
ছবি থেকে নিজেকে কেটে ফেলার পর মাঝখানের ফাঁকা অংশটা খুব অদ্ভুতুড়ে দেখায়। কিছুটা লিওয়ের মতো। হ্যাংলা, ফরফরে ফাঁপা অবয়ব। চারপেয়ে লিও এখন মাটির নিচে। ওকে কবর দেওয়ার দিন খুব কেঁদেছিল তানি। বাবা কবরের ওপরে একটা টগরের ডাল গেঁথে বলেছিল লিও ফুল হয়ে ফুটবে। সত্যি সত্যি একদিন সবুজ সবুজ পাতা গজিয়েছিল ডালে। তানিকে অপেক্ষায় রেখে রেখে ডালটা গাছ হয়েছিল, কলিও এসেছিল গাছের ডালে ডালে। কিন্তু লিও ফুল হয়ে ফোটেনি।
লিওকে দেখার জন্য তানি ফাঁক পেলেই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াত। বাসার বাইরে একটা বড় গাছের নিচে ছিল লিওর কবর। গাছটার নাম জানে না তানি। জানে সবুজ সবুজ পাতায় ভরা দেহটায় অনেক মায়া। মাটিতে শায়িত লিওকে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে গাছটা কেমন আগলে রাখত। বৃষ্টি, ঝড়ও ওকে কষ্ট দিতে পারত না।
হুট করে একদিন ঐ বাসা ছেড়ে এসেছিল ওরা। তানি সেদিনই প্রথম জেনেছে মানুষ আর গাছের মধ্যে অনেক পার্থক্য। গাছ স্বেচ্ছায় বাসস্থান বদল করে না। মানুষ করে। প্রিয়জনের কবরের ওপরে নিজের হাতে লাগানো ঝোপালো টগর গাছও ছেড়ে আসতে পারে মানুষ। নতুন করে নতুন স্থানে বাড়ি-ঘর সাজাতে পারে।
শূন্য ঘরে একা থাকতে এখন আর ভয় করে না তানির। আগে রোজ রাতে ডার্টি ভূত আসত। বাবা বলত, রাক্ষসখোক্ষসের নাকের কাছে দুটো মরিচপোড়া ধরলেই ওরা ভয় পেয়ে পালায়। বাবার আজগুবি কথা শুনে তানি হাহা হিহি শব্দে হাসত আর ভূতের ভয় পালাত। যদিও বাবা ঘর ছাড়তে না ছাড়তেই ভয়ের সঙ্গে ওরাও ফিরে আসত।
জানু খালা বলে, রাত-বিরাতে তেনাদের নাম নিতে নেই। নাম নিলেই তেনারা এসে হাজির হয়। সুযোগ বুঝে ঘাড় মটকে দেয়। খালাদের বস্তির একটা মানুষের ঘাড় মটকে গেছে গত বছর, খুব পালোয়ান ছিল লোকটা। রোজ রাতে ঘরে ফিরে বউ পেটাতো। তানি জানু খালার ভূতের ঘাড় মটকানোবিষয়ক গল্প শুনে বলেছে, ভূত-টুত কিছু না। লোকটার বউই শোধ নিয়েছে। সুযোগমতো একলা পেয়ে দুষ্ট লোকটার ঘাড় মটকে দিয়েছে। তানির কথা জানু খালা বিশ্বাস করেনি মোটেও। তানিও খালার কথা বিশ্বাস করেনি। আর এসবে তানির বিশ্বাস নেই বলে ভয়টাও আর নেই।
এখন অন্ধকার স্তূপীকৃত ফাঁকা ঘরেও একা থাকতে পারে তানি। শুয়ে শুয়ে টের পায় কিছু প্রাণি হরহামেশাই জেগে থাকে। পায়চারি করে পথে। ক্ষণে ক্ষণে শোরগোল তোলে। ওরা রাতের পাহারাদার। ডগিটার মতো। লিও কিন্তু ডগিটার মতো ছিল না। সন্ধ্যা এলেই বাদামি পশমের আদুরে লিও ঘুমানোর জায়গা খুঁজত। ঘুমকাতুরে লিও ফাঁক বুঝে তানির ঘাড়ে মুখ গুঁজে ঘুমাত, আয়েস করে নরম নরম পা তুলে দিত ওর শরীরে।
তানি এক পা ভাঁজ করে আরেক পা পাশবালিশে তুলে দেয়। ওকে এই ভঙ্গিমায় শুয়ে থাকতে দেখলেই মা হৈহৈ করে উঠত। বলত, ‘কী বিচ্ছিরি করে ঘুমাস তুই!’ আগে মায়ের বকা শুনলে কান্না উথলে উঠত তানির ভেতরে। তখন পড়ার ঘরের জানালার কাচে ঠুকঠুক করা শালিকের সঙ্গে নিজের দুঃখগুলো ভাগ করতে করতে খাওয়ার সময় পেরিয়ে যেত, অভিমানী তানি মায়ের ডাকে সাড়া দিত না।
এখন শালিক আসে না কার্নিশে। তানি এখন মাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বিছানায় বিচ্ছিরি করে শুয়ে থাকে। এখন মা বকে না, শাসন করে না। মা এখন খুব সাবধানি। তানিকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য এখন ভীষণ সচেতন থাকে মা। অথচ যেসব কষ্ট মায়েরা দেয় তানির খুব সেসব কষ্ট পেতে ইচ্ছে করে।
চোখ খোলে তানি। দেখে দরজার কাছে একটা শরীর দাঁড়িয়ে আছে। তানি ওঠার ভঙ্গি করতেই নড়েচড়ে ওঠে শরীরটা। কে… কে… ডেকে উঠতে গিয়েও তানি অস্পষ্ট অবয়বের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা স্বপ্ন দেখতে চায়। স্বপ্নে এই শরীর মায়ের শরীর হয়।
বাবা অফিস থেকে ফিরেছে তাই মায়ের গালে সোনালি আভা খেলা করছে। ‘আজকের চা আমি বানাই’ বলে রান্নাঘরে চায়ের পাতার কৌটা উলটে দিয়েছে বাবা। মাকে দেখে যেমন করে সিগারেটের ধোঁয়া লুকায় তেমন করে নিজের অপকর্ম আড়াল করতে চুলার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছে। শুকনো পাতার ঘ্রাণে ভেজা বাতাস ম ম করছে। মায়ের বকুনি শুনে বাবা-মেয়ে চোখে চোখ মিলিয়ে হাসছে।
স্বপ্নের ঘ্রাণ মিলিয়ে গেলে দুপুরে শোনা কথাটা মনে পড়ে তানির, ‘কী রে তোর মা এখন তোরে নেয় না ?’
আত্মীয়-স্বজনের টীকা-টিপ্পনীর শুরু হয়েছে অনেক অনেক দিন আগে থেকেই। দিন না, এর ভেতরে তিন তিনটা বছরও কেটে গেছে। যদিও ফেসবুকে মায়ের বিয়ের ছবি আপলোড দেওয়ার পর পরই এদের ভেতরে বেশ সাড়া পড়ে গিয়েছিল।
‘কেমন মহিলা, স্বামীকে অপবাদ দিয়ে ঘর ছাড়ল। তলে তলে সে তো নিজেই সিঁদ কেটে রেখেছিল। দ্যাখো গিয়ে ঐ লোকের সঙ্গে ভাব ছিল আগেই। মাঝখানে লোক দেখানো সব ন্যাকামি করল, কোর্ট-কাচারিও বাদ রাখল না। আহারে কী নাজেহালই না করল আমাদের ছেলেটাকে। আর রনকই বা কেমন, বিয়েশাদির নাম নাই এখনও। ওর তো বিয়ে করা উচিত, ঐ মহিলাকে শিক্ষা দেওয়া উচিত।’
এরপর কোথা থেকে ওরা অরণির জন্মের খবর পেয়েছিল কে জানে। মা তো ফেসবুকে অরণির একটা ছবিও পোস্ট করেনি। বিয়ের ছবির মতো মাকে কেউ কোনও ছবিতে ট্যাগও করেনি। তবু একটা ঝড় উঠেছিল চারপাশে। এখনও সেই ঝড় থামেনি।
কেউ কেউ তো রেগে গিয়ে তানির বাবার জন্য পাত্রীও দেখছে। যেন বাবার আগে মা বিয়ে করে সংসার পেতে বাবাকে মস্ত বড় লজ্জার ভেতরে ফেলে দিয়েছে। দুপুরে শিলা ফুপু সেই লজ্জা কাটানোর জন্যই এসেছিল। মায়ের রেখে যাওয়া নীল রঙের একটা ঢাকাই জামদানি নিজের ঢোলমার্কা ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বলেছিল, ‘কতদিন আর শোকে শোকে থাকবি তুই ? ঐ মেয়ে দিল তো তোর থোঁতা মুখ ভোঁতা করে। শোন ভালো একটা মেয়ে পেয়েছি। যেমন বংশ তেমন চরিত্র। তানিকে মায়ের আদর দিয়েও পালবে।’
বাবা আঁতকে উঠে ফুপুর দিকে তাকিয়েছিল।
‘কী শুরু করলি! মেয়ের সামনে এসব বলিস না তো।’
‘ক্যান রে ওরও তো সব জানা দরকার, বোঝা দরকার। আর ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ের বুঝদার না হয়ে কোনও উপায় আছে বল ?’
তানি ফুপুর কথা শুনে বাবার মতো চমকে ওঠেনি। ব্রোকেন ফ্যামিলি শব্দটা ওর খুব চেনা। মান্নান স্যারের ব্যাচে পড়তে আসা পল্লব নামের কোঁকড়া চুলের লম্বামতো ছেলেটাও ব্রোকেন ফ্যামিলির। সবার আগে এলেও ছেলেটা একদম শেষের সারির বেঞ্চে বসে। মুক্তা একদিন তানির কানে কানে বলেছিল, পল্লব ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে তো, তাই ক্লাসের সবার সঙ্গে মিশতে পারে না। কিন্তু তানি আগে পৌঁছে গেলে প্রথম সারিতেই বসে। মুক্তা জানে না তানির ফ্যামিলিও ব্রোকেন।
‘বুঝছিস এখন থেকে সতর্ক না হলে মস্ত বড় ভুল হয়ে যাবে। নাটক-সিনেমায় দেখিস না কী করে ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলেমেয়েরা ড্রাগ অ্যাডিক্টেড হয়ে যায়।’
ব্রোকেন তানি নড়বড়ে শরীরেই ছুটে পালিয়েছিল ফুপুর সামনে থেকে। এতদিন হয়ে গেল তবু তানি পালিয়ে যায়। মায়ের মতো পাহাড়ের সামনে অটল দাঁড়াতে পারে না। তানির মা পাহাড় ঠেলতেও পারে। পাহাড় সরাতেও পারে। তানি পারে না। বুকে পাহাড় গেঁথে অন্ধকারের সঙ্গে ভাব করে শুধু। মাঝেমাঝে স্থির অন্ধকার মুখের কাছে ঝুঁকে আসে। যেন তানির মনের খোঁজ নিতে চায়। তানি চুপ করে ডুব দেয় অন্ধকারে, কেউ জানে না ওর মনের খবর।
লিওর মতো বালিশে মুখ গোঁজে তানি। বুকের ভেতরে চুপ চুপ গুম গুম করে থাকা ভয়টা নড়েচড়ে ওঠে―মায়ের বিয়ের মতো ওকে একদিন বাবার বিয়েও দেখতে হবে।
২
প্যান্টিতে রক্তের দাগ দেখে চমকে যায় বহ্নি। নাহ ওকে তো জোর করেনি পাভেল। রাতের পুরো দৃশ্যটা এক ঝলকে মনে করার চেষ্টা করে। হ্যাঁ কিছু একটার কমতি ছিল যেন। নেই, কিছু একটা নেই মনে হচ্ছিল বারবার। এই নেই নেই করে করেও পাভেলের দেহের ভেতরে ও নিজেকে ছেড়ে দিয়েছিল। শ্লীলতার গণ্ডি পেরিয়ে বহ্নির দেহ হয়তো কোনও গোপন চাপ কাটাতে চাইছিল। ক্রমশ নাজুক হতে থাকা সম্পর্কটা শরীরী সুতোয় বাঁধা পড়ে টান খেয়ে গিয়েছিল একটা পর্যায়ে। পাশে নেতিয়ে পড়া পাভেলের নগ্ন শরীরটা চোখে অস্বস্তি জাগাচ্ছিল।
পুরুষ দেহের একরোখা আর ঔদ্ধত্যপূর্ণ সৌন্দর্য পছন্দ করে বহ্নি। স্বামী-স্ত্রীর শরীরী কসরতের সময়ে লুকোচুরির সব ধাপ পেরিয়ে গেলে শরীর যে কতটা বাক্সময় আর সুন্দর হয়ে উঠতে পারে তা ও একজনকে দেখে জেনেছে, বুঝেছে। এই একজন বহ্নির জীবনের প্রথম পুরুষ। পাভেল দ্বিতীয়। শরীরী সৌন্দর্য নিয়ে পাভেলের ভেতরে কোনও ভাবনা কাজ করে না। এইসব ক্লিশে ভাবনা মগজে ঠাঁই দেওয়ার মতো আবেগপ্রবণ পুরুষ সে না। তাই সঙ্গমের ক্ষণ শেষ হলে নিজের বেঢপ শরীরটাকে আরও বেঢপভাবে উন্মুক্ত করে চটজলদি ঘুমিয়ে পড়ে পাভেল। এরপর যথারীতি কুৎসিত ভঙ্গিতে নাক ডাকতে শুরু করে। দৃশ্যটা বহ্নির পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে রাত যত গভীরই হোক না কেন ঐ মুহূর্তে জামাকাপড় সামলে নিয়ে ও বাথরুমে ঢুকে ইচ্ছেমতো পানি ঢেলে গোসল করে। এরপর পরিচ্ছন্নতার তৃপ্তি নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে যায়।
প্রবল অস্বস্তি নিয়ে বহ্নি বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। এই ফ্ল্যাটের বারান্দা একেবারে ছোট। একটাই বারান্দা, বলতে গেলে এক চিলতে জায়গা। ইচ্ছেমতো হাঁটার উপায়ও নেই। তবু সকাল সকাল এখানে খোলা হাওয়া গড়াগড়ি খায়, দুপুরের দিকে ঝকঝকে রোদও উপচে ওঠে। কোলাহলহীন বারান্দায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর ফুরসত দেয় না অরণি। বিছানায় বসেই কান্না জুড়ে দেয়। ঘুম ভেঙে তার মাকে চাই প্রথমে। এখনও কান্না জুড়েছে মেয়ে। বহ্নি দৌড়ে ঘরের ভেতরে যায়।
সারাদিন ঘর, বারান্দা, বারান্দা, ঘর আর অরণি অরণি করে সময় কেটে যায় বহ্নির। অরণির জন্মের পর ব্যস্ততার অর্থ যেন নতুন করে বুঝতে হচ্ছে। ভুলেই গিয়েছিল কী করে ন্যাতা ন্যাতা ঐটুকুন তানিকে কোলে করে এতটা বড় করেছিল। যেদিন জন্মাল মেয়েটা এই দুই হাতের তালুতে দিব্যি এঁটে যেত। মনে আছে সেদিন হাসপাতালে যাওয়ার কোনও পূর্বপ্রস্তুতিই ছিল না ওর আর রনকের। স্কুল থেকে ফিরে কবে মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করবে তা ভাবতে ভাবতে শরীরে পানি ঢালছিল বহ্নি। হঠাৎ পানি ভেঙে গেল। বাথরুমের পিচ্ছিল মেঝে পেরিয়ে দরজার বাইরে মুখ রেখে ও বহু কষ্টে রনকের নাম ধরে ডেকেছিল। মাথায় ছিল না ঐ সময়ে রনক বাড়ি থাকে না। এরপর কী করে বাথরুমের বাইরে এসেছিল মনে নেই। পরে শুনেছে প্রতিবেশী বন্যা আপা ছুটে গিয়ে সিএনজি ডেকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিল বহ্নিকে। রনক যখন হাসপাতালে এসেছিল তখন সি-সেকশন শেষে বহ্নি ঘুম ঘুম ঘোরে আর তানি ওর নানির কোলে চুপটি করে ঘুমিয়ে ছিল।
মেয়েটা এখন এমনভাবে ঘুমায়, যেই পাশ ফিরে শোয় সেই পাশ ফিরেই ঘুম থেকে ওঠে। অথচ একটা বয়সে বিছানায় কেমন হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাতো তানি, বহ্নি দেখলেই হৈ হৈ করে উঠত। সব শাসন বারণ এখন কেমন আলগা হয়ে গেছে। মেয়েটাকে এখন চড়া স্বরে কিছুই বলে না বহ্নি। বলতে পারে না। মাঝেমাঝে বলার সুযোগও করে দেয় মেয়েটা, বহ্নি বলে না। কোথায় যেন বাধে।
এই বাধো বাধো করেও আরেকটা সংসারে ঢুকে পড়েছে বহ্নি। এমন না যে নিত্য একটা মানুষ যা করে, এই যে খায়, শোয়, ঘর-সংসার গুছায়, টুকে টুকে সঞ্চয় করে, বছরে এক দুবার দূরে কোথাও অবকাশ কাটায়―এই ছক বাঁধা জীবনের প্রতি এখনও ওর খুব লোভ। আবার জোর করে ঘাড়ে ধরে কেউ এমন একটা জীবনে ওকে ঢুকিয়ে দিয়েছে বিষয়টা ঠিক তা-ও না। জীবনে কতবারই তো বহ্নি বাবার নির্দেশ অমান্য করেছে, পাভেলকে বিয়ে না করলে আরেকবার অমান্য করা হতো। কী হতো তাতে ? আর এখন এসব ভেবেই বা কী হবে! সংসারের ছক থেকে কি আর কখনও বহ্নি বের হতে পারবে ?
তানির মুখটা মনে পড়ে। মেয়েটা লাজুক, মুখচোরা। ওর সকল কষ্ট, সকল অভিমান ঐ মুখেই লুকানো। তানির মুখে সবকিছুর ছায়া এমনভাবে পড়ে যে ওর ভেতরে কী হচ্ছে তা না জানার উপায় থাকে না কারও। একটা সময়ে কিছুই জানতে দেওয়া হচ্ছিল না তানিকে। তবু তানি সব জেনে যাচ্ছিল। জেনে যাচ্ছিল, ওরা আর একসঙ্গে থাকবে না। মেয়ের মুখে চোখ পড়লেই সব টের পেয়ে যেত বহ্নি। কিন্তু বহ্নির নিজের বুকের ভেতরে তখন দগদগে ঘা, ওর আর্তি শোনারও কেউ নেই। রনককে ছেড়ে সবাই ওর দিকে তর্জনী তাক করে বসে আছে। মেয়েকে কী করে আগলাবে বহ্নি তখন ? বিপন্ন বহ্নি ব্যাগ গোছাতে গোছাতে আড়চোখে একবার দেখেছিল মেয়েকে। হলুদ একটা ফ্রক পরার পর ঘরে ঘরে ঘুরে ঘুরে মেয়েটি কোথায় নিজের মুখটি লুকাবে বুঝে উঠতে পারছিল না। মলিনতাস্পৃষ্ট মুখটা মুহূর্তের জন্য বহ্নিকে ওর অবস্থান থেকে সরিয়ে নিচ্ছিল। ভাব বুঝে বহ্নি আর দেরি করেনি, মেয়েকে পেছনে রেখে একপ্রকার দৌড়ে ঐ বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল।
ঐ দিনের ঐ প্রগাঢ় বেদনার ছাপ কি আজও মেয়েটার মুখে লেপটে থাকে ? কতদিন মেয়েটা আসে না! তেলে পেঁয়াজ ছাড়তে ছাড়তে বহ্নির বুকের ভেতরে ঝমঝম করে ওঠে। মেয়েটার মুখটা ভালো করে দেখে না কতদিন! অরণি বুকে লেপটে থাকে বলে কতদিন ওকে বুকেও তোলে না। দূরে সরে যাচ্ছে মেয়েটা। মেয়ের হাত-পা নাগালের বাইরে চলে গেছে অনেক আগেই, এখন বাকিটাও সরে সরে যাচ্ছে।
ভাবনাগুলো শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকছে না। বহ্নি অন্যমনস্ক হয়ে উঠছে বারবার।
‘আজ ফিরব না, মাল ডেলিভারি দিতে দিনাজপুর যাব।’
পাভেলের কণ্ঠস্বর বহ্নিকে চমকে দেয়।
‘আচ্ছা।’
‘তোমার স্কুল নাই আজ ?’
‘না। ছুটি নিয়েছি।’
‘তাইলে বাজার-সদাই কিছু লাগলে বাইরে যাওয়ার দরকার নাই। দেশের অবস্থা ভালো না। আর কিছু লাগলে অনলাইনেই অর্ডার করা যায়। ঐসব বোঝো তো ?’
পাভেলের কণ্ঠের শ্লেষ বোঝার মতো মনের অবস্থা এই মুহূর্তে নেই বহ্নির। ও তানির কণ্ঠস্বর শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। মোবাইল হাতে নিয়ে মুখস্থ একটা নম্বর চাপতে গিয়ে বহ্নির আঙুল জমে যায়। শেষবার এ বাসা থেকে রনকের কাছে যাওয়ার দিন সকালে চার তলার মিতু তানিকে প্রশ্ন করেছিল, ‘উনাকে কি তুমি বাবা বলে ডাকো ?’ উত্তরের খোঁজে মায়ের দিকে তাকায়নি তানি। এক মনে নিজের একটা জামা ভাঁজ করে যাচ্ছিল। জামাটা হাত থেকে ছুটে ছুটে যাচ্ছিল, কিছুতেই ভাঁজ হচ্ছিল না।
বহ্নি ছুটে মেয়ের হাত থেকে জামাটা নিয়ে ভাঁজ করবে বলে এগোতে চাইছিল, কিন্তু কিছুতেই পা সরছিল না।
‘যাচ্ছি।’
‘হু।’
‘হু কী ? স্বামী ঘরে থাকবে না, মহামারির দিনে কাজে বের হচ্ছে, একটু ফিরে তাকাও, কান্না কান্না সাজ আনো চেহারায়।’
পাভেলের লঘু কণ্ঠে উচ্চারিত স্বামী শব্দটা খট করে কানে লাগলেও বহ্নি মোবাইল থেকে চোখ না সরিয়ে স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে।
‘হু, সাবধানে যাও। মাস্ক ছাড়া বাইরে ঘুরো না।’
‘এইটুকুই ? ভালোবাসা-টাসার কথা কি সব ঐ পক্ষেই শেষ কইরা আসছো নাকি!’
এই পক্ষের শ্লেষটুকু গায়ে মাখে না বহ্নি। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ফোন হাতে তুলে বারান্দায় চলে যায়।
আজ বহ্নির স্কুল নেই। তানি আসবে বলে ছুটি নিয়েছে। এদিকে শোনা যাচ্ছে সরকার দেশের সব স্কুল-কলেজেই ছুটি ঘোষণা করবে। মেয়েটাকে কি ছুটির ভেতরে নিজের কাছে রাখতে পারবে বহ্নি ? সংশয়ের তীরটা ঠিক হৃৎপিণ্ড বরাবর বিঁধে যায়। বহ্নি কাতরে ওঠে। বোঝে দিন যাচ্ছে আর ওর অক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই স্পষ্টতা এক প্রকার রিক্ততা, নিজের সামনে নিজে নগ্ন হয়ে দাঁড়ানো।
তানি ফোন ধরছে না। মেয়েটা আগে একবার রিংটোন বাজলেই ফোন ধরে ফেলত। এখন সময় নেয়। একবারের কলে কথা তো বলেই না, অনেকক্ষণ পরে কল ব্যাক করে। তারপর নিস্পৃহ স্বরে কথা বলে। বহ্নি প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়, নিজ থেকে কোনও প্রশ্ন করে না। অরণির জন্মের আগে থেকেই বিষয়টা খেয়াল করেছে বহ্নি। সবকিছু সবার আগে উপলব্ধি করে বলেই বহ্নির জীবনের সব হিসাব বারবার এলোমেলো হয়ে যায়।
এলোমেলো, অগোছালো বহ্নি জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে বাইরে তাকায়। কাছে, দূরে সবুজ নেই কোনও। আকাশও নেই। মানুষের হাতে গড়ে ওঠা পরিপাটি শহরের বুকে কংক্রিটের উঁচু-নিচু খোপ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না।
৩
মনের গভীরে ঘূর্ণায়মান শঙ্কাটা পাক খায় কয়েকবার। শরীরও অবশ হয়ে আসে। এই মুহূর্তে নিজেকে দৌর্বল্যসর্বস্ব একজন মানুষ মনে হচ্ছে ওর। শুধু এই মুহূর্তে কেন, শরীর-মন জুড়ে এই একই অনুভূতি নিয়ে রোজ সকালে রনকের ঘুম ভাঙে।
দুই পায়ের খরখরে তালু ঘষে উত্তাপ অথবা শক্তি কিছু একটা নেওয়ার চেষ্টা করে রনক। বিছানা ছাড়তে মন চায় না। কিন্তু অফিসে যেতে হবে না ভেবে প্রফুল্ল হওয়ার সুযোগও পায় না। আজ বাজারে যাওয়ার কথা। তানি রাতেই হাতে লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছে। আগে বহ্নি বাজারের লিস্ট ধরিয়ে দিত। বহ্নির নাম মনে হতেই অকস্মাৎ অন্য একটা জীবনের ভেতরে ঢুকে যায় রনক। বাজারের লম্বা একটা ফর্দ ধরবে বলে পাশ গড়িয়ে হাত বাড়ায়।
স্নান সেরে এসেছে বহ্নি। ভোরের সৌরভে ম ম করছে ঘর। ওর এলোচুল থেকে পানি ঝরছে। তোয়ালে মুড়িয়ে চুল চুড়ো করে বেঁধে রনককে হ্যাঁচকা টান দেয় বহ্নি। হাত পা মুচড়ে আহ্লাদি ঢঙে চোখ মেলে সামনে তাকায় রনক। তখনই তানিকে দেখে রনক। মনে পড়ে, তানি ছাড়া এ ঘরে কারও আসার কথা না। নিজেকে ফের পাপবিদ্ধ করতে করতে আরও দুর্বল লাগে রনকের। টের পায় ক্রমশ অচেতন হচ্ছে শরীর।
‘বাবা, এখনও শুয়ে আছো ? বাজারে যাবে বলেছিলে। ওঠো, তাড়াতাড়ি ওঠো!’
জানালা খুলেছে তানি। গ্রিলের ওপাশে পাখিদের কোলাহলে তানির কণ্ঠস্বর মিশে যাচ্ছে। রনক শুনেও শুনছে না। দুরন্ত কাঁপুনি শুরু হয়েছে শরীরে। জানালা ঠেলে হু হু করে হাওয়া আসছে। হিম হিম হাওয়া ঘিরে ফেলছে চারদিক। ক্রমে কাবু হয়ে যাচ্ছে রনক। গোঙাচ্ছে। তানি বাবার পিঠে হাত রাখে।
‘কী হলো বাবা ? শীত করছে ? স্বপ্ন দেখছ কোনও ?’
তানি বাবাকে আঁকড়ে ধরেছে। মেয়ের হাতের উষ্ণতায় মুহূর্তেই জেগে ওঠে রনক। এই মেয়ে অন্যরকম। অভিযোগ নেই, আলোড়ন নেই। প্রতিহিংসার প্রলয় নেই ভেতরে। বহ্নির সঙ্গে ডিভোর্সের পর কতদিন যে রনক মেয়ের চোখে চোখ রাখেনি। ভয় পেয়েছে। হয়তো তানি ঝাঁপিয়ে পড়বে, আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত করবে। জানতে চাইবে, ‘কেন এমন করলে বাবা ?’
