
নদীর দিক থেকে কুয়াশা ধীরে ধীরে উঠে আসছিল। ভৈরব সবার সামনে হাঁটছে―হাঁটুর কাছে লুঙ্গি গুটোনো, কাঁধে বাঁশের লাঠি, চোখে বহু পথ চেনা মানুষের স্থির দৃষ্টি। তার পেছনে মোহন আর বিষ্ণুচরণ―দুজনেই শূকরপালের চারপাশে ঘুরে ঘুরে হাঁটে, যেন চলমান পাহারা। যশোরের মনিরামপুর ছেড়ে আসার পর ফুলতলা আর তেরখাদার পর থেকে তারা কত খাল পেরিয়েছে, কত নদীর বুক চিরে নৌকা ঠেলেছে, কত মাঠ আর বিল ডিঙিয়েছে―সে হিসাব কারও কাছে নেই। দিনের পর দিন তারা হেঁটেই চলেছে। শুধু জানে, হাঁটা থামলে জীবন থামে; শূকরগুলোর ডাক ভারী হয়ে আসে, পেটের ভেতর শূন্যতা জমে। তারা এখন গোপালগঞ্জের চান্দার বিলে।
ভৈরব বলেছিল, ‘গোপালগঞ্জের চান্দার বিল―ওখানে মাটি নরম, ঘাসে নুন আছে। শূকর ভালো মোটা হবে, তাজা হবে।’ কথাটা আন্দাজে বলা নয়। তার বাপ, তার বাপের বাপ―সবাই এই বিলের নাম জানত। জল নামলে যেমন বিলের পাঁকে মাছ আটকে থাকে, তেমনি মানুষের ভাগ্যও কখনও কখনও এইখানেই থেমে যায়।
খাল পেরোনোর সময় মোহনের পা পিছলে গিয়েছিল। কাদার ভেতর দেবে গিয়ে সে টাল সামলাতে না পেরে বসে পড়েছিল; শূকরপাল তখন ছুটে গিয়েছিল এদিক-ওদিক। ভৈরব চিৎকার করেনি। সে বাঁশের লাঠিটা কাদায় গেঁথে দাঁড়িয়েছিল―নিশ্চল, যেন জল-জমির সঙ্গে তার বোঝাপড়া পুরোনো। নদী পার হওয়ার সময় নৌকার তলায় জল ঢুকেছিল; বিষ্ণুচরণ দু’হাত দিয়ে জল ছেঁচে বের করছিল―হাতের তালু জ্বালা করছিল, চোখে চাপা ভয়। মাঠ পেরোতে পেরোতে দিন ফুরিয়ে এল; আকাশে পাখিরা ঘরে ফেরার রেখা টানল।
বিলের ধারে পৌঁছাতেই মাটি নরম হয়ে গেল। পা দেবে গেল কাদায়, শূকরগুলোর নাক মাটিতে গুঁজে গেল লোভে। চান্দার বিলের মাঝখানে তারা আস্তানা গাড়ল। শুকনো কচুরিপানার ওপর পাটের বস্তা পেতে আগুন জ্বালানো হলো। আগুনের আলোয় ভৈরবের মুখটা আরও কঠিন লাগল―ক্লান্ত, কিন্তু ভাঙা নয়। মোহন চুপ করে বসে রইল, বিষ্ণুচরণ আগুনে কাঠ ঠেসে দিল।
শূকরগুলো বৃত্ত করে শুয়ে পড়ল; তাদের গরম শ্বাসে বিলের রাত ভারী হয়ে উঠল। দূরে ব্যাঙ ডেকে উঠল, জলের ওপর চাঁদের আলো কাঁপতে লাগল। ভৈরব ধীরে বলল, ‘এই বিল আমাদের চেনে।’ কথাটা যেন কুয়াশার ভেতর ভাসতে থাকল।
মোহন আর বিষ্ণুচরণ কিছু বলল না। তারা জানে―এই চেনা আর অচেনার মাঝখানেই কায়পুত্রদের জীবন; হাঁটা, থামা, আবার হাঁটা। চান্দার বিলের বুকে সেই রাতে তাদের আস্তানা শুধু তিনজন মানুষের থামা নয়, ছিল বহু পুরোনো যাত্রার এক নীরব চিহ্ন।
২
চান্দার বিলে রাত নেমে এলে জল আর কাদার গন্ধে চারদিক ভারী হয়ে ওঠে। আকাশে চাঁদ নেই―মেঘে ঢাকা, যেন বিলের বুকের মতোই চাপা কোনও দীর্ঘশ্বাস জমে আছে উপরে। বিলের মধ্যে এক পুকুরপাড়ে তিনজন শূকরপালক রাত কাটাচ্ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মাটির গায়ে ছিটকে পড়া একটা কালো দ্বীপ―আর তাদের চারপাশে গোল হয়ে শুয়ে আছে শূকরদের বিশাল শরীর।
প্রত্যেক দলের সঙ্গে দুই শতাধিক শূকর। বড়, মাঝারি, ছোট―কেউ আধখানা কাদায় গা ডুবিয়ে, কেউ গা-ঘেঁষে গা রেখে, কেউবা বাচ্চাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে শুয়ে আছে। তাদের নিঃশ্বাসে একটা গম্ভীর ছন্দ―হুং-হুং―যেন বিল নিজেই ঘুমোচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনও শূকর স্বপ্নে ছটফট করে ওঠে, খুরে কাদা ছিটায়, আবার চুপসে যায়।
পুকুরপাড়ে খড় আর পুরোনো পলিথিন পেতে পাশাপাশি বসে আছে তিনজন―ভৈরব, মোহন আর বিষ্ণুচরণ।
ভৈরবের বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। মুখে দাড়ির জঙ্গল, চোখে সব সময় একটা জেগে থাকা আগুন। সে অনেক পথ ঘুরেছে―ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ―যেখানে শূকর আছে, সেখানেই তার ঘর। মোহন তুলনায় কমবয়সী, চল্লিশের কোঠায়। কথাবার্তা কম, চোখ নামানো। বিষ্ণুচরণ সবচেয়ে বয়স্ক―ষাট পেরিয়েছে, কিন্তু গলার ভেতর এখনও গান বেঁচে আছে। সে গেয়ে ওঠে :
আর কতকাল বইবো এমন কাঠের ভাঙা নাও
দয়াল আমায় ভবনদী পার করাইয়া দাও।
তোমার নাওয়ে হইছি চরণদার
কে লইবে আর এই জীবনের ভার
কবে আমি ছুঁইতে পাব, তোমার রাঙা পাও।
গান থামিয়ে ভৈরব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে―এই বিলটার দিকে তাকালে বুকটা কেমন জানি করে। এত জল, এত কাদা―আমাদের জন্য একমুঠো শুকনো জমিও নেই।
নিবিষ্ট হয়ে গান শুনছিল মোহন। মোহন বলে, গান থামাইলা কেন। জমি থাকলেই বা কী হইত দাদা ? জমিতে তো আমাদের নাম নাই। যেখানে যাই, সেখানেই তাড়া খাই।
ভৈরব আগের গানটি শেষ করে :
নিজের নামে নাই যে বাড়িঘর
কেইবা আপন, কেইবা আমার পর
আমায় দেখে তবু দয়াল, আজ কেন লুকাও।
বিষ্ণুচরণ কাদায় একটা কাঠি দিয়ে গোল দাগ কাটে। তারপর বলে―আমাদের কপালটাই গোল, ওই শূকরগুলোর মতো। ঘুরতে ঘুরতে আবার নিজের লেজেই কামড় দিই।
একটু চুপচাপ। দূরে ব্যাঙ ডাকে। বিলের ওপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যায়। শূকরদের শরীরের তাপ থেকে বাষ্প উঠছে।
ভৈরব বলে, কাল সকালে বাজারে গেলে দাম ভালো পাবে তো ? তাদের হাতে টাকা নেই। এই শূকর বেচে খাবারের টাকা জোগাড় করে। তবে এই হিসাব আমার মহাজনকে দিতে হয়!
মোহন মাথা নাড়ে।―কে জানে! আজকাল মানুষ আমাদের শূকর চায়, কিন্তু আমাদের মানুষ বলে মানে না।
এই কথায় বিষ্ণুচরণ হেসে ওঠে―কিন্তু সে হাসি তেতো।
এই তো দুনিয়ার রীতি। শূকর খাবে, আমাদের ছোঁবে না। আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে গেলে বেঞ্চ পায় না, অথচ তাদের বইয়ের ট্যাক্সে রাস্তা হয়।
ভৈরব মাটির দিকে তাকিয়ে বলে―আমার ছেলে কয়, বাবা আমি এই কাজ কইরব না। শহরে যাব।
মোহন জিজ্ঞেস করে,―যাইবে তো যাক। কিন্তু শহর কি ওরে জায়গা দেবে ?
