
বিশ্বসাহিত্য : প্রবন্ধ
‘অক্টোবরের শেষের দিকে এক সকালে যখন প্রলম্বিত শরৎকালের নির্দয় অঝোরধারা এই জমিদারির পশ্চিম পার্শ্বের লবণাক্ত শুষ্ক জমিতে পড়ছিল, যখন পরবর্তী সময়ে হলুদ রঙের কাদায় মানুষের পায়ের ছাপ পর্যন্ত পড়বে না এবং এ লোকালয়টি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, তখন ফুটাকি ঘণ্টাধ্বনি শুনে জেগে উঠলেন।’
ওপরের অংশটি হলো ২০২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া হাঙ্গেরির অধিবাসী লাজলো ক্রাজনাহোরকাইয়ের ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস স্যাটানট্যাংগোর প্রথম অধ্যায়ের প্রথম বাক্য, যেটি আমি ইরেজি অনুবাদক জর্জ সার্টেসের ইংরেজি থেকে সরল বাংলায় অনুবাদ করে দিলাম।
এবার তাঁর ২০১৬ সালে প্রকাশিত, এবং অটিলি মুলজেট-এর অনুবাদে ব্যারন ওয়েনখেইমস হোমকামিং (বা ব্যারন ওয়েনখেইমের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন) উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম বাক্যটি আমরা সরল বাংলা অনুবাদে লক্ষ করি : ‘তিনি জানলার কাছে যেতে চাননি, কিন্তু একটু নিরাপদ দূরত্ব থেকে দেখতে লাগলেন, কারণ ঐ কয়েক কদম দূরে থাকলে তিনি রক্ষা পাবেন, কিন্তু তিনি দেখলেনই, অথবা ভেঙ্গে বললে তাঁর পক্ষে চোখ ফেরানোই কঠিন, এবং তিনি কষ্ট করে দেখতে থাকলেন… ।’
এই বাক্যটা আমি শেষ করলাম না, কারণ এই বাক্যটা শেষ হচ্ছে এই অনুচ্ছেদের শেষে যেটা গিয়ে থামছে অষ্টম পৃষ্ঠার মাঝামাঝি। এই অসাধারণ দীর্ঘ বাক্যাবলি ব্যবহারের দর্শনগত কারণ হলো, ক্রাজনাহোরকাইয়ের মতে, জীবন হলো চলমান একটি পরিপ্রেক্ষিত, আমৃত্যু এটার প্রবহমানতায় কোনও থামাথামি নেই। তাই ক্রাজনাহোরকাইয়ের উপন্যাসের বাক্যগুলি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর।
দ্বিতীয়ত রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির স্বকৃত ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর যে খেদ ছিল যে রবীন্দ্রনাথের কবিতার অসাধারণ গীতিময়তা তাঁর ইংরেজি অনুবাদে যথাযথ আসেনি, ঠিক সেরকম অন্য যে কোনও ভাষার অনুবাদ ইংরেজিতে পড়লে আমার মধ্যে খেদ থেকেই যায় যে মূল ভাষাটি যদি জানা থাকত তা হলে সাহিত্যের মৌলিক আস্বাদন পেতাম। কনস্ট্যান্স গার্নেট কৃত তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস এবং দস্তয়েভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট এবং স্টুয়ার্ট গিলবার্ট কৃত আলবেয়ার কামুর দ্য আউটসাইডার পড়ার সময় আমার একই অনুভূতি হয়েছিল যে, যদি রুশ এবং ফরাসি ভাষায় আলোচ্য উপন্যাসগুলি পড়তে পারতাম! কিন্তু জীবনের অনেক অসমাধানকৃত বিষয়ের মতো সাহিত্যপাঠের ব্যাপারে এই অতৃপ্তি থেকেই যাবে যে, সব ভাষায় তো সাহিত্যপাঠ কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়। অবশ্য ক্রাজনাহোরকাইয়ের অনুবাদের ক্ষেত্রে জর্জ সারটেস এবং অটিলি মুলজেট দুজনেই অনুবাদের জন্য পুরস্কৃত অনুবাদক।
তৃতীয় আরেকটি ব্যাপার হলো, আমাদের পাঠরীতিতে এটা অভ্যাস হয়ে গেছে যে, যখন সাহিত্যে কেউ নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত হন, সেই নামটা আমরা প্রথম শুনে থাকি। কয়েক বছর আগে আমেরিকান কবি লুই গ্লিক সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবার পর তাঁর নামটা সে সময়েই আমি প্রথম শুনি। ঠিক সে-রকম এ বছর যখন সাহিত্যে হাঙ্গেরির লেখক লাজলো ক্রাজনাহোরকাই নোবেল পুরস্কার পেলেন, তাঁর নামটি প্রথম শুনলাম, এবং সে নামের উচ্চারণ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম। গুগল মামা বললেন যে নামটা আমি এখন যেভাবে লিখেছি সেভাবে উচ্চারিত হবে। তারপর গেলাম তাঁর প্রকাশিত বইয়ের তালিকা দেখতে। ও মা, নোবেল পুরস্কার যে কখনও অযোগ্য ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না তার আন্দাজ পেলাম তাঁর বইয়ের তালিকা ও আর্ন্তজাতিক পুরস্কারের বহর দেখে। লুই গ্লিকের সময়ও এ ধরনের একটা বিস্ময়মাখা আবিষ্কার করেছিলাম। তিনিও কোনও হেজিপেজি কবি ছিলেন না।
