আর্কাইভগল্প

গল্প : স্বগতোক্তি ও একটি নির্ঘুম রাত : ফরিদুর রহমান

‘নেহাল করিম বেহাল দশা। খাচ্ছে ডালিম দিচ্ছে শশা।’

দেয়ালটা সাদা ছিল। এখন আর সাদা নেই। আলকাতরায় কাঁচা হাতে লেখা দুটো লাইন আমার মাথার ভেতরে ঢ়ুকে পড়েছে। আল আমিন জর্দা ফ্যাক্টরির দেয়াল। আমাদের বাসার মুখোমুখি। সেই দেয়ালটাই যেন আমার শরীর। আব্বুর লাঠি নেমে আসছে পিঠে, শব্দ নেই, শুধু আমার শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। অফিস থেকে ফেরা এলোমেলো জামাকাপড়, ঘামের গন্ধ, রাগের গরম নিশ্বাস, আর দেয়ালের লেখা, সব একসাথে। বুঝতে পারি, মা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দরজার ওপারে। মেঝের ঠান্ডা মোজাইকে তার পা দুটো আটকে গেছে।

আমার বয়স একুশ ছুঁয়েছে। অর্নাস থার্ড ইয়ার। বাবারা কি বয়স গোনে ? তারা শুধু লজ্জার হিসাব কষে। দেয়ালে লেখা মানে নাকি পাড়ায় আমাদের মুখ দেখানো যাবে না। আমি ভাবি, মুখটা কোথায় ? দেয়ালে ? নেহাল করিমের নামের ভেতর ? অশ্লীলতা কোথায় ? শব্দে, না বাবার চোখে ? এর আগেও হাত উঠেছে। চড়, থাপ্পড়, সংক্ষিপ্ত বাক্যের মতো। আজ লাঠি। পূর্ণ অনুচ্ছেদ। দেয়ালের লেখাটা উপলক্ষ্য মাত্র, আসল কারণ নয় আমি জানি। নেহাল করিম, এই নামটাই আব্বুর মাথার ভেতর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছে।

তিন বছর আগে কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠান। শহরের নামকরা মহিলা কলেজ। আমার রেজাল্ট ভালো, শৃঙ্খলা ভালো। আমি ভালো ছাত্রী। ইংরেজি সাহিত্য নিলাম, ভেবেছিলাম ভাষা শিখব। পেলাম গল্প, রোমান্টিকতা, ইউরোপের ছায়া, বিশ্বাসের সাথে দ্বন্দ্ব। মাঝে মধ্যেই মনের ভেতরে খচখচ করে। গ্রামার নেই। বিসিএস পরীক্ষায় মাত্র বিশ নম্বর। উপরে ওঠার সিঁড়িতে এই বিশ নম্বর কতটা ? জীবনের আকাক্সক্ষার গন্তব্য অধরাই থেকে যাবে।  

মঞ্চে উজ্জ্বল আলো। আমি রীতিমতো ঘামছি। মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেই ভুল করে বসলাম। ‘মাননীয় সভাপতি ও উপস্থিত মান্যগণ্য জঘন্য ব্যক্তি’…শব্দটা আমার মুখ থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। প্রথমে একটু কানাকানি, গুঞ্জন, তারপরে হাসি। গুঞ্জন ক্রমেই শোরগোল হয়ে ওঠে। বুঝলাম ভুল হয়ে গেছে। আমি কাঁদি। প্রথমে নিঃশব্দে তারপরে ফুঁপিয়ে উঠি। কান্না থামতে চায় না। কেউ একজন আসন থেকে উঠে আসে, হাতে পানির বোতল দেয়। বলে, ‘পারবে।’ আমি বলি, ‘পারব না।’ সে বলে, ‘শুরু করো। আমি কাছেই আছি।’

দুই মিনিট। দাঁড়িয়ে থাকা দুই মিনিট। ক্ষমা চাইলাম। তারপরে কী বলেছি মনে নেই। কতগুলা এলোমেলো শব্দ। আমি মঞ্চ থেকে নামলাম। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আবার একটু কেঁদেছিলাম। বের হতে গিয়ে অন্ধকার। কোথায় যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। অপমানের ওজন শরীরের চেয়ে ভারী। আমার হালকা পাতলা শরীর সেই ভার বহন করতে পারেনি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। হাতে স্যালাইন। বাবা খবর পেয়ে দৌড়ে এসেছেন। ভেবেছিলেন এক্সিডেন্ট!। না―এটা অন্য কিছু। নামহীন এক ধরনের দুর্ঘটনা। ঘণ্টাখানেক পরে বাবার সাথে বাড়ি ফিরে গেছি। পরে জেনেছি সেই লোকটা গাড়িতে করে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল।

