আর্কাইভভ্রমণ গদ্য

ভ্রমণ : জোহানেসবার্গের রেস্তোরাঁয় ক্যাটওয়াক : মঈনুস সুলতান

আমি সুইমিংপুলের লাগোয়া ছত্রিতলে বসতে বসতে ফুল্ল ঝোপঝাড়ে ভরপুর কটেজটির দিকে তাকাই। শনের দোতলা বাড়িটিকে ভিউকার্ডে সাঁটা চিত্রের মতো দেখায়। বুয়ার সম্প্রদায়ের আফ্রিকান ভাষায় এ কটেজের খটোমটো একটি পোশাকি নামও আছে। আমি তা সহজে উচ্চারণ করতে পারি না, তাই এ বাড়িটির নতুন করে নামকরণ করেছি ‘পরের জাগা পরের জমি’। তাতে আমরা ঘর বাঁধিনি, কটেজটি মুফতে পেয়েছি, এবং সাময়িকভাবে সপরিবারে এখানে থানা গেড়েছি। এ পিকচারাস্ক বাড়িটির স্বত্বাধিকারী হচ্ছেন, জোহানেসবার্গে আমি ও আমার স্ত্রী শ্রীমতি হলেনের দীর্ঘদিনের বান্ধবী ইহোনিকার পিতা-মাতা। তার পেরেন্টসরা বছরমেয়াদি ফার্লোতে ‘হোম’ বা বিলাতে গেছেন। এদিকে ইহোনিকা যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে পোস্টডক্টর‌্যাল গবেষণার কাজ গোছাতে। আমরা তার পেরেন্টসদের এ কটেজে মাস কয়েক কাটাব। বিনিময়ে ইহোনিকা যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের ছোট্ট বাড়িটিতে বসবাস করবে।

 সুইমিংপুলের পাড়ে ইজিচেয়ারে বসে ভেসে আসা সুগন্ধে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠি। সৌরভটি ছড়াচ্ছে কাঁঠালি চাঁপার সাথে যেন ঝরা জেসমিনের মিশ্রিত আবহ। আমরা যে আবাসিক কমপ্লেক্সে এ মুহূর্তে বাস করছি, তা চৌদেওয়ারে উপরিভাগে ভাঙ্গা কাচ ও বিদ্যুতবাহিত তার দিয়ে সুরক্ষিত। এখানকার উদ্ভিদ, লতা, নানাবিধ পুষ্প, প্রজাপতি ও পতঙ্গের রকমভেদ বোটানিক্যাল গার্ডেনের লীলাবৈচিত্র্যকে হার মানায়। প্রতিটি কটেজে আছে একাধিক গ্যারেজ, তাতে বিত্তের ব্যঞ্জনা হয়ে রোদ-জোৎস্না উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমায় অনেক বছরের পুরোনো ভিনটেজ  কিংবা ছাদখোলা কনভার্টেবল কার।

আমাদের কটেজের কৃষ্ণাঙ্গ হাউস-কিপার বউল ভর্তি তপ্ত পপকর্ন নিয়ে এসে সুইমিংপুল সংলগ্ন লন-টেবিলে রাখে। পপকর্ন চিবাতে চিবাতে দেখি, লনের এক কোনায় গাছের ডালে  ঝোলানো দড়ির হ্যামোকে শুয়ে আমাদের কন্যা কাজরি। সে শুয়ে শুয়ে নোটবুক কম্পিউটারে কোনও মডেল মেয়ের ফটোগ্রাফে পোশাক-আশাকের অদল-বদল ঘটাচ্ছে। অতঃপর সে মেয়েটির দাঁড়ানোর ভঙ্গিমায় শরীরের রেখাকে উপস্থাপনযোগ্য করে, কসমেটিকের ভার্চুয়াল কৌটায় রঙতুলি চুবিয়ে, মেকাপ ঘঁষে ঘঁষে তাকে নারীশোভনভাবে ক্রমশ মোহনীয় করে তোলে। হাউস-কিপার ফের নিয়ে আসে ফ্রেঞ্চ প্রেস, তাতে ডার্করোস্ট কফি এয়েসা তেজস্বী সুগন্ধ ছড়ায় যে, চাঁপা ও জেসমিনের মিশ্রিত সৌরভ ঈভ টিজিং-এর উৎপাতে পালিয়ে যাওয়া কিশোরীর মতো ভেসে যায় অন্য দিকে। আমি কফিতে চুমুক দিয়ে দুপুরের রোদে পুরোমাত্রায় ফুটে ওঠা ত্রিবর্ণা পুষ্পের আচানক ঝাড়ের দিকে তাকাই। বিচিত্র এ ফুলগাছটি একযোগে তিন রঙের ফুল ফোটায়, এটি ‘ইয়েস্টারডে-টুডে অ্যান্ড টুমরো’ নামে পরিচিত। আমার দৃষ্টি এখানে স্থির হয় না, অন্য একটি ঝাড়ের ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে ষোড়শী একটি মেয়ের মস্তক, তার ব্লন্ড চুলে বসে নীল-সবুজ পালকে দারুণ রঙচঙে একটি টিয়াপাখি যেন উকুন খুঁটছে।

