ভ্রমণ : স্বর্গের জানালা খুলে যায় যেখানে নীল আকাশ, বরফ, পাহাড় আর অনন্ত সৌন্দর্যে স্বপ্নযাত্রা : আশফাকুজ্জামান

কোনও এক নীরব সন্ধ্যায় ঠক ঠক আনন্দ…
এক মহাপুরুষ ঘর ছেড়েছিলেন পূর্ণিমা রাতে। তাঁর কাছে তুচ্ছ মনে হয়েছিল এই জগৎ-সংসার। আমরাও এক শীতের রাতে ঘর ছেড়েছিলাম। তবে আমাদের কাছে কোনও কিছু তুচ্ছ মনে হয়নি। আর সেটি কোনও পূর্ণিমা রাতও ছিল না। বরং বাসা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল কোনও সমস্যা হয় কি না।
সেদিনের গন্তব্য ছিল কাশ্মীর। প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের এক যাত্রা। ঢাকা থেকে আকাশপথে দিল্লি। তারপর এক অপরাহ্নে এখানে আসা। বিমান থেকে নেমে কাশ্মীরের ঘন কুয়াশায় ধূসর প্রকৃতিতে জীবনে প্রথম পা রাখা। প্রচণ্ড শীতে প্রায় জমে যাওয়ার অবস্থা।
আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল গাড়ি। এত ঠান্ডায় বাইরে থাকার কারও অভ্যেস নেই। সবাই দ্রুত গাড়িতে উঠল। তারপর শিশির ভেজা আলো-আঁধারি সন্ধ্যায় কাশ্মীরের এক লেকের পাড়ে নামতে হলো। জীবনের কত সকাল-সন্ধ্যা চলে গেছে তার হিসাব নেই। কিন্তু আজকের সন্ধ্যা মনে থাকবে চিরকাল। প্রায় শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় নীরব কোনও সন্ধ্যায় কোথাও দাঁড়িয়ে আছি―এমন সন্ধ্যা আসেনি কখনও।
আমাদের এক দলনেতা আছেন। তিনি বলেছেন কারও চিন্তার দরকার নেই। সব চিন্তা তাঁর। অন্যদের কাজ শুধু আনন্দ করা। এদিকে প্রচণ্ড শীত নিয়ে চারদিকে নেমে এসেছে রাত। কেউ জানি না কেন একটি লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আর কতক্ষণই বা থাকতে হবে। কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে প্রকৃতি। অল্প দূরের কিছুও দেখা যায় না। দলনেতা বলেছেন সদস্যদের কাজ শুধু আনন্দ করা। নিদারুণ শীতে সবাই ঠক ঠক করে আনন্দ করছি। জানি না কত সময় করতে হবে। তারপর এক সময় দুটো নৌকা এল। নৌকার ছাদ আছে। বিভিন্ন রঙে সাজানো। এখানকার মানুষ নৌকাকে ‘শিকারা’ বলে। শিকারায় ভেসে এক ঘরে উপনীত হলাম। এ যেন এক নান্দনিক প্রাসাদ। কিন্তু আসলে এটা এক ভাসমান নৌকা। অনেকটা আমাদের দেশের পানসি নৌকার মতো।
ভারতবর্ষে এক সময় ইংরেজরা রাজত্ব করেছে। অবকাশ বিনোদনে তারা এই লেকে আসত। লেকের এ পানসি নৌকাকে বলত হাউসবোট। সেই থেকে এই নৌকা হাউস বোট নামে পরিচিত। শিকারা থেকে নেমে সুন্দর সিঁড়ি দিয়ে হাউস বোটে উঠতে হয়। উঠেই একটা সুন্দর খোলা জায়গা। বসার সোফা আছে। সেখানে ফায়ার প্লেস। চুল্লিতে আগুন জ্বলে। প্রায় শূন্য ডিগ্রি তাপে দলনেতা ছাড়া সবার রক্ত জমে যাওয়ার অবস্থা। দলনেতার নাকি রাজা-বাদশার রক্ত। সহজে জমে না। ফায়ার প্লেস ঘিরে সবাই জড়ো হলো। জীবনে তাপ-উত্তাপ কত জরুরি এই প্রথম অনুভব করছি। দলনেতা ছাড়া প্রায় সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল। গবেষণা ছাড়া তাঁর আনন্দ-বেদনা বোঝা যায় না। তবে তিনি চান সবাই যেন আনন্দ করে। এর জন্য যা করা দরকার তার সবই করছেন।

সুইচ টিপলে গরম বিছানা…
হাউস বোট এত সুন্দর যে আনন্দে সবাই চিৎকার করে উঠল। আমাদের চিৎকার শুনে পাশের বোটের এক পরিবার এল। তারা এসেছে তামিলনাড়ু থেকে। তারা ঘরে-বাইরে দুজন ও এক কন্যা। মজা করে বললাম, ভাই সাহেব আপনাদের তো কোর্স কমপ্লিট হয়নি। আরেকটা সন্তান দরকার। সবাই হেসে উঠল। শুরু হলো তুমুল গল্প, আড্ডা। বাদ যায়নি হামাস-ইস্রাইল, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধান্দাবাজি। ইউরোপের তাঁবেদারি। চীন, ভারত, রাশিয়ার পরাশক্তি হয়ে ওঠাসহ নানা বিষয়।