কয়েক দিন কলেজ নেই। ফিরে গেলে বান্ধবীদের চোখে প্রশ্ন, ‘ওই লোকটা তোর কে রে ?’ শুরু হয় ট্রল। হাসির সাথে একটা পৌনঃপুনিক উচ্চারণ: সামথিং… সামথিং…। বাড়িতে বলেছি আমি কলেজ ছাড়ব। ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে চলে যেতে চাই। বাবা কিছুতেই রাজি না। বই পড়ে দিন কাটাই। মাথার ভেতর শব্দ জমতে থাকে। একদিন ভাবি, যার জন্য এই জটিলতা, তাকে একবার দেখে আসি।

জেলা প্রশাসকের অফিস। দরজায় দারোয়ান। সব অফিসেই যেমন থাকে। তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজন থাকলেও প্রয়োজনীয় মানুষটার কাছে পৌঁছাতে দেয় না। প্রশ্ন করে, জানতে চায়, ‘কার কাছে ?’ আমি তো নাম জানি না। শুধু বলি, ‘চোখে চশমা, কাঁচাপাকা গোঁফ।’ দারোয়ান হাসে। হয়তো পাগল ভাবে। বন্ধ দরজাটা খোলে না। বোধ হয় লাঞ্চের সময় হয়েছিল। হঠাৎ সেই লোকটা বের হয়। চোখে চোখ পড়তেই চিনে ফেলে।

‘আমি সেই জঘন্য ব্যক্তি, তাই না ?’

আমি থামি না। দ্রুত হাঁটতে থাকি। পিছু ডাক পেছনে পড়ে থাকে। আন্তরিক আহ্বানের শব্দগুলো বারান্দায় গড়াগড়ি খায়। দারোয়ানের বিস্ফারিত চোখ অনুমান করতে পারি।

লোকটা খোঁজ নেয়। প্রিন্সিপালকে ফোন করে, কলেজে যাই কি না। একদিন একটা পাজেরো এসে থামে জর্দা ফ্যাক্টরির সামনে। উইন্ডশিল্ডে লেখা এডিসি জেনারেল। পাড়ায় ফিসফিস। নিশ্চয়ই রিমির বাবাকে ধরতে পুলিশ এসেছে! সে শুধু আমার খবর নেয়। বোঝায়। কলেজে ফিরতে রাজি করায়। পাড়ার মানুষ যা ভাবে ভাবুক। শেষ পর্যন্ত আমি আর ড্রপ দিই না। কলেজে যাই। ক্রিস্টোফার মারলো, জন ডান, ডি এইচ লরেন্সের পাতায় ডুবে থাকতে চেষ্টা করি। বাইয়ের পাতায় পাতায় ভেসে ওঠে সেই লোকটার মুখ। এভাবেই এই লোকটা আমার জীবনে ঢুকে পড়ল। আব্বুকে জিজ্ঞেস করছিলাম এডিসি মানে কী ? এডিশনাল ডেপুটি কমিশনার। এটা হয় কীভাবে হয় জানতে চাইলে আব্বু বলেছে বিসিএস দিয়ে হতে হয়। বিসিএস কি আমি তখন তাও জানি না।

এক বান্ধবীর কাছে থেকে সে আমার নম্বরও নিয়েছিল। একদিন কলেজ থেকে আসছিলাম বান্ধবীসহ। তার গাড়িতে কয়েকজন পুলিশ। গাড়ি থেকে নেমে গেলে পুলিশেরা তাকে স্যালুট দেয়, আমি তো অবাক। কোন পদে জব করে জানি না। শুধু বলেছিল সিভিল সার্ভিস। কিন্তু পুলিশেরা কেন সালাম দেয়। পরে তাকে আমি কল করে বলেছি, ‘আপনি মিথ্যুক।’ সে হেসে বললো ‘কেন ?’ আমি বলেছি, ‘আপনাকে পুলিশেরা সালাম দিল কেন ?’ বলে ‘ওদের নিয়ম তাই দেয়।’ আমি বলেছি, ‘আপনি কিসে জব করেন তা বলেননি।’ তখন বলেছে, ‘ম্যাজিস্ট্রেট বোঝো ?’ ফোন কেটে দিয়েছিলাম ভয়ে। এই লোকটাকে যে মারতে গিয়েছিলাম অফিসে। এবারে ভয় পেয়েছি। ভেবেছি এই লোকের ছায়াও মাড়াব না আর। হয়তো এবার দেখা হলে উলটো আমাকেই জেলে ভরে দেবে।