মেয়েটির নাম ডোলিনডো, কাজরির সাথে দিন কয়েক আগে তার বন্ধুত্বের সূত্রপাত হয়েছে। ডোলিনডোর জন্ম জোহানেসবার্গ শহরে, তবে এ কিশোরীটি বড় হয়েছে বিলাতের একটি অরফ্যানেজে, যেখানে অবিবাহিত পিতা-মাতার যেসব শিশু জন্মমুহূর্তে দাম্পত্য মমতায় ভরপুর সংসার থেকে খারিজ হয়, কেবল তারা অর্থের বিনিময়ে বাস করার সুযোগ পায়। এ অরফ্যানেজে কিশোরী ডোলিনডো নানা কারণে ছিল দারুণভাবে অসুখী। সে ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুঁজে বের করেছে সম্প্রতি তার জন্মদাতা পিতার ঠিকানা। এ ভদ্রসন্তানের নাম হেনরিশ আদ্রিয়ানসে ডিকক। তিনি সস্ত্রীক বাস করেন এ আবাসিক কমপ্লেক্সের আরেকটি কান্ট্রি হাউসে। ডোলিনডো ইমেইল মারফত যোগাযোগ করলে তিনি পিতৃত্ব স্বীকার করে নিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ পাঠান এয়ার টিকিট। তিন মাস আগে ডোলিনডো এখানে এসে পৌঁছেছে। পিতার ব্যাপারে সে নানা কারণে হোস্টাইল হয়ে আছে, তবে ডিকক সাহেবের স্ত্রী, তার সৎমা মিসেস সায়বেলা গারহারদুস-এর সাথে তার গড়ে উঠছে স্নেহময় সম্পর্ক।

 ডিকক ও সায়বেলা দম্পতির সাথে ইহোনিকার পরিবারের শুধু বন্ধুত্বই নয়, বিশেষ রকমের বিজনেস রিলেশন্সও আছে। আমরা তার পিতা-মাতার কটেজে বাস করতে আসছি, এ সংবাদ জানিয়ে ইহোনিকা ফোন করলে ডিকক ও সায়বেলা ঝুড়িতে করে শ্যাম্পেন ও স্মোকড স্যামোন নিয়ে এসে আমাদের ওয়েলকাম জানান। পরদিন তাদের কান্ট্রি হাউসে আমরা ব্রিজ খেলতে যাই, তখন কাজরির সাথে ডোলিনডোর পরিচয় হয়। কথাবার্তায় জানতে পেরেছি যে, ডোলিনডোর জননী একজন কৃষ্ণাঙ্গ মেইড বা ডমেসটিক ওয়ার্কার। তিনি কাজ করতেন ডিককদের কান্ট্রি হাউসে। ডোলিনডো তার পিতা হেনরিশ ডিককের শ্বেতকায় গাত্রবর্ণ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। তবে তার মায়ের তরফে পাওয়া কালো চুল এবং ঊরু ও পায়ের দিকে অনেকগুলো চিত্রাপাকরা কালো দাগ অরফ্যানেজে তার জন্য সৃষ্টি করেছিল দারুণ এক সমস্যা। তার সতীর্থ শ্বেতাঙ্গ ছেলেমেয়েরা তাকে পায়ে কালো দাগের জন্য ‘জিরাফের বাচ্চা’ ডেকে ক্ষেপিয়ে পীড়া দিত। মেয়েটি তার ঘন কালো চুলকে ঘৃণা করে। গতকাল সন্ধ্যায় কাজরি তার চুল ডাই করে তা বিবর্তিত করে দিয়েছে সোনালি ব্লন্ড কেশে।

 ডোলিনডোর কৃত্রিম সুবর্ণ কেশে সবুজ টিয়া পাখিটি স্নেহভরে খেলছে দেখে আমি প্রীত হই। পাখিটি এ সপ্তা দুয়েকে আমাদের দারুণ নেওটা হয়ে পড়েছে। খেচরটির সাথে আমাদের পয়লা সাক্ষাৎ ঘটে জোহানেসবার্গে এসে কটসউল্ড গার্ডেন নামে গেস্টহাউসে বসবাসের সময়। আমি বাগিচায় ছত্রিতলে বসেছিলাম, পাখিটি আমার কাছে এসে আফ্রিকান ভাষায় সম্ভাষণ করেছিল। তারপর বাহুতে বসে ঠোঁট ফাঁক করে খাবার চাইলে আন্দাজ করেছিলাম, এটি কোনও বুয়ার পরিবারের পিঞ্জিরা খালি করে পালিয়ে এসেছে। সন্ধ্যাবেলা পাখিটি জানালায় ঠোঁট দিয়ে খুটখাট ধ্বনি তুলে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। হলেন কপাট খুললে, সে কামরায় ঢুকে বসে পড়ে বেডসাইড টেবিলে রাখা একটি ঝুড়ির ওপর। এ ঘটনার পর থেকে টিয়াটি আমাদের সাথে বসবাস করছে। আমি তাকে ‘পলাতকা’ নাম দিয়েছি। পলাতকার সাথে ডোলিনডোর সখ্য গড়ে উঠছেÑব্যাপারটি আমি পজেটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছি। কফি পান করতে করতে ভাবীÑ সে যদি পলাতকাকে দত্তক নিতে চায়, আশা করি কাজরি তাতে রাজি হবে, আমারও এতে কোনও আপত্তি নেই।

