আর্কাইভউপন্যাস

মেমোরি ট্রান্সফিউশন : দীপু মাহমুদ

সায়েন্স ফিকশন : উপন্যাস

শীতকাল। গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার শীত পড়েছে বেশি। এত বেশি শীত যে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের আবহাওয়া জটিল হয়ে উঠেছে। এখানকার আবহাওয়ার ভাবগতিক ভালো নয়। এখন অবস্থা শীতল নাকি উত্তপ্ত বোঝা যাচ্ছে না। কনস্টেবল রহমতউল্লাহ পড়ে গেছে বিরাট সংকটে। তার তিন দিনের ছুটি দরকার। স্ত্রী বাড়ি যেতে বলেছে। হঠাৎ কেন বাড়ি যেতে হবে তা বলেনি। তার স্ত্রী কঠিন ধাঁচের মানুষ। ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ না হলে তাকে বাড়ি যেতে বলত না। রহমতউল্লাহর সাহস হয়নি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে, কেন বাড়ি যেতে হবে ?

রহমতউল্লাহর বাড়ি যেতে হয় নদীপথে। সড়কপথে যাওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। যেতে লাগে একদিন। আসতে একদিন। স্ত্রী কেন ডেকেছে সেটা শুনতে লাগবে একদিন। সে ছুটির দরখাস্ত দিয়েছিল। ছুটি মঞ্জুর হয়েছে। এখন বলছে যাওয়া যাবে না, ছুটি ক্যানসেল।

নিজ ফ্ল্যাটে সাংবাদিক তানজিলা হোসেন খুন হয়েছেন। তার বয়স ৩২ বছর। ফ্ল্যাটে তিনি একা থাকতেন। বিয়ে করেননি। মাঝেমধ্যে বাবা-মা এসে তার সঙ্গে কয়েক দিন থেকে যেতেন। তানজিলা যখন খুন হন তখন ফ্ল্যাটে তিনি একা ছিলেন। কেন তাকে খুন করা হয়েছে সেই রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তানজিলার খুনি সন্দেহে এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। অ্যাপার্টমেন্টে সিসি ক্যামেরা আছে। খুনের সময়ের আগে ও পরের ফুটেজে দেখা গেছে ঝিরঝিরে অবস্থা। আচমকা ছবি ঝিরঝির করতে শুরু করেছে। এখনও ঝিরঝির করছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের আবহাওয়া জটিল হয়ে ওঠার কারণ আছে। মধ্য দুপুরে খুন হয়েছেন সাংবাদিক তানজিলা হোসেন। সন্ধ্যার পর খুন হয়েছে রফিকুল নামে ৩৮ বছরের এক তরুণ। তার লাশ পাওয়া গেছে মরা বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে নির্জন জায়গায়। তানজিলা হোসেন আর রফিকুলকে একই পিস্তল দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দুদিন আগে এক মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার খুন হয়েছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনও খুনের কূলকিনারা করতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষজন পুলিশের ব্যর্থতা নিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছে। মামলা এসেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে।

তানজিলা হোসেন যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন সেই অ্যাপার্টমেন্টের সিকিউরিটি গার্ড আর কেয়ারটেকারকে সিআইডি অফিসে নিয়ে আসা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। এখানে আসার পর থেকে মনে হচ্ছে দুজন পানি খাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। তারা ঘন ঘন পানি খাচ্ছে আর টয়লেটে যাচ্ছে পেশাব করতে। ভয়ংকর শীতেও তারা কুলকুল করে ঘামছে। তাদের কপালে, গালে, থুতনিতে ঘাম চিকচিক করছে। সিকিউরিটি গার্ডের নাম উত্তম। বয়স ২০-২২ বছর। শুকনো লিকলিকে শরীর। কেয়ারটেকারের নাম তোজাম্মেল। তার বয়স ৬২ বছর। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি আর মাংস জমে থলথল করছে।

জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে অদ্ভুতভাবে তাদের দুজনের পানি খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সিকিউরিটি গার্ড উত্তম বলল, ‘স্যার, আমি এই জায়গায় নতুন। আমার বাড়ি কুড়িগ্রামের বেহুলার চরে। কাকার সঙ্গে ঢাকায় এসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরিতে ঢুকেছি। যেদিন চাকরিতে ঢুকেছি ঘটনা সেই দিনই ঘটেছে।’

পুলিশ ইন্সপেক্টর সাজ্জাদ মুনির, রাদি হাসান আর আঞ্জুমান রশীদ বসে আছে শান্তভাবে। তাদের ভেতর অস্থিরতা কাজ করছে। কিন্তু তারা অস্থিরতা প্রকাশ করছে না। এদের ভেতর রাদি হাসান আর আঞ্জুমান রশীদ সাহসিকতা আর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক পেয়েছে। সাজ্জাদ মুনির পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ পদক। সাজ্জাদ আর আঞ্জুমান ব্যাচমেট। রাদিদের চেয়ে দুই ব্যাচ আগের। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এদের ওপর ভরসা রাখে।

শীতল গলায় রাদি বলল, ‘আপনাদের অ্যাপার্টমেন্টে কোনও রেজিস্টার মেইনটেন করা হয় না, এটা দুঃখজনক। কোন ফ্ল্যাটে কে এল তার কোনও রেকর্ড থাকে না।’

উত্তম বলল, ‘স্যার, আমি লেখাপড়া জানি না। বেহুলার চরে লেখাপড়ার খুব বেহাল অবস্থা। একটা মাদ্রাসা আছে। সেখানে আমার যাওয়ার অনুমতি নাই।’

রাদি বলল, ‘ঘটনার সময় সিসি ক্যামেরায় কোনও ছবি পাওয়া যায়নি। মনিটর ঝিরঝির করছে।’

উত্তম বলল, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না, স্যার। আমি কোনও ক্যামেরা দেখি নাই।’

আঞ্জুমান ঘাড় ঘুরিয়ে তোজাম্মেলের দিকে তাকাল। তোজাম্মেল মনোযোগ দিয়ে উত্তমের কথা শুনছে। আঞ্জুমান তার দিকে তাকাতে সেও কেন জানি মাথা ঘুরিয়ে এদিকেই তাকিয়েছে। আঞ্জুমান জিজ্ঞেস করল, ‘ঘটনার সময় আপনি কোথায় ছিলেন ?’

তোজাম্মেল বলল, ‘ইলেকট্রিক বিল দিতে গিয়েছিলাম। অনেকগুলো ফ্ল্যাটের ইলেকট্রিক বিল একসঙ্গে নিয়ে গিয়ে আমি জমা দিয়ে আসি। তানজিলা আপার ইলেকট্রিক বিলও ছিল। তিনি নিজে আমাকে দিয়েছেন।’

সাজ্জাদ বলল, ‘ঘটনার আগে ও পরে অ্যাপার্টমেন্টে বাইরের কোনও লোক এসেছিল ?’

প্রশ্ন কাকে করা হয়েছে তা উত্তম বা তোজাম্মেল বুঝতে পারছে না। সাজ্জাদের চোখে সানগ্লাস। তার চোখ দেখা যাচ্ছে না। চোখ দেখা যাচ্ছে না বলে সে কার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছে সেটা বুঝতে তাদের মুশকিল হচ্ছে।

তোজাম্মেল বলল, ‘আমি ফেরার পর ঘটনা জানাজানি হয়েছে। বাড়ির কাজের বুয়ারা ছাড়া সকাল থেকে বাইরের কেউ অ্যাপার্টমেন্টে আসেনি।’

উত্তম বলল, ‘একজন এসেছিল খবরের কাগজ দিতে।’

তোজাম্মেল বলল, ‘সে প্রতিদিন আসে।’

সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করল, ‘আর কেউ ?’

উত্তম বলল, ‘এক হুজুর এসেছিল। বলল পাঁচ তলায় যাব। সাহেব নাকি তাকে ডেকেছে।’

‘কত নম্বর ফ্ল্যাটে যাবে জিজ্ঞেস করেছিলে ?’

‘আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। এখানকার কোনও বাড়ির কাউকে আমি চিনি না। নতুন এসেছি, স্যার।’

তোজাম্মেল বলল, ‘তানজিলা আপা থাকত তিন তলার ফ্ল্যাটে। তিনি খুন হয়েছেন তিন তলায়।’

সাজ্জাদ বলল, ‘আর কেউ এসেছিল ?’

উত্তম বলল, ‘এক লোক এসেছিল ডিশের বিল নিতে। সেই লোক আসার প্রায় সাথে সাথেই চলে গেছে।’

রাদি জিজ্ঞেস করল, ‘ঘটনা জানা গেল কীভাবে ?’

তোজাম্মেল বলল, ‘ইলেকট্রিক বিল দিয়ে ফিরে এসে আমি গেছি তানজিলা আপাকে বিলের কপি দিতে। দরজা দিয়ে রক্তের স্রোত বের হয়ে আসছে খেয়াল করিনি। বেলে চাপ দিয়েছি। বেল বাজে। কেউ দরজা খোলে না। আচমকা দেখি পায়ের পাশে রক্ত। তানজিলা ম্যাডামের ফ্ল্যাট থেকে দরজার নিচ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে আসছে। আমি অ্যাপার্টমেন্টের সভাপতি আর সেক্রেটারি সাহেবকে খবর দিলাম। তারা পুলিশে খবর দিল। পুলিশ এসে দরজা খুলে দেখে দরজার সামনে পড়ে আছে তানজিলা আপা। রক্তে তার শরীর ভেসে যাচ্ছে।’

‘দরজা বন্ধ ছিল ?’

‘দরজা টেনে বন্ধ করা ছিল। রক্ত দেখে আমি ধাক্কা দিইনি। পুলিশ এসে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলেছে।’

মডেল নামে একজনকে নিয়ে আসা হয়েছে সিআইডি অফিসে। পুলিশ তাকে খুঁজতে গিয়েছিল। নদীর ধারে রফিকুল নামে যার লাশ পাওয়া গেছে তার পকেটে একটা নোটবুক ছিল। নোটবুকে সবশেষ তারিখে মডেলকে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা লেখা আছে। মডেল আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা পাবে সেটাও সেখানে উল্লেখ আছে। পুলিশের রেকর্ডে মডেল একজন দাগি আসামি। তার নামে ছিনতাই, গুম, মাদক, ধর্ষণ আর হত্যার অনেক মামলা আছে। ক্ষমতাবান প্রভাবশালী মানুষজনের সঙ্গে তার সখ্য। সে সব কয়টি মামলায় জামিনে আছে। মডেলকে নিয়ে আসা হয়েছে রফিকুলের কাছ থেকে সে কেন টাকা নিয়েছে সেটা জানতে। তাকে পাশের ঘরে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

কনস্টেবল রহমতউল্লাহর ডাক পড়েছে। সে ছুটে এসেছে। তার ধারণা ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেছে। সন্ধ্যার লঞ্চে বাড়ি যেতে পারবে।

আঞ্জুমান পকেট থেকে টাকা বের করে রহমতউল্লাহর দিকে বাড়িয়ে দিল। শান্ত গলায় বলল, ‘তাদের শিঙাড়া আর চা খাওয়ার ব্যবস্থা কর।’

চুপসে গেছে কনস্টেবল রহমতউল্লাহ। সে টাকা নিয়ে মন খারাপ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

মডেল উদাস ভঙ্গিতে বসে আছে। তার ভেতর কোনও ভাবান্তর নেই। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাঝেমধ্যে সিআইডি অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। সিআইডি অফিস তার কাছে পরিচিত জায়গা।

সাজ্জাদ বলল, ‘রফিকুলের কাছ থেকে কত টাকা নিয়েছিলেন ?’

মডেল একবার ডান দিকের আর একবার বাঁ দিকের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ব্যায়াম করার ভঙ্গি করে বলল, ‘কোন রফিকুল ?’

‘নদীর ধারে যার লাশ পাওয়া গেছে।’

‘বুঝেছি, বার্মা! সে বার্মা থেকে ইয়াবা নিয়ে এসে এখানে বিক্রি করত। আমাকে এসে বলল, ভাই, এই ব্যবসা খারাপ। এ ব্যবসা আর করতাম না। কাঁচাবাজারে সবজি বিক্রি করব। এই কথা বলে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল দেড় লাখ টাকা। তার এক লাখ টাকা শোধ দিয়েছে। আর পঞ্চাশ হাজার টাকা শোধ দেওয়ার আগেই খালাস হয়ে গেল। মানুষের উপকার করতে গিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা লস হলো আমার।’

টাকার অঙ্ক মিলে গেছে। মডেলের কাছে এই তিন পুলিশ অফিসারের কারও কিছু জানার নেই। তারা মডেলকে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এল।

পাশের ঘরের দরজার সামনে কনস্টেবল রহমতউল্লাহ আর উত্তম দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তাদের হাতে শিঙাড়া। মডেলকে দেখে উত্তম মুখের ভেতরের শিঙাড়া গিলে নিয়ে বলল, ‘স্যার এই লোক গিয়েছিল ডিশের বিল নিতে।’

মডেলকে আবার সিআইডি অফিসের রুমে ঢোকানো হলো। প্রয়োজন হলে ডাকা হবে এই শর্তে উত্তম আর তোজাম্মেল ফিরে গেছে।

মডেল ঘটনা স্বীকার করেছে। তবে ঘটনা সে একবারে স্বীকার করেনি। তাকে বিশেষ কায়দায় ঘটনা স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছে।

মডেল বলল, ‘ওই সাংবাদিক মহিলা তানজিলাকে খুন করার জন্য রফিকুল আমাকে দেড় লাখ টাকায় কন্ট্রাক্ট করে। এক লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছিল। কাজ শেষ হওয়ার পর বাকি পঞ্চাশ হাজার টাকা দেওয়ার কথা।’

আঞ্জুমান বলল, ‘তানজিলা হোসেনকে তাহলে আপনি খুন করেছেন ?’

মডেল বলল, ‘খুন করতে গিয়েছিলাম। দরজায় বেল বাজালাম। দেখি কেউ দরজা খোলে না। চাপ দিলাম। দরজা খুলে গেল। লোডেড পিস্তল তাক করে ঘরে ঢুকেছি। দেখি দরজার সামনে রক্তের ভেতর মুখ থুবড়ে মহিলা পড়ে আছে। খুন বেশিক্ষণ আগে হয়নি। তখনও রক্ত গড়িয়ে বাইরের দরজার দিকে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে এসেছি। খুন কে করেছে আমি জানি না।’

‘রফিকুল কেন তানজিলা হোসেনকে খুন করতে চাইল ?’

‘সে চায় না। সে হচ্ছে দালাল। ধরেন রফিকুল ওই মহিলাকে খুন করার জন্য কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল দুই লাখ টাকার। আমাকে দিল দেড় লাখ টাকা। এক মার্ডারে পঞ্চাশ হাজার টাকা তার রোজগার।’

‘কে তাকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছিল তানজিলা হোসেনকে খুন করার ?’

‘সে কথা তাকে জিজ্ঞেস করিনি। আমার কাজ খুন করা, বিনিময়ে টাকা পাই। কে কাকে খুন করতে বলল তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আর এখন জানাও যাবে না বার্মা কার কাছ থেকে ওই মহিলাকে মার্ডারের কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল। বার্মা নিজেই তো খরচ হয়ে গেছে।’

মডেলকে তানজিলা হোসেন হত্যা মামলার সন্দেহজনক আসামি হিসেবে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

সাজ্জাদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে কনস্টেবল রহমতউল্লাহ দাঁড়িয়ে আছে। সে কখন ঘরে ঢুকেছে তারা খেয়াল করেনি।

সাজ্জাদ বলল, ‘কমিশনার স্যার বলেছেন এখন কাউকে ছুটি না দিতে। আমরা তো ছুটি মঞ্জুর করে দিয়েছি। কমিশনার স্যার না করলে কী করা যাবে ?’

আঞ্জুমান বলল, ‘তুমি কি চাইছো যে আমরা তোমার ছুটির ব্যাপারে স্যারের কাছে সুপারিশ করি ? আমার মনে হয় তোমার যদি অতি জরুরি কাজ থাকে তুমি চলে যাও। স্যার জিজ্ঞেস করলে পরে আমরা ম্যানেজ করে নেব।’

রহমতউল্লাহ বলল, ‘ছুটি লাগবে না। বউকে বলেছি জটিল অবস্থায় আছি। ওদিকে কী হয়েছে তা বউ সামাল দেবে বলেছে। আমাকে বলেছে এদিককার জটিল অবস্থা সামাল দিতে।’

আঞ্জুমান বলল, ‘তাহলে তো প্রবলেম সলভড। তুমি ডিউটি করো।’

রহমতউল্লাহ বলল, ‘সাংবাদিক তানজিলা হোসেনের ল্যাপটপটা খুঁজে বের করা দরকার।’

রাদি বলল, ‘নিশ্চয় সেটা খোঁজা হবে।’

রহমতউল্লাহ বলল, ‘সাংবাদিক তানজিলা খুন হওয়ার আগে নওরিন ফার্মার ওপর একটা রিপোর্ট করেছেন। ধারাবাহিক রিপোর্টের প্রথম কিস্তি প্রকাশের পরেই তিনি খুন হয়েছেন।’

রাদি বলল, ‘রিপোর্ট আমরাও দেখেছি। সেখানে নওরিন ফার্মায় কী কী ওষুধ তৈরি হয় সেই কথা লেখা আছে।’

‘পরের রিপোর্টে হয়তো সেসব ওষুধের ভেজাল কারবারের কথা ছিল।’

‘নওরিন ফার্মা কার ওষুধ কোম্পানি জানো ?’

‘জি স্যার, দেওয়ান হাবীব সাহেবের। উনার মেয়ের নাম নওরিন। আমেরিকায় থাকে। প্রথম বিয়ে টেকে নাই। দ্বিতীয় বরের সঙ্গে আমেরিকায় বসবাস করছে।’

‘তুমি এসব জেনেছো কীভাবে ?’

‘দেওয়ান সাহেবের ঘনিষ্ঠজন হচ্ছে আলম। আমাদের গ্রামে তার বাড়ি। গত দশ বছর সে বাড়িতে যায় নাই। গ্রামে তার মা ভিক্ষা করে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে খায়। বাপ-মায়ের সে একটাই ছেলে। বাপ মারা গেছে। ঢাকা শহরে আলমের দুটো অ্যাপার্টমেন্ট আছে। জমি কিনে বানানো বাড়ি। এত টাকা সে পায় কোথায় ?’

‘তুমি তার এত খবর জানো কেমন করে ?’

