
ব্রিটিশ আমলের তৈরি লাল ইটের দুটি কামরা। এক ঘরে ঘোড়া, আরেক ঘরে কোচোয়ান মকবুলের ছোট সংসার। দুটো ঘরই একসময় আস্তাবল ছিল খাজা ফিরোজ শাহের, এখন মকবুলই এর মালিক। একবার ফিরোজ শাহের মা খদিজা বেগম হঠাৎ দারুণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে টমটমে করে মিটফোর্ড হাসপাতালে আনা নেওয়া করতে হতো দিনে-রাতে, যখন তখন। খাজা সাহেবের মা মকবুলকে খুব স্নেহ করতেন, কাজের প্রতি তার নিষ্ঠা আর সত্যবাদিতার জন্য। হাসপাতালের বারান্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে বসে থাকত খদিজা বেগমের কুশল জানার জন্য। খদিজা বেগম হুকুম করে খানসামা বা নোকরের হাতে তার জন্য শাহি-খানা পাঠাতেন। সেই খাবার বাড়িতে নিয়ে ছেলেমেয়ের সঙ্গে ভাগ করে খেত মকবুল।
ছোট মেহজেবিনকে সঙ্গে নিয়ে খদিজা বেগমকে দেখতে গিয়েছিল মকবুল। বিছানায় শায়িত খদিজা বেগম অনেক আদর করেছিলেন মেহজেবিনকে। সেদিন মকবুলের সামনেই তিনি ছেলেকে বলেছিলেন, ‘আমরা হগলেই অহন টমটম বাদ দিয়া গাড়ি ধরছি, মকবুলরে আর চাকরিতে রাখব ক্যাঠা! কথা হইল, মকবুল ক্যামতে বাঁইচা থাকব, বালবাচ্চারে মানুস করব! সাদা-সিধা মানুসটা কুনোদিন কিছু চায় নাই আমগো কাছে, জান-পরান দিয়া কামই কইরা গেছে। কই কি, আস্তাবলের ছোট তিন শতাংশের জমিনটা মকবুলের নামে হেবা কইরা দিলে কেমুন অহে ? হেবার দলিল হাতে দেওনের পর কিন্তুক জমিনের উপ্রে আর কারও পোদ্দারিই খাটব না খাজা বংশের, এইটা মনে রাখতে হইব।’
কথা রেখেছিলেন খাজা ফিরোজ শাহ। মায়ের মৃত্যুর পর জমির দলিল করে দেওয়ার পর বলেছিলেন, ‘অখন থিকা জমিনের মালিকানা ষোলো আনাই তুমার মকবুল। তয় আম্মাজান চোখ মুনজার আগে আমার হাত ধইরা একখান কথা কইছিলেন জমি লয়া… ’
‘কী কথা হুজুর ?’
‘কইছিলেন, জমিনটা য্যান মকবুল বিক্রি না করে, আমার আত্মায় কষ্ট পাইব।’ চোখের জলে ভিজে মকবুল বলেছিল, ‘না হুজুর, এই জমানায় ছোট জমির বড় দাম অইতে পারে, মাগার জমিন আমি বেচুম না। এই জমিনে উনি যে কতবার বেড়াইবার আইছেন, গনিয়ারি গাছের চাইরদিকে ঘাসের উপ্রে খালি পায়ে ঘুরছেন। আমিই উনারে লয়া গেছি টমটম কইরা। এই মাটির মইদ্যে আপনের আম্মাজানের অনেক মায়া-মহব্বত মিশা আছে, সেইটা তো ব্যাচনের জিনিস না হুজুর। জবান দিলাম, না খায়া থাকলেও জমি আমি বেচুম না, জবানের উপ্রে আর কিছুই নাই হুজুর।’
খাজা ফিরোজ শাহ বললেন, ‘তোমার চোখে পানি ক্যান মকবুল, এত্ত বড় আনন্দের সমে একটু হাইসা কথা কও।’ মকবুল কষ্ট করে হাসে, ‘জি হুজুর, জমিনের মালিক অইয়া মনে অইতাছে, আমি অহন নবাব বংশেরই একজন হয়া গেছি।’
‘হ, অইছ তো, অহন থিকা তুমি খাজা মকবুল, যতদিন জান আছে, জমিন আছে ততদিন তুমি খাজা মকবুল, মাইনসে যে যাই কউক।’
২
সন্ধ্যা থেকে টিপির টিপির বৃষ্টি পড়ছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের জোর বাড়ল, রীতিমতো ঝড় শুরু হয়ে গেল। খাজা মকবুলের শিয়রে বসে আছে তার মেয়ে মেহজেবিন। রাত বারোটা বাজে, তবু কাশি আর বুকের ব্যথায় ঘুমাতে পারছে না মকবুল কোচোয়ান। বেশ কয়েক দিন ধরে বিছানায় পড়ে আছে সে, টমটম নিয়ে রাস্তায় নামতে পারে না। মেহজেবিন ডাল আর কাঁড়া গমের সুরুয়া খাওয়ানোর চেষ্টা করছে বাবাকে। হঠাৎ করে ছোট মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। অসুস্থ মকবুল অস্থির হয়ে পড়ল, ‘এত রাইতে আবার ক্যাঠায় ফোন করল, ঠ্যাকায় পড়ছে নাকি কেউ!’
