আর্কাইভগল্প

গল্প : মশার সঙ্গে মশকরা : আনিস রহমান

নতুন মওশুমে মশারা বোধ হয় আরও অনেক বেশি চালাক-চতুর ও সতর্ক হয়ে গেছে!

তা না হলে দিন ফুরিয়ে মাস। মাস ফুরিয়ে আরও দুটো মাস বিদায় নিলেও আজতক একটি মশাও মারতে পারিনি।

অবশেষে গতকাল ব্যর্থতার সে কালিমা থেকে মুক্ত হয়েছি। আনন্দ আর শান্তি এবং সফলতার হাত ধরে উজ্জ্বল একটি দিনের দেখা পেয়েছি। মানে! মানে বড্ড পরিষ্কার! একটি মশা মারতে পেরেছি! এ সফলতা অবশ্য খুব সহজেই আসেনি। পাক্কা একুশ মিনিট সময় লেগেছে বটে! তবে ঠিকই সাফল্য ধরা দিয়েছে। হাত ফুঁড়ে বেরিয়ে যেতে পারেনি। উড়ে উড়ে দূরে সরে যেতে পারেনি। দুহাতের মুঠোয় ঠিকই ধরা পড়েছে মশাটি!

ওয়াশরুমে ঢুকতেই মশাটি তার সবটুকু চাতুর্যপনা নিয়ে আমার কানের কাছে রকেট গতিতে এসে গুঁতো মারে। তার আগে আমি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি এমনি দিনের বেলায় ওয়াশরুমে মশা থাকতে পারে! কিন্তু আমার সে ধারণাকে ভুল ঠাওরে মশাটি শুধু গুঁতোই দিল না, তার সরব উপস্থিতি জানান দিয়ে আমার চারপাশে চক্কর দিতে শুরু করল। রেসলাররা রিংয়ে উঠেই যেমনি শরীর ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চারদিক ঘুরে নিজের শক্তির প্রদর্শন শুরু করে—মশাটির কাণ্ডকীর্তিও অনেকটা তেমনি—‘শালা নিজেকে ভেবেছিস কী! লাগতে আসবি! তার আগে আরও সাতবার ভেবে দেখ! তা না হলে তোর রক্ত দিয়ে আজ মধ্যাহ্ন ভোজ করব।’ ভোজেরই সময় বটে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সময় একটা।

আকস্মিক ঘটনায় আমি যেন কেমন জমে গেলাম। একে তো শীত। তার ওপর মশার মোড়লিপনা দেখে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেছি।

মশা তার ক্যারিশমেটিক ভঙ্গিতে কখনও নাকে কখনও কানে না হয় চোখে-মুখে এমনকি মাথার চুল ভেদ করে চাঁদির ওপর ঠোক্কর মেরে যাচ্ছে যখন তখন। কিন্তু হুল ফোটাতে পারছে না। অথচ মশাটি যেমনি অস্থিরভাবে বিচরণ করছে, সুযোগ খুঁজছে হুল ফোটাবে কখন! তার আগে একটু সুস্থির হয়ে বসতে হবে তো! মশাকে সে সুযোগ দেব না বলে অনেকক্ষণ তাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করলাম। তবে দুজনেই সমানে সমান! না পারছে ও আমার গায়ে হুল ফোটাতে। না পারছি আমি ওকে এক থাপ্পড়ে কুপোকাত করতে!

এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে গালে ব্রাশ ঘষা শুরু করলাম। ফেনায় ফেনায় ফুলেফেঁপে ব্রাশ বটবৃক্ষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। উপচে পড়ছে ফেনা। কিন্তু কোনওভাবেই রেজর ছোঁয়াতে পারছি না গালে। যখনই রেজর গাল ছুঁইছুঁই, তখনই মশার চাতুরিপনা শুরু! শুধু কী চাতুরিপনা, রীতিমতো নৃত্যায়োজন! নৃত্যের তালে তালে এক হাত দেখে নেওয়ার ভঙ্গিতে কানের কাছে, নাকের কাছে এসে ওর সে কী অঙ্গভঙ্গি! এ অবস্থায় কী শেভ করা যায়! যে কোনও সময় গাল কেটে রক্ত ঝরতে কতক্ষণ! আমি ডাকি, সঞ্চারী, একটা কয়েল জ্বালিয়ে দেবে নাকি! সঞ্চারীর কোনও সাড়া নেই।

অগত্যা শেভের নিকুচি করে পূর্ণ মনোনিবেশ করলাম মশা নিধনে। একটিমাত্র মশা! অথচ কী তার হুজ্জোতি! রীতিমতো গোল খাইয়ে ছাড়ল! ডানে গেলে বাঁয়ে। বাঁয়ে গেলে কমোডের ওপর। ওখান থেকে হ্যান্ডশাওয়ারের গায়ে, না হয় ছাদের কোণে গিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে! অথচ আমার অসতর্ক মুহূর্তে ঠিকই নাকে মুখে কানে যেখানে সুবিধে হামলে পড়ছে কিছু বোঝার আগেই। যেন সাত জনমের বৈরিতা ওর সঙ্গে আমার।

এভাবে ওয়াশরুমে কতক্ষণ থাকা যায়! আর কাঁহাতক সহ্য করা যায় মশার বিটলেমি! মশাকে দুটো গাল দিয়ে ফের শেভ করায় মন দিলাম। অমনি দেখি বেসিনের সামনে মশার নিরন্তর ওড়াউড়ি। যেন স্বচ্ছ জলের গায়েও রক্তের দেখা পেয়েছে ও। কল ছাড়লেই জল থেকে রক্ত টেনে নেবে মুহূর্তে।

নির্বিঘ্নে শেভ পর্ব শেষ করার জন্যে তড়িঘড়ি ওকে তালুবন্দি করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সাঁই করে অনেক ওপরে ছাদের সীমানায় চলে গেল ও। ছাদ আঁকড়ে ঝিম মেরে বসে রইল অনেকক্ষণ। হয়তো নতুন কোনও বুদ্ধি কৌশল আর চাতুর্যপনা মিশিয়ে নতুন কোনও রণকৌশল নিয়ে ভাবছে। কিন্তু ভাবনার আগেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতার সঙ্গে আমার মুখের ওপর হামলে পড়ল হঠাৎ। কী আক্রমণাত্মক ভঙ্গিরে বাবা! আমি চটাশ করে দু তালু এক করতেই মশাটি বন্দি হতে হতে ছুটে পালাল! তবে কিঞ্চিৎ আহত হয়েছে বোঝা যায়। কেমন যেন ডানা দুটো কেঁপে কেঁপে উঠছিল। খানিক পরেই বুঝলাম এ আমার মনের ভুল। বরং যা ভেবেছি, ঘটছে তার উলটো।