হাঙ্গেরির গিউলা নামক একটি শহরে লাজলো ক্রাজনাহোরকাই ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, এবং তাঁর পিতামাতা দুজনেই ছিলেন নিজ নিজ পেশায় জড়িত। এবং যতটুকু বোঝা যায় তাঁর শিশুকাল স্বস্তিকর ছিল। তাঁর অধ্যয়নিক জীবন বৈচিত্র্যময়, এবং পুরোপুরি মানবতাবাদী বিষয়গুলোর ওপর নির্দিষ্ট ছিল। প্রথম দিকে তিনি আইনবিষয়ক পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু পরে ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। জীবিকা অর্জনের পথে তিনি প্রথমে একজন পুস্তক ব্যবসায়ীর অধীনে চাকরি করেন। ফলে তাঁর পক্ষে উৎকৃষ্ট সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিতি ঘটে। বলা যায়, তখন থেকে তাঁর গল্প বলার ক্ষমতা সিদ্ধি লাভ করতে থাকে।
হাঙ্গেরিতে জন্ম, এই লেখক যদিও তাঁর শক্তিশালী উপন্যাসগুলোর জন্য বিশ্বনন্দিত, কিন্তু তিনি সহজপাঠ্য লেখক নন। তাঁর উপন্যাসগুলো পাঠকের গভীর মনোনিবেশ দাবি করে। তাঁর কাহিনি আরেক হাঙ্গেরিয়ান লেখক কাফকার ঢং-এ পৃথিবীকে প্রধানত নৈরাশ্যজনক একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে অবলোকন করে। তৎসত্ত্বেও মেঘের কোলে রোদ হাসার মতো একটি দুর্মর আশাবাদ তাঁর লেখাকে আলোকিত করে রেখেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়ন শেষ করে লাজলো ক্রাজনাহোরকাই লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার পথে নিজেকে নিবেদন করেন। তাঁর গদ্যের ধরনে নানা পরীক্ষামূলক সংশ্লেষ থাকলেও তাঁর লেখনীর চিত্তাকর্ষক দিক হলো তাঁর অনুপম চরিত্র সৃষ্টি। তাঁর মূল চরিত্রগুলো সাদামাটা, নায়কোচিত নয়, তারা অদ্ভুত জটিলতার মধ্য দিয়ে তৈরি। এবং তারা কেউ সে অর্থে নিখুঁত, সৎ চরিত্র নয়। কিন্তু তারা সর্বোপরি আকর্ষণীয়। লেখকের পাঠককে টেনে নেবার অপূর্ব ক্ষমতা আছে। পাঠক তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা পরিভ্রমণ করেন। এর ফলে তাঁর উপন্যাসগুলো সত্যিকারের চিত্তবিনোদনমূলক হয়।
তাঁর আবেদন শুধু যে সাহিত্যের গণ্ডির মধ্যে আবর্তিত তা নয়, তিনি চলচ্চিত্রের জগতেও বিশেষভাবে আদৃত একজন লেখক। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস যেটা বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলেছিল, স্যাটানট্যাংগো এবং সেটির পরবর্তী উপন্যাস দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স পরিচালক বেলা টার চলচ্চিত্রে রূপায়ণ করে সাড়া ফেলে দেন। এটি ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হলে সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদিত গ্রন্থ হিসেবে পুরস্কার লাভ করে। এরপর ক্রাজনাহোরকাই ম্যান বুকার আর্ন্তজাতিক পুরস্কার পান।
বলতে হয় তাঁর মৌলিকত্বের কথা। তাঁর গল্প বলার কৌশল এতটাই মৌলিক এবং নতুন যে পাঠক বিস্ময়াভিভূত হয়ে যান। তিনি সহজ আবেদন তুলে পাঠকের দরবারে হাজির হতে চান না, বরঞ্চ জটিলতার দ্বারগুলো একে একে উন্মোচিত করেন পাঠকের কাছে, আর যদি পাঠক ধৈর্যশীল হন তা হলে তিনি তাঁর গদ্যরীতির প্রতি আকৃষ্ট হবেনই। তাই তাঁর নিজস্বতার শক্তির কাছে সংলগ্ন থেকে পাঠক বিভোর হয়ে যান। পাঠক উপলব্ধি করেন যে তিনি হালকা বিষয়ে আমোদিত না হয়ে মনস্তত্ত্বের গভীর কন্দরে সহজে সাঁতার কেটেছেন।
তাঁর শক্তি হলো একটি জটিল কিন্তু ছন্দোময় বর্ণনার সাহায্যে তিনি যে কিছুটা তমসাবৃত কিন্তু কৌতুকজনক পরিস্থিতির মধ্যে পাঠককে নিয়ে আসেন, আর তখন পাঠক বুঝতে পারেন যে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো জটিল থেকে জটিলতর হলেও উপেভোগ্য। এটিই তাঁর লেখার বিশেষ প্রণোদনা। বলা বাহুল্য, ক্রাজনাহোরকাই এটা প্রমাণ করলেন যে একজন লেখক নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যয়ের প্রতি নিবিষ্ট থেকেও আর্ন্তজাতিক খ্যাতি অর্জন করতে পারেন। তাঁর লেখা তাঁদেরকেই আকর্ষণ করে যাঁরা একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে চান। তিনি একটি সম্পূর্ণ জগৎ নির্মাণ করে তাতে পাঠকের আবাসস্থল গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাই তিনি বিশ্বসাহিত্যের দরবারে একজন আদৃত লেখক। তিনি আরও উৎকর্ষ কাজের আভাস রেখে যাচ্ছেন। অনেকের ধারণা এই যে তিনি ভবিষ্যতে আরও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রাখবেন।
