
সিআরবি এলাকায় টিলার ঢালে বিকেলটা যখন মরে যাচ্ছিল, একটি সোনালু ফুল গাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল একা। গাছে তখন অজস্র ফুল। সবুজ ডালপাতা প্রায় দেখাই যায় না, শুধু হলুদ আর হলুদ, থোকা থোকা ঝুঁকে আছে পতনের দিকে। একটা হলুদ শাড়ি লাল ব্লাউজ পরে এসেছে সে আজ। হলুদে ছাওয়া গাছের নিচে একটি হলুদ শাড়ি পরে এসে দাঁড়ানোর বুদ্ধিটা তারিফ করার মতো না ? কে করবে তারিফ ?
দিনটা ফুরিয়ে এলে তার আলোর কী রং, আর সেই আলোয় সোনালু ফুলগাছের নিচে হলুদ শাড়ি লাল ব্লাউজ পরা একা একটি মেয়েকে দেখে একটু ঘোর লেগে যায় কি না কে ভাববে ? এত সময় নাই, মনও নাই মানুষের। তারা শুধু চোখ দিয়ে দেখবে, জায়গা-জমি মাপার সার্ভেয়ারের মতো চোখ! শাড়িটা, কাঁচুলিটা তা সে হলুদ হোক বা লাল, দৃষ্টি থেকে সরিয়ে একপাশে রেখে একেবারে ভেতরটা মাপজোখ করে নেবে। জমির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, চড়াই-উতরাই মেপে নিয়ে তারপরই না দরদাম।
তা হোক, মাপজোখ দেখেই দরদাম হোক, এখনও তো মাশাল্লাহ চেহারা-ছবিটা সুন্দর, আর শরীরের খাদ-ভরাটের জায়গাগুলো ঠিকঠাকই আছে, কিন্তু আজ তো সেই সব লোকেরও, মানে কাস্টমারের দেখাও নাই। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কে জানে। গাছের গায়ে হেলান দিয়ে, দু-এক কদম আশেপাশে হেঁটে এসে আবার দাঁড়িয়ে, আসল লোকের দেখা মেলে না। চলতি পথে দু-একজন তাকায়, কেউ কেউ না দেখার ভান করে দেখে, কেউবা হা করেও দেখে, কিন্তু এরা আসল কাজের মানুষ না, চেহারা দেখেই চেনা যায়।
উদ্যম হারিয়ে ফেলার সেই সময়টাতে হঠাৎ দূর থেকে চোখে পড়ল লোকটাকে। রেলওয়ে হেড কোয়ার্টারের লাল ইটের ভবনটার সামনে যেখানটায় ব্রিটিশ আমলের একটি রেল ইঞ্জিন রাখা হয়েছে দর্শনীয় বস্তু হিসেবে, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে নজর রাখছে তার দিকে। মুহূর্তে মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। লোকটার উদ্দেশ্য কী বোঝার উপায় নাই। কদিন ধরে ঘুরঘুর করছে।
কাল সারা রাত এক ফোঁটা ঘুম জোটেনি দুই চোখে। অনেক লম্বা একটা খারাপ স্বপ্নের মতো কেটে গেছে রাতটা। অন্তত গত একটা বছর এ রকম খারাপ সময় আর আসে নাই। পড়েছিল দুই বেহেড মাতালের পাল্লায়। নিউ মার্কেটের ফুটপাথ থেকে তুলে নিয়েছিল তাকে। দুজনে তিন হাজার… এরকমই দরদাম হয়েছিল। সিএনজি ট্যাক্সিতে দুজনের মাঝখানে বসিয়ে লালখান বাজারের নানা গলিঘুপচি পেরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল পুরোনো দিনের একটা দোতলা বাড়িতে। তখন রাত দশ কি সাড়ে দশ। অথচ বাড়িটার আঙিনায় ঢুকেই বুক কেঁপে উঠেছিল। ভয় ধরানো অন্ধকার। ভূতের বাড়ির মতো। বাড়ির উঠানে আম-কাঁঠাল আর নানা জাতের গাছ। আজকাল শহরের বাড়িতে এ রকম খুব একটা দেখা যায় না। অন্ধকারের মধ্যে গাছগুলোকে মনে হচ্ছিল একেকটা বিরাট শরীরের লোমশ প্রাণির মতো।
‘এইডা কোথায় নিয়া আসলেন ?’