তার আক্রমণের কৌশল আরও জোরালো হচ্ছে। অঙ্গভঙ্গি পালটে গেছে অবাকরকম! জুতমতো এবার আমার কানে ঠোক্কর দিতেই আমি চটাশ করে আমার দুই তালু এক করে মশাকে বন্দি করার জন্যে পাঙ্গা দেই! কিন্তু মশা একটু নিচের দিকে ড্রাইভ দিয়ে মুহূর্র্তে লাপাত্তা। আবার উড়ে এসে আমার নাক ছুঁয়ে গেল আলতো করে।

রেজর গালে বসাতেই মশার তাড়া খেয়ে হাত নড়ে গেল। এতেও ক্ষান্তি নেই ওর। এবার পায়ের পাতা থেকে শুরু হলো ওর নতুন খেলা। কখনও লুঙ্গির ফাঁক গলে ঊরু না হয় হাঁটুর ভাঁজে সুড়সুড়ি দিচ্ছে মশাটি। ভারি অসভ্য তো! আমি নড়ে উঠতেই ও বেরিয়ে এসে কোথায় যে উড়াল দিল বুঝতে পারলাম না।

রেজর হাতে আয়নার মুখোমুখি হলাম ফের। আমার চোখের সামনে দিয়ে দু-দুবার টহল দিল মশা। ওর লম্ফঝম্ফ দেখলে সত্যি অবাক হতে হয়। আয়নার সামনে দিয়ে ঘুরছে উড়ছে। তারই ফাঁকে কানের লতি, চোখের ভ্রƒ, না হয় কপালে এসে ঢুঁ মারছে। কখনও আলতো করে সুচের খোঁচা দিচ্ছে! তবে রক্ত শোষণ করার মতো হুলের শক্তি একবারও হয়নি। ওদিকে সঞ্চারী বারবার তাড়া দিচ্ছে, ওগো এতক্ষণ কী করছ ওয়াশরুমে! শেভ এখনও হয়নি! শরীরও তো ভেজাওনি বোধ হয়!

ঝামেলায় আছি! আর বিরক্ত করো না। একজনের বিরক্তির ঠেলায় ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে যাচ্ছে!

কী বলছো! পাগল হলে নাকি ? আমি আবার কখন তোমার ব্রহ্মতালু জ্বালালাম।

তুমি না তুমি না তোমার সতিন!

আমার সতিন এল কোত্থেকে ?

কথা কম! ভীষণ বিরক্ত করছে।

ওয়াশরুমে তোমাকে কে আবার বিরক্ত করছে! কাকে নিয়ে ঢুকেছো বলোতো!

কাকে আবার! তোমার পোলাপানদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ!

আমাদের পোলাপান! ওরা তো বেলকনিতে খেলছে। একজন ডাক্তার, অন্যজন রোগী।

নিকুচি করি তোমার ডাক্তারের! এদিকে আমার দম ফুরোবার জোগাড়।

সঞ্চারী দরোজার গায়ে ধুম করে একটা কিল বসিয়ে চলে গেল! সতিনকে দেখতে সামান্যতম কৌতূহল হলো না ওর!

আমার মেজাজ এবার শুধু সপ্তমে নয়। রীতিমতো চরমে। একটা মশার মামদোবাজিতে এভাবে নাকাল হতে হবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা!

অমনি আমার গালে জোরসে একটা ঠোক্কর দিতেই এবার সর্বশক্তি আর সর্বরাগ ক্ষোভ সব ঝেড়ে দুহাত চালালাম সপাটে! দুতালুর ক্যালানিতে মশাটি ধেবড়ে গেল মুহূর্র্তে! ওর শরীর ছিঁড়ে ভুজভুজে রক্ত বেরিয়ে এল একগাদা। দু-হাতের তালু তখন রক্তে মাখামাখি! এক অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর এবং তৃপ্তির হাসি আমার সারা মুখ জুড়ে। দলবদ্ধ মশা নয়। এক হালি মশা নয়। একটি মাত্র মশাই আমার হাঁপ ধরিয়ে দিয়েছে এ কতক্ষণে! এবার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর নেমেছে। মাথার জমাট একটু একটু করে যেন সরে যাবে। অবশেষে বিজয়ীর ভঙ্গিতে একবার আয়নায় নিজেকে দেখে দু-তালুর রক্ত জলে মিশিয়ে দিতে দিতে বললাম, পোয়া ছটাকি মশা না! অথচ ভাবখানা কী যেন হনুরে! বলে জোরসে ব্রাশ ঘষা শুরু করলাম গালে। ক্ষৌরকর্মের ফাঁকে ফাঁকে মন বলল, পোয়া ছটাকি আর এক ছটাকি যা-ই বলি না কেন—মশাটা আমাকে সত্যি সত্যি নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছেড়েছে।

আসলে কোনও প্রাণিকুল হত্যার পক্ষে আমার কোনও সায় নেই। ছিলও না কখনও। এমনকি সাপ দেখলেও ভীষণ ভয় পাই বটে, তবে সর্পহত্যার পক্ষেও আমার মন কখনও সায় দেয় না।

