ভ্রমণ : প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নন্দনকলার ত্রিপুরা : খান মাহবুব

সব ঠিকঠাক থাকলে ঢাকা থেকে সড়ক কিংবা ট্রেনে চার ঘণ্টার মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ঘেরা ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় পৌঁছানো যায়―ভাবতেই বিস্ময় লাগে। বাংলাদেশের এত কাছে ভিনদেশের রাজ্যের রাজধানী মনে হলে ভাবনার জমিনে আনন্দের স্ফুরণ জাগে। বাংলাদেশের আখাউড়া বর্ডার থেকে আগরতলা শহর ১০-১৫ মিনিটের রাস্তা।
আগরতলা ছিমছাম ছোট শহর। ঐশ্বর্য নেই কিন্তু স্নিগ্ধতা আছে। শহরের পৌর এলাকার আয়তন ৭৬.৫০৪ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ৫ লাখ। অনেকটা পলিথিন ও আবর্জনামুক্ত শহর। রাস্তা যানজটমুক্ত। ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকায় কর্তৃপক্ষ উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয় না। শহরে ট্রাফিক পুলিশের আনাগোনা নেই, তবে সিগন্যাল অমান্য করলে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখে জরিমানার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে সুখকর হচ্ছে ত্রিপুরার বাঙালির পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের সঙ্গে চলনে-বলনে ভূষণে-ভাষণে সাযুজ্য রয়েছে। অনেকের পূর্বপুরুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও নোয়াখালী থেকে ত্রিপুরায় গিয়েছে, তাই জনজীবনে পূর্ববঙ্গের ছাপ লক্ষণীয়। খুব বেশি টাকা আয়ের ব্যবস্থা নেই ত্রিপুরায়। নগরজীবনে সেই চিহ্ন দৃশ্যমান। এখানকার মাটির গঠনে কুমিল্লার লালমাই পাহাড় অঞ্চলের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। ত্রিপুরা রাজাশাসিত এলাকা ছিল দেশভাগের আগে পর্যন্ত। ’৪৭-এর দেশভাগ পর্বে অনেক নাটকীয়তার মধ্যে ত্রিপুরা রাজ্য ভারতের অংশ হয়। বাংলাদেশের অংশ হওয়ার সুযোগও ছিল। দেশভাগ পর্বে ত্রিপুরার শেষ রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যের (১৯৪৭) সঙ্গে অনেক দেন-দরবার করে ১৫ অক্টোবর ১৯৪৯ ভারত সরকার রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এখনও শহরের পুরানো স্থাপনায় রাজাদের স্মৃতিমাখা। শহরের কেন্দ্রস্থলে রাজাদের বাসভবন, যা এখন জাদুঘর (উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ) হিসেবে ব্যবহৃত। ত্রিপুরার রাজাদের স্থাপত্যশৈলীতে হিন্দু-মুসলিম উভয় রীতির সম্মিলন দৃষ্ট। রাজপ্রাসাদটি বিশাল মোগল শৈলীর উদ্যানের সঙ্গে স্থাপিত। ত্রিপুরার রাজারা নন্দনকলার গুণমুগ্ধ ছিলেন এবং ইউরোপীয় শিল্প-সংস্কৃতির গুণগ্রাহী ছিলেন। এজন্য উজ্জয়ন্ত প্রাসাদে বাগান ও হ্রদ লক্ষণীয়। এখন এই ভবনে গেলে উত্তর-পূর্ব ভারতের বসবাসকারী সম্প্রদায়ের জীবনধারা, শিল্পকলা, সংস্কৃতির সন্ধান মেলে।
ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপকরণ সঙ্গত কারণেই রাজধানীর বাইরে। শহরের রাজ্যসভার ভবন ও রাজ্য অতিথিশালা বেশ নান্দনিক। রাজধানী থেকে বের হলেই বন-বনানী ও পাহাড়ঘেরা জায়গা। সবচেয়ে লোভনীয় পর্যটনকেন্দ্র নীরমহল। রাজধানী থেকে গাড়িতে দেড় ঘণ্টার দূরত্ব। ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের জন্য এই প্রমোদমহল নির্মাণ করেন। মহারাজার আভিজাত্যের ছাপ নীরমহলের পুরোটা জুড়ে। ১৯৩০ সালে নীরমহলের কাজ ব্রিটিশ কোম্পানি মার্টিন অ্যান্ড বার্ন-এর তত্ত্বাবধানে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৩৮ সালে। তৎসময়ের মূল্যে ১০ লাখ রুপি ব্যয় হয়েছিল নীরমহল নির্মাণে। মোগল ও হিন্দুরীতির মিশেলে তৈরি এই মহল আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধার বিষয় মাথায় রেখে নির্মিত। প্রাকৃতিক লেক রুদ্রসাগরের মাঝে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে এই মহলে মহারাজার জন্য বড় একটি অংশ এবং সৈনিক ও অন্যদের জন্য আলাদা অংশ রয়েছে। যোগসূত্রের জন্য সেতু রয়েছে। শুধু মহারাজা নয়, মহারানির জন্যও আলাদা সব ব্যবস্থা। নৌকাঘাট থেকে নাচমহল। মহারাজার সঙ্গে যোগসূত্রের কারণে এই মহলের নাম করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। জলাভূমির ভেতর একটা প্রাকৃতিক দ্বীপে এই মহল। চারদিকে থইথই জল। বর্ষাকালে জল প্রাসাদের গায়ে অনেকটা উঠে যায়। মহলের ভেতর নাচ-গানের ব্যবস্থা, কুস্তি খেলার আয়োজন হতো। বিভিন্ন স্থান থেকে বরেণ্য ব্যক্তি নীরমহলে মহারাজার অতিথি হয়ে আসতেন। নীরমহলে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ইংল্যান্ড থেকে সেই সময় তিনটি বড় জেনারেটর আনা হয়েছিল। নীরমহলে মহারাজা হরেক রকম গাছ রোপণ করেছিলেন। মহলের প্রায় চতুর্দিকে রাজবারান্দায় দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধ বায়ুসেবনের ব্যবস্থা আছে। উপরন্তু ভবনের ছাদে আছে ‘হাওয়ামহল’। এখানের নির্মাণশৈলীতে বায়ু ঘূর্ণিপাকের মাধ্যমে গায়ে লাগানোর প্রাকৃতিক কৌশল আছে। নীরমহলের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জনকোলাহলমুক্ত বিশুদ্ধ পরিবেশ, জনবিচ্ছিন্ন একটা ভূমি। ভারতের এ রকম জলমহল আরেকটি আছে রাজস্থানে।

নীরমহলের বিন্যাস অসাধারণ। নৌকা ভেড়ানোর জন্য মহারাজার ঘাট, মহারানির ঘাট, অতিথিদের সৈনিকদের ঘাট সবই আলাদা ও উপযোগী। মহারাজাকে অভিবাদন জানানোর জন্য মহারাজার ঘাটে রাখা হয়েছিল বিশেষ ব্যবস্থা। কোনও ত্রুটি নেই এই মহলের, তাই শতাব্দী পেরিয়েও নীরমহল দ্যুতি ছড়াচ্ছে। চাঁদনি রাতে রুদ্র সাগরঘেরা এই জলমহল যেন যমুনার বুকে তাজমহলের আরেক সংস্করণ।
ত্রিপুরার আরেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অমরপুরের ছবিমুড়া। রাজধানী আগরতলা থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে গোমতী নদীর পাশে বেলেপাথরের পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা হয়েছে বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা। উঁচু পাহাড়ের বন-বনানীঘেরা গোমতী নদীর ধারা ধরে নৌকায় যেতে হয় ছবিমুড়া। চারপাশ ছিমছাম নগর কোলাহলমুক্ত। নৌকা সর্পিল গতিতে ১০ মিনিট চললেই চোখে পড়বে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা প্রতিমা। কবে, কখন কে বা কারা এই শিল্পকর্ম করেছিল তার সঠিক তথ্য নেই। তবে ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালের এ অঞ্চলে বাস করা জমাতিয়া সম্প্রদায়ের রাজা চিচিংফাকের প্রপিতামহের রাজত্বকালে তৈরি হয় পাহাড়ের গায়ে এই শিল্পকর্ম। এই শিল্পকর্মের প্রধান আকর্ষণ জমাতিয়া উপজাতির চাকরাখমা দেবীর মূর্তি। ২০ ফুট উচ্চতার এই দেবীর ১০টি হাত দেখতে অনেকটা দুর্গাদেবীর মতো। গবেষকদের বর্ণনায় এই শিল্পকর্মের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনও মিল নেই। দক্ষিণ ভারতের আদলে গড়া এই শিল্পকর্ম এখানে কী করে এলÑ এ এক অপার বিস্ময়!
