আর্কাইভউপন্যাস

উপন্যাস : পেদ্রো পারামোর মুক্তি : অমর মিত্র

অনল চৌধুরীর বাড়ি এই হাটুরে পেড়োয়। পেড়ো এদিকে তিনটে আছে : হাটুরে পেড়ো, নিচ পেড়ো আর বন পেড়ো। তিনটি গাঁ পাশাপাশি নয়, মাঝে একখানি নদী ছিল। আমাদি নদ। নদ নয় খাল বলা যেতে পারে। আবার শাখানদী হতে পারে। শাখানদী হলে মূল নদী কোথায় ? গঙ্গা ? গঙ্গা থেকে বেরিয়েছিল সে, নাকি অন্য কোথাও জন্মে গঙ্গায় মিশে গিয়েছিল সেই আমাদি নদ বা নদী। নদই হবে। আর আসল হলো আমাদি নদ নয়, হার্মাদি নদ,  আসলে সেই পূর্বপুরুষ পেদ্রো পারামো খাল কাটিয়েছিল, গঙ্গার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া কাটা খাল। নাম দিয়েছিল  আরমাডা, আরমাদি, আমাদি নদ। বোঝা যায় তা হলো হারমাদি নদ। জলদস্যুদের নদ। একদিকে গঙ্গা, অন্য দিকে বিদ্যাধরী। এখন হার্মাদি খাল, আদি গঙ্গা, বিদ্যাধরীর চিহ্ন হেথাহোথা পড়ে আছে। কিন্তু তাদের চেনা যায় না তেমন। সব চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে। আদিগঙ্গা বুজিয়ে তার উপর দোকানপাট, বাড়িঘর উঠেছে। এদিকে আমাদি বলে একটা গ্রামও আছে। হার্মাদি। স্পেনীয়, পর্তুগিজ, জলদস্যু। মেহিকো, মেক্সিকো থেকে জলদস্যু আসত কি না জানা যায় না। সে দেশ তো দখল করেছিল স্পেনীয়রা। হার্মাদরা। পর্তুগিজরাও গিয়েছিল। অন্তত অনল চৌধুরীর ভাষ্য তেমন। চৌধুরী জমিদারদের বংশধর অনল।  

হ্যাঁ, এখানে তাদের বড় জমিদারি ছিল এক সময়। কেউ কেউ বলে ওরা আসলে পর্তুগিজ। অনলের চেহারা  দ্যাখো। অমন তেজোদীপ্ত হার্মাদ হার্মাদ চেহারা খুব একটা দেখা যায় না। উন্নত নাসা, গায়ের রং ধবল না হলেও  কৃষ্ণকায় বলা যাবে না। চওড়া কাঁধ, প্রশস্ত বুক, ঈষৎ কটা দুটি চোখ, উচ্চতায় ছ ফুট তো হবেই। তার বেশি ছাড়া কম হবে না। যা বলবে তা করে ছাড়বে।

অনলের নিরুদ্দিষ্ট ভাই প্লাবন বিবাহ করেনি। এমনিতে কিছুই করত না, শুধু পড়ত, আর শোনা যায় পেদ্রুনগর  মৌজার ইতিহাস লিখছিল। চৌধুরী তো জমিদারি পদবি, তাদের আসল পদবি কী। স্থানীয় মতে পেদ্রু এক জলদস্যু, এসেছিল আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে। স্থানীয় এক রমণীর প্রেমে পড়ে সে দস্যুতা ত্যাগ করে এখানেই   বসবাস করতে থাকে। জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন করে। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে জমিদারি কিনে এই অঞ্চলের নাম পেদ্রুনগর করে দেয়। তারই বংশধর অনল অলয়। অলয় উধাও হয়ে গেছে, অনলও ছিল না এ দেশে। অনল বলে তার ভাই প্লাবন আমেরিকা কিংবা মেহিকো চলে গেছে। আসলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ভাইয়ের সঙ্গে মেহিকো এবং আমেরিকার দুই ব্যক্তির যোগাযোগ হয়েছিল। তারা নাকি তাদেরই বংশের মানুষ। প্লাবন তাদের কাছে চলে গেছে। কিন্তু কীভাবে প্রমাণিত হলো, তারা সেই হার্মাদ পেদ্রুর বংশধর।  শিকড়ের সেই খবর অনল জানে না। প্লাবন জানত। খুঁজে বের করেছিল অনেক কিছু। এই যে জায়গাটির নাম পেদ্রুনগর, সেই পেদ্রুর পুরো নামটি কী ? অনল বলেছিল, পেদ্রো পারামো। অনেকে তা বিশ্বাস করল। কেউ কেউ  করল না। তারা মুচকি হাসল। একে অন্যকে বলল, আমাদের মূর্খ ভেবেছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা কম। বেশিরভাগই   বিশ্বাস করল না, পেদ্রো পারামো একটি বিখ্যাত উপন্যাসের নাম। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা। লেখক হুয়ান রুলফোর বাড়ি মেক্সিকো। এই উপন্যাস লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে অসম্ভব প্রভাব ফেলেছিল। পিতার কাছে যাচ্ছে সন্তান। পিতা মাকে পরিত্যাগ করেছিল এবং ভয়ানক এক ব্যক্তি। বিপুল সম্পদের অধিকারী এক প্রভু। সন্তান জানে  না সে চলেছে এমন এক গ্রামে যেখানে সকলেই মৃত। অনল চৌধুরী সেই ভূম্যধিকারী অত্যাচারী পেদ্রো পারামোকেই তার আদি পুরুষ বলে প্রচার করেছিল। হেয়ার লিভ ডিসেন্ডেন্টস অফ পেদ্রো পারামো। তারপর অজানা স্পেনীয় ভাষায়, তারপর বাংলায়, এই স্থানে পেদ্রো পারামোর বংশধরগণ বাস করেন। মহান পেদ্রো পারামো এই পেদ্রো নগরের স্থপতি। পেদ্রো পারামো উপন্যাসে মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতে বাবার সন্ধানে কোমালা নামক এক  গ্রামে এসেছে গল্পের নায়ক। সেই গ্রামে কে জীবিত কে মৃত―এমন এক ধোঁয়াশার মধ্যে শুরু হয় হুয়ান রুলফোর পেদ্রো পারামো। অনল বলে, তাদের সেই পিতৃপুরুষকে নিয়েই বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল। কেউ সে উপন্যাস পড়েনি। সুতরাং বিশ্বাস করে নিয়েছিল। আবার যে পড়েছে, সে, যেমন গৌরচন্দ্র গুপ্ত কিছু বলতে গেলে, অনল হাত তুলে তাকে থামিয়েছিল। তার কথা হলো, আগের কালে কী হয়েছিল তা কি বলা যায় ? কিংবা এমন হতে পারে, পেদ্রো পারামো ইন্ডিয়ায় এসে গিয়েছিল, তা কেউ জানত না। পেদ্রুনগর বা পেদ্রোনগরের নামেই প্রমাণ তিনি এখানে এসেছিলেন।

   কিন্তু পেদ্রো পারামো তো মৃত মানুষের কাহিনি। পেদ্রো পারামোর সন্ধানে গিয়ে প্লাবন বা প্রলয় তো শুধু মৃত মানুষদেরই খুঁজে যাবে। মৃত মানুষকে খুঁজে কেউ পেয়েছে বলে শোনা যায় না। অনল চৌধুরী কাউকে কাউকে বলেছে, এইটা হলো শিকড়ের সন্ধান। শিকড়ে ফেরা। পেদ্রুনগর ত্যাগ করে সে মেহিকো চলে গেছে। কেউ বলে সে আছে লাতিন আমেরিকার কোনও দেশে। মেহিকো, কিউবা, কলম্বিয়া, পুয়েরতিরিকো এমনি কোনও দেশে।  আবার কেউ বলে, গোপনে ফিসফিস করে বলে, তাকে সাফ করে দিয়েছে অনল। অনলের অনলে পুড়েছে প্লাবন। অনল ফিরে এসে বিস্তর টাকা খরচে বাড়ি সারাই করিয়েছে। একদিন কটি লোককে ডেকে এনে আনন্দ করেছে। তাদের কেউ কলকাতা থাকে, কেউ বারাসত, কেউ কোন্নগর, চন্দননগর। একেবারে বিলিতি কায়দায় পার্টি। অনেক মদ, গানবাজনা, হই হল্লা এবং খাদ্য। অনল বলেছিল ‘চেতনার রং’ গ্রুপ নিয়ে কাজ করতে আমি দেশে ফিরেছি। পেদ্রুনগরে ‘চেতনার রং-এর ভারতীয় শাখা প্রতিষ্ঠা করব। অনেক রকম কাজ করবে এই সংগঠন। পেদ্রুনগরকে বদলে দেব আমরা। এখানকার পেয়ারা বাগান নিয়ে নতুন করে ভাবব। পেদ্রুনগরে পেয়ারার চাষ থেকেই ধরা যায় পেদ্রো পারামোর মতো কেউ এখানে এসে এই নগর প্রতিষ্ঠা করে গেছে। পেয়ারা এ দেশের ফল নয়। মেহিকো, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা ইত্যাদি দেশ থেকে এই ফল এ দেশে আসে। তা নিয়ে এসেছিল অনলের পূর্বপুরুষ। তিনি পেদ্রো পারামো বা তার মতো কেউ হতেই পারেন। এই মহাবিশ্বে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। কত শত বছর ধরে কত কিছু না ঘটে গেছে।

শ্রীরামপুরের গৌরচন্দ্র গুপ্ত জিজ্ঞেস করেছিল, সুজনবাবু এলেন না ?

সুজনদা একদিন এসে ঘুরে গেছেন, দারুণ পছন্দ হয়েছে এই জায়গা, বলেছেন মাঝে মাঝে এসে কাটিয়ে যাবেন, তিনি পেদ্রুনগরের পেয়ারা নিয়ে গেলেন কিছু, অবশ্য আগেও এসেছেন এখানে, একেবারে অচেনা নয়, আর পেদ্রো পারামোর কাহিনি তাঁর পড়া, বললেন, তা হতে পারে, হওয়াই সম্ভব। 

গৌরচন্দ্র একটু বেশি কথা বলেন, কথা তাঁর শেষ হয় না, বললেন, আজ এলে ভালো হতো, অনেকের সঙ্গে ওঁর সাক্ষাৎ পরিচয় নেই, আমাদের ‘চেতনার রং’ ওঁরই তো সৃষ্টি।

একজনের নয়, সকলের। গৌরচন্দ্রর কথায় মৃদু আপত্তি করল অনল, তারপর বলল, উনি আমাদের শীর্ষে, ওঁর পরামর্শ মতো আমরা চলব।

গৌর জিজ্ঞেস করল, তিন্নি রায় ?

সে তো নিউ ইয়র্কে, আমেরিকান সিটিজেন, আমি সিটিজেনশিপ রিফিউজ করে চলে এসেছি, দেশের কাজ করব, দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে তো, তবে আমাদের সঙ্গেই থাকবে তিন্নি, যাবে কোথায় ? 

গৌরচন্দ্র কী যেন বলতে গিয়ে চুপ করে গেল। আসলে মার্কিন দেশে এখন থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন প্রেসিডেন্ট আসায়। হাত-পা শিকলে বেঁধে যে যার দেশে ফেরত দিচ্ছে। অনল সেইটা আন্দাজ করে ফিরে এসেছে মনে হয়। ভিসা রিনিউড হয়নি।

সেদিন অনেক খরচ করেছিল অনল। নিজের পরিকল্পনার কথা বলেছিল। এনজিও-কে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। ব্যক্তির চাঁদায় কোনও প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন চলতে পারে না। বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির ফান্ড ধরতে হবে। ব্যক্তি আর কত চাঁদা দিতে পারে ? একে গ্লোবাল করতে হবে। পৃথিবীর সব দেশে এর পরিচিতি তৈরি করতে হবে। ফলে নানা দেশ থেকে সাহায্য আসবে। সব কিছুই পরিকল্পনামতো করতে হবে। অনেক কথা  হলো। ভালো মদ পরিবেশন করা হলো। ভালো খাদ্য অপেক্ষা করছে মদ্যের পরে।

গৌরচন্দ্র বললেন, কোভিডের সময় এই সংগঠন খুব ভালো কাজ করেছে, এখনও তেমন কাজ খুঁজে বের করতে হবে, গরিব মানুষের কাছে আরও বেশি করে যেতে হবে, কোভিডের পর মানুষের অভাব বেড়েছে।

অনল মাথা নাড়ে, বলে, বেশি গরিব মানুষ গরিব মানুষ করলে রাজনৈতিক দল রেগে যাবে, আমরা সমস্যায় পড়ব।

কেন ? বিস্মিত হয় গৌরচন্দ্র।

গরিব মানুষ নিয়েই তো রাজনৈতিক দলের আস্ফালন। কে কত গরিব মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলে আমাদের দেশে, সেখানে আমরা ঢুকতে গেলে তারা ছেড়ে দেবে ?

গৌরচন্দ্রই প্রশ্ন করছিলেন বেশি। তিনি মদ্যপায়ী নন। অনল অনেক পুরোনো মদ্যপায়ী। সে মাতাল হয় না।  তবে তরল নেশায় তার জোশ বাড়ে। সে দাপুটে ব্যক্তি। কথা বেশ জোরের সঙ্গে বলতে ভালোবাসে। তার কথাই  শেষ কথা, এই তত্ত্বে সে বিশ্বাস করে। বিরোধীকে সে চিনে রাখে। সময়ে শোধ নেয়। সে শ্বাপদের মতো অপেক্ষা করতে পারে। সময় হলেই ঝাঁপ দেবে।

গৌরচন্দ্র বললেন, গরিব মানুষের কাছে না যেতে পারলে সংগঠন কোন কাজ করবে ?

কাজের শেষ নেই, আমাকে অনুসরণ করুন, সংগঠন শক্তিশালী করুন।

সকলে চুপ করে থাকে। কী বলবে বুঝতে পারছিল না। শুধু নীলেশ দাস এগিয়ে এসে বলল, হি ইজ রাইট, কাজ অনেক আছে, গরিব মানুষ রাজনীতির কাজে লাগে, তা ছাড়া তাদের দ্বারা কী হয়, গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মায়,  তাদের ফ্রিতে রেশন দাও, ফ্রিতে ঘর দাও, নইলে ফুটপাথ দখল করে রান্না করতে বসবে ভিক্ষার চাল।

কথাটা খারাপ লাগল কিন্তু গৌরচন্দ্র চুপ করে থাকলেন। আমল দিলেন না নীলেশের কথা। লোকটাকে তিনি পছন্দ করেন না। তার কারণও কম নয়। ক্রমশ তা প্রকাশ্যে আসবে। তিনি বললেন, কোভিডের সময় চেতনার রং  যে কাজ করেছিল সুন্দরবনের দ্বীপে দ্বীপে সাহায্য নিয়ে গিয়ে, খাদ্য বস্ত্র নিয়ে গিয়ে, অসুবিধে তো হয়নি, প্রশংসা  কুড়িয়েছিল, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় বড় রিপোর্ট বেরিয়েছিল।

অমন রিপোর্ট বের করানো যাবে, আমাদের সব কাজের বড় বড় রিপোর্ট বেরুবে।

নীলেশ দাস বলল, সব  ফ্রিতে দিলে অমন রিপোর্ট হয়, আমাদের ওসব দরকার হবে না।

এবার অনল গৌরকে বলল, কোভিডে সুন্দরবনে সাহায্য নিয়ে যাওয়াই ভুল হয়েছিল, রোগটা সুন্দরবনে হয়নি, গরিব মানুষের ভেতর ছড়ায়নি, এটা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তর বিরুদ্ধে একটা চক্রান্ত ছিল, বিশ্বব্যাপী চক্রান্ত, বৃদ্ধদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত, বৃদ্ধরা এখন ভার, ফলে যা হয়েছিল শহরে, ভুল সিদ্ধান্ত, টাকাটা জলেই গেছে বলা যায়।

গৌর বললেন, না, এটাও প্রচার, একটা কথা বুঝতে হবে, কোভিডের সময় যে ঝড় হয়েছিল, তাতে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছিল সুন্দরবনে, কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তিন্নি সব জানে, সেই বলেছিল, সুজনবাবু বলেছিল, সর্বসম্মতিক্রমে যাওয়া হয়েছিল, আম্ফান ঝড় সুন্দরবনকে শেষ করে দিয়েছিল, আমরা সেই কারণে   গিয়েছিলাম।

অনল মাথা নাড়তে লাগল। অনলের সঙ্গে নীলেশ দাসও। নীলেশই বলল, যা হয়েছে, হয়ে গেছে, এখন ভেবেচিন্তে এগোতে হবে, অনল তুমি সিদ্ধান্ত নিও, এখন মহামারিমুক্ত পৃথিবী, নতুন নতুন আইডিয়া দাও।

অনল বলল, আমি আইডিয়া দিতে পারি কিন্তু আমি একা নেব কেন সিদ্ধান্ত, মিটিং-এ যে সিদ্ধান্ত হবে সেই মতো কাজ হবে, আগে সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন হোক, রেজিস্ট্রেশন না হলে এগোতে পারব না।

আমাদের সংগঠন কি রেজিস্টার্ড নয় ? জিজ্ঞেস করল নীলেশ।

না, এটা পাড়ার ক্লাবের মতো হয়ে আছে, চাঁদা তুলে সরস্বতী পুজো করা, তারপর ক্যারম প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা, কম্বল বিতরণ, রক্তদান শিবির, আমি একে একটা পারফেক্ট শেপ দেব, সকলে আমার পাশে  থাকুন।

গৌরচন্দ্র বলল, সুজনদার মত নিয়েছেন ?

ইয়েস, সুজনদা আমার পাশে আছেন, আমরা বড় কিছু করব, খুব বড় কিছু, হি ইজ আ ফেমাস পার্সন, বড় অভিনেতা, তাঁকে সামনে রেখেই আমরা এগোব, তাঁর উপস্থিতির একটা দাম আছে।

সুজন চন্দ চলচ্চিত্র অভিনেতা। থিয়েটারের অভিনেতা। তাঁর নামেই থিয়েটারের হল ভর্তি হয়ে যায়। তিনি নাটক নিয়ে অনেক মৌলিক ভাবনা ভাবেন। অনল সুজনকে নিয়ে অনেকটা বক্তৃতা করল। বলল, আমাদের একটা  কাজ হবে সর্বভারতীয় নাট্যোৎসবের আয়োজন করা, অখিলেশ কুণ্ডুর সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তিনি আমার সঙ্গে  থাকবেন বলেছেন, রঞ্জনা পালিত, দেবাঞ্জনা বসু সকলের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছি। আমি চাই সুজনদাকে  আরও প্রমিনেন্ট করে তুলতে। ওঁকে আমি তিন শহরে সংবর্ধনা দেব, চেন্নাই, দিল্লি এবং কলকাতা, দিল্লিতে সেই   সভায় সংস্কৃতি মন্ত্রীকে নিয়ে আসব, তিনি সুজনদাকে সংবর্ধনা দেবেন, সুজনদা ওঁর যোগ্যতার সমাদর পাননি, ওঁকে  যাতে পদ্মভূষণ দেওয়া যায়, সেই প্রস্তাব আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বলব মন্ত্রীজিকে। লালুভাই চান্দানি আমার কথা ফেলতে পারবে না।

এসব সুজনবাবু জানেন ? জিজ্ঞেস করল সেই গৌরচন্দ্র গুপ্ত। এবার ঈষৎ বিরক্ত হলো অনল চৌধুরী, বলল, ধাপে ধাপে জানবেন, আপনারাও বলবেন।

গৌর তার কথার উত্তর পায়নি যেন। বলল, আমরা কী করে বলব, এসব তো চেতনার রঙের কাজ নয়, এই লক্ষ্যে তো আমাদের সংগঠন তৈরি হয়নি, আমাদের সভাপতি যাতে পদ্মভূষণ পায় সে ব্যবস্থা আমরা করব কেন, তাতে কি তাঁর সম্মান বাড়বে ?

স্মিত হাসে অনল, চারদিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, ওর কাজ নিয়ে আমরা গর্বিত, সুতরাং এসব কাজও চেতনার  রঙের কাজ, কারও অগোচরে কিছু হবে না, আমরা দিল্লি, চেন্নাইয়ে এর শাখা স্থাপন করব, তারাই পদ্মভূষণের  ব্যবস্থা করবে, কয়েক বছর বাদে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, এটা করতেই হবে, ওয়েট অ্যান্ড সি। 

রাত হচ্ছিল। সকলে ডিনার সেরে নিচ্ছিল। ডিনার করতে করতে অনল চৌধুরী বলল, পেদ্রু নগরের কিছু  কাজ আমরা করব, ধরুন পেদ্রু বা পেদ্রো পারামোর স্মরণে লেখকদের নিয়ে সম্মেলন করব, বিদেশের কবি, লেখক আসবে, সুজনদা তার উদ্বোধক হবেন, আর পেদ্রুনগরে আমরা একটা ফার্ম হাউস করতে পারি, জমি নিতে হবে লিজে, এইসব পরিকল্পনা সুজনদার খুব পছন্দ হয়েছে, চেতনার রং ফার্ম হাউস, জৈব সারের ফসল হবে, মাছ, মুরগি, দুধ, ঘি―সব তৈরি করব। এতে এমপ্লয়মেন্ট হবে অনেক, পেদ্রো পারামো রাইটারস কনফারেন্স সাড়া ফেলে দেবে, লেখকদের নামের তালিকা করতে হবে, বড় বড় কবি আসবে, একজন নোবেল লরিয়েটকে আনা যায় কি না দেখব, নাহলে মেসি, এমব্যাপো এমনি কাউকে।

সাহিত্য সম্মেলনে মেসি ?

ইয়েস, দেখুন এখন সব আইডিয়া বদলে যাচ্ছে, ফুটবল সাহিত্যের বিষয় কি হয়নি, মতি নন্দীর স্ট্রাইকার, উদার চোখে দেখতে হবে সব কিছু।  

গৌরচন্দ্র বলল, আমি এসবের পক্ষপাতী নই, আমার কথা হলো মেক্সিকোর একটা নভেলের চরিত্র বাস্তবে কি ছিল, নভেল তো কল্পনায় লেখা হয়, হুয়ান রুলফো থাকলে জবাব পাওয়া যেত।  

মনে করলেই পেদ্রো পারামো বাস্তব, আমাদের পূর্বপুরুষ, হেয়ার লিভস ডেসেন্ডান্ট অফ পেদ্রো পারামো। ফলক লেগে গেছে, আমরা যে পেদ্রো পারামো ফেস্টিভ্যাল করব, তাতেই হৈ হৈ পড়ে যাবে, দেখুন এই আইডিয়া বেচেই অনেক টাকা কামানো যায়, রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলেই আমি ফেস্টিভ্যালের কথা ঘোষণা করে দেব। 

গৌর মাথা নাড়তে লাগলেন, বললেন, হতে পারে না, আগে শুনিনি, শুনেছিলাম পেদ্রু একজন পর্তুগিজ হার্মাদ।

আমার পূর্বপুরুষ, আমি জানব না ? অনল দাপটের সঙ্গে বলল। তার চওড়া বুক, চওড়া কাঁধ পোক্ত শরীর   যেন মধ্যম চেহারার গৌরচন্দ্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল।

নীলেশ দাস মাথা নাড়তে লাগল, অবশ্যই। অনলই জানবে।

অনল বলল, বিশ্বাস করতে হবে, এটা হলো শিকড়ের সন্ধান করা, পেদ্রো পারামোর লাইফ লেখা হবে।

সে তো উপন্যাসই আছে।

ওটা লাইফ নয়, নভেল, ভালো লাগেনি, বউটার নাম কী ছিল যেন ?

কার বউ ? নীলেশ জিজ্ঞেস করল।

পেদ্রোর বউ যাকে ত্যাগ করেছিল পেদ্রো, সেকালে অমন হতো, হার্মাদ তো, কত মেয়েছেলে যে লাগত একজনের।

দোলোরিতাস। গৌর বলল।

আর তার সই, সেই গ্রামে যার বাড়ি গেল পেদ্রোর বেটা তার মায়ের মৃত্যুর পর।

এদুভিহেস দিয়াদা।

আপনার সব মনে আছে, আমার ঠাকুমার নাম ছিল দোলা, আর তার সই ছিল দিয়া।

গৌর বুঝলেন ভাট বকতে আরম্ভ করেছে অনল চৌধুরী। কিন্তু লোকটা একটি মিথ্যেকে ক্রমশ সত্যি করে তুলছে। বলছে উপন্যাসের কাহিনি। পেদ্রো পারামো কতখানি অত্যাচারী ছিল, লোকের জমিটা, বউটা, মেয়েটার   দিকে নজর পড়লেই নিয়ে নেবে। তা থেকেই এত সম্পত্তি করা, বড় কিছু করতে গেলে এসব করতে হয়, চেতনার রঙ পেদ্রো পারামোর পথে চলবে।

নীলেশ দাস মাথা দুলিয়ে সমর্থন জানায় অনলকে। অনল বলল, বড় কাজই করতে হবে চেতনার রঙ দিয়ে,  রিসোর্ট করব, প্রচুর রিক্রুট করব, হোম স্টে হবে, একটু পাশে থাকুন, চেতনার রং খুব বড় জায়গায় চলে যাবে।

গৌরচন্দ্র আর কথা বললেন না। তাঁর বয়স বছর পঞ্চাশ। অনলের যে বয়স, তাঁরও তাই। অনল অনেক লম্বা।  স্বাস্থ্যবান। স্মার্ট। অনেক দিন আমেরিকায় থেকে চলে এসেছে ভারতে। ভারত থেকে আর যাবে না। অনলের কল্পনা অনেক। অনেক কিছু করবে ভেবে এসেছে। মিথ্যে বলতে পারে অনর্গল। পেদ্রো পারামো নিয়ে গল্পটা ফেঁদেছে বেশ। মিথ্যে বলতে ভয় পায় না। অধিকাংশ ব্যক্তি হুয়ান রুলফো কেন শরৎচন্দ্রের পরে আর কিছু পড়েনি, আর যদি পড়ে ভৌতিক, তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদি।

 গৌর দেখবেন। দেখবেন সুজন চন্দ কতটা অনলের পাশে থাকেন। কতটা সমর্থন করেন। তিনি কি সুজনকে  বলবেন, নাকি কথাগুলো অনলের কাছ থেকে শুনবেন তিনি। গৌরচন্দ্র এবং উত্তরপাড়ার অমিতাভ সরকার  ফিরছিলেন এক গাড়িতে। গাড়ির ব্যবস্থাও করেছে অনল। আতিথেয়তার কোনও তুলনা হয় না। গাড়ি চলছিল অন্ধকার ফুঁড়ে। পেদ্রুনগর ছাড়িয়ে বাইপাস রাস্তায়, এরপর একটা সেতু ধরে মিনিট দশ চলতে হবে। গৌর  জিজ্ঞেস করলেন, কী মনে হলো ?

অমিতাভ মুখে আঙুল চেপে ধরে মাথা নাড়লেন। গাড়ির ড্রাইভার শুনবে। রিপোর্ট হবে। তারপর বললেন, ভালোই তো, বড় করে ভাবছেন উনি, আসলে পেদ্রো পারামো বংশে জন্ম তো।

পেদ্রো পারামোর কাহিনি বিখ্যাত এক উপন্যাসের, তার সন্তান যত্রতত্র ছিল, সব ধর্ষণে উৎপাদিত বলতে পারেন।

এক নামে আর একজন কি থাকতে পারে না ? আমার তো মনে হয় কথাগুলো সত্যি।

গৌরচন্দ্র চুপ করে থাকলেন। তিনি অমিতাভর সুরে সুর মেলাতে পারলেন না। যদিও বুঝতে পারছেন অমিতাভর মনের কথা ওইটি নয়, এই কথা ড্রাইভারকে শোনাতেই বলা, তবু তিনি ড্রাইভারকে শোনানোর মতো করে সমর্থন বাক্য বলতে পারলেন না। অমিতাভ ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই তোমার বাড়ি কোথায় ?

তরুণ ড্রাইভার বলল, বেলেঘাটা, গাড়ির গ্যারেজও সেখানে, ভাড়ায় নিয়েছেন অনল স্যার।

শুনতে শুনতে গৌরচন্দ্র বলল, অত বড় করে ভেবে কী হবে বুঝছি না, আমরা কোভিডের সময় গরিব মানুষের সাহায্যের জন্য করেছিলাম, তিন্নিই ছিল প্রধান উদ্যোক্তা। 

গরিব মানুষের তো কোভিড হয়নি। অমিতাভ বললেন যা তা অনলের কথার প্রতিধ্বনি।

কাজ ছিল না, ভাতের অভাব হয়েছিল। গৌর বললেন, ভালো কাজ করেছিলাম, তিন্নিই এই কাজ আরম্ভ করে, চেতনার রং একটা উদ্দেশ্য নিয়ে গড়া হয়েছিল, আমাদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছিল, আছেও।

নতুন একটা  গ্রুপ হয়েছে, পরিচালক অনল চৌধুরী।

গৌর বললেন, ঠিক হয়নি, আমি সেই গ্রুপ লিভ করেছি।  

অমিতাভ বললেন, তিনি দুই গ্রুপেই আছেন, হ্যাঁ, এখন তিন্নি কী বলছে ?                       

কথা হয়নি, আমি তো আজ জানলাম এসব, তিন্নি কি আমাদের সংগঠন ওর হাতে ছেড়ে দিল ?

অমিতাভ বললেন, করছে করুক।

মাথা নাড়তে থাকে গৌরচন্দ্র, বলে, না আমার এসব ভালো লাগছে না, ও এই নামটা নিল কেন, আমরা ঠিক করেছিলাম চলবে, তবে ধীরে ধীরে, তিন্নি বলেছে, বছরে চারটি ল্যাপটপ পাঠাবে, মেধাবী ছেলেমেয়েদের জন্য, নির্বাচন করতে হবে আমাদের, যদি বেশি পারে বেশি দেবে, টাকাটা প্রবাসীরাই দেবে, খোঁজ করতে হবে আমাদের, নিডি ফ্যামিলির পাশে কী করে দাঁড়ানো যায়।

সে দিক না, অসুবিধে কিছু নেই, কিন্তু এটি হচ্ছে হোক। অমিতাভ বললেন।

এমনি কথাবার্তা বলতে বলতে তাঁরা ফিরতে লাগলেন।

দুই 

সুজন চন্দর কাছে অনল চৌধুরী পারামো এক সকালে হাজির। নামের শেষ অংশটি অতি সম্প্রতি যোগ করা হয়েছে তার ফেসবুকে এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সে ঘোষণা করেছে যে সে তার পিতৃপুরুষ পেদ্রো পারামোর একটি অংশ তার নামে যুক্ত করছে। আসলে পারামো একটি স্পেনীয় শব্দ, যা কি না শৌর্য এবং বীর্যের পরিচয়দায়ক।  অনল তার বাংলা নাম। অনলকে সুজন বললেন, তুমি তো ভুল লিখেছো ?

জবাব দিল না অনল। সব কথার জবাব দেয় না সে। তাতে বিতর্ক বাড়ে। সে পেদ্রুনগর থেকে গাড়ি চালিয়ে শ্যামবাজার যাচ্ছে। শ্যামবাজারে সুজনের বহুদিনের বাস। আশপাশের অনেকে যখন শ্যামবাজার ছেড়ে সল্টলেক কিংবা  নিউটাউন, নিদেন পক্ষে ই এম বাইপাস রাস্তার ধারে গড়ে ওঠা আবাসনগুলির যে কোনওটিতে চলে গেছেন, তিনি  তাঁর পৈতৃক বাড়ির একতলায় আছেন তিনটি ঘর নিয়ে। ভাই উপরের তলায়। নভেম্বর মাস। শীত পড়েনি কলকাতায়, কিন্তু তার আমেজ এসে গেছে। এই একতলায় সুজন সস্ত্রীক থাকেন। মেয়ের বিয়ে হয়েছে এই শহরেই। থাকে দুর্গাপুর। সে আসে মাঝেমধ্যে। দুয়েক দিন থেকে চলে যায়। না এলে ফোনে কথা হয়। সুজন চন্দথিয়েটার সিনেমা সব করেছেন। বেশ নামি লোক। কলেজে অধ্যাপনা করতেন, অবসর নিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। এখন থিয়েটারই করেন। কোভিডের সময় থিয়েটার সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছে। লোকের ভেতরের ভয় এখনও যায়নি। সিনেমা লোকে ঘরে বসে দ্যাখে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দ্যাখে। থিয়েটারে তো অভিনেতার সঙ্গে   দর্শকের সরাসরি যোগাযোগ। সেই যোগাযোগ তো ঘরে বসে হয় না। তিনি আবার নতুন নাটক রিহার্সাল শুরু করবেন। তাঁরই লেখা। মহামারিই উপজীব্য। মহামারির সময়ে তিনি ঘরে বসে চেতনার রং গ্রুপে যুক্ত হয়েছিলেন অনলাইনে, ল্যাপটপ মারফত। তিন্নির সঙ্গে পরিচয় ছিল আগেই। তিন্নি বছরে একবার তাদের দল নিয়ে কলকাতা আসত শো করতে। তখন আলাপ। তিন্নি অভিনয় করে না। কিন্তু সে-ই ছিল দলের প্রধান। সেই দলেই ছিল  অনল। আবার তাও নয়। অনলকে সেই দলে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিলেন সুজন। অনলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় চেন্নাইয়ে শো করতে গিয়ে। সেও থিয়েটার ভালোবাসে। ভালোবাসত। এখনও বাসে কি না জানেন না। আমেরিকা   গেলে তার সঙ্গে তিন্নির যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর কোভিডে চেতনার রং গ্রুপ তৈরি। তারপর সেই  মহামারি গেল। ভিসা বিতর্কে অনল ফিরে এল দেশে। চেতনার রং সংস্থার কাজ দরিদ্র মানুষকে সেবা। নানাভাবে সেই কাজ তারা করে। পশ্চিমবঙ্গেই করে থাকে। করোনার তিনটি বছরে তারা কম কাজ করেনি। সবই পরিচালনা   করেছে নিউ ইয়র্ক নিবাসী তিন্নি রায়। অনল এসেছে তাঁর কাছে। চায়ের টেবিলে তাঁরা তিনজন। সুজন, বিনতা  এবং অনল। অনল বলল, সক্কালেই এলাম, সকালে রাস্তাঘাট ফাঁকা পাওয়া যায়, ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব থাকে।

অনলকে বহু দিন বাদে দেখলেন তিনি। আমেরিকায় গেল ২০১৮ সালে। তারপর আর দেখা হয়নি। সে যে এর ভেতরে দেশে আসেনি তা নয়। কিন্তু এসেছে চেন্নাই। কিংবা পেদ্রুনগর। কলকাতার কাছে পেদ্রুনগর ঠিক কলকাতা নয়। অনল কলকাতা এলেও ব্যস্ত সুজনের সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে নাট্যকলা নিয়ে কয়েকবার তিনি লিখেছেন ওদেশের পত্রিকায়। তিন্নির অনুরোধেই সেই লেখা। একবার বঙ্গ সম্মেলনে যাওয়ার কথা হয়েছিল, উদ্যোগ নিয়েছিল অনল, তিনি যেতে অস্বীকার করেছিলেন উদ্যোক্তারা সরাসরি আমন্ত্রণ জানাননি, তাই। অনল যেমন লম্বা, স্বাস্থ্যবান। পেদ্রুনগরের ভূম্যধিকারী ওদের পূর্বপুরুষ। ওর গায়ে নীল রক্ত আছে। চোখমুখে জ্বলজ্বলে  ভাব। চোখের মণিতে ঈষৎ কটা ভাব আছে। অনল হেসে বলল, সুজনদা চলে এলাম।

তুমি নামের মধ্যে পারামো যোগ করলে যে ? নিজের কথায় ফিরলেন সুজন।

আপনি হুয়ান রুলফো পড়েছেন ?

পড়েছি, পেদ্রো পারামো, কিন্তু নামের সঙ্গে পারামো যোগ করলে যে ?

