মাদারীপুরে নজরুল ইসলাম : প্রসঙ্গ : বিপ্লবী ‘শান্তিসেনা’ এবং ‘মৎস্যজীবী সম্মেলন’ : প্রথমা রায়মণ্ডল

দুর্লভ
প্রাক্কথন : নজরুলের বিপ্লবতীর্থ মাদারীপুর-দর্শন
কাজী নজরুল ইসলাম মনে ও মননে ছিলেন বিদ্রোহী-সংগ্রামী―যাঁর ঐকান্তিক চাওয়া ছিল স্বরাজ এবং পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল-মুক্তি। আর সে কারণেই তিনি ছিলেন ব্রিটিশ-সরকার বিরোধী, প্রতিবাদী এবং ব্যাপকার্থে বিপ্লবী। তিনি বোমা-পিস্তল হাতে তুলে নেননি বটে, কিন্তু যাঁরা এই সব আগ্নেয়াস্ত্রসহ স্বাধীনতাযুদ্ধে অগ্রগামী ভূমিকা নিয়েছিলেন, নজরুল ছিলেন তাঁদের এক প্রিয় বান্ধব। আর তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ ও বিদ্রোহাত্মক কিছু কবিতা এবং শেকলভাঙার রণসঙ্গীত ছিল তাঁর সংগ্রামের সাংস্কৃতিক অস্ত্র। তিনি কলমকে বানিয়েছিলেন শাণিত কৃপাণ। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দল গড়ে ও নির্বাচনী জনসভায়-সম্মেলনে যোগ দিয়ে, বলতে গেলে একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে সম্মুখ-সমরে নেমেছিলেন তিনি। নিজের সংবাদপত্রকে (লাঙল) রাজনৈতিক প্রচারের মুখপত্র বানিয়ে, সরাসরি সরকারবিরোধিতায় নেমে জেল খেটেছেন। শোষিত-পীড়িত-নিষ্পেষিত এবং সর্বোপরি প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে জীবনভর তিনি জনগণের সঙ্গে ছিলেন, পাশে ছিলেন। ‘বিপ্লবতীর্থ’ মাদারীপুরের প্রতি তাঁর যেন একটা অবচেতন টান তিনি অন্তরে অনুভব করেছিলেন। তবে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চল থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। ফরিদপুরে বারে বারে ছুটে গেছেন রাজনৈতিক প্রচারে। কিন্তু মাদারীপুর তাঁর নির্বাচনী এলাকার মধ্যে পড়া সত্ত্বেও, তখনও তাঁর মাদারীপুর যাওয়ার সময় ও অবসর হয়ে ওঠেনি।
সেই মাদারীপুর তাঁকে টেনেছে দুটি কারণে : মাদারীপুর একটি ছোট্ট মহকুমা শহর (এখন জেলা) হলেও, স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মাদারীপুরে তাই বারবার এসেছেন ভারতবর্ষের স্বনামধন্য নেতা-নেত্রীরা। অসহযোগ আন্দোলন উপলক্ষে মাদারীপুরে এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু, শ্রীমতী বাসন্তী দেবী (দেশবন্ধুর পত্নী) প্রমুখ। মাদারীপুর তখন অগ্নিগর্ভ, উত্তাল, প্রতিবাদে প্রতিবাদে মুখর। মাদারীপুরের বিপ্লবীদের মধ্য থেকে : ১. বালেশ্বর যুদ্ধে, সম্মুখ-সমরে নিহত হন খালিয়া এলাকার চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী; ২. বালেশ্বর-জেলে ফাঁসি হয় খৈয়ারডাঙ্গার নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের ও ৩. মনোরঞ্জন সেনগুপ্তের; ৪. পাশের ‘ডাণ্ডিশহর’ চরমুগুরিয়ার পোস্ট অফিসে ডাকাতি করে বিপ্লবের তহবিল সংগ্রহ করতে গিয়ে ধরা পড়েন এবং বিচারে ফাঁসি হয় বিপ্লবী মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের।
ব্রিটিশ সরকারের ত্রাস, ইশিবপুরের বিপ্লবী সন্তান পূর্ণচন্দ্র দাসের নেতৃত্বে মাদারীপুরে গড়ে ওঠে ‘শান্তিসেনা বাহিনী’। ‘অনুশীলন পার্টি’, ‘যুগান্তর দল’, ‘মাদারীপুর সমিতি’ প্রভৃতি সংগঠনের কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় ‘সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন’। মাদারীপুরের ‘মর্দবীর’ পূর্ণচন্দ্র দাসসহ একঝাঁক বন্দি বিপ্লবীর সঙ্গে, নজরুল ইসলামের গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বহরমপুর সেন্ট্রাল জেল-এ থাকাকালে। ঐ সময়, জেল থেকে গোপনে নানা কর্মকাণ্ড চালানোর সূত্রে, এই সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। জেল-এ একসঙ্গে থাকার ফলে বিপ্লবীদের প্রতি তাই নজরুল ইসলামের তৈরি হয় এক অমোঘ আকর্ষণ, এক গোপন-গভীর শ্রদ্ধাবোধ। বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাসকে নিয়ে রচনা করেন ৫৪ পঙ্ক্তির এক দীর্ঘ কবিতা/গান―উৎসর্গও করেন তাঁর শান্তিসেনাসহ তাঁকেই। পরবর্তী সময়ে, নজরুল ইসলাম ফরিদপুর সম্মেলনে এলে, পূর্ণচন্দ্র দাস তাঁর দলবল-সহ লংমার্চ করে নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাই নজরুল কৃষ্ণনগরে, ‘বঙ্গীয় মৎস্যজীবী সম্মেলনে’র প্রতিষ্ঠাতা, হেমন্তকুমার সরকারের বাড়িতে থাকাকালে, মাদারীপুরে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার সংবাদ তাঁকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই, তিনি শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করেই, ঐ সম্মেলনে যোগদানের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত ও চূড়ান্ত প্রস্তুতিসহ, রচনা করে ফেলেন অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সঙ্গীতও। মতাদর্শগত বামপন্থার কারণেই, তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ‘মৎস্যজীবী সম্মেলনে’ যাওয়ার এবং একই সঙ্গে ‘বিপ্লবতীর্থ’ মাদারীপুর দর্শনের সুযোগ ছাড়তে চাননি। তিনি স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন রক্তাক্ত মাদারীপুরের মাটি ; মাথায় ধারণ করতে চেয়েছিলেন ‘বিপ্লবতীর্থের’ পবিত্র ধুলি।
মাদারীপুরে, কবি নজরুলের তিনদিন অবস্থানের দিনলিপি ও আনুষঙ্গিক প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই লেখা হয়েছে বর্তমান এই নিবন্ধ বা ভ্রমণ দলিল। কবির স্টিমার ভ্রমণ, সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে প্রান্তিক জনতাকে আনন্দ দান, মাতৃসমা বিপ্লবী নেত্রী হেমপ্রভাকে নিয়ে সঙ্গীত রচনা―এই সব ঘটনার ঘনঘটায়, নজরুল-জীবনের, এক অজানা অধ্যায়ের চিত্রাভাস ফুটিয়ে তোলাই এই সংবাদভাষ্যের মূল উদ্দেশ্য।
পর্ব : ১
মাদারীপুরের সঙ্গে নজরুলের হৃদয়ের বন্ধন
নজরুল ইসলামের সঙ্গে মাদারীপুরের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তিনটি উপলক্ষকে কেন্দ্র করে। বহরমপুর জেলে থাকাকালীন সময়ে, কবি তাঁর সেল-এ মাদারীপুরের বিপ্লবীগোষ্ঠীর বেশ কয়েকজনকে তাঁর জেল-মেট হিসেবে পান। সেই অর্থে ওই পর্যায়ে মাদারীপুরের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ না হলেও মাদারীপুরের বিপ্লবী জেলবন্দিরা তাঁকে মাদারীপুরের সঙ্গে অন্তর আদান-প্রদানের একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল। ১৯২৩ সালে বহরমপুর জেল-এর সেলে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় মাদারীপুরের বিপ্লবী-কৃতীসন্তান―‘শান্তিসেনা’ বাহিনীর অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাসসহ কালীপদ রায়চৌধুরী, অমলেন্দু দাশগুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে। ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীও। ভালোবাসার গভীরতায়, জেলে বসে গোপনে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্ণচন্দ্র দাস হয়ে উঠেছিলেন তাঁর সহযোগী-অগ্রগামী-যোদ্ধা। মাদারীপুরের বিপ্লবী, এই ডাকসাইটে নেতার জনগণের মধ্যে ছিল ব্যাপক প্রভাব। তাঁর জেলমুক্তি উপলক্ষে, কবি নজরুল এই নেতাকে নিয়ে লিখলেন দীর্ঘ ৫৪ *পঙক্তির কবিতা বা গান : ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’। গভীর শ্রদ্ধায়, ১৯২৯ সালে কবি এই সেনানায়ককে তথা মাদারীপুরের ‘মর্দবীর’কে এবং তাঁর গড়ে তোলা বিপ্লবী ‘শান্তিসেনা’-বাহিনীকে উৎসর্গ করলেন তাঁর সন্ধ্যা নামের কাব্যগ্রন্থটি। ১৯২৫ সালে নজরুল ইসলাম প্রথম বারের জন্য ফরিদপুরে আসেন এক রাজনৈতিক সম্মেলনে। সেই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। উপস্থিত ছিলেন গান্ধিজিও। সেই উপলক্ষে, পূর্ণচন্দ্র দাস নিজে নেতৃত্ব দিয়ে, তাঁর ‘শান্তিসেনা’ বাহিনীকে মিছিল করে ফরিদপুরে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময় দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে দেখা হয় কবির। এই সম্মেলন-পর্বেই কবির সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে মাদারীপুরের দুই পড়ুয়া বিপ্লব-মনস্ক তরুণের সঙ্গে। ফরিদপুরে নজরুল ইসলাম, নানা উপলক্ষে, এসেছেন মোট ৭ বার। কিন্তু ঐ সময়ের মধ্যে কখনও তিনি একবারও মাদারীপুরে আসেননি। তিনি মাত্র একবারই মাদারীপুরে এসেছেন, ১৯২৬ সালে ‘নিখিল বঙ্গীয় ও প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলন’-এ যোগ দিতে। এই সম্মেলনে তিনি নিজের লেখা ‘জেলেদের গান’ বা ‘ধীবরদের গান’ গেয়েছিলেন। লিখেছিলেন কুমিল্লার জননেত্রী এবং বিপ্লবী হেমপ্রভা মজুমদারকে নিয়েও গান বা কবিতা : ‘হেমপ্রভা’ নামে। কোনও কোনও সমালোচক প্রামাণ্য তথ্য-প্রমাণ সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত না হয়েই, হয়তো মনগড়া ভাবনা থেকে লিখে দিয়েছেন যে, নজরুল ইসলাম মাদারীপুরে এসেছিলেন দুই বার। কিন্তু এই সব কিংবদন্তিমূলক জনশ্রুতি জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। নজরুল ইসলাম নিজের নির্বাচনী-প্রচারে কিংবা অন্য রাজনৈতিক প্রার্থীদের হয়েও মাদারীপুরে কোনও জনসভা করতে আসেননি।
বহরমপুর জেলে : ১৯২৩
বহরমপুর জেল : নজরুল-পূর্ণচন্দ্র দাসের বন্ধুত্ব এবং নজরুলের প্রথম নাটক রচনা।
নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের প্রথম নাটকটি লেখেন বহরমপুর জেলে বসে ; মাদারীপুরের বিপ্লবী এবং কৃতী-সন্তান পূর্ণচন্দ্র দাসের ‘শান্তিসেনা চারণদল’-এর অভিনয়ের জন্য। কবি হুগলি জেল থেকে বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত হন ১৯২৩ সালের ১৮ জুন এবং মুক্তি পান ওই বছরেরই ১৫ ডিসেম্বর। ওই জেলের একই সেলে নজরুলের সঙ্গে ছিলেন মাদারীপুরের শান্তিসেনা দলের অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাস―এ কথা শুরুতেই বলেছি। এই সেলে বসেই কবি পূর্ণচন্দ্র দাস এবং নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর পরামর্শে ‘শান্তিসেনা চারণদলে’র জন্য তাঁর জীবনের প্রথম নাটকটি রচনা করেন। প্রসঙ্গত মুজফ্ফর আহমদ তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা গ্রন্থে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন :
‘বোধ হয় জুলাই মাসের শেষ ভাগে হবে, অধ্যাপক জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ব্যক্তিগত কোনো কাজের উপলক্ষে কয়েকদিনের জন্য বহরমপুর ডিস্ট্রিক্ট জেল হতে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে এলেন। তিনি নজরুলের নিকট হতে আমার জন্য একখানি পত্র নিয়ে এসেছিলেন। একজন কয়েদি ওভারসিয়ার ওদের ওখান থেকে আমার খাবার নিয়ে আসত। সেদিন সকালেও ট্রেতে আমার চা এসেছে। সেই কয়েদি ওভারসিয়ারটি আমায় বলল যে, টি-পটের তলাটা একবার দেখে নেবেন। টি-পটটি তুলতেই দেখতে পেলাম যে একখানা পত্র চাপা আছে, নজরুলের পত্র। লিখেছে, আমার কথা সে সব শুনেছে। আমি কি বহরমপুরে বদলি হতে পারি না ? তারপরে লিখেছে তার সময় ভালই কাটছে। শ্রী পূর্ণচন্দ্র দাস (মাদারীপুরের) একখানা নাটক লিখে দেয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করেছেন। তাই লিখছে সে তখন। শ্রী পূর্ণ দাস বাইরে গিয়ে একটি চারণদল গঠন করবেন। সেই চারণদলের অভিনয়ের উদ্দেশ্যে প্রয়োজন নাটকখানির। নজরুলের এই নাটক লিখিত হয়েছিল, তার পাণ্ডুলিপি জেল থেকে বাইরে নিরাপদে পৌঁছেও গিয়েছিল, কিন্তু তার পরে নাকি পাণ্ডুলিপিখানা হারিয়ে যায়। নজরুল ইসলামের একটা সৃষ্টি এইভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।’ (পৃ. ২৬০-২৬১)।
এই বর্ণনা থেকে নজরুল ইসলামের প্রথম নাটক লেখার একটা হদিস পাওয়া গেলেও, ঠিক কবে সেটি তিনি রচনা করেছিলেন―এই তথ্য থেকে সেই সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা মেলে না। তবে এই হারিয়ে যাওয়া নাটকটির রচনাকাল সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট সদর্থক সংকেত-সন্ধান মেলে নজরুলেরই জেল-মেট নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর ডায়েরি থেকে : ‘নজরুলের সঙ্গে কারাগারে’ শিরোনামে। তিনি তাঁর জেলের ডায়েরিতে প্রসঙ্গত লিখে রেখেছেন :
‘আমার রোজনামচা : তারিখ ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯২৩। আজ সব স্থির হইয়া গেল। বাইরে যাইয়া আমরা পূর্ণবাবু, কাজী ও আমি চারণদল গড়িয়া তুলিব। আমার উপর থাকিবে অভিনয়ের দায়িত্ব। পরিচালনার ভার থাকিবে পূর্ণ বাবুর উপর।’
মুজফ্ফর আহমদ লিখেছেন স্মৃতিকথা, আর নরেন্দ্রনারায়ণ লিখেছেন ‘রোজনামচা’। ফলে রোজনামচার সন-তারিখ বিবেচনা করে দেখা যায় যে, কবি নাটকটি রচনা শুরু করেছিলেন সেপ্টেম্বর মাসেই। নাটকটি হারিয়ে গেলেও তার একটি মূল্যবান গান বা কবিতা, বিচ্ছিন্নভাবে রক্ষা পেয়েছিল। শিরোনামসহ গানটির পূর্ণ বয়ান উল্লেখ করা হলো :
জাতের নামে বজ্জাতি
জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছে জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।।
হুঁকো জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান,
তাই ত বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে এক শ’-খান।
এখন দেখিস্ ভারত-জোড়া প’চে আছিস বাসি মড়া,
মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া।।
জানিস না কি ধর্ম সে যে বর্ম সম সহন-শীল,
তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে ছোঁওয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল।
যে জাত-ধর্ম ঠুনকো এত,
আজ নয় কাল ভাঙবে সে ত,
যাক্ না সে জাত জাহান্নামে রইবে মানুষ, নাই পরোয়া।।
দিন-কাল সব দেখতে পাসনে দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে,
কেমন ক’রে পিষছে তোদের পিশাচ জাতের জাঁতা-কলে।
তোরা জাতের চাপে মারলি জাতি,
সূর্য ত্যাজি’ নিলি বাতি,
তোদের জাত-ভগীরথ এনেছে জল জাত-বিজাতের জুতো ধোওয়া।।
মনু ঋষি অণুসমান বিপুল বিশ্বে যে বিধির,
বুঝলি না সেই বিধির বিধি, মনুর পায়েই নোয়াস্ শির।।
ওরে মূর্খ ওরে জড়,
শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়,
তোরা চিনলি নে তা চিনির বলদ, সার হ’ল তাই শাস্ত্র বওয়া।
সকল জাতই সৃষ্টি যে তাঁর, এ বিশ্ব-মায়ের বিশ্ব-ঘর,
মায়ের ছেলে সবাই সমান, তাঁর কাছে নাই আত্ম-পর।
তোরা সৃষ্টিকে তাঁর ঘৃণা ক’রে
স্রষ্টায় পূজিস্ জীবন ভ’রে,
ভস্মে ঘৃত ঢালা সে যে বাছুর মেরে গাভী দোওয়া।।
বলতে পারিস বিশ্ব-পিতা ভগবানের কোন্ সে জাত?
কোন্ ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁওয়া অশুচি হন জগন্নাথ?
নারায়ণের জাত যদি নাই, তোদের কেন জাতের বালাই,
তোরা ছেলের মুখে থুথু দিয়ে মা’র মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া।।
ভগবানের ফৌজদারী-কোর্ট নাই সেখানে জাত-বিচার,
তোর পৈতে টিকি টুপি টোপর সব সেথা ভাই একাক্কার।
জাত সে শিকেয় তোলা র’বে, কর্ম নিয়ে বিচার হবে,
তা’পর বামুন চাঁড়াল এক গোয়ালে, নরক কিম্বা স্বর্গে থোওয়া।।
এই আচার বিচার বড় ক’রে প্রাণ-দেবতায় ক্ষুদ্র ভাবা,
বাবা এই পাপেই আজ উঠতে বসতে সিঙ্গি-মামার খাচ্ছ থাবা!