ভৈরব উত্তর দেয় না।
এই নীরবতার ভেতর বিষ্ণুচরণ হঠাৎ গলা খাঁকারি দেয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে গাইতে শুরু করে :
‘বিলের জলে ভাসে আমার নাম,
কাদা দিয়েই নাম লিইখে রাখলাম।
শুয়োর ঘুমায়, মানুষ জাগে,
আমায় কি আর কামে লাগে ?
জাইগা থাইকা অপমান পাইলাম।
ও মাটি মা, একদিন কবে
সকল কিছু ছাইড়তে হবে
না কি আমায় বিলেই রাইখবি
বিলেই জীবন সঁইপিলাম।’
গান থামলে চারপাশ আরও নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। এমনকি শূকরগুলোর নিঃশ্বাসও যেন একটু থমকে যায়। মোহন চোখ মুছে নেয়―সে কখন যে কেঁদে ফেলেছে, টের পায় না। ভৈরব চুপচাপ বসে থাকে, শক্ত হয়ে থাকা মুখের পেশি একটু ঢিল পড়ে। বিষ্ণুচরণ নিচু গলায় বলে―এই গান আমার বাবার। উনি বলতেন, গান গাইলে দুঃখ একটু হালকা হয়।
ভৈরব বলে―হালকা হয় ঠিকই, কিন্তু শেষ হয় না।
বিষ্ণুচরণ মৃদু হেসে বলে―দুঃখ যদি শেষ হইত, তাইলে আমরা মানুষ হইয়ে যেইতাম।
চান্দার বিলের সেই রাতে তিন শূকরপালক আর ছয় শতাধিক শূকর একই আকাশের নিচে ঘুমোয়। কারও স্বপ্নে জমি আসে, কারও স্বপ্নে আগুন, কারও স্বপ্নে শুধু জল―অন্তহীন জল।
আর বিল, সে সব দেখে চুপ করে থাকে।
৩
রাত আরও ঘন হয়। চান্দার বিলের জল কালো আয়নার মতো স্থির। শূকরগুলো গভীর ঘুমে―কেবল মাঝে মাঝে কোনও বাচ্চা শূকর মায়ের গায়ে নাক গুঁজে কুঁইকুঁই করে ওঠে। পুকুরপাড়ে আগুনের ছোট্ট আঁচটুকু নিভে আসছে। তিনজন মানুষ তখন আর বাইরের কথা বলে না―কথা ঘুরে যায় ঘরের ভেতরে।
মোহন প্রথম মুখ খোলে।―আমার সংসারে পাওয়া বইলতে কী আছে জানো ? দুইটা হাত, একটা শরীর―এই।
একটু থেমে বলে―স্ত্রীটা ভালো। বেশি কিছু চায় না। শুধু বলে, ছেলেটাকে মানুষ করো।
ভৈরব জিজ্ঞেস করে―ছেলেটা কয় ক্লাসে ?
পাঁচে।
মোহনের কণ্ঠে হালকা গর্ব, আবার ভয়ও।―স্কুলে নাকি ওকে আলাদা বসায়। অন্য ছেলেদের মা-বাবা আপত্তি করে।
ভৈরব চুপ করে থাকে। এই গল্প তার অচেনা নয়। মোহন বলে―আমার মেয়ে ক্লাস থ্রিতে উইঠে আর যায়নি। একদিন কেঁদে এসে বলল, ‘বাবা, আমি মানুষ না ?’
শুনে ভৈরবের গলা ভেঙে আসে। মোহন বলে,―ওই দিন থেইকে বই আর খোলে নাই।
বিষ্ণুচরণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।―আমার সংসারটাই তো ভাঙা। বউটা বছর দশেক আগে চলে গেছে। বলেছিল, এই জীবনে আর পারছে না।
সে হাসে―শুকনো হাসি।
আমি দোষ দেই না। দোষ ছিল আমাদের কপালে।
মোহন বলে―কপাল বললেই কি সব সেইরে যায় কাকা ?
বিষ্ণুচরণ মাথা নাড়ে।―না রে। কপাল আমরা নিজেরাই বানাই―অন্যরা আমাদের জন্য বানিয়ে দেয়।
একটু নীরবতা নামে। আগুন নিভে যায় পুরোপুরি। এখন কেবল শূকরদের নিঃশ্বাস আর দূরের পাখির ডাক।
ভৈরব বলে―তবু কী জানো, এই শূকরগুলোর জন্যই সংসারটা টিকে আছে।
হ্যাঁ, মোহন বলে―ওদের পিঠেই আমাদের ভাত।
বিষ্ণুচরণ যোগ করে,―কিন্তু ওদের জন্যই তো আমাদের এই জীবন।
সে ধীরে ধীরে বলে―আমরা চাইনি আলাদা কিছু। শুধু চাইতাম―হাটে গেইলে গালি না খেতে, হাসপাতালে গেইলে বিছানা পেতে, মরা মানুষটা পুড়াইতে বা কবর দিতে গিয়ে বাধা না পেইতে।
মোহন বলে―আর চাইতাম, আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন পরিচয় লুকিয়ে না বাঁচে।
ভৈরব আকাশের দিকে তাকায়। মেঘের ফাঁক দিয়ে একচিলতে তারা দেখা যায়।―এই তারাটুকুই আমাদের পাওয়া।
সে বলে,―আর না-পাওয়া ?
হালকা হেসে বলে―বাকিটা পুরো জীবন।
বিষ্ণুচরণ আস্তে বলে―সংসার মানে শুধু ঘর না রে। সংসার মানে মানুষ হয়ে বাঁচার চেষ্টা।
সে চোখ বন্ধ করে যোগ করে―আমরা সেই চেষ্টাটুকুই করে যাচ্ছি।
চান্দার বিলের সেই গভীর রাতে, শূকর আর মানুষের সংসার একসঙ্গে নিঃশ্বাস নেয়। কারও সংসারে চাল আছে, সম্মান নেই; কারও ঘরে ভালোবাসা আছে, নিরাপত্তা নেই; আবার কারও কাছে শুধু স্মৃতি আছে―আর একটা পুরোনো গান।
বিলের জল সব দেখে, সব জানে। তবু সে কিছু বলে না। শুধু ভোরের দিকে ধীরে ধীরে রং বদলায়।
৪
রাত তখন ভাঙার পথে। চান্দার বিলের জল হালকা কুয়াশায় ঢেকে গেছে। শূকরগুলো ধীরে ধীরে নড়েচড়ে উঠছে―কেউ উঠে দাঁড়ায়, কেউ কাদায় গড়াগড়ি দেয়। কিন্তু পুকুরপাড়ে বসে থাকা তিনজন মানুষের শরীর যেন আরও ভারী হয়ে এসেছে।
ভৈরব হঠাৎ বলে ওঠে―ছয় মাস রে… ছয়টা মাস বউ ছেইড়ে, ঘর ছেইড়ে, মানুষের গন্ধ ছেইড়ে থাকা কি কম কথা ?
মোহন তাকিয়ে থাকে বিলের জলের দিকে।―শরীরটাই আগে ভেইঙে পড়ে দাদা।
একটু থেমে বলে,―দিনভর হাঁটা, কাদা, রোদ। রাত হলে গা এলিয়ে দিলেই মনে হয়, কেউ যদি পাশে থাকত!
বিষ্ণুচরণ নিঃশব্দে শোনে। তারপর ধীরে বলে―শরীরের কষ্ট সহ্য করা যায়। মনেরটা যায় না।
সে চোখ নামিয়ে নেয়।―একেক রাতে মনে হয়, বুকের ভেতর পাথর বেইন্ধে হাঁটছি।
ভৈরব গলা নামিয়ে বলে―আমি কাউরে কই না। কিন্তু জানিস, অনেক রাতে হঠাৎ বউয়ের গলার শব্দ কানে আসে।
সে হেসে ফেলে নিজের ওপরই।―ডাকছে―‘ভাত ঠান্ডা হইয়ে যাইবে।’
মোহন চুপচাপ শোনে। তারপর বলে,―আমার বউটা রাতে দরজায় খিল মাইরা ঘুমায় না।
ভৈরব তাকায়।―কেন ?
যদি আমি হঠাৎ ফিরে আসি।
এই কথাটা বাতাসে ঝুলে থাকে। বিষ্ণুচরণ চোখ বন্ধ করে নেয়।
সে বলে―ওদের কষ্ট কি আমাদের চেয়ে কম ?
