আর্কাইভপ্রবন্ধ

শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৫ : কল্পনা, মনন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক দায়বদ্ধ আয়োজন : ইসমাইল জসীম

শিশুসাহিত্য উৎসব

শিশুসাহিত্য মানেই শুধু রঙিন মলাট, ছড়া কিংবা গল্পের সরল আনন্দ নয়, শিশুসাহিত্য আসলে একটি জাতির মনন গঠনের সূচনাবিন্দু। এই উপলব্ধিকে নতুন করে সামনে এনে বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৫। ২৪-২৫ অক্টোবর। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজন কেবল উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি হয়ে উঠেছিল এক গভীর ভাবনার ক্ষেত্র, যেখানে শিশুসাহিত্যের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পথ চলা নিয়ে চলেছে নিবিড় সংলাপ।

উৎসবের পর্বভিত্তিক আয়োজনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এর গভীরতা। ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য: সৃজনে মননে কতটা যুগোপযোগী’, ‘ছোটদের পত্রিকা : নতুন সাহিত্য সৃষ্টির উৎসমুখ’, ‘ছোটদের বইয়ের মান উন্নয়নে লেখক-প্রকাশকের দায়’, ‘প্রান্তিক জনপদে শিশুসাহিত্য চর্চা’, কিংবা ‘বই কীভাবে কাছে টানতে পারে শিক্ষার্থীদের’―এমন বিষয়গুলো একদিকে যেমন সময়ের দাবি, অন্যদিকে তেমনি আত্মসমালোচনারও সুযোগ তৈরি করেছে। আলোচকদের বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে একটি প্রশ্ন ‘আজকের শিশুর জন্য আমাদের সাহিত্য কতটা প্রস্তুত ?’

উৎসবের বিশেষ আয়োজন ছিল সম্মাননা। এবারের শিশুসাহিত্যিক সম্মাননায় ভূষিত হন কবি ও শিশুসাহিত্যিক তাহমিনা কোরাইশী, জাহাঙ্গীর আলম জাহান এবং আনোয়ারুল হক নূরী। বইয়ের পৃষ্ঠপোষক সম্মাননায় সম্মানিত হন মাজহারুল হক ও ঢালী মোহাম্মদ শোয়েব। এই সম্মাননাগুলো কেবল ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়; বরং শিশুসাহিত্যে দীর্ঘদিনের সাধনা ও নিঃশব্দ অবদানের প্রতি সম্মিলিত কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

এক অনুপ্রেরণামূলক পরিবেশে উৎসবের উদ্বোধন করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক। তাঁর বক্তব্য ছিল গভীর অভিজ্ঞতা ও বাস্তব উপলব্ধির সমন্বয়। তিনি বলেন, শিশুর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ছাড়া শিশুসাহিত্য রচনা সম্ভব নয়। শিশু যে কোনও কিছুকে স্পর্শ করতে চায়, খেলতে চায়, আনন্দ পেতে চায় এই স্বাভাবিক প্রবণতাগুলো বুঝে নেওয়াই শিশুসাহিত্যিকের প্রথম দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, ‘শিশুর মনস্তত্ত্ব আয়ত্ত করা জরুরি; শিশুসাহিত্যকে হতে হবে শিশুর আনন্দসঙ্গী।’ তিনি আরও বলেন, সহজ ও সরল রচনারীতি যে কোনও ভালো লেখার অন্যতম গুণ। কিন্তু এই সহজতা অর্জন করা সহজ নয়―এর পেছনে রয়েছে সাধনা, অনুশীলন ও আন্তরিকতা। শিশুসাহিত্যে এই সরলতা অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘ইচ্ছে করলেই লেখা সহজ হয় না; সহজ লেখার জন্যও কঠোর চর্চা প্রয়োজন।’ শিশুদের হাতে মোবাইল ফোনের পরিবর্তে বই তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আজকের এই উৎসবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তিন শতাধিক লেখকের অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

উৎসবের উদ্বোধনী আলোচনায় ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য: সৃজনে মননে কতটা যুগোপযোগী’ শীর্ষক পর্বে সভাপতিত্ব করেন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক, মনোশিক্ষাবিদ ও শব্দঘর সম্পাদক মোহিত কামাল। আলোচনায় অংশ নেন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক আনজীর লিটন, কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী, শিশুসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ, শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়ুয়া এবং শিশুসাহিত্যিক রহীম শাহ। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ।

