আর্কাইভপ্রবন্ধ

মুক্তগদ্য : ট্রাঙ্কের ভেতর জমে থাকা দিনগুলো : আনজীর লিটন

বরিশাল ছেড়ে জীবনানন্দ দাশ কলকাতায় এসেছিলেন একটা ট্রাঙ্ক নিয়ে। সেই ট্রাঙ্কে ছিল কবিতার পাণ্ডুলিপি। ছিল এমন সব কবিতা; যে কবিতাগুলোর শিরোনাম হয়নি। নিজের পোশাক-আশাকের চেয়ে ধূসর পাণ্ডুলিপিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে কবি এসেছিলেন নতুন শহরে, নতুন ঠিকানায়।

এই ট্রাঙ্কের ভেতর জমে থাকা দিনগুলো কোনও ক্যালেন্ডারের পাতায় ধরা পড়ে না। দুপুরের নিস্তব্ধতা, সন্ধ্যার আলো কিংবা রাতের গভীরতায় জেগে ওঠা কিছু কিছু মুুহূর্ত রাঙিয়ে দেয় ট্রাঙ্ক। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর স্থির হয়ে বসে থাকা ট্রাঙ্ক আমাদের স্মৃতিতে এমনভাবে মিশে থাকে―ভোলা যায় না। স্পর্শ করলেই বোঝা যায় ট্রাঙ্ক শুধু ঘরের অন্যসব আসবাবের মতো নয়―এটা সময়ের চিহ্ন রেখে দেওয়া টিনের একটা বাক্স।

ট্রাঙ্ক খুললে প্রথমে যে গন্ধটা আসে সেটা কাপড়ের নয়। যেন সময়ের গন্ধ। ভাঁজ করা কাপড়ের নিচে পড়ে থাকা কাগজ, পরীক্ষার এডমিট কার্ড, জমির দলিল, পুরোনো অসুখের প্রেসক্রিপশন, নেপথলিন ও কলমের ক্যাপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিনিসগুলো মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা অতীতের টুকরো স্মৃতিকথা। ট্রাঙ্কে জড়ানো থাকে বাবা-মা-ভাই-বোন কিংবা প্রিয়তমা স্ত্রীর ভালোবাসার ছোঁয়া।  ট্রাঙ্কের ভেতর খুঁজে পাওয়া প্রিয়জনের চিঠি বুকের ভেতরে অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে দেয়। ভালোবাসার উপাখ্যান মুুহূর্তের মধ্যে রচিত হতে থাকে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয় এ সবকিছুই ট্রাঙ্কের বন্ধুতা। কারণ ট্রাঙ্ক সংরক্ষণ করতে জানে বস্তু, সময়, ছবি, ভালোবাসা, দৃশ্যপট, অনুভূতি, গন্ধ―সবকিছু।

খুব মনে পড়ে আশির দশকের সূচনাভাগে রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নিজেকে ঘরছাড়া মানুষ হিসেবে তৈরি করি একটা ট্রাঙ্ককে সাথী করে। পরম যত্নে, মমতায় আম্মা-আব্বা আর মেজআপা, ছোটআপা আমার ট্রাঙ্ক গুছিয়ে দিয়েছিলো। শার্ট-প্যান্ট, কাঁথা, কম্বল, দু-একটা খাতা, প্রিয় কিছু গল্পের বই, মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েটের সার্টিফিকেট- টেস্টিমোনিয়াল ট্রাঙ্কে ভরে রওনা দিলাম রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে। ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে ফাইভ আপ ট্রেনে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট হয়ে রাজশাহী যেতে হবে। মধ্যরাতের ট্রেন। স্টেশনে আব্বা এলেন ট্রেনে বসিয়ে দেবেন বলে। প্ল্যাটফরমে এসে লক্ষ করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন ছাত্রবন্ধু, যারা ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে যাচ্ছে, সবার সাথে একটা করে ট্রাঙ্ক। আব্বার বিশেষ উপদেশ ট্রাঙ্ককে নিয়ে। কোনওভাবেই যেন চোখের সীমানার বাইরে না যায় ট্রাঙ্ক। সেই ট্রাঙ্কের ঠাঁই হলো রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হলের ১১৩ নম্বর কক্ষে। প্রথম দিন রুমের চকির নিচে সেই যে ঢুকিয়েছিলাম ওভাবেই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন পর্যন্ত।

ট্রাঙ্কে ঝুলে থাকা তালাটির কথাও খুব মনে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে আবারও ট্রাঙ্কটি সাথে নিয়ে ময়মনসিংহে ফিরে আসা। মধ্যিখানে কত কত মোহ তৈরি হয়েছে এই ট্রাঙ্ককে ঘিরে। কত কথা ট্রাঙ্কের ভেতর জমা ছিল চিঠি আকারে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর এমন একটি ট্রাঙ্ক থাকত। ট্রাঙ্কটিকে ঘিরেই যেন ছোট্ট সাম্রাজ্য রচিত হতো। তালা খুলে ট্রাঙ্কটি যখন চকির নিচ থেকে বের করতাম মনে হতো গুপ্তধন বের করছি। এখানে কারও কোনও ভাগ নেই। একান্ত আমার।