একদিন কলেজ থেকে ফিরে আসছি একা, সে ঐ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। আমি খেয়াল করিনি। হঠাৎ ব্রেক করল, সাথে পুলিশের গাড়ি। এবারে আমি সত্যিই ভয় পেয়েছি। মনে হলো লোকটা সত্যি সত্যি আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। যেভাবে নামল গাড়ি থেকে, ভয়ে আমি শেষ। লোকটা এসে বলে, ‘তুমি না মারতে চেয়েছিলে এই জঘন্য ব্যক্তিটাকে।’ দেখলাম কী সুন্দর প্যান্ট, শার্ট পরেছে আর অনেক লম্বা। দারুণ লাগছে। আমি তখন বলেছি, ‘আর মারব না আপনি বড় মানুষ। মারলে জেলে যেতে হবে।’ বলে, ‘তোমার বান্ধবীরা আজ আসেনি ?’ বলেছি, ‘আমি ভয় পাই না একা যেতে।’ সে বলে, ‘চলো তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসি।’ আমি তখন ভাবছি… এই লোক আবার এলাকায় গেলে মানুষ ভাববে রিমির বাবাকে আবার ধরে নিতে এসেছে। আমি মানা করে দিয়েছি। তারপর বলেছে, ‘এটা সেটা খাবে ?’ আমি সব না করে দিয়েছি। আমার ভীষণ খিদে পেয়েছিল আর সে ইয়াম্মি ইয়াম্মি সব খাবারের নাম বলছিল। লোকটা আমার ফেভারিট ডিশগুলা বলল। আমি খেতে যাইনি। পরে বাসায় এসে আফসোস! ইসরে গেলে আজ অনেক কিছু খেতাম।

এরপর কোনও একদিন সত্যিই একসাথে খেতে গেলাম। ওই যে বুড়িগঙ্গার ধারে একটা রেস্টুরেন্ট আছে রিভার ভিউ, সেখানে। ধীরে ধীরে কেন জানি অধিকার খাটাতে শুরু করলাম। এই অধিকার কোথায় থেকে এল জানি না। ওকে অনেক প্রশ্ন করেছি, খুব কষ্ট দিযেছি। ‘বউ ছাড়া কত জনের সাথে সম্পর্ক করেছে ? এখন কার কার সাথে রিলেশন আছে ? তোমার অফিসে মহিলা পিএ কেন ? ইমিডিয়েট বদলে ফেলো।’ অফিসে বিজি থাকলেও মাঝেমধ্যেই ভিডিও কলে দেখতে চেয়েছি। কখনও কখনও দিনে ৪-৫ বার। আর অন্য নারীকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ তো নিত্য দিনের সঙ্গী। সে কখনও বলত আমি তাকে জীবন্ত জ্বালিয়ে মারছি, আর কেউ এমন সাহস পায়নি। এটা ঠিক, আমিও মানি। তবে সেও পড়াশোনায় খুব করে সাপোর্ট দিয়েছে। খুব ভালোবাসে আমাকে।

দুই

পরবর্তী তিন বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। নেহাল করিম প্রোমোশন পেয়ে জয়েন্ট সেক্রেটারি হয়েছে। সচিবালয়ে বসে। আমি অনার্স মাস্টার্স শেষ করে বেকার বসে আছি। প্রস্তুতি নিচ্ছি বিসিএস-এর। আমরা বাসা বদলে চলে এসেছি পুরোনো ঢাকায় একটা অ্যাপার্টমেন্টে।