ফুল কিংবা ফুল গাছের পাতা ছিঁড়তেও আমার ভীষণ কষ্ট! বিশেষ করে সন্ধ্যায় কিংবা পড়ন্ত বিকেলে কাউকে গাছের পাতা কিংবা ফুল ছিঁড়তে দেখলেও আমি মনের দিক থেকে দারুণ বিপন্ন বোধ করি! বিষণ্নতায় ছেয়ে থাকে মন অনেকটা সময় ধরে। তবে সে-ই আমি, আমার প্রাণি হত্যা তালিকায় তিনটে প্রাণি রেখেছি। এর একটি অবশ্য মশা। অন্যটি ছ্যাংগা বা শুয়ো-পোকা। এবং শেষেরটি হচ্ছে বিছা। এদেরকে হত্যা করতে আমার বুক সামান্য পরিমাণ কাঁপে না। বরং আনন্দ হয়—যখন চ্যাট করে একটা ছ্যাংগা বা বিছা দলে ফেলি, পিষে ফেলি পায়ের নিচে ফেলে। তখন আমার আনন্দের আর শেষ থাকে না। প্রকৃতির এ সন্তানের ওপর কেন যে আমার মেজাজ এতটা খিঁচড়ে থাকে জানি না! মনে হয় ওদের দেখলে আমার ভেতরে কেমন যেন এক য্দ্ধু যুদ্ধ খেলা শুরু হয়ে যায়। আগে পিছে কিছু না ভেবেই মরণকামড় দেওয়ার জন্যে আমার মাথা চিড়বিড় করে ওঠে। এদের মধ্যে শুয়ো পোকা-ছ্যাংগা না হয় বিছা কিংবা চেলা কালে-ভদ্রে হাতের কাছে পেলেও মশার সঙ্গে মুখোমুখি হতে হয় প্রতি সন্ধ্যায়-রাতে।

আজকাল দিনের বেলায়ও ওদের নীরব বিচরণ চোখে পড়ে। কোথায় যে এরা গা ঢাকা দিয়ে থাকে সে এক বিস্ময়! তবে সন্ধ্যার ছায়া ঘনাতেই প্যাঁ পুঁ প্যাঁ পুঁ বাঁশি বাজিয়ে হামলে পড়ে ওরা। শিকার ধরবে, রক্ত টানবে সে নেশায় তারা এখন মত্ত। শিকার টার্গেট করে যখন-তখন ওরা ছড়িয়ে পড়ে ঘরের আনাচে-কানাচে, বারান্দায় বেলকনিতে। আজকাল সব জায়গায় নেট দেয়া থাকলেও সেভাবে কাজ হচ্ছে না। ওদের নৃত্য ওরা করেই যাচ্ছে। রক্তনৃত্য যাকে বলে। বাদ্য বাজিয়ে যাচ্ছে। রক্ত দ্রুত টেনে নেয়ার জন্যে অনবরত হুলে শান দিচ্ছে চোখের সামনেই।

কাজের সুবাদে কত জায়গায় না থেকেছি! তখন নানা জেলার নানা জায়গায় হরেক কিসিমের মশার সঙ্গে মোলাকাত করার সুযোগ হয়েছে আমার! এর মধ্যে রাজশাহীর মতো এত চতুর মশা আমি এ জীবনে কখনও দেখিনি। মাছির শুনেছি ছ-খানা চোখ! সেসব চোখ দিয়ে একই সঙ্গে সে তার চারদিকে দেখতে পায়। যেমনি সার্চলাইট ঘুরে ঘুরে আলো ছড়ায় চারদিকে। কাছ থেকে দূরে সব দেখা যায় ফকফকা। রাজশাহীর মশারাও বোধ হয় ছয় চোখা!

একা মানুষ! বউ ছেলেপুলে ঢাকায়। বদলির চাকরি যখন আসতেই হবে! চলে এসেছি। কিন্তু একা হয়ে গেছি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। নিঃসঙ্গতা! তাই সময় কাটাবার জন্যে নানা সঙ্গীর সঙ্গ পেতে নানা জোগাড়যন্তরের শেষ নেই। এর একটি হচ্ছে খবরের কাগজ। রোজ পাঁচটি দৈনিক শোভা পায় আমার নিঃসঙ্গ ঘরে। অফিসে যাবার পর হকার দরোজার তলা দিয়ে কাগজগুলো ছুড়ে মারে তিরের বেগে। ঘরে ফিরে যখন দরোজা খুলি, দেখি কাগজেরা ঘরের এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে অনাথের মতো। রাতে যখন আরও একা হয়ে যাই তখন মেঝেয় পড়ে থাকা কাগজগুলো টেনে নেই একে একে। পেপার পড়ি না যেন গিলে খাই। প্রতিটি কাগজের আদ্যোপান্ত মুখস্থ করে ফেলি। তবু মনে হয়, কী যেন বাকি রয়ে গেল!

এমনি করে খবরের কাগজের লেখাগুলো যখন ঢুলুঢুলু চোখের আলোয় একটু একটু ধরে ঝাপসা হয়ে আসে, তখনই হঠাৎ ঘুমের চটকা ভাঙে। মশারি! মশারি না টাঙালে তো এক দণ্ডও ঘুমোতে দেবে না ওরা। নির্ঘাত আমার গায়ের রক্তের দফারফা করে ছাড়বে। পারলে অন্য কোথাও তুলে নিয়ে যাবে। জুতমতো রক্তপিপাসা মেটাবে সেখানে নিয়ে। এক লাফে উঠে দু-দিকের দু-আঙটায় মশারির ফিতা লাগিয়ে জাজিমের নিচে গুঁজতে থাকি মশারির পুরো শরীরটা। ঘরের অর্ধেক জুড়েই জাজিম পাতা। তার ওপর দু-দুটো তোষক এবং দুটো পেল্লায় সাইজের লেপ! এদের পুরু শরীরের ফাঁকে ফাঁকে মশারি গুঁজতে হয়। কী পেরেশানিরে বাবা! কিন্তু এর চেয়ে বড় পেরেশানি শুরু হয় মশারির ভেতরে!