একটু থেমে যোগ করে,―আমরা তো অন্তত কাদা-জল-শূকর নিয়ে আছি। ওরা কী নিয়ে থাকে ? অপেক্ষা নিয়ে।
ভৈরব বলে―বুকের ভেতর পাষাণ বেঁধে।
তার গলা শক্ত।―গ্রামে থাকতে থাকতে শিখে গেছে। কারও সামনে কাঁদে না। শুধু রাত হলে চুপচাপ দেয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে পড়ে।
মোহন ধীরে বলে―আমার বউ বলে, ‘তুমি কষ্ট করো, আমিও করি। সংসারটা তো মাঝখানে।’
সে চোখ মুছে নেয়।―কিন্তু মাঝখানের সংসারটাই তো সবচেয়ে ভারী।
বিষ্ণুচরণ স্মৃতিতে ডুবে যায়।―আমার বউটা বলত, ‘তুমি গেলে ঘরটা বড় হয়ে যায়।’
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।―আমি বুঝিনি তখন। এখন বুঝি―খালি ঘর বড় হয়, বুকটা ছোট হইয়ে আসে।
ভৈরব বলে―এই ছয় মাস আমরা শুধু শরীর বাঁচাই।
মোহন যোগ করে―ওরা বাঁচায় সংসার।
আকাশের পূর্বদিকে হালকা আলো ফোটে। ভোর আসছে। শূকরগুলো গুছিয়ে নেওয়ার সময়। আবার হাঁটা, আবার বাজার, আবার ছয় মাসের দূরত্ব।
বিষ্ণুচরণ নিচু স্বরে বলে―এই জীবনটা শুধু কাজের না। এই জীবনটা সহ্য করার।
ভৈরব মাথা নাড়ে।
―আর সহ্য কইরতে গিয়ে আমরা সবাই পাথর হইয়ে যাই।
চান্দার বিল তখনও চুপ।
কিন্তু তার জলের ভেতর যেন কত নারীর অপেক্ষা, কত পুরুষের না-বলা কান্না একসঙ্গে ভাসতে থাকে।
৫
ভোরের আলো একটু একটু করে বিলের জল ছুঁয়ে পড়ে। কুয়াশা সরে গেলে দেখা যায়―দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা জল, মাঝখানে কচুরিপানা, কোথাও কোথাও ডোবা কালো মাটি। শূকরগুলোকে জড়ো করতে করতে বিষ্ণুচরণ হঠাৎ বলে ওঠে―
এই বিলটার ইতিহাস জানিস তো ?
ভৈরব তাকায়।
ইতিহাস আবার কী ? জল আর কাদা―এই তো।
বিষ্ণুচরণ হালকা হেসে মাথা নাড়ে।―তা না রে। এই চান্দার বিল অনেক কথা জানে।
মোহন থেমে শোনে। বিষ্ণুচরণ বলতে শুরু করে, যেন বিলের দিকেই কথা বলছে―
আমার দাদুর মুখে শুনেছি, এই বিল একসময় বিলই ছিল না। ছিল বন। সুন্দরবন। তারপর কোনও এক ভূমিকম্পে সেই বন নাই হয়ে গেল। ওই যে সুন্দরবন, ওটা শুরু ছিল এখান থেকেই। আর ভূমিকম্পে গাছপালা ঢুকে গেছে মাটির নিচে। এখনও মাটির ভেতর থেকে সেই গাছের গোড়া পাওয়া যায়। তারপর এখানে সাগর হয়ে গেলে। সাগর মানে হাওর। হাওর মানে বিল। এখানে ধান হতো।
বিষ্ণুচরণ হাত দিয়ে জল দেখায়―
―এই জায়গায় নাকি এক চান্দ নামের জেলে থাকত। বর্ষায় মাছ ধরত, খরায় চাষ করত। তার নামেই চান্দার বিল। আবার কেউ বলে এইটা ছিল সাগর। এই পথে চাঁদ সওদাগর তাঁর সপ্তডিঙ্গা নিয়ে বাণিজ্যে যাইত। এইখানে একসময় প্রবল স্রোতে তাঁর ডিঙ্গির বহর ডুইবা যায়। চাঁদ সওদাগরের নামেই সকলে একে চান্দার বিল বলে ডাকে। প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জায়গা নিয়ে এই বিল এখনও টিকে আছে। মানুষেরা ঘরবাড়ি বানিয়ে এই বিল যেন দখল করে লইছে।
ভৈরব বলে―তারপর ?
তারপর কী ?
বিষ্ণুচরণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।―নদী দিক বদলাইল, জল দাঁড়াইল। বিল শুকাইয়ে গেল। যারা ধনী ছিল, তারা সইরে গেল। যারা গরিব―তারা রইয়ে গেল।
মোহন যোগ করে,―যেমন আমরা।
বিষ্ণুচরণ মাথা নাড়ে।―ঠিক তাই। এই বিল গরিবদের জায়গা। যাদের কেউ নেয় না, তাদের বিল নেয়।
ভৈরব বলে―এইখানেই তো একসময় লাঠিয়ালদের আস্তানা ছিল।
সে স্মৃতি খোঁজে।―মারামারি, দখল, রক্ত… সব দেখেছে এই জল।
মোহন বলে―আমার দাদুর মুখে শুনেছি, ৭১-এর সময় এই বিলে লাশ ভেসে উঠত। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।―কেউ নিতে আসত না। জলই কবর দিত।
একটু নীরবতা নামে। শূকরগুলোর খুরে জল ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করে।
বিষ্ণুচরণ ধীরে বলে,―এই বিল তাই শুধু জল না। এই বিল স্মৃতির। সে বুকের দিকে আঙুল তোলে।―আমাদের মতোই―বাইরে শান্ত, ভেতরে কত কিছু জমে আছে।
ভৈরব বলে―এই বিলে আমরা আশ্রয় পাই, আবার এখানেই আমরা অদৃশ্য।
সে হেসে বলে,―মানুষের চোখে এই বিলের মতোই আমরা―কাজে লাগে।
মোহন যোগ করে―তাই তো শূকরগুলো এখানে শান্তিতে ঘুমায়।
সে চারপাশে তাকায়।―ওরা জানে, এই বিল কাউকে বিচার করে না। এখানে সকলেই সমান।
বিলের চারপাশে আছে মতুয়াদের বাস। হরিচাঁদ ঠাকুরের অনুসারী এরা। গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিষ্য এরা। হরিবোল ধ্বনিতে চারদিকে মাতিয়ে রাখে এরা। উত্তর দিকে নিশ্চিন্তপুর গ্রাম থেকে মাতমের হরিবোল ধ্বনি ভেসে আসছে। মন নেচে উঠছে ওদের।
বিষ্ণুচরণ শেষ কথা বলে―চান্দার বিল আমাদের মতো লোকদের ইতিহাস লিখে রাখে।
একটু থেমে বলে―কিন্তু কাগজে না, জলের ভেতরে।
ভোরের আলো পুরো ছড়িয়ে পড়ে। শূকরপালকেরা হাঁটা শুরু করে―নতুন দিনের দিকে, পুরোনো ইতিহাস বয়ে নিয়ে।
চান্দার বিল পেছনে পড়ে থাকে। জল নড়ে। কথা বলে না―কিন্তু সব মনে রাখে।
৬
শূকরগুলোকে হাঁটিয়ে নিতে নিতে তারা বিলের উত্তর পাড়ে ওঠে। সেখান থেকে দূরে দূরে কয়েকটা গ্রাম চোখে পড়ে―কখনও গাছের ফাঁক দিয়ে, কখনও ধোঁয়ার রেখায়। নিশ্চিন্তপুর পার হয়ে মোহন হঠাৎ বলে―ওই যে বাঁশঝাড়টার ওপারে, ওটাই গোয়ালগ্রাম।
ভৈরব তাকায়।―হ্যাঁ, গোয়ালগ্রাম।
সে হেসে বলে,―নামটা যত শান্ত, লোকজন ততটা না।
বিষ্ণুচরণ বলে―আগে নাকি গরুর খামার ছিল ওখানে। গোয়াল মানে গরু।
একটু থেমে যোগ করে,―এখন শুধু নামটাই আছে, গরু নেই, খামার নেই―মানুষও যেন কমে গেছে।
মোহন বলে―আমরা যখন বিলের ধারে রাত কাটাই, ওখানকার লোকেরা আলো নিভিয়ে দেয়। সে গলা নামিয়ে বলে―ভয় পায়।
ভৈরব তেতো হাসে।―ভয় পায় আমাদের নয়, আমাদের পরিচয়ের।
বিষ্ণুচরণ আঙুল তুলে পেছনের দিকে দেখায়।―ওই দিকটা উজানী।
উজানী ?