‘চুপ থাক।’
দুই বন্ধুর চেহারা-সুরত দুই রকম। একটা খ্যাংড়া কাঠি, জোরে একটা হাওয়া দিলে উড়ে যাবে, চোপায় দাড়ি ছাড়া আর কিছু নাই। আরেকজনের নানরুটির মতো গোলমুখ। বিরাট একটা ভুঁড়ি, ভুঁড়ির নিচে ওই জিনিস আছে কি না কে জানে, থাকলেও নিজের জিনিস নিজেই হয়তো গত পাঁচ বছর দেখে নাই।
হাবলু বলল, ‘চুপ থাক।’
‘তুই-তাকারি করেন ক্যান ?’ একটু উঁচু গলায় কথা বলে সে নিজের ভয়টা কাটাতে চাইছিল।
ডাবলু টিটকারির ঢঙে বন্ধুকে বলল, ‘অ্যাই ব্যাটা তুই-তাকারি করস ক্যান। ম্যাডামের একটা ইজ্জত আছে না ?’
এই কথায় দুজনে মিলে হাসল। শরীর বিক্রির জন্য পথে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ম্যাডামের ইজ্জত’ যে কতটা হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার এটা আবিষ্কারের আনন্দেই হাসল। মাতালদের একবার হাসি উঠলে সহজে থামে না। হাবলু বারবার বলছিল, ‘ম্যাডামের ইজ্জত আছে… হ ম্যাডামের একটা ইজ্জত আছে…,’ আর ডাবলুর হাসির তোড়ে তার বিরাট ভুড়ি কেঁপে উঠছিল।
দরজা খুলে স্যাঁতসেতে একটা ঘরে ঢুকেছিল তারা। এই বাড়িটাতে এখন যে কেউ থাকে না সেটা বোঝা যায়। দেয়ালের ছাল-চামড়া উঠে গেছে। হয়তো কদিন পরেই ভেঙে ফেলবে, বিরাট আলো ঝলমল একটা বিল্ডিং উঠে যাবে এখানে। সুইচ টিপে একটা আলো জ্বালল হাবলু, কম পাওয়ারের বাল্ব, ঘোলা আলো। একটা টেবিল, দুইটা চেয়ার, একটা আলনা আর একটা পুরোনো আমলের খাট আছে ঘরে। ডাবলু দরজা বন্ধ করে এসে তাকে ধরে খাটে বসিয়ে দিল, ‘বসেন ম্যাডাম।’
আবার শুরু হলো দুজনের হাসি। গা জ্বলে যাচ্ছিল, একবার ভাবছিল দুই মাতালকে দুইটা লাথি-গুঁতা মেরে পালিয়ে আসবে কি না। কিন্তু সেটা যে কুলিয়ে উঠতে পারবে না নিশ্চিত হয়ে চুপচাপ বসেই ছিল।
আসলে ভুল করে ফেলেছে। নতুন দুই খদ্দেরের সঙ্গে অজানা জায়গায় যাওয়ার প্রস্তাবে রাজি হওয়াটাই ছিল মস্ত বড় ভুল। সাধারণত পরিচিত হোটেলের কামরাতে যায়। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে সারা শহরের ছাত্রদের একটা আন্দোলন চলছে। পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া, টিয়ারগ্যাস, গোলাগুলি এইসবের মধ্যে লোকজন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়িঘরে ফিরে যায়। দেশের অবস্থা খারাপ। কাকে যে কখন কী ভেবে পুলিশে ধরবে তার ঠিক নাই। নিশাচর লোকগুলোরও এদিক-ওদিক উঁকি মারার সময় নাই। তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যায়, টেলিভিশনের খবর দেখে, আর রাতে বেশ আগেভাগে দুটো খেয়েদেয়ে বউয়ের ওইটার নিচে ঢুকে পড়ে। খদ্দেরের আর দেখা নাই।
এই কদিনে জমা টাকার এমন অবস্থা―এই বেলা ঘর ভাড়ার টাকাটা দিয়ে দিলে পরের বেলা দুইটা ভাতের ব্যবস্থা হবে কি না এই চিন্তা মাথার মধ্যে শুধু পাক খায়। সেই চরম দুশ্চিন্তার সময়ে হাবলু-ডাবলু, মানে ওই দুজনের জন্য মনে মনে যে দুইটা নাম ঠিক করেছে সে, তারা এসে হাজির নিউমার্কেটের ফুটপাথে। দুই জনে এক রাত তিন হাজার টাকা দরদাম হয়েছিল। হোটেলে যেতে রাজি হয়নি হাবলু-ডাবলু, তাদের বাড়িতে যেতে হবে বলেছিল। লালখান বাজার তো আর দূরে নয়। দোনমন করে রাজি হয়েছিল। অভাবে বুদ্ধিনাশ। রাজি হয়েই ফেঁসে গেল। হোটেলের ঘরে গেলে এই রকম বিপদ নাই। ম্যানেজার-কর্মচারী সবাই তো পরিচিত, তারা থাকলে কাস্টমার বেশি তেরিবেরি করার সুযোগ পায় না।
