আর্কাইভগল্প

গল্প : স্মৃতির সোয়াদ : মুম রহমান

দাদির চিৎকারে কুদরতের ঘুম ভাঙল। শুধু কি তার ঘুম ভাঙল! উঁচা শিমুল গাছে বাস করা এক ঝাঁক সবুজ টিয়া উড়ে গেল। লাল টুকটুকা শিমুল ফুলগুলো থেকেও কয়েকটা মাংসল শিমুল ঝরে পড়ল টুপ করে। পাশের বড় পুকুর থেকেও তিন চারটা জলপিপি দিল উড়াল।

মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণি। এই যে শস্যের মতো মনোরম সবুজ টিয়া সেটা মানুষ খায়, কোমল হৃদয়ের মতো শিমুল ফুল সেটাও মানুষ খায়। সোনালি নীল আর তামাটে রঙের একটা চিত্রকর্মের মতো সুন্দর যে জলপিপি―তাও মানুষ খায়। মানুষ সর্বভূক প্রাণিকুল। মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব বলা হয়, কিন্তু কুদরত এভাবে দেখে না। তার কাছে মানুষ সৃষ্টিকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বভূক প্রাণি। সে যা পায় তাকেই খাদ্য হিসেবে দেখে। সব কিছুকে খাবারে পরিণত করতে পারে মানুষ। ঘাস, গুল্ম, মাছ, মাংস, ফুল, পাখি, পোকা, বীজ কত কি যে মানুষ খায়। বাঘ হরিণ খায়, হরিণ ঘাস খায়, পাতা, লতা, কেওড়া খায়। কিন্তু মানুষ বাঘ, হরিণ, ঘাস, লতা-পাতা, কেওড়া―সবই খায়। এমনকি মানুষ মানুষকেও খায়। তবে এত সব খাওয়ার ভিড়ে আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই কুদরতের কানে বেজে উঠল ১৫/১৬ বছর আগের একটা খাওয়ার ঘটনা। শুধু কানে বাজলো না, সে চোখেও দেখতে পেল। 

ঘুম থেকে উঠে দীর্ঘ সময় নিজের আরামদায়ক বিছানায় শুয়েই সকালটা কাটায় কুদরত। ঘুম ভাঙার পরও সে বিছানা ছাড়ে না। বিছানায় শুয়েই একটু স্ট্রেচিং করে, একটু মেডিটেশন করে। ঘুম থেকে যে সময়ে ওঠার কথা, সে সময়ের চেয়ে এক ঘণ্টা আগে ওঠে কুদরত। এই একটা ঘণ্টা তার সারাদিনের ব্যস্ততার বাইরের বিলাস। অলস সকালের বিলাসিতাই জীবনের সেরা বিলাসিতা মনে হয় তার। এই সময়টায় শুয়ে, আধা শুয়ে, বিছানাতেই বসে কাটায়। আর আজকে ঘুম ভাঙার পরই এই বিলাসী সময়ে, তার মনে পড়ল ছোট্টবেলার কথা। হয়তো ১৫/১৬ বছর আগের কথা। দাদি চিৎকার করছে। দাদির গলা খুব বাজখাই ছিল। আর কুদরত দেখতে পাচ্ছে নিজের  কৈশোর কালটাকে।

কুদরত দেখে, কিশোর কুদরত চোখ ডলতে ডলতে বাইরে এল। দৃশ্যটি দেখার আগে কথাগুলো তার কানে গেল। দাদি চিৎকার করে যাচ্ছে, ‘আমি খাইবার দেই না তগোরে! তোর বাপেরে, তোরে আমি রাইন্দা খাওয়াই নাই! তোর পোলারে আমি রাইন্দা খাওয়াই না। আরে হাভাইত্তা, এমন বেইন্নাবেলাই তোর খিদা লাগছে ? পেডে কি রাক্ষস, জিব্বার এত লোল তোর!’

