব হইতে ঘিরিয়া রহিল ও ইহার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইল। লোকের জমায়েত বাড়িতে লাগিল, তাহারা ইহার প্রশংসা কীর্তন করিতে লাগিল ও ইহার প্রতি শ্রদ্ধাবনত হইল। আবসাল ইহাকে অবহিত করিয়াছিল যে, এই দলটি অন্য সমস্ত মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে বোধশক্তি ও বিচক্ষণতার নৈকট্যবাসী। আর যদি এই দলটিকে প্রশিক্ষিত করিতে ইহা ব্যর্থ হয় তাহা হইলে অন্য সমস্ত সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সফল হইবার কোনও সম্ভাব্যতা নাই।
আবসালের বন্ধু সালামান ছিল ঐ দ্বীপের প্রধান ক্ষমতাধর। এই সেই সালামান যাহার কথা ইতঃপূর্বে গল্পচ্ছলে স্মরিত হইয়াছিল। ইহা গোত্রের সহিত সহাবস্থানে আস্থাশীল ছিল, বিচ্ছিন্ন থাকিতে মোটেই পছন্দ করিত না [বিচ্ছিন্নতা নিষিদ্ধ করিতে বলিত]। হাই বিন ইয়াকজান ইহাদিগকে জ্ঞান দান করিতে এবং হিকমতের গুপ্তভান্ডার উন্মোচন করিতে আরম্ভ করিল।
যেই-না ইহা দৃশ্যমান বস্তু সম্বন্ধে স্বীয় মন্তব্য একটু একটু করিয়া উত্থাপন করিল ও দ্বীপবাসী যেমন করিয়া এ যাবৎ সেই সমস্ত সম্বন্ধে ধারণা পোষণ করিত তাহারা দেখিল যে, হাইয়ের মন্তব্য সে সমস্তের বিরুদ্ধাচরণসূচক তখন তাহারা হাইকে লইয়া সংকোচ বোধ করিতে শুরু করিল, হাই যাহা বলিত তাহাতে তাহাদিগের অন্তর হাইয়ের প্রতি বিতৃষ্ণ হইয়া উঠিতে লাগিল এবং তাহার মনক্ষুণ্ন হইয়া উঠিল। কিন্তু মুখে ইহার জন্য কোনওরূপ অসন্তুষ্টির ছাপ ফুটাইয়া তুলিত না। কারণ, ভিনদেশী বলিয়া ইহাকে তাহারা শ্রদ্ধা করিত এবং আবসালের খাতিরে কিছু বলিতে চাহিত না।
নিশিদিন এমন যত্ন করিয়া দ্বীপের অধিবাসীগণকে ইহা বুঝাইতে থাকিল। কখনও একান্তে কখনও প্রকাশে তাহাদিগের নিকট সত্যকে প্রকাশ করিতে থাকিল। ইহাতে হাইয়ের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব ও বিরাগের পরিমাণ বর্ধিত হওয়া ব্যতীত আর কিছুই হইল না। যাহাই হোক, তাহারা সদগুণ পছন্দ করিত ও সত্যকে জানিতে চাহিত। তথাপি তাহাদিগের প্রবৃত্তি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। আর এই ত্রুটিপূর্ণ প্রবৃত্তির নিমিত্তে তাহারা সত্যকে সত্যের পথ হইতে খুঁজিত না, সঠিক পন্থা অবলম্বন করিয়া তাহাকে ধরিত না এবং সত্যের দ্বীপের তলব করিত না। অধিকন্তু, তাহারা অনুসরণীয়দের পদ্ধতির অনুকরণে মারিফাতকে খুঁজিত না। এতদ্বিষয় অবলোকন করিয়া হাই তাহাদিগের ইষ্টসাধনে হতাশ হইল। তাহাদিগের নিকটে ইহার মতের প্রাধান্য অল্প বলিয়া তাহাদিগের ইষ্টসাধনের আকাক্সক্ষা ইহার মরিয়া যায়।