স্যাটানটাংগো ইংরেজিতে অনুবাদ করেন জর্জ সার্টেস। এই উপন্যাসটি তাঁকে আর্ন্তজাতিক খ্যাতি এনে দেয়। এটি একাধারে ক্রাজনাহোরকাইয়ের গল্প বলার রীতির সমস্ত কৌশলকে ধারণ করেছে, যেগুলি তিনি পরবর্তী উপন্যাসগুলোতে বারংবার ব্যবহার করবেন। কাহিনিটি হলো সমতলভূমিতে অবস্থিত একটি ক্ষয়িষ্ণু খামারবাড়িতে কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের সময় মুষ্টিমেয় কয়েকটি চরিত্রের জীবনালেখ্য উপস্থাপন করা। ইতিহাস দ্বারা পরিত্যাজ্য এই মানুষগুলির মধ্যে আবির্ভূত হয় ইরিমিয়াস নামক এক রহস্যময় খল জাদুকর যিনি মুক্তির আশ্বাস দেন কিন্তু চক্রান্ত করেন শয়তানি ও বিশ্বাসঘাতকতার। উপন্যাসটি ক্রমাগত উন্মোচিত হয় একটি কিম্ভূতকিমাকার নাচের মতো, যেটার সঙ্গে তুলনা চলে ট্যাঙ্গো নৃত্যের ছন্দের। বারোটি অধ্যায় আছে এই উপন্যাসে, তার মধ্যে ছয়টি অধ্যায় যেন সামনের কদম, আর বাকি ছয়টি পেছনের কদম। যেন অট্টহাস্যে পৃথিবীর সমাজগুলোতে নারকীয় অভিব্যক্তির পুনরাবৃত্তির প্রতি ঠাট্টা। গ্রামবাসীর আশা, প্রবঞ্চনা, মাতলামি যেন ধরা পড়ে এক অনন্য নরকবৃত্তে। অতীত বর্তমানের মধ্যে নিমজ্জিত হয়, আর ইতিহাস হয়ে ওঠে পুনরাবৃত্তির এক চরম প্রহসন। এটি তাই বিস্ময়ের ব্যাপার নয় যে বেলা টারের ১৯৯৪ সালের চলচ্চিত্রায়নে সাত ঘণ্টার একটি টানা অস্থির মুভমেন্ট দেখানো হয়, যেখানে কোনও বিরতি ছিল না। ক্রাজনাহোরকাইয়ের উপন্যাসে সময় প্রবাহিত হয় না, সময় বিষের মতো জমতে থাকে। কিন্তু এই আপাত প্রহসনের পেছনেও একটি গভীর বাণী আছে। ইরিমিয়াস হচ্ছে উভয়ত শয়তান এবং পরিত্রাণকারী। সে একইভাবে মেসিয়ার বা পিরের মতো আশা উদ্রেককারী। তাঁর ফিরে আসা ইঙ্গিত করে যে নিরীশ্বরের জগতে সে-ই একমাত্র আশা জাগানিয়া। এই বেদনার্ত চাহিদা এতই তীব্র যে এমনকি প্রতারণাকেও সত্য মনে হয়। এই চরিত্রগুলোর মধ্যে মুখ্য হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্র, অপরাধ এবং বিশ্বাসঘাতকতা। কাহিনিটির কেন্দ্রমূলে হলো পানাসক্ত লোকদের একটি ভয়ংকর মাতাল নৃত্য, যেটি ক্রাজনাহোরকাই মারণনৃত্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এটির বর্ণনা এবং কথন এমন মাদকাসক্তিসম যে পাঠক বুঝতে পারেন এরকম পাঠ অভিজ্ঞতা তার আগে কখনও হয়নি।
লাজলো ক্রাজনাহোরকাইয়ের দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। দক্ষতার সঙ্গে এটিও ইংরেজি অনুবাদ করেন জর্জ সার্টেস। এই কাহিনিতে আগের ছোট্ট গ্রামভিত্তিক পটভূমি থেকে সরে এসে তিনি পুরো একটি শহরের মধ্যে একই ভয়াবহতাসম্পন্ন পরিবেশ অংকিত করলেন। এর ফলে ক্রাজনাহোরকাই-এর খ্যাতি আরও বেড়ে যায়। এই উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয় হাঙ্গেরির একটি ছোট শহরে কয়েকটি রহসময় ঘটনা ঘটে গেলে। ঘন শীতের সময় একটি সার্কাস দল আসে প্রদর্শনীতে। তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসে এক বিশাল স্টাফড তিমি মাছ, এবং এটার সঙ্গে এ গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে যে একজন নবি সহসা আসছেন। যেটা নিয়ে শহরের অধিবাসীদের মধ্যে নানা গুঞ্জন, গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তার বদলে একজন ঠগ আসে, যার ফলে শহরের মধ্যে সব ধরনের নৈতিকতার ভয়ানক পতন হয়। কোনও বহিঃশত্রুর আগ্রাসন থেকে নয়, কিন্তু ভেতরে জারিত ভয় ও সংক্রমণ থেকে। মোট কথা তাদের জীবনে একটি ভীতির সঞ্চার হয়। এর মধ্যে দুটো চরিত্র ব্যাপক প্রাধান্য লাভ করে। একজন হলেন চক্রান্তকারী মিসেস এজটার, আরেকজন হলেন সাদা মনের ভালুস্কা। তিমি মাছটি, অচলিষ্ণু, মূক এবং ক্ষয়িষ্ণুমান