‘আমার সঙ্গে জানাশোনা আছে। খারাপ লোক পুলিশের সঙ্গে খাতির রাখে। সে খারাপ লোক। তানজিলা ম্যাডাম দেওয়ান হাবীব সাহেবের ওষুধ কোম্পানি নিয়ে লিখেছে। তিনি নিশ্চয়ই দেওয়ান হাবীব সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছেন কিংবা কথা বলার চেষ্টা করেছেন। তার সঙ্গে কথা বলার একমাত্র চ্যানেল হচ্ছে আলম। আমার ধারণা আলমের কাছে খবর আছে।’

রাদি অনিশ্চিতভাবে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, ‘পুলিশ তানজিলা হোসেনের ল্যাপটপ জমা দেয়নি।’

রহমতউল্লাহ বলল, ‘সিআইডি সেখানে গেছে পরে। প্রথমে গেছে পুলিশ। তারা লাশের ছবি তুলেছে। ছবি আমি দেখেছি, স্যার। ফ্ল্যাটের বাইরের দরজা দিয়ে ঢুকে ড্রয়িং রুম। সেখানে দেয়ালের সঙ্গে লাগানো সোফা। সোফার রং সবুজ। ছবিতে দেখবেন স্যার সবুজ সোফার ওপর ল্যাপটপে চার্জ দেওয়ার তার আছে। তারের মাথায় ল্যাপটপ নেই।’

রাদি, আঞ্জুমান আর সাজ্জাদ একসঙ্গে চমকে উঠেছে। তারা পরস্পর নিজেদের ভেতর দৃষ্টি বিনিময় করল। ছবি তারাও দেখেছে। এ কথা তাদের মাথায় আসেনি।  

রহমতউল্লাহ তখনও বলে যাচ্ছে, ‘তানজিলা ম্যাডাম হয়তো ল্যাপটপ চার্জে দিয়ে সেখানে বসে কাজ করছিলেন। বেল বাজলে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই তিনি খুন হয়েছেন। যে খুন করতে এসেছিল সে ল্যাপটপ নিয়ে চলে গেছে। ল্যাপটপের ভেতর আছে তানজিলা ম্যাডামের পরের লেখাগুলো। ল্যাপটপ এখন সবচেয়ে বেশি দরকার দেওয়ান হাবীব সাহেবের। তার নওরিন ফার্মা নিয়ে পত্রিকায় ধারাবাহিক খবর বেরুতে শুরু করেছে।’

রাদি বলল, ‘পত্রিকা বলেছে দেশীয় ওষুধ কোম্পানি নিয়ে তারা ধারাবাহিক রিপোর্ট করছে। নওরিন ফার্মার রিপোর্ট এখানেই শেষ।’

রহমতউল্লাহ বলল, ‘নওরিন ফার্মার বানানো প্যারাসিটামল ওষুধ খেয়ে ৪০ জন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাদের ৬ জন মারা গেছে।’

রাদি বলল, ‘পরে তো জানা গেল নওরিন ফার্মার প্যারাসিটামলে কোনও সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল অন্য কিছুতে।’

 রহমতউল্লাহ বিড়বিড় করে বলল, ‘টাকা দিলে স্যার সব সমস্যাই কাটানো যায়। বার্থ সার্টিফিকেটে পিতার নামও বদলে দেওয়া যেতে পারে।’

সাজ্জাদ বলল, ‘হুট করে দেওয়ান হাবীব সাহেবকে কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না। তিনি উলটো আমাদের ঝামেলায় ফেলে দিতে পারেন।’

আঞ্জুমান বলল, ‘ছাই উড়িয়ে দেখা যাক। আলমকে দিয়ে শুরু করি। থ্যাংক ইউ রহমতউল্লাহ।’

আলমের ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। চোখমুখ গম্ভীর। মনে মনে ভেবে নিচ্ছে তাকে কী প্রশ্ন করা হতে পারে। সে তার কী উত্তর দেবে।

আলম বসে আছে সিআইডি সদর দপ্তরে। তার সামনে বসে আছে সিআইডির তিনজন অফিসার। আঞ্জুমান, রাদি আর সাজ্জাদ। আলম এখানে এসে কনস্টেবল রহমতউল্লাহর খোঁজ করেছিল। তাকে বলা হয়েছে রহমতউল্লাহ ছুটিতে গেছে। রহমতউল্লাহ ছুটিতে যায়নি। সে রহমতউল্লাহর সঙ্গে এখন দেখা করতে চাইছে না। আলমের ইন্টারোগেশন শুরু হয়েছে।

আঞ্জুমান বলল, ‘আপনি কী করেন ?’

আলম বলল, ‘আমার একটা রেস্টুরেন্ট আছে চায়নিজ আর থাই খাবারের।’

‘রেস্টুরেন্ট কোথায় ?’

‘ফার্মগেট আর কারওয়ান বাজারের মাঝামাঝি। রেস্টুরেন্টের নাম দিলশাদ।’

‘দিলশাদ কার নাম ?’

‘দিলশাদ মানে হচ্ছে এখানকার খাবারের স্বাদ দিলে লেগে যাবে। দিলশাদ কারও নাম না।’

রাদি বলল, ‘খবরের কাগজে নওরিন ফার্মার রিপোর্ট দেখলেন। তারপর দেওয়ান হাবীব সাহেবের সঙ্গে এই রিপোর্ট নিয়ে আপনার কী কথা হয়েছে ?’

আলম বলল, ‘তিনি রিপোর্ট পড়ে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। বললেন, বাহ মেয়েটি তো বেশ লিখেছে।’

সাজ্জাদ উঠে আচমকা চটাস করে আলমের কানের নিচে থাপ্পড় মেরেছে। তাল সামলাতে না পেরে চেয়ার নিয়ে আলম মেঝেতে ঝুঁকে পড়ে গেল। 

এই পর্যায়ে আলমের ওপর টর্চার শুরু হয়েছে। টর্চার শুরু করেছে সাজ্জাদ। আলম সহজে মুখ খোলেনি। তাকে বিশেষ ইঞ্জেকশন দিতে হয়েছে। এই ইঞ্জেকশনের রি-অ্যাকশন ভয়াবহ। তাকে যা বলা হয় সে তাই দেখে। আপনজনদের নির্মমভাবে হত্যা করার দৃশ্য মনে হয় চোখের সামনে ঘটছে।

আলমের দুই চোখ ফুলে আছে। ঠোঁটের কোনা কেটে রক্ত গড়াচ্ছে। আলম ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘স্যারকে বললাম এই মেয়ে ডেঞ্জারাস। তার কাছে নওরিন ফার্মার সব খবর আছে। সে বেশ কয়েকটা ওষুধের কাঁচামালের স্যাম্পল নিয়ে গেছে। সব কয়টি ওষুধে ভেজাল আছে। নওরিন ফার্মার ওষুধ চলে মোড়কে আর ডাক্তার, রিপ্রেজেন্টেটিভ দিয়ে। বছরে তাদের মোটা টাকার গিফট দেওয়া হয়। রিপোর্ট বের হলে শুধু নওরিন ফার্মা বন্ধ হবে না, নওরিন ফার্মার সাথে জড়িত সবাইকে জেল খাটতে হবে।’

সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করল, ‘দেওয়ান হাবীব সাহেব কী বললেন ?’

আলম বলল, ‘তিনি বললেন, তুমি যাও। আমি চলে এলাম।’

দ্বিতীয় দফায় টর্চার শুরু হলো। তাতে নতুন কিছু জানা গেল না। আলমকে বলা হলো সিআইডি অফিসের এই ঘটনা সে যেন দেওয়ান হাবীব বা অন্য কাউকে না জানায়। যদি জানায় তাহলে তাকে কোনও একদিন কালো মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে। তুলে নিয়ে গিয়ে বালুর মাঠে গুলি করে মেরে ফেলা হবে।

আলম ঘটনা কাউকে জানাবে না বলেছে। তাকে সানগ্লাস দেওয়া হয়েছে। বড় ফ্রেমের কালো সানগ্লাস। সানগ্লাস পরলে চোখের ফোলা কম দেখা যাচ্ছে। সানগ্লাস পরে আলম সিআইডি অফিস থেকে বের হয়ে গেল।

চা দেওয়া হয়েছে। দুধ চিনি দিয়ে বানানো ঘন চা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সদর দপ্তরের একটা ঘরে তিন অফিসার বসে আছে। সাজ্জাদ চায়ে চুমুক দিয়েছে। রাদি আর আঞ্জুমানের চায়ের ওপর খয়েরি সর পড়েছে। তারা দুজন চায়ে চুমুক দেয়নি।

রাদির দিকে তাকিয়ে আঞ্জুমান বলল, ‘ধরুন আপনি কোনও নদীর ধারে বেড়াতে গেছেন। আগে সেখানে কখনও যাননি। সেই প্রথম। হংনসান চারপাশ। নদীর ধারে বটগাছ। গাছ থেকে ঝুরি নেমে এসেছে। বটের ঝুরি পানি ছুঁই ছুঁই করছে। নদীর ওপর দিয়ে শীতল বাতাস বয়ে আসছে। আপনার ভীষণ ভালো লাগছে। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ১০/১১ বছর বয়সের এক মেয়ে। তার মাথায় লালচে ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো চুল। গায়ে লাল জামা। অবাক হয়ে আপনাকে দেখছে। আপনার মনে হতে পারে এখানে আপনি আগেও এসেছেন। সেদিনও ঠিক এরকম একজন কিশোরী এসে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে আপনার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা অসম্ভব। কারণ আপনি এর আগে কোনওদিন এমন কোথাও যাননি এই ঝুরিনামা বটগাছ, এই নদী আপনার কাছে সবটা নতুন।’

উত্তেজনা দেখা দিয়েছে রাদির ভেতর। সে বলল, ‘আমি যখন সুদানের দার্ফুরে মিশনে ছিলাম তখন মাঝেমধ্যে এরকম ঘটনা ঘটত। রাস্তার ধারের কোনও রেস্তোরাঁয় হয়তো খেতে গেছি। একজন এসে বলল, তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি ? আমি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমার মনে হতো এখানে, এর আগে এ রকম রাস্তার ধারে জমজমাট ছোট্ট রেস্তোরাঁয় ঠিক এভাবেই একজন এসে আমাকে বলেছে, তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি ? এটা অসম্ভব। আগে আমি কখনও দার্ফুরে যাইনি। দার্ফুরে কি সুদানেই যাইনি। অথচ মনে হলো এই ঘটনা আগেও ঘটেছে। এরকম কোনও রেস্তোরাঁয় ঘটেছে। কিংবা ধপাভ যে আমাকে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি’―তার সঙ্গে আগে কখনও দেখা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ আমার মনে হলো হয়েছে। আমার মনে হলো এরপর কী কী ঘটনা ঘটবে তা যেন আমার জানা। কী অদ্ভুত অনুভূতি বলো।’

আঞ্জুমান বলল, ‘বিজ্ঞানীরা বলেন, এর নাম দেজা ভ্যু। দেজা ভ্যু ফরাসি শব্দ। যার অর্থ হলো অলরেডি সিন বা ইতিমধ্যে দেখা। এটা এমন এক অতিপ্রাকৃতিক অনুভূতি, যাতে আপনার মনে হবে এখনকার এই দৃশ্য আপনি আগেও দেখেছেন বা এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে আপনার জীবনে। অথচ আপনি নিশ্চিত যে এমনটা হতে পারে না। ১০০ জনের ভেতর ৬০ থেকে ৮০ জন মানুষের জীবনে এমন ঘটনা কখনও না-কখনও ঘটেছে।’

সাজ্জাদের চা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। সে আর চায়ের কাপে চুমুক দেয়নি। মনোযোগ দিয়ে আঞ্জুমানের কথা শুনছিল। সাজ্জাদ বলল, ‘এর সঙ্গে আমাদের কেসের কী সম্পর্ক ?’

আঞ্জুমান বলল, ‘দেওয়ান হাবীব গুরুতরভাবে সন্দেহের তালিকায় আছেন। এর আগেও বেশ কয়েকটা খুন আর গুমের সঙ্গে তার নাম এসেছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে সেগুলো প্রমাণ করা যায়নি। শুনেছি খুন আর গুমের ঘটনায় তিনি নিজে সরাসরি জড়িত থাকেন। তার ভেতর সিনেমাটিক হিরোইজম কাজ করে। নিজে কোনও ঘটনা ঘটিয়ে সেটা চাপা দিয়ে তিনি বিকৃত উল্লাস বোধ করেন।’

রাদি বলল, ‘তোমার প্ল্যানটা কি জানতে পারি ?’

আঞ্জুমান বলল, ‘খবর নিয়েছি দেওয়ান হাবীব হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সেদিন রাতে যেদিন মার্ডার দুটো হয়েছে। এখনও তিনি হাসপাতালেই আছেন।’

সাজ্জাদ বলল, ‘কী করতে চাইছো ?’

আঞ্জুমান বলল, ‘ওই হাসপাতালে ডাক্তার শরিফ আছেন। তিনি এপিলেপসিতে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে দেজা ভ্যু প্রয়োগ করেছেন। আমি পড়াশোনা করে এবং ডাক্তার শরিফের কাজ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে যতদূর জেনেছি মস্তিষ্কের টেমপোরাল লোবের রাইনাল কর্টেক্সে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিয়ে এটা করা হয়ে থাকে। ধারণা করা হয়, এই এলাকা নিউরনের বৈদ্যুতিক ডিসচার্জের অস্বাভাবিকতাই দেজা ভ্যুর জন্য দায়ী।’

সাজ্জাদ বলল, ‘তুমি ফার্মেসিতে পড়েছো। তুমি যত পরিষ্কারভাবে ঘটনা বুঝবে আমরা বুঝব না।’

রাদি বলল, ‘দেজা ভ্যু বুঝেছি। এখন কী করতে হবে তাই বলো।’

আঞ্জুমান বলল, ‘দেওয়ান হাবীবের মস্তিষ্কে ইলেকট্রিক চার্জ দিয়ে তার দেজা ভ্যু করাতে হবে। সেটার স্থায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। দেওয়ান হাবীব সাহেব থাকবেন দেজা ভ্যু অবস্থায়। তার মস্তিষ্ক সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে বর্তমান ঘটনাকে গুলিয়ে ফেলবে। আলম তাকে গিয়ে বলবে, ‘স্যার এই মেয়ে ডেঞ্জারাস। তার কাছে নওরিন ফার্মার সব খবর আছে। সে ওষুধের কাঁচামালের স্যাম্পল নিয়ে গেছে।’ যা যা সে বলেছিল সেদিন। তারপর আমরা দেখব দেওয়ান হাবীব কী করেন।’

সাজ্জাদ বলল, ‘যদি তিনি কিছু না করেন ? তার সাথে যদি এই খুন সম্পর্কিত না হয় ?’

আঞ্জুমান বলল, ‘তাতে বিজ্ঞানের বিশাল উপকার হবে। মৃগীরোগীর বাইরে সাধারণ মানুষের ওপর দেজা ভ্যুর প্রভাব দেখতে পারবে।’

সাজ্জাদ বলল, ‘ডাক্তার শরিফ যদি রাজি না হন ?’

আঞ্জুমান বলল, ‘ডাক্তার শরিফ কমিশনার স্যারের পরিচিত। তার সাহায্য লাগবে। ব্যাপারটা আমি ম্যানেজ করব। পরে দরকার হবে ডিআইজি স্যারকে। দেওয়ান হাবীব আর আমাদের ডিআইজি আকরাম স্যার একই ক্যাডেট কলেজে একই ক্লাসে পড়াশোনা করেছেন। তারা দুজন বন্ধু।’

ডাক্তার শরিফ দুটো কারণে দেওয়ান হাবীবের মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক ইলেকট্রিক স্টিমুলেশন দিয়ে দেজা ভ্যু করতে রাজি হলেন না। প্রথম কারণ হলো, এ ব্যাপারে রোগীর বা রোগীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কারও অনুমতি লাগবে। দ্বিতীয় কারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে দেওয়ান হাবীব রোড এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি তার স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছেন। অবশ্য স্মৃতি হারিয়েছেন ছোটবেলার। সেই স্মৃতি ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত দেজা ভ্যু কাজ করবে কি না সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। সম্ভবত কাজ করবে না বলেই তার ধারণা।

পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে ডিআইজি আকরাম এসেছেন। পুলিশ কমিশনার অসহায় চোখে ডিআইজি আকরামের দিকে তাকালো। ডিআইজি আকরাম বললেন, ‘আপনি দেওয়ান হাবীবের স্মৃতি ফেরানোর চেষ্টা করুন। আমি তার স্ত্রীর কাছ থেকে দেজা ভ্যু করার অনুমতি নিয়ে আসব।’

পাহাড়ের ওপাশে সূর্য ডুববে বলে ঝুলে আছে। শীতের শেষ বিকেলের সূর্য যতটা নরম হওয়ার কথা ততটা নরম বোধ হচ্ছে না। সূর্যের কমলা রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। তার কিছু আলো সবুজ পাহাড়ের ওপরটা আলাদাভাবে আলোকিত করে রেখেছে।

দেওয়ান হাবীব বিষণ্ন চোখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন। মাথার ভেতর অনেকক্ষণ হলো দাঁড়কাক ঠোকরানোর মতো অনুভূতি হচ্ছে। দেওয়ান হাবীবের বয়স ৬৮ বছর। কয়েক দিন আগে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রচণ্ডভাবে আহত হয়েছেন। রাস্তা পারাপারের হলুদ বাতি দেখে তিনি হাঁটা শুরু করেছিলেন। সময় খেয়াল করেননি। সাফকাত নূর ভিডিও কল করেছিল। দেওয়ান হাবীব কবজিতে আটকানো কন্ট্রোল বাটনে চাপ দিলেন। চোখে লাগানো চশমার দু পাশ থেকে আট ইঞ্চি মাপের দুটো স্টিক বেরিয়ে এল। তার সামনে আয়তকার মনিটর। এর একপাশে যে কল করেছে তাকে দেখা যায়, আরেক পাশে অন্য কোনও ছবি দেখানোর ব্যবস্থা আছে। রাস্তায় চলাচলের সময় এরকম ভিডিও কল করা বা কল রিসিভ করা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা আছে। দেওয়ান হাবীব নিষেধ অমান্য করেছেন। তিনি ভেবেছেন আলম কল করেছে। আলমের এই সময়ের কল জরুরি। রাস্তায় থাকলেও রিসিভ করতে হবে। কল করেছে তার বন্ধু সাফকাত। তিনি পথে হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা আনমনে সাফকাতের ভিডিও কল রিসিভ করলেন। মনিটরের একপাশে সাফকাতের হাসি হাসি মুখ দেখা যাচ্ছে। আরেক পাশে স্পেসশিপের ছবি। সাফকাত হাসিমাখা মুখে বলল, ‘দোস্ত, প্রোপোজাল অ্যাপ্রুভ হয়েছে। আমাদের স্পেস শাটলের চাঁদে যাতায়াতে আর কোনও বাধা নেই।’

পথচারী পারাপারের হলুদ আলো লাল হয়েছে, দেওয়ান হাবীব খেয়াল করলেন না। তিনি তখন রাস্তার মাঝখানে। দ্রুতগতির একটা গাড়ি তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে রাস্তার একপাশে ফেলে রেখে চলে গেল। দেওয়ান হাবীব জ্ঞান হারালেন। তিনি এখন আছেন কেন্দ্রীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সপ্তম তলায় পাহাড়ঘেঁষা রুমে।

দেওয়ান হাবীবের সামনে নিউরোসার্জন ডাক্তার কালিম এলাহী বসে আছেন। আচমকা দেওয়ান হাবীবের কেস সিরিয়াস হয়ে গেছে। সিআইডি সদর দফতর থেকে তার স্মৃতির ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে। সিনিয়র ডাক্তার শরিফ নিজে এসেছিলেন খোঁজ নিতে।

ডাক্তার কালিম এলাহীর কাছে শুরুতে এই কাজটি আর দশটা কাজের মতো সাধারণ ছিল। কিন্তু ডিআইজি আকরাম এই কাজের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। ডাক্তার শরীফ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায় থেকে অর্ডার বের করেছেন এটা স্পেশাল অ্যান্ড ইম্পর্টেন্ট কাজ হিসেবে। মন্ত্রণালয় ডাক্তার কালিম এলাহীকে নির্দেশ দিয়েছে গুরুত্বসহকারে কাজটি করতে। সেখানে তার এই কাজে অবহেলা করার কোনও উপায় নেই।

ডাক্তার কালিম এলাহী বিশাল হা করে দুবার হাই তুলে মুখ বন্ধ করলেন। দেওয়ান হাবীবকে ছোট ছোট কয়েকটা ভিডিও ক্লিপস দেখানো হয়েছে। ১৬/১৭ বয়সের একজন কিশোর বন্ধুদের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, গিটার বাজাচ্ছে। স্টিল ফটোগ্রাফও আছে। সেই কিশোর সাইকেল নিয়ে বাসায় ঢুকছে। আরও ছোট বয়সের একজন শিশু বাগানে ট্রাই সাইকেল চালাচ্ছে।

ডাক্তার কালিম বলেছেন এগুলো দেওয়ান হাবীবের ছোটবেলার ছবি। তিনি কিছু মনে করতে পারছেন না। অথচ অ্যাক্সিডেন্টের আগে রাস্তা পার হওয়ার সময় সাফকাত যে ভিডিও কল করেছিল তা স্পষ্ট মনে আছে।

ডাক্তার কালিম বললেন, ‘মনে করার চেষ্টা করুন। আপনার ছোটবেলা। নিজেকে চিনতে পারছেন না!’