আমরা দুই ভাই বোন। পিচকু আর আমি। ও ক্লাস ফাইভে পড়ে। আমার আব্বুর জন্মসাল ১৯৫৫ অর্থাৎ বয়স এখন প্রায় সত্তর বছর। বেসরকারি চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন কয়েক বছর আগে। আব্বুর দুই বিয়ে। বড় সংসারে তিন ছেলের সবাই বড় জব করে। একজন ডাক্তার, একজন ব্যাংকার, আরেক জন উকিল। আব্বুর খবর নেয় না। মরে গেলে মাটি দিতেও আসবে না। পিচকু অনাকাক্সিক্ষত বয়সের, তবে মেধাবী আর খুব দুষ্ট সে। বয়সকালের সন্তান নাকি মেধাবী হয়। আব্বুর থ্রোট ক্যান্সার। কেমো নিতে হয়েছে নয় বার। প্রত্যেকবার ইন্ডিয়া যেতে হয়েছিল। প্রায় ৭৫ লাখের মতো খরচ হয়ে গেছে। আমাদের অবস্থা শোচনীয়। ক্যান্সার চলে গেলেও আব্বুর শরীরে নানা রকম চিহ্ন রেখে গেছে। 

আব্বুর আগের স্ত্রী সেগুনবাগিচার ফ্ল্যাট লিখে নিয়েছে। কল্যাণপুরে নতুন বাজারে বড় ফ্ল্যাট ছিল আমাদের। সেটাও দখল করেছে ওরা। এখন পুরোনো ঢাকায় রায় সাহেব বাজারে আনোয়ার টাওয়ারে থাকি। আব্বুর শখ বনানীতে ফ্ল্যাট কিনবে। রাগ করে বলে হয়তো, নয়তো অভিমান। আব্বুর তো বনানীতে ফ্ল্যাট কেনার মতো পয়সা নাই। আমি বলেছি এটা খারাপ সিদ্ধান্ত। আব্বুকে হেল্প করতে চেয়েছিল আমার সেই লোকটা। আব্বুর যে ইগো! সরাসরি ইগনোর করেছে। আমাকে বলে, ‘তুমি যদি মরো তাহলে পিজি হাসপাতলে মরিও। আর যদি নিজের বাসায় মরো তাহলে বনানী গুলশানে মরিও।’ এইসব বলে। তাহলে নাকি লোকমুখে ভালো শোনাবে। তার ডাক্তার ছেলেটা সিলেট মেডিকেলে পড়ত। কোনও অসুবিধা হলেই আব্বু ফ্লাই করে চলে যেত। এখন বাবা অসুস্থ, সেই ছেলে কোনও খবর নেয় না। ওনার আগের স্ত্রী ভীষণ লোভী।

ওল্ড টাউনে আমাদের বাসার কাছে অনেক রেস্টুরেন্ট আছে। ও নিয়ে যায়। স্বপ্ন আউটলেটের অপজিটে পাপা জোন রেস্টুরেন্ট। এখানে শুধু যুগলরা আসে। এত ভালো নীরব পরিবেশ। কোরাল ফিস না-কি বলে, খেতাম না আগে। এখন ভালো লাগে খেতে। বাসায় বলি, স্বপ্নতে কেনাকাটা করতে যাচ্ছি। আসার সময় টুথপেস্ট, সাবান, নুডুলস এটা সেটা কিনে দেয়। ও এখন আমাকে স্পর্শ করতে চায় না, ‘বলে তোমার আব্বু বকবে।’ আমি বলি, ‘আব্বু কি এখানে আছে নাকি!’ বলে ‘বাসায় গেলে তোমার অবস্থা দেখলে টের পাবে।’ আমি বলি, ‘হয়েছে সাধুগিরি।’

ও তো আমাকে মালদ্বীপ নিয়ে যেতে চায়। দজ্জাল বাপটা দেবে না ওর সাথে যেতে। আমি ওকে প্রথম থেকে বলেছি হানিমুনে যাব ওখানে। তবে তার আগেই মনে হয় কবরে যাব আমি। এভাবে আর থাকা যায় না। প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। তখন আব্বু মানবে বোধহয়। এখন এভাবে বিয়ে করলে আব্বু হয়তো স্ট্রোক করবে। ওনার কাছে মানসম্মানটাই সবার আগে। এটাতে কম্প্রোমাইজ করে না । ২০১৯-এর পর থেকে কত ছেলে এনেছে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আমার পছন্দ না শিশু টাইপের এসব ছেলেদের। আমি রিজেক্ট করেছি। বলেছি এদের একটাও আমার পছন্দ না। মারও খেয়েছি অনেক। বড় হয়েছি তাও থাপ্পড় দেয়। খুব ব্যথা পাই।