ব্যক্তিগত গুপ্তধন রাখা এই টিনের বাক্সটির উৎপত্তি সেই প্রাচীন যুগে। মানুষ যখন ভ্রমণ করা শুরু করল তখনই দরকার পড়ল এমন একটি পাত্রের। প্রাচীন মিশরে এমন পাত্রের উদ্ভব হয়েছিল। রাজকীয় পোশাক, গয়না, দলিল রাখার জন্য নিরাপদ কিছু একটা দরকার বলেই এমন পাত্রের ব্যবহার হতে লাগল। এই পাত্রটি ট্রাঙ্ক। কাঠ দিয়ে বানালে বাক্স। আর ধাতব-টিন দিয়ে বানানো হয় বলে নাম হয়ে উঠল ট্রাঙ্ক। মধ্যযুগে ট্রাঙ্ক জনপ্রিয় হয়ে উঠল ভ্রমণ ও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। তালাবদ্ধ ট্রাঙ্ক মালপত্র ও সম্পদের নিরাপত্তা দিতে পারে। যুগের পটপরিবর্তনে ট্রাঙ্ক হয়ে ওঠে অনিবার্য নিরাপত্তা পেটরা।

ট্রাঙ্ক হয়ে উঠল নির্ভরতার প্রতীক। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকার সময় লোকজনের সাথে থাকত ট্রাঙ্ক। ট্রাঙ্কে থাকত দলিল-দস্তাবেজ, অর্থকড়ি, সোনাদানা, গহনা।

ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে যখন সৈনিকরা যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তখন বাঙ্কারে তাঁবুতে পড়ে থাকে তাদের ট্রাঙ্ক। প্রতিটি ক্যাম্প বদলের সঙ্গে সঙ্গে সেই ট্রাঙ্ক ঘুরে বেড়ায় এক ঘাঁটি থেকে আরেক ঘাঁটিতে। সেই ট্রাঙ্কে থাকে অস্ত্র পরিষ্কারের সরঞ্জাম, প্রিয়জনের চিঠি, কখনও কখনও সহযোদ্ধার শেষচিহ্ন―এক জোড়া মোজা, ভাঙা ঘড়ি, বিবর্ণ হয়ে থাকা পরিবারের ছবি। এই ট্রাঙ্ক শুধু সৈনিকের জিনিসপত্রই বহন করে না; বহন করে সৈনিকের সাহসী হৃদয়ের উদ্দাম ঝঞ্ঝা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাঙ্কের ব্যবহার কমে এসেছে। চাকায় ভর করে এল বাক্স সুটকেস। এল ট্রলি ব্যাগ। ট্রাঙ্ক নিয়ে এখন আর ভ্রমণে বের  হয় না কেউ। কিন্তু অনুভবে এখনও বিরাজমান। ঘরের ট্রাঙ্ক খুললে শুধু জিনিস নয়Ñখুলে যায় একটি অতীত। এ শুধু একটা টিনের বাক্স নয়। এটা একটা স্মৃতির ধন।

আজকের দিনে প্লাস্টিকের সুটকেস আর নিত্যনতুন ডিজাইনের ব্যাগের ভিড়ে ট্রাঙ্ক নতুন আমেজে জেগে উঠছে। ট্রাঙ্ক হয়ে উঠছে ঘরের শো-পিস। রিকশা পেইন্টিং-এর আদলে ফুলের নকশা বা মোটিফযুক্ত ট্রাঙ্ক আকারে ছোট হয়ে ঘরের শোভা বাড়াচ্ছে।

কিন্তু সেই ধাতব ট্রাঙ্ক কোথায়। যেখানে জড়িয়ে আছে সময়ের গল্প। এটি দৈনন্দিন জীবনে শুধু ব্যবহার্য জিনিসপত্র ভরে রাখা ধাতব কোনও পাত্র নয়। ট্রাঙ্ক মানে একটা নিজস্ব গোপনীয়তা। সমাজ ও সময়ের নীরব-সরব সাক্ষী। বাঙালি পরিবারের কাছে এ এক ভালোবাসার ইতিহাস―আজ সেই ট্রাঙ্ককে খুঁজি।

খুঁজতে খুঁজতে মন চলে যায় ময়মনসিংহের ট্রাঙ্কপট্টিতে। শহরের ব্যস্ত ও ঐতিহ্যবাহী ট্রাঙ্কপট্টিতে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর শব্দে মুখর করা দিন উদযাপন করতাম শৈশবে।

সেইসব দিন কি আর ফিরে আসে ? শুধু অনুভব করি কত কিছু হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চারপাশ থেকে। কত কিছু ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দৈনন্দিন ব্যবহার সামগ্রীতে আসছে কত-কত পরিবর্তন। পরিবর্তনের এই দোলাচলে খুঁজে পাই না স্মৃতিতে থাকা পারিবারিক বন্ধনে জড়ানো সেই ট্রাঙ্ক, যেখানে গচ্ছিত আছে আমাদের অতীত।

 সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button