শীত অনুভব করছেন দেওয়ান হাবীব। ঘরের তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে। বাইরের আবহাওয়া ঘরের ভেতর অনুভব করার কথা নয়। পাহাড়ের গায়ে শীতল আবহাওয়া। দেওয়ান হাবীব শীতে খানিক জবুথবু হয়ে বললেন, ‘তাকে চিনতে পারছি না।’

স্ত্রী নাঈমা ফেরদৌস পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি খানিক হাসিমুখে ভেজা গলায় বললেন, ‘এই ছবিগুলো দেখিয়ে তুমি আমাকে তোমার ছোটবেলার কত গল্প শুনিয়েছো! সেই যে সাইকেল চালিয়ে নদী দেখতে গিয়েছিলে। জাহাজ যাচ্ছিল নদী দিয়ে। তোমার ইচ্ছে হলো জাহাজে চড়ে দূরদেশে চলে যেতে। সাইকেল কোথায় রেখে যাবে বুঝতে পারলে না বলে তুমি যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিলে!’

দেওয়ান হাবীব কিছু মনে করতে পারছেন না। মনে করতে গেলে তার মাথার বাঁ পাশে কানের ওপর দাঁড়কাক ঠোকরানোর মতো অনুভূতি হচ্ছে।

ডাক্তার কালিম বললেন, ‘মিসেস নাঈমা, উনার মেমোরি লস ডেনসিটি বেশ হাই। এমএলডি টেস্ট রিপোর্টে সেরকম পেয়েছি। তবু প্রাকটিক্যালি নিশ্চিত হতে চাইছিলাম। অ্যাক্সিডেন্টে মিস্টার হাবীবের ব্রেইনের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলের খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে বড় রকমের আনপ্রিজেন্ট শক দেখা গেছে। তিনি তার ৪ বছর বয়স থেকে ১৭/১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিছু মনে করতে পারছেন না। বাদবাকি স্মৃতি ঠিক আছে।’

নাঈমা বললেন, ‘উনি কি তার জন্মের পর থেকে ৪ বছর বয়স পর্যন্ত স্মৃতি মনে করতে পারছেন ?’

ডাক্তার কালিম বললেন, ‘সে সময়ের স্মৃতি এমনিতেই কেউ মনে করতে পারে না।’

নাঈমা কিছু ভাবছেন। খানিকক্ষণ থেমে বললেন, ‘ছোটবেলার স্মৃতি তো তার জন্য এখন খুব ইম্পর্টেন্ট নয়, তাই না। বর্তমান সময়ের সব স্মৃতি তার আছে। তিনি স্বাভাবিক। তাহলে আপনাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন ?’

ডাক্তার কালিম হাসলেন। খুব বেশি ম্লান হাসি। তিনি বললেন, ‘মিস্টার দেওয়ান হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি হচ্ছে বলতে পারেন ফাউন্ডেশন। যেসব ঘটনার শুরু তার ছোটবেলায়, সেসব ঘটনার শুরু তিনি মনে করতে পারবেন না। তার কাছে মনে হবে আচমকা যেন কোনও ঘটনা ঘটেছে। তিনি সেই ঘটনার পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাবেন না। অনেকটা শিকড়বিহীন জলজ গাছ পানিতে ভেসে যাওয়ার মতো। গাছ ভেসে যাচ্ছে কিন্তু সে পানি থেকে কোনও রস আস্বাদন করছে না। স্বাভাবিকভাবেই তিনি অস্থির হবেন। বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনকে সম্পর্কের পরিচয়ে ডাকছেন কিন্তু অনুভব করছেন না। কারণ সেসব সম্পর্কের শুরুর কোনও আবেগ তার স্মৃতিতে নেই।’

পুলিশ কমিশনার এসেছেন। সঙ্গে পুলিশ ইন্সপেক্টর সাজ্জাদ, রাদি আর আঞ্জুমান। ঘটনা শুনে তাদের ভেতর একই সাথে অস্থিরতা এবং স্বস্তির সম্ভাবনা কাজ করছে। সিআইডি ইন্সপেক্টর আঞ্জুমান বলল, ‘ডক্টর, দেওয়ান হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি আমাদের দরকার নেই। আমাদের দরকার তার এখনকার স্মৃতি। সেটা ঠিক আছে। এবার আপনি তাকে ডাক্তার শরিফের কাছে রেফার করুন। পরবর্তী ব্যবস্থা তিনি নেবেন।’

ডাক্তার কালিম এলাহী রাজি হলেন না। তিনি বললেন, ‘পেশেন্টের পুরোপুরি সুস্থতার প্রয়োজন আছে। একজন মানুষ তার জীবনের অর্ধেক স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকলে একসময় অবশ্যই অস্বাভাবিক আচরণ করবে। সে কোনও কিছু মেলাতে পারবে না। তার ভেতর বিভ্রান্তি দেখা দেবে। তাকে এ অবস্থায় ঠেলে দেওয়া অন্যায়।’

ইন্সপেক্টর রাদি জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে আপনি এখন কী করতে চাইছেন ?’

ডাক্তার কালিম বললেন, ‘মেমোট্রান্সফিউশন করলে মিস্টার দেওয়ান হাবীব আবার আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেতে পারেন।’

ইন্সপেক্টর তিনজন যেন একসাথে তাদের বুকের ভেতর থেকে আটকে থাকা বাতাস গোপনে বের করে দিলেন। এমন কিছু আশঙ্কা তারা করেছিলেন। মেমোট্রান্সফিউশন স্মৃতি ফিরে পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা। তবে নিজ স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে অন্য কারও স্মৃতি পাওয়া বড্ড মুশকিলের ব্যাপার। তাছাড়া যার কাছ থেকে স্মৃতি নেওয়া হয় তার ব্রেইন থেকে সেই স্মৃতি পুরোপুরি মুছে যায়। তাই খুব আপন না হলে কেউ স্মৃতি দিতে চান না। চিকিৎসকরা এক্ষেত্রে আত্মীয় কিংবা অতি কাছের মানুষ ছাড়া অন্যদের স্মৃতি ট্রান্সফিউশনের জন্য নেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডাক্তারদের ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন কাছাকাছি থাকা কাউকে আত্মীয় সাজিয়ে নিয়ে আসে। বিপুল অর্থের বিনিময়ে তার স্মৃতি নেওয়া হয়। পুলিশ ইন্সপেক্টররা বুঝতে পারছেন না, কে দেবেন দেওয়ান হাবীবকে তার ছোটবেলার স্মৃতি!

পুলিশ কমিশনার জানতে চাইলেন, ‘মেমোরি ট্রান্সফিউশন কি আপনি করবেন ?’

ডাক্তার কালিম এলাহী বললেন, ‘মেমোরি ট্রান্সফিউশন করবেন নিউরোসায়েন্টিস্ট আসমান ঘটক।’   

দেওয়ান হাবীব বিছানা থেকে নামলেন। তিনি নেমেছেন ধীরে। সূর্য তার রশ্মি গুটিয়ে নিয়েছে। নরম দেখাচ্ছে সূর্যকে। পুরোপুরি কমলা হয়ে পাহাড়ের ওপাশে হারিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নাঈমা এগিয়ে এসেছেন। দেওয়ান হাবীবের পিঠে আলতোভাবে হাত রাখলেন। শান্ত গলায় বললেন, ‘সূর্য ডোবার আগে তোমাদের বাসায় ফিরতে হতো। তোমার বাবার রাগ ছিল প্রচণ্ড। সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরলে তিনি ভীষণ রাগ করতেন। তোমাকে একদিন মেরেছিলেন। তখন থেকে তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরতে।’

দেওয়ান হাবীব মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘আমার কিছু মনে পড়ছে না, নাঈমা। মাথার ভেতর দাঁড়কাক অনবরত ঠোকর দিচ্ছে।’

নিউরোসায়েন্টিস্ট আসমান ঘটক ভুরু কুঁচকে সামনের মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন। দেওয়ান হাবীবকে নিজ স্মৃতি দান করবেন এমন তৃতীয়জনকে তিনি পরীক্ষা করছেন। যে তিনজনকে আনা হয়েছে তারা দেওয়ান হাবীবের নিকট আত্মীয় বলা হয়েছে। তাদের বয়স ৭০ বছর এবং তার বেশি। প্রত্যেকের ছোটবেলার স্মৃতি অত্যন্ত ঝাপসা। সেখান থেকে স্মৃতি নিয়ে দেওয়ান হাবীবের স্মৃতির সঙ্গে ন্যূনতম সাইন্যাপ্টিক সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে না।

মেমোরি ট্রান্সফিউশন চিকিৎসাবিজ্ঞানে অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে এসেছে। যাকে মেমোট্রান্সফিউশন বলা হচ্ছে। এখানে নিউরোসাইন্যাপ্টিক ম্যাপিং করে স্মৃতিদাতা এবং গ্রহীতার স্মৃতির মধ্যে সাইন্যাপ্টিক সংযোগ তৈরি করা হয়। নিউরোসায়েন্টিস্টরা এখানে স্মৃতিদাতার ব্রেইন থেকে প্রথমে স্মৃতির ডিজিটাল কপি বানান। এটা কোড তৈরি করতে সহায়তা করে। ডিজিটালাইজড স্মৃতিকোড নিউরোসাইন্যাপ্টিক ইন্টারফেস দিয়ে গ্রহীতার ব্রেইনের মেমোরি সেলে সঞ্চালন করা হয়। মেমোট্রান্সফিউশনের মাধ্যমে কেবল ডাটা ট্রান্সফার করা হয় না। ব্রেইনে ইলেকট্রিক্যাল ইম্পালস আর সাইন্যাপ্টিক প্যাটার্নের ব্যালান্সড অবস্থা তৈরি করা হয়।

গ্রাহক যখন স্মৃতি অনুভব করতে পারে, তার সঙ্গে একাত্মবোধ করে তখন পরীক্ষা করে দেখা হয় চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ, সমানুভূতির অবস্থা স্মৃতিদাতার সঙ্গে মিলেছে কি না। যদি মিলে যায় তাহলে কোয়ান্টাম লিপিড ওয়েভের মাধ্যমে স্মৃতিগ্রহীতার ব্রেইনে স্মৃতিদাতার স্মৃতি স্থাপন করা হয়।

আসমান ঘটক উঠে পড়েছেন। তিনি বললেন, ‘অন্য কাউকে দেখুন। এদের স্মৃতি অধিক দুর্বল।’

নাঈমা বললেন, ‘হাবীবের আপন ফুপু এসেছেন।’

আসমান ঘটক বললেন, ‘তাকে পুরো আয়োজন বুঝিয়ে বলুন। প্রয়োজন হলে আমাকে ডাকবেন।’

ফুপু দু’হাত বাড়িয়ে দেওয়ান হাবীবের মুখে আদর করছেন। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মারুফ হাসান। সে আছে বিপুল আনন্দের ভেতর। কীসে সে এত আনন্দিত হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। দেওয়ান হাবীবের ছোট ভাই মারুফ। তারা দুই ভাই। মারুফ বিয়ে করেনি। একা থাকে। ভাই অসুস্থ শুনে এসেছে। এখন তার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে বড় ভাইয়ের জন্য স্মৃতিদাতা খুঁজে নিয়ে আসা। অত্যধিক আগ্রহ নিয়ে সে এই কাজ করে যাচ্ছে। এই কাজের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় হতাশ হয়ে পড়ার কথা ছিল। মারুফ হতাশ হয়নি। বিপুল উৎসাহ নিয়ে আনন্দের সঙ্গে স্মৃতিদাতার সন্ধান করে যাচ্ছে। ফুপু তার স্মৃতি দিতে রাজি হয়েছেন, সম্ভবত তাতেই মারুফ আছে বিপুল আনন্দে।

ফুপুর বয়স ৮৬ বছর। চোখে স্পষ্ট দেখেন না এবং কানে কম শোনেন। দেওয়ান হাবীবের মুখে হাত বুলিয়ে ফুপু বললেন, ‘ছোটবেলার কথা কিছু মনে করতে পারিস না, বাপ ? সেই যে একবার সাপের বাচ্চা ধরে নিয়ে এসে আমাকে ভয় দেখাচ্ছিলি। আমি দৌড়ে ঘরে ঢুকে গিয়ে দরজা আটকে দিলাম। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, দুপুর থেকে বিকেল হলো। তুই সাপ নিয়ে ঘরের দরজার সামনে বসে থাকলি, মনে আছে ? তোর বয়স তখন চৌদ্দ বছর।’

দেওয়ান হাবীবের কিছু মনে পড়ছে না। তিনি তার সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলাকে চিনতে পারছেন। তাকে ফুপু বলে ডাকেন। তবে তিনি যে তার আপন ফুপু এমন কিছু মনে করতে পারছেন না।

নাঈমা বললেন, ‘ফুপু, আপনার স্মৃতি পেলে সে আবার সব মনে করতে পারবে।’

ফুপু বেঁকে বসেছেন। তিনি বললেন, ‘স্মৃতি দিতে হয়, তুমি দাও। আমাকে বলছো কেন ?’

নাঈমা বললেন, ‘তার ছোটবেলার স্মৃতি দরকার। আপনার সঙ্গে তার ছোটবেলার স্মৃতি আছে। আমার সঙ্গে নেই।’

ফুপু বললেন, ‘তাহলে কুটুস তার স্মৃতি দিক। বিয়ে থা করেনি। একলা মানুষ। সে স্মৃতি দিয়ে কী করবে!’

মারুফকে বাড়ির সকলে আদর করে কুটুস নামে ডাকে। সে ঘরের একপাশে বসে আছে। সেখান থেকে উঠে এসে বলল, ‘ফুপু, আমার জন্মের সময় ভাইয়ার বয়স সতেরো বছর। ভাইয়ার মেমোরিতে এখন হয়তো আমিই নেই। আমার স্মৃতি নিয়ে ভাইয়ার কোনও লাভ হবে না।’

ফুপু বললেন, ‘তুই তোর বাপের বুড়ো বয়সের ছেলে।’

মারুফ বলল, ‘বাবা-মা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই তারা তাদের স্মৃতি দিয়ে ভাইয়াকে সুস্থ করে তুলতেন। আজ বাবা-মা বেঁচে নেই বলেই তোমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে ভাইয়াকে সুস্থ করে তোলার।’

বসা থেকে ফুপু উঠে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বললেন, ‘আমার চোখ নেই, কান নেই। ভালো দেখতে পাই না, শুনতেও পাই না। বেশির ভাগ স্মৃতি হচ্ছে অশান্তি আর যন্ত্রণার। হাবীবের সাথে যা স্মৃতি আছে সেসব আনন্দের। কষ্ট থেকে দূরে থাকতে মাঝেমধ্যে সেসব স্মৃতি নাড়াচাড়া করি। আর কয়দিন বাঁচব জানি না। এ কয়দিন আনন্দের স্মৃতি হারিয়ে বাঁচতে পারব না। তোরা অন্য কাউকে দেখ।’

এই প্রথম মারুফকে হতাশ মনে হলো। তবে সে তার হতাশা প্রকাশ করল না।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেল। যত সহজে মেমোরি ট্রান্সফিউশন করা যাবে ভাবা হয়েছিল তত সহজে সেটা করা গেল না। পুলিশ সদর দপ্তরের অবস্থা তখন আরও এলোমেলো হয়ে গেছে। উপর থেকে প্রচণ্ড চাপ আসছে। দ্রুত অপরাধীকে ধরার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। জনগণ এই নিয়ে অস্থিরতা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে লেখা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন কোনও না কোনও রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক সংগঠন রাজপথে মিছিল করছে। মানববন্ধন করছে। সাংবাদিকরা প্রতিদিন রাস্তায় নামছে। যে কোনও সময় বড় ধরনের বিক্ষোভ তৈরি হতে পারে। বিক্ষোভ তৈরি হওয়ার আগে খুনিকে ধরতে হবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হয়েছে দেওয়ান হাবীব এই খুনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া তাকে গ্রেফতার করতে পারছে না। জটিলতা তৈরি হয়েছে প্রবলভাবে। মেমোরি ট্রান্সফিউশন করার মতো স্মৃতিদাতা কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। মেমোরি ট্রান্সফিউশন ছাড়া নিউরোসায়েন্টিস্ট আসমান ঘটক পেশেন্টকে রিলিজ দেবেন না বলেছেন। তিনি এই অবস্থায় পেশেন্টের ওপর দেজা ভ্যু করার মতো কোনও পরীক্ষা চালাতেও রাজি হননি।  

ডিআইজি আকরাম তৎপর হয়ে ডক্টর রূপন্তীর সন্ধান করতে থাকলেন। তিনি জানেন এই কাজে সফলতা এলে ডক্টর রূপন্তীর মাধ্যমেই আসবে। 

ডক্টর রূপন্তীর চোখের কোনায় ভাঁজ পড়েছে। ভাঁজের রেখা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে কানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ভাঁজগুলো হয়ে যাচ্ছে আরও গভীর। এমন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু হচ্ছে। ডক্টর রূপন্তী একদৃষ্টে তার সামনের মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখ সরু হতে হতে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। মনিটরের সবুজ রঙের সরলরেখা কাঁপতে কাঁপতে ঢেউখেলানো দড়ির মতো হয়ে যাচ্ছে। রং বদলে যাচ্ছে সরলরেখার। সবুজ থেকে কমলা হয়েছে। কমলা থেকে লাল হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মনিটরের রেখা লাল হওয়া মানে বিপজ্জনক ঘটনা। যে  কোনও মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

ঘরের একপাশে পাঁচজন পাশাপাশি বসে আছেন। পাঁচজন পাঁচ রকমের পেশার সঙ্গে জড়িত। একজন ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের ব্যবসা করেন। তার পাশের জন সবজি বিক্রেতা। তার পাশে বসে আছেন সরকারি কর্মকর্তা। পরের জন বেকার। সবার ডানে যিনি বসে আছেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। এই পাঁচজনকে নিয়ে এসেছে তক্কেল। সে ডক্টর রূপন্তীকে নানা ধরনের মানুষ সাপ্লাই দেয়। তক্কেল সাতজনকে নিয়ে এসেছিল। তাদের একজন কলেজের শিক্ষক, আরেকজন রাজনীতিবিদ। বিশেষ বিবেচনায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ডক্টর রূপন্তী পেশায় নিউরোসায়েন্টিস্ট ও ফিজিসিস্ট। তিনি বিশেষ ধরনের যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। যন্ত্রের নাম দিয়েছেন ‘ইকোন’। ইমোশনাল এনার্জি কনভার্টার। তিনি দেখেছেন, মানুষের আবেগ কখনও বিলীন হয়ে যায় না। একরূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তরিত হয়।