 জোহানেসবার্গে আসা অবধি কাজরির মধ্যে কিছু পরিবর্তন আমরা লক্ষ করছি। সে ফ্যাশন ডিজাইনÑবিশেষ করে মেকাপ ও কসমেটিকস নিয়ে তীব্রভাবে মেতে উঠছে। একই সাথে স্কুলের একাডেমিক পড়াশোনার ব্যাপারে ক্রমশ হচ্ছে নির্লিপ্ত। সুগার বে-তে ফ্যাশন ডিজাইনের ওপর ওয়ার্কশপে যোগ দেওয়ার সুবাদে তার স্থানীয় একটি মেয়েদের মডেলিং স্কুলের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তারা তাকে এপ্রেনটিস হিসাবে মেকাপ আর্টের অনুশীলন করতে উৎসাহিত করেছে। তার চরিত্রের যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রীত করেছে, তা হলো অন্য কারও সংকটে সে সহানুভূতির সাথে উদ্যোগ নিয়ে কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করছে। ডোলিনডো বয়সের দিকে থেকে তার চেয়ে তিন বছরের বড়। বয়সের এ ব্যবধান তাদের বন্ধুত্বে অন্তরায় সৃষ্টি করেনি। বিলাত ছেড়ে পিতা মি. হেনরিশ ডিককের কাছে ফিরে আসার পর ডোলিনডোর আবেগসঞ্জাত সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। সে তার জন্মদাত্রী জননীর সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছিল। ডিকক সাহেব তাকে খুঁজেও বের করেছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গ এ মহিলা বর্তমানে জোহানেসবার্গের হলিডে ইন নামে একটি হোটেলের রুম সার্ভিসে কাজ করছেন। তার সাথে যোগাযোগ করার প্রয়াসে ডোলিনডো মা-কে রিং করেছিল। তো মহিলা তাকে চিনতে পারেন, তবে তার সাথে সাক্ষাতের কোনও আগ্রহ দেখান না। এতে মেয়েটি এত আঘাত পেয়েছে যে, রাত্রিবেলা তার ঊরু ও পায়ের ছোপ ছোপ কালো দাগে ব্লেড দিয়ে কাটাকুটি করে প্রচুর রক্ত ঝরায়। কাজরি বিষয়টা জানতে পেরে এগিয়ে যায় ইমোশনাল সাপোর্ট দিতে। গেল সন্ধ্যায় মেয়ে দুটি আমাদের এখানে সময় কাটিয়েছে, উল্কির নানারূপ ডিজাইনের বইপুস্তক ঘেঁটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা আগামী সপ্তাহে একটি ট্যাটু পার্লারে যাবেÑওখানে ডোলিনডো তার পা ও ঊরুতে কয়েকটি উল্কি আঁকিয়ে নেবে যাতে কাটাকুটির দাগ ঢাকা পড়ে।

কাজরি চাকাওলা একটি স্যুটকেসে মেকাপের নানাবিধ সাজসরঞ্জাম পুরে, ডোলিনডোর সঙ্গে ডিকক ও সায়বেলার কান্ট্রি হাউসে যাওয়ার জন্য আমাদের কাছে পারমিশন চায়। তাদের বাড়িটি এ কমপাউন্ডের অন্য প্রান্তে, তবে হাঁটা দূরত্বে।  তাকে পৌঁছে দিয়ে মিনিট দশেক পর হলেণ ফিরে আসলে, আমি আজ বিকালে অনুষ্ঠিতব্য একটি ইন্টারেস্টিং প্রোগ্রাম সম্পর্কে অবগত হই। যে মডেলিং স্কুলের সাথে কাজরির যোগাযোগ হয়েছে, তারা আজ অপরাহ্নে কয়েকটি শিক্ষানবিশ মেয়ের জন্য জোজি গার্ডেন-রেস্তোরাঁর আঙ্গিনায় ক্যাটওয়াকের আয়োজন করেছে। এ ক্যাটওয়াকের ইভেন্টে যে ছয়-সাতটি মেয়ে রানওয়ের ওপর দিয়ে হাঁটবে, তারা সকলেই বয়সের দিক থেকে টিনএজার, এবং মানসিকভাবে বিপন্ন। এদের কেউ ভুগছে ডিপ্রেশনে, কারও নিজের চেহারা মনঃপূত না হওয়ার কারণে আক্রান্ত হচ্ছে ক্রনিক দুশ্চিন্তায়, আবার কোনও কোনও মেয়ে এডিএইচডি বা অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার এক্টিভিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছে। যে পেশাদার সাইক্রিয়াটিস্টের কাছ থেকে এরা চিকিৎসা সাপোর্ট পাচ্ছে, তিনি মডেলিং স্কুলের সাথে কথাবার্তা বলে এ ইভেন্টের আয়োজন করেছেন। উপসংহারে হলেন আরও জানায় যে, আজকের ক্যাটওয়াকে ডোলিনডো সুদর্শন পোশাক-আশাকে সজ্জিত হয়ে রানওয়েতে হাঁটবে। কাজরি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছে ডোলিনডোর মেকাপ করে দেওয়ার।