নাই ক অন্ন, নাই ক বস্ত্র, নাই ক সম্মান, নাই ক অস্ত্র,
এই জাত-জুয়ারীর ভাগ্যে আছে আরো অশেষ দুঃখ সওয়া।।
এই গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বিজলী পত্রিকায় ১৯২৩ সালের ২০ জুলাই (১৩৩০ বঙ্গাব্দ)। পরে তা বিজলী থেকে ১৩৩০ সালের শ্রাবণ মাসে উপাসনা পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয়। এবং এরপর ১৩৩০ সালেই, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় (৬ষ্ঠ বর্ষ : দ্বিতীয় সংখ্যা) গানটি আবার পুনর্মুদ্রিত হয়। গানটির পাদটীকায় লেখা হয়েছিল : ‘মাদারীপুর শান্তি-সেনা চারণ-দলের জন্য লিখিত অপ্রকাশিত নাটক থেকে।’ পরে এটি ১৩৩১ সালের ১৬ শ্রাবণ কবির বিষের বাঁশী কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়। ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ শীর্ষক গানটির রচনা নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকীর কোনও এক সভায় ডাক্তার নলিনাক্ষ সান্যাল তাঁর ভাষণে জানিয়েছিলেন যে, এই গানটি তাঁর বিয়ে উপলক্ষ্যে ১৩৩১ সালে (১৭ এবং ১৮ এপ্রিল, ১৯২৪) রচনা করেছিলেন কবি। মুজফ্ফর আহমদ এই বক্তব্য খণ্ডন করে তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা গ্রন্থে জানিয়েছেন : ‘কবির সাহিত্য ও সঙ্গীতের বন্ধু উমাপদ ভট্টাচার্যের কাকার বাড়ি ছিল ডক্টর নলিনাক্ষ সান্যালের শ্বশুরবাড়ি। পরিবেশটি ছিল অত্যন্ত গোঁড়া হিন্দুয়ানী। সামাজিক ক্রিয়ায় এ-বাড়ির নিমন্ত্রণে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থদের আলাদা আলাদা পঙ্ক্তিতে খেতে বসতে হতো। মুসলমানদের তো তার ত্রিসীমানায়ও ঢোকার কথা নয়। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে ডক্টর সান্যালের শর্ত ছিল এই যে, জাতিভেদ মেনে নিমন্ত্রিতদের অপমান করা চলবে না। এমনিতেই সঙ্গীতচর্চার জন্য নজরুল ইসলাম উমাপদ ভট্টাচার্যের বাড়িতে যেত। … বরযাত্রীরা সমবেত নিমন্ত্রিতদের সঙ্গে বসতে যাচ্ছেন দেখতে পেয়ে গোঁড়ার দল উঠে গেলেন।’

এই পরিস্থিতিতে নজরুল ইসলাম, উমাপদ ভট্টাচার্যের বাড়িতে গিয়ে কাগজ কলম নিয়ে স্মৃতি থেকে লিখে ফেলেন এই গানটি এবং বিয়ের আসরে ফিরে এসে সুর করে গেয়ে শোনালেনও সেটি। ডক্টর সান্যালের অনুমান বা ধারণা হয়েছিল, বোধ হয় ওই সময়েই নজরুল গানটি লেখেন। তাঁর বক্তব্য যে ঠিক নয়, তার প্রমাণ মেলে বিজলী পত্রিকার ফাইল থেকেই। দেখা যায় গানটি ১৯২৩ সালেই বিজলী পত্রিকায় মুদ্রিত হয়ে গেছে।
নজরুল ইসলাম যখন বহরমপুর জেলে বসে তাঁর জীবনের প্রথম নাটক লেখা শুরু করেন, তখন গানগুলো বিচ্ছিন্নভাবেই লেখেন। সেকালে এমনটাই দস্তুর ছিল। কাজেই বিচ্ছিন্ন এই গানটি তিনি গোপনেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বিজলী পত্রিকায় মুদ্রণের জন্য ; এবং সরকারের চোখে ফাঁকি দেয়ার জন্য সরাসরি লিখেই দিয়েছিলেন : ‘এটি মাদারীপুর শান্তিসেনা ছাত্রদলের নাটকের জন্য রচিত।’ এর পেছনে অন্য কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। গানটির বিষয়ে কিছু তথ্য প্রাসঙ্গিকভাবে বলা প্রয়োজন :
গানের শিরোনাম : জাতের বজ্জাতি;
পত্রিকায় প্রকাশ : বিজলী, শ্রাবণ, ১৩৩০; উপাসনা, শ্রাবণ, ১৩৩০; বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা, শ্রাবণ, ১৩৩০।
সংকলিত গ্রন্থ : বিষের বাঁশী ; নজরুল-গীতি, অখণ্ড ; নজরুল-গীতি, তৃতীয় খণ্ড, কলকাতা ; নজরুল রচনাবলী; কাজী নজরুল ইসলাম রচনাসমগ্র। *স্বরলিপি গ্রন্থ : ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’; নজরুল স্বরলিপি, তৃতীয় খণ্ড; সুনির্বাচিত নজরুল-গীতির স্বরলিপি, প্রথম খণ্ড;
রেকর্ড : রেকর্ড নম্বর পি ৭০৫৭; প্রকাশকাল : অক্টোবর, ১৯২৫;
শিল্পী : হরেন্দ্রনাথ দত্ত; রেকর্ড নম্বর এন.২৭২৭৬ ; প্রকাশকাল : মে, ১৯৪২;
শিল্পী : মৃণালকান্তি ঘোষ; বিষয় : দেশাত্মবোধক; রাগ : পরজ মিশ্র; তাল : দ্রুত-দাদরা।
মুকুন্দ দাসের নাটক : পল্লীসেবা
নজরুলের ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ গান
নজরুল ইসলামের এই গানটির কোনওরকম স্বীকৃতি না দিয়েই, বা কোনওরকম কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করেই, বরিশালের চারণকবি মুকুন্দ দাস তাঁর রচিত নাটক পল্লীসেবাতে এ-গান ব্যবহার করেছেন। মুকুন্দ দাস, গানটিকে ভেঙে ভেঙে, বিয়েতে ‘জাতিগত ভেদাভেদ’ প্রসঙ্গে গানের কিছুটা করে অংশ চরিত্রের মুখে সংলাপের পরিবর্তে ব্যবহার করেছেন। নাটকের পঞ্চদশ দৃশ্যটি এই রকম :
স্থান : শরৎবাবুর বাড়ি।
কুশীলব : শরৎ, পঞ্চানন, সতীশ এবং নিতাই। গানটির ভেঙে ভেঙে ব্যবহার রয়েছে তাঁর নাট্যচরিত্রের সংলাপে। যেমন :
(নিতাইয়ের প্রবেশ)
নিতাই : হ্যাঁ, ব্রাহ্মণ! জাতি ধর্ম্ম দেখতেই হবে।
(গীত)
জাতের নামে বজ্জাতি সব,
জাত-জালিয়াৎ খেলছে জুয়া।
ছুঁলে পরেই জাত যাবে,
জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি,
ভাবলি এতেই জাতির জান।
তাই তো বেকুব করলি তোরা
এক জাতিকে একশখান।
এখন দেখিস ভারত জোড়া,
পড়ে আছিস বাসি মড়া,
জাত নাই আজ আছে শুধু,
জাত শেয়ালের হুক্কাহুয়া।
পঞ্চানন : বলি, ধর্ম্ম কর্ম্ম এ সব তো দেখতে হবে?
নিতাই : জানিস না কি ধর্ম্ম সে যে,
বর্ম্ম সম সহনশীল,
তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে,
ছোঁয়া ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল।
যে জাত ধর্ম্ম ঠুনকো এত,
আজ নয় কাল ভাঙবে সে ত,
যাক্ না সে জাত জাহান্নামে,
রইবে মানুষ নাই পরোয়া ।
(মূল গানের দুই স্তবক বাদ দিয়ে পরের অংশ থেকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে এখানে।)
বলতে পারিস বিশ্বপিতা
ভগবানের কোন্ সে জাত,
কোন্ ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁয়া,
অশুচি হন জগন্নাথ,
নারায়ণের জাত যদি নাই,
তোদের কেন জাতের বালাই,
ছেলের মুখে থুথু দিয়ে
মা’র মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া।
ভগবানের ফৌজদারি কোর্ট,
নাই সেখানে জাত বিচার,
পৈতা টিকি টুপি টোপর,
সব সেথা ভাই একাকার।
জাত যে শিকোয় তোলা রবে,
কর্ম্ম নিয়েই বিচার হবে।
পঞ্চানন : তারপর?
নিতাই : বামন-চাঁড়াল এক গোয়ালে,
নরক কিম্বা স্বর্গে থোওয়া।।
(প্রস্থান)
পঞ্চানন : যত সব বিধর্ম্মী জুটে সমাজটাকে উচ্ছন্নে দিতে বসেছে।
(প্রস্থান)
(মুকুন্দ দাসের গ্রন্থাবলী : চারণকবি মুকুন্দ দাস প্রণীত, বসুমতী-সাহিত্য মন্দির, কলকাতা।)
নাটকের বিষয়বস্তুর স্বার্থে নাট্যকার গানটির অংশবিশেষ, কোথাও বা কিছু শব্দ বাদ দিয়েছেন। বানানের ক্ষেত্রেও কোথাও কোথাও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে। কিছু পঙ্ক্তিকেও তিনি সরাসরি পরিহার করেছেন।
পূর্ণচন্দ্র দাসকে নিয়ে কবি নজরুলের কবিতা :
‘পূর্ণ-অভিনন্দন’
বহরমপুর জেলে, নজরুল ইসলামের সেল-এ গিয়ে মাদারীপুরের বিপ্লবী জেলবন্দি কালীপদ রায়চৌধুরী কবিকে জানালেন যে, পূর্ণচন্দ্র দাসের জেলমুক্তির পরে মাদারীপুরবাসীরা তাঁকে বিরাট আকারে সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে কবি যদি একটা কবিতা লিখে দেন, তাহলে অনুষ্ঠানে তা আবৃত্তি করা হবে। কবি সানন্দে কালীপদবাবুর এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখে দেন। কবিতাটি পরে বিজলী পত্রিকায় মুদ্রিত হয় এবং কবির ভাঙ্গার গান কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়। কবিতাটির মধ্য দিয়ে বিপ্লবী নজরুলের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক আভাসিত হয়। ইতিহাসের প্রয়োজনে কবিতাটি বা গানটি তাই তুলে দেওয়া হলো :
‘পূর্ণ-অভিনন্দন’
(গান)
এস অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র! এস পূর্ণিমা-পূর্ণচাঁদ!
ভেদ করি পুনঃ বন্ধ কারার অন্ধকারের পাষাণ-ফাঁদ!
এস অনাগত নব-প্রলয়ের মহা সেনাপতি মহামহিম!
এস অক্ষত মোহান্ধ-ধৃতরাষ্ট্র-মুক্ত লৌহ-ভীম!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরে মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
ছয়বার জয় করি’ কারা-ব্যূহ, রাজ-রাহু-গ্রাস-মুক্ত চাঁদ!
আসিলে চরণে দুলায়ে সাগর নয়-বছরের মুক্ত-বাঁধ।
নবগ্রহ ছিঁড়ি ফণী-মনসার মুকুটে তোমার গাঁথিলে হার,
উদিলে দশম মহাজ্যোতিষ্ক ভেদিয়া গভীর অন্ধকার।
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
স্বাগত শুদ্ধ রুদ্ধ-প্রতাপ, প্রবুদ্ধ নব মহাবলী!
দনুজ-দমন দধীচি-অস্থি, বহ্নিগর্ভ দম্ভোলী!
স্বাগত সিংহ-বাহিনী-কুমার! স্বাগত হে দেব সেনাপতি!
অনাগত রণ-কুরুক্ষেত্রে সারথি-পার্থ-মহারথী!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
নৃশংস রাজ-কংস-বংশে হানিতে তোমার ধ্বংস-মার
এস অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র, ভাঙিয়া পাষাণ-দৈত্যাগার!
এস অশান্তি-অগ্নিকাণ্ডে শান্তিসেনার কাণ্ডারী!