তবে এক সময় সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা ছিল সদরঘাট সাহেবপাড়ায়। সবাই তো জানত সেখানে কারা থাকে। খদ্দেররা সাহেবপাড়ায় তাদের কাছে আসত তখন। আর এখন খদ্দেরের জন্য পথে পথে ঘুরতে হয় তাদের। কখনও পুলিশে ঠ্যাঙায়, কখনও আবার কোত্থেকে কিছু ফেরেশতা আদমি লাঠিসোটা নিয়ে মারতে আসে।
সাহেবপাড়ায় সবই ভালো ছিল, শুধু একটাই সমস্যা। কদিন পর পর আগুন লাগত। পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছে, পাড়াটা তুলে দেওয়ার জন্য এলাকার মানুষরাই আগুন লাগাত। এসব নিয়ে অনেক দেন-দরবার হয়েছে তখন। পাড়ার মেয়েরা-খালারা সবাই এক হয়ে ওয়ার্ড কমিশনার, থানার ওসির সঙ্গে দেন-দরবার করেছে। এতগুলো মেয়ে, তাদের ছেলেমেয়ে… কোথায় যাবে এসব কথা উঠেছে তখন। কেউ কেউ তাদের পক্ষেও ছিল। কিন্তু এলাকাবাসীরও যুক্তির অভাব নাই। তাদের বউ-ঝিরা মানসম্মান নিয়ে চলতে পারে না। সাহেবপাড়ায় যেসব লোকজন আসে তারা কুনজর দেয়। এই এলাকায় থাকে বলে তাদের মেয়েদের ভালো বিয়ের সম্বন্ধ পর্যন্ত আসে না। ঠিক, এইটাও ভাবনার বিষয়।
শেষ পর্যন্ত সাহেবপাড়াটা উঠে গেল, ঠিকানা ছাড়া হয়ে পড়ল পাড়ার মেয়েগুলো, তাতে আসলে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল সাহেবপাড়া। এখন মাইল্যার বিলে একটা খুপড়ি ঘরে আরও দুইটা মেয়ের সঙ্গে থাকে সে। ভাড়া দুই হাজার সাতশ টাকা। জনপ্রতি নয় শ। তবে এই ঘরে বাইরের লোকজন আসতে পারবে না, ‘আকাম-কুকামে’র পারমিশন নাই।
কী আর করা! পথে পথে ফেরিওয়ালার মতো ঘোরে। ফুটপাথের আলো-আঁধারিতে বা চিপায়-চাপায় দাঁড়িয়ে থাকে। যে চেনার সে ঠিকই চেনে, দরদাম ঠিক হলে লালদিঘির পাড়ের হোটেলে গিয়ে ওঠে। হুজ্জোত কম নাই, পুলিশ এসে ঝামেলা করে। সেটা অবশ্য হোটেলের ম্যানেজার সামাল দেয়। তাতেও অবশ্য তাদের খাঁই মেটে না, বেশি রাতে রাস্তাঘাটে পেলে ব্লাউজের ভেতর হাতড়ে টাকা নিয়ে যায়। এই রকম করেই চলে যাচ্ছিল। সব কাজেরই তো ঝামেলা আছে এটা মেনে নিতে হয়। কিন্তু কালকের রাতেরটা হয়ে গেছে বাড়াবাড়ি।
খাটে বসিয়ে ডাবলু তার মোবাইল ফোনে একটা হিন্দি সিনেমার গান ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘এইবার কাপড়-চোপড় খুইলা একটা ড্যান্স দ্যান তো ম্যাডাম।’
মনে মনে মা তুলে একটা গালি দিয়ে বলল, ‘শালারা সিনেমা দ্যাখতে আসছে…।’ মুখে বলল, ‘ড্যান্স-ফ্যান্স আমি জানি না, যা করার এমনে করেন।’
‘ড্যান্স’ করার জন্য দুই মাতাল মিলে কিছুক্ষণ টানা-হ্যাঁচড়া করল। শেষে সেই খায়েশ পূরণ না হওয়ায় সারা রাত শরীর নিয়ে খাবলাখাবলি করল বলদ দুইটা। নানা কসরত করেও জুত-মতো কিছুই না পেরে শেষ রাতের দিকে আগাম দেওয়া টাকাটা কেড়ে নিয়ে ধাক্কা দিতে দিতে বের করে দিয়েছিল তাকে। গালাগালির তুবড়ি ছুটিয়েছিল সে; দুই গাড়লকে নির্বংশ হওয়ার বদদোয়াও দিয়েছিল। যদিও জানে যে শকুনের বদদোয়ায় গরুর মৃত্যু নাই।
দুর্বহ কয়েকটা ঘণ্টা জাহান্নামে কাটিয়ে যখন রাস্তায় নেমে এসেছিল তখন আকাশে সবে আলো ফুটছে। হাওয়ায় অল্প একটু শীত। সুবেহ সাদিকের সময়টাতে কার ওপর অভিমানে যেন বুক ছাপিয়ে কান্না এসেছিল। জনবিরল পথে কান্না লুকানোর দরকার নাই। সারাটা পথ চোখের পানিতে ভেসে ভেসে ঝুপড়িতে ফিরে এসেছিল সে।