শব্দর সুতো ধরে এগুতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল কুদরতের। আর এক ঝলকেই কুদরত ঘটনাটা বুঝতে পারল। ঘটনা হলো, তার বাবা হেকমত এই শীতের সকালেই খিচুড়ি রাঁধতে গিয়েছিল। মাসকলাইয়ের ডালের খিচুড়ি তার খুব প্রিয়, হেকমত খিচুড়িটা রান্না করে ঢিমা আঁচে, অনেক সময় ধরে। রান্নাটা সরল। প্রথমে কাচা মাসের ডালটাকে তাওয়ায় ভেজে নিতে হয়। ওদিকে ছোট দানার চাল ভিজিয়ে রাখতে হয়। আর হাতের কাছে সিম, আলু, মিষ্টি কুমড়াÑমোদ্দা কথায় শীতের যা যা নয়া সবজি পাওয়া যায় তা ইচ্ছামতো কেটে নিতে হয়। ডাল ভাজা হয়ে গেলে ডাল, চাল, সবজিসহ পাতিলে পানি আর লবণ দিয়ে খিচুড়ি বসিয়ে দিতে হয়। লবণ কম দিতে হয়, কারণ লবণ লাগলে পরে দেওয়া যায়। আর পানির হিসাবে কোনও গন্ডগোল নাই। আন্দাজের চেয়ে একটু বেশি পানি দিলেই সুন্দর লেটকা খিচুড়ি হয়। রান্না হয়ে গেলে বাগাড় দিতে হয়। সরিষার তেলে শুকনা ও কাচা মরিচ কয়েকটা, পেঁয়াজ, রসুন, তার সঙ্গে এট্টু বাটা হলুদ, বাটা মরিচ বাগাড় দিয়ে সেটা খিচুড়ির উপর দিয়ে দিতে হয়। ব্যাপারটা সহজ, কিন্তু সুস্বাদু। খিচুড়ির মজাটা আদতে অন্য জায়গায়। সেটা বুঝতে কুদরতের ১৯ বছর লেগেছে। সেটা অন্য ঘটনা, এখন যে ঘটনা মনে পড়ছে, সেটা হলো, কুদরতের বাবা খিচুড়িটা বাগাড় দিতে গিয়ে তেলের ছিটায় হাত পুড়িয়ে ফেলেছে। গরম তেলের একটা বড় ছিটা তার হাতে পড়ায় সে সইতে পারেনি। আর হাত থেকে কড়াইটাও পড়ে যায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। হেকমতের কণ্ঠ থেকে একটা ব্যথার চাপা ‘উফ’ বের হয় আর কড়াই পড়ার শব্দ। কড়াইটা পড়তেই একটু তেলের ছিটা পায়েও এসে পড়ে। কুদরতের এবারের ‘আহ’ শব্দটা আরেকটু জোরে হয়। কড়াই পতনের শব্দ, কুদরতের ‘উফ, আহ’ শব্দের তোড়েই দাদি ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ি মাথায় তোলে।

হেকমত তখন মাথা নিচু করে, অপরাধীর মতো, নিজের বাড়িতেই চোরের মতো দাঁড়িয়ে। আর দাদি চেচিয়ে যাচ্ছেন, ‘কতদিন কইছি, বাজারে যা, কাজ কাম কর। ক্ষেতে যা। ভাদাইম্মাগিরি ছাড়। তা না। খালি পাকের ঘরে ঘুরপাক। তুই কি বেডি ? আরে, বেইন্নাবেলাতেই পাকঘরে বেডা মাইনষের কী কাম! গেরামে আমি মুখ দেখাইতে পারি না। মাইনষে তোরে কয় মাই¹া। মাই¹া বেডি গো মতো রান্দন বাড়নের শখ হইছে তোর! দেহি, কতডা পুড়ছে হাত ?’