এভাবে কেটে গেল অনেক রাত। এদিকে প্রচণ্ড ক্ষুধায় সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ধৈর্যের বাঁধ আর মানছে না। ওই পরিবারটিও চলে গেল। ডাইনিংয়ে খাবার প্রস্তুত। হুমায়ূন আহমেদের এই সব দিনরাত্রি নাটকে দেখেছি একটা দৃশ্যে আনন্দ তো পরের দৃশ্যে দুঃখ। আসলে আনন্দ ও দুঃখ প্রায় এক থাকে। যার যখন প্রয়োজন সে তখন সামনে আসে। এত উচ্ছ্বাসের মধ্যেও একটা দুঃখের ঘটনা ঘটল। হঠাৎ ফায়ার প্লেসের পাইপে ছোঁয়া লেগে একজনের হাত পুড়ে গেল। তারপর যা হওয়ার তার থেকে কম কিছু হয়নি। টলস্টয়ের আনা কারেনিনা উপন্যাসে ছিল, আনন্দটা সবার। কিন্তু দুঃখগুলো যার যার মতো করে আলাদা। তাই যার হাত পুড়ে গেল দুঃখটা শুধু তারই রইল।
দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই ড্রয়িং-ডাইনিং। ডাইনিংয়ে খাবার দেওয়া হয়েছে। সবাই খেতে গেলাম। মেনুতে ছিল আলু রুটি, ভাত, মাংস, কোফতা, ডাল ও সালাদসহ আরও কিছু আইটেম। কাশ্মীরের রান্না অসাধারণ! একেবারে মায়ের হাতের রান্নার মতো।
হাউস বোটে অন্য পরিবারের সঙ্গে শেয়ারে থাকা যায়। আবার সম্পূর্ণ বোট ভাড়া নেওয়া যায়। ওই যে কবিতায় আছে ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়’। দলনেতা চান সবকিছুতে যেন স্বাধীনতা থাকে। অর্থ খরচে অকৃপণ। তাই সম্পূর্ণ বোট ভাড়া নিয়েছেন।

বেডরুমগুলোও স্বপ্নের মতো সাজানো। প্রতি রুমে সুন্দর পর্দা, ড্রেসিং টেবিল, ফ্লোরে কার্পেট, সুন্দর বিছানা। জীবনে প্রথম দেখলাম সুইচ টিপলে বিছানা গরম হয়। প্রতি বেডের সঙ্গে ইলেকট্রিক সুইচ আছে। সেটা টিপে দিলে বিছানা গরম হতে থাকে। বাথরুমে বাথটাব, ঠান্ডা-গরম পানি। হাউস বোটে কী আছে এর চেয়ে বড় প্রশ্ন কী নেই। এত সুন্দর মনে হবে যেন কল্পনার একটি ভাসমান বাড়ি।
অনেক রাতে ঘুমিয়ে অনেক সকালে ওঠা হলো না। কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই বিস্ময়! গত সন্ধ্যায় বোঝা যায়নি কতটা বিস্ময় এখানে আছে। পানসি নৌকার মাথায় দাঁড়িয়ে অপার দৃশ্য দেখা যায়। সন্ধ্যায় এক রকম তো সকালে অন্য রকম। যে কোনও কঠিন মানুষও এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবে। যেদিকে তাকাই চোখ জুড়িয়ে যায়। লেকটা যে কত বড় রাতে সেটা বোঝা যায়নি। যত দূর চোখ যায় তার পরেও লেক…।
দু পাশে সারি সারি অসংখ্য হাউসবোট। প্রতিটা বোটই নান্দনিক। নানা দেশ থেকে মানুষ ভ্রমণের জন্য এখানে এসেছে। রঙিন শিকারায় তাঁরা হাউস বোটে যাচ্ছেন। লেক জুড়ে ভেসে বেড়ায় অসংখ্য শিকারা। শিকারায় ভেসে লেক দেখা এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। মনে হবে এ যেন এক স্বপ্নের জগৎ। আমাদের এখানও শিকারায় ভেসে এই সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ হয়নি।
সবাই যা একদিন পরে ভাবে আমাদের দলনেতা সেটা একদিন আগে ভাবেন। তিনি একদিন আগেই দুটো শিকারা ঠিক করে রেখেছেন যেন পুরো লেক ঘুরে এর ঐশ্বর্য উপভোগ করা যায়। এই লেক শুধু তার সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও স্থানীয়দের এক অপরূপ মিলন মেলা। অনেকে এই লেককে প্রাচ্যের ভেনিস বলে। শিকারায় ভাসতে ভাসতে দেখা যায় মেঘ, পাহাড় ও রোদের খেলা। অনন্য বৈচিত্র্যে ভরা এর প্রকৃতি।

রূপকথার রাজকন্যা…