ঘরের শরিক অন্য দুজনের পাশে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু চোখ থেকে বদমাইশ দুইটার চেহারা মুছতে পারছিল না কিছুতেই। সকাল সাড়ে নয়টা-দশটা পর্যন্ত গাট মেরে পড়েছিল বিছানায়। এর মধ্যে ঘরের বাকি দুজন উঠে পড়েছে। চা-রুটি খাওয়ার সময় ডেকে তুলে মায়া করে তাকেও দিয়েছে খেতে। ওদের একজন রাতে কোনও ঝামেলা হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করেছিল। উত্তর দেয়নি। তারাও জানার জন্য বেশি উৎসাহ দেখায় নাই। জানে, নিজেই হয়তো একদিন সব বলবে।
ভেবেছিল আজ বের হবে না। কিন্তু হাত খালি। বাঁচার জন্যই তো মরতে হয়, বাঁচতে তো হবে! বিকেল হতে না হতেই গোসল সেরে তাই তার সব চাইতে সুন্দর শাড়িটার সঙ্গে ম্যাচ করা ব্লাউজ পরেছে, চোখে কাজল টেনে মুখে পাউডার বুলিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।
নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড এলাকায় না গিয়ে সিআরবিতে এসে দাঁড়িয়েছে আজ। এদিকে পুলিশের ঝামেলা একটু কম। সোনালু ফুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল কাস্টমারের আশায়। ঠিক তখনই চোখ পড়ল লোকটার ওপর। রেল ইঞ্জিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে নজর রাখছে তার ওপর। গত সাত-আট দিনে এই নিয়ে তিনবার দেখা গেল লোকটাকে। একবার সাদা পোশাকে পুলিশের লোক বলে সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু পরে মনে হলো, পুলিশ এত কষ্ট করে তার মতো একটা মেয়েকে ফলো করবে কেন। সরাসরি এসে ধরে ফেললেই তো হয়।
তাহলে কি খদ্দের ? খদ্দের হলেও দূর থেকে তাকিয়ে থাকার কী আছে, কাছে এসে সরাসরি কথা বলবে। তাহলে উদ্দেশ্যটা কী ?
দূর থেকে এবার সরাসরি তাকাল সে। লোকটা তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে এদিক-ওদিক দেখছে, যেন অন্য কিছুর খোঁজ করছে। মনোযোগটা যে আসলে তার দিকে নয় সেটা বোঝাতে কি না উলটোদিকে লাল বিল্ডিংটার দিকে এগিয়ে গেল কিছুটা।
মুহূর্তে একটা বুদ্ধি খুলে গেল মাথায়। পাশেই পাবলিক টয়লেট। পাহারাদার ছেলেটার হাতে দশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে সুরুৎ করে ঢুকে পড়ল সেখানে। দরজা বন্ধ করতেই ছোকরাটা বাইরে থেকে চেঁচিয়ে জানতে চাইল, ‘বড় না ছোট ?’
‘ছোট হইলে কি ঘরের ভেতর ঢুকতে হয় ? কাপড় তুইলা তোর মুখে কইরা দিলেই তো অইতো…।’
মুখ ঝামটা খেয়ে রাগ করার বদলে হেসে ফেলে ছোকরাটা, দাঁত কেলিয়ে সেও একটা খিস্তি দেয়, ‘ধুরো মাগী।’
পাবলিক টয়লেটের ভেতর প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। কিন্তু এইসব নিয়ে ভাবার সময় এখন নাই। ভেতরের দেয়ালে একটা ঘুলঘুলির মতো আছে, বাতাস আসা যাওয়ার জন্য ছোট ছোট ছিদ্রঅলা ঘুলঘুলি। এবার সেই ঘুলঘুলি দিয়ে দূরে দাঁড়ানো লোকটার দিকে তাকাল। এদিক ওদিক পায়চারি করে আবার রেল ইঞ্জিনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। দৃষ্টিটা এদিকে, মানে সোনালু ফুল গাছটার আশেপাশে। লোকটা যে তাকেই অনুসরণ করছে কোনও সন্দেহ নাই। সোনালু গাছের আশেপাশে তাকে না দেখে লোকটার বিচলিত ভাবসাবই বলে দিচ্ছে এতক্ষণ নজর রাখছিল তার ওপরই। বাইরে থেকে ছোকরা হাঁক দেয়, ‘কী অইল কতক্ষণ লাগব ?’