নেহাল আমার কাছে এলেই ওর স্ত্রী টের পায়। ফোনের উপর ফোন দিয়ে বিরক্ত করে। আমাকে বলে মাগি! অনেক টাকা অফার করে। বলে কত টাকা হলে তার স্বামীকে ছাড়ব! আরও জঘন্য টাইপের কথা বলে। আমি নাকি লোভে পড়ে ওকে পটিয়েছি। কী লোভটা করলাম! ওর কাছে কী এমন নিয়েছি, না অর্থ না সম্পদ, কিছু তো নিইনি। ওর নতুন কেনা ফ্ল্যাট সম্ভবত পরের বছর রেডি হবে। এটা আমাকে নিতে বলেছিল, আমি না করে দিয়েছি। ওর স্ত্রী এটাকে কেন্দ্র করে আমার সাথে লেগেছে। একবার, মাত্র একবারই তার সাথে দেখা হয়েছে। আমি দেখা করতে চাইনি। ও বলল ‘চলো, সে দেখা করবে, আমি তাকে ম্যানেজ করেছি।’ আমি তাও যেতে চাইনি, পরে বিশ্বাস করে গেলাম। গিয়ে ঐ মহিলার কী রূপটা দেখলাম! আমাকে কী যে অপমান করল। তাও একটা রেস্তোরাঁর ভেতরে। আমাকে মারতে এসেছিল। সে আটকে ধরেছিল তাকে। আমি কান্না করে চলে এসেছি। ও শিউরিটি দিয়েছিল ওর স্ত্রী নাকি স্বাভাবিকভাবে দেখা করবে আর আমাকে খারাপ কিছু বলবে না। হয়তো তার স্ত্রীর প্ল্যান ছিল কৌশলে ডেকে আনবে। বলেছিল সে সমঝোতা চাইছে। কিন্তু তার স্ত্রীর ভেতরে কুবুদ্ধি ছিল। নয়তো সে আমাকে দেখা করতে নিয়ে যেত না।

আমি যতবার জখম হয়েছি, সেও হয়েছে। সে মদ খেয়ে কী রকম করে হাত কেটে ফেলে। আমাকে ভিডিও পাঠাত। কী জঘন্য ভাবে কাটত নিজের শরীর। বলত তুমি একা পারো নাকি। এই ভয়ে আমি জখম হওয়ার আগে দশবার ভাবি। আমি ঘুমের ট্যাবলেট খাই। আব্বুর ওষুধ চুরি করে একদিনে চারটা খেয়ে ফেলছিলাম। তিন দিন কোমাতে ছিলাম, বাঁচার আশা ছিল না। আগে আব্বু মোবাইল কেড়ে নিত যোগাযোগ বন্ধ করার জন্য। এভাবে কয়েকটা মোবাইল আছড়ে ভেঙেছে। আমি এমনই, ঝগড়া লাগলে কী থেকে কী করে বসব ঠিক নেই। ওর সাথে থাকলে খুব সুখী অনুভব করি। ও আসলে খারাপ মানুষ না। লোকটা আমাকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য লড়ে যাচ্ছে। আমাকে সবসময় বলে বইতে ফোকাস দাও। আমি বলি, ‘আমার ফোকাস তো তুমি।’ তখন বলে, ‘পাগলি! পড়াশোনাটা ভালোমতো কর।’

মাঝখানে সে একবার বড় অ্যাকসিডেন্ট করল। ভাবছি আল্লাহ এই বুঝি কেড়ে নিল তাকে। দেখতেও যেতে পারিনি। এক মাস হসপিটালাইজড ছিল। কিন্তু ওর অ্যাকসিডেন্ট হবার পরও সে আমাকে মনে রেখেছে। আমাকে এইটুকু বলছে, হসপিটালে গুরুতর অবস্থায় আছে। আমাকে বুঝতে দেয়নি বড় অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। ও ভাবছে শুনলে আমি কষ্ট পাব। এখন ওর জামা খুলে দেখলে বিশাল একটা দাগ চোখে পড়ে। শরীর শিউরে ওঠার মতো।