অতঃপর ইহা মানব সম্প্রদায়ের কয়েকটি স্তরকে পর্যবেক্ষণ করিল। ইহা বুঝিতে পারিল যে, প্রতিটি সম্প্রদায় স্বীয় বিত্তবিভব লইয়া আনন্দে মশগুল। [সূরা মুমিনুল ৫৩] স্বীয় প্রবৃত্তিকে ও স্বীয় কামনা-বাসনাকে তাহারা উপাস্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছে। দুনিয়ার যাবতীয় বিলাস-ব্যসনে তাহারা ব্যাপৃত রহিয়াছে। প্রাচুর্য তাহাদিগকে গাফেল করিয়া রাখিয়াছে। এমনকি কবরে যাইবার পূর্ব পর্যন্ত তাহারা গাফেল রহিয়া যাইতেছে। উত্তম পরামর্শ তাহাদিগের কোনও উপকারে আসে না। সুন্দর বাক্যে, সুন্দর কথায় তাহারা নির্বিকার রহিয়া যায়। তাহাদিগের সহিত তর্ক করিলে কেবল তাহাদিগের গোয়ার্তুমিই বৃদ্ধি পায়।
হিকমতের কথা যদি বলিতেই হয় তাহা হইলে বলিব যে, হিকমত অর্জন করিবে তেমন কোনও পথ তাহাদিগের নিমিত্তে সৃজিত হয় নাই। এবং তাহারা ইহার অংশীদারও নহে। মূঢ়তায় তাহারা প্লাবিত হইয়া থাকে ও তাহারা যাহাই অর্জন করুক না কেন তদ্বারা তাহাদিগের হৃদয়ে মরিচা পড়ে। তাহাদিগের হৃদয়ে, কর্ণে ও চক্ষুতে আল্লাহ মোহর আঁটিয়া দিয়াছেন এবং তাহাদিগের জন্য রহিয়াছে নিদারুণ শাস্তি।
অতঃপর যখন ইহা দেখিতে পাইল যে, শাস্তির আচ্ছাদনে তাহারা চতুর্পার্শ্ব হইতে পরিবেষ্টিত হইয়াছে, পর্দার অন্ধকার তাহাদিগের উপর নিপতিত হইয়াছে এবং নগণ্য কয়েকজন ব্যক্তি ব্যতীত তাহাদিগের সর্বজন স্বীয় ধর্মকে দুনিয়াবি বলিয়া ধারণা করে, স্বীয় ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাকে লঘুভার ও আয়াসার্জিত ভাবিয়া সে সমস্তকে স্বীয় পৃষ্ঠে ফেলিয়া সেই সমস্ত দ্বারা সুলভ বস্তু ক্রয় করিয়াছে। ব্যবসায় ও বিকিকিনি আল্লাহ তায়ালার স্মরণ হইতে তাহাদিগকে গাফেল করিয়া রাখিয়াছে এবং তাহারা সেই দিবসের কথা ভাবিয়া ভীতসন্ত্রস্ত হয় না যে দিবসে তাহাদিগের আত্মা ও দৃষ্টিসমূহ উলটিয়া যাইবে। ইহার নিকট সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হইল যে, যাহা উদ্ঘাটন করিবার মনোবাঞ্ছা লইয়া ইহা তাহাদিগের নিকট আসিয়াছিল তাহা লইয়া অধিক বক্তব্য প্রকাশ কোনও কাজে আসিবে না এবং এই মাত্রার উপরে অধিক পরিমাণ ধর্মীয় বাধ্যবাধ্যকতা তাহাদিগের স্কন্ধে তুলিয়া দিলে তাহারা তাহা মানিয়া লইবে না। এবং অধিকাংশ জনগণ ধর্মীয় বিধান হইতে যাহা প্রাপ্ত হইয়াছে তাহা দুনিয়াভী জীবনধারা সহজতর করিতেই কেবল ব্যবহার করে এবং লক্ষ রাখে যেন তাহা করিতে গিয়া স্বীয় স্বার্থ বিনষ্ট না হয়। অল্প কয়েকজন ব্যতিক্রম ব্যতীত তাহারা পরবর্তী সুখশান্তি লভিতে পারে না। ব্যতিক্রম বলিতে তাহাদিগের কথা স্মরণ করিতেছি যাহারা পরজীবনের শস্য চাষ করিতে আশা করে ও যাহারা উক্ত কর্মে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে। তাহারাই ঈমানদার