আবার মুখঝামটা দেয় সে, ‘চুপ থাক ব্যাটা, দশ ট্যাহা অহনও উসুল হয় নাই।’
লোকটা টিলা থেকে নেমে এসেছে রাস্তায়। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে উদভ্রান্তের মতো। হয়তো ভাবছে হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি মেয়েটা। গুলগুলির ভেতর থেকে চোখ রেখে হাসি পায় তার, আবার দুশ্চিন্তাও হয়, কে লোকটা!
‘কী, অহনও অয় নাই ?’ বাইরে থেকে ছোকরা জানতে চায়।
‘না।’
লোকটা এবার চলে এসেছে সোনালু ফুলগাছটার নিচে। এই প্রথম বলতে গেলে মাত্র দু-তিন গজ দূর থেকে দেখল লোকটাকে। চল্লিশের নিচে বয়স, দেখতে শুনতে মোটামুটি ভালো, বেশি মোটাও না আবার চিকনাও না, গায়ের রং কালো। আর্মিদের মতো ছোট করে ছাঁটা চুল, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। জামা-জুতা চলাফেরায় একটা অফিসারের ভাব আছে। কিন্তু তার পেছনে লাগল কেন ?
যা হওয়ার হোক একটা বেপরোয়া ভাব এসে গেছে তার মধ্যে। দুম করে দরজাটা খুলে বেরিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল লোকটার সামনে। এ রকম হতে পারে ভাবে নাই, ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল লোকটা। এই থতমত ভাবটা দেখে নিজের ভয়-ডর কেটে গেল।
‘কী ভাইসাব, কী খোঁজেন ?’
‘না, কিছু না।’ কাঁচুমাচু চেহারা।
‘কিছু না মানে, আপনে আমারে খুঁজতেছেন এই কথা কইতে শরম লাগে ?’
‘হ্যাঁ, তোমাকেই খুঁজছি।’ এবার স্বীকার করল লোকটা।
‘ক্যান ?’
‘সবাই তোমাকে যে কারণে খোঁজে…।’
‘ভালো কথা। সেই কথা সামনে আইসা কইলেই হয়। আমরা তো আপনাদের জন্যই দাঁড়ায়া থাহি। কয়দিন ধইরা চোর-পুলিশ খেলতেছেন ক্যান ?’
লোকটা চুপ।
‘এহন কন, যাইবেন ?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার এক হাজার, হোটেল ভাড়া পাঁচশ। মোট দেড় হাজার।’
‘ঠিক আছে।’
অটোরিকশায় উঠে পাশে বসে বলল, ‘নাম জিগাইলেন না ?’
‘কী লাভ, তুমি তো আসল নাম বলবে না।’
‘এইটা ঠিক বলছেন, লোকে জানে যে আসল নাম বলব না, তবু জিগায়। আর আমরাও শাবানা, ববিতা, শাবনূর কিছু একটা বইলা দিই। শুনতে মনে অয় ভালো লাগে, চিত্রনায়িকার লগে বিছানায় যাইতেছে… হিহিহি…।’
‘তোমার নাম তো আমি জানি শারমিন।’
চমকে উঠল। দু ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল আপনাআপনি, কয়েক মুহূর্ত পলক না ফেলে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। চেনা লাগে, কিন্তু ঠিক চিনতে পারে না।
‘অই মিয়া আপনে কে ? আমার নাম জানলেন ক্যামনে ?’
‘এবার ঠোঁট টিপে হাসে লোকটা, নাম জানাটা কি খুব কঠিন ? চেষ্টা করলে কত কিছু জানা যায়।’
এটা ঠিক। নাম জানতে চাইলে কত ভাবে জানা যায়। শারমিন হেসে বলল, ‘আপনি মিয়া একটা বড় টিকটিকি। … আপনের কী নাম ?’
‘রঞ্জন।’
‘আমি তো অদের সঙ্গে কাজ করি না।’
‘কেন, সমস্যা কী ? শরীরের কি জাত আছে ?’
এবার একটু সলজ্জ হাসে, ‘সমস্যা তো আছে, আপনেদেরটা আকাটা না ?’