রেলওয়ে জংশনে ট্রেন থেমেছিল লাইন বদল করবে বলে। ডক্টর রূপন্তী ট্রেনের জানালার পাশে বসে ছিলেন। খোলা জানালা দিয়ে তিনি প্লাটফর্মে নানা রকমের মানুষ দেখছেন। খানিক আগেও যখন ট্রেন এসে স্টেশনে থামে, তখন এইসব মানুষের ভেতর প্রচণ্ড ব্যস্ততা ছিল। এখন সবাই অদ্ভুত রিল্যাক্স মুডে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ আয়েশ করে কফি খাচ্ছে। কোনও দুজন গল্প করতে করতে প্লাটফর্মের এক মাথা থেকে আরেক মাথার দিকে হেঁটে যাচ্ছে।

 ট্রেনের হুইসেল বাজছে। ইঞ্জিন ঘুরে এসেছে। ট্রেন এখন অন্য লাইনে নেওয়া হবে। তারপর রওনা হয়ে যাবে গন্তব্যে। আচমকা এক লোককে প্লাটফর্মের ওপর দিয়ে ছুটে আসতে দেখা গেল। তিনি ‘চিনি-মধু’ বলে চিৎকার করছেন আর ছুটছেন। ঘটনা তখন জানা গেছে। ভদ্রলোকের দুই যমজ মেয়ে। চিনি আর মধু। তাদের বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। তারা স্টেশনের কল থেকে খাওয়ার পানি আনতে গেছে। এখনও ফেরেনি।

ভদ্রলোক দুই মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে অস্থির হয়ে গেছেন। জোরে জোরে ট্রেনের হুইসেল বাজছে। ট্রেন পেছানো শুরু করেছে। পাশের লাইনে গিয়ে অন্য প্লাটফর্ম ঘেঁষে বেরিয়ে যাবে। ভদ্রলোক ‘চিনি-মধু’ বলে গলা ছেড়ে ডাকছেন আর প্লাটফর্মের ওপর দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন। চিনি আর মধুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে ভদ্রলোকের গলা দিয়ে আর কোনও আওয়াজ বের হচ্ছে না। তার গলা দিয়ে কান্নার মতো অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে।

কয়েকজন মানুষ এগিয়ে গিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানালেন, যতক্ষণ চিনি আর মধুকে পাওয়া যাবে না, ততক্ষণ যেন ট্রেন প্লাটফর্ম না ছেড়ে যায়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ রাজি হয়েছে। তখন দেখা গেল, প্লাটফর্মের একপাশ থেকে বোতলে পানি ভরে নিয়ে চিনি আর মধু হাসিমুখে গল্প করতে করতে এগিয়ে আসছে।

ভদ্রলোক মেয়েদের দেখতে পেয়েছেন। তিনি তাদের দিকে ছুটে গেলেন। ডক্টর রূপন্তী তাকিয়ে আছেন তাদের দিকে। তিনি দেখলেন ভদ্রলোকের শোক আচমকা রাগে রূপান্তরিত হয়ে গেল। তিনি ঠাস ঠাস করে দুই মেয়ের গালে দুটি চড় মারলেন। চড় খেয়ে মেয়ে দুজন হতভম্ব হয়ে গেছে। তারা বুঝতে পারছে না বাবা কেন তাদের মারল। তাদের হতভম্ব ভাব কাটার আগেই বাবা দুই মেয়েকে বুকের ভিতর জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। ডক্টর রূপন্তীর মনে হলো, মানুষের আবেগও শক্তির মতো এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তরিত হয়।

সেই ভাবনা থেকে ডক্টর রূপন্তী তৈরি করলেন ইমোশনাল এনার্জি কনভার্টার। সংক্ষেপে, ইকোন। অবিষ্কার করলেন আনন্দ, দুঃখ, রাগ, ভয়, বিস্ময় কিংবা ঘৃণা―সব আবেগকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার কৌশল। দেখালেন হাসির এক মুহূর্তের শক্তি দিয়ে একখানা ছোটঘরকে আলোকিত করা সম্ভব।

যে পাঁচজন ঘরের একপাশে বসে আছেন, তাদের ভেতর পাঁচ রকম আবেগ সঞ্চারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আনন্দ, দুঃখ, রাগ, ভয় আর ঘৃণা। বিস্ময়ের ব্যাপারটিকে আপাতত সরিয়ে রাখা হয়েছে। ডক্টর রূপন্তী পরীক্ষা করে দেখেছেন, সব আবেগের শক্তি একরকম নয়। হাসির শক্তি কোমল, স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী। রাগের শক্তি প্রচণ্ড অস্থির এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক। দুঃখের শক্তি ধীর, গভীর ও রহস্যময়। আনন্দের শক্তি সৃষ্টিশীল ও হৃদয়স্পর্শী। ভয়ের শক্তি অস্থির ও এলোমেলো। সেখানে ঘৃণার শক্তি কখনও প্রবল, কখনও হালকা। খুব বেশি ধারাবাহিকতা পাওয়া যায় না। আবার খানিক বিচ্ছিন্নও। তাই ঘৃণাকে এর সঙ্গে রাখা হয়নি।

সুরক্ষা চেম্বারে ডক্টর রূপন্তীর পাশে এথিন বসে আছে। এথিন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। বয়সে তরুণ। এই অবিষ্কারে প্রথম থেকে সে ডক্টর রূপন্তীকে সহযোগিতা করে আসছে। এথিন ছাড়া অন্য কাউকে এখনও ইকোন আবিষ্কারের ঘটনা জানানো হয়নি। তবে অনেকে জানে ডক্টর রূপন্তী মানুষের মৃতপ্রায় স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। তিনি সেটা কীভাবে করেন তা কাউকে আপাতত জানাতে চান না। তিনি কয়েকজন ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার পেশেন্ট এবং বয়সের তুলনায় কম বুদ্ধির মানুষের চিকিৎসা করে তাদের সুস্থ করে তুলেছেন। 

এথিন অস্থির গলায় বলল, ‘ডক্টর, খেয়াল করছেন, মনিটরে একটা রেখা লাল আর মোটা হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ কেউ অত্যধিক রাগে আক্রান্ত হয়েছে। তার শক্তি হয়ে গেছে অতিরিক্ত।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘এটা কার আবেগ ?’

এথিন উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।’

‘তাদের ভেতর আবেগ সঞ্চারের ব্যবস্থা নিশ্চয়ই পরিকল্পনামতো হয়েছে ?’

‘প্রত্যেকের ব্রেনের লিম্বিক সিস্টেমের সঙ্গে নির্ধারিত আবেগ সৃষ্টির কাহিনি জুড়ে দেওয়া হয়েছে।’

‘সেখানে নিশ্চয় নির্দিষ্ট মাত্রায় আবেগ তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে ?’

‘হয়েছিল কিন্তু রাগের আবেগ সৃষ্টির লিম্বিক সিস্টেমে ছোট সমস্যা দেখা দিয়েছে। লিম্বিক সিস্টেমের সঙ্গে অ্যামিগডালা অংশ আলাদা হয়ে গেছে।’

‘কার ?’

‘সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।’

‘তুমি বুঝতে পারছো এখন কী হতে পারে! অ্যামিগডালা আগ্রাসন তৈরি করে। কারও রাগের আবেগ যদি আগ্রাসী পর্যায়ে চলে যায় তবে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে ধারণা করতে পারছো!’

এথিন কিছু বলল না। মনিটরে লাল দাগ মোটা হয়ে পুরো মনিটরকে গ্রাস করে ফেলেছে। যে কোনও সময় ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে। এখান থেকে এত দ্রুত সেটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এথিন সুরক্ষা চেম্বার থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। রাগের আবেগ তৈরির চ্যানেল বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। সময় খুব কম। এই কম সময়ের মধ্যে চ্যানেল বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে ল্যাবরেটরিতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটবে।

এথিন এগিয়ে যেতে পারল না। তার আগেই বিস্ফোরণ ঘটল। সেই বিস্ফোরণে এথিন ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারিয়েছে। পরীক্ষার জন্য যে পাঁচজনকে নিয়ে আসা হয়েছিল তাদের পাওয়া গেছে ছিন্নভিন্ন অবস্থায়। ডক্টর রূপন্তী বিশেষ সুরক্ষা চেম্বারে থাকার জন্য রক্ষা পেয়েছেন।

এথিনের সামনে শরবত-ভরা গ্লাস। সে একা নয়। তার সাথে সিআইডি ইন্সপেক্টর রাদি, আঞ্জুমান আর সাজ্জাদ আছে। তারা এসেছে বিশেষ ইনভেস্টিগেশনে। তাদেরও শরবত খেতে দেওয়া হয়েছে। কমলালেবুর শরবত। এথিনের বিশেষ পছন্দের। তার শরবত খেতে ইচ্ছা করছে না। কয়েক দিন ধরে এক গভীর চিন্তা তাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। ডক্টর রূপন্তীর ল্যাবরেটরিতে দুর্ঘটনার পর এক বছর সে কোনও কাজ করতে পারেনি। বিস্ফোরণে তার ডান পাশ পুড়ে গেছে। পরে কৃত্রিম ডান হাত আর ডান পা লাগানো হয়েছে।

ডক্টর রূপন্তী এর ভেতর তার বানানো ইকোন মেশিন দিয়ে মানুষের আবেগ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছেন। অথচ কথা ছিল তিনি ইকোন মেশিন দিয়ে ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার পেশেন্ট এবং বয়সের তুলনায় কম বুদ্ধির মানুষের চিকিৎসা করবেন। মানুষের আবেগের সঙ্গে তার স্মৃতির নিবিড় সম্পর্ক আছে। ডক্টর রূপন্তী স্মৃতিবিভ্রাটজনিত চিকিৎসার পাশাপাশি ইকোন মেশিন দিয়ে মানুষের আবেগ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করছেন। বিজ্ঞান একাডেমি ও সরকার দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ডক্টর রূপন্তীর বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রক্রিয়াকে অনুমোদন দিয়েছে। বিজ্ঞান একাডেমি ও সরকারের জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে দেশে এখন বাণিজ্যিকভাবে মানুষের আবেগ থেকে বিদ্যুৎ তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।

এথিন সুস্থ হওয়ার পর অনুমোদন নিয়ে নিজেই আবেগের বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যাচ্ছে। তার সামনে যে লোকটি বসে আছে, তার নাম মডেল। সে কিছু দিন আগে জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছে। মডেল আবেগ বিক্রি করতে এসেছে। সে আছে পুলিশ নজরদারিতে। ছাড়া পাওয়ার পর থেকে সিআইডি তাকে নজরে রেখেছে। মডেল যখন এখানে এসেছে তার পেছন পেছন সিআইডির তিন অফিসার চলে এসেছেন।

মডেল এসে এথিনকে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দিয়েছে। বলেছে সে ভালো হয়ে যেতে চায়। সে আর ছিনতাই, গুম, মাদক, ধর্ষণ কিংবা মানুষ হত্যার মতো কাজ করবে না। তার অতীত-স্মৃতি সব বিক্রি করে দিয়ে সে নতুন জীবন যাপন করতে চায়।

কিন্তু গত সাড়ে তিন ঘণ্টা চেষ্টা করেও মডেলের ভেতর কোনও আবেগ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি।

এথিন জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আবেগ বিক্রি করতে চাইছেন কেন ?’

মডেল বলল, ‘আগে যে কাজ করতাম তা ছেড়ে দিয়ে এখন দিনমজুরি করি। গত পনেরো দিন কোনও কাজ পাইনি। এখান থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে এক অ্যাগ্রো খামারে কাজ করতাম। সেখানে কাজের জন্য নতুন রোবট নিয়ে এসেছে। আমরা ৪৫ জন একসঙ্গে কাজ হারিয়েছি। জমানো যে টাকা ছিল তাই দিয়ে ২৫ দিন আমাদের খাবার জোটাতে পেরেছি। তারপর থেকে আমরা পরিবারের সবাই আবেগ বিক্রি করে ইউনিট দিয়ে খাবার কিনে খাচ্ছি।’

এথিন বলল, ‘কিন্তু আপনার ভেতর তো কোনও আবেগ অবশিষ্ট নেই! কৃত্রিমভাবে কোনও আবেগ তৈরিও করা যাচ্ছে না।’

মডেল মুখ বিকৃত করে ফেলেছে। সম্ভবত সে কাঁদতে চেয়েছিল। কান্নার আবেগ শেষ হয়ে গেছে বলে কাঁদতে পারল না। গলা শুকিয়ে বুজে এসেছে। সে বুজে আসা গলায় বলল, ‘আমাদের পরিবারের কারও আর কোনও আবেগ নেই। আমাদের সব আবেগ বিক্রি হয়ে গেছে। আমার আবেগ, আমার ছেলেমেয়ে, স্ত্রী―সবার। কোনওভাবে কারও ভেতর আবেগ তৈরি হচ্ছে না। আপনি আরেকবার চেষ্টা করে দেখুন। তা না হলে না খেয়ে মারা যেতে হবে।’

এথিন বলল, ‘তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আপনি একইভাবে চেষ্টা করে দেখতে বলে যাচ্ছেন। আমরাও চেষ্টা করছি। কিন্তু আপনার ভেতর রাগ বা ঘৃণার আবেগও সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না। কী করব বলুন!’

হতাশ গলায় মডেল বলল, ‘আমার মন মরে গেছে।’

স্থির দৃষ্টিতে এথিন তাকিয়ে আছে। ভেঙে পড়া শরীর ও মন নিয়ে মডেল উঠে দাঁড়িয়েছে। সে ঘুরে ধীর পায়ে চলে যাচ্ছে। তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এথিনের মনে হলো, মানুষ যখন তার আবেগ বিক্রি করে দেয়, তখন কি সে শুধু তার আবেগ হারায়, নাকি অনুভূতিও হারিয়ে ফেলে!

মনের ভেতর দোটানা ভাব স্থায়ী হতে দিল না। এথিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। মানুষের শরীরের রক্তপ্রবাহ ও মস্তিষ্কের তরঙ্গপ্রবাহ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে এক অদৃশ্য শক্তি বের হয়। সেটা মানুষের আবেগ। সেই আবেগ কেবল মানসিক নয়, বিশুদ্ধ শক্তি। এটা সম্পূর্ণ জৈবিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া। এখানে অনুভূতির কোনও ব্যাপার নেই।

ঘরের দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতে মডেল মিলিয়ে গেল। এথিনের মনে হলো, আবেগকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ঠিকই, তবে সেই সঙ্গে মানুষ তার অনুভূতির গভীরতা হারিয়ে ফেলছে।

আবহাওয়ার অবস্থা হয়ে আছে এলোমেলো। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আবহাওয়া শীতল হওয়ার কথা। কিন্তু হয়ে গেছে গরম। মনে হচ্ছে মাটি দিয়ে ভাপ উঠছে। তক্কেল বিরক্ত হয়ে বাইরে থেকে কারখানার ভেতরে তার নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল।

তক্কেল একখানা বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা বানিয়েছে। সেখানে আবেগ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ বানানোর ব্যবসা করে। তবে তার কারখানা বিজ্ঞান একাডেমি বা সরকারের কাছ থেকে আবেগ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি পায়নি। তাকে ব্যবসা করতে হয় গোপনে। তক্কেলের বেশ কয়জন ভাড়াটে দালাল আছে। তারা কমিশনের বিনিময়ে লোক ধরে আনে, যারা কম মূল্যে তাদের আবেগ বিক্রি করতে চায়। এখানে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তক্কেল সেই বিদ্যুৎ গোপনে চোরাই পথে ছোট ছোট কারখানায় সাপ্লাই দেয়। 

তক্কেলের পেছন পেছন মডেল ঢুকেছে। তার মুখ হয়ে আছে বিষণ্ন। পথে এক লোক তাকে এখানকার সন্ধান দিয়েছে। বলেছে, ‘তক্কেল মরা মানুষের ভেতর আবেগ সঞ্চার করতে পারে।’

সেই লোকের কথা শুনে মডেল অনেক আশা নিয়ে তক্কেলের কাছে এসেছে। তক্কেল তার কারখানায় আবেগ সৃষ্টির নানা রকম আয়োজন করে রেখেছে। এখানে আবেগময় মুভি, জনপ্রিয় হাসির শো, রোমান্টিক গান―সব কিছুর ব্যবস্থা করা আছে। তা ছাড়া কিছু মানুষ রাখা হয়েছে, যারা তাদের বিরক্তিকর আচরণ দিয়ে কাউকে রাগিয়ে দিতে পারে। তবে এখানে রাগের অতিরিক্ত শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। কখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যায়।

গত পরশু একজন এসেছিল আবেগ বিক্রি করতে। মুভি দেখে, গান শুনে কোনও ভাবেই তার আবেগ সৃষ্টি করা গেল না। তখন তক্কেল ডাক দিল, ‘কিকো!’

ডাক শুনে কিম্ভুতদর্শন এক লোক এগিয়ে এল। তার মুখে বসন্তের দাগ। মোটা দুই ঠোঁট। চোখ দুটো কুতকুতে। থ্যাবড়া নাক। সে জানে, তাকে কেন ডাকা হয়েছে। সে এসে সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে বলল, ‘ঘরে ঢুকেই চুরি করেছিস! আবেগ বিক্রি করতে এসেছিস, আবেগ বেচে ইউনিট নিয়ে চলে যাবি। চোর-ছ্যাঁচ্চড়দের মতো ঘরে ঢুকেই জিনিস হাতিয়ে নিলি কেন ?’

অমনি সেই মানুষ রেগে গেল। তার মাথায় আর বুকে নানা রকমের পোর্ট আটকানো। কিছুক্ষণ আগে তার ভেতর আবেগ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। আবেগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সে দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘মুখ সামলে কথা বলবে। তুই-তুকারি করবে না। দায়ে পড়ে আবেগ বিক্রি করতে এসেছি। চুরি করতে আসিনি।’

কিকো বলল, ‘তোর কাপড় খুললেই বের হয়ে যাবে চুরি করতে এসেছিস, নাকি আবেগ বিক্রি করতে। তুই চোর, তোর বাপ চোর, তোর মা চোর। তোর গোষ্ঠীর সবাই চোর।’

তখনই মানুষটি কিকোর দিকে তেড়ে এল। কয়েক পা এগিয়ে এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। যেন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তক্কেল সামনে এসে বলল, ‘মেশিন অফ করে দিয়েছি। তোমার রাগের আবেগ থেকে অতিরিক্ত শক্তি তৈরি হয়েছে। তাতে যতটুকু বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে, তাই বিক্রি করে তুমি এক সপ্তাহ ভালোভাবে চলতে পারবে।’

পায়ের আওয়াজ শুনে তক্কেল পেছনে তাকিয়েছে। দেখে, শুকনো মুখে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তক্কেল চোখ দিয়ে ইশারা করে বসতে বলল। নিজে সামনে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল। শান্ত গলায় বলল, ‘তোমার নাম কী ?’

মডেল বসতে বসতে নিজের নাম বলল।

তক্কেল জিজ্ঞেস করল, ‘আবেগ বেচবে ? সরকারি কারখানায় গিয়েছিলে ?’