মোহন বলে,―ওখানকার লোকজন আবার আলাদা। নিজেদের বড় মনে করে।
ভৈরব বলে―উজানীর মাঠে আমরা ঢুকতে পারি না। সে স্মৃতি টানে। একবার শূকর ঢুকে পড়েছিল। এমন মার খেলাম, আজও গা কেঁপে ওঠে।
বিষ্ণুচরণ ধীরে বলে,
উজানী গ্রামের লোকেরা বলে, তারা নাকি ধর্ম রায়ের বাড়ির লোক।
এই নামটা উঠতেই তিনজন একটু থামে।
মোহন বলে―ধর্মরায়ের বাড়ি…
সে চারপাশে তাকায়।―ওটাই তো এই অঞ্চলের আসল শক্তি। ধর্ম ঠাকুরের নামেই ধর্ম রায়!
ভৈরব গলা শক্ত করে বলে―জমি, জল, মানুষ―সব ওদের কথায় চলে।
হাটে জায়গা দেয়, আবার কে বসবে না সেটাও ঠিক করে, মোহন যোগ করে।
বিষ্ণুচরণ বলে―আমার বাবা বলত, ধর্মরায় একসময় দেবতা ছিল, এখন জমিদার।
সে হেসে বলে,―দেবতা বদলায়, ভয় বদলায় না।
মোহন বলে―ধর্মরায়ের বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে আমার বউ একবার মাথা ঢেকে ফেলেছিল।
কেন ?
বইলেছিল, চোখ পইড়লে বিপদ।
ভৈরব দীর্ঘশ্বাস ফেলে।―এই গ্রামগুলো আমাদের চারপাশে আছে, কিন্তু আমাদের নয়।
সে মাটির দিকে তাকিয়ে বলে,―আমরা বিলের মানুষ। গ্রাম আমাদের নেয় না।
বিষ্ণুচরণ শেষ কথা বলে―তবু এই গ্রামগুলোর গল্প আমাদের শরীরেই লেখা। সে কাদায় পা ডোবায়।
গোয়ালগ্রামের ভয়, উজানীর দাপট, ধর্ম রায়ের ছায়া―সব আমরা বয়ে বেড়াই।
সূর্য তখন পুরো উঠেছে। গ্রামগুলো জেগে উঠছে―ধোঁয়া, হাঁকডাক, গরুর ঘণ্টা। আর শূকরপালকেরা আবার বিলের কিনারা ধরে এগিয়ে যায়― গ্রামের পাশে থেকেও গ্রামের বাইরে।
চান্দার বিল পেছনে পড়ে থাকে, গ্রামগুলো সামনে―কিন্তু মাঝখানে থেকে যায় এক দীর্ঘ, কাদামাখা দূরত্ব।
৭
শূকর চরানো মানে শুধু সামনে হাঁটা না। এটা একটা পূর্ণ দিনের শ্রম, যেখানে শরীর আগে ক্লান্ত হয়, পরে মন। ভোরের আলো ফোটার আগেই ভৈরব, মোহন আর বিষ্ণুচরণ উঠে পড়ে। শীত হোক বা গ্রীষ্ম―ঘুম ভাঙে অভ্যাসে। শূকরগুলো তখনও আধো-ঘুমে, কিন্তু মানুষদের মতো নয়―ওদের শরীর জানে কখন চলতে হবে।
প্রথম কাজ শূকর গোনা। তিন দলে ভাগ করে গোনা হয়―বড়গুলো একদিকে, মাঝারি একদিকে, আর বাচ্চারা মায়েদের সঙ্গে। সংখ্যায় ভুল হলে বিপদ। একটা শূকর হারালে শুধু টাকার ক্ষতি না―গ্রামের মানুষ অভিযোগ তোলে, মারধরও হতে পারে। তাই বিষ্ণুচরণ সবসময় মুখে মুখে গুনে নেয়―এক, দুই, তিন―দুশ’ পার হলে তবেই শান্তি।
তারপর শুরু হয় হাঁটানো। লাঠি হাতে ভৈরব সামনে থাকে। সে জানে কোন শূকর কেমন―কোনটা হঠাৎ দৌড় দেয়, কোনটা কাদায় বসে পড়ে নড়তে চায় না। লাঠি দিয়ে মার দেওয়া হয় না; মাটিতে ঠুকরে শব্দ করা হয়। শব্দেই শূকর বোঝে―এদিক নয়, ওদিক।
মোহনের কাজ বাচ্চাগুলো সামলানো। বাচ্চা শূকর দুষ্টু, হঠাৎ জঙ্গলে ঢুকে পড়ে, আবার পেছনে পড়ে কান্না জুড়ে দেয়। মোহন কণ্ঠ বদলে ডাক দেয়―একটা বিশেষ সুরে। সেই ডাক শুনে বাচ্চাগুলো থমকে যায়। এই ডাক সে শিখেছে তার বাবার কাছ থেকে―কোনও বইয়ে নেই।
বিষ্ণুচরণ পেছনে থাকে। পিছিয়ে পড়া, অসুস্থ, খোঁড়া শূকরগুলো সে দেখে। কার পেটে সমস্যা, কার পায়ে কাঁটা ঢুকেছে―সব সে বুঝে ফেলে হাঁটার ভঙ্গিতে। কখনও কাদায় বসিয়ে পা ধুয়ে নেয়, কখনও দাঁত দিয়ে কামড়ালে মুখে ছাই মাখিয়ে দেয়। ওষুধ নেই―আছে অভিজ্ঞতা।
শূকর চরানোর জায়গা বাছাইও একটা কাজ। সব জমিতে ঢোকা যায় না। কোথাও ধান, কোথাও পাট, কোথাও গ্রামের নিষেধ। বিলের ধারে, পতিত জমিতে, কচুরিপানা আর আগাছার ভেতরেই মূলত চরানো হয়। শূকরেরা কাদা খোঁড়ে, শিকড় খায়, পোকা ধরে। ওদের এই খোঁড়াখুঁড়িই মানুষদের চোখে অপরাধ।
দুপুরের দিকে সবচেয়ে কষ্ট। রোদ মাথার ওপর। শূকরদের শরীর গরম হয়ে যায়। তখন তাদের জল লাগবে। বিল বা খালে নামানো হয়। কিন্তু সবাই একসঙ্গে নামলে বিশৃঙ্খলা হয়। ভৈরব আগে বড়গুলো নামায়, মোহন বাচ্চাদের ধরে ধরে নামায়। বিষ্ণুচরণ খেয়াল রাখে―কোনওটা যেন ডুবে না যায়।
এই সময় মানুষদের নিজের খাওয়ার সময়। শুকনো ভাত, লবণ, কখনও কাঁচামরিচ। কোনও কোনও দিন কেবল পানিতে ভিজানো ভাত। বসে খাওয়ার সুযোগ নেই। দাঁড়িয়েই খেতে হয়। চোখ সবসময় শূকরদের ওপর। খাওয়ার মাঝখানে যদি কোনও শূকর জমির দিকে ঢুকে পড়ে, সব ছেড়ে দৌড়।
শূকর চরানোর আরেকটা বড় কাজ পাহারা। গ্রাম থেকে লোক আসে। কেউ গালি দেয়, কেউ লাঠি দেখায়। বলে―‘এখানে ঢুকছিস কেন ?’ তখন ভৈরব কথা বলে। নম্র হয়ে, মাথা নিচু করে। প্রতিবাদ করলে বিপদ বাড়ে। কখনও কখনও টাকা দিতে হয়―চুপ করানোর জন্য।
বিকেলের দিকে শূকরগুলো ক্লান্ত হয়। তখন আবার গোনা। কেউ নেই তো ? কেউ আহত তো না ? একবার মোহনের একটা শূকর উজানীর দিকে ঢুকে পড়েছিল। সারা বিকেল লেগে গিয়েছিল খুঁজতে। শেষে পাওয়া গিয়েছিল―পা ভাঙা অবস্থায়। সেই শূকর বাঁচেনি। সেই রাত মোহন কথা বলেনি।
রাতে শিবির বাঁধা হয়। পুকুরপাড়, বিলের ধারে উঁচু জায়গা। আগে জায়গা পরিষ্কার―কাঁটা, কাচ, সাপ আছে কি না দেখা। তারপর শূকরগুলোকে গোল করে বসানো হয়। মাঝখানে মানুষ। এই গোলই নিরাপত্তা। বাইরে থেকে কুকুর বা শেয়াল এলে আগে শূকর ডাক দেয়।
রাতে আবার কাজ শেষ হয় না। কোনও শূকর অসুস্থ হলে, বাচ্চা হারালে মা চিৎকার করে। তখন মোহন উঠে খুঁজে আনে। কখনও শূকর প্রসব করে। বিষ্ণুচরণ তখন ধাত্রী। নিজের হাতেই বাচ্চা টেনে বের করে, নাড়ি কামড়ে কাটে মা শূকর।
ঘুম আসে টুকরো টুকরো। আধচোখে। কারণ ভয় থাকে―চুরি, হামলা, আগুন। তবু এই ঘুমেই স্বপ্ন আসে। কেউ দেখে ঘর, কেউ দেখে বউ, কেউ দেখে এমন এক দিন―যেদিন শূকর চরাতে হবে না।
শূকর চরানো তাই শুধু পেশা না। এটা এক ধরনের জীবনযাপন―যেখানে মানুষ নিজেকে আড়াল করে রাখে, শূকরদের সামনে রেখে। মানুষ দেখে শূকর, দেখে না শূকরপালককে। কিন্তু এই মানুষগুলোর দিন যায় শূকর গুনে, রাত যায় দুঃখ গুনে।