মাই অ্যানসেস্টার্স নেম, আমি যোগ করেছি।

পারামো মানে জানো ?

পেদ্রো পারত, যে জমি দখল করতে পারত না, ব্যারেন ল্যান্ড, ওয়েস্ট ল্যান্ড করে দিতে পারত, এমনই ছিল তার বীরত্ব, শৌর্য, তার নিঃশ্বাসেই বুঝি জমি নিষ্ফলা পতিত হয়ে যেত। 

হাঁ হয়ে গেলেন সুজন। পেদ্রো পারামো এক দুশ্চরিত্র, খল ব্যক্তি, জমিদার, দরিদ্র প্রজার জমি নারী দখল করত। উপন্যাসে তার নাম পেদ্রো পারামো, পারামো নিষ্ফলা জমি, পতিত জমি, সেই জমি, তার চড়াই-উতরাইয়ের অপূর্ব বিবরণ আছে সেই কৃশকায় চিরায়ত উপন্যাসে। কথক, পেদ্রো পারামোর পুত্র মায়ের মৃত্যুর পর রুক্ষ, নিষ্ফলা পতিত এক বিস্তীর্ণ ভূমির চড়াই-উতরাই পার হয়ে বাবার সন্ধানে যাচ্ছে, যে বাবা তার মা দোলারিতাকে তাড়িয়ে  দিয়েছিল। কী নিষ্ঠুর সেই ব্যক্তি। ভয়ানক। তারই উত্তরাধিকারী হয়ে উঠতে চায় অনল। তাতেই সে গর্বিত হবে ? পেদ্রো শব্দের অর্থও তো পাথর। পাথুরে পতিত জমি পেদ্রো পারামো। অনল এসব কি জানে ?

অনল বলল, পেদ্রো পারামো আমার কাছে উপাস্য, আমার পূর্বপুরুষ খ্রিস্টধর্ম প্রচারে এই দেশে এসেছিল, হুয়ান রুলফো তাকে যেভাবে চিত্রিত করেছেন, আসলে তিনি তেমন ছিলেন না, সন্ত পারামো, সন্ত পেদ্রোর নামেই পেদ্রু নগর।

যুক্তি নানা রকম খাড়া করতে চাইছে অনল, কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। পেদ্রো পারামোর নামেই আছে পাথর, পতিত ভূমি, সন্তর নাম অমন হবে কেন ? সুজন কথাটা তুললেন না, শুধু জিজ্ঞেস করলেন, তিনি পাদরি ছিলেন তাহলে,  তুমি তাহলে হিন্দু হলে কীভাবে ?

এটাই পারামো ম্যাজিক স্যার, এসব থাক, আমি আমার পরিবার নিয়ে কথা বলতে আসিনি সুজনদা, আমি   ইউনাইটেড স্টেটস থেকে চলে এসেছি টু সারভ মায় নেটিভ ল্যান্ড, আমি ইন্ডিয়ান পারামো, স্প্যানিশ নই, কিন্তু আমি আমার শিকড়ের সন্ধান করছি, সমস্ত পতিত জমিতে ফসল ফলাব। 

জানি, তিন্নি বলেছে, তুমিও বলেছিলে চলে আসবে, কিন্তু সত্যি যে চলে আসবে তা ভাবিনি।

অনল বলল, ভালো লাগছিল না, মনে হচ্ছিল দেশে অনেক কিছু করার আছে।

একেবারে চলে এলে ?

একেবারেই, তবে যাব মাঝে মাঝে, মেহিকো যাব, পেদ্রো পারামো খুঁজতেই যাব। 

বুঝলাম না, ফ্যামিলি কোথায় ? সুজন জিজ্ঞেস করলেন, মেহিকোর পারামো আর ইন্ডিয়ান পারামো, একই নাকি ? 

একটি প্রশ্নের উত্তর দিল অনল, বলল, ওরা আসেনি, রয়ে গেছে, মেয়ে গ্রাজুয়েশন করছে, মাস্টার্স, পিএইচডি―সব করে তবে ইচ্ছে হলে ফিরবে।

তোমার স্ত্রী কি চাকরি করেন ওদেশে ?

না, চেষ্টা করছে, ওকে থাকতে দিয়েছে বাচ্চার পড়ার জন্য।

এ দেশে পড়া হতো না ?

অনল চুপ করে থাকে।

যোগাযোগ আছে ?

অনল জবাব দিল না।

সুজন জিজ্ঞেস করলেন, দোলারিতাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল পেদ্রো পারামো, এটাই রীতি, একা চলে এলে ওদের   ফেলে ?

অনল চুপ। সুজনও চুপ। আর কোনও কথা জিজ্ঞেস করা সমীচীন মনে করলেন না সুজন। পরিবারে উঁকি মারা তাঁর অভ্যাস নয়। অনল বলল, আমার বাড়িতে একদিন চলুন আপনারা, সারাদিন থাকবেন, ভালো লাগবে।

তুমি তো অনেককে ডেকেছিলে।

 অনল বলল, ডেকেছিলাম, দেশে ফেরা সেলিব্রেট করলাম, আর নানা বিষয়ে আলোচনা করলাম, আপনি শুনেছেন ?

মাথা নাড়লেন সুজন। তিনি শোনেননি। গৌরচন্দ্র ফোন করেছিল, কিন্তু পেদ্রুনগরে কী আলাপ হয়েছিল তা বলেনি। বলেছে, অনলের কাছেই আপনি শুনবেন। কিন্তু সুজন কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। অনল মনে হয় এই ধারণা করে এসেছে যে সুজন চন্দ সব জানেন। সুজন কিছু জানেন না, কিন্তু গৌরের কথায় আন্দাজ করতে   পেরেছেন যে আলোচনা হয়েছে তাতে সে খুব খুশি হয়নি। বরং তার উল্টোটাই হয়েছে। সুজন অপেক্ষা করছিলেন, কখন অনল কথাগুলি বলে। কিন্তু অনল বলছে না। জিজ্ঞেস করল, এর ভেতরে তিন্নির সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে ?

সুজন জিজ্ঞেস করলেন, তোমার হয়েছে কথা ?

মাথা নাড়ে অনল, বলল, না হয়নি, সময় পাইনি, আসলে পেদ্রুনগর নিয়ে আমার অনেক প্ল্যান আছে, চেতনার  রং নিয়েও, সেসব তৈরি করে তিন্নিকে বলব।

কী করতে চাও তা আগে ওঁকে বলো, ও ইয়েস করলে এগোও।

সে হবেখন, চলুন দাদা আমরা তিনজন কোথাও ঘুরে আসি।

কোথায় ঘুরবে, আগে গুছিয়ে বসো।

অনল বলল, গুছিয়ে নিচ্ছি, কিন্তু কয়েক দিন বাইরে কোথাও, পুরুলিয়ায় অযোধ্যা পাহাড়ে যেতে পারি কিংবা ডুয়ার্সে। দার্জিলিং ঘুরে আসি, নতুন শীত সেলিব্রেট করে আসি, সব প্ল্যান ওখানে বসে আমরা করব, আপনি যদি পান করেন সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি পাবেন, মেজাজে আনন্দ করবেন। 

মাথা নাড়লেন সুজন। কলকাতার বাইরে গিয়ে মদ্যপান করার ইচ্ছে তাঁর নেই। এসব হলো প্রলোভন। কত প্রলোভন এড়িয়েছেন তিনি। সারা জীবন কত ইশারা এসেছে। তিনি পরিত্যাগ করে এসেছিলেন সংবাদপত্রের চাকরি। এসব কথা তাঁর কাছে তুচ্ছ। তিনি বললেন, প্ল্যান তো অনলাইন মিটিং-এ হবে, তুমি আমি করব কী করে, তিন্নি থাকবে, গৌর থাকবে, অজন্তা থাকবে বোস্টন থেকে, কানাডার মৌসুমী, সকলের মত নিতে হবে।

অনল বলল, অধিকাংশই গুড ফর নাথিং, ওরা কী বলবে, ওরা তো বছরে একবারও দেশে আসে না, কিন্তু অনল চৌধুরী পারামো ফিরেছে, পতিত জমিতে ফসল ফলাতে ফিরেছে।

সুজন একটু অবাক হলেন। অনল সম্পর্কে বিরক্তি প্রকাশ করেছিল তিন্নি মাস কয় আগে। তখনও হয়তো ও সে দেশেই ছিল। কিন্তু তিন্নির কথায় সুজন বলেছিলেন, এখন তো কাজ বিশেষ নেই চেতনার রং-এর, কী আর করবে  অনল, ওর উৎসাহ বেশি।

তিন্নি বলেছিল, অনল তাকে বলেছিল চেতনার রং আমেরিকায় ভারতীয় সম্মেলন করুক, শাহরুখ খান, নিধি  চৌহান, সৌরভ গাঙ্গুলি, ধোনিদের নিয়ে আসবে, এতে ভালো ফান্ডিং হবে, কিন্তু এতে কি তাদের এই গ্রুপের মান থাকবে, এই উদ্দেশ্যে সে তো চেতনার রং প্রতিষ্ঠা করেনি, এটা লোকহিতে প্রতিষ্ঠিত, লাভের জন্য করা হয়নি।  

লাভের টাকায় লোকহিত হবে, থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল, কবি সম্মেলন ইত্যাদি, গানের আসর হতে পারে, কত কী!

সুজনের সব মনে পড়ছিল। তিনি চুপ করে থাকলেন। অনল বলল, দেখুন সুজনদা, কোভিড চলে গেছে বলে আমরা বসে থাকব না, তিন্নি ওদেশের সিটিজেন, আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নেব এ দেশে বসে, আমাদেরই তো অগ্রাধিকার। 

কিন্তু এটা তিন্নির প্রতিষ্ঠা করা।

মাথা নাড়ল অনল, তিন্নি একা নয়, আমরা সকলে ছিলাম এর ভেতরে, আপনি তো সভাপতি প্রথম থেকে।

সুজন বলল, সে একটা অরনামেন্টাল পোস্ট, তিন্নিই প্রথম আমাকে প্রস্তাব দেয়, সে কিছু টাকা পাঠাবে, কোভিডে সাহায্য করার জন্য।

অনল বলল, একটা গণতান্ত্রিক সংস্থা, সেখানে সে একা সিদ্ধান্ত নেয় কী করে ?

বিরক্ত হলেন সুজন, এটা তার মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তুমি পরে জয়েন করলে।

না সুজনদা, আমি প্রথম থেকেই।

বিনতা প্রবেশ করলেন তাঁদের কথার ভেতরে। বললেন, যেই করে থাকুক, তখন খুব ভালো কাজ করেছিল চেতনার রং, আর আমি তো জানি তিন্নিরই।

হাসল অনল, বলল, প্রেসিডেন্ট সুজন চন্দ, ম্যানেজিং সেক্রেটারি অনল চৌধুরী, জয়েন্ট সেক্রেটারি নীলেশ দাস, তাহলে কী করে তিন্নি রায়ের নিজস্ব হয়, তিন্নি তো সেক্রেটারি, মিটিং করে তাকে আমরা বাদ দিতেও পারি, নীলেশও হতে পারে সেক্রেটারি।

সুজন চুপ করে থাকলেন। অনল এসেছে তাঁর কাছে তাঁর বাড়ি। অনলকে তো অপমান করে বের করে দেওয়া যায় না। অনল এর আগে তাঁর বাড়ি আর একবার এসেছিল, সে হয়তো আমেরিকা যাওয়ার আগে। সে অতিথি।  তাকে আদর দিতেই হয়। বিনতা বললেন, ওসব পরে হবে, এখন তো মহামারি নেই, কী হবে ঐ সংস্থা ?

অনল বলল, এখনই বেশি দরকার বউদি, আচ্ছা সুজনদা, থিয়েটারের জন্য আপনি কী পেয়েছেন ?

কী পেয়েছি মানে, কী পাব ? সুজন বললেন, থিয়েটার নিয়ে বেঁচেছি, এটাই বড় কথা।

সিনেমার জন্যই বা কী পেয়েছেন ?

সুজন বললেন, পাওয়ার আশায় লোকে এসব করে নাকি, আমার দর্শক আছে, যারা আমার অভিনয় দেখতে, নির্দেশনা দেখতে হলে আসে, সিনেমাতেও তারা যায় আমার জন্য, এটা আমি তৈরি করতে পেরেছি, এটাই  আমার পাওয়া, এর চেয়ে বড় পাওয়া হয় নাকি ?

পদ্মভূষণ, দাদা সায়েব ফালকে ?

হা হা হা, হাসতে লাগলেন সুজন। বললেন, সে যদি কর্তৃপক্ষ চান, তবে হবে, বহুজন পাননি, যাঁরা পাননি তাঁরা কি অযোগ্য ছিলেন, না পাওয়া মানুষের উদাহরণ দেব ? 

অনল জিজ্ঞেস করে, যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের ভেতরে আপনি নেই, এটা খারাপ লাগে, আপনার পাওয়া তো উচিত।

উচিত অনুচিত বলে কিছু হয় না, কেউ পাবে কেউ পাবে না, না পেলে আমার থিয়েটার উঠে যাবে না, আর এসব একজন আর্টিস্টকে তার লক্ষ্য থেকে ভ্রষ্ট করে, আমি চমৎকার আছি। 

অনল তখন ঝুলি থেকে বেড়াল বের করল, তার অভিপ্রায় ব্যক্ত করল। বলল তিন শহরে সংবর্ধনার কথা, বলল সংস্কৃতি মন্ত্রীর কথা, চেতনার রঙ থেকেই সব প্রস্তাব দেওয়া হবে, সেই কথাও বলল। সুজন স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকলেন। বিনতাও নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন সুজনের মুখের দিকে। তাঁরা স্বামী স্ত্রী পরস্পরকে দেখছেন। অনল কথা বলেই যাচ্ছে। কিন্তু তার কথা তাঁদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না। কিন্তু শব্দজট তো শুনতে পাচ্ছেন, অনলের মুখ নাড়া দেখতে পাচ্ছেন। অনল কি এসব সত্যি বলছে, সংস্কৃতি মন্ত্রী, তার বন্ধু, তিন শহর, পেদ্রো    পারামো কি সত্যি কথা বলত ? এ জমি আমার বললে, কে তাকে আটকাবে ? সব মিথ্যে। অনল এসেছে তাকে ভোলাতে, কিন্তু অনল জানে না মাঝারি উচ্চতার মানুষ কতটা কঠিন হতে পারে নিজের মতে, আদর্শে। তিনি হাত তুলে অনলকে থামতে বললেন।

তিন

ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল পরিচারিকা। অনল এসেছে, লুচি করতে বলেছিলেন বিনতা। তিনি নিজে লুচি পছন্দ করেন। সুজনও। অনল ব্রেকফাস্ট করে এসেছে বলেও লুচি শাদা আলুর তরকারিতে আপত্তি করল না। সঙ্গে নলেন গুড়ের সন্দেশ। ব্রেকফাস্ট আসায় আগের আলাপে ছেদ পড়ল। খেতে খেতে তবু অনল জিজ্ঞেস করল, আপনার নাম কখনও প্রস্তাবিত হয়েছে ?

আমি তো জানি না, বাদ দাও এসব।

হাসল অনল, বাদ দেব কেন, বলছি, আপনাকে কেউ বলেনি যে আপনার নাম পাঠানো হচ্ছে।

না বলেনি, কেন তাতে কী হয়েছে ?

কিছু না। চুপ করে গিয়ে অনল লুচির সদ্ব্যবহার করতে থাকে। খাওয়ার পর চা এলে পেয়ালা হাতে সে বলল,  আগে আমাদের সংগঠন চেতনার রঙ-কে ভারতে রেজিস্টার্ড সংগঠন হতে হবে, তারপরেই প্রস্তাব পাঠাতে পারব।

তুমি কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না, চেতনার রঙের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী ?

আগে আপনি বলুন চেতনার রঙের কাজ কী, বাঙালির সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরা নয় ?

সুজন বিব্রত বোধ করছিলেন। এমন বিব্রত বহুদিন হননি। তিনি কোনও কথা বলতে পারছিলেন না। লজ্জিত বোধ করছিলেন। অনল এমন ভেবেছে ? তিনি কি এমনি ভাবেন ? তাঁর কথাবার্তায় কখনও কি মনে হয়েছে তিনি লোভী ? এই জন্যই চেতনার রং প্রতিষ্ঠা ? তিনি একটি চ্যারিটেবল অরগানাইজেশনের সভাপতি, সেই সংগঠন তাঁর  নামে প্রস্তাব করবে পুরস্কারের জন্য, এর চেয়ে লজ্জার কিছু হয় না। ছিছিক্কার পড়ে যাবে চাদ্দিকে। তিন্নি জানে ? তিন্নি শুনলে ভাববে তিনি এক সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি। তিনি চুপ করেই থাকলেন। বিনতা হয়তো বুঝতে পারছে তাঁর  মনের কথাটি। 

অনল বলল, তিন্নি রায়ের পর্ব শেষ দাদা, ইন্ডিয়াতে তো আমাকেই চালাতে হবে, ও মার্কিন নাগরিক, এখানে আউটসাইডার হিসেবে থাকতে পারবে, সংবিধান এমনই করা হয়েছে।

সংবিধান, আউটসাইডার, কী সব বলছো তুমি, মাথার ঠিক আছে ?

ঠিক আছে সুজনদা, বলছি, তিন্নি রায়ের পর্ব শেষ।

মানে, এটি তো তিন্নিরই সংস্থা, তুমি কী বলতে এসেছো বুঝতে পারছি না।

অনল বলল, আমি ভারতে রেজিস্ট্রেশনের সব কাগজ জমা দিয়েছি, যোগাযোগ করেছি ঐ ডিপার্টমেন্টে, কয়েক দিনের ভেতর চিঠি পেয়ে যাব।

সুজন বললেন, তিন্নি তো এসব জানে না। 

অনল বলল, না জানে না, দেখুন তিন্নিকে প্রস্তাব আমি অনেক আগেই দিয়েছিলাম, সুজনদার পাশে আমাদের  দাঁড়াতে হবে, ফান্ড রেইজিং প্রোগ্রাম শুরু করতে হবে, ও রিজেক্ট করে দিয়েছে সবই, দেখুন সুজনদা, আমি অবাকই হয়েছিলাম যখন পদ্মভূষণের বিষয়টা কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি সচিবকে বলতে চেয়েছিলাম নিউ ইয়র্কেই, তিন্নিকে  বললাম, বলতে ও এমন হাসল, যেন আমি নির্বোধের মতো কিছু বলেছি, সচিব তখন ওখানে গিয়েছিলেন মেয়ের   কাছে, একটা রেফারেন্সে আমাকে সময় দিয়েছিলেন, আমি বলতে প্রোপোজাল জমা দিতে বলেছিলেন, কিন্তু তা  হয়নি।

সুজন বললেন, তুমি থামো, আমি এভাবে ভাবিনি কখনও।

ভাবেননি, ভাবতে হবে না, আমরা ভাবব, আর আমরা না ভাবলে আর কে ভাববে, তিন্নি আপনার ভালো চায় না, এই সংস্থা কি তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যা করবে মেনে নিতে হবে, আমি অনেক পরিকল্পনা করেই ইন্ডিয়া ফিরেছি। 

সুজন বললেন, এটা তিন্নিরই ব্রেন চাইল্ড, তিন্নির নিজ হাতে গড়া, তার অধিকার সকলের আগে, তুমি যা বলছো সব তোমার মন-গড়া কথা, তুমি অন্য কোনও সংস্থা করতে পারো, চেতনার রং নিয়ে ইচ্ছে মতো কাজ করবে কেন ?

অনল হাসল, বলল, আপনি একজন উদার মানবিক ব্যক্তি, আপনার তুলনা হয় না, আর চেতনার রঙের যেটুকু  পরিচিতি, সব আপনার কারণে, আপনি ছাড়া কে চিনত একে, তিন্নিকে অহেতুক ক্রেডিট দিচ্ছেন আপনি, সে কে, একজন ইন্ডিয়ান আমেরিকান, তার বেশি কিছু নয়, একটু নিজের কথা ভাবুন, আমি পেদ্রো পারামোর   বংশধর, জানি কীভাবে কী করতে হয়। 

সুজন বললেন, কী সব পেদ্রো পারামো বলছো, তোমার অ্যাবসার্ড কথা আমি বিশ্বাস করছি ভাবছো ? শোনো অনল, তোমার ওই সব প্রস্তাবে রাজি নই, তুমি ওসব করতে যেও না।

অনল হাসল, আপনি জানেন না কালচারাল মিনিস্টার আমার বন্ধুর দাদা, ইউপির এক গ্রামে ওদের বাড়ি, বিশাল ফার্ম হাউস, চলুন আপনি থেকে আসবেন, হি ইজ আ নাইস ম্যান, সুযোগ ছাড়ব কেন ?

সুজন বললেন, সে তো নিশ্চয়ই সুযোগ ছাড়বে কেন, কিন্তু অন্য কারও কথা ভাবো, আমাকে বাদ দাও।

দেখুন সুজনদা, অন্য কেউ আপনার পাশে নেই, আপনিই যোগ্য ব্যক্তি, নীলেশ আমাকে সমর্থন করল, আর কেউই না বলেনি, এটা আপনার প্রাপ্য, আপনাকে আমরা কী দিতে পেরেছি বলুন। অনল কথা শেষ করে বিনতার দিকে তাকায়। বিনতার সমর্থন চায় বুঝি। বিনতা মাথা নাড়তে থাকেন, বললেন, না এটা  হয় না, তুমি কি তোমার দাদার ইতিহাস জানো ?

সবই জানি বউদি, দাদার স্ট্রাগল জানি, এই বয়সে তিনি সম্মানিত হবেন, তা কি খারাপ ?

না, এভাবে সরকারি খেতাব দরকার নেই। সুজন বললেন, চেয়েচিন্তে নেওয়া, আমি কি ভিখারি ?

অনল বলল, আপনি ভুল কথা বলছেন সুজনদা, আপনি কিছু করছেন না, যা করার আমি করব, আমি যেটা চাইব, করেই ছাড়ব।

মাথা নাড়লেন, তুমি অন্য কিছু ভাবো, নট ফর মি।

অনল বলল, আপনি একজন সৎ মানুষ, তাই প্রথমেই রিজেক্ট করছেন, কিন্তু এটি আমাদের সিদ্ধান্ত, আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত আপনি রিজেক্ট করবেন কীভাবে, আপনার সততাকে সম্মান দিতেই এই প্রস্তাব পাঠানো   হবে।

সুজন মাথা নাড়তে লাগলেন। অনল আরও অনেক কথা বলতে লাগল। চুপ করে শুনলেন সুজন এবং বিনতা।  এক সময় অনল উঠল, বলল, একদিন সকালে নিয়ে যাব আপনাকে, বিকেলে পৌঁছে দিয়ে যাব, পেদ্রুনগরে আমাদের পরিকল্পনা কীভাবে রূপায়িত হবে তা দেখাব আপনাকে, দেখলে খুশি হবেন, নগরটা পেদ্রো পারামোর স্মৃতি চিহ্নিত, দেখলে বুঝতে পারবেন।

সুজন চুপ। বিদায় জানালেন না। কিন্তু অনল বেরোতে বেরোতে বলল, আপনি পেদ্রো পারামোর ক্ষমতার কথা ভাবুন সুজনদা।

সুজন আর পারলেন না, বললেন, উপনিবেশ গড়ে দেশটার সব ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, মৃতদের গ্রাম হয়ে   গিয়েছিল কোমালা, ডু ইউ ওয়ান্ট টু ডু দ্যাট এগেইন ?

ওসব তত্ত্বকথা, আপনি ভাবুন হিটলার কী স্বপ্ন দেখিয়েছিল জার্মান জাতিকে, যদি সোভিয়েতের কাছে না হেরে যেত, পৃথিবীর ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো, আমাকে এগোতে দিন পারামোর স্মৃতি নিয়ে, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, এখন নাকি নাৎসিবাদ মানুষের মঙ্গলই করবে, যে যার দেশে ফিরে যাক, শিকড়ে ফিরে যাক, আমি একদিন আপনাকে সবই বলব, আপনার আশীর্বাদ নিয়ে এগোব।   

সুজন বুঝতে পারলেন অনল আটঘাট বেঁধেই দেশে ফিরে এসেছে। পেদ্রো পারামোর নতুন জন্ম হয়েছে,  অ্যাডলফ হিটলার ফিরে আসছে। অনলকে ঠেকাতে হবে। তিনি ভাবছিলেন নিউ ইয়র্কে এখন কত রাত। অনল চলে  গেলেই তিন্নিকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করতে হবে। সব জানাতে হবে। সুজনের মনে হচ্ছিল এই ঘটনার জন্য তিনিই  দায়ী। তিনিই অনলকে তিন্নির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। অনল তখন নিউ ইয়র্কে নবাগত, প্রায় একা।  তিন্নি ওখানকার বাঙালিদের ভেতরে পরিচিত এবং জনপ্রিয়। কলকাতার এক সাময়িক পত্রিকায় প্রবাসের চিঠি লেখে। থিয়েটার করে। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ, দুই দেশের বাঙালিদের ভেতরেই তার পরিচিতি। মহামারির সময় ওদেশের বাঙালিদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে তিন্নি অনেক টাকা পাঠিয়েছে সুজনের কাছে। সেই টাকায় আম্ফানে ঝড়ে বিধ্বস্ত সুন্দরবনে সাহায্য নিয়ে গেছেন সুজন। তিন্নির চেতনার রং গ্রুপের এখানে একটা শাখা  হয়েছিল। মহামারিতে কমিউনিটি কিচেন চালানো, অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ এসব করেছেন তাঁরা অন্য এক সংস্থার মাধ্যমে। সেই সংস্থা বহু পুরোনো একটি বেসরকারি সংগঠন। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে। খালপাড়ের  সুবিধা বঞ্চিত ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখায়। তারাই দায়িত্ব নিয়েছিল। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিয়েছিল  সল্টলেকের গৌরচন্দ্র গুপ্ত। গৌর অধ্যাপনা করত। অবসর নিয়েছে। নীলেশ দাস এসেছিল অনেক পরে। এই অনলের মাধ্যমে। নীলেশ ছিল সরকারি উচ্চ পদস্থ আমলা। চাকরিতে নেই, তবু তার প্রভাব কম নেই। অনেক জানাশোনা। পরে গৌর বলেছিল, নীলেশ মানুষটা কয়েকবার সাসপেন্ড হয়েছিল বেআইনি কাজের জন্য। অজয় সান্যাল বলে একজন আছেন। তাকে দ্যাখেননি সুজন। সেও সরকারি চাকরি করে। শোনা যায় সে নীলেশের  অধীনে কাজ করত। নীলেশ তাকে ঢুকিয়েছে। সব সুজনের ডায়েরিতে লেখা আছে। যেহেতু সংস্থার সভাপতি তিনি এবং সংস্থা টাকা-পয়সা লেনদেন করে, তাঁকে সতর্ক থাকতে হয়। চেতনার রঙের সহযোগী সংগঠন আব্দুল  মতিনের ‘আশ্রয়’। আশ্রয়ের খুব সুনাম। এখন তিনি বেঁচে নেই, কিন্তু কবি শঙ্খ ঘোষ আশ্রয়ের অনুষ্ঠানে নিয়মিত ছিলেন। অনুষ্ঠান হতো, এখনও হয় খালপাড়ে। তিনি সেখানে গেছেন কয়েকবার। তাদের টেক্সট বুক ছাড়াও   উপযোগী গল্পের বই দেওয়া হয়েছে চেতনার রঙের পক্ষ থেকে। কিন্তু সুজন যা করতে যাচ্ছে তাতে চেতনার রঙের  দর্শন বদলে যাবে, উদ্দেশ্য বদলে যাবে। তিন্নি কিছুতেই মেনে নেবে না।

অনল বলল, চলুন সুজনদা, আজই চলুন, আপনি তো পেদ্রুনগর দ্যাখেননি, আমার পরিকল্পনা শুনলে আপনি   খুশি হবেন। 

অনেক বছর আগে একবার পিয়ালি টাউন গিয়েছিলাম, সেই পথে পেদ্রুনগর পার হয়েছিলাম, গাছ-গাছালি আর বাগানে ভরা। বিনতা বললেন।

সব বদলে গেছে, চিনতেই পারবেন না বউদি।

সুজন বললেন, অনেক পেয়ারা বাগান ছিল, বাগানে বিখ্যাত ছিল পেদ্রুনগর, পেদ্রুনগরের পেয়ারা, লিচু, সবেদা খুবই সুস্বাদু জানি, মাটি ভালো, আর বেশ যত্ন নেওয়া হয় ফলের গাছের। 

অনল বলল, বাগান অনেক কাটা পড়ে গেছে, হাইরাইজ উঠেছে অনেক, শপিং মল, দেখার মতো জায়গা হয়েছে পেদ্রুনগর।

বাগান কাটা পড়েছে, বাগানের জন্যই তো বিখ্যাত পেদ্রুনগর ?

আছে আবার নেইও, আগে প্রত্যেক ফ্যামিলিরই বাসস্থান সংলগ্ন বাগান থাকত, আম, জাম, লিচু, পেয়ারা এসবের বাগান, এখন অধিকাংশ বাগান নেই, বাগান আর লাভজনক থাকছে না। বলল অনল।

তোমাদের বাগান ? সুজন জিজ্ঞেস করলেন।

কাটা পড়বে, আমার অন্য প্ল্যান আছে, সব জমি আমি চেতনার রঙের নামে ট্রান্সফার করে দেব, মানে ধরুন চল্লিশ একর জমি, এক শো কুড়ি বিঘে, তার বেশি ছাড়া কম নয়, একজন উকিল, রামেশ্বর মিদ্যেকে দায়িত্ব  দিয়েছি লিস্ট করতে, চেতনার রং এবার সেখানে ফার্ম হাউস করবে, হোম স্টে, লাক্সারি হোটেল, বুঝতে পারছেন তো সুজনদা, চলুন সুজনদা, বিকেলেই ফিরে আসবেন, বউদি যাবেন তো চলুন, অনলাইনে ইলিশ অর্ডার দিচ্ছি,  আপনি গলদা চিংড়ি খেতে ভালোবাসেন ?

সুজন বললেন, না, আমি  যাব না, কাজ আছে।

আচ্ছা নেক্সট সানডে, আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব, প্ল্যান দেখবেন, চেতনার রঙ কী কাজ করবে ভবিষ্যতে   তার তালিকা দেখাব।

সুজন বললেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে ?

সিদ্ধান্ত আবার কী, আপনি সাইন করলেই হবে, ইয়েস সুজনদা, আমি চেতনার রঙে এমন রঙ লাগাতে চাই যা  ঝিকমিক করবে।

তিন্নি কিছুই জানে না ?

আমি বলেছিলাম নিউ ইয়র্ক থাকতেই, বাট শি রিজেক্টেড এভরি প্রপোজাল।

তোমার জমি চেতনার রঙে দেবে কেন, চেতনার রংই বা তা নেবে কেন ?

নেবে, না নিলে সিলিং বহির্ভূত জমি সরকার নিয়ে বিলি করে দেবে গরিব মানুষের ভেতর, সেইটা একটা ডিজাস্টার হবে, আপনি সিলিং ল জানেন ?

কিন্তু সে তোমার সমস্যা।

না সুজনদা, জমি পেলে চেতনার রঙের অনেক কিছুই হবে, আপনি আশীর্বাদ করুন।

মাথা নাড়লেন সুজন। তিনি বুঝতে চাইছিলেন অনল পারামোকে, ধুরন্ধর ব্যক্তি। আগে বোঝেননি সে এত বুদ্ধি  ধরে। সুজন একটি থিয়েটার দল চালান। দলে নানা রকম সমস্যা তৈরি হয় মেম্বারদের নিয়ে। তারা কেউ বড় রোল  চায় অথচ তা করার ক্ষমতা নেই, মূলত এই কারণেই দলের ভেতরে দল তৈরি হয়। ক্ষোভ মিটিয়ে একতাবদ্ধ  করার দায়িত্ব তাঁর। কিন্তু এখানে যে সমস্যা ঘনীভূত হতে যাচ্ছে, তা অভিনব। জমি, পুরস্কার, মন্ত্রী, সবই চেতনার   বহির্ভূত কাজ। নাটকের দল গানবাজনার আসর বসানোর মতো প্রায়। নাটকের দলের সিনেমা-উৎসব করার মতো  প্রায়। সুজন নরম গলায় বললেন, এই সব তোমার প্ল্যান, তুমি তো অন্য সংস্থা করতে পারতে, এই নামটি কেন নিলে ?

হাসল অনল, বলল, তা কেন, এই সংগঠন কেন না ?

তুমি বুঝতে চাইছো না অনল, এটা একটা চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন, ব্যবসা করতে এর জন্ম হয়নি, তোমার   জমি বাঁচাতেও এর জন্ম হয়নি।

মানুষের সিদ্ধান্ত কি পরিবর্তন হয় না, আমার চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, যেমন ভাববেন, তেমন হবে।

এই নামটি বাদ দাও, অন্য কোনও নাম নাও, এটা তিন্নির দেওয়া নাম, তারই গড়া সংগঠন।

মাথা নাড়ে অনল, বলল, রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে নেওয়া।

তা সে-ই নিয়েছিল।

আমিও নিলাম। বলল অনল পারামো। সুজন যেন ঝলসে গেলেন আগুনে। মুখে তার ছায়া পড়ল। তা লক্ষ করে অনল মৃদু হাসে, বলে, এসব নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না সুজনদা, আপনাকে আমি ব্রডওয়ে থিয়েটারে প্রতিষ্ঠা দেব, নিয়ে যাব ওখানে ওয়ার্কশপ করাতে, ব্রডওয়ে থিয়েটারে সংবর্ধনা দেব, অনেক প্ল্যান  আছে, আমার পাশে থাকুন।

আমি বেশ আছি, আমার অত লোভ নেই অনল।

অনল আবার নিঃশব্দে হাসে। একটুও রেগে যায় না। এটাই অনলের গুণ। অনল বলে, বাঙালির এটা  পুরোনো রোগ, ব্যবসা খারাপ হবে কেন, আপনি সেই লিটল ম্যাগাজিনেই পড়ে আছেন, বড় জায়গায় যেতে চান না, আমার উপর নির্ভর করুন, আমি আপনাকে নিয়ে ভাবছি, ইনফ্যাক্ট, তিন্নি আপনাকে ব্যবহার করেছে, আমি পেদ্রো পারামোর বংশধর, আমি যা করতে চাই করবই।

পেদ্রো পারামো মানে হুয়ান রুলফো ?

ইয়েস সুজনদা, আমি তাই, কার শিকড় কোথায়, কে বলবে।

সে তো একটা উপন্যাস।

উপন্যাস তো বাস্তবতাকে অবলম্বন করে লেখা হয়, তিন্নি এসব ভাবতেই পারবে না, আমি শিকড়ের সন্ধান   করব আমাদের সংগঠন দিয়ে।

সুজন চন্দ হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। কথা বলতে বলতে মিথ্যে বলতে বলতে সীমারেখা হারিয়ে ফেলে   অনল। তিনি কি মূর্খ ? নাহ, যাই বলুক তিন্নির সংগঠনকে বাঁচাবেন তিনি। একগুয়ে মানুষ সুজন চন্দ। এই কারণে   ক্ষতিও সহ্য করতে হয়েছে অনেক। তা হোক, নিজের পথ থেকে সরবেন না তিনি।

চার

এটা তিন্নির সংগঠন, তিন্নি ভেবেছিল, আর কেউ ভাবেনি। একেবারেই সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তিন্নি চায় না তার সংগঠন এইভাবে ডালপালা মেলে ব্যবসায় নামুক, সে চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন করতে চায়। প্রবাসে থেকে দেশের জন্য সাধ্যমতো কিছু করতে চায়। আসলে সে এই কাজের সূত্র পেয়েছে বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে। তারা   দেশের জন্য করে কিছু। স্কুল ফান্ডে টাকা দেয়, গ্রাম উন্নয়নে সরকারকে টাকা দেয়। পয়লা বৈশাখ, পঁচিশে  বৈশাখ, নয়ই জ্যৈষ্ঠ পালন করে নিউ ইয়র্ক শহরে। এসবে তিন্নি যায়। সাহিত্য পাঠের অনুষ্ঠানেও যায়। অনল যা করতে যাচ্ছে, তার ভেতরে তিন্নির মন নেই। দেশে তিন্নি তাঁর উপর নির্ভর করে। এই সংস্থার ব্যাপারে তাঁর কাছে  পরামর্শ চায়। অনলাইন মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেয়। অনল দেশে ফিরে এইসব করছে শুনলে তিন্নি মেনে নেবে না।   তিন্নি একজন গবেষক অধ্যাপক। সে মহাকাশ বিদ্যার ছাত্রী। কী চমৎকার গল্প করে মহাকাশের। সুযোগ পেলেই  বেরিয়ে পড়ে নির্জনতার দিকে। সঙ্গে থাকে টেলিস্কোপ। সে বলেছিল একটা টেলিস্কোপ দিতে চায়, এমন কেউ আছেন যিনি আকাশ চেনাবেন অল্পবয়সী ছাত্রছাত্রীদের। সন্ধান করছেন সুজন।

অনল বেরোতে বেরোতে আবার বসেছে, বলল, রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে আমরা সেলিব্রেট করব দাদা, তখন যাবেন তো ?

