
মানববাবুর বয়স হয়েছে। আশি বছর হয়েছে তা-ও অনেক দিন আগের কথা। একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘এ দেশে অশীতিপর বৃদ্ধের সংখ্যা খুব কম। দেখুন, কোটি কোটি মানুষের দেশে আনুপাতিক হারে বৃদ্ধের সংখ্যা কিন্তু কম। শুনেছি দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, কিন্তু গ্রামে তো আমার বয়সের কাছাকাছি একজনও জীবিত নেই’। তবে কথাটা তিনি কবে বলেছিলেন সেটা তার আর স্মরণে নেই। এখন তার বয়স নব্বই ছুঁই ছুঁই করছে। শুভ্রকেশ, মুখ ও কপালের ওপর ভারী বলিরেখার চিহ্ন, একসময়ের কাঁচা হলুদ গায়ের রঙ কালচে তিলে পরিবৃত হয়ে আছে। তবু বনেদি ব্রাহ্মণ বলে কথা। তার চোখ এবং নাসিকার কারুকাজ সাধারণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পদযুগল সঞ্চালনের ভঙ্গিও অন্যরকম। পরিচয়ে এরা জাতব্রাহ্মণ। বাবা-মা, ভাই-বোন, কেউ আর অবশিষ্ট নেই। সে শুধু একাই পড়ে আছে পৈতৃক ভিটার ওপরে নির্মিত কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন অট্টালিকার কুঠুরির ভেতরে। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, মাকে তার কখনও মনে পড়ে না, খুব শিশুবেলায় মাতৃহারা হন। বাবা আর দাদুর স্মৃতিই তাকে সতেজ সজীব অনুভূতি এনে দেয়। তার জন্ম এবং শৈশব কাটে ব্রিটিশ ভারতের মাটিতে। দেশভাগের সময় সে স্কুল পড়ুয়া ছাত্র।
মানববাবুদের আত্মীয়-স্বজন প্রথমবার এ দেশ ছাড়ে ’৪৭ সালের পূর্বাপর দাঙ্গার সময়ে। দ্বিতীয়বার যখন যায় তখন পাক-ভারত যুদ্ধ চলছিল। ছোটভাই প্রাণেশ রায় ও ছোট চাচা প্রণব রায় তখনই জন্মভূমির সহায় সম্পদের মায়া ত্যাগ করে ওপার বাংলায় পাড়ি জমায়। একরোখা মানুষ বলে তাকে সঙ্গে নিতে পারেনি। একজন শিক্ষিত, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক মানুষ তিনি। তার রক্ত ও ধমনিতে প্রবাহিত হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া জমিদারের অমিত তেজ। মানববাবু নিঃসন্তান এবং নিজ এলাকা থেকে বারবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত জনবান্ধব মানুষ। শত ঝড়-ঝঞ্ঝায় দেশ ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে তিনি কখনওই না। জন্মভূমি তার কাছে স্বর্গাদপি গরীয়সী। গোটা বংশের পরম্পরায় তিনিই পূর্বপুরুষের মাটিকে আঁকড়ে ধরে আছেন। এখন জীবন সায়াহ্নে এসে উঠানের ঘাসের ওপর দাদুর ব্যবহৃত ছেঁড়া মাদুরটা বিছিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে চিত হয়ে শুয়ে থাকেন। পথচারী, পর্যটক, নানা শ্রেণির মানুষ আসে, মানুষ ফিরে যায়। এসবকিছুতে তার ভ্রƒক্ষেপ নেই, শতভাগ চৈতন্য নেই। তার চারপাশে অতীত দিনের দাসদাসীর মতো একাধিক কাজের লোক আছে। তবু তিনি একা এবং একজন হয়ে আছেন।
তাদের পুরানো বাড়িটার দীর্ঘ প্রাচীর, পতনোন্মুখ ভবন, কাঠের সিঁড়ি, পাটাতন, অজগর সাপের মতো দাগওয়ালা দেয়ালের ভাঁজে ভাঁজে পরগাছার সবুজ শাখা নিয়ে থোকা থোকা পরজীবী বটবৃক্ষের পত্রপল্লব বাতাসে দোল খাচ্ছে। মনে হয় কালের নিঃশব্দ যাত্রায় প্রকৃতিই দখল করে নিয়েছে সমগ্র বাড়িটার পেছনের ইতিহাস।
দুই
এক প্রসন্ন বিকেলে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে মানববাবুদের জমিদার বাড়িতে হাজির হলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী রশীদ খান। তিনি বাবুর অনেক দিনের পরিচিতজন। নিজ জেলা শহরে বেড়াতে এসে শহরের নিকটতম উপজেলায় বসবাসকারী মানববাবুকে এক নজর দেখতে এলেন তাদের গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়িতে। একসময়ে মানববাবু স্থানীয় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। সে সুবাদেই রশীদ সাহেবের সঙ্গে তার হৃদ্যতা ও আন্তরিক সম্পর্ক হয়। তাছাড়া তারা উভয়ই একই জেলার বাসিন্দা। যদিও পূর্বে বাবুদের জমিদারবাড়িতে আসা হয়ে ওঠেনি।