ব্যক্তির দলগত। কিন্তু যাহারা স্বেচ্ছাচারী হয় ও দুনিয়াবি জীবনকে প্রাধান্য দান করে জাহান্নামের অগ্নি তাহাদিগের জন্য চিরনির্ধারিত। সুতরাং যখন ইহা ঘুম হইতে জাগ্রত হয় ও যখন পুনরায় ঘুমাইতে যায় এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে যদি তুমি ইহাদিগের আমলসমূহ পর্যবেক্ষণ করো তাহা হইলে কী সবচাইতে বেশি ক্লান্তিকর বলিয়া মনে হইবে, কী সবচাইতে বেশি দুর্দশার কারণ বলিয়া মনে হইবে ? ঘৃণার্হ কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় ব্যতীত তুমি আর কিছুই দেখিবে না। দেখিবে সেই সমস্ত উদ্দিষ্ট হাসিল করিতে কী তাহাদিগের অনুনয়-বিনয়! হয়তো তাহারা সম্পদ পুঞ্জীভূত করিতেছে, আমোদ-প্রমোদে আকণ্ঠ নিমজ্জমান রহিয়াছে, যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করিতেছে, ক্রোধ প্রশমিত করিতেছে, যশ-খ্যাতি অর্জন করিতেছে, ধর্মীয় বিধানে সজ্জিত কর্মকাণ্ডের একটি-দুইটি সম্পাদন করিতেছে অথবা নিজস্ব গ্রীবা রক্ষা করিয়া চলিতেছে। আর এ সমস্তই অতল সমুদ্রে অন্ধকারের পর অন্ধকার। তোমাদিগের অভ্যন্তরে এমন কেহ নাই যে তথায় প্রবেশ্যমান হইবে না। তোমাদিগের প্রতিপালক কর্তৃক গৃহীত ইহা এক অনিবার্য সিদ্ধান্ত।
মানবজাতির অবস্থা অনুধাবনদৃষ্টে এবং যখন দেখিল যে, ইহাদিগের সিংহভাগই নির্বাক পশুতুল্য তখন ইহার বোধোদয় হইল এই বলিয়া যে, রাসুলগণ যেই সমস্ত প্রজ্ঞা, নিদর্শন ও সামঞ্জস্য বিধানের কথা বলিয়া গিয়াছেন এবং যেই সমস্ত ধর্মীয় বিধিবিধানের অন্তর্ভুক্ত বটে সে সমস্তর অন্যথা সম্ভব নহে কিংবা সে সমস্তর পরিবর্তনও সম্ভব নহে। প্রতিটি কর্মের নিমিত্তার্থে নিযুক্ত ব্যক্তি রহিয়াছে এবং যাহাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হইয়াছে সে উক্ত কর্মের জন্য যথার্থ: ইতঃপূর্বে যাহারা অন্তর্হিত হইয়াছিল আল্লাহ্ তাহাদিগের সহিত এমনই বিহিত করিয়াছিলেন এবং আল্লাহর যে বিহিত তাহাতে আপনি অন্যথা পাইবেন না।
অতঃপর সালামান ও তাহার মিত্রদের সান্নিধ্যে ইহা গমন করিল এবং তাহাদিগকে যাহা বলিয়াছিল তন্নিমিত্তে ক্ষমা চাহিল। মনক্ষুণ্ন হইয়া থাকিলে মন হইতে রাগ-খেদ বাহির করিয়া দিতে অনুরোধ করিলেন। তাহাদিগকে জানাইলেন যে, তাহাদিগের যেমনটা মতি ইহারও তেমনটাই এবং তাহাদিগের যেমন পথনির্দেশনা ইহাও তেমনটা অনুসরণ করিয়া থাকে। তাহাদিগকে ইহা উপদেশ দিয়া বলিল যে, ধর্মীয় বিধানের আওতার মধ্যে যাহা পড়ে ও বাহ্যিক যেই সমস্ত আবশ্যিক কর্মকাণ্ড রহিয়াছে সেই সমস্ত যেন তাহারা আবশ্যিকরূপে পালন করে। যেই সমস্ত কর্মকাণ্ডের কোনও অর্থবহতা নাই সে সমস্তে যেন তাহারা নিমজ্জিত না হয়। অদৃশ্য সত্তায় যেন