মডেল বলল, ‘গিয়েছিলাম। তারা আমার ভেতর আবেগ খুঁজে বের করতে পারেনি। শুনেছি, আপনি মরা মানুষের ভেতর আবেগের সন্ধান করতে পারেন। আবেগ বিক্রি করতে না পারলে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে মারা যাব।’

অত্যন্ত গভীর আবেগপ্রবণ গলায় তক্কেল বলল, ‘শুধু মানুষের আবেগ নয়, গরুর চোখে পানি দেখেছো ? প্রাণির আবেগ নিয়েও কাজ করছি। বানর, গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল, কাক সবার আবেগ থেকেই শক্তি নিয়ে বিদ্যুৎ বানাব।’

মাথা নিচু করে বসে আছে মডেল। তার পানি পিপাসা পেয়েছে কি না বুঝতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে, কী যেন দরকার। কী দরকার, আন্দাজ করতে পারছে না।

তক্কেল উঠে মডেলের মাথায় আর বুকের কাছে কতগুলো পোর্ট আটকে দিল। ইসিজি বা ইইজি মানে ইলেক্ট্রোএন্সফলোগ্রাম করার সময় এ ধরনের পোর্ট লাগানো হয়। তবে এখানে কোনও ক্যাবল্ ব্যবহার করা হয় না। ওয়ারলেস।

মডেল কিছু বলল না। সে চুপচাপ বসে থাকল। তক্কেল উঁচু গলায় ডাকল, ‘জিন্টু!’

এক লোক ঘরে ঢুকেছে। মডেল মুখ তুলে তাকাল। যে ঘরে ঢুকছে তাকে মডেল চেনে। এই লোক তাকে তক্কেলের কারখানার খবর দিয়েছে। জিন্টু ঘরে ঢুকে মডেলেন কাঁধে আলতোভাবে হাত রাখল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘বাড়িতে চলুন।’

জিন্টুর গলায় কিছু ছিল। মডেল অস্থিরতা বোধ করছে। সে বলল, ‘কী হয়েছে ?’

জিন্টু বলল, ‘আপনার কাছ থেকে সব শুনে আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। আপনার স্ত্রী ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দুই সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছে।’

মডেলের মস্তিষ্কে অদ্ভুত মিশ্র আবেগ তৈরি হয়েছে। রাগ, দুঃখ ও ঘৃণা একসঙ্গে। আবেগ বাড়ছে। বিপদসীমা অতিক্রম করার আগেই তক্কেল মেশিন বন্ধ করে দিল। প্রসন্ন হাসি দিয়ে বলল, ‘তোমার বউ-ছেলেমেয়ের কিছু হয়নি। তোমার আবেগ পাওয়া গেছে। তোমার মজবুত স্মৃতি তোমার আবেগ তৈরিতে সহায়তা করেছে। তোমার যে আবেগ পাওয়া গেছে তার জন্য বেশ ভালো ইউনিট দিচ্ছি তোমাকে। বাড়িতে গিয়ে কয়েক দিন আরাম করে খাওয়াদাওয়া কর। আর প্রয়োজন হলে আমার কাছে চলে আসবে।’

জিন্টুর দিকে তাকিয়েছে মডেল। জিন্টুর মুখ হাসি হাসি।

১০

গম্ভীর মুখে এথিন বলল, ‘ডক্টর রূপন্তী, আমি কনফেস করতে এসেছি। আশা করছি, আপনি আমাকে বুঝবেন।’

ডক্টর রূপন্তী নরম চোখে এথিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। এই ছেলেকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন। সে তাকে ছেড়ে গেলেও তার প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি।

এথিন বলল, ‘প্রতিদিন দেশে কয়েক হাজার মানুষের আবেগ থেকে শক্তি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখন আমরা শুধু মানুষের আবেগকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার কাজে লাগাচ্ছি। মানুষের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার কাজে ইকোন আর ব্যবহার করা হচ্ছে না। আপনি মনোযোগ দিলে দেখবেন, এর ফলে যা হয়েছে তা হচ্ছে, এখন আর কারও আবেগ তার নিজের আবেগ নয়। তার হাসি, রাগ, প্রেম সব কৃত্রিমভাবে বানিয়ে শক্তি উৎপাদনের কাজে লাগানো হচ্ছে। তাতে মানুষের ভেতর তৈরি হয়েছে একাকিত্ব, শূন্যতা। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক উষ্ণতা কমে এসেছে। স্পন্দন ধীর হয়ে গেছে। মানুষ একা হয়ে গেছে। হাহাকারের মতো একা।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘কী চাও তুমি ?’

এথিন বলল, ‘মানুষ তার সত্যিকারের আবেগ ফিরে পাক।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘তোমাকে ভালোবাসি, এথিন। কথা দিচ্ছি মানুষকে তার ভালোবাসা আর সাহসের মতো পবিত্র আবেগ ফিরিয়ে দিতে কাজ করব। তুমি আমার সঙ্গে থেকো।’

এথিন তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ডক্টর রূপন্তীর হাত ধরে সে বলল, ‘আপনাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’

ডক্টর রূপন্তী ও এথিন দুজনই বুঝতে পারছে, তাদের ভেতর আবেগ তৈরি হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে আবেগের সেই শক্তি বিদ্যুৎ বানিয়ে ঘর উজ্জ্বল করার জন্য নয়, নিজেদের মনকে আলোকিত করার জন্য। 

১১

ডক্টর রূপন্তীর সামনে বসে আছেন দেওয়ান হাবীব। তার ভেতর উদাসীন ভাব। আশপাশে কী হচ্ছে সে ব্যাপারে তার যেন কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। তিনি আছেন এক শূন্য জগতে। ডক্টর রূপন্তীর পাশে বসে আছেন ডিআইজি আকরাম। ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘ডিআইজি সাহেব, আমি ইমোশন কনভার্সনের কাজ বাদ দিয়েছি। এথিনকে কথা দিয়েছি এই কাজ আর করব না।’

ডিআইজি আকরাম অসহিষ্ণু গলায় বললেন, ‘এথিন কে ?’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘আমার অতি কাছের মানুষ। প্রিয়জন।’

ডিআইজি আকরাম বললেন, ‘তাকে ডাকুন। আমি বুঝিয়ে বলব।’

এথিন এসেছে। তাকে ডিআইজি আকরাম বললেন, ‘এটা স্পেশাল কেস। পুলিশ কমিশনার নিজে এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই কেস দেখছে। দেশের স্বার্থে এটা আমাদের করা খুব দরকার। দেওয়ান হাবীবের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে।’

এথিন রাজি হয়েছে। সে বলল, ‘স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে ইমোশনকে কাজে লাগাতে ইকোন ব্যবহার করা যেতে পারে।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘তবে তুমিই করো। এতদিন যে প্রক্রিয়ায় ইমোশনকে এনার্জিতে কনভার্ট করা হয়েছে সেই একই প্রক্রিয়ায় দেওয়ান হাবীবের মেমোরিকে জাগিয়ে তুলবে। বিজ্ঞানের জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি।’

এথিন বলল, ‘তবে প্রথমে এই পরীক্ষা সরাসরি মানুষের ওপর নয়, মানুষের বিকল্প নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।’

অসহিষ্ণু গলায় ডিআইজি আকরাম বললেন, ‘সে তো অনেক সময়ের ব্যাপার!’

এথিন বলল, ‘আমরা যতটা ভাবছি সময় ততটা নাও লাগতে পারে। তবে নিশ্চিত হতে মানুষের বিকল্পর ওপর এই পরীক্ষা আগে করা ভালো। নয়তো আমরা যা চাইছি তার সম্ভাবনা চিরদিনের জন্য হারিয়ে যেতে পারে।’

এথিনের প্রস্তাবে সকলে একমত হয়েছে।

রাত। নিউরোসায়েন্স হাসপাতালটাকে অন্য রকম লাগছে। দিনের আলোয় যে করিডোরগুলো মানুষের কোলাহলে ব্যস্ত থাকে, রাতে সেগুলো দীর্ঘ, নীরব সুড়ঙ্গের মতো হয়ে আছে। টানা বারান্দার প্রত্যেকটি বাতির নিচে ছায়া জমে আছে। মনে হচ্ছে যেন সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই।

এথিন বুঝতে পারছে, ইকোন কেবল যন্ত্র নয়। এটা একটি সময়ের জন্ম দিচ্ছে। সে ল্যাবের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ডক্টর রূপন্তী সেখানে আছেন। তবে তিনি সেখানে একা নন। আরও চারজন বিজ্ঞানী আছেন। তাঁদের চোখে ক্লান্তি কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে এক ধরনের উত্তেজনা। যা কেবল আবিষ্কারের আগমুহূর্তে দেখা যায়।

ল্যাবের মাঝখানে ইকোনের মূল যন্ত্রের পাশাপাশি আজ একটা বড় কাঠামো আনা হয়েছে। এটা আগের ছোট কনসোল নয়। মানুষের শরীরের সমান উঁচু কাঠামো। স্বচ্ছ ফাইবার গ্লাসের ভেতরে নীল আলো নড়াচড়া করছে। মনে হচ্ছে সেখানে যেন সত্যিকারের জীবন্ত স্নায়ুতন্ত্র আছে।

এথিন বুকের ভেতরে হালকা চাপ অনুভব করল। ল্যাবের একপাশে একটি চেয়ার। তাতে বসে আছে একজন মানুষ―অথবা মানুষের কাঠামোর অন্য কিছু। যা দেখতে অবিকল মানুষের মতো। চোখ খোলা, নিশ্বাস স্বাভাবিক, মুখে কোনও আবেগ নেই। না ভয়, না কৌতূহল, কিংবা বিরক্তি। এথিন তাকে দেখে বিভ্রান্ত হয়েছে।

এথিন জানতে চাইল, ‘এ কে ?’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘তার কোনও নাম নেই। এটা একটা নিউরাল শেল। তার কোনও অতীত নেই। কোনও স্মৃতি নেই। আজ আমরা তার ভেতর আবেগ সঞ্চারিত করব। কারও কোনও স্মৃতি ছাড়া তার ভেতর আবেগ সৃষ্টি করতে পারলে সহজেই হারানো স্মৃতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’

এথিন জানত এরকম কিছু করা হবে। যদিও কাজটা তাকে করতে বলা হয়েছে কিন্তু ডক্টর রূপন্তী এই কাজ পুরোপুরি তার কাছে ছেড়ে দেননি। তিনি নিজে থেকে সব কিছু করছেন। এথিনের মাথার ভেতর মনে হলো ঝাঁকি দিয়ে উঠল। তার মনে হলো যার কোনও স্মৃতি নেই তার ভেতর আবেগ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে আগামীতে আর মানুষ জন্মাবে না।

ইকোন চালু করা হয়েছে।। ল্যাবের সব আলো নিভে গেছে। শুধু যন্ত্রের হালকা নীল আলো কেঁপে যাচ্ছে। স্ক্রিনে অদ্ভুত সব ডেটা ভেসে উঠেছে। ভয়, আনন্দ, শোক, মমতা, অনুশোচনা। সবকিছু দেখা যাচ্ছে সংখ্যায় আর ফ্রিকোয়েন্সিতে।

ডক্টর রূপন্তী শান্ত গলায় বললেন, ‘এই আবেগগুলো মানুষের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনও একজন মানুষের কাছ থেকে নয়। এটাকে সম্মিলিত মানবিক আবেগ বলতে পার।’

এথিনের সহসা মনে হলো এই আবেগগুলোর মধ্যে হয়তো তার নিজেরও কিছু আবেগ আছে। যা ডক্টর রূপন্তী তাকে না জানিয়েই সংগ্রহ করেছেন। দেওয়ান হাবীবের ফুপুর আদরের উষ্ণতা আছে। মারুফের নির্ভীক হাসি আছে। দেওয়ান হাবীবের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের শূন্যতাও আছে।

ইকোন থেকে তীব্র অথচ সূক্ষ আলো নিউরাল শেলের মাথার দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। চেয়ারে বসে থাকা মানুষের মতো জীবন্ত কাঠামোর চোখের পাতা কেঁপে উঠেছে। মাত্র একবার। ল্যাবের ভেতরে সকলে যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেলেন। তাদের নিশ্বাস আটকে গেছে।

মানবসদৃশ কাঠামোর চোখের ভেতরে ধীরে ধীরে কিছু জন্ম নিচ্ছে। চমক নয়, বিস্ময় নয়―বরং অপরিচিত এক গভীরতা। সে চারপাশে তাকাল। ভাঙা এবং অনিশ্চিত গলায় মানবসদৃশ কাঠামো বলে উঠল, ‘আমি আছি!’

এথিনের মনে হলো ছোট শিশু প্রথম যেভাবে কথা বলে, এই কথার আওয়াজ অনেকটা সেরকম।

ডক্টর রূপন্তী নিজের আসন থেকে উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কেমন অনুভব করছো ?’

নিউরাল শেল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। যেন সে তার নিজের ভেতর প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে নিচ্ছে। খানিক বাদে খুব ধীরে বলল, ‘ভারী লাগছে বুকের ভেতর।’

এথিন যেন আচমকা অস্থির হয়ে পড়েছে। সে নিজেও নিজের আসন থেকে উঠে বসেছে। অস্থির হয়ে বলল, ‘এটা কী! তার কোনও স্মৃতি নেই।’

ডক্টর রূপন্তী তার কাঁধে হাত দিয়ে বসতে ইঙ্গিত করলেন। এথিন চেয়ারে বসে ভয় মেশানো গলায় বলল, ‘সে অনুভব করতে পারছে!’

ডক্টর রূপন্তী অত্যন্ত শীতল গলায় বললেন, ‘তার স্মৃতি নেই তবু সে অনুভব করতে পারছে। তবে সে জানে না কেন তার বুকের ভেতর ভারী বোধ হচ্ছে।’

এথিন বুঝতে পারছে আবার নতুন কোনও সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে। বিজ্ঞান উন্নত হবে সত্য, তবে মানুষের জীবনে নেবে আসবে ভয়াবহ সংকট। মানুষ অনুভব করবে কিন্তু তার কোনও অর্থ থাকবে না। কারণ সেই মানুষের কোনও স্মৃতি নেই, অভিজ্ঞতা নেই, সম্পর্ক নেই। শুধু সদ্য জন্মানো কিছু আবেগ। তার মানে সেই নিয়ন্ত্রিত মানুষ। যা কেবল কারখানায় তৈরি হতে পারে। মানুষ হাসবে, কাঁদবে, রাগ করবে। কিন্তু কেন সে এটা করছে তা জানবে না।

এথিন জানালা দিয়ে ল্যাবের বাইরের দিকে তাকাল। স্বচ্ছ কাচের জানালা দিয়ে বাইরে আকাশ দেখা যাচ্ছে। বাইরে অন্ধকার। সেখানে কোনও আলো নেই। এথিন আকাশে তারার সন্ধান করল। আকাশে তারা নেই। এথিনের মনে হলো যন্ত্র নয়, একদিন হয়তো সত্যিকারের মানুষ এরকম হয়ে যাবে। যাদের অতীত কোনও স্মৃতি ছাড়াই আবেগ থাকবে। কোনও মানুষের যদি স্মৃতি ছাড়া ভালোবাসা থাকে তা কী ভীষণ অসম্ভব হয়ে উঠবে ভেবে এথিনের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল।

ডক্টর রূপন্তী মনে হয় এথিনকে বুঝতে পারছেন। তিনি এথিনের অস্থিরতাকে অনুভব করতে পারলেন। নরম গলায় বললেন, ‘এথিন, আমরা যদি এখানে থেমে যাই তাহলে পৃথিবী বদলে যাবে। কেউ না কেউ কখনও এটা করবে। আর আমরা যদি আজ এটা করি তাহলে মানুষ বদলে যাবে। যারা স্মৃতিধারণে অক্ষম তারা নতুন স্মৃতি পাবে।’

এথিন বুঝতে পারছে নিউরাল সিন্যাপ্সের এই ট্রানজিশন কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত ঘটনা নয়। এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন সভ্যতার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

এথিন অনিশ্চিত গলায় প্রশ্ন করল, ‘আমরা কোন মানুষ চাই, স্মৃতি থেকে আবেগ তৈরি হবে নাকি আবেগ থেকে স্মৃতি!’

এথিনের প্রশ্নের উত্তর কেউ দিল না। তার প্রশ্নটা যেন ল্যাবের হালকা নীল আলোর ভেতর শূন্যে ঝুলে থাকল। 

১২

নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের ধূসর সকাল। ডক্টর রূপন্তীর চেম্বারে দেওয়ান হাবীব জানালার পাশে বসে আছেন। তার মনে হচ্ছে পাহাড়ের সবুজ ঢিবিগুলো কুয়াশার মতো ধোঁয়ার আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। সকালের নরম রোদ তার মুখে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি নিজের ভেতর অশান্তি বোধ করছেন। কীসের জন্য অশান্তি বুঝতে পারছেন না।

ডক্টর রূপন্তী মানুষের আবেগ থেকে স্মৃতি তৈরিতে মানুষের বিকল্প নিউরাল শেলে পরীক্ষা চালিয়ে সফল হয়েছেন। তিনি দেওয়ান হাবীবের দিকে তাকালেন। তারপর চোখ ফিরিয়ে এনে ডেস্কের ভেতর থেকে ছোট একটা কনসোল বের করে আনলেন। রঙিন আলো, ছোট ছোট স্ক্রিন আর স্লাইডার। এসব কিছু একটা জটিল যন্ত্রের ভেতরের অংশ।

তিনি বললেন, ‘দেখুন মিস্টার হাবীব, আমরা মানুষের আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, ভয়―সব আবেগের ডেটা সংগ্রহ করি। তারপর সেটা ডিজিটাল কোডে রূপান্তর করি। কোড থেকে আমরা এনার্জি তৈরি করি―ইমোশনাল এনার্জি।’

 দেওয়ান হাবীব কী বুঝলেন বোঝা গেল না। তিনি খানিক অবাক হয়ে বললেন, ‘তাহলে মানুষের আবেগ কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ?’

ডক্টর রূপন্তী হালকা করে হাসলেন। মুখে হাসির রেখা ঝুলিয়ে রেখে বললেন, ‘হ্যাঁ, মানুষের আবেগ কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে তার প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। একসময় দেখা যাবে, মানুষের প্রকৃত আবেগ হারিয়ে যাবে, সব কিছু কৃত্রিম হয়ে যাবে। তবে এখন আমরা প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করছি শুধু চিকিৎসায় এটা ব্যবহার করার জন্য।’

নিউরাল এক্সপেরিমেন্টের প্রত্যেক ধাপে দেওয়ান হাবীবের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছে। তিনি অনুমতি দিয়েছেন। তার কাছে এটা অত্যন্ত চমৎকার কিছু বলে মনে হয়েছে। তাছাড়া তিনি আছেন বিরাট যন্ত্রণার মধ্যে। তার ছোটবেলার কোনও স্মৃতি নেই। তিনি যা কিছু দেখছেন সব খাপছাড়া। কোথা থেকে শুরু বুঝতে পারছেন না। মারুফ তার আপন ভাই। তিনি মানছেন কিন্তু তার কোনও অতীত অভিজ্ঞতা হাতড়ে পাচ্ছেন না। তাতে তিনি আরও অস্থিরতা বোধ করছেন। মনে করছেন এভাবে চলতে থাকলে তিনি খুব দ্রুত অস্বাভাবিক হয়ে যাবেন। মানে উন্মাদ। তিনি দ্রুত এই অবস্থা থেকে মুক্তি চান।

ডক্টর রূপন্তীর কথা শুনে তার মনে অদ্ভুত ভয় জেগে উঠেছে। তিনি ভেবেছিলেন তার জন্য যে চিকিৎসা তা শুধু স্মৃতি হারানো মানুষের জন্য ব্যবহার করা হবে। এখন মনে হচ্ছে এটা মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করার মতো আবিষ্কার।

ডক্টর রূপন্তী তার কনসোলের সামনে বসেছেন। স্ক্রিনে দেওয়ান হাবীবের চোখ, মুখ, ভঙ্গি। ডিজিটালভাবে সবকিছু রেকর্ড করা হচ্ছে। ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘আমরা চাই মানুষ নিজের আবেগ অনুভব করুক। তারপর সেটাকে আমরা কালেক্ট করি। নতুন করে আপনার ভেতর কোনও আবেগ আমরা দিয়ে দিচ্ছি না। আমরা আপনার ব্রেইনের একটা পরীক্ষা করতে চাই। আপনি কি তাতে রাজি আছেন ?’