মোহিত কামাল তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই উৎসব কেবল সাহিত্যিক মিলনমেলা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক গভীর দায়বোধের উৎসব। প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে শিশুর হাতে প্রথম ধরা পড়ছে মোবাইল ফোন, বই নয়―এ বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। মোবাইলের দৃশ্য ও শব্দ শিশুদের ইন্দ্রিয় দখল করে নিচ্ছে, ফলে তারা ধীরে ধীরে বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাঁর মতে, সাহিত্য পাঠ্যবইয়ের পরিপূরক নয়―এটি মন গঠনের হাতিয়ার, জীবনবোধ শেখার পথ। তিনি বলেন, ‘চলুন, শিশুর হাতে আবার বই তুলে দিই। ঘরে ঘরে, সন্তানের ঘরে ছোট ছোট লাইব্রেরি গড়ে তুলি।’

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক আনজীর লিটন বলেন, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুসাহিত্যের ভাষা, বিষয় ও উপস্থাপন নতুনভাবে ভাবা জরুরি। আজকের শিশুরা বৈশ্বিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতায় বেড়ে উঠছে―এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই শিশুসাহিত্যকে আরও আকর্ষণীয় ও সময়োপযোগী করতে হবে।

কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী স্মরণ করিয়ে দেন বাংলা শিশুসাহিত্যের সোনালি অতীতের কথা। তিনি বলেন, আজ প্রচুর শিশুসাহিত্য রচিত হচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো কোন লেখা কালোত্তীর্ণ হচ্ছে ? তাঁর মতে, সময়কে ধারণ করেই এমন সাহিত্য রচনা করতে হবে, যা ‘কাল’কে অতিক্রম করতে পারে।

শিশুসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ বলেন, শিশুদের জগৎটাকে আর ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের কল্পনা বিস্তৃত, রঙিন ও মুক্ত। সেই কল্পনাকে জাগিয়ে তুলতে পারে এমন লেখাই শিশুদের বইয়ের প্রতি টানবে।

কবি ও শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়ুয়া বলেন, সাহিত্য সবসময় যুগের সারথি। কিন্তু আমাদের শিশুসাহিত্য কতটা সময়ের হৃৎস্পন্দন ধারণ করছে সে প্রশ্ন একবার গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।

উদ্বোধনী পর্বে ছড়াপাঠে অংশ নেন বিপুল বড়ুয়া, আবুল কালাম বেলাল, এয়াকুব সৈয়দ, কেশব জিপসী, জসীম মেহবুব, সনজীব বড়ুয়া ও সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, যা উৎসবের পরিবেশে এনে দেয় সজীব ছন্দ ও প্রাণের স্পন্দন।

দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘ছোটদের পত্রিকা: নতুন সাহিত্য সৃষ্টির উৎসমুখ’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন এমরান চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন অমিত বড়ুয়া, আইরীন নিয়াজী মান্না, আখতারুল ইসলাম, আল জাবেরী, ইসমাইল জসীম ও মঈন মুরসালিন। সূচনা বক্তব্য দেন শিপ্রা দাশ।

আলোচকেরা বলেন, শৈশব হলো কৌতূহল ও কল্পনার সময়। ছোটদের পত্রিকা সেই কল্পনাকে ভাষা দেয়, সাহস দেয়। একটি শিশুর লেখা যখন প্রথমবার মুদ্রিত হয়, তখন তার মনে জন্ম নেয় আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্ন। এই পত্রিকাগুলোই ভবিষ্যৎ সাহিত্যিকদের কলম ধরার প্রথম বিদ্যালয়। প্রবীণ সাহিত্যিকদের সাহিত্যযাত্রার সূচনা হয়েছিল এসব ছোটদের পত্রিকার হাত ধরেই―এ সত্যই প্রমাণ করে, ছোটদের পত্রিকা নতুন সাহিত্য  সৃষ্টির এক অবিরাম উৎসমুখ।

 ‘ছোটদের বইয়ের মান উন্নয়নে লেখক-প্রকাশকের দায়’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন অভীক ওসমান। আলোচক হিসেবে ছিলেন গোফরান উদ্দীন টিটু, নাফে নজরুল, নাহিদা আশরাফী, মালেক মাহমুদ, মিজানুর রহমান শামীম ও স ম শামসুল আলম। সূচনা বক্তব্য রাখেন রুনা তাসমিনা।

আলোচকেরা বলেন, শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হলো ছোটদের বই। রূপকথার যুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত বাংলা শিশুসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। শৈশবের রঙিন জগতের খোঁজ কেবল প্রাণবন্ত শিশুসাহিত্যেই পাওয়া সম্ভব। আর এই জায়গায় লেখক ও প্রকাশকের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। বইয়ের ভাষা, বিষয়, প্রচ্ছদ, অলংকরণ, মুদ্রণ, বাঁধাই ও পরিবেশনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ যত্ন প্রয়োজন। পাঠকের সঙ্গে প্রতারণার কোনও সুযোগ নেই। বক্তারা বলেন, শৈশবই মানবজীবনের মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি মজবুত করতে হলে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া বই অবশ্যই হতে হবে সুখপাঠ্য, সুলিখিত ও সুমুদ্রিত। লেখক ও প্রকাশক কেউই এই দায় এড়াতে পারেন না। ছোটদের বই শুধু শিশুদের জন্য নয়; তা বড়দের জন্যও শিক্ষণীয়।