তাহারা বিশ্বাস রাখে ও তাহাতে সম্মত হয়। অভিনব ধারণা ও জৈবিক তাড়না হইতে যেন তাহারা দূরত্ব বজায় রাখে। পুণ্যবান পূর্বসূরিদিগকে যেন তাহারা অনুসরণ করিয়া চলে ও অভিনবত্বকে বর্জন করিয়া চলে। সাধারণ জনগণ যেমন করিয়া ইতঃপূর্বে ধর্মীয় বিধানকে পায়ে ঠেলিয়া এই পৃথিবীতে আলিঙ্গন করিয়াছিল তাহারা যেন তেমনটা না করে তাহাই তাহাদিগকে ইহা নির্দেশ দান করিয়াছিল। অবশ্য ইতঃপূর্বেও তাহাদিগকে ইহা উক্ত ব্যাপারে চরম সতর্কতা জ্ঞাপন করিয়াছিল। ইহা ও ইহার মিত্র আবসাল জানিত যে, এই ত্রুটিপূর্ণ ও বশ্য মনুষ্য সম্প্রদায়টির এতদ্ব্যতীত মুক্তিলাভের আর দ্বিতীয় রাস্তা নাই। এমতাবস্থা হইতে তাহাদিগকে যদি অনুধ্যানের পর্যায়ে উত্তোলিত করিয়া আনা হয় তাহা হইলে তাহাদিগের অবস্থা মন্দতর হইবে। সৌভাগ্যবান যাহারা তাহাদিগের দলভুক্ত হওয়া ইহাদিগের পক্ষে অসম্ভব। স্বীয় স্থানে ইহারা টলিতে থাকে, ইহাদিগের অবস্থা পূর্বের চাইতে অধিকতর মন্দ হয় এবং ইহাদিগের পরিণাম নিকৃষ্ট হয়। আর যদি যে রূপ অবস্থায় ইহারা বিরাজ করিতেছে সেটি বহাল থাকে এমনকি অবধারিত মৃত্যুও চলিয়া আসে তাহা হইলেও ইহারা নিরাপদ থাকিবে ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত হইবে। কিন্তু উৎকৃষ্ট ব্যক্তিরা উৎকৃষ্টই থাকিবে এবং তাহারা আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হইবে।
অতঃপর ইহারা দুইজন তাহাদিগের নিকট হইতে বিদায় লইল। তাহাদিগকে ত্যাগ করিয়া স্বীয় দ্বীপে প্রত্যাবর্তনের জন্য মন্থর গতিতে আগুয়ান হইল। পরাক্রমশালী ও মহান আল্লাহ্ শেষ পর্যন্ত দুইজনের দ্বীপে প্রত্যাবর্তন সহজ করিয়া দিলেন। হাই বিন ইয়াকজান তথায় উপনীত হইয়া পূর্বের মতো পবিত্র আসনে উদ্যমী হইল যাহাতে ইহা পূর্ববৎ অবস্থানে ফিরিয়া যাইতে পারে। আবসাল ইহাকে অনুকরণ করিল যাহাতে ইহার মতো হইতে পারে। এমনকি ইহার প্রায় নৈকট্যে উপনীতও হইল। মৃত্যু অবধি ইহারা দুইজন দ্বীপের মধ্যে আল্লাহর ইবাদত করিতে লাগিল।
আল্লাহ ইহাকে ও আমাদিগকে স্বীয় চেতনা দ্বারা আলম্বিত করেন। হাই বিন ইয়াকজান ও আবসাল-সালামানের কিসসা হইতে ইহাই জানিতে পারিলাম। শব্দের এমন সমন্বয় অন্য কিতাবে মিলিবে না। এমনকি সাধারণ কোনও বক্তব্যেও এমনটা অশ্রুতপূর্ব। কেবল গুপ্ত জ্ঞানে এমনটা লব্ধ হয়। আল্লাহর জ্ঞান যাহাদিগের রহিয়াছে তাহারাই এটা গ্রহণ করে। আল্লাহ সম্বন্ধে যাহারা অনবহিত তাহারা এটা হইতে উদাসীন থাকে।