জাজিম ব্যবসায়ী রশিদের ফোন। টমটমের কোচোয়ানি ছেড়ে এখন সদরঘাটে ডাবের খোলা ছেঁচে জাজিমের ব্যবসা ধরেছে সে। রশিদ মিনতি করে, ‘খাজা ভাই, অনেক রাইতে ফোন দিলাম। পোলার বিবির যে বাচ্চা অইব, এইটা তো হুনছেন আগেই। আথকা ব্যথা উঠছে, অকখনি মিটফোর্ড হাসপাতালে লইতে না পারলে আল্লায় জানে কী অইব। বিষ্টি-বাদলার মইদ্যে গলির রাস্তা সুমসান, এউগা কুত্তাবি নাই, রেস্কা, ভ্যান, অটো সব ফুটছে, ভিজ্যাপুইড়া যে হাসপাতালে যামু এইরহম অবস্থাও নাইক্যা। পোলায় নাই বাড়িত, অয় তো সদরঘাটে গদিতে, ঘাট থিকা বাড়িত আহনের টাইম পাইব না। অহন কী যে করি ভাই, এত রাইতে আপনেরে ফোন দিয়া জ্বালাইবার লাগছি।’
মকবুল তাকে আশ্বস্ত করে, ‘পোলার ঘরে নাতি অইব, বংসের বাত্তি জ্বলব, এইটা তো সুখের খবর রসিদ, তুই ঘাবড়াইস না। আমি দ্যাখতাছি, দেহি আবুইলার লগে জেবিনরে পাঠাইতে পারি নাকি!’
মেয়েকে বলে, ‘দ্যাখতো মা টমটম লইয়া যাইতে পারস কি না, রসিদ্যায় বিপদে পড়ছে।’ জেবিন দুঃখ করে, ‘হাচাই তো মুশকিলে পড়ছে চাচায়, যাইতে অইলে যামু, সমেস্যা নাই আব্বা। টমটম চালান তো তুমিই হিগাইছ আমারে, চিন্তা কীয়ের, কথা অইল তুমার আবার ঘরে একলা থাকন লাগব।’
‘আমি গরম সুরয়া আর দাওয়াই খায়া এট্টু দাবছি জেবিন, তুই পারলে লয়া যা, ঠেকাঠেকির সমে মাইনসের লেইগা মাইনসেই আউগাইয়া আহে।’
সুইচ টিপে আস্তাবলের বাতি জ্বালায় জেবিন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছিল দুলদুল আর বুলবুল। বাতি জ্বলতেই সজাগ হয়ে উঠল তাদের ইন্দ্রিয়, উৎসুকভাবে কান খাড়া করে জেবিনের দিকে তাকাল তারা। জেবিন তাদের গলা ধরে আদর করল, ‘আইজ বিষ্টির মইদ্যে তগো ঘুম হারাম করাইলাম, ঝটপট যাইতে অইব মিটফোর্ডে। সামনেই রাস্তায় পড়ব রসিদ চাচার বাড়ি, সেইখান থিকা সোয়ারি লইতে হইব।’
ঘোড়াদুটো বুঝে নেয়, জরুরি কারণে এই ঝড়জলেও সোয়ারি নিতে হবে, যেমনটা তারা নিয়ে যেত ফিরোজ শাহের আম্মা খদিজা বেগমকে। জেবিন ঝট করে বোরকা পরে, ছাতা মাথায় দিয়ে ঘোড়াদুটোকে টমটমের সঙ্গে জুতে নেয়। ছোট ভাই আবুল চোখ কচলাতে কচলাতে কোচোয়ানের আসনে উঠে বসে, জেবিনের মাথার উপর ছাতাটা ধরে। লাগামে ঢেউ তুলে ইশারা দেয় জেবিন, চল হাট দুলদুল। চার চাকার টমটম আটপায়ে এগিয়ে চলে টিমটিমে বাতিজ্বলা রাস্তায়। কাদা বৃষ্টি ভেজা কংক্রিটের রাস্তায় ঘোড়ার পায়ের টকটক শব্দগুলো বাজে না, মনে হয় ঘোড়াগুলো গ্রামের কোনও রাস্তা দিয়ে চলেছে।
রশিদ চাচা অধীরভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ছেলে-বউকে নিয়ে। গাড়ি দেখেই উল্লসিত হয়ে বলে ওঠে, ‘এইত্তো আয়া পড়ছে মেহজেবিন, আর কুনো চিন্তা নাই মা, আল্লা রহম করছে।’ জেবিন সালাম দিয়ে নিচে নেমে যায়, ‘আহেন চাচা, আমি ভাবিরে একটু ধইরা গাড়িতে উঠায়া দিতাছি।’
টমটম এগিয়ে চলে, অন্ধকারে ঠাহর করতে না পেরে গাড়ির চলন কিছুটা এলোমেলো। হঠাৎ গাড়ির চাকা কংক্রিটের রাস্তা থেকে হড়কে গিয়ে খিচকাদায় আটকে যায়। বাম দিকে অনেকখানি কাত হয়ে পড়ে গাড়ি, যেন আরেকটু হলেই খাদে গড়িয়ে পড়বে। রশিদ বলে, ‘আমি নাইম্মা যামু নাকি ?’ জেবিন অস্থির হয়ে বলে ‘একটু খাড়ন চাচা, বিষ্টির মইদ্যে নাইমেন না।’ হাঁক দেয় সে, ‘দুলদুল, বুলবুল ডাইন সাইডে কইসা টান দে।’ ঘোড়াগুলো বুঝতে পেরে জান দিয়ে টানে। টানতে টানতে পা মুড়ে যেতে চায়, নাসারন্ধ্র ফুলে ওঠে তাদের, কিন্তু গাড়ি কংক্রিটের উপর টেনে তোলে। দুটো ঘোড়াই ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। জেবিন নেমে গিয়ে ঘোড়াদের পিঠ চাপড়ে দেয়―সাব্বাস দুলদুল, সাব্বাস বুলবুল, দুই মিনিট জিরায়া ল তরা।’
গাড়ি মিটফোর্ড হাসপাতালের ফটকে গিয়ে পৌঁছে, বউ নিয়ে নেমে যায় রশিদ চাচা। গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে জেবিন বলে, চাচা ডেলিভারির পর ভাবি ঠিক অইলে খবর দিয়েন, আবার আয়া লইয়া যামুনে।
বাড়ি ফেরার সময় খেয়াল করে, বুলবুল যেন একটু খুঁড়িয়ে চলেছে। সন্দেহ হয় তার―গাড়ি উঠানের সম মোচড় খাইছে নাকি পায়!