মডেলিং পারফরমেন্সের এ ইভেন্টে অন্য পেরেন্টসদের সাথে আমরাও আমন্ত্রিত। তাই লাঞ্চের পর খানিক গড়িয়ে আমরা রওয়ানা হই ডিকক ও সায়বেলার কান্ট্রি হাউসের দিকে। বিলাতে গ্রামীণ নিবাসের কায়দায় তৈরি বাড়িটি প্রচুর গাছপালায় ছায়াচ্ছন্ন এক উপবনের মধ্যিখানে আইভি লতার গাঢ় সবুজ ঘোমটা পরে দাঁড়িয়ে আছে। মারণাস্ত্রওলা দারোয়ান আমাদের নিয়ে আসেন কান্ট্রি হাউসটি ছাড়িয়ে পিছনের সুবৃহৎ আঙ্গিনায়। ওখানে কাচের গ্রিনহাউসের দোরগোড়ায় সাক্ষাৎ মেলে শীর্ণকায় নীলচোখা শ্বেতাঙ্গ হেনরিশ ডিকক সাহেবের। মানুষটি আচরণে উষ্ণ, অকারণে হাসেন, সম্ভবত বিশ্বাস করেন গ্রহ-নক্ষত্রের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায়। আমাদের দেখতে পেয়ে হাতের দশ আঙ্গুলে গোটা পাঁচেক রত্ন পরা আঙটি ঝলকিয়ে করমর্দন করেন। তার পায়ে পায়ে ঘোরে সাদা লোমরাজিতে কালো কালো ফুটকিওলা একটি ডালমেশিয়ান প্রজাতির কুকুর। আমরা গ্রিনহাউসের ভেতর ঝুলন্ত অর্কিডের তলায় পেতে রাখা বেতের সোফায় বসি। এক পেয়ালা চা পেলে গল্পগুজবে জোশ আসত, কিন্তু ডিকক সাহেবের খানসামা স্ফটিকের ডিক্যান্টার থেকে ঢেলে পরিবেশন করেন পিনোনোয়ার। আমরা মিহি ফ্লেভারের লোহিত বর্ণ মদিরায় চুমুক দিতে দিতে জানতে পারি, ডিককদের নিজস্ব ভিনইয়ার্ডে প্রতি বছর উৎপন্ন হয় অজস্র দ্রাক্ষা। তার খানিকটা ওয়াইনারির নিষ্পেষণ প্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হয় পিনোনোয়ারে। রপ্তানিযোগ্য পিনোনোয়ারের শিশি-বোতল উৎপাদন ছাড়াও তার পরিবারের মালিকানায় আছে ম্যাকাডেমিয়া নাট বা এক ধরনের বাদামের একাধিক বাগান। এছাড়া কেপটাউনের কাছাকাছি সমুদ্রতীরে আছে তাদের বিঘা দুই জমি। ওখানকার গ্রিনহাউসে জন্মানো আর্কিডেরও নাকি জগৎজোড়া সুনাম আছে। এসব দেখভাল করেই দিন গুজরান করেন ডিকক মহোদয়, অন্য কিছু করার তেমন কোনও ফুরসৎ পান না।

ডিকক সিগার লাইট করে নার্ভাসভাবে তা স্মোক করতে করতে আমার পেশা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। আমি লেখক জানতে পেরে উৎসাহের সাথে বলেন, এ তথ্যটি তিনি ইহোনিকার কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। জীবনে কখনও কোনও লেখকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি, তবে একজন লেখকের সাথে একটা বিষয়ে তার পরামর্শ করার প্রয়োজন আছে। খানসামা এসে আফ্রিকান ভাষায় ফিসিফিসিয়ে কিছু বললে ডিকক ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘চলুন আপনাদের আমার ডারলিং স্ত্রী সায়বেলার কাজকর্ম একটু দেখাই। পরে লেখা নিয়ে কথা বলব।’

আমরা তার সাথে হেঁটে হেঁটে চলে আসি বিদ্যুৎবাহী ফেন্স দিয়ে ঘেরা খোলামেলা একটি পরিসরে। দেখি তার স্ত্রী সায়বেলা রোদচশমা চোখে একটি চিতাবাঘের লোম আঁচড়ে দিচ্ছেন। তার মুখের সামনে ছড়ানো মাংসের গাব্দাগোব্দা টুকরা। পাশে বসে থাকা অন্য একটি চিতা আমাদের দেখে বিরক্ত হয়ে উঠে পেছন ফিরে চলে যায় ফেন্সের দিকে। চেহারা-সুরতে সায়বেলা অশ্বেতাঙ্গ, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে তিনি মিক্সড রেসের অন্তর্ভুক্ত, এদের সাউথ আফ্রিকার পরিভাষায় বলা হয় ‘কালারড’। চোখের সামনে জোড়া চিতাবাঘের উপস্থিতিতে আমরা অস্বস্তিবোধ করলে তিনি হেসে আশ্বস্ত করেন, ‘এক সময় আমি ডিককদের একটি সাফারি পার্কে চিতাগুলোর দেখভাল করতাম। সো, ফিয়ার নট, আতঙ্কিত হওয়ার আদৌ কোনও কারণ নেই, আই নো হোয়াট আই অ্যাম ডুয়িং।’