তানি কিছু জানতে চায় না বলেই অস্বস্তি বাড়ে। বুকের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ঘা-টা দগদগে হয়। ওদের বিচ্ছেদের নেপথ্যের কারণটাও হয়তো জানে তানি। ভেবে ভেবে বুক খামচে ধরে রনক। রাতে দেখা স্বপ্নের কথা মনে পড়ে তখনই।
রাতে রনক স্বপ্ন দেখেছে, ও ভাইয়ের সঙ্গে সিলেটে বেড়াতে গেছে। জিপে করে বহু দূরে যাচ্ছে আর ভাই থেমে থেমে চিৎকার করে উঠছে, পাহাড়ই তার প্রিয়। কোনওদিন সম্ভব হলে ঐ উঁচু পাহাড় থেকে পাখির মতো উড়াল দেবে। রনক দেখেছে, শেষ বিকেলের পাহাড় আরও সুন্দর। সূর্যাস্তের সময় সমগ্র আকাশ ঝুপ করে বদলে যাচ্ছে। ভারতের সীমানার উঁচু উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় লীন হয়ে যাচ্ছে সূর্যের কমলা রঙের গোলা। ঐ কমলা রং ছোঁবে বলে প্রাণপণে ছুটছে ভাই। রনক ভাইকে তাড়া করে পারছে না। একসময় আবিষ্কার করেছে ছুটতে ছুটতে ও অচেনা একটা ঘরে পৌঁছে গেছে। বিমূঢ় হয়ে রনক দেখছে সামনে মৃন্ময়ী, ভাই নেই।
আহা…কতদিন পরে ভাইকে দেখেছে অথচ ভাইয়ের মুখটা স্পষ্ট করে দেখতে পায়নি। আর মৃন্ময়ী কদিনেরই বা চেনা মুখ! সে কেন এত স্পষ্ট হয়ে এল! মৃন্ময়ী কেন এল ওর জীবনে!
ডুকরে ওঠে রনক। মেয়ে বাবার দুরবস্থা দেখে পিঠে চাপড় দেয়।
‘ওঠো বাবা, ওঠো।’
মেয়ের স্পর্শে ক্রমশ শান্ত হয়ে আসে রনক।
‘বাবা, তোমার মাসকাবারি বাজারের অবস্থা কিন্তু করুণ। জানু খালা এসে কাল বাসা মাথায় তুলেছে। এই নেই সেই নেই।’
‘খুব বড় হয়েছিস না ? কাল তো চলে যাবি। একা মানুষ আমার এমনিতেই দিন চলে যাবে। অত বাজার-সদাই লাগবে না। বাইরে কোথাও খেয়ে নিব।’
‘নাটকের সংলাপ ঝেড়ো না বাবা। দেশের এই পরিস্থিতিতে বাইরে খাওয়ার কথা চিন্তাও করো না। প্রতিদিনই আক্রান্তের হার বাড়ছে, মারাও যাচ্ছে মানুষ।’
‘হু, আমার মা আসছেন। চল চল যাই। মরতে ভয় পায় নাকি এ দেশের মানুষ! দ্যাখ গিয়ে সাতসকালেই বাজারে লুটপাট চালাচ্ছে। আমি গিয়ে কিছু পাই কি না।’
গতকাল অফিস থেকে ফেরার সময় একটা সুপার শপে কয়েকটা জরুরি কেনাকাটা করতে গিয়ে রনক দেখেছে জনসমাবেশের মতো লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। রনক কয়েকজনের কাছে জানতে চেয়েছে, কী হয়েছে ভাই ? এত লোকজন কেন ? কেউ কিছু বলেনি। বলবে কী! এদের মুখে মাস্ক, চোখে বিরক্তি আর হাতের ট্রলি বোঝাই সদাইপাতি। কারও অহেতুক প্রশ্নের জবাব দেবে সেই সময় বা ধৈর্য কারও নেই। একজন বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আরে দেখেন না এখনই নাকি গ্লাভস আর মাস্ক শেষ! সব দাম বাড়ানোর ধান্দা বুঝছেন। লকডাউন দিলে দেখবেন হাত দিতে পারবেন না কিছুতে।’ আরেকজন মাস্ক থুতনিতে নামিয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, ‘চোরের দ্যাশ। করোনা নিয়া নতুন ব্যবসা শুরু হইছে। যেখানে যা পায় তাই নিয়া ব্যবসা শুরু করে বাঙালি।’
রনক নিজের জিনিসপত্র কিনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখেছে খানিকক্ষণ। তারপর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখেছে সেই একই হুড়োহুড়ি। ‘নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন’ স্লোগানের রফাদফা করে একটা বাস আসতেই ত্রিশ/চল্লিশজন নারী-পুরুষ বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। উঠতে পারে একজন বা দুইজন। বাকিরা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে। শ দুই মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য একই রকম যুদ্ধ করেছে। রাগের মাথায় কেউ কেউ খিস্তি করেছে, ‘বালের লকডাউন দিব। পেটে ভাত নাই গরিবের। ঘোষণা দিলেই তো ঘরে দরজা দিয়া ছুটি কাটাইব মানুষ আর হেরা পাবলিকের গুষ্টি মারব।’
মেয়েকে সেসব গল্প শোনাতে শোনাতে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় রনক। তানিও প্রস্তুতি নেয়। ছোট ট্রলি ব্যাগে নিজের জিনিসপত্র তোলে।
কাল রবিবার, মায়ের কাছে যাওয়ার দিন। আগে প্রতি সপ্তাহে তানিকে বাসা বদল করতে হতো। তারপর বাসা বদলের নিয়মটা মাসে একবারে এসে দাঁড়িয়েছিল। এখন অবশ্য তেমন বাঁধা ধরা কোনও নিয়ম নেই। মা ডাকলে তানি মায়ের কাছে যায়।
বাবা-মা আপসনামা করে তানির দিনগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। কয়েক মাস আগেও তানি ভাবত রান্নাঘর থেকে মাংস কাটার ধারালো ছোরাটা এনে নিজেকে মাঝ বরাবর কেটে ফেলবে। তারপর বাবা আর মাকে বলবে, নাও নিজেদের ভাগ বুঝে নাও। এই বিদঘুটে ভাবনা ঝেড়ে ফেলে ঝটকায় তানি বড় হয়ে গেছে। গোপন ভাবনাটা গোপনই রয়ে গেছে, শুধু তানি নিজের থাকেনি।
তানি অর্ধেকটা বাবার, অর্ধেকটা মায়ের। তাই যাবে না যাবে না ভাবলেও মায়ের ডাক এলে তানি ঠিকই ব্যাগ গোছাতে শুরু করে। হঠাৎ তানির হাত থেমে যায়। ওর হাতে থাকা সবুজ রঙের জামাটা মা সেলাই করে দিয়েছিল। সাদা লেইস বসানো থাক থাক কুঁচিঘেরা ফ্রকটার বুকের দিকে টাইট হয়ে গেছে তবু প্রতিবার মায়ের কাছে যাওয়ার সময় তানি এটা সঙ্গে নেয়। জামাটা নাকের সামনে আনতেই বুকের ঠিক মাঝখানে শিনশিনে একটা অনুভব খামচে ধরে। অনুভূতির তীব্রতায় কেঁপে ওঠে তানি। তিন বছর আগের সেই রাতটার কথা মনে পড়ে।
ঐ জঘন্য রাতটা না এলে তানিকে এভাবে ব্যাগ গোছাতে হতো না।
৪
স্বপ্নের ভেতরে শেষ দমটুকু নিয়ে ছুটতে ছুটতে বহ্নি ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছে যায়। পৌঁছে যাওয়ার ক্ষণটুকু সমাপ্তির দাগ না টানলেও বহ্নি বুঝে যায় আজকের মতো এখানেই থামতে হবে। সামনে যাওয়ার জন্য সায় নেই শরীরের। শরীর-মন নিয়ন্ত্রণে নেই। সুতোকাটা ঘুড়ির মতো লক্ষ্যহীন দুলতে দুলতে মুখ থুবড়ে পড়েছে রসহীন ভূমিতে। ওঠার শক্তি বা তাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আলগা আলগা ঘুমের ভেতরে স্বপ্নের দৌরাত্ম্যে কাবু বহ্নি ক্লান্ত শরীর দু ভাঁজ করে শুয়ে চওড়া থামের কোণে ঝুলে থাকা মাকড়সা দেখছে। মাকড়সার পিছু নিয়েছে একটা লেজহীন সর্তক টিকটিকি। লক্ষ্য স্থির করছে। সতর্ক হয়ে উঠেছে মাকড়সাটাও। সরে যাওয়ার সময় দেয় না মাকড়সাকে, এক গ্রাসে মুখে তুলে নিয়ে টিকটিকিটা আরেকটা শিকারের পিছু দাঁড়ায়। এবার প্রাণিটাকে তৃপ্ত দেখায়।
লেজহীন প্রাণিটার সঙ্গে পাভেলের মিল দেখতে পেয়ে গা গুলিয়ে ওঠে বহ্নির। কদিন ধরেই যখন-তখন এমন গা গুলাচ্ছে, গলায় বমি উঠে আসছে। নাহ পিরিয়ড মিস হয়নি। হিসাব করে দেখেছে পাভেল কাছে এলেই কেবল নাকে গন্ধের ঝটকাটা লাগছে।
দুই বছরের মধ্যে কোনওদিন মদ পান করে ঘরে ফিরতে দেখেনি পাভেলকে। মাতলামি করতে দেখেছে। দু দিন আগেও দেখেছে। সেদিন ক্রুদ্ধ পাভেল অক্টোপাসের মতো পেঁচিয়ে ধরেছিল বহ্নিকে। ক্ষিপ্ত পিচ্ছিল শুঁড়ে ওকে বাঁধতে বাঁধতে রনকের নামের আগে নোংরা বিশেষণ লাগিয়ে নোংরা সব কথা বলছিল। পাভেলের মুখ থেকে ভকভক করে গন্ধ আসছিল। এই গন্ধ ওর নিজস্ব। গন্ধ আর ঘ্রাণ শব্দ দুটির মধ্যে যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে তা বহ্নি বিয়ের প্রথম রাতেই বুঝেছিল। সেদিন কথোপকথন শুরুর আগেই ও গন্ধের তীব্রতা টের পেয়েছিল। তারপর নিজেকে সরাতে সরাতে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল অনেকটা। লাভ হয়নি।
এবার বাসা থেকে বের হওয়ার আগে পাভেল বহ্নির প্রিয় ফুলদানিটা আছড়ে ভেঙে গেছে। ভাঙা কাচের টুকরোর ওপরে জুতো দিয়ে পিষে পিষে নোংরা কথাগুলো উচ্চারণ করেছে অসংখ্যবার। শব্দের বেখেয়াল ধ্বনি বহ্নির কান অবধি পৌঁছায়নি। পাভেল বলে চলেছে আর বহ্নি পাথরচোখে দেখেছে মেঝেতে ছড়ানো কাচের টুকরোগুলো।
রনক দিয়েছিল ফুলদানিটা, কৃত্রিম তাজমহল গোলাপসহ ক্রিস্টালের ফুলদানিটা লাস্যময়ীর ভঙ্গিতে বহ্নির প্রথম সংসারের বসার ঘরের সেন্টার টেবিলের ওপরে দাঁড়িয়েছিল অনেকগুলো বছর। এরপর বহ্নির পিছু পিছু এই সংসারেও এসেছে। বহ্নির দ্বিতীয় সংসারে। শেষবার যেদিন এই বাসায় এসেছিল রনক সেদিন চলে যাওয়ার সময় ও চাইলেই ফুলদানিটা ভেঙে ফেলতে পারত, ভাঙেনি। ওদের সম্পর্কের মতো নির্লজ্জ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল ফুলদানিটা। পাভেলের হাতেই যা এতদিন পর টুকরো টুকরো হলো। রনক আর বহ্নির সম্পর্কের মতো। বহ্নি ভেবেছিল একটা পূর্ণচ্ছেদ আঁকলেই শেষ হয়ে যাবে সম্পর্কটা। কিছুই শেষ হয়নি। কাচটুকরোর মতো বুকে, পিঠে, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে, ত্বকে, রোমে রোমে বিঁধে আছে।
টিকটিকিটা এবার বহ্নির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শিকারের সক্ষমতা পরখ করতে করতে এগিয়ে আসছে ধীর পায়ে। পেটফোলা নির্দোষ প্রাণিটাকে দেখতে দেখতে পুনরায় গা গুলিয়ে ওঠে বহ্নির। পাভেলের ত্বক টিকটিকির মতোই ঘি রঙা, নরম; হাত রাখলেই আঙুল গেঁথে যায়।
ঘর থেকে চোখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকায় বহ্নি। অকালের ছকহীন কুয়াশায় সকালটা কেমন ভুতুড়ে হয়ে উঠেছে। খোলা জানালা দিয়েও কিছুই দেখা যাচ্ছে না। জরাগ্রস্ত হাওয়া অশুভর ইঙ্গিত নিয়ে দুলছে। জানান দিচ্ছে, পৃথিবীতে মড়ক লেগেছে।
বহ্নির পাশে শুয়ে থাকা অরণি নড়েচড়ে উঠছে। মেয়ের এক বছরের ছোট শরীরটা দু দিনের জ্বরে একেবারে কাহিল হয়ে গেছে। মায়ের বুকের দুধ ছাড়া কিছুই মুখে নিচ্ছে না। অরণি জন্মের পর থেকেই অসুখে ভুগছে। জন্মকালেও ওর বিপত্তির কমতি ছিল না। এন.আই.সি.ইউর বাকশো থেকে বের করার পর যখন বহ্নি মেয়েকে কোলে তুলেছিল তখন ওর মনে হয়েছিল একটা ভেজা পায়রা কাঁপছে। দীর্ঘ বিরতির পর অনুভূত এই মাতৃত্বের আনন্দ ছিল প্রথমবারের মতোই বিস্ময়ের। বিস্মিত বহ্নির আনন্দের টুঁটি চেপে ধরে পাভেলের মা নাতনিকে দেখতে এসে প্রথমদিনই বলেছিল, ‘মায়ের চেহারা-ছবি তো ভালোই, জন্ম তো দিছে কাউয়ার ছাও।’
সেদিন হৈচৈ করে এমন এক কাণ্ড ঘটিয়েছিল বহ্নি যে ভদ্রমহিলা আর কোনওদিন ছেলের বাড়িতে পা রাখেননি। অথচ হঠাৎ কী জানি কী হয়েছে, নিজের বেপরোয়া স্বভাবের তাড়নায় আরও কঠিন হবে, না ভেঙে পড়বে, বহ্নি এখন আর সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
অরণি মুখ বাড়িয়ে মাকে খুঁজছে। না পেয়ে মাথা চেপে দিচ্ছে পাশ বালিশে। কদিন ধরে ঘুমের খেয়ালে সে মাকে ছেড়ে দিতে দিতেও ছাড়ছে না, বারবার কামড়ে ধরছে। স্তনের ভার নেই আর তবু মাকে ছাড়তে রাজি হয় না মেয়ে। দুপুরে মেয়েকে জড়িয়েই শুয়েছিল বহ্নি, কখন ঘুমিয়ে গেছে টের পায়নি।
শব্দহীন টিভি চলছে ঘরে। বিজ্ঞাপনচিত্রের নিচের দিকে টপ নিউজের চাকা ঘুরছে তো ঘুরছেই। আক্রান্তের দিক থেকে চীন ও ইতালিকে ছাড়ালো যুক্তরাষ্ট্র, চীনের আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সন্দেহ প্রকাশ, বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, প্রবাসীদের দেশে ফিরে আসা নিয়ে উৎকণ্ঠা আর ক্ষোভ, করোনার ঝুঁকি কমাতে পারে ভিটামিন ডি―সংবাদগুলো সরে যেতে যেতে শেষ সংবাদটা পড়ে নেয় বহ্নি, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের আশংকায় দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, শুরু হবে ‘লকডাউন’।
লকডাউন! কদিন ধরে বারবার কানে বিঁধছে শব্দটা। সংবাদ পাঠিকা গ্রীবা টান টান করে ঘুরেফিরে বিশ্বের নানা দেশের লকডাউন পরিস্থিতি জানাচ্ছে। অলৌকিক উৎসাহ ঝরে পড়ছে তার কণ্ঠস্বরে।
‘সত্যি লকডাউন শুরু হবে!’ আর্তনাদ করে উঠতে উঠতে বহ্নির মনে পড়ে, আজ তানির আসার কথা। ও চট করে বিছানা ছাড়ে। পাভেল নেই বলে দু দিন ধরে রান্নাও করেনি কিছু। ফ্রিজে বাসি যা ছিল তা দিয়েই চালিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু কী রান্না করবে আজ ? মুরগির মাংস, আলু পাতলা ঝোলে রান্না করে নামানোর আগে ভাজা জিরার গুঁড়ো ছড়িয়ে দিলে তানি খুব পছন্দ করে। জিরা কি আছে বাসায় ? নাকি একটু বিরিয়ানি করবে ? পিঁয়াজ বেরেস্তা করার পর তেলে সামান্য ঘি ছেড়ে বেশি করে কাজু বাদাম ভেজে নেবে, তারপর বিরিয়ানির ওপরে ছড়িয়ে দেবে। তানির খুব প্রিয় চিকেন বিরিয়ানি।
কোনটা রেখে কোনটা করবে তাল মিলাতে পারে না বলে অন্যদিনের চেয়ে কাজ সারতে দেরি হয়। কাজ সেরে বহ্নি তানিকে ফোন দেয়। ওপাশ থেকে সাড়া আসে না। নাহ, এবার মেয়েটা এলে ওকে অনেক অনেক আদর করবে বহ্নি। উজাড় করে সময় দেবে। একেবারে মেয়ের গায়ে গায়ে লেপটে থাকবে। দেখবে অভিমানী মেয়ের অভিমান কতক্ষণ থাকে।
রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গোসলে ঢুকতে না ঢুকতেই কলিংবেল বেজে ওঠে। আধভেজা শরীরে বহ্নি দরজা খুলতে ছোটে। বহ্নি জানে, দরজা খুললেই দেখবে তানি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর পাভেল বাসায় নেই শোনামাত্রই সাগ্রহে মাথা উঁচু করে তাকাবে।
আহা! মেয়েটা! ওর অভিমানী, দুঃখী মেয়েটা! বহ্নির বুকের ভেতরটা মমতায় টনটন করে ওঠে।
৫
মা বলেছিল বাবা যেন কিছু টের না পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে। তানির বাবা বোকা টের পায় না অনেক কিছুই। যদিও মাঝে মাঝে তানির মনে হয় বাবা সবকিছু টের পেলেও অন্যদের তা বুঝতে দেয় না।
কোর্টের রায় ঘোষণার দিনই মা তানিকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাবে বলেছিল। সেদিন সকালেও বাবা টের পেয়েছিল বাবার পক্ষে রায় হবে না। আগের দিন রাতে তানির ঘরে একটা ঢাউস ব্যাগ রেখে গিয়েছিল বাবা। তানি ‘ব্যাগ দিয়ে কী হবে’ প্রশ্ন করলেও বাবা জবাব দেয়নি। মাঝেমাঝে ভেঙে পড়া গাছের মতো নির্জীব থাকে বাবা।
দাদা-দাদি, চাচা-চাচি…সবাই বলে বাবা এমন উদার আর উদাসীন থাকে বলেই বাবা আর তানির এত বিপত্তি। আরও কত কিছু যে বলে আশপাশের মানুষগুলো! মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেলে সন্তান মানুষ হয় না, উচ্ছন্নে যায়, মাদকাসক্ত হয়, ভালো বিয়েও হয় না―এসব কথা বলতে বলতে দাদা ফোনের টাকাই শেষ করে ফেলে। দাদা বাবাকে ফোন করে ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কখনওই কথা বলে না তানি। ও ভালো করেই জানে, এসব কুশলাদি জিজ্ঞেস করার আহ্বান না, আকারে ইঙ্গিতে ওর মায়ের নামে দুটো মন্দ কথা বলার সুযোগ বের করা।
দাদাকে তাই একদম পছন্দ করে না তানি। দাদি তুলনামূলক ভালো। ভালো এই অর্থে যে, কথা বলার সময় দাদি বরাবর ওর মায়ের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। দাদির আগ্রহ অন্যদিকে। ফোন করলেই দাদি শুধু জানতে চায়, তানির মন খারাপ কি না, তানি ঠিকমতো খায় কি না, পড়াশোনা করে কি না। এরপর অনেকক্ষণ ধরে মানুষটা তানিকে বোঝাতে চেষ্টা করে, মন খারাপ করার কিছু নেই। জীবনে পথ চলতে গেলে অনেক কিছুই হয়। এসব পার করেই তানিকে বড় হতে হবে। তানি দাদিকে কখনওই পালটা বুঝাতে যায় না যে, ও অনেক বড় হয়ে গেছে। এসব কথা ওকে বলে লাভ নেই।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খানিকক্ষণ দেখে তানি। ও সত্যি সত্যি বড় হয়েছে। আর কদিন গেলে বাবার কাছাকাছি লম্বা হয়ে যাবে। শরীরেও পরিবর্তন এসেছে। ওর উদীয়মান শরীর এখন অনেকটাই ভরাট। গোসলের সময় শরীরের ঊর্ধ্বাংশ, পেট, নিতম্ব ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছে তানি। দেখেছে শরীরের সব ভাঁজ পাল্টে গেছে। এই পাল্টে যাওয়া একান্তে ঘটেছে। বাবা আর মায়ের টানাপোড়েনের ভেতরে একেবারে কোলাহলহীনভাবে বড় হয়ে গেছে তানি। এই জার্নিতে কোনও এক মনোরম সকাল কিংবা রাতে বাবা, মা দুজনের কেউই একবারের জন্যও আদর করে ওকে বলেনি, ‘তুই তো বড় হয়ে গেছিস মা! তুই তো আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছিস!’
হ্যাঁ, সবার অলক্ষ্যে বড় হয়ে গেছে তানি। আগের জামাগুলো বুকের কাছে আঁটোসাঁটো হয়ে গেছে। কিছু নতুন জামাকাপড় কেনা দরকার, আন্ডার গার্মেন্টসও কিনতে হবে। বছর দুই আগে মা-ই ওকে প্রথম ব্রা কিনে দিয়েছিল। ওর দিকে তাকিয়ে সেবার হঠাৎ চমকে উঠেছিল মা, বলেছিল, ‘তোকে তো এখন ব্রা পরতে হবে। চল, চল, দোকানে যাই। তোর বাবার কী আর এদিকে নজর আছে!’ কেমন ঘরোয়া ভঙ্গিতে যে কথাগুলো বলছিল মা, তানি লজ্জা পেতে পেতেও অবাক হয়ে মাকে দেখছিল।
মা এখনও কথায় কথায় বলে, ‘তোর বাবা…।’ মায়ের সব অনুযোগ এখনও বাবার ওপরে। তানির বাবা আবার মায়ের উলটো স্বভাবের। বাবার কারও প্রতি কোনও অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই। মা বলে, তানি বাবার স্বভাব পেয়েছে। তানি জানে, বাবা-মায়ের স্বভাবই হলো ছেলেমেয়েকে নিজেদের সঙ্গে তুলনা করা। ছেলেমেয়ে যেন স্বতন্ত্র কোনও মানুষ হতে পারে না। আসলে বাবা-মায়েরা সন্তানকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করে বলেই এমনটা ভাবে। তাই তো তানির বাবা-মা ওকে নিয়ে এমন টানাটানি করে।
দিনের ব্যস্ততা ঝিমিয়ে পড়েছে। এখন তো এমনিতেই ঝিমিয়ে থাকে সব। গতকাল ওদের বাসার সামনের রাস্তার ধারের পাঁচতলা বাড়িতে প্রশাসনের লোকজন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করে লাল পতাকা ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে, তখন থেকে যেন আরও সুনসান হয়ে গেছে চারপাশ।
বাবা কি এল ? তানি জানালা দিয়ে তাকাতেই দেখে একটা পরিবার কলরব তুলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ওরা মা, বাবা আর মেয়ে। কোথায় যাচ্ছে ওরা ? কাশফুল দেখতে ? এমন সময়ে মা-ও আয়োজন করে কাশফুল দেখাতে নিয়ে যেত। তানি কপাল গ্রিলে ঠেকিয়ে ভালো করে দেখার চেষ্টা করে। এদের তিনজনের কারও মুখেই মাস্ক নেই। কে বলবে, দেশে রোজ এত মানুষ মারা যাচ্ছে! সবকিছু থমকে গেছে মহামারিতে!
মেয়েটাকে জোরে ডাক দিয়ে সাবধান করবে কি না ভাবে তানি। তিনতলার জানালা থেকে ডাকলে ও কি শুনতে পাবে ? দেখতে দেখতে ওদের রিকশা চলতে শুরু করেছে। ছোট মেয়েটা বাবার কোলে বসেছে। তানিও বসত এমন করে। বড় হতে হতে বাবার কোলে আর ছোটবেলার মতো বসাই হয় না। আর এখন তো বাবাই কেমন ছোট হয়ে গেছে। একা থাকতে পারে না।
তানি যতবার মায়ের কাছে যায় ততবার ফিরে এসে বোঝে একা থাকতে কতটা কষ্ট হয় বাবার। মাঝেমধ্যে দাদা-দাদি এসে ওদের সঙ্গে থাকে। ছোট চাচির ছেলে হয়েছে, দাদা-দাদি এখন আর ঢাকায় আসতে পারবে না। তানি কাল চলে গেলে কয়েকটা দিন একা থাকতে হবে বাবাকে, নিজের হাতে রান্না করতে হবে। ওর তো গতকালই যাওয়ার কথা ছিল। বাবা এমনভাবে বলল, ‘মাকে বলে আরেকটা দিন থেকে যা মা!’ বাবার দম আটকে আসা চেহারা দেখে তখনই তানির চোখে পানি এসে গিয়েছিল। ঐ বাড়িতে তা-ও অরণি আছে, এই বাড়িতে সারাদিন একা থাকতে ওর দমবন্ধ লাগে। বাবার জন্য তবু ওকে ফিরে আসতেই হয়। ফিরে এসে বাবাকে পায়, মাকে পায় না।
এই বাড়ির মা মা গন্ধটা আর নেই। অনেক বছর তো পার হলো। মায়ের জিনিস সবই সরে গেছে এই বাড়ি থেকে। শেষ যা কিছু ছিল, একটা ডেস্কটপ, নানার নিজের হাতে তৈরি গাছের শেকড়ের আকৃতির সেন্টার টেবিল, সেলাই মেশিন, চার ড্রয়ারের ছোট একটা ওয়ারড্রোব আর তানির পড়ার টেবিলসহ বেতের দোলনাটা―এসব ছোট একটা পিকআপে তুলে বাবা মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। তানির তখন বারো বছর বয়স। ওর মনে আছে, যাওয়ার সময় ক্রিস্টালের ফুলদানিটাও নিয়ে গিয়েছিল বাবা।
মাঝেমাঝে তানির বুকের ভেতরে কেমন একটা করে ওঠে। চাপ চাপ ব্যথা ব্যথা অনুভবে হৃৎপিণ্ডের ভেতরে কাঁপন ধরে। তখন আশপাশের মানুষকে পাশ কাটিয়ে একা হয়ে যায় তানি। বাবা তখন ওর ঠোঁটের ভাঁজ দেখে বলে, মেয়েটা আমার অভিমানী। মা গতানুগতিক স্বরে বলে, তানি বাবার মতো।
তানি জানে ও তানির মতো। বাবা অথবা মা কারও মতোই হতে চায় না ও। লালসালু ঘেরা কোর্টের হৈ হট্টগোলে দাঁড়িয়ে উত্তর দিতেও চায় না একই প্রশ্নের, আজ থেকে ও কার কাছে থাকবে। তাই তো সেবার কোর্টে মুখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিল তানি। কিছুতেই বিচারককে জানায়নি ও কার কাছে যাবে।
তানি জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে মেঘের শুভ্র টুকরোগুলো ঝুঁকে আসছে মাটিতে। ওম ওম মেঘ ছুঁয়ে দিচ্ছে ওর গাল। তানি একেবারে গলে গলে যাচ্ছে। বুকের ভেতরে কেমন কেমন করছে আবার। বেদনার উৎক্ষেপণ নয়, এ যেন নিঃশব্দ ক্ষরণ। ছিন্ন মায়ার কুহক ছলকে উঠছে কোষে কোষে। ওকে দুঃসহ সত্যের মুখোমুখি ঠেলে দিয়েছে যারা তাদের চেহারা মনে হতেই চাপা একটা ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে স্নায়ুতে স্নায়ুতে।
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায় তানি, মায়ের জিনিসগুলো নিতে হবে। মা বারবার বলেছে, এবার যেন ও ভুলে না যায়।
বাবার ঘরের আলনার নিচের ড্রয়ারে থাকা ফাইল থেকে মায়ের কাগজগুলো আর লাল ভেলভেট কাপড়ে মোড়ানো ডায়রিটা বের করতে না করতেই স্প্যানিশ সুরে ফোন বেজে ওঠে। তানির বুক ধড়ফড় করে। কে ? বাবা কি চলে এসেছে ? ওর দরজা খুলতে দেরি হলে এই সময়ে ঠিক এমন করেই তো বাবা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কল দেয়!