নারায়ণী-সেনা-সেনাধিপ, এস প্রতাপের হারা-তরবারি!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
ওগো অতীতের আজো ধূমায়িত আগ্নেয়গিরি ধূম্রশিখ!
না-আসা-দিনের অতিথি তরুণ তব পানে চেয়ে নির্নিমিখ।
জয় বাঙলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ
জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
স্বর্গ হইতে জননী তোমার পেতেছেন নামি’ মাটিতে কোল,
শ্যামল শস্যে হরিত ধান্যে বিছানো তাঁহারই শ্যাম আঁচোল।
তাঁহারি স্নেহের করুণ গন্ধ নবান্নে ভরি’ উঠিছে ঐ,
নদীস্রোত-স্বরে কাঁদিছেন মাতা, ‘কই রে আমার দুলাল কৈ?’
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
মোছ আঁখি-জল, এস বীর! আজ খুঁজে নিতে হবে আপন মায়,
হারানো মায়ের স্মৃতি-ছাই আছে এই মাটিতেই মিশিয়া, হায়!
তেত্রিশ কোটি ছেলের রক্তে মিশেছে মায়ের ভস্ম-শেষ,
ইহাদেরই মাঝে কাঁদিছেন মাতা, তাই আমাদের মা স্বদেশ।
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
এস বীর! এস যুগ-সেনাপতি! সেনাদল তব চায় হুকুম,
হাঁকিছে প্রলয়, কাঁপিছে ধরণী, উদগারে গিরি অগ্নি-ধূম।
পরাধীন এই তেত্রিশ কোটি বন্দীর আঁখি-জলে হে বীর,
বন্দিনী মাতা যাচিছে শক্তি তোমার অভয় তরবারির।
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
গল-শৃঙ্খল টুটেনি আজিও, করিতে পারি না প্রণাম পা’য়,
রুদ্ধ কণ্ঠে ফরিয়াদ শুধু গুমরিয়া মরে গুরু ব্যথায়।
জননীর যবে মিলিবে আদেশ, মুক্ত সেনানী দিবে হুকুম,
শত্রু-খড়্গ-ছিন্ন-মুণ্ড দানিবে ও-পায়ে প্রণাম-চুম।
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাঙলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
মুদ্রিত কবিতাটির পাদটীকায় লেখা লেখা ছিল :
‘মাদারীপুর শান্তি-সেনা-বাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র দাস মহাশয়ের কারামুক্তি উপলক্ষে রচিত।’
এই গান বা কবিতাটি রচনার পেছনে যে একটা ইতিহাস রয়েছে, সেই কাহিনি জানিয়েছেন বিপ্লবী কালীপদ রায়চৌধুরী, তাঁর রচিত স্বাধীনতা-যুদ্ধে মাদারীপুর : এক স্মৃতি চিত্রণ (স্বাধীনতা সংগ্রামী কালীপদ রায়চৌধুরীর আত্মজীবনী) গ্রন্থে। তিনি গল্পের ঢংয়ে তাঁর বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে :
“পূর্ণদার শীঘ্রই জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা। তিনি মুক্তি পেয়ে মাদারীপুর পৌঁছলে জনগণের পক্ষ থেকে অভ্যর্থনার আয়োজন আগে থেকেই চলছিল। এই উপলক্ষে বিদ্রোহী কবিকে একটি কবিতা লিখে দেবার জন্য অনুরোধ করলাম। তিনি আনন্দের সঙ্গেই সম্মতি দিলেন। … একদিন সকালে যথারীতি ফালতুর হাতে জলখাবারের চা-পাউরুটি এল। খেতে বসেছি, হঠাৎ পাউরুটির ভেতর থেকে ভাঁজ করা ছোটো এক টুকরো কাগজ বেরিয়ে পড়ল। কৌতূহলী হয়ে ভাঁজ খুলে দেখি বিদ্রোহী কবির লেখা পূর্ণদাকে অভিনন্দনজ্ঞাপক একটি কবিতা। কবি আমার অনুরোধ রেখেছেন। মন আনন্দে ভরে উঠল। জেল থেকে বেরোবার সময়, পাছে জেল কর্তৃপক্ষ গেটে তল্লাশি করে সেটা রেখে দেয়, সেই ভয়ে বারবার পড়ে কবিতাটি মুখস্থ করে ফেললাম। ঠিক মনে আছে কিনা পরীক্ষা করার জন্য বারবার তা মনে-মনে আবৃত্তি করি। অবশেষে কবিতাটি বারবার স্মরণ করতে-করতেই এক দিন জেল থেকে বার হলাম। পাছে ভুলে যাই, এজন্য ছাড়া পাওয়া মাত্র প্রথমেই সোজা বহরমপুর কংগ্রেস অফিসে গিয়ে কাগজ-কলম চেয়ে নিয়ে কবিতাটি লিখে ফেললাম। সতর্কতা হিসাবে ওই দিনই ডাকে এক কপি মাদারীপুরে পাঠালাম, আর এক কপি আমি সঙ্গে নিয়ে মাদারীপুর রওয়ানা হলাম। পরে পূর্ণদা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সেখানে গেলে তাঁর অভ্যর্থনা সভায় কাজী নজরুলের ‘এস অষ্টমী পূর্ণচন্দ্র, এস পূর্ণিমা পূর্ণচাঁদ…’ ইত্যাদি যে অভিনন্দন কবিতাটি পাঠ করা হয়, এটিই সেই কবিতা।” (পৃ.৮৩-৮৪)।
কবির প্রথম ফরিদপুর দর্শন : ১৯২৫
ফরিদপুরে নজরুলের প্রথম আগমন: প্রসঙ্গ পূর্ণচন্দ্র দাস।
নজরুল ইসলাম প্রথম ফরিদপুরে আসেন ১৯২৫ সালের ১ মে ‘প্রদেশ কংগ্রেস সম্মেলনে’। সভায় সভাপতিত্ব করেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। উপস্থিত ছিলেন গান্ধীজীও। মাদারীপুরের কৃতীসন্তান বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাস তাঁর ‘শান্তিসেনা’ বাহিনী নিয়ে ভাঙ্গা থেকে ফরিদপুর শহরে সম্মেলন পর্যন্ত মিছিল করে গিয়েছিলেন।
বিপ্লবী এই পূর্ণচন্দ্র দাস জন্মেছিলেন রাজৈর উপজেলার সমাজ ইশিবপুর গ্রামে। নজরুলের সঙ্গে ওই সম্মেলনে তাঁর দ্বিতীয়বার দেখা হয়। এবং ওই সম্মেলনেই নজরুলের সঙ্গে পরিচয় হয় মাদারীপুরের ইসকান্দরের। ইসকান্দর তখন এমএ এবং আইন (ল) পড়ছে। সম্মেলনে তার কর্মতৎপরতায় এবং চারিত্রিক দৃঢ়তায় নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হয়েছিলেন। নজরুলের সংস্পর্শে এসে ইসকান্দর দেশপ্রেমে গভীরভাবে উদ্ধুদ্ধ হয়েছিলেন। তখন এই বৈপ্লবিক-প্রতিবেশের প্রভাবে বহু তরুণ বিপ্লবী-কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তেন। ফলে, ইসকান্দরও বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এদের মধ্যে ছিলেন নজরুল-ভক্ত বিপ্লবী জীবন মোল্লাও। জীবন মোল্লা ছিলেন বিপ্লবী দলের একজন বিশ্বস্ত সভ্য। পরে এক সময়, বোমা বানাতে গিয়ে তিনি আহত হন, এবং মাদারীপুর মহকুমার ‘ডাণ্ডি’ চরমুগুড়িয়া- ডাকঘরে ডাকাতি করতে গিয়ে এক মামলায় জড়িয়ে পড়েন এবং জেল খাটেন। ওঁর মতো ‘উদার এবং আত্মভোলা যুবকর্মী’ কদাচিৎ চোখে পড়ে। নজরুল ইসলাম ওঁকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন বলে নজরুল-বন্ধু প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় তাঁর কাজী নজরুল গ্রন্থে (ফরিদপুর পর্যায় : পৃ: ১৩৬) প্রসঙ্গত বর্ণনা করেছেন।
পূর্ণচন্দ্রকে গ্রন্থ উৎসর্গ : ১৯২৯
সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্র এবং ‘শান্তিসেনা’কে শ্রদ্ধা
বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাসের সঙ্গে নজরুল ইসলামের সম্পর্ক এতটাই গভীর হয়ে উঠেছিল যে, কবি তাঁকে এবং তাঁর ‘শান্তিসেনা বাহিনী’কে তাঁর সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন। সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থ মুদ্রিত হয় ১৯২৯ সালের ১২ আগস্ট (ভাদ্র, ১৩৩৬)। মুদ্রণের তারিখ নিয়ে আজহারউদ্দিন খান অবশ্য দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি তাঁর বাংলা সাহিত্যে নজরুল গ্রন্থে জানিয়েছেন যে, বইটি মুদ্রিত হয় কার্তিক মাসে। প্রকাশক ডি.এম. লাইব্রেরী, কলকাতা। এটি কবির পঞ্চদশ মুদ্রিত কাব্য। উৎসর্গপত্রটি এই রকম :
উৎসর্গ
‘মাদারীপুর’ শান্তি-সেনা’র
কর-শতদলে
ও
বীর সেনানায়কের
শ্রীচরণাম্বুজে।
―
পর্ব : ২
১৯২৬ সালে, নজরুল ইসলাম ‘যে-মাদারীপুরে’ এসেছিলেন:
কবি নজরুল ইসলাম মাদারীপুরে এসেছিলেন ১৯২৬ সালের ১০ মার্চ সাঁঝের বেলায়। মাদারীপুর শহরে এটাই তাঁর প্রথম এবং শেষ সফর। মাদারীপুর তখন বৃহত্তর ফরিদপুরের একটি মহকুমা শহর। আড়িয়াল খাঁ নদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই শহরটি ১৮৫৪ সালের ২ নভেম্বর বাখরগঞ্জ জেলার একটি মহকুমা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে ১৮৭৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর একে ঐ জেলা থেকে ফরিদপুরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৮৭৫ সালে একে একটি মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌরসভা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। (অনেকটা পরবর্তীকালে, অর্থাৎ ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এই শহরটিকে স্বতন্ত্র একটি জেলায় রূপান্তর করা হয়েছে।) নজরুল ইসলাম ‘যে-মাদারীপুরে’ এসেছিলেন, সেই শহর এখন আর নেই। খরস্রোতা আড়িয়াল খাঁর ভাঙনের ফলে ১৯৪৯ সালে সেটি পুরোপুরি সরে এসেছে বাদামতলা সিনেমা হলের প্রায় পাদদেশে। নজরুল ইসলামের সফরকালে যেখানে স্টিমার তার শিকল বা নোঙর ফেলেছিল, সেই মাদারীপুরের ঘাট ছিল তৎকালীন মাদারীপুর মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান মনমোহন সাহার বসতবাড়ির গা-ঘেঁষা লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকায়। এটা ছিল পরবর্তীকালের ভেঙে যাওয়া মাদারীপুরের চর-অঞ্চল রাস্তি ইউনিয়নের অন্তর্গত। সেই সব স্মৃতির শহর আজ ডুবে আছে আড়িয়াল খাঁর অতল-জলে। ওখানেই ছিল হাট-বাজার, দোকান-পাট, কোর্ট-কাছারি, হাসপাতাল, অফিস-আদালত এবং জেলখানা। এ কারণে, এখনও বেঁচে আছে এর কিয়দংশ পুরোনো মাদারীপুর বা পুরোনো বাজার নামে। ওই লক্ষ্মীগঞ্জেই ছিল মৎস্যজীবীদের তিনটি বড় বড় ‘টলঘর’ ; আর সেখানেই দুদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলন’-এর তৃতীয় অধিবেশন। কাছেই ছিল এখনকার মহিষের চর। অবশ্য সেই অঞ্চল এখন আড়িয়াল খাঁ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। নজরুল ইসলাম সেই যাত্রায় মাদারীপুরে ছিলেন তিন দিন।