বিদ্রƒপাত্মক কণ্ঠে সুজন বললেন, পেদ্রো পারামোর সেই গ্রামে, মৃতদের গ্রামে ?

সুজন এই কথা গায়েই মাখে না, বলল, যা বলেছি এভিডেন্স ছাড়া বলিনি সুজনদা, সে আপনি বিশ্বাস করুন না করুন।

এই কথায় মানে একটা অত্যাচারী জমিদারের সঙ্গে নিজের পরিচয় জুড়ে কী লাভ হবে তোমার, কেউ বিশ্বাস করবে ? হুয়ান রুলফোর উপন্যাসের চরিত্রর বংশধর। পেদ্রো পারামো বলে বাস্তবে কেউ ছিল নাকি, হয় নাকি ?

হয়, ফালতু বলছি না, নতুন প্রোজেক্ট নিচ্ছি, শিকড়ে ফেরা, কে হুয়ান রুলফো পড়েছে যে অবিশ্বাস করবে, মানুষকে বিশ্বাস করাতে হয় সুজনদা, বারবার বললে মানুষ মেনে নেবে, আমি পেদ্রো পারামোর বংশধর, যা চাই  তা আমার, অধিকার করতে হয়, কেউ অধিকার দেয় না, রেজিস্ট্রেশনের পর সব হবে।

সুজন চন্দ চুপ করে থাকলেন। তাঁর মৌনতার অর্থ তিনি অগ্রাহ্য করছেন অনলের কথা। অনল অপেক্ষা করছে  সুজনের সমর্থনের জন্য। কিন্তু তার অপেক্ষাই সার, সুজন বললেন, তিন্নি কি জানে এসব কথা, এই রেজিস্ট্রেশনের  কথা ?

না জানে না, জেনে তো কিছু করতে পারবে না, ও মার্কিন নাগরিক। 

তুমি বুঝছো না, তিন্নিরই পরিকল্পনা সব, তুমি তাকে লুকিয়ে চেতনার রং নিজের করে নিতে পারো না।

আপনার ভুল হচ্ছে সুজনদা, আপনিও ছিলেন, আমিও ছিলাম, আমাদের সকলের পরিকল্পনা, সকলের চিন্তা থেকেই এই চেতনার রঙের  জন্ম।

না, তিন্নিই তো আমাকে এই পরিকল্পনার কথা একদিন বলল, সেই কোভিডের প্রথম ঢেউয়ের সময়, তার মনে হয়েছিল ঘরে বসেই আমরা অনেক কাজ করতে পারি, বাইরের কাজ করবে আশ্রয়।

না, আমিই ওকে বলেছিলাম এইভাবে দেশের কাজ করা যেতে পারে, ও আমার একটুখানি নিল, বাকিটা নিজের মতো করে চালাতে লাগল, আশ্রয় কে, সে কেন জুড়ল এর সঙ্গে ? আমার আপত্তি ছিল, বাইরের ইউনিট এসে টাকা তছনছ করে যাবে, হোয়াই ? 

সুজন চন্দ অবাক হয়ে অনলকে দেখছিলেন। কেউ না গেলে তো বলা যায় না তুমি যাও। তা অভদ্রতা হয়। শিষ্টাচারবিরোধী হয়। আর তিনিও বিবাদ করতে চান না এখন। তর্ক করলে সময় যাবে, কাজ হবে না।  তিনি যা বলবেন, অনল তা মেনে নেবে না। কিন্তু অনল উঠছেও না। মনে হচ্ছে সারা দিন থেকে যাবে। সারা রাত থেকে যাবে। সূর্যাস্ত অবধি থেকে যাবে। সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত থেকে যাবে। সাত দিন থেকে যাবে। ওই সোফায় বসে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করে তবে যাবে।

অনল বলল, আমিই নামকরণ করি, তা মনে আছে সুজনদা ?

সুজনের মনে নেই। মনে থাকার কথাও নয়, কেন না তখন অনল এই সংগঠনে প্রবেশ করেনি। সে সেকেন্ড  ওয়েভের সময়, ২০২১-এ জয়েন করে। সেই সময় সংকট বেশি হয়েছিল। অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাব হয়েছিল  খুব। চেতনার রং প্রচুর অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করেছিল। তখন চেতনার রং পরিচিত নাম। তারা যে এই কাজ করছে, তা নানা পত্রিকায় খবর হয়েছিল। একটি ওয়েব পোর্টালে তিন্নির ছবি দিয়ে চেতনার রং সম্পর্কে  অনেকটা লেখা বেরিয়েছিল। সেই লিঙ্ক আছে তাঁর কাছে। তিনি খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। তিনি বললেন, এটা যখন খোলা হয়, আই মিন যখন এই সংস্থা কাজ আরম্ভ করে, তখন তুমি ছিলে না এর ভেতরে, তুমি আমার সুপারিশে পরে ঢুকলে।

হাসল অনল, বলল, কী যে বলেন সুজনদা, আপনি অবসেসড, আমি নাম দিলাম, ভুলে গেলেন ?

সুজন বললেন, কিছুই ভুলিনি, তুমি যা বলছো তা ঠিক নয়, সময় গুলিয়ে ফেলছো, তুমি নামটা এভাবে নিতে পারো না।

আর কথা হলো না। অনল বুদ্ধিমান। উঠল। বলল, আজ আসি, আপনার সঙ্গে দেখা করে গেলাম, আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট, আপনার স্থান অনেক উঁচুতে, আপনার নির্দেশমতো কাজ করব আমি।

এই কাহিনির শুরু এই। অনল চৌধুরী বেরিয়ে পড়ল সুজন চন্দর বাড়ি থেকে। তখন বেলা প্রায় এগারো। ফোন করল নীলেশকে। নীলেশ থাকে লেকটাউন। কাছেই। নীলেশের বাড়ি যাবে তা ঠিকই ছিল। আজ রবিবার। অজয় সান্যালও আসবে। অজয়ের বয়স বছর পঞ্চাশ। সে নীলেশের খুব বাধ্য। নীলেশ অবসর নিয়ে পুনঃনিয়োগে তিন বছর কাজ করেছিল সরকারের এক ডিপার্টমেন্টে, কিন্তু সেখান থেকে সরে আসতে হয়েছে হিসাবের গরমিলে।  মানে অবসরপ্রাপ্ত আমলা এবং চাকুরিরত আমলায় ক্ষমতার অনেক তফাত। নীলেশ দাস ক্ষমতা প্রয়োগ করে  কাউকে সুবিধা করে দিতে গিয়ে বারবার আটকে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে মন খারাপ করে সরকার এবং তার আমলাতন্ত্রকে  গালাগালি দিতে দিতে বাড়ি ফেরে একেবারে। তার টাকার দরকার না হলেও, অর্থ উপার্জনে যে সুখ তা সে ছাড়া  কে জানে ? নীলেশ মাঝারি উচ্চতার মানুষ। শ্যামবর্ণ। মাথায় চুল কম, তাই ইদানীং টুপি ব্যবহার করছে। নীলেশের  অনেক গুণ। অধীনস্থ মহিলা কর্মচারীর শ্লীলতাহানির কারণে তার বিচার হয়েছিল। কিন্তু বিচারকরা তার সহকর্মী  হওয়ার কারণে বেকসুর খালাস হয়ে শুধু বদলি হয়ে আরও পছন্দসই দপ্তরে গিয়েছিল। এমন হয়েছিল বার দুই। নীলেশের একটু ঝোঁক আছে নারীতে। অবশ্যই কম বয়সের। লেকটাউনে নীলেশের বড় ফ্ল্যাট। স্ত্রী তার সঙ্গে  থাকেই না বলা যায়। বেঙ্গালুরুতে তার ছেলের কাছেই থাকে বছরের অধিকাংশ সময়। নীলেশের একটি রান্নার লোক আছে। আছে এক পরিচারক, যুবক। সে এসেছে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে। গায়ে যেন কাদামাটির রং আর গন্ধ। সে এক ডাক্তারের গাড়ি চালায়। রবিবার তার ছুটি। আবার ডাক্তার কলকাতার বাইরে গেলেও তার ছুটি। সে  রাতে নীলেশের কাছে থাকে। সকালে বাজার করে। আসলে এত বড় ফ্ল্যাটে নীলেশ একা থাকতে অস্বস্তি বোধ করে। পরিচারকটি বেশ শক্ত-সমর্থ যুবক। এই ব্যবস্থা করে গেছে নীলেশের গৃহিনী অঞ্জনা। সে তার স্বামীকে চেনে। পরিচারক, স্থানীয় এক ডাক্তারের গাড়ির ড্রাইভার দেবু মাণ্ডিকে বলে গেছে, বেচাল হলে খবর দিতে।   দেবুও বলেছে নীলেশকে, স্যার, ম্যাম এই বলে গেছে। নীলেশ এখন মধ্য ষাট। সে যেন বাড়িতে উটকো  মেয়েমানুষ না আনে। ফেঁসে যাবে। এখন মি টু আন্দোলন চলছে ফেসবুকে। গুপ্ত কথা ফাঁস করতে কেউ পিছ পা নয়। বিশেষত কম বয়সী মেয়েরা। 

অনল এলে নীলেশ ডেকে নিল অজয়কে। সে থাকে পাতিপুকুর। কাছেই। নীলেশের ফ্ল্যাটে পৌঁছে অনল বলল, লোকটা একগুঁয়ে, কিছুতেই মানছে না।

নীলেশ বলল, মানবে, তুমি সংস্কৃতি মন্ত্রীর কথাটা কদিন বাদে আবার বলো।

অনল বলল, সুজনদা দিল্লিবিরোধী লোক, মনে হয় বামপন্থি, বুঝতে পারছি না শেষ অবধি কী করবে, বলে ওরা হাজার বছর শাসনের স্বপ্ন দ্যাখে, যেমন হিটলার বলত।

হাসল নীলেশ, বলল, আরে ওসব ফালতু ব্যাপার, চিঠিটা ধরাও, সব ভুলে যাবে, জানা আছে আমার।  

অনল বলল, এই ধরনের লোক খুব টেঁটিয়া হয়, তুমি সম্মান ঘোষণা করলে, উনি প্রত্যাখ্যান করলেন, তখন আমার পজিশন কী হবে বলো দেখি।

নীলেশ বলল, বাড়িতে ইডি সিবিয়াই পাঠাতে পারবে ?

হাহা করে হাসল অনল, বলল, সুজনদার তাতে কিছু হবে না, আচ্ছা উনি না এলেই বা আমাদের কী ?

নীলেশ বলল, কিছুই না, দরকার নেই লোকটাকে, তুমিই অহেতুক তেল মারছ ওঁকে।

অনল বলল, লোকটার উপস্থিতিই অনেক, একটা এনজিওর মাথায় সুজন চন্দ থাকলে অনেক, ডোনাররা নিশ্চিন্তে হাত খুলবে।

গ্লাস সাজানো হচ্ছিল। দেবু এ ব্যাপারে এক্সপার্ট। স্যার হুইস্কি খেলে সেও প্রসাদ পায়। দেবু স্যালাড, পমফ্রেট মাছ ভাজার ব্যবস্থা করল। বিদেশ থেকে সায়েব এসেছে। তাকে আপ্যায়ন করতে হবে তো। অজয় সান্যাল বলল,  ওঁকে বাদ দিয়েই হোক, আমার স্যার প্রেসিডেন্ট হন।

অনল চুপ করে থাকে। সুজনদার পরিবর্তে নীলেশ দাস ? নীলেশের পরিচয় প্রাক্তন ডেপুটি। নীলেশের পরিচয়  ওম্যানাইজার। খুব ভালো দেখাবে না তা। সমাজ মাধ্যমে কত যে টেঁটিয়া মেয়েমানুষ আছে। বড় বড় হ্যাজ নামিয়ে দেবে। প্রতিবাদে মুখর হবে মেয়েরা। নীলেশ থাকুক। আড়ালে থাকুক। ডেপুটির অভিজ্ঞতা কাজে লাগে খুব।   কত যে চেনাজানা আছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে সে কিছু বলল না, চুপ করে থাকল, তার অর্থ সে এই প্রস্তাব মেনে নিচ্ছে। অনল বলল, সুজন চন্দর নাম প্রেসিডেন্ট পদে রেখেই রেজিস্ট্রেশন  হচ্ছে।

নীলেশ বলল, হোক এখন, তারপর  মিটিং করে বাদ দিলেই হবে।

অনল হুইস্কির গেলাস হাতে নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করল। নীলেশ এবং অজয় সান্যাল গ্লাস তুলে ধরল। দেবু মাণ্ডি  দূরে বসে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। অনল সিপ করতে করতে বলল, সংস্কৃতি মন্ত্রী আমার বন্ধুর দাদা, দাদা মানে বন্ধুর থেকে দু বছর বড়, আমিও বন্ধুর থেকে দু’বছর বড়, মানে কালচারাল মিনিস্টার আমার এজের, প্রায় বন্ধুই, কত বড় ফার্ম হাউস আছে তুমি ভাবতে পারবে না, আমার উদ্দেশ্য অমনি একটা ফার্ম হাউস করা, এতে কিছু আম জাম পেয়ারা লিচুর বাগান কাটা পড়বে।

নীলেশ বলল, পড়ুক, ওসব সিজন ছাড়াও কিনতে পাওয়া যায়, বাগান রেখে হবে কী ?

অনল বলল, সংস্কৃতি মন্ত্রী এইটি উদ্বোধন করবেন, কথা হয়ে আছে, প্রথমে শিলান্যাস করিয়ে নেব সংস্কৃতি মন্ত্রী লছমনচাঁদ মহাত্মাকে দিয়ে, তাড়াতাড়ি করতে হবে, শিলান্যাস অনুষ্ঠানেই তাক লেগে যাবে সকলের।

নীলেশ মাথা দোলাতে লাগল, সুন্দরী কিছু মেয়ে রিক্রুট করো, তারা না থাকলে অনুষ্ঠান ঝলমল করবে না।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাই আনবে ওসব, আমার সব ভাবা আছে, ফার্ম হাউস হোক, তখন রিক্রুটমেন্ট হবে, আমি স্টেপ টু স্টেপ এগোতে চাই নীলেশদা।

তোমার সুজনদা জানে এসব ?

ইঙ্গিত দিয়েছি, যাকে বলে টোপ, পদ্মভূষণ আর দাদা সায়েব ফালকে, সুজনদাকে শুধু বলতে হবে, দিস ইজ  মাই ব্রেনচাইল্ড, অনল চৌধুরীর মানস সন্তান এই ‘চেতনার রঙ’, সি আর, তাতেই হবে, আমি অনেক পরিকল্পনা  করে ইন্ডিয়া এসেছি, এটা মনে রাখতে হবে আমি পেদ্রো পারামোর বংশধর।

সে কি আমি জানি না, তুমি কত বড় বংশের ছেলে, তাদের কত দানধ্যান! নীলেশ মাথা দোলাতে লাগল, বলতে লাগল, আমি তো এক সময় ভেবেছিলাম কুইট করব এই গ্রুপ, লাভ নেই কোনও, তুমি দায়িত্ব নাও, কাজ হবে, আমেরিকার বঙ্গ সম্মেলনে আমাদের প্রতিনিধি পাঠাও, আমি আমেরিকা যেতে চাই, জানি এসব ম্যানেজ করার ক্ষমতা তোমারই আছে।

নীলেশের মনোবাসনা জানে অনল, বলল, তোমাকে মেহিকো পাঠাব, পেদ্রো পারামোর গ্রামে।

সেখেনে গিয়ে কী করব ?

দেখে আসবে পেদ্রো পারামোর কীর্তি।

নেশা হয়ে যাচ্ছে নীলেশের। অনলের নেশা হয় কি না বোঝা যায় না। মস্ত চেহারা, খেতেও পারে অনেক।  পাঁচ পেগ খেয়েও স্থির থাকতে পারে। নীলেশ বলল, জমিদারের দান ধ্যান থাকে অনেক, তা এমনিই বলা যায়, ধরো আমার বাড়ি বর্ধমান, আমাদের ওখানে জমিদারি পুকুর আছে, সে ধরো সাত বিঘের দিঘি, সাত গাঁয়ের লোকের   জল খাওয়ার জন্য তিনি ঐ জল দান করেছিলেন নিজের মায়ের নামে, নিস্তারিনী দেব্যার দিঘি, ফলক বসেছে   সেখানে।

শুনতে শুনতে অনল হা হা করে হাসল, বলল, আরে নীলেশদা, এটা পেদ্রো পারামোর কথা হচ্ছে,  নিস্তারিনীর কথা নয়, কামালো গ্রামটাকে পেদ্রো পারামো ভূতের গ্রামে পরিণত করেছিলেন, দিঘি, যত পুকুর, যত  জল ছিল সেখানে সব তিনি শেষ করে দিয়েছিলেন, তার ভয়ে এক এক সঙ্গে বিশ পঞ্চাশজন হার্ট ফেল করে   মরত, কামালো গিয়ে তুমি দেখে আসবে।

তা কি ভালো হবে ?

হবে, গ্রুপের লোকজন, মেম্বাররা জানবে আমি কী করতে পারি, বিরোধিতা করলেই শেষ করে দেব, তুমি যাবে তো  বলো নীলেশদা, আমি পাঠিয়ে দেব, হুয়ান রুলফো অনেক বছর আগে মারা গেছেন, তাঁর নামে একাডেমি আছে, তারাই তোমাকে পাঠিয়ে দেবে কামালো ভিলেজে, মৃতদের গ্রাম, কেউ বেঁচে নেই, কিন্তু পারামোর নামে   তবু সেখানকার একদল জয়ধ্বনি দেয়, পারামো হলো পতিত জমি, নিষ্ফলা জমি, পতিত নিষ্ফলার জমির পাশে উর্বরা জমি থাকলে, পতিত জমি তা অজগরের মতো গ্রাস করে, ক্যান ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড ?

নীলেশ হাঁ করে তাকিয়ে আছে অনলের দিকে। সব বুঝতে পারছে না। দেবু নিষ্পলক। যেন বুঝে নিচ্ছে   অনল চৌধুরীকে। সে আদিম জনজাতির অংশ, তার কি মনে পড়ে যাচ্ছিল পূর্বজন্মের কথা। অনল চৌধুরী বলল, পারামো নামটা হুয়ান রুলফোর দেওয়া নয়, তিনি নিজে নিজের নাম বদল করেছিলেন, পারামো, পতিত জমি,  আমার নাম ছিল অভ্রনীল, আমি তা অনল করে নিয়েছি, আগুন, আগুনে ঝলসে দেব, পারামোর বংশে এমন নামই হয়।

পাঁচ

নীলেশের নেশা থমকে গেছে এইসব কথা শুনে। ভয় ভয় করতে লাগল। সে মাথা নামিয়ে বসে আছে। ভাবছে কথাটা মেয়েমানুষ চর্চায় শিফট করলে ভালো হত। কিন্তু অনল সরবে না। সুজন চন্দর বাড়ি থেকে জ্বলতে জ্বলতে এসেছে। সেই আগুন ঢালছে অবিরাম। না ফুরোলে থামবে না। দাবানল লেগেছে যেন। বস্তিতে আগুন দিয়েছে  প্রমোটার, লেলিহান শিখা, আমাজনের অরণ্যে আগুন দিয়েছে বহুজাতিক। বহুজাতিক অনল তার সমুখে। নতমুখ চায় সে। নতজানু দেখতে চায়। 

নীলেশের ডাইনিং কাম লিভিং অনেক বড়। দেওয়ালে মসৃণ গেরুয়ার স্নিগ্ধ প্রলেপ। তার মধ্যে তার শ্মশ্রুমণ্ডিত  দীক্ষাগুরুর মস্ত ছবি। তাঁর দু চোখ দিয়ে করুণা ঝরে পড়ছে। যেন হাত কৃতাঞ্জলিপুটে করুণা গ্রহণ করে নেবে  করুণাপিয়াসী কেউ। পান করবে করুণাধারা। এই ছবিটা চন্দননগরের এক চিত্রকরের আঁকা। তিনি পোট্রেট এঁকেই জীবন ধারণ করেন। দেওয়ার কথা ছিল দশ হাজার। সাড়ে পাঁচের বেশি দেয়নি নীলেশ। লোকটাকে বলেছে  বাকি টাকাও দিয়েছে একাউন্টে। দেখে নিন। লোকটা দেখেই যাচ্ছে। আসলে দেখতেই জানে না অনলাইন, দেখবে কীভাবে ? এসব না করতে পারলে ক্ষমতার স্বাদ অবসরের পরেও পাবে কীভাবে ? অন্য দেওয়ালে নাতির ছবি। ছেলে তাকে পছন্দ করে না। না করতে পারে, তার সঞ্চিত অর্থ ছেলেই তো ভোগ করবে।   ত্যাগ করতে পারবে ঘুষখোর, চরিত্রহীন পিতার সম্পদ ?

নীলেশ সীমিত পান করে। তবু অনলের কথা তার কাছে রোমহর্ষক হয়ে এসেছে। অনলের কথা সব বুঝতে না পারলেও বুঝেছে অনেকটা। আসলটা বুঝেছে। অনল বিরোধিতা সহ্য করবে না। সে বিরোধিতা করবেই বা কেন ? এসব সুজন চন্দ আর তিন্নি শুনলেই ঠিক হতো। সে সাহস করে মাথা তুলে প্রসঙ্গ বদলে দিল, পারামো, রুলফো সে জানে না। দেবদাসের পর আর কোনও উপন্যাস পড়েছে কি না সন্দেহ আছে। অনল ঐ এক অদ্ভুত নামের সঙ্গে নিজেকে জড়াল কেন তা বুঝতে পারে না নীলেশ। অত্যাচারীর বংশধর হতে চাইলে মহম্মদ ঘোরির  কেউ হতে পারত। যাক ওসব, মুসলমান হতে যাবে কেন সে ? সে জিজ্ঞেস করল, কবে নাগাদ শিলান্যাস হবে ?

সব জানতে পারবে দাদা, আমি আবার পেদ্রুনগরে মিটিং ডাকব, সেখানে সুজন চন্দকে হাজির করাব, পুরো মিটিং-এর ভিডিও আমাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করব।

ওয়েবসাইট তো তোমার হাতে নেই। এই কথা বলা মানে সব জেনে নিতে চাইছে প্রাক্তন আমলা নীলেশ দাস।   তা বুঝতে অসুবিধে হয় না অনলের। সে বলবে ততটাই, যতটায় তার কৃতিত্ব প্রকাশ করা যায়। নিজের মাথা উঁচা  রহে। সে বলল, আছে, সুজনদার কাছ থেকে পাসওয়ার্ড জেনে নিয়েছিলাম আপগ্রেড করব বলে, সে অনেক দিন  হলো, তিন্নি রায়ও আমাকে বলেছিল আপগ্রেড করে দিতে, আমি সেই পাসওয়ার্ড বদলে দিয়েছি, সুজনদা জানে না, তিন্নিও জানে না, খুলতে গেলেই নতুন পাসওয়ার্ড চাইবে। ডোমেইনের পেমেন্ট আমার কার্ড থেকে হয়।   তাও আমি তিন্নির কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলাম আপগ্রেডের কথা বলে। হাসতে লাগল অনল, আমি হাজার বছর রাজত্ব করার স্বপ্ন দেখি, যেখানে হাত দেব, শেষ দেখে ছাড়ব।

অজয় সান্যাল সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ‘হে পারামো’ বলে উঠল। হাসল অনল, বলল, আসলে স্বপ্ন অমনই দেখা উচিত, তারপর যতদূর যাওয়া যাবে যাব, আমি এসেছি একটা মিশন নিয়ে, মার্কিন সরকার আমাকে রাখতে চেয়েছিল, আমি থাকিনি, আমার টার্গেট আমার দেশ, যা করব দেশেই করব, ভবিষ্যতে দেখবে হয়তো আমিই  সংস্কৃতি মন্ত্রী, পার্টিতে না জয়েন করেও আদর্শ বিস্তার করা যায়।

নীলেশ বলল, তুমি করো, আমি আছি।

দেবু মাণ্ডি এত সময়ে কথা বলল, আগের বার কালীনগর, চাঁপাখালি, রেবন্তনগরের মানুষের খুব হেল্প হয়েছিল স্যার, এখনও বলে আপনাদের কথা।

নীলেশ বলল, দেবুকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম আম্ফানের পর।

ডাইরেক্ট দেওয়া হয়েছিল ?

না, দিয়েছিল আশ্রয়, আসলে কী নিতে হবে, কত নিতে হবে, এসব লিস্ট করেছিল মতিন, আমি সুজনবাবু আর দেবু আমার গাড়ি নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম, ভয়ানক অবস্থা ছিল সব। 

আশ্রয়ের কথা বলল সুজন চন্দও, আশ্রয় মানে সেই আব্দুল মতিন ?

হ্যাঁ, সেবার লাখ দেড়েক টাকার রিলিফ নিয়ে গেছিলাম, চাল, ডাল, আলু, তেল, লবণ, ওষুধ সব, মতিন লোকটা রিলিফ দিয়ে দিয়ে অভ্যস্ত, কী দিতে হবে জানে, সে বন্যায় রিলিফ নিয়ে যায় বছর বছর, হ্যাঁ, পানীয় জল নিয়ে গেছিলাম বড় বড় ড্রামে, পানীয় জলের অভাব ছিল নোনা জলে ঘেরা আইল্যান্ডগুলিতে।

নীলেশ এমনিতে বেশি কথা বলে না। অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না। কিন্তু হুইস্কি চাগাড় দেওয়ায় সে চাঁপাখালি, বুধনখালির অভিজ্ঞতা বলতে থাকে। আর মেক্সিকো, পেদ্রো পারামো বাদ দিতেও এসব বলতে থাকে। সে জীবনে কখনও রিলিফে যায়নি। জীবনে এক পয়সাও ব্যয় করেনি মানুষের ক্লেশ নিবারণে। চাঁদা দিয়েছে শুধু এলাকার পুজোয় আর অফিসের পিকনিকে। এই রিলিফের টাকা এসেছিল আমেরিকা থেকে। তার এক টাকাও যায়নি যখন  সে তো যাবেই। ফোকটে নাম হলো। তার ভেতরে একটা স্বপ্ন বুদবুদ কাটে, সে মার্কিন দেশে যাবে এই চেতনার রঙের মিটিং-এ। কিন্তু তা হবে কি না ধরা যাচ্ছে না। ঐ ভূতের গ্রাম যদি সত্যি হয় সে যাবে না। তাকে এখন অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষার মার নেই।

ঠিকঠাক সমর্থন পেলে এই অনলই তাকে বঙ্গ সম্মেলনে নিয়ে যাবে। অনল বঙ্গ সম্মেলনে চেতনার রঙের মেম্বার কি পাঠাতে পারবে না ? নীলেশের টাকা হয়েছে। সে ব্যাঙ্কক গেছে। আর দূরে যায়নি। ব্যাঙ্কক গিয়েছিল এক পার্টি মানে সরকারের কাজ উদ্ধারে আসা ঠিকাদারের টাকায়। এমন সব ভাবছিল নীলেশ। তিন্নি মেয়েটা খুব নীতিবাগীশ। রিলিফের খোঁজ নিত খুব। তারই ওয়াচম্যান সুজন চন্দ। ওরা থাকলে বঙ্গ সম্মেলনে যাওয়া, ফুর্তি করা, এসব কিছুই হবে না। নীলেশ বলল, ইয়েতে মানে বঙ্গ সম্মেলনে চেতনার রং থেকে যাবে নিশ্চয়ই।

কথাটা আমল দিল না অনল, দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল একই কথা, অনল বলল, আশ্রয়ের হাতে টাকা দেওয়া হলো, হিসাব নিয়েছিলে নীলেশদা ?

নীলেশ বলল, হিসাব সুজন চন্দ নিয়েছেন, আমি ঝড়ের পরে মানুষ কেমন থাকে নদী বাঁধের উপর তা দেখতে  গিয়েছিলাম, ওখানে নদীকে গাঙ বলে, মানুষ কী করে থাকে মাইরি।

অনল বলল, এবার হিসাব দিতে হবে আশ্রয়কে, এতদিন খুব পোদ্দারি করেছে পরের ধনে।

হিসাব নেবে, তোমারই সব, হিসাব দিতেই হবে, না মিললে সিবিয়াই, ইডি।

প্রতিটি পাই পয়সার হিসাব নেব, গরমিল হলে এফআইআর।

নীলেশ বলল, তাই তো হবে, বলছি এবার বঙ্গ সম্মেলনের সঙ্গে যোগাযোগ করো, তুমি পারবে, পেদ্রো পারামোর বংশধর, ভূতের গ্রামে সুজনদাকে পাঠাও, আমি লাস ভেগাস যাব, জুয়ো খেলে লাভ করব।

অনল বলল, সব হবে, একদিন অন্তর বোস্টন থেকে গুরুদাসদা কল করেন, ওঁরা জানুয়ারি থেকে লিস্ট করে করে আমন্ত্রণ জানাবেন, ওয়েট, দেখা যাক কী হয়, কিন্তু আশ্রয়ের মতিনের নাম্বার আছে ? একটু কড়কে দিতে   হবে।

মাথা নাড়ে নীলেশ, বলল, সে অনেক দিনের ব্যাপার, তারপরে দেওয়া হয়েছিল অক্সিজেন সিলিন্ডার, একুশ   সালে বোধহয়। ওই সময় আমার শাশুড়ি মারা যান অক্সিজেনের অভাবে।

কেন, অভাব হলো কেন, প্রচুর টাকা এসেছিল, ইন্ডিয়ান অক্সিজেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা ব্যবস্থা করেছিলাম অত দূর দেশ থেকে।

নীলেশ বলল, পাইনি, তাই, সব মতিন সাপ্লাই করেছিল, যেখেনে দরকার সেখেনে।

আপনার শাশুড়ি মারা গেল, আপনি অক্সিজেন দিতে পারেননি, দরকার ছিল না ? হয়তো অক্সিজেন পেলে বেঁচে   যেতেন।

নীলেশ বলল, উনি তো রানিগঞ্জ থাকতেন, সেখেনে মতিন কী করে দেবে ?

অনল মাথা নাড়তে লাগল, তাই তো, কিন্তু নয় কেন, মতিন এত সিলিন্ডার খরচ করল কীভাবে, তার হিসাব  হয়েছে ?

নীলেশ বলল, হিসাব আবার কী, সব অক্সিজেন বাতাসে মিশে গেছে।

অনল মাথা নাড়তে থাকে, ঠিক হয়নি, আপনি শাশুড়ি মাকে কলকাতায় এনে রাখেননি কেন ?

রেখেছিলাম, কলকাতায় তো মারা গেলেন শাশুড়ি মা।

অক্সিজেন ছাড়া ?

হ্যাঁ, গাড়িতে করে সন্ধে থেকে ঘুরছিলাম যে কোনও জায়গায় ভর্তি করাতে, পারিনি, অক্সিজেন দেওয়ার টাইম পেলাম কোথায় ?

আপনি হাসপাতালে সিট পেলেন না ?

না পাইনিই মনে হয়, উনি মরেই গেলেন সেই জন্য।

তখন দেবু মাণ্ডিও বলল, স্যার আপনার মনে নেই, গুলিয়ে ফেলছেন, এমন ঘটেনি।

তাহলে কী ঘটেছিল ? জিজ্ঞেস করল অনল। দেবু ছেলেটাকে তার খুব ভালো লাগছে। ইন্ডিয়ায় তার  নিরাপত্তারক্ষী হতে পারে দেবু। অনলের খুব ইচ্ছে একটা সিকিউরিটি গার্ড রাখে, সে পেদ্রো পারামোর বংশধর,  একটা গ্রামকে মৃতদের গ্রাম করে তুলতে চায়, কেউ কোনও কথা বলবে না, অন্ধকার ছাড়া বেরোবে না, নিরাপত্তারক্ষী থাকলে লোকের ভেতরে সম্ভ্রম জাগবে।

উনি তো বাড়িতেই মারা গেলো। দেবু বলল।

তুই ভুলে গেছিস, সারা কলকাতা গাড়ি নিয়ে চষে বেরালাম। মাথা নাড়তে লাগল নীলেশ।

সে অন্য একজনের জন্য হতে পারে। দেবু বলল।

অন্য একজন কে, বল সে কে ?

দেবু চুপ করে থাকে। এই তো সেদিনের কথা, এটা ২৫ সাল, সেইটা ২১ সালের কথা। চার বছর আগের কথা ভুলে গেল তার স্যার, নিজের শাশুড়ি বলে কথা। দেবু উঠে মাছ ভাজা আনতে গেল। যাদের ব্যাপার তারা বুঝুক, সে কথা বলবে না। অনুচিত। কে কীভাবে নেবে তা জানে না সে। কিন্তু অক্সিজেন পায়নি নীলেশ দাস।  কেন পায়নি, তাও জানে সে। পায়নি না নেয়নি ? অক্সিজেনের অভাব চলছিল দু মাস ধরে। চেতনার রঙের   অক্সিজেন আসা আরম্ভ করল নীলেশের শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর। চেতনার রং যখন অক্সিজেন বিলি করতে লাগল তখন স্যারের শাশুড়ি নেই। তার স্যার, নীলেশ দাস তার ফোনে চাহিদা নিচ্ছিলেন, মানে যাদের দরকার তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করছিল। তিনি দাম নিচ্ছিলেন অনেক টাকা। অথচ সব দেওয়া হচ্ছিল ফ্রি। বিনামূল্যে। ঐ সময় তার স্যার অনেক টাকা আয় করেছিল। কিন্তু তারপরই বন্ধ হয়ে গেল স্যারের যোগাযোগ। কেন তা দেবু আন্দাজ  করতে পারে, কিন্তু ভাবতেই ভয় হয়। স্যারের কীর্তি বুঝতে পেরেছিল অনেকে, বিশেষত সেই মতিন জানতে পেরেছিল। সেই সময় এই অনল স্যারের সঙ্গে তার স্যার নীলেশ দাসের খুব কথা হতে আরম্ভ করল। সন্ধের মুখেই  ভিডিও কল হতো। দেবু সব লক্ষ করে। সব বোঝে। তার আশ্রয় এখানে। তা খোয়া যাক, তা চায় না সে। যেটুকু  বলেছে, না বললেই ঠিক হতো। অনল বলল, নীলেশদা, তোমার শাশুড়ির জন্য তুমি হসপিটালে বেড পেলে না, মরে গেল ?

নীলেশ বলল, না, হাসপাতালের ব্যাপার নয়, বয়স হয়েছিল, গেছেন, না গেলে টাকা পয়সা নষ্ট করতেন শুধু,  সম্পত্তির ভাগ নিজের দেওরপো না ভাইপোকে দেবে বলে ফন্দি করছিল, তাই বলতে পার নর্মাল ডেথ, আমি   অবশ্য অনেক কথাই ভুলে যাই করোনার পরে।

তোমার হয়েছিল নাকি ?