৬
রোদে পুড়ে পুড়ে অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে রনক। ভারী ব্যাগটা হাতবদল করতে করতে ও ঢোক গিলতে চেষ্টা করে একবার। চোয়াল আটকে আসে। জিভ, আলজিভ শুকনো। বুকের ভেতরের সবটা পানি শুষে নিয়েছে ভাদ্রের তালপাকা উত্তাপ।
এমন কড়কড়ে রোদের দিন ফুরিয়ে ছুটির বিকেল এলে বহ্নি পিঠা বানাত। মন্থর বিকেলের কাচগলা রোদে জানালার গ্রিলে পাতলা কাপড় ঝুলিয়ে তালের তিতা রসটুকু বের করে নিত কায়দা করে। চুলায় বসানো লোহার কড়াইয়ের তেতে ওঠা তেলে পাঁচ আঙুলের গোল ফাঁক দিয়ে পিঠার গোলা ছাড়তে ছাড়তে ডাক দিত, ‘বেণিটা খুলে গেছে, চুল বাঁধার কিছু একটা দিয়ে যাও তো।’ অনলের আঁচে লাল হয়ে ওঠা বহ্নিলতার লতানো বেণি পিঠ থেকে সরানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই তো না শিকারি রনক। তাল মাখানো হাতে শিকারির পিঠে দুএকটা তাল ঠুকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে আরও জড়িয়ে যেত বহ্নি।
রোদপোড়া চোখ জ্বলছে রনকের। মায়ের মতো ঋতু ধরে পিঠাপুলি বানানোর রীতিটা ধরে রেখেছিল বহ্নি। সব…বহ্নি ওর সবকিছু ধরে রেখেছিল। মনের ভেতরে বজবজ করতে থাকা অনুভূতির জন্য আত্মগ্লানিতে ভোগে রনক। নিজেকে ছাইমাখা মাছের মতো শানানো বঁটিতে ধরে পোঁচ দিতে ইচ্ছে করে, কেন যে এখনও বাড়ির গেটের কাছে এসে ঐ নাম উচ্চারণ করে ফেলে। নিজের ভুল বুঝতে পেরেও ফিসফিস করে নিজেকে শোনায়, ‘বহ্নি…ই…ই…দরজা খোলো, বহ্নি…ই…ই…।’
তানি দরজা খুলেছে। মুখে মাস্ক ওর। রনক গোসল সেরে পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সে কিছুতেই মাস্ক খুলবে না। বাবার হাতের কিছু ধরবেও না। বাবাকে কিছু ধরতেও দেবে না।
‘আবার বাজারে গেছো তুমি ? তাই তো বলি এত দেরি কেন! ইস এর ভেতরে বাজারে না গেলে হয় না বাবা! জাকির চাচা তো রোজই ভ্যানে করে সবজি নিয়ে আসে।’
এই পাড়ার সবজিওয়ালা থেকে শুরু করে ময়লা নিতে আসার ছেলেটার নাম পর্যন্ত জানে তানি। কদিন আগেও নিচে দাঁড়ানো সকলের সাক্ষাৎকার নেওয়া তার প্রিয় কাজ ছিল। রনক খেয়াল করেছে আজকাল বাইরের কারও সঙ্গে যেচে কথা বলে না মেয়েটা।
হাতের ব্যাগ মেঝেতে রেখে রনক তাকে ইশারা করে দূরে সরে দাঁড়াতে। মুখাবরণের আড়ালে থাকা বাবার ক্লান্ত মুখটা দেখতে ভুল করে না তানি। দরজার কাছাকাছিই দাঁড়িয়ে ছিল ও। বাবার স্যান্ডেল জোড়া এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘বাথরুমে গরম পানি আছে বাবা, কিচ্ছু ছুবে না, সোজা গোসলে ঢুকে পড়ো। আমি তোমাকে লেবুর শরবত করে দিচ্ছি।’
‘যাচ্ছি রে।’
‘কী এনেছো আবার ?’
‘তাল।’
‘কী যে করো না বাবা, এসব কে করবে এখন! তালের রস ছাড়ানো কত ঝামেলা জানো তুমি ? জানু খালার ঘরে ঢোকা নিষেধ সেটাও কি ভুলে গেছো ?’
‘জানু আপাকে ডাকতে হবে বুঝলি মা। এভাবে আর চলে না। তোর কাছে আপার ফোন নম্বর আছে না ?’
‘মোটেও না, খুবই খারাপ অবস্থা দেশের। এখন কাউকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। আজও ত্রিশ জন মারা গেছে বাবা।’
‘তাহলে আর কী, তুই আর আমি মিলেই করে ফেলব। পেটে খেলে পিঠে সয়…বুঝলি না! লকডাউনে কত কাজ শিখেছি বল!’ বলতে বলতে মেয়ের দিকে হাত বাড়ায় রনক।
‘খবরদার, ছুবে না আমাকে। আগে গোসল সারো।’
মেয়েটা কদিনেই গিন্নি হয়ে উঠেছে। কে বলবে কয়েক মাস আগেও মায়ের ছবি দেখে সারাদিন ঘুরে ঘুরে কেঁদেছে।
‘তুই আমার মা রে…।’
তানি হাসে। পিলসুজের পোড়া সলতে জ্বলে ওঠে ওর হাসিতে। সম্পূর্ণ মিথ্যে হয়ে যাওয়া এই সংসারে এখন রনকই একমাত্র মানুষ। তানি এলে দুজন হয়। দুজন মিলেও ওরা একা। শূন্য। দুইজন দুই ঘরে ঢুকে গেলে শূন্যতার পারদ লাফিয়ে একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে ওঠে। গুমোট ঘর দুটিতে হাওয়ার সান্নিধ্যও যেন থাকে না তখন। লম্বা বেণি ঝাঁকিয়ে তানি হাসলেই কেবল ঘরে ঘরে প্রসন্ন হাওয়া ছড়ায়।
ঠোঁটের কোণে হাসি আটকে তানি বাবার দিকে তাকায়, ‘তুমি অনেক পাল্টে গেছো বাবা। আগে খুব অলস ছিলে।’
রনকের মুখের আলো নিভে যায়। মেয়েটা চলে যাবে। লকডাউনের ভেতরেও আজ মেয়েকে নিতে আসছে বহ্নি। তানিকে কথামতো ঐ বাসায় নিয়ে যায়নি বলে গত সপ্তাহেও এসেছিল বহ্নি, মেয়েকে যেতে দেয়নি রনক। বলেছে, তানি আপাতত এখানেই থাকুক। এভাবে এ বাসা ও বাসা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বহ্নি সেদিন মানলেও আজ মানেনি। মনে করিয়ে দিয়েছে, যে যখন চাইবে তখনই মেয়েকে দেখতে পারবে, এমনই শর্ত আছে আপসনামায়।
মেয়েকে পাঠাতে হবে মনে করিয়ে দিতে সকালে ফোন করেছিল বহ্নি। ফোনের ওপাশ থেকে আসা বহ্নির গনগনে কণ্ঠস্বর মনে করতে করতে বিমর্ষ রনকের ইচ্ছে করে নিজেকে কোথাও আড়াল করে। মেয়েকে জানায়নি রনক, ওর ‘অলস বাবার’ চাকরিটা আর নেই। মন্দাকালের ছাঁটাইয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য কর্মী হিসেবে যে তালিকা প্রকাশ করেছে অফিস, এর এক নম্বর ক্রমিকেই আছে ‘রনক হাসান’ নামটি।
তানির হাত থেকে কাপড়, গামছা নিয়ে স্নানঘরে ঢুকতে ঢুকতে রনক শুনতে পায় মসজিদ থেকে ঘোষণা আসছে, ‘মসজিদে এখন আজান হবে, আপনারা কেউ মসজিদে আসবেন না, বাসায় নামাজ পড়ুন।’ জীবনে প্রথমবারের মতো এমন ঘোষণা শুনে ওরা দুজন চমকে যায়।
‘অবস্থা দেখেছো বাবা ? ভয় করছে আমার।’
‘দুরো কিসের ভয় ? দেশে কোটি কেটি মানুষ, কতজন মরবে বল ?’
‘মরছে বাবা, রোজই মরছে মানুষ। হিসাবে আসছে না সব।’
‘তুই ওসব খবর দেখা বাদ দে তো।’
‘কী করব তবে সারাদিন ? আর কার সঙ্গে কথা বলব, কার কথা শুনব ? ঐ টিভিটাই যা আমার সঙ্গে কথা বলে।’
এখন সময়টাই কেমন চুপ মেরে গেছে, কথা বলছে না, কথা শুনছে না। নিচের রাস্তা আটকে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে ছেলেমেয়েদের ক্রিকেট খেলাও বন্ধ। পাখিদের সন্ধিবদ্ধ উড়াল নেই। হঠাৎ রিকশার ক্রিং ক্রিং, সঙ্গে বোলার আর ফিল্ডারের চিৎকার, ‘মামা দাঁড়াও এই বলটা কইরা নেই…এ্যাই এইটা নো বল কিন্তু…কে বলেছে! মোটেও নো বল না…মিথ্যাবাদী…তুই মিথ্যাবাদী!’ সব তর্ক, সব কলরোল শান্ত। কিছু নেই। কোথাও কোনও শব্দ নেই। শব্দহীনতার নিবিড়ে দুজন মানুষের ভেতরে কেবল অন্তহীন গুঞ্জন চলে। ঠিক তখনই বহ্নি আসে। এই বাসায় এলে কখনও ওপরে ওঠে না বহ্নি, সিঁড়িঘরে দাঁড়িয়ে ফোন করে তানিকে নামতে বলে। আজও তাই করেছে।
মা এসেছে জানিয়ে বাবার দিকে না তাকিয়েই তানি ব্যাগ হাতে নেয়।
৭
কুকুরগুলো বোধহয় খবর পেয়ে গেছে, শহর থেকে ওদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। সারারাত ওরা দলবাজি করতে করতে ডেকেছে। ডগিটাও ঘুমায়নি সারারাত। থেকে থেকে ডেকে উঠেছে। ডগিটার অযাচিত ডাকে অরণি ঘুমের মধ্যে কেঁপে কেঁপে উঠেছে। বহ্নির রাতজাগা সময়কেও সক্রিয় রেখেছে ওর উৎকণ্ঠিত স্বর। পাভেল একবার ধড়ফড় করে উঠে টয়লেটে ঢুকে ডগিটার জনক-জননীর নিষিদ্ধ সম্পর্ক নিয়ে অবিশ্রান্ত স্বরে গালিগালাজ করেছে।
দরজা খোলা টয়লেটের ভেতরে কমোডে বসা দু পেয়ে মানুষের দুর্গন্ধময় জল ছাড়ার শব্দ আর মুখ নিঃসৃত বাণী শুনতে শুনতে বহ্নি বারবার নিজেকে ভর্ৎসনা করছিল। এই দুই বছর ধরে কিছুতেই নিজের হিসাবের ছকটা মিলাতে পারেনি বহ্নি, কী করে ও ঝাঁপ দিল এই সর্বনাশের ভেতর খুঁজে পায় না সেসবের নেপথ্যের কারণ। পায় না বললে এক প্রকার মিথ্যে বলা হবে। বহ্নি জানে, একজন মানুষ ওকে ঠেলে দিয়েছে এমন নিবিড় অন্ধকারের ভেতরে। বহ্নির সঙ্গে সায় দিয়ে অবশিষ্ট রাতজুড়ে গলির কুকুরগুলো হল্লাবাজি করেছে।
এই গলিতে সংখ্যায় ওরা বারো-তেরো। পত্রিকায় খবরটা দেখেছিল বহ্নি তহবিলের অভাবে গত কয়েক বছর ধরে শহরের কুকুরগুলোর বন্ধ্যাত্বকরণ কর্মসূচি বন্ধ আছে। বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এদের অপসারণ চেয়ে মানুষেরা আন্দোলন করছে। সেই কারণেই হয়তো ওদের মধ্যে চঞ্চলতা আর অস্থিরতা বেড়েছে। এদিকে করোনার প্রকোপে হোটেল আর ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্টের অভাবেও ওদের প্রায় অভুক্ত থাকতে হচ্ছে।
এদেরই একজন ডগিটা। ডগিটা ওদের ভবনের সিঁড়ির সামনে বসে থাকে, রোজ একবার-দুবার করে পাভেলের তাড়া খায়। পাভেল এই প্রাণিটাকে দুই চোখে দেখতে পারে না। ওর আওয়াজ পেলেই বলে করোনা বিদায় নিলে প্রথমেই বাসা ছাড়বে। এই ফ্ল্যাট বিক্রি করে অভিজাত এলাকা দেখে বড় বাসা ভাড়া নেবে। বহ্নি জানে এই মন্দাকালে পাভেলের হাতে অনেক টাকা এসেছে। পাভেলের শরীরে টাকার ঘ্রাণ লাগলে ও এখন টের পায়।
বিয়ের পর পর ঘ্রাণ বা রং কিছু নিয়েই ভাবত না বহ্নি, অবধারিতভাবে দুটো সংসারের রং, ঘ্রাণ, ছন্দ সব আলাদা হবে তা ও জানত। বুঝত সোনালি সিঁথিতে রুপালি চুল চিকচিক করলেও ব্যথার মতো বেজে যাওয়া দিনগুলো স্মৃতিঘরে বন্দি রাখতে হবে, ভুল করে অন্যকে দূরে থাক নিজেকেও দেখানো যাবে না। আর বুঝত জানালার ওপাশের খইফোটা মেঘগুলোও এক, অকৃত্রিম থাকবে। বৃষ্টি না ছুঁয়ে দিলেও কারণে অকারণে মেঘের কাছে মেঘ সরে সরে যাবে।
পাশের বাড়িতে গান বাজছে। হিন্দি গানের অচেনা সুরের সঙ্গে দূর থেকে চেনা একটা সুর ভেসে আসে, ‘একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি…।’
রনক গান গাইতে পারত। বহ্নির বিস্মিত দৃষ্টি আরও তীব্র করতেই যেন নিবিড় কণ্ঠে গাইত, ‘যেটুকু যায় যে দূরে/ভাবনা কাঁপায় সুরে/তাই নিয়ে যায় বেলা/নূপুরের তাল গুনি…।’
বাবার গানের গলা পেয়েছে তানি। ভোরের রেওয়াজে তানির পাখিকণ্ঠ উড়ে উড়ে যেত অনেক দূর। মেয়েটা রেওয়াজ করে না অনেকদিন। হারমোনিয়ামটা কোথায় ওর ? এই বাড়িতে ? না ঐ বাড়িতেই রয়ে গেছে ?
কার্নিশে কাকেরা ঝগড়া করছে। ভাগ-বাটোয়ারা মনমতো হচ্ছে না কারও। ঝগড়া করতে করতেই ওরা একসঙ্গে উড়ে চলে যায়। ঝড়-বাদলের আভাস পেয়েছে মনে হয়।
গম্ভীর গম্ভীর কিছু মেঘ উড়ছে আকাশে। মেঘের ছোট ছোট ঢেউয়ের ভাঁজ গুনতে গুনতে বহ্নির মনে পড়ে, ময়লা নিতে আসবে চন্দন। রান্নাঘরের ময়লার ঝুড়িটা সিঁড়িঘরের কোনায় রাখতে রাখতে নিজেকে বারবার শোনায়, বাবার দেওয়া ফ্ল্যাটটা ছেড়ে কখনওই যাবে না। পাভেলকে ফ্ল্যাট বিক্রি করে টাকাও দিবে না। পাভেল জানে না, বহ্নির পক্ষে এ বাসা পাল্টানো সম্ভব না। এই বাসা পাল্টালে তানিকে নিজের কাছে আনার অধিকারটুকুও পাভেল আর ধরে রাখতে দেবে না। শুধু কি তাই, এই বাড়িঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ছড়ানো মায়াও হাতছাড়া হয়ে যাবে।
শুধু চার দেওয়ালের মায়ায়ই না, সিঁড়িঘরে আশ্রিত কুকুরটার জন্যও মায়া বেড়ে যাচ্ছে রোজ। প্রাণিটা নিজেও মায়া বোঝে। ওর ঘ্রাণশক্তিও প্রবল। অরণি ওকে দেখলে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। খিলখিলিয়ে হাসে। ভাঙা ভাঙা শব্দ জুড়ে বলে, ড-গি-টা। এখন ওর নামই ডগিটা হয়ে গেছে। অরণির রাখা নাম তানি চূড়ান্ত করেছে। তানিকে দেখলেই ডগিটা পায়ে পায়ে ঘোরে। শুরুর দিকে তানি ওকে দেখলে লাফিয়ে উঠত। এখন মায়ের মতো সেও ওর জন্য সিঁড়ির আড়ালে খাবার রেখে দেয়।
তানির স্কুল বন্ধ। ও এই সময়ে অনলাইনে ক্লাস করে। এখন তানির ঘরের দরজা বন্ধ। সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। এই বাসার বাড়তি ঘরটাতে তানি থাকে। ইদানীং কমই থাকে। বহ্নি বোঝে ও এখানে আর থাকতে চায় না। তানিকে জোর করে না বহ্নি, তবু রনক প্রতিশ্রুতিমতো ওকে এই বাসায় আসতে দেয়।
পারিবারিক আদালতে নিজের পক্ষে রায় পেয়েছিল বহ্নি। মেয়ের আইনি অভিভাবকত্ব আর ভরণপোষণের জন্য পৃথক ডিক্রি পেয়েছিল। পরে রনকের করা আপিলে ওপরের আদালতে আপসনামা করে বহ্নি তানির ভাগ রনককে দিতে রাজি হয়েছিল। রনককে এতটুকু দয়া তানির কারণেই দেখিয়েছিল বহ্নি। ততদিনে বহ্নি ওর বাবার গোয়ার্তুমির কাছে নত হতে শুরু করে পাভেলকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাভেলকে বিয়ে করার আগেই এই ফ্ল্যাটটা মেয়ের নামে লিখে দিয়েছিল বহ্নির বাবা। আর দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার ঠিক পনেরো দিন পরে বহ্নির বাবা মারা গেছে।
বহ্নি টের পায়, তানিকে জিতে নেওয়ার নির্মম উল্লাস নির্জীব হয়ে আসছে ক্রমশ। প্রতিশোধ নেওয়ার সীমারেখাহীন আনন্দটা তো ঝিমিয়ে পড়েছে সেই কবেই।
গতকাল ঐ বাসা থেকে মেয়েকে নিজেই নিয়ে এসেছে বহ্নি। বরাবরের মতো ওপরে ওঠেনি। তানি নিচে নামার আগে বারান্দায় দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখেছিল বহ্নি। না, যেমন দেখতে চেয়েছিল তেমনই আছে সে। ভেঙে পড়া মানুষের মতো মাথা কুঁজো করে দাঁড়িয়েছিল। তানিকে সঙ্গে নিয়ে বহ্নিকে কড়া রোদের মধ্যে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছে। কিছু ফেলে যাচ্ছে ভঙ্গিতে পেছনে ফিরে তাকিয়েছিল বারকয়েক। আসলে বারান্দায় দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখতে চাচ্ছিল।
রনকের মুখটা ছোট হতে হতে চেনা একটা দৃশ্য সামনে চলে এসেছিল বহ্নির। ঐ একটা দৃশ্যের ভেতরেই যেন প্রায় তেরো বছরের একটা যুগলজীবনের শুরু থেকে শেষটাও এঁকে দিয়েছিল কেউ।
এখনও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে দৃশ্যটা। দুজনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঘেয়ো কুকুরের মতো গলা উঁচু করে চিৎকার করছে।
‘সাধু সাজছো ? আজই প্রথম! আগে বলো, ঐ মেয়ের সঙ্গে কয়বার শুয়েছো তুমি ?’
‘থামো বহ্নি। বাড়াবাড়ি করো না। ঘরে মেয়ে আছে।’
‘এখন খুব লাগছে, না ? এখন মনে পড়েছে…মেয়ে আছে! ঐ নটির সামনে কাপড় খোলার আগে মনে পড়েনি ?’
‘চুপ…একদম চুপ…!’
‘কেন চুপ করব ? পরকীয়াতে কী থাকে আমি জানি না ভেবেছো ? এই বয়সে নতুন শরীর হাতাতে খুব মজা লাগে, তাই না ?’
রনকের হাতের আঘাতে ছিটকে পড়েছিল বহ্নি। ঐ প্রথম আর ঐ শেষ। কখনও হাত ওঠেনি রনকের। বহ্নিরও না। রনকের গালে সপাটে চড় মেরে সেদিন ঐ বাসা ছেড়ে এসেছিল বহ্নি।
৮
আকাশে ধূসর রং লাগতে শুরু করেছে। বিচিত্র ভঙ্গিতে ছড়িয়ে পড়ছে মেঘ। ক্ষিপ্ত যেন, কিছুটা লক্ষ্য ভ্রষ্ট পায়ে ছড়াচ্ছে বৈচিত্র্যহীন এক রং। ধূসর, আদতে রংহীন রং। পরিচ্ছন্ন তুলির ডগায় থেকেও এই রং ক্লান্তি ছড়ায়।
ক্লান্ত রনক একা একা বসে দেখে রংহীন রঙের পর্দায় কী করে ছেয়ে যায় আকাশের ফ্রেম। এভাবেই তো একাকিত্ব বিস্তৃত হয়েছিল ওর জীবনে। ভাবেনি রনক, পেটপুরে ভাত খেয়ে ভাতঘুম দেওয়ার মতো দু হাতে জড়ানো সুখগুলো মুছে দিবে ভাগ্যের তুলি। ভাগ্য ? যার নিয়ন্ত্রক স্বয়ং রনক। না কি সৃষ্টিকর্তাই সব নিয়ন্ত্রণ করছে ?
একটা রাত, মাত্র একটা রাত গ্রাস করে নিয়েছিল রনককে। ঐ রাতেই প্রথম জেনেছে এক তুড়িতে শরীরের শুচিতা ঝেড়ে ফেলা যায়। শুধু ঐ রাত কেন বুঝতে শেখার পর থেকেই রনক দেখেছে এই সমাজে সতীত্বের মাপকাঠিতে সাধারণত মেয়েদের মাপা হয়। আর মেয়েরা একই কাঠিতে মাপে নিজের বাবাকে, প্রেমিককে, স্বামীকে বা ছেলেকে। তাই পুরুষের কোনও একদিনের একটা ভুল তার জন্য পাপ হয়ে যায়। রনকের কাছে যা ভুল বহ্নির কাছে তা ছিল পাপ। এখন রনক তাই পাপবিদ্ধ।
মৃন্ময়ীর সঙ্গে একবারই বিছানায় গিয়েছিল রনক। নতুন একটা শরীরে বুঁদ হতে হতে কী করে যেন নিজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। ঐ মুহূর্তে যদি একটিবারের জন্যও তানি কিংবা বহ্নির মুখ মনে পড়ত তাহলে রনক ফিরে আসতে পারত। আসলে ভিন্ন নারীর অচেনা শরীরের আদিম ঘ্রাণ ওকে ভুলিয়ে দিয়েছিল সব। এই অজুহাত বহ্নিকে দেখিয়ে কোনও লাভ নেই, তাই বহ্নির ছুড়ে দেওয়া প্রতিটা প্রশ্নের সামনে রনক বরাবর চুপ করে ছিল। শেষদিন পারেনি। ধৈর্য হারিয়ে পরিমিতিবোধ পেরিয়ে বহ্নির গায়ে হাত তুলেছিল।
বহ্নির আগুনহীন ফ্যাকাসে মুখটা মনে পড়ে। আঁচড়হীন পুরোনো কাগজের মতো মুখাবয়ব আজও চোখ বন্ধ করলে স্ফটিকস্বচ্ছ কাচের এপাশে থেকেই দেখতে পায় রনক। সেদিন মৃন্ময়ীই বরং অনেক বেশি দীপ্তিময় ছিল। মৃন্ময়ীর দীপ্তি, মৃন্ময়ীর সৌন্দর্য ছিল কুহকের মতো। ওর শরীরে ডুবতে গিয়ে একবারের জন্যও কারও কথা মনে পড়েনি।
আহা! কেন যে ঘোরে পড়েছিল! কেন যে পাপী করেছিল নিজেকে! কিন্তু পাপী কেন হবে! মাঝেমধ্যে নিজের স্খলনের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে ইচ্ছে করে। শত চেষ্টাতেও রনক কোনও যুক্তিই সাজাতে পারে না, বরং ভেতরটা এফোঁড়-ওফোঁড় করলে দেখতে পায়, যুক্তি-বুদ্ধির আবর্তে থেকেও ও পাপ করেছে।
মেয়ের ঘর থেকে গান ভেসে আসছে, ‘ওলো সই…ওলো সই…।’ মন ভালো থাকলে মেয়েটা এমন গুনগুন করে গান করে। গতকাল দুপুরে মেয়েকে বহ্নি নিজেই এসে দিয়ে গেছে। রাস্তায় পুলিশ নাকি দুইবার রিকশা থামিয়েছে, লকডাউনের ভেতরে কেন বের হয়েছে তা নিয়ে ভর্ৎসনা করেছে। এসব শুনে রনক একবার জিজ্ঞাসা করেছিল, বহ্নিকে ও পৌঁছে দিবে কি না ? ওর প্রশ্ন শুনে হড়বড় করে বলে উঠেছিল বহ্নি, ‘না…আমি একাই যেতে পারব। আবার আটকালে বলব, ওষুধ আনতে বের হয়েছিলাম।’ বহ্নির বিব্রত মুখ দেখে রনক বুঝেছিল ঐ বাড়িতে পাভেল আছে। এই কারণেই হয়তো তানিকে তাড়াতাড়ি দিয়ে গেছে। বহ্নি না বললেও রনক বুঝতে পারে, ঐ বাসায় তানির উপস্থিতি এখন বহ্নির জন্য অস্বস্তিকর। কিন্তু এই কথা মুখ ফুটে স্বীকার করবে না।
কী করে করবে ? রনকের কাছে নত বা ছোট হতে চাইবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। রনকের মাথাটা তো ছোট হতে হতে একেবারে ধুলার সঙ্গে মিশে গেছে, বহ্নির জীবনে একেবারে অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে রনক।
আবার মৃন্ময়ীর কথা মনে পড়ে। ওর সঙ্গে যেই রাতটা কাটিয়েছিল সেই রাতেও নিজের অস্তিত্ব ভুলেছিল রনক। মৃন্ময়ীর শরীরটা এমনভাবে টেনেছিল ওকে, মেয়েটাকে একদম অচেনা মনে হয়নি। মৃন্ময়ীও নিজেকে অর্পণ করেছিল। সংযম হারিয়েছিল রনক, সম্ভোগের বিভ্রান্তি ওকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ভিন্ন এক পৃথিবীতে। যখন ঘোর কেটেছিল তখন নিজেকে হত্যা করা ছাড়া ভিন্ন কোনও পথ জানা ছিল না ওর। কিন্তু আত্মহত্যার উপায় ছিল না, জীবনের লোভ ওকে বহ্নির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ভালো মানুষ হতে চেয়েছিল রনক, কোনও মুখোশ পরতে চায়নি। নিজের মুখে তাই ভুল স্বীকার করেছিল বহ্নির কাছে। সেটাই কাল হয়েছিল। আহসান আগেই সতর্ক করে বলেছিল, স্বামী বা স্ত্রীর কারওই পরস্পরকে সব গোপন কথা বলতে নেই, কিছু কথা কিছু ঘটনা গোপন রাখা ভালো। এই গোপনীয়তা জীবনকে মসৃণ করে। চূড়ান্ত মূল্য দিয়ে সেই শিক্ষা লাভ করেছে রনক। এখন আহসানের সঙ্গে কথা হলেই আহসান রনককে কটাক্ষ করে, বলে, ‘মৃন্ময়ী না, তোর সাধুগিরিই তোরে ডুবাইছে।’
দিনক্ষণ মনে নেই। মৃন্ময়ী কবে কী করে এসেছিল, হেসেছিল কিছু মনে নেই। মৃন্ময়ী একটা ঝড়, মৃন্ময়ী একটা ভীষণ তুফান, যেই তুফানে আকাশে মেঘ থাকে না, থাকে বিজলি। আর বহ্নি হলো পিলসুজ, নিভু নিভু জ¦লেও দীপ্তি ছড়িয়ে যায় দীর্ঘ সময় ধরে।
মনে পড়ে, বিয়ের রাতে দুজনের শারীরিক সংযোগ ঘটেনি। পার্লারে বাঁধা চুল ছাড়াতে ছাড়াতে অস্থির হয়ে উঠেছিল বহ্নি। বিয়ের ভারী মেকআপ, সাজ-পোশাক সব গুটিয়ে বহ্নি যখন বিছানায় এসেছিল তখন রনকের চোখ লেগে আসছিল। কিন্তু পাশে কেউ বেলির সৌরভ নিয়ে শুয়েছে টের পেয়ে তৎক্ষণাৎ চোখ মেলেছিল রনক। এরপর দুজন দুজনকে পেয়েছে, সেই বিহ্বলতা কাটিয়ে ওরা আর শরীরে একাত্ম হতে পারেনি। বহ্নি কেঁদেছিলও খুব, বারবার বলছিল, ‘আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না তোমাকে পেয়েছি…।’ ঐ রাতে দুজনের মাঝখানে সবচেয়ে অগুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে অপাঙ্ক্তেয় বিষয় ছিল শরীর। আর সেই শরীরই কি না এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে!