কথাবার্তায় আমি বিশেষ ভরসা পাই না, তবে এটিকেট বজায় রেখে মন্তব্য করি, ‘দে আর অ্যা পেয়ার অব লাভলি চিতাজ,  মিসেস সায়বেলা। আপনি এদের ব্রিড করিয়েছেন কি ?’ তিনি হেসে জবাব দেন, ‘দ্যা স্টোরি ইজ অ্যা লিটিল মোর রোমান্টিক, আমার লাভলি হাজব্যান্ড হেনরিশ ডিকক আমাদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকীতে চিতার জোড়া বাচ্চা কিনে আমাকে উপহার দিয়েছে।’ হলেন এ পর্যায়ে জানতে চায়, ‘এদের নাম কী ?’ জবাব আসে, ‘যে সাফারি পার্কে এদের জন্ম, ওখানকার ব্রিডার ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তিনি ইন্ডিয়ান ল্যাংগুয়েজে এদের নাম দিয়েছেন বাঘেরা ও শেরশেরা। হাউ ডু লাইক দেয়ার নেমস্ গাইজ’ বলে মহিলা আমার দিকে তাকালে আমি চিতাজনিত নার্ভাসনেস চেপে গিয়ে জবাব দিই, ‘সাউন্ডস ডিগনিফাইড। আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন সাচ্চা প্রজাতির চিতাবাঘের বাচ্চাদের এ ধরনের জমকালো নাম হওয়াই উচিত।’ সায়বেলা চোখ থেকে কালো চশমা খুলে নিয়ে আমাকে নজর করে দেখে বোঝার চেষ্টা করেনÑআমার মন্তব্যটি আদতে মজাক কি না।

চিতা-চরা ভূমি থেকে আমরা ফিরি বাগানের ভেতর দিয়ে। দেখি, পথের পাশে একটি ছত্রিতলে চেয়ারে চোখ মুদে বসে ডোলিনডো। সামনের টেবিলে থরে বিথরে রাখা প্রসাধন সামগ্রীর হরেক রঙের কৌটা। কাজরি তুলি হাতে চিত্রকরের নিবিড় মনোযোগে ডোলিনডোর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে দিচ্ছে মেকাপের বর্ণিল টাচ। সায়বেলা আমাদের দিকে ফিরে বলেন, ‘ইয়োর ডটার ডাজ হ্যাভ অ্যা গুড ফ্যাশন সেন্স গাইজ।’ তিনি হলেনকে সাথে নিয়ে কান্ট্রি হাউসের দিকে ছোটেন ডোলিনডোর জন্য গাউন চুজ করতে।

আমি ডিকক সাহেবের সাথে হেঁটে হেঁটে টেনিস কোর্টের পাশ দিয়ে আগ বাড়ি। দেখে-শুনে মনে হয়, তার ব্যক্তিগত উপবনটি আকারে প্রকারে বেজায় বড়। চতুুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেড়ে উঠেছে বুশউইলো প্রজাতির বৃক্ষরাজি। পেপার বার্ক আকাশিয়া গাছের ডালে ডালে নীড় বুনেছে সোনালি শামওয়ারি পাখি। প্রকাণ্ড ব্লু গাম গাছের তালায় একটি মরচে পড়া ছোট্ট এরোপ্লেন পড়ে আছে। অপরাজিতার লতানো ঝাড়ে জড়িয়ে আছে হাওয়াই জাহাজটি। একটি কাঠের বেঞ্চে বসে ডিকক তার আধপোড়া সিগারের ছাই ঝেড়ে তা ফের লাইট করে বলেন, ‘এ প্লেনে চেপে ছোটবেলা আমরা রোডেশিয়ার ভিক্টোরিয়া ফলসে পিকনিক করতে যেতাম।’

আমি লঝজড় উড়োজাহাজ সম্পর্কে কোনও আগ্রহ না দেখিয়ে জানতে চাই, ‘মি. ডিকক, আপনি একজন লেখকের সাথে কী যেন পরামর্শের কথা বলেছিলেন’ তিনি ‘ওহ ইয়েস’ বলে ব্লু গাম গাছে খোঁড়ল খুদা ঠুকঠুকানো কাঠঠোকরার দিকে তাকিয়ে  ম্লান হেসে বলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট গেট মি রং। আমি শ্বেতাঙ্গ বুয়ার, লোকজন আমাকে মিলিওনিয়ার বলে থাকে। বাট আই অ্যাম নট অ্যা রেসিস্ট। আমার ছেলেবেলায় সাউথ আফ্রিকায় বর্ণবাদ চালু হয়, ব্যাপারটা আমি পছন্দ করিনি। ইট এফেক্টটেড মাই লাইফ সো মাচ। ভাবছি এ বিষয়টা নিয়ে অটোবায়োগ্রাফিক স্টাইলে একটি বই লিখব, বাট আই ডোন্ট নো হাউ টু রাইট। সো লুকিং ফর হেল্প।’

আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বলি, ‘আপনার জীবনের কোনও বিশেষ ঘটনা আছে কী, যা প্রস্তাবিত বইটিতে আপনি ফোকাস করতে চান ?’ তিনি উড্ডয়ন-রহিত উড়োজাহাজটির দিকে ইশারা করে বলেন, ‘আমার বয়স তখন সতেরো। প্লেনটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে বছর তিনেক হলো। আমার বাবা তা সারাই করাতে আগ্রহ হারিয়েছেন। আমরা চুপিসারে প্লেনের কেবিনে ঢুকে দুপুর বেলা সময় কাটাচ্ছি। শি ওয়াজ ব্ল্যাক অ্যাজ মুনলেস নাইট স্কাই…, ওয়ান্ডারফুল ফিজিক, দারুণ ফিগার, শি ওয়াজ ফিফটিন, অ্যান্ড আই লাভড হার।’ শুনে আমি সরাসরি প্রশ্ন করি, ‘হু ওয়াজ শি হেনরিশ ?’

ডিকক জবাব দেন, ‘ডোলিনডোর মা, আমাদের কান্ট্রি হাউসে সে পরিচারিকার কাজ করত। দুপুরে ছিল তার অফ ডিউটি আওয়ার, তখন আমরা প্লেনের কেবিনে সঙ্গোপনে অন্তরঙ্গ হতাম। আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম, অ্যান্ড ইট ইজ ট্রু …, বিবাহেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।’ কোনও দ্বিধা না করে আমি দ্বিতীয় প্রশ্নের বাণ ছুড়ি, ‘তো তাকে বিয়ে করেননি কেন হেনরিশ ?’ জবাব আসে, ‘তখনও দেশে এপারটাইট বা বর্ণবিভাজন চলছে, প্রথাগতভাবে বিয়ে করলে আমাকে ও তাকে জেলে যেতে হতো। আমাদের বিয়ে করার লিগ্যাল বয়সও হয়নি যে, অন্য দেশে পালিয়ে গিয়ে ম্যারেজ রেজিস্টারের দ্বারস্থ হব।’

ডিকক উঠে পড়ে কান্ট্রি হাউসের দিকে হাঁটতে শুরু করলে আমি পাশ থেকে মন্তব্য করি, ‘আরও কিছু তথ্য দিতে পারেন হেনরিশ, বই শুরু করতে হলে কাহিনির একটা অ্যাংকার তো লাগবে।’ তিনি একটু উত্যক্ত হয়ে জবাব দেন, ‘আই ডোন্ট নো হোয়াট ইউ মিন বাই অ্যাংকার, সে অ্যাবরসন করাতে রাজি হয়নি। কিন্তু ডোলিনডোর জন্মের পর তাকে বেবি ব্লুজ-এর ডিপ্রেশন এমনভাবে কাবু করেছিল যে সে বাচ্চাটির মুখ দেখতেও অস্বীকার করে। তো আমার পেরেন্টসরা বিলাতের অরফ্যানেজের সাথে ব্যবস্থা করে ছোট্ট শিশুটিকে ওখানে পাঠান। নাউ আই অ্যাম গ্ল্যাড দ্যাট ডোলিনডো ইজ ব্যাক টু মি.. এন্ড আই লাভ হার।’ ডিকক ‘দ্যাটস ইট’ বলে অতঃপর ঢুকে পড়েন কান্ট্রি হাউসের পার্লারে।

মিনিট বিশেকের ভেতর সব কিছু গোছগাছ করে আমরা ডিককদের স্টেশন ওয়াগনে চাপি জোজি গার্ডেন রেস্তোরাঁটির উদ্দেশে। মাঝের সিটে হেনরিশ ডিকক বসেছেন আমার হলেনের সঙ্গে। সায়বেলা কাজরি ও ডোলিনডোর সাথে পিছনের সিটে। ক্যাটওয়াকের কথা ভেবে নার্ভাসনেসে ডোলিনডো আড়ষ্ট হয়ে বসেছে। সে সায়বেলাকে জড়িয়ে ধরে উদ্বেগ জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘আই ওয়ান্ট দ্যা প্যারোট। পলাতকা আমার সাথে গেলে আমার এ রকম এংজাইটি হতো না।’ হলেন ঘাড় ফিরিয়ে তাকে আশ্বস্ত করে, ‘সুইটহার্ট, গার্ডেন রেস্তোরাঁ থেকে ফিরে আমরা পলাতকাকে তোমাদের কান্ট্রি হাউসে পৌঁছে দেব।’