লেক ঘিরে হাজারো মানুষের জীবিকা। কেউ হাউস বোটের মালিক, কারও শিকারায় পর্যটকেরা ঘুরে বেড়ায়। কেউ বিক্রির জন্য বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে শিকারায় ভেসে বেড়ায়। এসব পণ্যের মধ্যে যেমন রয়েছে আংটি, চুড়ি, হার, শাল, হাতের তৈরি লেদার-কাপড়ের ব্যাগ, গয়নার বাক্সসহ অনেক উপকরণ তেমনি খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে আখরোট, বাদাম, ভুট্টা, ফলমূল, মধু, বারবিকিউসহ আরও অনেক খাবার।
এই ঐতিহাসিক লেকের নাম ‘ডাল লেক’। এটা কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের এক বিশাল হ্রদ। কাশ্মীরকে বলা হয় রূপকথার রাজকন্যা। এই লেক হলো রাজকন্যার হৃদয়। লেকের দক্ষিণ ও পূর্বে রয়েছে আকাশছোঁয়া পর্বতমালা। সকালের স্নিগ্ধ রোদে চকচক করে বরফে ঢাকা পর্বতের চূড়া। উত্তরে মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শালিমার ও নিশাত উদ্যান। আর পশ্চিমে হজরত বাল মসজিদ।
শ্রীনগর এক সময় মোঘলদের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী ছিল। তাঁরা একে ফুলের বাগানসহ নানা উপকরণে সাজিয়েছে। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে এই নগরের পত্তন হয়েছিল বলে ধারণা। আর ‘ডাল লেক’ ছিল এর শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ। এর সঙ্গে বন্ধুত্ব ঝিলম নদীর। দূর থেকে এই নদী ছুটে এসেছে বন্ধুর সঙ্গে মিলনের জন্য।
কাশ্মীরে ঘুরতে এসে এই লেক দেখে না এমন পর্যটক প্রায় নেই। এখানে সাধারণত চারটি ঋতু। প্রতি ঋতুতে লেক নতুন রূপে সাজে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার। সাড়ে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত ও ২০ ফিট পর্যন্ত গভীর। আয়তন প্রায় ২৬ বর্গ কিলোমিটার। ফ্রেমে বাঁধাই করার মতো সৌন্দর্য এই লেকের।

কাশ্মীরের রানি পেহেলগাম
আমাদের দলনেতার যেন ভ্রমণের রাশি। জীবনে এত ভ্রমণ করেছেন যে অভিজ্ঞতার শেষ নেই। তাঁর কথা হলো যে কোনও ভ্রমণে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক বিনিয়োগ করতে হয়। আর বিনিয়োগ মানেই ঝুঁকি। ঝুঁকি ছাড়া কোনও অর্জন হয় না। দলনেতা এটা খুব ভালো বোঝেন। পুরো জার্নিতে হিসাববিজ্ঞানের নানা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর কথা হলো প্রতিটি মুহূর্ত অর্থ দিয়ে কিনতে হয়। ইচ্ছে হলে, ইচ্ছে মতো সবকিছু করা যায় না। যদি অনন্ত সময় ও অর্থ থাকে তাহলে এক একটা জায়গা মনের মতো করে দেখা যায়। তবে এ কথা ঠিক যে তিনি অন্যদের মতো না। প্রয়োজনে দু হাতে খরচ করেন। এই দলের থাকা, খাওয়া, যাতায়াত সবই রাজকীয়। ডাল লেকের ঐশ্বর্য উপভোগের সময় ছিল এক সন্ধ্যা, এক রাত, এক দুপুর। প্রায় ২০ ঘণ্টা।
এবার গন্তব্য কাশ্মীরের নদী ও উপত্যকাশোভিত আরেক জনপদ। এর নাম পেহেলগাম। ডাল লেক থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে গেলে পেহেলগাম। পথে পথে নানা বৈচিত্র্য। চারপাশের দৃশ্য মুগ্ধ করে। কখনও ফসলের মাঠ, জাফরান খেত, কোথাও আখরোট ও আপেল বাগান। আবার কখনও পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঝরনার সঙ্গে পথ চলা। কলকল ধ্বনিতে ঝরনার পানি এমনভাবে বয়ে যায় যেন তানপুরার এক মায়াবী সুর। দূরে বরফে ঢাকা পর্বতমালা আর সবুজ প্রান্তর। রাস্তার দু পাশে খাবার, ফলমূল, নান্দনিক গহনা ও ঐতিহ্যবাহী শালের দোকান তো আছেই। চলার পথটাও যে কত সুন্দর সেটা বোঝানো যাবে না।

নিউ হ্যাভেন…