রনক কেন এখনও উপেক্ষা করতে পারছে না বহ্নিকে ? কেন পারছে না মৃন্ময়ীর কাছে যেতে ? এত সাধুতা, এত ঋষিভাব কেন দেখাচ্ছে রনক ? ওর কি শরীরী চাহিদা নেই ? বহ্নির প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে কি রনকের শরীর নিভে গেছে ?
ঘাড় ভেঙে মাথা বুকের সঙ্গে চেপে আসে। দেশের ঘোর দুর্যোগের ভেতরেও কেন শরীরবিষয়ক ভাবনা প্রবল হয়ে উঠছে ? তবে কি রনকের জীবনে এখনও শরীরের প্রয়োজন ? শরীরের তৃপ্তিই কি ওকে ভাবনার টানাপোড়েন থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারবে ? এখন একটা নারীশরীর কোথায় পাবে রনক ? মৃন্ময়ীর কাছে যাবে ? শুধু শরীরের জন্য ? মৃন্ময়ীকে তো ও কখনওই ভালোবাসেনি। একটা রাতের জন্য ওর শরীরকে ভালোবেসেছিল। মৃন্ময়ী কি ওকে নেবে ? আহসানকে কি ফোন করবে ? বলবে কি মৃন্ময়ীর নতুন ঠিকানাটা দে… ?
এবার নিজের ওপরে বিরক্ত হয়ে ওঠে রনক। কত সব অসংলগ্ন প্রশ্ন সেই কখন থেকে ওকে খুঁচিয়ে চলছে। পেট খালি থাকার পরেও কেন এমন সব বিরক্তিকর ভাবনায় মাথার ভেতরটা ভরে উঠছে কে জানে।
গুনে গুনে হয়তো আর মাস দুই পেটে ভাতে চলতে পারবে রনক। এছাড়া তানি কিংবা ওর আর কোনও খরচই বহন করতে পারবে না। বহ্নির করা মামলায় দেনমোহর আর ভরণপোষণের ডিক্রির এককালীন টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে ওর সঞ্চয় সেই কবেই তো শূন্যের কোঠায় গিয়ে পৌঁছেছে। উকিল সাহেব অবশ্য বলেছিল, একবারে টাকাটা না দিয়ে কিস্তিতে টাকা দিতে, আদালতে এমন দরখাস্ত দিলেই নাকি মঞ্জুর হয়ে যায়। রনকের বাবাও বলেছিল, আদালতের বারান্দায় বহ্নিকে ঘুরিয়ে মেরে টাকা দিতে। রনক রাজি হয়নি। ওর ওপর শোধ নিতে বহ্নি টাকার বিষয়ে কোনও ছাড় না দিলেও রনক ছাড় দিয়েছিল।
রনক বাইরে যাবে। বাইরে গেলেই তো মানিব্যাগে হাত দিতে হবে। অন্যদের মতো তো পেটফোলা মানিব্যাগ না ওর। কে বলে মহামারিতে না খেতে পাওয়ার শঙ্কায় লোকে অস্থির হয়ে আছে, এরা খরচের চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠছে। বাইরে বের হলেই দেখা যাচ্ছে, দিব্যি বাজার-সদাই করছে সবাই। আগের চেয়ে বরং বেশি করছে। যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় খাবার, পানীয় মজুদ করছে। দরকারি, অদরকারি জিনিসপত্র দিয়ে বাড়িঘরকে গুদামঘর বানাচ্ছে।
তানি বলছিল, কিছু বাজার দরকার। ডিম, মাছ আর কী কী যেন ফুরিয়ে এসেছে। মেয়ের সামনে পড়তে ইচ্ছে করছে না রনকের। অবশ্য বেশিক্ষণ আড়ালে থাকতে পারবে না, মেয়ে ঠিক ঠিক ধরে ফেলবে, বাবা কিছু লুকাচ্ছে।
৯
বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ থেমে যেতেই তানি দুজনের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। কাক্সিক্ষত স্বর দুটো নরম হাওয়া পেরিয়ে ঘরের চৌহদ্দিতে বৃষ্টির মতো ছলকে পড়ে। ওর বুকের ভেতরে আস্ত এক পাহাড় আছে। তানি নিজেই পাহাড়ের শক্ত গা খুঁড়ে চলে অবিরাম। পাহাড় না তো যেন বুক ভাঙে। দুজনের কথোপকথনে বুকভাঙা শব্দ মিহি থেকে মিহি হতে থাকে। আর তানি চুপচাপ শুয়ে থাকে।
‘তুমিই তো চেয়েছ মেয়ে তোমার কাছে থাকবে। এখন কেন মেয়েকে আমার কাছে দিতে চাইছো ?’
‘চেয়েছি। এখন আর চাই না।’
‘এই নিয়ে কত কিছু হলো। আর এখন বলছো চাই না ?’
‘না চাই না। চাই ও তোমার কাছে থাকুক। ওকে তুমি নিয়ে যাও।’
বুকের ভেতরে ধক করে ওঠে তানির। মা কি সব বুঝে গেছে ? মা কি বুঝে গেছে পাভেল নামের লোকটা তানির দিকে কী করে তাকায় ? তানিকে তাই কি মা আর নিজের কাছে রাখতে চাইছে না ? আর বাবা! বাবা কেন তানিকে আর রাখতে চাইছে না ? আজমপুর থেকে বাড্ডা, বাড্ডা থেকে আজমপুর করে করে তানির জীবন কেন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল এই দুজন ? যারা একটা সময়ে তানিকে নিজের দখলে পেতে আদালতের বারান্দায় দৌড়েছে তারা কেন এখন আর ওকে চায় না ?
সব প্রশ্ন, সব অস্বস্তি নিজের ভেতরে চেপেই বড় হচ্ছে তানি। কেন যেন মনে হয় কেউ শুনবে না ওর কথা। বিশ্বাসও করবে না। কে শুনবে ওকে ? সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। ওর কথা শোনার জন্য কারও কি অবসর আছে ?
তানির চোখে প্লাবন। আর বুকের ভেতরে সুতোর গুটি। গুটিটা ঘুরছে নিঃশব্দে আর আয়তনে বড় হচ্ছে।
‘না। আমি চাই না তানি আর এই বাসায় থাকুক। আমার ইচ্ছে হলে আমিই যাব তোমার ওখানে। মেয়েকে দেখে আসব।’
‘আমার বাসায় তোমার না যাওয়াই ভালো। আমি বরং বাইরে কোনও রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাব মেয়েকে।’
‘রেস্টুরেন্টে! একবার রেস্টুরেন্টে যাওয়ায় কী ঘটেছিল মনে নেই তোমার ?’
তানির মনে আছে। মায়ের পিছু পিছু ক্ষ্যাপা ঘোড়ার মতো ঐ লোকটা গিয়েছিল রেস্টুরেন্টে। কী বিশ্রী ভাষায় যে কথা বলেছিল বাবার সঙ্গে। তানি যেন কিছু না শুনতে পায় তাই বাবা ওকে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মা তা দেখে ছুটে এসে বাবার গালে চড় বসিয়েছিল জোরে। তারপর লোকটা মাকে নিয়ে ঘোড়ার মতো ছুটতে ছুটতে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
খট খট শব্দ হচ্ছে। তানির পড়ার টেবিলের ওপরে অরণির রেখে যাওয়া খেলনাটা চলতে শুরু করেছে। অর্ধবৃত্তাকার চাকায় দাঁড়ান হলুদ ঘোড়ার পিঠে লাল আচ্ছাদন। ঘোড়ার চাকা বাতাসে গড়াচ্ছে। গড়াতে গড়াতে টেবিলের একেবারে ধারে চলে এসেছে। পড়ে যাবে খেলনাটা। শব্দহীন পায়ে দৌড়ে গিয়ে তানি ঘোড়াটা ধরে ফেলে।
এই বাসায় ডাকো কেন আমাকে ? না ডাকলেও পারো। ফোনেও তো কথা বললে হয়। নিচে দাঁড়িয়েও কথা বলা যায়। অরণির বাবা কী মনে করে আবার!’
‘কী মনে করে জানতে চাও ?’
‘না, জানতে চাই না।’
‘না! কেন জানতে চাও না…তোমার তো জানা উচিত, তোমার সম্পর্কে মানুষ কী কী ধারণা পোষণ করে।’
মা রেগে যাচ্ছে। মায়ের কণ্ঠস্বর চড়া হচ্ছে। তানি জানে এখন অনেক বেফাঁস কথা বলে ফেলবে মা।
আদালতের লাল কাপড়ে ঘেরা জায়গায় দাঁড়িয়েও সেদিন মা খুব জোরে জোরে চিৎকার করছিল। খুব রেগে গিয়েছিল মা বাবার ওপরে। চিৎকার করে বলছিল, ‘ঐ মানুষটা লম্পট…চরিত্রহীন। ওর কাছে আমার মেয়েকে রাখব না। কিছুতেই রাখব না।’ বাবা দূরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তানি দাদার পাশে বসে মাকে দেখছিল, তখনও ও বোঝেনি মায়ের রাগের কারণ। এখন তানি অনেক কিছু বোঝে। দুজনের অবস্থা, অবস্থান দুটোই বোঝে। বোঝে মস্ত নদীর ভেতরে টুপ করে একটা পাথর ডুবে গেছে, দুজনে অথৈ পানিতে মাথা ডুবিয়ে শুধু হাতড়ে মরছে, পাথরটা খুঁজে পাচ্ছে না কেউই। না বাবা, না মা।
‘মেয়েকে ডেকে দিচ্ছি। ব্যাগ গুছিয়ে নিক।’
‘আজ যাচ্ছে যাক তবে করোনার ভেতরে আমার ওখানে গেলে ওর কষ্ট হবে। অল্প কদিনের জন্য যায় সে এক কথা। এখন বাসায় কেউ নেই। তাছাড়া মেয়েটার অ্যাজমার ধাত, এ সময়ে ওর ছুটোছুটি করা মোটেও উচিত না।’
‘তুমি দায়িত্ব এড়াতে চাইছো ?’
‘হাসালে তুমি। এত কিছুর পরেও মামলাটা লড়ে গেছি আমি, হেরে গিয়ে আপসনামায় দেওয়া শর্ত মোতাবেক তোমার অ্যাকাউন্টে তানির ভরণপোষণের টাকা জমা দিয়ে যাচ্ছি।’
তানি কান খাড়া করে। বুঝতে পারে মা কোনও কথা বলছে না। গমগম একটা শব্দ হচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে আবার ? নাকি মা কাঁদছে ?
‘এই মাস থেকে আমার অ্যাকাউন্টে আর দিও না টাকা। তুমি মেয়েকে নিয়ে যাও।’
‘টাকা আপাতত দিতেও পারব না। আর তুমি যখন চাইছো তখন তানি যাক আমার সঙ্গে।’
‘মেনে নাও কেন এমন সবকিছু, কেন মেনে নাও। আজীবন তুমি এমনটা করে গেছো আমার সঙ্গে। এত ন্যাকামিপনা কিসের তোমার ? এত ভালোমানুষি কিসের ? এই পৃথিবীর মানুষের কাছে দেখাতে চাও তুমি কতটা মহান ? কতটা স্যাক্রিফাইস করেছো তুমি ? আর আমি স্বামী-সংসার ফেলে নতুন ঘরসংসার সাজিয়েছি ?’
মা থেমেছে। সুনসান হয়ে গেছে চারদিক। তানি দু হাতে মুখ চেপে ধরে মেঝেতে বসে। অনেকক্ষণ পরে মায়ের ভেজা ভেজা কণ্ঠস্বর শোনা যায়।
‘ভেতরে ভেতরে তুমি যে পুরোদস্তুর এক ইতর তা আমার চেয়ে কে আর ভালো জানে ?’
‘চুপ করো বহ্নি। মেয়েটা শুনছে।’
‘শুনুক, ও কী আর জানে না! ও কী জানে না ওর বাবা কেমন…।’
‘কেমন আমি ? খুব খারাপ!’
‘খারাপ! তুমি…তুমি…!’
এ ঘর থেকেও টের পাচ্ছে তানি, মা ছটফট করছে। এমন ছটফট করতে করতেই মা সবসময় রেগে ওঠে বাবার ওপরে। পুরোনো অনেক কথা বলতে বলতে সবকিছুর জন্য বাবাকে দায়ী করে। তানি এবার আর দুজনের কথা শোনার চেষ্টা করে না। বাবার দেওয়া সেই ঢাউস ব্যাগটা খাটের নিচ থেকে বের করে। ও নিজেও আর এই বাড়িতে আসতে চায়নি, সেই কথা মাকে বলতেও পারেনি তানি। মা ঠিকই বুঝেছে। মা ওর বলা, না-বলা সব কথাই বোঝে। মা নিঃশব্দে বুঝে যায় সবকিছু। তানি জানে মা ওর মা-ই আছে, বাবাও ওর বাবা, কেবল এই দুটি মানুষ এখন আর পরস্পরের নেই।
১০
বহ্নির আচরণে সেদিন নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়েছিল তানি। কী ভেবেছিল কে জানে। মেয়ের ভাবনার গভীরতার খোঁজ করতে ভয় পাচ্ছিল বহ্নি। তাই যাওয়ার সময় ওর চোখের দিকে চোখ রাখেনি। নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে কিছু না বলে তানিও বাবার পিছু পিছু বের হয়ে গেছে।
তানির আসা বন্ধ হওয়ার পর থেকে ওর ঘরটা নতুন করে ব্যবহার করতে শুরু করেছে পাভেল। পাভেল আসলে অপেক্ষা করছিল কবে ঐ ঘরে মালপত্র ওঠাবে। চক্ষুলজ্জায় কিছু বলতে পারছিল না। অবশ্য পাভেলের চক্ষুলজ্জা আছে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। এমন একটা মানুষকে বাবা কী করে ওর জন্য নির্বাচন করল বোঝে না। বাবাকে কী করে বিভ্রান্ত করেছিল পাভেল, আজও তা রহস্যময় বহ্নির কাছে। নাকি বাবা যেন-তেন ভাবে বহ্নির ডিভোর্সি পরিচয়টা মুছে দিতে চেয়েছিল ? এমনও হতে পারে বাবা পাভেলকে চিনতে পারেনি। বহ্নি যেমন চিনতে পারেনি রনককে।
বাবার আবেগের মূল্য দিতে গিয়ে কোথায় যে আটকে গেছে বহ্নি। বের হওয়ার কোনও উপায় নেই এখন। কী করে বের হবে! আরও একবার সংসার ছাড়লে আশপাশের মানুষগুলো বাঁচতে দেবে না ওকে। দশ জায়গায় ঘুরে বেড়ানো বেশ্যা উপাধি দেবে। আড়ালে আবডালে এখনই কম বলে না মানুষ। এক স্বামীর ঘর করতে পারেনি বলে বহ্নির চরিত্র নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করে। অথচ চরিত্র শব্দটা রনকই ঠুনকো করেছে।
সেদিন ঘরে ফিরে রনক এমনভাবে বহ্নির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, মনে হচ্ছিল ও সব হারিয়ে এসেছে। বন্ধুদের সঙ্গে চিল করবে বলে দুদিন আগে হৈ হৈ করতে করতে বাসা থেকে বের হয়েছিল রনক, বলেছিল, ‘আহসানই সব আয়োজন করেছে বুঝেছ। তোমারও মাঝেমধ্যে এমন করে বেরিয়ে পড়া উচিত। গার্লস ডে আউট। ঐ যে কার কার নাম বলো না, সুষমা, মনিকা, তনু…সব দল বেঁধে ঘুরতে যাওয়ার প্লান করলে। ধরো, ঘর-সংসারে একবারে লাথি মেরে বেরিয়ে গেলে। ফোনও সঙ্গে নিলে না। আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখলে না। ইচ্ছেমতো আড্ডা দিলে, খেলে, ঘুরলে। চাইলে একটু-আধটু ব্ল্যাক লেবেলও চেখে দেখতে পারো।’ শুনে বহ্নি হেসেছিল, ‘অত বড় পা নেই আমার। এই সংসার থেকে মুক্তিও নেই।’ রনক মুক্তির স্বাদ পেতে চেয়েছিল, ফিরে এসেছিল বহ্নিকে মুক্ত করে দিতে।
রনক সেদিন সামনে এসে দাঁড়ানোমাত্র বহ্নির পৃথিবী ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল। রনকের অমন মুখ তো দেখেনি আগে! এ কোন রনক ? ভাঙাচোরা, হাসিহীন, ভেজা ভেজা মুখ, আপাদমস্তক গ্লানিতে ডোবা। রনক না বললেও ওর ঐ চেহারা দেখে বহ্নি ঠিকই সব বুঝে যেত। তবু রনক বলেছিল। আচ্ছা রনকের আত্মসমর্পণ আর আত্মগ্লানির পর বহ্নি কি ওকে ক্ষমা করতে পারত না ? যদি ক্ষমা করত, যদি একটু উদার হতো সেদিন আজ তো বহ্নি, তানি আর রনকের জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। পাভেলও আসত না ওর জীবনে। আর অরণি!
কান্না পাচ্ছে বহ্নির। না…ও এত উদার হতে পারবে না। আর রনকও তো বহ্নিকে মিথ্যা বলতে পারত, আর না হয় কিছু বলত না। কিছু কথা গোপন রাখলে কার কী-ই বা এমন ক্ষতি হতো! বহ্নি তো আর রনককে খুঁচিয়ে ওর কাছ থেকে সত্যটা বের করার চেষ্টা করত না। না হয় একবার, মাত্র একবারই রনক অন্য কোনও মেয়ের কাছে গেছে, ফিরেও তো এসেছে অনুতপ্ত হয়ে, বহ্নি কেন রনককে ক্ষমা করতে পারল না ? বহ্নির ভার্সিটি লাইফের বন্ধু সুষমা, ওর হাজব্যান্ডের অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আছে জেনেও তো দিব্যি সংসার করে যাচ্ছে। দুজনের কেউই কাউকে কিছু বুঝতে দিচ্ছে না। ঐ মেয়েকে নিয়ে দুই তিন মাস পর পর ট্যুরেও চলে যায় সুষমার হাজব্যান্ড, বলে বিজনেস ট্যুর। সুষমা ঐ সময়ে দিব্যি নিজের মতো থাকে, পার্লারে যায়, পেডিকিউর, মেনিকিউর, স্পা, বডি ম্যাসাজ করে, শপিং করে গাদিগাদি, বন্ধুদের নিয়ে সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখে। সুষমা এসব নিজেই বলেছে বহ্নিকে। অমন একটা বহুগামী পুরুষের সঙ্গে সংসার করা নিয়েও কোনও ক্ষোভ বা অনুশোচনা নেই সুষমার ভেতরে। সুষমা বলে, ‘এমন একটা নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে কোনও অনিশ্চয়তার ভেতরে পড়তে চাই না আমি। বাচ্চা দুটোও তো আছে। ওদের প্রতি ওদের বাবার ভালোবাসারও তো কমতি দেখি না।’
সুষমার কথা শুনে সেদিন ওর প্রতি প্রবল ঘৃণা জন্মেছিল বহ্নির। ও সাফ জানিয়েছিল, ‘রনক এমন কাজ করলে ওকে ছাড়তে এক মুহূর্তও দ্বিধা করব না আমি। না খেয়ে থাকব তবু না।’ সত্যি সত্যি রনককে ছেড়েছিল বহ্নি।
প্রথম দিকে একটা জিদ কাজ করছিল, বার বার মনে হচ্ছিল রনককে শাস্তি দিতে হবে, ওকে ধ্বংস করতে হবে, ওর কাছ থেকে সব সুখ কেড়ে নিতে হবে। বহ্নিকে বাদ দিলে রনকের সুখের নাম তানি। তাই তানিকে রনকের কাছ থেকে কেড়ে নিতে উতলা হয়েছিল বহ্নি। দিন-রাত উকিলের চেম্বার আর কোর্ট-কাচারিতে দৌড়েছে। এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে বহ্নি। দৌড়ানোর শক্তি নেই।
এসব কী আবোলতাবোল ভাবছে বহ্নি! তানির কথা ভাবছে না! অরণির কথাও ভাবছে না! অরণির শরীরটা ভালো নেই। সারাদিন কিছু খায়নি ঠিকমতো। শরীরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের মতো মায়ের সঙ্গে লেপটে আছে। জ্বর আসবে নাকি মেয়েটার! এই সময়ের জ¦র তো খুব খারাপ! ভাবনাটা বহ্নিকে সহসা অস্থির করে তোলে। অরণি মায়ের অবহেলা বোঝে, খ্যানখ্যান করে কাঁদে খানিকক্ষণ। বহ্নিও কাঁদতে চায়, বিছানার ওপরে আছড়ে পড়ে চাদর দলে মুচড়ে উথালপাথাল কাঁদতে চায়। পাভেলও চায় বহ্নি কাঁদুক। কথায় কথায় তাই সে বহ্নিকে ক্রমাগত নাস্তানাবুদ করে। ব্যবসার কাজে রংপুর গিয়েছিল পাভেল, পাঁচদিন পরে আসার কথা থাকলেও, একদিন পরেই চলে এসেছে। বাসায় পা দিয়েই তানিকে দেখে বিশ্রী ভঙ্গিতে তাকিয়েছিল। দুপুরে খাওয়ার সময় তানি বসেনি দেখে ওকে ডাকতে যাচ্ছিল বহ্নি, তখনই নাটুকে স্বরে পাভেল বলেছিল, ‘ডাকো, ডাকো। দেশে মহামারি লাগছে, খানাখাদ্য নিয়া হাহাকার চলে। আর আমি তো এই বাড়িতে লঙ্গরখানা খুলছি, যে কেউ আইসাই থালা নিয়া বইসা পড়তে পারে।’
বহ্নির ইচ্ছে করছিল, নিজের দুই কানে নিজেই তপ্ত শলাকা ঢুকিয়ে দেয়, বধির হয়ে যায়। তানি খেতে আসেনি। না এসে বহ্নিকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। একা একা কাঁদতে দিয়েছে। মেয়েকে এরপর এই বাসায় কী করে রাখে বহ্নি! কী করে রনকের ওপরে জোর খাটায়!
আগে খুব জোর খাটাত। রনককে এক প্রকার বাধ্যই করত এটা সেটা করতে। আবার ছাড়ও দিত। রনক কখনও বহ্নির ওপরে কোনও জোর খাটায়নি। বহ্নির ইচ্ছেকে নিজের ইচ্ছের ওপরে প্রাধান্য দিয়েছে সবসময়। বহ্নির খুব কেনা-কাটার বাতিক ছিল। একটা সেফটিপিন থেকে শুরু করে তানির স্কুলের পানির পটটা পর্যন্ত ও নিজে কিনতে পছন্দ করত। আর রনক ছিল উলটো স্বভাবের, নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও কিনত না। বাজারের ফর্দ রনকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বহ্নি মাঝেমধ্যে কপট শাসন করলেও রনকের এই স্বভাব ওকে ভেতরে ভেতরে স্বস্তি দিত।
পাভেলের মাঝেও কেনাকাটার বাতিক নেই। সে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তেমন কেনে না, বহ্নি কেনাকাটা করে টাকা-পয়সা খরচ করুক সেটাও পছন্দ করে না। আগের মতো বহ্নিরও খরচের ধাত নেই। কী কিনবে ? এখন বহ্নির চাহিদা, প্রয়োজন সব সংকুচিত হয়ে গেছে। আর নিজের শৌখিনতা বলতেও কিছু নেই। এখন বহ্নি পেট চালানোর জন্য যা দরকার শুধু সেদিকেই নজর দেয়। গৃহস্থালি জিনিসপত্র বলতে তেমন কিছুই কেনে না। মাত্র হাফ ডজন প্লেট, গ্লাস আর বাটি দিয়েই ওর সংসার চলছে। মাঝেমধ্যে নিজেকে তাই অচেনা মনে হয় বহ্নির।
মনে পড়ে আগে অল্প কিছু টাকা হাতে এলেই ও মার্কেটের দিকে ছুটত। খুঁজে খুঁজে একটা ছোট লবণদানি বা মেলামাইনের বাটি, গ্লাস কিনে ঘরে ফিরত। ঈদের সময় বোনাস পেলে নতুন কোনও ফার্নিচার ঘরে ঢোকানো নিয়ে উত্তেজিত হয়ে থাকত। নিজের উত্তেজনা রনকের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে পারলে ভীষণভাবে উচ্ছ্বসিত হতো। এখন তেমন কোনও উচ্ছ্বাস নেই, উল্লাস নেই। প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন কি সত্যি ফুরিয়েছে ? এই যে অরণির কাপড়গুলো ওয়ারড্রোবে জায়গা হচ্ছে না, বাসায় দুইয়ের অধিক মেহমান এলে বসতে দেওয়ার মতো অতিরিক্ত কোনও সোফা বা চেয়ার নেই, রান্নাঘরের বাসনপত্র রাখার কোনও সেলফ নেই… এসব কি প্রয়োজন না ?
এই বাড়িতে দামি আসবাব বলতে তেমন কিছু নেই। বহ্নিরই পুরোনো কিছু আসবাব আছে। পাভেল নিজের একটা বড় ব্যাগ ছাড়া কিছু নিয়েই এ বাড়িতে ওঠেনি। আসবাবপত্র বা ঘরকন্নার জিনিস কেনারও কোনও ঝোঁক নেই ওর। মাঝে মাঝে ডেন্টাল ক্লিনিকে সাপ্লাইয়ের জন্য বড় বড় কার্টনে মালামাল আনে, আবার নিয়েও যায়। বলে, ব্যবসার টাকা ব্যবসাতেই খাটাতে হয়, ঘরের জিনিস কেনা অপচয়। আর বহ্নি তো পুরো জীবনটাই অপচয় করে ফেলল!
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুগ্ণ পৃথিবীর এক কোণে পড়ে থাকা বহ্নির ভেতরে অযাচিত ভাবনার সংখ্যাও বাড়ে। অরণি ঘুমিয়ে গেলে নিজের ভাবনার মধ্যে বড় বেকায়দাভাবে হাবুডুবু খেতে থাকে বহ্নি।
১১
নিঝুম এক মাঠে একটা পাতাহীন কাঁটাযুক্ত গাছ দাঁড়িয়ে আছে। লিকলিকে লম্বা গাছের মাথায় একটা ঝুলন্ত লেজের পাখি বসে আছে, পাখিটা শিস দিচ্ছে, টুউ… টুউ… সুতীক্ষè শিস ওর বুক ছিদ্র করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে… অসহনীয় কষ্ট হচ্ছে… কষ্ট হচ্ছে… অবেলার ঘুম ছেড়ে ধড়ফড়িয়ে ওঠে রনক। ফোন বাজছে, বাবা ফোন করেছে।
‘সত্যিই কি তোর চাকরি নাই ?’