আস্তাবলে ঢুকিয়ে ঘোড়াদের ভেজা শরীর মুছে দেয় জেবিন। দেয়ালগিরির তাক থেকে একটা ব্যথানাশক তেল নামিয়ে বুলবুলের পা ডলে দেয়। কৃতজ্ঞতায় নাক দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করে বুলবুল। মকবুল পাশের ঘর থেকে আওয়াজ দেয়, ‘জেবিন আইছস নাকি।’
মেহজেবিন ঘরে ঢুকে বাপের কপালে হাত রাখে, ‘দাওয়াই খায়া জ্বর নাইমা গেছে গা আব্বা, তুমি ঘুমাও। উনাগো ঠিকঠাক মতো নামাইয়া দিয়া আইছি মিটফোর্ডে, সমেস্যা হয় নাই। ভাবির ডেলিভারি অইলে আবার লয়া আমুনে।’
মকবুল বলে, ‘তরে বিয়া দিলে আমি মইরা যামুরে মা, কিন্তুক না দিলেও তো মরমু, মরণ ছাড়া আমার গতি আছে নাকি।’
জেবিন হাসে, ‘মাইন্সে তো জন্মায় মরণের লেইগাই আব্বা, দোলনা থিকা নাইম্যাই বেবাক মানু গোরস্তানের পথে লৌড়ান সুরু করে। যতদিন রাস্তায় থাকে ততদিনই জিন্দেগি, ততদিনই ঘর-সংসার। আবুইল্যা তোমার কাছে ছোট অইলেও অত্ত ছোট না, অরে একখান বিয়া করায়া দেও, পোলার বউ আয়া তোমার দেখভাল করব।’
‘হ, কথা ঠিক কইছস, দুইখান বিয়া, তর আর আবুইলার। খালি ক্যামতে বিয়া দিমু এইটাই কথা। ফিরোজ শাহ মারা যাওনের পর নবাব বংসের কেউ আর আমগো খোঁজ লয় নাই―ক্যান লইব সেইটাও কথা।’
৩
মকবুল আর সুস্থ হয় না ভালোমতো। দুদিন টমটমে উঠলে একদিন বিশ্রাম নিতে হয়। ঘোড়ার জন্য খড় আর চানা-ভুসির জোগান দিতে হিমশিম খেয়ে যায় সে। নবাবি আমলে আমদানি করা ভারতীয় ঘোড়াগুলোর খোরাকও বেশি। টমটম আর ঘোড়া কেনার জন্য জ্ঞাতিগোষ্ঠী চেনা-অচেনা লোক আসে। কেউ কেউ এখনও সোয়ারি টানে সংসদ ভবন আর গুলিস্তানের গোলাপ শার মাজার থেকে।
আস্তাবলে ঢুকে জেবিন দেখতে পায় দুলদুল মাটিতে শুয়ে আছে। ঘোড়া খুব বেশি অসুস্থ না হলে এভাবে মাটিতে শুয়ে পড়ে না, বেশির ভাগ সময় দাঁড়িয়েই ঘুমায়, অথবা দেয়ালে ঠেকনা দিয়ে রাখে শরীরটা, এটা ওদের জংলি অভ্যাস। জেবিন কাছে গিয়ে দ্যাখে দুলদুলের চোখের কোণ ভিজে কালচে হয়ে আছে। জেবিনকে দেখে ঘোড়াটা দাঁড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু জেবিন থামিয়ে দেয়, ‘হুইয়া থাক দুলদুল, উঠতে অইব না, আমি কবিরাজের কাছ থিকা দাওয়া লিয়া আহি।’
পশু-কবিরাজ দাওয়াই দিয়ে বলল, ‘আদা আর হলদি মিশায়া ছোলা-ভুসির লগে খিলায়া দেও, আরাম পাইব, সাবধান ঠান্ডা য্যান না লাগে, গায়ে কম্বল দিতে অইব। আর একটা কথা বোবা জানোয়ারের উপরে মাইনসের মায়া-মমতা অগো শক্তি জোগায়, নিয়মিত দেখাসুনা করতে অইব।’
মকবুল ঘোড়া দেখে বলে, ‘ঠান্ডায় কাবু অইয়া গেছে ঘোড়া। চিন্তা করিস না তুই, মিরাজের দোকানে গিয়া দ্যাখ ঘোড়ার কম্বল পাওন যায় নাকি, অগো তো ঘোড়া আছিল আগে। যেইরহম ঠান্ডা পড়ছে গরম রাখতে না পারলে দুলদুল আর বাঁচব না।’