চলতে চলতে গাড়ি থামে এক পাহাড়ের গাঁয়ে। তখন গোধূলি। পেহেলগামে একটু দেরিতে সন্ধ্যা নামে। ছবির মতো সুন্দর পেহেলগাম। পাহাড়, পাইন ট্রি, নদী আর বরফের অপূর্ব গ্রাম। যেন স্বপ্নের তুলি দিয়ে আঁকা উপত্যকা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচুতে। দূরের নীল আকাশকে মনে হয় ছোঁয়া যাবে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। চারদিকে রাত নেমে এসেছে।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নিউ হ্যাভেন হোটেল। রাস্তা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলে ছোট ল্যান্ডিং। ল্যান্ডিং থেকে গেট দিয়ে হোটেলে ঢুকে দুই তলায় আমাদের তিনটা রুম। কথা ছিল দ্রুত শুয়ে পড়া। কিন্তু দলনেতা বলেন সবকিছু কথা মতো হয় না। সত্যি সত্যি হলো না। শুতে শুতে অনেক রাত হলো। সকালে রুমের জানালা খুলতেই এমন এক দৃশ্য দেখা গেল যা বাস্তবে কেন স্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না। জানালা খুলতেই দেখি রুমের খুব কাছে সাদা বরফে ঢাকা বিশাল উঁচু পাহাড় চূড়া। সকালের মিষ্টি রোদে সেটা এমন অপরূপ লাগছে যে দলনেতার মতো কঠিন মানুষকেও বিস্মিত করবে। ঘুম থেকে উঠে এমন একটি নান্দনিক দৃশ্য দেখার আনন্দই আলাদা। পরে খেয়াল হলো আমাদের প্রতিটি রুম থেকেই এমন অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। এখানের হোটেলগুলো এমন পরিকল্পনা থেকেই করা হয়েছে। দলনেতাকে ধন্যবাদ যে তিনি এমন একটি হোটেল ঠিক করেছিলেন।

সুইজারল্যান্ড…
রাতেই ঠিক হয়েছিল যে সকালে নাশতার পর সুইজারল্যান্ড যেতে হবে। সবার মধ্যে এক অন্য রকম উত্তেজনা। এ এক অদ্ভুত সুইজারল্যান্ড। যেখানে যেতে পাসপোর্ট লাগে না। ভিসা লাগে না। বিমানে উঠতে হয় না। একমাত্র বাহন ঘোড়া। আবার হেঁটেও যাওয়া যায়। যাওয়া-আসা প্রায় ১৫ কিলোমিটার। প্রতি ঘোড়ার ভাড়া ১ হাজার থেকে ১৫০০ রুপি। আমাদের সাতটা ঘোড়া প্রয়োজন। ‘কথায় আছে ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল।’ আমরা ঘোড়ায় চড়ে হাঁটিয়া চলিলাম না। ঘোড়ায় চলিলাম। আমাদের দলে শিশু, কিশোর, নারী, সিনিয়র সিটিজেনসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের সদস্য আছে। সবাই ঘোড়ায় চড়তে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু সবার মধ্যে চড়ার উত্তেজনা আছে। কেউ এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চায় না। ভয়, আনন্দ, উত্তেজনা একই সঙ্গে কাজ করছে।
আবার দলনেতা তো বলেছেনই যে ঝুঁকি ছাড়া কোনও অর্জন হয় না। তাই যে কোনও ঝুঁকি নিতেই হবে। কোনও ছাড় নেই। এ দেশের মানুষ ইউরোপে যাওয়ার জন্য সীমাহীন উত্তাল সাগর পাড়ি দেয়। সাগরে ডুবে কত জনের মৃত্যু হয়। আর এখানে বড় জোর কোনও সদস্য ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে পারে। আর একান্ত কপালে লেখা না থাকলে মৃত্যু হবে না। পঙ্গু হতে পারে। তাতে কি। তখনও সে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে।
ঘোড়ার পিঠে ওঠার সময় কিছুটা বুক দুরুদুরু করে। কিন্তু একবার ঠিকভাবে বসতে পারলে আর সমস্যা নেই। বসার জন্য ঘোড়ার নীল দাঁড়ার ওপর আরামদায়ক করার কোনও ঘাটতি নেই। সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করে সবাই ঘোড়ার পিঠে উঠল। প্রথম কিছুটা ভয় পেলেও একটু পরে সবাইকে পেশাদার ঘোড়সওয়ার মনে হলো। যাত্রাপথের একটা অংশ কার্পেটিং, তারপর মাটি আর পাথর, এরপর শুধু পাথর আর পাথর। প্রত্যেকের ঘোড়ার নাম আছে। আমার ঘোড়া বুলবুল, দলনেতার ঘোড়া পাঠান, গালিবের দুলদুল, অয়নের পঙ্খিরাজ, মেঘলার ঘোড়ার নাম শাহজাদি। তন্দ্রার ঘোড়ার নাম রাজা, আহিলের সুলতান। ঘোড়ার পিঠে চড়ে কিসের বাংলা, কিসের হিন্দি, দলনেতার মধ্যে হলিউড সিনেমার নায়কের ভাব এসে গেল।