সকালে আমি রিঙ থেকে কেবল দুদিকের ফিতা খুলে রাখি। অবশিষ্ট দুটো ফিতে রিঙের সঙ্গে প্রথম দিন থেকে যে ঝুলছে আজও তা বিরামহীনভাবে লটকে আছে। দুটো রিঙের তলায় মশারি থুপ হয়ে পড়ে থাকে পুরো বিছানাজুড়ে। রাতে কেবল ওদের দু হাতে তুলে ধরে দাঁড় করাই মাথার ওপর।

সব আয়োজন শেষে সবে যখন মাথা রাখব বালিশের গায়ে তখনই হেলিকপ্টার হয়ে মশারা আমার কানের কাছে নাকের কাছে বাঁশি বাজাতে শুরু করে। প্রথমে হাত নেড়ে ওদের তাড়ানোর চেষ্টা। থাপ্পড়ের ভঙ্গিতে ওদের প্রতিহত করার চেষ্টা। কাঁথা কিংবা অন্য বালিশে মাথা ঢেকে ওদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা। তাতেও শেষ রক্ষা হয় না। মশারা ওদের তাবৎ আনন্দ তখন খুঁজে ফেরে আমার শরীরে। আমার শরীর নিয়ে রীতিমতো মশারা তখন ময়না তদন্ত চালাতে থাকে। আমার শরীরের কোন জায়গায় হাড়। কোন জায়গায় মাংস। কোথায় থলথলে চর্বি তার জন্যে কত সাইজের হুল ফুটিয়ে কাক্সিক্ষত রক্ত জোগাড় করা সম্ভব হবে। সে নিয়েই ওদের যত ভাবনা। শত ব্যস্ততা। অগত্যা বেড সুইচ জ্বালিয়ে আলোর বন্যায় ওদের খুঁজে ফেরার চেষ্টা। ‘বজ্জাত মশা! কতক্ষণ থাকবি লুকিয়ে! সময় থাকতে বেরিয়ে আয়। মারব না। একটুও মারব না—কথা দিচ্ছি!’ আমার কথায় সায় দিয়ে কখনও ওরা বেরিয়ে আসে ঠিকই কিন্তু ধরা দেয় না কোনওভাবেই! যেন আমার সঙ্গে নাইট শিফট তামাশা খেলার জন্যে ওরা অপেক্ষায় ছিল। ওদের না মেরে কিংবা না তাড়িয়ে শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ কোথায়!

আমি শুয়ে বসে কাত হয়ে চিত হয়ে উপুড় হয়ে বসে কখনও দাঁড়িয়ে মশা নিধনের চেষ্টা করি। কিন্তু সাফল্য ? সে থাকে অনেক দূরে! ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ধারে-কাছেও যেতে পারি না কখনও। ওদিকে রাতে ঘুম আসে না বলে ডরমিকাম পয়েন্ট ৭ খেয়ে ঘুমোতে হয়। রাতে খবরের কাগজ ধরার আগে আমি ডরমিকাম ধরে ফেলি। এবং চোখে ঢুলুঢুলু হয়ে এলে মশারি টাঙাতেই শুরু হয় ওদের রক্ত তামাশা। পুরো মশারি জুড়ে বড়জোর ছ থেকে আটটি মশার তাণ্ডব! তাতেই আমার জীবন নাকাল করে ছাড়ে।

একদিকে ঘুমের রেশ। সে সঙ্গে ডরমিকাম এবং সবশেষে মশাদের সঙ্গে লড়াই করে ক্লান্ত শরীরে কখন যে নেতিয়ে পড়ি এবং যথারীতি একসময় ঘুমিয়ে পড়ি জানি না!

এরই মধ্যে ইশকুল বন্ধ পেয়ে ছেলেমেয়ে সমেত সঞ্চারী এসে হাজির আমার একরুমের আবাসালয়ে। ও এসে রীতিমতো আঁতকে ওঠে। যেমনি করে অনেকে আঁতকে ওঠে তেলাপোকা কিংবা টিকটিকি দেখলে। ‘এ তো মানুষের বাসা নয়। জীবজন্তুর জঙ্গল। তুমি কী মানুষ! মানুষ হলে এমন জঙ্গলের মধ্যে থাক কী করে!’ এরপর বালিশ থাবড়ে চাদর নেড়েচেড়ে দেখে সঞ্চারী। ‘উহু! বালিশে কী গন্ধ, তেলচিটচিটে চাদর—কী বিচ্ছিরি গন্ধরে বাবা!’ বিছানার চাদর ধরে নাড়া দিতে প্রথমেই চোখে পড়ে জায়গায় জায়গায় রক্তের ছোপ। ‘বিছানা জুড়ে এত রক্ত কোত্থেকে!’

আমার শরীর থেকে।

তোমার শরীর থেকে!

সঞ্চারীর চোখে বিস্ময়। মুখ বিলাতি টমেটোর মতো এবড়োখেবড়ো। আসলে ঘুমের ওষুধের দাপটে একসময় ঘুমিয়ে পড়ি না শুধু—বেঘোরে ঘুমোতে থাকি। তখন আমি ওদের কাছে শুধু একটা অকশনের মাল। পরিত্যক্ত। সুতরাং মশারা তখন ইচ্ছেমতো আমার শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ত টেনে নেয়। এমনকি আমার শক্ত কপালের ওপর থেকেও রক্ত শুষে নিতে ওদের জুড়ি নেই। বাধাহীন সে রক্ত খেয়ে বেচারারা এমনই নাদুস-নুদুস হয়ে পড়ে যে ওদের আর নড়াচড়ার সুযোগ থাকে না তখন। শেষে আমার সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ে ওরা। সেসব বেলুন বেলুন চেহারার অজ্ঞান মশাগুলো আমার শরীরের নিচে পড়ে দলাই-মলাই হয়ে যায় কখন যেন! আমার শরীরের ভারে ওদের শরীর ফুটে পুটুশ-পাটুশ রক্ত বেরিয়ে আসে। সেসব রক্তই চটকে আছে বিছানায়। বালিশের গায়ে।

রক্ত খেয়ে বেলুন চেহারার মশা যদি কখনও হাতে পড়ে, দু তালুর চাপে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। রক্ত মাখা তালু দুটো চোখের সামনে রেখে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকি। তখন ভেতর থেকে কে যেন বিড়বিড় করে বলে, এ আমার রক্ত! আমার রক্তের রূপ ও রং কেমন তা হাতে নিয়ে দেখার সুযোগ হলো। মনে হলো আমার রক্ত যেন সাধারণত অন্য সবার রক্তের চেয়ে একটু কালো! এ রক্তের ভাষা খোঁজার চেষ্টা করি। এ বোধ হয় কোনও বদ রক্ত! না, তা হবে কেন ? তবে কি ব্লু ব্লাড বলব! তাও নয়। তাহলে ? এ রক্তের কোনও অর্থ কিংবা তাৎপর্য তো খুঁজে পাচ্ছি না। রক্ত তো রক্তই! কিন্তু এ রক্ত ওদের কাছে এত প্রিয় কেন ? মন এর নানা কারণ এবং অর্থ ফিকির করে! এবং কোনও উত্তর না পেয়ে একসময় রক্ত নিয়েই ফের ঘুমিয়ে পড়ি!