‘তুমি জানো কেমনে ?’
এ প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয় না শারমিন।
অটোরিকশা থেকে নেমে হোটেলে ঢোকার মুখে টাকা চাইল শারমিন, ‘হোটেলের ট্যাকা আগে দেওন লাগে।’
লোকটা বিনা বাক্যে তিনটা পাঁচশ টাকার নোট তুলে দিল তার হাতে।
দোতলার মোটামুটি পরিপাটি একটা কামরায় ঢুকল তারা। সিঙ্গেল রুম। একটা চেয়ার, ছোট একটা টেবিল, টেবিলের ওপর ছোট একটা টেলিভিশন। অ্যাটাচ বাথরুমও আছে একটা।
এই হোটেলের সবকিছুই শারমিনের চেনা, ম্যানেজার থেকে বয়-বেয়ারা সবাই পূর্ব পরিচিত। রঞ্জন বাবুকে সে জিজ্ঞেস করল, ‘মাল-মুল কিছু খাইবেন ?’
মাথা নেড়ে লোকটা জানাল তার অভ্যাস নাই। ভালো মানুষ ধরনের লোকগুলোর সঙ্গে একটু রগড় করতে হয়। থুতনিটা নেড়ে একটু ছেনালিপনা করল, ‘এই মাইয়াবাজির অভ্যাসটা হইল ক্যামনে ? ঘরের বউ দিয়া চলে না ?’
‘বিয়ে করি নাই।’
‘ও, এই বয়সেও বিয়া না কইরা বইসা আছেন ? তাইলে এই বাজারে ঘুরাঘুরি করা ছাড়া আর উপায়ডা কী…।’
‘তোমার তো বিয়ে হয়েছে তুমি কেন আসছ এই বাজারে ?’
আবার সারা শরীরে কেঁপে উঠল শারমিন, লোকটা কি তাকে চেনে ? তারও কেন যেন চেনা লাগছে তাকে।
‘আমার বিয়া অইছে কেমনে জানেন আপনি ?
‘আন্দাজ করে বললাম, বয়স দেখে আন্দাজ করা যায় না ?’
কথা বাড়াল না, কিন্তু সংশয়ের হেলদোল রয়েই গেল মনে। শাড়িটা খুলে চেয়ারের ওপর রেখে আবার রঞ্জন বাবুর পাশে বিছানায় এসে বসল শারমিন। কাতর কণ্ঠে বলল, ‘আমারে দশটা মিনিট ঘুমাইতে দিবেন স্যার ? তারপরে যা করার কইরেন।’
সম্মতি জানিয়ে লোকটা বলল, ‘কোনও অসুবিধা নাই, চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব ক্লান্ত, কিছুক্ষণ রেস্ট নাও।’
অনুমতি পেয়েই বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে পড়ল শারমিন। কী আশ্চর্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল বুঝে উঠতে পারে না। ঘুম ভেঙে দেখল, লোকটা নাই পাশে। ঘরের চারদিকে একবার চোখ বুলাল, নাই। তড়াক করে উঠে বাথরুমে দেখে এল একবার, সেখানেও নাই। টাকা-পয়সা তো আগেই বুঝিয়ে দিয়েছে, নিজের পাওনা বুঝে নিল না! শর্ত ছেড়ে চলে গেল লোকটা!