হয়েছিল, তবে তার কোনও চিহ্ন ছিল না বাইরে, অ্যাসিমটোমেটিক, শাশুড়ির সময় সকলে টেস্ট করেছিলাম তো।

আচ্ছা, এবার বলো তিনি মারা গেলেন কেন ? যেন জেরা করছে অনল চৌধুরী, হসপিটালে বেড পেলে না, তা কি  সত্যি নয় ? দেবুর কথা ঠিক ?

দেবুর কথা হয়তো ঠিক, নাহলে আমি কেন বেড পাব না আমার শাশুড়ির জন্য, তিনি বাড়িতেই মারা গেলেন, তবে অক্সিজেন থাকলে হয়তো বেঁচে যেতেন।

অনল আবার এক কথা জিজ্ঞেস করল, কোনটা ঠিক, ওই দেবুর কথা না তোমার কথা ?

নীলেশ বলল, দেখো ঠিক বেঠিক ব্যাপার দিয়ে কী হবে, অক্সিজেন সাপ্লাই আমার হাত থেকে নিয়ে নিল তোমার তিন্নি, তুমি ওকে একেবারে হটিয়ে দাও, সকলকে টেনে আনো এখেনে, পেদ্রুনগরে আবার মিটিং হোক।

ইয়েস নীলেশদা, তাই হবে, তোমাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করে দেব, তুমিই সব হবে, সুজনদার নাম মাথায়  থাকবে কিছু সুবিধের জন্য।   

নীলেশ বলল, দরকারে ওকেও হঠাতে হবে, অন্য কোনও সেলিব্রেটিকে প্রস্তাব দাও, সুজন চন্দ পুরোপুরিই   তিন্নির লোক, আমার পছন্দ হয় না লোকটাকে, খুব চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে, নীতি মাড়ায়, অমন কত লোককে   সার্ভিস পিরিয়ডে শেষ করে দিয়েছি।

অনল বলল, সে তো জানি, সেই জন্য তোমাকে ভরসা করি নীলেশদা, কিন্তু তিন্নিকে হটাতে সুজনকে আমার চাই, দ্যাখো নীলেশদা, অনেক ভেবেচিন্তে এগোচ্ছি, সকলেই জানে এটা তিন্নির সংস্থা, ভুলটা ভাঙ্গাতে হবে, বোঝাতে হবে তিন্নির কথা সব মিথ্যে, আমার কথাই সত্যি, আম্ফানের সময় আমিই সাহায্য করেছি, অক্সিজেন সিলিন্ডার আমিই দিয়েছি।

অবশ্যই তুমি দিয়েছো, এটা তিন্নির না, তোমার, তুমিই ফাউন্ডার, সকলে মিলে বলবে, তুমিই সব, যা করেছো, তুমিই করেছো, ঐ আমেরিকান লেডি কিছুই না, বরং দেশের ক্ষতি করেছে, অক্সিজেন পাঠাতে চাইছিল না সে,  তুমিই পাঠিয়েছিলে, দেশের কথা তুমিই ভেবেছো, ফেসবুকে লিখে দিতে হবে, ফলোয়াররা তোমার কথা শেয়ার করবে, ভালো রকম প্রচার করতে হবে, তিন্নিকে একঘরে করে দিতে হবে। 

আহ, আমি নিশ্চিন্ত হলাম, তিন্নি একটা কাঁটা, ছেঁটে ফেলে সুজনকে দলে এনে, শেষে ওঁকেও ছেঁটে দেব, অন্য  সেলিব্রেটিকে তুলব, পদ্মভূষণের  ব্যবস্থা  করব, যা যা অ্যাওয়ার্ড আছে, সব ব্যবস্থা করব, প্রস্তাবক চেতনার রং, ওয়েট, বুঝতে পারবে অনল চৌধুরী কী চিজ, অনল চৌধুরী পেদ্রো পারামোর বংশধর কি না।

অনলের কথা শুনতে শুনতে নীলেশও ভাবছিল এতদিনে অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে যে বদনাম দিয়েছিল সুজন চন্দ আর তিন্নি রায়, তা সাফ হবে, উলটে ওদের বুঝিয়ে দিতে হবে, নীলেশ কতটা কী পারে। তারা হুইস্কিতে চুমুক দিচ্ছিল উল্লসিত হয়ে। সে নিজেই যেন পারামোর বংশের মানুষ। অনলের মতো একটা নাম নেবে,   ভূমিকম্প, সুনামি, প্লাবন, অনাবৃষ্টি, খরা…।

ছয়

দেবু মাণ্ডি সাঁওতাল জনজাতির যুবক। তার পূর্বপুরুষ পশ্চিমের পাহাড়ের দেশ থেকে দক্ষিণে সুন্দরবন অঞ্চলে   এসেছিল জঙ্গল হাসিল করে জমি উদ্ধার করতে। তারপর রয়ে গেল ঐ উপকূলাঞ্চলে, দ্বীপাঞ্চলে। দেবু স্বাস্থ্যবান,  তার গায়ের রঙে বনের সবুজের আভাস আছে। মাথায় ঘন কুঞ্চিত কেশ। প্রশস্ত বুক, চওড়া কাঁধ। তার দেহে  লাবণ্য আছে। শহরে এসে ভালো খাদ্য পায় তো। সে ভাজা মাছ নিয়ে এল, সঙ্গে ফ্রায়েড চিকেন। নিঃশব্দে  তাদের সামনে নামিয়ে দিল। তারপর দূরে গিয়ে বসল। দেবু মাণ্ডি সব জানে। নীলেশ স্যারের শাশুড়ি মরে গিয়ে   স্যারকে সব কিছু দিয়ে গেছে। বুড়ির ছেলে নেই। একটাই মেয়ে। কিন্তু বুড়ির ভাইপো পিসির কাছে আসত। ফিরে   যেত, আসত। বুড়ি তাকে অর্থ সাহায্য করত। ভাইপোর চাকরি চলে গিয়েছিল করোনার প্রথম ঢেউয়ে। চাকরি যাওয়ার পর থেকে পিসি টাকা দিত। দেবে না কেন, টাকা জমিয়ে রেখে বাচ্চা পাড়িয়ে লাভ কী ? সেই ভাইপো আসানসোল না দুর্গাপুরে কোন একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করত। রানিগঞ্জ কাছেই। সুতরাং পিসির কাছে যাওয়া  সহজ ছিল। দেবু এসব জানে। তারপর কী হলো ? তাও জানে দেবু। এখানে থেকে সে এমন কথা জানে, যা আর  কেউ জানতে পারে না। তখন খুব ফোনে কথা হতো। করোনা চলছে, লকডাউন, লকডাউন উঠল কিন্তু তত সময়ে  ভয় আরও চেপে বসেছে। মানুষ ঘর থেকে বেরোত না। দেবু তার বাড়ি হাসনাবাদের ওপারে বুড়নখালি ফিরে যাবে  বলেছিল, কিন্তু স্যার যেতে দেয়নি। স্যারের বাজারঘাট তাকে করতে হতো। রান্নার লোক ক মাস ঢুকতে পারছে  না, দেবু রান্না করছে। দেবু ঘর মুছছে। ওয়াশিং মেশিন চালাচ্ছে। বলতে গেলে সে-ই সব। তখন গিন্নি মা এখেনে। এখেনে ছিল মানে ছেলের কাছে যেতে পারেনি, আটকা পড়ে গিয়েছিল। সেই সময় মায়ের সঙ্গে খুব কথা  হতো। কথা হতে হতেই জানতে পারল তার মামাত ভাই টাকা নিচ্ছে মায়ের কাছ থেকে। মা স্কুলের টিচার ছিলেন। পেনশন অনেক। বাবা সরকারি চাকরি করতেন, তিনি মারা যেতে মা ফ্যামিলি পেনশন পায়। সুতরাং মা  নিজের টাকা দেয় ভাইপোকে। এতে গিন্নি যত না, তার হাজব্যান্ড, মায়ের জামাই রেগে গেল খুব। নীলেশ স্যার  টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না। টাকা যে কী করবে জানে না, ফ্ল্যাট কিনেছে বাইপাস আর নিউটাউনে, দুটো। পড়ে  আছে। দুজন লোক তিনটে ফ্ল্যাটে করবে কী ? যাই হোক শাশুড়ি তার ভাইপোকে টাকা দেয় শুনে, করোনা  ক’দিনের জন্য কমলে নীলেশ স্যার গাড়ি নিয়ে রানিগঞ্জ গেল। শাশুড়িকে নিয়ে এল। গাড়ি চালিয়েছিল দেবু। দেবু সব জানে। তারপর থেকে সেই বুড়ি এখেনেই ছিল। তার ভাইপো এল কয়েকবার, বিফল মনে ফিরে গেল। টাকা-পয়সা সব নীলেশ স্যার হ্যান্ডেল করত। বুড়ি টাকা চাইলে বলত, কী লাগবে বলো মা, দেবুকে দিয়ে এনে দিচ্ছি, কী খেতে চাও বলো। ভাইপো আসা বন্ধ করল। একদিন বুড়ি তার মেয়েকে বলল, হাবল খুব আতান্তরে পড়েছে, ওরে মাসে দু হাজার করে দিতাম, আবার দেব, জামাইরে বলো।

মেয়ে বলল, হাবল সুযোগ নিয়েছে, ওকে একদম দেবে না টাকা, টাকা কি সস্তা, আয় করতে কষ্ট হয় না ?

মা বলল, না হয় না, তোর বাবার পেনশন আমাকে দেয় কেন, আমি তো পেনশন পাই।

দেয়, বাবা বড় চাকরি করত বলে দেয়, হাবলকে আমি আসতে বারণ করে দিয়েছি।

 দেবু বুঝেছিল বুড়ির অনেক টাকা। অনেক গয়না। রানিগঞ্জের দোতলা বাড়ি বুড়ি তার ভাইপোকে দেবে  বলেছিল। তা নিয়ে খুব টেনশন হয়েছিল মেয়ে জামাইয়ের। শেষে আবার করোনার ঢেউ এল। তা লাগল এসে  বুড়ির গায়ে। শাপে বর হলো। সময় লাগলেও বুড়ি মরল। দম আটকেই মরল। বাতাস পেল না। বুড়ি মরে গিয়ে স্যারকে নিরুদ্বেগ করে গেল। মেয়ে কাঁদল বটে। সে কাঁদতে হয় তাই কাঁদল। অক্সিজেন ইচ্ছে করেই আনেনি স্যার। টাকা দিলে কলকাতায় বাঘের দুধও পাওয়া যায়। হাঁসফাঁস করতে করতে, জলের মাছ ডাঙ্গায় যেমন করে,  তেমনি খাবি খেতে খেতে মরল ঠাকুমা। দেবু তাকে ঠাকুমা বলত। সব চোখে দেখেছে দেবু। এখনও চোখে   দেখছে। চুপ করে বসে দুজনের নেশা করা দেখছে। যেন জলের ঢেউ দেখছে। দেবু বুড়নখালির রায়মঙ্গল নদীর ঢেউ যেন। জলের সঙ্গে বাতাসের ঢেউ, যে বাতাস পায়নি বুড়ি, সেই বাতাসের ওঠা আর নামা। দেবু দুজনের  রোষ দেখছে। নীলেশ বলল, তিন্নি আর সুজন চন্দ আমার শাশুড়ির মৃত্যুর জন্য দায়ী, অক্সিজেন দিল না।

তুমি কি ওদের দয়ায় বাঁচো। লম্বা স্বাস্থ্যবান অনল চৌধুরী বলল, অক্সিজেন দিল না, ছেড়ে দিলে নীলেশদা ?

তখন অবশ্য খুব অমিল অক্সিজেন সিলিন্ডার, বাজারে খুব দাম, ওরা সেই মতিনকে নিয়ে কাজ করছে, আমি বললাম, মতিন বলল, স্টক খালি হয়ে গেছে স্যার, আবার পাই দেব। 

তারপর ?

তারপর আর কী, আমি বললাম কত লাগবে বলো, সে বলল, সব তো ফ্রি ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য, কালেক্ট  হচ্ছে আর পাঠিয়ে দিচ্ছি পেশেন্টের কাছে।

অনল বলল, তুমি দাদা ছেড়ে দিলে, আমি হলে তখনই ওকে হটিয়ে দিতাম, এবার প্রথমেই আশ্রয়ের কাছে  হিসাব চাইব, না মিললে এফআইআর, ইডি লেলিয়ে দেব, সিবিয়াই লেলিয়ে দেব, আমার সে ক্ষমতা আছে।

জানি তোমার তা আছে, তুমিই ভরসা, আমি সেই অপমানের শোধ নিতে চাই।

দুজনে উল্লাস করতে লাগল হুইস্কির ঢেউ অনুভব করতে করতে। দেবু মাণ্ডিও মনে মনে হাসে। অক্সিজেন না পেয়ে খুশিই হয়েছিল স্যার। হাসপাতালে দিলে বেঁচে ফিরত বুড়ি। কিন্তু দেয়নি সেই ভয়েই। রানিগঞ্জের বাড়ি দেড়  কোটি টাকায় বিক্রি করেছে। টাকার পাহাড়ে বসে আছে। কিন্তু কোনও টাকা ঘরে নেই। সব নগদ ছাড়া লেনদেন হয়। দেবুও তা শিখে গেছে। টাকা আছে কিন্তু তা চোখে দেখা যায় না।

দেবু, লাঞ্চের ব্যবস্থা কর, ভালো নেশা হয়েছে আজ।

দেবুর মনে হয় উঠবে না। তার মনে পড়ছিল সেই হাবলের কথা। হাবল বলত, কখন জামাইবাবু থাকে না বল  দেখি।

চাকরি থেকে রিটায়ার করেছে, এখন যাবে আর কোথায়, আর আমি তো তাই ডাক্তারের গাড়ি চালাই, জানতে  পারি না কখন বের হয়।

এসব করতে করতে বছরের শেষে, শীতের সময় বুড়িঠাকুমাকে করোনায় ধরল। দেবু বলেছিল হাসপাতালে  নিয়ে যেতে। দাদাবাবু দেয়নি। আলাদা ঘরে ফেলে রেখে মেরে দিল। বুড়ির মেয়ে মানে স্যারের বউ কিছু করতে  পারল না। মা মরতে ছেলের কাছে গিয়ে থাকা অভ্যেস করল। ওই রোগে মরেছে যেমন, বেঁচেছে তার শত শতগুণ।

অনল জিজ্ঞেস করল, ঐ হ্যান্ডসাম ম্যান দেবু কে ?

ড্রাইভার, আমার রাইট হ্যান্ড, সুন্দরবনে বাড়ি।

রিলিফ নিয়েছিল ?

দেবুই উত্তর দিল, নমস্কার স্যার, আমি এখেনে থাকি, রিলিফ পাব কেন ?

অনল বলল, তোমাদের গ্রাম ?

দেবু বলল, পেয়েছিল, তবে বিডিওর রিলিফ।

অনল জিজ্ঞেস করল, আমরা দিইনি ?

দেবু বলল, ন্যাজাট-কালীনগরের দিকে পেয়েছিল, আমরা দেখতে গিয়েছিলাম।  

অনল বলল, তোকে আমার কোম্পানিতে নিয়ে নেব, শুধু বলবি তোর গাঁয়ে যাবে বলেছিল, যায়নি।

দেবু বলল, ফলস দেব ?

অনল হাসল, আরে বেটা ফলস কী রে, আমি যা বলব, তাইই সত্যি, ভালো কাজের জন্য ফলস দিতে হয়।

দেবু বলল, বলা যাবে স্যার, তার বদলে আমার কী হবে ?

যখন দেবু আর অনলে কথা হয়, তখন নীলেশ গেছে টয়লেটে। আরাম করে শরীর হালকা করতে করতে তার মনে হয়, অনল এবার যাক। সে পত্রালিকে ডাকবে ফ্ল্যাটে। গল্প করবে। দেবু তখন তার সারভেন্ট’স রুমে দরজা   দেবে। এইসব ভাবতে গিয়ে নেশা আরও বেড়ে গেল। টয়লেট থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে ফোন করল পত্রালি গুহকে। আলাপ হয়েছিল কোনও এক পার্টিতে। পত্রালি তার ফোন ধরল না। এই তার অভ্যেস। ফোন ধরে না।   সময় বুঝে একা হয়ে রিং ব্যাক করে। বিয়ে করেনি। স্বাস্থ্যবতী স্কুল টিচার। তাকে প্রায়ই ডাকে তার বাড়িতে। নীলেশ যায় না বললে ভুল হবে। যায় তবে খুব কম। উজ্জ্বল শ্যাম। হুইস্কি খেতে ভালোবাসে। কেন বিয়ে করেনি ঈশ্বর জানেন। হয়তো করবে শিগগির। নীলেশ অপেক্ষা করতে লাগল পত্রালির ফোনের জন্য। তখন দেবু হাঁটু মুড়ে  বসেছে অনলের সামনে। অনল বলছে, যা বলব, তাই করবি তো ?

দেবু বুদ্ধিমান, এতক্ষণ সব শুনে অনলকে বুঝে গেছে। মাতালের কথা কথাই নয় তা অনলের ক্ষেত্রে খাটবে না, অনল মানে আগুন, সে বলল, ইয়েস স্যার।

তুই আমার পেদ্রুনগরে চ, আমার গাড়ি চালাবি, আমার প্রোজেক্ট ম্যানেজার হবি, এমন মাছ ভাজা দিয়েছিস ভোলা যায় না।

দেবু বলল, ইয়েস স্যার, আমাকে ছুটি নিতে হবে।

কেন ছুটি নিতে হবে কেন ?

দেবু বলল, আপনার কাছে যাব তো এখেনে কে থাকবে ?

কেউ না, তোকে আমার পছন্দ হয়েছে, নীলেশদা কত নেবে বল দেখি। দেবুর গায়ে হাত বুলোয় অনল, বাইসেপ টিপে টিপে পরখ করে। 

কিসের জন্য কত নেবে ?

কেন তোর দাম নেই, এমন ষণ্ডামার্কা জোয়ান, তার দাম অনেক হবে, আমি ফ্রিতে কোনও কাজ করি না।

দাম অনেক হবে ? দেবু ভ্যাবলা মেরে গেল। বলল, আমার আর কত দাম, দাম নেই স্যার, মানুষের কি দাম আছে, আর আমার মতো খেটে খাওয়া মানুষের, এল না গেল তাতে কাউর কিছু যায় আসে না।

আছে, দুনিয়ার সব কিছুর দাম আছে, নীলেশদাকে জিজ্ঞেস করব কতয় ছাড়বে।

দেবু মাণ্ডিও বুঝতে চেষ্টা করল এই আমেরিকা থেকে আসা লোকটা আসলে কী বলতে চেয়েছে। আমেরিকা সে  জানে। জানে মানে ইতিহাস ভূগোল বইয়ে পড়া। দেবু এইট অবধি পড়েছে। আমেরিকা ঠিক ইন্ডিয়ার উলটো দিকে। এখন এখানে দিন চলছে, সেখানে রাত চলছে। দিন শুরুই হয়নি। আর আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের   মেরে ফেলে শাদা মানুষ দখল নিয়েছিল ঐ দেশের। আফ্রিকা থেকে দাস নিয়ে গিয়েছিল সে দেশে। কালো মানুষ। আব্রাহাম লিঙ্কনের কথা সে পড়েছিল। দেবু ব্যালকনির দিকে তাকায়। সেখানে পত্রালির ফোনের জন্য নিজের  হাতের অ্যান্ড্রয়েড ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে নীলেশ দাস। এখন পত্রালির জন্য আকুল হয়ে উঠেছে সে।   অনলকে দেবু খাইয়ে দিক। অনল ডাকল, নীলেশদা গেলে কোথায় ?

নীলেশ উত্তর দেয়, ফোন এসেছে রে।

দেবুর দাম কত ?

তুই নিবি, দেবুকে নিবি ?

না নিলে দাম জিজ্ঞেস করব কেন ?

নীলেশ বলল, বাজারে খোঁজ করে দেখি, দাম কম হবে না, তুই কত দিবি বল অনল।

নীলেশ ব্যালকনিতে, অনল ডাইনিং-লিভিং হলে সোফায়। দুজনের ভেতরে দরাদরি চলতে লাগল। দেবু ডাইনিং টেবিল সাজাতে লাগল। বিরিয়ানি, মাটন, চিকেন, চিংড়ি। বিড়বিড় করতে লাগল, কত হতে পারে, ডলার না রুপি ? আমেরিকা মানে ডলার। দামটা কে নেবে, নীলেশ দাস না সে ? নীলেশের কোনও পর্চা-দলিল আছে যে  দাম সে নেবে ? টাকা ভালোবাসলেই হলো ? তার নামের পর্চা খতিয়ান কার কাছে ? রেজিস্ট্রি করে নেবে ?

সাত

তিন্নি রায়, চল্লিশের কাছাকাছি, জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক, একদিন হোয়াটসঅ্যাপ কল করল সুজন চন্দকে। সে সুজন চন্দের খুব অনুরাগী। তাঁর নাটকের তাঁর সিনেমার। তিন্নি  বলল, সুজনদা, আমি আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেব, কলকাতার চিত্রপট ছাপবে, আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, আপনার সত্তর বছর পালন করবে ওরা।

ঠিক আছে নিও, প্রশ্ন তৈরি  রো।

ওরা কি যোগাযোগ করেছে আপনার  সঙ্গে ?

সুজন বললেন, একদিন ফোন করেছিল বিজন সেন, বলল, একটা সংখ্যা করবে।

তিন্নি বলল, হ্যাঁ, নানাজনকে দিয়ে লেখাচ্ছে আপনার উপর, ভালো সংখ্যা হবে, আমি যাব পত্রিকা প্রকাশের  সময়, অনেক দিন তো যাইনি দেশে, আচ্ছা, অনল চৌধুরীর খবর কী ?

সুজন বললেন, ভালো নয়, ও পেদ্রুনগরে পাকাপাকি ফিরেছে বলছে।

তারপর সুজন সবই বললেন এক এক করে। তিন্নি চুপ করে থাকে। সুজন বললেন, আমি এটা মেনে নিতে পারব না তিন্নি, দিস ইজ আওয়ার অর্গানাইজেশন, সে তার চেহারা বদলে দিতে যাচ্ছে।

তিন্নি বলল, আমাদের ভেতর অনল তো আছে, মানে ছিল, ও যা করছে জানায়নি তো, আপনার মত নিয়েছে ?

না, নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, দ্যাখো তিন্নি, আমার মনে হচ্ছে ও এটা দখল করে নিচ্ছে।  

তিন্নি প্রশ্ন করতে লাগল। সুজন জবাব দিতে লাগলেন। এই ভাবে তিন্নি সুজন চন্দর কথা বুঝে নিতে থাকে। তারপর সে অন্য সদস্যদের কথা জিজ্ঞেস করল। সুজন বললেন, তিনি জানেন না তারা কী ভাবছে, তবে অনল এতদিনে রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছে মনে হয়, নিজে সেক্রেটারি হয়েই করছে, আমাকে গৌর বলেছে।

তিন্নি আবার চুপ করে থাকল। ভিডিও কল করেছিল, তার মুখ অন্ধকার হয়ে এসেছে তা দেখতে পেলেন সুজন। একটু চুপ করে থাকল, তারপর জিজ্ঞেস করল, আমরা আপত্তি জানাতে পারি না ?

আমরা তো রেজিস্ট্রি কবে হলো জানতেই পারলাম না, এখন কে শুনবে আপত্তি ?

তিন্নি বলল, ও সত্যি নিয়ে নেবে ? 

সুজন চুপ করে থাকেন। তিন্নি বলল, সে লিগাল অপিনিয়ন নেবে, নিজেরা কত কাজ করেছে আম্ফান আর ইয়াসের ঝড় ও মহামারির সময়, তা মিথ্যা হয়ে যাবে ? বলতে বলতে অনেক কথা বলল তিন্নি, তারপর জিজ্ঞেস করল, ও ভালো লোক নয়, এখান থেকে বের করে দিয়েছে, মার্কিন সরকার ভিসা রিনিউ করেনি।

সে অনেকেরই করেনি, কিন্তু একটা কথা সত্যি আমরা ওকে বুঝতে পারিনি। সুজন জবাব দিলেন।

আমি বুঝেছিলাম সুজনদা, আমি চাইনি ওকে রাখতে, কিন্তু ও রয়ে গেল, অনেকটা আপনার জোরেই, ও বলেছিল সমস্ত টাকা পয়সা ও ডিল করবে, আমি না করেছিলাম, ও আরও কিছু করতে চেয়েছিল, আমি আটকেছি,  ওকে ইন্ডিয়াতেও আটকাতে হবে।

সুজন বললেন, আমি তো বুঝতে পারিনি, বয়স হলে রিফ্লেক্স কমে যায়, তাই হয়তো।

তিন্নি বলল, না সুজনদা, আসলে আপনার সিমপ্লিসিটির সুযোগ নিয়েছে ও, এর আগেও তো এমন হয়েছে  আপনার। আপনাকে বরুণ সান্যাল ত্যাগ করেনি ? অথচ বরুণের হয়ে আপনি কত বলেছেন, আমরা কি জানতাম না, বরুন আপনার স্নেহধন্য, বরুণকে আপনি রেফার করেছেন কত জায়গায়।

সুজন বললেন, যেখানে গেলে সুযোগ বেশি পাবে, সেখানে গেছে, কিন্তু তেমন সুবিধে করতে পারছে কি ?

তিন্নি বলল, সে তার ডেডিকেশন নেই বলে, কিন্তু ঘটনা তো সত্য, আপনাকে ঠকাতে লোক বসে আছে।

সুজন চুপ করে থাকলেন। মাঝেমধ্যে বিষণ্ন লাগে। অনেকেই তাঁকে পরিত্যাগ করেছে। আবার ভবিষ্যতে  পরিত্যাগ করতে পারে, এমন কেউ কেউ এসেছে। তাঁরও বয়স হয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ে মাথা ঘামালে হবে না। নিজের কাজটি করে যাওয়ার ভেতরে তৃপ্তি আছে। লোভীদের সঙ্গে হাত মেলানো মানুষের কাজ নয়।

তিন্নি রায় তারপর বলল, সে দেশে ফিরবে, মানে মাস দুইয়ের জন্য ফিরবে, যখন সুজনের সত্তর হবে, সেই সময়, চিত্রপট প্রকাশিত হবে, অনেকের সঙ্গে দেখা হবে।

সুজন আর তিন্নির আরও কথা হলো। তিন্নি বলল, সুজন যেন শান্ত থাকেন। সে আবার ফোন করবে। এখন দেখবে যদি অনল থাকে অনলাইন, সে ওকে অডিও কল করে কুশল নেবে, যেন সে কিছুই জানে না। 

তিন্নি রায় এরপর অনল চৌধুরীকে অডিও কলে ধরল। অনল বলল, কেমন আছো তিন্নি, আমি তোমাকে কল করতাম, তোমার মতামত দরকার, অন্তত জানা দরকার চেতনার রং ভবিষ্যতে কী করতে যাচ্ছে। 

তিন্নি জিজ্ঞেস করল, দেশে গিয়ে সে কী করছে। অনল বলল, তেমন কিছু না, সব এখন পরিকল্পনার স্তরে   আছে। এমনি কথা হতে হতে অনল তার পরিকল্পনা কী তার আন্দাজ দিল তিন্নিকে। সুজন চন্দকে সে পদ্মভূষণ  দেবেই, চেতনার রং রেজিস্টার্ড, চেতনার রঙ প্রস্তাব পাঠাবে ভারত সরকারের কাছে, দাদা সায়েব ফালকেও টার্গেট আছে, এর আগে ভারতের তিনটে শহরে সংবর্ধনা দেবে, পরিকল্পনা কেমন ?

তিন্নি জিজ্ঞেস করেছে, সুজনদা এসব জানেন ?

হ্যাঁ তিন্নি, জানেন, আমার তোমার দায়িত্ব ওকে রাজি কর নো, না করেননি অবশ্য, রাজি হয়ে যাবেন, লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট প্রাইজ দেব আমরা, দশ লাখ টাকা প্রাইজ মানি, দ্যাখো তিন্নি আমি আগে ফেলিসিটেট করতে চাই সত্তর বছরের জন্মদিনে, অনুষ্ঠানটা রবীন্দ্রসদন হলে করব, ইউনিয়ন মিনিস্টার, স্টেট মিনিস্টার, মুম্বই আর্টিস্ট, টালিগঞ্জের অ্যাক্টর, ডিরেক্টর সকলকে নিয়ে আসব, তুমি এস কলকাতায়, এক অনুষ্ঠানেই চেতনার রঙ বিখ্যাত হয়ে যাবে, ডোনেশন আসবে।

তিন্নি শান্ত গলায় বলল, সুজনদা এই সংস্থার সভাপতি, তিনি এই সংস্থার কাছ থেকে সংবর্ধনা নেবেন, তা কি ভালো দেখাবে, চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন, প্রেসিডেন্টকে টাকা দেওয়া হবে, তা হয় ?

টাকা অলঙ্কার জুয়েলার্স দেবে, আমার কথা হয়ে গেছে।

এটা সুজনদার সব খ্যাতিকে ধ্বংস করে দেবে, তার একটা শ্রদ্ধার জায়গা আছে।

ওসব তোমরা ভাবো, পাবলিক ভুলেও যাবে কে প্রস্তাবক, উনি যোগ্য, কাজটা হবে।

তিন্নি বললো, আপনি সব সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছো, আমাকে বলছো কেন ?

অনল বলল, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি কি, তুমি আমাদের সঙ্গে আছো, ইউএসএ পার্ট-এর সেক্রেটারি, সকলকে  না জানিয়ে কাজ হয় না, গণতান্ত্রিকভাবে সব কিছু হবে।

তিন্নি বলল, এতে আমার মত নেই, সুজনদাও মত দেবেন বলে মনে হয় না, আর আমাদের অর্গানাইজেশনের  কি ইন্ডিয়ান পার্ট, ইউএসএ পার্ট আছে, আলাদা আলাদা সেক্রেটারি, আমি তো এমন করিনি।

এটা এবার করলাম, এখানকার সকলে ইয়েস করল, খারাপ তো কিছু হয়নি।

তিন্নি বলল, খারাপ হয়েছে অনলদা, আপনি কোন পদাধিকার-বলে এসব করলেন ?

যা করেছি লিগ্যালি করেছি, যেমন তোমার, তেমন আমারও সংস্থা এটা। লুকোনো দাঁত-নখ এত সময়ে বেরিয়ে  এল অনলের, আমি সুজনদাকে ফেলিসিটেট করব, তাতেও তোমার আপত্তি, তুমি ভেবে দ্যাখো, তুমি কি ওঁর যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করো ?

চিত্রপট পত্রিকার জন্য আমি ওঁর সাক্ষাৎকার নিচ্ছি, ওরা সুজনদার উপর একটা সংখ্যা করবে।

চমৎকার, আমরা স্পন্সর করব ঐ সংখ্যা, আমরা বিজ্ঞাপন দেব চেতনার রঙের, সংবর্ধনার কথা জানাব, আমাদের মানপত্রের লেখাটা ওখানে ছাপা হলে, বিনিময়ে কভার আর্টিস্টের রেমুনারেশন দিয়ে দেব। 

তিন্নি কঠিন গলায় বলল, না।

না কেন ? অনল জানে তিন্নি না বলবে, তবু সে বিস্ময় প্রকাশ করল, তোমার দোষ সব বিষয়ে না বলো কেন, এটা খারাপ কী হচ্ছে ? 

খারাপ ভালো পরের ব্যাপার, এই কাজ ঠিক হচ্ছে না অনলদা।

অনল বলল, সে আমি বুঝব, কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক, আমি জানি।

তিন্নি বলল, আপনি যা জানেন, ভুল জানেন, মন্ত্রীকে ধরে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, এটা কি সম্মানের ?

হাসল অনল, কে জানছে সেসব, দ্যাখো এসব করতে হয়, ঘরে বসে থাকলে কিছুই হবে না, আরে নোবেল প্রাইজের জন্য ইংল্যান্ড যেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে, তাতে কি তাঁর মহিমা কমে গেছে ? 

তিন্নি বুঝল তর্ক করে লাভ নেই। সে লাইন কেটে দিল। সকালটা বিস্বাদ হয়ে গেল তিন্নির। কিন্তু সব বুঝে গেল। তিন্নির হাজব্যান্ড সুপর্ণ বলল, হয়তো সুজনদা আপত্তি করেননি, হোক না, দেখা যাক ও পারে কি না। তিন্নির  মনে হলো না তা। তার বিশ্বাস সুজন চন্দ এর বিপক্ষে। তিন্নি রাইটিং টেবিলে বসে সুজনদার জন্য প্রশ্ন সাজাতে   থাকে।

তিন্নি : আচ্ছা সুজনদা, আপনাকে দেশের সরকার সেইভাবে সম্মানিত করেনি, এ বিষয়ে আপনার অভিমত ?

সুজন : সরকার যতদিন না দেয় ততদিন নিশ্চিন্ত। আমি নিজের মতো কাজ করে যেতে চাই।

তিন্নি : সরকার বলছে, সরকারের কাজের সুখ্যাতি করে নাটক প্রোডিউস করতে, বললে আপনি করবেন ?

সুজন : মনে হয় না, এমন প্রস্তাব কি আগে আসেনি, না বলতে পেরেছি।

তিন্নি:  আপনি কি নতুন কোনও প্রস্তাব পেয়েছেন ?

সুজন : পেয়েছিলাম, রাজি নই, আমি সব রকম আগ্রাসনের বিপক্ষে, প্রত্যাখ্যান  করেছি।

তিন্নি : আগ্রাসন বলতে কী বোঝেন ?

সুজন : আমরা যে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়েছিলাম।

তিন্নি : আপনারই সংস্থা আপনাকে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট দিচ্ছে শুনলাম।

সুজন : সে তো তোমার সংস্থা, জালিয়াতি করে নিয়ে নিয়েছে। আমি রিফিউজ করেছি, ঐটা আমার সংস্থা নয়।

তিন্নি নিজেই প্রশ্ন এবং উত্তর লিখতে লিখতে শান্ত হতে লাগল। সে উত্তরগুলো লিখছে বটে, কিন্তু প্রশ্নই  পাঠাবে সুজন চন্দকে। উত্তর এলে মিলিয়ে নেবে। কথাটা মনে হতে মুখে স্মিত হাসি জেগে উঠল। সে কি  অ্যাস্ট্রোনমির প্রশ্ন তৈরি করছে ? আজি যত তারা তব আকাশে, সবে প্রাণমন ভরি প্রকাশে। খুব শীঘ্র চেতনার রঙ-এর মিটিং করতে হবে, অনলাইন, তিন্নি সকলকে ডাকবে, অনল, নীলেশ, গৌরচন্দ্র, অমিতাভ, পায়েল, দোয়েল, আয়েশা সকলকে। তখন কল এল অনলের, হ্যালো, তিন্নি, ফোন কেটে দিলে, কথা শেষ হয়নি।

তিন্নি বলল, আমার শেষ হয়ে গেছে, আপনি যা করছেন করুন, কিন্তু তা অন্য নামে করুন।

অন্য নাম মানে ?

এই নামটা আমার দেওয়া, এই সংস্থা আমার করা, আমার একটা মিশন আছে, আপনি তা বদলে দিতে পারেন  না।

অনল বলল, বুঝলাম না, তুমি নাম দিয়েছো মানে ?

চেতনার রঙ, বুঝতে পারছো না ?

এ তো রবি ঠাকুরের কবিতার লাইন, আমার চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, আমি বলেছিলাম এই নামটা  দিতে, ভুলে গেছো ?

তিন্নি কল কেটে দিল। একটা লোক এমন অকপট মিথ্যে বলতে পারে ?

আবার ফোন বাজল, তিন্নি বলল, কী ব্যাপার বলুন তো, বারবার ফোন করছেন।

তুমি পেদ্রো পারামো পড়েছো ?

তিন্নি হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন বলুন তো ? 