এক স্বপ্নপুরী…
শুরুতে পাকা রাস্তা দিয়ে ঘোড়া হাঁটছে। ঠক-ঠক-ঠক-ঠক করে বাজনার মতো শব্দ হচ্ছে। মনে পড়ে গেল পরিচিত সিনেমার সেই দৃশ্যের কথা যেখানে নায়ক দস্যুদের কাছ থেকে নায়িকাকে উদ্ধার করে ঘোড়ার পিঠে নিয়ে ছুটে যায়। দ্রুত ছুটতে ছুটতে এক সময় ঘোড়া অদৃশ্য হয়ে যায়। শুধু তো দলনেতার সাত ঘোড়া না, অসংখ্য ভ্রমণ পিপাসুর ঘোড়া সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে। এক সঙ্গে এত ঘোড়ার ঠক-ঠক শব্দ কোনও দিন শোনা হয়নি। সবাই ভীষণ পুলকিত, শিহরিত। কোনও কোনও জায়গায় পাহাড় থেকে ঝরনা নেমে এসেছে। ক্লান্ত ঘোড়া সে ঝরনার পানি পান করছে। আবার কোথাও পানি জমে বরফ হয়ে গেছে।
বিশাল উঁচু পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে ঘোড়া হাঁটছে। চিরদিন মনে রাখার মতো সব স্মৃতি জমা হচ্ছে। যেতে যেতে কাশ্মীরের পুরোনো গ্রাম দেখা যায়। দেখা যায় পাহাড়ের দীর্ঘ উপত্যকা। অদূরে পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা বরফ। বরফের ওপর গড়িয়ে পড়ে সকাল, দুপুর ও বিকেলের মিষ্টি রোদ। পাহাড়ের মাটি ফুঁড়ে আকাশের দিকে উঠে গেছে সারি সারি পাইন ট্রি। মনে হয় এ যেন এক স্বপ্নপুরী।

মিনি সুইজারল্যান্ডের সবুজ গালিচা…
একজন মানুষ যত সুন্দর কল্পনা করতে পারে সুইজারল্যান্ড যেতে চারপাশের দৃশ্য এর থেকেও বেশি সুন্দর। আমাদের ঘোড়ারা পাকা রাস্তা, মাটি ও পাথরের রাস্তা পেরিয়ে এখন শুধু পাথর ও পাইন ট্রির ভেতর দিয়ে পাহাড়ের ওপর উঠছে। কোথাও কোথাও এত খাঁড়া যেন ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। সদস্যদের অনেকে ভয়ে চিৎকার করছে। কোনও উপায় নেই। উপায় একটাই মনে সাহস নিয়ে শক্ত হয়ে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা। কোনও সন্দেহ নেই খুব যত্নের সঙ্গে সবাই সেটা করছে। এমন নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা হর্স রাইডের পর এক সময় সুইজারল্যান্ড এলাম।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট ওপরে এই সুইজারল্যান্ড। উঁচু পাহাড়ের ওপর কয়েকটা ফুটবল মাঠের মতো বিশাল ফাঁকা সমতল ভূমি। সমস্ত জায়গা জুড়ে যেন ঘন ঘাসের চাদর। যেন এক দীর্ঘ সবুজ গালিচা। এত উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে আকাশ দেখা, দূরের পাহাড় দেখা, পাহাড়ের চূড়ায় সাদা বরফ জমে থাকতে দেখা, বিকেলের স্নিগ্ধ আলোয় আরও সুন্দর হয়ে ওঠে এই সুইজারল্যান্ডের প্রকৃতি। এখানে হিন্দি ছবির শুটিং হয়। অনেকে একে শুটিং স্পটও বলে। এমন দৃশ্য দেখতে পাওয়া অনেক বড় ব্যাপার। মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় শোনা শিল্পী রোমান ইসলামের গানের কথা, ‘হায়রে আমার মন মাতানো দেশ…রূপ দেখে তোর কেন আমার নয়ন ভরে না…।’ আসলেই তাই, এই সুইজারল্যান্ড যত দেখি পরান জুড়াবে না।

মিনি সুইজারল্যান্ড…
এতক্ষণ যে সুইজারল্যান্ডের কথা বলা হলো, সেটা আসলে পেহেলগামের একটি দর্শনীয় জায়গা। এ জায়গাটির স্থানীয় নাম বাইসারন। পাহাড়ের ওপরে এই সমতল ভূমি। পুরোটাই সবুজ ঘাসের চাদর। আকাশ ছোঁয়া পাইন-ট্রি। দূরে পাহাড়ের ওপর জমে থাকা বরফ সব মিলে এ জায়গার এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য আছে। একমাত্র সুইজারল্যান্ডে নাকি এমন দৃশ্য দেখা যায়। অপূর্ব সৌন্দর্যের জন্য জায়গাটির নাম মিনি সুইজারল্যান্ড। পেহেলগামে কয়েকটি অসাধারণ দর্শনীয় জায়গা রয়েছে। এরই একটি হলো মিনি সুইজারল্যান্ড।