বিকেল বেলা হেঁটে জেবিন গিয়ে উপস্থিত হয় ইসলামপুর কাপড়ের পট্টিতে মিরাজের দোকানে। বোরকা-নেকাব পরা মেয়েটাকে মিরাজ চিনতে পারে না। খরিদ্দার ভেবে কর্মচারীকে বলে ওঠে, ‘এই টুল আউগায়া দে, বহেন ম্যাম, কী লাগব আপনের ?’ মেহজেবিন নেকাব উঠিয়ে বলে, ‘সালামালেকুম মিরাজ ভাই, আমি মেহজেবিন, খাজা মকবুলের মাইয়া, আব্বায় পাঠাইছে আমারে আপনের কাছে।’
মাত্র তিন বছর আগের দেখা মেহজেবিন হঠাৎ করেই যেন বড় হয়ে উঠেছে। নারী-লজ্জা এসে ভিড় করেছে তার চোখে-মুখে। মিরাজ অবাক হয়, জিব কেটে বলে ‘আরে চিনছি তো তুমারে! মকবুল চাচা কেমুন আছে জেবিন, শইলডা ভালা তো ? যারা টমটমে খ্যাপ লয় অগো কাছে হুনছি, চাচায় বিমারে পড়ছে, গাড়ি লইয়া রাস্তায় নামবার পারে না।’
‘হ মিরাজ ভাই, আব্বায় একরহম বিছনায় পইড়া গেছে, আয়-রোজগার নাই, আমিই অহন মাঝেমইদ্যে টমটম লয়া রাস্তায় নামি।’
‘কও কী ? মাইয়া অয়া একলা বাইর অইতাছ গাড়ি লয়া ?’
‘সংসার চলে না, আলা করুমটা কী মিরাজ ভাই! তয় সমেস্যা নাই, টমটমের হগলতেই আমারে চিনে। সম্মান কইরা কথা কয়, খাজা মকবুলের মাইয়া কয়া বুলায়। কালা বুরকা পিন্দা বাইর অই, লগে ছোট ভাই আবুইল্যা থাকে। অয় অহনও পোলাপান, গাড়োয়ানি কায়দাটা সুল্লো আনা ভালা কইরা হিকবার পারে নাই। লগে থাকন লাগে আমার, রোড-ঘাট চিনাইতে হয়, সোয়ারির লগে বাতচিত ক্যামতে করন লাগে সেইটাবি বুঝাইতে হয়।’
‘আমি চাচারে দ্যাখবার যামু, আইজই যামু দুকান বন কইরা, এট্টু দেরি অইব।’
‘আপনি কাম শ্যাষ কইরা আহেন, আপনের চাচার লগে কথা কইয়া একটু সাহস দিয়া আইবেন, চিন্তায় চিন্তায় মানুসটা পাটশোলার মতন পল্কা অইয়া গেছে, কুনসুম যে ভাইঙ্গা পড়ে।’
‘অহন কও, চাচায় কিল্লিগা পাঠাইছে তুমারে ?’
‘আমগো টমটম টানে দুই ঘোড়া, দুলদুল আর বুলবুল। দুলদুল বিমারে পড়ছে, ঠান্ডায় হাঁপাইতাছে, আমি আইছি ঘোড়ার কম্বলের তালাশে, আপনেগো তো ঘোড়া আছিল আগে।’
‘হ আছিল, পুরান কম্বল আছে তো, দিমুনে তুমারে, মাগার বাড়িত থিকা আনন লাগব। আমি দোকান বন কইরা রাইতে যেইসুম চাচারে দ্যাখবার যামু হেইসুম লগে লয়া যামুনে।’
৪
দু দিন ধরে আস্তাবলেই বেশি সময় কাটে জেবিনের। ঘোড়া নিয়ে মা-বাবা দুজনই খুব উদ্বিগ্ন। কবিরাজের পরামর্শে আদা আর হলুদ মিশিয়ে ভুসি খাওয়ায় জেবিন, বারবার ঘোড়ার পাশে গিয়ে বসে।
রাতে ব্যবসার পাট চুকিয়ে একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে মিরাজ গিয়ে উপস্থিত হয় মকবুলের বাড়ি, ‘সালামালেকুম চাচা, কেমুন আছেন ? মেহেজেবিনরে পাঠাইয়া ভালা করছেন, নাইলে খবরই পাইতাম না। কই সে ?’