সঞ্চারী চটকে থাকা সে রক্তে হাত বুলিয়ে বলল, তোমার রক্তে তো বিছানা সয়লাব! কই দেখি বলেই ও আমার গেঞ্জি সরিয়ে পিঠে, পরে হাতে-ঊরুতে গালে হাত বোলাল। ওমা! কী রাক্ষুসে মশারে বাবা! পুরো শরীর একেবারে ক্ষত-বিক্ষত করে ছেড়েছে! কোনও মায়া-দয়া কিচ্ছু নেই মশাগুলোর! একা পেয়ে নির্দয় আক্রমণ! আর তুমিই বা কেমন মানুষরে বাবা! দিনের পর দিন এভাবে রক্ত খেয়ে যাচ্ছে, মচ্ছব করে খাচ্ছে আর তুমি নির্বিকারভাবে শরীর পেতে দিচ্ছ রোজ!

বালিশের খোল ছাড়াতে গিয়ে আমার চোখে চোখ রাখে সঞ্চারী। রাজ্যের মেঘ যেন ভিড় করেছে ওর দু চোখে। ‘নিজেকেই যে ভালোবাসতে পারে না, সে আমাদের ভালোবাসবে কী দিয়ে!’

এ নিয়ে কোনও তর্ক করব না। শুধু বলব, নিজেকে ভালোবাসি বলেই রোজ সন্ধ্যায় সাহেববাজারের মোড় থেকে শুরু করে ঘাটে ঘাটে নানা জায়গায় রাত পর্যন্ত কমপক্ষে দশ-বারো কাপ চা খেয়ে ফেলি! মানে মন যা চায়—তাই করি! নিজেকে আনন্দে রাখি, নিজেকে আনন্দ দিই! এর চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে বল!

চায়ের সঙ্গে ভালোবাসার কী সম্পর্ক!

সাহেববাজারের রাস্তায় যতগুলো চায়ের দোকান রয়েছে সবগুলোর চা-ই ফার্স্ট ক্লাস। গরুর দুধের চা, সঙ্গে মালাই! কী চমৎকার গন্ধ। কোনটা রেখে যে কোনটা খাবি ঠিক বুঝতে পারি না। মনে হয় সবই খেয়ে ফেলি! সব তো আর খেতে পারব না। তাই পথ চলতে চলতে যখন যে দোকান পড়ে, তার কাছ থেকেই এক কাপ চা খেয়ে নিই! এমনি চায়ের আনন্দ খুঁজে ফেরা আমার দারুণ প্রিয়! শুধু কী চা! চায়ের দোকান ঘিরে কত কত মানুষের ভিড়! ওদের কথায় কত বৈচিত্র্য। কথা বলার কত না ঢং। বিষয়ের কত না বাহার! এরাও ওর মনোযোগ কাড়ে। তখন বলতে পারি ওরাও আমার পাঠের অংশ। নিজেকে ভালোবাসি বলেই তো কতভাবে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করি। কতভাবেই না নিজের যত্ন নেই! তোমাদের শূন্যতা কতভাবেই না পূরণ করার চেষ্টা করি! এও তো এক ধরনের নিজেকে ভালোবাসা! মিথ্যে বললাম ?

আমার কথায় ওর বোধ হয় পোষাচ্ছে না। ও মনোযোগ সরিয়ে আমার উদোম পিঠে মনোযোগ দিতেই ওমা! কী লাল হয়ে ফুটে আছে। ডালিমের দানার মতো কী লালচে সব দানা! যেন গুটিবসন্ত উঠেছে।

সঞ্চারী এবার আমার গালে চিবুকে পায়ের পাতায় এমনকি হাঁটুর নিচে, ঊরুতে সব জায়গায় স্যাভলন দিয়ে ক্ষত মুছে দিল। বলল, ভাগ্যিস তোমার চিনিরোগ নেই!

চিনিরোগ!

ডায়াবেটিস গো ডায়াবেটিস!

শুনেছি যাদের ডায়াবেটিস আছে ওদের রক্ত বেশ মিষ্টি! তখন তোমার রক্ত খেয়ে একেকটি মশা মিষ্টিকুমড়োর মতো ফুলে উঠত।

আর—আর ?

মানে!

মশার কামড়ে ক্ষতগুলো ফুলেফেঁপে শেষে পেকে যেত! ইনফেকশনে ইনফেকশনে আমার শরীরের অবস্থা কী হতো একবার বুঝতে পারছ! কিন্তু চিনিরোগ নেই, তারপরও আমার শরীরটা মশাদের কাছে এত প্রিয় কেন ঠিক বুঝতে পারি না!

অমন অলুক্ষুনে কথা বলে না! বলেই আমার হাত টেনে নেয় সঞ্চারী ওর হাতের মুঠোয়।

একদিনের মধ্যেই পুরো ঘরের চেহারা বদলে গেল। সঞ্চারীর হাতে যেন জাদু আছে। এলোমেলো কাঁথা-বালিশগুলো সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা হলো। ঢাকা থেকে সুন্দর একটা বেডশিট কিনে এনেছিল। তা পেতে দিল। যেমনি রং তেমনি ছাপা চাদরের। পুরো ঘর যেন ফুলের বাগান হয়ে গেল। ঘর যেন পাখি হয়ে উড়ুউড়ু করছে। সঞ্চারীর পারফিউম, পাউডার, স্নো, ক্রিম এবং আরও কিছু প্রসাধনী রাখা আছে টেবিলে। ওদের গা থেকে মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে সারা ঘরে। আমি অবাক! ভীষণ মুগ্ধও বটে! যেদিকে তাকাই শুধু প্রাণের ছোঁয়া। ঘরখানিও বেশ বড় মনে হচ্ছে আজ। ওদিকে বারান্দায় স্টোভের চুলো থেকে যেমনি পোড়া কেরোসিনের গন্ধ আসছে, সে সঙ্গে পাঁচ সম্ভারের গন্ধ। নাক টেনে গন্ধ নিই। ‘বাহ চমৎকার সুবাস! দারুণ টেস্ট হবে তরকারি!’