চান্দার বিল জানে এই সব কাজ। কারণ প্রতিদিন এই মানুষগুলো নিজেদের জীবন বিলের কাদার সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
খুব সুন্দর হয়েছে। তুমুল বৃষ্টির দিনে ওরা কীভাবে সামলায় ? তার বিবরণ চাই।
ধন্যবাদ। আগের অংশের ধারাবাহিকতা রেখে, কায়পুত্র-এর ভাষা ও ছন্দ বজায় রেখে নিচে তুমুল বৃষ্টির দিনের বিবরণ দিচ্ছি―যেখানে প্রকৃতি, শ্রম, ভয় আর সহনশীলতা একসঙ্গে ধরা থাকবে।
৮
তুমুল বৃষ্টি নামলে চান্দার বিল আর আলাদা থাকে না―আকাশ, জল আর মাটি এক হয়ে যায়। বৃষ্টি তখন শুধু পড়ছে না, আছড়ে পড়ছে। কাদার গন্ধ ভারী হয়ে উঠে আসে, জল ছুটে আসে চারদিক থেকে। শূকরদের শরীর ভিজে চকচক করে, আর মানুষের কাপড় গায়ে লেপটে থাকে ক্ষতচিহ্নের মতো।
এই দিনগুলোই সবচেয়ে ভয়ংকর।
ভৈরব প্রথমেই আকাশের দিকে তাকায়। মেঘের রং দেখে সে বোঝে―এই বৃষ্টি ক্ষণিকের নয়। তখন আর হাঁটানো নয়, বাঁচানোই কাজ। শূকরগুলোকে সে জোর করে সামনে ঠেলে না; বরং এক জায়গায় জড়ো করে। লাঠির শব্দ বদলে যায়―এখন আর তাড়ানোর নয়, ডাকার শব্দ।
মোহন বাচ্চাগুলোকে ধরে। বৃষ্টিতে বাচ্চা শূকর দিশেহারা হয়। ঠান্ডায় কাঁপে, কাদায় পিছলে পড়ে। মোহন নিজের গামছা খুলে দু-তিনটাকে জড়িয়ে রাখে। নিজের শরীর ভিজে কাঁপলেও ওদের ছাড়ে না। কারণ সে জানে―একটা বাচ্চা মরলে শুধু শূকরটা না, সংসারের একটা ভাত কমে যায়।
বিষ্ণুচরণ তখন জমি খোঁজে―উঁচু জমি। বিলে উঁচু জায়গা মানেই আশ্রয়। কিন্তু বৃষ্টিতে সেই উঁচুও ডুবে যেতে পারে। সে পা ডুবিয়ে ডুবিয়ে দেখে―কোথায় জল থামে। সাপের ভয় থাকে। তাই লাঠি দিয়ে আগে মাটি ঠুকে নেয়। সাপ বেরোলে মানুষ আর শূকর―দুজনেরই বিপদ।
বৃষ্টি যত বাড়ে, শব্দ তত মুছে যায়। মানুষ মানুষের কথা শুনতে পায় না। তখন ইশারা চলে। হাত নেড়ে, চোখে চোখ রেখে। শূকরগুলো ভয় পেলে গোল ভেঙে ছুটতে চায়। তখন ভৈরব সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে থাকে―নিজেই এক ধরনের দেয়াল হয়ে।
বৃষ্টির মধ্যে খাবার নেই। শূকরেরা তখন যা পায় তাই খায়―ভেসে আসা শিকড়, কাদা, পচা পাতা। মানুষদের ভাগ্যে জোটে না কিছুই। ভেজা ভাত বের করলেও খাওয়া যায় না। দাঁত ঠকঠক করে। ঠান্ডা শরীরের ভেতর ঢুকে পড়ে।
সবচেয়ে ভয় রাতে।
বৃষ্টি নামলে রাত আর দিন আলাদা থাকে না। চারপাশ কালো। আগুন জ্বলে না। তখন শূকরদের গোলটাই ভরসা। মানুষরা শূকরদের গায়ে গা লাগিয়ে বসে। শূকরের শরীরের উষ্ণতা বাঁচায়। মানুষ তখন মানুষ থাকে না―পালেরই একটা অংশ হয়ে যায়।
বৃষ্টি নামলে রোগ আসে। কানে পচন, পেটে গ্যাস, জ্বর। বিষ্ণুচরণ তখন একমাত্র ভরসা। সে গাছের ছাল, কচুপাতা, ছাই―যা আছে তাই দিয়ে চিকিৎসা করে। কোনও শূকর মরলে বৃষ্টি থামে না, কিন্তু মন থেমে যায়।
কখনও কখনও বজ্র পড়ে। বিল কেঁপে ওঠে। শূকর ছুটে পালাতে চায়। মানুষ তখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে―ডাকার জন্য না, ভয় ঢাকতে। বজ্রের আলোয় মুহূর্তের জন্য সব দেখা যায়―জলে ডোবা বিল, কাদায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, গোল হয়ে কাঁপতে থাকা শূকর।
এই বৃষ্টির দিনেই বাড়ির কথা বেশি মনে পড়ে।
মোহনের মনে পড়ে―তার বউ এখন কী করছে ? চালের হাঁড়ি কি ভিজছে ? ছেলেটা ভয় পাচ্ছে কি না ? ভৈরব ভাবে―তার মেয়েটা কি স্কুলে যেতে পেরেছে ?
বিষ্ণুচরণ ভাবে―যে ঘরটা ছেড়ে এসেছিল, সেটা আদৌ ঘর ছিল কি না।
বৃষ্টি থামে হঠাৎ করে না। ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে থামে। তখন চারপাশে শুধু জল আর জল। শূকরগুলো কাদায় বসে হাঁপায়। মানুষদের শরীর ভেঙে পড়ে, কিন্তু কাজ শেষ হয় না। আবার গোনা, আবার দেখা―কেউ হারালো কি না।
ভৈরব তখন বলে―আজ বাঁচলাম।
এই ‘বাঁচা’ মানে শুধু প্রাণ নয়―পাল, সংসার, আগামী দিনের এক মুঠো ভাত।
চান্দার বিল এই সব বৃষ্টি দেখেছে বহু বছর ধরে। কত শূকর, কত মানুষ ভিজেছে, টিকে থেকেছে। বৃষ্টি সব ধুয়ে নেয়―কিন্তু এই মানুষগুলোর জীবন ধুতে পারে না।
৯
চান্দার বিলের কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি, যখন এক ভোরে ভৈরব মোহন আর বিষ্ণুচরণকে রেখে বাড়ির পথ ধরল। শূকরপাল দু’ দনের জন্য তাদের হাতেই তুলে দিল। ভৈরব জানত―বিলের মাঝখানে পড়ে থাকা মানুষের জীবনেও কখনও কখনও গ্রামের টান জাগে, মাটির ডাকে পা নিজে থেকেই ঘুরে যায়। পায়ের নিচে তখনও কাদার স্মৃতি, শরীরে বিলের গন্ধ; তবু সে হাঁটল মনিরামপুরের দিকে, যেন অন্য এক সুর তাকে টেনে নিচ্ছে।
গ্রামে ঢুকতেই সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে এল ঢোলের ডাক। একটু এগোতেই বোঝা গেল―কবিগানের আসর বসেছে। খোলা মাঠের এক কোণে হ্যাজাকের আলো, চারদিকে মানুষের গোল ঘেরা। ভৈরব প্রথমে দূরে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর অজান্তেই ভিড়ের ভেতরে ঢুকে পড়ল। চান্দার বিলের স্তব্ধ রাতের পর এই গান, এই ছন্দ, এই মানুষের কণ্ঠ―সবকিছু তার ভেতর নতুন করে নড়া দিল।
আসরের এক পাশে বসেছেন কবিয়াল অখিলবন্ধু সরকার। সাদা ধুতি, কাঁধে উত্তরীয়; চোখে স্থিরতা। তিনি নিয়েছেন রামের চরিত্র। ঢোলের প্রথম তাল পড়তেই তাঁর কণ্ঠে উঠল ছন্দ :
‘বনবাসী রাম আমি,
ন্যায়ের পথে চলি,
সিংহাসন ছাড়ি তবু
ধর্ম ছাড়ি না বলি।’
মাঠে হালকা গুঞ্জন। ভৈরব টের পেল, শব্দগুলো সরাসরি বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। রামের হাঁটা যেন তার নিজের হাঁটার মতো―খাল পেরোনো, নদী পেরোনো, মাঠ আর বিল ডিঙোনো।
তারপর ঢোলের পালটা তালে উঠে দাঁড়ালেন কবিয়াল বিন্দুপ্রসাদ সরকার। চোখে দীপ্তি, কণ্ঠে আগুন। তিনি নিলেন রাবণের পক্ষ :
‘আমি দশানন,
বিদ্যায় বলেই মহান,
অন্যায় কি সব সময় ?