কাশ্মীরি ভাষায় নাগ মানে ঝরনা। আর অনন্ত মানে অনেক। পেহেলগাম হলো কাশ্মীরের অনন্ত নাগ জেলার একটি সুন্দর জায়গা। এখানে একের পর এক মুগ্ধ হওয়ার মতো ঝরনা দেখা যায়। পেহেলগামের অনেক কিছু দেখা হলো, আবার অনেক কিছু দেখা হলো না। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো, সব পাখি ঘরে আসে―সব নদী―ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন…। তাই এক সময় ঘরে ফিরতে হয়। জীবনের লেনদেন শেষ হয়। মিনি সুইজারল্যান্ড থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় বিকেল হলো। তাড়াতাড়ি লাগেজ গুছিয়ে গাড়িতে আবার কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের পথে…।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বরফকন্যা গুলমার্গ
এবার গন্তব্য কাশ্মীরের আরেক বৈচিত্র্যময় জনপদ। এই জনপদের নাম ‘গুলমার্গ’। গুলমার্গের এক পৌরাণিক ইতিহাস আছে। পুরান কাহিনি মতে হিমালয়ের কন্যা পার্বতী। পার্বতীর আরেক নাম গৌরী। তিনি কাশ্মীরের এই পথ দিয়ে যেতেন। তাই প্রাচীনকালে এর নাম ছিল গৌরী মার্গ। অর্থাৎ গৌরী দেবী যে পথ দিয়ে যান।
পরবর্তীকালে রাজা ইউসুফ শাহ এর নাম রাখেন গুলমার্গ বা গোলাপের স্থান। শ্রীনগর থেকে এঁকেবেঁকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে গেলে এই গুলমার্গ। চলতে চলতে গাড়িচালক শাকিল ভাই বললেন, ‘গুলমার্গ হলো কাশ্মীরের এক অনিন্দ্য সুন্দর উপত্যকা। এর কিছু দূরেই পাকিস্তান সীমান্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯ হাজার ফুট ওপরে। এর রূপের যেন শেষ নেই।’
এঁকেবেঁকে সাপের মতো গাড়ি চলছে। একবার বাঁকা রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের ওপরে যাচ্ছে আবার নেমে আসছে। পাহাড়ের উপত্যকার ভাজে ভাজে বরফ জমে আছে। কোথাও কোথাও রাস্তার ওপরও বরফ জমা হয়েছে। অনেক উঁচু পাহাড়ের ঢাল দিয়ে রাস্তা। কোনও রকম দুর্ঘটনা হলে গাড়ি গড়াতে গড়াতে এত নিচু খাদে গিয়ে পড়বে যে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

বরফ কন্যা…
এখনে প্রায় সারা বছর শীত। তার ওপর এখন শীতকাল। চারদিকে প্রচন্ড শীত। এ সময় গুলমার্গকে মনে হয় বরফ কন্যা। শুভ্র বরফ, দৃষ্টিনন্দন পর্বত, উপত্যকা, উদ্যান, পাহাড় চূড়ায় রোদের খেলা, কুয়াশায় ঢাকা স্নিগ্ধ হ্রদ। সবকিছু যেন শিল্পীর আঁকা চিত্রকল্প। সেটা হোক না কোনও রোদেলা দুপুর বা ধূসর কোনও নীরব বিকেল। সব সময় এর এক অকল্পনীয় সৌন্দর্য। এসব ঘিরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘ সবুজ পাইন ট্রি। এ এক অন্যরকম জগৎ। যেন কোনও জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় অপরূপ সুন্দর হয়েছে।
এক সময় পাহাড়ের কোলে গাড়ি থামল। এখানেই বরফ দেখা যায়। স্থানীয়রা দলনেতাকে বলল―লোকাল গাড়িতে আরও কিছুটা দূরে গেলে বিস্তীর্ণ ভূমিতে বরফ জমে থাকতে দেখা যাবে। লোকাল গাড়িতে তিনি সদস্যদের নিয়ে সেখানে গেলেন। সত্যি এখানে বিস্তীর্ণ সমতল জায়গা জুড়ে বরফ জমে আছে। সাদা বরফের ওপর দৌড়াদৌড়ি, গড়াগড়ি, স্কেটিং, লাফঝাঁপ, চিৎকার চেঁচামেচি কত কিছু যে করা হচ্ছে এর যেন শেষ নেই। সবাই খুশিতে আত্মহারা।
এখানে বরফের পাহাড় যেন ওপরের দিকে আকাশের সঙ্গে মিশেছে। মনে হবে যেন আকাশ থেকে নেমে আসছে সাদা বরফের নহর। সেই বরফে ঢেকে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ ভূমি। সৃষ্টিকর্তার এমন অপার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চোখে জলও আসতে পারে।