‘মাদারীপুরে মৎস্যজীবী সম্মেলন’
[বি. দ্র. : লাঙল পত্রিকার প্রধান পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং সম্পাদক : মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়।]লাঙল-এর (বৃহস্পতিবার, ১৪ মাঘ, ১৩৩২) প্রথম খণ্ডের ষষ্ঠ সংখ্যার ‘খড়কুটো’ থেকে একটা আভাস পাওয়া যায় যে, মাদারীপুরে মৎস্যজীবী সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে পারে। ২৬ জানুয়ারি, ঢাকার জয়ালী গ্রামে মৎস্যজীবীদের অনুষ্ঠিত এক সভার ঘোষণা থেকেও এই কথার আভাস মেলে। তবে ওই সম্মেলন ৬ মার্চের পরে, মাদারীপুরেই যে অনুষ্ঠিত হবে, সে কথা জানা যায় নজরুল ইসলামের লেখা একটি চিঠিতে। চিঠিটি তিনি ১ মার্চ, কৃষ্ণনগরে বসে লিখেছিলেন, ঢাকায় তাঁর এক গুণমুগ্ধ, ‘মুক্তবুদ্ধি আন্দোলন’ ও ‘শিখা গোষ্ঠী’র অন্যতম সদস্য এবং বিশিষ্ট লেখক আনোয়ার হোসেনকে। নজরুল ইসলামের বয়স তখন সবে ২৬ অতিক্রম করেছে। থাকতেন হুগলীতে। কিন্তু তিনি তখন খুবই অসুস্থ। ম্যালেরিয়ায় ভুগছেন দীর্ঘ দিন ধরে। একদিকে ঋণে জর্জর; পরিবার নিয়ে আর্থিক সংকটে নাজেহাল। এই পরিস্থিতিতে, নজরুলের পরম শুভানুধ্যায়ী―‘নদীয়া কংগ্রেসে’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ‘স্বরাজ্য’ দলের চিফ হুইপ, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য শ্রী হেমন্তকুমার সরকার কবিকে নিয়ে আসেন তাঁর কৃষ্ণনগরের বাড়িতে। কবির সমস্ত ঋণমুক্তির দায়িত্বই যে কেবল নিজের কাঁধে তুলে নেন, তাই নয়; নজরুলের পরিবারসহ তাঁর খাওয়া-দাওয়ার যাবতীয় বন্দোবস্ত করেন এবং ভালো ডাক্তার দেখিয়ে তাঁর ম্যালেরিয়া রোগের নিরাময় ঘটান। হেমন্তবাবু মাঝে কংগ্রেস ছেড়ে শ্রমিক সংগঠনের কাজে যোগ দিয়ে মৎস্যজীবী সংগঠন তৈরি করেন। ফলে কৃষ্ণনগর থেকেই নজরুল ইসলামকে তিনি মাদারীপুরে অনুষ্ঠিতব্য মৎস্যজীবী সম্মেলনে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেন। নজরুল ইসলামও সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করেন। কবি মাদারীপুরের সম্মেলনে তাঁর যাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করার পরেই একটা সম্ভাব্য কর্মসূচির কথা জানিয়ে, কৃষ্ণনগর থেকেই প্রাসঙ্গিক ওই চিঠিটি লেখেন আনোয়ার হোসেনকে। তবে ওই চিঠি থেকে সম্মেলনের সঠিক তারিখ জানা যায় না। তিনি চিঠিতে লিখেছেন :
‘ভাই!
কৃষ্ণনগর ১লা মার্চ, ১৯২৬
…আমার স্বাস্থ্য ছিল অটুট,―জীবনে ডাক্তার দেখাইনি। এই আমার প্রথম অসুখ ভাই, বড্ডো ভোগাচ্ছে। প্রায় সাত মাস ভুগছি জ্বরে। বড্ডো জীবনীশক্তি কমে গেছে। বাইরে থেকে খুব দুর্বল হইনি। এতদিনে সুস্থ হয়তো হয়ে উঠতাম কিন্তু অবসর বা বিশ্রাম পাচ্ছিনে জীবনে কিছুই। এই শরীর নিয়েই আবার বেরব ৬ই মার্চ দিনাজপুরে। সেখানে ডিস্ট্রিক্ট *কনফারেন্স, সেখান থেকে মাদারীপুর ঋরংযবৎসবহ’ং ঈড়হভবৎবহপব-এ ধঃঃবহফ করতে যাব। ওখান থেকে খুব সম্ভবত ঢাকা যাব, যদি যাই দেখা হবে। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য ভঙ্গের জন্য। এত দুর্বল আমি, এখনও যে ধৈর্য ধরে একটা চিঠি পর্যন্ত লিখতে পারিনে। আমাদের বাঙ্গালী মুসলমানের সমাজ, নামাজ পড়ার সমাজ। যত রকম পাপ আছে করে যাও―তার জবাবদিহি করতে হবে না এ সমাজে,―কিন্তু নামাজ না পড়লে তার কৈফিয়ত তলব হয়। অথচ কোরানে ৯৯৯ জায়গায় জেহাদের কথা এবং ৩৩ জায়গায় সালাতের বা নামাজের কথা বলা হয়েছে।…’ ইত্যাদি।
এই চিঠি থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, নজরুল ইসলাম ৬ মার্চের পরেই মাদারীপুরে যাবেন। কিন্তু তাঁর চিঠিতে উল্লিখিত ৬ মার্চ, কৃষ্ণনগর থেকে তাঁর বের হওয়া হয়নি। কেননা, ৬ মার্চ কবি গিয়েছিলেন কলকাতায় তাঁদের সংগঠন ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলে’র সাহায্যের জন্য আয়োজিত বসন্ত উৎসবে যোগ দিতে। উৎসবের বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ২২ ফাল্গুন, শনিবার, ৬ মার্চ, ১৯২৬ সাল; সন্ধ্যা ৬টায়, কলেজ স্কোয়ারের এলবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউস)। টিকেটের মূল্য ছিল : তিন, দুই এবং এক টাকা। অনুষ্ঠান শেষ করে কবি অনেক রাতে কৃষ্ণনগর ফিরে যান। কাজেই ওই দিন তিনি বের হতে পারেননি।
৭ তারিখেও তিনি ফিরে যান। কাজেই ওই দিনও তিনি বের হতে পারেননি। অর্থাৎ ৭ তারিখেও তিনি কৃষ্ণনগরেই ছিলেন। কেননা, মাদারীপুর মৎস্যজীবী সম্মেলনের উদ্বোধনী সঙ্গীত ‘জেলেদের গান’ বা ‘ধীবরদের গান’ কবি রচনা করেন কৃষ্ণনগরে বসেই, ৮ মার্চ, ২৪ ফাল্গুন। তাই ৮ তারিখের আগে তাঁর বের হওয়া হয়নি। দিনাজপুরের অনুষ্ঠানের সংবাদভাষ্য থেকে মনে হয় যে, ৯ এবং ১০ তারিখের দিনাজপুরের কনফারেন্সে নজরুল ইসলামের যাওয়া হয়নি। গিয়েছিলেন শুধু হেমন্তবাবু’ই। সংবাদে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কাজেই কবি মাদারীপুরের সম্মেলনে পৌঁছেছিলেন ১০ মার্চ সন্ধ্যেবেলায় হেমন্তকুমার সরকার, বসন্ত মজুমদার এবং হেমপ্রভা মজুমদারের সঙ্গে একযোগে স্টিমারে করে। ১১ মার্চ তিনি ‘জেলেদের গান’ দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে তাঁদের উপস্থিতির সংবাদ প্রকাশিত হয় লাঙল পত্রিকায়, ‘খবরদারি’ পর্যায়ে (লাঙল, বৃহস্পতিবার, ৪ চৈত্র, ১৩৩২; পৃ. ১৪)। তাতে লেখা হয়েছিল :
‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলন।’
‘গত ১১ই ও ১২ই মার্চ, ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর শহরে মৎস্যজীবী সম্মিলনের তৃতীয় অধিবেশন হয়। ১০ই মার্চ সন্ধ্যায় সভাপতি শ্রীযুত হেমন্তকুমার সরকার মহাশয় স্টীমার যোগে আসেন। তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম, শ্রীযুত বসন্তকুমার মজুমদার ও শ্রীমতী হেমপ্রভা মজুমদার ছিলেন। স্টীমার ঘাটে অভ্যর্থনার জন্য প্রায় ৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়েছিলেন। সম্মিলনীতে বঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫ শত প্রতিনিধি এসেছিলেন। সভায় শ্রোতার সংখ্যা ৫ হাজারের উপরে হয়েছিল। সভাপতি হেমন্ত বাবুর বক্তৃতা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এবং মৌলিক ধরনের হয়েছিল। কাজী সাহেবের গানে সকলেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ডা. প্রতাপচন্দ্র গুহরায় ও সম্পাদক শ্রী কার্ত্তিকচন্দ্র মল্লবর্মণ মহাশয়ের বক্তৃতাও হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল। মৎস্যজীবীগণের হিতকারক নানা প্রস্তাব গৃহীত হয়। শাহ্ সৈয়দ এমদাদুল হকের মৎস্যের পোনা সংরক্ষণ আইনের তীব্র প্রতিবাদ করা হয়। হেমন্ত বাবুর ‘বেঙ্গল ফিসারিস্ বিল’-এর সম্পূর্ণ সমর্থন করা হয়।’
সম্মেলনের টুকিটাকি :
সম্মেলনের শিরোনাম : নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলন, তৃতীয় অধিবেশন।
অধিবেশনের স্থান : মাদারীপুর শহর : মৎস্যজীবীদের টলঘর।
তারিখ : ১১ ও ১২ মার্চ, ১৯২৬ (২৭ ও ২৮ ফাল্গুন, ১৩৩২)।
প্রতিনিধির সংখ্যা : পাঁচশত;
জনসমাগম: পাঁচ হাজার,
গৃহীত প্রস্তাবের সংখ্যা : ১৯ ;
বিশিষ্টজন : বসন্তকুমার মজুমদার/ হেমপ্রভা মজুমদার;
বক্তা : হেমন্তকুমার সরকার/ সভাপতি,
প্রতাপচন্দ্র গুহরায়/সভাপতি, অভ্যর্থনা সমিতি,
কার্ত্তিকচন্দ্র মল্লবর্মণ/সম্পাদক ।
জেলাওয়ারি প্রতিনিধি : ফরিদপুর, ত্রিপুরা, পাবনা, খুলনা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, বরিশাল, নদীয়া, ২৪ পরগনা, যশোর, ঢাকা, মালদহ, রংপুর, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, আসাম ইত্যাদি।
উদ্বোধনী সঙ্গীত : কাজী নজরুল ইসলাম।
গীতিকার ও সুরকার : কাজী নজরুল ইসলাম, ২৪ ফাল্গুন, ১৩৩২; ৮ মার্চ, ১৯২৬, কৃষ্ণনগর, নদীয়া;
প্রকাশ : ‘জেলেদের গান’ / লাঙল পত্রিকা (বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক-দলের মুখপত্র), প্রথম খণ্ড, দ্বাদশ সংখ্যা, কলিকাতা, বৃহস্পতিবার, ৪ চৈত্র, ১৩৩২, পৃ. ৩-৫।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয়, নজরুল ইসলামের উদ্বোধনী সঙ্গীত ‘জেলেদের গান’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। মূল গানটি এই রকম :
আমরা নীচে প’ড়ে রইব না আর
শোন্ রে ও ভাই জে’লে
এবার উঠব রে সব ঠেলে।
ঐ বিশ্ব-সভায় উঠল সবাই রে
ঐ মুটে মজুর হেলে!