ডিকক সাহেব আমার আঙ্গুলে পরা সোনালি এম্বার ও নীলাভ লাপিসলাজুলি পাথরের আঙটি দুটির দিকে ইঙ্গিত করে ফিসফিসিয়ে জানতে চান, গ্রহনক্ষত্র বিছরিয়ে পাথর ধারণ করলে সৃজনশীল লেখাজোকাতে প্রেরণা পাওয়া যায় কি না ? তাকে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু বক্তব্য গুছিয়ে ওঠার আগেই সড়কের কেওস-কোলাহলে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়। ট্রাফিক জ্যামে স্টেশন ওয়াগনটি দাঁড়িয়ে পড়ে। সাইরেন বাজিয়ে সারিবদ্ধ যানবাহনগুলোর ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে ছুটে যায় পুলিশের দুটি ভারী মোটরবাইক। সড়কের পাশের পেভমেন্টে দাঁড়িয়ে খাটো ঝুলের স্কার্ট পরা বারো-চৌদ্দ জন সেক্স ওয়ার্কার। তারা জ্যামে আটকে পড়া যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রিপু উদ্দীপক অঙ্গভঙ্গি করলে একজন কনস্টেবল এগিয়ে গিয়ে তাদের শাসন করতে চেষ্টা করে।

দেখি শজারুর ছবি আঁকা টি=শার্ট পরে কয়েকটি যুবক গাড়িগুলোর জানালায় গিয়ে চাঁদা চাচ্ছে। দুটি যুবক এসে আমাদের গাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে চাঁদা ডিমান্ড করে। তো হলেন তাদের কাছে জানতে চায়, ‘হোয়াট ফর ?’ একটি ছেলে হাসি মুখে জবাব দেয়Ñ‘টু ক্লিয়ার দ্যা রোড ম্যাম, জোহানেসবার্গ পর্কোপাইনস্ আর অ্যাট ইয়োর সার্ভিস।’ ডিকক সাহেব ইশারায় হলেনকে চুপ করতে বলেন। তিনি অতঃপর নীরবে ছেলেদের হাতে তুলে দেন পঞ্চাশ রেন্ডের নোট।

শজারু ক্লাবের সদস্যরা তাদের কথা রাখে। কিছুক্ষণ পর ট্রাফিক পুলিশের মতো হুইসেল বাজিয়ে চাঁদা দেওয়া গাড়িগুলোকে আগ বাড়ার বন্দোবস্ত করে দেয়। বিকেলের রোদ মরে যাওয়ার আগেই আমরা এসে পৌঁছি জোজি গার্ডেন রেস্তোরাঁয়। এখানকার বাগানটি দেয়াল ঘেরা, তবে প্রশস্ত ও খোলামেলা। ছত্রিতলে বসার বন্দোবস্তটি আরামদায়ক। উদ্যান বিন্যাসে জ্যামিতিক নক্সার চেয়েও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে পুষ্পিত ঝোপঝাড়ের স্বাভাবিক বিকাশকে। তার ভেতর দিয়ে বর্ণাঢ্য পোশাক পরা টিনএজার কিশোরীরা ছোটাছুটি করছে। তাদের মা-বাবা ও গোটা কতক বান্ধবীরাও এসেছে। আমরা একটি ফোয়ারার পাশে বেতের চেয়ারে বসি। পরিবেশন করা হয় ইংলিশ কেতার হাই-টি। তানজানিয়ার সৌরভ ছড়ানো চায়ের সাথে আমরা অলিভের নোনা পেস্ট মাখানো পাউরুটি চাখি। চা চায়ের প্রথম পেয়ালা শেষ করার আগেই পায়ে চলার পথে রেড কার্পেট বিছিয়ে তৈরি করা হয় ক্যাটওয়াকের রানওয়ে। মেয়েগুলোর সাইক্রিয়াটিস্ট মহাশয়ও এসেছেন। তার মাথায় ভাসকো ডা গামার টুপির মতো দেখতে একটি বিদঘুটে ক্যাপ। তিনি টেবিল থেকে টেবিলে হেঁটে গিয়ে, বড়কর্তার বিনয়ে  সকলের সঙ্গে হাতটাত মিলিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ার জন্য মোবারকবাদ জানিয়ে বলেন, ‘কনগ্রাচুলেশন্স, ইয়োর ডটার ইজ গোয়িং টু পারফর্ম রিয়েলি গ্রেট টুডে, আই অ্যাম টেলিং ইউ…দ্যা ইভেন্ট ইজ গোয়িং টু বি মেমোরেবল।’ 

রেস্তোরাঁর প্রাইভেট পার্টি হলকে মেয়েগুলো সাজগোজের জন্য গ্রিনরুম হিসাবে ব্যবহার করছে। হলেন ও সায়বেলা উঠে যায় গ্রিনরুমে কী হচ্ছে তা দেখতে। একটু পর হলেন ফিরে এসে বলে, ‘ডোলিনডো ইজ স্টিল শোয়িং সাইনস অব নার্ভাসনেস। রানওয়েতে গিয়ে যাতে তার প্যানিক অ্যাটাক না হয়, এজন্য সাইক্রিয়াটিস্টের পরামর্শ মোতাবেক সায়বেলা তাকে রিলাক্সসেশনের ক্যাপসুল খাইয়েছেন।’ শুনে ডিকক সাহেব বুকে ক্রুশচিহ্ন এঁকে মিরমিরিয়ে বলেন, ‘লেটস ক্রস আওয়ার ফিংগারস, যিশাস..আওয়ার লর্ড, প্লিজ হেল্প দ্যা গার্ল।’