প্রশ্ন রাখে রাবণ!’
হাসি আর হাততালি ছড়িয়ে পড়ল ভিড়ে। গান আর গানে শুরু হলো কবির লড়াই। অখিলবন্ধু ছন্দে ছন্দে তুললেন ন্যায়ের প্রশ্ন, বিন্দুপ্রসাদ গানে গানে ছুড়ে দিলেন যুক্তির বাণ :
‘রাজা মানে কি শুধু
শক্তিরই জয় ?
ধর্মহীন ক্ষমতায়
ধ্বংস সুনিশ্চয়’
রাবণের কণ্ঠে জবাব এল―
‘ধর্ম কে লিখেছে,
কার কলমে নিয়ম ?
জয়ী সেই, যে পারে ভাঙতে
পুরোনো ভ্রম!’
গানে-গানে, ছন্দে-ছন্দে রাম আর রাবণের যুদ্ধ জমে উঠল। ঢোলের তালে তালে শব্দগুলো আকাশে উঠে আবার মানুষের বুকে নেমে আসছিল। ভৈরব দাঁড়িয়ে রইল নিঃশ্বাস আটকে। তার মনে হলো―এই লড়াই শুধু পুরাণের নয়; এ লড়াই তার নিজেরও। ঘর আর পথ, থামা আর চলা, ন্যায় আর পেটের দায়―সব একসঙ্গে গানে গানে ধাক্কা খাচ্ছে।
রাত গড়িয়ে ভোর এল। কুয়াশা নেমে এল মাঠে, ঢোলের তালে তালে শেষ হলো কবির লড়াই। ভৈরব ধীরে ভিড়ের বাইরে এল। মনে হলো, এই গানের ছন্দ সে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে চান্দার বিলে―মোহন আর বিষ্ণুচরণের কাছে। গানে-গানে যে রাম-রাবণের যুদ্ধ সে শুনে এল, তা তার ভেতরে তখনও চলতে থাকল―ঠিক কায়পুত্রের জীবনের মতোই।
১০
ভোরে ভৈরব বাড়িতে গেল। স্ত্রী মালতী খুশি হয়, সময়ের আগেই বাড়িতে এসে দেখা দিতে। ছেলে রবিও খুশি হয়। বিকেলেই সে আবার রওয়ানা দেবে চান্দার বিলের দিকে।
ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটেনি তখনও, যখন ভৈরব বাড়ির উঠোনে পা রাখল। রাতের কবিগানের ছন্দ এখনও কানে বাজছে, ঢোলের তালে তালে ঘুম ভাঙা শরীর ক্লান্ত―তবু বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হালকা ভাব। দরজার শব্দ পেয়ে মালতী বাইরে এসে দাঁড়াল। এক ঝলক তাকিয়েই সে থমকে গেল; সময়ের আগেই ভৈরবকে দেখে চোখে বিস্ময়, তারপর আনন্দ।
‘এত ভোরে ?’―কথাটা বলার আগেই মালতীর মুখে হাসি ফুটে উঠল। ভৈরব কিছু বলল না। শুধু জলের ঘড়ায় হাত ধুয়ে উঠোনের মাটিতে বসে পড়ল। মালতী বুঝে নিল―এই আসা হঠাৎ, কিন্তু প্রয়োজনের। সে ভেতরে গিয়ে হাঁড়ি চাপাল, পাটিতে ভাতের গন্ধ উঠল।
রবি তখন ঘুম থেকে উঠছে। বাবাকে দেখে ছুটে এল উঠোনে। ‘বাবা!’―ডাকের সঙ্গে সঙ্গে ভৈরব তাকে কোলে তুলে নিল। ছেলের শরীরের উষ্ণতায় চান্দার বিলের কুয়াশা যেন এক মুহূর্তে ঝরে পড়ল। রবি বাবার গলায় মুখ গুঁজে রইল, আর ভৈরব টের পেল―এই ছোট্ট শরীরটাই তার সব হাঁটার মানে।
সকালের ভাত খেতে খেতে মালতী জিজ্ঞেস করল, ‘সব ঠিক আছে তো ?’
ভৈরব মাথা নেড়ে বলল, ‘আছে। মোহন আর বিষ্ণুচরণ বিলেই আছে।’ আর কিছু বলার দরকার পড়ল না। তাদের জীবনে কথার চেয়ে বোঝাপড়া বেশি।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠোনে রোদ পড়ল। মালতী ভৈরবের গামছা শুকোতে দিল, রবি পাশে বসে বাবার লাঠিটা নাড়াচাড়া করল। সময় যেন একটু থেমে ছিল―কিন্তু থামা যে তাদের জন্য নয়, সেটা সবাই জানে।
বিকেলের দিকে ভৈরব আবার বাঁশের লাঠি কাঁধে তুলল। মালতী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, চোখে উৎকণ্ঠা নয়―অভ্যস্ত অপেক্ষা। রবি বাবার হাত ধরে একটু দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিল। ভৈরব পেছন ফিরে তাকাল একবার―উঠোন, ঘর, মানুষ―সব মনে গেঁথে নিল।
তারপর সে রওয়ানা দিল আবার চান্দার বিলের দিকে। খাল, নদী, মাঠ পেরোনোর ডাক তাকে টানছে। জানে, মোহন আর বিষ্ণুচরণ অপেক্ষা করছে; শূকরপাল ছড়িয়ে আছে বিলের বুকে। আর তার ভেতরে তখনও ভেসে আসছে গানে-গানে শোনা সেই রামরাবণের ছন্দ―যেন পথের সঙ্গেই মিশে গেছে।
ভৈরবের মনটা বারবার উঠোনের দিকে ফিরে যাচ্ছিল। আর কিছুক্ষণ থাকলে ক্ষতি কী―এই ভাবনাটা তাকে ছাড়ছিল না। রোদটা যখন নরম হয়ে এসেছে, মালতী যখন চাল ধুয়ে উঠোনে বসেছে, রবি যখন মাটিতে দাগ কেটে খেলছে―তখন মনে হচ্ছিল, হাঁটার ডাকটা আজ একটু দেরিতে এলেও চলে। চান্দার বিল তো কালও থাকবে, মোহন আর বিষ্ণুচরণ সামলে নেবে―এইসব ভেবে বুকের ভেতর হালকা টান ধরছিল।
কিন্তু ভৈরব জানে, তার ইচ্ছে মানেই সময় থেমে যাওয়া নয়। তাই বিকেলের দিকে সে হাটের দিকে পা বাড়াল। খুব বেশি কিছু নয়―কিছু কাঁচা বাজার। কচু শাক, পুঁই শাক, দুটা বেগুন, এক মুঠো কাঁচা মরিচ। মাছ বা মাংস নয়―বিলের মানুষের ঘরে আজ সেটুকুই যথেষ্ট। বাজারের থলি হাতে ফিরতে ফিরতে তার মনে হলো, এটাই তার থাকা আর যাওয়ার মাঝখানের সান্ত্বনা।
মালতী থলিটা খুলে দেখল। মুখে কিছু বলল না, কিন্তু চোখে যে খুশি জমে উঠল, ভৈরব তা দেখল। রবি থলির ভেতর উঁকি দিয়ে বেগুন হাতে নিয়ে হাসল। ওই হাসিটুকুই ভৈরবের বুক ভরে দিল।
আর কিছুক্ষণ থাকবার ইচ্ছে তখনও রয়ে গেল। তবু সে বাঁশের লাঠিটা তুলে নিল। বাজারের থলি নামিয়ে রেখে, দরজার চৌকাঠে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর পেছনে না তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল। চান্দার বিলের দিক থেকে হাওয়া আসছে―কাদার গন্ধ মেশানো। ভৈরব বুঝল, আজ না পারলেও, এই বাজারের থলিটাই তার ঘরে থাকার চিহ্ন হয়ে থাকবে।
ভৈরব না-থাকার দিনটা মোহন আর বিষ্ণুচরণের কাছে শুরু হয়েছিল একটু আলাদা করে। ভোরের কুয়াশা তখনও চান্দার বিলের বুক ছেড়ে ওঠেনি। শূকরপাল আপনমনে কাদা খুঁড়ছিল, নাকে মাটি গুঁজে খাবারের খোঁজে। আগুনটা নিভে আসছিল ধীরে ধীরে। ভৈরবের অভাবটা তারা প্রথম টের পেল কথা কমে যাওয়ায়―কেউ সামনে হাঁটছে না, কেউ পথের দিকে তাকিয়ে হিসাব কষছে না।
মোহনই প্রথম নীরবতা ভাঙল। ‘আজ একটু গান ধরি ?’― বলেই সে গলা খাঁকারি দিল। বিষ্ণুচরণ হাসল। ‘ভৈরব থাকলে এখনই বকুনি দিত―কাজ ফেলে গান!’