 দেওয়ান হাবীব চুপ করে আছেন। তিনি কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। মাথার ভেতরে নানা স্মৃতি এলোমেলোভাবে জট পাকিয়ে গেছে। সেখানে ছোটবেলার কোনও স্মৃতি নেই। তাতে তিনি কিছু বুঝতে পারছেন না। কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছেন না। তার ছোটবেলার স্মৃতি ফিরিয়ে আনা খুব জরুরি। তিনি ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ আমি রাজি। আপনি করুন। তবে অনুরোধ করছি তা করবেন সতর্কভাবে যেন আপনি সফল হন।’

ডক্টর রূপন্তী কনসোল চালু করেছেন। ছোট ছোট সিঁড়ি দিয়ে জটিল সব গ্রাফ, হালকা নীল আলো, ইলেকট্রিক্যাল ইম্পালস―সবকিছু মিশে গিয়ে যেন এক হয়ে যাচ্ছে আবার সেগুলো আলাদা আলাদা আকার ধারণ করছে।

দেওয়ান হাবীব ভালোবাসা, আনন্দ আর দুঃখের মিশ্র অনুভূতি অনুভব করছেন। ডক্টর রূপন্তী দেখলেন দেওয়ান হাবীবের আবেগগুলো ধীরে ধীরে ইমোশনাল এনার্জিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। দেওয়ান হাবীবের মনে হলো তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন। তার ভেতর প্রচণ্ড আবেগ সঞ্চারিত হচ্ছে কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন না এই অবস্থা কেন হচ্ছে। তিনি দিশেহারা বোধ করছেন।

ইমোশন থেকে যে এনার্জি দেওয়ান হাবীবের ভেতর তৈরি হয়েছে তা ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করতে শুরু করল। তিনি দিশেহারা অবস্থা থেকে থিতু হয়ে আসতে থাকলেন। তার মনে হলো নদীতে আচমকা ওঠা প্রবল ঢেউ যেন শান্ত হয়ে আসছে। তিনি এখন নিজের ভেতর অন্য রকম প্রশান্তির এনার্জি অনুভব করছেন।

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘আমরা এখন পরীক্ষা করে দেখব কীভাবে কৃত্রিম আবেগ এবং প্রকৃত আবেগের মধ্যে পার্থক্য করা যায়। প্রথমে আপনি আপনার কোনও সুখের কিংবা দুঃখের স্মৃতি ভাববেন। সেই স্মৃতি থেকে আসা আবেগ অনুভব করুন। আমরা সেটাকে এনার্জিতে রূপান্তরিত করব।’

 দেওয়ান হাবীব আস্তে করে তার দুই চোখ বন্ধ করলেন। কোনও একক স্মৃতি নয়, বরং একসাথে অনেকগুলো স্মৃতি তার ব্রেনে জমা হয়েছে। নাঈমার আদর, ফুপুর স্নেহমাখা মুখ, মারুফের উৎসাহ, আসমান ঘটকের চোখ। সবকিছু তার মনের ভেতর ছোটাছুটি করছে। সেগুলো থেকে এনার্জি তৈরি হওয়ার কথা।

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘আপনি আবার সব স্মৃতি ফিরে পাবেন। মানুষের আবেগ কখনও হারায় না। শুধু রূপান্তরিত হয়। আমরা সেই আবেগ থেকে তার স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে অসুবিধা হচ্ছে সব কৃত্রিম হলে, মানুষ স্বাভাবিক আবেগ হারাবে। আর সেই দিন আমাদের খুব কাছে।’

দেওয়ান হাবীব বুঝতে পারছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই আবিষ্কার একদিকে মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারবে সত্য। যেমন তার স্মৃতি ও আবেগ ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আবার একই সাথে অন্যদিকে, মানুষের প্রকৃত অনুভূতি কেবল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে কৃত্রিম হওয়ার আশঙ্কা আছে।

এথিন বলল, ‘ডক্টর রূপন্তী, আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, এতে শুধু মানুষের স্মৃতি ফিরছে না, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ভয়ও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই যন্ত্র মানবজাতির আবেগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। সেই শক্তি ইকোনের আছে।’

ডক্টর রূপন্তী কিছু বললেন না। দেওয়ান হাবীব জানালার পাশে বসে দীর্ঘ সময় চুপ করে আছেন। পাহাড়ের সবুজ ঢিবি, হাসপাতালের নরম আলো, এবং তার ভেতরের আবেগ―সবকিছু একত্র হয়ে অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি করেছে। স্মৃতি, আবেগ এবং মানবিক সম্পর্ক―সব কিছু এখন তার ভেতর নতুনভাবে জায়গা করে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

ডক্টর রূপন্তী কনসোল বন্ধ করলেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের পরীক্ষা সফল হয়েছে। তবে এটা চূড়ান্ত কিছু নয়। প্রাথমিক অবস্থা। বলা যেতে পারে এটা সবে শুরু।’

দেওয়ান হাবীব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। পাহাড়ের ওপাশে সূর্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, তার জীবনে শুধু স্মৃতি ফিরিয়ে আনা নয়, বরং আবেগ এবং মানবতার মিশেলে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। তিনি বিভ্রান্ত বোধ করছেন। সব স্মৃতি তিনি ফিরে চাইছেন কি না বুঝতে পারছেন না। আবার তিনি আদৌ মানবিক মানুষ কি না সে ব্যাপারেও সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। তিনি খানিক আতঙ্ক বোধ করছেন এই ভেবে যে তার কোনও কোনও স্মৃতি ডক্টর রূপন্তীর কাছে প্রকাশ হয়ে পড়বে! তিনি আবার নিজের ভেতর একই সাথে অস্থিরতা এবং দিশেহারা ভাব অনুভব করলেন।

১৩

দেওয়ান হাবীব হাসপাতালের তৃতীয় তলায় মাঝারি আকারের এক ঘরে বসে আছেন। জানালার বাইরে শীতের হালকা কুয়াশা সবুজ পাহাড়ে লেগে আছে। ধূসর কুয়াশার মধ্যে সূর্য তার সোনালি আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। কুয়াশা আর সকালের নরম রোদ্দুর মিশে অদ্ভুত অস্পষ্ট অবস্থা তৈরি করেছে।

ডক্টর রূপন্তী পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তার হাতে নতুন কনসোল। ইকোনের ছোট ছোট স্ক্রিনগুলো জ্বলজ্বল করছে। তিনি বললেন, মিস্টার হাবীব, আজ আমরা শুধু স্মৃতি বা আবেগের শক্তি পরীক্ষা করব না। আমরা চাই আপনি বুঝতে পারেন কীভাবে আবেগকে নিজে থেকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’

কনসোল চালু হয়েছে। দেওয়ান হাবীবের ভেতর প্রশান্ত ভাব দেখা যাচ্ছে। তিনি তার ছোটবেলার কথা মনে করতে পারছেন। ছোটবেলার সেই আনন্দ, ফুপুর আদর, ছোটবেলার বন্ধু। আবার হাসপাতালে আসমান ঘটকের পরামর্শ। সবকিছু তার ভেতর জটিল নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছে।

ডক্টর রূপন্তী কনসোলের ওপর হাত বোলালেন। স্ক্রিনে ওয়াসিফের জীবনের স্মৃতির হালকা ইলেকট্রিক্যাল প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। প্রত্যেকটি আবেগ, প্রতিটি মুহূর্ত, আলাদা আলাদা সম্পর্ক―সবকিছু ডিজিটাল কোডে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।

ডক্টর রূপন্তী জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি এখন কেমন অনুভব করছেন ?

 দেওয়ান হাবীব কিছু বললেন না। তিনি অনুভব করলেন ছোটবেলার এক রোদেলা বিকেল, মারুফের সঙ্গে হাসি-খেলাধুলা। আবার সেখান থেকে চট করে আসমান ঘটকের গম্ভীর মুখ চলে এল। তিনি নিজের ভেতর পরিবর্তন বুঝতে পারছেন। তিনি অনুভব করতে পারছেন তার আবেগগুলো শুধু স্মৃতি নয়। সেগুলো শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি নিজের ভেতর আত্মবিশ্বাস অনুভব করছেন। কিন্তু তার ছোটবেলার স্মৃতি স্থির হচ্ছে না। এসেই চলে যাচ্ছে। আসছে খুব কম সময়ের জন্য। যতটুকু তিনি মনে করতে পারছেন তাও খুব ঝাপসা।

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘আমরা আপনার আবেগকে শুধু শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছি না। আমরা দেখছি কীভাবে সেই শক্তি আপনার চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আচরণকে প্রভাবিত করে।’

দেওয়ান হাবীব অসহায় গলায় বললেন, ‘আমার ছোটবেলার স্মৃতি দাঁড়াচ্ছে না। এসেই চলে যাচ্ছে। সেগুলোকে আমি কিছুতেই মনে রাখতে পারছি না।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘এখন আমরা ইকোনের পরবর্তী ধাপ শুরু করব। এবার শুধু শক্তি নয়, আমরা দেখতে চাই কীভাবে আবেগ মানুষের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণকে প্রভাবিত এবং পরিবর্তন করে।’

 দেওয়ান হাবীব নিজের ভেতরে ছোট ছোট আবেগের ধারা অনুভব করতে থাকলেন। তাকে নিয়ে ফুপুর দুশ্চিন্তা, মারুফের অস্থির হয়ে দৌড়াদৌড়ি, আসমান ঘটকের কঠোরতা―সব কিছু এক সঙ্গে মিলে শক্তিশালী এক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। কিন্তু সেখানে তার ছোটবেলার কোনও স্মৃতি নেই। শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কোথাও তিনি ছোটবেলার স্মৃতি খুঁজে পেলেন না। তার ভেতর প্রবল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মাথার ভেতরে দাঁড়কাক ঠোকর দিচ্ছে। প্রতিটি স্মৃতি নতুনভাবে তৈরি শক্তির সাথে মিলেমিশে এক জটিল মায়াজাল সৃষ্টি করছে।

পরের দিন। নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সপ্তম তলার এক বিশেষ রুমে দেওয়ান হাবীব বসে আছেন। বাইরে শীতের কুয়াশা ঢেউ খেলছে। তবে রুমের ভেতরের বাতাস শীতল নয়। বরং এক ধরনের অদ্ভুত তাপ অনুভূত হচ্ছে। ডক্টর রূপন্তী এসেছেন। তার হাতে ইকোনের আরেকটি নতুন কনসোল। এই কনসোলের প্রতিটি স্ক্রিনে আলাদা আলাদা ডেটা আর আবেগের ভেক্টর চলাচল করতে পারে।

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘আজ আমরা আপনার ছোটবেলার স্মৃতি খুঁজে বের করব। দেখব কীভাবে মানুষের আবেগ তার চিন্তাভাবনা, আচরণ এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। আপনি মনে করুন আপনার ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলো―আপনার ফুপুর আদর, মারুফের সাথে কিংবা আপনার বন্ধুদের সাথে খেলা করা, আপনার বাবার আচরণ।’

 দেওয়ান হাবীব চোখ বন্ধ করলেন। মনে পড়তে লাগল ছোটবেলায় বন্ধুদের সাথে খেলার কথা, সাইকেলে নদীর ধারে যাওয়া। নদীতে গোসল করা। মাঠের পাশ দিয়ে ইশকুলে যেতে যেতে দুষ্টুমি করা―সব।

ডক্টর রূপন্তী স্ক্রিনে দেখলেন দেওয়ান হাবীবের ছোটবেলার প্রত্যেকটি স্মৃতি ইলেকট্রিক্যাল প্যাটার্নের মাধ্যমে তার ব্রেনে প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি চমকে উঠে থমকে গেছেন। ডক্টর রূপন্তী খেয়াল করলেন দেওয়ান হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতির ইলেকট্রিক প্যাটার্ন যেভাবে তৈরি হয়েছিল সেভাবেই আবার খুব তাড়াতাড়ি মিলিয়ে গেল। যেন সেখানে কখনও কোনও প্যাটার্ন তৈরি হয়নি। ডক্টর রূপন্তী দুশ্চিন্তা নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে দেওয়ান হাবীবের হিপোক্যাম্পাস ও নিউরোসাইন্যাপ্টিক নেটওয়ার্ক। তার বর্তমান সময়ের স্মৃতি আর আবেগের ভেক্টর জটিল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সময়ের স্মৃতি খানিক বীভৎস, ক্রূর এবং সহিংস। আবেগের মাত্রাও সেই একই রকম।

ডক্টর রূপন্তী গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। তিনি নিজের মনে বিড়বিড় করে বললেন, ‘এই শক্তি কেবল অনুভূতি নয়। এটা মানুষের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণের প্রকাশ। তা সব সময় ইতিবাচক নাও হতে পারে। তা হতে পারে ভয়ংকরভাবে নেতিবাচক কিছু।

ডক্টর রূপন্তী যেন খানিকটা মরিয়া হয়ে কনসোলের আরেকটি স্ক্রিন চালু করলেন। তিনি সত্য বুঝতে চাইছেন। দেওয়ান হাবীবের বর্তমান স্মৃতির ইলেকট্রিক্যাল প্যাটার্ন তাকে দুশিচন্তায় ফেলে দিয়েছে। কনসোলের স্ক্রিনে মানুষের আবেগের কৃত্রিম রূপান্তরের ভেক্টর প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। যেখানে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা আবেগকে কনভার্ট করা হচ্ছে। সেগুলোকে ডিজিটাল কোডে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।

এথিন বলল, ‘কৃত্রিম আবেগ মানুষের জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে সেটা আশা করি বুঝতে পারছেন, ডক্টর রূপন্তী!’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘কিন্তু যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে এই শক্তি মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।’

এথিন কিছু বলল না। দেওয়ান হাবীব ঘরের বাইরে তাকালেন। পাহাড়ের সবুজ ঢিবি, হালকা কুয়াশা, নরম রোদ―সব কিছু যেন তার ভেতরের আবেগের সঙ্গে মিশে নতুন এক জগৎ তৈরি করেছে। কিন্তু কী সেই জগৎ সেটা বুঝতে পারছেন না।

আচমকা তার মনে পড়ল ছোটবেলার একটা ঘটনা। ফুপুর সাথে কাটানো এক বিকেলের কথা। ফুপুর মুখে হাসি। ফুপু তাকে কোলের ভেতর নিয়ে আদর দিচ্ছেন। মারুফ ছুটে এসেছে। সে মারুফের সাথে খেলছে। অমনি সব আবার মিলিয়ে গেল। তিনি দেখলেন তার সামনে গম্ভীর মুখে আসমান ঘটক বসে আছেন। তাকে কঠিন কঠিন প্রশ্ন করছেন। দেওয়ান হাবীব বললেন, ‘আমি কিছু মনে করতে পারছি না। আমার ছোটবেলার কোনও স্মৃতি আমার কাছে নেই।’

দেওয়ান হাবীব গভীরভাবে শ্বাস নিলেন। পরপর কয়েকবার। মাথার ভেতরের অস্থিরতা কমতে শুরু করেছে। দাঁড়কাকের ঠোকরও আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে।

ডক্টর রূপন্তী গভীর শ্বাস ফেলে বললেন, আমাদের হাতে এখন অপশন আছে দুটো। কৃত্রিমভাবে মিস্টার হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি বানিয়ে তার ব্রেনে স্থাপন করা। অথবা কারও কাছ থেকে তার বাস্তব স্মৃতি মিস্টার হাবীবের ব্রেনে প্রতিস্থাপন করা।’

চিন্তিত গলায় নাঈমা বললেন, ‘তাকে স্মৃতি দিতে পারে এমন কাউকে তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

ডক্টর রূপন্তী বলল, ‘আমরা কৃত্রিমভাবে মিস্টার হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি তৈরি করার চেষ্টা করছি।’

এথিন বুঝতে পারছে ডক্টর রূপন্তী কৃত্রিমভাবে দেওয়ান হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি তৈরির আড়ালে নতুন কোনও ব্যবসার ফন্দি করছেন। এই প্রজেক্টে এথিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই প্রজেক্টের সাথে সে আর থাকবে না। আজই সে অফিসিয়ালি এই কাজ থেকে ইস্তফা দেবে। এথিন তাই করল।   

১৪

নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সপ্তম তলার রুমের জানালার বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। পাহাড়ের ওপাশে সন্ধ্যার কমলা আভা শেষ প্রান্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। ডক্টর রূপন্তীর ল্যাব তখন নিয়ন আলোয় ঝলমল করছে। দেওয়ান হাবীবের চোখে দুশ্চিন্তাহীন স্বাভাবিক অবস্থা এবং অনিশ্চয়তার মাঝে মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। ছোটবেলার স্মৃতি ফিরে এসেছে। কিন্তু সেটা মেশিনের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে। এখনও সেই স্মৃতির কোড ব্রেইন নিউরনে সিঙ্ক্রোনাইজ করে স্থাপন করা যায়নি। তাতে যতক্ষণ দেওয়ান হাবীব মেশিনের আওতায় থাকছেন ততক্ষণ তিনি ছোটবেলার কথা মনে করতে পারছেন। মেশিনের প্রভাব মুক্ত হলে তিনি আবার তার ছোটবেলার স্মৃতি হারিয়ে ফেলছেন। অবশ্য তার ছোটবেলার স্মৃতি বলে যেগুলো তাকে দেখানো হচ্ছে সেগুলোর সব স্মৃতি তার নয়। কিছু স্মৃতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে।

ডক্টর রূপন্তী অবশ্য নিশ্চিন্ত গলায় বললেন, ‘মিস্টার হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি ফিরে এসেছে। সেটাকে অবশ্য পুরোপুরি কৃত্রিম বলা যাবে না। কারণ এটা তার স্মৃতিকে ভিত্তি করেই বানানো হয়েছে। বলা যেতে পারে এটা তার এক এক্সটেনডেড মেমোরি।’

কিন্তু এই মেমোরি দেওয়ান হাবীবের ভেতর অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। যেন প্রকৃত স্মৃতি থেকে আসা আবেগ তার কৃত্রিম স্মৃতিকে গ্রহণ করতে চাইছে না। এখন পর্যন্ত বাস্তব স্মৃতি আর কৃত্রিম স্মৃতি আলাদা হয়ে আছে। তাদের মধ্যে কোনও মিলন ঘটানো সম্ভব হয়নি।

নাঈমা দাঁড়িয়ে আছেন দেওয়ান হাবীবের পাশে। তিনি অনুভব করতে পারছেন দেওয়ান হাবীবের সব স্মৃতি কৃত্রিমভাবে হলেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে তা যন্ত্রের সহযোগিতা ছাড়া কাজ করছে না। এতে দেওয়ান হাবীবের সমস্ত অনুভূতি এক সময় মেশিনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তার নিজের অনুভূতি বলে আর কিছু থাকবে না। মেশিন ছাড়া নিজেকে সম্পূর্ণ শূন্য বোধ হবে। এই ব্যাপারটা নাঈমার মনে ভয়ের জন্ম দিয়েছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ‘হাবীব, আমাদের জীবন এক ধরনের পরীক্ষার মধ্যে আছে। তোমার স্মৃতি খানিক কৃত্রিম, খানিক বাস্তব। আমাদের সম্পর্ক বাস্তব। কৃত্রিম এই স্মৃতি বাস্তব স্মৃতিকে কতখানি সমর্থন করতে পারবে ?’