হওয়াতে একটি প্রতীকী বার্তা দিচ্ছে যে এখানে কিছু একটার অভাব আছে। শহরে যেন একটি নিদারুণ শাব্দিক শূন্যতা বিরাজ করছে। তার চারপাশে ঘুরছে দুনিয়ার যত ঠগ, সুযোগসন্ধানী ও দার্শনিক যারা কেবলই নিজেদের মতামত তৈরি করছে, ফলে বিরাজমান শূন্যতা আরও গভীর হয়। স্থূলকায়া মিসেস এশেনকা, যিনি নিজেকেই সাংস্কৃতিক অভিভাবক মনে করছেন, এবং গ্রাম্য বোকা ভালুস্কা যে জ্যোতির্মণ্ডলের মধ্যে ভারসাম্য দেখছে, তারা দু’জন হচ্ছে ক্রাজনাহোরকাইয়ের দুটো দার্শনিক স্তম্ভ: একজন হচ্ছে গোঁড়ামিপূর্ণ যুক্তির প্রবক্তা, আর আরেকজন করে যাচ্ছেন পবিত্র পাগলামি। উপন্যাসটির পরিণতি অংশে আমরা দেখতে পাই যে সরলমনা ভালুস্কার যে দর্শন যে জ্যোতির্মণ্ডলের মধ্যে কোথাও একটা শৃঙ্খলা আছে, বা একটি সুমিত অগ্রসরমানতা লক্ষ করা যায়, তেমনি মানুষের সমাজেও কোথাও একটা শৃঙ্খলা কাজ করছে। কিন্তু তার এ আশাবাদ ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে জনসন্ত্রাসের বা মব ভায়োলেন্সের মুখে। তারপরও তার আশা জাগরূক থাকে একটি ক্ষীয়মাণ ধারায়, যেন একটি শান্ত প্রলম্বিত ধারা। ভালুস্কার অভিব্যক্তিতেই লুকিয়ে আছে বিষাদমগ্নতার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান। প্রতিরোধ হয়তো বিজয়ী হবে না, কিন্তু তারপরও এটি ক্রিয়াশীল থাকবে। কারণ এই আশ্বাস ছাড়া জীবন অর্থহীন।

অনুবাদক জর্জ সার্টেস এই গদ্যরীতিকে বলছেন ‘ধীর গতির সঞ্চরমান লাভা’, যার ফলে একটি তীব্র রাজসিক বর্ণনাভঙ্গি তৈরি হয়, যা পাঠককে আকর্ষণ করে। প্রথম উপন্যাসটি যেমন পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল, দ্বিতীয় উপন্যাসটি পাঠককে এর ঘননিবদ্ধ গদ্যরীতির মাধ্যমে সৃষ্ট আবহে তৈরিকৃত অবিস্মরণীয় চরিত্রগুলোকে আরও প্রোজ্জ্বল করে তোলে। পাঠক ভাষাগত প্রতিরোধের সম্মুখীন হন অবশ্যই, কিন্তু তিনি সেটা উতরে যেতে পারলে শুধুই আনন্দ ভোগ করবেন।
জর্জ সার্টেস কর্র্তৃক অনূদিত এবং ম্যাগভেটো কর্র্তৃক প্রকাশিত ক্রাজনাহোরকাই-এর তৃতীয় উপন্যাস হলো ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার। আগের উপন্যাস দুটি যদি হাঙ্গেরির গ্রামাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়ে থাকে, এটি হলো একটি অচিহ্নিত ভৌগোলিক এবং মনস্তাত্ত্বিক আকাক্সক্ষা নিয়ে। কাহিনিটি হলো গিয়োর্গি কোরিন নামক একজন কেরানির, যিনি পুরোনো লেখা খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী, তিনি চমৎকার একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপি খুঁজে পান। পাণ্ডুলিপিটা হলো চারজন মানুষের ইতিহাসের মধ্যে পরিক্রমণ নিয়ে। সভ্যতার যে অনিঃশেষ আত্ম-ধ্বংসাত্মক রূপ আছে, এটি যেন তারই অনুসরণ। কোরিন নিশ্চিত হন যে পাণ্ডুলিপিটার একটা শাশ্বত রূপ আছে, তাই তিনি এটি ইন্টারনেটে টাইপ করার সিদ্ধান্ত নেন যাতে এটি টিকে থাকে। কিন্তু কাজে নেমে কোরিন যুগপৎ উন্মাদনাকর ও গভীর চেতনার সংমিশ্রণ করেন। তিনি হলেন এ যুগের একজন কপি করার লোক, যার কাজটি হচ্ছে বিলীয়মান ঐতিহ্যের বিপক্ষে কাজটি দাঁড় করানো। কিন্তু এটি করতে গিয়ে তিনি প্রায় নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিলেন। কারণ ইন্টারনেট জগৎটি এত বিশাল ও ব্যাপ্ত যে এটি যেন মহাকালেরই অনুবৃত্তি। এটি অসংখ্য তথ্যের সম্মিলন, কিন্তু প্রাণবিহীন। ক্রাজনাহোরকাই কোরিনের মাধ্যমে দেখাচ্ছেন যে, কোরিন যে ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন যেটি হলো অস্থায়ী জীবনপ্রবাহের ওপর স্থায়িত্বের ছাপ বসিয়ে দেওয়া। এটাই হচ্ছে আধুনিক জীবনের সংকট। উপন্যাসটার শিরোনাম বলছে যে পরস্পরবিরোধী মূল্যবোধের দ্বন্দ্বের মধ্যে ক্রাজনাহোরকাই কোনও সমন্বয়ের আভাস দেখছেন না। ইতিহাস বরঞ্চ হলো পুনঃপুন বৃত্তাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অথবা যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি। এর বেশি কিছু নয়। তারপরও এই নিরাসক্তির মধ্যেও লেখনী এক প্রকার ইতিবাচকতা বহন করছে। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে তিনি অজানা শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন এই ভয়ে কিছুদিন আত্মহত্যা করার মতো ঘোরের মধ্যে কাটান। অবশেষে তিনি পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে নিউ ইয়র্ক পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে তিনি যেন বাস্তবতার নিদারুণ রূপের মুখোমুখি হলেন। উপন্যাসটির শুরুতে একটি অধ্যায় আছে ‘ইসাইয়া’ শীর্ষক, যেটিকে উপন্যাসের প্রিকুয়েল বা পূর্বকথন বলা যায়। আগের দুটো উপন্যাসের মতোই এই উপন্যাসটি দুর্বোধ্য কিন্তু এটির প্রাঞ্জল গতিময়তার আবেশের কারণে পাঠক এটিকে গ্রহণ করে নেয়।
খুবই অল্পসংখ্যক লেখক বর্তমান দিনে বিংশ শতাব্দী এবং একবিংশ শতাব্দীর ভীতিপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিকে ক্রাজনাহোরকাইয়ের মতো বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিধৃত করেছেন। তাঁর জন্মের সময় হাঙ্গেরি কেবল সাম্যবাদী রাজনীতির ভয়াবহ ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। তিনি বলতে গেলে আধুনিক জীবনের অবক্ষয়ধর্মী মাত্রার স্মরণীয় রূপকার। তাঁর উপন্যাসগুলো যেমন আয়তনে বিশাল, তেমনি সাফোকেটিং বা আবদ্ধময়, যেটি তিনি দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্যে অবলীলায় বর্ণনা করে গেছেন উত্তরাধুনিক জীবনকে, যেখানে কোনও কোনও বাক্য কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপী বিধৃত। মানসিক বিপর্যয় যেমন অসমাপ্ত একটি ধকল, তেমনি তাঁর দীর্ঘ বাক্যগুলো কখনও নিঃশ্বাস নিতেও বিরতি নেয় না। ক্রাজনাহোরকাইয়ের গদ্যে আবিষ্ট হয়ে পড়ার অর্থই হচ্ছে একটি পঙ্গু টলটলায়মান বৈশ্বিক জীবনরীতির কাছে সমর্পিত হওয়া―যেখানে নৈতিক কোনও বাধা আর মানা যাচ্ছে না, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় কোনও ইতিবাচকতা কাজ করছে না, এবং তারপরও জীবন অব্যাহত গতিতে চলমান থাকছে।
তাঁর চতুর্থ উপন্যাস সিবো দেয়ার বিলো (২০০৮)। কিন্তু ইউরোপের যে ক্ষয়িষ্ণু চেহারা তিনি ক্রমাগত গত তিনটি উপন্যাসে অঙ্কিত করেছিলেন, তার থেকে সরে এসে তিনি দেখাচ্ছেন শত বাধা সত্ত্বেও একটি সুশীল সংস্কৃতি কীভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে বিরাজমান। গ্রন্থটিতে সতেরোটি গল্প আছে, প্রত্যেকটি গল্প ফিবোনাচ্চি ধারায় লিখিত, যাতে বোঝা যায় উপরের আপাত বিশৃঙ্খল আবরণের তলায় তলায় একটি গাণিতিক শৃঙ্খলা বিরাজমান। বইটির শিরোনাম একজন জাপানি দেবীর অনুসরণে, যিনি মর্ত্যে নেমে এসেছেন, এবং গ্রন্থটিতে বরাবরই এই ধরনের ঐশ্বরিক ছায়া বিধৃত হয়ে আছে, যেমন ভেনিসের সে চরিত্র যিনি দেবতাদের মূর্তি সংরক্ষণে ব্যস্ত, একজন জাপানি ‘নো’ অভিনেতার মধ্যে অথবা ক্যামো নদীর পাশে স্থির হিরণ পাখির মূর্তির মধ্যে। এখানে মহাপতন বাইরের থেকে হচ্ছে না, হচ্ছে ভেতর থেকে, কারণ মানবজাতি পতনটি উপলব্ধি করতে পারছে না। এই গল্পগুলোতে ক্রাজনাহোরকাই তাঁর অমোঘ জটিল কিন্তু দীর্ঘ ঘোর লাগানো জাদুকরি বাক্যের সমষ্টিতে এই বার্তাটি ফুটিয়ে তুলেছেন যে, মানুষ সেই সৌন্দর্যকে আয়ত্ত করতে বরাবরই সচেষ্ট যেটির সে নাগাল পায় না। একটি কাহিনিতে আছে একজন জাপানি শিল্পকর্মী তার জীবনকে উৎসর্গ করেছে বুদ্ধের একটি মূর্তিকে তার নিখুঁত রূপ ফিরিয়ে দিতে, যদিও সে জানে যে এই পূর্ণতা দেওয়া অসম্ভব ব্যাপার। তার কাজটি রীতিমতো ঐশ্বরিক আরাধনায় রূপ নেয়। এই গ্রন্থে ক্রাজনাহোরকাই তাঁর পূর্ববর্তী বিবমিষা থেকে সরে আসেন এবং এই প্রতীতি প্রমাণ করেন যে পবিত্রতা হয়তো বিদায় নিয়েছে, কিন্তু এঁর অভিঘাত পাওয়া যায় কাজের প্রতি মনোযোগের যে শৃঙ্খলা তৈরি হয় সেই ব্রততে।