তবু গান উঠল। বিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মোহন গাইতে শুরু করল পুরোনো ভাটিয়ালি―খাল-নদী-চরের গান। তার কণ্ঠে ঢেউয়ের মতো ওঠানামা, বিষ্ণুচরণ তাল ধরল হাততালি দিয়ে। গানটা শূকরগুলোকেও যেন শান্ত করল; তারা একটু দূরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
বেলা বাড়তেই দুজন মিলে শূকরপাল নিয়ে মাঠের দিকে গেল। কাদা নরম, রোদ ঝিলমিল। বিষ্ণুচরণ হঠাৎ লাফিয়ে উঠল―এক পা তুলে কাদার ওপর ঘুরে দাঁড়াল। ‘দ্যাখ, বিলের নাচ!’ বলে সে আবার ঘুরল। মোহন হেসে উঠল, তারপর সেও যোগ দিল। দুজনের পা কাদায় দেবে যাচ্ছে, ছিটকে উঠছে জল। নাচটা কোনও নিয়মে বাঁধা নয়―কখনও লোকনাচের ভঙ্গি, কখনও নিছক লাফালাফি। বিলের মাঠে তখন মানুষের হাসি আর নাচের শব্দ, সঙ্গে দূরের পাখির ডাক।
দুপুরে তারা শুকনো রুটি ভিজিয়ে খেল। ভৈরব থাকলে যে হিসেবি ভাগটা হতো, আজ সেটা ঢিলেঢালা। বিষ্ণুচরণ বলল, ‘বাড়িতে গেলে ভৈরব নিশ্চয় কবিগান দেখে এসেছে।’ মোহন মাথা নেড়ে বলল, ‘হ, এখন নিশ্চয় গান তার মাথার ভেতরই ঘুরছে।’
বিকেলের দিকে আবার গান। এবার বিষ্ণুচরণ ধরল কীর্তনের সুর―রাধাকৃষ্ণের নাম, নদীর পাড়ের ভাষা। মোহন তাল মিলিয়ে গাইল। বিলের বাতাসে সেই গান ভেসে ভেসে দূরে ছড়িয়ে পড়ল। যেন চান্দার বিল নিজেই শুনছে, জমা করে রাখছে সুর।
সন্ধ্যার সময় দু’জন আবার আগুন জ্বালাল। নাচ-গান শেষে শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন হালকা। বিষ্ণুচরণ বলল, ‘ভৈরব থাকলে আজ আমাদের দেখে বলত―বিলটা মেলাই বানিয়ে ফেলেছিস।’ মোহন হাসল। ‘তাই তো, ও ফিরলে সব শুনবে।’
রাত নামল। শূকরপাল বৃত্ত করে শুয়ে পড়ল। আগুনের আলোয় মোহন আর বিষ্ণুচরণ চুপচাপ বসে রইল। গান আর নাচে দিনটা কেটে গেল―কাজের ফাঁকে ফাঁকে, ভৈরবের অনুপস্থিতির ফাঁকটা ভরাট করার মতো করে। তারা জানত, এই বিলেই কাল আবার ভৈরব ফিরবে। আর আজকের এই গান-নাচের গল্প তখন তাকে শোনানো হবে―হাসির সঙ্গে, কাদামাখা পায়ের স্মৃতিসহ।
১১
ভৈরবের না-থাকার রাতে আগুনটা একটু বেশিই জ্বালানো হয়েছিল। চান্দার বিলের হাওয়া তখন ঠান্ডা, কুয়াশা নামছে ধীরে। শূকরপাল বৃত্ত করে শুয়ে আছে; দূরে জলের মধ্যে ব্যাঙ ডাকছে। মোহন আগুনে কাঠ ঠেসে দিতে দিতে বলল, ‘বিষ্ণু, একটা গল্প ধর না। আজ রাতটা লম্বা।’
বিষ্ণুচরণ হাসল। সে ভালো গল্প বলতে পারে―রূপকথা, ঠাকুরমার ঝুলির গল্প। কণ্ঠটা একটু বদলে নেয় সে, যেন সত্যিই কোনও এক পুরোনো উঠোনে বসে শোনাচ্ছে। আগুনের আলোয় তার মুখটা আধখানা ছায়ায় ডুবে গেল।
‘শোন,’ বলে সে শুরু করল, ‘অনেক দিনের কথা। এক রাজা ছিল, যার রাজ্য ছিল জল আর কাদার মাঝখানে। সেই রাজ্যে মানুষ হাঁটত পায়ের জোরে, আর ভাগ্য হাঁটত তাদের পেছনে পেছনে।’
মোহন চুপ করে গেল। বিলের রাতও যেন একটু নড়ে উঠল।
‘রাজ্যের এক প্রান্তে থাকত এক রাখাল ছেলে,’ বিষ্ণুচরণ বলল, ‘সে শূকর চরাত। সবাই তাকে ডাকত কায়পুত্র। সে জানত―খাল কখনও রাগ করে, নদী কখনও কথা বলে, আর বিল রাতে স্বপ্ন দেখে।’
মোহন হেসে উঠল, ‘এ তো আমাদেরই কথা!’