সন্ধ্যা হতেই ছেলেমেয়ে দুটো বলল, খেয়াল করছো আজ কিন্তু ঘরে তেমন মশা দেখা যাচ্ছে না। রাতে মশারি না টানালেই চলবে হয়তো। আমি খেয়াল করলাম মশারিও আর আগের মতো ঝুলন্ত নেই। সুন্দর করে ভাঁজ দিয়ে কাঁথার নিচে চেপে রেখেছে। আমি বলি—‘তাই বুঝি তোর মা মশারি আগেভাগেই লাপাত্তা করে দিয়েছে! মশারা তোদের আগাম খবর দিয়েছে নাকি!’

প্রীতি বলল, তুমি ছিলে জঙ্গলে! জঙ্গলে তো মশা থাকবেই! এখন ঘরটা অনেক কষ্ট করে আজ মানুষ করেছে মা। মানুষের ঘরে কি মশা থাকে!

আমি লা জবাব। কথা সরে না মুখে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললাম, তার মানে আজ রাতে আর মশারি টাঙাতে হবে না!

কোনও দরকার নেই বাবা! প্রীতির চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস উপচে পড়ছে যেন।

রাতে যথারীতি চারটে বালিশ পাতা হলো। কাঁথাগুলো সবার পায়ের কাছে রেখে মশারি চেয়ারে ছুড়ে মারল সঞ্চারী—‘আমি যতদিন আছি একে দূরেই থাকতে হবে। শুধু ঘরটাকে হাট বানিয়ে রেখে লাভ কী।’

আমিও আর কথা বাড়ালাম না। ওদের সঙ্গে সহমত হয়ে সুইচ টিপে আলো নেভালাম। ঝিম অন্ধকারে যেন সারা ঘর ডুবে গেল মুহূর্র্তে!

খানিক পরেই শব্দ—চ্যাট। দিঘলের দুতালুর শব্দ। খানিক পরেই প্রীতি বলল—উস!

আহা—দিঘল—

সর—সঞ্চারী—

কী যন্ত্রণা—মা, মশা!

ধপস করে ঊরুর ওপর থাবড়া বসায় দিঘল—মা মশা।

সঞ্চারী চটাস করে ওর কপাল চাপড়ে দেয়—মা গো কী শক্তি মশাটার!

আমি মটকা মেরে পড়ে থাকি!

আমরা সবাই জেগে আছি অথচ তোর বাবা ঘুমিয়ে পড়ল কী করে! অবাক! এই শুনছো, এই রূপম! ঘুমিয়েছো!

আমি হাই তুলে মুখ বাঁকিয়ে বললাম, কী হয়েছে! কাঁচা ঘুম ভাঙালে! আর ঘুম আসবে সারার াত!

তিনটে মানুষের ছয় তালুতে চটাশ চটাশ করে শব্দ উঠছে না যেন পটকা ফুটছে, অথচ মানুষটা কিছুই শুনছে না!

মা চালাকি! সব বাবার চালাকি! আসলে বাবা জেগেই আছে! শুধু শুধু ঘুমের ভান করছে।

প্রীতি আর দিঘলের উত্তাপময় সংলাপ সমস্বরে! তার সঙ্গে সঞ্চারীর কণ্ঠ মিলে রাত-দুপুরে রীতিমতো হাট বসে গেছে এককক্ষের বসতঘরে। ‘দেখ দেখ তোদের বাবার কপালে কী ঢাউশ মশা! অথচ ওর কোনও বিকার নেই! ওগো মশাদের সঙ্গে তোমার অত সখ্য কিসের! আমাদের ছেড়ে মশার সঙ্গে থাকতে থাকতে তুমি দেখি ওদের আত্মীয় বানিয়ে ফেলেছো!’

আমি আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসি। অমন মাঝরাতে কী শুরু করলে তোমরা! ঘুমের ওষুধের রেশ মাত্র জেঁকে বসেছে, তখনই ঘুম তাড়ানোর আয়োজন। তাই কোনওভাবেই চোখ খোলা রাখতে পারছিল না রূপম। ঘুমে দু-পাতা এক হয়ে যাচ্ছিল বারবার। ‘এই যে মশাদের বন্ধু! চোখ খোলো! চোখ খোলো!’

আধবোজা চোখে তাকাবার চেষ্টা করি সঞ্চারীর দিকে। ‘তুমি কি আমাদের মশার কামড় খাওয়ানোর জন্যেই মশারি টাঙাতে বারণ করেছিলে ?’

আমি তো বারণ করিনি, তোমাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছি মাত্র!

তুমি জানতে না, মশারি না টাঙালে কী দশা হতে পারে! আসলে আমাদের রক্ত না খাওয়া পর্যন্ত তোমার মশাদের শান্তি হচ্ছিল না!

বাবার বন্ধু ওরা, তাই আমাদের রক্ত দিয়ে বাবা ওদের আপ্যায়ন করতে চাইছে! বলেই ভাইবোন দুটো হেসে কুটি কুটি!

ঠিক বলেছিস! মশাদের বন্ধু! তখন ওদের সঙ্গেই তো সখ্য থাকবে!

ওদের কথার হুল শরীরে বিঁধতেই আমার ঘুম পানসে হয়ে গেল মুহূর্র্তেই—তা সখ্য তো মশার সঙ্গে, কোনও নারীর সঙ্গে তো নয়। তাহলে অত মাথা গরম করছো কেন ? এখন মশারিটা টাঙালেই তো হয়ে যায়!

হাতে হাতে পলকেই মশারি ছাদ হয়ে ঝুলতে থাকে ঘরে। মশারি গুঁজে চারটে মানুষের আটটি চোখ মশারির ভেতরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তীক্ষè চোখে। ‘না, ভেতরে কোনও মশা নেই মা!’

অমনি দিঘলের বিস্ময়! আমার হাঁটুর ভাঁজে কে যেন সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সুড়সুড়ি! বলতে না বলতেই দিঘলের হাঁটুর কুঁচকি থেকে বেরিয়ে একটি মশা সাই করে উড়াল দিল। দিদি, তুই না বললি মশা নেই! সবাই হতবাক!

রাত তো অনেক হলো—এবার থাম!