হেকমত দেখতে দেয় না। চুপচাপ পাক ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এই যে বের হয় আবার হয়তো তিন-চার দিন পর ফিরবে। কই যাবে, কী করবে কেউ জানবে না। হেকমত কথা কম বলে। তার কোন বন্ধু-বান্ধবও নেই। একা একা চলে। বৌ মরে গেল তিন দিনের জ্বরে। কুদরতের বয়স তখন সাড়ে পাঁচ বছর। তারপর থেকে লোকটা আর বিয়ে করেনি। দাদির চিল্লাচিল্লিতে ঘরের চারপাশে চড়ুই-শালিক উড়ে গেছে বহুবার, কিন্তু হেকমত তার নিজের জীবনে কোনও ময়না-টিয়া-ডাহুককে ভিড়তে দেয়নি। কেন জানি, সংসার আর মেয়েমানুষের প্রতি হেকমতের আর কোনও আগ্রহই ছিল না। সে সংসারে থেকেও নাই। আর তার চোখের সামনে দিয়ে কোনও মেয়েমানুষ গেলেও সে মরা মাছের চোখের মতো তাকিয়ে থাকত।

অথচ, কুদরত একদম উলটো। সে পাকা শিকারির মতোই ধৈর্য নিয়ে, ফাঁদ পেতে থাকে। থ্রিস্টার হোটেলের শেফ কুদরত নানা রকম খাবার রাঁধতে জানে। সেই সব খাবার ঠোঁটে, জিভে, তালুতে, চোখে, পেটে, আঙুলে সম্মোহন তৈরি করে। কুদরতের প্রতিযোগী অন্য শেফেরা বলে, ‘লোকটা কালা জাদু জানে, পানি সিদ্ধ করলেও হালকা মিষ্টি লাগে।’ বহু নারী-পুরুষও আড়ালে বা প্রকাশ্যে এমন বলে থাকে, ‘লোকটার রান্না আদতেই কুদরতি। আঙুল চেটে খাওয়া যায়, পেট ভরে, মনও ভরে, চোখে তৃপ্তি হয়, জিভে আর কলিজায় আরাম আসে।’ একজন উঁচুদরের শিল্পীর মতো এইসব প্রশংসা তাকে ছোঁয় না। কুদরত তার মন আর মগজ ঢেলে দেয় রান্নায়। হয়তো পিতা হেকমতের কাছ থেকেই সে পেয়েছে এই সব। মানে এই যে হাঁড়ি, পাতিল, কড়াই, খুন্তি, চামচ, চাল, ডাল, শাক, সবজি, মাছ, মাংস যাই দেখে কুদরতের প্রাণ নেচে ওঠে। এগুলো যেন তার রং তুলি। সে ছবি আঁকার মতো একেকটা রান্নাতে নিমগ্ন হয়ে যায়।

আর যদি কোনও নারী হয় তার বিশেষ অতিথি, তখন কুদরত ধ্যানস্থ। বক যেমন চুপচাপ বসে থাকে এক পায়ে, মাছরাঙা যেমন পুকুর পাড়ের একটা ডালে ঘাপটি মেরে থাকে, তারপর ঝুপ করে, টুপ করে একটা মাছ ঠোঁটে তুলে আসে, কুদরতও তেমনি ধ্যানস্থ হয়ে, নিমগ্ন হয়ে, নির্মোহ হয়ে একটা নারীকে শিকার করে। তবে, প্রচলিত অর্থে কুদরত সেই জিম করবেট যে শিকারি হয়েও শিকারকে ভালোবাসে, মায়া করে, কখনও সম্মানও করে বৈকি। ব্যাপারটা জটিল রসায়নের। লোকে বলে, কুদরত নারীলিপ্সু, কুদরত নারীশিকারি, কুদরত মেয়ে মানুষ খায়। কিন্তু নারীরা ভিন্ন কথা বলে।

