আর্কাইভউপন্যাস

উপন্যাস : আমিই সেই বধূ হে : হরিশংকর জলদাস

এক

অ নাতি, তোর দ্যাশে কি এই রীতি,

ছাগলে গিলে হাতি,

পুঁটি মাছে তানপুরা বাজায়!

‘অ দামু, খবর শুনছনি ?’

‘কুন খবরের কথা বইলছ তুমি ? অহন তো দ্যাশের আকাশে- বাতাসে, পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, চা-দোকানে-রেস্টুরেন্টে, শহরে-গেরামে, গঞ্জে-মোকামে খবর আর খবর। রাজনীতি- চালনীতি, ধর্মনীতি-দুর্নীতি, আকাম-কুকামের সংবাদে সংবাদে দ্যাশ আইজ সয়লাব। সকালে এক খবর তো দুপুরে আরেক খবর। বিকালে আবার অইন্য সংবাদ; রাইতে আবার ভিন্ন বার্তা। আইজ লক্ষ্মীপূজার খবর তো কাইল গণেশ উলটানোর বিত্তান্ত। আইজ দ্যাশ ভরতি রাহু-কেতুর সংবাদ। আইজ তো শুধু দুর্যোধন-দুঃশাসনের কাহিনি। দিকে দিকে দৈত্য-দানবের ফলাও বিবরণ। ব্রহ্মা যে নিবীর্য হইয়া ব্রহ্মলোকে নাকে তেল দিয়া ঘুমাইতেছেন, সেই সংবাদ আছে আমার কাছে। তুমি কুন খবরের কথা জিজ্ঞেস কইরছ, ধইরতে পারছি না জেঠা।’ দম না নিয়ে বলে গেল দামু।

‘তোমার এমনিতেই বেশি কথা কওনর অভ্যাস দামোদর। এক কথার উত্তরে পাঁচ কথা শোনাও। জিগাইলাম কী, শুনাইলা কী!’ জেঠা রেগে গেলে দামুকে পুরো নামে ডাকে। আজও ডাকল।

‘আহা জেঠা, চেতছ ক্যান! খবরের কথা কইলা বলেই তো দ্যাশের কথা, দশের কথা বইল্লাম একটু।’ দামোদরের কথায় জেঠাকে তুষ্ট করার সুর।

‘শুনো দামু, গণেশ উলটানোর কথা কইলা না তুমি ?’

‘কইলাম তো জেঠা।’

‘কুনু কুনু সময় দ্যাশে-সমাজে, রীতিতে-রাজনীতিতে বিপরীত হাওয়া বয়। সেই হাওয়ায় গণেশ উলটায়, নিয়মরীতিতে জং ধরে হঠাৎ। অরীতি রীতি হয়, দুর্নীতি সুনীতি হয়।’ দামু অত মনোযোগী শ্রোতা নয়। কিন্তু আজ কেন জানি, জেঠার কথা মন দিয়ে শুনছে।

জেঠা বলছে, ‘ছোডবেলায় একখান ছড়া মুখস্থ করাইছিলেন নিরপেন মাস্টরে। হঠাৎ আমাদের পাড়ায় আইসা পড়ছিলেন নিরপেন স্যার। বয়সের ভারে লাঠি ধইরেছেন তখন। তিনকুলে কেউ নাই। এই নাপিত পাড়ার ক্ষিতিশ মহাজন তাইনেরে আশ্রয় দিছিলেন। বিনিময়ে পাড়ার বাইচ্চা-কাইচ্চাদের পড়াইতেন দুই বেলা। আমিও একদিন সেলেট আর রামসুন্দর বসাকের বাইল্যশিক্ষা লইয়া নিরপেন স্যারের সামনে গিয়া বইসা পড়লাম।’

‘যা জিগাইছিলা, সেইটার সঙ্গে তোমার বাইল্যকালের সম্পর্ক আছেনি জেঠা ?’ দামোদরের কথায় উপহাস ছলকে ওঠে।

বুঝতে পারে নেপাল জেঠা। বলে, ‘সেই নিরপেন মাস্টরে সেই সময় আমাদের একখান ছড়া শিখাইছিলেন।’

‘কী ছড়া ?’

‘সবটা মুখস্থ নাই এখন। দুই এক লাইন আবছা আবছা মনে আছে অহনো। শুইনবানি ?’

‘কও।’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল দামু। কী দিয়ে শুরু করেছিল জেঠা, আর কোন ছড়ামড়াতে গড়াগড়ি খাচ্ছে! বিরক্তি চেপে রাখতে পারছে না দামু।

নেপাল জেঠা বুঝতে পেরেও গায়ে মাখল না। থেমে থেমে বলল―

‘অ নাতি, তোর দ্যাশে কি এই রীতি,

ছাগলে গিলে হাতি,

পুঁটি মাছে তানপুরা বাজায়!’

‘এই-ই রীতি অহন, গণেশ পূজা না কইরে গণেশ উলটাইয়া দেওনের হাওয়া দ্যাশ-গেরামে’ বলে ঝিম মেরে গেল জেঠা।

দামোদর জেঠার কথার মাহাত্ম্য ধরতে পারল না। ভেবাচেকা চোখে তাকিয়ে থাকল।

‘বুঝতে পারছি―তুমি আমার কথা ধইরতে পার নাই দামোদর। তোমার বুঝনর দরকারও নাই।’

‘হ জেঠা, তোমার গীতা-ভাগবত মার্কা কথা আমার বুঝনর দরকার নাই। কিন্তু একটা কথা কি কইবা, কুন খবরের কথা বইলতে চাইছিলা পরথমে।’

জেঠা বলল, ‘তুমি রাজনীতি-চালনীতি, আকাম-কুকামের কথা বইলছিলা না একটু আগে, হেই কথার জের ধইরে ছড়াটা কাটলাম। মিলাইয়া লইও।’

মুখটা কাঁধের গামছা দিয়ে মুছে নিল জেঠা। তারপর বলল, ‘তোমারে জিগাইছিলাম, সেই জবর খবরটা পাইছ কি না ?’

‘সেই প্রশ্নটা তুমি আগে একবার কইরছ জেঠা। বইলতে পারি নাই। তুমিই কও, সংবাদটা আসলে কী ?’

‘জোতা চুরির সংবাদ।’ বলে নির্বিকার থাকল নেপাল জেঠা।

পাশের টেবিলে চুপচাপ চা খেতে খেতে এতক্ষণ দুজনের কথা শুনে যাচ্ছিল করম আলি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে যাচ্ছিল করম। কাপটা ঠক করে টেবিলে নামিয়ে রেখে চমকানো গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘জোতা চুরি! কে কইরল ?’

করম নিজে একজন চোর। গাঁয়ের ছোটখাটো চুরি সে-ই করে। সিঁধকাটা থেকে জুতা চুরি। অনেক দিন সে জুতা চুরি করেনি। তাহলে এই গ্রামে আবার কোন চোরের উদয় হলো, যে জুতা চুরি করল! সেই চোরের নাম জানা খুব জরুরি। তার ভাতে ভাগ বসাতে এল কে ? আজকাল সিঁচকে চুরিদাড়িতে তেমন পয়সাপাতি মিলে না।

নতুন চোরের নাম জানতে উৎকর্ণ হলো করম।

‘কে কইরল জোতা চুরি ? কার জোতা চুরি কইরল ? ধরা পইড়ছেনি ?’ বাঁকা চোখে করমের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল দামোদর।

যদুর চা-দোকানেই কথাবার্তাগুলো হচ্ছিল। যদুর পুরো নাম যাদবচন্দ্র খাস্তগীর। পঞ্চাশ পেরোনো বয়স। চেহারাসুরত বেশ সুন্দর ছিল একসময়। গায়ের রং সাহেবদের মতো। গোরা। চুলও নীলচে নীলচে। এখন অবশ্য সেই নীলচে চুলে পাক ধরেছে। মাঝারি উচ্চতার যাদবচন্দ্রের একহারা গড়ন। বাপ শহরের এক উকিলের টর্নি ছিল। দিনরাত শহরে পড়ে থাকত বলে একমাত্র ছেলে যাদব উচ্ছন্নে গেল। দুটো বোন ছিল যাদবের। সুন্দরী বলে অল্পবয়সে দুজনেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। একদিন সাম্পানে নদী পেরোতে গিয়ে মারা গেল যাদবের বাপ। কালবৈশাখির ঝড় উঠেছিল হঠাৎ, কর্ণফুলিতে।

বাপের মৃত্যুতে সংসারের অথই জলে হাবুডুবু খেতে শুরু করল যাদব। কত আর বয়স তখন তার! মেরেকেটে আঠারো-উনিশ। বাপের হোটেলে খেয়ে গ্রামময় ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াত। বাপের তেমন জমাজিরাত ছিল না। পাড়ার বাপের বয়সী এক লোকের পরামর্শে বাড়ির ঘাটার আগায় চা-দোকানটি দিয়েছিল যাদব। সেই থেকে আজ পর্যন্ত চলছে দোকানটি। উনিশ বছরের যাদব এখন পঞ্চাশ পেরোনো।

যাদবের দোকান এখন মানুষের মুখে মুখে যদুর দোকান। চা-দোকান বলতে হয় না। যদুর দোকান বললেই এলাকার সবাই যাদবের চা-দোকানকে বোঝে। গাঁয়ে আরও অনেক চা-দোকান। চা-বিলাসীদের কাছে যদুর দোকানই সেরা। হরেক নাস্তা―লবঙ্গ, খাজা, আমিত্তি, পুরি, হালুয়া। সবার সেরা পুয়া। পুয়া সকালের নাস্তা। এই পুয়ার জন্যই কাস্টমারের ভিড়।

পুয়ার আবার দুই নাম। নাপিতরা বলে―পুয়া। বর্ণহিন্দুরা একে পুয়া বলতে নারাজ। বলে, পুয়া অশিক্ষিতদের দেওয়া নাম। এর বনেদি নাম―কুয়া। কুয়া নামেই ডাকে তারা একে। আসলে মালপোয়াই এর নাম। সমাজভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে সম্বোধন।

আটার সঙ্গে গুড় বা চিনি মিশিয়ে কাই তৈরি করে যদু। কুচি কুচি করে কেটে নারকেল মেশায়। পরে এক মুঠ মিষ্টি জিরা ছেড়ে দেয় কাইয়ে। ঘন হয়ে যায় কাই। তারপর গোল্লা করে করে ডোবা-তেলে ছেড়ে দেয়। গরম তেলে ভাসা-ডোবার মধ্যে টেনিস বলের আকার নেয় এক একটি পুয়া।

যখন দোকান শুরু করে যদু, একটি পুয়ার দাম ছিল এক আনা। এখন প্রতিটি দশ টাকা। যখন যদু পুয়ার কাই তেলে ছাড়ে, চারদিকের বাতাসে মিষ্টি জিরার সুগন্ধ ম-ম করে। এই সুগন্ধই কাস্টমারদের সম্মোহিত করে। ভূতে-পাওয়া পায়ে দোকানে এসে হাজির হয়।

এই যদুর দোকানেই যত আড্ডা নাপিতদের। মুসলমান কাস্টমারও কম নয়। বর্ণহিন্দুরা ক্বচিত আসে।

যদুর দোকানে এক সকালে দামোদর আর নেপাল জেঠায় কথা হচ্ছিল।

টিনের ছাউনি, বেড়ার ঘর। ছোট নয় তত। দোকানঘরের কোনার দিকে বসেছিল দুজনে। ওদিকেই বসে ওরা। খাওয়ার চেয়ে গপসপ হয় বেশি। মূলত নাপিতপাড়ার লোকেরা ওদিকেই বসে। যদু নাপিতপাড়ার লোকদের খাতির করে বেশ। কারণ তার লক্ষ্মীর ভান্ডারে নাপিতদের টাকাপয়সাই জমা পড়ে বেশি। নাপিতরা খেতে পছন্দ করে খুব। যত খাওয়া, তত কড়ি। সবসময় ছোটমোটো ভিড় লেগেই থাকে যদুর দোকানে। সামনের দিকের চেয়ার-টেবিলে অন্যরা নিজেদের খাবার পালা সাঙ্গ করে। ক্যাশে বসে যদু টাকা নেয়। দু তিনজন কর্মচারী টেবিলে টেবিলে চা-নাস্তা পৌঁছায়।

আজও একঠেরের টেবিলে বসেছিল ওরা।

দামোদরের জিজ্ঞাসায় নেপাল জেঠা বলল, ‘কে আবার! বলরামেরই কীর্তি। নাতির জোতা চুরি কইরে লইয়া আইছে।’

দুই

নাপিতপাড়ার লোকেরা আগে

‘শীল’ পদবি লিখত। এখন লেখে না।

আধুনিকতার হাওয়া

লেগেছে পাড়ায়।

গোমদণ্ডী গ্রাম। কর্ণফুলির দক্ষিণ পারে। নদীঘেঁষা। বিরাট গ্রাম। গ্রাম যেরকম হয়―অঢেল বৃক্ষাদি, মেটেপথ, ধানখেত, রবিশস্যের মাঠ, গাছে গাছে নানা পাখির কলরব, ডোবা, পুকুর, পয়সাওয়ালাদের উঁচু ভিটায় ইটের বাড়ি, গরিবদের উঠানঘেঁষা নিচু ভিতের ঘর, কোনওটার টিনের চাল, অধিকাংশ ছনে-ছাওয়া, মাঝেসাঝে মাটির বাড়ি। একতলা বা দোতলা। গ্রামের মধ্যিখানে রমরমিয়ে চলা হাট। দোকানপাট খোলা থাকে প্রতিদিন। শুক্র ও সোম জমাটি হাট। দূরদূরান্ত থেকে নানা পসরা নিয়ে আসে পসারিরা।

গোমদণ্ডীর পশ্চিমাংশের নাম ছন্দারিয়া। ছন্দ, থেকে ছন্দারিয়া। ছন্দারিয়ার শেষ প্রান্তে নাপিতপাড়াটি। কর্ণফুলি থেকে আসা খালটি পাড়াটিকে ছুঁয়ে গ্রামের গভীর দিকে এগিয়ে গেছে। খালটা বেশি বড় নয়। ছোটও নয় তেমন। বর্ষাকালে কোনও যুবক দু-চার-দশ কদম দৌড়ে এসে ঢিল ছুড়ে ওপারে নিতে পারবে না। খালের পূর্ব পারে নাপিতপাড়া, পশ্চিম পারে জেলেপাড়া। এই খাল বেয়েই জেলেপাড়ার মাছধরার নৌকাগুলো নদী-সমুদ্র থেকে উঠে আসে। আবার জোয়ার-ভাটার হিসাবে রাতে বা দিনে নৌকাগুলো নদী-সমুদ্রের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে।

নাপিতপাড়ার লোকেরা আগে ‘শীল’ পদবি লিখত। এখন লেখে না। আধুনিকতার হাওয়া লেগেছে পাড়ায়। ধুতি ছেড়ে লুঙ্গি ধরেছে এখন। কেউ কেউ পেন্টালুন পরা শুরু করেছে। প্যান্ট-শার্ট পরার প্রচলনও হয়ে গেছে কোনও কোনও বাড়িতে। সমাজের ভেতরটা পালটায়নি তেমন, বাইরের খোলনলচে পালটে যাচ্ছে দ্রুত। নিজেদের নাপিত বলে পরিচয় দিতে শরম করে এখনকার উঠতি বয়সের যুবকদের। বলে, পরিচয় পেলে অন্য জাতের মানুষেরা ঘৃণার চোখে তাকায়। থু করে থুতুও ফেলে। বেঁকা চোখের তাকানো সহ্য হয় না। বাঁচার উপায় হলো―‘শীল’ ত্যাগ করা। কোনও একটা পদবি তো লিখতেই হবে। ‘শীল’ বাদ দিয়ে কী লিখব ? কেন সুশীল লেখ! ‘সুশীল’ লিখলে আমরা যে নাপিত বুঝতে পারবে না কেউ, ধরে নেবে আমরাও বর্ণহিন্দু। ঘৃণার হাত থেকে রক্ষা পাব আমরা।

সেই থেকে নাপিত পাড়ার শীলরা সুশীল। ছন্দারিয়ার নাপিত পাড়ার নওজোয়ানরাও এখন সুশীল। কিন্তু বয়সী যারা, তারা পিতৃপুরুষের পদবি ত্যাগ করতে নারাজ। তারা সুশীল লেখে না, শীলই লেখে।

দামোদর, নেপাল জেঠা এই নাপিতপাড়ার লোক। বলরামের বাড়িও এ পাড়ায়।

পাড়াটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি। অনেকটা বুর্জ খলিফার মতো আকার। বুর্জ খলিফা গোড়া থেকে আগার দিকে সরু। নাপিতপাড়াটি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে কৃশ।

খালপাড়েই বলরামের বাড়ি। তবে একেবারে খালপার ঘেঁষা নয়। শ দেড়শ হাত দূরে। খালটির যেদিকে বলরামের বাড়িটি, সেদিকটা ভাঙনপ্রবণ নয়। খালের পার ভাঙে জেলেপাড়ার দিকে। ভাঙনে পড়ে জেলেপাড়ার বহু জেলেকে স্থানান্তরে যেতে হয়েছে। সেদিক থেকে নাপিতরা ভাগ্যবান। এ পাড়াটা ভাঙে না। জলই জলদাসদের তাড়িয়ে বেড়ায়, নাপিতদের নয়।

নাপিতপাড়ার বাস্তুভিটেগুলো নিচু নিচু। বলরামদের ভিটেটি কিন্তু বেশ উঁচু। বলরামের বাপ সুধাংশু শীল বড় বুদ্ধিমান। জলের মতিগতি ভালো করেই জানত। গানটাও গাইত গুনগুনিয়ে, কখনও সখনও। ‘নদীর এপার ভাঙে, ওপার গড়ে’―গানের এই কলিটি তাকে বাস্তবসচেতন করেছে। তাই যখন সুধাংশুর কোঁচরে টাকা চলে এল, বাপের ভাঙাচোরা ঘরের ভিটেয় একখানা শক্তপোক্ত ঘর তুলতে মনস্থ করে ফেলল। তার প্রথম সিদ্ধান্তই ছিল ভিটেটা আচ্ছামতন উঁচু করতে হবে। নদী-খালের তো কোনও বিশ্বাস নেই। অমাবস্যা-পূর্ণিমায় জলে ফুলেফেঁপে উঠলে ভাসিয়ে দেয় ঘরবাড়ি। বাস্তুভিটেটা উঁচু হলে খালের জল তার ঘরদোর ছুঁতে পারবে না।

যা ভাবল, তা-ই করল সুধাংশু। খালপারের বাড়িতে মাটির অভাব হয় না। শীতকালে খাল শুকিয়ে আধমরা। ওই সময় পানি খালতলায় নেমে যায়। জেলেনৌকাগুলোকে ভাটার সময় ঠেলে ঠেলে আনতে হয় জেলেপাড়ার ঘাটে। শীতকাল যত এগোয়, জলধারা তত ক্ষীণতর হতে থাকে।

শীতকালেরই একটা সময়ে কুয়াতি লাগায় সুধাংশু। খালের ভেতর থেকে মাটি কেটে কেটে ভিটেয় ঢালে কুয়াতিরা। সুধাংশু বলে দিয়েছে―ভিটেটা মানুষসমান উঁচু কইরতে হইব। যত মাটি লাগে আইনে আইনে ফেল। পয়সার জইন্য চিন্তা কইরো না তোমরা। পইসা ধইরে দিমু আমি তোমাদের। মজুরির বাইরেও খুশি করুম। শুধু ভিটাখান উঁচু করা চাই। খালের পানি যাতে ছুঁইতে না পারে আমার ঘরখানারে।

শেষ পর্যন্ত মনের মতো করে বাড়িটি বেঁধেছিল সুধাংশু। মূল বসতঘর, রান্নাঘর, পায়খানা। পায়খানা লাগোয়া স্নানঘর। ইটের গাঁথুনিও দিয়েছিল মূল ঘরে। ছনের পরিবর্তে টিন লাগিয়েছিল চালে। তাতে পাড়ার লোকেরা চোখ টাটিয়েছিল।

এত টাকা পাইল কই সুধাংশু ? করে তো ক্ষৌরকর্ম! টিনের বাক্স নিয়ে হিন্দুপাড়া, জেলেপাড়া, মুসলমানপাড়ার অলিতেগলিতে ঘোরে। ডাক পাড়ে, ‘চুল কাটাইবেন, চুল ? দাড়ি, গোঁফ ?’ হাঁটে আর ডাক দেয়।

কারও মন চাইলে গলা উঁচিয়ে বলে, ‘অ নাপিতের পুত, আইস, আমার উঠানে আইস।’

উঠানে গেলে পিড়াটা এগিয়ে ধরে বলে, ‘বইস, ওই গাছতলায় গিয়া বইস। দাড়িখান কাইট্যা দিবা।’

সুধাংশু বলে, ‘শুধু দাড়ি কাইটবেন দাদা! চুল কাইটবেন না ? পিছনের চুল যা লম্বা হইছে না!’

‘লম্বা হইছে ? হ আমার ছোড বিবিও কইল হেদিন চুলের কথা। কানে তুলি নাই। অখন তুমিও যখন কইতাছ, নিচ্চয় বড় হইছে। তাইলে চুলটাও কাইট্যা দিয়া যাইও।’

সুধাংশু খুশি হয়। দাড়ির সঙ্গে চুল কাটলে মজুরি ডবল পাওয়া যায়।

এইভাবে দিনে আট-দশজনের চুল-দাড়ি কাটতে পারলে চাল-ডালের টাকাটা জোগাড় হয়। দুই ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে কোনওরকমে চলে যায় সুধাংশুর। গেল বছর টাকার অভাবে চালের শন বদলাতে পারেনি।

আর এ বছর! এ বছর মাটি কেটে ভিটে উঁচু করা! উঠানে পাঁজা পাঁজা ইট! চালে শন নয়, একেবারে চকচকে টিন! বসতঘর, রান্নাঘর, বাহ্যকর্মের ঘর আলাদা আলাদা! মোহরভর্তি সোনার কলসি পেয়েছে নাকি সুধাংশু! না খালের স্রোতে ভেসে আসা টাকার ভেলা! আলাদিনের চেরাগ খুঁজে পায়নি তো! নাকি ডাকাতদলে নাম লিখিয়েছে ?

শেষের কথাটি পাড়ার মানুষ হেসে উড়িয়ে দেয়। টিঙটিঙে চেহারা সুধাংশুর। জোরে হাওয়া বইলে কাত হয়ে পড়বে। ওর শরীরে গোঁফখানা ছাড়া তো আর কিছুই নেই। হাড্ডি জড়িয়ে চামড়া। মাপলে বিশ সের মাংসও পাওয়া যাবে না শরীরে। সেই সুধাংশু করবে ডাকাতি! ‘ধুর, ওই কথাখান ছাড়া অন্য কথা কও’―পাড়ার সদ্ভাবী লোকেরা এই কথাটিই বলে।

এত সবের পরেও এই ঘটনা সত্য যে সুধাংশু হঠাৎ করে অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। আড়েঠাড়ে অনেকে সুধাংশুর কাছে জানতে চায়―ঘরটা কেমনে তুইল্যা সুধাংশু ? ঘরবাড়ির শান দেইখা মনে হইতাছে অনেক টাকা খরচ কইরেছ। তা এত টাকা পাইলা কই ?

সুধাংশু এই প্রশ্নের কোনও জবাব দেয় না। শুধু দুই হাত জড়ো করে উপর দিকে তাকিয়ে কপালে ঠেকায়।

প্রশ্নকর্তা কোনও জবাব না পেয়ে রাগ করে। রাগী চোখে বিড়বিড় করতে থাকে। সেই বিড়বিড়ানিতে দুই-চারখানা গালিও থাকে।

শোনে সুধাংশু। শুনেও চুপ থাকে। বিচক্ষণ সুধাংশু জানে―বোবার শত্রু নাই।

আসলে টাকা পেয়েছে সুুধাংশু, রাস্তায় কুড়িয়ে। নাপিতপাড়া থেকে মাইল দুয়েক দূরে গোমদণ্ডী হাট। সপ্তাহে দুদিন বসে। সেই দুই দিন কর্ণফুলি থেকে আসা খালটি বেয়ে নানা স্থানের পসরা নিয়ে ছোট-বড় নৌকাগুলো হাটের ঘাটে  ভেড়ে। বেচাকেনা শেষে নৌকাগুলো খাল দিয়ে বেরিয়ে নদীতে পড়ে। ধান বেচাবিক্রির জন্য বিখ্যাত হাটটি। লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়।

সেদিন সন্ধ্যার পরে বাড়িতে ফিরবার সময় মন বড় খারাপ ছিল সুধাংশুর। আয় তেমন হয়নি। জনা পাঁচেক চুল কাটিয়েছে। দুশ্চিন্তা নিয়ে হাটের সংকীর্ণ গলি দিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসছিল। অন্ধকার গলি। হঠাৎ কীসে যেন হোঁচট খেল! বান্ডিলমতন কিছু। নিচু হয়ে হাতে নিল সুধাংশু। তার মনে হলো―কিছু একটা আছে এই বান্ডিলে। টিপেটুপে দেখে কাঁধের ঝোলায় ঢুকিয়ে নিয়েছিল। টাকার বান্ডিল ছিল ওটা। ধান বেচাকেনার কোনও কারবারিরই ছিল বান্ডিলটি। অসতর্কতায় পড়ে গিয়েছিল পথে।

তিন

তা নেমন্তন্ন কী কী দিয়া খাইবা, বাড়িত আইস্যা

একবার কইয়া যাইও। সেই সময় বউয়ের

মুখখানও দেইখা যাইও।

মরার আগে সুধারাম-বলরাম―দুই ছেলেকে বিয়ে করিয়ে গিয়েছিল সুধাংশু।

সুধারামকে সে নিজে বিয়ে করায়নি, বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সে চট্টগ্রাম শহরের ফিরিঙ্গিবাজার রোডের এক সেলুনে চাকরি নিয়েছিল সুধারাম। মাস-মাইনে তেমন না। নিজে খেয়ে-পরে-থেকে যা বাকি থাকে, তা হাজার খানেক। ওই হাজার খানেক টাকা হাতে পেয়ে বেজায় খুশি সুধাংশু। গ্রামে থেকে শুধু তো ফ্যা-ফ্যা করে ঘোরা। ভাগ্যিস চাকরিটা জুটিয়েছিল সুধারাম। মাস শেষে অন্তত দুটো পয়সা তো হাতে গুঁজে দিচ্ছে।

কয়েক বছর পর সুধারাম একদিন বাপকে বলল, ‘কিছু টাকা দিতে পাইরবেনি বাবা ?’

‘কেন ? টাকা দিয়া কী কইরবে সুধা ?’ সুধাংশু জানতে চায়।

‘আমি যার সেলুনে চাকরি করি, সে কুনু একটা ঝামেলায় জড়াইয়া টাকার টানাটানিতে পইড়েছে। সেলুনটা বেইচে দিতে চায়। চালু সেলুন বাবা। কিনে লইতে পাইরলে খুব ভালা অইবে।’

সুধাংশু আর কথা বাড়ায়নি। রাজি হয়ে গিয়েছিল। এমনিতে সুধারামের মাসে মাসে দেওয়া টাকাগুলো খরচ করেনি সুধাংশু। জমিয়ে রেখেছিল। সেই জমানো টাকার সঙ্গে আরও কিছু টাকা যোগ করে সুধারামের হাতে তুলে দিয়েছিল।

সুধারামের ধারণা ভুল ছিল না। এই সেলুনটা সুধাংশুর পরিবারে সচ্ছলতা এনে দিয়েছিল। সুধাংশুর কোনও মেয়ে ছিল না। সুতরাং মেয়ের বিয়ের খরচপাতি নিয়ে উদ্বেগ ছিল না সুধাংশুর। বাক্স নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা ছেড়ে দিয়েছিল। প্রাইমারি স্কুল শেষ করে বাপের বাক্সটি হাতে তুলে নিয়েছিল বলরাম। বেলাশেষে যা আয় হতো, বাপের হাতে দিত। শেষে বাপবেটায় মিলে হাটে একটা চুলকাটার দোকান দিয়ে ফেলেছিল। বলরামই চুল-দাড়ি কাটত। বয়সীদের বগলের কেশ সাফ করত। কাস্টমার বেশি হলে সুধাংশ কাঁচি ধরত।

একদিন একটা আট-দশ বছরের ছেলের চুল কাটাবার জন্য সেলুনে নিয়ে এল একটি মেয়ে। আঠারো-উনিশ বয়স। কথায় কথায় সুধারাম জেনে নিল মেয়েটি ছেলেটির বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে। এক দেখাতে ভালো লেগে গিয়েছিল মেয়েটিকে। পরে আরও বার কয়েক চুল কাটাতে এসেছে। কখনও বড় ভাইকে নিয়ে, কখনও ছোট ভাইকে নিয়ে। বড়-ছোট দুই ভাই পিঠাপিঠি। অমলার সঙ্গে চিনপরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

একদিন সুধারামের মন বলল, ‘তুই অমলাকে ভালোবেসে ফেলেছিস।’

বাপ সুধাংশুকে বলার পর ছ্যাঃ ছ্যাঃ করে উঠল, ‘কী কইতেছস সুধা! বিয়া কইরবি তুই অই কাজের বুয়ারে! সমাজে মুখ দেখাইমু ক্যামনে!’

‘বাবা, অমলা ভালা। দেইখতে শুইনতে খারাপ না। কপাল মন্দ বইলে বাসায় কাম লইছে। বউ হইয়া ঘরে আইলে তোমার বাড়ির চেহারা পাইলটে যাইব বাবা।’

‘কোন জাত ?’ ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে সুধাংশু।

‘দত্ত কইল। বর্ণহিন্দু।’ আমতা আমতা গলা সুধারামের।

‘ওইখানেই তো মুশকিল রে সুধা। জাতের মাইয়া নাপিতের ঘরে আইয়া আমাগোরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য শুরু কইরব। অই ঘৃণা-অবহেলা সইতে পারুম না রে বাপ। গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছা কইরব তখন।’

‘বাবা, অমলারে না দেইখা দোষারোপ কইরে যাইতেছ। তারে একবার দেখো। কথা কও তার লগে।’

‘অই মাইয়ার লগে কথা কওনর দরকার নাই আমার।’ সুধাংশু গোঁ ধরে বসল।

সুধারামের মা বলল, ‘তুমি ওই রকম কইরে গোঁ ধইরলে ক্যান ? ছাওয়ালের পছন্দ বইলে তো একখান কথা আছে।’

‘চুপ থাকো তুমি সুধার মা। যা বোঝো না, তার মইধ্যে নাক গলাইতে আইস না।’ শাঁ করে সুধার দিকে ঘাড় ফিরিয়েছিল সুধাংশু। কড়া গলায় বলেছিল, ‘শুইনে রাখ সুধা, ওই মেইয়েরে বউ বইলে মাইনা নিমু না আমি।’

চুপচাপ উঠে গিয়েছিল সুধারাম, বাপের সামনে থেকে। তারপর শহর থেকে বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল।

মানুষে বলে―নাপিত্যা রাগ, তা-ই ছিল সুধাংশুর। পরশুরামের ক্রোধের মতো তারও ক্রোধ ছিল ভয়ংকর। সেই ক্রোধের কারণে সুধাংশু সুধারামের খোঁজ নিল না। কেন ছেলে বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ বুঝতে পারলেও তার অভিমান ভাঙাবার কোনও উদ্যোগ নিল না সুধাংশু।

সুধারাম মাসে মাসে সংসারের জন্য টাকা দিত। সেই টাকা আসা বন্ধ হয়ে গেল। খরচ-খরচায় টান পড়ল। তাতে ভ্রƒক্ষেপ নেই সুধাংশুর। সুধাংশুর যত ক্ষোভ―সুধারাম নিজের বউ নিজে নির্বাচন করেছে। সেই মেয়ে বাসাবাড়িতে বাসন মাজে, সে মেয়ে উঁচু বর্ণের।

অন্যের কাছে তার ক্ষোভের কারণগুলো হয়তো অর্থহীন, কিন্তু সুধাংশুর কাছে তা নয়। স্ত্রী যমুনারও অত সাহস নেই যে স্বামীর অর্থহীন রাগের বিরোধিতা করে। মনে মনে গুমরে মরে যমুনা। নির্জনে নীরবে কাঁদে। স্বামীর সামনে রা করে না।

বলরামের বয়স তখন কুড়ি পেরিয়ে গেছে। ঘরে যে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে, অনুমান করে। বাবার সঙ্গে দাদার কথাবার্তার দিন বলরাম ঘরে ছিল না। জানতে পারেনি―বাপ-বেটার মনোমালিন্যের কারণ।

দাদা বাড়িতে আসা বন্ধ করলে বলরাম একদিন মাকে শুধিয়েছিল, ‘মা, দাদা অখন বাড়িত আইয়ন কমাইয়া দিছেনি ?’

মা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল, ‘তোর বাপেরে জিজ্ঞেস কর। আমারে শুধাস ক্যান ?’

সুধাংশু ঘরেই ছিল। বউয়ের কথা শুনতে পেয়েছে সে। শুনতে পেয়েও চুপ করে থেকেছে।

বলরাম আঁচ করেছে―কিছু একটা ঘাপলা তো হয়েছেই। ওই সময় পিতাকে জিজ্ঞেস করবার স্পৃহা পায়নি মনে। ভেবেছে―সমস্যাটা বড়দের। ওরাই মিটাক। সেখান থেকে সরে গিয়েছিল বলরাম।

চার মাস পরে সুধাংশুর কাছে খবর আসে―সুধারাম বিয়ে করেছে।

কাকে করেছে ?

অমলা কি সরলা নামের কোনও এক মেয়েকে।

পাড়ার মুকুন্দ পথে দাঁড় করিয়ে বলে, ‘অ সুধাংশুদা, তোমার বড় পোলা না কি বিয়া কইরে ফেলাইছে ? উঁচু জাতের মাইয়া না কি। তা দাদা, এইবার তুমি জাতে উইঠলে বইলে। কী সৌভাগ্য তোমার! নাপিতের ছাওয়াল মণ্ডলবংশের মাইয়া বিয়া কইরেছে।’

সুধাংশু বুঝে গেল―এই মুকুন্দ সব জেনেবুঝে তাকে পথের মাঝখানে দাঁড় করিয়েছে। অপমানে অপমানে জর্জরিত না করে ছাড়বে না। সীমানার নারকেল গাছ নিয়ে মুকুন্দের সঙ্গে যে ঝগড়াটা হয়েছিল একদিন, তার শোধ নেবে আজ মুকুন্দ।

সুধাংশু ঠিক করে, কথা বাড়াবে না। চুপচাপ মুকুন্দের পাশ কাটিয়ে এগোতে চাইল সুধাংশু। কিন্তু মুকুন্দ নাছোড়। বহুদিন পর মওকা জুটেছে হাতে। ‘সোনার মোহর’ পেয়ে তেল এসে গিয়েছিল গায়ে।

আগে যেখানে গায়ে পড়ে কথা বলত, হঠাৎ টাকা পাওয়ায় শরীরে গরম এসে যায় সুধাংশুর। হেলা-অবহেলা করতে শুরু করেছিল পাড়ার মানুষদের। তবে অবহেলাটা খুব স্পষ্টভাবে দেখাত না। কিন্তু যাদের সূক্ষ্ম চোখ আছে, তারা বুঝতে পারত সুধাংশুর অবহেলার ব্যাপারটা। বুঝতে পারাদের মধ্যে মুকুন্দ একজন। আজ সেই অবহেলার দাম সুদে-আসলে আদায় করে নেবে বলেই সুধাংশুর পথ আগলে দাঁড়িয়েছে মুকুন্দ।

খপ করে সুধাংশুর হাতটা ধরে মুকুন্দ বলে, ‘আরে, যাও কই সুধাংশুদা! দাঁড়াও না। দুই-একখান কথা কই। তোমার কত যে ভাইগ্য, তোমার পোলার চেয়েও চাইর বছরের বড় আমার রাখাল। বিয়ার বয়স পার হইয়া যায়। টাকার অভাবে বিয়া করাইতে পারি না। আর তোমারে দেখো―বড় পোলা বিয়া কইরল, গাঁটের এক টাকাও খরচ হইল না তোমার। জাতের মাইয়া নাপিত্যার ঘরের বউ হইল।’

রাগে-অপমানে সুধাংশু তখন দু চোখে আঁধার আঁধার দেখছে।

মুকুন্দ তখনও থামেনি, ‘তা সুধাংশুদা, বউ কখন ঘরে তুইলবে ? নেমন্তন্ন খাওয়াইবে না সমাজের মানুষদের ?’

এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সুধাংশু চিৎকার করে বলল, ‘তুইলব তো, ঘরে তুইলব তো সুধারামের বউরে। তা নেমন্তন্ন কী কী দিয়া খাইবা, বাড়িত আইস্যা একবার কইয়া যাইও। সেই সময় বউয়ের মুখখানও দেইখা যাইও।’

হন হন করে হাঁটা দিয়েছিল সুধাংশু।

চার

তাদের মুখে দু বেলা দু মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য

মানুষের কত লাথি-ঝাঁটাই না খেতে হয়েছে বাপকে!

সে রাতে রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে খেতে বসেছে বাপে আর বেটায়―সুধাংশু এবং বলরামে।

ভাতেভরা দুটো থালা দুজনের সামনে এগিয়ে দেয় যমুনা। তার আগেই জলভর্তি দুটো গ্লাস পাতের পাশে রেখে দিয়েছিল। বড় একটা বাটি থেকে দু চামচ করে সবজি-তরকারি তুলে দিলে অনেকটা গোগ্রাসেই খেতে শুরু করল বলরাম। সারাদিন সেলুনে পড়ে থাকে। সেলুনের ঝাঁপ ফেলে দুপুরে যে বাড়িতে খেতে আসবে, তার উপায় নেই। একে তো দুই মাইল ঠেঙিয়ে আসা, খাওয়ার পর ওই পথ বেয়েই আবার ফিরে যাওয়া। অনেকটা সময় চলে যায় তাতে। মানুষের চুল-দাড়ি কাটার ইচ্ছে যে কখন জাগে! সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধে―যে কোনও সময় এসে হাজির হয়। স্নান-আহ্নিক, খাওয়া-প্রার্থনার একটা টাইমটেবিল আছে। মেনেও চলে মানুষেরা সেই সময়সূচি। কিন্তু চুল-দাড়ি কাটার কোনও টাইমটেবিল নেই। ইচ্ছে জাগল তো চলে এল! সে সকাল হোক বা দুপুর কিংবা অপরাহ্ণ। এজন্য সেলুন ছেড়ে আসার উপায় নেই বলরামের। এলেই বিপদ। সেলুন বন্ধ পেয়ে মাদল কাকার দোকানে চলে যাবে। আর তার বাঁধা লোকগুলো মাদল কাকার সেলুনে গেলে, ফের তার সেলুনে আসা বন্ধ করে দেবে। মাদল কাকার যে সম্মোহনী শক্তি আছে!

কিছুদিনের অভিজ্ঞতায় বলরাম স্থির করে―সেলুন বন্ধ করে দুপুরে বাড়িতে খেতে যাবে না। বাপ সুধাংশুরও সকালে সেলুনে আসার দরকার নেই। দুপুরে বলরামের জন্য ভাত নিয়ে আসবে। সন্ধ্যার দিকে দুই বাপ-ছেলে একসঙ্গে বাড়ি ফিরবে। সেই রকমই হয়ে আসছে এতদিন ধরে। শুধু সন্ধ্যা বেলাতেই ঘরে যায় বলরাম। বাপের পাশাপাশি বসে রাতে মায়ের হাতের রান্না মনের আনন্দে খায়।

আজ তার খাওয়ার মধ্যে আনন্দ কম, ক্ষুধা বেশি। সন্ধ্যার আগে কাজের ফাঁকে দুটো বিস্কুটের সঙ্গে যে এক কাপ চা খায় বলরাম, তাও খেতে পারেনি। আজ কাজের চাপ ছিল বেশি। রাক্ষুসে ক্ষুধা নিয়েই বাড়ি ফিরেছিল। মাকে বলেছিল, ‘মা, আইজ ভাতটা একটু তাড়াতাড়ি দিয়ো।’

মুখের দিকে তাকিয়ে ছেলের ক্ষুধার ব্যাপারটা অনুমান করে নিতে পেরেছিল যমুনা। দ্রুত রান্না চড়িয়েছিল। খেতে বসে তাই বলরাম গপগপ করে খেতে শুরু করেছিল।

খাওয়া থামিয়ে সুধাংশু আচমকা বলে ওঠে, ‘কাইল তুই শহরে যাবি বলরাম।’

মুখের খাবার চিবোতে চিবোতে অনেকটা বেখেয়ালেই জিজ্ঞেস করে বলরাম, ‘ক্যান বাবা ? কুনু দরকার আছেনি ?’

‘হ আছে। কাইল ফিরিঙ্গিবাজার গিয়া সুধরামের লগে দেখা করবি।’

খাবার চিবানো বন্ধ হয়ে যায় বলরামের। আধ-চিবানো ভাতগুলো কোনও রকমে গিলে ফেলে বলে, ‘দাদার লগে দেখা করুম! আমি!’

বলরামের অবাক হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। সুধারাম বাড়িতে আসা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে তার নাম মুখে উচ্চারণ করে না সুধাংশু। বিয়ের খবর চাউর হলে সুধাংশুর ক্রোধ-ক্ষোভ বহুগুণে বেড়ে যায়। যমুনা এবং বলরাম তার ক্রোধের চণ্ডতা সম্পর্কে জানত। তাই সুধাংশুর সামনে সুধারামের নাম উচ্চারণ করত না। একটা সময়ে সুধারাম নামটি এই বাড়িতে অচ্ছুত নাম হিসেবে নির্ণিত হয়ে গিয়েছিল।

সেই নামটি আজ বাপের মুখে উচ্চারিত হতে শুনে অবাক না হয়ে পারেনি বলরাম। শুধু সুধারামের নামটি উচ্চারণ করেই থেমে যায়নি বাবা, বলেছে―তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করতে! তাই বিস্মিত চোখে বাপের দিকে তাকিয়েই থাকল বলরাম।

যমুনারও হতবাক হওয়ার সীমা নেই। সুধারাম বাড়িতে আসা বন্ধ করার পর তার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য স্বামীকে বারবার বলতে চেয়েছে যমুনা। কিন্তু প্রতিবারই ধমকে থামিয়ে দিয়েছে সুধাংশু। বিয়ের সংবাদ কানে আসার পর স্বামীর ভয়ংকর চেহারা দেখে কিছু বলবার সাহস করেনি। ভেতরে ভেতরে আর্তনাদ করে গেছে যমুনা, কিন্তু সেই আর্তনাদের কোনও চিহ্ন বাইরে প্রকাশ করেনি। সেই নিষ্ঠুর নির্মম স্বামীটি আজ বলে কি ছোট ছেলেকে ?

বলরাম ঠিক শুনেছে তো ? পরিত্যক্ত ছেলের নাম বলছে বাবা! বলছে―কাল শহরে গিয়ে সুধারামের সঙ্গে দেখা করবি! দেখা না হয় করল সে। দেখা করে কী বলবে ? বড় ছেলেকে কিছু বলার আছে কি বাবার ? যদি থাকে, তাহলে সেটা কী ? পিতার পরের কথাগুলো শোনার জন্য উৎকর্ণ হয়ে থাকল বলরাম।

কিন্তু ওই কথার পর সুধাংশু আর কিছু বলল না। গ্রাসের পর গ্রাস খেয়ে যেতে লাগল।

যমুনা সবজির পর লতির তরকারি দিল। তারপর লইট্যামাছ দিল পাতে পাতে। দুই বাপ-ছেলে খেয়ে গেল। যমুনার মনে হলো―হঠাৎ ভুল করে সুধারামের নাম উচ্চারণ করে ফেলেছিল সুধার বাপ। কিছু একটা বলতেও চাইছিল। সংবিতে ফিরে নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে চুপসে গেছে। যাক, এ নিয়ে আর ভাবার দরকার নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস যমুনার বুকের তলা থেকে বেরিয়ে এল।

খাওয়া শেষে গ্লাসের পুরো জলটাই গলায় ঢেলে দিল সুধাংশু। বড় একটা ঢেঁকুর তুলল।

‘যা বলছিলাম বলরাম।’ তৃপ্তির কণ্ঠে সুধাংশু বলল।

বলরাম শেষ গ্রাসটা মুখে তুলছিল। বাপের কথায় হাতটা অর্ধেক পথে থেমে গেল।

সুধাংশু বলছে, ‘আগামী পরশু সে যেন বউ লইয়া ঘরে আসে।’ বলে তড়াক করে পিঁড়ি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আঁচাবার জন্য লোটা হাতে ঘরের বাহির দিকে পা বাড়াল।

যমুনা উচ্চস্বরে ‘ঠাকুর ঠাকুর’ করে উঠল।

বলরামের মুখে কিন্তু কথা নেই। প্রথমে কানাঘুষায়, পরে মায়ের মুখে দাদার কীর্তির কথা শুনেছে বলরাম। দাদার মা-বাবার অমতে বিয়ে করাটা ঠিক হয়েছে, না অন্যায় হয়েছে―বুঝে উঠতে পারেনি সে। পুত্রকে মা-বাবার বিয়ে করানোর যে বাসনা, তারও সুলুক সন্ধান তেমন করে জানে না বলরাম। দোলাচলের মধ্যে কাটতে থাকে তার সময়। কিন্তু একদিন তার মনে হলো―দাদা তার পছন্দের মেয়েটিকে বিয়ে করে এমন কী অন্যায় করেছে! দাদা যদি আজ ঘরে থাকত, কী ভালোই না লাগত! আর ওই মেয়েটি, যে তার বউদি হয়েছে, সে দেখতে কেমন জানে না সে, সেই মেয়েটি, মানে বউটি বাড়িতে এলে কী আনন্দই না লাগত তার! কেন আনন্দ লাগত, জানে না বলরাম। তবে আনন্দ যে লাগত, তা শতভাগ সত্য। মা কথা বলার একজন সঙ্গী পেত। বউদি রান্নাঘরে মাকে এটা-ওটা এগিয়ে দিত। হয়তো দু-একটা নতুন পদ রান্না করেও খাওয়াত।

এরকম এলেবেলে ভাবতে ভাবতে মায়ের দিকে তাকাল বলরাম। মা ফিক করে হেসে দিল। সেই হাসি বলরামের চোখেমুখে সঞ্চারিত হলো। দুজনের নীরব হাসি স্পষ্ট হলো―মৃদু থেকে উচ্চ। হাসির ঝরনাধারা উচ্ছ্বলিত হয়ে উঠতে গিয়ে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। সুধাংশুকে লোটা হাতে আসতে দেখা গেল।

হাসি গিলে যমুনা থালায় উচ্ছ্বিষ্টগুলো তুলে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বলরাম শেষ গ্রাসটি মুখে পুরল না। থালায় রেখে নিজের পাতের উচ্ছিষ্ট থালায় তুলতে লাগল।

লোটাটা মাটিতে রেখে সুধাংশু বলল, ‘তো এই কথাই থাইকল বলরাম। সকালে পান্তাভাত খাইয়া শহরের দিকে রওনা দিবি। আমি সকালে সময়মতো দোকানে যামু। চালাইয়া নিতে পারুম। কাস্টমার বেশি হইলে ঝামেলা হইব একটু। ভালা কামের লাইগা ঝামেলা তো সইতেই হইব।’ বলে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল সুধাংশু।

সুধারাম হাতে স্বর্গ পেয়েছিল। বাপের নির্দেশ তার কাছে মধুর বার্তা হয়ে পৌঁছেছিল। আবেগে বিয়ে করে ফেলেছিল ঠিকই, কিন্তু অবসর সময়ে মা-বাপ-ভাইয়ের কথা মনে পড়ত খুব। এই মা-ই তো গর্ভে ধরেছে তাকে, গু-মুত সাফ করে বড় করে তুলেছে। বাপকে ছোটবেলা থেকে কী পরিশ্রমই না করতে দেখেছে সে। গ্রামের গলিতে গলিতে ঘুরে দ্বিপ্রহরের পর যখন বাক্সহাতে বাড়ি ফিরত, কী ক্লান্ত বিষণ্নই না দেখাত বাপকে। তাদের মুখে দু বেলা দু মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য মানুষের কত লাথি-ঝাঁটাই না খেতে হয়েছে বাপকে। ভাইটি সারাক্ষণ তার পিছু পিছু থাকত। মুখে ‘দাদা দাদা’। সুধাদা ছাড়া কথা ছিল না বলরামের। সেই পরমাত্মীয়দের ভুলে অমলাপ্রেমে বিভোর হয়েছে সে। এ ভুল, এ মস্ত বড় পাপ! মর্মযাতনায় দিনরাত জ্বলে গেছে সুধারাম।

সেই সকালে বলরাম এসে যখন বলল, ‘বউদিরে লইয়া কাইল বাড়িত যাইতে কইছে বাবা’, কেঁদে দিয়েছে সুধারাম। আনন্দের কান্না। বলরামের মুখ থেকে বাবার নির্দেশটি বারবার করে শুনতে চেয়েছে। অনেকবার শোনার পরও আরেকবার শোনার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠেছে মনে।

বলেছে, ‘বাবাকে কইও ভাই, কাইল আমি অমলারে লইয়া বাড়িত আইমু।’

পাঁচ

নাহ, সুধার বউটা সুন্দরী বটে!

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ।

সুধাংশুর দাওয়াজুড়ে পাটি পাতা হয়েছে। সেখানে পাড়ার গণ্য-মুখ্যরা বসেছেন। কৌতূহলী কিছু সাধারণ মানুষও এসেছে। পাটির এক কোনায় মুকুন্দ শীলকেও দেখা যাচ্ছে।

পাড়ার গণনীয়দের সুধাংশু আজ তার বাড়িতে ডেকেছে। সমাজের অনুমতি ছাড়া তার বড় ছেলে সুধারাম বিয়ে করে ফেলেছে। নিজ জাতের মেয়েকে বিয়ে করেনি সে। করেছে ভিন্ন গোত্রের এক মেয়েকে। দুটো অপরাধ করেছে সুধারাম―সমাজ-অননুমোদিত বিয়ে এবং ভিন্ন জাতে বিয়ে। দুটোই গর্হিত অপরাধ। যদি পাড়ার মোড়ল-মুখ্যরা সুধারামের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়, তাহলে সমাজের মানুষদের নিমন্ত্রণ খাওয়ানোর প্রস্তাব দেবে সুধাংশু।

সুধারামের ব্যাপারটা নিয়ে উপস্থিতদের মধ্যে অনেক কথা হলো―পক্ষে এবং বিপক্ষে। বেশির ভাগ বিপক্ষেই বলল। ‘এই রকম ঘটনা আগে কুনুদিন হয় নাই এই নাপিতপাড়ায়।’ ‘শত শত বছর ধইরে আমাদের পুস্তপুরুষের বসবাস এইখানে। বাপদাদার কাছেও কুনুদিন শুনি নাই এইরকম জঘইন্য কথা―নিজের বউ নিজে খুঁইজ্যা লওয়া।’ ‘শুধু তো হেই কথা না জেঠা, বিয়াটা হইল ক্যামনে ? মা-বাবার মতের বিরুদ্ধে! এ ক্যামন কথা গো জেঠা, মা-বাবা ছেইলে-সন্তান জন্ম দিছে এই কাম কইরবার জইন্য নি ?’ ‘আসল কথা খান এড়াইয়া যাইতাছ ক্যান অনীল ? মাইয়াটা আমাদের জাতের যে নয়, সেইটা কইতাছ না ক্যান ?’ এরকম নানা অসহনীয় মন্তব্যে দাওয়ায় শোরগোল শুরু হলো।

সবচেয়ে কড়া কথা শোনাল মুকুন্দ শীল, ‘সবকথা না হয় মাইন্যা লওন যায়, কিন্তুক মাইয়াখান যে হিন্দুজাতের, তার কুনু গেরান্টি আছেনি ? পরমান আছেনি তোমাদের হাতে ? ছ্যা ছ্যা! এত বয়স হইল আমার। এই জন্মে এই রকম কাম হইতে দেখি নাই সমাজে।’

সকল কুমন্তব্য দরজার মুখে দাঁড়িয়ে শুনে গেল সুধারাম। অনেক কিছু বলার ছিল তার। কিন্তু কিছু বলল না। বিকেলে বাপ বলে দিয়েছিল, ‘সইন্ধ্যায় সমাজের মানুষগুলারে ডাইকতেছি। তোমার বিয়াটা সমাজে অনুমোদন করাইয়া নিতে হইব। নানা মানুষ নানা কথা কইব। খারাপ কথাই বেশি কইব। বাড়িখান বানানোর পর শত্রু বাইড়া গেছে। সকল কথা হজম কইরে যাইতে হইব। সমাজ ছাড়া চইলতে পারুম না। সমাজের নিয়ম কড়া। একঘরে কইরে রাইখলে বাঁচন দায় হইব। কথায় কথা বাইড়ব। চুপ থাইকবে। এই সংকট থেইকে উদ্ধার পাইতে হইব।’

বাপের কথা মনে রেখে সুধারাম চুপচাপ। তার পাশে বলরাম। মুখ তার চুলবুল করছে। বাবা সাবধান করার সময় সেও সুধারামের পাশে ছিল। পিতার কথা সেও শুনেছে। তাই মুখে কুলুপ এঁটে আছে বলরাম।

সুধাংশু মাথা অনেকটা নিচু করেই পাটিতে বসে ছিল। রাগে পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে তার। রাগটা ঠিক কার ওপর বুঝে উঠতে পারছে না। সুধারামের ওপর, না সমাজের কূটকচালির এইসব মানুষদের ওপর ? তবে সমাজের মানুষেরাও তো অন্যায় বলছে না। হ্যাঁ, তাদের বলার ধরনটায় ভব্যতা নেই, এটা ঠিক। কিন্তু এটাও তো মিথ্যে নয়, যে তার ছেলে সুধারাম অন্যায় করেনি। মাতা-পিতাকে অবহেলা দেখিয়ে, সমাজমানুষদের উপেক্ষা করে সে নিজে নিজে বিয়ে করে ফেলেছে। এরকম নিজে নিজে বিয়ে করার ঘটনা শিক্ষিত ধনী বর্ণহিন্দুদের মধ্যে মাঝেসাঝে দেখা যায়। কিন্তু জেলে-নাপিত-ধোপাদের মতো নমঃশূদ্র সমাজে এটাকে এখনও গর্হিত কাজ হিসেবেই গণ্য করা হয়। তার ছেলে সুধারাম সেই গর্হিত কাজই করেছে। কিন্তু উঁচু জাতের মেয়ে বিয়ে করে তো সুধা অন্যায় করেনি। যদি মুচি-মেথর-জেলে-ডোমের মেয়েকে বিয়ে করত সুধারাম, তখন না হয় দোষারোপ করা যেত। কিন্তু সেটা তো করেনি সুধা। দত্তের মেয়েকে ঘরে তুলেছে। এ তো শ্লাঘার ব্যাপার! সমাজের মানুষকে সেটা বলে কী করে এখন ? এখন তো তার সংকটের কাল। পাথরের তলায় হাত। তা না হলে শুনিয়ে দিতে পারত, ‘আইচ্ছা, আপনারা যে এত কথা কইতেছেন, বলেন তো মহাভারতের কতজন পুরুষ মা-বাপের নির্বাচিত কইন্যারে বিয়া কইরছে ? ভীম কইরছেনি ? অর্জুন কইরছেনি ? এমনকি আমাগোর পরম দেবতা যে কৃষ্ণ, তিনি কখান মাইয়ারে মা-বাবার মত লইয়া বিয়া কইরছেন ?’

চন্দ্রনাথ শর্মা সুধাংশুকে বাঁচিয়ে দিলেন।

চন্দ্রনাথ এই নাপিতপাড়ার বামুনঠাকুর। আশি ছুঁই ছুঁই বয়স। ছোটখাটো। কিন্তু ব্যক্তিত্বশালী। ধুতি-ফতুয়া ছাড়া অন্য কিছু পরেন না। এত বয়স হলো, লাঠি ধরেননি। প্রায় তিন পুরুষের ঠাকুর তিনি এই পাড়ার। যত খারাপ লোকই হোক না কেন, তাঁর সামনে চোখ তুলে কথা বলবার সাহস করে না। সবাইকে ভালোবাসেন তিনি, ন্যায়ের পথে চলেন। পাড়ার পুজো-আচ্চা তিনি করেন না এখন। বিয়ে-শ্মশানকর্ম, পুজোর সকল কাজ এখন দুই ছেলের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তাঁর সময় কাটে রামায়ণ-মহাভারত পড়ে, শাস্ত্রপাঠ করে, পঞ্জিকা ঘেঁটে। নাপিতপাড়ার মানুষেরা ধর্মসংকটে পড়লে, সমাজসংকটে পড়লে তাঁর কাছে ছুটে আসে। তিনি যথাসাধ্য সাহায্য করেন সংকটাপন্ন মানুষদের। কোনও পরিবারে বিয়ের আয়োজন হলে, নবজাতকের ষষ্ঠীর সময় হলে―দিনক্ষণ-তারিখের জন্য চন্দ্রনাথ শর্মার কাছে আসে। তিনি পঞ্জিকা দেখে, দৈবাদৈব বিচার করে, তিথি-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করে বিয়ে বা ষষ্ঠীর তারিখ নির্ধারণ করে দেন। সেই মতে ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন হয়।

পরিবারের এই কঠিন বিপদে সুধাংশু চন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই ভরসা মেনেছে। তাঁর পায়ের কাছে বসে পড়ে সাহায্য প্রার্থনা করেছে। আদ্যোপান্ত সব খুলে বলেছে।

শেষে বলেছে, ‘আমার ছাওয়ালটা অন্যায় কইরেছে মানি ঠাকুর। কিন্তু সুধা যে আমার বড় ছাওয়াল। তারে ফেলি কী করে। বহুদিন বাইরে রাইখছি। পেরানটা মুচড়ে মুচড়ে উইঠলেও কাউরে বুইঝতে দিই নাই। কিন্তুক ইদানীং ইস্তিরির মুখের পানে তাকাইতে পারি না। বেদনায় চুরচুর সেই মুখখানা। ছাওয়ালরে বউসহ আনাইয়া লইছি। কাইল সমাজমানুষদের ডাইকতেছি। জানি, অনেকে বেঁকাটেরা কথা কইব। আমারে একঘরে কইরবার প্রস্তাব দিব। আপনি আমারে বাঁচান ঠাকুর। ছাওয়াল-বউ-ইস্তিরি লইয়া সুখে কাটাইতে চাই ঠাকুর।’ বলতে বলতে চন্দ্রনাথ শর্মার দুই পা জড়িয়ে ধরেছিল সুধাংশু।

‘পা ছাড় সুধাংশু। পছন্দের কন্যাকে বিয়ে করে তোমার ছেলে অন্যায় করেনি।’ প্রমিত বাংলায় কথা বলেন চন্দ্রনাথ শর্মা। ‘যে কোনও কারও নিজের বউ নিজে পছন্দ করার অধিকার আছে। পুরাণকালেও ছিল, এখনও আছে। তুমি বাড়ি যাও সুধাংশু। আমি কাল সন্ধ্যায় তোমার বাড়িতে যাব।’

সুধাংশুর বাড়িতে এসেছিলেন চন্দ্রনাথ শর্মা। সকলের সকল কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে গিয়েছিলেন। মাঝখানে একটি কথাও বলেননি তিনি। প্রতিকূল আবহাওয়াই ছিল বেশি। কটুকাটব্যই করে গেছে অধিকাংশ সভাজন। একজন লোকও সুধাংশু বা সুধারামের পক্ষে কথা বলেনি অথবা কথা বলার সাহস করেনি। যদি সে সমাজরোষে পড়ে!

সুধাংশুর বিপদাশঙ্কা যখন তুঙ্গে, তখন চন্দ্রনাথ শর্মা বলে উঠেছিলেন, ‘সবাই মিলে একজন অসহায় মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে সে বাঁচে কী করে বলো তোমরা! আমার মতে সুধারাম নিজের বিয়ে নিজে করে কোনও অন্যায় করেনি। নিজের বিয়ে নিজে করেছে―এই কথা বলিই-বা কেমন করে ? বিয়ের আগে সে তার পছন্দের কথা বাবা সুধাংশুকে বলেছিল। সুধাংশু সমাজের ভয়ে ছেলের কথা মেনে নেয়নি। প্রেম বলে কথা! সুধারাম প্রেমের মর্যাদা দিতে গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে। সে যদি অন্যায় করে থাকে, মা-বাপের কাছে করেছে, সমাজের কাছে নয়। কারণ চট্টেশ্বরী মন্দিরে মন্ত্র পড়েই সে বিয়েটা করেছে। তোমরা রাগ থামাও।’ একটু থামলেন চন্দ্রনাথ শর্মা। প্রীতির চোখে সুধাংশুর দিকে একবার তাকালেন, ‘এখন সুধাংশুর কর্তব্য সমাজের মানুষদের নিমন্ত্রণ খাওয়ানো।’

চন্দ্রনাথ শর্মাকে আর কথা বলতে দিল না সুধাংশু, ‘খাওয়াব। অবশ্যই নিমন্ত্রণ খাওয়াব ঠাকুর। আপনি একটা দিনক্ষণ নির্ধারণ কইরে দিন। সেই দিনই সামাজিক নিমন্ত্রণের আয়োজন করমু আমি।’

তারপর গলা উঁচিয়ে বলল, ‘কই গেলা সুধার মা, বউয়েরে লইয়া আসো। গুরুজনদের দণ্ডবৎ কইরে যাক।’ বলে কড়া চোখে মুকুন্দের দিকে এক পলক তাকাল সুধাংশু।

অমলাকে দেখে উপস্থিত জনের অনেকে বলে উঠল, ‘নাহ, সুধার বউটা সুন্দরী বটে!’

ছয়

যে সুর ছন্দ জানে, সে মানুষকে ভালো না বেসে পারে না।

সমাজের মানুষদের নিমন্ত্রণটা খাইয়েছিল সুধাংশু।

বড় ছেলের বিয়ে বলে কথা! সুধা তার মতের বিরুদ্ধে বিয়েটা করেছে। অন্যায় করেছে, মা-বাবার মনে কষ্ট দিয়েছে। মনে গভীর দুঃখ পেয়েছেও সুধাংশু। কিন্তু বাপ হয়ে কতদিন সেই দুঃখ পুষে রাখতে পারে ? সন্তানরা দুঃখ দেওয়ার জন্য, মা-বাবা ক্ষমা করার জন্য। একটা সময়ে মনটা নরম হয়ে আসতে শুরু করেছিল। মাঝেসাঝে মনে হচ্ছিল―সুধারামকে ক্ষমা করে দিয়ে বউটাকে ঘরে তোলা উচিত তার। কিন্তু অভিমান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দোনামোনায় দিন গেছে।

মুকুন্দের সেদিনের কথা তাকে খেপিয়ে তুলেছে। মুকুন্দের চ্যাটাং চ্যাটাং কথা সুধাংশুর আঁতে লেগেছিল খুব। সেদিনই পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুধাংশু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল―বউসমেত সুধারামকে বাড়িতে নিয়ে আসবে। মনে মনে আরেকটা সিদ্ধান্তও নিয়েছিল সে―সমাজমানুষদের জম্পেশ করে নিমন্ত্রণ খাওয়াবে।

চন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহায়তায় পরিস্থিতি অনুকূলে এলে তাঁর মাধ্যমেই নিমন্ত্রণের দিন-তারিখ ঠিক করল সুধাংশু। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিমন্ত্রণ করে এল।

এই নাপিতপাড়ায় একশ কুড়িটির মতো পরিবার। ছয়শর মতন মানুষ―ছোট-বড়, নারী-পুরুষ মিলিয়ে। মেয়ের বিয়েতে গোটা সমাজকে নিমন্ত্রণ খাওয়ানোর প্রথা নেই। যৌতুকাদির চাপে এমনিতেই কনের বাপের নাজেহাল অবস্থা হয়। বিয়ে সম্পন্ন করার খরচাদিও বহন করতে হয় কনেপক্ষকে। এসব বিবেচনা করে সমাজপতিরা ঠিক করেছে―মেয়েপক্ষকে পাড়ার মানুষদের খাওয়াতে হবে না। সক্ষমতা থাকলে, আর মন চাইলে বেছে বেছে সমাজের দু-দশ-কুড়িজনকে খাওয়াতে পারে। তবে তাতে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।

কিন্তু ছেলের বিয়েতে পাড়াপড়শিদের নিমন্ত্রণ খাওয়ানোর রেওয়াজ। তবে বরের বাপ গরিব হলে মোড়ল-মুখ্যদের অনুমতিক্রমে নারী বা পুরুষ―যে কোনও একটা পক্ষকে একবেলা খাওয়ানোর রীতি আছে। একটু পয়সাওয়ালা যারা এবং যারা কনেপক্ষের কাছ থেকে মোটা টাকা যৌতুক নেয়, তাদের পাড়ার নারী-পুরুষ―উভয় পক্ষকে খাওয়াতে হয়।

সুধাংশু যৌতুক না পেলেও নাপিতপাড়ায় পয়সাওয়ালা বলে গণ্য। তাই তাকে গোটা পাড়ার মানুষদের খাওয়াতে হবে এবং তাতে সুধাংশুর আপত্তিও নেই কোনও।

প্রচলিত আইটেমের আয়োজন তো করেছেই সুধাংশু, অধিকন্তু একটি বিশেষ খাবারের বন্দোবস্ত করেছে। সেই খাদ্যটির নাম―লাক্ষা মাছ। লাক্ষা মাছ সমুদ্রের মাছ। দামি এবং সহজলভ্য নয়। রুই-কাতলার চেয়ে লাক্ষার দাম অনেক বেশি। রুই মাছ রান্না, কাতলাভাজি, বেগুনভাজি, ফুলকপি-আলু-টমেটোর সবজি, মুগ ডাল, অম্বল, পায়েস এবং খাওয়া শেষে মিষ্টি―এসবের আয়োজন তো করেছেই, মহার্ঘ আইটেম লাক্ষা মাছেরও ব্যবস্থা করেছে। শেষের আইটেমটা করেছে মুকুন্দের সেদিনের খোঁচা-দেওয়ার কথা ভেবে। তার থোঁতা মুখ যে ভোঁতা করে দিতে হবে!

খাওয়াশেষে সবাই ধন্য ধন্য করে বাড়ি ফিরেছিল। যেতে যেতে বলাবলি করছিল―সুধাংশু জম্পেশ একখান নেমন্তন্ন খাওয়াইল বটে! অনেক দিন মনে থাইকব সুধারামের বিয়ার এই খাওনের কথা।

সুধাংশুর এলোমেলো সংসারে সুস্থিরতা এল। বাড়ি থেকেই যাতায়াত শুরু করল সুধারাম, সেলুনে। একটু সকাল সকাল রওনা দিতে হয়, এই যা। কর্ণফুলির ওপারেই তো ফিরিঙ্গিবাজার। এতদিন তার বুকে যে চাপ ছিল, তা সরে গেছে। মা-বাবা-ভাইয়ের সঙ্গে বউ নিয়ে জীবন কাটানো কী যে আনন্দের!

আগের মতোই সুধাংশু আর বলরাম হাটের সেলুনে যায়।

বলরাম আরেকটা জায়গায় যায়, সে খালের ওপারের জেলেপাড়া। বিশেষ একজনের কাছে যায় বলরাম। সে জন বয়সে তার চেয়ে অনেক বড়। অনেকটা বাপ-ছেলের বয়সের মতো। গিয়ে তাঁর সঙ্গে যে কথাবার্তা বলে, তা নয়। অধিকাংশ সময় কথাই হয় না তাঁর সঙ্গে। কোনও কোনওদিন গিয়ে দেখে―লোকটি সংসারের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। কোনওদিন-বা ক্লান্তদেহে দাওয়ায় বিছানো চাটাইয়ে ঘুমিয়ে আছেন। মন খারাপ করে ফিরে আসে সেদিন। যেদিন ভাগ্য ভালো হয়, সেদিন ওই লোকটিকে ঢোল সামনে নিয়ে বসে থাকতে দেখে। উৎকর্ণ হলে শুনতে পায়―লোকটি দু হাতের দশ আঙুল দিয়ে ঢোলের ডাঁয়ায় এবং বাঁয়ায় তাল ঠুকে যাচ্ছেন। তিনি বিনয়বাঁশী জলদাস।

ছোটবেলা থেকে বলরাম তাঁর নাম শুনে এসেছে। আট-দশ বছর বয়স তখন তার, একদিন বিনয়বাঁশীর উঠানে গিয়ে হাজির হয়েছিল। নাপিতপাড়া থেকে একটু দক্ষিণে এগিয়ে গেলে একটা বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো বেয়ে বড় রাস্তায়ও যাওয়া যায়, আবার জেলেপাড়াতেও ঢোকা যায়। একসকালে বাপ সুধাংশু ক্ষৌরকাজে বেরিয়ে গেলে পা পা করে বিনয়বাঁশীর বাড়ির উঠানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল বলরাম। বিনয়বাঁশী তখন কোলের ওপর ঢোল রেখে চক্ষু মুদে মৃদু তালে বাজিয়ে যাচ্ছিলেন। আশেপাশে কেউ নেই। নারীরা হয়তো ভেতর-ঘরে ঘরকন্নায় ব্যস্ত। তারই বয়সী সাত-আটজন ছেলেমেয়ে দূরের এক উঠানে এক্কাদোক্কা খেলছে। বাজনার আওয়াজ মৃদু থেকে ধীরে ধীরে প্রবল হচ্ছিল। ওই বয়সে একটুকুন বলরামের কী হলো কে জানে, সম্মোহিতের মতো নিষ্পলক চোখে বিনয়বাঁশীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। তার দু পা যেন মাটিতে গেঁড়ে গেছে। নড়নচড়নের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। কখন ঢোল বাদন থেমে গেছে, খেয়াল রাখেনি বলরাম।

খেয়াল হলো যখন শুনল, ‘কে তুমি খোকা ? কোন বাড়ির ছেলে তুমি ? বাহ, কী মিষ্টি চেহারা!’

বিনয়বাঁশী ততক্ষণে দু হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বলরাম এগিয়ে গিয়েছিল।

প্রথম দিনেই দুজনের মধ্যে বেশ ভাব হয়ে গেল। কথায় কথায় বিনয়বাঁশী জেনে গেলেন―বলরাম নাপিতপাড়ার সুধাংশুর ছোট ছেলে। সুধাংশু শীলকে বিনয়বাঁশী ভালো করেই চেনেন। তাঁর চুলদাড়ি আর তাঁর ছেলেদের চুল তো সুধাংশু দাদাই কাটে। আদরে কোলের কাছে টেনে নিয়েছিলেন বিনয়বাঁশী, বলরামকে। সুরবালা দেবী এক বাটি মুড়ি এনে সামনে রেখেছিলেন। বিনয়বাঁশী বললে সেই মুড়ি মুঠো মুঠো খেতে শুরু করেছিল বলরাম। তার মুড়ি চিবানো পরম মমতায় দেখে গিয়েছিলেন বিনয়বাঁশী। বলরামের বিনয়বাঁশীর সান্নিধ্য পাওয়া সেই থেকে শুরু।

এর পর থেকে সুযোগ পেলেই জেলেপাড়ায় চলে আসে বলরাম। এদিক-ওদিক না তাকিয়ে বিনয়বাঁশীর উঠানে এসে দাঁড়ায়। বিনয়বাঁশী থাকলে দাওয়ার দিকে এগোয়, না থাকলে পেছন ফিরে শ্লথ পায়ে হাঁটতে থাকে। এইভাবে অসম বয়সের দুজন মানুষের মধ্যে গাঢ় সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

বাপ তাকে গোমদণ্ডী প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। ফাইভ পাস করে হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল। এইটের পর আর এগোতে পারেনি বলরাম। অঙ্কটা মাথায় ঢোকেনি, ইংরেজিটা খটমটে লেগেছিল। এইটে দু’বার গাড্ডা খাওয়ার পর সুধাংশু বলেছিল, ‘আর না। তোরে দিয়া আর লেখাপড়া হইব না বলরাম। চিরুনি-কাঁচি হাতে ল এইবার। আমি বাঁইচ্যা থাইকতে থাইকতে, চুল-দাড়ি কাডনর কামটা শিখ্যা ল ভালা কইরে।’

নাপিতের কাজটা বাপের কাছ থেকে ভালো করে শিখে নিয়েছিল বলরাম। আর শিখেছিল ঢোল-বাদন। তাঁর বাদনগুরু বিনয়বাঁশীর কাছ থেকে।

একদিন বিনয়বাঁশী বলেছিলেন, ততদিনে বলরামের বয়স পনেরো পেরিয়ে গেছে, ‘পাশে বসে বসে আর কতদিন আমার বাজনা শুনবি বলরাম। এবার তুইও বাজাতে শিখ।’ বলে হাত ধরে কাছে টেনে নিয়েছিলেন বলরামকে।

থতমত হয়ে বলরাম বলেছিল, ‘আমি!’

‘হ্যাঁ, তুই। আমার ছেলে বাবুল যেমন শিখছে, তুইও তেমন করে শিখবি। আমি তোকে শেখাব।’

‘বাবা যদি…।’

বলরামের কথা কেড়ে নিয়ে বিনয়বাঁশী বলেছিলেন, ‘তোর বাবা আর কী মনে করবে! শোন, প্রত্যেক মানুষের দু-একটা বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখে রাখা উচিত। সুর আর তাল মানুষকে কষ্টের সময় আনন্দ দেয়। যে সুর ছন্দ জানে, সে মানুষকে ভালো না বেসে পারে না।’

হঠাৎ সংবিতে ফিরেন বিনয়বাঁশী―ছোট ছেলেটির জন্য তাঁর কথাগুলো ভারী হয়ে গেল না তো ? নিজেকে সংযত করেন। তারপর হালকা গলায় বলেন, ‘নে, ঢোলটা সামনে নে। দুই হাত ডাঁয়ায় আর বাঁয়ায় রাখ। মনে রাখবি―তোর আঙুলগুলোই ঢোলের সঙ্গে কথা বলবে। আলাপ যত গভীর হবে, বাজনাও সুন্দর হবে তত।’

সাত

বুইঝছি গো বুইঝছি। অখন আমার চাইতে তোমার

কাছে পুতের বউয়ের দাম বেশি।

অমলা আসার পর বাড়ির ভেতরকার চেহারা একটু একটু করে পালটাতে লাগল। আগে বাড়িটিতে ছন্নছাড়া পরিবেশ ছিল, অমলা আসার পর এখানে-ওখানে শ্রী লাগতে শুরু করল। উঠানটা প্রতি সকালে ঝাঁট দেওয়া হতো না। আশপাশের গাছ থেকে পাতাপুতা ঝরে উঠানজুড়ে জঞ্জাল তৈরি হতো। যমুনার শরীরে কুলাত না। থালাবাসন-ডেকচি-পাতিল ধুতে-মাজতে রাত গভীর হয়ে যেত। গোটা দিনের কাজের চাপে শরীরটা জরজর। স্বামী-পুত্রের খাওয়ার পর নিজে দু মুঠো মুখে দিয়ে রান্নাঘর গুছিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ত। ভোরে উঠে ছেলেদের পান্তাভাত দেওয়া, সঙ্গে আবার দুটো ডিমের মামলেট করে দেওয়া। ওরা বিদেয় হলে স্বামীর হাঁক, ‘কই সুধার মা, কিছু খাইতে দিবানি ? পেট যে চোঁ-চোঁ কইরতেছে!’

স্বামী-সন্তানের প্রয়োজন মিটাতে মিটাতে সকালের দাঁত মাজাটা পর্যন্ত ভুলে যেত যমুনা। সকালে কিছু খাওয়া ? না না, সে খাবে কেন ? মেয়েদের যে খিদে পেতে নেই! এরপর তো দুপুরের রান্নার আয়োজন করা। উঠানের ময়লা-পাতাচোতার দিকে তাকানোর সময় কোথায় যমুনার!

অমলা আসার পরদিন ভোরে বাড়ির সবাই দেখল―ঝাঁট দেওয়া উঠানটি একেবারে ঝক ঝক করছে। দাওয়ায় উঠার ধাপগুলো লেপামোছা। ওই যে উঠানের একঠেরে তুলসীবেদিটি, তার গোড়ার এবং আশপাশের ঘাস-আগাছা একেবারে উধাও।

সুধাংশু আর যমুনার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এ অমলার কাজ। ভোরসকালে স্বামীর পাশ থেকে উঠে ভোজবাজির মতো এই কাজগুলো সম্পন্ন করে রেখেছে অমলা।

সুধাংশু মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিল―এই মেয়েটিকে বিয়ে করার বিরোধিতা করেছিল সে ? এতদিন বাড়িতে আসতে দেয়নি ?

যমুনার তৃপ্তির অবধি থাকল না। চট করে হাত দুটো কপালে ঠেকিয়েছিল, কার উদ্দেশে কে জানে, হয়তো তার ইষ্টদেবতার উদ্দেশে, বলেছিল, ‘সুধার বউটারে দীর্ঘজীবী কইরো ঠাকুর।’

অমলা ওখানেই নিজের কর্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ধীরে ধীরে শাশুড়ির হাত থেকে প্রতিদিনের সাংসারিক দায়িত্বের অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে। যমুনা পুতের বউয়ের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চায়নি। বারবার বলেছে, ‘তুমি নতুন আইছ মা এই বাড়িতে। নতুন বউয়ের কিছু কইরতে নাই। ইচ্ছা হইলে আমার পাছে পাছে থাইক। মন চাইলে দুই একটা কাম উজাইয়া-বাড়াইয়া দিয়ো। তাতেই আমার ভালা লাইগব।’

‘কী যে বলেন না মা!’ কয়েক দিনের মধ্যে শাশুড়ির সঙ্গে অমলার সম্পর্ক সড়গড় হয়ে গেছে। ‘আপনার কি আরেকটা ছেলের বউ আছে যে আপনার হাতের কাজ কেড়ে নেবে ? আর আমি নতুন বউ কোথায় মা ? বিয়ে হয়েছে সাত-আট মাস হয়ে গেল। আমি আপনার অত কথা শুনতে চাই না মা। আপনি আমাকে দু-একদিন রান্নার কাজটা দেখিয়ে দিলে আমি ঠিক রপ্ত করে নেব। আপনাকে কোনও কাজ করতে হবে না। সারা জীবন তো করে গেছেন!’

হাসির একটা ঝলক যমুনার সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে বউমা। সব কাজ তুমি নিজে কইরলে হইবে না, আমার লাইগাও দু-চাইরখান কাম রাইখা দিয়ো। একটা বাড়িতে কি কামের শেষ আছে!’

সকালে স্বামী-দেবর-শ্বশুরকে পান্তাভাত দেওয়া, শাশুড়ি সকালে একটু চা খেতে চায়, তার জন্য চা করা, সকালের খাওয়াপর্ব শেষ হলে দুপুরের খাবারের জন্য শাক-তরকারি-মাছ এসব কুটাবাছা করা―হাসিমুখে করে যেতে লাগল অমলা।

একদিন সকালে শাশুড়ির সঙ্গে চা খেতে খেতে অমলা বলে, ‘আচ্ছা মা, সকালে পান্তাভাতের বদলে ছেঁকারুটি খেলে কেমন হয় ? পান্তাভাতের জন্য তো রাতের হাঁড়িতে দু-চার মুঠো চাল বেশি দিতে হয়। সকালে আটার রুটি খেলে ওই বাড়তি ভাত আর রাঁধতে হবে না। চালের দামের চেয়ে আটার দাম তো অনেক কম।’

‘বুইঝলাম মা, কিন্তুক সকালে উইঠা আটা মথ রে, গোল গোল কইরে বেল রে, তারপর আগুনে ছেঁক রে! ওই ঝুটঝামেলাগুলা কে কইরব রে বউ ?’

গম্ভীর মুখে অমলা বলল, ‘কেন, আপনি করবেন। স্বামী-সন্তানের জন্য ওই কষ্টটুকু করতে পারবেন না আপনি ?’

চমকে অমলার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয় যমুনা। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মøান মুখে বলে, ‘তুমি কইলে সব পারুম মা।’

ঝরনাধারার মতো খিল খিল করে হেসে উঠে অমলা। হাসতে হাসতে শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘তোমার এই মেয়ে মরে গেছে মা ? মেয়ে থাকতে মা কেন আটা মাখা-আটা বেলার কাজ করবে!’ সেদিন ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নেমে এল অমলা। আরও বলল, ‘বাবাকে রাজি করানোর দায়িত্ব কিন্তু তোমার মা।’

দুটো ছেলে জন্মানোর পর আর কোনও সন্তান হয়নি যমুনার। হলে মেয়েরই আকাক্সক্ষা করত। বিধির বিধানে কন্যার মা হওয়ার সুখ থেকে বঞ্চিত হয়েছে যমুনা। আজ যমুনার মনে হলো―পুত্রবধূ অমলা যমুনার কন্যার মা হবার বাসনা মিটিয়ে দিল। অমলাকে পরের ঘরের মেয়ে বলে মনে হলো না, নিজের পেটের মেয়ে বলে মনে হলো। সেই সকালে অমলার মাথাটি বুকের মাঝখানে টেনে নিয়েছিল যমুনা।

পরদিন থেকে সুধাংশু শীলের বাড়িতে পান্তাভাতের বদলে আটার ছেঁকা রুটি খাওয়া আরম্ভ হয়েছিল।

রাতে শোয়ার ঘরে যমুনার কাছ থেকে প্রস্তাবটা শুনে বিরক্তই হয়েছিল সুধাংশু, ‘কী আজগুবি কথাখান কইলা সুধার মা! পুস্তপুরুষ ধইরে নাপিতপাড়ার মানুষগুলান সকালে পান্তাভাত খাইয়া আইসতেছে। সেই ধারা ভাইঙ্গা তুমি কইতেছ আটার রুটি খাওয়া শুরু কইরবা। মাথা থেইকা ছেঁকা রুটির পোকা বাইর কইরে দাও তো দিকিনি।’

যমুনা এবার মোক্ষম অস্ত্রটি ছাড়ল, ‘কথাখান কিন্তুক আমার না, বউয়ের। বউয়েই আইজ সকালে পরস্তাবখান দিছে।’

বউয়ের নাম শুনে চুপসে গেল সুধাংশু। সুধার বউটাকে যে কখন বুকের তলায় স্থান দিয়ে ফেলেছে, জানে না সুধাংস।

‘আইচ্ছা, ঠিক আছে। বউ যখন কইছে…।’ কথা অর্ধসমাপ্ত রেখে পাশ ফিরল সুধাংশু।

ঝটকা মেরে স্বামীকে নিজের দিকে ফেরাল যমুনা। কৃত্রিম ফোঁসানো গলায় বলল, ‘আমি বইল্লে হাজারখানা অজুহাত! বউয়ের নাম শুইনে জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতন চুইপসা গেলা ক্যান ?’

সুধাংশু স্ত্রীর অভিনয়টা বুঝল না। ধরে নিল সত্যি সত্যি রেগে গেছে যমুনা। পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টা করল, ‘আহা, তুমি অত চইটলা ক্যান ? পুতের বউ একখান কথা কইছে, মাইনা না-লইয়া কি পারি ? তুমিই কও যমুনা, সুধার বউয়ের পরস্তাবরে অবহেলা দেখানো উচিত আমার ?’

যমুনা চাপা গলায় বলল, ‘বুইঝছি গো বুইঝছি। অখন আমার চাইতে তোমার কাছে পুতের বউয়ের দাম বেশি।’

দুজনেই খলবল করে একসঙ্গে হেসে উঠল। আবার দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘চুপ চুপ! আস্তে আস্তে! পাশের ঘরে যে ছেইলে আর ছেইলের বউ!’

এইভাবে দুই বছর কেটে যায়। এই দুই বছরে বারবার শতবার মায়ের কথা মনে পড়েছে অমলার। ছোট বোনটির কচি মুখখানি তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। নদীর ধারের বাড়িটি। আম-জাম গাছে ঘেরা পুকুরটি। ধানখেত, আলুখেত, ডাহুকের কিলবিলানি, গাভিটি, সন্ধ্যায় গাছজুড়ে নানা পাখপাখালির কিচিরমিচির―একের পর এক চোখের সামনে দিয়ে চলচ্চিত্রের মতো ভেসে যায়। জানালার সিকে মাথা ঠেকিয়ে জীবনের কত কথা ভেবে যায় অমলা।

হঠাৎ ডুকরে ওঠে অমলা, ‘বাবা, বাবা রে! আমাদের ওই রকম করে রেখে কেন চলে গেলে রে বাবা ?’

তার এই আকুতি কেউ দেখল না। আর্তনাদ কেউ শুনতে পেল না।

বাড়ি খালি। শাশুড়ি গেছে পাড়ার লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দিরে।

আট

দু বোনের বেশ বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যেস ছিল।

ঘাঘর নদী। পৃথুলা নয়। তন্বী তরুণী। উছল। প্রাণময়ী। বড় নয় বটে, গভীর। তীব্র স্রোতস্বিনী। এ নদীর গতিপথ কখনও সোজা, কখনও আঁকাবাঁকা। তার এগোনো সমুদ্রের দিকে। জানে না সে সমুদ্রের দেখা পাবে কি না, এ জনমে। নরম মাটি কেটে কেটে এগোনোই তার নেশা।

ঘাঘরের দু পাশে নানা গ্রাম―রামনগর, বৈকুণ্ঠপুর, ছিকটিবাড়ি, নয়ানগর, কমলাপুর। এসব গ্রামজীবনের নাড়িতে নাড়িতে জড়িয়ে আছে ঘাঘর নদী। তীরবর্তী দশখানা গাঁয়ের মানুষ স্নান সারে এই নদীর জলে। এমন নির্মল স্বচ্ছ নিরাপদ জল আর কোথায় আছে ?

এই ঘাঘরের জলে স্নান করে করে বড় হয়েছে অমলা। শুধু অমলা কেন, তার বোন সুজলাও দিদির হাত ধরে ঘাঘরের জলে সাঁতার শিখেছে।

মায়ের সঙ্গেই নাইতে যেত দু বোন। পাশের পাড়ার শোভনা কাকির সঙ্গে বড় খাতির মায়ের। সখীর মতো ভাব। শোভনা কাকির বাপের বাড়ি আধাশহর-আধাগ্রামের মতন। সেখানে গাড়ি-রেডিও যেমন আছে, আবার সকাল-সন্ধ্যায় পাখির কলরবও আছে। হাইস্কুল পাস করা এই শোভনা কাকি। পাশের পাড়ার বসুবাড়িতে বিয়ে হয়েছে কাকির। অখিলেশ কাকা গ্র্যাজুয়েট। মাদারীপুর শহরে চাকরি করে। জেলা-শাসকের দপ্তরে। থাকে শহরে। সপ্তাহান্তে আসে। ঘরে বিধবা মা আর সুন্দরী স্ত্রী। ওদের টানেই আসে অখিলেশ কাকা। বিয়ের বছর খানেক পরে চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় দেখা হয় দুজনের―শোভনার আর সুশীলার। বয়সের ফারাক বেশ। তবু একজন আরেকজনকে পছন্দ করে ফেলে। পছন্দ থেকে ভালোবাসা। শোভনার নদীতে নাইতে আসার দরকার নেই। বাড়িতে স্বচ্ছ জলের পুকুর। তারপরও সপ্তাহে এক-দুই দিন ঘাঘরে আসে শোভনা। শুধু সুশীলার সঙ্গে দেখা করবে বলে।

দুই সখী কোমরজলে নেমে গল্প শুরু করে। সঙ্গে যে দুই কন্যা এসেছে, ভুলে যায় সুশীলা। সুজলা তখন অশান্ত হয়ে ওঠে। বয়স তখন তার কত ? এই চার-পাঁচ। অমলার পক্ষে তাকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অমলার হাত ছাড়িয়ে জলের মধ্যে ঝাঁপরাতে চায়। নেমে যেতে চায় মাথাসমান জলে। নদীজলে তখন মৃদু চোরাস্রোত। অমলার বুক কেঁপে ওঠে। যদি স্রোতে ভেসে যায় সুজলা! আর ভাবতে পারে না অমলা। চিৎকার দেয়, ‘মা দেখো, সুজলা গভীর জলে যেতে চাইছে।’

মা চোখ দুটো তুলে তাকায়। সখীকে বলে, ‘ছোট মেয়েটা এমন দামাল হয়েছে না! কথা শোনে না মোটেই। দেখো না, দিদির সঙ্গে কেমন ত্যাদরামি করছে।’ বলে আবার শোভনার সঙ্গে কথায় মশগুল হয়ে পড়ে।

মায়ের কাছ থেকে কোনও ধমক না পেয়ে আরও দস্যু হয়ে ওঠে সুজলা।

অমলা কৌশল করে, ‘শোনো বোনটি, তুমি যে জলে দাপাদাপি করতে চাইছ, ঠিক আছে। কিন্তু ওসবের আগে যে সাঁতারটা শিখতে হবে।’

‘শিখব তো। সাঁতার শিখব। শিখাও না। সাঁতার শিখে আমি নদীর ওই পারে সাঁতরে যাব।’ সুজলার কোমল গলায় ভাঙা ভাঙা কথাগুলো বড় ভালো লাগে অমলার।

বুক এবং পেটের নিচে দু হাত ঢুকিয়ে বোনটিকে উপুড় করে জলে ভাসিয়ে রাখে। বলে, ‘হাত-পা নাড়তে শুরু করো।’

এইভাবে একদিন অমলা নামের শিক্ষিকার কাছে সাঁতারটা রপ্ত করে নেয় সুজলা নামের ছাত্রীটি।

আরেক দিনের কথা বেশ মনে আছে অমলার। সেদিন শোভনা কাকি আসেনি। নদীজল-ছোঁয়া বড় পাথরটিতে বাসি কাপড়গুলোতে সাবান ঘষছিল সুশীলা। মনটা বড় উতলা সেদিন। স্বামীটি দুই গ্রাম পরের গ্রামে ঘরামির কাজ করতে গেছে। পাঁচ দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও ফেরেনি। এরকম হয় মাঝেমধ্যে। দূর গ্রামে কাজ নিয়ে যায়। দুই-তিন দিন লাগে। কোনও কোনও বার সাত দিনও লেগে যায়। যাওয়ার সময় বলে যায়, ‘চিন্তা করো না। বড় কাজ। ধনী লোক। কাজটা ভালো করলে খুশি হয়ে কিছু টাকা বাড়তি দেবেন।’

এই ঘটনা একবার-দুইবারের নয়। অনেকবারের। অভ্যস্ত হয়ে গেছে সুশীলা। কিন্তু কেন জানি, মনটা বড় আনচান করছে এবার। স্বামীর কথা চিন্তা করতে করতে কাপড় কেঁচে যাচ্ছে। ওদিকে দুই মেয়ে বুকজলে এগিয়ে গেছে। দু-চারদিনের শেখায় সুজলা নিজেকে বেশ লায়েক ভাবতে শুরু করেছে। দিদিকে ছাড়া গভীর জলে এগিয়ে গেছে। হঠাৎ শরীরে কীসের একটা টান খায় সুজলা। প্রথমে বুঝতে পারে না। বুঝতে পারে, যখন স্রোত বেশ কিছুটা দূরে টেনে নিয়ে গেছে তাকে। সাঁতার কাটা ভুলে যায় সুজলা। ভয় তাকে জড়িয়ে ধরে তখন। জলে খাবি খেতে শুরু করে। দুই হাত ওপরে তুলে হাঁচোড়পাঁচোড় করতে শুরু করে। পেটভরা জল নিয়ে কোনও রকমে ডেকে ওঠে, ‘দি―দি!’

দিদি শোনার আগে মা-ই শোনে, সুজলার ডাক।

সাঁতরে কাছে গেলে ভীষণ জোরে আঁকড়ে ধরে মাকে। অমলার শরীর তখন ঠান্ডা! হে ভগবান, বোনটি যদি মারা যেত! যদি ভেসে যেত মাঝনদীতে! কান্না ভুলে গিয়েছিল অমলা, সেদিন।

দু বোনের বেশ বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যেস ছিল। বনবাদাড় মানে নদীঘেঁষা বিস্তীর্ণ জায়গা। ওই অঞ্চল জুড়ে খড়বন-বাঁশবন, শিমুল-পাকুড়-শিরীষ-জিউলি-শাঁড়া গাছের ছড়াছড়ি। সব গাছ যে চেনা, এমন নয়। অচেনা গাছগাছড়াই বেশি। যত রাজ্যের পাখি এসব গাছে। কোন কোন রাজ্য থেকে যে উড়ে এসে গাছে গাছে বাসা বেঁধেছে, কে তার হদিস রাখে ? চাষের জমির চেয়ে কুমারী ভূমির পরিমাণ বেশি। আর এই ভূমির ঝোপেঝাড়ে শিয়াল-খরগোশ-নেউল-ভাম-বনবিড়াল-খটাশ আর হরেক রকম জাতসাপের নিশ্চিন্ত আশ্রয়। এখানে ঘুরে বেড়াতে দুজনের কেউ ভয় পেত না। বরং সুজলার ভয়ডর ছিল অমলার চেয়ে কম। পাখির বাচ্চা ঘরে নিয়ে আসতে চাইত সুজলা। পাখি পালবে সে। মা-নেউল পেছনে বাচ্চার সারি নিয়ে সরসর করে পালিয়ে যেতে চাইলে তাদের পিছু নিত। একটি বাচ্চা যদি কব্জা করা যায়! একবার দুটো গোসাপ ঝগড়ায় লেগেছিল খুব। সে কী মারামারি-কামড়াকামড়ি, লেজের বাড়ি! খড়বনের ওই অংশটা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। লম্বা ঘাসগুলো দুমড়ে মুচড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেল। গোসাপের একটারও সেদিকে খেয়াল নেই। খেয়াল শুধু প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। দুটোরই শরীরের এখানে-ওখানে ছিঁড়ে গেছে। একটার তো এক পা ভেঙে লড়খড়াচ্ছে।

এই জীবনমরণ যুদ্ধ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবেই দেখবে সুজলা। অমলা যতই বলে, ‘চলো চলো। এদের যে কোনও একটা টিকতে না পেরে ধুম করে দৌড় ছুটাবে। আমাদের দিকেও আসতে পারে। ওদের পেট ভরতি গোসসা এখন। সামনে আমাদের পেলে শত্রু ভেবে কামড়ে দেবে।’

কে শোনে কার কথা! সুজলা যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেখেই যাবে। সেদিন অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল অমলাকে সুজলাকে ওখান থেকে সরিয়ে আনতে।

এই সুজলা এখন কেমন আছে, কোথায় আছে কে জানে ?

বাপ বড় ভালোবাসত সুজলাকে। বাড়ির হাঁসটা, ডিমগুলো, সবজিগুলো হাটে বিক্রি করতে যাওয়ার সময় গোঁ ধরে বসত সুজলা―সেও বাপের সঙ্গে হাটে যাবে। বাপ যতই না না করত; সুজলার বেগরবাই বেড়ে যেত তত। সে যাবেই যাবে। কখনও কখনও অমলাও যে যেত না, তা নয়। গাঁ ছাড়িয়ে বড় রাস্তার ধারে খালের পারে হাটটি। সপ্তাহে দু দিন বসে। সারিবদ্ধ বাঁশের খুঁটির ওপর ছোট ছোট দোচালা। চারদিক খোলা। সেখানেই দোকানিরা পসরা নিয়ে বসে। এর বাইরে বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা। আশপাশের গাঁ-গেরাম থেকে আসা গৃহস্থরা তাদের ঘরের দ্রব্যাদি নিয়ে বিকাতে বসে। বাপ বাবুলালও ওই খোলা স্থানের কোনার দিকটা ঘেঁষে তার পসরা নিয়ে বসে পড়ত।

হাটে যাওয়ার দিন কী মজা দুই বোনের! অমলা-সুজলা হাত ধরাধরি করে বাপের আগে আগে হাঁটে। হাঁটে না, লাফিয়ে লাফিয়ে এগোয়। এক এক সময় খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ত সুজলা। রাস্তার ওপর বসে পড়তে চাইত। বাপ অমলার হাতে হাঁসটা ধরিয়ে দিয়ে সুজলার ডান হাতটা আঁকড়ে ধরত। মুখে বলত, ‘আর বেশি দূরে নয়। ওই তো হাট দেখা যাচ্ছে মা।’

দিনের শেষে দুই বোন বুকভরা আনন্দ নিয়ে বাপের সঙ্গে বাড়ি ফিরত।

অমলা আবার ফুঁপিয়ে ওঠে। আজ সে কোথায়, মা-বাবা আর বোন সুজলা কোথায়!

নয়

‘আলপনার পেটখানার দিকে তাকিয়েছো ?’

ঠাম্মা মুখের আড়ালটা সরিয়ে নিল।

অমলাদের গাঁ রামনগর। ঘাঘর নদীর গা-ঘেঁষেই। তার বাপ বাবুলালের তেমন কোনও জমিজমা ছিল না। একখণ্ড ঊষর জমি ছাড়া। বর্ষায় ধান চাষ করত ওই একফসলি জমিতে। ধান তেমন পেত না। মেরেকেটে দু মাসের। নিজের জমিতে ধানচারা পোতা শেষে অন্যের জমিতে কামলা খাটত বাবুলাল। আদ্যিকালের যন্ত্রপাতি―লাঙল, নিড়ানি আর কাস্তে। লাঙল টানে জোড়া বলদ―লোকে বলে দামড়া। বলদগুলো যে পালোয়ান, তা নয়। অধিকাংশই খর্বাকৃতি। শীর্ণ শরীর। গাঁয়ের সমর্থ দু-চারজন চাষির বলদ বেশ স্বাস্থ্যবান। তেল-চুকচুকে শরীর। বাবুলাল ধনারামের কাছ থেকে অনেক অনুরোধ-উপরোধ করে বলদজোড়া ধার আনত। একদিনের জন্য। ওই একদিনেই খণ্ডজমিটির চাষের কাজ শেষ করতে হতো। এর পর গোটা বর্ষাকাল জুড়ে অন্যের জমিতে মজুরিখাটা। দৈনিক হিসাবে।

পেটভরে পান্তাভাত খেয়ে খেতমজুরি করতে যেত বাবুলাল। পান্তার আমানি ঘামঝরা খাটুনিতে শরীর ঠান্ডা রাখে। কতক্ষণ আর ঠান্ডা রাখা! পাট বা ধান খেত নিড়ানো, ধান কাটা, ধান রোয়া―এসব কাজে শক্তির দরকার। এক-দুই দণ্ড পরে পেটের পান্তাভাত কোথায় উধাও হয়ে যায়! দেহে তখন টান ধরে খুব। একটু বসে জিরিয়ে নিতে যায় বাবুলাল। জমির মালিক কাজ তদারকির জন্য আলের ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। কাজে ঢিল দেওয়া বাবুলালকে উদ্দেশ করে বলে, ‘বসে পড়ার ধান্ধা করো না বাবুলাল। দিন শেষে পয়সা নিচ্ছ গুনে। কাজও তো সেরকম করে বুঝিয়ে দিতে হবে আমায়! কাজে ফাঁকি দিলে ওপরঅলার কাছে কী জবাব দেবে ?’ কথা একটু থামায় অনীল পোদ্দার। তারপর ঘা-এ প্রলেপ দেয়, ‘তোমরা মন লাগিয়ে কাজ করছ বলেই না গোলায় আমার কিছু ধান ওঠে। তোমরা ঢিলেমি করলে আমার গোলা যে খাঁখাঁ করবে ভাই। আমার বাড়ির মন্দিরে দু বেলা যে ভোগ চড়ে, সে তো তোমাদের জন্যই। ঈশ্বরকে ভয় করো ভাই। কাজে ফাঁকি দিয়ো না।’

বাবুলালের দেহখানি টনটন করছে, কথা শুনতে চাইছে না শরীর। ধানখেতের পাশের গাছের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নেওয়ার আকুতিকে গিলে ফেলে কাজে মন দেয়।

মনে মনে গরজায় বাবুলাল, ‘শালা, মন্দির ঝাড়ছে! ঈশ্বর-ভগবানের দোহাই দিচ্ছে! নিজে কী করেছে শালা দু-চার-দশ গাঁয়ের মানুষ জানে।’

অনীল পোদ্দার রামনগর গাঁয়ের সম্পন্ন চাষি। অনেক জমিজমা তার। গোয়ালে গাভি-বলদের ছড়াছড়ি। বিশাল উঠানে ডজনখানেক ধানের গোলা। ওপাশে গুদামমতো পাটের ঘর। হ্যাঁ, মন্দির একটা আছে তার বাড়িতে। রাধাকৃষ্ণের মন্দির। ভোগও চড়ানো হয়। দু বেলা। গাঁয়ের দরিদ্র মানুষগুলো ভোগও পায়। পোদ্দারের মুখে সবসময় হরিনাম।

এই পোদ্দারের প্রতি ঘৃণার অবধি নেই গাঁ-গেরামের মানুষের মনে।

দিদির বাড়িতে বেড়াতে এল আলপনা। অনীল পোদ্দারের স্ত্রী দীপ্তিরানির বোন সে। বালবিধবা। বোনঝি-বোনপোগুলোকে বড় ভালোবাসে আলপনা। তাদের নাওয়া-খাওয়া, খেলনাপাতি, আদরযত্ন―এসব নিয়েই দিন কাটে তার। যেতে চাইলে দিদি ছাড়ে না তাকে।

বলে, ‘যাবি কোথায় ? যাবি তো বাপের বাড়ির সেই অযত্নের সংসারে। কেউ তো যত্ন নেয় না তোর। মা-বাপ যতদিন ছিল, কিছুটা কদর ছিল। এখন তো দাদারা তোকে তেমন দেখতে পারে না। এখানেই থেকে যা, যে কদিন মন চায়।’

দিদির কথা ফেলেনি আলপনা। সত্যিই তো কৃশকায়া দাঁত-উঁচু আলপনার তেমন কোনও আদর নেই বাপের বাড়িতে। তার চেয়ে দিদির বাড়িতে থেকে যাওয়াই ভালো। দিদির আদর, দাদাবাবুর সযত্ন চাহনি, বোনপো-বোনঝিদের মাসি মাসি ডাক―তাকে দিদির বাড়িতে থেকে যেতে প্রেরণা দেয়।

এক সকালে পুকুরে নাইতে গেল দিদি। ফিরল ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে খোঁচা খেয়ে। দরদর করে রক্ত ঝরছিল। ঘাটের কাছে পুকুরের তলায় মরা গাছের ডালটাল পোঁতা ছিল। সুচালোই ছিল আগাটা। খোঁচাকে খুব আমলে নিল না দিদি। কচি দূর্বা ছেঁচে বুড়ো আঙুলে বেঁধে বলল, ‘ও কিছু না। সেরে যাবে।’ স্বামীকেও জানাল না।

সারেনি। দুদিন পর টের পেল―বুড়ো আঙুলে যখন পুঁজ জমল, ব্যথায় টনটন করতে শুরু করল আঙুলটা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল এই কদিন। অবশেষে হাঁটাই বন্ধ হয়ে গেল। ধনুষ্টঙ্কার হলো দিদির। মরেই গেল এক সকালে।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, মাসিক শ্রাদ্ধ এমনকি বাৎসরিক শ্রাদ্ধ চুকে গেলেও দাদাবাবুর বাড়ি থেকে চলে গেল না আলপনা। যাবে কী করে ? দিদির বাচ্চাদের প্রতি মায়া আছে না! সে চলে গেলে এই গুড়াগুর্বাদের দেখভাল করবে কে ? না-খেয়ে, না-পরে যে বোনঝি-বোনপোগুলো মরে যাবে! দাদাবাবুর মতো বেখেয়ালি মানুষ আর আছে একজন, আশপাশের দু চার-দশগ্রাম জুড়ে ? শুধু জমিজমা, ক্ষেতখামার, ধান-পাট-রবিশস্য―এগুলো নিয়েই তো পড়ে থাকে দাদাবাবু। সন্তানদের প্রতি যে একটু চোখ তুলে তাকাবে, সেই সময় নেই তার হাতে। তাই দিদির বাচ্চাকাচ্চাদের কথা ভেবে দিদির বাড়িতে থেকেই গেল আলপনা।

পাড়ার নারীরা ধন্য ধন্য করে উঠল। শীর্ণদেহের গাল তোবড়ানো দাঁত উঁচু মেয়েটির কী অপূর্ব কাণ্ডজ্ঞান! এতগুলো বাচ্চাকে মানুষ করবার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজ কাঁধে তুলে নিল!

ভোরসকাল থেকেই আলপনার কাজ শুরু হয়। দাদাবাবুকে জলখাবার দেওয়া, ঘরদোর ঝাড়মোছ করা, বাচ্চাদের একে একে স্নানাদি করানো, সময়মতো তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া―এসব কি চাট্টিখানি কাজ ? আলপনার সহিষ্ণুতার কথা, কর্তব্যনিষ্ঠার কথা পাড়া থেকে সারা গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়ল। আহারে! কী অসাধারণ মেয়ে আলপনা! সতেরো-আঠারো বছরের বালবিধবাটি যেন দীপ্তিরানি হয়েই অনীল পোদ্দারের সংসারের হাল ধরেছে!

ধন্য ধন্য করা নারীদের মুখ একদিন চুপসে গেল। এ কী দেখছি! হা ভগবান, কী দেখাচ্ছ তুমি আমাদের! মা-মরা ছেলেপুলেদের আগলাতে, শোকতপ্ত দাদাবাবুর মুখে ভাতজল জোগাতে যে আলপনা একদিন উজ্জ্বল মুখ করে জামাইবাবুর বাড়িতে থেকে গিয়েছিল, সেই আলপনা লজ্জায় মাথাটা হেঁট করে দরজার সামনের পৈঠায় বসে আছে। তাকে ঘিরে পাড়ার দিদিমা-জ্যাঠাইমা-কাকিমা-বউদি-মায়েরা।

তারা অবাক চোখে আলপনার দিকে তাকিয়ে থাকে। আরে, এ কোন আলপনাকে দেখছে তারা ? এ তো দাঁত-উঁচু কৃশকায়া সেই আলপনা নয়! এই ক-মাসে তার চেহারাখানা যে একেবারে পালটে গেছে! এ যে হৃষ্টপুষ্ট লাবণ্যময়ী আলপনা! তার চেহারার এরকম আমূল পরিবর্তন হলো কী করে ?

পাশ থেকে কাকিমা বলে, ‘আহা, বাপের বাড়িতে এতদিন অভাবের মধ্যে ছিল। ভাই-ভাইবউরা কি ঠিকঠাক মতন খেতে দিয়েছে তাকে ? পরতেও তো দেয়নি। দেখোনি তোমরা, যেদিন সে দিদির বাড়িতে এল, রংচটা সাদা একটা থানকাপড় পরেই এসেছিল ? জামাইবাবুর বাড়িতে এসে তিন বেলা পেট পুরে খেতে পারল, ভালো ভালো জামাকাপড় পরতে পারল। মনের সুখ বলেও তো একটা কথা আছে। অল্পবয়সে স্বামী হারিয়ে মনে যে ব্যথার পাহাড় জমেছিল, দিদির বাড়ির সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্য সেই ব্যথা ভুলিয়ে দিয়েছে আলপনার। খাবার সুখ আর মনের সুখের কারণে আলপনার স্বাস্থ্য ফিরেছে। গতরের চেকনাই বেড়েছে। ও নিয়ে এত ভাববার কী আছে জ্যাঠাইমা ?’

জ্যাঠাইমা চোখে ঝিলিক তুলে কী একটা যেন বলতে গিয়ে চুপ মেরে যায়। বাঁকা চোখে আলপনার দিকে তাকিয়েই থাকে।

এতক্ষণ চুপ করে থাকা ফোকলা দাঁতের ঠাম্মা বলে, ‘বিমলের বউ, এতক্ষণ তুমি আলপনাকে নিয়ে যা যা বলেছ, তার সবগুলোই সত্যি। কিন্তু সেই সত্যির মধ্যে যে একটুখানি ইয়ে লুকিয়ে আছে বউ।’

‘ইয়ে মানে কী, বুঝলাম না ঠাম্মা। খোলসা করে বলবে ?’ বিরোধিতায় খেপে গেল বিমলের বউ।

‘আলপনার পেটখানার দিকে তাকিয়েছ ?’ ঠাম্মা মুখের আড়ালটা সরিয়ে নিল।

দশ

‘মশারির নিচে ঢুকে আমাকে ধরল।’

ঠাম্মার কথা শুনে আরও কুঁকড়ে যায় আলপনা। আঁচলটা সামনের দিকে টেনে ধরে। ততদিনে বিধবার সাদা থানকাপড় ছেড়ে সধবার ডুরে শাড়ি ধরেছে। দাদাবাবু খুব করে বলল যে একদিন! পাড়ার বউঝিরা খেয়াল করেনি তা এতক্ষণ। আলপনা আঁচল টেনে পেট ঢাকতে গেলে শাড়ির রং চোখে পড়ল সবার।

মুখরা ঠাম্মা বলে উঠল, ‘অ মল! জঙ্গলিছাপা শাড়িও তো পরেছে দেখি!’

পাড়ার নারীদের কাছে এই মুহূর্তে রঙিন শাড়ি বড় কথা নয়। বড় ব্যাপার―আলপনার পেট ওরকম উঁচু হলো কী করে!

জ্যাঠাইমা নিজকে আর ধরে রাখতে পারে না। মুখঝামটা দিয়ে ওঠে, ‘মুখপুড়ি, এ কী সর্বনাশ করেছিস তুই! লেজে আর গোবরে যে এক করে ছেড়েছিস রে!’

নারীবৃত্ত থেকে উঠে গিয়ে ঘরের ভেতর যে মুখ লুকাবে, তার জো নেই। ঘরে সে ছাড়া এখন আর কেউ নেই। বিকেলবেলাটায় বোনপো-বোনঝিদের ধরে-বেঁধে ঘরে রাখতে পারে না। খেলতে যাবেই যাবে ওরা। আর দাদাবাবু অনীল পোদ্দার ? তিনি তো দুপুরখাবারের পর সেই যে বের হন, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়ায়। তাই আজ বিকেলে পাড়ার নারীদের হাত থেকে যে তার রেহাই নেই।

মাথা নিচু করে বসে থাকে আলপনা। জ্যাঠাইমার কথার কোনও উত্তর নেই তার কাছে। আবার আছেও। কিন্তু সেই উত্তর মুখ ফুটে বলে কী করে ওদের সামনে ?

চুপ থাকতে দেখে বউদি বলে, ‘কী আলপনা, চুপ করে আছো যে! জ্যাঠাইমা কী জানতে চাইল, শোনোনি ?’

আলপনার চিবুকটি বুকে এসে ঠেকে। চোখ বন্ধ করে। কিন্তু গঁাঁ-গেরামের নারীরা দুঁদে গোয়েন্দার অধিক। পেট-উঁচুর রহস্য উদ্্ঘাটন করেই ছাড়বে।

‘বুকে চিবুক ঠেকালে আর চোখ বন্ধ করে রাখলে সত্যকে কি লুকিয়ে রাখতে পারবে আলপনা ? তোমার পেটে প্লিহারোগ হয়নি তো ? শুনেছি―প্লীহারোগ হলে পেট ফেঁপে যায়।’ কিছুক্ষণ আগে আলপনার পক্ষে বলা কাকিমাটি বলল।

‘তুমি চুপ করো তো বিমলের বউ! সেই প্রথম থেকে কী সব বকবক করে যাচ্ছ!’ ঠাম্মাটি অনেকটা চেঁচিয়েই বলল।

‘চোখে ছানি পড়েছে আমার ঠিক, কিন্তু দৃষ্টি তো একেবারে হারিয়ে বসিনি! পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এই ফোলা প্লিহার ফোলা নয়। অন্য কারণে ফোলা। তা কী কারণে তোমার পেটটা ফুলেছে, বলো দিখিনি!’

পাশে দাঁড়ানো বাবুলালের বউ সুশীলা সাততাড়াতাড়ি ঠাম্মার মুখটা চেপে ধরে। অনুনয়ের গলায় বলে, ‘থাক না ঠাম্মা। ওই ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর দরকার কী ? যার ব্যথা, সে কঁকাবে। যার বোঝা তাকেই বইতে দাও না।’ বলে নরম চোখে আলপনার দিকে তাকায় সুশীলা।

জরাধরা দু হাত দিয়ে একঝটকায় নিজের মুখ থেকে সুশীলার হাতটা সরিয়ে দিল ঠাম্মা। গরম গলায় বলল, ‘আমাকে খেপাস না বাবুলালের বউ। আসল ঘটনা জেনেই তবে শান্ত হব আমি।’

সুশীলার আর কী করা। কাঁচুমাচু মুখ করে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকল।

বিব্রত কাকিমা অদ্ভুত এক কণ্ঠে আমতা আমতা করে বলল, ‘মেয়েমানুষের কি হুঁশজ্ঞান হারালে চলে আলপনা ?’ এতক্ষণ যে বিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখেছিল কাকিমা, তার এখনকার কথা শুনে মনে হচ্ছে―সেই আস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে। ‘কী কাণ্ড বাঁধিয়ে বসেছিস, বল দেখিনি মুখপুড়ি ?’ ভড়কানো গলায় বলল কাকিমা।

আলপনা জোরে জোরে শ্বাস টানে। যেন তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে বড় জল খেতে ইচ্ছে করছে তার। গলা শুকিয়ে কাঠ একেবারে। জল খেতে না পেলে বুঝি তার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে! কিন্তু কার কাছে চাইবে জল ? কে এনে দেবে রান্নাঘর থেকে তাকে এক ঘটি জল ? সে যে নিজে উঠে গিয়ে কলসি থেকে জল গড়াবে, তার উপায় নেই। তার দেহটা যে মাটির ভেতর শিকড় গেড়ে বসে আছে। নিজের দেহটাকে জগদ্দল পাথর বলে মনে হচ্ছে।

তারপরও না-বলে পারল না, ‘জল।’

তড়িঘড়ি করে এক ঘটি জল এনে দিল সুশীলা।

ঢকঢক করে জলটা গলায় ঢেলে নিল আলপনা। দীর্ঘ একটা শ্বাস ছাড়ল। মনে হলো―যে কষ্টটা আর লজ্জাটা তার কণ্ঠরোধ করে রেখেছিল এতক্ষণ, জলের সঙ্গে তা বুঝি পেটে নেমে গেল।

খাবি-খাওয়া গলায় কাউকে না-শুনিয়ে অথবা সবাইকে শুনিয়ে আলপনা বলল, ‘কী করে বুঝব আমি! কী করেই-বা জানব―মানুষটির মনে এমন কুপ্রবৃত্তি আছে ?’

‘মানুষটা! কোন মানুষটা ?’

‘কে সে ?’

‘কার কুপবিত্তির কথা বলছ ?’

এক ঝাঁক প্রশ্ন সবার মুখ থেকে বেরিয়ে এল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের গাণ্ডীব থেকে ছুটে আসা অগণন তিরের মতো।

পাশের বাড়ির বউটি, যে এতক্ষণ চুপচাপ সব কাণ্ডকারখানা দেখে যাচ্ছিল, নিমপাতা চিবানো গলায় খেঁকিয়ে উঠল, ‘লোকটির বড় কুপ্রবৃত্তি আর তোমার সুপ্রবৃত্তি, না ? এক হাতে তালি বাজে নাকি ?’

‘আহা, তুমি থামো তো বউ! এতক্ষণ শুনে যাচ্ছিলে, শুনে যাও। কী করে গলার তলায় চুপানো কথা বের করে আনতে হয়, জানি আমি।’ জ্যাঠাইমা বউটির দিক থেকে আলপনার দিকে মুখ ফেরায়, ‘তা আলপনা, সেই কুপবিত্তির মানুষটা কে, বলবে ?’

আলপনার, এই শীতের বিকেলেও, কপাল-গলা-গাল ঘামে জবজবে। আলপনা জ্যাঠাইমার প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয় না। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ‘মাঝরাতে মশারির নিচে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলাম।’

ঢোঁক গিলবার জন্য থামল একটু আলপনা।

ঠাম্মার তর সইল না। ত্বরিত বলল, ‘আহ, পোড়ারমুখী, থামলি কেন! রস গড়ানোর আগের কথাখানা পষ্ট করে বল না। কান পেতে শুনি। খবদ্দার এড়িয়ে যাবি না। পুঙ্খপুঙ্খ করে বলবি। কোনও কথা বাদ দিবি না।’ বলতে বলতে ঠাম্মা যে নিজের ডান হাতটা নিজের চুপসে-যাওয়া স্তনে রেখে চাপ দিচ্ছে, অন্য কেউ খেয়াল না করলেও পাশের বাড়ির বউটি খেয়াল করল। তার স্বামীটি যে প্রতি রাতে তার স্তন দুটিতে এমনিভাবে চাপাচাপি করে, মনে পড়ে গেল বউটির। মুচকি একটু হাসল বউটি।

কুক কুক, খেঁক খেঁক, হি হি করে প্রায় সবাই হেসে উঠল। হাসল না শুধু বাবুলালের বউ সুশীলা। চাপা স্বরে বলল, ‘আহা ঠাম্মা! মুখে আগল দাও না। দেখছ না, এখানে কমবয়সী বউ-ঝিরা আছে ? তাদের সামনে মুখ এরকম আলগা না করলে হয় না ?’

‘বাবুলালের বউ তুই থাম তো। দুইখানা বিয়াইয়া গায়ের জৌলুশ কমে গেছেনি তোর ? রসের কথায় এত পেরেশান হচ্ছিস কেন ?’ কথার সঙ্গে বিকৃত দেহভঙ্গি মিশিয়ে পরিবেশটাকে আরও সঙ্গিন করে তুলল ঠাম্মা।

জ্যাঠাইমা পরিবেশকে হালকা করবার জন্য বলল, ‘কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছিলে। তারপর ?’

‘মশারির নিচে ঢুকে আমাকে ধরল।’

‘ধরল! তারপর ? তারপর কী করল ?’ ঠাম্মার অপার কৌতূহল।

‘আমি ঘুমাচ্ছিলাম।’

‘আমি ঘুমাচ্ছিলাম, আমি ঘুমাচ্ছিলাম―এই কথাখানা কবার বলবি হতচ্ছাড়ি ? আসল কথাখান বল না।’ ঠাম্মার তর সইছে না।

আলপনার ভ্যাঁ করে কেঁদে দেওয়া বাকি, ‘আমাকে শক্ত বাহুতে জড়িয়ে ধরলে আমি কী করতে পারি বলো।’

জ্যাঠাইমা চোখ রাঙিয়ে মুখ খিঁচিয়ে ধমকে উঠল, ‘হতভাগী, ভোন্দা মাইয়া কোথাকার! তোমার জিভখানা কি খসে গিয়েছিল ? চেঁচাতে পার নাই ?’

আলপনা হাউমাউ করে বলে, ‘কী করে চেঁচাই জ্যাঠাইমা! ছোট ছোট বাচ্চাগুলি যে আমার বিছানায় ঘুমাচ্ছিল! জেগে যদি তাদের বাপকে দেখে ফেলে!’

পাড়ার মহিলারা একেবারে বোবা বনে গেল। তাদের মুখে রা নেই।

একজন, দুইজন করে করে সবাই অনীল পোদ্দারের উঠান ছেড়ে গেল।

বউ সুশীলার মুখ থেকেই অনীল পোদ্দারের কীর্তির কথা জানতে পেরেছিল বাবুলাল। দারিদ্র্যের ফেরে সেই ধার্মিক, ঈশ্বরমুখী অনীল পোদ্দারের খেতে কাজ করে স্ত্রী-কন্যার মুখের খাবার জোটাচ্ছে বাবুলাল।

এগারো

পিঠে খাওয়ার আনন্দে বাবুলাল নামের দরিদ্র মানুষটির উঠানটি

সেই সন্ধ্যায় স্বর্গীয় সুষমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।

সুদিনে ঘরামির কাজ। বর্ষা ছাড়া তো এই অঞ্চলে চাষ হয় না। খেতগুলো খাঁখাঁ করে। দু-চারজন চাষি রবিশস্য ফলায়। নিজেরা নিজেরা। ঘরের মানুষ দিয়ে শস্য ফলানোর কাজ সারে। জনমনুষ্যির দরকার পড়ে না। বাবুলালের মতো অনেক পরজীবী মানুষ তখন বেকার। বেকার মানুষেরা নানা কাজে জড়িয়ে পড়ে। নিজে বেঁচে থাকতে হবে তো, ছাওয়ালদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে তো। বাবুলাল ঘরামির কাজকে বেছে নেয়।

এ অঞ্চলে অধিকাংশ মানুষের ঘরবাড়ি বেড়ার। শনের ছাউনি। ঘরের বেড়া না বদলালেও বছর বছর ছাউনি বদলাতে হয়। বাবুলাল ঘরছাওয়ার কাজটি ভালোই পারে। ঘরামির কাজে যখন যায়, সুধীরের ছেলে রামচরণকে সঙ্গে নেয়। সতেরো-আঠারোর রামচরণ জোগানোর কাজটা রপ্ত করেছে বেশ। বাবুলাল যত টাকা দৈনিক মজুরি পায়, তার অর্ধেক পায় রামচরণ। রামচরণের বাপ সুধীর মণ্ডলও হতদরিদ্র মানুষ। সংসার ভারী সুধীরের। তিন মেয়ে, দুই ছেলে। বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে ফতুর হয়ে গেছে। দুই বিঘা ধানি জমি ছিল, বেচেছে। এখন দিনমজুরি ভরসা। একা সামাল দিতে পারছে না বলে কচি ছেলে রামচরণকে কায়িক শ্রমে ঠেলে দিয়েছে।

বাবুলাল যে শুধু ঘরামির কাজ করে, তা নয়। কাঠুরিয়ার কাজও করে। আসলে যখন যে-কাজ পায়, সে-কাজই করে। কখনও হালচাষ, কখনও মাটি কাটা, কখনও ঘর-ছাওয়া, কখনও গাছ কাটা। কোনও কিছুতে না নেই বাবুলালের। মেয়ে দুটোকে যে বড় করতে হবে। অমলাকে ইস্কুলে দিয়েছে। প্রাথমিক পাস করে হাইস্কুলে গেছে। ছোটটি টু-তে।

বউ সুশীলাকে বড় ভালোবাসত বাবুলাল।

বাসত মানে ? এখন বাসে না ?

বাসে। আগের ভালোবাসাটা অখণ্ড ছিল। এখন খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে। অমলা জন্মানোর পর বউয়ের প্রতি টান যেন একটু কমেছে। কন্যা অমলার প্রতি বউয়ের চেয়েও বড় টান জন্মাল বাবুলালের মনে। সেই টানের নামই বুঝি ভালোবাসা! সবসময় অমলা অমলা। খেত থেকে এসে বলত―অমলা কই ? সারা দিন ঘরামির কাজ সেরে হাড়ভাঙ্গা শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরে বলত―অমলা কই ?

একদিন সুশীলা বলেই ফেলল, ‘এখন আমি তোমার কাছে কেউ না। অমলাই তোমার সবকিছু।’

বউয়ের কথায় যে অভিমান আর বাৎসল্যের মেশামেশি আছে, বুঝতে অসুবিধা হয় না বাবুলালের।

গলা ছেড়ে বলে, ‘তুমি যা-ই বলো আর তা-ই বলো সুশীলা, ভালোবাসা এখন দুই ভাগ হয়ে গেছে। বুকের অর্ধেকটা জুড়ে যে অমলা বসে আছে, অস্বীকার করি কী করে ?’

তৃপ্তির হাসিতে সুশীলার চোখ-মুখ ভেসে যায়। বাবুলালের ভালোবাসা আরেকবার ভাগ হলো, সুজলা জন্মালে।

কোন ভালোবাসায় কোপ পড়ল ? সুশীলার প্রতি ভালোবাসায়, না অমলার প্রতি ভালোবাসায় ? না দুই ভালোবাসা মিলেজুলে এক হয়ে তারপর তিন ভাগ হলো ? বুঝতে পারে না বাবুলাল। শুধু এইটুকু বুঝতে পারে―সুজলার প্রতি বাৎসল্য অমলার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।

ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে বাড়িতে ফিরলে কে আগে গামছাটা, জলের ঘটিটা এগিয়ে দেবে, তা নিয়ে দুই বোনের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অমলার হাত থেকে গামছাটা নিলে জলের ঘটিটা সুজলার হাত থেকে নিতেই হয়। নইলে সুজলা কেঁদে বুক ভাসায়। বাবার মাথায় সরষে তেল ঘষার দ্বন্দ্বে জড়ায় সুজলায় আর অমলায়। বাবাকে পিঁড়িতে বসিয়ে যেই না মাথায় তেল মাখার প্রস্তুতি নিয়েছে অমলা, অমনি কোত্থেকে ছুটে আসে সুজলা। শিশুবোতল থেকে এক কোষ তেল গড়িয়ে বাবার দুই পায়ে মাখতে শুরু করে। বাবুলালের চোখে তখন পৃথিবীর রং বদলে যায়। মনে মনে সে বলতে থাকে―স্বর্গসুখ কি একেই বলে ?

সুশীলার তিনটা শাড়ি। সস্তা দামের। সারা বছর ঘুরেফিরে এই তিনটা শাড়িই পরে সুশীলা। কোনও কোনওটার পাড়ের দিকে ফেঁসে গেছে। সুঁচ ফুড়িয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে ছেঁড়া অংশটায়। একটার মাঝখানে মাঝখানে টুটে গেছে। সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই সুশীলার। বাপ-মেয়েদের ভালোবাসাবাসিতে তার মনে সুবাতাস বয়। শাক দিয়ে খেয়ে রুইমাছ খাওয়ার ঢেঁকুর তোলে। সংসারের সুখই যে বড় সুখ, খাওয়াদাওয়া বড় কথা নয়―ভাবে সুশীলা।

বর্ষাশেষে পূজা সাঙ্গ হয়। দুর্গাপূজা। এরপর লক্ষ্মীপূজা, কালী পূজা। সরস্বতী পূজা একটু পরে। মাঘ-ফাগুনে। হেমন্তের বাতাসে শীত শীত। ভোরবেলায় আর সন্ধ্যাবেলায় জানান দেয়―শীত আসছে। হেমন্ত শেষ হবে হবে সময়ে শিউলিদের আবির্ভাব ঘটে, গাঁ-গেরামে। শিউলি ফুল নয়, খেজুরগাছি। এদিকে আবার বেশ খেজুর গাছ। মাঠের আলে আলে খেজুর গাছ। বাড়ির চারধারে, ঘাটার দু পাশে সারি সারি। মাথাভর্তি ডাল-কাঁটা, সন্ন্যাসীর চুলের মতো। গ্রীষ্মে কাঁদি কাঁদি খেজুর। প্রথমে সবুজ, পরে হলদে। পাকা খেজুরের মিষ্টি গন্ধে আশপাশের বাতাস ম-ম করে। গরিব ঘরের মানুষেরা ধামা-চুপড়ি ভরে খেজুর সংগ্রহ করে। ভাতের বদলে খেঁজুর খেয়ে খিদে মিটায় তারা।

শিউলিরা ডাক পাড়ে, ‘গাছ ছিলাবেন, খেজুর গাছ ?’

খেজুর-নারকেল-সুপারি গাছ ছোলার কাজে দক্ষ শিউলিরা। কাছি নিজের কোমরে এবং গাছের গায়ে জড়িয়ে তরতর করে ওপর দিকে উঠে যায়। তাদের পেছনে ঝোলানো বেতের টুঙ্গিতে থাকে ভারী-পাতলা দা। তা দিয়ে খেজুর গাছের মাথা সাফ করতে শুরু করে। গাছের মাথা সাফ করার পর গাছটিকে সদ্য চুল-ছাঁটা ভদ্রলোকের মতো দেখায়।

দিন পনেরো পর খেজুর গাছের কপাল বের করে শিউলিরা। তাতে লাগে পাতলা ধারালো দা। এ বড় সূক্ষ্ম কাজ। কপাল বের করার দক্ষতার ওপর রসের কম-বেশি নির্ভর করে। নরম কাণ্ড বেশি কাটা গেলে খেজুর গাছের প্রাণ নিয়ে টানাটানি। মানুষের চামড়া তুলে নিলে যেমন রক্ত বেরোয়, তেমনি খেজুর গাছের সদ্যকাটা শরীর থেকে রস চুইয়ে পড়ে। চাঁছা অংশের দুদিকে বিঘতখানেক বাঁশের নলি পুঁতে দেয়। সেই নলি বেয়ে রস নামে নিচে ঝোলানো মাটির কলসিতে। লালচে খেজুর রস ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে থাকে গোটা রাতভর। ভোরের দিকে পূর্ণ হয়ে ওঠে কলসি। রসে ভর্তি সেই কলসিগুলো বাঁকে ঝুলিয়ে গেরামের বাড়িতে বাড়িতে হাঁক দেয় শিউলিরা―রস, খেজুরের রস।

অমলা-সুজলা মায়ের কাছে খেজুর রস খাওয়ার আবদার করে। মেয়েদের শুধু শুধু তো আর রস খাওয়ানো যায় না। পিঠা লাগবে যে! সুশীলা পিঠা বানাতে বসে যায়। চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা।

সকালেই কেনা হয়েছিল পাঁচসেরির মেটে-কলসির খেজুর রস। কেনার পর একবার জ্বাল দিয়ে রেখেছিল সুশীলা। তাতে সেরমতন কমে গেছে ঠিক, কিন্তু রস হয়েছে ঘন, বর্ণ হয়েছে গাঢ়। সুশীলার গোটা দিন গেছে চাল ভেজাতে, সেই চাল পাটায় পিষে গুঁড়া করতে। গুঁড়া করারও আবার ধরন আছে―ঝুরঝুরে আর মিহি। ভাপা পিঠার জন্য দরকার ঝুরঝুরে চালের গুঁড়া, চিতই আর পাটিসাপটার জন্য মিহি। দুপুররান্নার পর পেষার কাজে লেগে গিয়েছিল সুশীলা।

সন্ধ্যায় বাবুলাল ফিরে এলে সুশীলা উঠান-উনুনে পিঠা বানাতে বসে পড়েছিল। দু পাশে দুই কন্যা―অমলা-সুজলা। সামনে চুলার ওপাশে বাবুলাল। দুই পাকের চুলার একটিতে রসের ডেকচি। অন্যটিতে ভাপাপিঠের ছিদ্রযুক্ত হাঁড়ি। হাঁড়ির ভেতর টগবগে গরম পানি। সুজলা আবদার ধরেছিল ভাপাপিঠে খাবে প্রথমে। গুড়-নারকেল আর চালের গুঁড়ায় সরা ভর্তি করে সাদা ন্যাকড়ায় জড়িয়ে হাঁড়ির ছিদ্রমুখে উপুড় করে রেখে ঢাকনা দিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিচ্ছে। অল্পসময় পর ঢাকনা উলটালেই আস্ত ভাপা পিঠে। আগেই বাটিতে বাটিতে সবার সামনে খেজুর রস রেখে দিয়েছে সুশীলা।

গাঢ়-গম্ভীর তৃপ্তির মুখ নিয়ে সুশীলা সন্তান আর স্বামীর হাতে হাতে পিঠে তুলে দিতে থাকল।

পিঠে খাওয়ার আনন্দে বাবুলাল নামের দরিদ্র মানুষটির উঠানটি সেই সন্ধ্যায় স্বর্গীয় সুষমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।

বারো

বাবুলালের রাক্ষুসেপনাও কেন জানি স্তিমিত হয়ে এল।

এই বাবুলাল দত্ত একদিন কাজ থেকে ফিরল না। ফিরল না মানে জীবন্ত ফিরল না। ফিরল শব হয়ে।

সুশীলা কাঁদতে ভুলে গেল। স্বামীর দেহপাশে স্তব্ধ-নিথর। ব্যাকুল কান্নায় মাথা আছড়াচ্ছে অমলা, বাবার শরীরের ওপর। বাবার কী হয়েছে―বুঝে উঠতে পারছে না সুজলা। মৃত্যু কাকে বলে, বোঝে না সে। বাবা ঘুমাচ্ছে, একটু পরে উঠে বসবে―বিশ্বাস তার। পাড়াপড়শিরা চোখ মুছছে কেন, মা স্তব্ধ কেন, দিদি এরকম আছাড়িপিছাড়ি করছে কেন, ঠিকঠাক বোধগম্য নয় সুজলার। তারপরও সে উথাল-পাথাল করে কাঁদছে। কেন কাঁদছে ? দিদি কাঁদছে যে!

পান্তাভাত খেয়েই বেরিয়েছিল বাবুলাল, সেই সকালে। পান্তাভাতে টান পড়েছিল। পুঁটিমাছের রান্নাটা সোয়াদ হয়েছিল বলে রাতে বেশি ভাত খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। নিজে একটু কম খেয়ে সোয়ামির জন্য ভাত রেখে দিয়েছিল। সকালে পান্তাভাত খেয়েই ঘরামিতে যাবে লোকটি, জানে সুশীলা।

থালায় কম ভাত দেখে বউয়ের দিকে একপলক তাকিয়েছিল বাবুলাল। মুখে কিছু না বললেও সোয়ামির মনের কথা ত্বরিত বুঝে ফেলেছিল সুশীলা।

শরমিন্দা গলায় বলেছিল, ‘বেশি ভাত থাকার মতো করেই রেঁধেছিলাম। কিন্তু পুঁটিমাছের তরকারিটা একটু বেশি স্বাদ হয়ে গেল। তাই রাতে ভাত একটু বেশি খাওয়া…।’

সুশীলার কথা কেড়ে নিয়ে হাসি হাসি মুখে বাবুলাল বলল, ‘অত ভাবছ কেন অমলার মা ? পান্তাভাত কম হলে সমস্যা নাই তো। দুপুরে একটু আগে আগে খেয়ে নেব।’

সুশীলা চুপ মেরে যায়। সে তো জানে―তার স্বামীটি কী কঠোর কায়িক পরিশ্রম করে। তাতানো রোদে ঘরের চালে কাজ করে লোকটি। সমস্ত শরীর রোদে পুড়তে থাকে। দরদর করে ঘাম ঝরে দেহ থেকে। রোদে চোখমুখ ঝাঁঝাঁ করে। তেষ্টায় বুক ফাটে। চাল থেকে নেমে গাছের ছায়ায় যে একটু জিরিয়ে নেবে, তার উপায় নেই। পেছনে ফেউ লেগে থাকে। গৃহস্থটি কাঁই কাঁই করে ওঠে। হাউকাউয়ের ভয়ে চাল থেকে নামে না লোকটি। রোদে শুকিয়েই আধখানা হয়।

দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে সুশীলা।

দুপুরভাতের ভাঁড়টা পুরোনো গামছা দিয়ে জড়িয়ে গিঁট দিতে দিতে বলে, ‘মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ো। ফিরতে দেরি করো না।’

একটু হাসে বাবুলাল।

বেশ কদিনের আকামানো দাড়ি গালে। গাছা কয়েক দাড়িতে পাক ধরেছে। সুশীলার আবার দাড়ি সহ্য হয় না। বারবার তাগাদা দেয়, ‘দাড়ি কাটো না কেন ? দেখতে বিশ্রী লাগে।’

বাবুলাল বলে, ‘হতভাগার আবার সৌন্দর্য!’

‘দাড়ি কাটতে যে টাকা লাগে রে অমলার মা। আগে নাপিতরা কম টাকায় দাড়ি-চুল কাটত। এখন তাদের দাবি অনেক। বলে―জিনিসপত্রের যা দাম, আগের রেটে সংসার চালাতে পারি না বাবুলাল। ঘন ঘন দাড়ি কাটলে অনেক টাকা বেরিয়ে যাবে। তুমি তো জানো―ঘরে কত অভাব। দাড়িকাটার টাকাগুলো সংসারের খরচে লাগাতে পারি। দাড়ি কদিন পরে কাটলে সমস্যা নেই, ডাল-চাল-তেল কিনতে না পারলে সমস্যা।’ মনে মনে এসব কিছু ভাবে বাবুলাল আর বউয়ের দিকে আড়চোখে তাকায়।

আজকের হাসিটা সেই আকামানো দাড়ি ছাপিয়ে চোখে-ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়ে।

‘হাসলে যে ?’ সুশীলা শুধায়।

‘এমনি এমনি।’ বলে উঠে দাঁড়ায় বাবুলাল।

দু কদম বউয়ের দিকে এগিয়ে এলে আঁতকে ওঠে সুশীলা, ‘ও কী! এরকম করে কাছে আসছ কেন ?’

‘একটু এলাম না হয় কাছে। আপত্তি আছে ?’ বাবুলালের চোখের হাসিটা কীরকম কীরকম যেন।

চট করে এদিক-ওদিক তাকায় সুশীলা। মেয়েরা কাছেপিঠে কি না চকিত চোখে দেখে নেয়।

বাবুলালের চোখের রং যে বদলে গেছে, তা বহুদিন পর দেখল সুশীলা। বিয়েজীবনের প্রথম দিকে বাবুলালের চোখেমুখে এই রং নিত্য খেলা করত। রঙের মানে বুঝে যেত সুশীলা। হয় চুমু খাওয়া, না হয় জাপটে ধরে আদর করা অথবা সুযোগ থাকলে বিছানায় নেওয়া। শ্বশুর-শাশুড়ি ছিল সেই সময়। কী যে ভয় লাগত তখন! যদি ওরা দেখে ফেলে! বড় বেপরোয়া ছিল বাবুলাল। ভয়-লজ্জাও কম ছিল। ওর লজ্জা-ভয় না থাকলে কী হবে, সুশীলার তো ছিল! কোনওরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে একলাফে শাশুড়ির নিকটে গিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কাটত।

মেয়েরা জন্মাল। শ্বশুর-শাশুড়ি মারা গেল। সংসারটা চেপে বসল বাবুলালের বুকের ওপর। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা দাঁড়াল। বাপ বেঁচে থাকতে বুঝতে দেয়নি। বাপ মারা যাওয়ার পর কত ধানে কত চাল টের পেতে শুরু করল বাবুলাল।

বাবুলালের রাক্ষুসেপনাও কেন জানি স্তিমিত হয়ে এল। আগে এক-দুই রাত পর পর ব্যাকুল হয়ে উঠত। এখন সপ্তাহ চলে যায়। বাবুলালের দিক থেকে কোনও ডাক পায় না সুশীলা। সুশীলা ভাবে―সংসারের জগদ্দল পাথরটাই বাবুলালের জীবন থেকে কাম-ভালোবাসা কেড়ে নিচ্ছে।

মাঝে মাঝে শরীরটা বড্ড খলবল করে ওঠে সুশীলার। নিজে উদ্যোগ নেয় না। স্বামীর আহ্বানের জন্য অপেক্ষা করে। বাবুলাল ক্লান্তিতে জরজর শরীরটা নিয়ে নাক ডাকে। পুরোনো দিনের দেহলীলার কথা ধীরে ধীরে ভুলতে থাকে সুশীলা।

আজ স্বামীর চোখে সেই পুরোনো দিনের রং দেখল সুশীলা। এই অসময়ে এই রং!

বাবুলাল হঠাৎ গেঁয়োভঙ্গিতে বলে, ‘খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে তোমাকে। দেবে ধরতে ?’

সুশীলার বুকের ভেতরটা আচমকা ছলাৎ করে উঠল। জোয়ার এলে নদীর কিনারায় ছোট ছোট ঢেউ ছলাৎ ছলাৎ করে আছড়ে পড়ে। একটু একটু করে নদী ভরতে থাকে, জলে। সুশীলার নদীটিতেও কি জলের স্পর্শ লেগেছে ? তার হৃদয়নদী এমন করে ছলাৎ ছলাৎ করছে কেন ?

কিছু বলার অবকাশ দিল না বাবুলাল। দু হাত বাড়িয়ে জোরসে জড়িয়ে ধরল সুশীলাকে। জড়িয়েই থাকল। চুমু খাওয়া, বুকে হাত দেওয়া―কিছুই করল না। শুধু সুশীলাকে বুকের একেবারে গভীরে টেনে নিয়ে জড়িয়ে থাকল।

সুশীলাও আর চোখ খোলা রাখতে পারল না। তার চোখ দুটোও আবেশে বুজে এল। মিনিট দুয়েকের ঘটনা। আলো-আঁধারির রান্নাঘরটিতে মুহূর্তরা মুহূর্তের কাছে বন্দি হতে থাকল।

একটা সময়ে বাহু আলগা করল বাবুলাল। দুপুরভাতের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে ঘর থেকে উঠানে নামল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সুশীলা, স্বামীর যাওয়ার দিকে। একবারের জন্যও পেছন ফিরল না বাবুলাল। ঘাঁটার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

পথের ধারে সুধীরের বাড়ি। বাবুলালের বাড়ির চার-পাঁচ বাড়ি পরেই। মূল মেটেরাস্তা থেকে চিকন মেটেগলি সুধীরের উঠান পর্যন্ত। বাড়িতে আম-কাঁঠাল-জাম-কলা গাছ। খুব যত্ন করে যে ফলিয়েছে সুধীর, এমন নয়। গাঁ-গেরামে এসব ফলফলাদির গাছ এমনি এমনি হয়। আমটা খেয়ে বড়াটা, কাঁঠাল খেয়ে বিচিটা ছুড়ে দিলেই হলো। কিছুদিন পর আঁটি থেকে দুটো পাতা চোখ খোলে। জল-যত্নআত্তির দরকার নেই। এমনি এমনি গাছ গজিয়ে গেল। সুধীর, শুধু সুধীরের বাড়ি কেন, এদিককার সকল বাড়ির গাছগাছড়া এমনিভাবে জন্মায়, জন্মেছে।

সুধীরের ছায়া ছায়া উঠানে দাঁড়িয়ে বাবুলাল হাঁক দেয়, ‘কী রে রামচরণ, এখনও হলো না তোর ?’

রামচরণ হাতে খাবারের পোঁটলা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। পিছু পিছু সুধীরও।

‘সুধীর, এখনও কাজে যাও নি ?’ হালকা গলায় জিজ্ঞেস করে বাবুলাল।

তেরো

চক্রবর্তী মশাই চাপা গলায় বললেন, ‘চুপ চুপ।

ওরকম করে বলো না। শুধু শুধু মেয়েটার দোষ দিচ্ছ কেন ?

তন্ময়েরও তো খামতি থাকতে পারে!’

‘ঢেলা ভাঙার কাজ। মতিলালের টিলামতন জমিটিতে। হাল দিয়েছিল গতকাল। মাটি গুঁড়া হয়নি। কোদালের পিঠ দিয়ে বাড়ি মেরে মেরে গুঁড়া করতে হবে। পরিশ্রমের কাজ। ইচ্ছে করে একটু দেরি করে যাচ্ছি। এক ঘণ্টা দেরিতে গেলে এক ঘণ্টার পরিশ্রম কম হবে।’ দেরিতে কাজে যাওয়ার বৃত্তান্ত জানাল সুধীর।

‘মতিলাল কি ছেড়ে কথা কইবে তোমায় ?’

‘ঘ্যানরপ্যানর একটু করবে ঠিক, তবে মুখ খারাপ করে না মতিলাল।’

‘যেমন করে অনীল পোদ্দার।’ বলে হাসল বাবুলাল।

‘পোদ্দারের পো-এর কথা বলো না আর বাবুলালদা। মুখে একেবারে টাট্টিখানা বসানো।’

‘জ্যাঠা, দূরের পথ। যেতে ঘণ্টা লেগে যাবে। জানো তো, আজ চক্কোত্তি মশাইয়ের বাড়িতে চাল-ছাওয়ার কাজ।’ পাশে দাঁড়ানো রামচরণ তাগাদা দেয়।

সুধীর বলে, ‘ঠিক আছে দাদা, তোমরা এগোও। একটুক্ষণ পরে আমিও বেরোব।’

বাবুলালরা এগিয়ে যায়।

পেছন থেকে সুধীর গলা উঁচায়, ‘আমার ছেলেটারে দেখো বাবুলালদা। কালে কালে যেন তোমার মতো নামকরা ঘরামি হয়।’

বাবুলাল পেছন ফেরে। ঘাড় ডান দিকে কাত করে বাম হাতটা ওপরদিকে তোলে।

রাধামাধব চক্রবর্তীর চৌচালা বাড়ি। মাটির। এদিকটায় মাটির ঘর নাই বললেই চলে। চক্রবর্তী মশাই শখ করে মাটির ঘরখানি বানিয়েছিলেন। আইডিয়াটা অবশ্য তার নিজের নয়। ধার করা। যৌবনকালে একবার মাস্টারদা সূর্যসেনের জন্মভিটা দেখার খুব ইচ্ছা জেগেছিল মনে। দুজন বন্ধুও জুটিয়ে নিয়েছিলেন। একদিন চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় উপস্থিতও হয়েছিলেন। সূর্যসেনের জন্মস্থান দেখে বিভোর তো হয়েছিলেনই, অবাক হয়েছিলেন গোটা এলাকার মাটির বসতবাড়িগুলো দেখে। তখন তখনই মনে মনে স্থির করেছিলেন―নিজের বাস্তুভূমিতে এমন একখানা মাটির ঘর বানাবেন। পরিকল্পনাটা মনের কোনায় গুঁজে রেখেছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেননি। যদি তারাও মাটির বাড়ি বানায়! তাহলে যে তার বাড়িটির চমৎকারিত্ব থাকবে না।

মধ্যবয়স তখন। মজা পুকুরটির জল শুকিয়ে নিলেন। শীতকালে কামলা লাগালেন। এর আগে চট্টগ্রাম থেকে মাটির ঘর বানানোর লোক আনিয়ে নিলেন। কামলা পুকুর কেটে মাটি তোলে আর চট্টগ্রামীরা ঘরের দেয়াল গাঁথে।

একদিন ঘরটি দাঁড়িয়ে গেল। রাধামাধব চক্রবর্তীর বুক ফুলে হিমালয়। নিজের গ্রামের মানুষ তো বটেই, অন্য গাঁয়ের মানুষেরা দলে দলে দেখতে এল।

অনেকটা বছর কেটে গেছে তারপর। চক্রবর্তীমশাইয়ের বয়সও বেড়েছে অনেক। বাড়ির অনেক কিছুই ভেঙেভুঙে গেছে, কিন্তু বাড়িটিকে জীর্ণ হতে দেননি। বছর বছর মেরামত করিয়েছেন। যেখানে সারানোর সারিয়েছেন। ক্ষয়ে-যাওয়া জায়গায় মাটি জুড়েছেন, সপ্তাহে সপ্তাহে গোবরমাটি দিয়ে দেয়াল লেপিয়েছেন। আর বছর বছর নতুন ছন দিয়ে চাল ছাইয়েছেন।

গেল দশ বছর ধরে এই গৃহটি ছাওয়ার কাজ করে যাচ্ছে বাবুলাল। এ বছরও করছে।

একটু দেরি করেই পৌঁছাল বাবুলালরা। গত চার দিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছে ওরা। বড় ঘর। চৌচালা মাটির ঘরটির চতুর্দিক ঘিরে প্রশস্ত বারান্দা। মূল ঘরের চাল এসে যেখানে থেমেছে, সেখান থেকেই বারান্দার চাল শুরু। চতুর্পার্শ্বের বারান্দা চক্রবর্তী মশাইয়ের বাড়ির শ্রী অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। এই কদিন গেছে চাল মেরামত করতে। চালের পুরোনো বাঁশ বদলে নতুন বাঁশ লাগানো, ছিঁড়ে যাওয়া বাঁধন শক্তভাবে বাঁধা―এসব তো আর একদিনের কাজ নয়! তারপর তো ছনের বড় আঁটি ভেঙে ছোট ছোট আঁটিতে বাঁধা। শনেরুরা আঁটির ভেতরে উলুখাগড়া, লম্বা ঘাস, লতাপাতা ঢুকিয়ে আঁটি মোটা করে। কিনিয়েরা বুঝতে পারে না তা। বাড়িতে আনার পর গোঁজামিল ধরা পড়ে। তখন গৃহস্থদের করার আর কিছুই থাকে না। দু-চার-দশটা গালপাড়া ছাড়া। বাছাইয়ের কাজটা ঘরামিদেরই করতে হয়।

রাধামাধব মশাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এবার শনেরুরা তাঁকে ঠকিয়েছে বেশ। শন বাছাইয়ের কাজ শেষ করতে লেগে গেছে দুই দিন। ভেজাল মেশানো শন দিয়ে চাল ছাইলে যে বর্ষায় জল পড়বে চাল ভেদ করে।

রাধামাধব চক্রবর্তী অনীল পোদ্দারের মতো নন। খিটিমিটি করা তাঁর স্বভাবে নেই। সবার সঙ্গে শান্ত ব্যবহার করা তাঁর অভ্যাস। জীবনের পরপারে চলে এসেছেন প্রায়। বড় ছেলে শুভময় চট্টগ্রাম শহরে চাকরি করে, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে ডিপার্টমেন্টে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ওখানেই থাকে। পূজা-পার্বণে আসা-যাওয়া। ছোট ছেলে তন্ময় লেখাপড়া করেনি তেমন। পুজো-আচ্চা-বিয়ে-শ্রাদ্ধের মন্ত্রগুলো ভালো করে মুখস্থ করিয়েছেন তন্ময়কে। যাতে ওগুলো করিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। পুজো-আচ্চা করা আর যজমানবাড়িতে যাওয়া-আসাই এখন তন্ময়ের পেশা।

ক বছর আগে তন্ময়কে বিয়ে করিয়েছেন। দুঃখ এই―এখনও কোনও সন্তানাদি হয়নি তার। চাপা একটা বেদনা কুরে কুরে খায় রাধামাধব মশাইকে।

গিন্নি আফসোস করেন, ‘তন্ময় যে এখনও নিঃসন্তান রয়ে গেল! বউটার পেটের কোনও দোষ আছে কি না কে জানে!’

চক্রবর্তী মশাই চাপা গলায় বলেন, ‘চুপ চুপ। ওরকম করে বলো না। শুধু শুধু মেয়েটার দোষ দিচ্ছ কেন ? তন্ময়েরও তো খামতি থাকতে পারে।’

ছেলের পক্ষ নিয়ে গিন্নি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, চক্রবর্তী মশাই গলাকে আরও চিকন করে বললেন, ‘নিজের কথা ভাবছ না কেন গিন্নি ? তোমার প্রথম ছেলে বিয়ের ক বছর পরে হয়েছিল, মনে আছে! তন্ময়ের বিয়ে হলো ক বছর মাত্র। সন্তান হওয়ার সময় তো আর পার হয়ে যায়নি।’

স্বামীর কথায় গিন্নির আর বলার কিছু থাকে না। দীর্ঘশ্বাস চেপে সেখান থেকে সরে যান।

চক্রবর্তী মশাইয়ের দয়ার মন। কাউকেই আঘাত দিতে চান না। না গিন্নিকে, না পুত্রবধূকে, না বাবুলাল-রামচরণকে।

বাবুলালদের দেখে বললেন, ‘এসো বাবুলাল, এসো তোমরা। দূর থেকে এসেছ। একটু জিরিয়ে নাও। পুকুরঘাটে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসো দুজনে। ঘেমে গেছো খুব।’

কোথায় দেরিতে আসার জন্য ক্ষমা চাইবে বাবুলাল, তার আগেই চক্রবর্তী মশাইয়ের এসব কথা! কী বলবে দিশে পেল না বাবুলাল। কাঁচুমাচু হয়ে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল।

ঘাট থেকে ফিরতে না-ফিরতে পুত্রবধূটি দুই হাতা মুড়ি এনে সামনে ধরল। মুড়ির ওপর একটা মিষ্টি।

অবাক হলো বাবুলাল। আগে তো কখনও এভাবে আপ্যায়ন করেননি চক্রবর্তী মশাই। আজ কী হলো ?

ছেলেবউ সরে গেলে চক্রবর্তী মশাই হাসতে হাসতে বললেন, ‘খাও, খাও বাবুলাল। এই ছোকরা, তোমার নাম কী যেন ? তুমিও খাও।’

‘কেন এসব ?’ বাবুলাল জিজ্ঞেস না করলেও রাধামাধব মশাই উত্তর দিলেন, ‘মিষ্টি খাওয়ানোর কারণ আছে। সুখবর আছে। অতিথি আসছে। নতুন অতিথি। আমাদের ঘরে।’ বলে পুত্রবধূর গমনপথের দিকে মায়াময় চোখে তাকিয়ে থাকলেন।

রামচরণ কিছুই বুঝল না। যা বোঝার, বাবুলাল বুঝল। ওপরের দিকে তাকিয়ে সে কিছু একটা বলল যেন! তারপর খাওয়ায় মন দিল।

ঘরের চালে উঠে গেছে বাবুলাল। চাল সারাইয়ের কাজ গতদিনই শেষ করে গেছে। আজ ছাউনির কাজ শুরু করবে। প্রথমে মূল ঘরের চাল, তারপর বারান্দার। পূর্বমুখী ঘর। পূর্বদিকের চালটাই আগে শুরু করতে হবে। সেরকমই নির্দেশ রাধামাধব চক্রবর্তীর। পূর্বদিকে ঈশ্বরের ঠিকানা যে!

নিচ থেকে শনের ছোট আঁটি একের পর এক ছুড়ে দিচ্ছে রামচরণ। বাবুলাল সামনের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে আঁটিগুলো লুফে নিচ্ছে।

চৌদ্দ

ওই ঘোরের মধ্যেই সামনের দিকে ঝুঁকে

আঁটিটা ধরতে গেল বাবুলাল।

রামচরণ খাটো নয়, ছিপছিপে। এই বয়সে শরীরে পুষ্টি লাগার কথা। লাগেনি। ফলে যেরকম জোর থাকার কথা শরীরে, সেরকম জোর নেই। হাত দুটো টিংটিঙে। পেশি শক্তপোক্ত নয়। নারকেল ঝুনা হতে শুরু করলে শাঁস যেমন প্রথম দিকে থকথকে থাকে, রামচরণের দু বাহুর পেশিও তেমন। সেই অসমর্থ হাত দুটো দিয়ে রামচরণ শনের আঁটিগুলো নিচ থেকে ছুড়ে দিচ্ছে।

প্রথমদিকে বাবুলালের নাগাল পর্যন্ত পৌঁছাল আঁটিগুলো। ধীরে ধীরে বাবুলাল থেকে ছুড়ে দেওয়া আঁটির দূরত্ব বাড়তে লাগল। প্রথম প্রথম যে-শক্তিতে আঁটিগুলো ছুড়ে দিচ্ছিল রামচরণ, পরের দিকে সেরকম জোরে ছুড়তে পারছিল না। তার বাহুর বল কমতে শুরু করেছে। ফলে আঁটিগুলো বাবুলালের বাড়ানো হাত পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল না। এই সময় জেঠাকে বলে একটু যে জিরিয়ে নেবে, সে উপায় নেই। রোদ চড়ে গেছে। চড়া রোদে জেঠা ঘামতে শুরু করেছে, নিচ থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রামচরণ। এমন অবস্থায় জেঠাকে ঠা ঠা রোদে সিদ্ধ হতে দিয়ে জিরায় কী করে সে ? শরীরের সমস্ত শক্তি হাতে জড়ো করে আবার শনের আঁটি ছুড়তে শুরু করল রামচরণ। দু-একটা বাবুলালের নাগালে গেল। পরেরগুলো আর নাগালে পৌঁছাল না। বাবুলাল নিজের দেহটাকে সামনে ঝুঁকিয়ে আঁটিগুলো ধরতে চাইল। কিন্তু বার বার ব্যর্থ হলো।

‘আরও জোরে ছুড়তে পারিস না ?’ চোখ পাকিয়ে ধমক দিল বাবুলাল।

রামচরণ অসহায় চোখে হাসল।

আরও কড়া দু কথা শোনাতে গিয়ে থমকে গেল বাবুলাল। আরে, কীভাবে কথা বলছে সে এই ছোট্ট ছেলেটির সঙ্গে! ছোট্টই তো! মাত্র সতেরো-আঠারো। এই বয়সে তার তো পড়াশোনা করার কথা। নিদেনপক্ষে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে পাড়া বেড়িয়ে বাপের আয়ে খাওয়ার কথা। কিন্তু রামচরণের ভাগ্যে তা তো হয়নি। এই কচি বয়সে দিনমজুরিতে নামতে হয়েছে। সুধীর সংসারটা টানতে পারছিল না বলে বাধ্য হয়েই বড় ছেলেকে কঠিন শ্রমের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তারও তো একরকম বয়সের একটা ছেলে থাকতে পারত!

ছিল তো! জন্মেছিল তো! নিজের অজান্তে হাত-ইশারায় রামচরণকে থামতে বলল বাবুলাল। ফেলে আসা গহিন এক কষ্টের স্মৃতিতে ডুবে গেছে তখন বাবুলাল। বিয়ের দু বছরের মাথায় গর্ভবতী হয়েছিল সুশীলা। মা কী যে খুশি হয়েছিল! একদিন মা বাবাকে বলতে শুনল, ‘বুঝেছ, আমার আরেকজন আসছে। তখন আমি তোমাকে এরকম সময় দিতে পারব না। তামাক সাজিয়ে দিতে পারব না, মাথায় তেল ঘষে দিতে পারব না। তোমার জামা-কাপড় ধুতে…।’

‘আরে থাম থাম, বাবুলালের মা। এমন দেখছি―যদি নাতি হয়, তাহলে তো তুমি আমাকে ছেড়ে তার জন্য দেওয়ানা হয়ে পড়বে।’

‘পড়ব তো, আলবৎ পড়ব। তখন নিজের পথ নিজে দেখে নিয়ো।’ বলে খিল খিল করে হেসে উঠেছিল মা।

ছেলেই হয়েছিল বাবুলালের। কিন্তু এক বছরের অধিক বাঁচেনি। কফ লেগে গিয়েছিল বুকে। অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার ছিল না গাঁয়ে। হরনাথ কবিরাজের চিকিৎসায় বাঁচানো যায়নি সেই প্রাণের ধনটিকে।

প্রথমে বোবামতন, তার পরে ক্ষ্যাপা হয়ে গেল সুশীলা। তাকে স্বাভাবিক করতে কয়েকটা বছর লেগে গিয়েছিল। এই ঘটনার বহু পরে অমলা জন্মাল। হুস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বাবুলাল―ছেলেটা বেঁচে থাকলে রামচরণের মতোই তো হতো!

‘জেঠা ছুড়ব ?’ রামচরণের ডাকে বাস্তবে ফিরল বাবুলাল। কিন্তু ঘোরটা চোখ-মুখ থেকে কাটল না।

ওই অবস্থাতেই বলল, ‘দে।’

বলে হাত বাড়াল বাবুলাল।

রামচরণ সর্বশক্তি দিয়ে আঁটিটা ছুড়ে দিল বটে, কিন্তু বাবুলালের হাত পর্যন্ত পৌঁছাল না।

ওই ঘোরের মধ্যেই সামনের দিকে ঝুঁকে আঁটিটা ধরতে গেল বাবুলাল। ঠিক এই সময় পা-দুটো হড়কে গেল। শরীরটাকে চালের সঙ্গে আটকে রাখতে পারল না। হুমড়ি খেয়ে পড়ে নিচের দিকে গড়াতে থাকল। বড় চাল থেকে বারান্দার চাল, সেখান থেকে উঠান। মাথাটা আগে পড়ল। পড়ল পাথরের ওপর।

বড় চ্যাপটা কালো পাথর। সমতল নয়। একদিকে সুচালো। এই পাথরটির একটা ভূগোল-ইতিহাস আছে। রাধামাধব চক্রবর্তীর সময়ে এই পাথর বাড়িতে আসেনি। ছোটবেলায় বাবার কাছে শুনেছেন―এককালে তাদের বেশ কয়েক বিঘা ধানি জমি ছিল। একখণ্ড ছিল এবড়োখেবড়ো। তাঁর পিতামহ সিদ্ধান্ত নিলেন―এই জমিতে চাষ করাবেন। কিন্তু তার আগে তো জমিটি খোঁড়াখুঁড়ি করে সমতল করতে হবে! মজুররা ওখানে কাজ করতে গিয়ে মাটির তলায় পাথরটি পেয়েছিল। তৎক্ষণাৎ নাকি পিতামহের মাথায় এই পরিকল্পনা ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল যে পাথরটি পুকুরের ঘাটলা হিসেবে ব্যবহার করবেন। মজুররা কাঁধাকাঁধি করে পাথরটি পুকুরপাড়ে নিয়ে এসেছিল। সেই থেকে রাধামাধব মশাইয়ের মধ্যজীবন পর্যন্ত পাথরটি ঘাটলা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। মাটির ঘর করার সময় সেই হাজা পুকুরটি থেকে মাটি তুললেন চক্রবর্তী মশাই। পুকুরে শান বাঁধানো ঘাট দিলেন এবং সেই পাথরখণ্ডটি ঘরের সামনে এনে রাখলেন। বাহির থেকে ধুলোবালির পা নিয়ে ফিরলে ওই পাথরেই ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতেন।

ব্রাহ্মণের পা-ঘষা পাথরে বাবুলালের মাথাটা সাংঘাতিকভাবে ঘা খেল।

চক্রবর্তী মশাই বাবুলালদের কাজে লাগিয়ে দিয়ে অদূরের রান্নাঘরে সকালের জলখাবার খাচ্ছিলেন। ধাপুস শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে গিন্নি আর পুত্রবধূ। দেখলেন―বাবুলালের দেহটি পাথরখণ্ডটির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে।

রামচরণ নির্বাক। তার চক্ষুগোলক খুলে এই বুঝি মাটিতে পড়বে! কাঁদছে না সে, নড়ছেও না। হাত দুটো সামনের দিকে বাড়িয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।

‘কী হলো! কী হলো রে বাবুলালের ?’ ছুটে এসে বাবুলালের দেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন রাধামাধব চক্রবর্তী।

তারপর রামচরণের দিকে ফিরে ধমকে বললেন, ‘অই পোলা, হাঁদারামের মতো ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? বউমা, বউমা রে, এক ঘটি জল নিয়ে আসবে বউমা! বাবুলাল রে তুমি এইরকম করে পড়ে আছ কেন রে বাবুলাল ? কথা কও বাবুলাল, কথা বলো!’ বুকভাঙা আর্তনাদে চুরমার হতে থাকলেন রাধামাধব।

পুত্রবধূটি বাবুলালের চোখেমুখে জলের ছিটা দিয়ে যেতে লাগল। চক্রবর্তীগিন্নি দু হাত দিয়ে মাথা চাপড়াতে লাগলেন।

বাবুলালের শরীরের কোথাও ফাটেনি, আঁচড়ও লাগেনি কোনওখানে। শুধু প্রাণবায়ুটা বেরিয়ে গেছে তার।

ততক্ষণে পাড়ার মানুষ জড়ো হয়ে গেছে উঠানে। নারীরা হাহাকার-আর্তনাদ করলেও পুরুষেরা কথা বলতে ভুলে গেছে যেন। হয়তো তারা ভাবছে―বাবুলালের মতো তাদেরও তো এরকম অপঘাতে মৃত্যু হতে পারে!

বাবুলালের মৃতদেহটি তার বাড়িতে পৌঁছানো দরকার। এদিকে গাড়িঘোড়ার চল নেই। দেহটি বয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

পাড়াপড়শির বুদ্ধিতে বাঁশ দিয়ে একটা মাচা বানানো হলো। সেই মাচার নিচে শক্ত দুটো লম্বা বাঁশ ঢুকিয়ে বহনযোগ্য করা হলো। দেহটি মাচার ওপর রেখে একটা চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো।

চারজন মানুষ বাবুলালের শব বয়ে চলেছে। পেছনে পাড়াভাঙা মানুষ।

সবার সামনে লাঠিতে ভর দেওয়া রাধামাধব চক্রবর্তী।

পনেরো

রাধামাধব চক্রবর্তী মর্মযাতনায় জরজর।

জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল সুশীলার।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার। পরিবারটাকে একটা স্থিরতায় রেখেছিল বাবুলাল। সচ্ছলতা বাড়াতে পারেনি, আবার দারিদ্র্যকেও বাড়তে দেয়নি। যা রোজগার করেছে, তা দিয়েই সংসারটা চালিয়ে নিয়ে গেছে সুশীলা।

অভাবী পরিবারেরও একটা সৌন্দর্য আছে। কম খেয়ে তৃপ্তির সৌন্দর্য, পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসার সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য বাবুলালের পরিবারে পুরোমাত্রায় ছিল। হরেক অভাবের মধ্যেও হাসিখুশি থেকেছে গোটা পরিবারের মানুষগুলো। বাবুলালের মৃত্যুতে সেই হাসি উবে গেল।

বাবুলালের মৃত্যু নিয়ে কোনও থানা-পুলিশ হয়নি। প্রত্যন্ত এই গ্রাম থেকে থানা বহু যোজন দূরে। এ ধরনের অপঘাতে মৃত্যুর খবর থানা পর্যন্ত পৌঁছে না। কেউ যে উদ্যোগী হয়ে চক্রবর্তী মশাইকে ফাঁসাবার জন্য বাবুলালের মৃত্যুকে হত্যা বলে প্রচার করে থানার কানে পৌঁছাবে, সেরকম লোকও এ গ্রামে নেই। সবাই রাধামাধব চক্রবর্তীর সহৃদয়তার কথা জানে। তাঁকে সবাই মান্যগণ্য করে।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং শ্রাদ্ধের সকল খরচাপাতি রাধামাধব বহন করলেন। শ্রাদ্ধক্রিয়া চুকে গেলে সুশীলার হাতে বেশ কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে অপরাধীর কণ্ঠে রাধামাধব বললেন, ‘সব আমার দোষ মা। কেন আমি পাথরটি ওখানে নিয়ে গিয়ে রেখেছিলাম! কেন পুকুরঘাটের একপাশে ফেলে রাখিনি ? ওই ছেলেটা যখন শনের আঁটি ছুড়ে দিচ্ছে, কেন তখন আমি ওখানে দাঁড়িয়ে থাকিনি ?’ বলতে বলতে ঝর ঝর করে কেঁদে দিলেন চক্রবর্তী মশাই।

সুশীলা জেনে গেছে―বাবুলালের মৃত্যুর জন্য চক্রবর্তী মশাই বিন্দুমাত্র দায়ী নন। ওই পাথরটি তিনি তো সেদিনই ওখানে নিয়ে গিয়ে রাখেননি। অনেক অনেক বছর আগে নিয়ে গিয়ে রেখেছেন। ওই পাথরেই যে তার স্বামীর মাথা এসে ঠুকে যাবে, তা তো তিনি জানতেন না। যা হয়েছে কাকতালীয়ভাবেই হয়েছে। কপালের লিখন বলেই হয়েছে। ঈশ্বর তার স্বামীর মৃত্যু ওভাবে নির্ধারিত করে রেখেছিলেন বলেই হয়েছে।

আর আঁটি ছোড়ার সময়ে দাঁড়িয়ে থাকার কথা বলছেন তিনি। এই কথাটিও নিজের বিবেক-যন্ত্রণা থেকে বলছেন। তিনি অত্যন্ত দয়াবান আর মানবিক বলেই এরকম করে ভাবছেন। কোন গৃহস্থ ঘরামিদের সঙ্গে সঙ্গে থাকেন ? প্রথম দিকে কিছুক্ষণ থাকলেও পরে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন গৃহকর্তা। ঘরামিরা নিজের দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করতে থাকে। দিনশেষে গৃহস্থকে তাদের কাজের অগ্রগতি বুঝিয়ে দেয়। তাছাড়া সেদিন তো ঠাকুরমশাই সকালের জলখাবার খাচ্ছিলেন। একজন বয়স্ক লোক কি জলখাবার না খেয়ে সারাক্ষণ তার স্বামীর পিছু পিছু থাকবেন ?

এসব ভেবে ঠাকুরমশাইয়ের কাকুতির সামনে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় সুশীলার।

কাতর গলায় বলে, ‘আপনার কোনও দায় নেই ঠাকুরমশাই। কোনও কারণে হয়তো অন্যমনস্ক ছিল লোকটা। আঁটি ধরতে গিয়ে টাল ঠিক রাখতে পারেনি।’

তারপর হাউমাউ করে উঠল, ‘নিজে চলে গেল ঠিক, আমাদের যে ভাসিয়ে দিয়ে গেল! এই দুটো মেয়ে নিয়ে আমি কোথায় যাব, কী করব রে ঈশ্বর! তুমি আমাকে পথ দেখাও রে ঠাকুর!’

রাধামাধব চক্রবর্তী মর্মযাতনায় জরজর। সুশীলার দিকে জলভরা চোখ তুলে বললেন, ‘টাকা একেবারে কম না মা। বছরখানেক বেঁচে থাকার খরচ মিটে যাবে। আরও অনেক বেশি টাকা দেওয়া উচিত ছিল আমার। কিন্তু আমি যে মা খুব ধনী, তেমন নয়। সচ্ছল সেটা মানি। আমার সক্ষমতার সর্বোচ্চ পরিমাণ দিয়েছি মা। এগুলো দিয়ে জীবনটা শুরু করো। তবে এটা নয় যে এই টাকা দিয়েই আমি দায়মুক্ত হলাম। আমি তোমাদের খোঁজখবর রাখব। যদি কখনও কোনও ঠেকায় পড়ো, নির্দ্বিধায় আমার কাছে চলে যাবে। ভাববে―তোমার একজন বাবা ও-গাঁয়ে আছে।’

সুশীলার মনের সকল অভিমান, সকল ক্রোধ গলে গেল। রাধামাধব চক্রবর্তীর পায়ের ধুলো মাথায় নিল।

অনীল পোদ্দারের বাড়িতে কাজ নিল সুশীলা। নবজাতকের দেখভাল করা। রান্নাঘরের মাছ-শাক-সবজি কুটাবাছা করা। গোটা দুই-তিনেক তরকারি রান্না করা। সকালে যেতে হয়, ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে যায়। মাসের শেষে কিছু টাকা পায়। দুপুরের খাবার পোদ্দার বাড়িতেই খায় সুশীলা। আলপনাকে বলে দুই মেয়ের জন্য দুপুরখাবার ঘরে নিয়ে আসে।

সমাজের চাপে অনীল পোদ্দার আলপনার সঙ্গে বিয়েটা নমো নমো করে সেরে নিয়েছিল।

পেট খালাস করবার উদ্যোগ নিয়েছিল পোদ্দার। অতি গোপনে হরিবালা দাসীকে ডেকে আনিয়েছিল, গভীর রাতে।

আলপনার সঙ্গে কথা বলে, তার পেটপুট দেখেটেখে জোরে জোরে দু দিকে মাথা ঝাঁকিয়েছিল হরিবালা।

চিকন গলায় বলেছিল, ‘হবে না পোদ্দারদা। দেরি হয়ে গেছে। এখন কিছু করতে গেলে জীবনের ঝুঁকি আছে।’

‘তোমার টাকা বাড়িয়ে দেব হরিবালা। যেভাবে পার খালাস করো।’ অনীলের মুখেচোখে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার আকুতি।

টাকার লোভটা হরিবালার চেহারায় লকলকিয়ে উঠল। কিন্তু তা ক্ষণিক সময়ের জন্য। ভেতরের হরিবালা খেপা গলায় বলল, খবরদার হরিবালা। লোভ করিস না। তুই তো দেখতেই পাচ্ছিস―পেটের বাচ্চা পোক্ত হয়ে গেছে। এই সময় লোভে পড়ে কিছু করতে গেছিস কি মরেছিস। শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতকড়া পড়বে তোর হাতেই। অনীল পোদ্দারের অনেক টাকা। নিজেকে বাঁচিয়ে নেবে। গলায় ফাঁস পড়বে তোর।

চমকে উঠল হরিবালা। ঢোঁক গিলল, ‘টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলছ কেন ? আমি তো তোমার বাড়ির বাঁধা ধাইমা। তোমার সব ছেলেপুলে তো আমার হাতেই জন্মেছে। এটা করা যাবে না। ছা-মা―দুজনেই মরবে। শেষে জেলের ঘানি টানতে হবে তোমায়।’

ওষুধে কাজ হলো। থেমে গেল অনীল পোদ্দার। তারপর বিয়ের আয়োজন।

বিয়ের চার মাস পরেই বাচ্চা হলো। আঁতুড়ঘর থেকে হরিবালা দাসী গলা উঁচিয়ে বলে উঠেছিল, ‘তোমার ছেলে হয়েছে গো অনীলদা।’ হরিবালা অনীল পোদ্দারকে কখনও পোদ্দারদা, কখনও অনীলদা বলে সম্বোধন করে।

বেজার মুখে অনীল পোদ্দার জবাব দিয়েছিল, ‘অ, আচ্ছা।’ মনে মনে গজর গজর করে বলেছিল, ‘সবসুদ্ধ আধা ডজন হলো।’

বড়বোন দীপ্তিরানির ঘরে পাঁচটা আর শ্রীছাদহীন ছোটটির ঘরে একটা। কী কুক্ষণেই যে সে রাতে আলপনার মশারির তলায় গিয়েছিলাম! মনটা বিষিয়ে উঠল অনীল পোদ্দারের।

এক মাস অশুচির সময় অনীল পোদ্দার টের পেল আলপনা তার পরিবারে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ। গুড়াগুর্বাদের নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। মাসির যত্ন-আত্তি না পেয়ে, ঠিক সময়ে খাবার না পেয়ে ছেলেপুলেরা বাড়ি মাথায় তুলল। চ্যাঁভ্যাঁ-তে গোটা বাড়ি আখড়ায় পরিণত হলো। বাড়িতে দুলালের মা বলে সর্বক্ষণের একজন ঝি আছে বটে, কিন্তু সে ওই মাসি-নেওটা বাচ্চাদের সামাল দিতে পারল না।

পোদ্দারের দুরবস্থা দেখে হরিবালার মন নরম হলো।

একদিন বলল, ‘পোদ্দারদা, তুমি আরেকজন এমন কাউকে রাখো, যে আলপনার এই অবস্থায় বাচ্চাদের দেখভাল করবে।’

‘তুমি তো বলেই খালাস হরিবালা। এই গেরামে কে আছে যে আমার এই দুর্দিনে এগিয়ে আসবে!’

‘আছে একজন। চাও তো কাল সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারি।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘বড় কষ্টে আছে বেচারি।’

অনীলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘ও যা শর্ত দেবে, মানতে হবে তোমায়। তাহলেই আনতে পারি।’

অনীল পোদ্দার একটু থমকাল। তারপর বলল, ‘যা বলবে, তাই মেনে নেব। শুধু আমাকে এই ভবযন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করো হরিবালা।’

পরদিন সুশীলাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল হরিবালা। বলেছিল, ‘বাবুলালের বউ। বড় কষ্টে আছে।’

বাবুলালের মৃত্যুর ঘটনা মনে পড়ে গিয়েছিল অনীল পোদ্দারের। ‘ভালো লোক ছিল বাবুলাল।’ বলে উঠেছিল অনীল পোদ্দার।

মেয়েদের খাবার দেবে, মাস শেষে টাকা দেবে, কাজ শেষে দ্বিপ্রহরে বাড়ি ফিরে যাবে―এরকম শর্তে সুশীলা পোদ্দারের বাড়িতে কাজ শুরু করল।

ষোলো

এ অঞ্চলের ব্রাহ্মণরা কখনও অব্রাহ্মণের

বাড়িতে কিছু খান না।

এক বিকেলে রাধামাধব চক্রবর্তী বাবুলালের উঠানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন অমলার বয়স তেরো।

‘কেমন আছো মা ?’ চক্রবর্তী মশাইয়ের চোখেমুখে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার ক্লান্তি।

তাড়াতাড়ি জলচৌকিটা এগিয়ে ধরে সুশীলা বলল, ‘বসুন ঠাকুরমশাই।’ আঁচল দিয়ে জলচৌকি মুছতে মুছতে আবার বলল, ‘ভালো আছি।’

সুশীলা যে ভালো নেই, তা তার চেহারা দেখে বুঝতে পারছেন রাধামাধব। তার চেহারাখানা জুড়ে রাজ্যের ক্লান্তি বিষণ্নতা। চোখে-মুখে যে সতেজতা ছিল, তৃপ্তির যে একটা আভা ছিল, এখন তা নেই। চোখের কোলে গভীর কালি। দু গাল দেবে গেছে। কিন্তু মুখমণ্ডলজুড়ে যোদ্ধার দীপ্তি দেখতে পেলেন রাধামাধব। তাঁর মনে হলো―পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও হার মানে না। জীবনযুদ্ধে জিতবার জন্য প্রাণবাজি রাখে। সুশীলাকে দেখে এরকমই একজন জীবনযোদ্ধা বলে মনে হলো। এই ধরনের মানুষগুলো কখনওই বলে না―ভালো নেই, আর পারছি না।

তাই সুশীলা বলল, ‘ভালো আছি।’

রাধামাধব প্রসঙ্গ পালটালেন, ‘তোমার মেয়েদের দেখছি না যে! ওরা কোথায় ?’

‘কাছেপিঠে কোথাও আছে। সারাক্ষণ টই টই। ঘরে থাকি না। স্বাধীনতা পেয়ে বাউণ্ডুলেপনা বেড়ে গেছে ওদের।’

সুশীলার কথায় দুটো প্রশ্ন চক্রবর্তী মশাইয়ের মুখ থেকে হড়গড়িয়ে বেরিয়ে এল, ‘ঘরে থাক না মানে! কোথায় যাও তুমি ? তোমার মেয়েরা স্কুলে যায় না ?’

প্রথম প্রশ্নের প্রথমেই উত্তর দেয় সুশীলা, ‘অনীল পোদ্দারের বাড়িতে ঝিগিরি করি ঠাকুর মশাই।’ বলে স্থির চোখে চক্রবর্তী মশাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই চোখে ক্লান্তি আর অপমানের আভা।

সুশীলার চাহনিতে রাধামাধব চক্রবর্তী কুঁকড়ে গেলেন। তাঁর মনে হলো―সুশীলার চোখে-চেহারায় যে গ্লানির ছায়া, সে শুধু তাঁরই জন্য।

বিষণ্ন একটু হেসে সুশীলা ঠাকুর মশাইয়ের দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিল, ‘ওদের বাপ মারা যাওয়ার পর থেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেছে ওরা।’

‘তুমি কিছু বলোনি ওদের ? স্কুলে যাওয়া যে জরুরি, তা বোঝাও নি ?’

‘না, বোঝাইনি ঠাকুরমশাই। স্কুলে গিয়েই-বা কী হবে আর! ঝি-এর মেয়েদের লেখাপড়ারই-বা দরকার কী ?’

সুশীলার কথা শুনে রাধামাধবের মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন তিনি।

এই ফাঁকে দুটো বাতাসা আর এক ঘটি জল এনে চক্রবর্তী মশাইয়ের সামনে রাখল সুশীলা। ও স্থির জানে―চক্রবর্তী মশাই বাতাসা তো খাবেনই না, উপরন্তু জলও স্পর্শ করবেন না। এ অঞ্চলের ব্রাহ্মণরা কখনও অব্রাহ্মণের বাড়িতে কিছু খান না। রাধামাধব চক্রবর্তীও খান না। তবে অন্য ব্রাহ্মণরা খান না বর্ণবাদিতায় অন্ধ হয়ে আর চক্রবর্তীমশাই খান না বহুদিনের প্রথাগত অভ্যাসের কারণে। তাঁর বুকের মধ্যে এই তথাকথিত ছোটলোকদের জন্য ভালোবাসা ছাড়া ঘৃণা নেই কোনও।

জল-বাতাসার দিকে একপলক তাকালেন রাধামাধব। অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘একটা কথা বলবার জন্য তোমার কাছে এসেছিলাম মা।’

‘কী কথা’ শোনবার জন্য উদ্গ্রীব হলো সুশীলা। কিন্তু রাধামাধব কিছু না বলে মাথাটা নিচু করে রাখলেন।

আজ সকালে খুব পরিশ্রম গেছে অনীল পোদ্দারের বাড়িতে। আলপনা অশৌচ কাটিয়ে উঠলেও সংসারের কাজে হাত লাগাতে পারছে না। নবজাতকটির ক্ষীণ দেহ। সারাক্ষণ ওঁয়া ওঁয়া। মায়ের কোল থেকে অন্য কোলে দিলে তারস্বরে চেঁচায়। ফলে সব কাজ প্রায় এক হাতে করতে হচ্ছে সুশীলাকে। দুলালের মায়ের বয়স হয়ে গেছে। ভারী কাজ দূরে থাক, হালকা কাজ করতেও হাঁপিয়ে ওঠে। আজও কাজের চাপে চিঁড়ে-চ্যাপটা হয়েছে সুশীলা। সকালের ক্লান্তি-অবসাদ এখনও দেহজুড়ে। সেই ক্লান্তি মনেও ছড়িয়েছে। তা অতি যত্নে চেপে রেখে ঠাকুর মশাইয়ের সঙ্গে কথা বলছে সুশীলা।

‘কী কথা ঠাকুর মশাই ?’ ঠাকুর মশাই চুপ করে আছেন বলে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে হলো সুশীলাকে।

‘তোমার বড় মেয়েকে আমি চাইতে এলাম।’

‘কাকে ? অমলাকে! চাইতে এলাম মানে! আপনার কথা বুঝতে পারলাম না ঠাকুর মশাই!’ সুশীলার ভ্রƒ কোঁচকানো। চোখে বিস্ময়।

‘তুমি হয়তো জানো না―আমার দুই ছেলে। জানবেই-বা কী করে! তুমি তো ভিন গাঁয়ের গৃহবধূ। দূরগ্রামের একজন ব্রাহ্মণের ঘরে কয়টি ছেলেমেয়ে, তা তো তোমার জানার কথা নয়।’

বয়স হয়ে গেলে মানুষের কথা বলার প্রবৃত্তি বেড়ে যায়। শ্রোতার তার কথা শোনার আগ্রহ আছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখে না। রাধামাধব চক্রবর্তীরও সেই প্রবৃত্তি। সুশীলা তাঁর কথা শুনছে কি না, সেদিকে নজর নেই তাঁর। বলেই যাচ্ছেন।

ওদিকে ঠাকুরমশাই মেয়ে দুটোর কথা জিজ্ঞেস করায় উচাটন বেড়ে গেছে সুশীলার। দীর্ঘ সময় মেয়েদের উঠানে বা আশেপাশে দেখতে পাচ্ছে না। অন্যদিন হলে হয়তো এরকম উচাটন লাগত না। ঠাকুর মশাই মেয়েদের কথা জানতে চাওয়ায় তাদের জন্য উদ্বেগ বাড়ল। সুশীলা ইতিউতি তাকাতে লাগল। ঠাকুর মশাইয়ের সামনে থেকে উঠছে না ঠিক, কিন্তু তার মনটা মেয়েদের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে।

‘তুমি তো আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছো না মা। বলছিলাম―আমার দুই ছেলের ছোটটি আমার সঙ্গে থাকে। বিদ্যা তেমন নেই বলে বামুনগিরি করে। বড়টি কিন্তু বেশ। লেখাপড়া জানে। ইঞ্জিনিয়ার। বড় চাকরি। চট্টগ্রাম শহরে থাকে। ফিরিঙ্গিবাজার রোডে। তার দুই ছেলে। ছোটটির বয়স দুই বছর।’

এই লোকটি তার স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক সাহায্য করেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব পিতৃসুলভ। তাদের ভালোও বাসেন খুব। কিন্তু এই পড়ন্তবেলায় উঠানে বসে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত কেন শোনাচ্ছেন ঠাকুর মশাই, বুঝতে পারে না সুশীলা। কিছুটা ধৈর্য হারায়।

শান্ত গলায় বলে, ‘এসব কিছু আমাকে কেন বলছেন, বুঝতে পারছি না ঠাকুর মশাই!’ সুশীলার তৎক্ষণাৎই মনে হলো―ঠাকুর মশাইকে কড়া কথাই বলে ফেলেছে।

তখন তখন রাধামাধবের পায়ে হাত রেখে বলল, ‘আমায় ক্ষমা করুন ঠাকুর মশাই। আমি আর পারছি না। সংসারের বোঝা টানতে আমি আর পারছি না গো বাবা!’ বলতে বলতে রাধামাধব চক্রবর্তীর পায়ের কাছে ভেঙে পড়ল সুশীলা।

‘শান্ত হও মা, ধৈর্য ধরো। ওপরে ঈশ্বর আছেন। তিনি তোমার কষ্ট দেখছেন। তুমি দেখে নিয়ো মা―এই দুঃখ তোমার একদিন দূর হবে।’ কণ্ঠকে আরও স্নেহময় করলেন রাধামাধব চক্রবর্তী, ‘বলছিলাম কি মা, শুভময় মানে আমার বড় ছেলের বউটির দুই ছেলে নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা। তার একজন সাহায্যকারী দরকার। তুমি যদি তোমার বড় মেয়েটিকে দাও, তাহলে বউটির বড় উপকার হয়। ওর ভরণপোষণের দায়িত্ব শুভময় নেবে। তুমি মাসে মাসে টাকা চাইলে টাকা দেবে। না চাইলে ওর বিয়ের সকল খরচপত্র আমার বড় ছেলে বহন করবে।’

স্বামীর মৃত্যুর পর দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে সুশীলা। তার জীবন না হয় তাইরে নাইরে করে চলে যাবে। কিন্তু মেয়ে দুটির জীবন ? ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে ওরা। অমলার শরীর তো বাড়বাড়ন্ত। ওদের চাহিদা বাড়বে, রূপযৌবন বাড়বে। তখন, তখন কী করবে সে ? কী করে রক্ষা করবে মেয়ে দুটিকে ? সমাজে তো দুষ্ট লোকের অভাব নেই। সে প্রতিদিন অন্যের বাড়িতে ঝিগিরি করতে যায়। মেয়ে দুটি ঘরে থাকে। এই সময়ে যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যায়! আর ভাবতে পারল না সুশীলা। শিউরে উঠল।

আগুপিছু চিন্তা না করে সুশীলা বলে উঠল, ‘আমি রাজি ঠাকুর মশাই। অমলা অন্তত দু বেলা পেট পুরে তো খেতে পারবে বড়দার বাসায়। আমার মেয়েটা নিরাপদে তো থাকতে পারবে।’

‘তুমি যা ভাবছো, সেরকম নয় মা, তার চেয়েও অধিক যত্নে থাকবে অমলা, শুভময়ের বাসায়। তার বউটি বড় ভালো মেয়ে। নিজের সন্তানের মতোই দেখবে তাকে।’ মধুর হেসে রাধামাধব চক্রবর্তী বললেন।

সেই থেকে অমলা শুভময়ের ফিরিঙ্গিবাজার রোডের বাসাবাড়িতে।

এর পর ছয় বছর কেটে গেছে। ধীরে ধীরে অমলা এ বাড়ির একজন সদস্য হয়ে উঠেছে।

তারপর ঘটনাচক্রে সুধারামের সঙ্গে পরিচয়। এবং বিয়ে।

সতেরো

শাশুড়ির কথা শুনে অমলার লজ্জার অবধি থাকল না।

‘বউ, বউমা। কই গেলা ?’

শাশুড়ির ডাকে সংবিতে ফেরে অমলা।

আঁচল দিয়ে দ্রুত চোখ দুটো মুছে নেয়। মোছায় জল যায়, কিন্তু গণ্ডজুড়ে অশ্রুরেখা থেকে যায়। শাশুড়ির দৃষ্টি বড় তীক্ষè―জানে অমলা। গালের অশ্রুরেখা তার চোখে পড়বেই পড়বে। তখন হাজারো প্রশ্ন। উত্তর দিতে গিয়ে মিথ্যে বলতে হবে। শ্বশুর-শাশুড়িকে বড় ভালোবেসে ফেলেছে অমলা। বিশেষ করে শাশুড়িকে তার মা-মা বলে মনে হয়। তার সঙ্গে মিথ্যে বললে মহাপাপ হবে। কান্নার কোনও চিহ্ন রাখা যাবে না।

জলের ঘটিটি হাতে নিয়ে স্নানঘরে যেতে যেতে আওয়াজ দেয়, ‘এই তো মা, আমি এখানে। আসছি।’

পা চালিয়ে স্নানঘরে ঢুকে ঘটির জল দিয়ে জোরে জোরে চোখেমুখে ঝাপটা দেয়। কান্নার ভাব যায়, গণ্ডের জলরেখা যায়, কিন্তু চোখের রক্তাভ রংটা স্বাভাবিক হয় না।

ওই সময় অমলা আবার শুনতে পায়, ‘বউমা, আইতে অত দেরি কইরতেছ ক্যান ? ফুল হাতে দাঁড়াইয়া রইছি!’

দু হাতের চেটো দিয়ে মুখের জলটা সরিয়ে দিল অমলা। মুখে লেগে থাকা জলগুলো আঁচলের চাপ দিয়ে দিয়ে মুছে নিল।

শাশুড়ির সামনে উপস্থিত হলে ডান হাতে ধরা বেলপাতা-জবাফুল ‘ঠাকুর, ঠাকুর’ বলে বউয়ের মাথায় ছোঁয়াল যমুনা। তারপর আবেগি গলায় বলল, ‘তুমি আশীর্বাদ কইরো নারায়ণ। আমার সুধার য্যান একখান পোলা হয়। আমি য্যান নাতিরে কোলে লইয়া পরান খুইল্যা আদর কইরতে পারি।’

শাশুড়ির কথা শুনে অমলার লজ্জার অবধি থাকল না। চিবুক তার বুকে লাগল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি করতে করতে বলল, ‘কী সব বলছো না মা! শুনতে আমার খুব লজ্জা করছে!’

যমুনা অমলার মাথায় হাত রেখে বলে, ‘লজ্জার কী আছে কও! লজ্জার কিছু নাই বউমা। তোমার কোল জুইড়া একখান সোনার চাঁদ আসুক―লক্ষ্মী-নারায়ণের কাছে এই পেরার্থনাই কইরা আইছি।’

অমলা কথা হারাল। শাশুড়ির এরকম কথার জবাবে কী বলবে ঠিক করতে পারল না।

‘বউমা, কিছু খাইতে দেও। উপুসমুখেই মন্দিরে গেছি, তোমার লাইগ্যা আশীর্বাদ চাইতে। বড় খিদে পেয়েছে মা।’

অমলার মনে পড়ল―শাশুড়ি খায়নি বলে সেও খায়নি কিছু। এর মধ্যে ফেলে-আসা জীবন, মা-বাবা-বোন―এরা এসে ভিড় করল মনে। বিভোরতা। কান্না। এসব কিছুতে খাবার কথা ভুলে গেছে অমলা। শাশুড়ি বলায় তারও খিদে চাগিয়ে উঠল।

অমলা বলল, ‘তুমি মন্দিরের শাড়ি বদলে ফেলো মা। আমি জলদি জলখাবার দিচ্ছি।’ বলে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল।

আরও দু বছর কাটল।

অমলা অন্তঃসত্ত্বা।

সুধারামের সেলুন এখন জমজমাট। রমরমিয়ে চলছে।

আগে একা কাটত। কাস্টমারের জন্য চেয়ারও ছিল একটা।

এখন চার-চারটা চেয়ার। পাশাপাশি। চুল-দাড়ি কাটার সরঞ্জামাদি পাশের দেয়ালের তাকে থরে থরে সাজানো। তিনজন লোক রেখেছে সুধারাম। লোক মানে তরুণ―আটাশ-ত্রিশ। বয়স্ক নাপিতের চুলকাটা আজকালকার কাস্টমাররা পছন্দ করে না। বড্ড সেকেলে স্টাইলে চুল কাটে ওরা। কমবয়সীরা মডার্ন স্টাইলে চুল-দাড়ি কাটতে দক্ষ। স্মার্ট ভঙ্গিতে কাজ করে ওরা, কথাও বলে সেই ভঙ্গিতে। স্মার্টনেস কার না পছন্দ ? কাস্টমারদেরও পছন্দ। তাই তাদের চাহিদামতো বয়স্ক লোক না রেখে কমবয়সী রেখেছে। তাদের চাহিদা একটু বেশি। বয়সীদের তুলনায় বেতন বেশি চায়। তাতে কী ? আয় তো আর কম নয়! ওদের বেতন মিটিয়ে মাসশেষে তারও তো কম থাকে না!

একটা টেবিল সামনে নিয়ে দরজার কাছাকাছি বসে থাকে সুধারাম। কাটিং শেভিং হয়ে গেলে যে কাটল সে আওয়াজ দেয়―তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, সত্তর বলে। কাস্টমাররা ওই পরিমাণ টাকা সুধারামকে দেয়। সুধারাম তা ক্যাশবাক্সে রাখে।

কাস্টমারের চাপ বেশি থাকলে সুধারামও ক্ষুর-কাঁচি ধরে। ঈদে-পুজোয় কাস্টমার বাড়ে। তখন শ্বাস ফেলার সময় পায় না সুধারাম। বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায় তখন। কোনও কোনওদিন কাস্টমার বিদেয় করতে করতে রাত দেড়টা-দুটো হয়ে যায়। ঈদের সময়েই এরকম হয় বেশি। সে রাতে আর বাড়ি ফেরে না সুধারাম। চেয়ারগুলো এদিক-ওদিক সরিয়ে সেলুনেই শুয়ে পড়ে।

প্রথম প্রথম অমলা অভিমান করত বেশ। সে এসেছে অন্য সমাজ থেকে। তাই ঈদ-পুজোর চাপের ব্যাপারটা তার জানা নেই। স্বামী রাতে না ফিরলে তাই ক্ষুব্ধ হতো অমলা। এ নিয়ে কথা কাটাকাটিও হতো দুজনের মধ্যে।

একদিন টের পেল সুধাংশু। সুধারামকে একান্তে ডেকে জিজ্ঞেস করল। প্রথম দিকে এড়িয়ে যেতে চাইলেও বাপের চাপাচাপিতে মুখ খুলল সুধারাম।

সব শুনে সুধাংশু চুপ থাকল কিছুক্ষণ।

সকৌতুকে হেসে বলল, ‘তুই এ লইয়া ভাবিস না সুধা। বউরে বিষয়টা আমি খোলসা কইরে বইলব। ঘটনাটা জানে না তো, তাই ভুল বুইঝছে তোরে।’

সুধারাম আমতা আমতা করে, ‘আমি অমলারে বুঝাইছি তো বাবা! বুইঝবার চায় না।’

‘বুঝানোর মতো কইরে হয়তো বোঝাইসনি তুই। আমার উপর ছাইড়ে দে।’

বাপের সামনে থেকে যেতে যেতে সুধারাম চাপা গলায় বলে, ‘কী জানি বাপু! দেখো বুঝাইতে পারো কি না!’

সেদিনই দুপুরখাবারের পর পুতের বউকে কাছে ডেকেছিল সুধাংশু। সমাদরে পাশে বসিয়েছিল।

এ কথা-সে কথার পর প্রসঙ্গটা তুলেছিল, ‘বউমা, ঈদ আর দুর্গাপূজায় নাপিতদের আসল কামাই হয়। এই সময় সব পুরুষ চুল-দাড়ি ছাটাই করে। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ ঢুকে সেলুনে। কাস্টমারদের বিদায় কইরতে কইরতে গভীর রাইত হইয়ে যায়। তুমি জানো, সুধারামকে নদী পার হইয়া বাড়িতে আইসতে হয়। তুমিই বলো―নিশুতি রাইতে সুধারামের বাড়িতে আসা কি ঠিক ? পথে কত বিপদ ওত পাইতে থাকে! যেদিন পারে না, সেদিন আসে না সুধা। এ ছাড়া অইন্য কিছু নয় মা।’

অমলা চোখ নামিয়ে বলে, ‘কী জানি বাবা! সব কিছু ঠিকঠাক মতো বুঝি না! আপনার ছেলেকেও মাঝেমধ্যে অচেনা লাগে।’

‘এ কী বলছে বউ!’ ভাবতে বসে সুধাংশু। বউয়ের কথার মধ্যে কীসের যেন ইঙ্গিত!

থমকে যাওয়া গলায় সুধাংশু বলে, ‘তোমার মইধ্যে কুনু কষ্ট জমা হইছে মা ? আমারে খুইল্যা কও।’

‘না বাবা, কিছু না।’ নিজেকে সামলে নেয় অমলা।

শব্দ করে একটু হেসে বলে, ‘আপনি এ নিয়ে চিন্তা করবেন না বাবা। আমি সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

এবার সত্যি সত্যি ভয় পেল সুধাংশু। পিঁড়িটা নিয়ে অমলার আরও পাশ ঘেঁষে বসল।

‘কিছু কি হয়েছে মা ?’

ছোট একটা শ্বাস ত্যাগ করে আবার বলে সুধাংশু, ‘এটা সইত্য মা―পরথম দিকে আমি তোমাদের বিয়ের বিরোধিতা কইরেছি। তোমার নাম শুইনে তেলে-বেগুনে জ্বইলে উঠছি। কিন্তু তোমারে দেখনর পর আমার মত পাইলটে গেছে মা। পুতের বউ হিসেবে তোমারে পাইয়া আমি নিজেরে ধইন্য মনে কইরেছি।’

যে কাজ কোনওদিন সুধাংশু করেনি, আজ সেই কাজ করল। নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে অমলার হাত ধরল, ‘মা রে, আমার কুনু মাইয়া নাই। মাইয়া না থাইকলে পুরাপুরি বাপ হওন যায় না। তুমি আইসা আমারে পূর্ণ বাপ কইরেছ। তুমি আমার মাইয়া রে মা।’ সুধাংশুর চোখের জল টলমল।

একটু আগে যে কথাটি শ্বশুরকে বলবে বলে ঠিক করেছিল, সেই কথাটি গিলে ফেলল অমলা। ব্যাকুল হয়ে বলল, ‘বাবা―, আপনি এত উতলা হয়ে উঠলেন কেন ? আসলেই কিছু হয়নি বাবা। আপনার ছেলে আমাকে পছন্দ করে বিয়ে করেছে না বাবা!’ বলে মনে মনে বলল, ‘আপনাকে সত্য কথা বললাম না। মিথ্যা দিয়ে সত্যকে লুকালাম। আমাকে মাফ করে দেবেন।’

সেই রাতে, গহিন রাত তখন, সুধারাম বেহেড মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরল।

আঠারো

ভয় পাইও না বউ। হারামজাদার কিচ্ছু হয় নাই।

রাতে সুধারাম ফিরলে দরজা অমলাই খুলে দেয়। বিয়ের পর, মানে শ্বশুরবাড়িতে আসার পর দায়িত্বটা সে নিজে চেয়ে নিয়েছে।

গাঁ-গেরামের মানুষেরা রাত নটার মধ্যেই খাওয়াপর্ব শেষ করে। দশটার মধ্যে বিছানা নেয়। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও যমুনা জেগে থাকত। জলচৌকিতে বসে ঝিমাত। সুধারামের ফিরতে ফিরতে সেই এগারোটা। ছেলে এলে ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দিত।

শ্বশুরবাড়িতে আসার দিন কয়েকের মধ্যে অমলা বুঝে নেয়―এ তারই কর্তব্য। স্বামী কর্মস্থল থেকে ফিরলে, দরজা খুলে দেওয়া তো উচিত তারই। এটা তো শাশুড়ির কাজ নয়।

এক রাতে খাওয়া শেষে যমুনা জলচৌকিতে বসতে গেলে অমলা বলে, ‘মা, আপনি ঘুমাতে যান। আপনার ছেলে এলে আমি দরজা খুলে দেব।’

যমুনা হেসে বলল, ‘তুমি ক্যান কষ্ট কইরবে। খুইলে দিতে আমার কুনু কষ্ট হয় না। সুধা ফিইরা আইলে, তারে দুই চক্ষে দেইখতে পাইলে মনে শান্তি পাই।’

‘তা না হয় বুঝলাম মা। কিন্তু এত রাত পর্যন্ত আপনার জেগে থাকার দরকার নেই। আজ থেকে দরজা খোলার দায়িত্ব আমার। কোনও সমস্যা হলে আপনাকে ডাকব। না ডাকলে বুঝবেন―আপনার ছেলে নিরাপদে বাড়িতে ফিরেছে।’

‘বইলছ ?’ যমুনা দোনোমনা করে।

‘হ্যাঁ তো। কথা দিচ্ছি―কোনও সমস্যা হলে আপনাকে নিশ্চয়ই ডাকব।’

সে রাতে ঘুমাতে গিয়েছিল যমুনা।

এরপর থেকে রাতবিরাতে দরজা খোলার কাজটা অমলাই করে গেছে। সুধারাম ফেরার পর খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে দুজনে ঘুমঘরে গেছে।

অমলার সন্তানধারণের চিহ্নসমূহ যখন স্পষ্ট হয়ে উঠল, যমুনা বলল, ‘আজ থেইকে তোমাকে আর রাত জাইগতে হইবে না বউমা। দিন দিন তোমার শরীর ভারী হইতেছে। চইলতে-ফিরতে অসুবিধা হইতেছে। এই সময় বিশ্রামের প্রয়োজন খুব। রান্নাঘরের খাওয়ার পাট চুইকে গেলে শুইতে যাইবে তুমি। দরজা খোলার ব্যাপারখানা এখন থেইকে আমিই দেখুম।’

অমলা যত না না করে, যমুনা ততই নাছোড় হতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছিল অমলাকে।

সেই থেকে যমুনা দরজা খোলে। সুধারামকে ভাত দেয়।

সে রাতে যথা-অভ্যাসে দরজার কাছে জলচৌকিতে বসে ঝিমাচ্ছিল যমুনা। জোর করে বউকে শোয়ার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। অমলা শাশুড়ির পাশে বসে থাকতে চেয়েছিল। যমুনা আপত্তি করেনি।

কিন্তু রাত এগারোটা বেজে গেলে অমলাকে তাড়া দিয়ে যমুনা বলেছিল, ‘আর না বউ। অনেকক্ষণ বইসেছ। রাইত গভীর হইছে। আরও নির্ঘুম থাইকলে পেটেরটা কষ্ট পাইব। মা না ঘুমাইলে ছা-ও ঘুমাইতে পারে না রে মা।’ অনেককটা ঠেলেই অমলাকে বসা থেকে উঠিয়ে দিয়েছিল যমুনা।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও শোয়ার ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিল অমলা। আজ কেন জানি তার শুতে যেতে ইচ্ছে করছিল না। মনটা আনচান করছিল কেন―কে জানে! সুধারামের জন্য বুকের মধ্যে তোলপাড় লাগছিল।

শাশুড়ির চাপাচাপিতে শোয়ার ঘরে এসেছিল অমলা, বিছানায় গা-ও এলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ঘুম আসছিল না। অন্যদিন শুলেই চোখ জড়িয়ে আসে, আজ এল না। আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে শুয়ে থাকল অমলা।

কতক্ষণ পর কে জানে, শেষের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল অমলা, ধুপ করে একটা আওয়াজ শুনল। ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল।

এই সময় শাশুড়ির চাপা অথচ কঠিন স্বর শুনতে পেল, ‘সুধা―! এসব কী ?’

স্বামীর গলা শুনতে পেল না অমলা। বিছানা থেকে সে দ্রুত মাটিতে পা নামাল।

দরজার কাছে গিয়ে দেখল―সুধারাম দরজার চৌকাঠে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। শাশুড়ি তাকে হাত ধরে টেনে তোলবার চেষ্টা করছে। আরও নিকটে গেলে বিকট এক বদবু তার নাকে এসে ঝাপটা মারল। অমলা চট করে নাকে আঁচল চাপা দিল।

আগাপাছতলা কিছুই বুঝতে পারল না অমলা।

দ্রুত একবার সুধারামের ওপর, আরেকবার শাশুড়ির ওপর চোখ রাখল। শাশুড়ির চোখ-মুখ পাথরের মতো কঠিন বলে মনে হলো।

‘কী হয়েছে মা ? আপনার ছেলের কী হয়েছে ?’ বলে সুধারামকে ধরতে গেল অমলা।

যমুনার ভ্রƒ গুটানো। চোখে ঘৃণা। কণ্ঠ নির্মম। ‘ভয় পাইও না বউ। হারামজাদার কিচ্ছু হয় নাই। গু গিলে আইছে।’ অদ্ভুত নিষ্ঠুর চেহারা নিয়ে ছেলের দেহের পাশে দাঁড়িয়ে আছে যমুনা। তার চেহারায় মমতার কোনও চিহ্ন নেই।

বিয়ের পর থেকে কোনওদিন শাশুড়ির মুখে গালি শোনেনি অমলা। গালিতে শ্বশুর সড়গড়। কারণে-অকারণে গাল দেওয়া সুধাংশুর অভ্যাস। যমুনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। শত দুঃখেও কোনওদিন তার মুখ থেকে গালি তো দূরের কথা, কটু কথাও বের হয় না। আজ সেই শাশুড়ি ‘হারামজাদা’ বলল। ‘হারামজাদা’ তো গালিই, জঘন্য গালি! ‘হারামজাদা’ মানে তো জারজ! শাশুড়ি এরকম একটা গালি পাড়ল সুধারামকে! এরকম কদর্য গালি দেওয়ার কারণ কী ? কোনও কি খারাপ কাজ করেছে তার স্বামী ? কী রকম খারাপ কাজ ? আর ‘গু গিলে’ আসার মানে কি ? ‘হারামজাদা’র অর্থ ধরতে পারলেও ‘গু গিলে’ আসার মানে বুঝতে পারল না অমলা। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তবে সে অল্পসময়ের জন্য। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা সুধারামের এক হাত ধরে টেনে তুলতে গেল অমলা। যমুনা তখনও স্থির দাঁড়িয়ে।

বিশাল বড় এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে যমুনাও অন্য হাত ধরল। টলোমলো পায়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সুধারাম এলোমেলো কণ্ঠে বলল, ‘এ―ই, তুই কে রে ?’

তারপর ভাঙা বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল―

‘কি মজা আছে রে লাল জলে

জানে ঠাকুর কোম্পানি

মদের গুণাগুণ আমি কি জানি ?

জানে ঠাকুর কোম্পানি।’

ভক ভক করে উৎকট এক দুর্গন্ধ বেরিয়ে এল সুধারামের মুখ থেকে।

মেয়েবেলার অনেকটাই কেটেছে গ্রামে। শেষ ছয় বছর চট্টগ্রাম শহরে। পরের বছরগুলো আবার গ্রামে―শ্বশুরবাড়িতে। এরকম বিদঘুটে ঘটনার মুখোমুখি আগে কখনও হয়নি অমলা। গাঁ-গেরামে সে কখনও কাউকে মদ খেতে দেখেনি। শুভময় ঠাকুরের বাসাবাড়িতে থাকার সময়ও এই অভিজ্ঞতা হয়নি তার। তিনি তো অনেক ভালো লোক। তাঁর স্ত্রী আরও ভালো। কোনওদিন তাকে অযত্ন-অনাদর করেননি। উপরন্তু সে তাঁদের মনে ব্যথা দিয়েছে। ওঁদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে সুধারামকে বিয়ে করেছে। একটা সুন্দর বাসনা নিয়ে সে সুধারামকে বিয়ে করেছিল। আজ সেই বাসনা মাটির কলসির মতো চুরমার হয়ে গেল।

এত ভাবনার মধ্যেও সুধারামের হাত ছাড়েনি অমলা। শাশুড়ির সঙ্গে ধরে শোয়ার ঘরে নিয়ে যেতে চাইছে।

ঠিক ওই সময়ে কোথা থেকে সুধাংশু উড়ে এল। সুধারামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে সপাটে সুধারামের গালে এক চড় বসিয়ে দিল। ‘শুয়োরের বাচ্চা, খানকির পোলা’―আরও উৎকট উৎকট গালি সুধাংশুর মুখ থেকে গল গল করে বেরিয়ে আসতে লাগল।

এমন পরিস্থিতির জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না অমলা। স্থির দুটো চোখ মেলে এই পরিবারের মানুষদের কাণ্ডকারখানা দেখে যেতে লাগল।

যমুনা সুধারামকে ছেড়ে দিয়ে সুধাংশুকে জাপটে ধরল। জোর হাতে টেনে নিজেদের শোয়ার ঘরের দিকে নিয়ে গেল।

যার গালে চড় হাঁকানো হলো, যাকে নিয়ে এত কাহিনি-বৃত্তান্ত, সেই সুধারাম কিন্তু নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি, এমন করে টলমলানো পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে যেতে লাগল। তাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল অমলার। সুধারামের শরীরের ভার নিতে পারছিল না সে।

যমুনা এসে সুধারামের হাত ধরলে অতি শান্ত ও ধীর পায়ে নিজের শোবার ঘরের দিকে একা এগিয়ে গেল অমলা।

উনিশ

‘খবরদার, আমার আইনের অপমান আমি কিন্তুক সইয্য করুম না।’

পরদিন সকালে কেউ জাগার আগেই সুধারাম ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ভোরের আজানে ঘুম ভেঙেছে তার। তখন নেশা কেটে গেছে। রাতের ঘটনা আবছা আবছা মনে পড়ল। মায়ের গালি, বাপের চড়। নিজের অজান্তে ডান গালে হাত রাখল সুধারাম। চট করে অমলার দিকে তাকাল। দেখল―অমলা ওপাশ ফিরে ঘুমাচ্ছে। তার শরীর মৃদু উঠা-নামা করছে। হায় হায়, গত রাতে কী করেছে সে! মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছে! প্রথম দিকে নেশা তেমন লাগেনি। বাড়ির পথে নৌকা থেকে নামার পর আর পা বাড়াতে পারছিল না। চেনা পথ বলে মদের ঘোরের মধ্যেও বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল। তারপর যে হুঁশ হারাবে, ভাবেনি।

এখন কী করবে ? আর কিছুক্ষণ পর তো ভোরের আলো ফুটতে শুরু করবে! জেগে উঠবে সবাই। মুখ দেখাবে কী করে সে! মা-বাবা! ভাই! অমলা! অমলার দু চোখের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবে! তার চেয়ে পালানো ভালো। বিছানা থেকে নেমে পড়ল সুধারাম। জামা-প্যান্ট পরে নিল। দোকানের চাবি, টাকা পকেটেই ছিল। চোরের মতো পা টিপে টিপে মূল দরজার কাছে পৌঁছাল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার তাকাল অমলার দিকে। অমলা তখন ঘুমের মধ্যে এপাশ ফিরেছে। তার মুখটা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। সামনের শাড়ি শরীর থেকে সরে গেছে বেশটুকু। স্ফীত স্তন, ভারী পেট একপলক দেখে নিয়ে মুখের ওপর দৃষ্টি স্থির করল। নরম চেহারাটায় কষ্টের গাঢ় আভা সুধারামের চোখ এড়াল না।

‘আমাকে মাফ করে দিয়ো অমলা’ মনে মনে বলে হুড়কোটা নিঃশব্দে খুলল সুধারাম।

বেলা একটু হয়েছে তখন। সকাল-নাস্তার আয়োজন এখন যমুনাই করে। অমলা আসন্ন-প্রসবা। নড়াচড়া করতে অসুবিধা হয়। শাশুড়ি বলে দিয়েছে―চুলার কাছে একদম আইসো না বউমা। রান্নাঘরের কাজ আমি সামলাইয়া নিমু।

অমলা বলেছিল, ‘তা কী করে হয় মা! আপনার একার হাতে সব কাজ করা সম্ভব নয়।’

‘সম্ভব কি সম্ভব না, সে আমি দেখুম। কুনু অজুহাত দেখাইও না মাইয়া। আমি যেন আগে সংসারের কাজ-কাম করি নাই!’

অমলা চুপ করে থাকে। বুকের তলায় মায়ের স্নেহ অনুভব করে। তার নিজের মা যদি কাছে থাকত, তাহলে হয়তো এমন করেই বলত।

শাশুড়ি আরও বলেছে, ‘আমার দাদা দিদি না হওন পর্যন্ত তোমারে সংসারের কুনু কাজে হাত দিতে দিমু না। সন্তান হইয়া গেলে তোমার সংসার তুমি বুইঝা লইও। এখন শুধু ঠাকুর ঠাকুর করো বউমা।’

অমলার চোখে কি জল এল ? এসেছে বোধহয়। নইলে শাড়ির খুঁট দিয়ে চোখের কোনা মুছছে কেন ?

অমলা এখনও তক্তপোশে শুয়ে আছে। ওদের কামরা একটেরে। যমুনা ভেবেছে―রাতে দেরি করে শুয়েছে। এখন ওদের একটু ঘুমাতে দেওয়া উচিত। তাছাড়া, মনে বড় একটা আঘাত নিয়েই ঘুমাতে গেছে অমলা। কী করে যে সেই আঘাত সামলে উঠবে মেয়েটি, কে জানে! যদি দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া হয়! নষ্টটা যদি মাফটাফ চেয়ে মেয়েটির কষ্টটা ভোলায়! রাতে বেহুঁশে ঘুমিয়েছে হারামিটা। সকালের দিকে নিশ্চয়ই হুঁশ ফিরেছে। এই সময় যদি মেয়েটির মান-দুঃখ লাঘব করে। এজন্য দুজনকে সময় দেওয়া দরকার। তাই ওদের ঘরের দিকে গেল না যমুনা।

বলরামকে পান্তাভাত দিল, সুধাংশুকে রুটি-আলুভাজি।

প্রথম দিকে বলরাম আটার রুটি আর সবজি-ডাল খেয়ে সেলুনে গেছে। কিন্তু একদিন সে খেয়াল করল, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার খিদে লেগে যাচ্ছে। পেটের খাদ্য দ্রুত হজম হয়ে যাচ্ছে বলেই এরকম হচ্ছে―বুঝে ফেলল বলরাম।

এক রাতে মাকে বলল এবং বউদির দিকে করুণ চোখে তাকিয়েই বলল, ‘কাল থেকে আমারে সকালে পান্তাভাত দিয়ো।’ কাস্টমারদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এবং বিনয় বাঁশীর প্রভাবে বলরামের ভাষায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সে একেবারে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে না এখন, কিছুটা প্রমিত-ঘেঁষা বাংলা বলে। ‘দুই এক ঘণ্টা কাজ করার পর পেটে টান লাগে। পান্তাভাত অনেকক্ষণ পেটে থাকে। রুটি-তরকারি ততক্ষণ থাকে না মা।’

বউদির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কথা শেষ করেছে বলরাম।

‘আইচ্ছা বাবা, আইচ্ছা। কাইল থেইকে তুই পানিভাত খাইয়াই দোকানে যাইস।’ হালকা একটু হেসে অমলার দিকে তাকায় যমুনা।

তারপর সকৌতুকে বলে, ‘তবে মাঝেমইধ্যে বউয়ের চালু করা নিয়মও তোরে মাইনতে হইবে। আটার ছেঁকা রুটি আর ডাইল-তরকারিও খাইতে হইবে।’

কৌতুকটা বুঝতে পেরে বলরামও হাসতে থেকেছে।

অমলা রাগের ভান করে বলেছে, ‘মনে থাকে যেন। খবরদার, আমার আইনের অপমান আমি কিন্তুক সইয্য করুম না।’

সবাই একসঙ্গে হা হা হি হি করে হেসেছিল সেদিন।

সুধাংশু আজ চোখ-মুখ ঠাটিয়ে সকালের খাবার খেল। অন্যদিন নানা কথা বললেও আজ তার মুখ কঠোর। কথা বলল না একটাও। জোর বৃষ্টি শুরু হবার আগে মেঘলা আকাশ যেমন গুমোট হয়ে থাকে, সুধাংশুর চেহারাখানাও আজ তেমন। যেন বড় একটা বিস্ফোরণ ঘটাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে মনে মনে।

যমুনা আঁচ করল তা। রাতে গন্ডগোল একটা হয়ে গেছে। বউটাকে দেখে মনে হয়েছে―এই বুঝি জোয়ার-লাগা বালির মূর্তির মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। স্বামীকে দেখেছে পরশুরামের চেহারায়। ঋষি পরশুরামকে সে যে চিনে খুব, তা কিন্তু নয়। একদিন এই পাড়ায় মহাভারত পাঠের আসর বসেছিল। সেই রাতে কথকঠাকুরের মুখে পরশুরামের ক্রোধের কথা শুনেছে। নিজের পরিচয় লুকিয়ে কর্ণ পরশুরামের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে গিয়েছিলেন। বহুদিন পর একদিন পরশুরাম ঠাকুর কর্ণের পরিচয় জেনে গেলেন। অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিলেন পরশুরাম। সেদিনের ক্রোধান্বিত পরশুরামের যে বিবরণ দিয়েছিলেন কথক ঠাকুর, তা এতদিন পরেও মনে গেঁথে আছে। পরশুরামের রাগী চেহারাটাই যেন আজ যমুনা তার স্বামীর চেহারার মধ্যে দেখতে পাচ্ছে। যে করেই হোক তাকে শান্ত করতে হবে। কিন্তু এ লোক তো শান্ত হবার নয়! জানে তা যমুনা। যে করেই হোক, সংসারের ঝামেলা আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। সে বুঝে গেছে―লোকটি সুধারামের অপেক্ষায় আছে। ঘর থেকে বেরোলেই তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। রাতে মীমাংসা হয়নি। এখন, এই সকালে রাতের ঘটনার এসপার কি ওসপার করবে।

বাড়ি থেকে এই মুহূর্তে সুধার বাপকে সরাতে হবে। নইলে পরিস্থিতি তুঙ্গে উঠবে। কিন্তু কী করে সরাবে ? যমুনা জানে―তার স্বামীর দুর্বল জায়গা কোনটি।

যমুনা বলল, ‘তোমারে যে বাজারে যাইতে হইবে আইজ। ঘরে মাছ-তরকারি কিচ্ছু নাই। না আইনলে দুপুরের রান্না যে হইবে না।’

মুখে তাচ্ছিল্যের আওয়াজ করে সুধাংশু বলল, ‘বাজারে পাঠানোর আর সময় পাইলা না। যাইতে পারুম না। কাজ আছে। বলরামরে কও।’

‘কী যে কও না তুমি! বলরাম আছেনি যে তারে কমু! সে তো কুনসময় পানিভাত খাইয়া দোকানে চইলে গেছে।’

‘দোকানে চইলে গেছে! দোকানে যাওনর সময় হইছেনি!’

মধুর একটু হেসে যমুনা বলে, ‘বেলার দিকে আইজ বুঝি তাকাও নাই! চাইয়া দেখো―কত বেলা হইয়া গেছে।’

বাইরে তাকিয়ে সুধাংশু একটু লজ্জা পেল বলে মনে হলো। কিন্তু সে লজ্জা চেহারায় ফুটতে দিল না।

বলল, ‘আইজ আমি কোথাও যামু না। কইছি না, কাম আছে।’

‘কী কাম আছে, তা তো আমি জানি। সুধারামেরে তুমি আইজ দেইখ্যা লইবা!’ মনে মনে আওড়ায় যমুনা, মোক্ষম চালটা দেয়, ‘দেখো, বউ পোয়াতি। তারে যদি এই সময় ভালা-মন্দ না খাওয়াই, বাইচ্চাখান হৃষ্টপুষ্ট হইবনি ?’

যমুনার কথায় কাজ হলো।

সুধারামের ঘরের দিকে কটমটে চোখে তাকিয়ে সুধাংশু গরগরে গলায় বলল, ‘বাজারের থলেখান দেও।’

স্বামী বাজারের উদ্দেশে বের হয়ে গেলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যমুনা।

‘তাজ্জব! বউটা এখনও দরজা খুইল্ল না ক্যান! এতক্ষণ তো দরজা বন্ধ কইরে থাকার মাইয়া না অমলা!’ আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল যমুনার।

দ্রুত পা চালাল।

ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ধড়ফড়ানো গলায় ডাকল, ‘বউ, বউমা।’

কুড়ি

নারীর সহ্যক্ষমতা যে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি!

অমলা কোনও সাড়া দিল না।

বউয়ের সাড়া না পেয়ে যমুনার ভয় আরও বেড়ে গেল। অজানা আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠল।

থাপড় দিলে হাট হয়ে খুলে গেল দরজাটা। দেখল―বউ ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে। বিছানায় সুধারাম নেই। গলা বাড়িয়ে ইতিউতি তাকাল। কোথাও ছেলেকে দেখতে পেল না যমুনা। ভয় আরও চেপে ধরল। কী ব্যাপার! সুধা কোথায় গেল ? পায়খানায় যায়নি তো ? ওখানে যেতে গেলে তো রান্নাঘরের পাশ দিয়েই যেতে হয়। সুধাকে দেখেনি তো যেতে। সেই ভোরে জেগেছে সে। চোখেমুখে জল দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকেছে। পাকঘর থেকে ঘরের ভেতরকার অর্ধেকই দেখা যায়। ছেলে-স্বামী-বউয়ের গতায়াত সবই চোখে পড়ে। সে নিশ্চিত―সুধা ঘর থেকে বেরই হয়নি।

দ্রুত পা চালিয়ে তক্তপোশের নিকটে পৌঁছাল। ‘বউমা’ বলে গায়ে হাত দিতে গিয়ে দেখল―অমলার চোখ খোলা। চিত হলো অমলা। নির্বিকার মুখ। চোখ লালচে। বোঝা যাচ্ছে―কেঁদেছে। এখন জল নেই। শুকিয়ে গেছে। শুকালেও চোখের আশপাশে জলের ছাপ দৃশ্যমান। শরীরটা খারাপ করল নাকি ? জ্বর এসেছে ? তৎক্ষণাৎ রাতের ঘটনা মনে পড়ল। রাতের ঘটনাটা নিতে পারেনি বউ। সে নিজেও তো নিতে পারেনি সুধারামের মদ খেয়ে বাড়িফেরা! রাতের মধ্যে সে অনেকটাই ধাতস্থ হয়েছে। যদিও সুধার বাপ এখনও তেতে আছে। বলরাম রাতের ঘটনার কিছুই জানে না। রাতখাবার খেয়ে ক্লান্তদেহে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালেও কিছু জানায়নি বলরামকে। কষ্টের কথা কম মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ভালো। যমুনা ভেবেছিল―তার মতো অমলাও ধাতস্থ হবে। বিস্ময় ও ব্যথা―দুটোই কাটিয়ে উঠবে রাতের মধ্যে। নারীর সহ্যক্ষমতা যে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি! সর্বংসহা বলে যে তাদের!