‘সত্যি মিথ্যার কী আছে বাবা। নাই তো।’
‘কী করবি এখন ? এই বয়সে নতুন চাকরি পাবি ? সবার তলা ফুটা, মহামারির মইধ্যে কেউ তোরে চাকরি দিব ?’
‘দেখি ব্যবসাপাতির চেষ্টা করতে পারি।’
‘ব্যবসা করবি কী দিয়া ? পুঁজিপাটা তো সব বউরে দিয়াই শেষ করছস। কে কইছিল তখন এত টাকার কাবিন করতে। কোর্ট-কাচারি কইরা মানসম্মান, টাকাপয়সা সব তো গেলই, পথের ফকির বানায় গেল ঐ মাইয়া। এখন নিজের পেটই চলে না।’
‘আমার চাকরি নিয়া আপনার চিন্তা করতে হইব না। যেই কাজে গেছেন সেই কাজ কইরা আসেন।’
‘হ, তোর চিন্তা তো মাইনষে করব। আর আসব মানে ? তুই আমাদের খাওয়াইবি কী ? সামনের মাসের বাড়িভাড়াও তো দিতে পারবি না। নিজের ভবিষ্যৎটা নষ্ট করলি। কত ভালো চাকরিতে ঢুকতে পারতি। বলছিলাম আমার সার্টিফিকেটটা কাজে লাগা…শুনলি না। আর লাবড়া-জাবড়া কত মানুষ এই সার্টিফিকেট দিয়া কত কিছু কইরা ফেলল।’
অস্বস্তিকর বিষয়টার মুখোমুখি হতে চায় না রনক কিছুতেই। তবু বার বার বাবাই মুখোমুখি করে। সন্তানদের কাছে নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিলেন তিনি এই সার্টিফিকেট দিয়েই। কত টাকা মূল্যে কিনেছেন তা না জানালেও বলেন, এই সার্টিফিকেট ছাড়া চাকরিই জুটত না কপালে। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের যে বিরোধিতা করেননি সেটাও বলেন দৃঢ়তা নিয়ে। এসব শুনলে রনক ভেতরে ভেতরে ভেঙে যায়।
বাবা ধূর্ত, সুযোগসন্ধানী রনক জানে। এ-ও জানে, একজন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নিয়ে ভালোটুকু তুলে আনলে নিচে ময়লাটুকুই অবশিষ্ট থাকে। ময়লা ছুঁতে চায় না রনক আর।
বহ্নির সঙ্গে কাটানো সময়ে এই বিশ্বাস আরও প্রবলভাবে গেড়ে বসেছিল নিজের ভেতরে। এরপর কী করে যেন এক ভূমিকম্পে ভেতরে চাপা পড়া সকল আবর্জনার উদ্গীরণ ঘটেছিল। সেসব সময়ের কথা মনে করতে চায় না রনক। এড়াতেও পারে না। সম্পর্কের দায় এমন করে বেঁধে রাখে যে বহ্নির মুখটা মনে পড়ে বার বার।
তালাকনামার নোটিশ পাঠিয়েছে জানিয়ে দরজা থেকে যেদিন রনককে ফিরিয়ে দিয়েছিল বহ্নি, ওর সেদিনের চেহারাটা মনে করলে নিজেকে নরকের কীট বলে মনে হয়। এত ঘৃণা, এত ঘৃণা জমেছিল বহ্নির চোখে-মুখে যে রনক ওর চোখে চোখ রাখতে পারেনি। জানত এই ঘৃণা তৈরির কারিগর ও নিজেই। এখনও পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঘৃণার তরলেই ডুবে আছে রনক। এই ঘৃণা অভিশাপের মতো। তাই বহ্নি চলে যাওয়ার পর থেকে রনকের জীবনে কোনও ভালো কিছু ঘটছে না।
নিচের গেটে তালা দিতে দিতে রনক টের পায় বৃষ্টি নেমেছে। ছাতা আনার জন্য এখন আবার তিনতলায় উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তানিকে বললে সামনের বারান্দা থেকে দড়ি দিয়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে ছাতা নামিয়ে দেবে। কিন্তু বের হওয়ার আগে দেখেছে, মেয়েটা অনলাইনে ক্লাস করছে, ওর মনোযোগে ছেদ ঘটানো ঠিক হবে না। ভাবতে ভাবতে সামনে এগিয়ে রিকশা ধরতে না ধরতেই বৃষ্টি নেমে যায়। তবু বাসায় ফিরে যায় না রনক। বৃষ্টি হোক, ঝড় হোক আজ ওকে আহসানের কাছে যেতেই হবে।
আহসানের অফিসে একেবারে ভেজা কাপড়ে ঢুকেছে রনক। ব্যক্তিমালিকানাধীন পাঁচতলা ভবনের তিন তলার দুটো কক্ষ নিয়ে আহসানের অফিস। শুধু অফিস বললে ভুল হবে। একটা কক্ষে খাট পেতে আহসান নিজের থাকার ব্যবস্থাও করেছে। আগে বামপাশের একটা ইউনিটে ছিল ওর প্রেসের একসেসরিজ সরবরাহের অফিস কাম গোডাউন। ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছে আহসান। দেশ ছাড়বে।
ভেজা কাপড় থেকে সোফা বাঁচাতে আহসানের কক্ষে ঢুকেও দাঁড়িয়ে থাকে রনক। বন্ধুর দিকে চেয়ার এগিয়ে দেয় আহসান।
‘কীরে শালা পুকুরে ডুব দিয়া আসলি নাকি। না কারও ডরে কাপড় ভিজায় ফেলছস ?’
‘এক জায়গায় বসে টের পাবি কিছু, বাইরে বের হয়ে দ্যাখ।’
‘এক জায়গায় বইসা থাকলেও সব টের পাই। শুধু দেশ না, দেশ-বিদেশে কী ঘটে সব খবরই রাখি।’
আহসান দেশের বাইরে চলে যাবে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আকাশপথে যাত্রী পরিবহণ শুরু হয়েছে। সব দেশ তবু নিচ্ছে না যাত্রী, নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আহসানের কাগজপত্র ঠিকঠাক হয়নি এখনও। রনক জিজ্ঞেস করতেই ও ক্ষেপে ওঠে। এমনিতে খুব কম সময়ই খিস্তি ছাড়া কথা শুরু করে আহসান।
‘বালের দ্যাশ, পিছা মারি দেশের উন্নয়নে।’
‘তোর কাগজ হয় নাই ?’
‘বালের কাগজ। করোনামুক্তির সার্টিফিকেট নিছি দরদাম কইরা। এখন শুনি সব ধরনের ফ্লাইট বন্ধ। বাঙালি ভুয়া সনদ নিয়া ধরা পড়ছে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়া গিয়া। ঐসব দেশের সরকার ডাউন গ্রেড বইলা সব বন্ধ কইরা দিছে। দেশ থেইকা নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে যাওয়ার পর তাদের ওখানকার পরীক্ষায় করোনা ধরা পড়ছে। নেগেটিভের ভুয়া সনদ বিক্রি করতেছে বাঙালি। যেখানে যেই পরিস্থিতিতেই থাকুক শালারা ব্যবসা খুইলা বসে।’
রনক হাসে।
‘আমারেও একটা ব্যবসা খুইলা দে। বিপদে আছি।’
‘না করছে কে, ফেসশিল্ড, মাস্ক আর হ্যান্ড সানিটাইজারের ব্যবসা এখন রমরমা। শুরু কর। আমার এত বছরের প্রেসের ব্যবসা তো মাইর খাইছে। দেশে থাকলে ব্যবসা পাল্টাইতে হইব।’
রনকের মনে পড়ে তানিকে আনতে গিয়ে বহ্নির ওখানে বসার ঘরের এক পাশে ফেসশিল্ড, মাস্ক আর হ্যান্ড সানিটাইজারের সারি সারি কার্টন দেখেছে। বাইরে ইংরেজি লেবেল সাঁটা ছিল পণ্যগুলোর।
‘নাহ আমারে দিয়া হইব না। পুঁজিও নাই। গ্রামের বাড়িতে বাবা-ভাইয়ের কাছে ফিরা যাব নাকি ভাবি। আবার তানির কথা ভাবি। ও কি গ্রামে গিয়ে থাকতে পারবে ? শহরে মানুষ, ওর একটা ভবিষ্যৎও তো আছে। গ্রামে ভালো স্কুল নাই।’
‘চলে যা, ভাবাভাবির কিছু নাই। এই বছর আর স্কুল-কলেজ খোলা লাগব না সরকারের। তারচেয়ে বাড়ি ফিরা বাপের হোটেলে খা কয়টা দিন।’
বাপের হোটেল শব্দটা শুনে রনকের হাসি পায়, স্বস্তিও পায় হয়তো আপাত সমাধানে। পরক্ষণেই তানির মুখটি মনে পড়ে। ওদের দুজনের পিলো পাসিং খেলার ছোঁড়াছুড়িতে মেয়েটা কেমন আছে জানতে চাওয়ার সাহস নেই রনকের। কিন্তু এ কথা ও ভালো করেই জানে এখন তো ওদের লোফালুফিতে শূন্যে ভাসছে মেয়েটা, গ্রামের বাড়িতে থিতু হতে চাইলে ও নতুন এক গহ্বরের ভেতরে পড়ে যাবে।
১২
কত দিন হয়ে গেল, যেন এক মহাকাল, শরীরে-মনে একসঙ্গে জেগে ওঠে না বহ্নি। ওর ইন্দ্রিয়সকল কি জাগতে ভুলে গেছে ? বিপরীত লিঙ্গের স্পর্শের তালে কোরাসে গেয়ে উঠতে ভুলে গেছে ? রনকই একমাত্র পুরুষ যে ওকে সুরে সুরে জাগাত। এই জেগে ওঠা আরও প্রবলভাবে বুঝতে শুরু করেছিল তানি একটু ঝরঝরে হয়ে ওঠার পর। মেয়ে তখন টলমলে পায়ে হাঁটত, আধো আধো বোলে রাজ্যের সব কথা বলত, জীবনের শ্রান্তি ঝেড়ে ফেলে বহ্নি আর রনক তখন তুমুলভাবে উপভোগ করত শরীরী সুখ। বহ্নির তৃপ্ত মুখ দেখে রনক কৌতুকময় হেসে উঠে বলত, ‘আমরা এখন পরিণত, একেবারে পাকা খেলোয়াড়।’ ‘ধ্যাত…’ বলে আশ্লেষে রনকের বুকে মুখ গুঁজতো বহ্নি। এখনও আড়াল খোঁজে বহ্নি, নিজেকে লুকাতে চায়, নিজের কাছে।
সমর্পণের শুরুর দিনগুলোতে মনের সাড় বুঝে ওঠার আগেই শরীরের ওপরে আগ্রাসী হয়েছে পাভেল। প্রস্তুতির আগেই অনুপ্রবেশের তাড়না থাকায় শরীরী সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক না হয়ে একপাক্ষিক হয়ে গেছে। এ এক বিপন্ন বোধে জড়িয়ে পড়া। ভেঙে ফেলবে সব ভেঙেচুরে ফেলবে ভাবতে ভাবতে অরণিও চলে এসেছিল গর্ভে। সুরহীন শরীরযাপনের চিহ্ন অরণিকে পেয়ে নিজের শরীরকে ভুলেছে বহ্নি। অথচ পেছনের কিছুই ভুলতে পারেনি। কে পারে ভুলতে ?
যে মেয়ে একবার সংসার ছেড়েছে তাকে বিয়ে করে খুব বর্তে দিয়েছে এই ভাবনা পাভেলের ভেতরে আসবে তা সংসার শুরুর আগে থেকেই জানত বহ্নি। বাবা জানত না। কিংবা জানলেও মানতে চায়নি। বাবাকে আশ্বস্ত করতেই নতুন মানুষের সান্নিধ্যে অভ্যস্ত হতে হতে বহ্নি হাতড়ে বেরিয়েছে মন। কিন্তু ও মনকে আজও ধরা যায়নি, ছোঁয়া যায়নি। ছুঁতে গেলেই সে অবগুণ্ঠনের আড়ালে চলে যায় আরও। আড়ালে গেলেও বহ্নিকে ভুলতে দেয় না মাতৃত্বের প্রাচীন দাগ, মুছতে দেয় না ললাটে আঁকা বেদনার চিহ্ন।
‘তোমার মতো মেয়েরে বিয়ে করছি, ভুলে যাইও না আমার সঙ্গে সংসার শুরুর আগে থেইকাই তুমি দামড়া একটা বাচ্চার মা। আমি না হইলে আঘাটা তোমারে কেউ ছুঁইয়াও দেখত না।’
এমনভাবে দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলে পাভেল যেন বহ্নি ব্যবহারের অযোগ্য কোনও পণ্য বা কোনও খাবারের উচ্ছিষ্ট।
‘তো আমি তোমারও বাচ্চার মা। আর তোমার শরীরে কি অন্য নারীর স্পর্শ নেই ? তোমার আগের ঘরে সন্তান হলে তো তুমিও আমার মতোই দুই বাচ্চার জন্মদাতা হতে। কী হতে না ?’
বহ্নির স্বরকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ওর কণ্ঠনালি চেপে ধরেছিল পাভেল।
‘এখন বুঝি তোর প্রথম স্বামী কেন পরকীয়া করছিল। এই মুখ, তোর এই মুখের জন্যই অন্য মাইয়ার কাছে গেছিল ঐ লোক।’
এই মুখের জন্যই হয়তো বহ্নির মন দূরে আরও দূরে সরে যায়। তাই শরীরও সরে যায় অনিবার্যভাবে। তবু সম্ভোগে নিজেকে সমর্পণ করতে হয় বহ্নির।
রনকের কাছে সমর্পণ অর্থ শুধু পরস্পরের কাছে শরীর সঁপে দেওয়া ছিল না। বহ্নির রক্ত-মাংস-চামড়াকে অভ্যাসে পরিণত করেনি রনক, তাই হয়তো সামান্য একটা কথা বা অভিব্যক্তিও ওর শরীরকে জাগিয়ে তুলতো, যা শ্লীলতার সূক্ষ্ম চালনির ফাঁক গলে অনায়াসে বেরিয়ে যেত আর বহ্নির শরীর-মন মুখিয়ে উঠত রনকের স্পর্শের জন্য।
পাভেলের সঙ্গে প্রতিটি সঙ্গমে খোঁড়লের খাড়ি ধরে নামতে নামতে বিশাল এক লুপহোলের ভেতরে আটকে যায় বহ্নি। ওর অনস্তিত্বে হারিয়ে যাওয়াটা টের পেয়ে যায় পাভেলও। বহ্নিকে প্রতিবার সজোরে বিদ্ধ করতে করতে চাপা স্বরে শাসায়, ‘কার কথা ভাবিস হ্যাঁ, কার কথা ভাবিস ? তোর আগের স্বামীর কথা। আমি পারি না, আমি পারি না…পারি না, দ্যাখ কেমন লাগে, দ্যাখ আমিও পারি…আমিও পারি।’
থকথকে বীর্যে ভিজে যেতে যেতে বহ্নির মনে পড়ে রনক তুমি থেকে তুইতে নামতে নামতে ওর গভীরে নামত। পাভেলও নামে। নেমেই উঠে যায়। পাভেল উঠে গেলেও ‘কেমন দিলাম’ শব্দ দুটির ভর নিতে নিতে সাদা শূন্যতায় নীল হতে থাকে বহ্নি। গতকাল রাতেও তাই হয়েছে।
অনেক অনেক বছর আগে একবার এমন নীলে নীলে কালো হয়েছিল বহ্নি। সেবার বহ্নি মায়ের সঙ্গে চার নম্বর সেক্টরের একটা পার্কে গিয়েছিল। বহ্নির তখন ঝুঁটিবাঁধা কৈশোর। মা বাদাম কেনার জন্য একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। একটা আলখেল্লা পরা লোক পাশ ঘেঁষে যাওয়ার সময় ওর স্তনের কুঁড়ি নিঙড়ে নিয়ে বলেছিল, ‘কেমন দিলাম ?’ অমন করে এর আগে কখনও কেউ ছোঁয়নি ওকে। ঐ স্পর্শটুকু ভুলে যেতে অনেক সময় লেগেছিল বহ্নির। ভুলেছে কি আদৌ ?
রনকের কাছে বহ্নির শরীর ছিল পূজার নৈবেদ্য, সাদা নরম ফুলের তোড়া, যাকে আলতো করে স্পর্শ হয়। খানিক পর পর যাকে জ্বরতপ্ত কণ্ঠে বলতে হয় ‘ব্যথা লেগেছে ? মাফ করে দাও… জতেম… জতেম… জতেম।’ রনকের স্পর্শে শরীরের সব ব্যথার যোগফল ছিল সুখ। বহ্নি না না করে তখন ব্যথাকে টেনেছে আরও গহিনে। সব বেদনা জেরবার করে রনক বহ্নির গর্ভ ভরিয়েছে পুষ্পে। পুষ্পসম্ভারে সজ্জিত বাসনাতৃপ্ত বহ্নি ডিম লাইটের নরম আলোতে ডুবে ডুবে হেসেছে।
কেন তুলনা করছে বহ্নি ? ভুলভাল বেদনায় কেন এত গুমরে গুমরে মরছে ? হাভাতের মতো কেন এমন সুখ সুখ করছে ? ও নিজেই তো ছুড়ে ফেলেছে রনককে। কিন্তু এর আগে রনকই কি ওকে ছুড়ে ফেলেনি ? কত সহজেই না ওকে ছুড়ে ফেলেছে রনক। সব নিয়ে বহ্নিকে নিঃস্ব, রিক্ত করে ওকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্য কারও কাছে যেতে তো বাধেনি রনকের।
১৩
আহসানকে বোঝানোর চেষ্টা করে না রনক। বন্ধুর পুনঃপুন তিরস্কারেও ও চুপচাপ বসে থাকে। সন্ধ্যার ছায়া নামতে না নামতেই আহসান ওর বাসায় হাজির হয়েছে। মুখে মাস্ক নেই। ভ্রাম্যমাণ আদালতের দণ্ডের ধার ধারে না আহসান। লকডাউনের বিধিনিষেধ মানে না। বলে, এ দেশে করোনা ভাইরাসের চরিত্রস্খলন ঘটেছে। শতরূপে নিজেকে পালটেও ভাইরাস বাঙালিকে কাবু করতে পারছে না। রনক যদি বলে, ‘রোজই মরছে মানুষ আক্রান্ত হয়ে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং দেখিস না ? নিম্নে পঁচিশ থেকে ঊর্ধ্বে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন জন করে মরছে।’ আহসান ক্ষেপে ওঠে।
‘ঐ গুনেই মরছিস তোরা, শালা রোজ সড়ক দুর্ঘটনা আর অন্য সব রোগে এর চেয়ে বেশি মরে বাঙালি। সবচেয়ে বেশি মরে মদ না খেয়ে।’
‘তোর কী সব কথা!’
‘কী কথা! ফেসবুক দেখস না ? গার্মেন্টস কর্মীদের বাড়ি যাওয়া দেইখা, তাদের ফেরিতে ওঠা দেইখা খুব মজা নিতাছে বাঙালি। ভাবখানা এমন ওরা করোনা ছড়ায়া দ্যাশটার হোগা মাইরা ছাইড়া দিব আর কী! আর এদিকে ঢাকা ছাইড়া যাওয়ার অভ্যন্তরীণ একটা ফ্লাইটেও কোনও সিট খালি নেই। যমুনা, বসুন্ধরা, নর্থ টাওয়ারে পা ফেলার জায়গা নেই, মার্কেটের মেঝেতে হেরা ইফতার করতেছে জামাতের সঙ্গে বইসা। ওদিকে নিউমার্কেটেও হাঁটার মতো জায়গা নেই। সুশীল সাংবাদিক আর উন্নয়নের ধ্বজাধারী ফেসবুককেন্দ্রীক জাস্টিফায়েড মেশিনগুলা এই যমুনা, বসুন্ধরা চোখে দ্যাহে না। প্লেনে সিট খালি নাই তা দ্যাহে না। নাকি এডির শইল দিয়া ফরাসি ঘ্রাণ বাইর হয় আর মুরুক্ষ চোদা গার্মেন্টস কর্মীগো শইল দিয়া ঘামের গন্ধ বাইরায় দেইখা এই ফারাক ?’
খিস্তি করতে করতে আহসান হাতের ব্যাগের ভেতর থেকে সুডৌল একটা বোতল বের করে। বোঝা যাচ্ছে সংযম মানবে না সে আজ, কিন্তু তাই বলে সঙ্গে করে মেয়ে নিয়ে আসার মতো অসঙ্গত আচরণ করবে আহসান―তা ভাবেনি রনক।
‘মেয়েটাকে চলে যেতে বল।’
‘কেন রে ? ভয় পাচ্ছিস ? ভাবছস শরীরে ভাইরাস বইয়া আনছে ?’
‘যা বলছি কর।’
‘না মানে তুই এতদিনের অভুক্ত আছিস। আর এই মহামারির কালে বেচারিও বেশ বিপদে আছে। সঙ্গনিরোধের চাপে পড়ে বেচারি এখন ভীষণ অর্থকষ্টে আছে। একটা জনসেবা হয়ে যেত আর কী।’
নিজের অবস্থা-অবস্থান আহসানকে বোঝানোর চেষ্টা করে না রনক। চরিত্রে ও সাধু তা বলতে আজ দ্বিধা হলেও শরীর ভোগ করতে নিজের ঘর পর্যন্ত পেশাদার কোনও রমণীকে নিয়ে আসবে এমন বুভুক্ষুও নয় রনক। আহসানও জানে প্রকৃতিগতভাবে রনক বেপরোয়া নয়। তরল পানীয় রনক কখনও ছোঁয়নি তা নয়, কিন্তু শরীর-সম্ভোগে নিজের ভেতরে রক্ষণশীলতা আছে রনকের। আঁচল খসে যাওয়া কিংবা অবিন্যস্ত শরীরের আত্মীয়-অনাত্মীয় নারীর দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকায়নি কখনও রনক। পৃথুলা শরীরে অকস্মাৎ চোখ পড়ে গেলে বা কোনও পর্ন ভিডিও দেখে রতিক্রিয়ার শিহরণ পাওয়ার সাধ হয়নি। তাই বলে সন্ন্যাসীর জীবন-যাপন করেনি রনক। ভুলের মাসুল দিতে ভুলও করেছিল।
আহসান বরাবর ওর বিপরীত। এখনও ওর ল্যাপটপে হাত দিলে পাসওয়ার্ড চাইবে অসংখ্য ফাইল। এসবের ভেতরে গুপ্ত আছে লাল-নীল বিষভরা প্রাণি। যেন সাপুড়ের ঝাঁপি এই ল্যাপটপ। শুধু তাই না, নিয়ম করে নিষিদ্ধ পল্লীতে যায় আহসান। জীবনের আনন্দ-উল্লাস বিসর্জন দিয়ে পারিবারিক বন্ধনে আটকে থাকার নাকি কোনও মানে নেই। তাই আহসান জীবনকে সব রকমভাবে সব দিক দিয়ে উপভোগ করে। ছাত্রজীবনে আহসান এমন ছিল না। আরও অনেকের মতো আহসানেরও জীবনদর্শন পালটে গেছে। রনক পালটাতে পারেনি, এই কথা এখন আর আগের মতো একরোখা স্বরে বলতে পারে না রনক। কত দর্শনকে গলা টিপে হত্যা করে রনক আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, একমাত্র রনকই তার হিসাব জানে।
‘কী রে কী ভাবছিস ?’
‘ভাবাভাবির কিছু নেই। মেয়েটাকে তুই টাকা-পয়সা দিয়ে বিদায় কর। বাড়াবাড়ি করিস না।’
‘কীসের বাড়াবাড়ি, আগে একটু দ্যাখই না কী জিনিস এনেছি!’
আহসান মেয়েটিকে ঘরের ভেতরে আসতে ইশারা করে। ওকে বোঝাতে না পেরে ঘেমে একাকার হয়ে ওঠে রনক। ঘন ঘন শ্বাস নেয়। মেয়েটি সত্যিই ঘরে ঢুকবে নাকি! রনকের কোটরাগত চোখে আতঙ্ক ভর করে।
‘না করেছি কিন্তু আহসান!’
‘না! এখন সাধু সাজছিস ? সেই মৃন্ময়ী না ফিন্ময়ী যার জন্য সংসারটা ভেঙে গেল ওর সঙ্গে আর বিছানায় যাস নাই ? ন্যুড পিকচার চালাচালি করিস নাই ? দে দেখি ফোনটা। তোর চ্যাট হিস্ট্রি দেখি। আসছে আমার সাধুবাবা!’