তারা জানে, কুদরত আদর করতে জানে, মায়া করতে জানে, ভালোবাসতে জানে। একবার যে নারী কুদরতের কাছে আসে সে বারবার আসতে চায়। কিন্তু সেটাতেই কুদরতের সমস্যা। বারবার কোনও কিছুই তার ভালো লাগে না। একবারের যত্নই তার কাছে অনন্তকালের স্মৃতি।

কিন্তু আজকের ঘটনাটি আলাদা। স্মৃতিকে সে আসতে বলেছে আজ নিজের স্মৃতিকে জাগাতে। বাবার হাতের রান্না করা মাসকলাইয়ের খিচুড়ি করবে সে। সাথে দাদির হাতের চালের গুড়া দিয়ে মুচমুচা বেগুন ভাজা, সরিষা ফুলের বড়া আর পেঁয়াজ ও পোড়া মরিচের ভর্তা করবে। আর নিজের তরফ থেকে কুদরত আজ বানাবে রোজেলা ওরফে চুকাইয়ের চাটনি। চিনা এক স্যুসেফের কাছে কুদরত শিখে ছিল এই চাটনির গোপন কারিগরি। তো পাতলা খিচুড়ির সাথে কুড়মুড়ে বেগুন ভাজা, সরিষা ফুলের বড়া, পেঁয়াজ-মরিচ ভর্তা আর রোজেলা চাটনি এই হলো আজকের আয়োজন। এই আয়োজনের নাম দিয়েছে সে ‘স্মৃতির সোয়াদ’।

স্মৃতিকে বলেছিল কুদরত, ‘শোনো তুমি তো সুর দিয়ে, কণ্ঠ দিয়ে মানুষকে ভোলাও আমি তোমাকে একদিন দাওয়াত দিব। তোমাকে ভোলাব আমি স্মৃতির সোয়াদ দিয়ে।’

: স্মৃতির সোয়াদ, সেটা কি গো ?

: সোয়াদ মানে স্বাদ, স্মৃতির স্বাদ। আমাদের সবার জীবনে প্রথম কি স্বাদ থাকে বলত ?

: মায়ের বুকের দুধ।

: হুম। কিন্তু সেটা ইউনিক, এত অথেনটিক যে তার স্বাদের ডিকনস্ট্রাকশন হয় না। তারপরের স্বাদটা কি জানো ? বাঙালি শিশুর জন্য ?

: কী ?

: খিচুড়ি। বাচ্চা একটু বড় হলেই মা একটা লেটকা খিচুড়ি বানিয়ে দেয়। খিচুড়ি অতি সহজপাচ্য, মানে সহজে হজম হয় অথচ পুষ্টিতে ভরপুর। ডাল, চাল, সবজি মিলিয়ে এ এক অনবদ্য স্বাদ। কার্ব, ক্যালোরি, ভিটামিনস, প্রোটিনের এক মহা সম্মেলনের ডাক নাম খিচুড়ি।

: মাগো, খিচুড়ির এত মাহাত্ম্য, তো সেই খিচুড়ি খাওয়াতে চান আপনি আমাকে, বাচ্চাদের লেটকা খিচুড়ি ?

: না। মায়ের স্মৃতি বড় ম্লান আমার কাছে। পাঁচ বছর পার করে ছয়ে পড়ার আগেই মা মরে গেল। বাবা আর বিয়ে করেনি। দাদি আর বাবার কাছেই আমি মানুষ হয়েছি।

স্মৃতি তাকায় লোকটার দিকে। চল্লিশের আশেপাশে হবে লোকটার বয়স। ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩-এর যে কোনও একটা বয়স হতে পারে তার। কিংবা কে জানে এর বেশি বা কম। লোকটার পেটানো শরীর। মুখে ফ্রেঞ্চকাট। সেখানে গোটা দশেক দাড়ি পাকা। চুল ছোট করে কাটা। মনে হয়, লোকটার ছোট চুলের বাতিক। শ্যামলা মুখ, চোয়ালটা বেশ দৃঢ়। এই লোকের বয়স আন্দাজ করা কঠিন। আর এই লোকের নিয়ত, চালচলন সেটাও আন্দাজ করা কঠিন। লোকটা তখনও বলেই চলেছে…