এর মধ্যে ভালো খবর হলো গত ১৪ তারিখে দুইটা ভাইভা দিয়েছি। একটা সিভিল এভিয়েশনে আরেকটা বিএফএ শাহীন কলেজে। কিন্তু একটা ভাইভাও ভালো হয়নি। সিভিল এভিয়েশনে নেহালের ব্যাচের অফিসার ছিল কয়েকজন। আমাকে বলে তুমি তো ইংরেজির ছাত্রী। সেজন্য ক্রিকেটে একটা ধারাভাষ্য থেকে সেনটেন্স ধরেছে। বলে, ‘এটা কেন বলা হয় ? এর অর্থ কি ? ব্লা ব্লা…।’

আমি উত্তর জানি না, কী উত্তর দেব! তারপর বলে ইংরেজির স্টুডেন্ট এটা জানো না! সাথে সাথে ইনসাল্ট করে। তারপর বলে, ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস কার লেখা ?’ যখন মিলি সেকেন্ডে উত্তর দিলাম তখন আর এখান থেকে ধরে না প্রশ্ন। চলে গেল আরও অপদস্থ করার জন্য। আবারও পারলাম না, আবার ইনসাল্টেড হলাম। একটা ছাড়া আর কিছু পারিনি, সব আমার রেঞ্জের বাইরে ছিল। এরপর জিজ্ঞাস করল, ‘ংযধষষ আর রিষষ-এর পার্থক্য কি ?’ আমি বলেছি, ‘মডার্ন গ্রামারে ংযধষষ-এর ব্যবহার উঠিয়ে দিয়েছে রিষষ দিয়ে সবখানে চালানো যায়।’ ওরা বলে, ‘হয়নি।’ এখন মডার্ন গ্রামারে শুধু রিষষ ব্যবহার করা হয়। আসলে ওরা তো আগের পাস করা। তাই আগেরটা জানে। নতুনটা জানে না। ংযধষষ পুরাপুরি তুলে দেবে ভবিষ্যতে।

আব্বু সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল সিভিল এভিয়েশনে। আব্বুকে সেদিন অনেক খুশি দেখেছি। ভাইভা থেকে বের হয়ে আব্বু জিজ্ঞেস করছে, ‘কেমন হলো ?’ আমি বলেছি, ‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো।’ ওনাকে আর বুঝতে দেইনি। তারপর চলে গেলাম কুর্মিটোলা। সেখানে গিয়ে ডেমো ক্লাস দিল তাও আবার ইংরেজি মিডিয়াম সেকশনে। স্টুডেন্টগুলো খুব অ্যাডভান্সড, সাথে বিমানের বড় কর্তাগুলা দাঁড়িয়ে ছিল। টপিক ছিল ন্যারেশান। এখানেও ভালো করতে পারিনি। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ক্যান্ডিডেট ছিল। ওদের হবে হয়তো।

আর একটা পরীক্ষা ভালো দিয়েছি। রেজাল্ট দিচ্ছে না। ভাইভা কল পাব আশা করি। আমার জন বলছে সিভিল এভিয়েশনে নেপোটিজম আছে। আমি বলেছি, ‘আছে তাতে কি হয়েছে! আমি কি বলেছি তোমাকে রেফারেন্স টানতে ? হলে হবে না হলে নাই। শত শত ভাইভা দেব। একটা তো নিশ্চয়ই হবে।’

বিমান হেডকোয়ার্টার তিনটাই ছিল বেসামরিক পদ। আমার টার্গেটও ছিল বেসামরিক পদ। আল্লাহর রহমে দুইটা ভাইভা দিয়েছি, আরেকটা দিব। নবম গ্রেড। আমার ও বলে, ‘এখানে জব হলে তাকে নাকি ভুলে যাব ব্লা ব্লা…।’ আমি না ওকে চিমটি কাটি। রাগ উঠলে কামড়েও দিয়েছি।

এখন মাঝেমধ্যে খেতে যাই। আসলে দেখা করতে যাই, স্বপ্ন আউটলেটের অপজিটে পাপা রেস্তোরাঁতে আর রিভার ভিউ-এ। সেক্স করার জন্য ওর নির্দিষ্ট একটা হোটেল আছে। ঢাকায় অনেক ব্রাঞ্চ আছে এদের। খাবার হোটেলের বাইরে সিক্রেট সার্ভিস। খুবই সিকিউরড। কতটা সিকিউরড হলে সে সেখানে আমাকে নিয়ে যায়!

নেহালের বয়স আটান্ন। সামনে রিটায়ারমেন্ট এক বছর পরে। চুক্তিভিত্তিক হলেও হতে পারে। ও আগে সিগারেট খেত আমি ছাড়িয়েছি। মুখে মুখ দিলে সিগারেটের গন্ধ বিশ্রি লাগে। আমি ওর জীবনে আসার আগে দুই চারজন গিলেছে। এসব নিয়ে খোঁটা মারি কখনও কখনও। বেচারা মন খারাপ করে। বলে, আমি আসাতে ওদের সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। আগে ওর সার্কিট হাউসের রুমের কোনায় কোনায় সার্চ করেছি ভিডিও কলে। ওর হোয়াটসঅ্যাপ সব তানাফানা করতাম। দিতে চাইত না। বলে, ‘অফিসের নিষেধ আছে।’ আমি বলেছি, ‘অফিস বড় না আমি ?’ তখন ভীষণ অভিমান করে দেখাতো। বলতাম, ‘এই মেয়েটা কে ? ওটা কে, এটা কে ?’ ও বলে, ‘কলিগ এসব।’ আমি তারপর কন্টাক্ট লিস্ট দেখতে চাইতাম। আমি বলেছি, ‘এত নাম্বার কেন ?’ উত্তরে বলেছে ‘বিসিএস হও বুঝবে।’ আগে সন্দেহ করতাম খুব। এখন ছেড়ে দিয়েছি। অশান্তি হয়, ঝগড়া লাগে। না খেয়ে থাকি দুজনে। এখন আর এসব দেখতে চাই না।

কিছুদিন আগে একবার ভূমিকম্প হয়ে গেল। ভূমিকম্পের দিনে কেমন অনুভূতি হয়েছিল বলি। আমাদের বারো তলা ভবন তো মনে হচ্ছিল এই বুঝি ধসে পড়বে। তখন মরতে ইচ্ছে হচ্ছিল। একদম বাঁচতে চাইনি। আল্লাহ বাঁচিয়ে দিল। কিন্তু এখন আবার মরতে চাই। বিসিএস-এ কোয়ালিফাই না করতে পারলে মরে যাওয়াই ভালো। সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি। অন্তত একটা সম্মানজনক জব না পেলে সুইসাইড করব। 

তিন

রাত তিনটা। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে অনেকটা সময় বসে আছি। আমি একটা ম্যাসেজ লিখব। ঘরে শুধু টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। শেলফের বইগুলা এলোমেলো। আব্বুর রুম থেকে ট্যাবলেট এনে রেখে দিয়েছি। এবারে চারটা নয়, পুরো এক পাতা। মোবাইল ফোনের বোতামগুলো নাড়াচাড়া করছি। আমার বিসিএস-এর খবর সে জেনে গেছে নিশ্চয়ই। কয়েক দিন আগে অফিসের কাজে হঠাৎ কোথায় চলে গেল, গিয়ে ঠিকমতো কথা বলে না। মফসসলে নেটওয়ার্ক ডিস্টার্ব বলে। এখন এতটা সত্যি মিথ্যা কীভাবে যাচাই করব!

মোবাইল ফোনের স্ক্রিন অন করে সামান্য স্ক্রল করতেই একটা নিউজ ফিড। ছবিতে চোখ আটকে গেল। নেহাল করিম! সংবাদের শিরোনাম: দুর্নীতির দায়ে যুগ্ম-সচিব নেহাল করিম গ্রেফতার। বিস্তারিত বিবরণ পড়ে দেখার সাহস হলো না। ছবিতে পাশের মেয়েটির মুখ ব্লার করা। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার স্ক্রিনে চোখ চলে গেল। ‘বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের একাধিক মামলায় সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত যুগ্ম-সচিব নেহাল করিমকে একজন নারীসহ মংলার অদূরে সুন্দরবন সংলগ্ন একটি রিসোর্ট থেকে…।’ নেহালকে ব্লক করে মোবাইলটা টেবিলে ছংড়ে ফেলে দিলাম। 

ভোরের আজান হলো। আমি ঘুমাইনি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখলাম। নেহালের মুখোশটা খুলে পড়েছে।  হঠাৎ মনে হলো, আমি প্রেমে পড়িনি। রিমির জন্যে কোথাও কোনও ভালোবাসা নেই। সে প্রতারণার জাল ছড়িয়েছিল। আর আমি একটা ধূর্ত ক্ষমতাবান পুরুষের ন্যারেটিভে আটকা পড়েছিলাম। বাতি নিভিয়ে এখন ঘুমিয়ে পড়ব।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button