বন্ধুর অচঞ্চল নিদ্রাহীন মুখশ্রীর দিকে আহসান ফিরেও তাকায় না। সুখ লোপাট হওয়া সন্ন্যাসীর মতো রনক মিনতি করে।
‘বাড়াবাড়ি করিস না। যা করার আমার বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর। তুই ব্যাপারটা বুঝতে পারছিস না, তানি আছে ঘরে।’
বিব্রত রনকের দিকে একবার তাকিয়ে নিতম্বের চঞ্চল ভাঁজ দেখিয়ে সামনে এগিয়ে আসতে থাকে মেয়েটি, অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসে, যেন এসব বাগ্বিতণ্ডা দেখে অভ্যস্ত সে।
গ্লাসের তরল এক চুমুকে খেয়ে নিয়ে আহসান বন্ধুকে যথেচ্ছ গালাগাল করছে। রনকের ইচ্ছে করছে ওকে ধাক্কা দিয়ে দরজার বাইরে বের করে দেয়। তাই করবে ভাবতে ভাবতে ও আহসানের বুকে হাত রাখে। রনকের আগেই আহসান একা ধাক্কা দিয়ে রনককে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়। তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে আছড়ে পড়ে রনক। এবার দৌড়ে আসে মেয়েটি। রনক বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখে, মেয়েটির মুখের গড়ন অবিকল মৃন্ময়ীর মতো।
মৃন্ময়ী পর্যন্ত আহসানই টেনে নিয়ে গিয়েছিল ওকে। রোমাঞ্চকর সময় কাটানোর লোভে গলেছিল রনক। ইগোতে আঘাত করতে করতে সেদিন আহসানই ওকে পর্যুদস্ত করেছিল।
আহসানকে কেন দোষ দিচ্ছে ? নিজের ভেতরে পুষে রাখা সাপটা তো লকলকে জিভ বের করেছিল নিষিদ্ধ কিছুর খোঁজ পেয়েই। পরম কৌতূহলে রনক নিজেই নতুন একটা শরীরের অন্ধিসন্ধি জানতে চেয়েছিল। শরীরে-মনে নগ্ন একটা খিদে চাগিয়ে উঠেছিল। স্বীকার করতেই হবে, মৃন্ময়ী আলাদা ছিল। অন্য সব পেশাদার বেশ্যার মতো ঢলোঢলো ভাব কিংবা আহসানের ভাষায় ছেনালিপনা ছিল না ওর মধ্যে। বহ্নি চলে যাওয়ার পর অভব্য বালকের মতো রনক একদিন ছুটে গিয়েছিল মৃন্ময়ীর কাছে। মৃন্ময়ী যেন প্রেমিকা, এমনভাবে ও কদিন রনককে আঁকড়ে রেখেছে ফোনে, মেসেজ বক্সে। এরপর দ্বিতীয় কোনও ভুল নয়, নিজেকে শাসন করে রনক ফিরেও এসেছে, কিন্তু ততদিনে সব হারিয়েছে।
পুরোনো ক্ষত চাঙা হতে হতে রনকের সব রাগ গিয়ে আহসানের ওপরে পড়ে। ও দরজা খুলে আহসানকে ধাক্কা দিতে দিতে চিৎকার করতে থাকে, ‘তুই এখনই বেরিয়ে যা…বেরিয়ে যা।’ বিস্মিত দৃষ্টিতে আহসান বন্ধুর দিকে তাকায়, প্রতিরোধ করে না। আচমকা মেয়েটা ওদের দুজনকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এসে দ্রুত গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করে।
১৪
হারিয়ে যাবে একদিন―এই কথা ভেবে ভেবে একা একা কত কেঁদেছে ও। কেউ শোনেনি সেই কান্নার শব্দ। এই ঘরের দরজা বন্ধ থাকলে কান্নার শব্দ বাইরে যায় না। তানির তো মনে হয় ও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদলেও কেউ ওর কান্নার শব্দ শুনতে পাবে না।
ঘরের দরজা বন্ধ করে দুই বালিশের মধ্যে মাথা গুঁজে আছে তানি। হারিয়ে যাওয়ার জায়গা খুঁজে পায় না বলে বুক চেপে আসে বৃষ্টি। হারানো দূরে থাক, কোথাও থাকার জায়গাই নেই ওর। মায়ের কাছে না, বাবার কাছেও না। মানুষ দুজন নিজেরাই নিজেদের সব হারিয়ে বসে আছে। আর তানির তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। কেউ নেই ওর। একজন বন্ধুও নেই। এমন একজন স্বজনও নেই যে কারও কাছে গিয়ে থাকবে। তার ওপরে এই মহামারির দিনে কেউ তো ওকে বাড়িতেই ঢুকতে দেবে না। স্কুল, পার্ক, রেস্টুরেন্ট সব বন্ধ। কেউ কারও বাসায় বেড়াতেও যাচ্ছে না এখন। মানুষেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে পরস্পরের কাছ থেকে। বাবা-মা মৃত সন্তানকে ছুঁয়ে দেখতে পারছে না। এমনকি অসুস্থ সন্তানকেও চার দেওয়ালের মাঝে বন্দি রাখছে। সঙ্গনিরোধের দিনে সবাই তানির মতোই একা হয়ে যাচ্ছে।
ওর সহপাঠী দিবাকে ফোন দিয়েছিল সেদিন, হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাথ ক্লাসটা কিছুতেই ডাউনলোড করতে পারছিল না। দীবা বলল, ওর বাবা হাসপাতালে ডিউটি করলে বাসায় ফেরে না গুনে গুনে চৌদ্দ দিন। হোটেলে থাকে। বাবাকে ও খুব মিস করে। তানি দীবাকে আর জানায়নি, এ অভিজ্ঞতা ওর আগে থেকেই আছে। সেই কবে থেকেই তো ও কখনও বাবাকে ছাড়া কখনও মাকে ছাড়া থাকছে। আজ খুব ইচ্ছে করছে দুজনকে ছেড়েই অনেক অনেক দূরে গিয়ে থাকে।
ঠিক এই মুহূর্তের ইচ্ছে না। রাতে বাসায় বাবার বন্ধু আহসান চাচা এসেছিল। সঙ্গে একটা মেয়েও এসেছিল। ঘরের দরজা ফাঁক করে তানি দেখেছে মেয়েটাকে। মেয়েটা পরিচিত না হলেও ওর অঙ্গভঙ্গি বলে দিচ্ছিল ও কে। এরপর দরজা বন্ধ করে বালিশে কান চেপে শুয়ে থাকলেও তানি বাবা আর আহসান চাচার কথোপকথন শুনেছে। একটা সময়ে দুজন মারামারিও করেছে, কুৎসিত ভাষায় কথা বলেছে। তানি কিছু শুনতে না চাইলেও সব শুনতে পাচ্ছিল।
তানি বাবাকে কিছু বুঝতে দেয়নি। কিন্তু বাবা কী বুঝেছে কে জানে। সকালে নাস্তা খেতে বসে ওর সঙ্গে একটা কথাও বলেনি। পানির গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খেয়েছে। তানি অন্য সময়ের মতো দৌড়ে গিয়ে বাবার পিঠে আলতো করে বাড়ি দেয়নি, বলেনি, ‘নির্ঘাৎ তোমাকে কেউ মনে করছে বাবা।’ তানির শুধু মনে হচ্ছিল এই বাসাটা থেকে বের হওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় যাবে ?
পূরবীর বাসায় যাবে ? মেয়েটা ওকে খুব ভালোবাসে। ক্লাসের ফাঁকে এসে নিজে থেকেই গল্প করে যায়। বলে, তানির চেহারা নাকি ওর আগের জন্মের বান্ধবী ইরার মতো। আগের জন্মের বান্ধবী বিষয়টা কী তানি আর জানতে চায়নি। নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে কাউকে প্রশ্ন করতে ওর ভালো লাগে না। মনে মনে সব প্রশ্নের উত্তর ও একাই খুঁজে নেয়। সেভাবেই ও ভেবে নিয়েছে পূরবীর প্রাণের বন্ধু ইরা। বাবার বদলির চাকরির সূত্রে নতুন জেলায় নতুন স্কুলে এসে পূরবী তানিকেও নিজের আগের জন্মের বান্ধবী করতে চাইছে। তাই এই লকডাউন, আধা-লকডাউন সময়েও রোজ একবার ফোন না করলে বা ইনবক্সে মেসেজ না পাঠালে ও শান্তি পায় না। কিন্তু ফেসবুকে কয়েক দিন পর পর বাবা-মায়ের গলা জড়িয়ে তোলা গাদি গাদি ছবি পোস্ট দেওয়া ন্যাকা পূরবীকে ও আগের জন্মের বান্ধবী দূরে থাক এই জন্মের বান্ধবীও করতে চায় না। নাহ, যাবেই না ওর কাছে।
জানু খালার সঙ্গে চলে যাবে নাকি ? জানু খালা ওকে খুব আদর করে। জানু খালা ওকে বলে কুট্টি খালা। কুট্টি মানে একেবারে ছোট্ট কাল থেকে খালা ওকে বুকে বুকে করে রেখেছে। খালা তানির বয়সের কথা মাথায় রেখে একদম সচেতন হয়ে কথা বলে না। খালা বলে, বস্তিতে মানুষ লাগালাগি, গলাগলি ধরে থাকে, করোনা ভাইরাস ঢোকার জায়গাই পায় না। ওরা নাকি এক বউকেও তিন-চার বার বিয়ে করে কেউ কেউ। মানুষের কথার ধার ধারে না। জানু খালার মেয়েও তার স্বামীকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। বিয়ের পরের দিন মেয়ে-জামাইয়ের দেওয়া নতুন শাড়ি পরে কাজ করতে এসে খালা হেসেই বাঁচছিল না।
‘ঐ কাকলাশটা আরেকটা বিয়া করছিল, ঐ বউ সেই খারাপের খারাপ। দুই এক ঘাটের পানি না খাইলে পুরুষ মানুষের শিক্ষা হয় না। বেটি ওরে এমন নাকানিচুবানি দিছে, অমন কাকলাশ শরীল আর ফুটা পকেট নিয়া কই যাইব, আমার কামাই-রুজি করা মাইয়া ছাড়া পেট চলব ঐ ভাদাইম্মার ?’
জানু খালার মেয়ে বানু একটা পোশাক কারখানায় কাজ করে। কারখানা বন্ধ এখন। বানুর স্বামী মতিয়ার ডিশের লাইনের মাসিক টাকা তুলতে আসে ওদের বাড়িতে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা সংগ্রহ করলে সে নাকি টাকা পায়। ও দিয়ে সংসার চালাবে কী লোকটার নিজেরই নাকি হাতখরচ চলে না, সপ্তাহ না ঘুরতেই খালার মেয়ের কাছে হাত পাতে। লোকটাকে অনেকবার দেখেছে তানি। জানু খালা তাকে কেন কাকলাশ ডাকে দেখে বুঝেছে।
আজ সকালে খালা জোর করে কাজে ঢুকেছে। বলেছে, ‘বইসা বইসা আর কত বেতন নিব কও কুট্টি খালা। আমি থাকতে তোমরা বাপে-মাইয়া কষ্ট করতেছো। তোমার দাদা-দাদি আসলে কী জবাব দিমু আমি। ওসব করোনা ফরোনা আমাগো হইব না খালা, ঘরে আটকা আছো তাই বুঝতেছো না, বাইরে বাইর হইয়াই দ্যাখো, মাকস ছাড়াই শয়ে শয়ে মানুষ ঘুরতাছে। যারা মিনিটে মিনিটে হাতে ওষুধ মাখে, মুখে মাকস পরে তারাই দম আটকায় মরতাছে।’
শূন্য বাড়িতে নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল তানির। খালাকে পেয়ে খুশি হয়েছে, বুঝতে দেয়নি। কাউকে কিছু বুঝতে দিতে চায় না তানি। কিছু না।
গোসল না করে আর মাস্ক না পরে খালাকে ঘরের একটা জিনিসও ধরতে দেয়নি তানি। জানু খালা ঘরগুলো ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করে বাসার চেহারাই পালটে দিয়েছে। খালা আজ তেঁতুল দিয়ে বেগুনের পাতুরি আর কাচকি মাছের চচ্চড়ি রান্না করেছিল। খেতে খেতে তানির চোখে বার বার পানি এসে যাচ্ছিল। মা-ও এই দুটো তরকারি রান্না করত। ও বাড়িতে গেলে এখন মাকে এসব রাঁধতে দেখে না। উনি নাকি দু চোখে মাছ দেখতে পারেন না। অথচ লোকটা দেখতে একেবারে মাছের মতো। পাশে দাঁড়ালে তার গা থেকে পিচ্ছিল আঁশটে গন্ধ আসে। মা যে কী করে সহ্য করে তাকে, কে জানে!
ঐ বাড়িতে থাকতে ভালো লাগে না তানির। তবু ওকে ওখানে যেতে হয়। তানিকে যে বাবা-মা জোর করে তা না। যে যখন ওকে যেভাবে থাকতে বলে তখন সেখানে সেভাবেই থাকার চেষ্টা করে তানি। ঐ বাড়িতেও ও ভালো থাকার চেষ্টা করে। যদিও তানি বুঝে গেছে আপাতত ঐ বাড়িতে ওর যাওয়া হবে না। এ আরেক বিপত্তি। মায়ের জন্য মন কেমন কেমন করে বলেই না, আজকাল অরণির জন্যও মায়া হয়। আসলে তানি নিজেও জানে না ঠিক কোথায় আর কার কাছে থাকতে ভালো লাগে ওর। জানে না বলেই তো ও হারিয়ে যেতে চায়।
‘কী করছো তোমরা বাসাটারে! আইজ যদি আমি না আসতাম, পুরা বাসাটা…আমাগো বস্তিঘর হইয়া যাইত…কী দিয়া আমি বুঝ দিতাম…’
তানির ঘরে ঢুকে কথাটা শেষ করে না জানু খালা। বুঝে নেয়, ওর মন খারাপ। তানির মন আরও খারাপ হয়। মুখ দেখেই তানির অভিব্যক্তি অন্য কেউ চট করে ধরে ফেলে বলেই ওর ভেতরে হারিয়ে যাওয়ার গোপন ইচ্ছেটা পুনরায় জেগে ওঠে।
১৫
আজ অরণির জ্বর নেই। খুশি মনে সে মাকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদ করছে। অপ্রত্যাশিত ছুটির দিনে মাকে কাছে পেয়ে পেয়ে সে ক্রমে মায়ের বিশ্বস্ত অনুচর হয়ে উঠেছে। লিকলিকে পায়ে ঘরময় হেঁটে বেড়াচ্ছে। মায়ের পিছু নিচ্ছে। তানিকে দেখতে না পেয়ে মাঝে মাঝে ওর ঘরে উঁকিও দিয়ে আসছে।
মেয়েকে মন খারাপ করে ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে বহ্নি ডাকে। মাথা দু পাশে ঝাঁকিয়ে টুলটুল পায়ে অরণি শোবার ঘরের গিয়ে খাটে উঠতে উঠতে বলে, ‘না…না…না…।’
ডোরবেল বাজছে। অনেক দিন হলো বেলটা বাজায় না কেউ। কে এল এই সঙ্গনিরোধের দিনে! দরজা না খুলেই বহ্নি প্রশ্ন করে, ‘কে ?’
‘খালা আমি রাশিদা। দরজাটা খোলেন।’
‘বাইরে থেকেই বলো রাশিদা।’
দরজার ওপাশ থেকে হাসির শব্দ শোনা যায়।
‘খালা ডরাইতাছেন ? মুখে মাকস আছে আমার। সমস্যা নাই।’
‘তুমি বলো রাশিদা। দরজা খোলা যাবে না।’
‘ও খালা চাল, ডাল, আলু, তেল, ডিম, লবণ কিনবেন ? একেবারে কম দামে দেওয়া যাইব।’
বিস্মিত বহ্নি জানতে চায়, ‘কেন ? তুমি মুদি দোকানি হলে নাকি ?’
‘খালা, মসজিদ কমিটি আর ফেসবুক কমিটি থেইকা সাহায্য পাইছি। দুই মাস চলার মতো সদাই খালা। ঘরে চারজন মানুষ। কত দিন বাঁচমু, কত দিনে খামু। তাই বিক্রি করি। কলোনির অনেকেই বিক্রি করে। জিনিসের চেয়ে টাকা থাকলে লাভ বেশি।’
‘না, আমার লাগবে না রাশিদা। তোমার গরিব আত্মীয়দের দান করো। এসব বিক্রি করার জিনিস না।’
‘চার তলার খালা নিছে খালা। দুই প্যাকেট ডিটারজেন বেচলাম। বাজারের চেয়ে কম দামে।’
চার তলার মেয়েটার নাম মিতু। গতকাল প্রায় জোর করেই সিঁড়িঘরে দাঁড় করিয়ে অনেকক্ষণ গল্প করেছে। কথা বলতে না পেরে মেয়েটার নাকি দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একবার ফিসফিস করে বলেছিল, ‘রোজার বাবার অফিস ছুটি, সারাদিন বাসায় থাকে। কত ভালো লাগে এর সঙ্গে কথা বলতে বলেন। আর কথা বলার সময় আছে তার ? সারাদিনই ফেসবুক আর ইউটিউব খুলে বসে থাকে। আর রেস্টুরেন্টের মতো খাবারের অর্ডার করে, এটা রান্না করো, ওটা রান্না করো। রান্না করতে করতে আমার জান শেষ ভাবি। এর চেয়ে সে অফিসে থাকলে আমি রেস্টে থাকি।’
বহ্নিকে চুপচাপ দেখে মেয়েটা এক গাল হেসে বলেছিল, ‘দই খাবেন আপা ? দই পেতেছি। এখন দুধ খুব সস্তা জানেন। পানির বদলে দুধ খাবার দশা। চল্লিশ টাকা কেজি। একটু চাপ দিলে দুধওয়ালা পঁয়ত্রিশ টাকাও রাখে।’
মেয়েটা স্বামী আর খাওয়ার গল্প ছাড়া তেমন কোনও গল্প করে না। জানেও না হয়তো। বহ্নিকে পেলেই উচ্ছল মুখে রেসিপি শেখাতে চায়। কী করলে পিৎজ্জার ডো সফট হবে, পাকা আমের কেক কী করে তৈরি করা যায়, কালোজাম মিষ্টিতে কী দিলে ভেতরে গুটলি পাকাবে না―এসব মিতুর কাছ থেকেই শিখেছে বহ্নি। বহ্নি আগ্রহ নিয়ে কিছু শিখতে চাইলে নিজেকে উজাড় করে দেয় মেয়েটা। মিতুদের ফ্ল্যাট থেকে মাঝরাতে মাঝেমাঝে কান্নার শব্দ আসে। সম্ভবত ঝগড়াঝাটির এক পর্যায়ে মিতুর স্বামী ওর গায়ে হাত তোলে। আগেও কান্না আর গর্জনের শব্দ আসত। এখন বেশি আসে।
বহ্নি কাঁদে না। রাশিদা চলে গেলে সংসারের কাজকর্ম সেরে অনলাইন ক্লাসের লেকচার শিট তৈরি করে। এই সপ্তাহে এটাই ওর শেষ ক্লাস। হেডস্যার জানিয়েছেন এই মাসে ওর আর ক্লাস নেওয়ার দরকার নেই।
সংকটের মোড় ঘুরিয়ে দিতে জীবিকার কোনও বিকল্প ছিল না বহ্নির কাছে। দলছুট পাখির মতো উড়তে উড়তে নতুন করে বাসা বাঁধলেও পুরোনো চাকরিটা ছাড়েনি কখনও। এখন না ছেড়েও ছাড়ার মতো ঘরে বসে আছে। ওদের স্কুলের বিশ জন শিক্ষকের এ মাসের বেতন বন্ধ হয়ে আছে। দু মাস পঞ্চাশ ভাগ বেতন দিলেও এ মাসে তাও দেয়নি। অল্পসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে অনলাইনে ক্লাস করালেও সব শিক্ষককে বেতন দেওয়ার ভয়ে সবাইকে কাজে সম্পৃক্ত করছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। এদিকে অভিভাবকদের কাছ থেকে ঠিকই বেতন আদায় করছে। ওদের স্কুলের ক্লাস ফাইভের অঙ্কনের শিক্ষক ফরিদ স্যার পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে গেছেন। বাসা ভাড়া দিয়ে শহরে পোষাচ্ছে না তার, তিনটা বাচ্চাসহ পরিবারের খরচ চালাতে পারছেন না। বহ্নির সেই দায় নেই, কিন্তু জীবিকাটা জীবনের জন্যই দরকার ওর।
তৃতীয় শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতি বইয়ের ‘মহাদেশ ও মহাসাগর’ অধ্যায়ের প্রশ্ন-উত্তরগুলো লিখে বই-খাতা গুছিয়ে রাখতে রাখতেই মোবাইল বেজে ওঠে। মনিমালা দিদি ফোন করেছে। দিদিও ওর মতো বেতন পাচ্ছে না।
‘বহ্নি, ভিক্ষাও তো করতে পারি না। বল তো বাচ্চাদের খাওয়াব কী। তোর দাদার যেই অসুখ তাতে মাসে কত টাকার ওষুধ লাগে জানিস ? কী করি বল তো, হেড স্যার কদিন ধরে ফোনও ধরে না। বাসাটাও ছেড়ে দিতে হবে, টানতে পারছি না ভাড়া।’
‘কোথায় উঠবেন দিদি ?’
‘বস্তিতে।’
দিদি কান্না চাপছেন।
‘বস্তিতেও তো থাকতে পারব না। কই যাব বল, তুই পরামর্শ দে বহ্নি। আমি আর পারছি না। বাচ্চা দুটোর টিচার বাদ দিয়েছি। আমিই এখন পড়াই কিন্তু ধৈর্য রাখতে পারি না আজকাল। অনলাইনে টিচাররাও ১৫০০ করে নেয়। ওরা বড় হচ্ছে, ওপরের ক্লাসে উঠছে, তার ওপরে ছেলেটা সায়েন্স নিয়েছে, ওর জন্য অন্তত তিনটা সাবজেক্টে টিচার দরকার। একটা টিচারের খরচ দিব তাতেই দম আটকে আসে।’
‘আমরা সবাই মিলে স্যারের বাড়ি যাই চলেন। আমার ক্লাসের কয়েকজন ছাত্রী তো জানাল, ওরা পুরো বেতন দিয়ে যাচ্ছে স্কুলে, তবে আমাদের বেতন কেন হবে না দিদি।’
‘যেই সিন্ডিকেট পোষেন উনি, তুই আমি মিলে ভাঙতে পারব বহ্নি ? পারব না। তার চেয়ে ফরিদ স্যারের মতো শহর ছাড়ব সেই-ই ভালো। অবশ্য আমার তো বাবা-ঠাকুরদার জমিদারি নাই। তবু গ্রামে গেলে সম্ভ্রমটুকু যদি বাঁচে।’
ফোন রাখার পরও মনিমালার ভেজা ভেজা স্বর বহ্নিকে অনেকক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে। অর্থকষ্ট নেই বহ্নির। অর্থকষ্ট ছাপিয়ে যেসব কষ্ট দিনভর ওকে কাতর করে রাখে সেসব কথা মনিমালা দিদিকে বলা যায় না। বললে ভাববে, সুখের অসুখ। এক প্রকার সুখেই আছে বহ্নি। কাজের কথা বলে চার দিন হলো পাভেল বাড়ির বাইরে থাকছে। বাজার-সদাই লাগবে কি না মাঝে ফোন করে একবার খোঁজও নিয়েছে। সেই সঙ্গে ফিরে এসে তানিকে যেন না দেখতে পায় সেই কথাও শুনিয়েছে।
তানিকে আর আনবে না বহ্নি। কিছুতেই আনবে না। সেদিন গোসল সেরে পায়জামা না পরেই তানি বাথরুম থেকে বের হয়েছিল। খাওয়ার ঘর থেকে যেই দৃষ্টিতে তানির নগ্ন পা-জোড়ার দিকে তাকিয়েছিল পাভেল সেই দৃষ্টি মাপতে সেকেন্ডও ব্যয় হয়নি বহ্নির। এর ওপরে যুক্ত হয়েছিল তানির খাওয়া নিয়ে পাভেলের শ্লেষমাখা কথা। রনককে তড়িঘড়ি আসতে বলে সেই দিনই তানিকে ঐ বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে।
এসব মনে করলেই দলাপাকানো কষ্ট বেপরোয়া ভাইরাসের মতো ওর শ্বাসনালি আক্রান্ত করে ফেলে। শ্বাস নিতে পারে না বহ্নি। আরও একবার হেরে গেছে বহ্নি। এই পরাজয় জীবনে নতুন করে জয়ী হওয়ার আর কোনও রাস্তাই খোলা রাখেনি।
১৬
পথের দুই ধারে এখন চেনা ছবি। মুখাবরণহীন মানুষ যে যার মতো ছুটছে। কারও কারও কানে ঝুলছে সাদা ফিতা, থুতনিতে দাড়ির মতো সেঁটে আছে রং-বেরঙের আচ্ছাদন। লকডাউন পরবর্তী শিথিল অবস্থা শেষে চাবি দেওয়া পুতুলের মতো ছুটছে সবাই।
দম আটকে আসছে রনকের। মুখের চাপা গন্ধ নাকে ঢুকে যাচ্ছে। রনক মাস্ক খুলে পকেটে রাখে। রিকশাওয়ালার মুখেও মাস্ক নেই। সেদিন এক চাচা মিয়াকে বলেছিল, ‘চাচা, মাস্ক কই ?’ চাচা একেবারে ক্ষেপে উঠেছিল, ‘মাকস দিয়া কাম কী ? করোনায় গরিবের মরণ নাই। গরিব মরে পাতে, ভাতে।’ সেই কথা মনে করে রনকের ভেতরে একটা কুটিল ভাবনা পাক দেয়, গরিবের খাতায় নাম উঠেছে, ওরও মরণ নেই এবার।
গতকাল রনক বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল বাসার সামনের একটা আবাসিক ভবনের নিচে লাশবাহী গাড়ি দাঁড়ানো। পিপিই পরা গাড়িচালক, খাটিয়াবাহক আর নিঃসঙ্গ লাশ―এই দৃশ্যাবলি জানিয়ে দিচ্ছিল করোনাকালে স্বজনদের জটলা করে কাঁদার কোনও সুযোগ নেই। লাশবাহী গাড়িটার পাশ ঘেঁষে চলছিল আসবাব বহনকারী একটা মিনি ট্রাক। কেউ বাসা পালটাচ্ছে নয় শহর ছাড়ছে। গাড়ি দুটা সরে যেতেই চোখে পড়েছে বড় রাস্তা সংলগ্ন সুপার শপের আশপাশে বেশ কিছু গাড়ি। সেসব গাড়ির চালক আর মালিকেরা গাড়ির ব্যাকডালা খুলে কাড়ি কাড়ি বাজার তোলায় ব্যস্ত।
তানি ওর মায়ের কাছে চলে গেলে রনকের বাজার-সদাইয়ের আর কোনও ভাবনাই থাকে না। এখন তানি আর মায়ের কাছে যাচ্ছে না। তবু ওর কোনও ভাবনা নেই এখন। পেশাগত জীবনে নির্ভার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসার জীবনেও কোনও বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে না আর।
রনক সামনে তাকায়। আকাশের রুপালি বলটা এক কিকে সরিয়ে দিয়েছে কেউ। অন্ধকারের বিমূঢ় ভাঁজ চলে এসেছে একেবারে নিকটে। রনকের মনে হচ্ছে ও অন্ধকারের ভেতরে ডুবোপাথরের মতো হারিয়ে গেছে। প্রকাণ্ড পৃথিবী থেকে মুখ লুকিয়ে রাখতে রাখতে পাথরে শ্যাওলা জমেছে।
উঁকি দিয়ে তাকালে চোখে পড়ে নিচেও নীরব অন্ধকার। এই অন্ধকারের অধীশ্বর তো ঐ উপরে আলোর মাঝে বসে আছেন। মানুষের জন্ম-মৃত্যু-পেটের ফয়সালা আগে থেকেই করে রেখে সুতা নাচাচ্ছেন। নিজেই সকল ব্যাধি, সকল জরা আর বৈষম্য সৃষ্টি করে তার দায়ভার সৃষ্টিকুলের ওপরে চাপাচ্ছেন।
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ মরে আর জীবন-জীবিকা থেকে দূরে সরে নাকি শুদ্ধ করে তুলছে পৃথিবীর হাওয়া। পশুপাখিরা নির্বিঘ্নে চলাচল করছে, সমুদ্র পাড়ে নেচে বেড়াচ্ছে কাঁকড়ার মিছিল, শারীরিক কসরত দেখাচ্ছে ডলফিন, আবার সবুজ হচ্ছে অরণ্য। ফেসবুকে এসব সংবাদ দেখে দেখে বিরক্ত হয়ে উঠেছে রনক। মানুষই যদি সুন্দরের সান্নিধ্যে না যায়, পেটেই যদি ভাত না ঢোকে তবে কী হবে এই অর্থহীন সবুজ দিয়ে ? বোঝে না রনক। গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে নিচের অন্ধকারের দিকে তাকায়।
একটা কুকুরও ডাকছে না। চোখে অন্ধকার সয়ে না আসা পর্যন্ত কিছুই চোখে পড়ে না। এই পাড়ায় স্ট্রিটলাইট লাগাতে না লাগাতেই চুরি হয়ে যায়। এখন রাস্তা জুড়ে ছায়া ছায়া অন্ধকার। আবছায়াতে হঠাৎ একটা শরীরী অবয়ব ফুটে ওঠে। গলির সরু রাস্তায় বিক্ষিপ্তভাবে হাঁটছে একজন মানুষ। কোনও বাড়ির দিকে নজর রাখছে হয়তো। গত পরশু দোতলার ভাড়াটিয়ার বারান্দা থেকে শুকাতে দেওয়া প্যান্ট, শার্ট, কামিজ নিয়ে গেছে চোর। অর্থনৈতিক মন্দার প্রকোপে চুরির প্রকোপও নাকি বেড়েছে। বাড়িওয়ালা এসে রনককে সাবধান করে গেছে, কানের কাছে ফিসফিস করতে করতে বলেছে, ভাড়াটিয়ার স্ত্রীর অন্তর্বাসও চুরি হয়েছে। রনকের হতবুদ্ধিভাব কাটার আগে বাড়িওয়ালা বাসা ভাড়াও চেয়েছে। এই মাসের ভাড়ার টাকা দেয়নি রনক। টাকাটা হাতছাড়া করতে মায়া লাগছে। বাসাটাই বরং ছেড়ে দেবে। দুই গলি পরে একটা মেসে কথা বলে এসেছে। সমস্যা হলো, বাসার এত মালপত্র টেনে মেসে তোলা যাবে না, তানিকেও নেওয়া যাবে না।
এমন অকিঞ্চিৎকরভাবে বেঁচে থাকার কথা কখনওই ভাবেনি রনক। বাবাও ভাবতেন না। ভাবতেন তিন ছেলের মধ্যে রনকই দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ক্লাস ফাইভ থেকে শুরু করে এসএসসি পর্যন্ত বৃত্তি পেয়ে পড়ে আসা রনক কলেজে ঢুকেই গড়পরতা ছাত্র হয়ে গেল। ছাদ থেকে পড়ে ওর বড় ভাই কনকের মৃত্যুর পর মা-ও বিছানায় পড়ল। মায়ের দিকে তাকাতে তাকাতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হতে পারল না রনক। পাসকোর্সে ভর্তি হলো। এরপর নন-ক্যাডার পদেও কোনও সরকারি চাকরি জুটল না। রনক হয়ে গেল জীবন বীমা কোম্পানির ক্যানভাসার।
জীবনের নিরাপত্তা নেই মানুষ বুঝে গেছে, কেন মিথ্যে বীমা করবে ? তবু বহ্নির সঙ্গে বীমার সূত্রেই পরিচয় হয়েছিল রনকের। প্রেম হয়েছিল তুমুল। সংসার হয়েছিল। সংসার ভেঙেও গেছে। সেসব দিনের কথা মনে হলে এখন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে রনকের।
অন্ধকার ঘন হচ্ছে আরও। অন্ধকারের পেটের ভেতরে ঘূর্ণায়মান কাল জানান দিচ্ছে, এখন জেগে থাকার সময় না। জন্তু-জানোয়ার ছাড়া কেউ জেগে নেই। রনক বারান্দা ছেড়ে তানির ঘরের সামনে দাঁড়ায়। দরজায় কান পাতে। কোনও সাড়াশব্দ নেই। মেয়েটা ঘুমুচ্ছে হয়তো। ঘরে ঢুকবে ভেবেও এক পা পিছিয়ে আসে রনক। মেয়ে বড় হয়েছে, এখন হুট করে ওর ঘরে ঢোকা যায় না। ধীর পায়ে হেঁটে তাই রনক নিজের বিছানায় চলে আসে।
পরের দিন অনেকটা বেলা পেরোলে ঘুম ভেঙে রনক টের পায় তানি ওকে ডাকতে আসেনি। যে কটা দিন বাবার সঙ্গে থাকে মেয়ে রোজ সকালে নিয়ম করে বাবাকে ডাকতে আসে। বলে, ‘বাবা তুমি ভীষণ অলস। এতবার ডাকতে হয়!’