: আমার পাঁচ ইন্দ্রিয়ে রান্নাবান্নার যে স্বাদ তা দাদি আর বাবার রান্না থেকেই পাওয়া। আমি চোখ বুজলেই এখনও মাছ ভাজার ঘ্রাণ পাই, মুড়ি ভাজার শব্দ, ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার শব্দ পাই, দুই হাতে নরম খিচুড়ির সঙ্গে মুচমুচা গোলগাল বেগুন ভাজার স্পর্শ পাই, চোখে দেখতে পাই সবুজ পালং শাকের উপর সাদা রসুন আর লাল টমোটোর রং আর জিভে স্বাদ পাই ঝাল-টক-মিষ্টি-নোনতা-তিতার কত মিশ্র স্বাদ।

: এই যে জনাব কুদরত, আপনার উচিত ছিল কবি হওয়া। তাতে নিদেন পক্ষে আমরা আপনার কাছ থেকে কবিতার পাশাপাশি দুয়েকটা গান পেতাম। আপনি লিখতেন, আর আমি সুর দিতাম।

: তাই হবে। আগামী সাত তারিখ আমি লিখব, আমার লেখা হবে আগুনের আঁচে, আর তুমি আসবে সেই লেখা চেখে দেখতে।  তোমার সুর হবে জিভ আর দাঁতের কোরাসে।

: সাত তারিখ ? বিশেষ কোনওদিন ?

: হুম।

: আপনার জন্মদিন ?

: না। তোমার আমার যৌথ গানের প্রথম দিন। আসবে তো ?

: দেরি হলো যে ?

: অপেক্ষায় খুব কষ্ট হচ্ছিলো ?

: না, আমি যখন রাঁধি তখন অন্য কোনও কিছু আমাকে ছোঁয় না। রান্নাটা সবেই শেষ হলো। তারপরই মনে হলো, তুমি তো এলে না। দেরি করাটা অবশ্য মেয়েদের ক্লাসিকাল চরিত্র।

: নারী চরিত্রের খুব খোঁজখবর রাখেন আপনি ?

: না। আমি তো গোয়েন্দা নই। খোঁজ খবর রাখি না। তবে অনুভব করি। বোঝার চেষ্টা করি। যদিও বলে, নারীকে বোঝা যায় না। তবুও কবিতার মতো, না-বুঝলেও ভালো লাগা ঘিরে থাকে।

: উফ, আপনি ভুল পেশায় এসেছেন কুদরত। শেফ নয়, আপনার উচিত কবি হওয়া।

: একজন সেফও কবি।

: একদম কথার জাদুকর। তা খালি কথার ফুলঝুরি ফোটাবেন নাকি খেতেও দেবেন। আমি কিন্তু সকাল থেকে কিছু খাইনি। রেওয়াজ করে, স্নান টান সেরে এসেছি। পেটে এখন খিদে মোচড় দিচ্ছে।

: হাতটা ধুয়ে এসো। এইদিকে বেসিন।

স্মৃতি হাত ধুয়ে এসে দেখে, সব খাবার থেকে ঢাকনা সরানো হয়েছে। পুরো টেবিলটা সাজানো হয়েছে মাটির থালা, বাটি, গ্লাসে।

: মাটির ডিনার সেট! বাহ! এ কি, কুপি ?

: হুম। শৈশব কৈশোরটাকে একটু তৈজসপত্র আর আলোতেও ধরার চেষ্টা।

: যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় কুপি, হারিকেনের আলো… আশু গৃহে তার দেখিবে না আর…

: খাওয়ার সময় কথা নয়। একটু গান চলুক।

: আপনি খাবেন না ?