আমাদিগের পুণ্যাত্মা পূর্বপুরুষ যাহারা ছিলেন তাহারা উক্ত ব্যাপারে স্বল্পবাক ছিলেন, বাকসংযম অবলম্বন করিয়া চলিতেন। এত বাক্য ব্যয় করিয়া আমরা উহাদিগের রীতি লঙ্ঘন করিয়াছি। অন্যদিকে, আমাদিগের সমসাময়িকে দার্শনিকম্মন্য কর্তাব্যক্তির প্রকাশিত অসৎ মতামত এই গুপ্তবস্তু অনাবৃতকরণে ও তাহার অবগুণ্ঠন ছিন্নকরণে প্রণোদনাস্বরূপ। এমনকি তাহারা ঈদৃশ গুপ্তবস্তুর খবর রাষ্ট্র করিয়াছে ও তাহার দ্বারা সংঘটিত অনিষ্টও চতুর্পার্শ্বে পরিব্যাপ্ত হইয়াছে। দুর্বল ব্যক্তি লইয়া আমরা আতঙ্কে থাকি। কারণ, তাহারা আম্বিয়া-এ-কেরাম (আল্লাহ্)-এর ঐতিহ্যকে দূরে নিক্ষেপ করিয়া স্থূলবুদ্ধি ও নির্বোধ লোকেদের ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহে। তাহারা এমনটা ভাবিয়া উক্ত কর্মে লিপ্ত হয় যে, ঐ অসৎ মতামতসমূহ স্বীয় লোকেদের অভ্যন্তরেই গুপ্ত থাকিবে, অধিক কেহ সেইসমস্ত জানিবে না। অতএব, এমন করিয়া অসৎ মতামতসমূহের প্রতি তাহাদিগের আকর্ষণ বাড়িয়া চলে ও তাহারা সেসমস্তে মোহিত হয়।
অতএব, তাহাদিগকে যেন যথার্থ পথের দিকে টানিতে পারি এবং যেন তাহাদিগকে নিজেদের পথ হইতে সরাইয়া আনিতে পারি তাহার নিমিত্তে এমন গুপ্ততমস্য গুপ্তের কয়েক প্রস্থ এ স্থলে উন্মোচন করিয়া বর্ণনা করিলাম। যৎসামান্য এই কয়টি পৃষ্ঠায় স্বচ্ছ অবগুণ্ঠনের আড়ালে ও সূক্ষ্ম পর্দার অন্তরালে যাহা আমরা বর্ণনা করিলাম তাহা গুপ্ততমস্য গুপ্তকে ভেদ করিবার নামান্তর নহে। কিন্তু যাহারা আকলমান্দ তাহারা অতি সহজেই অবগুণ্ঠন ছিন্ন করিবে। আর যাহারা ইহাকে অতিক্রম করিবার যোগ্য নহে তাহাদিগের জন্য এই অবগুণ্ঠন জগদ্দল পাথরবৎ হইবে। এমনকি তাহারা ইহাকে লঙ্ঘন করিতে পারিবে না।
আমার যে ভ্রাতৃবৃন্দ উক্ত আলাপে আমার সহমত তাহাদিগের নিকট আমি ওজর প্রার্থনা করিতেছি। তাহাদিগের মত হয়তো এইরূপ যে, আমার বর্ণনায় আমি যত্নবান ছিলাম না কিংবা সচেষ্ট ছিলাম না। তাহারা যেন ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন। এমন কর্ম আমি সম্পাদন করিলাম না। কারণ, লোকেদের দৃষ্টির অগম্য এইরূপ কোনও উচ্চ অবস্থানে যদি আমি ইহাকে উত্তোলিত করিতাম তাহা হইলে লোকেদের দৃষ্টি উক্ত অবস্থান হইতে পিছলাইয়া পড়িত। উক্ত পথে প্রবেশ করিবার নিমিত্তে লোকেদের যাহাতে উদ্গ্রীব করিয়া তুলিতে পারি, লোকেদের উৎসাহকে যেন জাগাইতে পারি সেই জন্য আমি এমন করিয়া বর্ণনা করিলাম।
আল্লাহর নিকট আমি ক্ষমা প্রার্থনা করি। তাঁহার অনুগ্রহের কাঙাল আমি। স্বীয় মারিফাতের পরিষ্কার জ্ঞান তিনি আমাদিগকে দান করিয়া আনুকূল্য দান করেন, অনুকম্পা বর্ষণ করেন। ভাই আমার, এত সমস্ত সাহায্য করিবার নিমিত্তে আপনি নিজেকে নিয়োজিত করিয়াছেন। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। বরকত দান করুন।
পাদটীকা
১ মহাবিষুব
২ জলবিষুব
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