ত্রিপুরা রাজ্যে জলাভূমি কম। তবে আগরতলা থেকে বের হলেই টিলা ও পাহাড়ময় ভূমি। বৈচিত্র্যময় আদিবাসীর আবাস এখানে। আদিবাসীদের সংস্কৃতি যেমন প্রবেশ করেছে বাঙালির মধ্যে-এর চেয়ে ঢের বেশি সাংস্কৃতিক উপাদান প্রবেশ করেছে আদিবাসীদের জীবনাচরণে। ত্রিপুরার বাঙালিরা আদিবাসীদের বাঁশের মূল খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়েছে। ত্রিপুরার চা-বাগানগুলোয় সিলেট, মৌলভীবাজারের সাদৃশ্য। রাজধানী আগরতলা সমতল। শহরে রবিঠাকুর ও কাজী নজরুল বিষয়ের চর্চা আছে। শহরে তাদের ছবি রয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে কলকাতার পর বোধকরি আগরতলা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার অগ্রগণ্য কেন্দ্র। আগরতলার নাগরিক সমাজে এখনও ঢাকা ও কলকাতার চেয়ে কূটকচালি কম।

ত্রিপুরা হয়ে মেঘালয়, আসাম, মণিপুর, মিজোরাম সহজে যাতায়াত করা যায়। এমনকি এই পথে ভুটান ও নেপাল যাওয়া যায়। ঢাকা-ত্রিপুরা সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালু হলে ভারতের পূর্ব অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে।
ভারতের অন্যতম নিদর্শন হলো ভারতের খোদাইশিল্প। প্রাচীন খোদাইশিল্পের এক অন্যতম কেন্দ্র ত্রিপুরা রাজ্যের উনাকোটি। আগরতলা থেকে ১৮৫ কিলোমিটার দূরে উনাকোটি একটা শৈলশহর। পাথর কেটে হিন্দু দেব-দেবীর ছবি খোদাই করা আছে এখানে। উনাকোটি ইউনেসকোর হেরিটেজ তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। কথিত আছে উনাকোটি দেব-দেবীদের মিলনস্থান। এটি একটি তীর্থকেন্দ্র। উনাকোটির পাথর খোদাই করা মূর্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় আগ্রহের বিষয় শিবের মূর্তি। শিবের মাথার উচ্চতা ৩০ ফুট, শিবের মাথায় মা দুর্গাকে দেখতে পাওয়া যায়। এখানকার নীরব পরিবেশ। পাথর খোদাই করা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে নানা বিগ্রহ দেখে আপনিও বিমোহিত হবেন, এখানকার উদয়ন বৌদ্ধ বিহার, লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দিরসহ সমস্ত পরিবেশ পর্যটকদের জন্য মনোমুগ্ধকর। ত্রিপুরা রাজ্যে আরও দেখতে পারেন জাম্মুই পাহাড়, কমলাসাগর ও আগরতলা শহরের কুঞ্জবন প্রাসাদ। ত্রিপুরা রাজ্যের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষের চাপ নেই। পুরো রাজ্যে মাত্র ৪৫-৫০ লাখ মানুষের বাস। চলার পথে রাস্তার পাশে দোকানপাট, মানুষের জটলা নেই, ঘন ঘন হাটবাজার নেই। মানুষের চোখে বাংলাদেশের মানুষকে গ্রহণ করে নেওয়ার