: না আমি দেখব।

: এটা কিন্তু বিব্রতকর।

: ইগনোর মি। জাস্ট এনজয় ইউর মিল। বন আপেতি।

কুদরত থালার মধ্যে খিচুড়ির উপর একটু ঘি ছড়িয়ে দেয়। তারপর গান বেজে ওঠে। কুদরতের মোবাইলের সঙ্গে কোনও স্পিকারের কানেকশন আছে। হালকা ভলিউমে সন্ধ্যা গাইতে থাকেন, ‘মধু মালতি ডাকে আয়’….

সচরাচর প্লেটটা সাজিয়ে দেয় শেফরা। কুদরত এখানে প্লেটিং করেনি। তবে মাটির বাসন, থালা, গ্লাসগুলো সুন্দর করে সাজানো। অনেকটা অর্ধচন্দ্র আকারে সাজানো হয়েছে থালা-বাটিগুলো। মাটির পানির বোতল, মাটির মগÑকেমন একটা স্নিগ্ধ শীতলতা।

স্মৃতি ক্রমে মগ্ন হয়ে যায় খাওয়ায়। বেগুন ভাজা এত পাতলা আর এত মুচমুচে যেন পাঁপড়। নরম গরম ধোঁয়া ওঠা পাতলা খিচুড়ির সাথে মুচমুচে বেগুন ভাজা একটা বৈপরীত্য তৈরি করে। এ যেন উদারা আর মুদারার ‘সা’ থেকে আরোহণ, অবরোহণ। মাটির পাত্রে সরিষা ফুলের বড়াগুলো শুইয়ে রাখা হয়েছে তাজা একগুচ্ছ সরিষা ফুলের উপর। যেন সরিষা ফুলের বিছানাতে শুয়ে আছে কড়া তেলে ভাজা সরিষা ফুলের বড়া। সেটাও মুখে দিতেই ঝাল, ঝাঁজ আর কুড়মুড়ে স্বাদের বিস্ফোরণ ওঠে দাঁতে-জিভে। এইবার সন্ধ্যা গাইছে, ‘এ শুধু গানের দিন এ লগনও গান শোনাবার।’

: আপনি বুঝি নিরামিষাশী ?

: না। তবে আজকের আয়োজনটা মাছ-মাংসহীন। একটু সাত্ত্বিক।

: বাহবা, বেদ-বেদান্তও জানেন নাকি ?

: কিছুটা।

কুদরত গ্লাসে জল ঢেলে দেয়। চামচে একটু পেঁয়াজ মরিচ ভর্তা নিয়ে চোখে প্রশ্ন করে দেবে কি না পাতে। স্মৃতি ঘাড় নাড়ে। কুদরত তার পাতে একটু পেঁয়াজ-মরিচের ভর্তা দেয়।

: এটা কিন্তু মাসকলাইয়ের খিচুড়ি। আমার বাবা রাঁধতেন। যদিও আমি তার রেসিপি পুরোটা অনুসরণ করতে পারিনি। তবুও এটা তার স্মৃতির প্রতিই শ্রদ্ধা। শেষ পাতে একটু রোজেলা চাটনি নাও।

: আপনার বাবা কোথায় ?

: জানি না।

: জানি না মানে ?

: বাবা চলে গেছেন। প্রায়ই যেতেন। হুটহাট। দাদির সঙ্গে কিংবা আমার সঙ্গে কিংবা যে কারও সঙ্গে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেন। আবার ফিরে আসতেন। দু-চারদিন কোথাও থাকতেন। কই থাকতেন, কই যেতেন আমরা জানতাম না। তারপর একদিন গেলেন, আর এলেন না।

: সে কি ?