ক্রাজনাহোরকাইয়ের উপন্যাসের তালিকায় শেষে আছে ব্যারন ওয়েনখেইমস হোমকামিং (২০১৬) (বাংলা অনুবাদ : ‘ব্যারন ওয়েনখেইমের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’) যেটি একটি বিশাল প্রেক্ষাপটের বিপরীতে দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স-এর সেই গ্রামীণ পরিবেশে তিনি ফিরিয়ে আনেন একজন বৃদ্ধ প্রবাসীকে। ব্যারন হলেন একজন অভিজাত শ্রেণির লোক, জুয়া খেলে যিনি সর্বস্ব খুইয়েছেন। তিনি ফিরে আসেন নিজ গ্রামে, এবং আশা করেন যে তিনি সমাদর পাবেন। কিন্তু বিপরীতে তিনি প্রত্যক্ষ করেন দুর্নীতির মহাচিত্র, মৌলবাদিতা ও ভণ্ডামি। উপন্যাসটির বিভিন্ন উপসর্গ―যেমন মোটরবাইক গ্যাং, আত্ম-গুরুত্বসম্পন্ন রাজনীতিবিদেরা, একজন নির্জন অধ্যাপক, যাকে লেখকের অল্টার ইগো বা অনুরূপ সত্তা হিসেবে মানা যায়, সব মিলিয়ে একটি সমাজ চিত্রিত হয়, যেটি নিজের মধ্যে নিজেই অবিশ্বাস্য রকমভাবে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ব্যারনের রোম্যান্টিসিজম এবং নস্টালজিয়া ধারাবাহিকভাবে ভূলুণ্ঠিত হতে থাকে। অবশেষে শহরটি যখন আক্ষরিক অর্থে সে ভয়াবহ দাবানলের শিকার হয়, তখন প্রতীকীভাবে ক্রাজনাহোরকাই জানান যে, সে দাবানলটি মানুষের সভ্যতা, প্রতীতি, এমন কি ভাষাকে পর্যন্ত ছাইয়ে পরিণত করছে। এটি ট্র্যাজেডির চেয়েও একটি প্রহসনে পরিণত করেছে, যেন পৃথিবীটা এভাবেই শেষ হবে। আর সেই অধ্যাপক তিনি লোকালয় থেকে দূরে বনে নির্বাসনে চলে যান, কারণ তিনি ক্রাজনাহোরকাইয়ের মতো একলা থাকতে চান, যেন যে কোনও অর্থগম্যতা থেকে দূরে চলে যান। সে মহাপ্রলয় আর সামনে ঘটবে এরকম রইল না, এটি এর মধ্যেই ঘটে গেছে, বা বারংবার ঘটে যাচ্ছে। যেটা বাকি থাকল, সেটি হলো এক সুদূরপ্রসারী ক্লান্তি, যেন শেষের শেষকে অবলোকন করার ক্লান্তি।
যদি কাফকা আধুনিক জগতের আমলাতান্ত্রিক ভয়াবহতাকে তাঁর সাহিত্যে ফুটিয়ে তোলেন, এবং স্যামুয়েল বেকেট একটি অবদমনীয় হতাশাকে, তা হলে ক্রাজনাহোরকাই এই দুটো বৈশিষ্ট্যকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান যখন ধ্বংসপর্ব ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাঁর চরিত্রগুলোর জন্য অবশেষে থাকছে সে নিঃশেষিত জীবনাচারের চর্বিতচর্বণ ক্লান্তি। কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে, আদর্শ আর নীতি গেছে গুঁড়িয়ে, এবং নিশ্চিন্ত প্রত্যয় সব গেছে নিশ্চিহ্ন হয়ে, কিন্তু তাদের প্রেতরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাঁর সৃষ্ট দুনিয়াতে ধর্মযাজকেরা ধর্মহীন, বিজ্ঞানীরা নির্বোধ, এবং উন্মাদ যারা কিছুটা হলেও ধরে নেয় যে সবকিছু ঠিকমতো চলছে। এই মহাপ্রলয়ের লণ্ডভণ্ড সময়ে ক্রাজনাহোরকাই তাঁর গদ্যকে আকার দিচ্ছেন ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে। এটিই যেন মহাপতনকে প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। এমন এক গদ্য যেটা মাইলের পর মাইল অভঙ্গুর, নিষ্ঠ, যেন ঐশ্বরিক।
ক্রাজনাহোরকাইয়ের গদ্যরীতির কথা আগেই বলেছি। তাঁর গদ্যরীতির সঙ্গে তাঁর দর্শন অবিচ্ছেদ্য। তাঁর অনুচ্ছেদগুলো দীর্ঘ বাক্যের সমাবেশ, কোনও কোনওটি কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপী। একটি প্রবল মানসিক তাড়নার তলে বাক্যগুলো সুগ্রন্থিত থাকে। বাক্যগুলো মানুষের চিন্তার প্রতিবিম্ব যেন, চিন্তার মতোই অসীমিত, কারণ মানুষ কখনও চিন্তা থামায় না। মানুষের চিন্তার মতোই একটি অর্থবোধকতার মধ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত বাক্যগুলো চলতে থাকে, যদিও শেষ পর্যন্ত বোধগম্যতা থাকে নাগালের বাইরে। তাঁকে পড়তে গিয়ে অনেক সময় বোধ হবে যেন চোরাবালির মধ্যে হাঁটছি, আর গদ্যের জাদু একজনকে বশীভূত করে রাখে। এই অনবরত প্রবহমান গদ্য যে শুধু মানব মনের চিন্তার গতিকে অনুসরণ করে তা নয়, নিজেই যেন একটি ঘূর্ণাবর্তের মতো আবহ সৃষ্টি করে। ভাষার একটি ব্যাকরণ তৈরি হয়, যার ফলে ভিন্নতার সীমারেখাগুলো মুছে যায়, বিষয় বর্ণনার মধ্যে ডুবে যায়, শুধু চিন্তার জঙ্গমতা অবশিষ্ট থাকে। তাঁকে অনুবাদ করা একটি চূড়ান্ত বীরোচিত কাজ, এবং তাঁর ইংরেজি অনুবাদক, যথাক্রমে জর্জ সার্টেস এবং ওট্টিলি মুলজেট, এই বেশ আয়াসসাধ্য কাজটি সম্পাদন করার জন্য নন্দিত থাকবেনই, কারণ তাঁরা অনুবাদে ক্রাজনাহোরকাইয়ের জাদুকরি বর্ণনাভঙ্গি অক্ষুণ্ন রেখেছেন।