মানুষের ভাব বোঝা মুশকিল! এই লাইনে কত রকম লোকের সঙ্গে যে পরিচয় হলো। বিস্ময়ের একটা ঘোরের মধ্যে শাড়িটা পরতে যাবে, ঠিক তখন চোখে পড়ল শাড়ির ভেতর বেশ কিছু টাকা আর একটা কাগজ। অনেক টাকা। গুণে দেখল, দশ হাজার। এখনও কি ঘুমের মধ্যে আছে শারমিন ? স্বপ্ন দেখছে ? হাতে চিমটি কেটে দেখল একবার। না, স্বপ্ন না। সত্যিকারের টাকা। পাশে পড়ে থাকা কাগজটা হাতে নিল এবার, দুই লাইনে একটা চিঠি।
‘শারমিন, তোমাকে একবার দেখার জন্য মন কেমন করছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তোমাকে পেলাম। দেখা না হলেই বোধহয় ভালো হতো।―ইতি মালু।’
‘মালু’ শব্দটা পড়ার পরই যেন ঢং করে একটা ঘণ্টা বেজে উঠল কোথাও। স্কুল ছুটির ঘণ্টা, আর বৈলতলী মতলব-মোমেনা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের আনন্দ-কোলাহল। মুহূর্তে মিলে গেল। ‘মালু’ মানে তো সেই পালপাড়ার প্রিয়রঞ্জন পাল। ক্লাস সেভেনের ফার্স্ট বয় প্রিয়রঞ্জন! তার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকত। খুব বিরক্ত লাগত। বান্ধবীরা বলে, ‘তোরে মনে অয় পছন্দ করে রঞ্জনদা।’ শুনে কেমন জানি লাগত। ‘পছন্দ করে’ কথাটার মধ্যে ভালোলাগার একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু রঞ্জনদা তো হিন্দু, সে কেন তাকে পছন্দ করবে এই ভেবে একটু রাগও হতো। কিছু বলত না, সরাসরি তার দিকে তাকাতোও না। কিন্তু একদিন বেশি সাহস দেখিয়ে ফেলেছিল প্রিয়রঞ্জন। টিফিন ছুটির সময় একটু আড়ালে পেয়ে তার হাতে একটা চিঠি গুঁজে দিয়েছিল। চিঠির সব কথা এখন আর মনে নাই, শুধু চিঠির শেষে গানের একটা লাইন লিখে দিয়েছিল মনে আছে―‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ…।’
কোনটা অপরাধ আর কোনটা অপরাধ নয়, সেটা বোঝার বোধবুদ্ধি কি ক্লাস সিক্সের মেয়েটির হয়েছিল তখন। সমস্ত শরীর কাঁপছিল। ভালো লাগার মতো কিছু একটা হয়েছিল। ক্লাসের ফার্স্টবয়, স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু প্রিয়রঞ্জন তো হিন্দু। কিছুটা রাগ হয়েছিল ওই ছেলেটার ওপর, আর কিছুটা নিজের ওপর, কেন চিঠিটা নিতে গেল, এমনকি চিঠিটা পড়ে তার একটু ভালোই বা লাগল কেন! রাগে-দুঃখে সোজা গিয়ে চিঠিটা তুলে দিয়েছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার আবদুল হক স্যারের হাতে। আবদুল হক স্যার প্রিয়রঞ্জনকে ডেকে ভর্ৎসনা করেছিলেন, কিন্তু শাস্তি দেননি। ‘তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি প্রিয়রঞ্জন’―এ রকম কিছু একটা বলেছিলেন। তার দিকে তাকিয়ে রঞ্জনদার ব্যথিত-অপমানিত মুখটা এখনও চোখে ভেসে ওঠে।
ঘটনা ওইটুকুতে শেষ হতে পারত। হলো না। নাইন-টেনের কয়েকটা ছেলে খুব পিটিয়েছিল তাকে।
তার সহপাঠী তপতী তো কেঁদে ফেলেছিল, তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে প্রায় বইয়ের ভাষায় বলেছিল, ‘তুই এটা করতে পারলি শারমিন! ভালোবাসার এই প্রতিদান!’ যেন রঞ্জনদার ভালোবাসার প্রতিদান দিতে সে নিজেই এক পায়ে খাড়া।
নিজেকে সত্যি খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। দু-একবার চোখের চাউনিতে দোষ স্বীকার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রঞ্জনদা ফিরেও তাকায়নি। শেষে একদিন জোড়া দিঘির পাশে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। পাল পাড়ায় ফিরে যাওয়ার পথে আচমকা হাত ধরে ফেলেছিল রঞ্জনদার, ‘আমারে মাপ কইরা দিও…।’
রঞ্জনদা অবশ্য দোষ দেয়নি তাকে, বরং অন্যায়টা তার নিজেরই, ভুল পথে হাঁটলে পায়ে কাঁটা তো বিঁধবেই… এ রকম আরও কঠিন কঠিন কী সব যেন বলেছিল। এমনভাবে নিজের দোষ স্বীকার করেছিল, কী এক অদ্ভুত অভিমান আর ক্রন্দন যেন মেশানো ছিল গলায়, শারমিনের চোখে পানি আসার জোগার। মাফ-টাপ চেয়ে কোনওমতে পালিয়ে এসেছিল সেদিন।