: বাদ দাও। বহু বছর আগের কথা। আমি ভুলে গেছি।

: খোঁজেননি।

: যে নিজ থেকে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে বের করা যায় না।

স্মৃতি বিস্মিত হয়। এই কুদরত লোকটা নেহাত ভালো শেফ নয়, কথার জাদুকর, কবি, দার্শনিকও বলা যায়। তার চেহারায় কিংবা উপরিতলে যে চেনা চোস্ত ভঙ্গিমা, তার আড়ালে একটা অচেনা গভীরতা আছে।

: আমি ইচ্ছে করেই আয়োজন কম করেছি। এটা তোমার রাগ সঙ্গীতের আলাপের মতো। দুতিনটা স্বর নিয়ে খেলা।

: চাটনিটা চূড়ান্ত স্বাদের হয়েছে। একদম চূড়া ছুঁয়ে যাওয়ার আনন্দ।

কুদরত একটা বিনয়ের হাসি হাসে। স্মৃতি যতদিন কুদরতকে দেখেছে, ততদিনই মনে হয়েছে, লোকটা ওভার কনফিডেন্ট, অতিমাত্রায় অহংকারী, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, এ তো মাটির মানুষ। এই সব মাটির থালা-বাসন-গ্লাসের মতো, এইসব সরিষা ফুলের মতো নরম, কোমল আবার মুচমুচে একটা লোক। স্মৃতির মনে পড়ে, তার মায়ের কথা। মা এমন সরিষা ফুল ভাজতেন।

: চালটা কিন্তু গোবিন্দভোগ। ইন্ডিয়া থেকে আনিয়েছি। এই চালটা আর মাসের ডালটা মিলেমিশে একটা স্টিকিনেস তৈরি করে।

: মানে মাখো মাখো। জড়িয়ে থাকা।

: তুমি রসিক লোক স্মৃতি।

: আপনাকে আমি গান শোনাবো আজ। কী শুনবেন বলুন।

: ভরা পেটে সুর খেলবে ? বরং একটু বিশ্রাম নাও। একটু দই খাও। আমার নিজের বানানো দই। টক-মিষ্টি।

: দই ? এই খাবারের সঙ্গে দই।

: খিচুড়ি কি চার ইয়ার, দহি, পাপড়, ঘি অর আচার।

: তা পাপড় তো দেননি ? আচারই বা কই।

: ওই বেগুন ভাজা, সরিষা ফুল ভাজা ওগুলোকেই স্মৃতির পাঁপড় বলতে পারো। আর আচার হিসেবে তো রোজেলা চাটনিই দিয়েছি।

: আপনিও রসিক বটে।

গানের সঙ্গে রান্নার কি কোনও মিল আছে ? কে জানে থাকলেও থাকতে পারে। দই খাওয়ার সময়, কুদরত থালায় খিচুরি নেয়। গল্প চলতে চলতে খাওয়া চলে ধীরেসুস্থে। কুদরত জিজ্ঞেস করে, চা-কফি কিছু চলবে কি না। স্মৃতি না করে।

: তবে চলো, ও ঘরে বসি। খানিক গল্প হোক।

গল্প তেমন জমে না। কোথায় যেন ঘাপটি মেরে নীরবতা নামে। কুদরত দেখে স্মৃতিকে, স্মৃতি দেখে কুদরতকে। দেখাদেখি চলে। সঙ্গে টুকটাক অর্থহীন দু-চারটা কথা। তারপর স্মৃতি তার মোবাইলে তানপুরার একটা অ্যাপ খোলে। ঘরের ভেতর তানপুরার চলাচল। স্মৃতি গাইতে শুরু করে, কোমল রে, ধা আর কোমল ও কড়ি মা-তে চলাচল করে স্মৃতির কণ্ঠ। স, ঋ, গ, হ্ম, প, দ, ন, র্স। র্স ন দপ, ক্ষ, গ, হ্ম, স। এই বিমূর্ত সুরের চলাচল কুদরত বোঝে না। কিন্তু এটুকু বোঝে, তারা দুজন শুধু নয়, এ ঘরে অন্য কেউ আছে। সে অন্য কেউ হয় স্বয়ং ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরের প্রতিনিধি কোনও। ঘরটা ভরে ওঠে সুরের আরোহে অবরোহে। কী অপূর্ব আর অপার্থিব স্মৃতির কণ্ঠস্বর। এক সময় রাগের তান, আলাপ থেকে স্মৃতি সোজা ঢুকে পড়ে ঠাকুরের গানের বারান্দায়―গাইতে থাকে―