বিষ্ণুচরণ হাত তুলে থামাল। ‘গল্পে সবই আলাদা। সেই কায়পুত্র একদিন শুনল―বিলের মাঝখানে আছে এক অদ্ভুত আলো। যে আলো দেখবে, সে নিজের মন চিনতে পারবে। কিন্তু সেই আলো দেখতে গেলে ঘর ছাড়তে হয়, আবার ফিরেও আসতে হয়।’
আগুনের শিখা নড়ে উঠল। কুয়াশার ভেতর আলোটা যেন সত্যিই ভাসতে লাগল।
‘ছেলেটা হাঁটল,’ বিষ্ণুচরণ বলল, ‘খাল পেরোল, নদী পেরোল, মাঠ পেরোল। পথে সে গান শুনল―কখনও রামের, কখনও রাবণের। বুঝল, লড়াই শুধু বাইরে নয়, ভেতরেও।’
মোহন মাথা নেড়ে শুনছে। শূকরগুলোর শ্বাসের শব্দ তাল দিচ্ছে।
‘শেষে সে আলো দেখল,’ বিষ্ণুচরণ ধীরে বলল, ‘আলোটা কোনও সোনা নয়, কোনও রাজ্য নয়―আলোটা ছিল তার ঘর। মা, স্ত্রী, সন্তান। সে বুঝল, হাঁটা থামাতে নেই, আবার ঘর ভুলতেও নেই।’
গল্প থামল। আগুনে কাঠ পুড়ে খসখস শব্দ করল। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
মোহন শেষে বলল, ‘ভৈরব থাকলে বলত―তুই গল্পে বেশি সত্য ঢুকাস।’ বিষ্ণুচরণ হেসে উঠল, ‘ঠাকুরমার ঝুলির গল্পে সত্য না থাকলে ঝুলিটাই ফাঁকা থাকে।’
চান্দার বিলের সেই রাতে রূপকথাটা আগুনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বলতে থাকল। আর মোহন জানল―ভৈরব ফিরে এলে এই গল্পটাই আগে শোনাবে।
১২
ভৈরব ফিরে আসার রাতে চান্দার বিলের আকাশটা ছিল পরিষ্কার। কুয়াশা একটু দূরে সরে গিয়েছিল, চাঁদের আলো জলে পড়ে কাঁপছিল। আগুন জ্বলছিল আগের রাতের মতোই, শুধু মানুষটা বদলে গেছে―আজ সামনে বসে আছে ভৈরব। সারা দিন হাঁটার ক্লান্তি তার চোখে, কিন্তু মনে একরাশ শোনার আগ্রহ।
মোহন বলল, ‘কাল রাতে বিষ্ণু একটা গল্প ধইরেছিল। তোকে শোনাইতে হইবে।’
ভৈরব হালকা হেসে বলল, ‘আচ্ছা, শোনাও। বিলের গল্প তো বিলেই ভালো শোনায়।’
বিষ্ণুচরণ একটু গলা খাঁকারি দিল। ভৈরব সামনে থাকলে সে গল্পটা আরও যত্ন করে বলে―এটা দুজনেই জানে। আগুনের আলোয় তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘শোন ভৈরব,’ বিষ্ণুচরণ শুরু করল, ‘এ গল্প কোনও রাজার নয়, কোনও রাজপ্রাসাদেরও নয়। এটা কাদার রাজ্যের গল্প―যেখানে খাল-নদীই রাস্তা, আর হাঁটাই মানুষের কাজ।’
ভৈরব স্থির হয়ে বসে পড়ল।
‘সেই রাজ্যে এক কায়পুত্র থাকত,’ বিষ্ণুচরণ বলল, ‘তার ঘর ছিল এক জায়গায়, আর জীবন আরেক জায়গায়। সে শূকর চরাত, বিলের ঘাস চিনত, কাদার ভাষা বুঝত। দিনে দিনে সে বুঝে ফেলেছিল―সব মাটিই এক রকম নয়, সব জলও কথা বলে না।’
আগুনে কাঠ ফাটল। ভৈরবের চোখে চান্দার বিলের ছবি ভেসে উঠল।
‘একদিন কায়পুত্র শুনল,’ বিষ্ণুচরণ বলল, ‘বিলের একেবারে মাঝখানে আছে ‘মন-দীপ’। সে দীপ দেখা যায় না চোখে―দেখা যায় বুক দিয়ে। যে সেই দীপ দেখবে, সে বুঝবে কেন সে হাঁটে, আর কোথায় তাকে ফিরতে হয়।’
মোহন নিঃশব্দে আগুনে কাঠ ঠেসে দিল।
‘কায়পুত্র হাঁটল,’ বিষ্ণুচরণ বলল, ‘খাল পেরোল―যেখানে পা পিছলায়। নদী পেরোল―যেখানে ভরসা লাগে। মাঠ পেরোল―যেখানে রোদ সহ্য করতে হয়। আর বিল পেরোল―যেখানে মানুষ একা হয়। পথে সে গান শুনল―রামের গান, ন্যায়ের গান। আবার শুনল রাবণের গান―শক্তির গান, প্রশ্নের গান। সে বুঝল, দুই গানই সত্য, যদি মানুষ নিজের জায়গাটা ভুলে না যায়।’
ভৈরব নিঃশ্বাস ছাড়ল ধীরে। কবিগানের রাতটা তার মনে পড়ে গেল।
‘শেষে সে মন-দীপ দেখল,’ বিষ্ণুচরণ গলা নামিয়ে বলল। ‘দীপটা ছিল না সোনা, না রত্ন। দীপটা ছিল এক উঠোন, এক হাঁড়ি ভাত, এক নারীর অপেক্ষা আর এক শিশুর ডাক। কায়পুত্র বুঝল―এই দীপ না থাকলে তার হাঁটার কোনও মানে নেই।’
আগুনের আলোয় ভৈরবের মুখটা নরম হয়ে এল।
‘তবু,’ বিষ্ণুচরণ যোগ করল, ‘সে কায়পুত্র হাঁটা ছাড়ল না। সে জানত, দীপ বাঁচিয়ে রাখতে হলে আবার পথে নামতে হয়। তাই সে বারবার ঘরে ফেরে, আবার বিলের দিকে হাঁটে। এই আসা-যাওয়ার মাঝখানেই তার জীবন।’
গল্প থামল। চান্দার বিল নিঃশব্দ হয়ে রইল, যেন গল্পটা নিজের বুকের ভেতর তুলে নিল।
ভৈরব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে বলল, ‘এই গল্পটা তো আমার পথের মতো।’
বিষ্ণুচরণ হাসল, ‘ঠাকুরমার ঝুলির গল্প সবসময় কারও না কারও পথেই লাগে।’
মোহন আগুনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাই তো, নইলে গল্প টেকে কেন ?’
চাঁদের আলোয় শূকরপাল নড়ে উঠল। বিল আবার নিজের মতো হয়ে গেল। আর ভৈরব বুঝল―এই গল্প, এই আগুন, এই মানুষ―সব মিলিয়েই তার হাঁটার শক্তি।
১৩
ভৈরবসহ তিনজনই মহাজনের কাছ থেকে ছয় মাসের টাকা তুলে নিয়েছিল আগেই। সেই টাকা তারা এক টাকাও সঙ্গে রাখেনি। গোপালগঞ্জ ছাড়ার আগে, মনিরামপুরে ফিরে―সব টাকা তুলে দিয়ে এসেছে ঘরের হাতে। বউদের কাছে, সংসারের ভেতর। ভৈরব মালতীর হাতে যেমন দিয়েছিল, তেমনি মোহন আর বিষ্ণুচরণও দিয়েছিল তাদের ঘরের উঠোনে। তারা জানে―এই ছয় মাস ঘর চলবে ওই টাকাতেই; আর তারা চলবে বিলের দয়ার ওপর।
চান্দার বিলে এসে তাদের আর টাকার দরকার পড়ে না বললেই চলে। শূকর বেঁচে যে টাকা পাওয়া যায়, সেটুকুই যথেষ্ট। মাসে মাসে কেউ একজন হাটে গিয়ে শুধু চাল কিনে আনে। চাল থাকলেই হলো। বাকি সব তো বিল দেয়―নীরবে, বিনা দামে।
সকালে কাদা ভেজা মাঠে নেমে কচু তুলে আনে। কোথাও ঘেচু, কোথাও তিতা শাক, কোথাও হেলেঞ্চা―সবই হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। বিষ্ণুচরণ ভালো করে শাক চেনে; কোনটা কচি, কোনটা তেতো বেশি―সে বুঝে নেয়। মোহন আগুন ধরায়, ভৈরব কাদামাখা হাতে শাক ধুয়ে আনে। হাঁড়িতে জল বসে, লবণ পড়ে, শাক সেদ্ধ হয়। কোনও তেল নেই, মশলা নেই―তবু খিদে থাকলে স্বাদ ঠিকই লাগে।
কখনও কখনও বিল দয়া করে মাছও দেয়। জোয়ার নামার পর ছোট গর্তে আটকে থাকা শোল, টাকি বা পুঁটি―দু-একদিন ভাগ্যে জোটে। সে দিন ভাতের সঙ্গে মাছ হলে কথা কমে যায়; সবাই মন দিয়ে খায়। ভৈরব তখন বলে, ‘আজ বিল খুশি।’
এইভাবে দিন চলে। টাকা নেই বলে অভাব লাগে না; বরং টাকার হিসাব না থাকায় মন হালকা থাকে। তারা জানে―মহাজনের টাকা ঘরে আছে, সংসার আপাতত নিরাপদ। আর তারা এখানে আছে শরীর দিয়ে―হাঁটা, পাহারা, গান, গল্প আর কাদার ভেতর জীবনটাকে টিকিয়ে রাখার কাজে।
চান্দার বিলে রাত নামলে আগুন জ্বলে, শূকরপাল ঘুমায়, আর তিনজন মানুষ বুঝে নেয়―এই ছয় মাস তারা ঘরের জন্য নয়, পথের জন্য। চালের ভাত, সেদ্ধ শাক আর বিলের জল―এই দিয়েই কায়পুত্রদের দিন চলে। আর সেই চলাটাই তাদের সবচেয়ে বড় সম্বল। তাদের ফিরে চলার পায়ের শব্দে প্রতিধ্বনিত হয় আবার আসার প্রতিশ্রুতি।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