কী বলছো, মশা নিয়ে ঘুমানো যায়!

বলেই মা-ছেলেমেয়ে তিনজনে মিলে ফের ঝাঁপাঝাপি শুরু করল। মনে হলো মশা নিয়ে ওরা খেলছে—যেমনি ভলিবল খেলে মানুষ!

মশাটা যে কোথায় গেল! মশারির কোনাকানচি ধরে নাড়া দেয়। তোশকের ভাঁজে ভাঁজে হাত চালায়! বিছানায় চাদরের খুঁট ধরে টান দেয়—নেই—কোথাও মশা নেই! অথচ একটু আগেই তো ছিল! ক্লান্ত চোখগুলো সবে যখন হতাশ তখনই আরেকটা মশা পাখা নেড়ে নেড়ে দেখা দিল। অই তো মশা! প্রাপ্তির কণ্ঠে বিস্ময়!

এটা নতুন মশা মা—অন্যটা!

কী করে বুঝলি!

দিঘল বলে, ওটা আরও মোটা আরও কালো ছিল!

তাহলে তো দুটো মশার খোঁজ পাওয়া গেল!

দুটো!

দুটো মশা নিয়ে ঘুমোবো কেমন করে ?

ফের ছ হাত ছ চোখ আর তিনটে শরীর ধুপধাপ বিছানায় আছাড়ি-পিছাড়ি খেতে থাকে। কিন্তু সাফল্য আসে না কোনওভাবেই। অধরাই রেখে ঘুমিয়ে যায় ওরা। এতগুলো মানুষের রক্ত পেয়ে মশাদের এখন সে কী উৎসব!

এমনি করে রোজ রাতে মশারি টাঙানো হলেও মশারা বিদায় হয় না। তাদের বংশ নির্বংশ করা কত যে কঠিন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তিন তিনটে আগন্তুক। আমি কেবল ওদের কাণ্ডকীর্তি দেখি আর মিটিমিটি হাসি। মাঝে মাঝে ওদের সান্ত¦না দিতে এদিক-ওদিক একটু হুশহাশ করি। দু-হাতের তালু এক করে চটাশ চটাশ শব্দ তুলি—তা না হলে আবার বলবে মশাদের সঙ্গে আমার প্রেম চলছে। দোষ নিও না! সবই জীবলীলার ছলচাতুরি!

এভাবে প্রতিদিনই চলে তাদের মশা নিধন পর্ব। সঙ্গে জোগালি হিসেবে আমার তৎপরতাও মন্দ নয়। অভিজ্ঞতার সঞ্চয়গুলো এখন জ্ঞান হয়ে পাকতে শুরু করেছে। তাই জ্ঞানী মানুষের জ্ঞাননির্ভর তৎপরতা বেশ আদরণীয় ও বরণীয় ওদের কাছে।

দিঘল বিস্ময় প্রকাশ করে ওর বাবার কাছে। রোজ মশা মেরে না হয় মশা তাড়িয়ে মশারির ভেতরটা যখন ফকফকা মনে হয় তখনই শুতে যায় ওরা। কিংবা শুয়ে সবে বাতি নিভিয়েছে তখনই হুলে তাও দিয়ে ফের ওদের আবির্ভাব। এ নিয়ে সঞ্চারীর তেমন কোনও মাথাব্যথা না থাকলেও দিঘল আর প্রীতির মনে বিস্ময়ের শেষ নেই। ওরা বলে ‘বাবা মশারির ভেতর ওদের লুকানোর জন্য নিশ্চয়ই কোনও গোপন জায়গা রয়েছে!’

জায়গা না বাবা রীতিমতো গর্ত রয়েছে। আমাদের তাড়া খেয়ে নিশ্চয়ই গর্তের ভেতর গিয়ে লুকিয়ে থাকে!

কোনওদিন ওরা ওদের পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট তুলে ধরে। ‘বাবা, মশাদের অনেক চেহারায় দেখেছি।’

কিছু মশা আছে দেখতে বেশ ছোট। কোনওটা একেবারে চিকন। কোনও মশা আবার চিকন এবং লম্বাটে। দেখতে ফড়িংয়ের আদল অনেকটা। কোনও মশা আবার তিলের দানার মতো। তিলগুলো পড়ে থাকে না। তিরতির করে নড়ে না হয় একটু একটু করে মশারি বেয়ে ওপরে ওঠে। তখন ওরা কলকল করে—‘এটা মশার ডিম! তাই না বাবা! কিন্তু ডিমেরাও বড্ড চতুর! সহজে মারা যায় না!’

আমি বাকরুদ্ধ, বোবা বোবা চেহারা নিয়ে তাকিয়ে থাকি ওদের দিকে—‘মশার ডিম তো কখনও দেখিনি বাবা, কী করে বলব!’

দিঘল বলে, ‘বাবা এটা নিশ্চিত মশার ডিম! ওরা কামড় দিয়েছে আমাকে। মশার কামড়ের মতোই জ্বালাপোড়া করছে!’

‘এ মশাটা দিদি, দু দিন হলো ডিম ফুটে বেরিয়েছে!’

মশা নিধন মশা হরণ না হয় মশা বরণ করে নেয়ার জন্যে ওদের ভাবনার শেষ নেই। শেষ নেই বিস্ময়ের! তাই এক রাতে ওরা বলে, ‘সব মশা চলে যাবার পর ফের মশার উপদ্রব স্বাভাবিক মনে হয় না বাবা!’

‘অস্বাভাবিক কী দেখলি ?’ কণ্ঠে ক্লান্তি সঞ্চারীর।

যেভাবে শূন্যের মধ্য থেকে ওরা আবার বের হয়। নড়েচড়ে কামড় বসায়। এবং সে কামড়ের কী তীব্র যন্ত্রণা! তাই আমাদের মনে হয় গভীর রাতের মশারা আসলে মশা নয়। ওরা ভূত না হয় জিন!

ভূত-জিনের কথা উঠতেই দিঘল ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর মায়ের কোলে—‘শিগগিরই লাইট অন করো মা! ভয় করছে!’