এবার উঠবে রে সব ঠেলে।।
আজ সবার গায়ে লাগছে ব্যথা
সবাই আজি কইছে কথা রে,
আমরা এমনি মরা কইনে কিছু
মড়ার লাথি খেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
আমরা মেঘের ডাকে জে’গে উঠে
পান্সিতে পাল তুলি।
আমরা ঝড়-তুফানে সাগর-দোলার
নাগর-দোলায় দুলি।
ও ভাই আকাশ মোদের ছত্র ধরে
বাতাস মোদের বাতাস করে রে।
আমরা সলিল অনিল নীল গগনে
বেড়াই পরান মেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
ভাইরে মোদের ঠাঁই দিল না
আপন মাটীর মায়ে,
তাই জীবন মোদের ভেসে বেড়ায়
ঝড়ের মুখে নায়ে।
ও ভাই নিত্য নূতন হুকুম জারি
করছে তাই সব অত্যাচারী রে,
তারা বাজের মতন ছোঁ মেরে খায়
আমরা মৎস্য পেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
আমরা তল করেছি কতই সে ভাই
অথই নদীর জল,
ভাই হাজার ক’রেও ঐ হুজুরদের
পাইনে মনের তল।
আমরা অতল জলের তলা থেকে
রোহিত মৃগেল আনি ছেঁকে রে
এবার দৈত্য দানব ধরব রে ভাই
ডাঙাতে জাল ফেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
আমরা পাথার-জলে ডুব-সাঁতার দিই
ম’রেও নাহি মরি,
আমরা হাঙর কুমীর তিমির সাথে
নিত্য বসত করি।
ও ভাই জলের কুমীর জয় ক’রে কি
কুমীর হ’ল ঘরের ঢেঁকি রে,
ও ভাই মানুষ হ’তে কুমীর ভাল
খায়না কাছে পেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
ও ভাই আমরা জলে জাল ফেলে রই,
হোথা ডাঙার পরে
আজ জাল ফেলেছে জালিম যত
জমিদারের চরে।
ওভাই ডাঙার বাঘ ঐ মানুষ-দেশে
ছেলে মেয়ে ফেলে এসে রে
আমরা বুকের আগুন নিবাই রে ভাই
নয়ন-সলিল ঢেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
ওরে সপ্ত লক্ষ শির মোদের ভাই
চৌদ্দ লক্ষ বাহু,
ওরে গ্রাস করেছে তাদের ভাই আজ
চৌদ্দ জনা রাহু।
যে চৌদ্দ লক্ষ হাত দিয়ে ভাই
সাগর ম’থে দাঁড় টেনে যাই রে।
সেই দাঁড় নিয়ে আজ দাঁড়া দেখি
মায়ের সাত লাখ ছেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
ও ভাই আমরা জলের জল-দেবতা
বরুণ মোদের মিতা,
মোদের মৎস্যগন্ধার ছেলে ব্যাসদেব
গাইল ভারত-গীতা।
আমরা দাঁড়ের ঘায়ে পায়ের তলে
জলতরঙ্গ বাজাই জলে রে।
আমরা জলের মতন জল কেটে যাই,
কাটব দানব পেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
আমরা খেপলা জালে মাছ ধরি ভাই
একলা নদীর তীরে,
এবার এক সাথে ভাই সাত লাখ জেলে
র্ধ বেড়াজাল ঘিরে।
ঐ চৌদ্দ লক্ষ দাঁড়-কাঁধে ভাই
মল্লভূমির মল্ল-বীর আয় রে,
ঐ আঁশ-বটীতে মাছ কাটি ভাই
কাটব অসুর এলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
(কৃষ্ণনগর, ২৪ ফাল্গুন, ১৩৩২।)
সম্মেলনে পরিবেশিত এবং লাঙল পত্রিকায় মুদ্রিত দীর্ঘ গানটি সম্পর্কে কিছু জ্ঞাতব্য তথ্য :
পত্রিকায় মুদ্রণ : লাঙল, দ্বাদশ সংখ্যা, ১৯২৬ (১৮ মার্চ);
শিরোনাম : জেলেদের গান;
গ্রন্থভুক্তি: সর্বহারা কাব্য; পরিবর্তিত শিরোনাম : ‘ধীবরদের গান’।
প্রকাশ : বর্মণ পাবলিসিং হাউস, কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলকাতা; পৃ. ২+৬৪; মূল্য: এক টাকা ছয় আনা; অক্টোবর, ১৯২৬ (আশ্বিন, ১৩৩৩)। কবিতার সংখ্যা : ১০।
‘নজরুল-গীতি’ভুক্ত, ৪র্থ খণ্ড, কলকাতা; ‘নজরুল-গীতি’, অখণ্ড, হরফ প্রকাশন, কলকাতা; নজরুল রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ঢাকা; কাজী নজরুল ইসলাম রচনাসমগ্র,পশ্চিম বঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা; বিষয় : বিচিত্রা; শ্রেণি: আনুষ্ঠানিক।
প্রাসঙ্গিক সংবাদ : ‘১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে মাদারীপুর নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনের উদ্বোধন সঙ্গীত’―লাঙল-এ মুদ্রিত কবিতাটির পাদটীকায় এই কথা জানানো হয়েছে।
পত্রিকায় মুদ্রিত গানটির মূল পাঠের সঙ্গে সর্বহারা গ্রন্থভুক্তির পাঠ বা টেক্সট-এর মধ্যে বেশ কিছুু ছোট ছোট পরিবর্তন, একটু বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করলে লক্ষ করা যায়।
এছাড়াও, লাঙল পত্রিকায় মুদ্রিত ‘জেলেদের গান’ বা ‘ধীবরদের গান’টির মৌলিক পাঠের সঙ্গে, বিভিন্ন গ্রন্থভুক্তিতে প্রকাশিত টেক্সটের মধ্যে নানা ধরনের পাঠ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলাম রচনাসমগ্র (দ্বিতীয় খণ্ড) তে এই গানটির শব্দগত, বানানগত এবং বিরামচিহ্নজনিত নানান পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। অবশ্য ‘রচনাসমগ্র’-এর সংকলক-সম্পাদক-পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে : ‘বানানের সমতাবিধানের প্রয়োজনে বাংলা আকাদেমির বানানবিধি যথাসম্ভব অনুসৃত হয়েছে।’ বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলীতেও অনবধানতাবশত স্তবক ছেদের(বাদ) দৃষ্টান্ত মেলে। এই দীর্ঘ কবিতাটির তৃতীয় স্তবক আবদুল কাদির সম্পাদিত দ্বিতীয় খণ্ড থেকে বাদ গিয়েছে। কোন্ যুক্তিতে বাদ গিয়েছে বা বাদ দেয়া হয়েছে, তার কোনও যৌক্তিক কারণ সম্পাদক কোথাও জানাননি। তবে ওই সংস্করণে কোথাও কোথাও দু’একটি শব্দ বর্জন এবং কোথাও কোথাও সংযোজন হয়েছে। মূল কবিতার সঙ্গে গ্রন্থভুক্ত পাঠের সমান্তরাল পাঠভেদ দেখলে তবেই তা বোঝা যাবে। তবে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সংস্করণে, ছয় নম্বর স্তবকে ‘পাথার-জল’ শব্দটির জায়গায় ‘পাথর-জল’ মুদ্রিত হয়েছে। ফলে, অর্থান্যাস ঘটেছে। ‘পাথার-জল’-এর ‘পাথার’ মানে ‘সমুদ্র’; ‘পাথার-জল’ মানে ‘সমুদ্র-জল’। ‘পাথর-জল’ দিয়ে কি বোঝানো যাবে, বোঝা মুশকিল! সম্ভবত এটাকে মুদ্রণ-প্রমাদ বলে মেনে নেয়া যেতে পারে। প্রথম স্তবকের পঞ্চম পঙ্ক্তিতে ‘মুটে মজুর হেলে’-এর ‘হেলে’ শব্দটির অর্থ হলো : হালিয়া অর্থাৎ চাষি বা কৃষক। অরুণকুমার বসু তাঁর নজরুল জীবনী শীর্ষক গ্রন্থে (আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত) কবিতাটি নিয়ে আলোচনা-প্রসঙ্গে হেলে’র স্থলে ‘জেলে’ লিখে দিয়েছেন। এই প্রয়োগও ভ্রান্তিজনিত কারণে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করবে। মূল কবিতার সপ্তম স্তবকে আছে : ‘জমিদারের চরে’―সেখানে পশ্চিমবঙ্গের ও বাংলাদেশের বাংলা একাডেমির উভয় সংস্করণেই ‘জমিদারের চরে’র স্থলে কেন ‘জমাদারের চরে’ মুদ্রিত হয়েছে, বোঝা গেল না। সংকলন ও সম্পাদনার সময়ে মূল রচনারই অনুসরণ করা শ্রেয় ও শোভন। অবশ্য নজরুল ইসলামের গ্রন্থে―সংকলন, সম্ভার, রচনা সংগ্রহ, রচনাসমগ্র, রচনাবলীতে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় পাঠজনিত এবং মুদ্রণজনিত কারণে ভিন্ন ভিন্ন পাঠ পরিলক্ষিত হয়।
মৎস্যজীবী সম্মেলনে নজরুলকে সাধুবাদ
লাঙল―প্রথম খণ্ড, ত্রয়োদশ সংখ্যায় (কলিকাতা, বৃহস্পতিবার, ১১ চৈত্র, ১৩৩২): ‘মৎস্যজীবীর কথা’ শিরোনামে সভাপতি হেমন্তকুমার সরকারের দীর্ঘ ভাষণটি মুদ্রিত হয়। এই সংখ্যাতেই অধিবেশনের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে (২৫ মার্চ, ১৯২৬); অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি, ডা. প্রতাপচন্দ্র গুহরায়ের ভাষণ উদ্ধৃত করে নজরুল ইসলামের প্রশংসা করে লেখা হয়েছে :
নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলন/ তৃতীয় অধিবেশন/মাদারীপুর ১১ ও ১২ মার্চ ১৯২৬। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি শ্রী প্রতাপচন্দ্র গুহরায়ের ভাষণ :