প্রশান্তি। মানুষের মধ্যে বৈষয়িকতার বিষয়টি অতটা এখন চেপে বসেনি। বাড়িঘর সাবেকিই বেশি। হাল আমলে কিছু ৪-৫ তলা ভবন নির্মাণ হচ্ছে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এখনও ত্রিপুরাকে খুব বেশি গ্রাস করেনি। কোচিং সেন্টার, ক্লিনিক, খাবারের যত্রতত্র দোকান, মার্কেট খুব একটা জেঁকে বসেনি। রাজধানী আগরতলায় টাউন সার্ভিস বাস নেই, ব্যক্তিগত গাড়িও কম। এখনও শহরের ফুটপাথ অধিকাংশ ঘাসে আচ্ছাদিত।
ত্রিপুরার রাজ্যসভার বিধায়ক সংখ্যা ৬০ জন, উপজাতিদের জন্য ১০টি আসন সংরক্ষিত। কেন্দ্রীয় লোকসভায় ত্রিপুরার জন্য বরাদ্দ মাত্র দুটি সিট। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলকাতা কিংবা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রচার না থাকলেও এটি একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলা ভাষা-সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা বিনিময়ের অবারিত দ্বার খোলা আছে। একটা দেশে যেসব উপকরণ ও সুবিধা নাগরিকদের জন্য থাকে, তার অনেকটাই আছে ত্রিপুরা রাজ্যে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পার্ক, চিড়িয়াখানা, জাদুঘর ইত্যাদি। আগরতলা শহরে শতায়ু কিছু প্রতিষ্ঠান টিকে আছে। উমাকান্ত একাডেমি এ রকম একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলোর প্রতি ভারত সরকারের উন্নয়নে নজর কম। এই দলভুক্ত ত্রিপুরা। তবে দীর্ঘদিন বাম শাসনের ফলে জনগণের শৃঙ্খলা ও সচেতনতা লক্ষ্যণীয়।
ত্রিপুরার মানুষের খাদ্যাভ্যাস আমাদের মতোই। তবে রন্ধনপ্রণালিতে ভিন্নতা রয়েছে। নদী ও বিল-ঝিল কম বলে অন্য রাজ্য, এমনকি বাংলাদেশ থেকে মাছ যায় ত্রিপুরায়। গোমতী নদী ছাড়া প্রাকৃতিক মাছের উৎস কম।

বাংলাদেশের সঙ্গে ত্রিপুরার এক বড় যোগসূত্র আছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সহায়তা করেছে ত্রিপুরা। এমনকি সীমান্ত থেকে হানাদার বাহিনীর গুলির আঘাতে প্রাণ গিয়েছে আগরতলা শহরের মানুষের। বাংলাদেশের সঙ্গে শুধু কম দূরত্বই নয়, নানাবিধ সুবিধাও রয়েছে―অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের। বাংলাদেশের সঙ্গে কলকাতাকেন্দ্রিক যে যোগাযোগ বলয় রয়েছে, তার ভিন্ন পথ হতে পারে আগরতলা। বিকল্প যোগসূত্রের সুবিধার প্রশস্ত সেই সম্ভাবনার জায়গা থেকে ভাবার সময় এখন। এছাড়া পর্যটকদের জন্য আসামের ঘন বন, শিলংয়ের পাহাড়-পর্বত, ঝরনা, জলপ্রপাত তো হাতছানি দিচ্ছে। আর দূরে দাঁড়িয়ে ডাকছে নেপাল ও ভুটান। সবকিছু আপনার অপেক্ষায়।