আট

অনল আবার এসেছে সুজন চন্দর কাছে। অপরাহ্নবেলা। খানিক দূরে গঙ্গার ওপারে সূর্যাস্ত হচ্ছে। ফোনে সুজনের কাছে সময় নিয়েছিল অনল। সঙ্গে নীলেশ এসেছে। নীলেশের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানেন না সুজন, শুধু এইটুকু জানেন, লোকটা খুব বিব্রত করেছিল কোভিডের সময়। প্রাক্তন অসৎ আমলা। খরচাপাতি সব নিজে করতে  চেয়েছিল। তার স্ত্রীর একাউন্ট ডিটেল দিয়েছিল তিন্নিকে। তিন্নি সুজনদাকে পাঠাত, আবার আব্দুল মতিনের  আশ্রয়ের একাউন্টেও পাঠাত। নীলেশকে অক্সিজেন ডিস্ট্রিবিউশনের ভার দিয়ে অনেক অভিযোগ আসায়, তা কেড়ে  নেওয়া হয়েছিল। লোকটাকে নিয়ে অনল এসেছে, হাতে একটি শাড়ি, পাঞ্জাবির প্যাকেট এবং এক বাক্স মিষ্টি।   সুজন জিজ্ঞেস করলেন, হঠাৎ এসব ?

আপনাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছি। নীলেশ দাস বলল।

অভিনন্দন, কেন, কিসের অভিনন্দন ? সুজন অবাক হয়েছেন।

চেতনার রং সরকারের খাতায় রেজিস্টার্ড, এর মূল কারিগর আপনিই তো স্যার। বলল নীলেশ।

আমি, আমি কী করে, আমি তো কিছুই জানি না। সুজন তাকালেন অনলের দিকে। অনল হাসল, বলল, আপনিই আবেদন করেছেন, আপনার আবেদনেই এটা গ্র্যান্ট হয়েছে, আপনার নাম বড় একটা ব্যাপার সুজনদা, আপনার সাকসেস শুরু হলো এখান থেকে।

আমার সাকসেস মানে, কী বলছ বুঝতে পারছি না।

আপনি প্রেসিডেন্ট, অনেক অ্যাপ্লিকেশন পিছনে রেখে, আমাদেরটা হয়ে গেল, আপনার সংস্থা, আপনার  আবেদন।

সুজন কিছু আন্দাজ করতে পারছিলেন, বললেন, না আমি নই, আমি তো কোনও আবেদন করিনি। মানে   অ্যাপ্লিকেশন সাইন করিনি।

কিন্তু এটা আপনার নামেই জমা পড়েছিল, আপনি ভুলে যাচ্ছেন সুজনদা, আমি সেদিন সাইন করে নিয়ে গিয়েছিলাম।

কোনদিন ?

ভুলে গেলেন, সেই যে সক্কালে পি নগর থেকে এলাম, লুচি আর মিষ্টি খেলাম, অনেক গল্প করলাম, ফরগট ?

হ্যাঁ, এসেছিলে তো, সেদিন বললে জমা দিয়েছ অ্যাপ্লিকেশন, আজ বলছো অন্য কথা।

আপনার যে ভুল হচ্ছে তা হতেই পারে, বয়স বাড়লে এমন হয়, আসল কথা হলো আমরা রেজিস্টার্ড আন্ডার  ইওর লিডারশিপ, আর আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেটা খুব প্রেস্টিজিয়াস প্রাইজ হবে, প্রাইজ মানি দশ লাখ, পাঁচ ভেবেছিলাম প্রথমে, কিন্তু পাঁচটা কম হয়ে যায়, প্রথম চেতনার রং লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট প্রাইজ আপনি পাবেন, এই সিদ্ধান্ত হতেই আপনাকে কংগ্রাচুলেট করতেই আসা, আপনার সিভি আমরা তৈরি করেছি, আপনার ছবি নেব কয়েকটা, গর্জিয়াস অনুষ্ঠান হবে, ইউনিয়ন কালচারাল মিনিস্টার লছমনদাস মহাত্মার ডেট নিয়েছি, তা ছাড়া স্টেট মিনিস্টার, মুম্বই আর্টিস্ট, মারাঠি থিয়েটারের ডিরেক্টর, টালিগঞ্জের অনেকেই আসবে, আমি অলরেডি যোগাযোগ আরম্ভ করেছি, এমন ব্যাপার কলকাতায় হয়নি, কংগ্রাচুলেশনস সুজনদা।

সুজন চন্দ বললেন, এত কিছু হলো আমাকে না জানিয়ে, আমাকে দিয়ে সাইন করিয়েছো, তা আমি জানি না, তুমি কী করতে চাইছো।

অনল চৌধুরী হেসে বলল, আপনার সেবায় নিয়োজিত হতে চাই।

সুজন চন্দ বুঝছিলেন একেবারে জালিয়াতের হাতে পড়েছেন। এখন কোনটা নিয়ে কথা বলবেন ? রেজিস্ট্রেশন   তিনি করেননি, কিন্তু অনল বলছে, তিনিই নাকি সাইন করেছেন অ্যাপ্লিকেশনে। আর নিজের সংস্থার প্রাইজ নিজে   নেবেন, তাঁর এত দুরবস্থা ? সুজন মাথা নাড়তে লাগলেন, না, হবে না।

কী হবে না ? হাসল অনল, আমরা আপনার গুণগ্রাহীরা বলছি হবে, হবেই, গলা উঁচুতে তুলে বলল, বউদি চা চাই।

 সুজনের স্ত্রী বিনতা বেরিয়ে এসে বললেন, চা আসছে, কিন্তু  এটা কি হওয়া উচিত ?

কোনটা ? অনল যেন কিছুই বুঝছে না এমন গলায় জিজ্ঞেস করল।

এই প্রাইজ, নিজেকে নিজে প্রাইজ দেবেন, সংবর্ধনা নেবেন, টাকা নেবেন, এতে কি সম্মান বাড়বে ?

আমরা জুরিদের নাম প্রকাশ করে দেব, তাঁরা কেউ আমাদের নন, বাইরের, দিল্লি, মুম্বই, কলকাতার, তাঁরা  নির্বাচন করেছেন। অনল দৃপ্ত গলায় বলল, এটা একটা বিরাট ব্যাপার হচ্ছে, আমরা জানি সুজনদার সম্মান কিসে  রক্ষা হবে, উনি বরেণ্য মানুষ, প্রণম্য মানুষ।

সুজন চন্দ মাথা নাড়তে লাগলেন, না, আমি নেব না, আর চেতনার রঙের জন্ম এই জন্য হয়নি, তিন্নির আমার উদ্দেশ্য ছিল না এমন কিছু করা।

তিন্নির কথা বাদ দিন, সে বিদেশি নাগরিক, নিজের কথা ভাবুন সুজনদা, আপনি যেমন অনেস্ট মানুষ, আপনি না বলবেন আমরা তা ভেবেছিলাম, কিন্তু এই যে জুরি বোর্ড, তাদের নির্বাচন আপনাকে, টাকা দিচ্ছে হালদার জুয়েলার্স, দিস ইজ এইচ জে চেতনার রং, লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট প্রাইজ, আপনি নেবেন, আমার অ্যাডভাইস আপনি নেবেন, টাকাটা আপনি আমাদের চেতনার রঙে দান করে দিতে পারেন, যদি ইচ্ছে করেন, তা দিয়ে   সেবামূলক কাজ হবে, যা হবে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

না, তোমরা অন্য কাউকে ভাবো, আর এর সঙ্গে চেতনার রং মিশিও না। সুজন একটু রুক্ষ গলায় কথাটা বললেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন খুব চতুরভাবে ফাঁদে ফেলেছে অনল। প্রথমেই তাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, নইলে তিনি জড়িয়ে যাবেন। তিন্নি তাঁকে এত বিশ্বাস করেছে, তার পরিণতি এই হবে ? তাঁর সিগনেচার জাল করে আবেদনে স্বাক্ষর করা হয়েছে। কলকাতা শহরে এমন জালিয়াত কম নেই। দশ লাখ প্রাইজ মানি, সেই টাকা  আবার চেতনার রঙ নেবে, তারপর ফুর্তি হবে।

অনল বলল, আমরা এটা ভেবেই এসেছিলাম, আপনি সময় নিন, হ্যাঁ, এই টাকাটা ট্যাক্স ফ্রি, ট্যাক্স আমরা দিয়ে দিচ্ছি, নীলেশ, তাই তো ?

নীলেশ বলল, তাই। 

অদ্ভুত দুই জালিয়াত সুজনের সামনে বসে আছে। জালিয়াতি করেছে, বলছে সুজন চন্দই আবেদন করেছেন।  সুজন দুজনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। কীরকম নিরীহ মুখ। উদ্দেশ্য কী, চেতনার রঙ গ্রাস করা। তা করেইছে। তাঁকে বিব্রত করছে কেন, কোন উদ্দেশ্যে ? সত্যি কি বাইরের বিখ্যাতদের জুরি করেছিল, তাঁরা কারা ? না কি তাও জালিয়াতি ? নামগুলি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে তাঁরা ? আজকাল এমন হচ্ছে, আজকাল কী না কী হচ্ছে, হয়তো  তাঁরা জানেনই না যে তাঁরা জুরি।

অনল বলল, এটা ডিসেম্বর, ২৬ জানুয়ারির আগের দিন ঘোষণা করা ভারত সরকারের পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ সম্মান এবার আপনার হবে না, নেক্সট ইয়ার ঠিক হয়ে আছে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি পদ্মভূষণ পাবেনই,  আর দাদা সায়েব…।

কথা শেষ করতে দিলেন না সুজন, বললেন, স্টপ অনল স্টপ, তুমি আমাকে বুঝতে খুব ভুল করেছো, আমি লোভী নই, আমি ওসব চাই না।

হা হা করে হাসল অনল, আমরা কি জানি না আপনি লোভী নন, আপনি কোনও রাজনৈতিক দলে নেই, কিন্তু আমাদের তো একটা দায় আছে, আমরা চাইছি আপনার মূল্যায়ন হোক, আপনি সম্মানিত হন, আপনি নিজে তো  কিছু করছেন না, আপনাকে বলতে এলাম, শুভেচ্ছা জানাতে এলাম, আপনার সঙ্গে নাম উঠেছিল আরও কয়েকজন  সেলিব্রেটির, কিন্তু আপনি সর্বসম্মতভাবে মনোনীত হয়েছেন, না করবেন না।

সুজন বিরক্ত হলেন, ক্রুদ্ধ হলেন, বললেন,  আমি সই করিনি, বলছো আমিই করেছি, আমি প্রাইজ চাই না, তুমি  চেতনার রঙ নিয়ে ছেলেখেলা করতে পারো না।

এবার জবাব দেয় অনল, পেদ্রো পারামোর বংশধর অনল, ঠান্ডা গলায় বলল, ছেলেখেলা আগে হয়েছে, এখন কন্সস্ট্রাকটিভ কাজ হচ্ছে, ইউএস থেকে অত টাকা পাঠানো হয়েছে, সেই টাকার হিসাব নেই, আমরা আপনাকে  নিয়ে কাজ করছি, আপনি ভুল ভাবছেন, আপনার ফ্যান তিন্নিকে জানানো হয়েছিল, সে আপনাকে দেওয়ার বিরোধী, কী করে হয়, আপনি তাকে নিজের মেয়ের মতো দ্যাখেন, সে অন্য কথা বলল, আমরা ভাবতেও  পারিনি, তিন্নি এমন বলতে পারে। 

চুপ করে থাকলেন সুজন। বিব্রত হলেন, কী বলতে চাইছে অনল, তিনি বুঝতে পারছেন না। তিন্নি কি তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলেছে ? তিন্নির বিরোধিতা তার মতোই হবে। এই কাজ চেতনার রঙের নয়। কিন্তু এত কথার ভেতরে  অনল একটা কথা বলেছে, হিসাব। সেবামূলক কাজে যে ব্যয় হয়েছে তার হিসাব চায়। কী করতে চায় সে ? সুজন কি ঈষৎ কুঁকড়ে গেলেন, নীলেশ লোকটার পাশে বসে অনল হিসাবের কথা তুলছে, হিসাব আছে, কাকে কত দেওয়া হয়েছে, সব আছে, কিন্তু এই হিসাব চাওয়ার অধিকার আছে ওর ? নীলেশ যে ফ্রি অক্সিজেন সিলিন্ডার অনেক দামে বেচতে শুরু করেছিল, সেই অভিযোগ আশ্রয়-এর আব্দুল মতিনের থেকে আসায় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এসব অনল জানে। তিনি কিছু বলতে গিয়ে বললেন না। তাঁর বাড়ি এসেছে ওরা, তিনি তো কটু কথা বলতে পারেন না। শান্ত গলায় বললেন, সব আছে, তিন্নির কাছে সব আছে, অক্সিজেন সিলিন্ডারের হিসাব আছে, সব অক্সিজেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে ভেবো না, রিলিফের হিসাবও আছে।

অনল বলল, সে আমি তিন্নির কাছ থেকে সব বুঝে নেব, ইন্ডিয়ার হিসাব নিশ্চয়ই আমেরিকায় থাকতে পারে না, যাকগে, তিন্নিকেও আসতে হবে আপনার জন্মদিনের সেই অনুষ্ঠানে, চেতনার রঙের প্রথম অনুষ্ঠান সেই দিনেই  করব।

না, আমি এতে অসম্মত, তোমরা অন্য কাউকে দাও।

তা হয় নাকি, আপনাকেই থাকতে হবে, আপনার জন্মদিনে কি আপনার ডামি থাকবে ?

আমার ডামি যদি সাইন করতে পারে তাহলে সে-ই থাকবে। শুষ্ক গলায় বললেন সুজন। কোনও প্রতিক্রিয়া  দেখা গেল না অনলের ভেতর। সে হাসতে লাগল। হাসিটা এমন যে সুজনের মনে হলো বিদ্রƒপ করছে অনল। পরিহাস করছে। তাকে পর্যবেক্ষণ করছে অনল। দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। মুখ ঘুরিয়ে নিলেন সুজন। অনল জল চাইল। বলল। কলকাতার জল মানে টালার জল, দারুণ সুস্বাদু, আগে বলত কলকাতার কলের জলে গায়ের রঙ ফর্সা হয়, হতো নাকি সুজনদা ?  

সুজন মুখ ফেরালেন, বললেন, আমিও শুনেছি।

পেদ্রুনগরে জল ভালো না, আমি তো জল কিনি, জলই আসল, তাই না ?

নীলেশ বলল, সেও জল কেনে, যদিও লেক টাউন, বাঙ্গুরের জল টালারই জল।

চা এল। চায়ে চুমুক দিয়ে আবার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল অনল। বলল, সে এর ভেতরে দার্জিলিং গিয়েছিল,  সুজনদার জন্য আসল দার্জিলিং চা এনেছে, আনতে ভুলে গেছে। সুজন কোনও উচ্ছ্বাস দেখালেন না। আসলে তাঁর ডামি সাইন করেছে, এ তো খুব বিপজ্জনক ব্যক্তি। পাক্কা জালিয়াত। বলছে, তাঁকে দিয়ে সাইন করিয়েছে, ওই  কথার পর আর বিশ্বাস রাখা যায় না।  

আরও কিছু সময় তারা থাকল। রেখে গেল দামি শাড়ি আর পাঞ্জাবি। নকুড়ের সন্দেশের বাক্স। হতভম্ব হয়ে  বসে থাকলেন বিনতা ও সুজন। এখন কি ঘুমিয়ে তিন্নি ? যা ফোন করেন তিনি সব সকালে, যখন ওদের রাত্রি। দশটা মানে সকাল হয়ে গেছে। সকালে ওদের ব্যস্ততা বেশি থাকে। ওদের সন্ধে অবধি অপেক্ষা করতে হবে। তার মানে আগামীকাল সকাল। বিনতা বললেন, কী করবে ?

দেখি তিন্নি কী বলে।

সিদ্ধান্ত তোমাকে নিতে হবে, তিন্নি বলবে কী, ও ভাববে তুমি ওর অনুমোদন চাইছ, চেতনার রঙ নিয়ে নিয়েছে  অনল, নীলেশরা, তোমাদের মতামতের ধার ধারে না ওরা। 

কত বড় মিথ্যেবাদী, বলছে আমি সাইন করেছি অ্যাপ্লিকেশনে ?

সেদিন কি তুমি সই করেছিলে কোনওকিছুতে ?

সেদিনই ও বলেছিল রেজিস্ট্রেশন ফর্ম জমা দিয়েছে উইথ অ্যাপ্লিকেশন।

তাহলে তুমি লিখিত রিফিউজ করো ঐ প্রাইজ, তোমাকে সামনে রেখে ওরা বড় একটা খারাপ কাজ করতে  যাচ্ছে, আসলে কিছুই না মনে হয়, হালদার জুয়েলার্সের কাছ থেকে টাকা বের করা। 

রিফিউজ করব, কিন্তু লিখিত চিঠি না এলে কী করে তা করব ? সুজন চন্দ বিপন্ন গলায় বললেন।

নয়

সন্ধে হয়ে রাত বাড়তে লাগল। দূর পশ্চিমে দিনের ব্যস্ততা বাড়তে লাগল। এখন তিন্নি সময় দিতে পারবে না।  সময় না দিলে সব কিছু গুছিয়ে বলা যাবে না। বাইরে যে রাতই হোক, রাতের অতি অন্ধকার যেন ছায়া ফেলেছে  এই বাড়িতে। অনেক হয়েছে রাত। অথচ এখন সাড়ে ছটা। সুজনের মনে হচ্ছে আজ ঘড়ির কাঁটা দ্রুত চলুক।  তাড়াতাড়ি ঘুমের রাত আসুক। তিনি ঘুমিয়ে পড়বেন। যে অনল চৌধুরীর সঙ্গে চেন্নাইয়ে শো করতে গিয়ে আলাপ, যে অনল চৌধুরীর সঙ্গে কলকাতায় বেশ কয়েকবার দেখা, অভিনয় খারাপ করত না ও। তা থেকে এখন অনেক দূরে, কিন্তু অভিনয় যেন আরও ভালো করছে। অভিনয় করতে করতে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। অনল তিন্নির  সঙ্গে পরিচয় করতে কতবার তাঁকে বলেছে। তিনি শুধু কিছু ডোনেশন চেয়েছিলেন ঝড়ে বিধ্বস্ত সুন্দরবনে রিলিফ পাঠানোর জন্য। দিয়েছিল একশো ডলার। তারপর খুঁটিনাটি সব জেনে তিন্নির সঙ্গে পরিচয় করে চেতনার রঙে  ঢুকে পড়ে। এখন দেশে ফিরে এই করছে।

বিনতা বললেন, তিন্নিকে সব বলো আগে, ও কী বলতে চায় শোনো, ব্যাপার খুব ভালো নয়।

সারাটা দিন ঝিমিয়ে থাকলেন সুজন। ঘুমিয়ে পড়তে লাগলেন। তন্দ্রার ঘোরে বিচিত্র স্বপ্ন দেখলেন। মস্ত এক ব্যানারের মতো চেক তাঁকে অজগরের মতো পাকিয়ে ধরেছে। চেকে কোটি কোটি টাকার নোটের ছাপ। নোটের   পরে নোট, তাহার উপর নোট। ঘুম ভাঙার পর স্বপ্ন আবছা হতে হতে মিলিয়ে গেল। ভাবলেন একবার ফোন করে বলেন কাউকে। তাঁর নিকটতম বন্ধু রঞ্জন কলকাতা পুলিশে ছিল। উঁচু পদেই ছিল। এখন অবসরপ্রাপ্ত। সারা দিন তাঁকে নানা রকম তথ্য পাঠিয়ে যায় হোয়াটসঅ্যাপে। এক সময় অভিনয় করত রঞ্জন। মিডিওকার। সে শুনল সব। বলল, সিগনেচার জাল করেছে, অভিযোগ করলে কোর্টে যেতে হবে, কোর্ট অর্ডার করলে ফোরেন্সিক টেস্ট হবে।

আমি কি এফআইআর করব ?

কোর্টে যাবে সব, উকিল ব্যারিস্টার, সময় লাগবে, ততদিন ওরা ওদের কাজ করে যাবে।

তাহলে আমি কী করব ?

একটা কাজ করতে পারিস, রিজাইন দে, রেজিগনেশন মেইল কর, মিটে যাবে সব, ওদের উদ্দেশ্য তোর মতো  সেলিব্রেটিকে কমিটিতে রাখা, তোর নাম ভাঙিয়ে টাকা তুলবে, বেরিয়ে আয়, ঠান্ডা হয়ে যাবে।

খারাপ কথা বলেনি। তাই করবেন সুজন। রঞ্জন বলল, রেজিগনেশনের বয়ান লিখে পাঠিয়ে দেবে  আগামীকাল, চিন্তার  কিছু নেই। সুজন ফুসফুসে বাতাস পেলেন যেন।

সুজন যখন এইসবে ব্যস্ত, তখন নীলেশের বাড়ি পৌঁছে গেছে অনল, নীলেশ। দেবু আছে। সুজন ডিনার করে পেদ্রুনগর ফিরবে। দেবু ঠিক তেমনই বসে ছিল কার্পেটে। তারা বসে আলোচনা করতে লাগল। নীলেশ বলল,  উনি না এলে হালদার জুয়েলার্স টাকা দেবে না।

অনল বলল, আসবে, আসলে ভীতু, মনে হয় কিছু টাকার গরমিল করেছে, না হলে তিন্নির প্রতি ওর অন্য আকর্ষণ আছে, বুড়োদের এসব হয়।

নীলেশ বলল, থাকতে পারে, ওঁকে চেতনার রঙে রেখে দিয়ে তিন্নিকে বের করে দাও।

সব হবে, আর  সুজন চন্দ না থেকে যাবে কোথায় ? বলল অনল, কী দেবু, আজ যাবি তো ?

ও কোথায় যাবে ? জিজ্ঞেস করল নীলেশ।

সিগারেট ধরিয়ে অনল বলল, ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, ও যাবে।

যাবে মানে, ও একজনের গাড়ি চালায়।

ডাক্তারের গাড়ি তো, ডাক্তার এখন ইউরোপ বেড়াতে গেছে, ও আমার গাড়ি চালাক কদিন, তুমি না করো না।

আমিও গাড়ি চালাতে পারি না, ও আমার গাড়ি চালাবে, তা ছাড়া আমার সঙ্গে থাকে, আমি একা থাকতে অভ্যস্ত নই।

হা হা করে হাসল অনল, একা থাকা অভ্যাস করো নীলেশদা, নাহলে মিসেসকে নিয়ে এসো ছেলের কাছ থেকে।

এ তুমি কী বলছো, ওকে আমি কতদিন ধরে পালন করছি তা জানো তুমি ?

জেনে কী হবে, তুমি বরং কদিন ছেলের কাছ থেকে ঘুরে এসো, আমি দেবুকে নিয়ে যাই, দেবুকে আমার পছন্দ হয়েছে, পেদ্রুনগরে দেবুই আমাদের চেতনার রঙ কোম্পানির ম্যানেজার হবে, কন্সট্রাকশন হবে তো ফার্ম হাউস।

চেতনার রঙ কি কোম্পানি ? নীলেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এটা তো একটা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট বা অর্গানাইজেশন।

অনল বলল, সে তো ট্যাক্স ফাঁকি দিতে, আসলে আমি ছোট কিছুতে আটকে থাকতে পারব না, লাভও নেই, দেবুকে আমার পছন্দ হয়েছে, যেমন হয়েছিল চেতনার রঙ, আর যা পছন্দ হয়, তা আমি নিয়ে নিই, অভ্যেস  বলতে পারো, একবারও ফেল করিনি, পেদ্রো পারামো এই অভ্যাস দিয়ে গেছে আমাদের।  

তুমি কি সিরিয়াসলি বলছো ?

বলছি, সিরিয়াসলিই বলছি, দেখ নীলেশদা, যেদিন দেখলাম ওকে প্রথম, আমি ঠিক করে নিয়েছি ওকে নেব, তুমি না  রো না, দেবু ভালো থাকবে।

নীলেশ দেখল দেবু চুপ করে বসে আছে। সে দেবুকে জিজ্ঞেস করল, তুই যাবি ?

দেবু বলল, উনি বলছেন, দেখি কত কী করছেন স্যার, আপনি যা বলবেন তাই হবে।

তুই এতদিন থাকলি, সত্যিই যাবি।

উনি বলেছেন আমাকে নেবেন কাজে, ভালো টাকা দেবেন, আমি কি সারা জীবন গাড়ি চালিয়ে কাটিয়ে দেব  স্যার ?

স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকল নীলেশ। তখন হো হো করে হেসে উঠল অনল। বলল, আরে নীলেশদা, ঘাবড়াইয়ে  মাত, নেব বলেছি বলে কি এখনই নেব, আর তুমি না করলে আমার সাধ্য কি নেওয়ার।

নীলেশ দম ছেড়ে বাঁচল যেন। তবু বিশ্বাস হচ্ছে না। অবাক হয়ে দেখছে অনল চৌধুরীকে। অনলের ডান হাত  হয়েছে সে। অনল যা করছে, তার সমর্থন আছে। শুধু অনল সুজন চন্দকে এখানে না নিলে পারত। কী হতো না নিলে। অনেক সেলিব্রেটি আছে কলকাতায়। কবি আছে, ঔপন্যাসিক আছে, থিয়েটার সিনেমার অনেকে আছেন,  তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারত। তিন্নি আর সুজনকে বাদ দিয়েই চেতনার রঙ চলত। ভালো চলত।  তাহলেই সবচেয়ে ভালো জবাব দেওয়া হতো। কিন্তু অনলের একটু টান আছে সুজনে। কিছুতেই সরানো যাচ্ছে   না।   

অনল জিজ্ঞেস করল, বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার ?

নীলেশ বলল, কিসের বিশ্বাস ?

দেবুকে আমি নিচ্ছি না।

নীলেশ এই কথা থেকে সরে যেতে চায়, বলল, কিন্তু সুজন চন্দ তো রাজি হবেন না, অন্য কাউকে নিলে কি হতো না ?

না, হতো না, দেখো নীলেশদা, আমি ভবিষ্যৎ ভেবে কাজ করি, সুজন চন্দকে না নিলে কিছুই হতো না, কিন্তু  ওঁকে আমি রাখব, ওঁর হাতে দশ লাখ টাকার চেক তুলে দিয়ে তা ফেরতও নেব, আমি যা বলি তা করিই।

না করলেই বা হতো কী ?

অনল বলল, তিন্নি রায়ের মাজা ভেঙ্গে দেব, তাই করতে হবে, তিন্নি কেঁদে আকুল হবে, সব মেম্বার আমার   পক্ষে চলে আসবে, এমন কি সেই গৌরচন্দ্র গুপ্তও। 

নীলেশ বলল, সুজনকে বাদ দিলে তাঁর কোমরও ভাঙত, দুজনের ভাঙত।

অনল বলল, না, দুজনে মিলেই অভিযোগ করত, সুজনের মুখে তালা দিতেই এই ব্যবস্থা, তিন্নি একা শুধু ঘরে বসে গজরাবে, আমি ঐ ‘আশ্রয়’-কেও কাঠগড়ায় তুলব, এতে তোমার উপর অবিচারের শোধ তোলা হবে, দু পেগ   হয়ে যাক।

দেবু সাজালো। মাছ ভেজেও আনল। তখন নীলেশ বলল, ড্রিংক করে তুমি অতটা ড্রাইভ করবে ?

পারব, ঐ জন্য দুটির বেশি নেব না, নাহলে দেবু চালিয়ে নিয়ে যাবে, কী দেবু পারবি না ?

দেবু হাসল। হাসির অর্থ সে পারবে। নীলেশ তা দেখল। নীলেশ সরকারি আমলা ছিল। তার যেমন বস ছিল, সে ছিল বহুজনের বস। তার ভেতরে প্রভুত্ব জেগে উঠছে। কিন্তু এও মনে হচ্ছে, তার এখন সেই প্রভুত্বের ক্ষমতা  নেই। সে ক্ষমতায় বসে নেই। থাকলে তার হাত থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডারে বিলির অধিকার সুজন চন্দ কেড়ে  নিতে পারত না। নিঃশব্দে যেন তাকে অক্সিজেনশূন্য করে দেওয়া হয়েছিল। নীলেশ ভাবছিল, অনল চৌধুরীকে  পরিত্যাগ করে তিন্নি রায় এবং সুজন চন্দর কাছে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু নয় বলে সত্যি কি কিছু হয় ?  চারদিকে যা ঘটছে, তাতে সব কিছুই এখন সম্ভব মনে হয়। ভোটে যে দলের প্রার্থীকে হারিয়ে এল বাবু, ভোটের  পরে সেই দলেই নাম লেখালেন তিনি। দলবদ্ধ হয়ে দল ত্যাগ করে সরকার ফেলে দিচ্ছে। আজ যিনি শত্রু, আগামীকাল তিনি পরম মিত্র। সুতরাং সুজন চন্দর সঙ্গে হাত মেলালেই বা কী ? কিন্তু তখন সে অনলের শত্রু হয়ে যাবে। আর অনলের উপর রাগ করে সুজন চন্দর মতো নীতিবাগীশের পক্ষে গিয়ে হবেটা কী ? অনলের যাতায়াত ক্ষমতার অলিন্দে। তাই সব চেয়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয়। নীলেশ বলল, দুইয়ের বেশি দেব না অনল, তোমাকে ফিরতে  হবে।

ইয়েস বস, যা বলবে তাই হবে, তবে বেশি হয়ে গেলে দেবু আছে, আমার কোম্পানির ম্যানেজার, কোয়ার্টার  দেব, ফ্যামিলি নিয়ে আসবে, খারাপ থাকবে না, দেবুকে আমি নেব।

নীলেশ প্রথমে চুপ করে থাকল। বুঝতে পারছিল দেবুকে কব্জা করেছে অনল। দেবুই বা রাজি হয়ে গেল  কীভাবে ? সে বলল, আচ্ছা নিও, আজ বেশি খেও না।

অনল বলল, এইটুকু তো রাস্তা, সাবধানে গেলেই হবে, ডোন্ট ওরি, আচ্ছা বলো দেখি সুজন চন্দ রাজি হয়ে গেলে, আর রাজি হবেই, রাজি হতে চাপ দেব এমন জায়গা থেকে যে না হয়ে পারবে না।

নীলেশ বলল, কোন জায়গা, উনি এক বগগা লোক।

থিয়েটার বন্ধ করে দেব ?

এতটা পারবে না। নীলেশ উসকানি দিয়ে অনলের পরিকল্পনা জেনে নিতে চাইছিল।

হলের ডেট পাবে না, রিহার্সাল করেই যাবে, শো করতে পারবে না, কেমন হবে বলো তো ?

এমন হয় ?

খুব হয়, আমি বলেছি না আমার বিরোধিতা করলে তার সর্বনাশ করে দেব, আমি পেদ্রো পারামোর বংশধর।

শিহরিত নীলেশ  বলল, তারপর ?

তারপর আর কী, সুজন নতজানু হবে আমার সামনে, হা হা করে হাসল অনল, তখন তিন্নি রায়ের মুখখানা   কেমন হবে বল দেখি।

নীলেশ বলল, তিন্নিই তো আমার দায়িত্ব থেকে আমাকে সরিয়েছিল, পারফেক্ট রিটার্ন, কিন্তু সুজন চন্দ সহজে   রাজি হবেন বলে মনে হয় না।

হতেই হবে, নইলে হিসাব চাইব, দরকারে বাড়িতে পুলিশ পাঠাব, জীবন হেল করে দেব, শেষে নাটকের শো  বন্ধ, সিনেমার শুটিং বন্ধ, সুজন থাকলে হামলা হবে, আর ইডির রেইড তো হবেই।  

কিন্তু ইডি তো পাবে না কিছু।

না পেলে কী, ইডি, পুলিশ ঢুকবে বাড়িতে, এতেই যা হওয়ার তা হয়ে যাবে, একশো আটবার গঙ্গা স্নান করলেও তা মুছবে না, সব যাবে সুজন চন্দর।

নীলেশ বলল, কিন্তু এসব করে তোমার লাভ কী ?

অনল টলটলে গলায় বলল, উচ্ছেদ করে দেব ওদের, তিন্নি আমাকে অপমান করেছিল, মনে নেই ?  

আমাকেও। বলল নীলেশ দাস।

তাহলে হাত মেলাও নীলেশদা, ওদের নো হোয়ার করে দেব, বিনিময়ে দেবুকে তো পাব ?

দেবু সব শুনছিল আর হাসছিল ভেতরে ভেতরে। পয়সাওয়ালা শুধু পয়সায় খুশি নয়। কত যে তাদের বায়না। মেটাতে হবে দেবুকে। এই নীলেশ স্যারকেও তো কমদিন দেখছে না।

দশ

সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোনেই মেল চেক করে অনল। সে তিন্নিকে একটা মেল করেছিল ক’দিন আগে, মেলে লিখেছিল, চেতনার রং সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই চ্যারিটেবল ট্রাস্টে বিদেশের সাহায্য নেওয়া হতে পারে  কিন্তু বিদেশে এর কোনও শাখা থাকবে না। ডোনারদের নাম নতুন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। আয়-ব্যয়ের  হিসাব এপ্রিলে এবং সেপ্টেম্বরে দেওয়া হবে। বিদেশে বসবাসরত ব্যক্তিরা এর সদস্য হতে পারবেন। সকলকে  অনলাইন আবেদন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের পর আগের কমিটি বাতিল হয়েছে। নতুন নিয়মাবলি প্রণয়ন  করেছেন নতুন কমিটি। তিন্নি যেন তার সদস্যপদের জন্য নিজের আবেদনপত্র পাঠিয়ে দেয়। তা বিবেচনা করে  দেখা হবে। 

এই ‘চেতনার রঙ’ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ধারণা তিন্নির মাথা থেকে বেরিয়েছিল মহামারির সময়। সুজন চন্দ  এক কথায় রাজি। গৃহবন্দি হয়ে যদি নিজেকে ব্যস্ত রাখা যায়, তাই। এবং মানুষের কল্যাণকর কাজে জড়িয়ে   থাকায় একটা সুখ থাকে। তাঁর থিয়েটার তো মানুষের প্রতিই নিবেদিত। অনল চৌধুরী সেখানে যোগদান করে মাস ছয় বাদে যখন মহামারির প্রথম ঢেউ স্তিমিত হয়েছে, পরের ঢেউয়ের জন্য পৃথিবী অপেক্ষা করছে। তিন্নি সেই কথা   স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রত্যুত্তর দিয়েছে মেলে। প্রত্যুত্তরে এও লিখেছে অনল যদি চায় অমন প্রতিষ্ঠান পত্তন করতে পারে। কিন্তু ‘চেতনার রঙ’ নামটি বাদ দিয়ে।

অনল লিখল, নামটি তার দেওয়া, নামে তার সম্পূর্ণ অধিকার এবং নামটি রবি ঠাকুরের কাছ থেকে নেওয়া।  

পেদ্রুনগরে ভোর, নিউ ইয়র্কে তখন সন্ধ্যা পার। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মেলের উত্তর এল। তিন্নি তাকে মিথ্যাবাদী  বলেছে। সুজন চন্দকে সাক্ষী মানল। অনল বলল, সুজন চন্দ তার ‘চেতনার রঙ’-এর সভাপতি। সব সিদ্ধান্তে তাঁর অনুমোদন আছে। তাঁর স্বাক্ষর আছে। এরপর মেল আসা বন্ধ হলো। কিন্তু ঘণ্টাখানেক বাদে ফোন এল সুজন চন্দর। অনল ফোন ধরল না। বেজে বেজে থেমে গেল। ফোন না ধরা মানে সুজনকে অধৈর্য করে তোলা। সক্কালবেলায়  তিনি নিশ্চয়ই তিন্নির কল পেয়েছেন। তিন্নি সব মেল তাঁকে ফরোয়ার্ড করেছে নিশ্চয়ই। সব পড়ে এবং তিন্নির কাছে সব শুনে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে ফোন করেছিলেন। অনল প্রতিটি ঘটনা যেন প্রত্যক্ষ করছিল, তাই ফোন ধরেনি। ফোন এখন ধরবে না। মার্কিন দেশে রাত গভীর হোক, তিন্নি ঘুমিয়ে পড়ুক তারপর অনল যোগাযোগ করবে। এতটা  সময়ে সুজন চন্দের উত্তেজনা কমে আসবে ঠিক। না এলেও তার কিছু করার নেই। সুজন চন্দর বোঝা উচিত এই বয়সে শান্ত থাকতে হয়। উত্তেজনা এড়াতে হয়। আর সুজন এই সংস্থার সভাপতি। যা লিখেছে অনল, তার পিছনে   সভাপতির সম্মতি আছে আইনত। তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবং সুজন চন্দের অনুমোদন নিয়েছে স্বাক্ষরের  মাধ্যমে। স্বাক্ষর তাঁর নয়, তিনি প্রমাণ করুন। অনল চা খায় নিশ্চিন্তে। পা দোলায়। এর ভেতরে আরও দু বার  ফোন বেজে থেমে গেছে। দরকারে ফোন ব্লক করে দিতে পারে অনল, অথবা এমন একটা বদল আনবে সেটিংসে যে সব সময় তার ফোন এনগেজড পাবেন সুজন চন্দ। চা খেয়ে সে দেবুকে ফোন করল। দেবু ফোন ধরে বলল, গুড  মর্নিং স্যার।

নীলেশ উঠেছে ?