যেথা নিখিলের সাধনা পূজালোক করে রচনা,

সেথায় আমিও ধরিব একটি জ্যোতির রেখা ॥

নিভৃত প্রাণের দেবতা  যেখানে জাগেন একা…

সন্া হ্ম গপা। পা পা পা। পা পহ্মা ধহ্মা। া া গা।

গ হ্মা না। ধা পা হ্মা হ্মা। গম গা ঋ। গা ঋা সসা ॥

একসময় স্মৃতি থামে। কুদরত বিস্মিত। তার চোখে জল। কিন্তু সে জল কেন সে জানে না। ধীরে স্মৃতির পাশে এসে বসে সে। স্মৃতি হাতটা বাড়িয়ে দেয়। কুদরতের মনে হয়, কোথাও যেন কিছু একটা ঘটে গেছে। সেটা ঘটনা নাকি  দুর্ঘটনা তা সে জানে না। কেউ জানে না। কুদরত স্তম্ভিত। শান্ত। মগ্ন। স্মৃতি নির্বাক। হাতের মুঠোয় হাত। স্মৃতি ঠোঁট বাড়িয়ে দেয়। কুদরত তার দু ঠোঁট দিয়ে আলতো করে স্মৃতির ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ায়। সামান্য স্পর্শ। চুমুও বলা যায় কি না কে জানে। তারপর স্মৃতির কপালে একটা আলতো চুমু খায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ব্যস, এইটুকুই।

কুদরত উঠে পড়ে। বলে, আমি বেরুবো। আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে সন্ধ্যায়। তুমি পাঁচ মিনিট বসো। আমি রেডি হয়ে আসি। তোমাকে এগিয়ে দেব আমি।

স্মৃতিকে কোনও কথা বলার সুযোগ না-দিয়ে কুদরত ভেতরের ঘরে চলে যায়। স্মৃতি ঘরটার চারিদিকে চোখ বোলাতে থাকে। অনেক কিছুই হতে পারত, আজ, এখন, এই ঘরে। কিন্তু হলো না। সে কি ভুল করেছে, ঠোঁট বাড়িয়ে দিয়ে ? কুদরত কী ভাবল তাকে ? কিন্তু কুদরত তো কচি খোকা নয়, এ সব ব্যাপারে সে পারদর্শী। তবে কেন সরে গেল তাড়াহুড়া করে ? স্মৃতিকে পছন্দ হয়নি তার ? কত কি ভাবতে থাকে স্মৃতি। নিজেকে বোকা মনে হতে থাকে। কিছুটা কি বঞ্চিতও ?

কুদরত একটা কুর্তা, ট্রাউজার পরে এসেছে। বেশ অল্প সময়ে বেশ ফিটফাট। স্মৃতির হাতটা ধরে।

: স্মৃতি, কখনও কখনও অসমাপ্ত মুহূর্তটাই সেরা স্মৃতি হয়ে থাকে। তুমি রাগ করো না। তুমি আমার কাছে আমার বাবার মতোই থাকবে। চলে গেছে সে। ফেরেনি। ফিরবে কি না জানি না। হয়তো বেঁচে নেই। কিন্তু মন বলে, সে আছে, সে থাকবে। চিরকাল। তুমিও থেকো।

তারপর দু হাত বাড়িয়ে দেয় কুদরত। স্মৃতি তার আলিঙ্গনে ধরা দেয়। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। কুদরত মনে মনে ১ থেকে ৯০ পর্যন্ত গোনে। দেড় মিনিটের একটা আলিঙ্গন হয়তো বেঁচে থাকবে বাকিটা জীবন।

: চলো বেরুই।

: চলুন।

সচিত্রকরণ : রজত 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button