‘আহো, চোকির উপ্রেই বহ ভাতিজা। ঘরে তো একখানই চেয়ার, ওইটা লয়া জেবিন আস্তাবলে বয়া থাকে, ঘোড়ার অবস্থা ভালা না, যাও গিয়া দ্যাহো।’
মিরাজ আস্তাবলে ঢোকে। সারা ঘরে অস্বাভাবিক ভেষজ ঘ্রাণ তার ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন সে ঘোড়াকে বিচালি খেতে দিত। লাল ইটের দেওয়ালে ঝুলছে একটা লাল ঘুড়ি। এক ঝলক সেদিকে তাকিয়েই খড়ের বিছানায় শয়ান দুলদুলকে দেখে। মেহজেবিন ঘোড়ার গায়ে কাঁথা জড়ানোর চেষ্টা করছে। মিরাজকে দেখে সালাম দেয় মেহজেবিন, ‘আহেন মিরাজ ভাই, চেয়ারে বহেন।’
‘এইটা তো মাইনসের খ্যাতা জেবিন, করতাছ কী! তুমি তো মনে অয় নিজের গায়ের খ্যাতাডা অর গায়ে দিতাছ, ঠিক কইছি ?’
মেহজেবিন মাথা নিচু করে, কথা বলতে পারে না, তার চোখ ফেটে জল আসে।
‘এলা কানবার লাগছ ক্যালা, ঘোড়ার লেইগা দুইটা কম্বল আনছি তো লগে কইরা, এই দ্দ্যাহো! অনেক দিন পর তুমার কান্দন দ্যাখলাম জেবিন। একবার যে কানছিলা, এইটা তুমার মনে আছে কি না জানি না। ওই বছর শাকরাইনের সমে ছাদে উইঠ্যা নতুন মাঞ্জা দিয়া ঘুড্ডি উড়াইতাছিলাম। তুমি একটা লাল ঘুড্ডি হাতে দিয়া কইছিলা―আমার ঘুড্ডিটা কেউ উড়াইয়া দিতাছে না, তুমি আসমানে উড়াইয়া দেও মিরাজ ভাই। আমি তখন কাটাকাটি খেলতাছি, হমানে ধুয়া দিতাছি গোয়াদার, চৌরঙ্গী আর ময়ূরপঙ্খিরে। চোক নামাইয়া দেহি, তুমার মনটা বড় ব্যাজার। কাটাকাটি থুইয়া তুমার ঘুড্ডিটারে আসমানে উড়াইলাম। সুতা ছাড়তে ছাড়তে এক্কেরে ম্যাঘের কাছে চইলা গেল। ভালাই উড়তাছিল, তুমার হাতে নাটাই ধরাইয়া দিলাম, চোখেমুখে তুমার কী যে আনন্দ। কিন্তু ম্যাঘে ভিজ্যা ঘুড্ডিটার ডান্ডিপটাশ অইয়া গেল। আমি তাড়াতাড়ি নাটাই ঘুরাইয়া হাতের উপ্রে খিচা আনলাম ঘুড্ডিটা। সেই ডান্ডিপটাশ ঘুড্ডিটা বুকে লইয়া তুমার কী যে কান্দন, কান্দন আর থামে না। ক্যামতে কী করি, আমার ঘুড্ডিটা তুমারে দিয়া কইলাম, আর কাইন্দো না। তাও তুমার লাল ঘুড্ডির দুঃখটা আর দূর অইল না।’
‘সেই ডান্ডিপটাশ লাল ঘুড্ডিটা অহনও আছে মিরাজ ভাই, ঐ দ্যাহো ঝুলতাছে দেওয়ালের লগে।’
‘তুমি তো মনে অয় কোনও কিছুই ভুলবার পারো না জিন্দেগিতে, আমারেও ভুলো নাই।’
‘সাকরাইনের দিন ঘুড্ডি উড়াইতে গিয়া আমার মনে এত কষ্ট লাগছিল যে কী কমু! ঐ ঘটনার পর আমি আর কোনওদিন ঘুড্ডি উড়াইয়া সুখ পাই নাই। আইজ আবার তুমার কান্দন দেখলাম। কম্বল আনছি তো ঘোড়ার লেইগা, মন ব্যাজার কইরা থাইকো না জেবিন, একটু হাসো তো!’
ঘোড়ার কম্বল হাতে নিয়ে অনেক দুঃখের মধ্যেও মেহজেবিন একটুখানি হাসে, ‘সব মনে আছে আমার মিরাজ ভাই, আসমানে ঘুড্ডি উড়ার পর মনে হইতাছিল, তুমিই আমার সব থিকা প্রিয় মানুস।’
‘তর দিলটা খুব নরম, এমন মাইয়ার লগে যার বিয়া অইব, হ্যায় খুব মোহব্বতের মইদ্যে দিন গুজরান করব।’
মেহজেবিন লজ্জা পায়, প্রসঙ্গ অন্তর করে―‘আইজ আমেগা লগে খায়া যান মিরাজ ভাই, গইনারি পাতার লগে শুটকি মাছ পাকাইছি।’
‘গইনারি পাতা! এই গাছ কি আর অহনও আছে মহল্লায়, কই পাইছ তুমি ?’