এই টিমের সবার জন্য এমন জায়গায় আসা, এমন দৃশ্য দেখা এই প্রথম। আবার এটাই হয়তো শেষ। এখানে সারা দিন থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ওই যে দলনেতা বলেছেন সব ইচ্ছে পূরণ হয় না। লোকাল গাড়িতে যেখান থেকে এসেছিলাম আবার সেখানে ফিরে এলাম।
অপূর্ণতা রইল না…
এখানে এসে আবার পেয়ে গেলাম অষ্টম আশ্চর্য। এ কদিন শুধু দূর থেকে বরফে ঢাকা পাহাড় দেখেছি। বারবার মনে হয়েছে যদি কোনও দিন ওই পাহাড়ে উঠতে পারতাম। দেশের টেলিভিশনে একটা বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একজন পাহাড়ে উঠতে যাচ্ছে আরেকজন এসে বলছে সম্ভব না। আবার আরেকজন এসে বলছে সম্ভব। কেউ পারেনি তো কী হয়েছে আপনি পারবেন। সত্যি সত্যি সে পেরেছিল। আমরা সেই বিজ্ঞাপনের প্রথম অংশকে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু এবার আমরা সত্যি সত্যি এমন একটা বরফের পাহাড় পেয়ে গেলাম। যে পাহাড়ে ওঠা যায়। সবাই ক্লান্ত ছিলাম, তারপরও অনেক ঝুঁকি নিয়ে বরফের পাহাড়ে উঠলাম। জীবনে আর কোনও অপূর্ণতা রইল না।

রোপ ওয়ে…
এখানে রুপি দিয়ে রোপ ওয়েতে ওঠা যায়, স্কেটিং করা যায়। রোপ ওয়ের স্থানীয় নাম ‘গন্ডোলা’। এটা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ক্যাবল কারের একটি। অনেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্যাবল কার বলে। আমাদের অবশ্য রোপ ওয়েতে ওঠা হয়নি। এর টিকিটের মূল্য বেশি। তারপরও পাওয়া যায় না। কয়েক দিন আগে টিকিট করতে হয়। আমরা রোপ ওয়ের খুব কাছে ছিলাম। এসব বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। যদি ওঠার কোনও সুযোগ থাকে।
এখানে কংডুরি নামে একটি পর্বত আছে। রোপ ওয়েতে এক ঘণ্টায় সেখানে যাওয়া যায়। সেখান থেকে গুলমার্গের পুরো ল্যান্ডস্কেপ দেখা যায়। পর্যটকের কাছে এটি নাকি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। শুনেছি এখানে আফারাওয়াত শিখর নামে একটি জায়গা আছে। এটি নাকি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায়। এ জায়গাটি গুলমার্গের এত সুন্দরের মধ্যে আরও সুন্দর। এখানে প্রায় সব সময় তুষারপাত হয়। এর শিখর থেকে উপত্যকার আরও নান্দনিক দৃশ্য দেখা যায়। এর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই আবার পাকিস্তান সীমান্ত। গুলমার্গের আরেকটি রূপ কথার মতো জায়গা হলো খিলান মার্গ। কারও যদি এই গ্রহের সুন্দর কোনও জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে তাহলে নাকি খিলান মার্গ হতে পারে সেই জায়গা। মনে হবে সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে।
স্নোফল…
এখানে আসার ভালো সময় হলো মার্চ থেকে নভেম্বর। তবে এপ্রিল-মে’তে এখানকার প্রকৃতি বেশি সুন্দর হয়। কিন্তু যারা স্নোফল দেখতে চায় তাদের যেতে হবে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। আবার এ সময়ের মধ্যে এলেই যে স্নোফল দেখা যাবে সেটাও নিশ্চিত না। আপনি হয়তো বড় জোর পাঁচ থেকে সাত দিন থাকবেন। সে সময়ের মধ্যে স্নোফল নাও হতে পারে। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে শুভ্র বরফের চাদরে ঢাকা থাকবে বিশাল এলাকা। তবে যারা কঠিন ঠান্ডা পছন্দ করেন তাদের কাছে ডিসেম্বর-জানুয়ারি হবে সবচেয়ে প্রিয় সময়। মোঘল ও ব্রিটিশ শাসকদের অবকাশের প্রিয় জায়গা ছিল গুলমার্গ।
পাহাড় ও বরফের এক নিঃশব্দ মায়া সোনমার্গ