‘… বাঙ্গালীর অগ্নিমন্ত্রের উপাসক, তরুণ প্রাণের অরুণ আলোক-বিজ্ঞান, অগ্নি-বীণার শক্তিবাদক, প্রাণোপম শ্রীমান নজরুল ইসলামকে সানন্দে ভ্রাতার আদরে বক্ষে আলিঙ্গন করিয়া ধন্য হইতেছি।’
এই প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, প্রতাপচন্দ্র গুহরায় ছিলেন মাদারীপুরের দত্তকেন্দুয়া এলাকার বাসিন্দা নজরুল-বন্ধু এবং নজরুল-সম্পাদিত নবযুগ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর প্রধান ও যুগান্তর দলের বিপ্লবী কালিপদ গুহরায়ের ছোট ভাই। প্রতাপবাবু ছিলেন মূলত যুগান্তর পার্টির সদস্য। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সংস্পর্শে এসে তিনি ‘স্বরাজ্য’ পার্টির একজন সক্রিয় সংগঠক হয়ে ওঠেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে তিনি ১৫ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। তিনি ছিলেন কলকাতা প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার এবং মৎস্যজীবী আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা।
মৎস্যজীবী সম্মেলনে নজরুলের সমর্থিত ৪ প্রস্তাব গৃহীত
প্রসঙ্গান্তরে বলেছি, কৃষ্ণনগরে প্রজা সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে যে ১৯টি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল, তার ৪টি প্রস্তাবের সমর্থক ছিলেন নজরুল ইসলাম। মাদারীপুরের অধিবেশনেও, মৎস্যজীবীদের অধিকার ও কল্যাণবিষয়ক পূর্বোক্ত, কবির ঐ প্রস্তাব চারটিও অন্যান্য প্রস্তাবের সঙ্গে প্রায় কোনও রূপ ভাষা পরিবর্তন না করেই গ্রহণ করা হয়। নজরুল ইসলামের কৃষ্ণনগরের সমর্থিত ও গৃহীত ১৫ নং প্রস্তাবটি মাদারীপুরে একাদশ প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয় :
১. ‘এই সম্মিলনী বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নদীয়া জেলার প্রতিনিধি শ্রীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকার মহাশয়ের প্রস্তাবিত’ বেঙ্গল ফিসারিজ বিল ১৯২৬ (ঞযব ইবহমধষ ঋরংযবৎরধষ ইরষষ, ১৯২৬) সর্ব্বান্তকরণ অনুমোদন করিতেছে এবং যাহাতে ঐ বিল আইনে পরিণত হয় তাহার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিবার জন্য ব্যবস্থাপক সভার সদস্যগণকে একান্ত অনুরোধ করিতেছেন।
তাঁর গৃহীত ১৬ নং প্রস্তাবটিও, মাদারীপুরের অধিবেশনে দ্বাদশ প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হয়। প্রস্তাবটির ভাষা ছিল এই রকম :
২. “যেহেতু মৎস্যজীবীরা অত্যন্ত গরীব এবং যেহেতু তাহাদের একবেলাও মাছ না ধরিলে তাহাদের অন্ন সংস্থানের জন্য কোনও ব্যবস্থা নাই বলিয়া এই সম্মিলনী বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার ত্রিপুরা জেলার প্রতিনিধি শাহ্ সৈয়দ ইমদাদুল হক সাহেবের প্রস্তাবিত ‘মৎস্যের পোনা সংরক্ষণ বিল, ১৯২১’ (ইবহমধষ ঋরংয ঋৎু চৎবংবৎাধঃরড়হ ইরষষ, ১৯২১) অর্থাৎ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় এই তিন মাস মৎস্য ধরা বন্ধ রাখা সম্বন্ধীয় বিলের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছেন এবং গভর্নমেন্টের নিকট ও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সভ্যগণের নিকট এই প্রার্থনা করিতেছেন যে, যাহাতে ঐরূপ সর্ব্বসাধারণের অনিষ্টকর বে-আইনি আইন বিধিবদ্ধ না হয়, তাহার জন্য যেন সকলেই যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া দরিদ্র প্রজা সাধারণের চিরকৃতজ্ঞতাভাজন হন।”
কৃষ্ণনগরের অধিবেশনে নজরুল ইসলামের সমর্থিত ১৭ নং প্রস্তাবটি মাদারীপুরে ত্রয়োদশ প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হয়। প্রস্তাবটি হলো :
৩. ‘এই সম্মিলনী ফরিদপুর জেলাবাসী মৎস্যজীবী ভ্রাতাদিগের দুঃখে সহানুভূতি জ্ঞাপন করিতেছেন এবং ফরিদপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান বাহাদুর ও অন্যান্য মেম্বরদিগকে এই অনুরোধ করিতেছেন যে, তাঁহারা যেন দয়া করিয়া অনতিবিলম্বে মৎস্যজীবীদিগকে রক্ষা করিবার জন্য কাঠা, ভোসাল, আওর, কোণ্ প্রভৃতির সাহায্যে মৎস্য ধরিবার নিষেধাজ্ঞামূলক বিধির প্রত্যাহার করেন এবং গভর্নমেন্ট যেন *ফতেপুর হইতে মাদারীপুর পর্যন্ত কুমার নদীর সন্নিহিত খালসমূহে *কবাট না দেন।’
কবির সমর্থিত ১৮ নং প্রস্তাবটি মাদারীপুরের সম্মেলনে চতুর্দশ প্রস্তাবাকারে গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবে বলা হয় :
৪. ‘এই সম্মিলনী মৎস্যজীবীদের প্রতি আচরিত জল-পুলিশের অন্যায় ও অসঙ্গত ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছেন এবং মৎস্যজীবীদিগকে এই সব অত্যাচারের হাত হইতে বাঁচাইবার জন্য এই বিষয়ে গভর্নমেন্টের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছেন।’
―
হেমপ্রভা মজুমদার : ‘হেমপ্রভা’ শীর্ষক গান/কবিতা রচনা
নজরুলের সঙ্গে একই স্টিমারে এসেছিলেন কুমিল্লার বিপ্লবী নেতা বসন্তকুমার মজুমদার এবং তাঁর স্ত্রী বিপ্লবী হেমপ্রভা মজুমদার। নজরুল ইসলাম কুমিল্লা গিয়েছিলেন পাঁচবার। তখনই হেমপ্রভা মজুমদারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। হেমপ্রভার প্রতি নজরুলের শ্রদ্ধা ছিল অগাধ। মাদারীপুর-সম্মেলন উপলক্ষে, একটানা তিন দিন একসঙ্গে সময়-যাপনের ফলে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। হেমপ্রভা মজুমদার ছিলেন বিপ্লবী, দেশ-নেত্রী। নারীকর্মী-সংগঠনের নেত্রীস্থানীয়া এই শ্রদ্ধেয়া মানবীকে, নজরুল ইসলাম বসিয়েছিলেন মায়ের আসনে। পরে, ১৯৩০ সালে আইন অমান্য করে এই বিপ্লবী নেত্রী এক বছরের জন্য কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালে তিনি হয়েছিলেন প্রাদেশিক বিধানসভার সদস্যা। নজরুলকে তিনি খুবই স্নেহ করতেন। মাদারীপুর সম্মিলনী শেষ হয় ১২ মার্চ। কিন্তু তাঁরা ১৩ মার্চও মাদারীপুরে ছিলেন। মাদারীপুরেই ২৯ ফাল্গুন অর্থাৎ ১৩ মার্চ হেমপ্রভা মজুমদারকে নিয়ে কবি রচনা করেন ‘হেমপ্রভা’ নামে একটি গান বা কবিতা। কবিতাটি পরবর্তীকালে, নজরুল তাঁর ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৬ পঙ্ক্তিবিশিষ্ট, প্রাসঙ্গিক এই কবিতাটি তুলে দেওয়া হলো :
হেমপ্রভা
কোন্ অতীতের আঁধার ভেদিয়া
আসিলে আলোক-জননী।
প্রভায় তোমার উদিল প্রভাত
হেম্-প্রভ হ’ল ধরণী।।
ভগ্ন দুর্গে ঘুমায়ে রক্ষী
এলে কি মা তাই বিজয়-লক্ষ্মী,
‘ম্যায় ভূখা হুঁ’-র ক্রন্দন-রবে
নাচায়ে তুলিলে ধমনী।।
এস বাঙলার চাঁদ-সুলতানা
বীর মাতা বীর-জায়া গো।
তোমাতে পড়েছে সকল কালের
বীর-নারীদের ছায়া গো।
শিব-সাথে সতী শিবানী সাজিয়া
ফিরিছ শ্মশানে জীবন মাগিয়া
তব আগমনে নব-বাঙলার
কাটুক আঁধার রজনী।।
(মাদারীপুর
২৯ ফাল্গুন, ১৩৩২)
গানটি দেশাত্মবোধক। রাগ : সিন্ধুড়া এবং তাল : একতাল ।
প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যায়, নজরুল ইসলামের ধূমকেতু পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর (১১ আগস্ট, ১৯২২, শুক্রবার/২৬ শ্রাবণ, ১৩২৯), কবি স্বেচ্ছায়―সাগ্রহে পত্রিকার কপি পাঠিয়েছিলেন মাতৃসমা হেমপ্রভা মজুমদারকে। হেমপ্রভা মজুমদার পত্রিকার প্রাপ্তি স্বীকার করে, ২ আশ্বিন ১৩২৯ তারিখে, নজরুল ইসলামকে একটি তাৎপর্যবহ চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটি তুলে দেওয়া হলো :