‘গইনারি গাছ ঝাড়েবংসে শ্যাষ অইয়া গেছে। আখাওয়া মাইনসে পাতা খাইতে খাইতে গাছই মাইরা ফালাইছে, খালি আমগো বাড়ির উঠানে অহনও তিনখান গাছ আছে বহাল তবিয়তে। আমি তো ছোট থেইকা গইনারির চাইরদিক ঘুইরা ঘুইরা খেলছি আর বড় অইছি। অহন ওই গাছের নিচেই তো ছাড়া থাকে দুলদুল আর বুলবুল। অরাও ঘুরে, ঘুইরা ঘুইরা কাঁচা ঘাস খায়। সেই ডান্ডিপটাশ লাল ঘুড্ডিটার দিকে নজর করলে আইজও তুমার কথা মনে অহে, কিন্তু দেখা হয় না।’
‘আস্তাবলে ঢুইকাই তো দেখলাম ঘুড্ডিটা, মগার কাহিনিটা মনে আইতাছিল না। বুঝলাম, তুমি তাইলে জিন্দেগির কোনও কষ্টের কথাই ভুলবার পারো না।’
‘না, কষ্টের কথা না, মোহব্বতের কথা ভুলবার পারি না।’
৫
যত্ন আর দাওয়াই পেয়ে মকবুল আর দুলদুল দুজনেই সুস্থ হয়ে ওঠে কিছুদিনের মধ্যে। মকবুল এবার মেহজেবিনের বিয়ে নিয়ে পড়ে। কিন্তু পাত্র দেখে পছন্দ হয় না তার। মাঝে মাঝে রাতের বেলা ঠাটারি বাজারের হাশেম কসাই আসে। আগে তারও টমটম ছিল, এখন সে কসাইখানায় কাজ করে। আয় রোজগার মন্দ নয়। মকবুলকে উপদেশ দেয় সে, ‘চাচা, আপনে তো করাল করছেন, জমি বিক্রি করবেন না। আপনের কথা সম্মান করি আমি, মাগার ঘোড়াগুলা বেইচ্যা দ্যান। ট্যাকা যা পাইবেন, তাতে বিয়ার খরচ উইঠ্যাও হাতে পয়সা থাকব। দুই ঘোড়ার দাম পঞ্চাস হাজার, টমটমের দাম চাল্লিস হাজার―কত অইল, লাখ ট্যাকার কাছে না ? আবুইলারে কামে লাগায়া দ্যান, চান তো অরে আমার লগে দিয়া দ্যান, আমি তো ময়মুরুব্বির দোয়ায় ভালাই আছি।’
মকবুল হাশেমের কথা শোনে কিন্তু শেষ অবলম্বন ঘোড়া-টমটম বেচতে মন চায় না তার, অথচ মেয়ের বিয়ে দিতে না পেরে মনের কষ্ট দূর হচ্ছে না কিছুতেই। পাত্র যারা আসে, তারা সবাই আসে জমির লোভে। আগে মেহজেবিনের বিয়ে হয়েছিল কাদিরের সাথে, পয়সাওয়ালা মানুষ। বিয়ার পর দিন থেকেই সে তার নামে তিন শতাংশ জমিন লিখে নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠল। কিন্তু যখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, মকবুল কিছুতেই জমি বিক্রি করবে না তখনই তালাক হয়ে গেল। বিয়ে ভেঙে যাওয়াতে মেহজেবিনের কষ্ট হলো না, বরং তার মনে হলো, তারা যেন এক অত্যাচারীর হাত থেকে রেহাই পেয়ে গেল।
বিয়ের ব্যাপারে বাবার কথায় মেহজেবিনও সায় দেয়, কোনও কিছুই বিক্রি না করতে পারলেই সবচেয়ে ভালো। মানুষের অনেক অদ্ভুতরকম স্বপ্ন থাকে, এমন স্বপ্ন তারও আছে―টমটমে চড়ে তার বিয়ে হবে, দুলদুল আর বুলবুল সেই টমটম টেনে নিয়ে যাবে সদরঘাটে, বুড়িগঙ্গার পাড়ে।
শুক্রবার বিকেল বেলা। দোকানপাট বন্ধ। হঠাৎ মিরাজ তার মা মর্জিনা বেগমকে নিয়ে উপস্থিত হলো মকবুলের বাড়িতে, হাতে মিষ্টির প্যাকেট। মর্জিনা বেগম শোবার ঘর আর আস্তাবলে একটা সংক্ষিপ্ত চক্কর দিয়ে বলল, ‘তুই যা মিরাজ, মেহজেবিনের লগে ঘোড়াগুলা দ্যাখ, আমি খাজা ভাইয়ের লগে বাতচিত করি।’
কুশল বিনিময়ের পর মিরাজের মা-ই কথা উঠাল, ‘অনেক আগেই আহনের চিন্তা করছিলাম, আপনের শইলডা ভালা আছিল না দেইখা আইতে দেরি অইল খাজা ভাই। আপনেরা তো আমগো জানপেহচান, কাছের মানুস। আমার পোলাটা আপনের মাইয়া মেহজেবিনরে খুব পছন্দ করে। ছোটবেলা থিকা অগো চিন পরিচয়, একই মহল্লায় বড় অইছে। মিরাজরে বিয়ার কথা কইলে অয় তো মেহজেবিন ছাড়া কারও বাত হুনবারই পারে না। বয়েস অইছে আপনের খাজা ভাই, আমারও অইছে। পোলা মাইয়া বিয়া না দিতে পারলে ঠ্যাকা থাকুম আল্লার কাছে। পোলায় তো একপায়ে খাড়া, আমিও খাড়া, মাগার তিনপায়, লাঠি ছাড়া তো চলবার পারি না। আপনে রাজি থাকলে অহনই বিসমিল্লা কইরা মত দেন, তেইলে আমরা বন্দোবস্ত করবার পারি।’
‘মর্জিনা আপা, আপনার পোলার কথা আমি জানি, আমারে খুব সম্মান করে, এমন পোলারে না করি ক্যামতে, মনে মনে বিসমিল্লা কইরা ফালাইছি আমি। তবু দিনক্ষণের লেইগা মাইয়ার লগে এট্টু কথা কওন দরকার।’
‘কথা কইতে আর কতক্ষণ! পোলায় পাবনা যাইব কাইল, কাপড়ের পেটির চালান আইব ঢাকায়। ব্যবসা দ্যাহনের মানুস নাই, অরই যাওন লাগে নানা জায়গায়। দুই দিন বাদে আইব। ঢাকায় আহনের পরের হপ্তায় বিয়া হইলে মন্দ কী! এইরহম চিন্তা কইরা রাখলাম, আপনে মাইয়ার লগে কথা কন।’
আস্তাবলের ভেতর থেকে বের হয়ে মিরাজ আর মেহজেবিন গইনারি গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। কৈশোরের স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে শহরের ধুলোবালির ভেতর দিয়ে নেমে আসে এক ফালি জোছনা। মিরাজ বলে, ‘অহন আমার মনে অইতাছে, আবার আসমানে ঘুড্ডি উড়াই, জীবনের বেবাক ঘুড্ডি তোমারে দিয়া দেই, তোমার য্যান আর কান্দন না লাগে জিন্দেগিভর।’
‘আমার খুব সখ, টমটম সাজাইয়া আমার বিয়া অইব, দুলদুল আর বুলবুল আমারে দিয়া আইব হউর বাড়ি। ঘোড়াগুলান ওয়াপাস গেলে আমার জান পয়মাল অইব, অরা মনমরা অইয়া থাকব, তাই আবদার করলাম, মাঝে মইদ্যে আমারে বাপের বাড়ি লয়া আইবেন আপনে।’
‘একশবার আমু, ঘোড়া দেখতে আমু, চাচারে দেখতে আমু, পুরা পরিবারের দায়দায়িত্ব তো তোমার আর আমারই নেওন লাগব। জমি ব্যাচনের পক্ষে আমিও নাই। সীমানা যাঁইত্যা একখান ঘর উঠাইলে, ঐখানে কাপড়ের দোকান দেওন যাইব, দোকানে আবুইল্যা বইব, ব্যবস্থা আমি কইরা দিমু।’
মর্জিনা বেগম বিদায় নেওয়ার পর মেহজেবিনকে পাশে বসালো মকবুল, ‘তুমারে বিয়া দিলে আমার কেমুন লাগব সেইটা তো আমি বুঝতাছি, মাগার বিয়া তো দেওন লাগব। পোলার মায় প্রস্তাব লইয়া আইছিল, সেইটাবি জানো। মিরাজ কেমুন মানুস, এইটা তো তুমারে বুঝাইয়া কওনের দরকার নাই। তুমি রাজি হইলে বিয়ার আয়োজন করি, সময় হাতে নাই, মাত্তর কয়েক দিন।’
‘মিরাজ ভাই খুব ভালা মানুস, আমগো সংসার লয়া উনি অনেক কিছু চিন্তা করেন। কিন্তু বিয়ার খরচ জোগাইবা ক্যামনে, সেইটাও ভাবি।’
‘বিয়া হইব, খরচ বাপে যোগাইব নাইলে ভূতে যোগাইব, য্যামতে পারা যায়, তর কিয়ের মাথাব্যথা!’
৬
বিকেল বেলা হাশেম কসাই আসে বাড়িতে। মকবুলের সঙ্গে আলাপ করে ঘোড়া আর টমটম বিক্রির ব্যাপারে। মেহজেবিন বাড়িতে নেই, ঘোড়ার ভুসি কেনার জন্য বাজারে গেছে। মকবুলকে সে বোঝায়, ‘আপনার ঘোড়াগুলান ভালা জাতের, অনেক আগে থিকা এইগুলা নবাবরা আনাইছিল ইন্ডিয়া থিকা। দাম ভালাই পাইবেন। আমগো দেশি ঘোড়া মগা, কয় বছর পর আর সোয়ারি টানবার পারে না। ঘোড়া আর কতদিন বাঁচে চাচা, অহনই সময়, চোক মুইঞ্জা এইগুলা বেইচা ফালান চাচা, ট্যাকা হাতে পাইলে আপনে বিয়ার ধাক্কাটা সামাল দিয়া উঠবার পারবেন।’
‘হ, বিয়ার ধাক্কা তো অহন এক বড় রহম ধাক্কা। ক্যামতে ব্যাচন যায় ঘোড়া, ক্যাঠায় কিনব ? টমটম তো অহন চলে কম।’
‘টমটমের গাড়ি টানা ঘোড়ার দাম পর্তায় পড়ব না। গাজীপুর, চট্টগ্রাম আরও কিছু জায়গার মানুস তো ঘোড়ার গোস্ত খায়, স্বাদ কইরাই খায়। পুরান আমলে তো হিন্দুরাও খাইত, অশ্বমেধ যজ্ঞ কইরা, হুনছি, জয়পুরের রাজা জয়সিংও এই যজ্ঞ করছে। অহন খায় কি না জানি না। এলা যে-ই খাক, য্যামতে খাক, বিসমিল্লা কইরা ঘোড়া জবাই অহে, গোস্ত ব্যাচে পাঁচশো ট্যাকা দরে, তাই ব্যাচন দামটা ভালা পাওন যায়।’
‘কারা বেচাকেনা করে জানো নাকি ?’