 টিপট থেকে পেয়ালায় আরেকটু চা ঢেলে হলেন ফিসফিসিয়ে বলে, ‘ইয়োর ডটার ইজ অল ইনটু ফ্যাশন। গ্রিনরুমে গিয়ে দেখে আসো, কাজরি ইজ হেল্পিং গার্লস টু চুজ রাইট কাইন্ড অব গাউনস।’ কাজরি প্রথামাফিক লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফ্যাশনের দিকে ঝুঁকছে, এ ব্যাপারটা আমাকে উৎকণ্ঠিত করে না মোটেও। ফ্যাশন আমার কাছে দিনযাপনে নিজেকে উপস্থাপন করার মুখোশ বিশেষ, এ আচরণে নাখোশ হওয়ার তো কিছু দেখি না।

ঝোপঝাড়ের আবডালে লুকানো সাউন্ডবক্স থেকে বেজে ওঠে চমৎকার একটি নৃত্যপ্রধান মিউজিক কম্পোজিশন।  সাইক্রিয়াটিস্ট মহোদয় যেন সার্কাসের জোকারের পার্ট করছেন, এ রকম ভঙ্গিতে নত হয়ে সবাইকে বাও করে মাথা থেকে খুলে নেন বেমক্কা ডিজাইনের ক্যাপটি। তা থেকে বেরিয়ে এসে পাখা ঝটপটিয়ে শূন্যে ডানা মেলে একটি শ্বেত কপোত। আর রানওয়ে হিট করে আকাশ-নীল গাউন পরা একটি কিশোরী। মেয়েটির চোখে আলো পড়া রত্নের মতো খেলা করছে অস্থিরতা। সে কাঁধের ভঙ্গিতে বুকের কাছে কুঁচি দেয়া ফ্রিলে ঊর্মি তুলে অ্যাপিল ছড়ানোর চেষ্টা করলে, তার বান্ধবীরা হাততালি দিয়ে সাধুবাদ জানায়। রানওয়েতে আসা পরের বালিকাটির চোখ-মুখ থেকে ছড়ায় মেঘলা মাঠের ভিজে বিষণ্নতা। তবে পিংক গাউন পরে হাল্কা চালে সে ক্যাটওয়াক করলে পুরো বাগানে ছড়িয়ে পড়ে এক ধরনের সেনসেশন। পাশের টেবিল থেকে পাইপ ফোঁকা এক পুরুষ গার্জিয়ান মুখ ফসকে বলে ফেলেন, ‘দ্যা গার্ল ইজ রিয়েলি প্রিটি, অ্যা রিয়েল হার্ট ব্রেকার।’

উতরোল হয়ে বাজছে মিউজিক। তৃতীয় মেয়েটির রানওয়েতে আসতে কেন জানি দেরি হচ্ছে। ফোয়ারার ঝরে পড়া জলের দিকে তাকাতেই ঝিক করে আমার করোটিতে ভেসে ওঠে, আসার পথে দেখা পেভমেন্টে দাঁড়ানো কৃষ্ণাঙ্গ সেক্স ওয়ার্কারদের দৃশ্যপট। ভাবি, শ্বেতাঙ্গ কিশোরীরা ক্যাটওয়াকের এক্সাইটিং আমেজে এখানে চমৎকার একটি অপরাহ্ন কাটাচ্ছে, আর এ নগরীর অন্যত্র গোটা কতক কৃষ্ণাঙ্গ সেক্স ওয়ার্কারের শরীর হয়তো এ মুহূর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে খদ্দেরদের রিপুতাড়িত অভিলাষে।    

আমার প্রতিফলন দানা বাঁধার ফুরসত পায় না, সাইক্রিয়াটিস্ট মহোদয়ের হাত ধরে টলোমলো পায়ে রানওয়ের লাল গালিচায় এসে দাঁড়ায় ডোলিনডো। তার নার্ভাস অভিব্যক্তিতে আমরা প্রমাদ গুনি। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে সে ক্যাটওয়াকে এক-পা দু-পা করে আগ বাড়ে। পাশের টেবিল থেকে পাইপ ফোঁকা পুরুষ আওয়াজ দেন, ‘দ্যা গার্ল লুকস গ্রেসফুল।’ সাদা গাউন পরায় মেয়েটিকে সত্যি নিষ্পাপ দেখায়। সে লাজুক মুখে গ্রীবা তুলে দর্শকদের দিকে তাকালে, গোধূলির আলো পড়ে তার চোখমুখ মায়াবি হয়ে ওঠে। ভালোয় ভালোয় সে গ্রিনরুমে ফিরে গেলে আমরা হাঁপ ছেড়ে ডিকক ও সায়বেলাকে কংগ্রাচুলেট করি। তারাও ‘থ্যাংকস লর্ড’ বলে মাথা ঝুঁকিয়ে জবাব দেন।

 লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button