মনে পড়ে, সেদিনের আকাশটা ছিল অপূর্ব স্বচ্ছ ও নীলাভ। সোনাঝরা বিকেলের মৃদুমন্দ হাওয়ায় পুরোনো রাজবাড়ির সামনের খোলা মাঠের সবুজ দূর্বাঘাসে সাদা ও কালো দুটো গাভী চড়ছিল। পাশে ছোট্ট একটা বাছুর লেজ তুলে এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি করছিল। গাভি দুটোও নির্ভার হয়ে মনের আনন্দে ঘাস খাচ্ছিল। কয়েকজন শিশু স্কুলছাত্রী বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। তাদের সঙ্গে একজন ম্যাডাম গাইড হিসেবে কাজ করছিল।
রশীদ খান গাড়ি থেকে নেমেই মানববাবুর খোঁজ নিলেন। একজন সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে গিয়ে তার আগমনের খবর জানালেন, কিন্তু বাবু ঠিক চিনতে পারছে না কোন রশীদ ? একটু বিব্রত হলেও সময়টাকে মেনে নিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করলেন তিনি। খানিক পরে কোনও অনুমতির তোয়াক্কা না করে রশীদ সাহেব নিজেই অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন। তাকে অনুসরণ করছে বাড়ির একজন বয়োবৃদ্ধ কর্মচারী। তিনি দেখলেন, মানববাবু ঘোর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে খাটের এক পাশে উলটো হয়ে পড়ে আছেন। যেন ভুলে গেছেন আজ কার আসার কথা ছিল ? নাম ধরে ডাকতেই তিনি সচকিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন―‘সরি, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম’। রশীদ খান দেখলেন বাবু তাকে ঠিক স্মরণ করতে পারছেন না। রশীদ তখন নিজেই সকল পরিচয় দিলেন। এবার চিনতে পেরে রশীদের স্কন্ধ বরাবর হাত রেখে মোলাকাত করলেন বাবু। এবং হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলেন। তার কাঁপা কাঁপা ডান হাতটা প্রসারিত করে বললেন, সামনে তাকান, ডানে বাঁয়ে দেখুন, এই যে পতিত জমি, ফসলের মাঠ, সুবিশাল জলাশয়, পুকুরে মাছের চাষ এমনকি সাম্প্রতিক কালে রাস্তার ওপর গড়ে ওঠা বাজার-হাট এগুলো সবই আমার কয়েক পুরুষের ভূমি এবং সেকালের জমিদারি। আজ আমার নিয়ন্ত্রণের আওতায় না থাকলেও আমি দেখি আর অশ্রুজলে বাবা, দাদুকে মনে করি। আমি মানুষকে ভালোবাসি, ভালোবাসি তাদেরকেও যারা জাল জালিয়াতি করে আমার বাপ-দাদার ভূমি দখলে নিয়ে দিব্যি বেঁচে আছে।
তিন
অনতিদূরেই জোড়া জোড়া পুকুরের অনেক খামার দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা কিছু একটা উপায় বের করে এসব ভোগ দখল করে চলেছে। অতিথি এলেই মানববাবু সেখানে নিয়ে যান মাছের খেলা দেখাতে। তখন পশ্চিম দিগন্তে সূর্যাস্তের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। পুকুরের মৃদু তরঙ্গায়িত জলে নানা জাতের মাছের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। মাছরাঙা-জাতীয় কয়েকটি বুনো পাখি পানির ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে ওড়াউড়ি করছে। যেন অন্ধকার নামার আগে এদেরও নৈশভোজের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। রশীদ খান ভাবলেন, কী অদ্ভুত সাদৃশ্য! যেন এই দৃশ্যপটের সঙ্গে মানববাবুর জীবন প্রদীপেরও একটা কাল্পনিক মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
একটা বড় পুকুরের প্রশস্ত পাড় দিয়ে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে হাঁটতে রশীদ খান জিজ্ঞেস করলেন,
আচ্ছা বাবু, এসব পুকুর কি আপনাদের নিজের জমিতে করা হয়েছে ? কারা করেছে ? লিজ দিয়েছেন কী ?