‘হ জানি চাচা, পাট্টি আহে আমগো কাছে, ঠাটারি বাজারে। আমিও কিনবার পারি চাচা, আগেই কইছি―দুই ঘোড়ার দাম পঞ্চাস হাজার, টমটমের নকশাটা ভালা, ৪০ হাজারে বেইচা দেওন যাইব। ঘোড়ার ট্যাকা আমি লগে লইয়া আইছি, টমটম ব্যাচনের লেইগা খোঁজ লইতে অইব চাচা।’
লুঙ্গির ট্যাঁক থেকে ৫০ হাজার টাকা বের করে সামনে রাখে হাশেম। গনিয়ারি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা ঘোড়াগুলোকে তার হাতে ধরিয়ে দেয় মকবুল। মেহজেবিন ফিরে এসে ঘোড়া না দেখে বাপের ঘরে ঢোকে, ‘আব্বা, ঘোড়া কই গেল ? কই গেল বুলবুল, দুলদুল ?’
মকবুলের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে, ‘বেইচা দিছিরে মা, এই ল তর ঘোড়ার দাম ৫০ হাজার ট্যাকা, হাশেম্যা দিয়া গেছে।’
মেহজেবিন চিৎকার করে কাঁদে, ‘আমি তোমার লেইগা বাখরখানি আর ঘোড়ার লেইগা ভুসি আনতে গেলাম আর তুমি আমারে না কইয়া ঘোড়া বেইচা দিলা কসাইর কাছে ?’
‘না বেচলে বিয়ার খরচ ক্যামনে যোগামু ?’
‘তাই বইলা আমারে না কইয়া ঘোড়া বেইচা দিবা! আমার বিয়া দেওন লাগব না তোমার, আমার ঘোড়া আইনা দেও, দুলদুল আর বুলবুলরে আইনা দেও, নাইলে আমি বাঁচুম না, কী করলা তুমি! আমারে অ্যাদ্দিন পালপোস কইরা আখেরে গলা টিপ্যা মাইরা ফালাইলা ?’
মকবুল হকচকিয়ে যায়। মেহজেবিন সারা রাত বিছানায় ছটফট করে। ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে বড় গণিয়ারি গাছের নিচে যায় যার নিচে ঘোড়াদুটো বেঁধে রাখত সে। গাছটাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে।
পেছন পেছন মকবুল আসে মেয়ের খোঁজে, ‘তোর ঘোড়া গেছে, বিয়ার আগে তোর বাপও যাইব। কষ্ট কি তোর একার, আমার নাই ? জমি বেচবার পারি না, জবানে আটকাইছি, ঘোড়াও বেচবার পারুম না তর লেইগা, তর বিয়ার লেইগা। কব্বরে যাওনার আগে আমি ট্যাকা দিয়া কী করুম ?’
মেহজেবিন স্তব্ধ হয়ে যায়, মকবুলকে জড়িয়ে ধরে, ‘আব্বা, আমারে মাফ কইরা দেও, তোমার শইলডা ভালা না, ক্যান যে আমি ফুজুল বাত কইরা তুমার মন খরাপ কইরা দিলাম!’
ঘরে ঢুকে দুজন কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকে। মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসে। এ সময় ঘোড়ার গলার আওয়াজ শুনত মেহজেবিন, খড়-বিচালি নিয়ে আস্তাবলে চলে যেত সে। আজ আর শব্দটা শুনতে পায় না। ক্লান্তিতে চোখ লেগে আসে তার। সকাল আটটা বেজে যায়। হঠাৎ বাইরে থেকে ঘোড়ার গলার আওয়াজ শোনে। ঘর থেকে বেরিয়ে গইনারি গাছের দিকে রওনা হয় মেহজেবিন। ঘোড়াগুলো বাঁধা আছে গইনারি গাছের সাথে! নিজের গায়ে চিমটি কাটে, ভুল দেখছে না তো! ঘোড়ার গলা ধরে আদর করে, আবেগে কাঁদতে থাকে। পেছনে এসে দাঁড়ায় মিরাজ, ‘এইবার নিয়া তুমি তিনবার কাঁনলা জেবিন।’
মেহজেবিন অবাক হয়ে তাকায় মিরাজের দিকে, ‘তুমি কি মিরাজ ভাই, নাকি ফেরেশতা ? ক্যামনে কি আমারে বুঝাইয়া কও তো।’
‘ঘোড়া তো আপনা থিকা টগবগ কইরা ছুইটা আয়া পড়ছে, অরা ঠেকাইবার পারে নাই। অর পিছে পিছে আইছিল হাশেম, আমি অরে ট্যাকা বুঝাইয়া দিছি, গেছেগা। বুলবুল আর দুলদুল আর অহন কেউ পয়সা দিয়া কিনবার পারব না আমগো কাছ থিকা। মগার আমগো সংসারে ওউরবি কিমিত চিজ আছে, কও তো কী ?’
‘কীয়ের কথা কইবার লাগছ, তিন শতাংশ জমি ?’
‘আরে না, অর থিকাও দামি, সেই ডান্ডিপটাস লাল ঘুড্ডিটা।’
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