ক্রাজনাহোরকাইয়ের জন্য ভাষা হলো উভয়ত নৈরাশ্যের উপসর্গ এবং প্রশমন। ‘যা কিছু অস্তিত্বশীল তার সবটির কেন্দ্রই একটি’ ঘোষণা দিচ্ছেন সিয়েবোর একটি চরিত্র। আর এই কেন্দ্রটি হচ্ছে ভাষা। তারপরও ভাষা বরাবরই খণ্ডিত, কাটা কাটা। কিন্তু এই খণ্ডিতাংশগুলোর জোড়া লাগানোই হচ্ছে ক্রাজনাহোরকাইয়ের গদ্যরীতির দার্শনিক ভিত্তি। ভাষা তাঁর কাছে অস্তিত্বশীল, জীবন্ত ও পর্যায়-উত্তরিত। তাই তাঁর অনিঃশেষ বাক্যগুলো ঐ ধরনের ঐক্যে পৌঁছাতে আপ্রাণ চেষ্টায় রত। তাঁর উপন্যাসগুলোর ভাষারীতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পাঠক যেন একটি তীর্থযাত্রায় সামিল হচ্ছেন দেবত্ব অর্জনের উদ্দেশ্যে। বিষয়গত বিবেচনায় ক্রাজনাহোরকাইয়ের কাহিনিতে মূলত অ্যাপোক্যালিপস বা মহাদুর্যোগ, পুনরাবৃত্তি ও আশীর্বাদ সম্বলিত বিষয়গুলো ঘুরে ফিরে আসে। মহাবিপর্যয় তাঁর রচনায় কোনও একক ঘটনা নয়, এটি সর্বব্যাপ্ত, কারণ ক্রাজনাহোরকাইয়ের চোখে পৃথিবী সবসময় অবসানের পথে। এই মহাদুর্যোগের ভাবনা তাঁর চরিত্রগুলোর চেতনা জুড়ে থাকে, যেন এর ভারে অর্থ পর্যন্ত লুপ্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে পুনরাবৃত্তির বলয়ে ঘুরছে ইতিহাস, ভাষা, এবং জিগীষা। তাঁর চরিত্রগুলো এই ব্যর্থতাবোধগুলো বারংবার নাট্যায়ন করছে, এবং করতে গিয়ে বারংবার পুনরাবৃত্তির ফাঁসির রজ্জুতে আটকা পড়ছে।
তাঁর কাহিনিতে মানুষের পতনের পাশাপাশি পবিত্রতার একটি মাত্রা দেখা যায়, দুটোই এখানে যতটা মূর্ত, তার চেয়ে বেশি বিমূর্ত। বিশ্বাসের পতন হয়ে ওঠে সর্বব্যাপী একটি চিত্রপট জুড়ে। তারপরও এই পতনের ঢালুতে জেগে থাকে আশীর্বাদপুষ্ট একটি আশা, যার রূপায়ণ হয় শিল্প, নিষ্ঠা এবং আশ্চর্য সম্মোহনী শক্তি দ্বারা।
আবার অপ্রকৃতিস্থ মানসিক বিপর্যয়ের সঙ্গে দিব্যচেতনার ফারাকটি খুব ধারালো থাকে না, বরঞ্চ একটু ঝাপসা। বরঞ্চ যাদেরকে উন্মাদ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেমন ভালুস্কা কোরিন, অথবা বেনামি সন্তগুলো তারাই একমাত্র চরিত্র যারা লুক্কায়িত অর্থকে কিছুমাত্র আন্দাজ করতে পেরেছে।
আবার, তাঁর অন্যতম আরেকটি থিম, এক্সজাইল বা পরবাস, হোক আক্ষরিক অর্থে কিংবা রূপক, কিন্তু তাই বস্তুত মানবজীবনকে সংজ্ঞায়িত করছে। প্রতিটি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বস্তুত একটি নতুন আবিষ্কার যে স্বদেশ বলতে কোনও কিছু থাকে না, যেখানে ফিরে যাওয়া যায়। যেটি ব্যারন ওরখেইমের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখলাম।
তাঁর সব উপন্যাসে ক্রাজনাহোরকাই এমন কৌশল অবলম্বন করেছেন যে ধর্মীয় তত্ত্বের সঙ্গে আইরনি বা বক্রার্থ, পরাবিজ্ঞানের সঙ্গে কাদা মিশে যায়, এবং মিশে গিয়ে এমন একটি বিবমিষাময় অবস্থা তৈরি হয় যে তাঁর কাহিনিতে দুর্যোগ আকস্মিক বজ্রপাতের মতো ঘটে না, বরঞ্চ তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়াদি দিয়ে জীবনের অর্থ একটি ধীরগতির শ্বাসরোধকারী অবস্থার মধ্য দিয়ে বিনষ্ট হতে দেখি। কিন্তু, যেটা বারবার বলছি, এত বিপর্যয়ের পরও ভাষাটাই যেন নতুন বিশ্বাসে প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে।
পশ্চিমা জগতে ক্রাজনাহোরকাইয়ের আবেদন তৈরি হবার পেছনে বেলা টারের চলচ্চিত্রায়নের অবদানের কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তারপরও তাঁর লেখক হিসেবে পরিচিতি দেশীয় সীমানা পার হয়ে আন্তর্জাতিকতায় পৌঁছেছে সবিশেষ তাঁর অনুপম ভঙ্গির গদ্যরীতির কারণে। তাঁকে গোত্রভুক্ত করতে চাইলে ডব্লিউ জি সিব্যাল্ড, রবার্তো বোলানো এবং হোসে সারামাগোর সঙ্গে রাখতে হবে, কারণ তাঁরা যে আধুনিক যুগের ক্ষয়িষ্ণুতাকে সৃষ্টিশীলভাবে সাহিত্যায়নের জন্য আলাদা একটা ভাষা-কাঠামো তৈরি করেছিলেন সেটির উত্তরাধিকারী স্বয়ং ক্রাজনাহোরকাই।