‘প্রান্তিক জনপদে শিশুসাহিত্য চর্চা’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন সাঈদুল আরেফীন। আলোচক ছিলেন আতিক রহমান, ইলিয়াস বাবর, চন্দনকৃষ্ণ পাল, চন্দ্রশিলা ছন্দা, জাকির হোসেন কামাল, জালাল খান ইউসুফী, মুসতাফা আনসারী ও শিবুকান্তি দাশ। সূচনা বক্তব্য দেন নিজামুল ইসলাম সরফী।

আলোচকেরা বলেন, ‘আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় বর্তমানে প্রান্তিক জনপদে শিশুসাহিত্য রচনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে শিশুদের জন্য প্রকাশিত বইয়ের বড় একটি অংশই প্রান্তিক অঞ্চলের লেখকদের। তবে ঢাকার সাহিত্যসম্পাদক, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রান্তিক লেখকেরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। রাজধানীকেন্দ্রিক সাহিত্য কর্মশালা ও উৎসবে অংশ নিতে না পারায় তাঁরা প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য থেকেও বঞ্চিত হন। ফলে কেন্দ্র ও প্রান্তিকের ব্যবধান রয়ে যাচ্ছে।

‘বই কীভাবে কাছে টানতে পারে শিক্ষার্থীদের’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর রীতা দত্ত। আলোচক ছিলেন নাসের রহমান, নেছার আহমদ, মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান, মাহফুল আখতার, শাহেদ আলী টিটু ও সৈয়দা সেলিমা আক্তার। সূচনা বক্তব্য দেন লিপি বড়ুয়া।

আলোচকেরা বলেন, শিশু-কিশোরেরা স্বপ্ন দেখে ভবিষ্যতের, আগামীর। লেখক যদি তাদের মনোজগতে ঢুকতে না পারেন, তবে সে লেখা তাদের আকর্ষণ করে না। শিশু-কিশোরের জন্য লিখতে হলে লেখককে শৈশব ও কৈশোরে ফিরে যেতে হয় এবং সময়ের ব্যবধান বিবেচনায় নিতে হয়। যে বই তাদের মনের কথা ও স্বপ্নের কথা বলে, সেই বইই তাদের কাছে টানতে পারে।

‘উৎসবে প্রকাশিত বই: সৃজনের আনন্দ’ পর্বে সদ্য প্রকাশিত নিজ নিজ বই সম্পর্কে বইয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, ‘জলের গানে ঝরনা নামে’ নিয়ে আজিজ রাহমান, ‘পৌলমির গাছ বন্ধু’ নিয়ে দীপক বড়ুয়া, ‘শর্মীর নেপচুন যাত্রা’ নিয়ে কাসেম আলী রানা, ‘মেঘবালকের বৃষ্টিবিলাস’ নিয়ে আকাশ আহমেদ, ‘আকাশ জুড়ে রঙের মেলা’ নিয়ে জি এম জহির উদ্দীন,  ‘বঙ্কুচোরা ভাইরাল’ নিয়ে ইফতেখার মারুফ, ‘উড়ছে মনের ডানা মেলে’ নিয়ে প্রদ্যোত কুমার বড়ুয়া, ‘স্বপ্নে আঁকা কিশোরবেলার দিন’ নিয়ে মার্জিয়া খানম সিদ্দিকা। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক এলিজাবেথ আরিফা মুবাশশিরা।

উৎসবে কবি আজিজ রহমান তাঁর কিশোর-কবিতার গ্রন্থ ‘জলের গানে ঝরনা নামে’-এর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘কিশোরদের জন্য কেমন কবিতা রচিত হতে পারে, কোন নতুন আঙ্গিকে লেখা যায় এবং কোন বিষয়গুলো তাদের কল্পনার দিগন্তকে প্রসারিত করতে পারে এসব প্রশ্নের একটি উত্তম রূপরেখা তাঁর বই থেকে পাঠক পেতে পারেন। তাঁর বিশ্বাস, তরুণ কবিরা এই ধরনের কবিতা থেকে সৃষ্টিশীল অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবেস’।

আকাশ আহমেদ সৃজনশীলতার অনন্ত আনন্দের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সৃষ্টি নিজেই জীবনের আনন্দময় চলন, আর শিশুসাহিত্য সেই চলনেরই অপরিহার্য অংশ। তিনি বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যকে কেন্দ্র করে যে সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তার নেপথ্যে রাশেদ রউফ ও বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির ভূমিকার প্রশংসা করেন। তাঁর ভাষায়, এই প্রতিষ্ঠান শিশুসাহিত্যের জন্য যেন এক জাদুকরি উদ্যান, যেখানে তরুণ-শিশু লেখকেরা স্বপ্ন ও সৃজনের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে।