দেওয়ান হাবীব চুপ করে আছেন। তিনি অনুভব করতে পারছেন, তার মনে যে শিশুবেলার উষ্ণতা এবং প্রাণবন্ত ভাব তৈরি হচ্ছে তা এখনকার আবেগের সাথে মিলছে না। তিনি খানিকটা অসহায় এবং অবসন্ন বোধ করছেন।

ডক্টর রূপন্তী এক দৃষ্টিতে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন। সেখানে দেওয়ান হাবীবের ডিজিটাল প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছে। মনিটরে কতগুলো সবুজ আর কমলা রেখা দেখা দিয়েছে। সেগুলোকে খুব বেশি জিগজ্যাগ দেখাচ্ছে না। তার মানে দেওয়ান হাবীব এখন প্রশান্তি বোধ করছেন। তিনি বাস্তব স্মৃতির কাছাকাছি চলে গেছেন।

দেওয়ান হাবীব তার ছোটবেলার প্রিয় বন্ধুকে দেখতে পেয়েছেন। তার নাম আয়াত আলি। তিনি আয়াত আলির সাথে হাঁটছেন। তাদের ভেতরের খেলা আর দুষ্টুমি মিশে যাচ্ছে। কিন্তু সেই স্মৃতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারল না। তার বাস্তব স্মৃতি আর কৃত্রিমভাবে তৈরি স্মৃতির ভেতর সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। তারা একে অপরকে তাড়িয়ে দিতে চাইছে। কেউ কাউকে ব্রেনে জায়গা দিতে চাইছে না। দেওয়ান হাবীবের স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে তার ছোটবেলা অস্পষ্ট হয়ে গেল।

ডক্টর রূপন্তী তখন ল্যাবের কম্পিউটার স্ক্রিনে নতুন ডেটা খুঁজে পেয়েছেন। তিনি মেশিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। মানুষের আবেগের তাপমাত্রা ডিজিটাল মানচিত্রে অস্বাভাবিক রঙে ধরা দিয়েছে। তিনি কৃত্রিম আবেগ দিয়ে মানুষের চিকিৎসার সাফল্যের কথা ভাবছেন। তবে তিনি এটাও জানেন যে যদি সময়মতো এসব নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে তাদের প্রকৃত আবেগ হারাতে শুরু করবে। তার সাময়িক উত্তেজনা অনুভব করতে কৃত্রিম আবেগের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। একসময় মানুষ কেবল কৃত্রিম আবেগ নিয়ে বেঁচে থাকবে, যা মেশিন তৈরি করেছে।

দেওয়ান হাবীবেব মাথার ভেতরে দাঁড়কাক ঠোকরানোর মতো অনুভূতি আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু এবার তা শুধু স্মৃতির সাথে সম্পর্কিত নয়। এখন তা নতুন ধরনের অজানা এক ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে ফিরেছে। যা ইকোন যন্ত্রের প্রভাবের সাথে জড়িত। তিনি কাউকে খুঁজছেন কিন্তু কাকে খুঁজছেন বুঝতে পারছেন না। তিনি কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না।

রাত বাড়ছে। হাসপাতালে নীরবতা নেমে এসেছে। সকলের ভেতর অদ্ভুত উত্তেজনা। আশার আলো আর অনিশ্চয়তার আশঙ্কা। দেওয়ান হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি ফিরে এসেছে কিন্তু তা এখনও কৃত্রিম। নিজে থেকে কখন তার স্মৃতি সজাগ হবে বুঝা যাচ্ছে না।

নাঈমা ক্লান্ত গলায় বললেন, ‘আমাদের মেনে নিতে হবে হাবীব, তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে কিছু কৃত্রিম আর কিছু বাস্তব স্মৃতি নিয়ে।’

দেওয়ান হাবীব চুপ করে আছেন। তিনি ঘটনা বুঝতে পারছেন কিন্তু বোঝাতে পারছেন না যে এই কৃত্রিম স্মৃতি থেকে আসা আবেগ আর বাস্তব স্মৃতির আবেগ তার ভেতর কী ভীষণ জটিল টানাপোড়েন তৈরি করছে, যা তাকে অস্থির করে দিচ্ছে। তিনি কিছুটা প্রতিবাদ করার মতো করে বললেন, ‘এভাবে বাঁচতে পারব না। এর চেয়ে ভালো আমার মৃত্যু নিশ্চিত করুন। আমি অনুমতি দিচ্ছি।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘এখন শুধু একটি অপশন খোলা আছে। তা হচ্ছে মেমোট্রান্সফিউশন। আর এটা করবেন নিউরোসায়েন্টিস্ট আসমান ঘটক। তার জন্য এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে যার সাথে মিস্টার হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি আছে।’

নাঈমা হাহাকারের মতো হাহা করে উঠলেন। সেই তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না যার সাথে দেওয়ান হাবীবের ছোটবেলার স্মৃতি আছে। যিনি তাকে নিজ স্মৃতি দান করবেন।

মারুফ তার এক হাতের করতল দিয়ে আরেক হাতের করতলে চাপড় দিয়ে বলল, ‘ভাবি, চিন্তা করো না। ব্যবস্থা করছি।’ 

মারুফ অতি দ্রুত ব্যবস্থা করে ফেলল। সে আয়াত আলিকে খুঁজে বের করে ফেলেছে।

দেওয়ান হাবীবের বাড়িতে আয়াত আলি এসেছিলেন পাঁচ বছর বয়সে। তার বাবার নাম ছিল জব্বর আলি। তিনি দেওয়ান হাবীবের বাবার গাড়ি চালাতেন। জব্বর আলির স্ত্রী মারা গেলে তিনি একমাত্র পুত্র আয়াত আলিকে নিয়ে এসে দেওয়ান হাবীবের বাড়িতে রেখে দেন। দেওয়ান হাবীব আর আয়াত এক ইশকুলে এক ক্লাসে পড়তেন। তারা সমবয়সী। পরে আয়াত আর পড়াশোনা করেননি। তার বয়স যখন ২৩ বছর তখন সে দেওয়ান হাবীবের বাড়ি থেকে চলে যান। কোথায় চলে গেছেন কেউ জানে না। মারুফের বয়স তখন কম। ছোটবেলায় আয়াতকে দেখার স্মৃতি মনে করতে পারে না। তবে বাবা বেঁচে থাকা পর্যন্ত আয়াত বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। মারুফ তখন তাকে দেখেছে। মারুফ তাকে আয়াত ভাই বলে ডাকে। বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসে কোনও এক বিচিত্র কারণে আয়াত ভাই কখনও বড় ভাইয়া মানে দেওয়ান হাবীবের সঙ্গে দেখা করতেন না। যদিও বাবা ভাইয়ার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন। আয়াত ভাই সেখানে আসত।

আয়াত তার ছোটবেলার স্মৃতি দেওয়ান হাবীবকে দিতে রাজি হয়েছেন। মারুফ ভেবেছিল এজন্য হয়তো আয়াত ভাই মোটা অংকের অর্থ দাবি করবেন। আয়াত কিছুই চাননি।

দেওয়ান হাবীবের মুখোমুখি বসে আছেন আয়াত আলি। দেওয়ান হাবীব তাকে চিনতে পারছেন না। আয়াত বললেন, ‘হাবীব, কেমন আছো ?’

দেওয়ান হাবীব প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। তার ব্রেইনে আবার দাঁড়কাক ঠোকর দেওয়ার অনুভূতি হচ্ছে। অস্পষ্ট অবয়ব এসে মিলিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার বললেন, ‘ব্রেইনের ওপর চাপ দেবেন না।’

১৫

নিউরোসায়েন্টিস্ট আসমান ঘটক সফলভাবে মেমোরি ট্রান্সফিউশন করেছেন। আয়াত আলি বসে আছেন দেওয়ান হাবীবের সামনে। তার বসার ভেতর জড়োসড়ো ভাব। দেওয়ান হাবীব গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী রে আয়াত, কোথায় থাকিস ? কী করিস এখন! বিয়ে করেছিস ? বউ-বাচ্চা কোথায় ?

 আয়াত কোনও কথা বলছেন না। দেওয়ান হাবীব তার অতি পরিচিত। তবে কীভাবে পরিচিত মনে করতে পারছেন না। অদ্ভুত এক দৃশ্য মনে পড়েছে দেওয়ান হাবীবের। তিনি তাদের ডুপ্লেক্স বাড়ির দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন। সোফার ওপর বাবা বসে আছেন। তার সামনে বসে ছিল আয়াত। তাকে নামতে দেখে আয়াত সোফা থেকে উঠে দরজার পর্দার আড়ালে চলে গেল। সে চলে যাওয়ার পর আয়াত এসে আবার বাবার সামনে বসেছে। এই ঘটনার সাক্ষী সে নয়। পুরোটা আয়াতের স্মৃতি।

ডাক্তারের মুখে সাফল্যের হাসি। তিনি নিশ্চিত হয়েছেন আয়াত আলির মেমোরি যথাযথভাবে দেওয়ান হাবীবের ব্রেইনে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।

দেওয়ান হাবীবের মনে পড়ছে ইশকুল থেকে সে আর আয়াত একসঙ্গে ফিরেছে। বাড়ি ফিরেই দেওয়ান হাবীব চলে গেছে বাবার কাছে। আয়াত অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ইশকুলে সবাই তাকে ভীষণ পছন্দ করে। এটা দেওয়ান হাবীবের ভালো লাগেনি। সে বাবাকে গিয়ে বলল, ‘আয়াত যদি ইশকুলে যায়, তাহলে আমি ইশকুলে যাব না।’

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আয়াত বেয়াদবি করেছে ?’

দেওয়ান হাবীব বললেন, ‘সে কী করেছে না করেছে তা বিবেচনা করার দরকার নেই। আয়াত ইশকুলে যাক তা আমি চাইছি না।’

বাবা কিছু অনুমান করলেন। তিনি বললেন, ‘মানুষকে কখনও ভাগ করবে না। ড্রাইভারের ছেলে বলে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে না।’

দেওয়ান হাবীব রাজি হলেন না। আয়াত ইশকুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন।

আয়াত হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন। নাঈমা তাকে যেতে দেননি। বলেছেন, আর কয়েকটা দিন থেকে যান। মারুফও জোর করে তাকে থেকে যেতে বলেছে।

আয়াতের মনে হচ্ছে তারা খুব আন্তরিক। সে এ বাড়িতে আগেও এসেছে। এ বাড়ির সবাইকে চেনে। কিন্তু তাদের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক তা মনে করতে পারছেন না। মনে করতে গেলে মনে পড়ছে না, কষ্ট হচ্ছে আর অনুভব করছেন মাথার ভেতর যেন দাঁড়কাক ঠোকর দিচ্ছে।

নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সপ্তম তলায় রাত গভীর। জানালার বাইরে পাহাড়ের ছায়া ঢেউ খেলছে, বাতাসে শীতের গন্ধ ভেসে যাচ্ছে। ডক্টর রূপন্তীর ল্যাবের সব লাইট জ্বলজ্বল করছে। আর ইকোন যন্ত্রের হিউম্যান-ইমোশন কনভার্টারের স্ক্রিনে মানুষের আবেগের ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে। দেওয়ান হাবীবের ব্রেইনে দাঁড়কাকের ঠোকরের যে অদ্ভুত অনুভূতি ছিল তা আয়াত আলির ব্রেইন ম্যাপে দেখা যাচ্ছে। আয়াত আলি তার ছোটবেলার স্মৃতি পুরোটা দেওয়ান হাবীবকে দিয়ে দিয়েছেন।

দেওয়ান হাবীব ল্যাবের ভেতর চেয়ারে বসে আছেন। তার সামনে আয়াত আলি বসে আছেন। দুজনের মধ্যে এক ধরনের শীতল নীরবতা। তাদের প্রত্যেক বারের নিশ্বাস যেন অতীতের স্মৃতি আর বর্তমানের অজানা ভয়কে ছুঁয়ে যাচ্ছে। দেওয়ান হাবীব বিশাল দুশ্চিন্তার ভেতর পড়ে গেছেন। মনে হচ্ছে তার ছোটবেলার স্মৃতি সব তার নয়। কিছু স্মৃতি আয়াতের। তিনি গোপনে যেন আয়াতের অনেক কিছু জেনে ফেলেছেন।

নাঈমা এসে পাশে বসেছেন। তিনি দেওয়ান হাবীবের হাত নিজের হাতের ভেতর টেনে নিয়েছেন। তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘তোমার ছোটবেলার স্মৃতি ফিরে এসেছে। বুঝতে পারছি তার সাথে আরও অনেক স্মৃতি আছে যা তোমার একান্ত নিজস্ব নয়। এসব নিয়ে আর ভেবো না। এক সময় দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

 দেওয়ার হাবীব কিছু বললেন না। তিনি বুঝতে পারছেন না তার আর আয়াতের স্মৃতি নিয়ে তাকে কতদিন এভাবে বেঁচে থাকতে হবে। চেনা আর অচেনার মধ্যে টানাটানির এক জটিল জীবন।

১৬

বাসার সামনে দেয়াল-ঘেরা বিশাল সবুজ লন। শীতের সকালের ঝকঝকে নরম রোদ ছড়িয়ে আছে। সেখানে চেয়ারে মুখোমুখি বসে আছেন দেওয়ান হাবীব আর আয়াত। দেওয়ান হাবীব বললেন, ‘আয়াত, তোকে না খেতে দিয়ে ছোটবেলায় একবার সারা দিন স্টোর রুমে আটকে রেখেছিলাম, মনে আছে ?’

আয়াত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। তার দৃষ্টি শূন্য। দেওয়ান হাবীব বললেন, ‘তুই আমার ওপর রেগে গেলি। কবিরাজের কাছ থেকে করবী ফুলের বীজ নিয়ে এসেছিলি আমার খাবারে মিশিয়ে আমাকে মেরে ফেলবি বলে। সেই খাবার যখন খেতে যাব, তোর মনে হলো অন্যায় করছিস। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভান করে আমার খাবারের ওপর পড়ে গেলি। খাবার বদলে আমাকে নতুন খাবার দেওয়া হলো। আমি বেঁচে গেলাম। বাবা তোকে খুব মেরেছিলেন সেদিন আমার খাবারের ওপর পড়ে গিয়েছিলি বলে।’

আয়াতের মনে পড়ছে না। তার মাথার ভেতর দাঁড়কাক অনবরত ঠোকর দিয়ে যাচ্ছে।

দেওয়ান হাবীব বুঝতে পারছেন না এই স্মৃতি তার নাকি আয়াতের। তিনি বললেন, ‘কাউকে কোনওদিন কষ্ট দেব না। তুই আমার পরম আত্মীয় হয়ে আমার কাছে থেকে যা।’

আয়াত কিছু বললেন না। দেওয়ান হাবীব বললেন, ‘কোনও দিন যদি মনে পড়ে ছোটবেলায় তোকে ভীষণ নির্যাতন করেছি, তখন কী করবি ?’

আয়াত স্পষ্ট চোখে তাকালেন। বললেন, ‘বিশ্বাসই করব না। তুমি কোনও দিন আমাকে কষ্ট দিতে পারো না।’

পুলিশ কমিশনারের রুমে ডিআইজি আকরাম, সিআইডি অফিসার সাজ্জাদ, রাদি আর আঞ্জুমান দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ কমিশনার যথেষ্ট রেগে আছেন। তিনি আজকের খবরের কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন, দেখো সাংবাদিক তানজিলা হোসেনের হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশে কী অবস্থা চলছে। এখন পর্যন্ত তোমরা খুনের কোনও কিনারা করতে পারলে না। একজনকেও গ্রেফতার করতে পারোনি। কী জবাব দেব আমরা হোম মিনিস্ট্রিকে!

ইন্সপেক্টর আঞ্জুমান রশীদের হাতে খবরের কাগজ। সে সাংবাদিক তানজিলা হোসেন হত্যার রিপোর্ট পড়ছে।

সাংবাদিক তানজিলা হোসেন হত্যার দ্রুত বিচার দাবি

সাংবাদিক তানজিলা হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কালক্ষেপণ না করে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত, গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়েছে। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের আয়োজনে এ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করা হয়।

সমাবেশে উপস্থিত সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বলেন, সাংবাদিক তানজিলা হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর এতটা সময় পার হয়ে গেল অথচ এখনও খুনিদের শনাক্ত করে বিচার হলো না। আমরা এই রহস্য উন্মোচনের দাবি জানাচ্ছি। সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়ার কারণে মানুষ আজ হাসে। তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে ? হত্যার পর খুনিরা সাংবাদিক তানজিলা হোসেনের বাসা থেকে ল্যাপটপ নিয়ে গেছে। সেই ল্যাপটপ উদ্ধার করতে পারেনি তদন্তসংশ্লিষ্ট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই ল্যাপটপে কী তথ্য ছিল, তাও উন্মোচিত হয়নি।

তারা আরও বলেন, তদন্ত সংশ্লিষ্টদের অনীহা ও গাফিলতি রয়েছে। না হলে ৪৮ ঘণ্টার ঘোষণার পর এত সময় অতিবাহিত হয়েছে হত্যার রহস্য উন্মোচন করা হয়নি। এখন কোনও প্রহসন নয়, আমরা অবিলম্বে সাংবাদিক তানজিলা হোসেন হত্যার বিচার চাই। সাংবাদিক তানজিলা হোসেনের হত্যাকারীরা কোন মাফিয়ার আওতায় আছে, তারা কার লোক, তা খুঁজে বের করতে হবে। আর যদি সাংবাদিক তানজিলা হোসেন হত্যায় গাফিলতি দেখা যায় তাহলে ধরে নেওয়া হবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরকারের একাংশের গভীর যোগাযোগ আছে। তারা এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে বাধা সৃষ্টি করছে। আমরাও ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিচ্ছি। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি সাংবাদিক তানজিলা হোসেনের হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে গ্রেফতার করা না হয় তাহলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাব।

এ সময় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলে বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানানো হয়। সমাবেশে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি, মহাসচিব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি উপস্থিত ছিলেন।

ডিআইজি আকরাম বললেন, স্যার, ‘আশা করছি আমরা ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ে অপরাধীকে ধরতে সমর্থ হব।’

পুলিশ কমিশনার বললেন, ‘এই আশা সফল হোক।’

ডিআইজি আকরাম এসেছেন ডাক্তার শরিফের কাছে। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি ডাক্তার শরিফকে বুঝিয়ে বললেন। ডাক্তার শরিফ বললেন, ‘দেজা ভ্যু করার জন্য দেওয়ান হাবীবের এই অবস্থাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। আমি কাগজপত্র তৈরি করছি, আপনি দেওয়ান হাবীবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসুন।’

ডিআইজি আকরাম বললেন, ‘এ ব্যাপারে দেওয়ান হাবীবের কাছ থেকে আগেই অনুমতি নেওয়া আছে। সেই সমস্ত কাগজপত্র আমাদের কাছে আছে।’

দেওয়ান হাবীবের মস্তিষ্কে টেমপোরাল লোবের রাইনাল কর্টেক্সে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিয়ে দেজা ভ্যু করানো হলো। এর স্থায়িত্ব ছিল ৭২ ঘণ্টা। দেজা ভ্যু করানোর পর হাসপাতাল থেকে দেওয়ান হাবীবকে ছেড়ে দিয়েছে। তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে।

১৭

দেওয়ান হাবীব বসে আছেন নিজ বাড়ির ড্রয়িং রুমে। তার পরনে ট্রাউজার। গায়ে টি-শার্ট। বাড়িতে তিনি একা আছেন।