সমালোচকেরা বেশির ভাগ সময় তাঁকে সমকালীন কাফকা হিসেবে অভিহিত করেন। এটি হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু এটি একটি অসম্পূর্ণ তুলনা। কাফকার দুঃস্বপ্ন হচ্ছে ব্যুরোক্রেটিক বা আমলাতান্ত্রিক, কিন্তু ক্রাজনাহোরকাইয়ের দুঃস্বপ্ন হচ্ছে মহাজাগতিক। তিনি লেখেন যেন ইতিহাসের গতি বিনষ্ট হয়ে গেছে, যেন মানবতা তার নিজের ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একটি যান্ত্রিক উদাসীনতায়। তারপরও যেখানে কাফকা থেমে যান নীরবতার মধ্যে, ক্রাজনাহোরকাই এগিয়ে যান একটি গানের মতো, করুণ, প্রলম্বিত ও অনিঃশেষ।
তাঁর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি (২০২৫) স্বীকার করছে যে তাঁর অবদান শুধু দেশীয় সাহিত্যের জন্য নয়, বরঞ্চ এটি যেন একটি পরাবিজ্ঞানী অভিযান, একটি প্রচেষ্টা, যেন উপন্যাস শিল্প শেষ হয়ে যাবার পর উপন্যাস লেখা। কিংবা আমরা বলতে পারি, এক অত্যাশ্চর্য গদ্যরীতির মাধ্যমে অর্থের বিনষ্ট হয়ে যাওয়া ধরে রাখা।
উত্তরাধুনিক ভাষাবিদেরা, যেমন ফার্দিন্যান্ড ডি স্যাসুর, রল্যাঁ বার্থ, রোমান জ্যাকবসন, জ্যাক দেরিদা, পল ডি মান প্রমুখ স্বীকার করছেন শব্দের কোনও স্থির বা চিরকালীন অর্থ নেই। ভাষা তাই পিচ্ছিল, এটার অর্থ পরিপ্রেক্ষিত দিয়ে তৈরি হয়। আমার মনে হয়, ক্রাজনাহোরকাইয়ের ভাষা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি এই ভাষাবিদদের সিগনিফাইড আর সিগনিফাইয়ারের মধ্যে বিরাজিত সংকটেরই সৃজনশীল প্রতিধ্বনি। কারণ তাঁর রচনায় শব্দের সঙ্গে অর্থের অনিত্য সংযোগের চিন্তাটি গোত্রভুক্ত।
ব্যারন ওয়েনখেইমেস হোমকামিং উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ে একটি পরীক্ষামূলক ভাষা ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি। নায়ক একটা স্লিপে প্রথমে লিখলেন, ‘ইয়ু আর মাই পাপা’। তারপর মুহূর্তে এই ইতিবাচক বাক্যটি মুছে পুনরায় লিখলেন, ‘আর ইয়ু মাই পাপা’। কিন্তু যতিচিহ্ন প্রশ্নবোধক দিয়ে শেষ হয়নি। অর্থাৎ, এটি প্রশ্ন নয়, কিন্তু লুক্কায়িত অনুসন্ধান। কিন্তু দুটো বাক্যের সমান্তরাল ব্যবহার প্রমাণ করছে যে আধুনিক জীবনের জটিলতা ও অনিশ্চয়তা প্রকাশের জন্য ভাষাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্মর বাহন।
তাই উপসংহারে বলতে হয়, ক্রাজনাহোরকাই পাঠ করা সহজসাধ্য কাজ নয়, কিন্তু দুর্গমতাই হচ্ছে তাঁর নান্দনিক দর্শন। তাঁর দীর্ঘ বাক্যাবলি নির্দেশ করে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, যে অর্থে প্রার্থনা বা ধ্যানমগ্নতা পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ দাবি করে। তাঁর গদ্য পাঠককে আমন্ত্রণ জানায় ধীরগতির মধ্যে বসবাস করা, চিন্তাকে একটি জটিল প্রকরণ হিসেবে মনে করা। এই জটিল বাত্যাবিক্ষুব্ধ বর্ণনার মধ্যে থেকে বের হয়ে আসে এক অদ্ভুত অম্লান, অমরভাবে বিচ্ছুরিত দীপ্ত চেতনা এবং তার বিপরীতে হতাশা এবং বিবমিষা লুপ্ত হয়ে যায় এক অনির্বাপিত আলোর কাছে এবং তখন ধ্বংস প্রত্যুজ্জ্বল হয়ে ওঠে অবস্থান্তরের পর্যায়ে।
ব্যারন ওয়েনখেইমসের প্রত্যাবর্তনের শেষের দিকে অধ্যাপক চরিত্রটি বনবাসে যান, বিড়বিড় করে বলেন, ‘আমাকে একা থাকতে দিন।’ এই বাক্যটি যেন একটি ক্লান্তিকর আশীর্বাণীর মতো শোনায়, যেন সভ্যতার ধ্বংসতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে নীরবতার পিঞ্জরে বাঁধা পড়া। সম্ভবত সেই মহা নীরবতার দিকে ক্রাজনাহোরকাইয়ের পৃথিবী অঙ্গুলি নির্দেশ করে : মহা দুর্যোগতাকে ছাড়িয়ে, শব্দকথনকে ছাড়িয়ে, এমন এক নীরবতার দিকে এগিয়ে যাওয়া যেখানে হয়তো শেষ পর্যন্ত পবিত্রতা ফিরে আসবে।
চেঁচামেচিময় পৃথিবীতে তাঁর লেখনী দাবি জানাচ্ছে দিব্যদৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার দিকে, যেন ক্যাওজের মধ্যেও দায়িত্ব থাকে অনুধাবন করা, সহে যাওয়া, এবং ব্যক্ত করা। তাঁর উপন্যাসগুলো পতনের ক্যাথিড্রাল, কিন্তু তারপরও তাদের ধ্বংসের মাঝেও স্বর্গীয় আশীর্বাদের সঙ্গীত অনবরত বাজতে থাকে। এবং তাঁর ব্যবহৃত বাক্যাবলি এই প্রত্যয় খোঁজার জন্য টিকেট।
লেখক : কথাসাহিত্যিক