না স্যার, উনি অনেক রাতে ঘুমোন।

অনল জিজ্ঞেস করল, সকালে কোনও ফোন এসেছিল ?

এসেছিল, কিন্তু উনি তো ঘুমিয়ে, ঘুম ভাঙ্গেনি, ঘুমের ওষুধ খান তো।

অনল জিজ্ঞেস করল, কার ফোন ?

দেখিনি স্যার, ফোন ওঁর বালিশের পাশে থাকে, ধরা বারণ, অনেক রকম থাকে তো।

অনেক রকম কী ?

আমি জানি না, স্যার আপনি চা খেয়েছেন ?

না খেলে তুই কি এসে করে দিবি ?

নো স্যার, আপনার লোক আছে তো।

দেবু, আমি সুন্দরবনে যাব, তোর বাড়ি।

যাবেন স্যার, গোসাবার বাংলোয় থাকবেন, সেখেন থেকে ভুটভুটি কি স্টিমারে আমাদের বুড়নখালি।

ভুটভুটি না, ভয় করবে।

দেবু বলল, আপনার ভয় আছে স্যার ?

তোর কী মনে হয় ? জিজ্ঞেস করল অনল।

আমি ভাবি আপনার ভয়ডর কিছুই নাই, গাঙ সাঁতরে পার হয়ে যাবেন মিঞা ভাইয়ের মতো।

মিঞা ভাই কে আবার ?

দেবু বলল, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, সুন্দরবনের বাঘ।

তুলনা খুব ভালো লাগল অনলের। তাকে দেবু অমনি ভেবেছে। বুক স্ফীত হয়ে গেল। নীলেশ দাস রাত জাগে।  জাগে মানে চ্যাট করে মেয়েদের সঙ্গে। তারপর ঘুমোয়। ফোন বেজে গেলেও ধরতে পারে না। এর মানে তার  পক্ষে ভালো। হয়তো দেবুর কারণে নীলেশ ফোন ধরে সুজনের কথায় সায় দিত। দেবুকে সে ছাড়তে চায় না। নীলেশের টাকার নেশা। এবং ক্যাশ টাকার। এখন ইডি, সিবিয়াই ক্যাশ বের করছে তল্লাশ করে তাই এখন  ব্যাঙ্কেই থাকে সব। আর অবসর নেওয়ার পর ক্যাশ জুটবে কোথা থেকে ? মহামারির সময় কিছু ঝেঁপেছে ‘চেতনার রঙ’-এর রিলিফ ফান্ড থেকে। সেই টাকার লোভেই হয়তো সুজনের কথায় মাথা দোলাত। তিন্নি আমেরিকায় থাকে।   আমেরিকা মানে টাকার পাহাড়-ডলার। আমেরিকায় সকলেই ধনকুবের। তিন্নি কি ছাড়বে তার সংস্থা ? অনল তো  তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েই যাচ্ছে, তার বেশি কিছু নয়। কবে সে কিছু পাবে জানে না। নীলেশ যে ফোন ধরেনি, তা  ভালোই হয়েছে প্রকারান্তরে। সুজন উত্তেজিত হয়ে আছেন। নীলেশ দাস সেই উত্তেজনার আগুনে বাতাস দিত। বেলার দিকে, তা প্রায় দশটা নাগাদ অনল ফোন করল সুজনকে, ‘হ্যালো দাদা, কেমন আছেন, শরীর ঠিক আছে  তো, বউদি ভালো আছে তো, লেখা চলছে, নতুন প্রোডাকশন, সিনেমা ? আমরা একটা তথ্যচিত্র বানাবো  আপনাকে নিয়ে, গত পরশু সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ মুখস্থ সংলাপ যেন আউড়ে গেল।

সুজন চন্দ উত্তেজনা পরিহার করলেন। সকালে তাঁর গা কাঁপছিল। এখন স্থির হয়েছেন। রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল। না বাড়লেই তা হতো আশ্চর্যের। সুজন এর ভেতরে তাঁর পরামর্শদাতা মাসতুতো ভাই রঞ্জনের সঙ্গে  কথা বলেছেন। বললেন, আমি আমার রেজিগনেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার মেলে, কপি সকলের কাছে চলে যাবে,  ইউ আর এ লায়ার, এত মিথ্যে তুমি বলতে পারো।

সুজনদা, আপনি অন্যের দ্বারা চালিত হচ্ছেন, আমি আপনাকে নিয়ে কাজ করতেই এসেছি, আপনি আমাকে ভুল ভাবছেন, তথ্যচিত্র করবে দুটি মেয়ে, অদিতি এবং শুভ্রা। তারা এস আর এফ টি আই থেকে পাসআউট, তাদের বলেছি কাজ আরম্ভ করতে, আপনার সম্পর্কে রিসার্চ ওয়ার্ক শেষ হলেই তারা নেমে পড়বে ফিল্ডে, সময় দেন  যদি আলাপ করতে যাবে আর কিছু স্টিল ফোটো তুলবে।

সুজন ওসব কথায় পাত্তা দিলেন না, বললেন, তোমার সব মেল আমাকে তিন্নি পাঠিয়েছে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি  তোমার সংস্থায় থাকব না, যা মনে হচ্ছে তুমি তা বলছো, সব ফলস।

আপনি সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেননি বলছেন ?                   

হ্যাঁ বলছি, আমার কলমের আঁচড়ও নেই তোমার খাতায়, তুমি এত মিথ্যে বানাতে পারো!

আমি আর নীলেশ যে সাইন করিয়ে নিয়ে এলাম, ভুলে গেলেন। অম্লানমুখে বলল অনল, দাদা শান্ত হন, শুভ্রা আর অদিতি কয়েক দিনের ভেতরে যাবে, তিন্নি আর কেউ নয় চেতনার রঙে। আপনিই সব। আপনি সভাপতি, আপনি প্রধান পরামর্শদাতা।

ফোন কেটে দিলেন সুজন। একের পিঠে আর এক মিথ্যে চাপিয়েই যাচ্ছে অনল। তিনি পদত্যাগপত্র  পাঠাবেন। এখনই মেল করবেন। তখন রঞ্জনের ফোন এল, তুমি কি রিজাইন করেছো সুজনদা ?

না করিনি, করব, পাঠাচ্ছি মেল করে।

একটা ব্যাপার ভাবলাম, তুমি রিজাইন করা মানে তুমি সভাপতি ছিলে, এবং পদত্যাগ করছো, তুমি সভাপতি ছিলে মানে সিদ্ধান্ত তুমি অনুমোদন করেছিলে, ও যা বলবে, সব সত্যি হয়ে যাবে।

হতাশ হয়ে সুজন জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে তিনি এখন কী করবেন ?

তুমি বরং প্রেস মিট করে বলে দাও, এই অনল চৌধুরীর চেতনার রঙে তুমি নেই।

সুজন বললেন, তাহলেও তো একই কথা রয়ে যাবে, আমি ছিলাম, আমি বরং অভিযোগ করি, প্রতারককে এত ভয় পেলে চলে না।

রঞ্জন বলল, তাহলে তাই করো দাদা, কোনও সিদ্ধান্তই তোমার জ্ঞাতসারে হয়নি, তা লিখে দাও। 

বিনতা বললেন, এতে ঝামেলা বাড়বে, তোমার বয়স হয়েছে, এত চাপ নিও না।

মিথ্যেগুলো সহ্য করে নেব ?

বিনতা চুপ করে থাকলেন। মেয়েকে ফোন করলেন দিল্লিতে। মেয়ে সুনেত্রা বলল, মা, আজ নেটে দেখলাম, বাবা লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পাচ্ছে, টেন ল্যাকস।

দেখলি মানে, ও অনলের করা।

এখনই নেটে এল মা, আপলোড হয়েছে এখনই।

বিনতা বললেন, আমি ওসব বুঝি না, কিন্তু ঐ পুরস্কার তোর বাবা নেবে না।

কেন নেবে না তা বুঝিয়ে বলতে সুনেত্রা বলল, বাবা যে সিদ্ধান্ত নেবে, নিতেই পারে মা, তবে, এটা অনেকে   দেখেছে, আমাকে ফোন করেছে কয়েকজন।

সুজন চুপ করে বসে আছেন। সামনে ল্যাপটপ খোলা। সুজন মেল লিখছেন। কানে আসছে বিনতা আর সুনেত্রার কথোপকথন। বিনতা সুজনকে বললেন, ওরা ইন্টারনেটে দিয়ে দিয়েছে।

দিক, আমি তো আমার রেজিগনেশন পাঠিয়ে দিলাম।

সুনেত্রা বলল, বাবাকে ভাবতে বলো, রাগারাগি করে লাভ নেই, কেউ ভালোবেসে কিছু দিলে তা গ্রহণ করতে  হয়।

বিনতা বললেন, বড় করে জন্মদিন পালন করবে বলছে।

সুনেত্রা বলল, দারুণ, আমি অন্তত সেই দিনের জন্য যাব কলকাতায়।

সুজন চন্দ পদত্যাগপত্র পাঠানোর আগেই ইন্টারনেটে নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রথম চেতনার রঙ লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট ঘোষিত হয়েছে। ওয়েবসাইটে সুজন চন্দর ছবি এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য। হালদার জুয়েলার্সের সৌজন্যে  এই সম্মাননা। অনেক শেয়ার হয়েছে। খবর ক্রমশ ছড়িয়ে যাচ্ছে। তিন্নি ঘুম থেকে উঠে দেখবে আর নিজে নিজে ফুঁসবে। আবার ফোন করবে হয়তো সুজন চন্দকে। সুজনের সম্মতি ব্যতীত কি এই ঘোষণা হয়েছে ? গৌরচন্দ্রের  ফোনে অনল বলল, উনিই নিজের কথা বলেছিলেন এমন নয়, কিন্তু চাইছিলেন উনি নিজেই পান। তাই হচ্ছে।  উনি সভাপতি হিসেবে অনুমোদন করেছেন।

এগারো  

টার্গেট এখন সুজন চন্দ। সুজন চন্দকে অনল দেখে নেবে। তার বিরোধিতা করলে সে ছেড়ে কথা বলবে না। একগুঁয়ে লোক সুজন। অনল অনেক সেধেছে, আসুন আমার কথায় সায় দেন, আসুন, আপনাকে আমি ভরিয়ে  দেব।

অনলের কথায় সুজন বারবার না করেছে, তা হয় না অনল, তুমি যা করেছো, তার জন্য অনুতাপ করো, তিন্নির কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও।

অনল বলেছিল, তা হয় না সুজনদা, তিন্নি আমাকে অপমান করেছে, নীলেশদাকে অপমান করেছে, আমার কোনও প্রস্তাবই গ্রহণযোগ্য মনে করেনি, আমি যা করছি আপনাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেই করছি, এই সব কথা  তিন্নির কাছে আগেই প্রস্তাবিত। তিন্নি না করেছে বারবার, আমার দেশে ফেরা আপনাকে সম্মানিত করার জন্য।

সম্মানিত হয়েছি কি, ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে চেতনার রঙের সভাপতি আমি, আবার চেতনার রং আমাকেই   লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট প্রাইজ দিচ্ছে, লোকে হাসছে।

হাসুক, অনুষ্ঠান দেখে সকলে চমকে যাবে।

কথা হচ্ছিল ফোনে। সুজন শান্ত গলায় কথা বলছেন। তাঁকে তাঁর মেয়ে সেইভাবে বলতে উপদেশ দিয়েছে। গৌরচন্দ্র গুপ্ত সেইভাবে কথা বলতে উপদেশ দিয়েছে। তার মনে হয়েছে সুজনকে উত্তেজিত করে কিছু একটা  ঘটানোর উদ্দেশ্যে আছে অনল।

সুজন বললেন, এতই যদি সাধ, তুমি নিজে পারলে না অন্য একটা নাম দিতে ?

অনল বলল, এই নামের প্রস্তাব আমিই দিয়েছিলাম তিন্নিকে, আমিই প্রথম ভেবেছিলাম এই ট্রাস্টের কথা, সুতরাং আমার অধিকার আছে।

তুমি অসত্য বলছো, সেই মহাসংকটের দিনে তিন্নিই এগিয়ে এসেছিল দেশের জন্য, তুমি আসোনি, তিন্নি কত টাকা তুলে দেশে পাঠাল মহামারির ত্রাণে, তুমি ভুলে গেছো অনল ?

অনল বলল, আপনার বয়স হয়ে যাচ্ছে সুজনদা, তিন্নি একা তোলেনি, আমি, শতদ্রু, বৈশাখী, সকলে ওকে সাহায্য করেছিলাম, কমিটিতে আমরাও ছিলাম, বেশির ভাগ টাকা আমিই তুলেছিলাম।

জমা দিয়েছিলে কী ?

দিইনি বলছেন, টাকা তুলেছি অথচ জমা দিইনি, প্রমাণ করতে পারবেন ?

সুজন চন্দ গত রাতে মানে তিন্নির সকালে এইসব কথা শুনেছেন তিন্নির কাছে। অনেক টাকা তোলা হয়েছিল। সব ছিল সুজনের কাছে। অনেক ডলার মানে অনেক টাকা। লাখ দশেক হতে পারে, হাজার বারো ডলার, টাকাটা থাকলে কতভাবে বিপন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেত, সন্দেহ সব নিজের একাউন্টে পাঠিয়ে দিয়েছে অনল। সেই টাকা দিয়েই ফুটানি মারছে।

হিসাবের বাইরের টাকা, প্রমাণ হবে কীভাবে ?

সব জমা পড়েছে সুজনদা, মনে হয় তিন্নি আর আপনিই অনেক হিসাব অন্ধকারে রেখেছেন। তখন আপনারাই  সব, আমরা চাকর-বাকর। 

তোমরা পরে এসেছিলে, তুমি নীলেশ, এটা একটা চ্যারিটেবল অরগানাইজেশন, তাকে নষ্ট করছো তুমি।

আচমকা শান্ত হয়ে গেল অনল, ঠান্ডা গলায় বলল, একটা ভুল হচ্ছে আপনার, আপনি জানেন না, এই চেতনার  রঙ করে তিন্নি মস্ত বাংলো কিনেছে ভার্জিনিয়ায়, ও শিগগির নিউ ইয়র্ক ছেড়ে ভার্জিনিয়া চলে যাবে, সবটা শুনুন, জানুন, এপিডেমিকে তিন্নির আমেরিকান হাজব্যান্ডের চাকরি নেই, ও বড় গাড়ির কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ছিল। এপিডেমিকে তাদের বিক্রি তলানিতে যাওয়ায় কোম্পানির প্রচুর লস। ছাঁটাই করে সামাল দিতে চাইছে, তিন্নির  এখন চেতনার রঙ ছাড়া চলবে না। বলতে লাগল অনল। বানাচ্ছে গল্প। অনেক বিখ্যাত কোম্পানি ছাঁটাই করে  টিকে থাকতে চাইছে, এমনিতেই ওদেশে পাকা চাকরি বলে কিছু হয় না, এখন আরও খারাপ। তিন্নি ট্রাস্টের নামে  টাকা তুলছে আর তা থেকে সামান্য খরচ করে বাকিটা নিজের জন্য ব্যবহার করছে।   

সরল অর্থ দাঁড়াল, তিন্নির হাজব্যান্ডের চাকরি নেই। চেতনার রঙ হলো তিন্নির সোর্স অফ ইনকাম।   

সুজন চন্দর বয়স হয়েছে। কিন্তু এত বয়স হয়নি যে সব ভুলে যাবেন। সুজন সারা জীবন ধরে ঘরের খেয়ে বনের  মোষ তাড়িয়েছেন। থিয়েটার সিনেমা করেছেন আবার মহামারির দুঃসহ দিনে, আম্ফান ঝড়ের পর, ইয়াসের ঘূর্ণিঝড়ের সময় সুন্দরবনের হিঙ্গলগঞ্জে ত্রাণ নিয়ে গেছিলেন। ঘরের বাইরে যাওয়াই তখন বিপজ্জনক, তবু গিয়েছিলেন। সেই ত্রাণের টাকা তাদের চেতনার রঙ গ্রুপ পাঠিয়েছিল। কী দিন গেছে, কিন্তু বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তৃপ্তি হয়েছিল খুব। তিন্নি কোভিডের ঠিক আগে দেশে এসেছিল। তারপর তাঁর কাছে। বলেছিল, কাকু, আপনি যদি আমাদের সাহায্য করেন, আমার গ্রুপের মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশের জন্য কিছু করতে পারি, আমাদের একটা দায়িত্ব আছে।

গ্রুপের বিষয়টা সুজনের বাড়ি থেকেই জন্মেছিল বলা যায়। এরপরই এসে যায় মহামারি। নিউ ইয়র্কে তা ছড়িয়েছিল ভয়ানক ভাবে। সেসব সামলেও আম্ফান ঝড়ের সময়, সেই মে মাস থেকেই চেতনার রং কাজ করতে  আরম্ভ করে। অনল ছিল না এই গ্রুপে। ২০২০-এর শেষ দিকে সে জয়েন করে। তারপর বৈশাখী, তারপর শতদ্রু।  এদের নিয়ে আসে অনলই। আর যখন মহামারি স্তিমিত হয়ে আসতে লাগল ২০২২-এর শেষে, অনল বলেছিল, কোভিড চলে গেলেও চেতনার রং থাকবে। আমরা নানা বিষয় নিয়ে কাজ করব। তিন্নি বলেছিল, নিশ্চয়ই, কিন্তু ত্রাণ আমাদের প্রথম প্রেফারেন্স। আমাদের দেশের মানুষের অধিকাংশ গরিব। সকলকে সাহায্য করা সম্ভব হবে না, কিন্তু সিন্ধুতে বিন্দুর মতো আমরা আমাদের কাজ করে যাব। কোভিডের পর আমাদের দেশে প্রচুর মানুষ কর্মহীন হবে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

সুজনের মনে পড়ে, একটি অনলাইন মিটিং হচ্ছিল। সেই মিটিং-এ এসব আলোচনা হচ্ছিল। সেই মিটিং-এ ছিল অনল। অনল কথাবার্তায় চৌকশ। বলেছিল, আমরা কালচারাল ফাংশন করে টাকা তুলতে পারি, আমি দেশে গিয়ে সেই ব্যবস্থা করব।

তিন্নি বলেছিল, তুমি দেশে ফিরে গিয়ে কাজ করলে দুর্দান্ত হবে, সুজনকাকুর ভার কমবে।

অনল বলেছিল, বিদেশ তার ভালো লাগছে না, দেশে ফিরলে বাঁচে।

সেই অনল দেশে ফিরে তার মুখোশ খুলে ফেলেছে। বলছে, এখন তো আর অক্সিজেন সিলিন্ডার দরকার নেই, সুজন চন্দকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে, শাহরুখ খানকে নিয়ে এসে অনুষ্ঠান করবে, অ্যান ইভিনিং উইথ খান। 

না, আবার বিপদ হলে দিতে হবে, আর দুস্থ ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করার প্রোগ্রাম তো আছেই। সুজনের এই কথা গ্রাহ্যই করেনি অনল। এখন বলছে, সুজন তার কথামতো না চললে, তাঁকে দেখে নেবে সে, ‘আশ্রয়’ সংস্থাকে  হিসাব দিতে হবে কত টাকা পেয়েছে আর কীভাবে খরচ করেছে, ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট চাই, না হলে ব্যবস্থা নেবে অনল, তার সংস্থার টাকা কীভাবে নয়-ছয় হয়েছে তা খুঁজে বের করবে সে, আব্দুল মতিনকে জেল খাটাবে, নয়তো বলুক সব, সুজন আর তিন্নি তাকে ঢাল করে টাকা সরিয়েছে কি না।

সুজনের সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল নীলেশের বাড়ি বসে। দেবু সাক্ষী। নীলেশ সাক্ষী। নীলেশ দেখছে অনলের  রোষ। যেন পেদ্রো পারামোর রক্ত জেগে উঠেছে তার ভেতরে। প্রত্যাখ্যান সে সহ্য করতে পারে না। সুজন তার  কথামতো কাজ করলে সে সব দেবে। দিল্লি থেকে পদ্মভূষণ পর্যন্ত এনে দেবে। না হলে পুড়িয়ে ছারখার করে   দেবে। এই পুরস্কার নিতেই হবে সুজন চন্দকে। নত শিরে নিতে হবে। লোকে হাসলেও নিতে হবে। এতদিনের   সব সুনাম ধ্বংস করে দেবে পেদ্রো পারামোর বংশধর।

কাকে দেবে, উনি তো নেবেন না। নিরীহ কণ্ঠে বলল নীলেশ। আসলে শুনতে চাইছে আরও কিছু। সব তারও   জানা দরকার। কখন কোন প্রয়োজনে কাজে লাগে তা তো আগে জানা যায় না।

নিতে হবেই, না হলে উনি সমস্যায় পড়বেন।

ছেড়ে দাও না, কী হবে ? নীলেশ থামাতে চায় অনলকে। আসলে নীলেশের ভয় আছে। টাকা যদি কেউ মেরে   থাকে, সে হলো সে নিজে। টাকা নিয়েছিল ফ্রি অক্সিজেন সিলিন্ডার বেচে। সুজনকে ফাঁসাতে গিয়ে যদি সে ফেঁসে যায়। প্রমাণ তো আছে। যারা সিলিন্ডার নিয়েছিল তাদের সবার নাম সুজনের কাছে আছে।

ছাড়ব কেন, তুমি সরকারি কাজ করতে তো, তাই এসব বলছ, রিস্ক তোমার রক্তে নেই, না হয় শাশুড়ি বেঁচেই  থাকত, অক্সিজেন সিলিন্ডার না দিয়ে ওরা গলাবাজি করতে পারত না, আদায় করতে হতো অক্সিজেন সিলিন্ডার, তারপর সেই অক্সিজেন বাতাসে উড়িয়ে শাশুড়িকে না হয় মরতে দিতে দাদা।

তুমি এসব কী বলছো অনল ?

অনল বলল, আমি দেবুকে নেব।

দেবুকে তো আমি দিতে পারব না।

কত চাও বল, দরকারে তোমার জন্মদিন আমি পালন করব ব্যাঙ্কোয়েট হল ভাড়া করে, দেবুকে আমার চাই, আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হবে ও। 

নীলেশের মুখখানি করুণ হয়ে গেল, সে অনলকে দেখতে থাকে। তখন দেবু বলে, যাই না কদিন, আপনি  বরং ছেলের কাছে ঘুরে আসুন স্যার।

যাবি, তোর ইচ্ছে করছে ?

দেবু বলল, পেদ্রুনগর দেখে আসি, ডাক্তারবাবু নেই, এই সময় আপনিও ঘুরে আসুন।

নীলেশ বলল, বলছিস ?

উনি বলতেছেন কতবার, আমারে উনি পছন্দ করেছেন, বড় মানুষ, কথা ফেলতি নেই, আদর করে  ডাকতেছেন।

এরপর নীলেশ কি কিছু বলতে পারে ? দেবুকে লোভ দেখিয়েছে। অনেক টাকা দেবে মনে হয়। তা ছাড়া  কোয়ার্টার, নানা রকম সুবিধে। সুন্দরবনের ছেলে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। নীলেশ ফ্লাইটের টিকিট কাটল কয়েকদিন বাদে। গোপনে বিশ হাজার টাকা তাকে দিল অনল। ফোনে বলল, দেবুর দাম।

কী বলছ, ওর দাম, তুমি সত্যিই ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছ ?

দাস কেনা-বেচা হচ্ছে নীলেশদা।

এটা ঠিক হলো না, টাকা দিলে মানে ফেরত দেবে না।

তোমাকে ঠিক দাম দিচ্ছি না আরও কিছু চাও, সুন্দরবনের সাঁওতাল ওরা, পাহাড়-জঙ্গলের দেশ থেকে বন কাটতে এসেছিল, রয়ে গেছে, ওকে নিয়ে আমি রাঁচি-বেতলা ফরেস্টে যাব, না হলে বেলপাহাড়ি যাব, জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে বলব, চিনতে পারিস, মনে কর দেখি।

নীলেশ বলল, কী যে বলো তুমি, সাতপুরুষ দশপুরুষ আগে ওরা সুন্দরবনে এসেছিল, কী মনে করবে ?

আমার চেতনার রঙের নতুন প্রোজেক্ট এটা, রিটার্ন টু মাই হোম, কেমন হবে, আমেরিকা থেকে ডোনেশন আসবে, ওরা এইরকম চায়, অ্যালেক্স হেইলির রুটস পড়েছ নীলেশদা।

না পড়িনি, সব পড়া হয় নাকি, কিন্তু এটা বাস্তব মনে হচ্ছে না।

বাস্তব আর কত দেখতে চাও, দেখছো না কেমন হাতে হাতকড়া, পায়ে শিকল লাগিয়ে সব রিটার্ন টু ইওর হোম করছে, দিস ইজ আ পার্ট অফ দ্যাট প্রোজেক্ট, আমি দেবুকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করব, মার্কিন এইড আসবে, টাকা আয়ের কত ধান্ধা আছে তুমি জানো না, তোমরা শুধু ফ্রি অক্সিজেন সিলিন্ডার বেচে দিয়ে ইনকাম, ব্রাইব এইসব জানো, বড় করে ভাবতে প রো না। 

কিন্তু এই সব প্রোজেক্টে টাকা দিলে ওদেশের রেড ইন্ডিয়ানদের হাতে দেশ দিয়ে ফিরে আসতে হবে মার্কিনিদের, আমার তো মনে হয় সমস্ত হোয়াইট এইচ ওয়ান বি ভিসা নিয়ে ঢুকেছে, ওদের প্রেসিডেন্টের পূর্ব পুরুষ এইচ ওয়ান বি ভিসা নিয়ে জার্মানি থেকে আমেরিকায় ঢুকেছিল। 

অনল বলল, ওরা ওদের কথা তুলবে না, যা করবে অন্য দেশের জন্য, নিজেদের পেট্রল জমা রেখে আরব দেশে যুদ্ধ বাঁধায় পেট্রলের জন্য, এই প্রোজেক্ট সাকসেসফুল হলে অনেক দেশে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়া যাবে, সবাই  নিজেদের শিকড়ে গিয়ে জমির ভাগ চাইবে, ওদের অস্ত্র বিক্রি হবে, উদ্বাস্তুরা যদি নিজ দেশে ফেরে মদদ পাবে  আমেরিকার, জঙ্গল কেটে নগর গড়ে উচ্ছেদ করেছে যে আদিবাসীদের, সেই আদিবাসীরাই ধামসা-মাদল বাজিয়ে  ফিরবে নিজের গ্রামে।

নীলেশ দাসের মনে হলো সব ফালতু কথা। তাকে ভুল বোঝাচ্ছে অনল চৌধুরী। পছন্দ হয়েছে, নিয়ে নিল। যেমন পছন্দ হয়েছিল ‘চেতনার রঙ’। নিয়েছে। তবে এতে সেই পারামো না কার রক্তের ধারা প্রমাণ হচ্ছে। সেই   পেদ্রো পারামো এমনই করত, যা শুনেছে সে অনলের কাছে। 

বারো

নীলেশ ছিল পদস্থ আমলা। নীলেশের বিশ্বাস তার কূটবুদ্ধির কাছে হারতেই হবে অনলকে। ফেরত দিয়ে যেতে  হবে দেবুকে। দেবু তার কাছে এসেছিল বছর পনেরোয়, এখন তার তিরিশ পার। পূর্ণ যৌবন। বিয়ে করবে করবে  করছে। কোথায় থাকবে তা নিয়ে সমস্যা ছিল। সমস্যা মিটে যাবে। পেদ্রুনগরে সে কোয়ার্টার পাবে। দেবুকে  অনলের চাই। কেন এতখানি চাই, তা ধারণা করতে পারছে না নীলেশ। কিছুটা আন্দাজ করছে। পুরুষে আকর্ষণ  অনলের। ফ্যামিলি ফেলে চলে এসেছে তাই। দেবুর প্রতি সেই আকর্ষণ ?

অনল মনে করছে দেবুকে একেবারে পাচ্ছে। শুধু দেবু না থাকতে চাইলে চলে আসবে। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখবে না তো অনল। দেখা যাক। চলে গেল নীলেশ মাসখানেকের জন্য। শীত এল শহরে। দেবু  ড্রাইভ করে নিয়ে গেল অনলকে পেদ্রুনগর। চমৎকার হাত দেবুর। বাঁচল যেন অনল। এতদিন ড্রাইভার ভাড়া করে চলছিল।  ড্রাইভিং ছাড়াও কী করতে হবে, বুঝিয়ে দিল দেবুকে। দেবু তার অর্ডারলি। আর্দালি। আজ্ঞাবহ। দেবুকে পেয়ে উল্লসিত হয়েছে অনল। কেন উল্লাস সে জানে না। আসলে এমন একজন আজ্ঞাবহ নীলেশ দাসের থাকবে, তার থাকবে না ? তার যত প্রোজেক্ট সব ভুয়ো। এই রিটার্ন টু মাই হোমও ভুয়ো। যারা টাকা দেবে তারাও জানে আবার  যে নিচ্ছে টাকা সেও জানে। তাহলে টাকা আসবে কেন ? আসবে যে ফান্ড রিলিজ করবে, তার জন্য। সে এক এশিয়ান। তার মাথা থেকেই বেরিয়েছে এই প্রকল্প। কত লোক, ধনী, অর্থ উপার্জনে পারঙ্গম ব্যক্তি ঐটিই জানে যে উদ্বৃত্ত অর্থ দান করে দিতে চায়। এই প্রকল্পের টাকা ওখান থেকে আসবে। 

একদিন মিটিং ডাকল অনল। মিটিং মানে তার পেটোয়া লোকজনকে। ঢালাও মদ। দেবু পরেছে আর্দালির   পোশাক। বড় মানিয়েছে তাকে। তার নতুন প্রোজেক্টের কথা অনল বলল। মার্কিন দেশ থেকে টাকা আসবে।  ইউনেস্কো টাকা দেবে। রিটার্ন টু মাই হোম। উদ্বাস্তুদের নিজ বাসভূমে ফেরা। আদিবাসীদের জঙ্গলে ফেরা।  পৃথিবীময় মানুষ উচ্ছেদ হয়ে চলেছে। তাদের নিয়ে চেতনার রঙের নতুন কাজ। সকলে হাত তুলে সমর্থন জানায়। দারুণ দারুণ দারুণ। বড় কাজ হাতে নিয়েছে অনল চৌধুরী। শুধু গৌরচন্দ্র গুপ্ত বলল, হয় না, হতে পারে না, তাহলে যাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল, তাদের ফেরাতে হবে।

অনল এল গৌরের কাছে, বলল, আপনার সঙ্গে বসতে হবে গৌরদা।

গৌরচন্দ্র বললেন, বসে কী হবে, এইসব অলীক প্রোজেক্টে আমার নোট অফ ডিসেন্ট থাকবে, সুজনদার লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্টেও।

সুজনদা পদত্যাগ করে মেইল পাঠিয়েছেন, কিন্তু আমরা আমাদের লক্ষ্য থেকে সরছি না, গৌরদা, আপনি   আমাদের পাশে থাকুন।

গৌর কথা বললেন না। হ্যাঁ-ও না, না-ও না। অনল বুঝল দোলাচলে আছে। গৌরচন্দ্র বহুদিন লেখেন ছদ্মনামে। নামটি হলো প্রাবৃটচন্দ্র গুপ্ত। প্রাবৃট মানে মেঘ। অভিধান ঘেঁটে বের করেছে অনল। প্রাবৃট গুপ্ত নামে  আর একজনকে বাজারে হাজির করে দিতে পারে অনল। তখন গৌরচন্দ্র যাবেন কোন গুপ্ত জায়গায় ?

গৌর বললেন, তুমি সব করতে গিয়ে ছ্যারাভ্যারা করে দিচ্ছ, দিস ইজ নট দ্য ওয়ে। 

আপনি পথ দেখান।

এই যে সুজনদাকে লাইফ টাইম দিতে চাও, এটা না করলে ঠিক হতো।

আপনি কি মনে করেন সুজনদা যোগ্য নন ?

গৌর গুপ্ত বললেন, যোগ্যতা পরিমাপ করার স্কেল আছে নাকি, তুমি অন্য কথাও ভাবতে পারতে।

তাহলে প্রস্তাব ঠিক আছে ? অনল জিজ্ঞেস করল।

গৌর চুপ করে থাকলেন। তার মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ তা ধরে নেয় অনল, বলল, নেক্সট হবে অন্য কেউ।

গৌর বললেন, উনি যদি না নেন, এক বগগা লোক।

নেবেন, দশ লাখ প্রাইজ মানি, নেবেন না কেন, ঘোষণা হয়ে গেছে, রিফিউজ কি করেছেন ?

গৌর বললেন, করেননি, কিন্তু করতে পারেন।

আমরা প্রস্তাব দিয়েছি উনি ঐ টাকা আমাদের দান করে দিতে পারেন, টাকা নিয়ে উনি করবেন কী, বরং এতে ওঁর সম্মান বাড়বে।

গৌর বললেন, তাহলে এটাই কারণ ?

হ্যাঁ, উনি রাজিও হয়েছেন এই প্রস্তাবে, আচ্ছা আপনাকে যদি দেওয়া হয় নেক্সট ইয়ারে, আপনি কি এই    পদ্ধতিতে রাজি ?

গৌর হকচকিয়ে গেলেন, আমি, আমি কেন ?

আপনি একজন স্ট্রাগলিং রাইটার, আপনাকে পেদ্রো পারামো সম্মান দেব।

গৌরের বুক চিনচিন করে উঠল, বললেন, না না, দরকার নেই।

নেই কেন, আমি আপনার বই অনুবাদের ব্যবস্থা করে দেব, আমার সঙ্গে থাকুন, আমার পরিকল্পনায় যুক্ত   হন।

গৌর চুপ করে ছিলেন। নিজের গাড়িতে ফিরতে ফিরতে গৌর গুপ্ত ভাবছিলেন, রিটার্ন টু মাই হোম কেন ?   এটা কীভাবে সম্ভব, গৌর টেক্সট করলেন অনলকে, লিখলেন এই কথা। লেখার উদ্দেশ্য হলো, তিনি অনলের  কথায় সহজে প্রলোভিত হচ্ছেন না। অনল যে বলল, তাকে সম্মানিত করবে, তা নিয়েও তার মাথাব্যাথা নেই।  নেই কেন না, এই ধরনের গিভ অ্যান্ড টেক পদ্ধতি খুবই প্রচলিত। তিনি এতে সায় দেননি কখনও।

অনল উত্তর দিল না। দেখেনি। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। 

গৌরচন্দ্র গুপ্ত পরদিন সকালে ফোন করলেন সুজন চন্দকে। সুজন জিজ্ঞেস করলেন, গতকাল মিটিং হয়েছিল ?

আপনাকে কে বলল ?

কেন অনল, গাড়ি পাঠাবে বলছিল।

যাননি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সিদ্ধান্ত আমি আগেই নিয়েছি, রিজাইন করেছি, মেইলের কপি তোমাকেও দিয়েছিলাম।

জানি তো, আমি ঐ সিদ্ধান্তর কথা বলছি, কিন্তু অনল বলছে এটা সাময়িক, পুরস্কার নেওয়ার পর ফেরত    আসবেন আপনি, রিটার্ন টু মাই হোম, এটা ওর নতুন প্রোজেক্ট।

আমি তো নেবই না। বিরক্ত হলেন সুজন।

গৌর বললেন, ঠিক করবেন, চেতনার রঙ আর আমাদের নেই।

সুজন জিজ্ঞেস করলেন, মেম্বাররা কী বলছে ?

কিছু বলছে না।

তুমি কী বলছ ?

গৌর বললেন, আমি কে, আমি তো নিমিত্ত মাত্র, আমি থাকি না থাকি, তাতে অনলের কিছু যায় আসে না।

সংঘ আমাদের, তিন্নি, আমি, তুমি, মতিন, আমরা ছেড়ে দেব।

আপনি কেন সাইন করলেন ?

কোথায় সাইন করেছি ?

গৌরচন্দ্র বলল, অ্যাপ্লিকেশনে, মিটিং-এর মিনিটসে, অডিট রিপোর্ট, সব জায়গায়, ফাইনাল প্রস্তাবটিতেও।

তুমি দেখেছো ?

গৌরচন্দ্র বললেন, না দেখে বলব কেন, ফোটোকপি অবশ্য ?

আমার সিগনেচার ?

আপনারই তো।

জালিয়াতি হয়েছে।

গৌর বললেন, তা যদি হয়, আপনি অনলের সঙ্গে থাকবেন না, থাকলে আমি আপনার সঙ্গে থাকব না।

আমি রিজাইন করেছি।

কিন্তু অ্যাওয়ার্ড রিফিউজ করেননি তো।

তুমি কী মনে করো, ঐ অ্যাওয়ার্ড আমি নেব ?

আমার মনে করায় কিছু যায় আসে না সুজনদা, আপনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।

সুজন বলল, আমার কাছে চিঠি এলে আমি ভাবব।

ওদের ওয়েব সাইটে উঠে গেছে, আপনি বলছেন আপনি জানেন না ?

সুজন বললেন, তোমার কথা মনে রাখব, আমি বলছি নেব না, তবু।

প্রত্যাখ্যান করতে হবে সুজনদা।

সুজন বললেন, জালিয়াতি করে নিয়ে নিল আমাদের চেতনার রং, তুমি মিটিং-এ গেলে কেন ?

আপনি যদি সই না করে থাকেন, আপনি সেটাও বলুন।

কোথায় বলব, মদের পার্টিতে ?

আহা রেগে যাচ্ছেন কেন, বলতে হবে তো, সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখুন, না হলে এফআইআর করুন। 

সুজন চন্দ বললেন, আমি তোমাকে বললাম, তুমি বলো।

তা হয় না, বরং অনল বলছে আপনি তার কথায় রিজাইন করেছেন, যে সংস্থার প্রেসিডেন্ট, সেই সংস্থার  অ্যাওয়ার্ড যাতে না নিতে হয়, এটা সত্যি ?

তুমি কী মনে করো ?

আপনি টাকাটা কি দান করে দেবেন চেতনার রঙকে ?

আমি নেবই না, তো দান করব কীভাবে ?

রিটার্ন টু মাই হোম, এই প্রোজেক্টে আপনি ফিরে আসবেন শুনলাম।

কথা আর এগোয় না। সুজন আচমকা লাইন কেটে দিলেন। বুঝতে পারছেন তাকে প্যাঁচে ফেলে দিয়েছে অনল। তিনি রিফিউজ করতেই চেয়েছিলেন, কিন্তু রঞ্জন বলল, রিজাইন করতে, চিঠি না পেলে প্রত্যাখ্যান করবেন কীভাবে ? রঞ্জনকে ফোন করলেন। রঞ্জন ধরল না। আবার ফোন করলেন, যোগাযোগ হলো না। গৌরচন্দ্র তাকে  উত্তেজিত করে দিয়েছে। তাঁর স্বাক্ষর নয়, কিন্তু গৌর বলছে তাঁরই। কবে সই করলেন, তিন্নি শুনলে কি বিশ্বাস  করবে তাঁর সই নয় ? রিটার্ন টু মাই হোম মানে কী, হতে পারে তা ? সুজন চন্দ চুপ করে বসে থাকলেন। মিসড কল থাকলে, রঞ্জন ফোন করবে। করছে না কেন ? অনল কি রঞ্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করল ?

তেরো

যোগাযোগ করেছিল অনল। রঞ্জনকে বলেছিল, সুজন চন্দকে রাজি করাতে। রঞ্জনের খোঁজ পেয়েছিল সে সামাজিক  যোগাযোগ মাধ্যমে। ফেসবুক করেন রঞ্জন। সুজনও করেন। অনল ফেসবুক থেকে পরিচিত হয়ে রঞ্জনের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বলেছিল, আপনাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করব রঞ্জনদা, হেল্প করুন।

রঞ্জন তার বন্ধুর একগুঁয়েমি জানেন, ফলে বলেছিলেন, সম্ভব হবে না।

অনল জেনেছে রঞ্জন অভিনয় করতেন, সিনেমায় অভিনয় করা ছিল স্বপ্ন, হয়নি। সরে এসেছেন। রঞ্জনের সঙ্গে  সুজনের বন্ধুতার সূত্র ছিল থিয়েটার। সেই যোগাযোগ এখনও আছে। রঞ্জন চেতনার রঙে ছিল না, সুজন আমন্ত্রণ   জানালেও ছিলেন না। মেম্বার হয়ে করবেন কী ? তিনি মহামারির সময়ে ঘর থেকে বেরোননি। সুজনকে বলেছিলেন, যে কাজ সরকার করবে, সে কাজ তুমি করছো কেন ? রঞ্জনের রোটারি ক্লাব আছে, নিয়মিত মদ্যপান আছে, মেয়ের কাছে বেড়াতে যাওয়া আছে, চেতনার রঙে থেকে ভূতের বেগার খাটতে তিনি রাজি নন। তখন বন্ধুকে উপদেশ দিয়েছিলেন, এই বয়সে এসবে না জড়াতে। 

বন্ধু থিয়েটারের দল চালায়। থিয়েটারের দল চালালে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান চালাতে অসুবিধে হবে কেন ?   অনেককে নিয়ে চলার অভ্যেস তাঁর আছে। রঞ্জনের কাছে চলে গিয়েছিল অনল, সঙ্গে একটি সিঙ্গল মল্ট হুইস্কির বোতল। রঞ্জন বলেছিল, চেষ্টা করবে।

তখন অনল বলেছিল, চেষ্টা করলে হবে না, করতেই হবে রঞ্জনদা, আপনি যা বলবেন, তা মেনে নেব।

সুজন চন্দ এতই দামি মানুষ ?

অনল বলেছিল, তাইই, আসলে তিন্নি রায়কে আউট করব, সুজন চন্দকে রাখব, মাজা ভেঙে দিতে চাই   পুরোনো আইডেন্টিটির, আমাদের ওয়েবসাইট বদল করে ফেলছি, ওয়েবসাইট থেকে পুরোনো সব কিছু আলাদা করে স্টোর করে রেখেছি, বলুন আমাদের সাহায্য করবেন কি না।

রঞ্জন বলল, একটা প্রস্তাব দেব ?

দিন, শুনি।

এই পুরস্কারে আর একটা নাম জুড়ে দাও, আমি বাবাকে বাঁচিয়ে তুলতে চাই।

আপনার বাবা ?

হ্যাঁ, অসুবিধে আছে ?

তিনি কে ?

কেন আমার পিতা, মাই ফাদার নিরঞ্জন শর্মা।

তিনি কে ছিলেন ?

কেন আমার বাবা ?

অনল বুঝল রঞ্জন মানুষটি তুখোড় খেলোয়াড়। পুলিশ সার্ভিসে থেকে আরও বুদ্ধিমান। সে বিনীত ভঙ্গিতে   বলল, সে আমি বুঝেছি, কিন্তু তাঁর নাম কীভাবে আনব ?

আনবে কীভাবে, বলবে দানবীর এন শর্মা।

তিনি দানবীর ছিলেন ?

সে খবরে দরকার কী, তিনিও পুলিশ সার্ভিসে ছিলেন, আমাদের ঠাকুরদাও, তিনি ইংরেজ আমলের পুলিশ, তিনিও এন শর্মা, নীহাররঞ্জন শর্মা, ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ওবিই দিয়েছিল, অর্ডার অফ ব্রিটিশ এম্পায়ার, মনে করো এন শর্মা, ওবিই-র নাম যুক্ত করছো।

কিন্তু তিনি তো থিয়েটারের কেউ নন, সিনেমা সাহিত্য―তাঁকে কেউ চেনে না।

রঞ্জন মুখুজ্জ্যে বললেন, দরকার নেই, আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল সুজন, আমি রাজি হইনি, এখনও না হয় রাজি হলাম না।

দুদিন বাদে আবার এসেছিল অনল। বলেছিল, রাজি, কিন্তু শর্ত, রাজি করাতে হবে।

রঞ্জন বলেছিল, হয়তো রাজি হবে না, কিন্তু না বলতেও পারবে না।

রঞ্জনের উপদেশেই সব কাজ অনলের। আবার তার কথায় শুধুই পদত্যাগ করেছে সুজন চন্দ। রঞ্জন  ভাবছিলেন, এন শর্মা না থাকুক পুরস্কারে, কিন্তু সুজনকে তিনি ভুল পথে চালিত করবেনই। করেছেন। লিখিত   চিঠি ব্যতীত প্রত্যাখ্যানের মূল্য নেই।

রঞ্জনের কাছে ফোন আসছিল সুজনের। রঞ্জন ধরছিলেন না। তাঁর ভেতরে সুজন নিয়ে বিতৃষ্ণা ছিল যে এতটা তা তিনি নিজেই জানতেন না। সুজনের কাছে গেছেন, সুজনের নাটক দেখেছেন, সিনেমা দেখেছেন, উচ্ছ্বসিত   প্রশংসা করেছেন, কিন্তু ভেতরের বিদ্বেষ টের পেলেও বাইরে নিয়ে আসেননি। কতবার ভেবেছেন কোনও নাটক বা সিনেমায় সুজনের অভিনয়ের খুব নিন্দা করবেন, কিন্তু শেষ অবধি সামলে নিয়েছেন, কারণ নিজেকে উন্মোচিত   করতে তাঁর অনীহা। পুলিশ সার্ভিসের শিক্ষা এটা। অভ্যাস এটা। তিনি আবার গোয়েন্দা দপ্তরে ছিলেন বহুদিন।  ফলে অভ্যাসটা চেপে বসেছিল দৈনন্দিনতায়।

সুজনের ফোন তিনি ধরলেন না। সুজন উদ্বিগ্ন হোক। উত্তেজিত হয়ে পায়চারী করুক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত   একদিন বাদে ফোন করলেন। কেন করলেন, না তাঁর পুলিশি অভ্যাস। জানা দরকার সুজন কী ভাবছে।  আমেরিকাবাসী মেয়েটির পক্ষে থাকার কোনও কারণ নেই। যে তাকে সম্মানিত করতে চাইছে, তার পক্ষে থাকাই   তো বুদ্ধিমানের লক্ষণ। কিন্তু এই কথা রঞ্জন বলবেন না। তিনি শুধু ভুল পথে চালিত করবেন। যেভাবে অপরাধী  ভুল পথে চালিত করে পুলিশকে, সেই ভাবেই তিনি এগিয়েছেন। ফোন ধরলেন সুজন, বললেন, তিনি কী করবেন,  তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করে মেইল এসেছে।

রঞ্জন বললেন, আসবেই।

তাহলে ?

পদত্যাগ হলো না।

আমি কি আবার রিজাইন করব ?

দুবার রিজাইন করা যায় না।

সুজন বললেন, আমি প্রেস মিট করি।

করবে, কিন্তু প্রেস বলবে আপনারই সংস্থা ঘোষণা করল, আপনি তার বিরুদ্ধে বলছেন, আপনি কি জানতেন না   এমন হতে পারে ?

সুজন : জানতাম, বারণ করেছিলাম।

কিন্তু প্রস্তাবে আপনার স্বাক্ষর।

সুজন : আমার স্বাক্ষর নয়।

এর পরে কোর্ট-কাছারি করতে হবে। তুমি তার ধকল সহ্য করতে পারবে ? বারবার তারিখ পড়বে। হাজিরা না দিলে তোমার আর্জি বাতিল হয়ে যাবে।

তাহলে আমি কী করব ?

কিছুই করো না, পরে ভাবা যাবে।

পরে ভাবব, কিন্তু ওরা যে ততদিনে সব কাজ করে ফেলবে।

আমি বিকেলে তোমার বাড়ি যাব। রঞ্জন বললেন, তুমি শুনেছো তো, ও আসলে পেদ্রো পারামোর বংশধর।

জালিয়াত জালিয়াত।

রঞ্জন বললেন, হতে পারে, নাও হতে পারে, তবে ওর স্পিরিট এবং কাজকম্মো দেখে মনে হচ্ছে, ওর রক্তেই অ্যাগ্রেসিভনেস আছে, যা করবে ভাবে তা করেই ছাড়ে।

চুপ করে থাকলেন সুজন। সেদিন বিকেলে রঞ্জন এলেন এক বাক্স সন্দেশ নিয়ে। সন্দেশ কেন ? মনে হলো তাই নিয়ে এলাম। মনে হলো কেন ? হাসলেন রঞ্জন, তুমি সম্মানিত হচ্ছ, আমি কিন্তু খুশি।

অবাক হয়ে গেলেন সুজন, বললেন, তুমি সব জেনেও বলছ।

যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে, তুমি তো যোগ্য, তোমাকে ও সম্মানিত করতে চাইছে, এর ভেতরে অন্যায় কোথায় ?

সুজন এবং বিনতা চুপ করে থাকলেন। নিজেদের একা মনে হচ্ছিল তাঁদের। রঞ্জন আজকের বন্ধু নয়। রঞ্জন এই ব্যাপারে সব চেয়ে ভালো পরামর্শদাতা হতে পারত। তাইই হয়েছিল। কথাটা শোনার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। বলেছিল, তুমি খুব নরম মনের মানুষ সুজন, তুমি ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে না কেন ?

তুমি কী করতে ?

তাইই করতাম, এমন লোকের সংসর্গে থাকলে তোমার ক্ষতিই হবে।

কথাটা মনে এল। সুজন ভাবলেন স্মরণ করিয়ে দেন রঞ্জনকে। কিন্তু তাতে লাভ কী হবে ? রঞ্জন এসেইছে   তাকে নিজের মত থেকে সরে আসার কথা বলতে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ও কি তোমাকে পাঠিয়েছে ?

আমার মনে হলো তোমাকে সুপরামর্শ দেওয়া উচিত। তুমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছ, তোমাকে একজন ভালোবেসে   সম্মানিত করবে, তুমি রিফিউজ করবে কেন ?

কেন না ও আমার সই জাল করেছে, আমাদের গ্রুপ ভেঙে দিয়ে নিজেই সেই নামে একটা সংস্থা করে   ফেলেছে, তুমি বলো এর সঙ্গে মিত্রতা করতে ?

সেই সংস্থাকে আরও ছড়িয়ে দিতে চাইছে, বড় করতে চাইছে, ভুলটা কোথায় ?

  সুজন দম নিলেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন, তুমি কিন্তু বলেছিলে ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে এবং তুমি হলেও তাই করতে।

তখন সবটা জানতাম না, পরে বুঝেছি সে তোমার অসম্ভব এক গুণগ্রাহী, তাকে অস্বীকার করা ভুল হবে।

তোমার কাছে ও গিয়েছিল ?

কথাটার উত্তর না দিয়ে রঞ্জন বললেন, আসলে প্রথমে আমি সবটা কেন কিছুই জানতাম না, পরে অনেক খোঁজ   নিয়েছি, আমি পুলিশে সার্ভিস করেছি, আমি যতটা জানতে পারব, তুমি তা পারবে না, একদম ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্ট খোঁজ দিয়েছে।

এবার বিনতা বললেন, আপনি ওর কথায় গলে গেলেন ?

না তো, ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হলো কবে ?

আপনার কাছে যায়নি বলছেন ?

চুপ করে থাকলেন রঞ্জন।

সুজন বললেন, আমি তোমার সঙ্গে একমত নই, আপাদমস্তক অসৎ এক ব্যক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে পারব না।

রঞ্জন বললেন, আমার মনে হয় তোমার ভাবা উচিত, রিথিংক করতে হবে, ওর উদ্দেশ্য খারাপ নয়।

সুজন চন্দ বললেন, আমি যা বোঝার বুঝে গেছি, আর ভাবা দরকার নেই, আমার সব কটা সিগনেচার জাল করেছে, তুমি ওর হয়ে কথা বলতে এলে রঞ্জন।

রঞ্জন বললেন, আমার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলে, তাই এসেছি, একজন সব জায়গায় তোমার সিগনেচার নিজে   বসিয়ে দেবে, এটা কেউ বিশ্বাস করবে না, তোমার বাড়ি ও নিয়মিত আসে, তুমি সই করোনি, তা বলছো কীভাবে ?

তুমি কি মনে করো আমি মিথ্যা বলছি ?

না, ভুলে যেতে পারো, বয়স হলে মানুষের স্মৃতিবিভ্রম ঘটে, তা অসম্ভব কিছু নয়।

বিনতা চায়ের ট্রে রাখতে রাখতে বললেন, না উনি জানেন না একদম, ওঁকে বাদ দিয়েই সব হয়েছে, সই করলে আমি জানতাম।

রঞ্জন চায়ে প্রথম চুমুক দিয়ে বলল, এই যে আপনি কিচেনে গেলেন চা করতে, মিনিট পনের গেল, আমাদের  ভিতর কী কথা হলো সব শুনলেন ?

বিনতা বলল, তেমন গুরুত্বপূর্ণ কথা হলে আমি পরে শুনতে পাব আপনার বন্ধুর কাছে।

কয়েকটা সিগনেচার, তার গুরুত্ব তখন ছিল না, তাই হয়তো শোনেননি, সুজনের মেমরি থেকে হারিয়ে গেছে।

বিনতা এবং সুজন চুপ। সুজন বুঝতে পারছিলেন রঞ্জন সরে যাচ্ছে, কিংবা সরে গিয়েছে। কেন হলো তা   বুঝতে পারছেন না। রঞ্জন না বলেছিল, অনলকে সে কেন ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তার কাছে এলে সে তাইই করত। রঞ্জনের কাছে তাহলে গিয়েছিল অনল। পেদ্রো পারামো তাকে বশ করেছে। অনল কীভাবে সন্ধান পেল রঞ্জনের ? অনল কীভাবে জানল, তিনি রঞ্জনের পরামর্শ চেয়েছিলেন ? তিনি রঞ্জনের কথামতো এগোচ্ছিলেন। কীভাবে জানল সে ? রঞ্জন কি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ? কেন করবে ? রঞ্জনের কি অভিলাষ আছে জীবন-কৃতী   সম্মাননায় ? সমস্ত জীবন পুলিশ সার্ভিসে কাটিয়ে সুনামের সঙ্গে অবসর নিয়ে, এখন কি রঞ্জন সেই পুরোনো    আকাক্সক্ষার দিকে আবার এগোতে চায় ? তিনি তো বলেইছিলেন চেতনার রঙে যোগ দিতে। রঞ্জন তা করেনি। এখন হয়তো জয়েন করতে চায় অনলের নানা রকম পরিকল্পনায় মুগ্ধ হয়ে।

রঞ্জন উঠবেন। বললেন, আমার মত জানালাম, ঠিক এই বয়সে উত্তেজনা পরিহার করতে হয়, তোমার যে  পার্টনার, সেই তিন্নি রায় তো কোনও দায়ই নেবে না, সব বইতে হবে তোমাকে, ভেবে দেখো।

রঞ্জন চলে গেলে বিনতা বললেন, তুমি আর এ নিয়ে ভাববে না, সিদ্ধান্ত যা নিয়েছো, তা নিয়েই থাকো।

সুজন বললেন, এমন কি হতে পারে ?

কী হতে পারে ?

আমিই কি সই করেছি ?

তুমি জানো না সই করেছ কি না।

আমি তো জানি সই করিনি, কিন্তু অনল এত কনফিডেন্ট হয়ে বলছে কী করে, আর রঞ্জন তার কথায় বিশ্বাস করেছে সেই কারণে।

তখন ফোন বাজল। অনলের নাম ভেসে উঠল ফোনের স্ক্রিনে। তাকিয়ে আছেন সুজন। সব খবর অনল পেয়ে   গেছে, এখন কী বলতে পারে সে ?

চৌদ্দ 

গৌরচন্দ্র গুপ্তকে ফোন করলেন সুজন। বেজে গেল। তিনবারের বার থেমে গেলেন সুজন। তখন গৌর নিজেই   যোগাযোগ করল, জিজ্ঞেস করল, আপনি সিদ্ধান্ত বদল করছেন সুজনদা ?

না, কেউ বলেছে ?

বলেনি, কিন্তু মনে হলো যেন।

সুজন জিজ্ঞেস করলেন, মনে হলো কেন ?

হতেই পারে, কিন্তু আমার মত হলো আপনি সিদ্ধান্ত বদল করবেন না।

তাই তো করছি, আমি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি।

করবেন, না হলে আপনিই পরিত্যক্ত হবেন, ভুল করেছেন তা সংশোধন করার সুযোগ এটা, প্রস্তাবে সই না করাই ঠিক ছিল।

সুজন বুকে বল পান, বললেন, আমার সিগনেচার জাল করেছে ও, আমি কোনও প্রস্তাবে সই করিনি।

এটা কেউ বিশ্বাস করছে না, এর জন্য আপনাকে আদালতে যেতে হবে।

সুজন বললেন, রেজিস্ট্রেশনের সময় যে অ্যাপ্লিকেশন করা হয়েছিল, সেখানেও আমার নামে সই জাল করা হয়েছে, আমি কোনও সই করিনি।

এটা না বলে আপনি আপনার সিদ্ধান্তে অচল থাকুন।

কোন সিদ্ধান্ত ?

রিফিউজ করবেন বলেছিলেন সেদিন।

তা ঠিকই আছে।

গৌরচন্দ্র বললেন, আর সিগনেচার জাল এই কথা বলবেন না, অনল বলেছে প্রকাশ্যে এটা বললে, আপনার নামে মামলা করবে।

অনল কাকে বলেছে ?

আমাকে বলেছে, আমি তাই আপনাকে কল করলাম।

আমি তোমাকে তিনবার রিং করেছি।

অবাক হলেন গৌর, বললেন, ফোন করেছিলেন, কবে ?

এই তো এখন।

না তো, তাহলে ফলস রিং শুনিয়েছে, আমার কাছে কোনও ফোন আসেনি।

সুজন চন্দ বললেন, আশ্চর্য! আমি তিনবার কল করলাম।

অমন হয় সুজনদা, বলছি, এখন ফেরার রাস্তা হলো রিফিউজ করা, তাই করুন।

সুজন চুপ করে থাকলেন কয়েক দণ্ড। ভাবছিলেন গৌরচন্দ্র কেন মিথ্যে বলল, তিনবার কল করলেন, তিনটিতেই ফলস রিং হলো ? গৌর কি বিশ্বাস করে না তাঁর কথা ? তিনি সই করেননি, তা মানতে চায় না ? গৌর  কি অনলের হয়ে তাঁকে ভয় দেখাতে ফোন করল। স্বাক্ষর জালের কথা প্রকাশ্যে বললে অনল মামলা করবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে কথাটা অনল বলেছে ?

হ্যাঁ, তাই আপনাকে ফোন করলাম।

তোমার সঙ্গে অনলের কথা হয় ?

হয়, নতুন একটা প্রোজেক্ট করেছে, রিটার্ন টু মাই হোম।

তুমি তো বলেছিলে, এটা অ্যাবসার্ড, হতে পারে না।

বলেছিলাম কি, না মনে হয়।

বলোনি ?

না, কদিন আগে সব ডিটেলে শুনলাম, অনল এসেছিল আমার বাড়ি, একেবারে প্রোজেক্টের ডিটেইলস নিয়ে।

সুজন আবার নিশ্চুপ। কেমন যেন ভয় হচ্ছিল। অনল টোপ দিয়ে লোক তুলছে। এতকালের বন্ধু রঞ্জন যা বলল,  গৌরচন্দ্রও প্রকারান্তরে তাই বলছে। তিনি থিয়েটার করা লোক। তাঁর দলে কি নানা রকম বিক্ষোভ হয় না ? সব থামাতে হয় তাঁকে। আড়ালে তাঁর বিরোধিতা কি হয় না ? তাও দূর করতে হয় তাঁকে। কত রকম ক্ষোভ, ভালো  চরিত্র না পাওয়া, কর্তৃত্ব করতে না পারা, এই সব। তিনি সামলাতে জানেন, আবার রুখে দাঁড়াতেও পারেন মিথ্যের বিরুদ্ধে। সুজন বললেন, বিশ্বাস কেউ না করলেও, সত্যটা সত্য থাকবে গৌর, মামলা করুক ও, আচ্ছা আমি লিখব না, তিন্নি লিখবে সোশ্যাল মিডিয়ায়, ফেসবুকে, ওর ফলোয়ার পঞ্চাশ হাজার, ওর বিরুদ্ধে মামলা করুক, মার্কিন দেশ হলে ও জেলখানায় থাকত, আমাদের সংগঠন নিজের করে নিয়েছে ছলচাতুরি করে। 

রাগে গরগর করছিলেন সুজন চন্দ। মামলা করবে, করুক। গৌর বললেন, উত্তেজিত হবেন না সুজনদা, তিন্নি   লিখলেও এই স্বাক্ষর নিয়ে কথা উঠবে যদি আপনি তিন্নিকে সমর্থন করেন। তখন আপনাকে প্রমাণ করতে হবে, সিগনেচার আপনার  নয়।

কেন ও প্রমাণ করুক আমি সই করেছি।

ও বলছে ওর প্রমাণের দায় নেই কেউ যদি মিথ্যে বলে।

চুপ করে গেলেন সুজন। ভাবলেন ফোন কেটে দেন। তবু নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী মনে করো, আমি সত্যি বলছি না ?

গৌরচন্দ্র বললেন, আমার মনে করায় কী যায় আসে, ও অনেকবার গিয়েছে আপনার বাড়ি, সেই ছবিও আছে, ও যে যায়নি তা সত্য নয়।

আসেনি এই কথা তো আমি বলছি না।

তাহলে যা হয়েছে তাই বলুন।

কী হয়েছে ?

গৌর বললেন, আপনার বাড়ি গিয়ে আপনার স্বাক্ষর নিয়েছে, আপনি না সই করলে কোনও প্রস্তাবই আইনত গ্রাহ্য নয়, তাও করা হয়েছে শুনলাম, প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়ে আপনি তার বিপক্ষে গেলেও, কারণ জানাতে হবে।

গৌর আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না। গলার স্বরে অসহায় ভাব ফুটে উঠল।

গৌরচন্দ্র বললেন, আসলে যা সত্য তা বলছি সুজনদা, বাস্তবতাকে কি অস্বীকার করা যায় ?

সুজন বললেন, তাহলে আমি মিথ্যে বলছি ?

মিথ্যে বলবেন কেন, আপনি ভুলে গেছেন।

ভুলে যাব কেন ?

বয়স হলে এটা হয় সুজনদা, সাবধান হন, আপনি কি ট্রাঙ্কুলাইজার নেন ঘুমের আগে ?

সামান্য, পয়েন্ট টু ফাইভ অ্যালপ্রাক্স।

গৌর বললেন, ডিমেনশিয়ার দিকে যাত্রার প্রাথমিক অবস্থা এটি, বি কেয়ারফুল।

তুমি খাও না ঘুমের জন্য ?

বয়স হলে কায়িক পরিশ্রম কমে যায়, ফলে ঘুম কমে যায়, মেনে নিয়েছি।

তুমি ভুলে যাও না ? জিজ্ঞেস করেই সুজন বুঝলেন ভুল করেছেন। এই প্রশ্নে নিজের ভুলে যাওয়াকে সমর্থন   করা হলো। অনলের কথা মেনে নেওয়া হলো।

গৌর বলল, ভুলব না কেন সুজনদা, কত কলিগের নাম মনে করতে পারি না, একটা গেট টুগেদার হয়েছিল আমাদের, কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম চিনতে না পেরেই, আসলে শরীর ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে গেলে, মনও ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে যায়।

এবার সুজন নিজের কথাকে ফিরিয়ে নিলেন, বললেন, আমি তো ইনঅ্যাক্টিভ নই, নতুন নাটক নামছে, তার জন্য পরিশ্রম জানো, এখনও লিড রোলে আমি, অভিনয় করতে পরিশ্রম নেই ভাবো ?

গৌর বললেন, ঠিক এই কারণেই আপনাকে সংবর্ধনা দেবে বলছে অনল, আপনি না করছেন, অথচ প্রস্তাবে   প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনার সই, এটার ব্যাখ্যা কী, আপনি ভুলে গেছেন, এই ভোলা কিন্তু সহজ কিছু নয়, ইঙ্গিত  দিচ্ছে ডিমেনশিয়ার, অবশ্য আপনি যদি যদি জ্ঞানত স্বাক্ষর করে ভুলে না যান।

সুজন বুঝলেন, সব বদল হয়ে যাচ্ছে। যাকে পরম সহায় মনে করেছিলেন, তার গলায় অবিশ্বাসের সুর। অনল বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে তা আন্দাজ করেছিলেন তিনি। আন্দাজ মিলে যাচ্ছে। এক ব্যক্তি এতখানি জালিয়াতি করে সকলের সমর্থন আদায় করে নিচ্ছে। এবং তাঁকে একলা করে দিচ্ছে।

ফোন কেটে দিলেন সুজন। বুঝলেন রঞ্জন, গৌর অনলের পক্ষে মত বদলেছে। অমিতাভ, চন্দন, সুব্রত, অনেক আছে মেম্বার। সকলকে তিনি ফোন করবেন ? কিন্তু কেউ তাঁকে তো ফোন করছে না। অন্তত অভিনন্দন জানিয়ে ফোনও করছে না। কারণ কেউ এই প্রস্তাব মেনে নেয়নি। মনে করছে সুজন চন্দ নিজেই নিজেকে পুরস্কৃত করছেন। তার অর্থ সকলেই প্রকারান্তরে ঢলেছে অনলের অনুকূলে। তাই হবে। না হলে তাঁকে ফোন করতই। তাঁর বাড়ি আসত। নিজেদের বিরক্তি অসমর্থন তাঁকে জানাত। কিন্তু চারদিকে অদ্ভুত এক নীরবতা বিরাজ করছে। মধ্যরাত্রির  স্তব্ধতা। চুপ করে বসে থাকলেন সুজন। বিনতা বললেন, তুমি আর কাউকে ফোন করো না।

সবটা তাহলে মেনে নিতে হয়।

বিনতা বললেন, রিজাইন দিয়েছো এবং পুরস্কার ফিরিয়ে দেবে, এতেই হবে।

মাথা নাড়তে থাকলেন সুজন, বললেন, আমি প্রস্তাবনায় সই করেছি, অনলের কথা তাই, আমি তাহলে  রিফিউজ করছি কেন, কী কারণে সেই প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে।

বিনতা বুঝলেন অনল চক্রব্যূহে প্রবেশ করেছে, নিষ্ক্রমণের পথ জানে না। একমাত্র উপায় সব কিছু স্বীকার করে নেওয়া। পুরস্কার বিনা বাক্যে গ্রহণ করা। লোকে অনেক কথা বলবে, ব্যঙ্গ করবে, বিদ্রুপ করবে, তা সহ্য করা। সময় গেলে লোকে অন্য কিছুতে মত্ত হবে, তখন নিশ্চিন্ত হবেন সুজন। ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ সহ্য করতেই হবে। কবিদের কেউ কেউ ভয়াবহ বিদ্রƒপ এবং নিন্দার মুখোমুখি হন কৃতকর্মের কারণে, কিন্তু তা সহ্য করে দিব্যি  আছেন। এই অভ্যাস রপ্ত করতে হবে সুজনকে। তিন্নির সঙ্গে বন্ধুত্ব ত্যাগ করতে হবে। তিন্নি তাঁর অনুরাগিনী, নাটক পছন্দ করে, অভিনয় পছন্দ করে, নিজের প্রিয় শিল্পীর এই পরিবর্তনে সে হতাশ হবে। তার সমস্ত শ্রদ্ধা চলে যাবে। বলবে, ‘আমি আপনার কোনও নাটক আর দেখব না। কলকাতায় গিয়ে আপনার সঙ্গে আর যোগাযোগ করব না। আমি আপনাকে কালো তালিকাভুক্ত করছি।’ বিনতার সঙ্গে সুজনের পরিচয় নাট্যক্ষেত্রেই। বিনতাও   অভিনয় করতেন। তারপর ছেড়ে দেন তা। কিন্তু কোনও অভিমানে তা ছাড়েননি। হতাশা নিয়ে ছাড়েননি। ছেড়েছেন সুজনকে আরও বেশি সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। তিনি নিজে বুঝেছিলেন, তাঁর প্রতিভা সীমিত। তা নিয়ে বহুদূর যাওয়া যায় না। কিন্তু সুজন সত্য অর্থেই প্রতিভাবান। জীবনের উপান্তে এসে এক জালিয়াতের পাল্লায়  পড়ে এতদিনের অর্জিত সুনাম ডোবাও নয়, গোস্পদে বিসর্জন দিতে হবে। তিন্নি কেন, সুজনের অনেক অনুরাগীই  অবাক হবে। হতাশ হবে। সুজনকে পরিত্যাগ করবে। একজন শিল্পীর খুব বড় ব্যর্থতা এটা যদি তার দর্শক তাকে ছেড়ে যায়, পাঠক তাকে পরিত্যাগ করে। বিনতা বুঝতে পারছিলেন সমস্যা। তাঁরা চুপচাপ সময় অতিবাহিত করতে লাগলেন। এই সময় তিনি না পেরে আব্দুল মতিনকে ফোন করলেন। মতিন চেতনার রঙের  কেউ নয়। কিন্তু তাদের সাহায্য করেছে অনেক। সে আশ্রয় বলে একটি সংগঠন চালায়। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই ত্রাণসামগ্রী বিলি করা হয়েছিল। মতিন হলো তিন্নির সহপাঠী। বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একসঙ্গে পড়ত। মতিনও অ্যাস্ট্রোনমির অধ্যাপক। কিন্তু কেরিয়ার না গড়ে সে আশ্রয় গড়েছে। মতিনকে দেখেই তিন্নির মনে এই সংগঠনের ভাবনা এসেছিল। মতিন ফোন ধরে বলল, স্যার, চেতনার রঙ কি আপনাকে ফেলিসিটেট করবে, ওয়েবসাইটে দেখলাম যেন।

দেখেছেন ?

হ্যাঁ, আমি আপনার সম্পর্কে অত জানতাম না, ভালো লাগল, আপনার ফুল বায়োডাটা দিয়েছে।

তিন্নির সঙ্গে কথা হয় ?

এর মধ্যে হয়নি, কিন্তু একটা কথা, আমার কাছে একটা মেইল এসেছে অনল চৌধুরীর থেকে, তিনি একাউন্টস বুঝে নিতে চাইছেন, আমি উত্তর দিইনি, আমার কাছে তো টাকা-পয়সার হিসাব থাকার কথা নয়, আমি হিসাব দিতে বাধ্য নই। 

পনের

অনল চৌধুরী বুঝতে পারছিল, তার পরিকল্পনা সফল। সুজন চন্দকে আলাদা করে দেওয়া গেছে। নিঃসঙ্গতার একশ কেন সহস্র বছর শুরু হলো সুজনের। তা আর ফুরোবে না। তিন্নি ত্যাগ করবে লোকটাকে খুব শিগগির যখন ওয়েবসাইটে দেখা যাবে, সুজনের সমর্থন আছে, স্বাক্ষর আছে প্রস্তাবে। সুজন যদি তেমন কিছু বলে, উকিলের চিঠি চলে যাবে, যতই হোক না কেন, উকিলের চিঠি কে না ভয় করে। নীলেশদা, আপনি খুশি তো।

বাঙ্গালুরুবাসী নীলেশ বলল, যদি অ্যাওয়ার্ড নেয়, টাকার কী হবে ?

টাকা চেতনার রঙে দান করে মুখ রক্ষা করবে, কিন্তু পুরস্কারের রহস্য এবং কালি তাতে মুছবে না, তিন্নি নিউ ইয়র্কে থাকুক, কলকাতায় লুকিয়ে এসে লুকিয়ে ফিরে যাক, আমি তো বাতাসে ভাসিয়ে দেব সুজন চন্দ নিজের নাম নিজে প্রস্তাব করেছেন।

নীলেশ বলল, তুমি পেদ্রো পারামোর বংশধরই, বইটা আমাজন থেকে কিনেছি কিন্তু পড়তে গিয়ে বুঝতে পারছি না।

বুঝতে হবে না, সাজিয়ে রেখে দিন, সুজন চন্দের রিটার্ন টু মাই হোম হবে, গৌরদা, রঞ্জনদা সব কনভিন্সড, আসলে কেউই চায় না সুজন চন্দ সংবর্ধিত হন, কেউই অন্যের সফলতায় খুশি হয় না, প্রত্যেকেই মনে করে এটা অতিরিক্ত, বুঝলেন নীলেশদা ?

নীলেশ বলল, এখন তুমি কোথায় ?

আমি একটু বেলপাহাড়ি যাচ্ছি দেবুকে নিয়ে, কদিন রেস্ট নেব, দেবু সাজিয়ে দেবে আমি রিল্যাক্স করব, নীলেশদা তুমি থাকলে ভালো হতো, জমে যেত, তবে দেবুকে তখন নিজের মতো করে পেতাম না, এখন ও পা টিপবে, মাথা টিপবে, দলাই মলাই করবে।

নীলেশ বলল, সে আমি থাকলেও, আমি আদেশ করলে করত সেবা, যদি আমি কলকাতায় থাকতাম, তোমার   সঙ্গী হতাম।

দিন তো ফুরিয়ে যাচ্ছে না, আপনি বরং সুজন চন্দকে কল করুন, হাবভাব আন্দাজ করুন, একটু ভয় দেখান   কথা বলুন, বলুন রিফিউজ করলে কারণ দর্শাতে হবে, চেক চেতনার রংকে দান করে দিলে, সুনাম একটু রক্ষা হবে।  

অনল চলল দেবুকে নিয়ে বেলপাহাড়ির দিকে জঙ্গলে। জঙ্গল মহলে। দেবু অসম্ভব লয়াল। চুপচাপ আজ্ঞা পালন করে। নীলেশ দাসকে আর ফেরত দেবে না এমন জিনিস। টাকা দিয়ে দাস কিনেছে সে। দেবু তার সম্পত্তি।

কলকাতা থেকে পশ্চিমে চলেছে তারা। দেবু ড্রাইভ করছে। হাত খুব ভালো। হাইওয়ে দিয়ে ছুটল সেই দামি  গাড়ি। রানিহাটি, উলুবেড়িয়া, বাগনান, রূপনারায়ণ নদ, কোলাঘাট পার হয়ে পশ্চিমে ছুটছে গাড়ি। তার পাশে  বসে আছে অনল স্যার। অনল স্যার ফোনে কথা বলতে ভালোবাসে খুব। অবিরল কথা বলে যাচ্ছে। দেবু আচমকা গাড়ি থামিয়ে দিল, সাইড করে বলল, স্যার আপনি পিছনে বসে কথা বলুন, গাড়ি চালাতে অসুবিধে হচ্ছে, বেশি কথা শুনলে আমার ঘুম পেয়ে যায়।

অনল অবাক হলো, কেউ কথা বললে ঘুম পায় ?

ইয়েস স্যার, ঘুম পায়।

অনল বলল, তুমি যে উলটো কথা বলছো।

দেবু কোনও উত্তর দিল না। অনল কী মনে করে পিছনে গিয়ে বসল। কথা বলছিল এত সময় নীলেশের সঙ্গে। কিন্তু নীলেশও বেশি সময় কথা বলতে পারল না, নাতির সঙ্গে ফুটবল খেলছে। বলল, কবে কলকাতা ফিরবে জানে না, নাতি নিয়ে খুব আনন্দে আছে। অনল তখন ফোন জুড়ল সুজন চন্দের সঙ্গে। সুজনদা, আমার নতুন প্রোজেক্ট   রিটার্ন টু মাই হোম, আপনি ব্যাক করুন।

মর্মাহত সুজন চন্দ এই ফোন পেয়ে ভাবলেন, অনল হয়তো ভুল বুঝতে পারছে, বুঝতে পারছে সুজন চন্দ ভাঙবেন কিন্তু মচকাবেন না। কিন্তু অনলের সেই বস্তাপচা প্রোজেক্টের কথা শুনে সুজন বললেন, এসব হয় না, তুমি যা ভাবছো তা হবে না। 

হবে, দেখবেন কেমন হবে, কত টাকা যে আসবে, এটা গবেষণামূলক প্রকল্প, অনেকগুলি ফেলোশিপ দেওয়া হবে, আপনি একটা নাটক লিখুন, সেই নাটক চেতনার রং প্রযোজনা করবে। আগামী সাতই এপ্রিল, আপনার  জন্মদিনের অনুষ্ঠান, গর্জিয়াস হবে, ওখানেই নতুন প্রোজেক্টের কথা ঘোষণা করে দেব। 

সুজন আবার বললেন, আবার লোভ দেখাচ্ছ, তুমি একটা সংস্থা হাতিয়ে নিয়েছো, আমি ঐ দিন উপস্থিত থাকব না।

আপনার অনুষ্ঠান, জীবনকৃতী সম্মান দেবেন মারাঠি থিয়েটার এবং সিনেমার অ্যাক্টর―, তাঁকে উড়িয়ে আনছি  আমরা, অনেক টাকা ফিজ দেব, আপনি না থাকলে হবে ?

সুজন বললেন, যা ইচ্ছে করো, আমি নেই, তার আগেই আমি প্রেসে সব ক্লিয়ার করব, তিন্নিও আসছে, আমরা দুজনে প্রেস মিট করব।

অনল শান্ত গলায় বলল, সুজনদা, আপনি পরামর্শদাতা, আপনি যা বলবেন তা হবে, আমার বহুদিনের ইচ্ছে  আপনাকে ফেলিসিটেট করি, দারুণ হবে তা, আপনাদের প্রেস মিট করতে হবে না, আমিই করব, আপনি পাশে থাকবেন, নট তিন্নি।

সুজন বললেন, তিন্নি ছাড়া কিছু হবে না, সে আসুক, মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অনল চুপ করে থাকল। তারপর বলল, তিন্নির সঙ্গে মিটিং কেন হবে, তিন্নি কেউ নয়, আপনিই সব, খুব শিগগির অদিতি শুভ্রা যাবে ক্যামেরা নিয়ে আপনার কাছে, তথ্যচিত্র তৈরি করবে আপনার উপর, তিন্নি এসব ভেবেছে কোনও দিন ?

তিন্নিই এই প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়েটর, ও ছাড়া এই প্রতিষ্ঠান জন্মাত না।

আপনি তিন্নি নিয়ে অবসেসড, তিন্নি চাঁদা তুলে নিজের অ্যাকাউন্টে জমা করেছে।

সুজন বললেন, তোমাকে যে কেন  নিয়েছিলাম  গ্রুপে, খুব ভুল করেছিলাম।

হাসল অনল, বলল, কী যে বলেন, তিন্নির চেয়ে ভালো মেয়ে রিক্রুট করব আমি, যদি চান তাকে নিয়েই লং ড্রাইভে যাব, আমি আপনি আর সে, দাদা, চলুন একটা লং ড্রাইভে যাই।

তুমি তো অপমান করছো আমাকে, নোংরা কথা বলছো। শান্ত গলায় বললেন সুজন।

ছি, আমি আপনাকে অপমান করব! আপনি প্রণম্য, বলছি চলুন ঘুরে আসি রাঁচি, বেতলা ফরেস্ট, গাড়ি নিয়ে যাব, না হলে পুরুলিয়া, অযোধ্যা পাহাড়, আমার নতুন ড্রাইভার দেবু মাণ্ডিও সঙ্গে যাবে, খুব ভালো চালায়, রিটার্ন  টু মাই হোম প্রোজেক্ট দেবুকে দিয়ে শুরু করেছি আজ, জঙ্গলমহলে যাচ্ছি, ওদের আদি পুরুষ জঙ্গলবাসী ছিল।

সুজন আর কিছুই বললেন না। অনলের কথা পছন্দ হয়নি। অনল তখন বলল, আপনার পদ্মভূষণ নেক্সট  ইয়ারে হবে, আমি যোগাযোগ করেছি।   

আমি রিফিউজ করব, তুমি আমাকে পাইয়ে দেবে ?

অনল বলল, আপনি কি জানেন না, আপনিই আমাকে বলেছিলেন, আমি তাই যোগাযোগ করেছি, সব প্রস্তাবেই আপনার সই আছে, পদ্মভূষণের প্রস্তাবেও।

আমি বলেছিলাম, তুমি এত বড় মিথ্যেবাদী!

অনল বলল, সরাসরি বলেননি, কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, আপনি একজন ডিপ্রাইভড পার্সন, সুজনদা আমি মঙ্গলবারে আপনার কাছে যাব।

আসতে হবে না, তোমাকে আমার ভয় করছে, তুমি আমাকে পাঁকে টেনে নামাচ্ছ, উদ্দেশ্য কী ? 

একদম না, আই লাভ ইউ সুজনদা, ইউ আর অ্যান এভারগ্রিন পার্সন, চির তরুণ।  

 সুজন বিরক্ত হলেন, তোমার কথা আমি একটিও বুঝতে পারি না, মিথ্যের ঝুড়ি নিয়ে কথা বলো।   

একদম না, আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন সুজনদা, আমি আপনাকে গুরু মানি, শ্রদ্ধা করি।

সুজন চুপ করে আছেন। অনলের মিথ্যে শুনছেন। একের পর এক কাহিনি বানায় অনল। গল্প তৈরি করে। কিন্তু  কত মিথ্যে সহ্য করবেন, বললেন, আমি যদি আগে জানতাম, তোমাকে নিতে বারণ করতাম, তুমি লোভী, যা দেখবে গ্রাস করতে চাও, আই ডু নট লাইক ইউ।

অনল শান্ত গলায় বলল, আমি কি আপনাকে বলিনি, চেতনার রং হতে পারে আমাদের সংগঠনের নাম ?

সুজন বলেছিলেন, না বলনি, এটা তিন্নির দেওয়া নাম।

অনল বলল, আবার তিন্নি, ভুলতে পারছেন না ওকে, নামটা আসলে তো রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে নেওয়া, এটা রবি ঠাকুরের, আমিই প্রস্তাব করেছিলাম, আপনি মনে করতে পারছেন না, থাক, আমাদের নাম দিয়েছেন রবি ঠাকুর, আনডিসপিউটেড, আমার চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ―আপনি আপনার সংবর্ধনার দিন দেখবেন অনল চৌধুরী কী করতে পারে, আপনি আমাদের সভাপতি, না করতে পারবেন না।

সুজন জিজ্ঞেস করলেন, আমি সভাপতি কে বলল, আমি রিজাইন করেছি।  

পদত্যাগ পত্র নট অ্যাকসেপ্টেড, আপনি তো জানেন আপনিই সভাপতি, আপনি না করেননি আমার প্রস্তাবে, এখন উৎসবের সামনে রিজাইন দিলে হবে ?

সুজন বললেন, তুমি চেতনার রং নাম না নিয়ে অন্য নাম নিতে পারতে, তুমি আমাদের সংগঠনকে কপি করলে  কেন ?

এটা সেই সংগঠনই, মূল সংগঠন, ভুল করছেন সুজনদা, আপনি তো প্রথম থেকেই প্রেসিডেন্ট।

না, আমি তোমার সংগঠনের প্রেসিডেন্ট নই।

আপনি চেতনার রঙ সংগঠনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।

সেই চেতনার রঙ এইটি নয়।

চেতনার রঙ দুটো হতে পারে নাকি, একটিই, এবং আপনি তার সম্মাননীয় প্রেসিডেন্ট।

আমি তিন্নির সঙ্গে আছি।

তিন্নি তো আমাদেরই মেম্বার, আপনার কথায় ওকে মেম্বার করে নিয়েছি আমি, ও টাকা কালেকশন করে পাঠাবে, হোয়াটসঅ্যাপ করেছে, তিন্নি ভুল বুঝতে পারবে, চেতনার রং একটা বিশ্ব বঙ্গ সম্মেলন করবে  কলকাতায়, বিদেশের সব বাঙালি আসবে, আপনার নেতৃত্বেই হবে, আপনিই সব।

ষোলো

সুজন চন্দ জেনে গেছেন, এরপরে তাঁকে ছেঁটে দিয়ে সবটা কুক্ষিগত করবে অনল। মিথ্যে বলতে ওর জুড়ি মেলা ভার। তিনি অত সহজে নুয়ে যাওয়ার মানুষ নন। অনলের সঙ্গে সমানে তর্ক করে যাচ্ছেন, বলছেন, এত মিথ্যে  তুমি বলতে পারো, তিন্নি তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছে ?

করেছে, আপনাকে বলবে নাকি, আপনাকে এক কথা বলছে আমাকে অন্য কথা, কোভিডের পর থেকে ওর হাজব্যান্ডের চাকরি নেই, ওর টাকার দরকার, আমি সে সমস্যা মিটিয়ে দেব, তিন্নির ব্রেভ ফোটোগুলো ডিলিট   করেছেন তো ?

বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলে আমাকে ভয় দেখাবে না।

আমি এই সংস্থাকে এক বছরের ভেতর পরিচিত করে তুলব, প্লিজ আপনি যেভাবে ছিলেন, সেই ভাবে থাকুন।  অনল নরম গলায় যেন অনুনয় করল, তিন্নির চেয়ে সেক্সি মেয়ে আমাদের টিমে আসবে। 

উফ, তুমি কি মানুষ ?

আমি পেদ্রো পারামোর বংশধর, কিছুতে কেয়ার করি না, সব বুঝি, কেমন মেয়ে চাই আপনার ?

সুজন এই নোংরা কথায় দমে যান না, বললেন, আমি তোমার চেতনার রঙে নেই, এটা মিথ্যে চেতনার রঙ, ফেক চেতনার রঙ।

অনল বলল, আপনি তিন্নি দ্বারা চালিত হচ্ছেন, শুভ্রা অদিতিও কম সুন্দর নয়, বয়স কত কম, অনেক সেক্সি, তারাও ভালোবাসবে আপনাকে। 

একদম বাজে কথা বলবে না। গরগর করে উঠলেন সুজন।

অনল পাত্তাই দিল না গরগরানিকে। বলল, সুজনদা, তিন্নি ও আপনাকে নিয়ে বাতাসে কথা ভাসছে, আমি প্রোটেস্ট করেছি, আপনি তিন্নির বিপক্ষে বলুন, ওকে ত্যাগ করুন, আমি ওর সব মেসেজের স্ক্রিনশট বাজারে ছেড়ে দিতে পারি, কিন্তু তা করব না, ওকে সাহায্য করব।

যা রটার রটুক, রটাতে পারো তুমি, আমাকে ভয় দেখিও না। 

অনল বলল, তিন্নি সব মিথ্যে কথা বলেছে, আপনাকে নিয়ে কথাটা ও রটিয়েছে।

সুজন বললেন, মিথ্যে দিয়ে এসব কাজ হয় না অনল, তুমি এমন অন্যায় করেছো যার জন্য আমার মাথা নত হয়ে গেছে।

অনল বলল, আমি জ্ঞানত কোনও অন্যায় করিনি, আমার নিজের জিনিস বুঝে নিয়েছি, চেতনার রঙ নিয়ে  আমার অনেক স্বপ্ন।

সুজন ফোন কেটে দিলেন। গাড়ি হাইওয়ে দিয়ে ছুটছিল। শীতের বেলা। সন্ধে নাগাদ বেলপাহাড়ি পার হয়ে লাল ডুংরি বাংলোয় পৌঁছে যাবে। দেবুর হাত খুব ভালো। দেবু ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, স্যার আপনি এত ফোন করেন কেন ?

দরকার হয়। বিরক্ত হতে গিয়েও সামলে নিল অনল।

দেবু জিজ্ঞেস করল, আপনি আমেরিকায় ফিরবেন না ?

কেন ? অবাক হলো অনল।

জিজ্ঞেস করলাম, এত সত্যি মিথ্যেয় কাজ কী ?

অনল বলল, মিথ্যে বলতে হয়, মিথ্যে বলে অনেক সময় বড় কাজ উদ্ধার করা যায়। বলতে বলতে অনল  আবার ফোনে ধরল সুজন চন্দকে, দাদা, রাগ করলেন, এখন মনে হচ্ছে আপনাকে নিয়ে এলে বেশ হতো, এখান থেকে আদিবাসী মেয়ে তুলে নিতাম ?

চুপ করে থাকেন সুজন। অনল বলল, আপনার কোনও দরকার পড়লে আমাকে বলবেন, আমরা চেতনার রং   নিয়ে সব অপপ্রচারের জবাব দেব।

সুজন বললেন, এমন মিথ্যেবাদী আমি কম দেখেছি, প্যাথোলজিকাল লায়ার।

রাগ করবেন না সুজনদা, এনজয় করার কথা বলেছিলাম, আমি সাফ বলতে পছন্দ করি, আপনার সব ইতিহাস আমি জানি, মনে রাখবেন আমি কোনও অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই না।

সুজন বললেন, আমি ফোন রেখে দিচ্ছি, আমাকে তুমি ভয় দেখিয়ে কিছু করতে পারবে না।

ভয় দেখাচ্ছে কে, যা সত্য তা বলছি, জানেন তো ট্রুথ ইজ ক্রিয়েটেড নাও, সত্য নির্মিত হয়।

আমাকে নিয়ে তোমার সমস্যা কী, আমি প্রেসে সব বলে দেব।

ইয়েস, আপনি প্রেস মিট করে বলবেন, লিখবেন আপনার ফেসবুকে, আমার চেতনার রঙই আসল চেতনার  রং, আমিই এর প্রবর্তক, একটা ভিডিও করে নেব আপনার, ইন্টারনেটে সব ছড়িয়ে দেব। 

সুজন চুপ করে থাকেন। অনল বলল, আমি একটা হোম স্টে করেছি ঝাড়গ্রাম জেলায়, অনেকটা জঙ্গল কিনব  আদিবাসী সমেত, তাদের উন্নয়ন হবে আর ট্যুরিজমও চলবে, আপনি উদ্বোধন করবেন, সেখানে বসে নাটক লিখবেন, ওয়ার্কশপ করবেন নাটকের।

সুজন বললেন, রাবিশ।

অনল বলল, আপনি ভুল করছেন সুজনদা, আশ্রয়ের আব্দুল মতিনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সে স্টেটমেন্ট দেবে, আমার সঙ্গেই তার মূল যোগাযোগ, নইলে তার বিপদ আছে, সে যা টাকা পেয়েছে, চেতনার রং থেকে পেয়েছে, হিসাব দিতে হবে, এফআইআর করলে ঝঞ্ঝাট তাকে এবং আপনাকে সামলাতে হবে, আমি তিন্নির নামেও এফআইআর করতে পারি, মতিন আমার কাছে এসে মাথা নামিয়ে দাঁড়াবে।  

সুজন বলল, আমি এবার রাখি, বেরোতে হবে।

রাখবেন, রাখবেন তো নিশ্চয়ই, কিন্তু আপনি এত মিথ্যেকে কেন সমর্থন করছেন ?

তোমার কোনও মিথ্যেকে আমি সমর্থন করি না।  

দুনিয়ার সবাই জেনে যাবে মিথ্যে, আমার টিমে ইউএস, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকে ডোনেশন আসছে,  সুজনদা, আপনি খুব ভুল করছেন, গৌরচন্দ্র, রঞ্জনদা আমার টিমে এসে গেছেন।

সুজন বললেন, জালিয়াতি ধরতে পারলে আর থাকবে না। 

আপনি একা হয়ে যাবেন।

সুজন বললেন, না হব না, হলেই বা কী, একটা ফ্রডের সাহায্য নেব না।

আপনি চেতনার রঙের প্রেসিডেন্ট, আপনি আমার কথামতো চলুন, গোঁয়ার্তুমি করবেন না।

অরণ্যের পাশ দিয়ে ছুটছিল গাড়ি। এই অরণ্য কবছর আগেও ভয়ের ছিল। উগ্রপন্থিরা আশ্রয় নিয়েছিল   এখানে, সি আর পি ক্যাম্প থেকে রাইফেল লুট করে নিয়ে গেছিল। নামী উগ্রপন্থি নেতা শিবির গেড়েছিল এখানে। তারপর তাদের নিকেশ করেছে সরকার। এখন ভয় অনেক কম। শান্ত হয়ে আছে জঙ্গল। সামনে বাঁদিক ঘেষে সূর্যের রং লালচে হয়ে গেছে। দেবু তাকিয়ে আছে জঙ্গলে। স্টিয়ারিং হাতে।

সুজন বললেন, তুমি এত অন্যায় করেছো অনল, তুমি কীভাবে এত মিথ্যে বলো, গৌরের সঙ্গে আমার একটু আগে কথা হলো, তুমি তাকেও ভুল বুঝিয়েছ। 

কী যে বলেন দাদা, আমি কোনও অন্যায় করিনি, আমি কিছুই করিনি, গৌরদা এত সহজে ভুল কথা সত্যি মনে করবেন, তিনি যে হোয়াটসঅ্যাপ করেছেন, আপনি দেখবেন ?

আশ্চর্য! সুজন বিস্ময়ে মাপতে লাগলেন অনলের কথাগুলি। এসব কি প্র্রিরেকর্ডেড ভাষ্য। একই কথা বলে   যাবে অনর্গল। মনে হবে কথাটি সত্যের থেকেও সত্য।

অনল বলল, আপনি ভাবুন বসে বসে, ইতিমধ্যে ফেসবুক থেকে আমার বিপক্ষের সব পোস্ট, মন্তব্য মুছে  গেছে, আমি পেদ্রো পারামোর বংশধর, যা ভাবব তাই করব, আমার বিপক্ষে যে থাকবে, সে ধুলো হয়ে যাবে, সুজনদা, পেদ্রুনগরে আসুন, ভালো লাগবে, না হলে জঙ্গলে আসবেন, বেতলা যাব, সাসানডিংরি, বুদ্ধদেব গুহর উপন্যাসের জায়গায়, দেখুন সুজনদা, তিন্নি চুপ করে যাবে, ও জানে আমি কোনও অন্যায় করিনি, আপনিও  জানুন, বলুন, সত্যের পক্ষে কথা বলুন, দেখুন দাদা, আমি কোনও অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই না, পেদ্রো পারামোও   দেয়নি, তাই গ্রামটাকে ভূতের গ্রাম বানিয়ে দিয়েছিল, সুজনদা শুনছেন ?

সুজন চন্দর হাত থেকে ফোনটি আচমকা সোফার উপর পড়ে গেল। সুজন বসে শ্বাস নিচ্ছেন, নিঃশ্বাস  ফেলছেন ফোন রেখে। ফোনে অবিশ্রান্ত কথা ভেসে আসতে থাকে। এসে যেতেই থাকে। কথা বাজতে থাকে।   অনল কোনও অন্যায় করেনি, ফোনে সেই কথা বেজে যেতে লাগল অবিশ্রান্ত। হাত বাড়িয়ে ফোনটি নিয়ে বন্ধ  করবে যে সুজন, সে ক্ষমতাও তার নেই। সত্যের এমনই জোর। বিনতা ফোন কেটে দিয়ে বললেন, ওকে ফোন করো কেন, ওর ফোন ধরো কেন, ও চাইছে তোমাকে উত্তেজিত করে শারীরিক ক্ষতি করে দিতে।

তখন অনল ভাবছিল, লোকটার কলজের জোর আছে। তার সঙ্গে সমানে লড়ে যাচ্ছে। অন্য কেউ হলে  সেরিব্রাল হয়ে যেত, হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত। সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে অনল। তাকে সুবিধে করে দিতে লোকটা ফোনে তার সঙ্গে ঝগড়া করে যাছে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। রক্তচাপ বাড়ছে বলে মনে হয় না। বুকে ব্যথাও উঠছে বলে মনে হয় না। থিয়েটারের লোকের মতো অভিনয় করে যাচ্ছে সুজন চন্দ। উত্তেজিত হচ্ছেই না। প্রলুব্ধ হচ্ছেও না। এখন ক্লান্ত লাগছে। একই কথা কতবার বলবে, কতজনকে দিয়ে বলাবে ? ভয়ডর নেই সুজন চন্দর। উফ। ঘেমে গেছে সে। এসি বাড়িয়ে দিতে বলল। তখন দেবু বলল, আপনি এত কথা বলেন স্যার, একই কথা, কথাগুলো  কি সত্যি ?

সতেরো 

চমকে ওঠে অনল, বলল, তার মানে ?

মানে এই যে সব বলেন, আপনিই কি ঠিক বলেন ?

অনল গম্ভীর গলায় বলল, তোমার কাজ তুমি করো।

করছি তো, কিন্তু আমার কথাটার জবাব কি এটা ?

দেবু, তুমি আমার ড্রাইভার, ভুলে যাচ্ছ।

দেবু হঠাৎ গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমি আপনার ক্রীতদাস স্যার, কিনে নিয়েছেন নীলেশ স্যারের থেকে, তা আমি জানি, কিন্তু আমি নিজেকে বেচিনি, একটা ভালো মানুষের সঙ্গে ঐভাবে কথা বলতে হয় ?

অনল চুপ করে থাকে। তারপর শীতল গলায় বলল, আস্তে চালাও, কথা বল না।

কী বলেন পারামো না কী, আপনি আমার প্রভু তা আমি জানি।

তাহলে চুপ করে থাকো, আমি পেদ্রো পারামোর বংশধর।

ধুর, সব মিথ্যে, আপনি সেই গল্পটাই পড়েননি।

চমকে উঠল অনল, সুন্দরবনের দেবু মাণ্ডি বলছে কী ? বলছে পেদ্রো পারামোর বংশধর সেই ছেলেটা, কামালো,  তাইই তো, অনল কি সেই কামালো যার মাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল পেদ্রো পারামো। অনল কেউ না।  জাল পারামো, জালিয়াত। পেদ্রো পারামোর বংশধর আমি। শালা আমাদের জমি পাহাড় সব সেই শয়তানটা দখল   করে নিয়েছে, ক্ষেতের জমি পতিত করে দিয়েছে, শুয়োরের বাচ্চা জালিয়াত, আমাকেও কিনে নিয়েছে।

এই বলছিস কী, তোকে আমি পুতে রেখে দেব। গরগর করে উঠল অনল। 

দেবু স্থির। কথা বলে চুপ করে গেছে। গাড়ি ঝাড়গ্রাম পেরিয়ে এসেছে। পরিহাটি পেরিয়েছে। দহিজুড়ি শিলদা   পার হয়ে গেছে। এখন নির্জন বনভূমি চিরে যে রাস্তা, সেই রাস্তায় ছুটছে। অনল বলল, আস্তে চালাতে বলেছি, তুই চাস তোর চাকরি খাই।

চাকরি খাবে, খেও, আমি কামালোর বংশধর, দেখে নেব।

তুই পড়েছিস ?

পড়তে হয় নাকি, এমনিই জানা যায়, তোমার সঙ্গে দু দিন ঘুরলে সব বোঝা যায়। বলতে বলতে গাড়ির স্পিড  তুলল দেবু। তাতে অনল চিৎকার করে উঠল, আস্তে চালাতে বলেছি বানচোত।

তাহলে তুই চালা। দেবু ব্রেক কষল, বলল, গাড়ি চালাব যখন এত কথা বললে জঙ্গলে ঢুকে যাবে গাড়ি, চুপ করে বসে থাক, এখন সেই পারামোর গ্রামে পৌঁছে গেছি প্রায়, ভূতের গ্রাম, শালুক পাহাড়ি না লালজল পেরিয়ে যাব, মেঘ উঠবে তখন, ঝড় হবে, বাজ পড়বে, ভূতেরা ছাড়বে না, বাজ পড়তে আরম্ভ করবে, তুই খুব বেয়াড়া মানুষ, সুজন স্যারকে আমি চিনি, রিলিফ দিতে গিয়েছিলাম, ভগবান।

একটা ড্রাইভারের ভাষা এমন! বিড়বিড় করল অনল, তারপর গর্জন করে উঠল, তুই গাড়ি চালা, কথা বলবি  না, আমার ব্যাপারে মাথা গলাতে হবে না।

তুইও কথা বলবি না, ফোন করবি না, আমার অসুবিধে হয়, জালিয়াত! আমি আমার বাপের জায়গায় যাচ্ছি, তোর প্রোজেক্ট।

কী সাহস! অনল ভাবল নীলেশকে ফোন করে, কিন্তু ফোনে হাত দিতে দিতে সরিয়ে নিল। চুপ করে থাকে।   দু’পাশে জঙ্গল, রাস্তাটা মোরামের, মানে পাকা রাস্তা থেকে জঙ্গলের রাস্তায় ঢুকে গেছে। অনল জিজ্ঞেস করল, কোন রাস্তা নিলি ?

জবাব পায় না।

পাকা রাস্তা কোথায় ফেলে এলি ?

জবাব পায় না অনল। বেলা পড়ে গেছে। দু পাশের জঙ্গলে ছায়া ঘন হয়েছে। কেমন গা ছমছম ভাব। মেঘ করেছে মনে হয়। গাড়ি বনভূমি ছেড়ে খাখা টাঁড় জমিতে উঠেছে। চড়াই উতরাই। অনল নরম গলায় বলল, পথ   ভুল হয়েছে মনে হয় ?

কথা বলিস না।

দেবু তুমি কী বলতে চাও বলো, আমার সন্দেহ লাগছে।

দেবু সেই মস্ত বিস্তৃত ডাহি পুরাতন পতিত জমিতে দাঁড় করাল গাড়ি। মাথার আকাশ কালো হয়ে এসেছে   সত্যি। থামিয়ে বলল, আমাকে কতয় কিনলি ?  

ওভাবে কথা বলছো কেন দেবু ?

শালা আমাকে জঙ্গলে ফেরাতে এনেছো, এই জমি তুই এমন করেছিস, পুরাতন পতিত, ঘাস পর্যন্ত নেই, শালা  পারামোর বংশধর, এত মিথ্যে বলিস কেন, জঙ্গলে এসেছি, আমার বাপ-ঠাকুদ্দার জায়গা, এবার তোর কী হবে ?

মুখ সামলে কথা বল দেবু, তোকে শেষ করে দিতে পারি, তা জানিস।

গাড়ি থামিয়ে দেবু দরজা খুলে বেরিয়ে এল, তারপর গর্জন করে উঠল, বানচোত আমাকে কিনেছিস, লোক ডাকব, আদিবাসী মেয়ে তুলবি, জঙ্গলে এলেই দশ বিশ টাকায় আদিবাসী মেয়ে পাওয়া যায় ? এই জালিয়াতের বাচ্চা জালিয়াত, এখন তুই যাবি কোথায় ?

আকাশ ছেয়ে গেল ঘন মেঘে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাস বইছে। ঝড় এল বলে। অনল চৌধুরীর শীত করল,  ভুল হয়ে গেছে, খুব ভুল হয়ে গেছে। বনের কাছে এসে দেবু মাণ্ডি উলটে গেছে, বিগড়ে গেছে। চুপ করে সব শুনত সে। সব জানে। জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে তার সাহস বেড়ে গেছে। দেবু বলল, গাড়ি থেকে নেমে যা শালা, তোরে আমি নেব না গাড়িতে, তোর বিচার হবে, আমি লোক ডাকব। বলতে বলতে দেবু মাণ্ডি বৃহৎ হয়ে যেতে থাকে যেন অনলের সামনে। নিজগৃহে ফিরে সে বনের বনস্পতির মতো, প্রাচীন শালগাছের মতো মস্ত হয়ে ওঠে সেই পুরাতন পতিত তৃণহীন বিস্তারে। অনল ভয় পায়। মনে হচ্ছিল দেবুর কথায় বনের ভেতর থেকে তির-ধনুক, টাঙ্গি, বল্লম নিয়ে বেরিয়ে আসছে তার পূর্বজরা। সিধু কানহু, বীরসা, তিলক মাঝিরা। নিজের শিকড় চিনতে পেরেছে দেবু মাণ্ডি। বুক চিতিয়ে নির্ভয়ে বলছে, চলে যা একা একা, আমিও বনের ভেতরে ঢুকে যাই, হামার বাপ সিধো, হামারা বাপ কানহ, হামারা বাপ ই শাল বৃক্ষ, পেদ্রো পারামো আমার কেউ না, এটা সেই ভূতের গাঁ কামালো, হামি হুয়ান প্রেসিয়াদো, হামার মাকে তুই তাড়াইছিলি, হামি তুরে দেখি নিব শুয়ার ইঁদুর গরু গাধার বাচ্চা।    

শুনতে শুনতে আতঙ্কিত অনল বুকে হাত রাখে। আচমকা ব্যথা উঠল। তার অত গর্জনেও সুজন চন্দ নুয়ে যাননি। ভয় পাননি। সমানে লড়ে গেছেন। কিন্তু সে ভয় পেল দেবুর কথায়। ঘামছে অনল। ডাকল, দেবু, ঝাড়গ্রাম থেকে কতটা এসেছি আমরা ?

জানা নাই।

তুমি ঝাড়গ্রাম ফিরে চলো।

কেন ? দেবু মাণ্ডি জিজ্ঞেস করল।

কেন কী, ফিরে চল, বুকে ব্যথা উঠছে, আমি চিনি এ ব্যথা, দেবু কথা শোনো, আমার খুব বিপদ হতে পারে।

দেবু মাণ্ডি নির্বিকার। অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। মেঘ কড়কড় করে। চারপাশে কেউ নেই। বৃষ্টি নামল। এই সময়ে হাতি নেমে আসে উচ্চভূমি থেকে, পাহাড় থেকে। দেবু গাড়িতে ঢুকে সিগারেট ধরিয়েছে। অনল আবার ডাকল, দেবু, ক্ষমা করে দাও।

দেবু মাণ্ডি বলল, পথ ভুলে গেছি।

দেবু, আমার ব্যথা বাড়ছে, দম আটকে আসছে।

নির্বিকার দেবু মাণ্ডি সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দিতে থাকে। জঙ্গল চিনছে সে। মনে পড়ে যাচ্ছে জঙ্গলকে। লোকটাকে চিনেছে সে। একটা সুযোগ এসেছে, নষ্ট করবে না। দেবু গাড়ি ছাড়ল। গাড়ির ভেতরে এলিয়ে পড়ে অনল চৌধুরীর মনে হলো, এই গ্রাম থেকে আর ফেরা যাবে না। পেদ্রো পারামো এইভাবে ভূত হয়ে থেকে গিয়েছিল এই গ্রামে।

জঙ্গল, আলো মরে আসা শীতের বিকেল সব দেখতে থাকে গাড়ির ভেতরে এলিয়ে পড়া দীর্ঘদেহী। বৃষ্টি নেই। এখন বৃষ্টি আর ঝড়ের সময়ও নয়। যা দেখেছে দেবু মাণ্ডির কথায় দেখেছে। অনলের ফোন বাজছে। সে ধরতে ভয় পাচ্ছে। দেবু মাণ্ডির ভেতরে জেগে উঠছে অরণ্য পাহাড়, পিতৃপুরুষ। সে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছিল সেই উচ্চাবচ চড়াই উতরাই ভেঙ্গে অনেক দূর। জঙ্গল থেকে জঙ্গলে, নিজ বাসভূমে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button