কী আশ্চর্য, এরপর থেকে সম্পর্কটা কেমন যেন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। এমনকি হাসিঠাট্টাও হতো। তার আনন্দিত চোখ-মুখ দেখে সেটা বোঝা যেত। মানুষের কীসে যে আনন্দ, আর কিসে দুঃখ বোঝার উপায় নাই।
তারপর তো সময় ভেসে গেল বানের তোড়ের মতো। রঞ্জনদা পড়তে চলে গেল শহরে। এসএসসি পরীক্ষার আগেই ওমান প্রবাসী মাঝবয়সী এক লোকের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল শারমিনের। লোকটা বিয়ের পর তিন মাস দেশে ছিল। এই কদিনে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় তার শরীর নিয়ে যা-তা করেছে। শুধু যেন এক শরীর ক্ষুধা নিয়ে দেশে এসেছিল লোকটা। শরীর ছাড়া আর কিছু দেখার, অন্য কিছু নিয়ে কথা বলারও সময় বা ইচ্ছা তার ছিল না। ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি…’ গানের লাইন তাকে আর কে শোনাবে! ভাগ্য ভালো গোপনে ওষুধ খেয়েছিল, বাচ্চা-কাচ্চার ঝামেলায় পড়ে নাই।
ওমানে ফিরে যাওয়ার পর মাঝে মাঝে ফোন করত প্রবাসী। ভালোবাসার দুইটা কথা নাই, এতদিন বউয়ের সঙ্গে যে দেখা হয় না সেটা নিয়ে কোনও আফসোস নাই। ফোনে শুধুই গালিগালাজ… কখন মার্কেটে গেছে একা, কোন পুরুষের সঙ্গে কথা বলেছে হেসে… দোষের তার শেষ নাই।
এত দোষ শ্বশুরবাড়ির এক গাদা মানুষের রান্নাবান্না ফাই-ফরমাশ খেটে কখন সে করে উঠতে পারল নিজেও হিসাব মেলাতে পারেনি কখনও। প্রথম দিকে কান্নাকাটি করত। পরে তা-ও করত না। বিদেশ থেকে ফোন এলে শুধু শুনেই যেত, উত্তর দেওয়ার ইচ্ছা হতো না। তাতে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত লোকটা। অনেক দূরে বসে বউয়ের কান্না শুনতে বোধহয় পছন্দ করে এই লোকগুলো। সেটাও না শুনতে না পেয়ে রাগের সঙ্গে হতাশাও মিশে গিয়েছিল বোধহয়।
ওই প্রবাসীর আত্মীয়-স্বজনের একটাই ছিল মহান দায়িত্ব, তার স্ত্রী কত খারাপ সেটা ফোনে তাকে জানিয়ে দেওয়া। তিন বছর পর দেশে এসে তালাক দিয়েছিল প্রবাসী। বড় উপকার করেছে তার। কিন্তু সমস্যা একটাই; আশ্রয় ছিল না। বাপ মারা গিয়েছিল সেই কবে। তার তালাকের ছয় মাসের মধ্যে মা-ও গেছে। এখানেও দোষটা ঠিক তার কাঁধেই পড়েছিল। তার জন্য চিন্তায় চিন্তায় নাকি শয্যা নিয়েছিল মা। হতেও পারে। মা তো গেল, মা নাই গৃহে যার, সংসার অরণ্য তার। তিন ভাইয়ের একটা বোন টিকতেই পারল না বাপের বাড়িতে।
তো, এতদিন পর শারমিনকে একবার দেখার সাধ হলো প্রিয়রঞ্জনের। বৈলতলী মতলব-মোমেনা স্কুলের ভালো স্টুডেন্ট, পালপাড়ার প্রিয়রঞ্জন পাল। বিয়ার আগে একবার আইলা না রঞ্জনদা। একটু জোর দিয়া বলতে পারলা না, চলো শারমিন পালায়া যাই। একবার বইলা দেখতা…। তালাকের পরও তো আসলা না…। তহন যদি একবার কইতা, তুমি সুন্দর তাই…, খোদার কসম দুনিয়াদারির কুনো কিছুর পরোয়া করতাম না, চোখের পানিতে তোমার বুকের জামা ভিজায়া কইতাম, তোমারে ভালোবাসি মালু।
মঞ্জুর মা-র সঙ্গে শহরে আইসা গার্মেন্টসে ঢুকলাম, এক মাস বেতন পাইলে দুই মাস পাই না… তহনও খোঁজ করলা না! এতদিন পর শারমিনরে দেইখা তোমার মনে অইল, দেখা না অইলে ভালো অইত। ভালো তো অইতই, সব তো ভুইলা গেছিলাম। ক্যান আইলা মনে করায়া দিতে ?
এতদিন তো খালি বাইচা থাহনের লাইগা কত কিছু করছি। বাইচা থাহন যে কত কঠিন শারমিনের মতো কয়জন সেইটা জানে! কিন্তু আইজ যে আমার মরতে ইচ্ছা করতেছে প্রিয়রঞ্জন…। এত মনসরা অন্তরের কোথায় জমা আছিল! তোমার লগে দেখা হওয়ার পর সামান্য একটু ভালোবাসার জন্য এত যে বাসনা জাইগা উঠছে মনে, না মরলে তো সেই বাসনা আর জুড়াবে না!
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