দেখুন, এগুলো এখন আমার চিন্তার বাইরে। আমার এই পথ দেখাতেই আনন্দ। কারা করে, কী করে, সেদিকে না যাই। পরিচিত মানুষজন এলে নিয়ে আসি। দেখাই, কথা বলি, গ্রামের মানুষকে দেখি, তারা কথা বলে, আদব লেহাজ করে বেশ, এখন এটাই আমার একমাত্র চাওয়া। এগুলো আজ যেমন আছে, আগামীকালও হয়তো থাকবে।
রশীদ সাহেব তাকে আর কোনও পারিবারিক বিষয়ে প্রশ্ন না করে সোজা পেছনে চলে গেলেন।
বললেন, মনে আছে অনেক বছর আগে আপনি একবার আমার ঢাকার সরকারি কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন ?
আপনার সাথে আরও দু’জন কর্মচারী ছিল। আপনি তখন চেয়ারম্যান।
হ্যাঁ মনে পড়ছে। সেটা ২০/২৫ বছর হয়ে গেছে।
রশীদ আরও বললেন, সেদিন আমার স্ত্রী নাশতা রেডি করে দিলে আপনি বলেছিলেন, ‘না না শুধু চা নিব। একটু আগেই বাসা থেকে মাখন-সেদ্ধ ভাত খেয়ে এসেছি’। আপনি কি এখনও মাখন-সেদ্ধ ভাত খেতে পারেন ?
না, আজকাল আর তা হয় না। আমার স্ত্রীর চলে যাওয়ার পরে খাবারেও পরিবর্তন চলে আসে। দেখুন, আমার সব আছে কিন্তু পরিবেশনকারীর বড় অভাব। তারা বুঝতে পারে না আমার কী প্রয়োজন।
এবার রশীদ সাহেব বললেন, বাবু, আমার সেই স্ত্রীও কয়েক বছর হলো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আমিও নিঃসঙ্গ।
মানববাবু একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বললেন, আহা! সকলেরই অনন্তলোকে যেতে হচ্ছে। একবার ভাবুন, আমার তো কেউ নেই। মায়ায় পড়ে জড়িয়ে ধরে আছি, মাটির সাথে লেপ্টে আছি। অথচ এই দুনিয়ায় আমার মুখাগ্নি করারও কেউ নেই। থাকলেও এই দেশে এই মাটিতে নেই। এখন আমার সারা দিন কেটে যায় গান-বাজনার সুরে সুরে। তবে রাতটা কাটে না। আমার প্রতিটা রাত দীর্ঘতর হয়, সূর্যোদয়ের আশায় আশায় বেঁচে ওঠি।
চার
তখন চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। পুকুর পাড় থেকে গাড়িতে করেই ফিরে এলেন সবাই। মনে হচ্ছে, অস্পষ্ট ভূতুড়ে একটা গলি দিয়ে প্রবেশ করছে গাড়ি। দিনের আলোয় যে জ্যোতির্ময় দৃশ্যাবলি উদ্ভাসিত হয়েছিল জমিদারবাড়ির আঁট কুঠুরিতে। অন্ধকারের চিত্র এর সম্পূর্র্ণ বিপরীত। রশীদ সাহেব রীতিমতো ভয় পাচ্ছিলেন, মনে মনে ভাবছিলেন―
এই প্রকাণ্ড নির্জন দেয়ালের ভেতরে সরীসৃপের আস্তানায় কোনও মানুষ বাস করতে পারে না।
এবার মানববাবু জমিদারসুলভ ভাষায় তার তবলচিকে নির্দেশ দিলেন, কোথায় তোমরা, আমার অতিথি কি গান না শুনে চলে যাবেন ? জলদি জলসাঘরে যাও। বাতি জ্বালাও।
সেখানে তার নিজস্ব বেতনভুক দুজন শিল্পী, হারমোনিয়াম, তবলা, মোমের আলো সবকিছু প্রস্তুত আছে। এটা তার নিত্যদিনের আসর। এই জলসাঘরেই বাবুর রাতের একটা প্রহর কাটে।