তখন হাসির রোল পড়ে যায় এ গভীর রাতেও। আমার বেশ ভালো লাগে। এতদিন একা একা মশা দাবড়ে বেড়িয়েছি। এখন সমবেত আয়োজনে নিঃসঙ্গতার কষ্টগুলো কেটে যায় ঠিকই, আবার ভয়ও হয়, ওরা চলে গেলে এমনি ধুপধাপ সব থেমে যাবে। এত রা-শব্দ কিছুই থাকবে না। তখন আরও নিঃসঙ্গ মনে হবে! একা একা রাত জেগে হয়তো আর মশাই মারা হবে না! তখন ওরা আরও দ্বিগুণ বেগে হুল ফোটাবে আর আমার রক্ত টানবে!

এমনি বিষণ্নতা আর বেদনায় যখন প্রতিদিনই একটু একটু করে মন ভারী হচ্ছে—তখনই সঞ্চারীর জানাল মোক্ষম কথা—‘গভীর রাতের মশারা ভূত না হয় জিন! তেমনি গভীর রাতের বাবাটা তোদের আর বাবা থাকে না, ভূত না হয় জিন হয়ে যায়!’

ওরা যখন মশার বংশ নিপাত করবে বলে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে বীরবেশে—তখন আমাকে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখে ওদের মনে হয়েছে—আমি আসলে ভূত মশাদেরই কেউ। মশাদের আত্মীয়-স্বজন না হয় শুভাকাক্সক্ষী হব। কেন এমন মনে হলো ? কারণ আমি নাকি মশা মারার ব্যাপারে একেবারেই তৎপর নই। বরং ওরা থাকলেই যেন আমি খুশি। শুধু তাই নয়, মশাদের হত্যা করলে বাবার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। এমনটিই ওরা দেখেছে গভীর পর্যবেক্ষণ করে। তাই গভীর রাতের মশারা যেহেতু ভূত। সেসব ভূতের স্বজন আমি! তাই আমি ‘বাবা’ বেশে আসলে একজন বড় ভূত না হয় মানুষরূপী ভূত! এমনটিই ওদের ধারণা

এ কথা যেদিন বলছিল সঞ্চারী হেসে লুটোপুটি। কোনওভাবেই ওর হাসি থামছে না। এদিকে ভূত উপাধি পেয়ে আমারও হাসির শেষ নেই! এমনি প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর যখন আমাদের এক কক্ষের বসত ঘর তখনই একদিন দেখি সঞ্চারী লাগেজ গোছাচ্ছে।

ট্রলির ভেতর থাক থাক করে কাপড় সাজিয়ে রাখছে। আমি পাথর চোখে দেখছি ওকে। ও হঠাৎ খেয়াল করে বলে, অমন দেখছো কী! ছুটি শেষ হয়ে এল। পরশু রওনা দিতে হবে। একদিন বিশ্রাম। তারপর ফের ইশকুল আর বাসা! বাসা আর ইশকুল! বোরিং! কেমন ক্ষ্যাপাটে কণ্ঠ সঞ্চারীর!

শোনো আমাদের জন্যে যদি মায়া হয় তাহলে বাসা ঠিক করো! আমরা দলেবলে চলে আসি! একা একা একদম ভালো লাগে না। সময় কাটতেই চায় না। মনে মনে বলি, তুমি তো তবু ছেলেপুলে নিয়ে আছো, অথচ আমি না! আমি কোনও উত্তর দিতে পারিনি।

একদিন ঠিকই বিদায়পর্ব এল। আমি ওদের বাসে তুলে দিয়ে যেই নামতে যাব—অমনি পেছন থেকে সঞ্চারী চেঁচিয়ে ওঠে, এই দাঁড়াও-দাঁড়াও। বলেই হাতের ভ্যানিটি খুলে মশকিউটোরোলঅন দিয়ে বলল, রাতে শোয়ার সময় এটা গায়ে মেখে শুবে। তাহলে মশা আর কামড়াবে না! আমি তো অবাক!

কী দেখছো। পরশু মার্কেট থেকে কিনে এনেছিলাম। দিতে ভুলে গিয়েছি। গায়ে মাখতে ভুলবে না কিন্তু!

আমি ছেলেমেয়ে দুটোর চুলে বিলি কেটে বলি ‘ভূত বাবা’ তো যাচ্ছে না সঙ্গে! খুশি তো! ওরা নীরব। চোখ ছলছলে।

সেই আমি ফের মশার কামড় খাচ্ছি সেই কখন থেকে। তাও ওয়াশরুমে বসে!

মশা মেরে স্বস্তি নিয়ে যখনই রেজর ধরেছি গালে, অমনি পায়ের পাতায় একটি মশা এমনভাবে হুল ফোটালো যে পুরো শরীর ঝাঁকি খেলো প্রচণ্ড রকম। গাল কেটে রক্তে সয়লাব পুরো গাল! কী অলুক্ষুণে কাণ্ড!

সঞ্চারী, সঞ্চারী, সব্বোনাশ হয়ে গেছে তাড়াতাড়ি এসো! সেভলন তুলো গজ-ব্যান্ডেজ যা আছে নিয়ে এসো—গাল কেটে গেছে!

তোমার আর গাল কাটার সময় হলো না! কেবিনেটে সব রাখা আছে, নিয়ে নাও।

নেব কী দু-হাতে গাল চেপে রক্ত ধরে রেখেছি!

রক্ত ধরো আর ছাড়ো আমি এখন আসতে পারব না।

মানে!

মানে সহজ—আমি এখন তোমার নাতিকে নিয়ে শোবো। ওকে ঘুম পাড়াব! সারা রাত কেন যেন কেঁদেছে! একটুও ঘুমোতে পারেনি। এখন আমাকে একদম ডাকবে না! একটুও বিরক্ত করবে না। নাতির ঘুমের সময় এখন! ঘুম পুরো না হলে সারাক্ষণ ট্যাঁ ট্যাঁ করবে। জ্বালাবে!

আমি বিস্ময় জড়ানো দুটো চোখে হারানো সে সময়কে খুঁজে ফিরি আয়নার দিকে তাকিয়ে!

কোথায় সময়! আয়না জুড়ে শুধুই রক্তের ক্ষিপ্রতা!

ওদিকে সঞ্চারীর মায়াবী কণ্ঠে তখন সুরের আলপনা—‘ঘুম আয় ঘুম আয়, আমার সোনা ঘুমায়!’

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button