আলম এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের মাঝখানে। তার হাতে খবরের কাগজ। আলমের চোখমুখ শুকনো। দেওয়ান হাবীব মুখ তুলে আলমের দিকে তাকালেন। সিআইডি অফিসার যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছে সেভাবে আলম আগে বলা কথাগুলো বলে গেল, ‘স্যার এই মেয়ে ডেঞ্জারাস। তার কাছে নওরিন ফার্মার সব খবর আছে। সে বেশ কয়েকটা ওষুধের কাঁচামালের স্যাম্পল নিয়ে গেছে। সব কয়টি ওষুধে ভেজাল আছে। নওরিন ফার্মার ওষুধ চলে মোড়কে আর ডাক্তার, রিপ্রেজেন্টেটিভ দিয়ে। বছরে তাদের মোটা টাকার গিফট দেওয়া হয়। রিপোর্ট বের হলে শুধু নওরিন ফার্মা বন্ধ হবে না, নওরিন ফার্মার সাথে জড়িত সবাইকে জেল খাটতে হবে।’

দেওয়ান হাবীব শীতল গলায় বললেন, ‘তুমি যাও।’

আলম মাথা নিচু করে ঘর থেকে বের হয়ে এল। দেওয়ান হাবীবের স্মৃতিতে এক অপরিচিত ঘটনা ভেসে উঠেছে। ১৭ বছর বয়সের আয়াত দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার সামনে। স্থির গলায় আয়াত বলল, ‘রিযারত আপনার সব খবর জেনে গেছে। সে এই খবর পুলিশকে জানাবে। পুলিশ এসে আপনাকে ধরে নিয়ে যাবে। এটা মানসম্মানের কথা।’

শীতল গলায় বাবা বললেন, ‘রিযারত যাতে পুলিশকে খবর জানাতে না পারে সেই ব্যবস্থা করো।’

এরপর দেওয়ান হাবীবের স্মৃতিতে বীভৎস এক ঘটনার ছবি দেখা দিয়েছে। রাত। আয়াত আলির পরনে মাদ্রাসার বড় হুজুরের পোশাক। মাথায় বিশাল সবুজ পাগড়ি। মুখে লম্বা দাড়ি। এত অল্প বয়সে তার এমন লম্বা দাড়ি কীভাবে হয়েছে সেটাও ভেবে বের করা যাচ্ছে না। আয়াত আলির জোব্বার নিচে কোরবানির সময় গরু জবাই করার ধারালো বড় ছুরি। আয়াত আলি হাঁটছে, আয়াত আলির সাথে সাথে পূর্ণিমার চাঁদ ভেসে যাচ্ছে। সে যাচ্ছে বাজারের দিকে। এই পথে বাজার থেকে রিযারত ফিরবে। সে দেড়শো বছরের পুরোনো বটগাছের নিচে রিযারতের জন্য অপেক্ষা করবে।

দেওয়ান হাবীব সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন এই মুহূর্তে তাকে কী করতে হবে।  

সাজ্জাদ, রাদি আর আঞ্জুমান অপেক্ষা করছে দেওয়ান হাবীবের জন্য। তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে কোন দিকে যান সেটা তারা দেখতে চায়। এক ঘণ্টা আগে আলমকে তার কাছে পাঠানো হয়েছে। দেওয়ান হাবীব এখনও বাড়ি থেকে বের হননি। আলমের পকেটে মাইক্রোফোন দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে কী বলে তা যাতে শোনা যায়। আলম বাড়তি কোনও কথা বলেনি। সে দেওয়ান হাবীবের ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। এখন আছে বাড়ির ছাদের ওপর। তাকে সেখানে থাকতে বলা হয়েছে। সিআইডির তিন অফিসার আলমকে নজরের ভেতর রেখেছে।

তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর দেওয়ান হাবীবের বাড়ি থেকে কালো কাচে ঢাকা একটা গাড়ি বের হয়ে এল। দেওয়ান হাবীব সচরাচর এ গাড়িতে চড়েন না। এটা অন্য গাড়ি।

দেওয়ান হাবীবের বাড়ির বাইরে খানিক দূরে দুই প্লাটুন পুলিশ আছে। এক প্লাটুন পুলিশ সেখানে থেকে গেল। আর এক প্লাটুন পুলিশ সিআইডি অফিসারদের সঙ্গে দেওয়ান হাবীবের বাড়ি থেকে বেরুনো গাড়ি ফলো করে এগুতে থাকল।

সাংবাদিক তানজিলা হোসেনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেশ কিছুটা দূরে রাস্তার পাশে এসে দেওয়ান হাবীবের বাড়ি থেকে বেরুনো সেই গাড়ি থেমেছে। গাড়ি থেকে নামলেন গায়ে চাদর জড়ানো, লম্বা জোব্বা পরা এক হুজুর। তার মাথায় যথেষ্ট বড় পাগড়ি। পাগড়ির সামনে গাঢ় সবুজ পাথর। পান্না হতে পারে বা ক্রিস্টাল। বেশ উজ্জ¦ল।

হুজুর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলেন। সিকিউরিটি গার্ড উত্তম দাঁড়িয়ে আছে গেটে। তাকে অস্থির দেখাচ্ছে। সিআইডি অফিসার তাকে বলে দিয়েছে সেই হুজুর আবার এলে তার সঙ্গে আগের মতোই আচরণ করতে হবে। উত্তম আগে কী আচরণ করেছিল তার মনে পড়েছে না। হুজুরকে দেখে সে সালাম দিয়েছিল কি না মনে নেই। এবার সালাম দেবে নাকি বুঝতে পারছে না। তার সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

হুজুর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে বললেন, ‘পাঁচ তলায় যাব। সাহেব আমাকে আসতে বলেছে।’

উত্তম কিছু বলল না। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। হুজুর লিফট দিয়ে উপরে চলে গেলেন।

তানজিলা হোসেনের ফ্ল্যাটে এসে হুজুর ডোর বেল বাজালেন। তিনি দেয়ালের দিকে একটু সরে গেলেন যেন তাকে পিপ হোল দিয়ে দেখা না যায়। ভেতর থেকে নারী কণ্ঠ শোনা গেল, ‘কে ?’

হুজুর বললেন, ‘পেপারের বিল নিতে এসেছি।’

দরজা খুলে গেছে।

হুজুর সামনে এগিয়ে গিয়ে তানজিলা হোসেনকে দেখলেন। এক হাত বাড়িয়ে তাকে জোরে ধাক্কা দিয়েছেন। তানজিলা উলটে মেঝেতে পড়ে গেলেন। হুজুর তখন পা দিয়ে দরজা বন্ধ করে চাদরের নিচ থেকে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল বের করলেন। পরপর দুবার গুলি করেছেন তানজিলাকে। তানজিলা পড়ে আছেন মেঝেতে।

ঘরের চারদিকে তাকালেন হুজুর। খেয়াল করলেন না ঘরের ভেতর সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। তাতে পুরো ঘটনা রেকর্ড হচ্ছে। তিনি দেখলেন না মেঝেতে মানুষের ডামি পড়ে আছে। তার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে না। ড্রয়িং রুমের পাশে আড়ালে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন সিআইডি কর্মকর্তা। তাদের ভেতর দুজন নারী। ডোর বেল বাজার পর এদের একজন ভেতর থেকে বলেছিল, ‘কে ?’

হুজুর বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখলেন সোফার ওপর খোলা ল্যাপটপ। তিনি ক্যাবল থেকে ল্যাপটপ খুলে চাদরের নিচে নিয়ে নিলেন। পিস্তল গুঁজে রাখলেন কোমরে। দরজার দিকে ঘুরতেই দেখেন তিনজন সিআইডি অফিসার তার দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি পেছনে তাকালেন। পেছনে আরও কয়েকজন অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো।

হুজুর কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাদি এগিয়ে গিয়ে তার কোমর থেকে পিস্তল নিয়ে নিল। সাজ্জাদ নিয়েছে ল্যাপটপ। এই ল্যাপটপ অফিস থেকে আনা হয়েছে।

আঞ্জুমান এগিয়ে এসে বলল, ‘আমি কি আপনার দাড়ি খুলে নিতে পারি ?’

হুজুর কিছু বললেন না। আঞ্জুমান হুজুরের মুখ থেকে নকল দাড়ি আর পাগড়ি খুলে নিল। হুজুরের ছদ্মবেশ থেকে বেরিয়ে এলেন দেওয়ান হাবীব।

রাদি বলল, ‘আমরা আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।’

দেওয়ান হাবীব কিছু বললেন না। তিনি হতভম্ব চোখে তাকিয়ে থাকলেন।

১৮

ডিআইজি আকরাম বললেন, হাবীব বরাবরই চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। ওর ডাক নাম রিন্টু। আমরা সেই নামেই ওকে ডাকতাম। অপরাধ প্রবণতা ছিল ওর ভেতর। তবে রিন্টুর একটা ব্যাপার ছিল। কোনও অপরাধ করলে ছটফট করত। কাউকে বলতে চাইত। আমাদের ক্যাডেট কলেজের বাউন্ডারির বাইরে গাঁজা চাষ হতো। রিন্টুর উদ্যোগে সেই গাঁজা চাষ করা হয়েছিল। একদিন সেই গাঁজা বাগানে একজনকে পাওয়া গেল অজ্ঞান অবস্থায়। তার মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। রাতে দেখি রিন্টু বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। তার পরদিন আমাদের ম্যাথ ক্লাস টেস্ট ছিল। বললাম, আগামীকাল ম্যাথের ক্লাসটেস্ট। অনুশীলনী সাত আরেকবার ভালো করে দেখে নে।

রিন্টু হাই তুলে বলল, ‘ঘুম পাচ্ছে খুব।’

তারপর উঠে পানি খেয়েছে। আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। তখনও সে খুব ছটফট করছিল।

আমি বললাম, ‘এবার কী করেছিস, মার্ডার ?’

রিন্টু বলল, ‘হ্যাঁ। লোকটা গাঁজার সব জট খুলে নিয়েছে। খবর পেয়ে আমি গেলাম। দেখি অন্ধকারে তখনও সে গাছ থেকে গাঁজার জট ছাড়াচ্ছে। আমাকে দেখেনি। পেছন থেকে পাকা বাঁশ দিয়ে লোকটার মাথায় জোরে বাড়ি দিয়েছি। লোকটা ঠাস করে পড়ে মরে গেছে।’

বললাম, ‘তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সে মরেনি। বেঁচে আছে।’

রিন্টু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

আঞ্জুমান বলল, ‘স্যার আমরা ঠিক এটাই করতে চাই। এখানে ক্যাডেট কলেজ হোস্টেলের আপনাদের সেই রুম বানানো হবে। ঘটনা ঘটবে রাতে। আপনি তাকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘এবার কী করেছিস, মার্ডার ?’

সাজ্জাদ আর রাদি একসঙ্গে বলল, ‘দেজা ভ্যু’।

তাদের মুখ হাসি হাসি। আঞ্জুমান বলল, ‘ঘরে ক্যামেরা বসানো থাকবে। পুরো ঘটনা সাউন্ডসহ ভিডিও হবে। আমরা বাইরে থেকে মনিটরে দেখব। আশা করি আপনার কোনও অসুবিধা হবে না।’

১৯

নাঈমা বাবার বাড়ি গেছেন। দেওয়ান হাবীব বাড়িতে একা। ক্যাডেট কলেজের বন্ধু আকরাম তাকে ইনভাইট করেছে রাতে তার কাছে থেকে যাওয়ার জন্য। তারা দুই বন্ধু সারা রাত আড্ডা দেবে।

দেওয়ান হাবীবের মনে হলো সে শুয়ে আছে তার ছোটবেলার ক্যাডেট কলেজের রুমে। আকরাম পাশের টেবিলে আলো জ্বালিয়ে পড়ছে। ঠিক এরকম ঘটনা তার জীবনে আগে ঘটেছে।

আকরাম বললেন, ‘শুয়ে পড়লি ? আগামীকাল ম্যাথের ক্লাস টেস্ট। অনুশীলনী সাত আরেকবার ভালো করে দেখে নে।’

দেওয়ান হাবীব মুখে বিরাট হা করে হাই তুলে বললেন, ‘ঘুম পাচ্ছে খুব।’

তিনি উঠে পানি খেলেন। আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন। ছটফট করছেন।

আকরাম বললেন, ‘এবার কী করেছিস, মার্ডার ?’

দেওয়ান হাবীব বিছানায় উঠে স্থির হয়ে বসলেন। তার চোখমুখ ফ্যাকাসে। রাদি তাকিয়েছে আঞ্জুমানের দিকে। আঞ্জুমান তখনই রাদির দিকে তাকাল। সাজ্জাদ বলল, ‘দেজা ভ্যু!’

দেওয়ান হাবীব বললেন, ‘আমার মানি এক্সচেঞ্জের দোকান আছে। সেটা দেখত ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন। কয়েক দিন আগে মালয়েশিয়া থেকে এক লোককে দিয়ে ২ কেজি সোনা আনালাম। সেই লোক সোনা পৌঁছে দিল বিমানের গ্রাউন্ড সুপারভাইজার ওমর ফারুকের কাছে। সোনাসহ ওমর ফারুক ধরা পড়ে গেল। সিআইডি মামলা তদন্ত করছিল। সিআইডির কাছে ওমর ফারুক ঘটনা ফাঁস করে দিয়েছে। আমার মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালানের কথা সিআইডি জেনে গেল। গত পাঁচ বছর ধরে ঘটনা ঘটছে। টাকার বিনিময়ে সোনার চালান বিমানবন্দর পার করে আনোয়ার হোসেনের হাতে তুলে দিত এ কথা ওমর ফারুক বলে দিল। সিআইডি তখন আনোয়ারকে খুঁজছে। আনোয়ার ধরা পড়া মানে আমি ধরা পড়ে যাওয়া। আনোয়ার ধরা পড়ার আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল। এক রাতে তাকে রাস্তার মাঝখানে হাত-পা আর মুখ বেঁধে ফেলে দিলাম। আনোয়ার তখন গোঙাচ্ছিল। আমি তার গায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিয়েছি। সে মারা গেলে তার শরীর আর মুখ থেকে বাঁধন খুলে নেওয়া হয়েছে। গভীর রাতে আনোয়ারের রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার খবর জানা গেল পরদিন সকালে। 

সাজ্জাদ আর রাদি একসঙ্গে বলল, ‘দেজা ভ্যু!’

আকরাম বললেন, ‘রফিকুলকে মারলি কেন ?’

দেওয়ান হাবীব বললেন, ‘মায়ানমার থেকে ইয়াবার বিরাট চালান এসেছিল। সেই চালান থেকে রফিকুল নিজে বড় ব্যবসা করতে চেয়েছিল। সে আমার সাথে বেঈমানি করেছে। তাদের রেষারেষিতে ধরা পড়ে গেল ইয়াবার চালান। পুলিশ তখন রফিকুলকে খুঁজছে। তানজিলাকে মার্ডার করার জন্য লোক ঠিক করেছিল রফিকুল। আমার সব খবর তার কাছে। রাতে রফিকুল দেখা করতে এল আমার সাথে। বলল ইয়াবার চালান ধরা পড়ার পর সে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। ঘটনা কতদূর গড়িয়েছে খোঁজ করার চেষ্টা করছিল। পুলিশ যাতে তাকে ট্র্যাক করতে না পারে সেজন্য মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে আমার কাছে এসেছে শেল্টার নিতে। রফিকুলকে বললাম, খুব গরম। চল নদীর ধারে যাই। শীতল বাতাসে মাথা ঠান্ডা করে কথা বলি। এখন কাজ করতে হবে ভেবেচিন্তে। রফিকুল আমার সাথে গেল। মরা বুড়িগঙ্গার ধারে জনমানবহীন এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাকে গুলি করে মারলাম। গুলির শব্দ হয়নি। পিস্তলে সাইলেন্সার লাগানো ছিল।’

আকরাম বললেন, ‘তানজিলা হোসেনকে খুন করার জন্য রফিকুলকে দিয়ে তুই লোক ভাড়া করিয়েছিলি। তাহলে রিন্টু, তুই নিজে কেন গেলি তানজিলাকে খুন করতে ?’

দেওয়ান হাবীব ঢকঢক করে পানি খেলেন। তাকে অত্যধিক শান্ত ও ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার ভীষণ ঘুম পেয়েছে। তিনি বললেন, ‘রফিকুল টাকা আর তানজিলার বাসার ঠিকানা নিয়ে চলে গেল। সে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের ভেতর ইয়াবার চালান ধরা পড়ার খবর পেলাম। রফিকুলকে ফোন করি। দেখি তার ফোন বন্ধ। বারবার ফোন করলাম। প্রতিবার তার ফোন বন্ধ পেলাম। আমার মনে হলো গ্রেপ্তার এড়াতে সে বর্ডার পার হয়ে চলে যাচ্ছে। বর্ডারে সেরকম ব্যবস্থা করা আছে। আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। একদিকে ইয়াবার চালান ধরা পড়েছে, অন্য দিকে তানজিলাকে মারার ব্যাপারে রফিকুল কী ব্যবস্থা নিয়েছে কিছুই জানা যাচ্ছে না। সব কিছু আমার কাছে অসহ্য বোধ হতে লাগল। আমার মনে হলো তানজিলাকে দ্রুত শেষ করে দেওয়া দরকার। সে বেঁচে থাকলে নওরিন ফার্মার রিপোর্ট প্রকাশ হবেই। পেপারে না হোক অন্য কোথাও। মানুষ হত্যা করার ভেতর আনন্দ আছে। হত্যা করে কোনও নিশানা না রাখা। কেউ ধরতে পারবে না। এই আনন্দ আমি সব সময় নিতে চেয়েছি। এ রকম হত্যা করতে গিয়ে আগেও ছদ্মবেশ নিয়েছি। ভালোই লাগে। অন্যের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার ভেতর সুখ আছে। অন্যকে বোকা বানানোর সুখ। এবার হুজুর সাজলাম। মাথায় পাগড়িতে হাই রেজুলেশন ম্যাগনেট লাগালাম। দেখলে মনে হয় খাঁজকাঁটা সবুজ পান্না। সেটা আসলে ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করে। যেকোনও ক্যামেরার সামনে গেলে ক্যামেরা অকেজো হয়ে যায়। ছবি ঝিরঝির করে। তখন আর আমাকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা যায় না। নিজেকে আড়াল করার এটা অতি আধুনিক পদ্ধতি। তানজিলাকে পরপর দুটো গুলি করেছি। মারা যাওয়ার আগে সে ওয়াক করে উঠেছিল। মনে হলো আমাকে থুতু দিচ্ছে। মেয়েটা কিছুই করতে পারল না। সে মরে গেল।’

দেওয়ান হাবীব আর কিছু বললেন না। লম্বা হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। ঘুমে তার চোখ বুজে আসছে। পায়ের কাছ থেকে গায়ের ওপর চাদর টেনে নিলেন। বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন।

ডিআইজি আকরাম উঠে পড়লেন। তিনি দেওয়ান হাবীবের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তার কপালে আলতো করে হাত রাখলেন। দরজায় পায়ের শব্দ হয়েছে। ডিআইজি আকরাম দরজার দিকে তাকালেন। দেখলেন সিআইডি অফিসার তিনজন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বললেন, ‘রিন্টু ঘুমুচ্ছে।’

২০

এই ঘটনার আড়াই বছর পর হত্যা মামলায় মাননীয় আদালত দেওয়ান হাবীবকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। রায় ঘোষণার ছয় মাস পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়ান হাবীবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button