গুলমার্গের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে প্রায় ঘনিয়ে এল সন্ধ্যা। হোটেলে ফিরতে হলো বেশ রাত। পরের দিনের যাত্রা সোনার তৃণভূমি। এখানে এক সোনালি জলের কূপ থাকার কথা প্রচলিত আছে। যে কারণে এ জায়গার নাম সোনমার্গ। রাজধানী শ্রীনগর থেকে প্রায় ৮৭ কি.মি. উত্তর-পূর্বে এই সোনমার্গ। এখানে রাস্তার দু পাশে, কাছে, দূরে এত পাড়ার যেতে যেতে মনে হলো নিউ ইয়র্কে যেমন জাতি সংঘের সদর দপ্তর তেমনি কাশ্মীর হলো পৃথিবীর পাহাড়ের সদর দপ্তর।
এই দপ্তরে পাহাড়ে পাহাড়ে বৈষম্য, পাহাড়ের প্রতি মানুষের অত্যাচার, পৃথিবীতে তাদের টিকে থাকার অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কি না সব যেন এখান থেকে নিশ্চিত হয়। জীবনে এত পাহাড় এক জায়গায় কখনও দেখা হয়নি। আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে যেন ঘোমটা পরা লজ্জাবনত পর্বতমালা। কাশ্মীর ভ্রমণে এ পর্যন্ত অনেক পাহাড় দেখা হলো। কিন্তু সোনমার্গের এক একটি পাহাড় যেন একেকটি মায়া।
শুধু পথের টানেই…
বরফ ও পাহাড়ের দিক থেকে গুলমার্গ ও সোনমার্গ প্রায় একই রকম। তবে অন্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ভূস্বর্গের সেরা আকর্ষণ সোনমার্গ। শ্রীনগর থেকে কারগিল হয়ে সোজা রাস্তা গেছে লাদাখের পথে। চলার সময় দেখা যাবে পাহাড়ের স্বর্ণ চূড়া। সিন্ধু নদীর স্রোত। তবে এটা ছোট বেলায় বইয়ে পড়া সেই সিন্ধু নদ না। সোনমার্গের একটি পাহাড়ি অপূর্ব নদীর নাম সিন্ধু। এর সৌন্দর্য আত্মহারা করে দেয়। শুধু পথের টানেই সোনমার্গ যাওয়া যেতে পারে। পুরো পথটাই আকর্ষণীয়। চোখ ফেরানো কঠিন। রাস্তার দুপাশে কাঠবাদাম ও চেরি গাছের সারি যে কাউকে আপন করে নেবে।
এক সময় পৌঁছে গেলাম সোনমার্গ। সোনমার্গও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এটি একটি দীর্ঘ উপত্যকা। এর পাহাড়ি ঢালে রয়েছে কাশ্মীরের গ্রাম।
গাড়ি থামল পাহাড়ে ঘেরা এক সবুজ ঢেউ খেলানো উপত্যকায়। এখানে সুন্দর হিমবাহ আছে। সেখানে ঘোড়ায় চড়ে ও হেঁটে যাওয়া যায়। হিমবাহের পাশে আছে শুকনো জায়গা। এটা হলো মানুষ ঘোড়ার ল্যান্ডিং। পর্যটকেরা ঘোড়ায় চড়ে এখানে নামে। এখানে ফায়ার প্লেস আছে। ঠান্ডায় হাত-পা জমে গেলে আগুনের পাশে বসা যায়। নানা প্রজাতির বাদাম ও মসলা দিয়ে বানানো ‘কাওয়া’ নামে এক ঐতিহ্যবাহী চাসহ নানা খাবার রয়েছে।
এটি এক দুর্দান্ত ল্যান্ডস্কেপ। ফটোগ্রাফারদের স্বর্গরাজ্য। আসলে ভূ-স্বর্গ তো স্বর্গই। দূরে কিছু পর্বত ধূসর, কিছু সবুজ, কিছু তুষারাবৃত। এখানে বরফে মোড়া পাহাড় চূড়ার রূপ সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। এখানেও পর্যটকেরা সাদা গালিচার মতো বরফের আনন্দ নিতে পারে। তুষারময় পাহাড়ের পেছনে থাকে নীলাকাশ। এ এক সীমাহীন আনন্দ। মনে হয় যেন জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই। সোনমার্গের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এক সময় এটা সিল্ক রোডের প্রবেশ দ্বার ছিল। এই সিল্ক রোড কাশ্মীরকে চীনসহ উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
‘আগার ফেরদৌস বে-রোহী যামীন আস্ত, হামীন আস্ত, হামীন আস্ত, হামীন আস্ত’ অর্থাৎ পৃথিবীতে যদি কোনও বেহেশত থাকে, তবে তা এখানে, এখানে, এখানে। ফার্সি ভাষায় এ কথাটি বলেছিলেন মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গীর। কাশ্মীরকে তিনিই প্রথম স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
লেখক : কবি, সংগঠক ও সাংবাদিক