গল্পকার দীপক বড়ুয়া তাঁর শিশু উপন্যাস ‘পৌলমির গাছবন্ধু’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানান, পৌলমির দুরন্ত স্বভাব, স্বপ্নময় মন ও নানা দুষ্টুমি এসব মিলিয়ে শিশুর জগৎকে গল্পে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। উপন্যাসটি শিশুদের জন্য লেখা হলেও যে কোনও বয়সের পাঠকই এতে আনন্দ খুঁজে পাবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি আরও বলেন, শিশুদের স্বপ্নপ্রবণতা, অস্থির কৌতূহল ও নতুন কিছুর প্রতি আকর্ষণই তাঁর লেখার প্রেরণা।

এ উৎসবে ‘আকাশ জুড়ে রঙের মেলা’ নিয়ে জি এম জহির উদ্দীন গ্রামবাংলার প্রকৃতি, মানুষের সরলতা ও ঋতুবৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে তাঁর কবিতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, প্রকৃতির রূপমাধুর্য শিশুদের কল্পনাকে প্রসারিত করে, আর কবিতার ভাষা সেই কল্পনার দিকে এক আলোকিত পথ দেখাতে পারে। তিনি চান শিশুরা প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনও উপলব্ধি করতে শিখুক।

শিশুসাহিত্য সম্মাননা প্রদান: বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির একটি ধারাবাহিক আয়োজন হচ্ছে শিশুসাহিত্যিক সম্মাননা। এবার সম্মাননাপ্রাপ্ত লেখকরা হলেন : তাহমিনা কোরাইশী, জাহাঙ্গীর আলম জাহান ও আনোয়ারুল হক নূরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি ওমর কায়সার। বাচিক শিল্পী আয়েশা হক শিমুর সঞ্চালনায় আলোচক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক অরুণ শীল, আহমেদ জসিম, জসিম উদ্দিন খান, মিলা মাহফুজা, রমজান মাহমুদ। সূচনা বক্তব্য রাখেন কাঞ্চনা চক্রবর্তী।

সম্মাননার জবাবে কবি ও শিশুসাহিত্যিক তাহমিনা কোরাইশী তাঁর অনুভূতিতে বলেন : চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত দুইদিনের এই উৎসব (২৪ ও ২৫ অক্টোবর) ছিল মনন, শৈলী, উচ্চারণ ও ছন্দে সমৃদ্ধ এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। শিশুসাহিত্য নিয়ে সময়োপযোগী আলোচনা আয়োজনের সার্থকতাকে আরও দৃঢ় করেছে। বিশেষ করে শিশুদের সম্পৃক্ততা উৎসবের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। শিশুদের জন্য আয়োজিত প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার হিসেবে বই প্রদান শিশুদের বইপাঠে আগ্রহী করে তুলবে―এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন : সমসাময়িক ছড়াকার ও কবিদের ছড়া-কবিতা শিশুদের কণ্ঠে শোনার উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সম্মাননায় ভূষিত হওয়ায় তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা ও আবেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির পরিচালক রাশেদ রউফসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

সম্মাননার জবাবে আনোয়ারুল হক নূরী তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শিশুসাহিত্য একাডেমির প্রতি হৃদয় উৎসারিত কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এই সম্মান তাঁর চোখ খুলে দিয়েছে নতুন দায়বদ্ধতার দিকে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি স্মরণ করেন তাঁর পিতাকে যিনি নিজেও ছিলেন একজন লেখক। পিতার বুকভরা স্বপ্ন যেন আজ এক অর্থে পূর্ণতা পেল―এই উপলব্ধিই তাঁর আবেগকে আরও গভীর করে তোলে।

শিশুসাহিত্য সম্মেলনে শিশুদের সরব উপস্থিতি ও প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে করে তোলে আরও অর্থবহ। বিষয়ভিত্তিক আলোচনার ধারাবাহিকতা, আবেগ ও উপলব্ধির এই মিলনমেলা প্রমাণ করে শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৫ কেবল একটি উৎসব নয়; এটি শিশুসাহিত্যের প্রতি নিবেদন, কৃতজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পথচলার এক দৃঢ় অঙ্গীকার।

সব মিলিয়ে শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৫ আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিশুসাহিত্য কেবল সাহিত্য নয়, এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানেই আমরা গড়ে তুলছি এক কল্পনাপ্রবণ, মানবিক ও মননশীল আগামী প্রজন্ম। এই উৎসব সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল কাগজের পাতায়, গল্পের ছন্দে, ছড়ার সুরে।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button