আলসেমি তাড়িয়ে বিছানা ছাড়তে গিয়ে রনক টের পায় বুক ভেঙে যাচ্ছে। নিশ্বাস নিতে পারছে না। করোনা ভাইরাস আক্রমণ করেনি তো আবার ? অক্সিজেন স্যাচুরেশন নেমে যায়নি তো ? জ্বর জ্বর ভাব নেই কোনও। মাথা ভারী লাগছে, শূন্য শূন্য লাগছে বুক। কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের জানালা দুটো খুলে দেয় রনক। বহ্নি বলত শোবার ঘরে একাধিক জানালা থাকলে ফার্নিচার ঠিকঠাক রাখা যায় না। তবে খুব বাতাস হয়।
বাতাস হচ্ছে। রোদ পোড়া বাতাস হুম হুম করে ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতরে। রনক নাকেমুখে ভাপ নেওয়ার মতো উষ্ণ বাতাস টানে। শব্দহীন ঢেউয়ের মতো বাতাসের প্রবাহ ওর বুকের ভেতরে ঢুকে যায়। আরাম লাগার বদলে কেমন যেন ফাঁপা লাগে ভেতরটা। মনে পড়ে কাল রাত থেকে তানিকে দেখেনি।
‘তানি! তুই কোথায় ?’
কোনও সাড়াশব্দ নেই।
‘তানি! তানি!’
এ ঘর ও ঘর কোথাও নেই তানি। ওর ব্যাকপ্যাক নেই। ইউটিউব দেখে আঁকা সূর্যাস্তের সিরিজ ছবিগুলো ওর পড়ার টেবিলের কাচের নিচে সাজানো ছিল। সেগুলোও নেই।
কেঁপে ওঠে রনক। টেবিলের ওপরে একটা ছবি রাখা, ছবির দুজন মানুষের মাঝখানে দাঁড়ানো ছোট মানুষটাকে কেটে ফেলার পর মাঝখানের ফাঁকা অংশটা খুব অদ্ভুতুড়ে দেখাচ্ছে।
১৭
ভুল করেছে তা বোঝার মতো বয়স তানির হয়েছে। মতিয়ার নামের লোকটার দৃষ্টি দেখে নিজের ভুলের পরিমাণ মেপেও তানি জানু খালাকে বলে, ‘আমাকে অতটা ভাত দিও না খালা। আমার ক্ষিধে নেই।’
‘কুট্টি খালা খিদা নাই কইলেই হইব, খাওন লাগব। নাইলে শরীলে জুত পাইবা কেমতে ?’
‘তুমি শুধু আমার ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দাও।’
এই ঘরে ঘুম আসবে কি না―জানে না তানি। তবে এই মুহূর্তে একটা বিষয় ওর কাছে পরিষ্কার, অচেনা এই দৃশ্যপট থেকে ওকে পুনরায় পালাতে হবে। কিন্তু এখনই তা সম্ভব না। জানু খালার জন্যই সম্ভব না। খালা ওকে খুব ভালোবাসে। তানি জানে, ওকে মানুষটা বুক দিয়ে আগলে রাখবে।
চারপাশটা একবার দেখে নেয় তানি। ওদের বাসার গেস্টরুমের চেয়েও ছোট এই ঘর। আসবাব বলতে একটা কাঠের আলনা যাতে জানু খালার শাড়ি পেটিকোটের পাশাপাশি উদ্ভট রঙের কয়েকটা গেঞ্জি, লুঙ্গি, গামছা আর ময়লা ব্লাউজ ঝোলানো আছে। চোখ ফিরিয়ে তানি টিভির দিকে তাকায়। আলনার পাশেই একটা টেবিলের ওপরে একটা ছোট টিভি রাখা, তার পাশে একটা বিশাল ট্রাংক। ঐ ট্রাংকের জিনিস তুলতে গেলে নির্ঘাৎ মই লাগবে। এখানে ঢোকার সময় দেখেছে পাশের ঘরেও এমন মস্ত এক ট্রাংক আছে। এই ঘরের পাশাপাশি এমনই সাত-আটটি টিনশেড ঘর আছে। ঘরগুলোর দেওয়াল ইটের, ছাদ টিনের।
তানির নানার গ্রামের বাড়িটা এই ধরনের। তবে ঘরগুলো এল শেইপে বাঁধা। প্রতিটা ঘরের আলাদা নামও আছে, বড় ঘর, ছোট ঘর, ঢেঁকি ঘর, বৈঠক ঘর। তানির নানা শহরে চলে আসার পর ওদের আর তেমন যাওয়া হতো না গ্রামে। তবে নানার মৃত্যুর পর ওরা সবাই গিয়েছিল মুন্সিগঞ্জে, হাটখান গ্রামে। বাবা, মা আর তানি গিয়েছিল। পাভেল নামের লোকটা যায়নি।
ঘরের একমাত্র খাটে সাদা-কালো চেকের একটা তোলা চাদর বিছিয়েছে জানু খালা। এ নাকি খাট না, চারপেয়ে চৌকি। খালা আর তার স্বামী কোথায় শোবে জেনে বিহ্বল ভাবটা আরও চেপে ধরে তানিকে। এইটুকু ঘরে মেঝেতে বিছানা পেতে মাঝখানে চাদর ঝোলালেই বা কতটা আড়াল হবে।
‘তোমরা বরং খাটে ঘুমাও খালা। আমাকে নিচে বিছানা করে দাও।’
জানু আঁতকে ওঠে।
‘কী কথা বললা কুট্টি খালা, বাড়ি ছাইড়া আসছ দেইখা কি পানিতে ফালায় দিমু তোমারে ? মা-বাপের কত আদরের মাইয়া তুমি। আমি কী তা জানি না!’
জানু খালার কথা শুনে তানির ভেতরে একটা জলডোবা মাছ নড়েচড়ে ওঠে। কে আদর করে ওকে, কেউ না…কেউ না। হুট করে মনে পড়ে তানির অ্যকোরিয়ামের মাছগুলোকেও তানি ছাড়া কেউ আদর করে খেতে দেবে না।
‘আমার জন্য কেন তোমরা মেঝেতে শোবে ?’
‘ঘুমাইলে আমাগো পাকাই কি আর চৌকিই কি ? সব সমান। এক কাজ করো তো, কথা না বইলা তুমি শুইয়া পড়ো।’
জানু দরজায় দাঁড়ানো মতিয়ারের দিকে ক্রূর দৃষ্টিতে তাকায়।
‘তুই যাস না ক্যান এখনও। যা, যা।’
‘সার্টিফিকেটটা দেন।’
‘নগদ দুইশ টাকা দে আগে। বানুরটা বানুরে দিয়া দিছি।’
‘হ নিজের মাইয়ারটা মাগনা দিছেন আর আমার বইনেরটার জইন্য টাকা চান ?’
‘চামুই তো, করোনার সাটিফিকেট তো আর মাগনা পাই নাই। নগদে চাইরশো টাকা দিছি দুইটার জন্য।’
‘আগে জানলে আমার বইনেরটা নিজেই আনতাম।’
‘না করছে কে! এহনই আন। আমার কাছে আসছোস ক্যান ?’
মতিয়ার হিসহিস করে ওঠে, ‘মা-মাইয়া একই খাসলত।’
জানু ব্যঙ্গ করে, ‘হ, তোর খাসলত তো ভালা।’
অনিঃশেষ এক যন্ত্রণা বিদ্ধ করে তানিকে। মতিয়ার লোকটা ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। স্কার্টটা কখন ওপরে উঠে গেছে ও দেখেনি। অতিরিক্ত সতর্কতায় আঁটোসাটো হয়েই তো বসেছিল তানি। কখন এমন হলো!
‘গেলাম গা। আপনাগো মাইয়ারে বইলেন বাড় একটু কমাইতে। নইলে খবর আছে।’
‘তোর বাড় কমা আগে ছ্যাড়া। আমার মাইয়ার শইল্যে আরেকবার হাত তুইলা দ্যাখ, তোরে টুন্ডা বানায় দিমু। সব শুনছি আমি, তুই আবার যাওয়া শুরু করছস ঐ পাড়ায়।’
‘তোর মাইয়া অসুখখা, অসুখখা মাইয়ারে লাগাইয়া সুখ পাই না। পাড়ায় যামু না তো কী করমু।’
খিকখিক করে হাসতে হাসতে দরজার সামনে থেকে সরে যায় মতিয়ার। ঘরের দরজা বন্ধ হতেই আচ্ছাদনহীন ছাতা পড়া শক্ত বালিশটা উলটে নিয়ে দ ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ে তানি। ঘরের অন্য দুজনও শুয়ে পড়েছে। খালা আর তার স্বামী। কেউ ঘুমায়নি। ওদের খণ্ড খণ্ড সংলাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামা, অঙ্গ সঞ্চালনার শব্দ জোরালো হয়ে তানির কানের ফোঁকড় গলে ঢুকে পড়ছে।
নানা যেদিন মারা যান, সেই রাতে এক বাড়ি ভর্তি মানুষ জমায়েত হয়েছিল। বড় ঘর, ছোট ঘরের খাট, মেঝেতে ঘুমিয়েছে সকলে। তানি মায়ের সঙ্গে নানার বিছানায় শুয়েছিল। বাবা শুয়েছিল পাশের ঘরের মেঝেতে। তানি আর মা যে ঘরে শুয়েছিল সে ঘরের মেঝেতেও দুজন শুয়েছিল। সম্পর্কে তারা মায়ের চাচি হয়। ঐ দুজনের মধ্যে একজন বিকট শব্দে নাক ডাকছিল। শব্দে তানির ঘুম আসছিল না। মাঝরাতে টের পেয়েছিল, মা ফুলে ফুলে কাঁদছে, বাবা খাটের পাশে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘এখন তো শান্ত হও। শরীর খারাপ করবে।’
বাবার কণ্ঠস্বর শুনেও তানি মায়ের মতো কোনও সাড়াশব্দ করেনি। চুপচাপ দেখেছে, বাবা আর মায়ের মাঝখানের দূরত্ব অতিক্রম করে বাবা কিছুতেই মাকে স্পর্শ করতে পারছিল না। এখন তানিও বাবার স্পর্শের বাইরে চলে এসেছে। ওকে না পেয়ে কী করছে বাবা ? পাগলের মতো এদিকে সেদিকে ছুটছে নিশ্চয়ই। আর মা! মা নিশ্চয়ই কেঁদে কেঁদে বাবাকে দোষারোপ করছে। মা বাবাকে বার বার দোষী সাব্যস্ত করলেও বাবার ভাবনা ছাড়তে পারে না, বোঝে তানি। বিষয়টা মা হয়তো ধরতে পারে না। বাবাও পারে না।
তানি কেন এত বেশি বোঝে, তাই তো ওর বেশি বেশি কষ্ট। তানি ভেবে পায় না কেন ওর অনুভূতি এত তীব্র ? কেন ও সব বন্ধু, সব সহপাঠীর চেয়ে আলাদা ? ও কেন পূরবীর মতো হতে পারে না। পূরবী কত চঞ্চল, উচ্ছল। বাবা-মা কাউকেই লাগে না পূরবীর। পূরবীর কাছে অফলাইনের জীবন জীবনই না, অনলাইনই ওর জীবন। পূরবী সারাদিন চ্যাটিং, সেক্সটিং, ব্রাউজিং করে সময় কাটায়। একটা ছেলের সঙ্গে ওর সম্পর্ক গভীর থেকে গভীর হচ্ছে। পূরবী বাবা-মায়ের মনোযোগ চায় না। বাবা-মায়ের খবরদারি ওর কাছে নাকি অসহ্য লাগে। তানি কেন এমন ? যারা ওর দিকে ফিরেও তাকায় না ও কেন তাদের এত মনোযোগ চায় ?
অপাঙক্তেয় হওয়ার বেদনারা নিঃশব্দে আসে, অন্ধকার এড়িয়ে বুকের ঠিক মাঝখানে আছড়ে পড়ে। অধরা কষ্টে কান্না পায় তানির। দুই ঠোঁট চেপে ও নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে, কান্না এড়াতে পারে না। পানির ভারে তানির দুই চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায়।
১৮
ফোনে খবরটা জেনে বহ্নি এক ছুটে বাসা থেকে রাস্তায় নেমেছে। অরণির জ্বর। খবরটা জানামাত্র জ্বরতপ্ত মেয়েকে চার তলার ফ্ল্যাটের মিতুর কাছে রেখে ঘরের বাইরে বের হয়েছে। মায়ের কোল ছাড়তে হচ্ছে দেখে মা মা করে কাঁদছিল মেয়েটা। কচি মুখের মায়ার হিল্লোলে বহ্নির বুক টনটন করে উঠেছে। মেয়ের ঘন ঘন জ্বর আসছে, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
ছোট বাচ্চাদের কোভিডে আক্রান্তের ইতিহাস তেমন একটা নেই বরং চিকিৎসার অজুহাতে হাসপাতালে গেলেই করোনা পজেটিভ হচ্ছে মানুষ। কথাটা জানিয়ে মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার নাম করেনি পাভেল। অরণির প্রতি পাভেলের টান বোঝার চেষ্টা করতে একবার পায়ে পা রেখে কলহে লিপ্ত হয়েছিল বহ্নি। পাভেল বুঝিয়ে দিয়েছে, ওসব মায়াকান্না করে লাভ নেই, প্রয়োজনে অরণির ডিএনএ পরীক্ষা করাতেও ওর বাঁধবে না।
কী নোংরা পাভেল! কত কুৎসিত, কত কদর্য ওর ভাবনা! এই মানুষটার জন্যই তো তানিকে নিজের কোল ছাড়া করেছে বহ্নি! যার প্রায়শ্চিত্ত করার সময় এসেছে এখন। তানি সব জানে, সব বোঝে, তাই মাকে ও জব্দ করতে চাইছে এবার। মাকে শাস্তি দিতে চাইছে। ঐ ঐটুকু মেয়ে, মনে মনে কত কষ্ট জমিয়েছে কে জানে, যার ভাগ কোনওদিন কাউকে দিতে পারেনি। সেও তো খোঁজ করেনি মেয়ের কষ্টের গভীরতার। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। পাভেলের মতো বিকৃত রুচির একটা মানুষের সঙ্গে সংসার পেতেছে, তার ঔরসে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। সে কি আরেকটু ধৈর্য ধরতে পারত না ? শুধু তানিকে আশ্রয় করে সুন্দর একটা পৃথিবী সাজাতে পারত না ?
কার কাছে এসবের উত্তর খুঁজবে ? কোথায় যাবে বহ্নি ? পা বাড়ালেই পায়ের নিচে বিরাট এক পৃথিবী দোদুল্যমান হয়ে ওঠে। চক্রবাল পেরিয়ে এসে শান্তির রেখাটা পুনরায় হারিয়ে যায় অবিশ্বাসের শূন্যতায়।
একটা সিএনজি ধরে বহ্নি সোজা রনকের বাসায় এসেছে। ও জানে তানি এখানে নেই। চেনা-জানা অনেক জায়গায় খুঁজে ফিরে বিকালে রনক ফোন করেছে বহ্নিকে। জানিয়েছে, ঘুম ভেঙে দেখে মেয়ের ঘর ফাঁকা, ওর বড় ব্যাগটাও ঘরে নেই। তাহলে কি তানি স্বেচ্ছায় ছেড়ে গেছে ওদের ?
সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে বহ্নি টের পায় বাসা থেকে জুতো ছাড়াই বেরিয়েছে। মুখে মাস্কও নেই। রনকের মুখোমুখি ফ্ল্যাটের দরজায় একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে। বহ্নিকে দেখে কিছু বলতে উন্মুখ নারীটি সামনে এগিয়ে এলে বহ্নি তাকে পাশ কাটিয়ে রনকের দরজায় জোরে ধাক্কা দিতে থাকে।
রনকের সংসার ছেড়ে যখন বেরিয়েছিল তখন তানি বারো, এই ডিসেম্বরে তানি পনেরো পার হবে। রনককে ছাড়ার সময় খুব বেশি দীর্ঘ না, দূরত্বটা দীর্ঘ।
খোলা দরজায় রনককে দাঁড়ানো দেখেই বহ্নি ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রচণ্ড শক্তিতে দু গালে চড় মারতে থাকে। সেই তিন বছর আগের মতো, মৃন্ময়ীর কথা শুনে যেমন উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল ঠিক তেমন করে বহ্নি সর্বগ্রাসী আগুনের মতো জ¦লে ওঠে। এবারও বিপরীত দিক থেকে কেউ প্রতিরোধ করে না।
‘আমার তানি কোথায় ? আমার মেয়ে কোথায় ? কী করেছিস ওকে! বল! বল! আমার জীবনটা শেষ করেছিস! সাধ মেটেনি তোর ? আমার মেয়েকেও শেষ করতে চাস! তুই একটা কীট, নরকের কীট! তোর জন্য আমার জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার তানির জীবন ধ্বংস হয়েছে। আমি তোকে ছাড়ব না… আমার মেয়েকে এনে দে, আমার তানিকে এনে দে…।’
মার খেতে খেতে রনকের পাণ্ডুর মুখ লাল হয়ে উঠেছে। কিছু বলতে পারছে না ও। বহ্নিকে আটকাতেও পারছে না। ইচ্ছে করেই আটকাচ্ছে না হয়তো। এসব কিছু বোঝার মতো অবস্থায় বহ্নি নেই।
‘বল… কোথায় আমার তানি… কোথায়!’
বহ্নি হাঁপিয়ে উঠলে ব্যথাহীন এক যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে হতে রনক বহ্নির আগুন থেকে নিজেকে ছাড়ায়। টের পায় পায়ের পাতা পানিতে ভেসে গেছে। বহ্নির ধাক্কায় কর্নার শেলফের ওপরে রাখা অ্যাকোরিয়ামটা ভেঙে গেছে। মরতে মরতে তিনটা মাছই অবশিষ্ট ছিল জারে। সোনালি-কমলা মাছ তিনটা, টুকরো টুকরো কাচ, শামুক, ঝিনুক, জলজ লতা-পাতা ছড়িয়ে পড়েছে টাইলসের মেঝেতে। অতটুকু অ্যাকোরিয়ামে এত কিছু ছিল―বিস্মিত রনক তাকিয়ে দেখে।
জলাধারটি তানির খুব প্রিয় ছিল। রনকের এনে দেওয়া গোল একটা কাচের জারে ছিল তানির প্রথম অ্যাকোরিয়াম। পরে এক জন্মদিনে ওর নানা কাঠের ছাউনি দেওয়া সুন্দর এই অ্যাকোরিয়ামটি উপহার দিয়েছিল ওকে। একা একা পরিষ্কার করতে পারত না তানি, বাবাকে হাত লাগাতে হতো। মাঝেমাঝে ওপরের অংশ খুলে রেখে পানিতে আঙুল ডুবিয়ে মাছের সঙ্গে খেলতো মেয়ে।
বহ্নি, রনক দুজনেই বেদনামথিত দৃষ্টিতে দেখে, সোনালি-কমলা মাছ তিনটি নিস্তরঙ্গ মেঝেতে কী করে সাঁতার কাটার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এদিকে বহ্নি কখন রনকের হাত চেপে ধরেছে জানে না। একদিন যে হাত নিশ্চিতভাবে ছেড়ে দিয়েছিল সেই হাতকেই আজ শক্ত করে ধরে যেন কিছু একটা খুঁজে পেতে চাইছে।
১৯
বিপণিবিতান সব খুলে গেছে। ছাব্বিশে মার্চ থেকে দুই মাসের সাধারণ ছুটি আর পরের দুই-আড়াই মাসের নিয়ন্ত্রিত লকডাউনে মার খেয়ে গেছে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রনকদের গলি থেকে বেশি দূরে নয়, চৌরাস্তার ধারে একটা বড় বইয়ের দোকান ছিল, ও মাঝেমাঝে তানির জন্য বই কিনতে যেত। দোকানটা উঠে গেছে। ঠিক উঠে যায়নি। ঐ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে রনক খেয়াল করেছে ‘পাঠশালা’ নামের বইয়ের দোকানটিতে নতুন সাইনবোর্ড ঝুলেছে ‘দ্যা শ্যাডো ফাস্টফুড অ্যান্ড বুক শপ।’ কাচের দরজার বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছিল, নামমাত্র কিছু বই রাখা দোকানে। টেবিলে বসা তরুণ-তরুণীরা থুতনিতে বা কানে মাস্ক ঝুলিয়ে স্যান্ডউইচ কফি খাচ্ছে।
কী করবে মানুষ ? নিরুপায় হয়ে উঠেছে ব্যবসায়ীরা। পাভেলের মতো ভোক্তাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে দুর্যোগকালীন সাজ-সরঞ্জাম সাপ্লায়ারদের ব্যবসাই কেবল রমরমা চলছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো কম শ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ আদায়ের চেষ্টা করছে। তবু একটা কাজ চাই রনকের। তানিকে খুঁজে বের করার জন্য হলেও পকেটে টাকা চাই। সেদিনের পর তো আর আহসানের কাছে যাওয়ার কোনও উপায় নেই।
রনক এই মুহূর্তে বাটার একটা বড় শো-রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কাচের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, দুজন অল্পবয়সী বিক্রেতা মোবাইলের দিকে মাথা তাক করে বসে আছে, নিশ্চয়ই ফেসবুক দেখছে।
বুকের ভেতরে গমগম করে ওঠে রনকের। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটা সংবাদ পড়েছিল রনক। গাজীপুরে এই লকডাউনের মধ্যেই ডাকাতি হয়েছে একটা বাড়িতে। জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ডাকাতেরা মা-মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। মেয়েটার ওপরে বলপ্রয়োগ করার সময় ও নাকি মৃত ছিল। লাশের সঙ্গে শারীরিক মিলন উপভোগ করেছে ডাকাতেরা!
তানি…ছোট্ট তানি ওর। মোমের শরীর তানির। মোমগলা মন তানির। কাঁদতে কাঁদতে রনক শো-রুমের সামনে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিচ্ছন্ন করা সিঁড়িতে বসে দুই পায়ের মাঝে মাথা গুঁজে থাকে। কোথায় যাবে জানে না, তাই বসেই থাকে। হঠাৎ কাচের দরজা ঠেলে একটি মেয়ে বেরিয়ে আসে।
‘আঙ্কেল প্লিজ এখানে বসবেন না। একটু আগেই পরিষ্কার করা হয়েছে। ক্রেতাদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্লিজ অন্য কোথাও সরে যান।’
উঠে দাঁড়ায় রনক, ক্রোধহীন চেহারায় তাকিয়ে দেখে মেয়েটির পরনে তানির মতোই প্যান্ট, ফতুয়া, স্কার্ফ। মেয়েটির মুখেও যেন তানির মুখটি খোদিত। রনকের ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে মেয়েটি ঘাবড়ে যায়। কণ্ঠস্বর কোমল করে জানতে চায়, ‘কী হয়েছে আপনার ?’
প্রশ্নকারীকে পেছনে রেখে টলতে টলতে হাঁটে রনক। মুখাবরণহীন মুখ তবু দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। বহ্নির বিয়ের খবর যেদিন পেয়েছিল সেদিন এমনভাবে শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল বার বার। বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত রনক ফিরে ফিরে গেছে বহ্নির কাছে। কখনও কখনও চিৎকার করে লম্পট বলে ওকে তাড়িয়েছে। কখনও বা চুপ থেকে চোখে বিষ ঢেলেছে। একদিন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে বহ্নিকে জড়িয়ে ধরেছিল রনক। ওকে শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলে আগুনের শিখার মতো লকলক করে উঠেছিল বহ্নি।
‘ঐ বাজারি মেয়েটার শরীর ঘাঁটার সুযোগ হয়নি বুঝি! পিরিয়ড চলছে নাকি!’
কথার চাবুকে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল রনক, বুঝেছিল ওর ক্ষমা নেই। সেদিন সত্যিই মৃন্ময়ীর কাছে গিয়েছিল রনক। যা আগে চায়নি তাই চেয়েছিল ওর কাছে।
মৃন্ময়ী ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডের মতো কোনও সাজানো-গোছানো বাসায় থাকে না। ঝড়-জল পেরিয়ে সেদিন যে ঠিকানায় পৌঁছেছিল রনক সেখানকার পরিবেশ ওর জন্য মোটেও স্বস্তিকর ছিল না। ছোটখাটো অদ্ভুদ দর্শন একটা লোক মৃন্ময়ীর বাসার প্রবেশদ্বার জুড়ে দাঁড়িয়েছিল। মৃন্ময়ীও শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল লোকটার। রনককে দেখে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিতেই লোকটা এক লাফে অনেকটা সরে দাঁড়িয়েছিল। যেন আশেপাশে কেউ নেই মৃন্ময়ী এমনভাবে রনকের হাত টেনে ধরে ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করেছিল। রনকের গলা জড়িয়ে জমকালো কণ্ঠে বলেছিল, ‘মরলাম মরলাম সখা…এই অসময়ে কী চাই ?’
মৃন্ময়ীর অকুতোভয় ভঙ্গিতে জড়োসড়ো হওয়ার বদলে নিজেকে নির্ভার লাগছিল রনকের। শরীরের রোমে রোমে বাজনা বেজে উঠেছিল, মনে হচ্ছিল ভীষণভাবে একটা শরীর চাই। কিন্তু মৃন্ময়ীর কাছে ঘেঁষতেই হঠাৎ করে একটা ধাক্কা খেয়েছিল রনক। নিজেকে ভর্ৎসনা করতে করতে ফিরে এসেছিল।
রাস্তায় হোঁচট খেতে খেতে রনক সিদ্ধান্ত নেয় আজ সত্যি সত্যি মৃন্ময়ীর কাছে যাবে। হ্যাঁ, আবার পতনের রাস্তায় হাঁটবে, মৃন্ময়ীর কাছে যাবে। স্পষ্ট মনে পড়ছে, মৃন্ময়ীর শরীরের বাঁক, মনোরম হাসি, কথার ঠুমরি। অমন কথা, হাসি সব গ্লানি মুছিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তানিকে ভুলিয়ে দিতে পারে কি ? তানি! তানি! বার বার নামটি জপেও শান্ত হতে পারছে না রনক। মনে হচ্ছে চিতার আগুনে শুয়ে আছে। আগুনের লকলকে শিখা ওকে গ্রাস করে ফেলছে। চামড়া, মাংস, রক্ত গলিত লাভার মতো দেহকাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
অসহনীয় বেদনায় হাহাকার করে ওঠে রনক। তারপর এলোমেলো পায়ে সামনে এগোতে থাকে।
২০
বারোয়ারি কলপাড় থেকে মুখ ধুয়ে ঘরে ঢোকার সময় তানি দেখেছে রাস্তায় লোকজন আর বাচ্চার ভিড়। আট-দশজন নারী ও পুরুষ ‘মানবিক পৃথিবী’র ‘গরিবের বন্ধু জননেতা মইনুল কোরাইশি ভাই’ লেখা ব্যানার নিয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বিস্কুট বিতরণ করছিল। বিস্কুট হাতে পেয়ে শিশুদের তেমন একটা খুশি বলে মনে হচ্ছিল না, বরং থুতনিতে মাস্ক ঝুলিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত বিস্কুট বিতরণকারীদের কাণ্ডকারখানা দেখে এদের ফুর্তির শেষ ছিল না। নাজেহাল হওয়া মানুষগুলোকে দেখে ওরা হাসতে হাসতে এর ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ছিল। দরজার কাছে দাঁড়ানো পাঁচ-ছয় বছরের মেয়েটাও ওদের দলে ছিল। এখন সে তানির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বিস্কুটে একটা কামড় বসিয়ে উসখুস করছে। বোঝা যাচ্ছে ওর চোখে-মুখে হরেক প্রশ্ন। খানিকক্ষণ ইতস্তত করে মেয়েটা তানিকে একটা প্রশ্ন করেই ফেলে।
‘তোমার ঐ ব্যাগে কী আছে ? বিস্কুট ?’