কল্যাণস্পদেষু―
তোমার লাল কালিতে লেখা চিঠিখানি পাইলাম। তোমার কাগজও পাইয়াছি―সে-ও তোমার জীবনের রক্ত দিয়া লেখা। আমার সমুদয় অন্তরের আশীর্বাদ জানিবে।
নিজেকে ‘অমঙ্গল’ বলিতে ভালবাস। আমি হিন্দু মেয়ে। শ্মশানের ভস্ম, মড়ার মাথার খুলি, ধুতরা ফুল, কালকূট বিষ, ভূতপ্রেতের নাচ―এই সমস্ত বীভৎস অকল্যাণের মধ্যে শিবেরই লেখা দেখিতে ভারতবর্ষ আমাদিগকে শেখায়। এই কারণে, পুনরায় আমার আশীষ
জানিবে।
ইতি―
শুভানুধ্যায়িনী―
শ্রীহেমপ্রভা মজুমদার
এই চিঠিটি ছাপা হয় ধূমকেতুর প্রথম বর্ষ, ১০ম সংখ্যায় (মঙ্গলবার, ২ আশ্বিন, ১৩২৯ সাল; ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯২২, পৃ.২; পর্যায় : ‘হংশ-দূত’।) চিঠির দ্বিতীয় স্তবকে তিনি লিখেছিলেন ভারতীয় শিব সংক্রান্ত মিথ-এর কথা। প্রায় তিন বছর পূর্বের সেই চিঠির বক্তব্যকে স্মরণ করেই কবি লিখলেন এই গানটির শেষ চারটি পঙ্ক্তি, যাতে ‘হেমপ্রভা’র অন্তরের কামনা প্রতিভাত হয়েছে। কবি লিখেছেন :
‘শিব-সাথে সতী শিবানী সাজিয়া
ফিরিছ শ্মশানে জীবন মাগিয়া
তব আগমনে নব-বাঙলার
কাটুক আঁধার রজনী।।’
[ঢাকার বাংলা একাডেমি (আবদুল কাদির সম্পাদিত) প্রকাশিত নজরুল রচনাবলীর দ্বিতীয় খণ্ডে কবিতাটির মৌলিক পাঠকেই অনুসরণ করা হয়েছে; অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি মুদ্রিত কাজী নজরুল ইসলাম রচনাসমগ্র-এর তৃতীয় খণ্ডে বানানের সমতা রক্ষার্থে বাংলা আকাদেমি বানানবিধি অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে, বানান এবং বিরামচিহ্নের ক্ষেত্রে মূল পাঠ থেকে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।]উপসংহার
স্বাধীনতার নিষ্ঠ সৈনিক, কবি নজরুল চেয়েছেন ‘পূর্ণ স্বরাজ’ ও মুক্ত স্বাধীন-ভারতের প্রতিষ্ঠা। তাঁর সমগ্র কর্মকাণ্ডের অধিকাংশটাই কেন্দ্রীভূত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতায়। এই অমোঘ আকাক্সক্ষাতেই তিনি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, ভাষণ দিয়েছেন।
তিনি কবিতা লিখেছেন, গান লিখেছেন; সভা-সমিতিতে তা পড়েছেন, গেয়েওছেন। চারণ-কবির মতোই, স্বভাব-কবি ও স্বভাব-গীতিকার নজরুল, প্রয়োজনে যে কোনও অবস্থায়, যে কোনও পরিস্থিতিতে কবিতা ও গান লিখেছেন; লিখতে পারতেন সহজাত-ধ্যানীর মতো। স্বাধীনতার সৈনিক, কবি নজরুলের কলম’ই ছিল তাঁর যুদ্ধের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্প্রচারের হাতিয়ার।
স্বরাজ ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার, আর নিরন্ন মানুষের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল হয়ে কথা বলেছেন সারা জীবন। নজরুল তাই মাদারীপুরে গেছেন ‘বঙ্গীয় মৎস্যজীবী সম্মেলনে’। উদ্বোধনী গান লিখেছেন শত ব্যস্ততার মাঝেও। ঐ বিরাট সম্মেলনে, তাঁর রচিত ও সুরারোপিত ‘ধীবরের বা জেলেদের গান’ নিজেই গেয়ে, সভার উপস্থিত জনতাকে এবং দুস্থ―সর্বহারাদের’কে তথা মৎস্যজীবীদর’কে তাদের অধিকারের কথা বলেছেন; তাদের উদ্দীপিত করেছেন উদ্বোধনী সঙ্গীতের ভাষায়।
গান লিখেছেন বিপ্লবী হেমপ্রভা মজুমদারকে নিয়েও।
এসব কিছুরই মূল কথা : বিপ্লব, বিদ্রোহ এবং দেশমাতৃকার স্বাধীনতা। কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে তাঁর দল গঠন, তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, এসবই মেহনতী মানুষের জন্য। বিপ্লবের পীঠস্থান, স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর যোদ্ধা ও যুদ্ধ-প্রস্তুতিক্ষেত্র ‘মাদারীপুর’, তাই নজরুলের কাছে তীর্থ দর্শনের সমতুল। আগেই বলেছি, এখানকার বিপ্লবীদের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে উঠেছিল বহরমপুর সেন্ট্রাল জেল-এ থাকাকালেই। দেশকে ও দেশপ্রেমিকদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার নিদর্শন রূপে, তাই তাঁদের অন্যতম নেতা ও বিপ্লবী ‘শান্তি সেনা’র অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাস’কে নিয়ে কবিতা লেখেন, কবিতার বই উৎসর্গ করেন। বলেছি, মাদারীপুরের চার বিপ্লবী সন্তান ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ বলি দিয়েছেন; প্রাণ দিয়েছেন সম্মুখ-সমরে বালেশ্বর-এ ।
তাই বলা যায়, ‘মৎস্যজীবী সম্মেলন’কে উপলক্ষ্য করে কবি নজরুলের মাদারীপুর-দর্শন, প্রকারান্তরে এক ‘বিপ্লব-তীর্থ’ দর্শনেরই সমতুল।
সহায়কপঞ্জি
১. নজরুল-রচনাবলী, আবদুল কাদির সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২৫শে মে, ১৯৬৬।
২. কাজী নজরুল ইসলাম রচনাসমগ্র, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা; কলকাতা বইমেলা, ২০০১।
৩. লাঙল ও গণবাণী, মুহম্মদ নূরুল হুদা সম্পাদিত; নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা; মে, ২০০১।
৪. বাংলা নাটকে নজরুল ও তাঁর গান, ব্রহ্মমোহন ঠাকুর; পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি, কলকাতা, নভেম্বর, ১৯৯৫।
৫. স্বাধীনতাযুদ্ধে মাদারীপুর; সংকলন ও সম্পাদনা: বরুণ রায়চৌধুরী, গ্রন্থতীর্থ, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০০।
৬. কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা; মুজফ্ফর আহমদ; মুক্তধারা, ঢাকা, অক্টোবর, ১৯৭৩।
৭. কাজী নজরুল ইসলাম : জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ; পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ২৯ আগস্ট, ২০০০।
৮. নজরুল ও বাংলাদেশ : আলী হোসেন চৌধুরী, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, অক্টোবর, ২০০০।
৯. নজরুল-সঙ্গীত অভিধান ; আবদুস সাত্তার, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ২৫ মে,১৯৯৩।
১০. নজরুল জীবনী; রফিকুল ইসলাম। বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২৫ মে, ১৯৭২।
১১. অজানা নজরুল; শেখ দরবার আলম, মল্লিক ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৭ জুলাই, ১৯৮৮।
১২. সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান, অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, মে, ১৯৭৬।
১৩. বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল জীবনী; গোলাম মুরশিদ। ‘প্রথমা’ প্রকাশন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৮।
১৪. নজরুল-জীবনী; অরুণকুমার বসু, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, জানুয়ারি, ২০০০। আনন্দ সংস্করণ, ডিসেম্বর, ২০১৬।
১৫. কাজী নজরুল; প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়। প্রাপ্তিস্থান : ন্যাশনাল বুক এজেন্সী প্রা: লি:, কলকাতা ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬২। দ্বিতীয় বর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ, ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৭৩।
১৬. নজরুলের সঙ্গে কারাগারে; নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী, কলকাতা।
১৭. বাংলা সাহিত্যে নজরুল; আজহারউদ্দিন খান, ডি.এম. লাইব্রেরি, কলকাতা, জ্যৈষ্ঠ ১৩৬২।
১৮. অপভ্রংশ শামন্দার অপভ্রষ্ট : মাদারীপুর জেলার ইতিকথা; মতিয়ার রহমান, গতিধারা, ঢাকা, মে, ২০১০।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক