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তো তা হয়নি। সে তো স্বাভাবিক হয়নি এখনও। কীরকম ভাবলেশহীন চেহারা। অমলা তাকিয়ে আছে ঠিক, কিন্তু দেখছে না তো কিছু। যদি দেখত, তাহলে পলকহীন উদাস চোখে এমন করে তাকিয়ে থাকত না তার দিকে।

কী জিজ্ঞেস করবে এখন সে বউকে ? তোমার কি শরীর খারাপ ? জ্বর এসেছে ? এমন চেহারা করে তাকিয়ে আছ কেন আমার দিকে ? বলছ না কেন কিছু ? না জিজ্ঞেস করবে―সুধারাম কোথায় ? তাকে দেখছি না যে!

থমমত চোখে অমলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকল যমুনা। ত্রস্ত চোখে খানিকক্ষণ অমলার মুখের দিকে তাকিয়েই থাকল।

বউয়ের পাশে তক্তপোশের ওপর আস্তে করে বসে অমলার গায়ে ডান হাতটি রাখল। অমলার ঝড়ো চেহারা দেখে সুধারামের কথা জিজ্ঞেস করতে সাহস করল না।

বুকটা অমলার শরীরের ওপর নামিয়ে যমুনা ডাকল, ‘মা, বউমা।’

অমলা চুপ করে রইল।

‘তোমার কষ্ট কুন জায়গায় আমি  বুঝি রে মা। আমিও যে তোমার মতো নারী। পুরুষের চরিত্তি আমার বুইঝতে বাকি নাই রে মা। সারা জীবন পুরুষেরা নিজেরা বিপথে চইলেছে। কিন্তুক বউয়েরে শাসন কইরে গেছে কড়া হাতে। আমার কপালখানা যা-ই হোক, তোমার কপালটা এমুন হওয়ার কথা না। সুধারাম, বলরামরে ছোডবেলা থেইকে কড়া হাতে শাসন কইরে গেছে তোমার শ্বশুর। কিন্তুক কেন যে সুধারাম বিপথে গেল, মদ খাইল, কুনুভাবেই বুইঝা উইঠতে পারতেছি না রে বউ!’

কথার মাঝখানে একটি কথাও বলল না অমলা। তার চোখে তখন জলের ধারা।

যমুনার আর সহ্য হলো না। অমলার কান্না, তার কষ্টেভাসা চোখ-মুখ যমুনাকে ব্যাকুল করে তুলল। জাপটে ধরে অমলাকে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। পা গুটিয়ে বসতে অসুবিধা হলো অমলার। যমুনা ধরে পুত্রবধূর পা দুটো তক্তপোশের পাশে ঝুলিয়ে দিল। দুই হাতের তালু দিয়ে অমলার চোখে গালে বোলাতে লাগল, এলোমেলো চুল পরিপাটি করতে থাকল।

আচমকা অমলা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার ছেলে কি আগে থেকেই এমন ছিল ? মদ খেত ?’

‘না না, নারে মা! আগে কুনুদিন সে মদভাঙ খায় নাই রে মা! মদমুত তো দূরের কথা পান-সিগারেটও কুনুদিন খায় নাই সে। আজ ক্যান যে এই কাম কইরল, জানি না রে ভগবান! এমুন দুমর্তি ক্যান যে তার হইল রে ঈশ্বর!’ বলতে বলতে নিজ কপালে করাঘাত করতে থাকল যমুনা।

শাশুড়ির এত আহাজারি সত্ত্বেও অমলার চেহারার তেমন রূপান্তর হলো না। আগের মতো কষ্টে-ছাওয়া মুখ তার। আসলে অমলা স্থির করতে পারছিল না―কী সিদ্ধান্ত নেবে ? যাকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছে, সেই সুধার চরিত্রের এইদিকটি সে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছে না। সুধারামের কথা সে যেদিন শুভময় চক্রবর্তীকে জানিয়েছিল, গুম মেরে বসে থেকেছিলেন তিনি। পরে নাম-ধাম-পেশা-ধর্ম-জাত এসব জেনে বলেছিলেন, ‘তুমি সুধারামকে বিয়ে করো না অমলা। ওই সমাজে গিয়ে তুমি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবে না। ওরকম সমাজের মানুষদের এমন কিছু ধাত আছে, যা তুমি মানতে পারবে না। কষ্ট পেতে হবে তোমাকে।’

‘সুধারাম বড় ভালো ছেলে। তার মধ্যে কোনও বদ-অভ্যাস নেই।’ চিবুক বুকে ঠেকিয়ে বলেছিল অমলা।

‘তুমি মোহের চোখে দেখছো বলে সুধারামের মধ্যে কোনও দোষ দেখতে পাচ্ছ না। তাছাড়া তোমাকে মুগ্ধ করবার জন্য সে ভালো মানুষের চেহারা নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াচ্ছে।’

সেদিন অমলার কী হয়েছিল কে জানে, জোর গলায় বলে উঠেছিল, ‘সুধারাম সম্পর্কে আপনার ধারণা ঠিক নয় ঠাকুর।’ শুভময় চক্রবর্তীকে ঠাকুর সম্বোধন করতে অমলাকে শিখিয়ে দিয়েছিল তার মা সুশীলা।

পাশে স্ত্রী দাঁড়িয়েছিলেন। হতাশ গলায় বলেছিলেন, ‘ওকে বুঝিয়ে লাভ নেই। প্রেমে অন্ধ হয়ে গেছে। বাধা দিলে কী অঘটন ঘটিয়ে বসে কে জানে!’

হাল ছাড়েননি শুভময় চক্রবর্তী। বাবা এই অমলাকে তার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাপমরা মেয়েটিকে দেখিস তুই বাবা। অবুঝ মেয়ে। ভুলটুল মাফ করে দিস। আগলে রাখিস।’

বাবা রাধামাধব চক্রবর্তীর কথা মনে পড়ে গিয়েছিল সে সময়। স্ত্রীর কথা উপেক্ষা করে বলেছিলেন, ‘অল্পবয়সে তুমি আমার বাসাবাড়িতে এসেছিলে অমলা। এখন বড় হয়েছ। নিজের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বুদ্ধিও তোমার হয়েছে। তারপরও অভিভাবক হিসেবে আমার যা বলার, বললাম তোমাকে। বাবাকে চিঠি লিখছি। তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত জানালে তারপর তুমি স্থির করো―সুধারামকে বিয়ে করবে কি করবে না।’

মাথা নিচু করে অমলা চুপ করে থাকলে শুভময় চক্রবর্তী আবার বলেছিলেন, ‘তোমার বিয়ের সকল খরচ আমি চুকাব―এরকমই শর্ত ছিল তোমার মায়ের সঙ্গে। বাবারও সেরকম নির্দেশ ছিল। সেই শর্ত মেনে তোমার বিয়ের খরচাদি আমি দেব অমলা। শুধু চিঠির উত্তর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।’

কিন্তু সুধারাম অপেক্ষা করতে দেয়নি অমলাকে। তার তর সইছিল না। তখন তখনই বিয়ে না করলে কর্ণফুলিতে ঝাঁপ দেবে―এমনই বুঝিয়েছিল সুধারাম। কম বয়সে প্রেমে উতলা হলে মানুষ দিগি¦দিক জ্ঞান হারায়। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে। অমলাও ভুল করেছিল। রাধামাধব চক্রবর্তী এবং মায়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করেনি। এক বিকেলে শুভময় চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল। চট্টেশ্বরী কালীমন্দিরে মালাবদল করে বিয়ে করেছিল সুধারামকে। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় লিখে এসেছিল―আমি নিজ ইচ্ছায় চলে যাচ্ছি। সুধারামকে বিয়ে করব আজ।

শুভময় খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন―সুধারাম নামের নাপিতের ছেলেটিকেই বিয়ে করেছে অমলা। গ্রামের বাড়িতে তা জানিয়ে দিয়েছিলেন।

আজ, এই মুহূর্তে শুভময় ঠাকুরের সেই কথাটি মনে পড়ে গেল অমলার―তুমি মোহের চোখে দেখছো বলে সুধারামের কোনও দোষ দেখতে পাচ্ছ না।

ডুকরে উঠল অমলা। চাপা থেকে গলা ছেড়ে। এ কান্না হঠাৎ কোনও কষ্টের জন্য নয়, এ কান্না বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না। এ কান্না শুভময় চক্রবর্তীকে অমান্য করার কান্না, এ কান্না সুধারামের মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরার কান্না, এ কান্না ভুল সিদ্ধান্তকে শুধরাতে না পারার কান্না।

যমুনা বলে যেতে থাকল, ‘কান্দিস না মা। মাফ কইরে দে মা।’

একুশ

লালশাড়ি পরা। আঁচলঠেলা স্তন।

স্তনের আধেক-দেখানো ব্লাউজ। নাভি-নামানো শাড়ি।

আসলেই সুধারাম কখনও মদ বা পান বা সিগারেট কোনওটাই খায়নি। কুসঙ্গই তাকে নষ্ট করেছে।

সেলুনে সকল বয়সের মানুষ আসে। বালক-কিশোর-বুড়ো। বেশি আসে তরুণরা। তারা শৌখিন। শৌখিনরা চুলের কাটিং, গোঁফের ডিজাইন, দাড়ির ধরন নিয়ে ভাবে খুব। গোঁফ আজ মোটা রাাখল তো কাল এসে বলল, আগাটা চিকন করে দাও, আজ চাপদাড়ি তো পরশু এসে বলল, ফ্রেঞ্চকাট করো। চুল আজ ঝাঁকড়া তো কাল বাটি-ছাঁটা। বালকদের আর প্রবীণদের এরকম বায়নাক্কা নেই। এক ছাঁটে তিন মাস। তরুণদের অস্থিরতাই সেলুনের আয়ের প্রধান উৎস।

সুধারামের সেলুুনেও তরুণদের আনাগোনা বেশি। তবে তারা সকালের দিকে তেমন ভিড় করে না। চাকরিতে যাওয়ার সময় বা গোত্তা খেতে, সেলুনে একবার ঢুঁ মারে। পকেটে যতই চিরুনি থাকুক, সেলুুনে ঢুকে গোঁফটা, চুলের ভাঁজটা ঠিক আছে কি না একবার দেখে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার ঘাড় কাত করে, আর ঘাড় সোজা করে চিকন চোখে নিজের দিকে কয়েকবার না দেখলে মনে শান্তি পায় না ওরা। ওদের আসল ভিড় সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে। লোকাল ছেলেরাই ভিড় করে বেশি। ওরা যত না চুল-দাড়ি কাটে, তার চেয়ে অধিক মারে আড্ডা।

এই আড্ডারই একজন, বশর তার নাম, সুধাকে বলল, ‘সকাল সইন্ধ্যা নদী পারাপার কইরাই যৌবন শ্যাষ কইরা দিলি হালার পুত।’

সুধারাম বশরের কথা বুঝতে পারে না। ফ্যালফ্যালে চোখে তাকিয়ে থাকে।

দশটা বেজে গেছে। সেলুুনে কাস্টমার নেই। আছে বশর, বাবলু, ভোলা আর জামাল। এই জামালের আলাদা পরিচয় আছে। শিপে চাকরি করত। যেবার জাহাজ লন্ডনের ফোর্টে গেল, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে গেল। বেশ ক বছর লন্ডনে ছিল। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে। ধরা পড়ল একদিন। জোর করে প্লেনে তুলে দিল। দেশে আসার পর জামালের নাম হয়ে গেল―লন্ডনি জামাল। এই জামালের পৈতৃক বাড়ি কুইশ্যাল খেতে। কুইশ্যাল মানে আখ। এদিককার মানুষজন আখকে কুইশ্যাল বলে।

একসময় এলাকাটা নিচু জমি ছিল। আখের চাষ হতো সেখানে। মানুষের কাছে এলাকাটা কুইশ্যাল খেত নামে পরিচিত ছিল। কালক্রমে স্থানটার চেহারা আগাপাছতলা বদলে যায়। নিচু জমি উঁচু হয়। বিল্ডিং হয় সারি সারি। স্থানটির চেহারা পালটাল ঠিক, নাম পালটাল না। ওই কুইশ্যাল খেতই থেকে গেল। ফিরিঙ্গিবাজার থেকে কুইশ্যাল খেত দূরে নয়। ফিরিঙ্গিবাজার রোড কুইশ্যাল খেতের রাস্তায় গিয়ে মিশেছে।

কুইশ্যাল খেত ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে গেলে জলিলগঞ্জ। আগে নাম ছিল গঙ্গাবাড়ি। সময় পালটাল। রাজনীতির হাওয়া ঘুরে গেল। মানুষের মনও বদলাতে শুরু করল। মন পালটানোর সঙ্গে সঙ্গে এলাকা, রাস্তা, জেলা, স্কুল, কলেজ―এসবের নামও পালটে যেতে থাকল। নবীন গড় হলো নবীনগর, প্রাণহরি একাডেমি হলো আমিন একাডেমি, লক্ষ্মীবাজার হলো সোলতান বাজার। যেটা ক্ষিতিশচন্দ্র রোড ছিল, তা হলো কামালউদ্দিন রোড। যে নামগুলো পালটানো সহজ হলো না, তা ঢুকিয়ে দেওয়া হলো এবিসিডি―এসব ইংরেজি বর্ণের মধ্যে। নারায়ণগঞ্জ হলো এন. গঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ডাকা হতে লাগল বি. বাড়িয়া নামে। আর কলেজগুলোর নামও ওইভাবে ইংরেজি বর্ণমালার কুহকে বন্দি হলো―এমসি কলেজ, বিএল কলেজ, বিএম কলেজ, পিসি কলেজ ইত্যাদি।

গঙ্গাবাড়িও রেহাই পেল না, হয়ে গেল জলিলগঞ্জ। কর্ণফুলির উত্তরপার ঘেঁষেই জলিলগঞ্জ। একসময় চর এলাকা ছিল। ওই জলিলগঞ্জে বেশ কয়েকটি জেলেপাড়া। বহু পুরুষ পুরোনো। নদীতে মাছ ছিল বলে জেলেপল্লিগুলোও নদীপারঘেঁষা। এখন জলিলগঞ্জে কসমোপলিটন জীবন। হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টানেরা থাকে।

আলোর নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, ওই জলিলগঞ্জেরও তেমনি অন্ধকার দিক আছে। মদের ঠেক আছে ওখানে। ভোলা, বাবলু, বশর, লন্ডনি জামাল ওই ঠেকে আসে-যায়।

‘কী রে, আমার দিকে ভ্যাবলা চোখে তাকাইয়া রইছস ক্যান ? কী কইতেছি বুইঝতে পারতেছ না ?’ সিগারেটে টান দিয়ে মুচকি মুচকি হাসে বশর।

দু দিকে মাথা নাড়ে সুধারাম।

‘প্রতিদিন এক জায়গায় কী আনন্দ পাস রে সুধা ?’ পিঠে মৃদু থাপ্পড় মেরে লন্ডনি জামাল বলে। চোখে তার কু-ইঙ্গিত। ইঙ্গিতটা যে তার বউকে লক্ষ করে করেছে জামাল, বুঝে ফেলে সুধারাম।

তাড়াতাড়ি বলে, ‘আমার যাওনের সময় হইয়া গেছে। আইজ তোমরা যাও। যাইতে হইবে সেই নদীর ওইপারে।’

‘সেই জন্যই তো কইতেছি―চিন-পরিচয়ের জায়গায় এত তাড়াতাড়ি যাওনর দরকার কী ? যার কাছে যাবি, সে তো আর পলাইয়া যাইতেছে না! তোর ঘরেই তো থাকবে! তাড়াতাড়ি গেলেও পাবি, দেরিতে গেলেও পাবি। আজ একটু দেরি কইরেই বাড়িত যা দোস্ত।’ ভোলা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল।

‘দেরি কইরে বাড়িত যামু মাইনে!’ অবাক জিজ্ঞাসা সুধারামের।

বাবলু খপ করে সুধারামের হাতটা ধরে ফেলল, ‘চল, আজ তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।’

ঝটকা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সেলুন বন্ধ করতে থাকল সুধারাম। এই সময় ভোলা-বাবলুরা কিছু বলল না। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। চাবিটা পকেটে রাখার সঙ্গে সঙ্গে ভোলা বলল, ‘চল না দোস্ত। তোরে কোনও খারাপ জায়গায় নিমু না। একটা মজার জায়গা দেখাইতে নিমু। দেইখ্যা চইলে আইসবি। বড় জোর পনরো মিনিট।’

মজার জায়গা দেখার জন্য সুধারামেরও ইচ্ছে জাগল একটু। এরা তার বহুদিনের পরিচিত। নিশ্চয়ই ওরা তাকে কোনও খারাপ জায়গায় নিয়ে যাবে না। পান-সিগারেট খায়, খিস্তি করে। ওইটুকুই। তার চেয়ে খারাপ কিছু তো করে না! গিয়েই দেখি না! কোথায় নেয় তারা, দেখি!

সুধারাম তো আর জানে না―ভোলা-জামালরা নিয়মিত মদের ঠেকে যায়।

ওরা তাকে জলিলগঞ্জের মালতির ঠেকে নিয়ে গিয়েছিল, সে রাতে।

সুধারামের রা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ কোন জায়গায় নিয়ে এল ওরা তাকে ?

হেলানো চালের একটা রুম। এখানে-ওখানে তিন-চারটে হাইবেঞ্চি। পাশে বসার উঁচু টুল। সবসুদ্ধ সাত-আটজন বসে আছে। প্রত্যেকের সামনে মদের গেলাস। বাংলা মদের। চল্লিশ পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছে। রুমের মধ্যে আলোর চেয়ে আঁধার বেশি। কোনার দিকে গোলমতন একটা টেবিল। নিচু পায়া। টেবিলের ওপাশে এক নারী। পঁয়তাল্লিশ-সাতচল্লিশ। কাজল কালো। লালশাড়ি পরা। আঁচলঠেলা স্তন। স্তনের আধেক-দেখানো ব্লাউজ। নাভি-নামানো শাড়ি। যৌবন-চিকচিক কোমর। মালতি জানে―মদ তার মূলধন নয়, ওই ব্লাউজফাটানো বুক দুটো, চেকনাই কোমরই তার ব্যবসার আসল মূলধন। কাস্টমাররা ওসব দেখে আর চুকচুক করে মদের গেলাসে চুমুক দেয়।

মদোরা জানে―মালতিকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না।

‘কোথায় লইয়া আইছ আমারে ?’ বলে পেছন ফেরে সুধারাম। ডান হাত চেপে ধরে ভোলা, ‘যাও কই ? এতদূর আইলা, ভেতরমহলটা দেইখ্যা যাইবা না ?’ টেনে সুধারামকে ঘরে ঢোকাল ভোলা।

‘আমাকে যাইতে দে ভোলা।’ কঠিন গলায় বলল সুধারাম।

‘যাইতে দেওনর মাইরে চুদি। এক গেলাস খাইয়া তারপর বাইর হবি।’ বশরের কথায় ঝিমধরা মদোরা একবার চোখ তুলে তাকাল।

ঝনঝনে গলায় মালতি বলে উঠল, ‘কোনও হাঙ্গামা করবে না বশর। হইচইয়ের জায়গা নয় এটা।’

‘জানি তো মালতিদি।’ সুধারামকে দেখিয়ে বলল, ‘আমাদের ফ্রেন্ড। লইয়া আইছি। মদ খেতে চায় না। তুমি এক গেলাস সুধা ভইরে দেও তো সুধারামের জন্য।’

খিলখিল করে হেসে উঠে মালতি, ‘ওর নাম বুঝি সুধা! আহা, কী জুতসই নাম! সুধারামকে নিয়ে এসেছ সুধাভান্ডারে!’ মালতির ঠেকের কোনও নাম না থাকলেও মদোরা যে একে সুধাভান্ডার বলে, জানে মালতি।

সেই রাতে মদ খাওয়ার হাতেখড়ি হয় সুধারামের।

তারপর থেকে মাঝেমধ্যে আসে। এক-দেড় গেলাস খেয়ে বিদায় হয়।

অমলা মুখে গন্ধ পায়। একদিন জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘ও কিছু না। জর্দার গন্ধ। বন্ধুদের চাপে জর্দা দিয়া পান খাইছি একটা।’

তারপর তো এক রাতে বেহেড মাতাল হয়ে বাড়িফেরা, সুধারামের।

বাইশ

কিন্তু অমলা আর যমুনা জানে না, তাদের

জীবনানন্দ দেখে নিয়তি আপনমনে হাসছেন।

এক মাস ধরে পালিয়ে পালিয়েই থাকল সুধারাম, বাপের সামনে থেকে। গভীর রাত করে ফেরে। অতি ভোরে বের হয়ে যায়। প্রথম কদিন না-খেয়েই বেরিয়ে গেছে।

যমুনার প্রাণ কাঁদে। আহারে, ছেলেটা না খেয়ে যায়! হাজার হলেও মায়ের প্রাণ! এক রাতে ভাতপাতে, অন্যরা তখন ঘুমিয়ে, যমুনা বলে, ‘কাইল থেইকে জলখাবার না খাইয়া বাইর হবি না সুধা।’

শরমিন্দা চেহারাটা মায়ের দিকে সুধারাম তুলে বলে, ‘বাবা…!’

‘তুই ভাবিস না। তোর বাপ উডনর আগেই তোরে খাবার দিমু।’

‘মা, বাবার রাগ কি কমে নাই ?’ ভাত মাখতে মাখতে জিজ্ঞেস করে সুধারাম।

‘চোখমুখ দেইখা তো আর বুঝা যাইতেছে না! তবে রাগ একটু কমছে বইলে মনে হয়। তুই এমুন একখান কাম কইরলি সুধা! বউয়ের চোখের দিকে তাকাইতে পারি না।’

সুধারাম শুকনো মুখে বলে, ‘আমারে মাফ কইরে দেও মা।’

‘আমার কাছে মাফ চাইয়া কী হইব রে বাছা! বউয়ের কাছে মাফ চাইছস কি না বল। পোয়াতি বউটা বড় কষ্ট পাইছে রে সুধা!’

সুধা ভাতের থালার দিকে আরও ঝুঁকে পড়ে বলে, ‘অমলা খুব অভিমানী মা। কত বুঝাইছি তারে! হাত ধইরে মাফ চাইছি। কুনু কথা কয় না। পাতলা একটু হাসে। সেই হাসিতে কষ্ট লাইগা থাকে মা। আগের মতো আমার লগে কথা কয় না। না বইল্লে নয়, এমন দুই একটা কথা বলে শুধু।’

‘আমি কী আর বইলব সুধা! অপরাধ কইরেছিস তুই, মাফ চাইয়া বউয়েরে স্বাভাবিক করনর দায়ও তোর।’

ভাত খাওয়া শেষ হয়। সুধারাম শোবার ঘরে আসে। অমলা তখন পাশফেরা। পাশে শুয়ে পেছন থেকে অমলাকে জড়িয়ে ধরে সুধারাম। ‘অমলা, এই অমলা।’

প্রথমবার কোনও জবাব দেয় না অমলা।

সুধারাম আবার বলে, ‘অ্যাই অমলা, ঘুমালে ?’

বহুদূর থেকে অমলার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, ‘উঁহু।’

টেনে নিজের দিকে ফেরায় অমলাকে, ‘এতদিন হইয়ে গেল! এতবার এত কইরে মাফ চাইলাম তোমার কাছে! আমারে ক্ষমা কইরে দেও না। আমার ভেতরটা যে জ্বইলে যাইতেছে অমলা!’

ছল ছল চোখে অমলা বলে, ‘তুমি মদ খেলে!’

‘এই তোমার মাথায় হাত রাইখা কইতেছি, আর কুনুদিন মদ খামু না।’

‘ঠিক বলছো ?’

‘সইত্য বইলতেছি অমলা। তুমি আমারে ক্ষমা কইরে দেও।’

পরদিন সকালে বড় তৃপ্তি নিয়ে সেলুনে গেল সুধারাম।

সেদিন সকালের আলোটা অন্যরকম লাগল অমলার চোখে। কী রকম নরম নরম! আঁজলা ভরে সেই আলো মুখে মাখতে ইচ্ছে করল তার। ঘরদোর-উঠান-শ্বশুর-শাশুড়ি―সব কিছুকে, সবাইকে নতুন করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করল।

বউয়ের তৃপ্তিমাখা চেহারাখানা দেখে যমুনার বড় ভালো লাগল। ভাবল―তার রাতের কথায় কাজ হয়েছে। সুধাকে বোঝানোরই ফল। নিশ্চয়ই সে রাতের বেলা বউয়ের দুঃখ ভুলিয়েছে। যে কোনও ভাবে বউয়ের মনে আগের বিশ্বাস আর ভালোবাসা ফিরিয়ে এনেছে।

‘আইস মা, আইস।’ অমলাকে রান্নাঘরের দরজায় দেখতে পেয়ে আহ্বান জানায় যমুনা।

অমলা জলচৌকিটা টেনে শাশুড়ির পাশে বসতে বসতে বলে, ‘বাবা খেয়েছে ? বলরাম ?’

‘খেয়েছে। বলরাম খেয়ে দোকানে চইলে গেছে। তোমার শ্বশুরও খাইছে।’ তারপর গলায় হাসির রেশ ছড়িয়ে বলে, ‘বলরাম আইজ পানিভাত খায় নাই। বলে কী, মা, আইজ আমি রুটি-তরকারি খামু। তারপর কয় কি জানো, কয়―কতদিন হইয়া গেল বউদিরে হাসিখুশি দেখি না!’

শাশুড়ির কথায় অমলা হেসে ফেলে। দু হাতের তালু দিয়ে মুখটা ডলে বলে, ‘বলরাম আমাকে পছন্দ করে মা, ভালোবাসে।’

‘ঠিক বইলেছ। সংসারের ঝামেলায় সে ঢুকে না ঠিক, কিন্তুক সকল কিছুর উপর নজর রাখে। একদিন আমারে জিগায়―বউদির কী হইয়েছে মা। সারাদিন কেমন যেন চুপচাপ থাকে! আগে তো বউদি এমুন ছিল না! আর দাদারেও তো দেখি না তেমন! ঠিকঠাক বাড়ি আইসে না নাকি ? কী জবাব দিই আমি, কও তো বউ।’

নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দেয় যমুনা, ‘বলি―বউয়েরে কখন আবার চুপচাপ দেইখলি তুই! সারাদিন তো আমার লগে লগে থাকে বউ। তারে তো মনমরা দেখি নাই। তোর শুধু শুধু মনে হইয়েছে বলরাম। বউমা ঠিকই আছে। আরও কইছি কি জাননি ? কইছি―অখন শরীর খারাপ। মাইয়া মানুষের জীবনসংকটের সময়। পরথম পোয়াতি। মনের মইধ্যে একটু-আধটু ডর যে ঢুকে নাই, তা তো নয়!’

‘আর দাদা। তারে তো আগের মতো ঘরে…!’ কথা অসমাপ্ত রাখে বলরাম।

‘এর উত্তরে ডাঁহা একখান মিছা কথা কইছি। বইলছি―অখন নাকি কাস্টমারের চাপ অনেক বাইড়া গেছে। সকালে তাড়াতাড়ি চইলে যায়। আইসতে আইসতে রাইত-দুপুর হইয়া যায়।’ অনুচ্চ কণ্ঠে গরজায় যমুনা, ‘হারামখোর, নিজে কইরেছে অপরাধ। ভূরি ভূরি মিছা কথা কইতে হইতেছে আমারে!’

মাথা নিচু করে থাকে অমলা। তার বুক চিরে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। শাশুড়ির দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবার মনের অবস্থা কেমন ?’

‘বাবা, মাইনে তোমার শ্বশুরের কথা বইলছ তো ? তিরিশ বছর এই লোকটার সঙ্গে সংসার কইরতেছি বউ, ঠিকমতো বুইঝে উইঠতে পারি নাই তারে। একখান কথা বুইঝেছি―বড় রাগী মানুষ। রাগ মাথায় উইঠলে হুঁশজ্ঞান হারাইয়া ফেলে।’

‘সেই রাতে দেখেছি। বাবাকে আগে কখনও এমন চেহারায় দেখি নাই।’

খাবারের থালা বউয়ের সামনে এগিয়ে দিতে দিতে যমুনা বলে, ‘এখনও গর্জায়। ফোঁসে। কখন যে আবার কী অঘটন ঘটাইয়া বসে কে জানে!’

‘তুমি বোঝাও না। রাগ ত্যাগ করতে বলো না। বলো না―ছেলে অপরাধ একটা করেছে, মাফ করে দাও না তাকে।’

‘বলি না আবার! বলি―ছেইলে-মেইয়ে দোষ কইরবে। মা-বাবাও রাগ-শাসন কইরবে। সেই রাগ শরীরে পোষণ কইরে রাখন ঠিক নয়। তুমি রাগ কমাও সুধার বাপ। সুধারে শুধরাবার সুযোগ দেও।’

ক্লিষ্ট হেসে অমলা শুধায়, ‘বাবা কী বলে ?’

‘বলে, রাগ তো গ্রীষ্মের গরম নয় যে বরফ দিয়া ঠান্ডা করি। রাগ মনের ব্যাপার। মন যেদিন চায় শান্ত হইবে, না চাইলে রাগ থাইকবে।’

‘শুনে তুমি কী বললে ?’

যমুনার চোখে-চেহারায় একটু শরম শরম ভাব, ‘মাথায়-গায়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে কইলাম―তোমার জনমের ছেইলে। নিজের পোলার উপর কতদিন আর রাগ কইরে থাকবে ? লক্ষ্মী আমার, রাগ কমাও।’

‘তো তোমার লক্ষ্মীটা কী কইল ?’ বলে গলা ছেড়ে হেসে উঠল অমলা।

‘ধুর বেটি! চুপ কর।’ নিজেও পুত্রবধূর হাসির সঙ্গে কণ্ঠ মিলাল যমুনা।

বহুদিন পর যমুনার রান্নাঘর আগের মতো আলোকময় হয়ে উঠল। আকাশ থেকে ঘন মেঘ সরে গেলে যেমন গোটা পৃথিবী আলোয় ঝলমল করে ওঠে, অমলা-যমুনার জীবনটাও তেমনি সেই সকালে আনন্দালোতে ভেসে যেতে লাগল।

কিন্তু অমলা আর যমুনা জানে না, তাদের জীবনানন্দ দেখে নিয়তি আপনমনে হাসছেন। বলছেন―তোমাদের এই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হবে না। অচিরেই তোমাদের জীবনে, সুধাংশুর তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসারে বজ্রাঘাত নেমে আসবে।

সেই রাতে সুধারাম অমলার মাথা ছুঁয়ে শপথ করেছিল―জীবনে কোনওদিন আর মদ খাবে না। সেই শপথ বেশ কয়েক মাস রক্ষা করতে পেরেছিল সুধারাম।

কিন্তু একদিন তার সেই প্রতিজ্ঞা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

ভোলা বলেছিল, ‘জানি, তুই আর কখনও মদ খাবি না। তোরে মদ খাইতে আর কমুও না। কিন্তুক মালতিদি বেশ কইরে কইল―কী রে সেদিনের কচি ছেলেটা, কী যেন নাম ? সুধা। সুধা আসে না কেন ইদানীং ? ওকে নিয়ে এসো। তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। অখন তুই-ই ঠিক কর কী কইরবি ?’

ভোলার কথা শুনে সুধার মনটা আনচান করে উঠল। মালতির ব্লাউজফাটানো স্তন, কোমরের চেকনাই, মিষ্টি হাসি―এসব মনে পড়ে গেল।

বলল, ‘চল, আজই যামু।’

সেই থেকে সুধারাম আবার মদ খাওয়া শুরু করল। তবে মাত্রায় কম। খাওয়ার পর পান খেয়ে, লং-এলাচি চিবিয়ে মুখের মদোগন্ধ দূর করে। ভালো মানুষের মতো মুখ করে অমলার সামনে হাজির হয়।

অমলা কিছু বুঝতে পারে না।

অমলা দু হাত তুলে ভগবানের উদ্দেশে বলে, ‘ঈশ্বর, আমার স্বামীকে ভালো রেখো।’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button