‘না।’
‘বুঝছি জামা। কতগুলা জামা তোমার ? অনেক ?’
প্রশ্ন করেই দরজার সামনে থেকে উধাও হয়ে যায় মেয়েটা। তানি খেয়াল করে, বাইরে কেউ ‘মিনু মিনু’ বলে ডাকছে।
ব্যাগের চেইন খুলতেই কালো ডায়েরিটা বেরিয়ে পড়ে। কালো কভারের ডায়েরিটা ছোট, চিঠি লেখার প্যাডের মতো সোনালি রঙের রিঙে পাতাগুলো আটকানো। এটা মা দিয়েছিল ওকে। কোনও এক দিবসে স্কুলের শিক্ষকদের সৌজন্য উপহার দিয়েছিল একটা কোচিং সেন্টার। মা-ও একটা পেয়েছিল। মা বলেছিল, ব্যবসাটা খুব ভালো বোঝে এরা। এমন কোনও কথার সূত্র ধরে ঘরে আলোচনা শুরু হলে এখন মা খুব বিপত্তিতে পড়ে। ঐ লোকটা মাকে কেন যেন হেনস্তা করতে চায় পদে পদে। বলে, কথায় কথায় ব্যবসায়ীদের গালি দেওয়া না ? তো বাঙালির কে না ব্যবসা বোঝে ?
তানি খেয়াল করেছে মা উনার সব কথার পিঠে জবাব দেয় না। বাবার সব কথার পিঠে মা কথা বলত, কখনও হেসে হেসে, কখনও রেগে রেগে। ঐ রাগ কেমন মিষ্টি মিষ্টি ঝাল। ঝালের ঝাঁঝ পেতে পেতে বাবা ছোট তানির দিকে তাকিয়ে চোখ নাচাতো। বাবা আর মেয়ে খুব হাসতো তখন। মা-ও বাধ্য হয়ে হেসে ফেলত। এখন মা মেপে হাসে। মেপে কথা বলে।
তানি ডায়েরির প্রথম পাতায় চোখ রাখে। সব পাতা ফাঁকা। ডায়েরি লেখার অভ্যাস নেই তানির। যেই কথা লিখে গোপন রাখতে হয়, সেই কথা নিভৃতে নিজের কাছে রেখে দেওয়াই ওর কাছে যৌক্তিক মনে হয়। গোপন সব গোপনই থাক। তবু ডায়েরিটা সঙ্গে রাখে তানি। মায়ের মতো। মায়েরও এমন একটা ডায়েরি আছে। ফাঁকা সেই ডায়েরির শেষের পাতায় কিছু ফোন নম্বর, জন্মদিনের তারিখসহ আরও অদ্ভুত কিছু তারিখ টুকে রাখা। যেমন, বাবা কবে প্রথম মাকে ভালোবাসি বলেছিল, তানির জন্মের খবর প্রথম কবে পাওয়া গেল, তানির জন্ম, প্রথম দাঁত ওঠা, প্রথম হামাগুড়ি দেওয়া, প্রথম হাঁটা, তানি কবে দুধ খাওয়া ছেড়েছে―এসবের দিনক্ষণ। সেই ডায়েরিটাই সেদিন বাবার ঘর থেকে সরিয়েছিল তানি। মায়ের অ্যাকাডেমিক পরীক্ষা পাসের সার্টিফিকেটের ফাইলের সঙ্গে ডায়েরিটাও মাকে দিয়ে এসেছে। ডায়েরিটা হাতে নিয়েই কাঁদতে শুরু করেছিল মা। মা কবে যে এত ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে তানি বুঝতেই পারেনি।
মা কি এখনও কাঁদছে ? তানিকে হারিয়ে ফেলে কেঁদে কেঁদে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে ? কিন্তু অরণি তো তাহলে কষ্ট পাচ্ছে। ডগিটাও। নিশ্চয়ই ডগিটাকে আর খেতে দিচ্ছে না মা। বাবা কী করছে ? বাবা তো কাঁদতে পারে না একদম। না কাঁদলেও বাবার মুখটা এখন ভেজা ভেজাই থাকে সারাক্ষণ।
কেন ঐ দুজনকেই মনে পড়ছে তানির! তানি মনে করতে চায় না। ফিরতেও চায় না ওদের কাছে। বাসা থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই জানু খালাকে বলে তার মোবাইল বন্ধ করেছে তানি। এতক্ষণে নিশ্চয়ই থানা-পুলিশ করে ফেলেছে বাবা-মা। ফোন চালু করলেই সবাই জেনে যাবে ওর অবস্থান।
কোথায় আছে জায়গাটার নাম ঠিকঠাক জানে না তানি। শুধু জেলার নাম জানে। নারায়ণগঞ্জ। জানু খালার সঙ্গে ট্রেনে করে যেখানে নেমেছে সেখান থেকে বাসে উঠে একটা গ্রামীণ জায়গায় এসেছিল। একটা ছোট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কলা, রুটি খেয়েছিল। সেখান থেকে অটোরিকশাতে করে সত্যিকারের একটা গ্রামে চলে এসেছে। এরপর কোথায় যাবে জানে না তানি।
বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্তটা হুট করে নেয়নি তানি। অনেক দিন ধরেই ভেবেছে, ঐ মানুষ দুজনের সঙ্গে আর থাকবে না। কিন্তু যতবারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ততবারই বাবা-মায়ের বিবর্ণ চেহারা ওকে দুর্বল করে তুলেছে। এবার শরীর ঝাড়া দিয়ে সব ফেলে তানি ঘরের বাইরে পা রেখেছে। এখন কী করবে ও জানে না। জানু খালা কদিন ওকে খাওয়াতে পারবে তা ঠিকঠাক জানে না। খালাকে কী বলবে, খালার মেয়ে বানুর মতো খালা যেন ওকেও একটা কাজ ঠিক করে দেয় ? কিন্তু তানির তো আঠারো বছর হয়নি, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি কি ওকে কাজে নেবে ? তাহলে কী করবে তানি ? এখানকার বাচ্চাদের পড়াবে ? টিউশনি করলে অন্তত নিজের হাতখরচ তো উঠবে। কিন্তু আশপাশের মানুষের যেই অবস্থা দেখেছে, এরা তো বেতনই দিতে পারবে না। তাহলে কী করবে ? বুকের ভেতরে ফের ঝড় শুরু হয়। কে যেন সুদূর থেকে বলে, ‘ফিরে আয় মা…ফিরে আয়।’
২১
রনকের কোনও কথায় কান দেয়নি বহ্নি। ছুটতে ছুটতে থানায় গেছে। শুনবে না, ঐ মানুষটার কোনও কথাই আর শুনবে না―মনে মনে পণ করেছে। বহ্নি জানে ওর স্থিতিহীন জীবনের জন্য একজনই দায়ী, কেবল একজন। জানে ও রনকই সেই প্রতারক। প্রবঞ্চিত বহ্নি জানে কার জন্য ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে সব। আর প্রবঞ্চক একের পর এক ছল করছে, জীবনের অবশিষ্টটুকু কেড়ে নেওয়ারও পাঁয়তারা করছে।
দুটো দিন পেরিয়ে গেছে মেয়ের খোঁজ নেই। ওদিকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যে ইঙ্গিত করেছেন তা মোটেও শোভন নয়। তানি, ঐ অতটুকু তানি, যাকে কদিন আগেও মুখে ভাত তুলে খাইয়েছে সে কি না কোনও প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গেছে! অপরাধ দেখে দেখে অভ্যস্ত পুলিশের দৃষ্টিতে বহ্নির উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর বিশ্বাস ক্লিশে লাগছিল হয়তো। অনেকক্ষণ ধরে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তানির কোনও প্রেমিক নেই। তানি এমন করতে পারে না। সরকারি উর্দি পরা মানুষটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হেসেছে, বুঝিয়েছে, সব বাবা মা-ই সন্তানদের ব্যাপারে একই ধরনের কথা বলে। পরে ভেতরে হাত দিলে দেখা যায় ঘটনা অন্য।
বহ্নি জানে, এখানে অন্য কোনও ঘটনা নেই, তানি অভিমান করে চলে গেছে। ওদের দুজনের ওপরে অভিমান করে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে মেয়েটা। এখন মেয়ের অভিমান ভাঙাবে কী করে! ছোটবেলায় তানি অভিমান করলে রনক কখনও ঘোড়া, কখনও বা বানর সেজে মেয়েকে হাসাতো। আর বহ্নি মেয়ের পছন্দমতো কোনও একটা খাবার রান্না করত। এখন সব অধিকার হারিয়েছে, মেয়েকে বহ্নিই তো দূরে ঠেলে দিয়েছে। পাভেলের কারণে তানিকে বুক থেকে ঠেলে সরিয়েছে। না, আর না। পাভেলকে আর সহ্য করবে না। এই ঘর, এই সংসার, এই সং সেজে থাকা―এসব কিছুই বহ্নিকে মানায় না। সবরকম উটকো বাঁধন ছিঁড়ে মুক্ত হবে, মুক্ত হবে…।
চমকে ওঠে বহ্নি। ফোন বাজছে, মনিমালা দিদি কল করেছে।
‘চলে যাচ্ছি রে। হেডস্যার বললেন এই মাসেও পুরো বেতন দিতে পারবে না। আমিও আর এভাবে চলতে পারব না রে। বাচ্চাদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিলাম। গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছি, যা হয় কিছু একটা করে খাব। মাঝেমাঝে তুই ফোন করিস কিন্তু।’
মনিমালার কান্নাভেজা স্বর আটকে যায়। সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পায় না বহ্নি। বহ্নিও যেতে চায়। জীবনের প্রবহমানতায় খড়কুটোর মতো ভাসতে চায় না আর, নোঙর ফেলতে চায়। কিন্তু ঐ পারে কি সুখ আছে ? তানি আছে ?
ফোন বাজছে আবার, পাভেলের ফোন। না… আর কোনও কথা না। আর কোনও বন্ধন না… বহ্নি শুধু তানিকে চায়… তানিকে চায়।
অহেতুক বেজে বেজে থমকে যায় ফোনটা। ফের চমকে ওঠে বহ্নি। বাইরে একটা হৈ চৈ শোনা যাচ্ছে। সমস্বরে কথা বলছে কারা যেন। দরজা খুলতে এগিয়ে যায়, দৌড়ে এগোতে গিয়েও মনে হয় হাজার মিটার দূরত্ব অতিক্রম করছে। ওরা তানির খোঁজ এনেছে! ভাবতেই সুখ খুঁজে বেড়ানোর অনন্ত ইচ্ছেটুকু লাফিয়ে আকাশ স্পর্শ করে। কী করবে ও তানিকে এবার দেখতে পেলে ? মারবে ? বকবে খুব ?
শিশুকালে কোনও দুষ্কর্ম করে ফেললেও মেয়ের শরীরে হাত তোলেনি। কোনও অঘটন ঘটিয়ে মেয়ে নিজে ব্যথা পেয়ে কেঁদে উঠলে মেয়ের পিঠে রোষে চড় দিয়েছে, চিৎকার করেছে, আর করবি ? আর যাবি ? আর ধরবি ? এমনটা করলে তানি বিহ্বল চোখে মাকে দেখত। বুঝতোই না হয়তো ওর ব্যথায় সবচেয়ে বেশি ক্ষরণ হয় মায়েরই, যার দৌর্বল্যে এমন বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখায় মা।
সেই মেয়ে চলে গেছে, স্বেচ্ছায় চলে গেছে। সকল জেদ, অভিমান মনে পুষে পুষে চলে গেছে দৃশ্যের অন্তরালে। বহ্নিও তো চেয়েছে তানি চলে যাক। পাভেলের কদর্য আচরণের পর তানিকে এই বাড়িতে রাখতে চায়নি। মেয়েটা কি বুঝেছে তা ? মেয়ের চোখে চোখ রেখে কারণটা বলেনি।
ওর মনে কি ভয় ছিল ? কীসের ভয় ছিল মনে ? হিংস্র শ্বাপদের মতো দাপাতে দাপাতে বহ্নিকে ঠেলে সেই যে সেদিন চলে গেছে পাভেল, আর আসেনি। ও নিজেও মনে মনে প্রার্থনা করেছে অসংখ্যবার, সে যেন না আসে। বহ্নির ফোনটা যেন না বেজে ওঠে।
দরজা খুলতে ভুলে গেছে। দরজায় ঠেকানো মাথা তুলতে তুলতে টের পায়, বাইরের কোলাহল থেমে গেছে। সব নিশ্চুপ। তবে কি তানি আসেনি!
সব সংশয় ঠেলে দরজা খোলে। রনক এসেছে। ও কোনও প্রশ্ন করার আগেই বহ্নি চিৎকার করে ওঠে, ‘তানির কোনও খোঁজ পেলে ?’ রনক দু পাশে মাথা ঝাঁকাতেই যেভাবে দরজা খুলেছিল সেভাবেই দরজা আটকে দেয়।
মাথা নিচু করে রনক সিঁড়ি দিয়ে নামে। সিঁড়িঘরে একটা কুকুর কুণ্ডুলি পাকিয়ে আছে, ওর নাম ডগিটা। তানি প্রতিবার ফিরে ডগিটার গল্প করত। এই বাসার আর কারও কোনও গল্পই বলত না মেয়ে। অথচ রনক চাইত, তানি বহ্নির কথা বলুক। কিন্তু মেয়েটা আলগোছে মায়ের কথা এড়িয়ে যেত। মেয়েটা একা একা কবে যে বড় হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি রনক। এমন কি কবে যে ওর পিরিয়ড হয়েছে জানতেই পারেনি। একদিন ওয়েস্ট বিন খুলে টের পেয়ে বাড়ির কাছের ফার্মেসিতে চলে গিয়েছিল। প্যাডের প্যাকেট এনে মেয়ের পড়ার টেবিলে চুপচাপ রেখে গেছে। মেয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে দ্যুতিময় হেসেছিল।
আহা কোথায় গেল মেয়েটা! কোথায় গেল ওর আত্মাটা!
ঝর ঝর করে বৃষ্টি পড়ছে যেন শোকের মাতম তুলেছে হাওয়ায়। মাথা বাঁচাতে রাস্তার ধারের যাত্রী ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে যায় রনক। বৃষ্টির তোড়ে যাত্রী ছাউনি চারা রোপার জলডোবা ভূমি হয়ে আছে। ওর মতো কিছু মানুষ প্যান্ট, পায়জামা, শাড়ি পা থেকে অনেকটা ওপরে তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে প্রতিটা নারীকে পা থেকে চুল পর্যন্ত একবার করে তাকিয়ে দেখে রনক। না এদের মধ্যে কেউই তানি নয়। হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। ওর চাহনিতে অস্বাভাবিক কিছু ছিল তা আবিষ্কার করে মেহেদি রঙা শাড়ি পরিহিত আধভেজা এক তরুণী তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে, ‘মহামারি আসুক আর যাই আসুক পুরুষ মানুষের নজর একই থাকে। শুধু মুখে না এদের চোখেও পট্টি বাঁধা উচিত।’
বিব্রত রনক কথাটা শুনে দ্রুত মাথা নিচু করে। যা করে ফেলেছে তা কাটাবার উপায় নেই বলেই বৃষ্টির মধ্যে রনক হাঁটতে শুরু করে। কবে যেন ফেসবুকে পড়েছিল বৃষ্টি নামলে করোনা ভাইরাস থাকবে না।
২২
একটা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। বজ্রপাতের মতো চিলিক দিয়ে ওঠা কণ্ঠস্বরটি সকালের নীরবতা ছিন্ন করে দিচ্ছে। তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেটে গেছে তানির। চিনতে ভুল হয় না ওর, জানু খালার স্বর এটা। বুকের ভেতরে জমে ওঠা ভয় ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কি ভুল করেছে ও ? জানু খালা যে ঠিকানা বদলেছে বাবা তো জানে। তাহলে ওকে খুঁজতে খুঁজতে কেন চলে আসছে না এখানে ? আর মা ? মা কী করছে ? অরণিকে বুকে তুলে ওকে কি ভুলে গেছে ? অভিমানের তীব্র একটা আগ্নেয় শিখা জড়িয়ে ধরে তানিকে। পৃথিবীর এই বিপর্যয়ের মাঝেও যাদের জন্য নিজেকে নতুন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে তাদের জন্য বুকের মধ্যভাগে জল থই থই করে। দূরে সরিয়ে দিতে চাওয়া মুখজোড়াও মনে পড়ে। মনের ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা বিপ্লব ওর সঙ্গেই সংঘর্ষে মেতে ওঠে।
কেন পালিয়েছিস তুই ? কেন ঘর ছেড়েছিস ? কষ্ট পেয়ে পেয়ে ক্ষয়ে যাওয়া মানুষ দুটিকে নতুন করে কেন কষ্ট দিচ্ছিস ?
প্রশ্নের ঘূর্ণির ভেতরে ফের আর্তনাদ শোনা যায়। তানি টের পায় সকালের আলো উদ্দাম হতে না হতেই ঘরের পরিবেশ কেমন যেন বদলে যাচ্ছে।
‘কুট্টি খালা ও কুট্টি খালা, আমার মাইয়ারে মাইরা ফালাইছে গো খালা। আমার বানুরে ঐ হারামি বিষ খাওয়াইছে…।’
জানু খালার চিৎকার শুনে ঠান্ডায় জমে যেতে থাকে তানি। বানুর ঘরের দিকে তাকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে যেতে থাকে শরীর। জানু খালার ঘরের মতো একটা চৌকি এ ঘরে। চৌকিতে বিছানো ফুল ফুল চাদরের ওপরে একটা মেয়ে শুয়ে আছে। জানু খালার ঘরের আদলেই এ ঘর সাজানো, একই রকম আসবাব। কেবল এ ঘরের টিভিটা বড়, ওপরের দিকে ডান কোনায় ট্যাপ খাওয়া আর আলনায় ঝোলানো কাপড়ের ওপরে আধময়লা আন্ডারওয়্যার আর ব্রা ছড়ানো। বাবা-মাকে আন্ডারগার্মেন্টস কখনও এমন উন্মুক্ত জায়গায় রাখতে দেখেনি তানি। দৃষ্টি সরিয়ে নিতে নিতে ও দেখতে পায় আলনার বামদিকটা ফাঁকা।
‘কাপড়চোপড়, ব্যাগ নিয়া পালাইছে হারামজাদা। চশমখোর, বউয়ের খাইয়া, পইরা…আগেই কইছিলাম জানু এই পোলার লগে মাইয়ার বিয়া দিছ না। এহন ভালো হইছে তো, কোন না কোন নটি মাগীরে হাঙ্গা কইরা বসছে…।’
কথাগুলো বলতে বলতে একজন মহিলা জানু খালার আছড়ে পড়া শরীর শূন্যে তোলার চেষ্টা করে। খালা বিড়বিড় করছে এখন। এ সময়ে কী বলে সান্ত্বনা দিতে হয় জানে না তানি। মায়ের বিয়ের পর বাসায় ওকে আর বাবাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছিল কেউ কেউ। ছোট চাচা বলেছিল, ‘তোর বাবাকেও বিয়ে করাব। ঐ মহিলার উচিত শিক্ষা হবে।’
ঐ মহিলা যে ওর মা বুঝতে অনেকক্ষণ সময় লেগেছিল তানির।
‘আমার মাইয়া বিষ খায় নাই। অয় মারছে রে আমার বানুরে…।’
বানুর মুখের দিকে তাকায় তানি, ঠোঁটের কোণে ফেনা জমে আছে মেয়েটার। ইঁদুর মারার ওষুধ খেয়েছে বানু। ইঁদুর মারার বিষ দেখেনি তানি। তেলাপোকা মারার ওষুধ দেখেছে, রাতে তানি বিছানায় গেলে মা ওষুধের গুঁড়ো ছিটিয়ে দিত ঘরের কোনায় কোনায়। ওর হাতের নাগালে রাখত না ওষুধ কখনও, তবু প্রায়ই সতর্ক করত, ‘একদম হাত দিবি না খবরদার।’
জানু খালা অজ্ঞান হয়ে গেছে। তানি কাঁপতে কাঁপতে জানুর ঘরে ঢোকে। ব্যাগ বুকে চেপে ধরে চৌকির ওপরে বসে তানি। শীত করছে ওর। ভয় করছে। মাকে মেরে ফেলবে ঐ লোকটা। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে তানি সেদিন স্পষ্ট শুনেছে কথাগুলো।
‘তুমি আমার মেয়ের সামনে ঘরের দরজা বন্ধ করবে না।’
‘কেন! দরজা খুলে বউকে আদর-সোহাগ করতে হবে নাকি তার আগের ঘরের চারার জন্য!’
‘অমন বিশ্রী করে বলবে না। হাসবে না এমন করে। ও চলে যাক ঘরে। তারপর…আমি জানি তানি এলে তুমি ইচ্ছে করেই ওর মুখের ওপরে দরজা বন্ধ করো।’
‘ন্যাকামি রাখো তো, অত চিন্তা যখন, ওর বাবা আসলে দিয়া দাও না কেন, তোমার প্রাক্তন নাগর তো প্রতি মাসেই এই বাড়িতে আসে।’
কণ্ঠের ঝাঁঝ বাড়তে থাকলে দরজার কাছ থেকে সরে যেত তানি। সরতে সরতে আজ ও কোথায় এসেছে! কিন্তু ও না থাকলে তো মাকে বানুর মতো মেরে ফেলবে লোকটা, তানি কিছু করতে পারবে না তখন। ঢেউ ওঠে বুকে, বুকের ভেতরে আটকে পড়া ঢেউয়ের চাপে ও ছটফট করে।
ঘরের ভেতরে মানুষের ভিড় কমেছে, পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে শুনে সরে পড়েছে অনেকে। বানুর ঘরের চৌকাঠে শুয়ে থাকা জানু খালাকে একবার চোখ তুলে দেখে নিয়ে ঘাসওঠা, গলির অপরিচ্ছন্ন সরু পথ ধরে হাঁটতে শুরু করে তানি।
চেনা চোখগুলোকে ফাঁকি দিয়ে বাইরে যাওয়ার আর প্রয়োজন নেই তানির। এদের কেউই তানির প্রস্থান লক্ষ করার মতো অবস্থায় নেই। সবাই বিষে নিথর হয়ে যাওয়া বানুকে নিয়ে ব্যস্ত। এত কাছ থেকে সম্পূর্ণ একটা মৃত মানুষকে দেখেনি বানু। সাদা কাপড়ে জড়ানো নানার মুখটি দেখেছে শুধু। আর লিওকে দেখেছে। চারপেয়ে লিওকে মৃত্যুর পর মৃত মানুষের মতোই অসহায় দেখাচ্ছিল।
মৃত মানুষের মুখ ঘুমন্ত মানুষের মতো নয়। এই মুখ আলাদা। যেই মুখ দেখে হাহাকার করে উঠতে ইচ্ছে হয়। লিওকে দেখে যেভাবে বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠেছিল অপরিচিত এই নারীর প্রাণহীন মুখটি দেখেও তানির ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে হাহাকার করে উঠেছে। এই মানুষটি আর উঠে বসবে না! ওর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরবে না! বলবে না, ‘ও মা আমার অনেক কষ্ট…আমার ভেতরে বাইরে অনেক ব্যথা গো মা!’ বলবে না, ‘মা গো আমাকে একটা ঘুম পাড়ানির গল্প শোনাও…।’
ছোটবেলায় তানিকে কত গল্প শোনাতো বাবা-মা। সবই বেঁচে থাকার গল্প। মৃত্যুর গল্প শোনায়নি কেউ। জানায়নি, মৃত্যু মানে কোনওদিন মা-বাবার বুকে ফিরে আসতে না পারা।
মৃত্যুর চেয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে কঠিন মনে হচ্ছে তানির কাছে। কঠিন বিষয়টা মাথায় পাক দিয়ে উঠতেই ওর শরীর ঝমঝম করে ওঠে।
রাস্তার ওপরে মানুষের ভিড় বাড়ছে। পৃথিবী যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের দৌরাত্ম্যে ঘায়েল হয়ে আছে তা এত মানুষ দেখে বোঝা মুশকিল। হঠাৎ ভিড় দু ভাগ হয়ে যায়, উৎসুক মানুষের মাঝখান দিয়ে একটা গাড়ি এগিয়ে আসে। তানি মুহূর্তের মধ্যে পায়ের লক্ষ্য বদলে ফেলে। তারপর দৃপ্ত পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পায়ের জোর বাড়ায় তানি, ইউনিফর্ম পরা ঐ মানুষগুলোর কাছে যেতে হবে ওকে, ওরা নিশ্চয়ই তানিকে বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে।
ভাবনাটা জোরালো হয়ে উঠতেই শরীর জুড়ানো হাওয়া এসে ছুঁয়ে দেয় তানিকে। বুকের ঢেউগুলো পাড় ভাঙে, টলটলে পানি ছড়িয়ে পড়ে পুরো শরীরে, আনন্দের মূর্ছনা জাগে সর্বত্র।
তানি জানে, এমন হাওয়া বইলে ভীষণ বৃষ্টি নামে পৃথিবীতে। এবার বৃষ্টি নামলে পৃথিবীটা ঠিক ঠিক ভাইরাসমুক্ত হয়ে যাবে।
২৩
রাশি রাশি মেঘ আকাশটাকে গ্রাস করে ফেলছে। ধীরে ধীরে মেঘেদের ওজন বাড়ছে। ঘোর লাগা চোখে তানি দেখছে দুটি ভিন্ন পথ থেকে দুজন মানুষ ওর দিকে এগিয়ে আসছে। তারা কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারছে না।
তানির বুকের ভেতরে এক সমুদ্র পানি উছলে ওঠে। ও দু পাশে দু হাত বাড়িয়ে দেয়। এবার বৃষ্টির মতো ছুটে এসে মানুষ দুটি তানির দু হাত আঁকড়ে ধরে।
এই মুহূর্তে ওরা তিনজন হাঁটছে। বৃষ্টির বড় বড় দানা ঝরে পড়তে শুরু করেছে। ওরা অবাক হয়ে দেখছে, বৃষ্টির একেকটি ফোঁটা অশ্রুঅমরার মতো টলমল করতে করতে ওদেরকে ভিজিয়ে দিতে চাইছে। বহুকাল বৃষ্টিহীন থাকা তিনটি মানুষ বৃষ্টিকে অবলম্বন করে নিজেদের কষ্ট, যন্ত্রণা, গ্লানি, ক্ষোভ…ধুয়ে নিতে শুরু করেছে। চুল, কপাল, নাক, গাল, ঠোঁট ছুঁয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ওদের পোশাক ভারী করে দিলেও তিনজনের পায়ের গতি হয়ে যাচ্ছে হালকা। দেখে মনে হচ্ছে ওদের কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, কাউকে ছেড়ে যাওয়ারও কোনও তাড়া নেই।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