এদিকে রশীদ সাহেব বারবার ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ রাখছেন, তাকে ফিরতে হবে দূরে, অনেকটা পথ যেতে হবে।
একজন তরুণ শিল্পী গান শুরু করল, তার মাথায় বাবরি চুল। শুরু করল সেই হারানো দিনের বাংলা গান―হিরন্ময় কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখার্জির কালজয়ী ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যেন পিছু ডাকে―।’
রশীদ খান ভাবছেন, এখন কোনও রকমে সময় পার করা দরকার। এমন আতিথেয়তাকে অশ্রদ্ধা করা যাবে না। শিল্পীর গায়কীতে ভুলত্রুটি যা-ই হোক বলা যাবে না। দ্বিতীয় শিল্পীর নাম কৃষ্ণদাস। সে অপেক্ষাকৃত ভালো গায়ক। তবু সে হারমোনিয়ামটা স্পর্শ করতেই রশীদ সাহেব বলে উঠলেন, না না, আমরা মানববাবু’র কণ্ঠে গান শুনতে চাই।
গানটা তিনি দরদ দিয়েই গাইতে চাইলেন কিন্তু তাল লয়ে হেরফের হবে তার বয়সের কারণে। অশীতিপর বয়সে যে গান মান্না দে স্বয়ং সহজে গলায় তুলতেন না সেই বিখ্যাত গানটি ধরলেন মানববাবু।
‘আমি যে জলসাঘরে বেলোয়ারী ঝাড়, নিশি ফুরালে কেহ চায় না আমায়, জানি গো আর।’
তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। স্বরটা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে আসছিল। আহা, তিনি চেষ্টা করছিলেন, হুবহু গাইতে,
‘আমি যে আতর ওগো আতরদানে ভরা
আমারি কাজ হলো যে গন্ধে খুশি করা’
জানা যায়, এ গানটি তিনি প্রতি রাতেই একবার গেয়ে থাকেন।
সেদিন প্রায় ঘণ্টাখানেকের এমন এক বেসুরো সঙ্গীতানুষ্ঠানের মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে সঙ্গীত-বোদ্ধা রশীদ খান সাহেব এর ওপর একটা ছোটখাটো বক্তৃতা দিয়ে দিলেন।
প্রখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এই রাগাশ্রয়ী গানের শিল্পী কিংবদন্তি মান্না দে। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘এন্টনী ফিরিঙ্গী’ ছবির জন্যে তিনি গানটি গেয়েছিলেন। একই ছবিতে তাঁর আরও একটি ল্যান্ডমার্ক গান ছিল,
‘আমি যামিনী তুমি শশী হে―
ভাতিছ গগন মাঝে।’
এতে সুর করেছিলেন অনিল বাগচী। এই ছবির জন্যই মহানায়ক উত্তম কুমার সে বছর সর্বভারতীয় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছিলেন’।
মানববাবুর জানা ছিল না রশীদ খান গানের এত বড় সমঝদার মানুষ বা গানের ইতিহাস জানা সঙ্গীতপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি অভিভূত হয়ে রশীদ সাহেবকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘রশীদ ভাই, দেখলেন তো, আমি সত্যিই অন্ধকারে আছি।’
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



